মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

​ছড়া থেকে কবিতায় উত্তরণ ~ তমাল রাহা

কিছুদিন আগে হঠাত এক বন্ধুর ইমেইল এলো। তমাল, মহায়ন এর একটা কপি পেয়েছি ! পড়লুম, আর প্রচুর হাসলুম। সত্যি, কি অদ্ভূত প্রতিভা বাঙালীর ছড়া বানানো নিয়ে ! আসলে বাঙালীর রক্তে ছড়া। ছোটবেলাটা বোধহয় সবারই ছড়াময়। তাই দু-লাইন ছড়া কাটা আমাদের বাঙালীর জন্মগত প্রতিভা। সেটা ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান থেকে রাজনীতির আঙ্গিনা অথবা ইস্কুল এর মাস্টারমশায় দের নিয়ে মজা করা …. কোথায় নেই ?
বাঙালী-র ঘরে জন্ম।তাই ছোটবেলা থেকেই ছড়ার সাথে পরিচয়। প্রথম ছড়া যা স্মৃতির পাতায় প্রথম দাগ কেটেছিল সেটা মা-এর মুখে ঘুমপাড়ানি ছড়া …. ¨ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি আমাদের বাড়ি এসো¨ কিম্বা ´খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়াল/ বর্গী এল দেশে´…. ঠাম্মা-কে বলতে শুনতাম ¨আয় আয় চাঁদ মামা, টিপ দিয়ে যা/চাঁদের কপালে চাঁদ, টিপ দিয়ে যা¨। অবাক হয়ে ভাবতুম খোকা এতো দুষ্টু যে ঘুমোলে পাড়া জুড়ায় …. কিন্তু খোকা ঘুমোলে চাঁদ মামা কিন্তু টিপ দিয়ে যেতে ভোলেন না ! একটা সময় ছিলো যখন এই ছড়া ছাড়া ঘুম আসাটাই ছিলো দায় ! ক্রমশ ছড়া ব্যাপারটা হে উঠলো জীবনের অঙ্গ। খেলতে গিয়ে ছড়া … আমপাতা জোড়া জোড়া/ মারব চাবুক ছুটবে ঘোড়া … শাসনের সময় ছড়া …পারিব না এ কথাটি বলিও না আর/ কেন পারিবে না তাহা ভাব এক বার।
বাড়িতে তো ঠাম্মা-র নির্দেশে সকালে ঘুম থেকে উঠে চালু করে দিলাম ¨সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি¨ …. আপনারে বড় বলে, বড় সেই নয়/ লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়¨ ইত্যাদি ও প্রভৃতি। ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলে ঠাম্মার বিছানা থেকে তুলে দেওয়ার মধ্যেও সেই ছড়া ¨পাখী সব করে রব, রাতি পোহাইল/ কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল¨। তখন অবশ্য মদনমোহন তর্কালঙ্কার বা হরিশচন্দ্র মিত্র মহাশয়দের নাম জানা ছিলো না। সব তো শুনে শুনে শেখা ! প্রচন্ড হতাশ হয়েছিলাম প্রথম ঠাম্মা আমায় আসল হাট্টিমাটিম দেখালো। .. আমি ছড়া পড়ে মনে মনে কি জানি কি ভেবে রেখেছিলাম ! মনে হলো …. ধুসস …. জমলো না ঠিক।
ক্রমশ বড় হার সাথে সাথে নিজের ছড়া বলা শুরু। বাবুরাম সাপুড়ে, কথা যাস বাপুরে? ….. জন্মদিনে পাওয়া ´আবোল-তাবোল´…. 'হাঁস ছিল সজারু ( ব্যাকরণ মানি না) হয়ে গেল 'হাঁসজারু' কেমনে তা জানি না´……. চরিত্র গুলোর সাথে আলাপ হার প্রবল ইচ্ছে।অদ্ভূত একটা মানসিক অবস্থা। কোথায় পাব হাসিমুখ আহ্লাদী দের, কিম্বা কুমড়োপটাশ, রামগরুড়ের ছানা, গঙ্গারাম, কাঠবুড়ো, বোম্বাগড়ের রাজা কে ? অসাধারণ সব চরিত্র। একদিকে মনে মনে ভিজে কাধ সেদ্ধ করে খাওয়ার প্রবল সাধ আর অন্যদিকে হুঁকোমুখো হ্যাংলার জন্যে মনে তখন ভারী কষ্ট। কিন্তু কে বোঝে আমার কথা? মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার/সবাই বলে 'মিথ্যে বাজে বকিস নে আর খবরদার!'
এগুলোর সাথে সাথেই চলল বড় হয়ে ওঠা।
আলাপ কাজী নজরুল এর সাথে …. কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও? কিম্বা ভোর হোলো , দোর্ খোলো … অথবা বাবুদের তাল-পুকুরে গিয়ে হাবুদের ডাল-কুকুরে-র কথা ভেবে ভয়ে মাঝরাতে ঘুমভেঙে যাওয়া। প্রায় একই সময় আলাপ কবিগুরুর সাথে … তালগাছ এর মতো এক পায়ে দাড়িয়ে থাকার অভ্যেস করার মধ্যে দিয়ে, মনে মনে আকাশেতে বেড়িয়ে, তারাদের এড়িয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে ভাবতে। এরিই মাঝে মা-কে নিয়ে বিদেশ ঘুরতে গিয়ে ডাকাত দলের সাথে মনে মনে যুদ্ধটাও চলছে। বিদেশ মানে কলকাতা বা বড়োজোর আসাম (মাসি থাকতেন) হবে ভাবতাম ! ওদিকে কবিগুরুর ছড়াতেও বিভ্রান্তি কাটছে না … ক্ষান্তবুড়ি র দিদিশাশুড়ি দের নিয়ে ভীষণ বিপদে পরা গেল। কিছুতেই বুঝতে পারি না কেন তারা শাড়ি গুলো উনোনে বিছায়, হাড়িগুলো রাখে আলনায় ! ওদিকে ইস্কুল এও কবিতা ! পরীক্ষার খাতায় দশ লাইন মুখস্থ লিখতে হবে, দাড়ি-কমার ভুল হলেই নম্বর কাটা ! ছড়া আর পিছু ছাড়ে না ! কিন্তু ভারী মজা। নতুন ক্লাস এর বই এলে প্রথম কাজই ছিলো ছড়াগুলোকে পড়ে ফেলা। কেমন যেন মাথার মধ্যে গেথে গিয়েছিল।মনে রাখার অভ্যেসটা সেই ছড়া দিয়েই শুরু।
বাবা নিয়ে গেলেন দামদর বাঁধ দেখাতে। ছিপখান তিনদাঁড়, তিনজন মাল্লা/ চৌপর দিনভর, দেয় দূরপাল্লা।এবার সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এসে গেলেন।এ যেন নতুন করে ছড়া-ছন্দের সাথে আলাপ ! অসম্ভব রকম আলোড়ন তুলেছিলো মনে …
পাড়ময় ঝোপঝাড়
জঙ্গল,–জঞ্জাল,
জলময় শৈবাল
পান্নার টাঁকশাল। ..
সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের হাত ধরেই কখন যে ছড়া আর কবিতা মিশে গেল মনের মধ্যে তা টের-ও পেলুম না। এক নিঃশ্বাসে পড়তে লাগলুম ´পালকির গান´, কোন দেশেতে তরুলতা, মানুষ জাতি, উত্তম অধম ….. কী সহজ সাবলীল ভাষা আর শব্দের ব্যবহার!
বর্ষার নবীন মেঘ এল ধরণীর পূর্বদ্বারে,
বাজাইল বজ্রভেরী। হে কবি, দিবে না সাড়া তারে
তোমার নবীন ছন্দে?
আবার ফিরে আসা কবিগুরুর কাছে। কবিগুরু তখন যেন সমুদ্দুর। বালিশের পাশে সঞ্চয়িতা নিয়ে শোয়া। নজরুলের বিদ্রোহী , সুকান্তর ছাড়পত্র, আগ্নেয়গিরি … একেরপর এক পড়ে চলেছি পাগলের মতো। গোঁফ গজানোর সময় থেকে জীবনান্দ।সব মেয়েকেই প্রায় সুচেতনা বা আকাশলীনা লাগা শুরু ! নাটোরের বনলতা সেন কে জানার ইচ্ছে আর মনে প্রশ্ন লাশকাটা ঘরে পরে থাকা লোকটাকে নিয়ে। চলছিলো বেশ, বাবা হাতে ধরিয়ে দিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যা, বিষ্ণু দে, শামসুর রহমান, দীনেশ মজুমদার, নীরেন চক্রবর্তী , জসীম উদ্দীন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক। কবিতা আর গদ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এলেন পূর্ণেন্দু পত্রী।জয় গোস্বামী এলেন একটু বাদে ´যমুনাবতী´কে নিয়ে। তবে সবার সব কবিতা ভালো লাগত না। selective ভালো লাগা শুরু হলো। সব অপূর্ণতা পূর্ণ করার জন্যে বারবার কবিগুরু তো রইলেন-ই।
কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি।
মাঝে হঠাত একটা সময় এলো যখন ভালোলাগা টা কেমন যেন মিইয়ে যেতে লাগলো। ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত। একটা অস্থিরতা ছিল। ভালো লাগছিলো না বেশিরভাগ কবিতা। ভাবছিলুম বয়স বাড়ার সাথে সাথে হয়তো এই পরিবর্তন !
কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো।
কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না
রাত কাটে তো ভোর দেখি না
কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না কেউ জানেনা।
হঠাত সেই সময়ে আবার আবিস্কার করলুম হেলাল হাফিজ, হুমায়ুন আজাদ, নির্মলেন্দু গুন, হাবীব কাশফি, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লা , আল মাহমুদ, মহাদেব সাহা, আবুল হোসেন, শহীদ কাদরী, আবুল হাসান, আহসান হাবীব কে। এরা ছিলেন, কিন্তু আমার সাথে পরিচয় ছিলো না !
তোমাকে হারানোর প্রয়োজন ছিল।
প্রয়োজন ছিল সময়কে মিথ্যে ভেবে
অসমাপ্ত কবিতা লেখার।
প্রয়োজন ছিল-
ধূসর রাতে একাকী থাকার,
দুঃস্বপ্নের ঘোরে … (জাবীর রিজভী)
আবার ভালো লাগাটা ফিরে এলো। বুঝলুম, মধ্যবয়সের চাহিদা একটু আলাদা। এখন তাই,
কষ্টে-সৃষ্টে আছি
কবিতা সুখেই আছে,–থাক,
এতো দিন-রাত যদি গিয়ে থাকে
যাক তবে জীবনের আরো কিছু যাক।
…..শুধু কবিতা পড়ার জন্য আরেকবার জন্মাতে ইচ্ছে করে।