মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বাঙালনামা - ২ ~ তমাল রাহা

অনেকদিন বাদে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর একটা সুযোগ পাওয়া গেছে। ফুটবল খেলা যেখানেই থাকি না কেন দেখেছি, দেখি। হয় মাঠে গিয়ে, নয় টেলিভিশন-এর পর্দায়। কিন্তু কলকাতার ফুটবল কে খুব মিস করতাম। কিন্তু গত কয়েকমাস ধরে আমার লাইফ পুরো ঝিঙ্গা-লালা।

বদলে গেছে অনেক কিছুই, আগে ছিল রেডিও, তারপর সাদা-কালো টেলিভিশন, আস্তে আস্তে তাতে রঙের প্রলেপ পরল। আগে সংবাদপত্রে মতি নন্দী, আর এখন ….. থাক সে কথা। আসলে প্রফেশন ব্যাপারটা কে ভালো-না-বসলে কোয়ালিটি ব্যাপারটায় কম্প্রমাইজ করতেই হয়।

দুর্গাপুরে থাকাকালীন মোহনবাগানী বন্ধু বেশি ছিল। কেন জানি না, এইসব মাচা-লোটা, এই শব্দগুলো অজানা ছিল। বাঙাল-ঘটি আর ইলিশ-চিংড়ি র মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তর্ক। বদলে গেছে সত্যি অনেক কিছুই! তখন ময়দানে দুটো কাগজ বেরোতো, মোহনবাগানের খেলার দিন 'গড়ের মাঠ' আর ইষ্টবেঙ্গলের দিন 'অলিম্পিক'। দলবদল আর ক্লাব কেচ্ছা ছাড়া .... ঐ কাগজ গ্যালারীর কাঠে পেতে বসা আর রোদ ঠেকানোর কাজ-ও হতো। আজকাল তো দেখি না আর ….
পাড়ায় একটাই টেলিভিশন, কল্যাণ-দা দের বাড়িতে। কিন্তু মোহনবাগান গোল খেলেই টেলিভিশন বন্ধ। অগত্যা ভরসা রেডিও। রেডিও তা ছিল বহুদিনের সাথী। বারাকপুর এ আসার পরেও শুরুর দিকে টেলিভিশন ছিল না। দল বেঁধে রেডিও শোনা হতো, বাড়ির উঠোনে। বারাকপুর এ আবার বাঙালের সংখ্যা বেশি। আমি, জেঠু, জেঠুর বন্ধুরা আর পড়ার অনেক পোলাপান। মাঝে মাঝে ঠাম্মা বা জেঠিমা এসে জিগ্যেস করতেন "কেডায় গোল দিসে?" ওদের আগ্রহটা ঐখানেই শুরু আর ঐখানেই শেষ। মনে আছে একবার রেডিও তে গোল শুনে শংকর-দার বাবার কি নাচ, খেয়াল-ই নেই যে পরণের লুঙ্গিটা ভুমিসজ্জা নিয়েছে!

বাংলায় ধারাভাষ্য কোনকালেই খুব একটা উচ্চমার্গের ছিল না , কিন্তু একটা অদ্ভূত ভালো লাগা ছিল।

কতকাল হয়ে গেল, বিকেল তিনটে
কাঠের রেডিও, তার নবটা পাল্টে
বন্ধ হলো সবে অনুরোধের গান,
খেলা ইস্ট বেঙ্গল আর মোহনবাগান।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ছোঁয়া আসার পরেও অনেক কে বলতে শুনেছি "ও: জংলার ফ্রি কিকটা মনে আছে (অবশ্য যে দেখেছে সে জীবনে ভুলবে না)। আমাগো বেকহ্যাম লাগতো না।" পাশ থেকে জেঠু মাথা নাড়তেন আর বলতেন সামাদ সাহেবের গপ্পো। দুবার নাকি বারপোস্ট শট লাগার পর রেফারি কে গিয়ে বলেছিলেন, "বারপোস্ট ছোট", তারপর মেপে নাকি দেখা গেল সত্যি তাই ! অব হযে শুনতুম।

আবেগপ্রবণ বাঙালি। তাই ধারাবিবরণী তে সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটত স্বাভাবিক ভাবেই। সেটা বোধহয় ২০০৬, ওয়ার্ল্ড কাপ চলছে তখন। ব্রেজিল ফ্রান্সের কাছে হেরে গেল। টিভি চ্যানেলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষন। একটি চ্যানেলে পিকে-র বক্তব্য - ... কাকা এক একটা স্ট্রেচের দৌড়ে চার-পাঁচটা ডজ, এক একটা ডজে ৬০-৭০ গজ টেনে বেরিয়ে যাচ্ছিল ... (ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্য বোধহয় ১২০-১৩০ গজ, ফ্লো-তে পিকে-র সে সব খেয়াল নেই)। প্রসুন বানার্জী কেও একবার ইস্ট-মোহন ম্যাচ এ হেমন্ত ডোরার এক অনবদ্য সেভ নিয়ে বলতে শুনেছিলাম …. 'একটি অবৈধ গোল বাঁচালেন হেমন্ত"। পিকে -কে অনেকবার দেখেছি খেলোয়ারদের সংগ্রামী মনোভাবকে ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিংহের আত্মবলিদানের সাথে তুলনা করতে। সবই বাঙালির আবেগ।

তবে এই আবেগের শুরু আরো আগে। অজয় বসু কে মনে পড়ে? কথা বলতে বলতে গলার পারদ চড়তো ক্রমশ।

...ফাউল , ফাউউউউল, ফাউউউউউউউউল ….

হ্যাঁ, আমি তিনবার বললুম বটে, তবে ফাউলটা তেমন গুরুতর কিছু ছিল না, পোর্ট ট্রাস্টের ডিফেন্ডার কৃশানুকে হাল্কা ধাক্কা দিয়েছেন যা রেফারির নজর এড়ায়নি। কিন্তু ফাউল করার সময় খেলোয়াড়দের মনে রাখতে হবে মাঠভরা দর্শকদের আবেগের কথা, মনে রাখতে হবে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা থেকে ঘটে যেতে পারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, সামান্য প্ররোচনায় দর্শককূল হয়ে উঠতে পারে উন্মত্ত (গলা চড়ছে), মনে রাখতে হবে উনিশশো আশি সালের ষোলই আগস্ট (গলা আরও চড়েছে), সেদিন যে পাপ আমরা করেছি তার ক্ষমা নেই, (ব্যাকগ্রাউন্ডে তুমুল দর্শকোচ্ছ্বাস অগ্রাহ্য করে) নিরীহ নির্দোষ ফুটবলপ্রেমীদের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল ইডেনের গ্যালারি (গলা এখন তারসপ্তকে) - সে রক্তের দাগ আজও আমাদের হাত থেকে মোছেনি।
(ব্যাকগ্রাউন্ড আওয়াজ কিছুটা থিতিয়ে এসেছে, গলা ফের মন্দ্রসপ্তকে) এসব বলতে বলতে বোধহয় গোল হয়ে গেল ... কে গোল করলেন সুকুমার?

সুকুমার সমাজপতি: অজয়দা, আমার ঠিক সামনে একটা থাম পড়ে যাওয়ায় আমি ঠিক দেখতে পাইনি কে গোলটা করলেন, তবে খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হল কুলজিৎ।

সুকুমার সমাজপতি আবার ৬০ এর দশকে ইষ্টবেঙ্গলে খেলে গিয়েছেন। তো, উনি যখন ভাষ্য দিতেন, কোনো একটা মুভ, আগেথেকে আঁচ করতে চাইতেন ...... ফলে ওনার ভাষ্যতে প্রচুর 'না' থাকতো ...... যেমন .....
--- প্রবীর (মজুমদার) বল ধরেছেন .... সামনে ফাঁকা জমি .... এগোবেন কি ... না .... হাবিব-কে পাস করলেন । হাবিব এবার কি করবেন .... গোলমুখে সেন্টার করবেন ? .... না না ..... সুভাষকে দিয়েছেন .....

সুকুমার সমাজপতি আবার নিজের গা থেকে ইস্টবেঙ্গল গন্ধটাও ছাড়তে পারেন নি ধারাবিবরণীর সময়েও। ওই যে বলছিলাম, বাঙাল-এর (বা বাঙালীর) আবেগ! খেলার বিবরণী দিতে দিতে হঠাত করে চলে যেতেন স্মৃতিচারণে। কথার ফ্লো তে খেয়াল নেই যে ইষ্টবেঙ্গল গোল খেয়েছে রাজস্থান-এর কাছে। গ্যালারি যথারীতি চুপ। হঠাৎ খেয়াল হতে, 'যা তেরি! এ কি কেলো! ইষ্টবেঙ্গল গোল খেয়ে গেল' । পরের দিন কাগজে কমেন্টেটর-এর পক্ষপাতদুষ্ট বিবরনী নিয়ে সমালোচনা।

তবে এব্যাপারে পিকে কে কেউ ধরতে পারবেন না। ইডেনে বড় ম্যাচ। অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে। পি কে, প্রায় মিনিট দশেক স্মৃতি চারণের পর ... ' ... প্রশান্তর সামনে মনোরঞ্জন কতটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বুঝাতে না পারলেও, আমার সামনে একটি বিশাল থাম্বা এবং মুশলধারায় বৃষ্টি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে আবার অলিম্পিকে ফিরে যাই... যে কথা বলছিলাম, ৫৬-তে মেলবোর্নে …

আজ অনেক কথা মাথায় আসছে। আজ CFL এর নির্ধারক ম্যাচ। আমার ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানী বাবলু ভাত্চার্জির কোচিং এ তৈরী টলিগঞ্জ অগ্রগামী।

আজ ইস্টবেঙ্গল জিতলে পর পর পাঁচ বছর CFL জয়ের হাতছানি, অবশই দারুন ব্যাপার। টলিগঞ্জ অগ্রগামী জিতলেও কলকাতার ফুটবল এর পক্ষে ভালো বিজ্ঞাপন। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান , মোহামেডান এর বাইরে কেউ জিতবে। শেষ হযেছিল ১৯৫৮ সালে। বাঘা সোম এর কোচিং এ পিকে ব্যানার্জির ইস্টার্ন রেল। যদি খেলা ড্র হয়? নেপোয় দই মেরে যাবে , মানে ভোম্বল এর মোহনবাগান। ইস্টবেঙ্গল জিতুক মনে প্রাণে চাই। টলিগঞ্জ অগ্রগামী জিতলে "আমি দুঃখ পেলেও, খুশি হব জেনো " ….. চাই না খেলাটা ড্র হোক আর নেপোয় মাঝখান থেকে দই মেরে যাক , আসলে আমি মনে প্রাণে বাঙাল তো !!