বুধবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

এক টানেতে যেমন তেমন ~ তমাল রাহা

প্রথম হোস্টেল এ থাকতে গিয়ে আলাপ এক দাদার সাথে। ইউনিভার্সিটি topper, সাহিত্যে। রোজ সকালে দেখতাম বাংলা মদের বোতল খুলে বসতে।আর ছিলো গঞ্জিকা বা সাদা বাংলায় যাকে বলে গাঁজা। আমায় স্নেহ করতেন। একদিন প্রশ্ন করলাম, ¨দাদা, তোমায় দাঁত মাজতে দেখি না তো!¨ উত্তরে বললেন, ¨বাঘ কি দাত মাজে রে খোকা?¨ দাদা গাঁজা-মদে ডুবে থাকলেও পড়াশোনাটা করতেন আর বছর বছর পরীক্ষায় প্রথম হতেন। এমন ছেলে তো আবার অনুজদের আদর্শ , বিশেষত হোস্টেল লাইফ এ। অনেককেই দেখেছি ওই দাদা কে নকল করতে গিয়ে নিজেদের পড়াশোনা গোল্লায় পাঠিয়েছে।আমার এক সহপাঠি তো দাদার ভক্ত হয়ে গাঁজা-র নেশা করে পাগল হয়ে গেলো ! অথচ ইকোনমিক্স এর কতো ভালো ছাত্র ছিলো , ছিলো জুনিয়র বাংলা দলের গোল-কিপার।ভাবা যায় ! দোষ আর দি কাকে ! আমরা বাঙালিরা মনে করি নিষিদ্ধপল্লী তে যাতায়াত করলেই শার্ল বোদলেয়ার হওয়া যাবে, অর্শ হলেই রবীন্দ্রনাথ হওয়া যাবে আর প্রথাবিরোধী হলেই হুমায়ুন আজাদ হওয়া যাবে।তাই বন্ধুরা যখন ভাবতো সকাল বিকেল গাঁজা-মদে ডুবে থাকলেই ওই দাদার মতো হিরো হওয়া আটকায় কে ….. তখন আর কিই বা বলি !

নেশার এরকম অনেক effect আমরা অল্পবিস্তর সবাই জানি। তবে আজ ভাবছিলুম একটু অন্যরকম কথা বলি। নেশা সংক্রান্ত কিছু মজার গল্প। কিছু নিজের অভিজ্ঞতা, কিছু শোনা, কিছুটা পড়া।

আবার সেই হোস্টেল এর গল্পে যাই। একবার ইচ্ছে হলো হুকো তে তামুক পান করার। থাকতাম ইডেন হোস্টেল-এ। কলেজ স্ট্রিট-এ। কাছেই নাখোদা মসজিদ। অম্বুরি তামাক পাওয়া যেতো। হুকো এলো, তামাক এলো। রাতে ডিনার এর পর বারো জন বন্ধু একসাথে বসা হলো। নাহ …. সে যাত্রায় তামাক খাওয়া হয় নি। সারারাতের চেষ্টাতেও হুকো জ্বালানো গেল না। ভোর রাতে শেষে বিড়ি খেয়ে গাল পরতে পরতে শুতে গিয়েছিলাম মনে আছে।

নাগা সন্ন্যাসী বলতে ছিলিমভর্তি গাঁজা আর শৈশবের পোশাকে ঘুরে বেড়ানো সাধু-সন্তরাই মনে আসেন। গাঁজা -র নেশা না থাকলে কি আর ওই অবস্থায় ঘোরা যায় ! এক সাধু কে বলতে শুনেছিলাম যে গাঁজা খেলে পরমব্রহ্ম কে সাকার রূপে দেখা যায় ! শিবঠাকুর তো দিব্য গাঁজা-ভাং খেয়ে কচুরিপানার ওপর হেঁটে বেড়াতেন। অষ্টম শতকে (কেউ কেউ বলেন ষষ্ঠ শতক) রচিত বানভট্টের কাদম্বরীতে রয়েছে, রাজধানী বিদিশায় বসে শুদ্রক রাজা স্নানাহারের পর কষে গাঁজা খেতেন। কারণ তখনও ভারতে তামাক আসেনি। অবশ্য তামাক জ্বালানোর করুণ অভিজ্ঞতা ওনার-ও হযেছিলো কিনা সেটা জানার উপায় নেই। গাঁজা , সিদ্ধি …. আরো কিছু কথা 

তপস্যার চার পথ-- স্থূল, পর্বত, ছাতক ও সিদ্ধি। গুরুর নামে যখন গাঁজা খাওয়া হয়, তখন সেটা সিদ্ধি আর এমনি এমনি খেলে তা নেশা করা, পাগলামি।

দেহের ভেতর আত্মা রাজা। 

সে খায় গাঁজা।

গাঁজা খাওয়ার জন্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কলকি। এগুলোকে বলা হয় বাঁশি। রয়েছে, কৃষ্ণ বাঁশি, নাগিনী বাঁশি, শঙ্খ বাঁশি, বিচ্চু বাঁশি, গণেশ বাঁশি, মেগনেট বাঁশি ও সাধারন বাঁশি। কারুকার্য, বানানোর নিপুণতার দিক দিয়ে বাঁশির দাম ১০টাকা থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। তবে সবচেয়ে বেশি চলে কৃষ্ণ বাঁশিই।

গাঁজা আর byproducts 
গাঁজা : স্ত্রীপুষ্পকে ৪৮ ঘণ্টা রৌদ্রে শুকালে ফুলগুলো জমাট বেধে যায়। এই জমাটফুলই গাঁজা নামে বিক্রয় হয়। সাধারণত কল্কিতে গাঁজা ভরে অগ্নিসংযোগ করে এর ধোঁয়া গ্রহণ করা হয়। এছাড়া সিগারেট বা বিড়ির মতো করে গাঁজা ভরে এর ধুমপান করা হয়।
ভাং :
 স্ত্রী উদ্ভিদের ভূ-উপরিস্থ অংশ শুকিয়ে বা কাঁচা অবস্থায় পিষে পানির সাথে মিশিয়ে সরবত বানিয়ে পান করা হয়। নেশাকারক উপাদান কম থাকে বলে গাঁজা অপেক্ষা ভাং কম দামে বিক্রয় হয়।
চরস্ : গাছের আঠা থেকে চরস তৈরি হয়ে থাকে। অনেক সময় গাঁজার ফুল শুকানোর সময় যে গুঁড়া উৎপন্ন হয়, তা আঠার সাথে যুক্ত করে চরস তৈরি হয়ে থাকে। অনেক সময় এই আঠা পাওয়ার জন্য গাঁজার গাছ কেটে দেওয়া হয়।
সিদ্ধি : গাঁজা গাছের পাতা শুকিয়ে সিদ্ধি তৈরি করা হয়। সিদ্ধি থেকে অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে ঔষধ তৈরি করা হয়। এছাড়া সিদ্ধি মুখে পুরে চিবিয়ে নেশা করে অনেকে।
হাসিস : গাঁজার স্ত্রীপুষ্পের নির্যাস থেকে হাসিস তৈরি করা হয়। গাঁজা গাছ থেকে ঊৎপন্ন সকল নেশা দ্রব্যের মধ্যে হাসিসকে শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করা হয়।


ফিরে আসি আবার হোস্টেল এর গল্পে।

হোস্টেল-এ অনেক কেই গাঁজার নেশায় বুঁদ হতে দেখেছি দিনের পর দিন।এক দাদা কে গাইতে শুনতাম দ্বিজেন্দ্র লাল রায়-এর গান

গাঁজা গুলি চরস
...তার চেয়ে ভাঙ
লক্ষ গুণে সরস।

একদিন হোস্টেল ই প্রচন্ড হৈ - চৈ। বাইরে বেরিয়ে দেখি সেই দাদা তারস্বরে চেচাচ্ছে , ¨শালা কেস করে দেবো ¨বলে। বুঝলুম নেশার ঘোর। জানতে পারলাম বান্ধবী ল্যাং মেরেছে। তাই কেস করে দেবে বলে হুমকি দিচ্ছে। বলা হলো, এসব ব্যাপারে কেস দেওয়া যায় না, খালি কেস খাওয়া যায়। শুনে তার কি রাগ! বললো, ¨আমার কাছে evidence আছে। আমি জানি সেই কি রঙের অন্তর্বাস পড়ে।¨ তারপর থেকে সেই দাদা হোস্টেল-এ গনখোরাক হয়ে গেলেন।

সৈয়দ মুজতবা আলীর গাঁজা নিয়ে একটা মজার গল্প আছে। অনেকেই পড়েছেন হয়তো। যারা পড়েননি তাদের জন্য স্মৃতি থেকে একটু তুলে দিচ্ছি। দেশভাগের পর কোন এক নিয়মের গ্যাড়াকলে পড়ে তৎকালীন পূর্ব বঙ্গ থেকে ভারতে গাঁজা রপ্তানি বন্ধ। গাঁজা রপ্তানি বন্ধ হওয়াতে গুদামে গাঁজা জমে আছে মণকে মণ। নতুন গাঁজা উৎপাদিত হয়ে, প্রস্তুত হয়ে গুদামে ঢোকার অপেক্ষায়। বাধ্য হয়ে পুরানো গাঁজা নষ্ট করে ফেলতে হবে। কোনো কারণে আলী সাহেব সেখানে উপস্থিত ছিলেন। খুব সম্ভব দায়িত্বরত অফিসার তার আত্মীয় (ভাই?) ছিলেন। আলী সাহেবকে বললেন, চল দেখবি। জীপে করে যথাস্থানে গিয়ে দেখলেন পুরানো গাঁজা জড় করে রাখা হয়েছে পোড়ানোর জন্য। সমগ্র গ্রামবাসীও (নারী, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ) হাজির হয়েছে অগ্নুত্সব যোগ দিতে। মজা শুরু হোলো আগুন লাগানোর পর। বাতাস যেদিকে যায় সমগ্র গ্রামবাসী সেইদিকে দৌড়ায়। বেশিক্ষণ আলী সাহেবের পক্ষে সেখানে অবস্থান করা হয়ে ওঠেনি। তবে ফেরার সময় তিনি জীপে করে ফিরে এসেছেন নাকি হাতির পিঠে করে ফেরত এসেছিলেন তা আর মনে করতে পারেননি। বাতাস তো সব দিকেই দৌড়িয়েছে, আর উনিও তো এক দিকে ছিলেন।

ইস্টবেঙ্গল মাঠে এক কালে রোজ যেতুম। দু-টাকার গ্যালারি তে উত্তমকুমার বলে একজন আসতেন।ওটা অবশ্যই ওনার আসল নাম ছিলো না। সবাই আদর করে ওই নামে ডাকতো। গাঁজা-র ছিলিম বানাতেন মাঠে বসে। আর কল্কে সারা মাঠে ঘুরতো।দু-একবার টান দেওয়ার কথা আমার-ও মনে পরে।

গাঁজা পরিবারের নিজস্ব কিছু টার্ম রয়েছে। যেমন, গাঁজা কাটার ছুরি নাম 'রতন কাটারি'। যে পিঁড়িতে গাঁজা কাটা হয় তা 'প্রেমতক্তি' আর ধোঁয়া ছাঁকবার ভিজে ন্যাকড়ার নাম 'জামিয়ার'। আর গাঁজাতন্ত্রের শেষ আচার হলো একটানে কলকে ফাটানো। ছিলিম আর কলকে হলো একই জিনিস।ছিলিমের মূল আরবি 'ছিলম' আর কল্কের মূল সংস্কৃত 'কলিকা'। আর ফারসি ´নাইচা´থেকে বাংলায় এসেছে ´নলচে।
অন্যদিকে গাঁজা এসেছে সংস্কৃত ´গঞ্জিকা ´ থেকে। সংস্কৃত 'গাঁজ' (ফেনা) থেকেও বাংলায় গাঁজা শব্দটি এসেছে। এ গাঁজার অর্থ ফেনিল হয়ে ওঠা, টক হয়ে যাওয়া।

গাঁজা গাছ দুরকমের হয়। স্ত্রী - পুরুষ ভেদ আছে। স্ত্রী গাছে নেশা বেশি। সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না ? গাঁজা-র ব্যবহার শুরু নাকি শক-জাতির আমল থেকে। আদর করে ´কুনবু´বলে ডাকতো ওরা। ওরা কি জানতো যে গাঁজা-র সাইন্টিফিক নাম Canabis sativa ? Canabis এর আদুরে নাম কুনবু ! হোস্টেল-এ অনেক কে বলতে শুনেছি ´পাতা´।

ওপার বাংলায় একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। একদিন লোকমান হেকিম রাস্তা যাচ্ছেন। যেতে যেতে গিয়ে পড়লেন এক জঙ্গলের সামনে। লোকমান হেকিম জঙ্গলের পাশ দিয়া হাটেন আর নতুন নতুন গাছ দেখেন । গাছের সামনে হেকিম দাড়ালেই গাছ তাকে সম্মান জানায়। যেই গাছ সামনে পড়ে হেকিম তারে জিগায়, তোর নাম কি, আর কি কামে লাগছ? গাছ উত্তর তারে সম্মান জানাইয়া উত্তর দিলো আমার নাম আমলকি। আমি ভিটামিন সি এর ভান্ডার বিভিন্ন কাজে লাগি, এই সব। এরপর আস্তে আস্তে আম, কলা, জাম, বাসক, লজ্জাবতী, কাটানটি, চুতরা, করমচা, হিজল, বট সব গাছের প্রশ্ন করতে করতে যাইতে লাগলো। হঠাৎ হেকিম দেখেন একটা নতুন গাছ। এর আগে লোকমান হেকিম দেখে নাই। যথারীতি সে সেই গাছের সামনে দাড়ালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, করো ওরে গাছ তোর নাম কি আর কি কামে লাগছ?

গাছ নিশ্চুপ।

লোকমান আবার জিগায়।
গাছ আবারও নিশ্চুপ।

এইবার লোকমান রেগে গিয়ে জিগায় -
ওরে বেয়াদপ গাছ তোর নাম কি আর কি কামে লাগস?
গাছ ও সামান তেজে উত্তর দেয়
"তোর মতো হাজার হাজার লোকমান হেকিম পয়দা করাই আমরা কাম"

চুপিচুপি আরেকটা জিনিস জানিয়ে যাই, গাঁজা গাছ হলো একমাত্তর গাছ যা স্বর্গেও পাওয়া যায়। গল্পটা ঠিক এইরকম ….

শিবঠাকুরের মনে সুখ নেই। কোনো নেশাই তাকে খুশি করতে পারছে না। এলেন তখন লোকমান হেকিম। বোধহয় ওই আলাপচারিতার পরের ঘটনা ! শিবঠাকুর কে বললেন গাঁজার নেশা করতে। শিববাবাজি গাঁজা খেয়ে এতো খুশি হলেন যে স্বর্গে নিয়ে গেলেন সাথে করে গাঁজাগাছ।

সেই সাহিত্যের ছাত্র আমার হোস্টেলের দাদার কথা দিয়েই শেষ করি। পরবর্তীকালে সেই দাদা রাজধানীর এক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের বিভাগীয় প্রধান হযেছিলেন। কয়েকবছর আগে খবর পেলুম তিনি আত্মহত্যা করেছেন। খোজ নিয়ে জানলুম নেশাটা ছেড়ে উঠতে পারেন নি। মানসিক অবসাদ হয়তো ….
আজ এই পর্যন্ত থাক।