বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৩

টুক্‌নামচা... ১ ~ সংগীতা দাশগুপ্তরায়

পরশুরামচাচার সঙ্গে আমাদের মানে ছোটদের বেশ ভাব ছিল। আমাদের পরশুরামের কুঠার ছিল না ছিল মোড়ের মাথায় একফালি এক মুদির দোকান । পাড়ায় আরও কিছু ওমনি দোকান ছিল। সেগুলো সবই লালার দোকান । কবে কোনকালে উত্তর কলকাতায় কোথা থেকে এক দঙ্গল বিহারিরা এসে মুদির দোকান করেছিল আর কেনই বা সে সব দোকানই লালার দোকান নামে পরিচিত ছিল তা জানিনা। তবে এটা জানতাম পরশুরামের দোকানের নাম ছিল পরশুরাম সওদা ঘর... আমরা বলতাম পরশুরাম সওদাগর। বিহারি ছিল সেও। কিন্তু তবু তার দোকান কোনমতেই লালার দোকান ছিল না । পরশুরামের ঘরে এক মা তিন বিবি আর সাত বাচ্চা মিলে সারাদিন ক্যাচর ম্যাচর করত আর সে নিজে দোকানে বসে জিনিস বিক্রি করতে করতে হনুমান চালিশা পড়ত দিনভর।
আমাদের দলের সঙ্গে তার ভাব ছিল খুব সাদাসিধে কারনে। আমরা কখনও তার দোকানের লজেন্স বিস্কুটের বয়ামের দিকে তাক করে ক্রিকেট বা পিট্টু খেলতাম না (প্রথম প্রথম বেশ কিছু বয়াম আমাদের পিট্টুর বল লেগে ভেঙ্গে গেছিল আর আমাদের হজমী ফুচকা ইত্যাদি স্যাক্রিফাইস করে সে বিল মেটাতে হয়েছিল) ... বদলে হনুমান জয়ন্তী আর গনেশ চতুর্দশীতে আমাদের প্রসাদ জুটত। আখের গুড় মেশানো আটাভাজা, কালো তিল ছড়ানো তিলকুট, মুগ আর গুড়ের পুর দেওয়া মিঠি লিট্টি, কালো চানার ভাজি আর পুরি থাকত প্রসাদে। অমন ইউনিক প্রসাদ আমরা কেউ মিস করতে চাইতাম না । ওর সাত ছেলেমেয়ের সবার নামই বোধহয় বুধন, লাখি অথবা গানু ছিল। এই তিনটে নাম ধরেই আমরা ওকে ডাক দিতে শুনতাম। দোকান আর ঘরের মাঝের ছেঁড়া চাদর ঝোলানো পার্টিশনের দিকে মুখ করে চাচা এই তিনটের কোন একটা নাম ধরে ডাকত আর ভেতর থেকে যে কোনো একটা ছেলে বা মেয়ে ঠিক বেরিয়ে আসত হাতে গরম চা আর প্রজাপতি প্যাঁচের বিস্কুট নিয়ে। যার সামনে থরে থরে রাখা রকমারি বিস্কুট তার জন্য ভেতর থেকে বিস্কুট কেন আসত তা আমার কাছে একটা বড় প্রশ্ন ছিল । পরে ব্যালান্স শীট-এর আঁক কষতে বসে আমি সেই প্রশ্নের উত্তর বুঝে গেছিলাম নিজে নিজেই। সেই পরশুরাম চাচা , প্রফিট এন্ড লস বোঝা সওদাঘরের পরশুরামচাচা একবার দোকান বন্ধ করে দেশে গেল তো গেলই। দেশে নাকি ক্ষেতি জমি করেছিল অনেক। সে সব সম্পত্তি জ্ঞাতিরা হাতিয়ে নিচ্ছে তাই চলে গেল দোকান ফেলে... সেই যে গেল, আর এলোও না। আমার মন কেমন করত খুব। চাচার জন্য, চাচার সুর করে পড়া হনুমান চালিশার জন্য আর সবচেয়ে বেশি মনকেমন করত একটা পাঁচমিশালি গন্ধের জন্য। তেল, বেসন , সাবান, ধূপ, চিট লজেন্স, ভেলিগুড় আরও না জানি কি কি মেশানো একটা গন্ধ ছিল দোকানটায় । কিছুদিন পরে সেইখানেই একটা লন্ড্রী খুলে গেল। আমি বাপীর শার্ট প্যান্ট ইস্ত্রী করতে দিতে গিয়েও ওই গন্ধটা খুঁজতাম কিন্তু ততদিনে গন্ধটা বদলে গেছে। ধীরে ধীরে ভিজে চাদরের ওপর চালানো লোহার ইস্ত্রীর ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধটাই কায়েমি হয়ে গেল ওখানে ।

আমাদের বাড়ির পিছনে দুটো পাশাপাশি স্কুল। সারাদিন প্রচন্ড হৈ হল্লার পর বিকেল চারটে বাজলেই সব চুপ। সন্ধের পর একদম নিস্তব্ধ হয়ে যেত বাড়ির পিছনদিকটা। প্রবল বৃষ্টির দিনে একটানা ব্যাঙের ডাকের মধ্যে দিয়ে রাত নামত আমাদের ছাদে। খুব ভালবাসতাম ওই আঁধার, ওই নির্জনতা। লোডশেডিং হত নিয়ম মাফিক। মোমবাতির আলোয় পড়া কম, মশা মারা বেশি চলত। বোনের অভ্যেস ছিল মশা মেরে আগুনে ফেলে দেওয়া। মা বারন করলে বলত মানুষ মরলে তো জ্বালিয়ে দিতে হয় তাহলে মশা মরলে জ্বালাব না কেন? এই রকম কুটিল লজিক্যাল প্রশ্নের সামনে মাও চুপ। আমার অবশ্য অন্য একটা খেলা দারুন লাগত। এক বাটি জল নিয়ে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে ওই জলের ওপর মোমটা উল্টো করে ধরতাম। ছোট্ট ছোট্ট মোমড্রপস পরত জলে আর পরেই জমে গিয়ে ছোট্ট পুঁথির মত দেখতে হয়ে যেত। কালীপূজোয় কেনা রঙিন মোমবাতি দিয়ে অমনি রং বেরঙ্গি পুঁথি বানিয়ে ছুঁচে গেঁথে মালা বানাতাম আমরা। সে মালা এমনিতে কোনোই কাজে লাগত না । তবে কোনোকোনোবার অনেকগুলো ওরকম মালা একসঙ্গে জুড়ে জুড়ে আমরা তুলির রথ সাজিয়ে দিতাম ।

তুলি ছিল রোমির পিসতুতো বোন। সেই সুবাদে আমাদের সবার পাড়াতুতো পিসতুতো বোন। বাগবাজারের কাছে থাকত । দোল, রাস, রথ এসব মালপোয়া বানানোর উৎসবে বেড়াতে আসত মামার বাড়িতে। রোমিরা থাকত আমাদের দুটো বাড়ি পরেই। ওদের বাড়ির সামনে একটা অদ্ভুত মজার গাড়ী দাঁড়িয়ে থাকত। সেই যে বাইকের সঙ্গে লাগানো নৌকো যেটা বীরু আর জয় চড়ত শোলেতে, ওইটা । আমাদের ছোটবেলায় সিইএসসি তে চাকরী করা অনেকেরই ওইরকম নৌকো কাম বাইক ছিল। রোমির মা মাঝে মাঝেই বিকেলে খুব সাজগোজ করে হাই হিল পরে দু আঙ্গুলে চিমটি করে শাড়িটা তুলে ধরে ওই নৌকায় উঠে বসে কাকুর সঙ্গে বেড়াতে যেতেন। যাবার আগে রোমিকে পইপই করে বারন করতেন বাজে কিছু না খেতে। এদিকে কাকিমা কাকু বেরনোর পরই রোমিরা দুই ভাই ওদের লক্ষ্মীর ভাঁড় আর একটা ব্লেড নিয়ে বসে যেত আমাদের রকে। আমরা খুব এক্সপার্ট ছিলাম ভাঁড়ের ওই ফিনফিনে কাটা জায়গাটায় ব্লেড ঢুকিয়ে সিকি আধুলি এসব বার করায়। মাঝে মাঝেই ওই পয়সা দিয়ে রোমি বাদাম চাকতি বা টিকটিকি লজেন্স কিনে আমাদের খাওয়াত। তবে আমি টিকটিকি লজেন্স খেতে পারতাম না । সাদা রঙ্গের হলে তো একদমই না । আমার বদ্ধমূল ধারনা ছিল ওই সাদা রঙের লজেন্সগুলোর মধ্যে অবশ্যই দু চারটে সত্যিকারের টিকটিকির ডিম ই আছে। রোমির সঙ্গে অবশ্য আমাদের খেলা তারপর আর খুব বেশিদিন হয়নি। পড়াশুনোয় অমনোযোগ এবং সারাদিন খেলে বেড়ানোর মত গুরুতর অপরাধে ওকে পুরুলিয়া রামকৃষ্ণমিশনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। 

ওই সময়টায় আমি অনেক কিছু হারিয়েছিলাম। পরশুরাম চাচাকে, রোমিকে এবং আমাদের বাড়ির শোবার ঘরের সাবেকি দেওয়াল-শেলফটাকে। খুব বড় করে কাটা ওই শেলফটায় আমরা সব কিছু রাখতাম। মানে সবকিছুই। পুরোনো ব্যাটারি, বোনের পুতুল, আমার পেন এবং গুচ্ছের ফুরিয়ে যাওয়া রিফিল, পাখির পালক , বাপীর পাঞ্জাবীর ঝিনুকের বোতাম, মায়ের চুড়ি, বারোয়ারি স্টিচিং কিট, বার বার শোনা ক্যাসেট...সব ...সব... তারপর একবার বাড়ি রং করার সময় ওই তাকটা বন্ধ করে দেওয়া হল। বন্ধ করার সময় আমি স্কুলে ছিলাম। ফিরে এসে দেখলাম ওখানে ইঁট গেঁথে দেওয়া হয়েছে। আমার যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ইতিহাসের আনারকলির মতই যেন আমাকেও ওখানে দাঁড় করিয়ে দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে এমনি লাগছিল আমার। মা মনে হয় বুঝেছিল কিছু। আমাকে বলল তোর সব পালক, ক্রেয়ন, ক্যাসেট আমি সরিয়ে রেখেছি। আমি কিচ্ছু বলতে পারছিলাম না । মনে হচ্ছিল কি যেন রয়ে গেছে ওর মধ্যে। যেন তাকটারও প্রাণ ছিল, মিস্ত্রিরা দম বন্ধ করে মেরে ফেলেছে আমাদের তাকটাকেই। বার বার হাত রাখছিলাম ইটগুলোর গায়ে... বহুবছর অবধি আমি কিছু খুঁজে না পেলেই ধরে নিতাম সেটা ওই তাকে রয়ে গেছে। এমনকি কোন গানের সুর ভুলে গেলেও মনে হত ওইখানে ওই বন্ধ করা জায়গাতেই আটকে আছে সুরটাও। আজ বুঝি সবুজ রিফিলের পেন নয়, হাতির দাঁতের ক্লিপ নয়, আপেল বীজের মালাটাও নয়... আসলে বন্ধ হয়ে রয়ে গেছে আমারি ছেলেবেলার একটা বড় অংশ দেওয়ালের ওই গহ্বরে ...

ক্রমশ...