বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০১৪

“প্রেম”!! বাপরে বাপ! বহুত চাপ!... - সাগর চক্রবর্তী


বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ- নীচের লেখাটি পড়া আদি অকৃত্রিম নিখাদ প্রেমে উন্মত্ত যুগলের পক্ষ্যে বিপদজনক। নিজেদের দায়িত্বে ঝুঁকি নিয়ে পড়ুন!!

“প্রেম”!! বাপরে বাপ! বহুত চাপ!...

         *****************
হায় হায়!! কথায় বলে, “আশায় বাঁচে চাষা”। এতদিন হল আমাদের রিলেশন, রোজই মনে হয়, এই বুঝি আজ থেকে বেগার খাটা বন্ধ হবে। কিন্তু কোথায় কি! শুধু বেগার খেটে যাও। তাও শুধু ওর জন্য হলে মানতাম। ওর ছোটভাই-মাসির ছেলে-থুত্থুড়ে ঠাম্মা-সবার জন্য খেটে মরতে হবে। “এই তুমি আজ সন্ধায় ফ্রি তো, তাতাই কে একটু ফিজিক্স টা দেখিয়ে দিও।” ব্যস, পাড়ার রকের আড্ডা জলে। সোনামুখ নিয়ে একটা হাফ-বাঁদরকে পড়াতে বোসোঠাকুমার বুক ধড়ফড়, অ্যাপয়েন্টমেন্ট তো বটেই, ডাক্তারখানায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। হ্যাঁ, অবশ্যই ট্যাক্সিতে। ভাড়াটাও তুমিই গুনবে হে গৌরী সেনের নাতজামাই। “বাঁকুড়া থেকে ন’পিসিরা এসেছে, নেটে ৪ টে টিকিট কেটে দাও না সোনা।” উঁহু! নো দাঁতচাপা খিস্তিয়াল কমেন্টস! এখন ডেবিট কার্ডে খরচা তো কি, ও দিকে যে ক্রেডিট (প্রেম) জমছে। বোঝো ঠ্যালা!!
                    *****************
মাঝেমধ্যে মনে হয়, প্রতি উইকেন্ডেই নতুন চাকরির ইন্টার্ভিউতে বসছি। তখন মনকে বোঝাই, না, প্রেম করছি। কিন্তু মন মানতে চায় না। সত্যিই মনে হয়, কেন রে বাবা, প্রেমই তো করছি, তা হলে প্রতি শনিবার বিকেলে অমন ধোপদুরস্ত ধড়াচুড়ো পরে ডিও বাগিয়ে হাঁচিকাশি চেপে প্রেজেন্ট প্লিজ কেন দিতে হবে? রোজ চোখ কুঁচকে, “ম্যাগো, কী মুটচ্ছো রে বাবা! দেখি, বেল্টের ফুটো ফের এক ঘাট বেড়েছে?” বলি, প্রেম করছি না পি.টি. টিচারের কাছে দশ আঙুলের নখ পরিষ্কার কি না দেখাচ্ছি! “এ কি, পাঞ্জাবি পরেছ, এ দিকে পায়ে স্নিকার?” আড়াই দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়িমুখ, সামনে গেলে চাঁদবদনী হাড়িমুখ। “খবরদার চুমু খাবে না এই জঙ্গুলে মুখ নিয়ে!” এতদিনে বুঝেছি, প্রেমিক=২৪*৭ মডেল-লুক। প্রেম করতে গিয়ে আমি ফ্যাশন শিখে ফেলেছি। বোঝো ঠ্যালা!!
                     *****************
মাঠে ঘাটে বসলে পিঁপড়ে-লোফার-ভিখিরি-পলিউসন, তাই রোজ রেস্তরাঁ। টানা হপ্তাদুই বিরিয়ানি, পোলাও, মাটনকসা, চিলিচিকেনের পর, যা হওয়ার তাই। সারা রাত বাথরুমে বসে তার কথা ভাবা। মুশকিলটা হচ্ছে, প্রেমিকের কখনও আমাশা হতে পারে না। তাই ফুটো লিভার-থ্যাতলা প্যানক্রিয়াস আর ছদ্মসুখী মুখ নিয়ে ফের শ্যামবাজার গোলাবাড়িতে হানা দেওয়া, জমিয়ে রেশমি কাবাব আর রোগান জোশ! ক্রমে প্রেম জম্পেশ, আলসার-ও। বেশীরভাগ সময় প্রনয়ী ছেড়ে যায়, পেটব্যথা ছাড়ে না। ধুত্তোর!!
*****************
মুখে চোর চোর ভাব। হাত ধরাধরি করে সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটতে গিয়েও তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুন্ডুর ব্যায়াম। যদি ২-এক পিস চেনা থোবড়া বেরিয়ে পড়ে! আচ্ছা, সামনের সিটের ভদ্রলোকের টাকটা ঠিক মেসমশাইয়ের মতো চকচক করছে না! গাছের আড়াল থেকে অবিকল ছোট কাকার স্টাইলে ধোঁয়ার রিংগুলো বেরিয়ে আসছে না! পার্কের ঝোপে চুমু খেতে গিয়েও বুক ধড়াস ধড়াস। যদি ঘাড়ে এসে পড়ে পুলিশের থাবা! আত্মীয়ঘন পরিবেশে বেমক্কা মোবাইলে ওর ডাক এলে বেইজ্জতির ভয়, দুম করে কেটে দিলে ওর রাগের ভয়, প্রেমের কথা বাড়ীতে চেপে রাখতে ভয়, উগরে দিলে তুমুল অশান্তির ভয়। পঁচিশের আগেই ব্লাডপ্রেশার, ই.বি.এস. (ইরিটেটিং বাওয়াল সিনড্রোম)! বোঝো ঠ্যালা!!
*****************
যেন প্রেম করতে গেলে অসামাজিক হতেই হবে! প্রথমেই বেস্ট ফ্রেন্ডদের নামে চুগলি করে করে তাদের সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেবে। বন্ধুরা যখন ফ্রিক আউট করছে, আমায় পার্কে ওর চোখে চোখ রেখে মশার কামড় খেতে হবে! বন্ধুরা গ্রুপে মন্দারমণি গিয়ে মস্তি করছে, কিন্তু ঐ গ্রুপে ২ টো ছেলে আছে বলে ও আমাকে যেতে দেবে না! কলেজের টিচারের বিয়েতে নেমন্তন্ন। ও কোনও এক অজানা কারণে, এক ঘন্টা আগে সেখানে পৌঁছে আমাকে বের করে আনবে। এই যে আমরা গোটা পৃথিবীটাকে দু’ভাগ করে ফেললাম, এক প্রান্তে আমরা ‘দো জিসম এক জান’ আর অন্য প্রান্তে না জানি কেন ‘দুশমন জমানা’, বলতে নেই কোনও কারণে যদি ‘সাধের প্রেম’টাই ভ্যানিশ হয়ে যায়, তো এই ব্যর্থ প্রেমের আবর্জনা পোড়াতে আসবেটা কে? সেই বন্ধুবান্ধব আত্মীয়রা? যাদের একসময় ২ জনে মিলে ‘হাম কো জমানে সে কেয়া’ বলে ফুটিয়ে দিয়েছিলাম? ইল্লে??
*****************
সবচেয়ে বড় অসুবিধা, প্রেম অন=খিস্তি অফ। ওর সঙ্গে থাকলে, পেট ফুলে গেলেও খিস্তি করা যাবে না। অটোতে ২ জন যাচ্ছি, সিগনালে কেতাবাজ বাইকবাহন ওর দিকে তাকিয়ে স্যাট করে নিজের ঠোঁটে কদর্য জিভ বুলিয়ে নিলেও না! প্রিন্সেপ ঘাটের সিঁড়িতে জোড়ায় বসে আছি, ঠিক সামনেটায় কেউ ছিরিক করে গুটখার পিক ফেললেও না। রাগে অন্ধ, তবু খিস্তি বন্ধ। মাইরি বলছি, আলজিভ নিশপিশিয়ে ভোকেবুলারি উঠে আসে, কিন্তু কেন জানি না ও সামনে থাকলে মুখ দিয়ে পলিটিকালি কারেক্ট ‘অসভ্য! অশিক্ষিত!’ই বেরিয়ে আসে, যাতে ওর মনে হয়, আহা! ‘প্রেমিক’ যে একেবারে গোলাপ পবিত্র, চার অক্ষর বলতে ও শুধু ‘ভালবাসা’ই বোঝে! বোঝো ঠ্যালা!!
*****************
গোড়াতেই নিজের কাছে নিজে শপথ নিতে হয়, ‘যাহা বলিব মিথ্যা বলিব, মিথ্যা বই সত্য বলিব না’।  ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়া টি২০ ম্যাচের নাটকীয় মুহূর্তে প্রেমিকার ফোন এলে অম্লান বদনে বলতে হয় ‘এই তো তোমার কথাই এতক্ষণ ভাবছিলাম’। সাজের বহর দেখে রাগে গা জ্বলে গেলেও মুখে একটুকরো হাসি লাগিয়ে বলতে হয়-‘ফাটাফাটি!’ বুক ফাটলেও মুখ দিয়ে বেরোবে না ‘ওরে মড়া, আমি এখন পাশবালিশ আঁকড়ে স্বপ্নে সানি লিওন-এর সাথে মরিশাস-এ বেড়াতে যেতে চাই, তোমার সঙ্গে গঙ্গার পাড়ে নয়!’ কিংবা, ‘এর আগে আরও ১৪টা মেয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তুমি ১৫তম।’ প্রেমের রাজ্যে পৃথিবী মিথ্যেময়। আর অভিমান বোঝাতে নিজের চোখের কোনায় নখ দিয়ে খুচিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার ফ্যাকড়া তো আছেই! ধুত্তোর!!
*****************
বাস্তব ডকে উঠে যায়। পুরোটাই ভবিষ্যৎ কাল, পুরোটাই ওয়ান্ডারল্যান্ড। কত্ত সুন্দর একটা বাড়ী হবে আমাদের, গুল্লু গুল্লু ২টো ছানা, বছরে একবার ফরেন ট্যুর, আমরা কিন্তু একদম ঝগড়া করবো না, কেমন? ঘুন্টুপুচু, এখন একটু কষ্ট করে ঝালমুড়িতে মন দাও। এই তো, মাইনে একবার বাড়লেই ফি হপ্তায় দু’বার মোক্যাম্বো থেকে মেনল্যান্ড চায়না। প্রমিস। এই দুনিয়ায় আর্থিক মন্দা নেই, ইএমআই নেই, আগুন বাজার নেই, হু হু করে ডলার পতন নেই... কিন্তু ফ্যান্টাসির ফানুস ফুলতে ফুলতে এক দিন ফটাস! আর, তার পর সোজা প্লুটো থেকে পৃথিবীতে আছাড়। গায়ের ব্যথা মারতে নেক্সট প্রেমের অপেক্ষায় বসে থাকা...!!!
*****************
প্রেম সফল হলে বিয়ে হয়ে যায়! যে জিনিসের লাস্ট সিনে এমন সাংঘাতিক সর্বনাশ অপেক্ষা করে আছে, সে কি ভদ্র কান্ড হতে পারে? ভুলিয়েভালিয়ে লজেঞ্চুস দেব বলে ফুটন্ত কড়ায় এনে ফেলা যার অভ্যাস, সেই প্রেমকে তোল্লাই দেয় যারা, সকলে মিলে তাদের চিহ্নিত করুন এবং সর্বসমক্ষে ‘রদ্দা মারুন’!!
----------