মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১২

চোর ~ অমিতাভ প্রামাণিক

'সবুজ দ্বীপের রাজা'র কাকাবাবুর হাত ধরে যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হলাম 'মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি'র আনাচে কানাচে ঘুরে। আধুনিক লেখকদের মধ্যে এঁর মত পল্লীনির্ভর ছোটদের গল্প তেমন লিখেছেন কি? সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, অনেক গল্পেই চরিত্র হিসাবে ছড়িয়ে থাকত একটা পিসি, একটা চোর আর একজন দারোগা। পিসিটা দয়ালু, চোরটা ছিঁচকে কিন্তু ভীতুর ডিম, আর দারোগাটা গল্পের ঠিক শেষ 
সীনের আগে অবধি কোনো কম্মের না। এগুলোকে সম্বল করে বেশ কিছু গল্পের জাল বুনেছেন শীর্ষেন্দু। মজার গল্প নিঃসন্দেহে, কিন্তু শহরের শিশুরা সেই গল্পে কতটুকু নিজের ছায়া দেখতে পায়, জানি না।

মাজদিয়ায় ভাড়া বাড়ি ছেড়ে আমরা যখন আমাদের নিজের বাড়িতে উঠে এলাম, তখন আমাদেরটাই ঐ পাড়ার একমাত্র ইঁটের বাড়ি, বাকি সব মাটির। দু তিন বছরের মধ্যে অবশ্য আরো কিছু পাকা বাড়ি তৈরি হয়ে গেল। আমাদের বাড়ির ঠিক পাশ দিয়েই উত্তর-দক্ষিণ বরাবর একটা সরু কাঁচা রাস্তা। তার ঠিক উলটো দিকে, আমাদের বাড়ির পূবদিকে প্রতাপকাকু বাড়ি বানালেন। প্রতাপকাকু একটা প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ওঁর বড়ো ছেলে পরেশ আমার ক্লাশমেট ছিল। এই বাড়ির পূবদিকে আর একটা ইঁটের বাড়ি উঠলো, যিনি বানালেন, তাঁর নাম মনে আসছে না, বোধ হয় সরকারী চাকুরে ছিলেন। কয়েক বছর পর সেই বাড়ি বিক্রি করে ওরা চলে যান। তার বাড়ির দক্ষিণে ছিল কাশীকাকার বাড়ি, উনার বাজারে টেলারিঙের দোকান ছিল। আমাদের যাবতীয় জামাকাপড় উনি সেলাই করে বানাতেন। কাশীকাকার দাদা ছিলেন প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক, তার বাড়িও ওটার লাগোয়া। প্রতাপকাকুর বাড়ির দক্ষিণে হারুকাকার মাটির বাড়ি। হারুকাকা বাজারে কারো দোকানে ফাইফরমাশ খাটতেন। হারুকাকা আর কাশীকাকার বাড়ির দক্ষিণে কামারবাড়ি, সে বাড়ির পুরুষরা অকম্মার ধাড়ি, মহিলারা এর ওর বাড়ি ঠিকে কাজ করতো। রোজ ভোরবেলা সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যেত ওদের প্রভাতী গালাগালি অনুষ্ঠান। বাপ মা তুলে এ অন্যকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি দিত ওরা, কেন কে জানে। আমাদের বাড়ির দক্ষিণে আর হারুকাকার বাড়ির পশ্চিমে থাকতো গজে, ওর মা আর ঠাকুমাকে নিয়ে। গজে রিক্সা চালাতো, আর ওর মা, তাকে আমরা পিসি বলতাম, ছাগল টাগল পুষতো। ওদের বাড়ির উঠোনে ছিল এক মস্ত কুলগাছ, যাতে শীতকালে প্রচুর কুল হত। বাড়িতে কেউ নেই ভেবে আমরা ঐ গাছে ঢিল মেরে কুল কুড়োতে গেলেই গজের ঠাকুমার চোস্ত গালাগালি ভেসে আসতো। আমরা ওঁকে খ্যাপানোর জন্যে বলতাম, 'ভাটাম গাছে ঢেঁকির ছিয়া'। এই কথাটার কোনো মানে নেই, কিন্তু এটা কানে গেলেই অশীতিপর বুড়ির মুখ হয়ে যেত কাঁচা নর্দমা। সে যা ভাষা, তা দিয়ে আর একটা চলন্তিকা লেখা যেতে পারে। আমাদের বাড়ির পশ্চিমে ছিল হালদার বাড়ি। তাদের চার ভাই আমার মাকে বৌদি ডাকতো বলে আমার কাকা, যদিও ছোটজন আমার সহপাঠী ছিল। ওদের বাবা আর মেজভাই পুজোর প্রতিমা বানাতেন, দুর্গা-কালী-সরস্বতীর। গজের আর হালদারদের বাড়িও ছিল মাটির।

আমার বাবা গ্রামের সেকেন্ডারী আর হায়ার সেকেন্ডারী স্কুলে শিক্ষকতা করে সেই প্রাক-বামফ্রন্ট আমলে যা আয় করতেন, তা দিয়ে সংসার চলতো না, কেননা বেতন নিয়মিত পাওয়া যেত না, আর যা পাওয়ার কথা, তা থেকে কম দেওয়া হত। সেইজন্যে বাধ্য হয়ে বাড়িতে টিউশানি করতে হত। আমাদের বাড়িতে দুটো ঘর, তাতে তক্তাপোষ পাতা, আর একটা বারান্দা। পড়ুয়ারা বারান্দায় বসতো, রোদ-বৃষ্টি বা সংখ্যায় বেশি হলে ঘরের মধ্যেও। একটা ঘর, যেটাতে আমি আর আমার ছোটবোন শুতাম, তার লাগোয়া রান্নাঘর, সেটায় টালির ছাওনি।

আমার মা বেশ অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে হলেও নিজের সংসার চালানোর জন্যে অসম্ভব পরিশ্রম করতো। বর্ষা ছেড়ে একটু শীত পড়লেই আমরা রান্নাঘরের পাশে জমিতে টমেটো, বেগুন, পালংশাক, পেঁয়াজকলি, শিম, বরবটি, শশা, ফুলকপি – এসবের চাষ করতাম। আমার বোন আর আমি নিয়ম করে রোজ বিকেলে জল দিতাম চারাগাছে। চালকুমড়ো আর পুঁইশাক লাগাতে হত না, এমনি এমনিই কী করে গজিয়ে যেত কোথা থেকে বীজ টীজ পড়ে।

শহুরে সম্বোধন, যেমন, 'দাদা, কেমন আছেন' বা 'আজ ওয়েদারটা বেশ ভালো, না?' এসব আমাদের গ্রামের জন্যে না। ওখানে হাঁড়ির খবর জানতেই লোকজন বেশি উৎসাহী। তাই, 'দিদি, কী রান্না করছেন' বলে কারো হেঁসেলে ঢুকে পড়া মোটেও অশালীন আচরণ বলে গণ্য হত না, বরং এটা বেশ সাবলীল। অনেকেই আমাদের বাড়ি এসে কুটনো কুটে দিয়ে যেত। আমার মা-ও অন্যের বাড়ি গিয়ে আটা মেখে দিয়ে আসতো বা দুটো লুচি ভেজে দিলো। মা বিভিন্ন রকমের বড়ি বানানোয় ছিল বিশেষ পারদর্শী। শীত পড়লেই আশেপাশের সব বাড়িতে বড়ি দেওয়ার হিড়িক পড়তো, আর মা-র ডাক পড়তো বড়ি দেওয়ার কাজে। রোদে পিঠ দিয়ে গল্প করতে করতে ঝোলের বড়ি, ভাজা বড়ি, কুমড়োর বিচি দেওয়া ক্রিস্পি বড়ি – এই সব নানান বড়ি দেওয়া, লাল লঙ্কা মাথায় গুঁজে বড়ির বিয়ে, কোন ব্রত পালনের চেয়ে কম নয়। বড়ি দেওয়ার দিন রোদ না উঠলে বিপদ, বড়ির নাক সুন্দর হতে হবে, ঝোলের বড়ি মুখে দিলেই যেন গলে যায়, ভাজা বড়ি কুড়মুড়ে হতে হবে, মোট কথা সহজ ব্যাপার নয় মোটেও।

কলাই বা বিউলির ডালের এই বড়ির এক অন্যতম উপাদান হল পাকা চালকুমড়ো। কচি কুমড়োর তরকারি হয় বিভিন্ন রকমের, সর্ষে দিয়ে ঝালঝাল এক প্রপারেশন খুবই মুখরোচক। কিন্তু বড়ির জন্যে সব বাড়িতেই সাদা খড়ি ওঠা পাকা চালকুমড়ো বাঁচিয়ে রাখতেই হত। আমাদের বাগানে কুমড়োর ফুল থেকে ফলের গুটি এলেই মা দাগিয়ে রাখতো, এটা বড়ির জন্যে। মানে ওটাকে কাটা হবে না, যতদিন না পেকে সাদা হয়ে যায়।

বাকি কুমড়ো পেড়ে খাওয়া হয়ে গেল, গোটা তিনেক বাড়তে লাগলো সেই গোকুলে। তারমধ্যে একটা আমাদের জন্যে, আর বাকি দুটো প্রতিবেশীদের কাউকে দেওয়ার জন্যে। সময় এলে তারা তাদের দুটো নিয়ে গেল, মা বললো, আমার তো বড়ি দেওয়ার আরো এক সপ্তা বাকি, আরো একটু বাড়ুক, এখনো তো সাদা দাগ ধরেনি। আমরা রোজ সকালে উঠে সেই নধর কুমড়ো কতটা বাড়ছে রোজ, সাদা খড়ি এলো কি না, তার খতেন রাখতাম।

আমাদের সব আশায় জল ঢেলে একদিন সকালে সেই প্রায়-পক্ক কুমড়ো গাছ থেকে হাওয়া হয়ে গেল। কেউ টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে, বেশ বোঝা গেল। মা-র খুব মন খারাপ হয়ে গেল। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে মা ঘুমাতে যায়, ওঠে সব্বার আগে, আর মা-র ঘুম খুব পাতলা, একটু আওয়াজেই ঘুম ভেঙে যায়, তা সত্বেও কী করে পাকা কুমড়ো চুরি হয়ে গেল, এই ভেবে মা খুব আপসেট। একজন প্রবোধ দিতে মাকে এসে বললো, 'ও দিদি, আমার কুমড়োটাতো বেশ বড়ো, আমি এবার বেশি বড়ি দেব না, আপনি আধখানা নিন'।

তার দু' দিনের মধ্যেই ঘটলো আর এক কান্ড।

মাঝরাত্রে ঘটাং করে একটা শব্দ এলো রান্নাঘর থেকে। বাড়িতে একগাদা বেড়াল, তারা হুটোপুটি করে নিত্য, হয়তো কেউ কিছু উলটে দিয়েছে, এই ভেবে মা ঘুম ভেঙে গেলেও উঠবো কি উঠবো না করে শেষে উঠে যে ঘরে আমি আর বোন শুই, সেটার খিল খুলে রান্নাঘরে ঢুকে দেখে একটা কালো লোক, বাইরের ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে। ছাদের টালিতে একটা বড়ো গর্ত।
মা-র চীৎকারে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল, আর আমরাও তারস্বরে চোর-চোর বলে চ্যাঁচাতে লাগলাম। পাঁচ সাত মিনিটের মধ্যে যাবতীয় পাড়ার লোক আমাদের উঠোনে। প্রতাপকাকুর বাড়ির বাইরে রাখা মইটা দেখা গেল আমাদের রান্নাঘরের চালে লাগানো। ওটা দিয়ে চালে উঠে চোর টালি সরিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। ভাগ্য খারাপ লাফিয়ে যেখানে পড়েছে, সেখানে রাখা ছিল এক লোহার বালতি, তাতে পা লাগায় সেই ঘটাং শব্দ।

প্রথমে কুমড়ো চুরি, তার দুদিন পরেই টালি খুলে চোর ঘরে ঢুকে পড়লো, স্বাভাবিকভাবেই আমরা সবাই খুব উদ্বিগ্ন। কুমড়োর ব্যাপারে গজের মা পিসির ওপর মা-র একটু সন্দেহ ছিল, কিন্তু উনি তো আর টালি খুলে চালে চড়তে পারবেন না, আর মা স্পষ্ট দেখেছে ওটা একজন পুরুষ। 

আমাদের বাড়িতে সারাদিন কত লোক আসে যায়, দরজা বন্ধ করার কোন দরকার পড়ে নি এতদিন। কিন্তু এই বিপর্যয়ে মা মুষড়ে পড়ে এর পর থেকে কয়েকদিন বাড়ির দরজা বন্ধ করে দুপুরে এর ওর বাড়ি গল্প করতে কি রান্নায় সাহায্য করতে গিয়ে পুরো রহস্যটার সমাধান করে ফেললো। হারুকাকার এক কামরার মাটির বাড়িতে মা দেখলো একটা কুমড়ো, যে রকম কুমড়ো বাজারে পাওয়া যায় না। কচি নয় মোটেই, সুতরাং তরকারি খাওয়ার মতো নয়, আবার তার গায়ে সাদা খড়িও পড়ে নি। আর তার ডাঁটিটা দেখেই বোঝা যায় ওটা কাঁচি দিয়ে কাটা না, গাছ থেকে টেনে ছেঁড়া। তার থেকেও বড়ো কথা, হারুকাকার পায়ের পাতায় একটা গামছা জড়ানো। বাজারে নাকি তার পায়ে পেরেকের গজাল ঢুকে গেছে, তিন দিন কাজে যায় নি হারুকাকা।

পাড়ার ছেলে ছোকরার দল রাত্রে পাহারার ব্যবস্থা করবে ভাবছিল, এ খবর পাঁচকান হওয়ার পর তার আর দরকার হয়নি। কয়েক মাস পর হারুকাকারা ঐ পাড়া ছেড়ে কোথায় চলে গেল। চিত্তকাকা সেই জমি কিনে মাটির বাড়ি ভেঙে সেখানে পাকা বাড়ি তুললো। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের ঘটনা, হারুকাকাদের আর আমরা কোনদিন দেখিনি।

একটা চোর, একটা পিসি আর প্রায়-দারোগা আমার মা-র মত একটা ডিটেকটিভ নিয়ে আমার এই ঘটনা যেন শীর্ষেন্দুরই গল্প। গজের মা-ঠাকুমা, প্রতাপকাকু, হালদারদাদু, কাশীকাকা – এরা কেউ আজ বেঁচে নেই। আমার বোনের বিয়ের পর আমাদের বাড়ির উঠোন আগাছায় ভরে গেছে, সেখানে আর শীতের সবজি চাষ করার কেউ নেই। বড়ি দেওয়ার প্রথাও প্রায় উঠে যাচ্ছে, আমার মা হাঁটুর ব্যথায় শয্যাশায়ী, সিঁড়ি ভেঙে কারো বাড়ির ছাদে উঠে বড়ি দেওয়ার ক্ষমতা আর তার নেই।