মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১২

ইস্কুল ~ অমিতাভ প্রামাণিক

বাচ্চারা কেন স্কুলে যায়? রবীন্দ্রনাথ কেন বেশিদিন যাননি, সে তো আমরা জানি। অন্যরা কেন যায়? ওঁর মত বিদ্রোহ করতে পারে না বলে?

আমার স্কুলে যাওয়ার গল্পটাও বেশ মজার। মানে যতটুকু মনে আছে, বাকিটা মা-র আর অন্যান্যদের মুখে শোনা। 

আমি খুব সরল সাদাসিধে বাচ্চা ছিলাম না তো। ঘ্যানঘ্যানানি লেগে থাকতো খুব। আর থাকবে নাই বা কেন? আমার রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল একেবারে শূন্য। ফলতঃ একের পর এক রোগ লেগেই থাকতো আমার। একটু ঠা
ন্ডা পড়লেই আমার অবধারিত নিউমোনিয়া, সেটার থেকে ব্রঙ্কাইটিস, তা থেকে হুপিং কাশি। এখন হুপিং কাফ রোগটা আর দেখি না, এমনকি ছোটখাটো ডাক্তারের কাছেও নেবুলাইজার বলে একটা মেশিন থাকে, লাগিয়ে দিলেই কাশির দমক কমে যায় অনেক। আমার তো কাশতে কাশতে ফুসফুসটাই প্রায় গলা দিয়ে বেরিয়ে আসতো, থামতোই না কাশি। সেটা কোনক্রমে ম্যানেজ হয়ে গেলেই প্রবল ডাইরিয়া শুরু হতো, তার পরে টাইফয়েড। ডাক্তার টাইফয়েডের মিক্‌চার দিতো, সেটা খেয়ে দুদিন পরে গেলে বলতো, না হে, মনে হচ্ছে জন্ডিস।

বস্তুতঃ পোলিও আর রিকেট – এই দুটো রোগ ছাড়া আর বাচ্চাদের বাকি যা যা রোগ হতে পারে, সেই সবকিছু হয়েছে আমার বারো-তেরো বছর বয়স অবধি। চেহারাটা ছিলো সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষপীড়িত বাচ্চাদের মত, বন্ধুরা বলতো ঝ্যাঁটার কাঠির মাথায় ভাটাম ফল। পেট ভর্তি পিলে, পটলডাঙার প্যালারামের চেয়ে অনেক বেশি বড়। কালমেঘের বড়ি, বাসক পাতার রস, চুনের জল, কচি খেজুর চারার শিকড়, আখের গুড় দিয়ে কাঁচা হলুদ - সব ফেল মেরে গেছে পিলে কমাতে। বাচ্চারা যখন লুকোচুরি, হুশ-হুশ, এক্কা-দোক্কা, কিরিং-কিরিং, হা-ডু-ডু এসব খেলতো, আমি জুলজুল করে ডাকঘরের অমলের মতন জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতাম।

খুব বেশিদিন যে আমি টানতে পারবো, এ বিশ্বাস প্রায় কারো ছিল না। পাড়ায় ডাক্তার নেই বললেই চলে, হোমিওপ্যাথি গুলি খেয়ে যা হয় তাই ভরসা। এক এক সন্ধ্যেবেলা আমার পেট ফুলতে শুরু করতো। তখন পেট ঠান্ডা করার জন্যে - না, বরফ নয়, বরফ কোথায় পাবে - পুকুরের পাঁক তুলে এনে পেটের ওপর চাপানো হত। তাতেও ফোলা না কমলে বেশি রাত্রে হোমিওপ্যাথি ডাক্তারকে হয়তো তলব করা হত, তিনি তাঁর মোক্ষম অস্ত্রটি পরীক্ষা করতেন আমার ওপর। ব্যর্থ হয়ে 'সবই তাঁর ইচ্ছা, ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখো' টাইপের একটা আশ্বাসবাণী শুনিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বাড়ি ফিরে যেতেন। আমার পেটের ওপর তখন পাঁকের পুরু চাদর, তার ওপর টপটপ করে ঝরে পড়তো মায়ের চোখের জল।

এখন হাসি পায়, যখন শুনি কেউ অসুস্থ হয়ে বড়ো হাসপাতালে গেল, আর বিভিন্ন অত্যাধুনিক চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে 'ফাইটার' খেতাব পেয়ে গেল। আমি জ্ঞানতঃ রোগ সারানোর জন্যে কোন ফাইট করতাম না। বেশি ঘ্যানঘ্যান করলে মা মাঝেমাঝে রেগে গিয়ে আমাকে যে বলতো 'যমের অরুচি', সেটাই বোধ হয় একের পর এক এইসব মারণব্যাধি থেকে ন্যূনতম চিকিৎসায় আমার বেঁচে যাওয়ার একমাত্র কারণ। 

পড়াশুনার কথা বলবো বলে রোগব্যাধি নিয়ে এই যে সাতকাহন শুনাচ্ছি, তার একটাই কারণ, একেবারে অন্যরকম ছিল আমার জগত। আমরা তখন ভাড়াবাড়িতে থাকতাম। আমাদের একটাই শোবার ঘর, তাতে দুটো তক্তাপোষ পাতা। আর একটা রান্নাঘর। বাড়িওয়ালা সীতানাথ বিশ্বাসকে আমি দাদু ডাকতাম। তিনি অবস্থাপন্ন মানুষ, ব্যবসা করেন, কাছে বাজিতপুর গ্রামে তার জমিজমাও আছে। একটা ছোট উঠোনের তিনপাশ ঘিরে অনেকগুলো গায়ে লাগা ঘর, তাতে তিন-চারটে ভাড়াটে। বাকি ঘরগুলো তার নিজের পরিবারের বসবাসের জন্যে। উঠোনের মধ্যে একটা শান-বাঁধানো টিউব-ওয়েল, সেখানে জামাকাপড় কাচাকাচি হত, বাসন ধোয়া হত, পুরুষরা সেখানেই স্নান করতো। পাশে একটা ঘেরা কমন বাথরুম, শুধু মহিলাদের জন্যে। একদিকে সারি দেওয়া তিনটে পায়খানা, যেটা খালি পাওয়া যায়, সেটাই ব্যবহার করতে হত।

সেই দাদুর স্ত্রীকে আমি ঠাকমা বলতাম, আর আমার মা তাঁকে মা বলেই ডাকতো। তার দুই ছেলে জিতেনকাকু আর শৈলেনকাকু, আর এক মেয়ে ফুটিপিসি। জিতেনকাকু আর যমুনা কাকিমার মেয়ে খুকু আর ছেলে সৌমেন আমার বোনের চেয়ে অল্প ছোট। শৈলেনকাকু আর ফুটিপিসি দুজনাই স্কুলে আমার বাবার স্টুডেন্ট ছিল। আমাদের পাশের ঘরের ভাড়াটে ছিলেন শ্যামলকাকু, উনি মাজদিয়া কলেজে পড়াতেন। উনি আর ওঁর স্ত্রী অঞ্জলিকাকিমার মত নরম মনের মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। মাঝে মাঝে তাদের ঘরে আড্ডার জন্যে হানা দিতেন ওঁর সহকর্মী মানসকাকু, তিনিও খুব মজাদার মানুষ। শ্যামলকাকুর, আমাদের আর জিতেনকাকুর শোবার ঘর পাশাপাশি, দরজা খুললেই সামনে টানা বারান্দা। তার সামনে একফালি জমি, দশ বারো পা পেরোলেই মেন রাস্তা, যশোর রোড, কলকাতার উপকন্ঠ থেকে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে অধুনা বাংলাদেশের ভিতর।

যখন রোগে বিছানায় শুয়ে থাকতাম না, সেই বিরল কিছু রাত্রে নৈশাহারের পর সামনের বারান্দায় বসে শ্যামলকাকু আমাকে দেশ-বিদেশের গল্প শোনাতেন। ওঁর গল্প বলার একটা মনোমুগ্ধকর ধরণ ছিল। কথার মাঝে স্বর উচ্চনীচ করে আর বিরতি দিয়ে দিয়ে একটা দারুণ আবহ তৈরী করতেন, তাতে গল্প শোনার উৎসাহ অনেক বেড়ে যেত। আর কেউ কেউ যেমন কথার মাঝে মুদ্রাদোষের মত ব্যবহার করে 'তোমার ধর গিয়ে', 'এই হল গিয়ে ব্যাপার', উনি বলতেন 'গিয়ে গা'। আমি তাই মাঝে মাঝেই বায়না ধরতাম, 'কাকু, আমাকে গিয়েগার গল্প বলো'। পায়েস জাতীয় ঘন দুধের কোন খাবার আমার পেটে সহ্য হত না বলে ঘটা করে জন্মদিন পালন ছিল অনাবশ্যক। তবু উনি আমাকে কখনো কখনো কিছু কিছু বই উপহার দিতেন। উপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনির গল্প আর ছোটদের রামায়ণ, ছোটদের মহাভারত দিয়ে আমার কল্পজগতে প্রবেশ হয় সেই সময়ে।

বাবা স্কুলে খুব কড়া শিক্ষক ছিল, আর বাড়িতে টিউশানি করত। সেই সময়, যখন আমি খুব ছোট, বাবা বাড়িতে হায়ার সেকেন্ডারির ছাত্রদের কমার্সের বুক-কীপিং শেখাত। জার্নাল-লেজার-ট্রায়াল ব্যালেন্স-গোল্ডেন রুল্‌স্‌ অফ ডেবিট অ্যান্ড ক্রেডিট-প্রফিট অ্যান্ড লস অ্যাকাউন্ট এইসব আকছার শুনতে পেতাম সেই টিউশানির জায়গা থেকে। আর কেউ ভুল বললেই ধুপধাপ পিঠে পড়তো বাবার কিল। ছাত্ররা বাবার ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত। আমার অবশ্য তখন বাবাকে ভয় পাওয়া উচিৎ, না সমীহ করা, সে সম্বন্ধে ধ্যানজ্ঞান তৈরী হয়নি।

অনেক সকালে ঘুম থেকে তুলে আমাকে পাশে শুইয়ে বাবা আমাকে মুখে মুখে সহজ পাটিগণিত আর ইংরাজী গ্রামার-ট্রানস্লেশন শেখাত। বাংলা ইংরাজী অক্ষরপরিচয় এর মধ্যেই কখন হয়ে গেছে। বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় বা রবীন্দ্রনাথের সহজ পাঠ চোখে দেখার আগেই। তাই এক বছর সরস্বতীপুজোর সময় বাবা যখন স্কুলের সহকর্মী ভবানীবাবুকে ধরলেন আমাকে হাতেখড়ি দেওয়ানোর জন্যে, আর ভবানীজ্যেঠু আমার হাত ধরে স্লেটের ওপর গোটা গোটা করে লিখলেন 'অ', আমি বললাম, অ এ রকম না, এই রকম হবে। আমার বাবার হাতের লেখা ছিল খুব সুন্দর, ক্যালিগ্রাফির মত। কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং লেখা তাই আমার ছিল বিলকুল না পসন্দ।

আমাদের ভাড়াবাড়ির পাশে এক সরু গলি দিয়ে একটু গেলেই একটা বাড়ি, সেই বাড়ির দুটো মেয়ে তখন প্রাইমারী স্কুলে পড়ে। ওদের ছোটটার নাম ঘুম, আর বড়োটার নাম ছোটি। ঘুম ছিল একেবারে টমবয় ধরণের, ছেলেদের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করে হারিয়ে দিত। ওদের ভাই সন্টু প্রায় আমার সমবয়েসী, সে তখনো স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। প্রাইমারী স্কুল শুরু ক্লাশ ওয়ান দিয়ে, এখনকার মত প্লে স্কুল, নার্সারী, কেজি ওয়ান, কেজি টু – এসবের বালাই ছিল না। 

মা একদিন ছোটিকে ধরলো, 'এই আমাদের মিঠুকে একটু ইস্কুলে নিয়ে যাবি? কিচ্ছু করতে হবে না, শুধু এক জায়গায় বসিয়ে দিবি। আর একটু নজরে রাখিস, যেন এদিক ওদিক চলে না যায়। দু'দিন অভ্যেস হয়ে গেলেই ওর বাবা ভর্তি করে দিয়ে আসবে'।

সেই প্রাইমারী স্কুল আর হাইস্কুল একেবারে গায়ে লাগা। কোনটাতেই বাউন্ডারী ওয়াল ছিল না তখন, ইউনিফর্ম বোধ হয় এখনো নেই। আমার বাবা হাইস্কুলের শিক্ষক, প্রাইমারীর সব শিক্ষক তাকে চেনেনই শুধু নয়, মান্যও করেন, আমার পক্ষে এভাবে হুট করে একটা ক্লাসে গিয়ে বসে যাওয়া মারাত্মক গোলযোগের কোন ব্যাপার নয়। বললেই হল, অজিতবাবুর ছেলে।

কদিন পরেই মা আমাকে চান করিয়ে নতুন জামা পরিয়ে ভাত খাইয়ে হাতে শেলেট পেন্সিল ধরিয়ে দিয়ে ছোটির সাথে ইস্কুলে পাঠিয়ে দিল। আমিও নাচতে নাচতে চলে গেলাম। ক্লাসে বসেই অবশ্য আমার নাচুনি থেমে গেল। তারাপদ স্যার পড়াচ্ছিলেন, অ-এ অজগর। সবাই বললো, অয়ে অজগর। উনি ছোটিকে জিজ্ঞেস করলেন, আ-এ কী? ছোটি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। উনি এবার গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আ-এ কী? ছোটি চুপ। তারাপদ স্যার এবার ক্লাশের অন্যদিকে তাকিয়ে একজনকে টার্গেট করে জিজ্ঞেস করলেন, এই পরাণ, তুই বল, আ-এ কী? পরাণ বললো, আয়ে আম ছার। তারাপদ স্যার বললেন, গুড। দে, দুগ্‌গার কানটা মলে দে। অমনি পরাণ এসে ছোটির দুই কান পেছন থেকে ধরে মলে দিল। আমি ওর পাশে বসে ভয়ে আধমরা হয়ে গেলাম। এবার কি আমাকে ধরবে, আর কান মলে দেবে?

তারাপদ স্যার আরো কিছুক্ষণ ছোটিকে কী সব বললেন। তারপর অন্যদের দিয়ে 'ই', 'ঈ' শেষ করে ছোটিকে আবার ফিরে ধরলেন, দুগ্‌গা বল, হ্রস্ব-উ-এ কী? ছোটি আবার নিস্পন্দ, নির্বাক। আমি ভাবছি ওকে পাশ থেকে বলে দেব কিনা, উট বল, উট। কিন্তু ছোটি চুপ, আবার ভয়ে গুটিয়ে গেছে। আমি ভাবছি, আবার কেউ বলে দেবে, আর ছোটি আবার কানমলা খাবে। কিন্তু না, তারাপদ স্যার ওকে এবার মোক্ষম প্রশ্ন করলেন। 'এক্ষুণি কী যেন তোকে জিজ্ঞেস করলাম? ও হ্যাঁ, বল দেখি, আ-এ কী?' ছোটি তাও চুপ। তারাপদ স্যার এবার কাছে এসে ছোটির চুল ধরে দিলেন এক টান। ছোটি উঃ করে উঠলো, আর তারপর পিঠে গুম করে এক কিল। আমার বাবা হায়ার সেকেন্ডারীর ছাত্রদের যত জোরে মারে, তার চেয়েও বেশি জোরে। ছোটি ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠলো। আমিও ভয়ে পাথর।

পরদিন মা চান করিয়ে ভাত দিতেই আমি 'পেটে কী ব্যথা' বলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। পেটে ব্যথা আমার জন্মসঙ্গী, তা নিয়ে কারো কোন সংশয় নেই। ফলে আমার স্কুলে যাওয়া হল না সেদিন। তার পরদিনও। এবং তারও পরদিন।
রোজ রোজ পেটে ব্যথা বললে বৈচিত্র চলে যায়, তাই আমি নিত্যনতুন ফিকির আমদানি করতে লাগলাম, আর ধরাও পড়ে গেলাম। মা যত বোঝায়, ওরে, তোকে কিছু বলবে না, ঠিক আছে আমি তারাপদ স্যারকে বলে দেব তোকে পড়া না ধরতে, আর তুই তো এসব জানিস, আমার কিছুতে চিঁড়ে ভেজে না। কেউ আমাকে পেছন থেকে কানমলা দিচ্ছে, কি স্যার চুল ধরে টেনে পিঠে কিল মারছে, আমি ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখতে লাগলাম। তিন চারমাস কি তারো বেশি আমার স্কুলে যাওয়া হল না।

বাবা এসব কিছু জানতো না। মা ভেবেছিল একাই এসব ছোটখাট ব্যাপার ম্যানেজ করে নেবে। হল না দেখে এবার বাবার কোর্টে বলটা ঠেলে দিল একদিন নৈশাহারের সময়। বাবা অল্প কথার মানুষ। 'ঠিক আছে, কাল ও আমার সঙ্গে যাবে', বলে আমাকে কোন চান্স না দিয়ে প্রসঙ্গের ইতি টেনে দিল।

পরদিন সকালেই আমার ধুম জ্বর। কদিন পর সে জ্বর সেরে গেলে যখন আর নতুন কোন অজুহাত বের করতে পারলাম না, বাবা খেয়ে দেয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্যে রেডি, আমি বললাম, আজ না, কাল যাবো। পরদিনও, কাল যাবো। এই ভাবে দিন চলে যায়, 'কাল' আর আসে না। কদিন বাদে নিজেই বুঝতে পারলাম, বাবা রেগে যাচ্ছে, তাই পলিসি পালটে বললাম, মঙ্গলবার যাবো। কোন মঙ্গলবার, কেন মঙ্গলবার, সেই ডিটেল্‌সে যাইনি। পরের মঙ্গলবারেও বললাম, মঙ্গলবারে যাবো। মা বললো, আজ তো মঙ্গলবার, আজ যা। আমি বললাম, আজ না, আর এক মঙ্গলবার।

রোগা টিংটিঙে সদা অসুস্থ বাচ্চার গায়ে হাত তুলতে যে কোন পুরুষেরই মায়া লাগবে। কিন্তু মানুষের ধৈর্যের তো সীমা আছে। এক মঙ্গলবারে আমি আবার নতুন মঙ্গলবারের বাহানা তুলতেই বাবার রাগের বাঁধন টুটে গেল।

কী মার যে খেয়েছিলাম, বলতে পারবো না। আশে পাশের অনেক বাড়ির লোক ছুটে এসেছিল। বাড়িওয়ালা দাদু-ঠাকমা এসে আমাকে কোলে করে নিয়ে গেল তাদের ঘরে, আর আমার বাবাকে বকতে লাগলো, একটা দুধের বাচ্চাকে ঐভাবে কেউ মারে? 

আমি মোটেও দুধের বাচ্চা নই তখন। ছ'বছর পুরতে আর দু'মাস মাত্র বাকি। এখন এই বয়সে বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞ। আর আমি স্কুলের চৌকাঠই পেরোতে পারছি না। পরের সপ্তাহে বাবার সঙ্গে যেতেই হল স্কুলে। আমার যাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই, বাবাও ছাড়বে না। আমি রাস্তায় তিনপা হাঁটি তো একপা পিছাই, বাবার অভ্যেস দ্রুত হেঁটে যাওয়ার, আমাকে নিয়ে প্রায় নাজেহাল অবস্থা বাবার। ভীষণ সময়ানুবর্তী বাবার স্কুলে কোনদিন এক মিনিট লেট হবার উপায় নেই। গোঁজ হয়ে থাকা আমাকে কোনমতে প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টারের কক্ষে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে বাবা 'আমার ছেলে, একটু দেখবেন' বলে হনহন করে বেরিয়ে পাশে নিজের ইস্কুলে চলে গেল।

হেডমাস্টারমশাই আমাকে 'যাও, ঐ ক্লাশে গিয়ে বসো' বলে একটা ঘর দেখিয়ে দিলেন। সেখানে তখনো জল পড়ে, পাতা নড়ে চর্চা হচ্ছে।

পরদিন বাবার সঙ্গে আবার এলাম, এবার ভর্তি হবো। হেডমাস্টারমশাই বাবাকে কী একটা বলতেই আমি বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, না, আমি ঐ ক্লাশটায় যাবো না, আমি ও সব জানি। আমার মুখস্থ। হেডমাস্টারমশাই আমার কঠোর আস্থা দেখে আমাকে একেবারে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করে নিলেন কোন প্রশ্ন না করেই। 

এর ঠিক দুমাস বাদেই পুজোর ছুটি, স্কুল খুললেই পরীক্ষা, আর সব পরীক্ষাতে আমি ফুল মার্ক্স পেয়ে ক্লাশ থ্রীতে উঠে গেলাম। এর মধ্যে আর এক রাউন্ড টাইফয়েড-রক্ত আমাশা হয়ে গেছে। 

আমার বয়স তখন ছ বছর তিন মাস। এখন এই বয়সে ক্লাশ ওয়ানে ভর্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সমস্ত শিক্ষায়তনে।

----------------------------------------

যে ভাড়াবাড়িতে জীবনের প্রথম আট-ন'বছর কেটেছে, তার স্মৃতি এখন প্রায় ফিকে হয়ে এসেছে। বাড়ির মালকিন ঠাকমা, যাকে আমার মা 'মা' বলে ডাকতো, নিজের নাতি-নাতনীদের সাথে আমাদের কোন পার্থক্য করতেন না। আমাদের বাচ্চাদের সকাল দুপুরের খাওয়া দাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট মেনু বা সময় ছিল না, যেখানে কেউ মুখে কিছু ঢুকিয়ে দিত, সেটাই খাওয়া হয়ে যেত। পোড়া শুকনো লঙ্কা দিয়ে আলুভাতে মেখে সকালে পান্তাভাত খাইয়ে দিতেন ঠাকমা নিজের বড়ছে
লে জিতেনকাকুর ছেলে-মেয়ে খুকু-সৌমেনকে, কাছাকাছি আমি থাকলে আমাকেও। আমার মা জানতেও পারত না। একটু পরে মা যদি ডাকতো, মিঠু খাবি আয়, আমি বলতাম, আমি ওদের ঘরে খেয়ে নিয়েছি। ওদের মা যমুনা কাকিমা আর আমার মা বোধ হয় সমবয়েসী, উনিও আমাকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসতেন। জ্বর বা পেট খারাপ না থাকলে আমার সারা গায়ের এখানে ওখানে ঘা-প্যাঁচড়া হত। যমুনা কাকিমা কত যত্ন করে গরম জল দিয়ে সেগুলো ধুইয়ে লাগিয়ে দিতেন লাল ওষুধ (মারকিউরোক্রোম), বা সবুজ রঙের বোঁটকা গন্ধওলা অ্যান্টিব্যাকট্রিন।

অসুস্থতার জন্যে বাইরের জগতের সঙ্গে আমার সংস্পর্শ ছিল বড়ো কম। আমার দৌড় ছিল শোবার ঘরের দরজার বাইরে যে লম্বা টানা বারান্দাটা, সেই পর্যন্ত। ভাটামের গোল গোল ফল পা দিয়ে কিক করে সেখানে আমরা ফুটবল খেলতাম। পার্মানেন্ট গোলকীপার আমি অবশ্য বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না, একটু পরেই হাঁপিয়ে গিয়ে বসে বা শুয়ে পড়ে সারা শরীর দিয়ে গোল বাঁচিয়ে দিতাম। সারা গায়ে জামা কাপড়ে ধুলো লেগে যেত, আর মা-র কাছে বকুনি খেতাম। যেদিকে জিতেনকাকু-যমুনা কাকিমাদের শোবার ঘর, সেইদিকে বারান্দা পেরোলে একটা সরু গলি, যেটা দিয়ে ঘুম-ছোটি-সন্টুদের বাড়ি যেতে হত। ঐ গলির উলটো দিকেই যশোর রোডের দিকে মুখ করে ছিল সন্টুর বাবার টিমটিমে মুদিখানা দোকান। কখনো কখনো আমাকে বাবা সেখান থেকে বিড়ি বা চারমিনার সিগারেট কিনে আনতে বলতো। সন্টুর বাবা আমার হাতে জিনিষ দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ইস্কুলে যাচ্ছিস এখন?
খুবই সামান্য দোকান, যা পণ্য-সামগ্রী ছিল তা বিক্রি করে কী করে সংসার চলতো তা ভাবলে এখন অবাক লাগে। বাবার জন্যে বিড়ি-সিগারেট ছাড়া সেখানে আর একটা জিনিষ কিনতেই আমি মাঝে মাঝে যেতাম। সেটা হল বাতাসা। মা আমার হাতে গুণে গুণে কিছু পয়সা দিয়ে বলত, যা স' পাঁচানার বাতাসা নিয়ে আয় তো, হরির লুঠ দেব।

আমাদের সেই বাড়ির সামনেই যশোর রোডের ঠিক উলটো দিকে ছিলো একটা ফাঁকা মাঠ, সেটাকে বলা হত ইউনিয়ান বোর্ডের মাঠ। ইউনিয়ান বোর্ড-টা যে কী, সেটা কেউ জানতো না, সবাই বলতো ইন্নান বোড। সেখানে একটা লাল রঙের সিমেন্টের বাঁধানো চাতাল, তার ওপর দুর্গা বা কালীপুজো হত পুজোর সময় প্যান্ডেল বেঁধে ধুমধাম করে। অন্য সময় সেই মাঠে বাচ্চারা বাতাবিলেবুর ফুটবল, ডাঙ্গুলি, মার্বেল, লাট্টু এইসব খেলতো, আর ঘুড়ি ওড়াতো। মাঝে মাঝে কোথা থেকে বাস নিয়ে এক পার্টি এসে বায়োস্কোপ দ্যাখাতো সেখানে সন্ধ্যেবেলা। তখন শরীর খারাপ থাকলেও আমি রাস্তা পেরিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে মাঠে যেতাম বায়োস্কোপ দেখতে। বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন কি করে ঘুড়ি উড়িয়ে আকাশের বিদ্যুৎ মাটিতে নিয়ে এসেছিলেন, তার সেই অবাক কার্যকলাপের সবাক প্রতিফলন ছবির পর্দায় দেখে শিহরিত হতাম।

ঘন ঘন শরীর খারাপ হওয়া সত্ত্বেও মা প্রতিবারই ঠাকুরের কাছে মানত করত আমার দ্রুত আরোগ্যলাভের জন্যে। সেজন্য কতটা দ্রুত আমি সেরে উঠতাম তা বলা মুশকিল, কিন্তু প্রতিবার আমি সুস্থ হয়ে দুপুরে ভাত খেলেই মা বিকেলে বলতো, যা, স' পাঁচানার বাতাসা নিয়ে আয়। আগে চার পয়সায় আনা ছিল, সেই হিসাবে সোয়া পাঁচ আনা হল টায়ে টায়ে একুশ পয়সা। পরে নয়া পয়সা এসে যাওয়ায় আনা হয়ে গেল সওয়া ছ'পয়সা, তাহলে সওয়া পাঁচ আনায় কত পয়সা হবে, এ ছিল বেশ জটিল ধাঁধাঁ। কিন্তু যে অন্য সব ইহলৌকিক ব্যাপারে মোটামুটি অক্ষম, তার কাছে এটা ততোটা কঠিন সমস্যা ছিল না। আমি সন্টুর বাবাকে তেত্রিশ পয়সা দিয়ে বলতাম, বাতাসা দাও। কেন যে প্রত্যেকবার সওয়া পাঁচ আনার মত এক বদখৎ ডিনোমিনেশনের বাতাসা মানত করা হত, জানিনা। ইউনিয়ান বোর্ডের সিমেন্টের চাতালে মা একটা সর্ষের তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে আমার রোগমুক্তির জন্যে ভগবানের কাছে অসংখ্য প্রণাম জানিয়ে হলুদ রঙের সেই গুড়ের বাতাসা ছড়িয়ে দিত আকাশে। আমি আর আমার মত কিছু কাচ্চাবাচ্চা সেগুলো কুড়িয়ে কপাকপ খেয়ে নিতাম।

ইউনিয়ান বোর্ডের ঠিক পাশে একটা বড়োসড়ো বিল্ডিং ছিল, তার নাম অজন্তা কুঠি। সেটা প্রায় সবসময় বন্ধ থাকতো। 'মুগুর মার্কা অজন্তা হাওয়াই' লেখা কিছু কাগজ পড়ে থাকত আশেপাশে, হাওয়াই চপ্পলের ছবি দেওয়া। বোধহয় আগে ওয়্যারহাউস ছিল অজন্তা ব্র্যান্ড চপ্পলের। সেই অজন্তা কুঠির ঠিক সামনে একটা কাঠের বাটাম দেওয়া স্ট্রাকচার ছিল, অনেকটা সিনেমায় দেখা কোর্টের কাঠগড়ার মত। তার সামনে একটা কাঠের হোর্ডিঙে লেখা ছিল, কৃত্রিম গো-প্রজনন কেন্দ্র। জিনিষটা কী, সেটা তখন জানতাম না। আমি আমার ঘরের জানলা দিয়ে মাঝে মাঝেই দেখতে পেতাম, রোদের মধ্যে সেই কাঠগড়ায় একটা গরুকে দাঁড় করিয়ে রাখা। 

আমাদের ওই বাড়িতে রান্না হত তোলা উনুনে। কয়লার উনুন, নীচে ঘুঁটে দিয়ে আগুন বানিয়ে তার ওপরে কয়লা সাজানো। এখন যারা বাড়িতে ফুরুৎ করে একটা নব ঘুরিয়ে গ্যাস জ্বালিয়ে নেয়, তারা ভাবতেও পারবে না, কী ঝামেলার কাজ ছিল সেই নিত্য উনুন ধরানো। বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। শুধু তাই না, কয়লা পাওয়াও ছিল দুস্কর। বাজারে মাঝে মাঝেই কয়লা হাওয়া হয়ে যেত, আর এখনকার মত ধূমহীন গুল তখনো আবিস্কারই হয়নি। পাড়ার দু একজন জানতো, কী করে অসাধু উপায়ে কয়লা জোগাড় করা যায়। খুব সহজ পদ্ধতি। তখন যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন কয়লায় চলতো। মাজদিয়া ষ্টেশন ছেড়ে কোনো ট্রেন পূবদিকে যাত্রা শুরু করলে রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে তারা একটা লম্বা কঞ্চির মাথাটা চিরে একটা দুই বা পাঁচটাকার নোট আটকে সেটা ট্রেনের চালকের কামরার দিকে বাড়িয়ে ধরতো। চালক টাকাটা কঞ্চির মাথা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কয়লার ষ্টোর থেকে কিছু অংশ গড়িয়ে দিত চলন্ত গাড়ি থেকে কামরার বাইরে। সেগুলো কুড়িয়ে এনে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করতো তারা। বাজারে যখন কয়লা পাওয়া যেত না, আমার মা বাবা-বাছা করে তাদের কাউকে ধরে নিজের রেশন মজুত করে রাখত। আর ঘুঁটে দিত নিজেই, গোবর টোবর জোগাড় করে। সেই বাড়িতে দু-তিনটে গরু পোষা থাকত সব সময়।
গোবরে কাঠের গুঁড়ো মিশিয়ে ঘুঁটে দিলে আগুন তাড়াতাড়ি জ্বলে আর সে আগুন চট করে নিভেও যায় না। মা তাই আমাকে চুপিচুপি বলতো, মিঠু, একটু কাঠের গুঁড়ো এনে দিতে পারবি?

আমাদের বাড়ীওয়ালা সীতানাথ বিশ্বাসের জমির পাশেই তখন নতুন তৈরী হয়েছে ফটিক স'মিল। আমি একদিন সেখানে ঢুকে দেখেছি কী আশ্চর্য সব ব্যাপার স্যাপার। রেললাইনের মত সমান্তরাল দুটো লাইনের ওপরে চাকা লাগানো একটা লোহার পাটাতন, তার ওপর মোটা কাঠের গুঁড়ি রাখা হত। লোহার শিকল দিয়ে সেই পাটাতন লাগানো থাকতো একটা গোল পুলির সঙ্গে। পুলির হ্যান্ডেল ঘোরাতে আরম্ভ করলেই সেই শিকল লাইনের ওপর দিয়ে টেনে আনতো পাটাতনটাকে, কাঠের গুঁড়ি সমেত। যাত্রাপথে সেই গুঁড়ির সাথে মোলাকাৎ হত একটা ঘূর্ণায়মান ইলেক্ট্রিক করাতের, একটা নির্দিষ্ট উচ্চতা বজায় রেখে যে অবিরাম ঘুরে চলেছে। গুঁড়ির ওপরের লেভেল থাকতো করাতের লেভেলের থেকে একটু ওপরে, তাই করাতের উচ্চতা বরাবর তার মাথাটা ছেঁটে যেত, আর বেরিয়ে আসতো সুন্দর এক স্ল্যাব। প্রতিবার করাতের লেভেল একটু একটু করে নীচু করে নেওয়া হত। করাতের সঙ্গে কাঠের ছোঁয়া লাগলেই চ্যাঁ করে একটা একটানা শব্দ হত, আর ফুলকির মত উড়ে যেত কাঠের গুঁড়ো, সেগুলো জমা হতে হতে একটা ডাঁই হয়ে যেত।
আমি একটা চটের থলে নিয়ে তার মধ্যে যতটা পারি সেই কাঠের গুঁড়ো ভরে এনে মাকে দিতাম। কিছুদিন পরে কাঠকলের মালিক আবিস্কার করলো, তার এই আপাত নিরীহ জিনিষটার বেশ চাহিদা। সঙ্গে সঙ্গে ওটা একটা পণ্য হয়ে গেল, মানে এমনি এমনি দেবে না, পয়সা দিয়ে কিনতে হবে। যে জিনিষ এত দিন ফেলে দিচ্ছিল, সেটা নিতে এখন পয়সা লাগবে, এ তো মহা অন্যায়। আমারো রোখ চেপে গেল। কেউ জানতে না পারে এমন ভাবে পা টিপে টিপে আমি থলে নিয়ে চলে যেতাম পাঁচিলের পেছনের একটা ফোকর দিয়ে, আর বিজয়ীর মত মা-র জন্যে নিয়ে আসতাম মহার্ঘ কাঠের গুঁড়ো। 'না বলিয়া পরের দ্রব্য লইলে চুরি করা হয়', এটা জেনেও এই কাজের জন্যে আমার মনে কোন অনুশোচনা হতনা।

প্রাইমারী ইস্কুলেও আমার তখন কিছু কিছু প্রতিপত্তি শুরু হয়েছে। অঙ্ক ক্লাশে সব অঙ্ক আমি মুহূর্তের মধ্যেই কষে ফেলতে পারি। তারাপদ স্যার, নির্মল স্যার, সুবল স্যার সবাই আমাকে খুব ভালোবাসেন। স্কুলে একজন দিদিমণি, আভা দিদিমণি, তিনি আমার মা কে চিনতেন আগে থেকেই, কৃষ্ণনগরে এক কলেজে পড়েছেন। তাঁর বড় মেয়ে টিঙ্কু আর আমি এক ক্লাশে। কেউ পড়া না পারলে যে পারবে সে কানমলা দেবে, এটাই বিধান। অসহ্য লাগলেও আমি আমার ক্লাশের প্রায় সবাইকেই কানমলা দিয়েছি কোন না কোন সময়। ঘা-প্যাঁচড়ার মত কান পাকাও একটা রোগ ছিল তখন, মানে কানে পুঁজ জমতো। কান মলে দিলেই সেই পুঁজ বেরিয়ে হাতে লেগে যেত। আমার নিজের শরীরে অসংখ্য খুঁত, তাও পরের কানের পুঁজ হাতে লেগে গেলে গা ঘিনঘিন করে উঠতো। টিঙ্কু আর আমি আলাদা সেকশানে ছিলাম। একদিন আভা দিদিমণি ওদের ক্লাশে কিছু পড়া ধরেছিলেন, কেউ পারেনি, সবাইকে দাঁড় করিয়ে রেখে উনি পাশের সেকশান থেকে আমাকে ডাকিয়ে সেই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করলেন। আমি পেরে যেতে বললেন সবার কান মলে দিতে। যে দু একজনকে আমার অত্যন্ত বকাটে মনে হত, তাদেরই আমি কানমলা দিলাম, বাকিদের বেলায় কানমলার অভিনয় করে গেলাম। টিঙ্কু বা অন্যান্য কোন মেয়েদের আমি কান স্পর্শ করলাম না। নির্জীব সরীসৃপের মত আমার অবস্থা হলেও মেয়েদের অপদস্থ করতে সেই আমার প্রথম পুরুষকারে লাগল।

বেশি নড়াচড়া করতে কষ্ট হলেও আমার একটা বাজে অভ্যাস হয়ে গেছিল সব সময় তর্জনী দিয়ে হাওয়ায় কিছু লেখা। অধিকাংশ সময় সেটা বাংলা বা ইংরাজী কোনো অ্যালফ্যাবেট। ছবি আঁকতে পারতাম না, কিন্তু যাকে আমরা ফন্ট বলি, সেগুলো হাতের লেখায় আরো কী করে সুন্দর করা যায়, আমি সর্বদা তার শ্যাডো প্র্যাকটিশ করে চলতাম। 'ঞ্জ' আর 'জ্ঞ'-তে যে বর্গীয় 'জ'-টা হুবহু ওর নিজের মতো নেই, আগে বা পরে 'ঞ' লেগে ওর শারীরিক বিবর্তন হয়েছে, সে রকম দন্ত্য 'স'-এর নীচে 'ত' লাগালে যে 'স্ত' তৈরী হয়, সেখানে 'স'-টা অনেক আলাদা দেখতে, সেগুলো বইতে যেমন ছাপা সেরকম লিখতে না পারলে আমার শান্তি হত না। আর তার জন্যে সবসময় হাওয়ায় আমার ডান হাতের তর্জনী নকশা বুনে চলতো। বাবা বলতো, ইংরাজী শিখতে গেলে ভালো করে ট্রানস্লেশন শিখতে হবে। কোনো একটা লেখা, যেমন ইংরাজী ঈশপের গল্প, আমাকে প্রথমে ইংরাজী থেকে বাংলা করতে হত। বাবা তারপর ইংরাজী বইটা নিয়ে নিত, আর বলতো, এবার তোমার নিজের ওই বাংলা তর্জমাটা আবার ইংরাজীতে ট্র্যানস্লেট করো। অনেক কিছুই এখন ভুল মনে হয়, বিশেষতঃ বিদেশী ভাষা শিখতে গেলে সেই ভাষায় লেখা সাহিত্য পড়া ও অনর্গল কথা বলা যে গ্রামার বা ট্রানস্লেশনের চেয়ে অনেক বেশি জরুরী, সেটা। কিন্তু আমাদের সেই অজ গাঁয়ে কোথায় বিদেশী সাহিত্য পাঠের সুযোগ, কার সাথেই বা ইংরাজীতে কথা বলব? ইংরাজী শেখানোর শিক্ষকরাই বাংলায় পড়ান যেখানে! 

গরু রচনা দিয়ে আমাদের বাঙালীদের সাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশ। গরুর পরেই বর্ষাকাল। ক্লাশ থ্রী-র ছাত্রবন্ধু বইতে গরু রচনা ছিল সাত-আট লাইনের, আর বর্ষাকাল ন'দশ লাইনের। পরীক্ষায় এ দুটোই আসতো সাধারণতঃ, দুটোর মধ্যে একটা লিখতে হত। গরু লিখলে কুড়িতে বারো, আর বর্ষাকাল লিখলে তেরো পাওয়া যেত, কেউ যদি বানান ভুল না করে ছাত্রবন্ধু উগরে দিয়ে আসতে পারে। হাতের লেখা ভালো হলে আরো এক-আধ নম্বর বেশি পাওয়া অসম্ভব ছিল না। সেবার কী কারণে বর্ষাকাল আর দুর্গাপুজো – এই দুটো রচনা এলো অ্যানুয়াল পরীক্ষায়। যারা শুধু গরু মুখস্থ করে গেছিল তাদের তো মাথায় হাত। বাকিরা সবাই বর্ষাকাল লিখলো, কেননা দুর্গাপুজো রচনা ছাত্রবন্ধুতে নেই।

সেবার পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবার পর আভা দিদিমণি আমাদের বাড়ি এসে মাকে বলেছিলেন, তোমার ছেলেটা কী সুন্দর রচনা লিখেছে গো, পড়ছি আর মনে হচ্ছে আমি পুজো মন্ডপে বসে আছি। কী সুন্দর হাতের লেখা। তোমরা ওর শরীরের দিকটা একটু দ্যাখো। ও তো বাড়ছেই না। ক্লাশে বসে, ওর মাথা হাইবেঞ্চের ওপার থেকে দ্যাখাই যায় না। একটু ছানা টানা খাইয়ে দ্যাখো।

অথচ হাইবেঞ্চের ওপারে না, আমার নজর তখন প্রাইমারী আর হাইস্কুলের মাঝখানে যে দেওয়াল, তার ওপারে নিবদ্ধ। কত বড়ো স্কুল, সামনে কতো বড়ো মাঠ, পেছনে কত বড়ো মাঠ, একটা বিশাল পুকুর। আর কতোদিন লাগবে ঐ স্কুলে যেতে?