রবিবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০১৪

ক্যাডার ~ অবিন দত্তগুপ্ত

দৃশ্য এক


         সত্তরের কোনো এক গ্রীষ্মের দুপুর। গড়িয়া চৌমাথার মোড় । এখন যেখানে রাষ্ট্রীয় পরিবহনের বাস গুমটি,ঠিক তার উল্টো দিকে দাড়িয়ে অর্ক দরদর করে ঘামছে। কালো সস্তা কাপড়ের প্যান্ট আর সাদা চেক-চেক জামা গায়ে অর্ক সেদিন নতুন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। লুকিয়ে থাকার অভিজ্ঞতা তার নতুন নয় । গত সাত মাস সে লুকিয়েই ছিল,কিন্তু এবার সম্পূর্ণ অপরিচিত এলাকায়। ৮ নম্বর রেল বস্তির ঘুপচি আস্তানার আশেপাশে সব কিছুই সে হাতের তালুর মতো চিনতো। কিন্তু পার্টি জানিয়েছে,কোনো কিছু পরিচিতই এখন আর নিরাপদ নয় । পার্টি-ই তার সন্তানকে বলেছে ১০ই মে ১৯৭১ বেলা আরাইটের সময় গড়িয়া চৌমাথার মোড়ে,ঠিক এই জায়গায় দাঁড়াতে। আর বলেছে,নিল লুঙ্গি-সাদা ফতুয়া-লাল গামছা পরিহিত কোনো একজন অর্ককে তার নতুন আস্তানা দেখাবে।


        আশেপাশে দুটো কালো ভ্যান, মাছির মতো ভনভন করছে। কিছুদিন আগেই সি আর পি আর কংগ্রেসি গুণ্ডারা বেধড়ক মার খেয়েছে কামাড়পাড়ায়ে,দক্ষিন কলকাতার স্তালিনগ্রাদে। এখনো সেই ঘা শুকায়নি । তাই,পাগল কুকুরের মতো জোয়ান ছেলে-মেয়েদের গায়ে বামপন্থি গন্ধ খুজছে। অতএব,অভ্যাসবসত পকেট থেকে রুমাল বার করে অর্ক নাকে চাপা দিল, যদিও সে জানে তার চোখ দুটোই তাকে ধরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেস্ট। কুকুরগুলো যখন প্রায় ঘাড়ের উপর,ঠিক তখনি উল্টোদিকের ভিড় ফুঁড়ে এক ক্ষয়াটে লোক রাস্তায় এসে পড়ল। পরনে নিল লুঙ্গি-সাদা ফতুয়া। ঘাম মুছে লাল গামছাটা কাধে ফেলতেই অর্ক পথপ্রদর্শককে চিনে নিলো । ভিড়ের মানুষটি অনায়াসে ভিড়ে মিশে এগিয়ে চললেন। ঠিক দশ পা পেছনেই অর্ক। এগলি-ওগলি-তস্যগলি ঘুরে অর্ক তার নতুন আস্তানায় পৌঁছল। পথপ্রদর্শক একটা কথাও বলেননি। অর্ক আজ-ও তার নাম জানে না।


                                                                     দৃশ্য দুই 


         ১৯৮২ সাল। অর্ক এখন এক সরকারি ব্যাঙ্কে কেরানির কাজ করে। পরিক্ষা দিয়ে চাকরি পাওয়ার পরদিনই সে ব্যাঙ্কের বামপন্থি ইউনিয়ানের খোজ নিয়েছিলো। পুরানো ইউনিয়ানে পচন ধরায়,সবে তৈরি হয়েছে নতুন শিশু গনসঙ্গঠন। ডেকার্স লেনে পোস্টার মারার কাজ চলছে। বেশির ভাগ লোকজনেরই অনভ্যস্ত হাত। পোস্টার মারতে দেরি হচ্ছে। হঠাৎ এক গালভাঙ্গা,উষ্কখুষ্ক চুলের মানুষ অর্কের পাশে এসে উপস্থিত। কোন ভুমিকা ছাড়াই বলল "সাহায্য করতে পারি?" প্রচলিত অর্থে,ভদ্রলোকের চেহারা নয়, অর্কর চিনে নিতে ভুল হল না। একটু সরে জায়গা করে দিতে ভদ্রলোক প্রথমেই বালতি ভর্তি আঠার মধ্যে খানিক জল মিশিয়ে নিলেন। তারপর অদ্ভুত কায়দায়,দু-বগলে পোস্টার চেপে ধরে,মই বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে গেলেন। যুদ্ধকালীন তৎপরতায়  চার-চারটি দেওয়াল একঘণ্টার মধ্যে পোষ্টারে ভরে গেল। কর্মসূচী শেষ। চা-মুড়ি খাওয়া চলছে। গোগ্রাসে মুরি গেলা লোকটার পাশে এসে অর্ক জিজ্ঞেস করলো " আপনি কে ?"  ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, "আমি আপনাদের লোক, এটুকুই কি যথেস্ট নয়?"


অর্ক - " আপনি কি এই অঞ্চলের ?"

অপরিচিত- "মেটিয়াবুরুজ"

অর্ক-"এখানে ?"

অপরিচিত-" যেখানে লড়াই সেখানেই তো আমাদের থাকার কথা!" 

 অর্ক- "আপনার নামটা?"

অপরিচিত (মুচকি হেসে) - "ক্যাডার"


        মেটিয়াবুরুজে, অর্কর এক কলেজের কমরেডের বাড়ি। বহুদিন দেখা-সাক্ষাত নেই। এই ঘটনার প্রায় দশ বছর পরে অর্ক সেই কমরেডকে ব্রিগেডে দেখেছিল। দশ বছর আগের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দেওয়ার পর অর্কর কমরেডের মুখে মেঘ ঘনিয়েছিল। মাটির দিকে তাকিয়ে সে জানিয়েছিল "শামিম আর পার্টিতে নেই"।  

                                                               

                                                                     দৃশ্য তিন


        ২০১১। অনেক কিছুই ভেঙ্গেচুরে গেছে। শরির ভেঙ্গেছে ,সম্পর্ক ভেঙ্গেছে,মন ভেঙ্গেছে,স্বপ্নগুলো ভেঙ্গেছে বেশ অনেকদিন হল।

শেষ ভাঙ্গাটা,মানে অর্কের মতে প্রয়োজনীয় ভাঙ্গাটা শেষ হয়েছে কয়েকদিন আগে। ষাট ছুঁইছুঁই অর্ক জানে ভিত শক্ত করে নতুন স্বপ্ন গড়তে হলে, পুরনো জরাজীর্ণ অস্তিত্ব ভেঙ্গে পড়াই ভালো। তবুও, কোথাও যেন একটা কাঁটা খচখচ করে। যাই হোক,এতো ভাঙ্গনের মধ্যেও নিজের মনের মতো করে সে তার সন্তানকে গড়েছে। ভবিষ্যতের নরকে লড়াই করতে অপু মোটামুটি প্রস্তুত। অর্ক এখন অনেকটাই ঝারা হাত-পা। 

    

বহুদিন পরে সে আজ বালিতে এসেছে তার অভিন্নহৃদয় বন্ধু কল্যানের সাথে দেখা করতে। বালিহল্ট স্টেশান থেকে রিক্সায়ে ঘোষপাড়া বাজার। কল্যানের বাড়ির সামনে রিক্সা থামিয়ে অর্ক রিকশাচালককে ১০টাকার নোট বাড়িয়ে দিল। "লাগবেনি বাবু",রিক্সাওলার খ্যানখ্যানে গলা ভাবনার অতল থেকে অর্ককে আকস্মিক কান ধরে টেনে হিঁচড়ে বাস্তবে আনল। তার বিরক্তির উত্তরে ফোকলা হাসি ফেরত দিলেন চালক। "সমীরদা,তুমি আবার ভাড়া নেবে না বলে জিদ ধরেছ ?",কল্যান যে কখন এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে অর্ক খেয়ালি করেনি। সমিরের হাতে দশটাকার নোট গুজে দিয়ে অর্ক হেসে বলল "বিনে পয়সায় কারো ঘাম কিনতে আমার বাপ শেখায়েনি।" ডাইনোসরের যুগের রিক্সাটা আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে গেলো। 


   ঘরে বসে একটা নেভিকাট ধরিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই,কল্যান হেসে ফেললো। "পুরানো মানুষ,সত্তরের কমরেড"।  


পুরানো নোনতা স্বাদটা জিভে হঠাৎ ফিরে পাওয়ায়ে, অর্ক সোজা হয়ে বসল । কল্যাণ স্মৃতি হাতড়াচ্ছে,"এই সমীরদার জন্যই বার চারেক খুন হতে হতে বাঁচা। কোনো রাস্তার মোড়ে বিপদ দেখলেই , ঐ হরিদার চায়ের দোকানের সামনে দাড়িয়ে পাঁচবার পর পর হর্ন বাজাতো। কাছে গেলেই বলে দিত,কোন রাস্তায় বিপদ,কোন রাস্তা ফাঁকা। এক ছেলে -এক মেয়ে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে এস এফ আই করত,বদলের পর থেকে নিখোজ।প্রতিসন্ধায়ে এল.সি তে বসে নেতাদের গল্প শোনে। চা-বিড়ি এনে দেয়। নিজেও খায়। আর সব মিছিলে রিক্সা চালিয়ে সবার আগে আগে যায়। অর্ক হাসে। নিজেই বোঝে হাসিটায় একটা "আমি তো এই পার্টিটাই করি "গোছের প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ আছে। হঠাৎ কল্যানের গলার শব্দে ভাবনার উড়ান থমকে যায়। 


"তোকে হাসতে দেখে সমীরদাকে নিয়ে একটা মজার গল্প মনে পড়ে গেলো।এই সেদিন ভোটের আগে,এখানে একটা পার্টির জনসভা ছিল। মঞ্চের সামনে শতরঞ্জি পাতা। তারপর চেয়ার,তারপর দাড়ানোর জায়গা। তা সমিরদা,তার ঢাউস ঝাণ্ডা নিয়ে শতরঞ্জিতে  বসেছে। হঠাৎ ঝামেলা।। পেছনের লোকজন পতাকায় ঢেকে যাওয়া নেতাদের দেখতে পারছেন না। বুড়োকে অনেকে মিলে বোঝানর চেষ্টা করল,গালি দিল,কিন্তু কিছুতেই সে পতাকা নামাবে না। ঘাড় ত্যারা করে তার সেই এক যুক্তি,লাল ঝাণ্ডা মাটিতে রাখবো না। পুরো মিটিঙে ঝাণ্ডা মাটি ছোয়ে নি।"


         সেই সুন্দর দুপুরের ঠিক এক সপ্তাহ পড়ে অর্কর মবাইলে কল্যানের নাম ভেসে উঠেছিল। কল্যাণ জানিয়েছিল ,নয়া ফ্যাসিস্টরা বুড়ো সমীরকে মিছিলে যাওয়ার অপরাধে বেধড়ক মেরেছে। রিক্সা ভেঙ্গে দিয়েছে। সমিরদা এখন, ঘরছাড়াদের ভিড়ের একজন। 


                                                              শেষ দৃশ্য


          আজ সন্ধ্যা। আজকে রানী রাসমনি রোডে পার্টির জনসভা ছিল। অভ্যাসবশত এদিনও অর্ক একদম শেষের সাড়িতে দাঁড়িয়ে। দু চোখ ভরে কালো মাথার ভিড় দেখছে। পরিচিত,মাফলার জড়ানো একটা মুখ দৃষ্টিপথ আড়াল করলো। এক গাল হাসি নিয়ে, পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে,অর্কের সেই মেটিয়াবুরুজের কমরেড খবর দিলেন "শামিমকে পার্টিতে ফেরানো হয়েছে। ও কোন প্রশ্ন করেনি। আগের মতই যুদ্ধ খোঁজে এখনো।" অর্ক মনে মনে বলল "আমরাও কি খুঁজি না ?"


          দুতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে,অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে অর্ক শামিমদের দেখতে পেল। আকাশ ভরা মিছিলে শামিম হাটছে,ঢাউস পতাকা হাতে সমীরদা,রহিমস্তাগর রোডের সুফল, যোধপুরপার্কে গনশক্তি বেচতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া তাপস হাঁটছে দৃপ্ত ভঙ্গিতে। হাটছেন,মিছিলে দেখা নাম না জানা কতো মানুষ। হাঁটছেন, নিল লুঙ্গি-সাদা ফতুয়া কাধে ফেলা লাল গামছায় সত্তরের আপনজন। হাঁটছে স্মৃতি।  আজ দুপুরে অর্ক যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, তার অনতিদুরেই কালো মাথার ভিড়ে সে অপুকে দেখেছে। নিজের কমরেডদের সাথে অপু ব্যাচ আর পিন আটকে দিচ্ছে সকলের বুকের বা-দিকে। আবার আকাশের দিকে মুখ তুললো অর্ক  এবারের মিছিলের শেষে,মানুষের ভিড়ে সে তার অপুকে খুজে পেলো। আর কিছু না পারুক, অর্ক জানে,সে ভবিষ্যতের এক মানুষকে গড়ে তুলেছে। মানুষের আন্দলনের ঋজু সৈনিক।  ক্যাডার বাপের ক্যাডার সন্তান।