মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৩

প্রবাস এবং ~ তমাল রাহা

এবার ফেরা যাক প্রবাসের অভিজ্ঞতা তে। ছাত্রাবস্থায় আমার সেভাবে খুব একটা ঘোরাঘুরি হয় নি। বাবা মা এর সাথে পুরী যাওয়া হযেছিল আর পাঁচটা বাঙালী পরিবারের মত। বেশ দূরে যাওয়া বলতে শিলং, গৌহাটি  আর জোরহাট।আসলে জোরহাট এ মাসি থাকতেন, গন্তব্য সেটাই থাকত। মাঝপথে গৌহাটি আর শিলং যাওয়া এই আর কি! আমার বাবা ভালোমানুষ, কিন্তু কোথাও যাওয়ার কথা হলে বোধকরি খুব একটা আরাম পেতেন না। হয়তো ছোটবেলায় বাস্তুচ্যুত হয়ে উত্বাস্তু হওয়ার ভয় টা  মনে ছিল, তাই বাসার কাছাকাছি জায়গাতেই নিজেকে নিয়ে থাকতে ভালবাসতেন। আর পাহাড়ে খুব ভয় পেতেন। মোটের ওপরে নানাকারণে "পর্বতমালা বা সিন্ধু" কোনটাই ছোটবেলায় দেখা হয় নি।
প্রথম একা দূরে যাওয়া মনে পরে। সেটা বোধহয় ১৯৯৫। সবে পিএইচডি র গবেষণা শুরু করেছি।কাজের জন্যে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সাইন্স এ যেতে হবে।আমার বাবার বেশ ভীত হয়ে  পড়লেন। ছেলে একা কি ভাবে বেঙ্গালুরু (তখন বাঙ্গালোর) যাবে। মনে আছে হাওড়া থেকে করমন্ডল এক্সপ্রেস। বাবা ট্রেন এ তুলে দিতে এসে এক বাঙালী পরিবার কে দেখে যার পর নাই আহ্লাদিত হযে বললেন "আমার ছেলে একা এই প্রথম বাইরে যাচ্ছে। একটু দেখবেন।" পরিবারের কর্তাটি বাবাকে আশ্বস্ত করে বললেন "কোনো চিন্তা করবেন না। আমরা তো আছি!" বাবা নিশ্চিন্ত মনে ফিরে গেলেন। ট্রেন যাত্রা শুরু করল। কিছুক্ষণ বাদে ওই ক্ষনিকের অভিভাবক আমায় নানা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। আমি প্রচন্ড বিরক্ত হচ্ছি। তবে ধৈর্যের বাঁধ  ভাঙ্গলো যখন উনি আমায় প্রশ্ন করলেন, "জানো তো মাদ্রাজের পরে কি?"
আমি বললুম "সমুদ্দুর"
"না না, তারপর?"
আমি একটু বিরক্ত হযে তাকালুম। ভদ্রলোক না থেমে বলে চললেন "চীনের বর্ডার হবে বোধহয়!"
জানি না ভদ্রলোক রসিকতা করছিলেন কিনা! তবে ওনার কাছ থেকেই মাথা ধরার ওষুধ চেয়ে খেয়েছিলাম মনে আছে।
গুয়াহাটি তে সেবার সন্তোষ ট্রফি ফুটবল খেলে কর্নাটকের ফুটবলার রা বাঙ্গালোর ফিরছিল।তারা ছিল পাশের কম্পার্টমেন্ট এ। মনে আছে বাকি যাত্রা টা তাদের সান্নিধ্যেই কাটিয়েছিলাম। আর নিজের সিট এ ফিরে যাই নি!
আমার বংশেও কেউ কখনো বিদেশে গিয়েছেন তাও শুনি নি। কলকাতার শহরতলির (বারাকপুর) যেখানে থাকতাম সেখানেও কেউ কখনো বিদেশে গিয়েছেন বলে শুনি নি। তাই আমার বিদেশ যাত্রার আগের, পরের আর অবশ্যই প্রবাসে থাকার অনেক মজার মজার ঘটনা আছে খুব স্বাভাবিক ভাবেই।
সেটা '৯০ এর দ'শক এর শেষের দিকের কথা। আমি তখন পিএইচডি করছি। সেখানে থিসিস শেষ হলেই সব্বাই আমেরিকা তে পারি দিত। কেউ কিছুদিন থেকে ফিরত, কেউবা ফিরত না।কিন্তু সকলেরই একটাই উদ্দেশ্য, যেমন করে হোক থিসিস কমপ্লিট  আর আমেরিকা তে পারি দাও।
আমাদের ল্যাব এর এক অগ্রজ দাদা তাঁর থিসিস শেষ করে আমেরিকা যাবেন Post -doctoral রিসার্চ করতে। একদিন বললেন, "জানিস তো তমাল, কবি  কি বলেছেন ? "
"- আজব দেশ এই আমেরিকা সকল দেশের চেয়ে , হাত বাড়ালেই পয়সা আসে, চোখ টিপলেই মেয়ে!"
আমার সেই অগ্রজ দাদা আমেরিকা গিয়েছিলেন, ফিরেও এসেছেন। এখন রাজধানীর এক নামী প্রতিষ্ঠানের নামজাদা বিজ্ঞানী।
আমার দারুন লাগল। মনে তখন দোলা।আমেরিকা যাব।যেতেই হবে।
আমি বারাকপুর থেকে রোজ বালিগঞ্জ সাইন্স কলেজ এ আসতুম সকালবেলা, আর রাত্তিরে শিয়ালদা থেকে ১১:৪০ এর রানাঘাট লোকাল এ বাড়ি ফিরতুম।নিত্যযাত্রীরা কেউ ছিলেন দাদা, কেউ বা মেসমশায়, আবার কেউ বন্ধু। যখন প্রথম সব্বাইকে জানালাম যে আমি আমেরিকা যাচ্ছি, এক ভদ্রলোক এর reaction আমার আজ মনে পরে! বোধকরি উনি বড়বাজার এ কোনো দোকানে  কাজ করতেন। রোজ সকালে যেতেন আমার সাথে এক ট্রেন এ আর ফিরতেন ওই রাতের ট্রেন এ। আমার ট্রেনতুতো এক মেশোমশাই বলা যায়।সব সুনে বললেন, " পাঁচ বছর ধৈরা দেখি হেই হক্কল বেলায় যাও, আর এই মাঝ রাত্তির এ বাড়ি ফেরো , তা মালিক পার্মানেন্ট করলো না?" কি করে বোঝাই পিএইচডি তে পার্মানেন্ট হলে আমায় বাঁচানো ভগবানের অসাধ্য!
প্রায় একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখেছিলুম যে দোকানে চুল কাটতে যেতুম, তার মালিকের কাছে। চুল কাটতে গিয়েছি একদিন। বললেন, "শুনলাম নাকি তুমি আন্দামান না কোনহানে জওয়ান লাগছো, হেইর লাগ্যা কৈছিলাম তোমারে, লেদ মেশিন এর কাজ টা শিখ্যা রাখো, শোনলা না আমার কথা! এখন সব ছাইরা যাও কালাপানি! বুরহা বাপ-মা রইল হেইখানে, বাবু চললেন আন্দামান!" অনেক ভালবাসার থেকেই কথাগুলো ঐভাবে বলা। তখন খারাপ লেগেছিল। এখন লাগে না। আজকাল ওই সরল মানুষ গুলোর কথা খুব মনে পরে।
প্রথমবার আমেরিকা যাওয়া, সেটা ২০০০ সাল। থাই এয়ারওয়েজে ব্যাঙ্কক হযে সান-দিয়েগো।
ট্রাভেল এজেন্ট ব্যাঙ্ককের  ভিসা করে দিয়েছিলেন, কারণ ওয়েটিং ছিল ১২ ঘন্টা। ভয়ে ব্যাঙ্কক এয়ারপোর্ট এর বাইরে বেরোই নি। তারপর  ব্যাঙ্কক দেখার সুযোগ আর আসে নি। এখনো ওই বোকামোর জন্যে আপশোস করি।
আমার প্রথমবারের আমেরিকা যাত্রা আর থাকা টা খুব একটা মসৃন হই নি। মনে আছে, আমার মাস্টারমশাই ধ্রুবাজ্যতি বাবু ২০০ ডলার দিয়েছিলেন সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। যে ল্যাবরেটরি তে কাজ করার কথা, তারা একটা হোটেল ঠিক করে দিয়েছিল। এয়ারপোর্ট এ কেউ নিতেও আসে নি! ২৫ ডলার দিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে হোটেল এ গিয়ে শুনি ভার ৬০ ডলার প্রতিদিন! দু দিন ছিলেম। টাকা ফুরিয়ে গিয়েছিল। ইউনিভার্সিটির দুটি মেয়ে শেয়ার করে থাকত একটি এপার্টমেন্ট-এ। আমার অবস্থা দেখে তারা তাদের বাড়িতে আমায় ৭ দিন থাকতে দিয়েছিল। তারপর অগ্রিম বেতন নিয়ে নিজের এপার্টমেন্ট বুক করি! অর্থের অভাব থাকলেও, জীবনে রসের অভাব ছিল না। কোনদিন হতাশ লাগে নি! বোধহয় বয়সটাও অল্প ছিল! আজকাল তো অল্পেতেই আঁতকে উঠি!
প্রবাস থেকে প্রথমবার দেশে ফিরেছি। মনে আছে, একদিন কলকাতা থেকে ফিরছি। বারাকপুর স্টেশন থেকে রিক্সা করে বাড়ি ফিরছি। রাস্তায় দেখি, পারার এক দাদা হেঁটে ফিরছেন।বৌবাজারে বই বাঁধাই এর কাজ করতেন।ডেকে নিলাম, বললাম "আমি একাই যাচ্ছি, তুমিও চলে এসো আমার সাথে।" রিক্সায় যেতে যেতে বার বার দেখি আমার হাতের দিকে তাকাচ্ছেন। অস্বস্তি হচ্ছিল।
জিগ্যেস করলাম, "কিছু বলবে?"
উনি বললেন " একটা কথা জিগাই?"
"নিশ্চয়, বল না !"
"হক্কলে কয় যে তুমি আমেরিকায় থাক, হেইটা তো সত্য?"
আমি বললাম, "কেন বলত?"
উনি বললেন, "আমার বিশ্বাস হয় না। শুনি ঐহানে হক্কলের গায়ের রঙ সাদা, তা তোমার তো কুনো পরিবর্তন নাই!"
আমার চামড়ার রঙ টা ঠিক চিমা ওকরির মত না হলেও কাছাকাছি। কিন্তু এইভাবে কেউ চোখে আঙুল দিয়ে দেখান নি! আজ বসে বসে যখন ভাবি, ওই মানুষটার সারল্য আমায় মুগ্ধ করে, যদিও সেদিন কিন্তু রাগ হযেছিল!
আমার দ্বিতীয়বারের আমেরিকা যাত্রার একটা মজার ঘটনা আছে।
সেটা ছিল জানুয়ারি মাস। রাত ১০টায় এয়ারপোর্ট (লোগান এয়ারপোর্ট, বস্টন) এ পৌছনোর পর দেখলুম দেখলুম একটি গাড়ি, সারথী সহ দাঁড়িয়ে, আমায় নিয়ে যাবে বলে।  প্রথমবারের চেয়ে ভিন্ন  এবং  সুখকর অভিজ্ঞতা, তা বলাই বাহুল্য। লোগান এয়ারপোর্ট থেকে বর্সেস্তের শহরে যাচ্ছি। রাস্তার দু ধারে দেখি সাদা সাদা পাথরের ঢিবি। অবাক হয়ে দেখছি। শেষে থাকতে না  পেরে ড্রাইভার কে জিগ্যেস করলুম, "এখানকার সব পাথর বুঝি সাদা রঙের?".... আজও ভুলি নি ড্রাইভার এর অট্যহাস্য। বলল, "না এগুলো বরফের ঢিবি।" এরপর প্রায় তিন বছর ওই ঢিবির মধ্যেই বাস করেছিলাম।আমার জীবনের সেই প্রথম বরফ দেখা!
মাসাচুসেটস  এ থাকাকালীন একটি মজার ঘটনা মনে পড়ল। বিদেশে কারো সাথে আলাপ হলেই প্রথম পাঁচটি প্রশ্নের একটি থাকে, "দেশে বাড়ি কথায়?" এক অগ্রজ কে জবাবে বলতে শুনেছিলাম "ডাউন টাউন সোনারপুর এ।" ভারী মজা লেগেছিল শুনে।
এর কিছুদিন বাদের ঘটনা। সেই ভদ্রলোক বস্টন এর উপকন্ঠে একটি সুন্দর বাড়ি কিনলেন। গৃহ-প্রবেশে আমাদের অনেকের নিমন্ত্রণ ছিল। তার স্ত্রী আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়ি দেখছিলেন।রান্নাঘর এ নিয়ে গিয়ে বললেন, "দ্যাখো ভাই, আমার প্যানটি টা কত বড়! আর পেছনের দিকে (মানে রান্নাঘর সন্নিহিত বাগান) দ্যাখো …. কত্ত ছোট ছোট ধানি লঙ্কা!" তারপর সারাদিন হেসেছিলুম মনে আছে। হাসতে হাসতে শরীর  খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগার হযেছিল!!
স্পেন-এ এসেও একটা মজার অভিজ্ঞতা হযেছিল শুরুতে। পরে যেটা আমার নিজের অভ্যেসে পরিনত হযেছে।
কেউ যদি ক্রমাগত হাসিমুখে "বালে বালে বালে বালে" অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বলতে থাকে তাহলে আপনার কেমন লাগবে? হ্যা, আমারও সেরকম অবস্থ্যা হয়েছিল স্পেন এ এসে। শালা যাই বলি তাই শুনে লোকে তার দন্তবিকশিত করে "বালে বালে বালে বালে" বলে যেত। পরে জানলাম অর মানে হলো "ঠিক আছে"... আর তারপর অভ্যেসটা আমারও হে উঠলো। মাঝে মাঝে আমার বউ বলে ¨দেখ কলকাতায় গিয়ে আবার ´বালে বালে বালে বালে´বলে উঠিস না। লোকে চাদা তুলে পেটাবে!¨
শুধু আমি নই। বিদেশে গিয়ে এরকম মজাদার অভিজ্ঞতা বোধহয় অনেকেরই! আমার এক দক্ষিন ভারতীয় বন্ধুর প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা টা তো না বললেই নয়! তার নতুন সুন্দরী প্রফেসর তাকে প্রথম দিনই ডিনার এ নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে মেনু কার্ড দেখে আমার বন্ধুটি তো প্রথমে কিছুই বুঝতে পারে না! তা প্রফেসর মহিলাটি সালাড অর্ডার করাতে, সেও একই জিনিস অর্ডার করলো।
ওয়েট্রেস বিনীত ভাবে জিগ্যেস করলেন "what dressing, sir?"
আমার বন্ধুটি অত্যন্ত লজ্জিত ভাবে নিজের প্রফেসর কে বলে বসল "whatever she is wearing, is fine with me!" এই গল্পটি যে আমি কতবার শুনেছি আমার বন্ধুর কাছে তার শেষ নেই। আমিও বিভিন্ন আড্ডায় ততোধিক বার বলেছি বোধহয়!