শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০১৩

বাবার ছবি ~ অরুনাচল দত্ত চৌধুরী

স্বপ্ন বলতে একটাই ছিল মানুষ করবে ছেলে
ভাবত ছেলের লেখাপড়া হবে নিজে আধপেটা খেলে।
স্বপ্ন বলতে এই বোকা আনি আমি মানুষ হইনি তত ,
যদিও ডিগ্রী পেয়ে গেছি কিছু সান্ত্বনা অন্তত।
এই কাহিনীর প্রথমটা শুরু সুদুর মফসসলে
প্রতি শনিবার বাড়ি ফেরে বাবা সপ্তাহ শেষ হলে।
প্রায় জাদুকর , ব্যাগের ভেতর থেকে বের করে দিত,
সন্দেশ , বই , লাটাই, কলম। আমি উৎকন্ঠিত,
জেগে থাকতাম , কড়া বাজলেই "খোকা| বলে ডাক দিলে ,
মনের ভুলেও প্রশ্ন করিনি , "বাবা তুমি ভালো ছিলে"?
রবিবার চলে যাবার সময় জড়িয়ে বলত হেসে.
"তোকে ছেড়ে আমি কখনো যাবনা আকাশে তারার দেশে"I

কিছুদিন পর পাশ করে যাব হায়ার সেকেন্ডারী
মফসসলের মেধাবী ছাত্র কলকাতা দেবে পাড়ি i
রাজনীতি, তাস সাথে সিগারেট , সবটা শিখবে ছেলে ,
দিন ও রাত্রি একাকার হবে শিবপুর হোস্টেলে।
যোগাযোগ কড়া সহজ ছিল না , সুলভ ছিল না ফোন ,
চিঠি দিতাম না , ভেবে নিত বাবা পড়ছি সারাক্ষণ।
অবহেলা ভরা বাতাসে হারাত প্রিপেড টেলিগ্রাম
রিপ্লাই কার্ড,উত্তর দিতে ভুলেই গিয়েছিলাম ।
এত উড়লেও ভবিষ্যতের ততটা ঘটেনা ক্ষতি,
আজ উৎসব, সহপাঠিনীর পাওয়া গেছে সম্মতি ।
জানিয়েছে মেয়ে,"রাজি আছি প্রেমে যদি গড় কেরিয়ার",
উজ্জ্বল ভিসা জোগার করতে ঘটল না দেরী আর ।

সহপাঠিনীর সাথেই এখন সাত সাগরের পারে,
সন্তান নিয়ে টেক্সাসে এ আছি সুখে ভরা সংসারে ,
ফোনের মধ্যে বাবাকে বোঝাই "চলো ওল্ড এজ হোমে,
বাড়িতে একলা নিরাপদ নও", বোঝে না সে কোনো ক্রমে।
যত বলি সব খরচ পাঠাব , ডাক্তার, নার্স, আয়া ,
বাবা বলে "খোকা এই উঠোনেই পড়ে আছে তোর ছায়া"
কান পাতলেই তোর গলা শুনি এ বাড়ির প্রতি ইঁটে
শেষ অবধিও একরোখা বাবা আঁকড়ে থাকলো ভিটে I

আজ প্রতিবেশী ই -মেল পাঠিয়ে জানিয়েছে সংক্ষেপে ,
তারাদের দেশে চলে গেছে বাবা, আগুন ভেলায় চেপে i
শেষ প্রলাপেও আমার কথায় গিয়েছিল নাকি মিশে
এইবার বাড়ি ছেড়ে যেতে কোনো আপত্তি করেনে সে।


আমার দু চোখে এতদিন এ নামে অগ্নিগিরির লাভা,
এলবাম থেকে ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে দেখছে বাবা ।