সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০১৩

সোঁদরবনের বাঘের বাপ ~ অবিন দত্তগুপ্ত

সেদিন বোধহয় কোন রাজ্য কমিটি, অথবা তৎসম তৎভব মিটিং ছিল। তাই উনি এসেছিলেন। পরনে নীল লুঙ্গি, ফ্যাকাসে দাদু মার্কা ফতুয়া (দাদু মার্কা একারণে, কারন রেলওয় ম্যানস ইউনিয়ান করা আমার বাপের বাপ, অমনি ফতুয়া পরতো। সুতরাং সমস্ত ফ্যাকাসে ফতুয়াই আমার কাছে দাদু মার্কা)। মিটিং-র শেষে, বেরোনোর মুখে নাগরিক এক কমবয়েশি কমরেডের সাথে দেখা। ছেলেটি জোর করে একটা কার্ড গুঁজে দিয়ে বললো, সাড়ে ৫টায় রবীন্দ্রসদন, আসবেন কমরেড... হয়তো যেতেন না, কিন্তু 'কমরেড' বলে ডাক দিলে কেউ ফেরানো কঠিন, অতএব বাসে উঠে পরা... নন্দন চত্ত্বরে পৌঁছে, বাইরের মাইকে সুচিত্রা মিত্রের গলা অনুসরণ করে রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গন... নীল লুঙ্গি, দাদু মার্কা ফতুয়া পরা লোকটার হাতে তখন 'গেস্ট কার্ড'... একদম সামনের সারি... চারপাশে গাঢ় চশমা পরা, কলপ করা দাড়ি, পোড়া মাটির গয়না... এমতাবস্থায়, ঘেমো লোকটা কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে লাল গামছা বের করে, ঘাম মুছে সীটে বসলেন... সামনের দিকে যান্ত্রিক স্বেচ্ছাসেবক, এদিকে মহা অস্বস্তিতে... এমন ধোপদুরস্ত জনতা, রাবীন্দ্রিক ভীড়, তার মধ্যে ঘেমো নীল লুঙ্গি, দাদু মার্কা ফতুয়া পরা, লাল গামছায় ঘাম মোছা একটা কেলে কুচুটে লোক... অতএব বার তিনেক ভদ্রলোকের কার্ড পরীক্ষা হলো। শেষে কার্ড পরীক্ষা করতে এলেন স্বয়ং স্বেচ্ছাসেবকদের অধিনায়ক... সুচিত্রা মিত্র 'তা সে যতই কালো হোক' –এর মুখরায় যখন, যখন সেই ঘেমো লোকটা সবে চেয়ারের উপর হাঁটু তুলে মুখ রেখেছে, ঠিক তখনই, 'দাদা আপনার কার্ডটা......' ভুরু কুঁচকে 'ধুত্তোরি, রইল তোমার কার্ড' বলে বাঘের মতো লাফিয়ে উঠে, চোখের পলকে নোংরা, ঘেমো লোকটা রবীন্দ্রসদন ছাড়লো... হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো ধোপদুরস্ত শহুরে স্বেচ্ছা সেবক... শান্তির নিঃশ্বাস ফেললেন পোড়া মাটির গয়না পরিহিতারা, অথবা ধোপদুরস্ত ভদ্রমহাদোয়গণ। তখন সুচিত্রা মিত্র কোন অন্য রাগে... ঘেমো লোকটা নন্দন ছাড়লো... সামনে কর্তব্যরত ঝাড়ুদার তার কমরেডকে ফিস ফিস করে বললেন, 'ফেউয়ের দেশে বাঘের জায়গা হয়না... ওই যে লোকটা হেটে চলে গেলেন, যতীন মাইতি, সোঁদরবনের বাঘের বাপ, তেভাগার নেতা... চোখটা দেখলি?