রবিবার, ৩০ জুন, ২০১৩

টুক্‌নামচা... ২ ~ সংগীতা দাশগুপ্তরায়

খাটের তলা মানেই রাতের বেলা একটা ভয় ভয় ব্যাপার ছিল। আমাদের ডানলপের বিখ্যাত মশা আর লোডশেডিংএর আড়তে খাটের তলা কোনোকালেই তেমন আকর্ষণীয় লাগত না আমার। এদিকে আমাদের পুরোনো বাড়ির বারান্দার একদিকে শোবার ঘর আর অন্যদিকে রান্নাঘর ইত্যাদি। এমনিতেই একটু একটেরে শোবার ঘরে একটু ভয় ভয় লাগত আমার। মার রান্নাঘরের পাট চুকতে দেরি হত অনেক। আমি আর বোন খেয়ে দেয়ে বিছানায় চলে যেতাম আগে। বোনের আবার চোখে আলো লাগলে ঘুম আসে না । এদিকে আলো নিভিয়ে খাটে উঠতে গেলেই আমার মনে হত এই বুঝি কেউ নিচে থেকে পা টেনে ধরল। অনেক সময় লাইট অফ করেই এক পেল্লায় লাফ দিয়ে খাটে ওঠার চেষ্টা করতাম। তবে সেটা করতে গিয়ে বোনের ঘাড়ে পড়ে এমন হাঁউ মাঁউ সৃষ্টি হয়েছিল কয়েকবার যে সে চেষ্টাও বন্ধ করতে হয়েছিল। 
এক দুবার বেড সুইচের কথা ওঠেনি তা নয় কিন্তু কোথায় কোন দেশের কোন বাড়িতে কবে কে জানি বেড সুইচের তার থেকে শক খেয়ে মারা গেছিল... এসব গল্পগাছার চোটে সে আর হয়ে ওঠে নি। 
এর কিছুদিন পরেই আমাদের বাড়িতে এক অদ্ভুত জিনিস এল... তার নাম খাটিয়া। খাটিয়া মানে নারকেল দড়ির খাটিয়া যাতে বসে ডানলপ, ভবানীপুর মায় চন্ডীগড় অবধি পাঞ্জাবীরা সংসার ধর্ম সেরে ফেলল সে খাটিয়া না ... একটা অদ্ভুত চ্যাটালো ক্রেপ ব্যান্ডেজ টাইপের জিনিস দিয়ে বোনা খাটিয়া। বাপীর নাকি জিনিসটা দেখে দারুন ভাল লেগেছে তাই কিনে নিয়েছে। আমারাও বসে দেখলাম বেশ একটা বাউন্সিং এফেক্ট আছে। মোটের ওপর বেশ মজার হাফ দোলনা হাফ ইজিচেয়ার টাইপ । আসলে যখন আমরা ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট টিভির থেকে কালার টিভিতে সুইচ করতে গিয়েই আহ্লাদে আটখানা তখন এইসব ব্যাপারে বাড়িতে বেশ একটা হইচই-ই হত। 
আমি তো আবার ভেবেই ফেললাম এবার আমার মা-ও পাড়ার পাঞ্জাবী আন্টিদের মত ঢিলে সালোয়ার কামিজ পরে সারাদিন স্টিলের থালার ওপর ছুরি দিয়ে সবজী কাটবে । আমিও মীনা, রীতু, লাভলিদের মত হেব্বি সুন্দরী পাঞ্জাবী মেয়ে টাইপ হয়েই যাব আর সারাদিন উঠোনে বা বাড়ির সামনে খাটিয়ে পেতে বিভিন্ন ধাঁচে বিনুনি বাঁধব । তবে আদতে এসব কিছুই হল না। খাটিয়াটার জায়গা হল আমাদের ওই বিচ্ছিরি উঁচু খাটের তলায় যেখানে রাত হলেই ভূতেরা ওঁত পেতে থাকত আমার পা ধরে টান দেবে বলে । কোনদিন বাগে পায়নি তাই টানেনি সেটা আলাদা ব্যাপার ... সারাদিন খাটিয়াটা বড় খাটের নিচ থেকে টেনে বার করা থাকত । আমরা ওখানে বসে পড়তাম, মাঝে মাঝে মা-ও আমাদের পাশে বসে বসে মটরশুঁটি ছাড়াত আর আমরা মাকে হেল্প করার নামে সেগুল টুপটাপ মুখে পুরতাম... এর ই মধ্যে খানিক খোসা হয়ত সবুজ চাদরে হারিয়ে মিশে রইল আর মা রান্নাঘরে রান্না চাপিয়ে উল কাঁটা নিয়ে আবার ওই খাটিয়াতেই এসে বসল। মোটের ওপর মায়ের শাড়ির বদলে সালোয়ার কামিজ আর আমার সুন্দরী হয়ে যাওয়া ছাড়া বাকি অনেক কিছুই মীনা, রীতুদের বাড়ির মতই ঘটত । আর রাত্তিরে খাটিয়াটা ঠেলে বড় খাটের নিচে ঢুকিয়ে দেওয়া হত। ফলে নিচের ভূতগুলো আমাকে আর ভয় দেখাতেই পারত না। 

তবে এ সুখ বেশিদিন সইল না । খাটিয়ার আধিপত্য আমাদের থেকে চালান হয়ে গেল কিছুদিন পরেই আমার মায়ের কোন এক গ্রামতুতো কাকার হাতে। ওই কাকার ভাল নাম নিশ্চই কিছু ছিল কিন্তু মা-রা ডাকত প্যালা কাকা বলে। আমরা ডাকতাম প্যালাদাদু। আসলে আমাদের অলরেডি বেশ কিছু কাকুদাদু, জেঠুদাদু ছিলই। সেগুলো জন্মানোর পর পর ই পাওয়া দাদুর ঝাঁক। কিন্তু ইনি অনেক পরে আবির্ভুত হওয়ার কারনেই বোধহয় তেমন পাত্তা পান নি আমাদের কাছে। সামনে যদিও দাদুই বলতাম তবে আড়ালে প্যালাদাদু বলাই অভ্যেস হয়ে গেছিল। খুব পান খেতেন প্যালাদাদু আর খুব আজগুবি গল্প বলতেন । মাঝে মাঝে এসে থেকে যেতেন কয়েক দিন। সেবার এসে দাদু মহা খুশি । আরে! তোরা নেওয়ারের খাটিয়া কিনেছিস? আহা, এতে শুয়ে যা সুখ! আমরা দুই বোন তো একদম ব্যাজার হয়ে গেলাম শুনে। কারন দাদু বাড়িতে থাকলেই আমাদের বেশ কাজ করতে হত। আর বোধহয় কিপ্টেও ছিলেন ফলে বাকি আত্মীয়দের মত যাওয়ার সময় তোমরা চকলেট খেও বলে হাতে কিচ্ছুটি দিতেন না (হ্যাঁ, আমরা তখন খুব চকচকে লাল দুটাকা বা ভাগ্যভাল থাকলে পাঁচ দশ টাকা করে পেয়েই যেতাম মামা মাসিদের থেকে) ... তো সেবার প্যালাদাদু বেশ কিছুদিন থেকে গেলেন। আমরা সবাই পালা করে করে তাঁর ফাইফরমাশ খাটতাম। এক রোববার আমরা সাপ্তাহিক মাটনের ঝোল ভাত খেয়ে উঠে আয়েস করব করব করছি এমন সময় দাদু ডাকলেন, আয় তো, তোর হাতটা দেখি! আমি বললাম হাতে এঁটো নেই তো! পরিস্কার করে ধোয়া । বললেন আরে ডেঁপো মেয়ে, তোর হাতটা দেখতে চাইছি, দেখা... বাড়ালাম হাত। ভুরু টুরু কুঁচকে অনেক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মার দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললেন এ মেয়ের তো কিস্যুই হবে না রে। কোন রকমে মাধ্যমিক। লিখে নে। আমি কাঁদো কাঁদো মুখে বললাম মানে!! মাধ্যমিক আবার কি! আমি বড় হয়ে জার্নালিস্ট হব কিংবা চার্টার্ড একাউন্টেন্ট। প্যালাদাদু পানটা গালের অন্যদিকে ঠেলে উদাস হয়ে বললেন, সে তুমি চাইলেই কি হবে দিদি! তোমার হাতেই নেই বেশিদূর। ব্যাস... মা করুন মুখ করে জিগ্যেস করল হাতে পড়াশুনো নেই কাকাবাবু? 
নাঃ, ঘরের কাজকম্ম রান্নাবাড়া শেখাও বরং তারপর ... 
আমি হাত ছাড়িয়ে সো-ও-জা আমার সেই ভাঙ্গা জানলা ড্যম্প দেওয়ালের চিলেকোঠায় গিয়ে ইন্দ্রজাল কমিক্স নিয়ে বসলাম। অরণ্যদেব, আর বাহাদুর মিলে আমার সব মনখারাপ মুছে দিল কিছুক্ষনের মধ্যেই । 
বিকেলে শুকতারাদি এসে ঘুম থেকে তুলল। বৃষ্টি হয়ে গেছে এক পশলা আর এমনই কপাল যে বৃষ্টির মধ্যে উঠোনে পা পিছলে প্যালাদাদু আছাড় খেয়েছেন। সন্ধের মধ্যে পা ফুলে ঢোল। আমার মাথায় প্রথমেই যে কথাটা এল সেটা হল "বেশ হয়েছে"... এবং সঙ্গে সঙ্গেই মনে মনে ঠাকুরকে বলে নিলাম দোষ নিওনা ঠাকুর। কে না জানে যে অন্যের খারাপে যে খুশি হয় তাকে ঠাকুর মোটেই ভাল চোখে দেখেন না । দোষ কাটাতে সেদিন রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে দাদুর পায়ে আয়োডেক্সও মালিশ করে দিলাম। কিন্তু পরের দিন থেকে তুমুল জ্বর এল আর সেই সঙ্গে ভুল বকা। প্যালাদাদুর নিজের লোক বলতে তেমন কেউ ছিল না। এই সব গ্রামতুতো জ্ঞাতি ভাইপো ভাইঝিদের বাড়িতেই ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন । বোধহয় আমাদের বাড়িতেই একটু সমাদর পেতেন আমার মায়ের কাছে তাই হয়ত এখানে এসেই বিপদ হল। ডাক্তার এসে বললেন পায়ের লিগামেন্ট-এ চোট পেয়েছেন তা ছাড়া এমনিতেও খুব দুর্বল। একটু ভাল যত্নে আর রেস্টে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবেন । 

দু মাস ছিলেন সেবার দাদু। এই দুমাসে খাটিয়ার সঙ্গে আমার ভাবসাব একটু কমে এল। দাদুই সারাক্ষন ওটার অধিকার ভোগ করতেন। আমি আর বোন কখনও মার কাছে রান্নাঘরে আবার কখনও ছোট ঘরের তক্তাপোষে বসে পড়তাম। গরম রুটিতে গুড় লাগিয়ে রোল করে দিত মা। অঙ্ক কষতে কষতেই খাওয়াদাওয়া সারা হয়ে যেত। মুঘলদের প্রবল বিক্রমের কাহিনী মুখস্ত করতে করতে আমি ঢুলে পড়তাম এক এক সময়। 

দাদু ইতিমধ্যে খুবই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। মাঝে মাঝে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হওয়া ছাড়া বাকি সময়ে দিব্যি ভালই থাকেন। এই সময় একদিন জামালপুর থেকে একটা পোস্টকার্ড এল। প্যালাদাদুর কোন বোনের ছেলে সপরিবারে দার্জিলিং না জয়সলমীর (আসলে এখন আর নামটা মনে নেই) কোথায় যেন যাবে কিন্তু বাড়ি খালি রেখে বেশিদিনের জন্য যাওয়া ঠিক হবে না । দাদু যদি কটা দিন ওনাদের বাড়িতে থেকে পাহারা দেন... ইত্যাদি... চিঠি পাওয়া মাত্র দাদু হুড়ুমদুড়ুম করে গোছগাছ শুরু করে দিলেন। পরের দিন সকালেই বেরোতে হবে কিনা! 

দাদু চলে যাওয়ার পরেই আমরা দুই বোনে এক লাফে খাটিয়ায়। অনেক দিন পর খাটিয়াটাও যেন একটা হালকা আর্তনাদ করে আমাদের স্বাগত জানাল... 
বেশ কয়েক বছর ওই খাটিয়াটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা অঙ্গ হয়ে ছিল। আমি তো মাধ্যমিকের প্রিপারেশনে নিজে থেকেই একটা খাটিয়ার আত্মকথা লিখে স্কুলে দেবযানীদির থেকে একটা ভেরি গুড ও পেয়েছিলাম... 
আরও অনেক কিছুর মতই খাটিয়াটাও আমার স্মৃতির জানলা আলো করে আছে আজও...
.