সোমবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৩

একশো ছেচল্লিশ বছর আগে ~ অমিতাভ প্রামাণিক

মার্গারেট এলিজাবেথ নোব্‌ল্‌, আমরা যাঁকে ভগিনী নিবেদিতা বলে চিনি, তাঁর আজ জন্মদিন। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর একশো ছেচল্লিশ বছর পূর্ণ হত।

১৮৯৩ সালের সেই ঐতিহাসিক নাইন ইলেভেনের শিকাগো সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ জয় করেছিলেন আমেরিকার হৃদয়। এরপর তিন বছর ধরে তিনি আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যত্র – মূলতঃ শিকাগো, ডেট্রয়েট, বস্টন ও নিউ ইয়র্কে – হিন্দুধর্মের ওপর ভাষণ দেন। এর মধ্যে ১৮৯৫ আর ১৮৯৬ সালে দুবার কয়েক মাসের জন্যে ইংল্যান্ডেও যান। এর প্রথমবার লন্ডনে এক বক্তৃতার আসরে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় মার্গারেটের। এর পর লন্ডনে যতগুলো বক্তৃতা দেন স্বামীজী, তার প্রায় সবগুলোতেই উৎসাহী শ্রোতা ও প্রশ্নকারিণী হিসাবে দেখা যায় তাঁকে। কী গভীরভাবে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, তার প্রমাণ – বৃদ্ধা মা, অন্যান্য আত্মীয় পরিজন ও বন্ধুবান্ধব ছেড়ে ভারতে পাড়ি দেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ২৮শে জানুয়ারী তাঁকে কলকাতায় দেখা যায়, তার তিন সপ্তাহের মধ্যেই দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে। বিবেকানন্দ স্টার থিয়েটারে মিটিং ডেকে কলকাতার জনগনের কাছে তাঁকে ভগিনী নিবেদিতা হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেন ভারতের কাজে ইংল্যান্ডের গিফ্‌ট্‌ হিসাবে। সারদা মা তাঁকে কোলে টেনে নেন খুকি ডেকে।

কলকাতায় পৌঁছাবার বর্ষপূর্তির আগেই বাগবাজারে তিনি মেয়েদের স্কুল স্থাপন করেন। পরের বছর প্লেগ কলকাতায় মহামারী রূপ ধারণ করলে নিবেদিতাকে রাস্তা থেকে হাসপাতাল সর্বত্র দেখা যায় রোগীর সেবা করতে। ভারতে মাত্র সাড়ে তেরো বছর ছিল তাঁর আয়ু, ১৯১১ সালের ১১ই অক্টোবর দার্জিলিঙে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ভারতের সেবা করে গেছেন। তৎকালীন সমস্ত প্রভাবশালী কলকাতাবাসীদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা ছিল। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রী অবলা বসুর সঙ্গে ছিল বিশেষ হৃদ্যতা। চিত্রকলায় উৎসাহী নিবেদিতা ঘনিষ্ঠ ছিলেন অবনীন্দ্রনাথেরও।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে স্মরণ করে ভগিনী নিবেদিতা শীর্ষক এক প্রবন্ধ রচনা ও পাঠ করেন। কোন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে এই প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য প্রবন্ধের চেয়ে অনেকাংশে আলাদা। আমি এখানে তার লিঙ্কটা দিয়ে দিচ্ছি, ইচ্ছা হলে পড়ে নিতে পারেন - http://tagoreweb.in/Render/ShowContent.aspx?ct=Essays&bi=72EE92F5-BE50-40B7-BE6E-0F7410664DA3&ti=72EE92F5-BE50-4517-BE6E-0F7410664DA3

এই প্রবন্ধে অশ্রদ্ধার কোন চিহ্ন নেই, বরং কবি নিবেদিতাকে লোকমাতা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। অথচ, এ কথা অনস্বীকার্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব না থাকলেও তাঁদের বিশেষ অন্তরঙ্গতা ছিল না। রবীন্দ্রনাথ অবলা বসুকে এক চিঠিতে নিবেদিতাকে 'মাথায় তুলে নাচতে' নিষেধ করেছিলেন, বলেছিলেন, বিবেকানন্দের কথা বড় মুখে গেয়ে গেলেও সে আসলে আমাদের ধর্মের কিছুই বোঝেনি।

রামকৃষ্ণের পৌত্তলিক পুজো-আচ্চা এবং উপাসনাধর্মী ব্রাহ্মদের পাশ্চাত্যপন্থী উদার মনোভাবের একটা কালচারাল ডিফারেন্স ছিলোই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মেয়ে মীরাকে পড়ানোর জন্যে নিবেদিতাকে অনুরোধ করেছিলেন, যা উনি প্রত্যাখ্যান করেন, যদিও জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তাঁর বিশেষ খাতির ও অবাধ যাতায়াত ছিল। নিবেদিতা চেয়েছিলেন ব্রাহ্মদের কালীমন্দিরে নিয়ে গিয়ে তুলতে, তাতে বিবেকানন্দের প্ররোচনাও ছিল। সে নিয়ে ১৮৯৯ সালে রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দের সঙ্গে বাগবাজারের বাড়িতে বৈঠকও হয় তাঁর, কিন্তু তখন ব্রাহ্মসমাজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রবীন্দ্রনাথ স্বাভাবিকভাবেই তাতে রাজী হন নি। বিবেকানন্দ এর পর নিবেদিতাকে ঠাকুরদের সাথে মেলামেশা করতে নিষেধ করেছিলেন। নিবেদিতা এক চিঠিতে লিখেছিলেন, so we are to give up. After all, who are these Tagores?

কিন্তু তা সম্ভব হয়নি, কেননা এই ঠাকুরটি কোন হেঁজিপেঁজি লোক ছিলেন না। তিনি নিবেদিতাকে শিলাইদহে তাঁর সংস্কারমূলক নিজস্ব কাজকর্ম দেখে আসার অনুরোধ করেন নিবেদিতাকে, যদিও নিবেদিতা তক্ষুণি সেই প্রস্তাবে সাড়া দেননি।

ঠাকুরদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করলেও নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা, দেনা-পাওনা আর ছুটি গল্পের ইংরাজী অনুবাদ করেন তিনি। সেই সময় বিদেশী পত্রিকাগুলো অনুবাদ ছাপাতে খুব আগ্রহী ছিল না। একমাত্র কাবুলিওয়ালাই প্রকাশিত হয়েছিল মডার্ণ রিভিউ পত্রিকায়, তাও তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস পরে, জানুয়ারী ১৯১২ সালে।

নিবেদিতা-রবীন্দ্রের বিরোধের আরও একটি কারণ হল – নিবেদিতা চেয়েছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মডেল হোক সশস্ত্র আইরিশ বিপ্লবী সংগ্রাম। তিনি অরবিন্দ ঘোষ ও তাদের অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এবং এই নিয়ে রামকৃষ্ণ মিশন যাতে বিপদে না পড়ে, তার জন্যে মিশনের সঙ্গে সংস্রব অফিশিয়ালি ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যেকোন সহিংস ও হিংস্র কার্যকলাপের ঘোর বিরোধী ছিলেন।

শিক্ষা নিয়ে অবশ্য দুজনেরই সমান উৎসাহ ও মতামত ছিল। দুজনেই লর্ড কার্জনের বিশ্ববিদ্যালয় বিলের নিন্দায় লুখর ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষকদের শিক্ষার জন্যে জোড়াসাঁকোতেই একটা স্কুল খোলার পরিকল্পনা করেছিলেন, এবং নিবেদিতাকে সেই স্কুলের ভার নিতে অনুরোধ করেছিলেন।

এর কিছুকাল পরেই রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে নিবেদিতা – সঙ্গে জগদীশচন্দ্র ও অবলা – শিলাইদহে যান ও পদ্মায় বোটে বাস করেন। সারাদিন গ্রাম দর্শন ও সন্ধ্যায় বোটে গল্প-গান-বাজনা। রবীন্দ্রনাথের 'প্রতিদিন আমি হে জীবনস্বামী' শুনে নিবেদিতা ধ্যানস্থ হয়ে যান।

অবশ্য এখানেই এক কাণ্ড ঘটে যার ফলে নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথের ওপর প্রণ্ড ক্ষুব্ধ হন, এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁদের সম্পর্ক তিক্তই থাকে। রবীন্দ্রনাথকে একটা গল্প বলতে অনুরোধ করলে উনি যে গল্পটা শোনান, সেটা মোটামুটি গোরা-র ড্রাফট। এক আইরিশম্যান ভারতে এসে এ দেশের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে। কিন্তু জীবনসায়াহ্নে সে বিদেশী, এই কারণে তার প্রেমিকা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। পরে গোরা উপন্যাসে তিনি অনেক অংশ বাদ দিলেও সুচরিতা স্রেফ বিদেশী বলে গোরাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, শিলাইদহে বোটে বসে রবীন্দ্রনাথের এই গল্প শুনে তিনি ভীষণ রেগে যান।

গোরা প্রকাশ হয় নিবেদিতার মৃত্যুর বেশ কিছু সময় পরে। অনেক রবীন্দ্র-গবেষকদের মতেই নিবেদিতা এমন এক চরিত্র যাকে রবীন্দ্রনাথ কোনভাবেই উপেক্ষা করতে পারতেন না। নিবেদিতাই রবীন্দ্রনাথের গোরা, পুরুষের বেশে।

নিবেদিতার মৃত্যুর পর লেখা প্রবন্ধে তিনি নিবেদিতার স্তুতি করেছেন ঠিকই, তবে তাতে একটু রাশ টেনে রাখা আছে। নিজের মৃত্যুর কয়েক মাস আগে অবশ্য সেই রাশ খুলে যায় তাঁর। রাণী চন্দকে বলেছিলেন, মেয়েদের এই যে সংবেদনশীলতা, এটাই যখন একটা দৃঢ় চরিত্রের সঙ্গে মেশে, তা হয় অত্যন্ত বিস্ময়কর কিছু। নিবেদিতা সেই রকম। নিজের হৃদয় দিয়ে সে এই দেশ আর তার মানুষকে ভালবেসে গেছে, তার সমস্ত কিছু ত্যাগ করে। তার সাহসিকতা আর ঔদার্য আমাকে প্রতিপদে বিস্মিত করে।

২৮শে সেপ্টেম্বর ২০১৩

--
~Saibal