বুধবার, ২২ জানুয়ারী, ২০১৪

​কমরেড কমরেডকে মারতে পারে কি ~ অবিন দত্তগুপ্ত

আমার সমস্ত ছোটো গল্পের জন্য আমি চার জনের কাছে ঋণী । প্রথম সত্যজিত,দ্বিতীয় স্বপ্নময়,তৃতীয় ইলিয়াস হলে শেষ জন দেবু দত্তগুপ্ত। এই গল্পটা শেষ জনের থেকে পাওয়া। ভাগ করে নিলাম। এটা মূল দ্বন্দের গল্প নয়। চলতি মারক্সিস্ট পরিভাষায় পার্শিক দ্বন্দের(secondary contradiction)এর গল্প। নিজের মতো করে বলি,কারণ আমারও পেন আছে।

গল্পটা তেভাগার । সজনেখালির কোন এক গ্রাম। প্রভাস রায়-যতীন মাইতিরা গেছেন এক কর্মীসভায়। তা পুরো গ্রাম ভেঙ্গে পড়েছে। যতীন জানালেন, কৃষকসভা পরবর্তী সংগ্রামের জন্য প্রতিটা ঘর থেকে একটা মরদ, একটা লাঠি আর একটা টাকা চাইছে (মানে মধ্যবিত্ত জবানিতে ঐ কৌটো নাড়াচ্ছে আর কি ।) যে সমস্ত জায়গায় সংগঠন দুর্বল,সেখানে সবল অঞ্চল থেকে শক্তি বিকেন্দ্রীভূত হবে।

নেতৃত্বের ভাবনার সাথে অব্যর্থ কো-অরডিনেশানে এক বৃদ্ধ,হাজার বছর পড়ে পড়ে মার খাওয়া, শিরিঙ্গে চাষি হাত তুললেন। জানতে চাইলেন "মরদরাই যদি না থাকলো ,তবে ঘাটি আগলাবে কারা ?" । উত্তুত্তর মিনিট খানেকের নিস্তব্ধতা। উত্তর দিল ভিড়। এ ভিড় অনেক বেশি ঘন, অমাবস্যার অর্ধেক আকাশের মতো মায়ের ভিড় উত্তর দিল " কেন ? ফসলের মরশুমে আমাদের কাস্তে কি মরদের চেয়ে আস্তে চলে। যে কাস্তেতে ফসল কাটি, সেই কাস্তে ধরতে শেখায় কোন মরদে। আমরাই আমাদের গ্রাম রক্ষা করতে পারবো " । এই বক্তব্যে

একটু নড়ে উঠে,প্রভাস বাবু বললেন " হ্যা, তোরাও তো আমাদের কমরেড । মরদরা যা পারে,তোরা আরও ভালো পারবি। আমি এই প্রস্তাব সম্পূর্ণ সমর্থন করছি।" কেমন যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেলো দলা পাকানো অর্ধেক অন্ধকারে। অমন একটা মানুষ,দুই জেলার পুলিশ যাকে ছুঁতে পারে না, জোতদারের ধুতি ভেজে যার নামে, এই অরণ্যের আসলি বাপ তাদের কমরেড বলেছে। অন্ধকার ঘন হয়। এদিক-ওদিক ঠেলা-ঠেলির মধ্যেই এক দলা অন্ধকারে ছিটকে বেরিয়ে আসে। অর্ধেক আকাশ তার সদ্য কমরেড প্রভাস-যতীন কে প্রশ্ন করে " আচ্ছা, একজন কমরেড কি আরেকজন কমরেডকে মারতে পারে?"। নেরিত্বেন
স্বভাবতই,মাটি চেনা নেতৃত্ব এই প্রশ্নের উৎস বুঝতে পারে। যতীনদের সম্মতি সূচক নিস্তব্ধতার নিড়েন দেওয়া জমিতে,ফসল ফোটাতে শুরু করে যুগ যুগ ধরে বোবা হয়ে থাকা এক চিরপ্রাচীন-নিষ্পেষিত শক্তি।" আমার মরদ,রোজ জন খাটে। মহাজনে মারে,টাকা দেয় না। যা পায়,তার অর্ধেক যায় সাহা বাবুর চোলাইয়ের ঠেকে। বাড়ি ফিরে আমায় বেদম মারে। আচ্ছা দাদা,তুই তো বললি আমি তোর কমরেড। আমার মরদ-ও তোর কমরেড। তাহলে তো আমি আর আমার মরদ কমরেড। এবার বল, কমরেড কমরেডকে মারতে পারে কি ?"
যুগ যুগ ধরে চাপা পড়ে থাকা ভয়ঙ্কর অগ্নি শিখায়,তখন অন্য অর্ধেক আকাশ জলছিল। এক অন্য আগুনে পুরে ইস্পাত হচ্ছিল নিশ্ছিদ্র চাঁদহিন আকাশ। এক শ্রেণি যুদ্ধ যখন, অন্য এক অজানা দ্বন্দের মুখ চেনাচ্ছে, মানুষ সিদ্ধান্ত নিলো "আজ রাতেই ভাঙ্গবে সাহার চোলাইয়ের ঠেক"।