শনিবার, ১৫ জুন, ২০১৩

পারি আর পারিনা’র গল্প - পিয়া সেন


ঘটনা ১ঃ স্থানঃ পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার একটি গ্রাম।
  বক্তাঃ প্রাইমারি স্কুলে মিড্‌-ডে-মিল রান্নায় নিযুক্ত এক রাঁধুনি।
“আমরা গ্রামের মুখ্যু মেয়ে দিদি। আমরা কি আর বুঝি আর কত’টাই বা পারি? এই সব হিসেব-পত্র মাস্টাররা আমাদের চেয়ে ঢের ভাল করতে পারেন।”

ঘটনা ২ঃ স্থানঃ কেরালার তিরুবনন্তপুরম জেলার একটি গ্রাম।
 বক্তাঃ গ্রামের এক সাধারণ মহিলা। কাঠ বিক্রি করে পেট চালান।
“আমি কাঠ বিক্রি করি গ্রামের এক ছোট কারখানায়। সেখানে তা’ দিয়ে নানা জিনিস তৈরি হয়। এ ছাড়াও আমি পঞ্চায়েতের কুড়ুম্বশ্রী শাখার সঙ্গে যুক্ত।”

ভারতবর্ষের দু’ই প্রান্তের গ্রামের দু’জন সাধারন মহিলার আপাতসাধারন মন্তব্যকে বন্ধনীর মধ্যে উল্লেখে কারোর ভ্রূ কুঞ্চিত হতেই পারে। প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।  কিন্তু একটু মনযোগী হলেই দুই সমশ্রেণীর শ্রমজীবি মহিলার বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের এক বিশাল ফারাক লক্ষ্য করা যায়, যে’টি যথেষ্টই কৌতূহল উদ্রেক করে।  
অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তাঁর একটি লেখায় capability বলতে বুঝিয়েছেন প্রত্যেকটি মানুষের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার বিকাশ ও তাকে উপলব্ধি করার স্বাধীনতা বহুলাংশে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। এখানেই বোধহয় উক্তি দু’টির প্রাসঙ্গিকতা।
একটু বিশ্লেষণে আসা যেতে পারে। এই দুই মহিলাই অল্প বিস্তর শিক্ষিত- প্রথম জনের পড়াশোনা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় জন পঞ্চাশোর্ধ বিধবা। অথচ যে হতাশার সুর প্রথমজনের সর্বাঙ্গ থেকে ঝ’রে পড়ছিল, তার লেশমাত্র-ও দ্বিতীয়জনের গলায় প্রতিদ্ধনিত হল না। বরং দেখা গেল এক আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা। তিনি যে শুধু কাঠ বিক্রি করেন তাই নয়, গ্রামের বিভিন্ন সমস্যা সম্বন্ধেও তিনি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল এবং কুড়ুম্বশ্রীর শাখা অফিসে অন্যান্য মহিলাদের সাথে নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনাতেও অংশগ্রহণ করেন।
এই প্রসঙ্গে বলি কুড়ুম্বশ্রী কেরলে সরকারি সহায়তায় গঠিত এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা যা প্রায় গত এক দশক ধরে মহিলাদের জন্য কাজ করে চলেছে। আজ কেরলের প্রায় প্রতিটি জেলায় কুড়ুম্বশ্রীর অফিস আছে এবং পঞ্চায়েতের সাথে যুক্ত হয়ে তারা কাজ করেন। মহিলাদের জন্য তাদের প্রকল্প ও পরিকল্পনা আছে। প্রতিটি গ্রামের সমস্ত পরিবারের অন্ততঃ একজন মহিলা সদস্য এদের গ্রামীণ শাখার সাথে যুক্ত এবং এর সাহায্যে এনারা অনেক রকমের সুযোগ সুবিধা  পেয়ে থাকেন। এই দলবদ্ধ ভাবে নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা এবং তার সমাধান খুঁজে বার করার প্রচেষ্টাই জাগিয়ে দিয়েছে গ্রামের মহিলাদের মধ্যেকার আত্মবিশ্বাস- “আমরাও পারি”- এই বোধ, চেতনা। কুড়ুম্বশ্রী খুব-ই জনপ্রিয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের “মডেল”রূপে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। কেরলের গ্রামের ওই বৃদ্ধা মহিলার মুখের ঔজ্জ্বল্যের- দীপ্তিময় হাসির কারণ-ও কুড়ুম্বশ্রীর সাহচর্য্যে তার নিজের মধ্যে জাগ্রত সচেতনতা। এই সচেতনতা তাকে দিয়েছে মনের জোর, ভরসা আর সব চাইতে বেশি- নিজেকে বিশ্বাস করার ক্ষমতা।
এবারে ফিরে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মহিলার কাছে। মুর্শিদাবাদ জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে ওনার বাস। গ্রামটি প্রধানতঃ মুসলমান ও অনগ্রসর শ্রেণী অধ্যুষিত। দারিদ্রসীমার নিচে বাস করা এই পরিবারগুলির দিন  গুজরানের প্রধান ভরসা ক্ষেত মজুরি ও বিড়ি বাঁধা। ফলে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অনটন এনাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
প্রথম থেকেই স্কুলে চলা মিড্‌-ডে-মিল্‌ সঙ্ক্রান্ত কোন কথাবার্তাতে অংশগ্রহণ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছিলেন বছর তিরিশের এই রাঁধুনি। মাস্টারমশাইদের কাছে  না গিয়ে তাঁর সাথে কথা বলতে এসেছি শুনে অত্যন্ত অবাক হলেন এবং বারংবার নিজের অক্ষমতা ও অজ্ঞতার কথা তুলে ধরলেন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন কথাবার্তার মধ্যে খাবারের হিশেব-নিকেশ রাখার প্রসঙ্গ উঠলে একদম প্রথমোক্ত উক্তিটি উনি করেন। ক্লাস্‌ এইট্‌ পাশ হওয়া সত্ত্বেও একটি ছাপা লেখা পড়ার জন্য এগিয়ে দিলে অবিশ্বাসের হাসিতে “আমি পারবনা” ছিল তার প্রথম উত্তর। বারংবার পীড়াপীড়িতে শেষে পড়তে নিলেন এবং তার পড়ার অনর্গল স্রোতকে আমি অবশেষে নিজের কাজের তাগিদে থামাতে বাধ্য হলাম। মহিলার মুখটি ততক্ষণে “আমি পেরেছি”র হাসিতে উদ্ভাসিত। কষ্টকর এটি- উনি যে পড়তে পারেন তা উনি নিজেই বিস্মৃত হয়েছিলেন।
উপযুক্ত সামাজিক পরিবেশের অভাবে শিক্ষা তাই তার মধ্যে কোন আত্মবিশ্বাসের ভিত তৈরি করেনি। দিন গুজরানের কঠর পরিশ্রম সত্ত্বেও “পারিনা”র থেকে “পারি”তে উত্তরণ ঘটেনি। অথচ আপাতদৃষ্টিতে এই দুই মহিলাই অর্থনৈতিক ভাবে যথেষ্ট দুর্বল এবং সামাজিক স্তরেও পশ্চাৎপদ। দুই পক্ষই দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারি উপরন্তু কেরলের ওই বয়ষ্কা মহিলা নিজের ছেলের সংসারে আশ্রিতা। কিন্তু পার্থক্যটা এই যে এই দুই রাজ্যের দারিদ্রসীমার মধ্যে যেমন ফারাক রয়েছে তেমন-ই তারতম্য আছে এদের সামাজিক পশ্চাৎপদতার মাত্রাতেও। পশ্চিমবঙ্গে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারি এক মুসলমান পরিবারের সঙ্গে কেরলে ওই এক-ই অবস্থায় বাস করা আর একটি নিম্নবর্গীয় পরিবারের মধ্যেকার সামাজিক অবস্থানের বিপুল তফাৎ।
বহু প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কেরলে প্রত্যক্ষ করা যায় জাত-ধর্ম ও দলমত, প্রধানত রাজনৈতিক মত-অমত নির্বিশেষে এক সামূহিক উদ্যোগ যা এই রাজ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই এর কিছুটা বিপরীত মনোভাব লক্ষ্য করা যায় এই রাজ্যে- যেখানে উচ্চবর্গীয়রা সমাজের নিম্নবর্গীয়দের ভিতরে অত্যন্ত নিপুণভাবে “পারবিনা” মনভাবের বীজ রোপণ করে যা প্রত্যক্ষ করা যায় প্রথম মহিলার ক্ষেত্রে। অথচ ক্ষণিকের জন্য পড়তে পারার মত সামান্য সু্যোগেই নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে এই নবসচেতনতা তার মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দের জন্ম দিয়েছিল এবং এইখানেই যেন কোথাও এই দুই ভিন্ন প্রান্তের অপরিচিত মহিলা এক সত্তা হয়ে উঠেছিলেন।

** লেখক “প্রতীচি ইন্সটিটিউট্‌”-এ সহগবেষক (Research Associate) হিসেবে কর্মরত।