বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১২

রেসিপি ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

প্রথমেই জীবনটাকে লম্বালম্বি চিরে নিন। অনেককটা টুকরোয়। কটা টুকরো? গোনা বারণ। কারণ, এই রান্নাটা হিসেব মাফিক এগোবে না। হাতের কাছে সুবিধামত ধারালো ছুরি না থাকলে, মনে সাহস না থাকলে, ভুল করে জড়িয়ে ধরুন খুব নরম মায়াবী কাউকে। পেলবতার আড়ালে বাঁধন আলগা হলে বুঝে নেবেন শত টুকরো হয়ে গিয়েছে জীবন। 

এক নম্বর টুকরোটা কুচিকুচি করে চওড়া থালার ওপর শুকোতে দিন। একটু চোখের জল মাখিয়ে নিন। ওতে নুন থাকে। শুকোনোটা এক দিনে হবে না। অনেকদিন ধরে। প্রখর রোদে। একলা ছাদে। কার্নিসের পাশে। কাছেই তারের ওপর ভুলে যাওয়া শাড়ি হাওয়ায় দুলবে। তারপর, সেই কাঠশক্ত দানাগুলো পিষে নিতে হবে। পাউডারের মত মিহি করে। মিক্সিতে হবে না কিন্তু। শিলনোড়া চাই। 

এবার দ্বিতীয় টুকরোটা। তাকে ম্যারিনেট করুন ঝাল ঝাল ঈর্ষা , ট্যানজি পরশ্রীকাতরতা আর স্পাইসি পরনিন্দার কেচাপ দিয়ে। কতক্ষণ? রুচি অনুযায়ী। এবার সাঁতলে নিন। মৃদু উপেক্ষার আঁচে। সেদ্ধ হয়ে ক্রমশঃ শুকিয়ে আসবার মুখে, সামান্য সমবেদনার তেল ছিটিয়ে, কষে ফেলুন। বেশি তেল দেবেন না, সেটা কিন্তু স্বাস্থ্যবিরুদ্ধ। দেখবেন এমনিতেই এতক্ষণ ধরে কষে জিনিসটা দুষ্পাচ্যরকমের মুখরোচক হয়ে উঠেছে। 

পরের খন্ডটাকে ফিলের জন্য আলাদা করে রাখুন। উচ্ছ্বাসের কিম্বা হাহুতাশের অ্যারারুটগুঁড়ো মাখিয়ে, সেগুলোকে ভাজতে হবে, অতিথিরা আসার ঠিক আগে আগে। যাতে গরম গরম সার্ভ করা যায়, আনন্দ বা দুঃখের টপিং দিয়ে। স্ন্যাকস হিসেবে ওঁদের ভালোই লাগবে বোধহয়। 

এই ভাবে রান্না এগোতে থাকুক। জীবনের টুকরো তো অজস্র অগণন। তা' দিয়ে আরও নানা পদ ... সামোসা ... ভাজি ... নান ... ভর্তা ... দো পিয়াঁজা ... । নানা প্রনালী ... ভাপানো ... ভাজা ... ঘৃতপক্ক ... শূল্যপক্ক ... ডিপ ফ্রাই ... আপসাইড ডাউন ... বেক ... সিজানো ... । নানান অনুপান ... রায়তা ... সম্বর ... স্যুপ ... জ্যাম ... জেলি ... ব্র্যান্ডি। আপনার রান্না শেষই হতে চাইবে না। 
ইতিমধ্যে অতিথিরা এসে গেছেন। তাঁরা পৌরুষেয় ... রাজপুরুষ ... আমিষাশী ... শাকাহারী ... মাদমোয়াজেল ... শ্রীমতী ... বেগমসাহেবা ... পাতকুড়ানি ... উচ্ছিষ্টভোজী ... । 

আপনি তড়িঘড়ি সবাইকে যথাযোগ্য আসনে অভ্যর্থনা করে বসান। পরিবেশন করুন আপনার উথালপাথাল পরিশ্রমের ফসল। তাঁরা আপনাকে, মানে আপনার জীবনের টুকরোগুলোকে চিবিয়ে চুষে অবলেহন করে পান করে, চলে যাবার পর সবিস্ময়ে দেখুন, তখনও প্লেটগুলোতে, একটা দু'টো করে টুকরো পড়ে রয়েছে। আপনারই জীবনের টুকরো! 

ফেলবেন না। হোক না এঁটো, হোক না ঠান্ডা, এমনকি ছিবড়েও যদি হয়, কিই বা আসে যায়। রাত্রি ঘননির্জন হয়ে এসেছে এতক্ষণে। ঘর অন্ধকার। 

সেই প্রায় স্বাদহীন জীবনের টুকরো গুলো নিজের সামনে সাজিয়ে নিন। চোখ ঝাপসা? তাতে কি? ঘরে তো বাতি নেই। চাঁদ নেই জানালায়। একটা জোনাকিও ভুল করে আলো দিতে আসেনি এখানে। 

কাঁপা হাতে একটু জীবন তুলে নিন নিজের লালা শুকিয়ে যাওয়া জিভের ওপর।