শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০১৪

লোড়সেরিঙ ~ অবিন দত্তগুপ্ত


টেবিলের উল্টো দিকে বসা চিতাবাঘকে,কোলকাতা সম্পর্কিত মধ্যবিত্ত ভালোবাসা ব্যক্ত করার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা করছিলাম। ট্রাম-বাস,ভিক্টোরিয়ার বাদামভাজা,নিওন আলো, মেট্রো বার,মিছিল ইত্যাদি বহু ব্যবহৃত (এবং ব্যবহার হতে হতে ক্লান্ত)উদাহরণে না গিয়ে,একটু  subtle হওয়ার চেষ্টায় অন্ধকার হাতড়াতে হলো । অর্থাৎ অন্ধকারেরই হাত ধরতে হলো । কিন্তু উনি চিতা, জাতে  বাঘ..শান্ত স্বরে জানালেন তার বাড়ি যে অরন্যে,সেখানে অন্ধকার একটা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার । আমার মতো শহুরে ছোঁড়ার কাছে ব্যাপারটা যতই রোম্যান্টিক হোক না কেন,ওনার কাছে অন্ধকার গা-সওয়া..প্রতিদিন সূর্য ওঠার মতো আর কি !! মেনে নিলাম। উনি বাঘ... আমি নেহাত মানুষ,তায় কোলকাত্তাইয়া(তাও আবার দক্ষিনের)....এটুকু তফাৎ থাকাই স্বাভাবিক । বাঘের চোখে চোখ রেখে তর্ক অনর্থক,অতএব খাতা-পেন্সিল ভরসা ।

                                     আমার বাড়ি যে অঞ্চলে,সেখানে কাঠ বাঙালের বাস । প্রায় সব-ই উদবাস্তু পরিবার ।  ছোটবেলার সেই বাসস্থানগুলি মূলত অস্থায়ী,মধ্যবিত্ত জবানিতে জবরদখ্‌লি । তা ঐ অঞ্চলের লোকজনের এক স্বভাবিক দোষ এবং গুণ ছিল । তারা প্রায় সকলেই,প্রচণ্ড তাড়াতাড়ি রেগে যেতেন,এবং ততোধিক তাড়াতাড়ি ভুলেও যেতেন. ৯০এর গোড়ার দিকের এক গ্রীষ্মের রাতে,এমনি এক রাগি বাঁজখাই গলার "জ্যোতিবাবু চলে গেলেন",আমাকে প্রথম অন্ধকার উৎসুক করেছিলো । এই বক্তব্য এবং তারপরের জটলা, গভীর আলোচনা,চিল-চিৎকার,খিস্তি ইত্যাদির কোনকিছুরই কারণ বুঝতে না পারলেও,"আলো  বা জ্যোতি চলে যাওয়া" বিষয়ক একটা one liner-এর এই বিপুল ক্ষমতা আমাকে অবাক করেছিলো । চটজলদি বাঙাল উচ্চারণে, সেদিনই প্রথম
লোড়সেরিঙের সাথে পরিচয়। এবং হ্যা ব্যাঘ্রকুল নন্দিনি( অথবা পাঠিকার চাহিদায় রঞ্জন ),আপনার অরণ্যের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের সাথে হঠাৎ বিদ্যুৎহীন শহরের শরীরের,লোড়সেরিঙের কোলকাতার শরীরের একটা তফাৎ আছে বইকি ।

                                     ছোটবেলার পড়ার সময় ছিল লোড়সেরিঙের সন্ধ্যাগুলি ।  লন্ঠনের আলোয় সাদা পাতাগুলি আগুন আগুন ঠেকত।কালো কালো অক্ষরেরা আগুনে খেলে বেড়াত. সেই রহস্যময় অক্ষরের তানেই,আমার লন্ঠনময় পড়াশুনা ।  অন্য রহস্যরা আস্তেও আস্তে বাড়তে শুরু করলো যখন,যখন  লোড়সেরিঙের যাতায়াত অনিয়মিত হয়ে পড়ল,তখন নিরুপায় হয়েই ওই অভ্যাসটি আমায় বিদায় জানিয়েছিল।

                                    লোড়সেরিঙের ছেলেবেলার আরেকটা স্মৃতি মাঝে মাঝেই ফিরে আসে ।  যে কোন প্রাণের মিছিলেই ফিরে ফিরে আসে ।  প্রথম মিছিল দেখা -মায়ের কোলে চেপে, অমনই এক শরীরি অন্ধকার রাতে. ঘরের ভেতরের লন্ঠন ঠিকরানো চার-আনা হাল্কা আলোয় দেখা প্রথম প্রাণের মিছিল......অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা দৃপ্ত কণ্ঠস্বর "হাতে হাতে কমরেড ।" হাজার মূস্থিবদ্ধ হাত অন্ধকার আকাশ ছুচ্ছে ।আজ জানি প্রতিবার হাতে এক চিলতে আকাশ ধরা পড়ে...সেদিন জানতাম না। সেদিন মিছিলের শব্দ শুনেছিলাম,সেদিন-ই প্রথম দেখা তার পেশীবহুল শরীর । ঠিক যেন, টি.ভি তে দেখা আফ্রিকান বক্সার। অন্ধকার গ্রেনাইটে গড়া পেশী বেয়ে,চুয়ে চুয়ে পড়ছে তাজা রক্তবিন্দু...প্রতি বিন্দুতে নতুন লড়াইয়ের অঙ্গিকার । সেই দিন অন্য এক শরীরী অন্ধকারের সাথে দেখা হয়েছিলো । এখানে উল্লেখ করা ভালো, প্রথম রাতের "জ্যোতি হারানো" ভদ্রলোক তখন barricade গড়ার শপথ গলায় নিয়ে,মিছিলের মধ্যভাগে । 

                                    আচ্ছা আপনার অরণ্যে শব্দের তো একটা কন্টিনুইটি আছে। মানে ঠিক যেমনটা থাকার কথা,ভয় ধরানো সুন্দর... কিন্তু একঘেয়ে । ইট-কাঠ- কংক্রিটের  জঙ্গলে, হঠাৎ নৈশব্দের বাজনা  কি তার থেকে একটু আলাদা নয় ? আপনাকে বলেছিলাম,সেলিমপুর থেকে যোধপুর পার্ক হয়ে আমার পুরনো পাড়ার রাস্তাটা,আমার প্রিয় ... পৃথিবীর অন্য যে কোন লোড়সেরিঙের রাতের রাস্তা, যার ধারে কাছে আসে না । এর কারণও হঠাৎ নৈশব্দ । ধরুন আপনি গড়িয়াহাট পেরিয়ে,ঢাকুরিয়া পেরিয়ে,ভয়ঙ্কর ভিড় ঊষাগেটের মিনি থেকে সেলিমপুরে নামলেন । হঠাত-ই  লোড়সেরিঙের সঙ্গে দেখা । আপনি জানতেনি না,সেদিন পূর্ণিমা । মুহূর্তে আপনার সামনের রাস্তা বদলে গেলো । অনেকক্ষণ ধরে আশে-পাশে ঘাপটি মেরে থাকা ঝিঁঝিঁরা, হঠাৎ পাওয়া নৈশব্দের সুযোগে তাদের উপস্থিতি জানান দিলো । হঠাৎ দুধ-সাদা মাটিতে ঘন ছায়া দেখে, আপনি চোখ তুললেন....দেখলেন ঝাঁকড়া চুলের দারুণ সুপুরুষ এক গাছ ।  হঠাৎ করে আশে-পাশে থাকা সুন্দর, অন্ধকারের বোর্খা পড়ে ,আপনার সম্পূর্ণ অজান্তে, আপনার পাশে এসে দাঁড়ালো....চোখে চোখ রাখলো । এই ভালো লাগাটা যেহেতু আকস্মিক,তাই তার রেশটাও দীর্ঘস্থায়ী । শব্দের-নৈশব্দের এবং  চোখের ভাষার এই ঝটিকা আক্রমনে,আপনি যথেস্ট পটু।  সুতরাং এবিষয়ে আপনাকে জ্ঞ্যান দেওয়া, মোটামুটি বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানোর সমগোত্রীয় হবে । এখানে আমি ধরে নিচ্ছি দক্ষিনবঙ্গের বাঘ যখন,তখন আপনি বাঙাল বাঘ-ই হবেন।  

                                   আপনাদের বাঘেদের মধ্যে প্রেমপত্র দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারটা এখনো আছে কিনা জানি না ! আমাদের  শহুরে মানুষদের  মধ্যে ব্যাপারটা প্রায় উঠেই গেছে । সে জায়গায় গুড়ি মেরে ঢুকে পরেছে  sms,watsapp ইত্যাদি বিবিধ রতন । আপনি যেমন  মোনোসিলেবিক-বাইসিলেবিক হালুম-হুলুমের মধ্যে দিয়ে আপনার ভালোলাগা-খারাপলাগা ইত্যাদি প্রকাশ করেন,আমরাও তেমনি ইদানিং :),:-P,:,:<3 ইত্যাদি সংকেত মারফৎ আমাদের ভাললাগা,খুনসুটি ও ভালবাসার জানান দিয়ে থাকি। তো, লোড়সেরিঙ সেই সময়ের চরিত্র যখন এইসব সঙ্কেতবাহি যন্ত্রগুলো সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা ছিল না। সুতরাং, সংকেতগুলোরও কোন অস্তিত্ব ছিল না। হ্যাঁ,বাড়িতে ফোন অবশ্যি ছিল,কিন্তু যা বলার যখন বলার,তা কি আর তৎক্ষণাৎ গলা থেকে কবিতা হয়ে ঝরে-পড়ে ? সুতরাং কাগজ-পেন্সিল তার প্রয়জনিয়তা হারায়নি। সেই সব দুর্ধর্ষ নিষিদ্ধ ইস্তেহারের হাত বদল হওয়ার আদর্শ সঙ্গী ছিল লোড়সেরিঙ। সে, তার উপস্থিতি জানান দেওয়া মাত্র,চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ত। কোথাও কাজলা দিদির ঘরের জানলায়,খোকন মামার টর্চের ইশারা । কোথাও বা তিনতলার খুকি,মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলেন প্রাণের বার্তা। অন্ধকারে নীচে দাঁড়িয়ে খ্যাদার সেই আকাশবাণী খিমচে ধরার সে কি অদ্ভুত উত্তেজনা। বয়েসে কাঁচা হওয়ায়,আমরা তখন মূলত দূতের কাজ করতাম। আমাদের উত্তেজনাও কিছু কম ছিল না। প্রতিটা চিঠি পৌঁছে দেওয়ার পর সুন্দরি দিদিদের হাতে গাল টেপা,অথবা পাড়ার নায়কদের পিঠ চাপড়ানি...সেই তখন পরম পাওয়া। মাঝেসাঝে আকাশবার্তা নায়ক হৃদয় উতফুল্ল করে দিলে,এক-আধটা কোকা-কোলাও জুটে যেত। এই সবই হতো দুরন্ত গতিতে। অসংখ্য হাত বদলের, ছুঁয়ে জাওয়ার,নিঃশব্দ ইশারার,উত্তেজনার,মন খারাপের, চাপা কান্নার একমাত্র নিরব সাক্ষী লোড়সেরিঙের কোলকাতা। 

ওঃ,সময় হয়ে এলো । লাস্ট মেট্রো ছেড়ে যাবে। আপনার মবাইল নম্বরটাই নেওয়া হয় নি....ফেসবুকে আছেন তো ?