শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০১৩

মেঘের চিঠি ~ অনির্বান মাইতি

যখন সব ঘুড়ি গুলো একে অন্যকে কাটতে আকাশ জুড়ে লুটোপুটি খাচ্ছে , চারদিকে ভো কাট্টা আওয়াজ এ কান পাতা দায় , তখন একটা ঘুড়ি একদম একা , নিঃসঙ্গ হয়ে ঠিক উত্তরপূর্ব কোনে একটুকরো মেঘের কাছে আসার চেষ্টা করছিল, ওই ঘুড়িটার মালিক গুলগুল , আমার বন্ধু , আমার পাশের ফ্ল্যাট এ থাকে , মোটে ৬ বছর বয়েস হলে কি হয় ? এখনি ঘুড়ি ওড়ানোয় ওস্তাদ হয়ে উঠেছে , আর গুলগুল এর এই ভিড় থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার এই অভ্যেসটা আমার ই মস্তিষ্কপ্রসূত, গল্পটা ছোট করে বলি .....

মাস খানেক আগে, আজকের মত একদিন ছাদে উঠেছিলাম চা খেতে, গুলগুল কে দেখি এক কোনে বিমর্ষ মুখে বসে রয়েছে , এগিয়ে গিয়ে মুখের ওপর ঝুকে পরা চুলগুলোকে ঘেটে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম " কি ওস্তাদ ? আজ কাটা যায় নি নাকি ? ঠোঁট ফুপিয়ে জানালো একটাও কাটতে তো পারেই নি বরং নিজের সব থেকে প্রিয় ঘুড়িটাকে হারিয়েছে, ওকে দেখে বেশ মন খারাপ হলো , কিছুক্ষণ ওর পাশে বসে থাকলাম.... ,

এমনিতেই পাড়ার বাচ্চাদের মাথা খাওয়ার ব্যাপারে আমার বেশ বদনাম আছে , নিন্দুকেরা তো আমার ফ্ল্যাট টাকে জঙ্গিশিবির বলে, এখানে নাকি দামী কাঁচের গ্লাস কি করে ভেঙ্গে প্রমান লোপাট করতে হয় , আচারের বোতল খালি করে তাতে কাদা ভরে দিতে হয়, বা জলের ট্যান্ক এ কি ভাবে আলতা ফেলে দিতে হয় , ইত্যাদি শেখানো হয় , এই অভিযোগে অনেক বাবা মা ই বাচ্চাদের আমার ফ্ল্যাট আসার অনুমতি দেন না , আপনাদের কাছে স্বীকার করতে আপত্তি নেই এই সব অভিযোগের বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে......

এবার গুলগুল এর কথায় আসা যাক, হঠাত মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল , ওকে টেনে কোলে বসিয়ে নিলাম " দেখো ওস্তাদ এই ঘুড়ি কাটাকাটি তে কোনো আনন্দ নেই , তুমি কি জানো ঘুড়ি আসলে কি ?
নিচু মাথা এবার উঁচু হলো "কি ?"
"চিঠি"
গুলগুল চোখটাকে পিটপিট করে আমার দিকে চাইল "মানে ?"
বললাম "একটা ম্যাজিক দেখবি ?"
বলল "দেখাও "
"দেখ ওই যে মেঘ টা দেখছিস , আমি ওকে চিঠি লিখব , আর ও আমার কথা শুনবে"
পকেট থেকে একটা পেন বের করে একটা ছোট ঘুড়ির ওপর বড় বড় করে লিখলাম "একটু বামদিকে সরবি ?"
গুলগুল ঘুড়িটা ধরে দাড়ালো , আমি লাটাই , এক দমকা হওয়ার সাথে ছোট হাতে উপরে ছুঁড়ে দিল ঘুড়ি টা , আমিও টান দিলাম , ঘুড়ি টা পত্পত করে উড়তে থাকলো , আমি বাম দিকে সুতো টানতে টানতে ঘুড়িটাকে মেঘের কাছে নিয়ে চললাম,
গুলগুল চিত্কার করছে "আরো ঢিল দাও , মেঘ তো পড়তেই পারবে না চিঠি টা "
অবশেষে মেঘ এর কাছে পৌঁছলো ঘুড়ি ওরফে চিঠি , পত্রপাঠ মেঘ আসতে আসতে বাম দিকে সরতে সরতে অনেক দুরে চলে গেল ,
গুলগুল এর ফুর্তি চাক্ষুস করার মত তখন কেউ ছিল না , অজানা আবিষ্কারের আনন্দে ছাদের এপ্রান্ত থেকে প্রান্ত ছুটে বেড়াতে লাগলো , লাফিয়ে এসে আমার কোলে উঠে পড়ল , আমিও ওকে নিয়ে বনবন করে দুপাক দিলাম ....... সেদিন থেকে আমি, গুলগুল আর মেঘ খুব বন্ধু হলাম

তারপর অনেকদিন কেটে গেছে , অফিস এর কাজে বাইরে গেছিলাম , ফিরে দেখি প্রচন্ড দাবদাহে কলকাতা জ্বলছে , তার মধ্যে রোজ হাজিরা অফিসে, ফিরে এসে আর শরীর দিত না ..... আজ হঠাত ছুটি জুটে গেল তাই আবার ছাঁদে, গুলগুল এক প্রান্তে , আমি অন্য প্রান্তে নিজের মত চায়ে চুমুক দিতে দিতে ওর ঘুড়ি ওড়ানো দেখছিলাম , হঠাত ঘুড়ি লাটাই ছুঁড়ে ফেলে চিত্কার করে কান্না জুড়ে দিল , আমি দৌড়ে গেলাম , "আবার কি হলো ওস্তাদ ?"

অভিমানী ঠোঁট ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল " কাল থেকে সমানে চিঠি পাঠাচ্ছি, মেঘ কথাই শুনছে না "
একটু হাসি ই পেল, হাটু মুড়ে ওর ঘুড়িটার সামনে বসলাম , উল্টিয়ে দেখি সদ্য গড়ে ওঠা হাতের লেখায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা " কিরে বৃষ্টি দিবি না ?"
অনেক কষ্টে হাঁসি ছাপার চেষ্টা করছি এমন সময় ওর চোখের এক ফোঁটা জল ঘুড়িটার ওপরে পড়ল , মুছতে না মুছতেই আবার এক ফোঁটা , না এত চোখের জল না , আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি তাজ্জব , কোত্থেকে একখন্ড কালো মেঘ , ঠিক আমাদের মাথার ওপরে এসে গুড়গুড় গুড়গুড় করছে , ভাবখানা এমন যেন "কেমন দিলাম ?"

আমি উঠে দাড়াতে না দাড়াতেই রিমঝিম ধারায় বৃষ্টি নেমে আসতে থাকলো , গুলগুল চোখের জল মুছে বড়বড় চোখে আকাশ আর আমার মুখের দিকে দেখছে .....

আমি চোখ বুজে দুইহাত প্রশস্ত করলাম , কানে এলো গুলগুল এর চিত্কার "মেঘ আমার চিঠি পেয়েছে ওস্তাদ " আমার চারদিকে তখন বৃষ্টির রিমঝিম আর দুটো ছোট পায়ের দৌড় এর শব্দ , বৃষ্টির জলে টের পাই নি দুফোঁটা চোখের জল ও মিশেছিল কিনা , গুলগুল এর হাসি দেখে বুকের ভিতর কি অপরিসীম একটা আনন্দ হচ্ছিল , ফ্ল্যাট এর বাকিরাও ছাদে আসছে একে একে বৃষ্টি তে ভিজবে বলে , আমি শুনলাম গুলগুল ওদের কাছে গিয়ে বোঝাতে চাইছে ও কিভাবে বৃষ্টি টা আনলো , ওরা ওকে নিয়ে মশকরা করছে , কিন্তু আমি জানি গুলগুল এই বৃষ্টিটা তোর ই আনা , তোর চিঠি তে মেঘের মান ভেঙ্গেছে ,আমি জানি ......