বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২

আপনাকে এই জানার আমার ~ অমিতাভ প্রামাণিক

'ও মিটু, চাড্ডি চালভাজা খাবি? আয়,' বাড়িওয়ালি ঠাকমা ডাক দিলেন ওঁদের রান্নাঘর থেকে। মা রোজ সকালে গুড় দিয়ে বাসি রুটি, নয় লেবু-চিনি দিয়ে চিঁড়ে দেয় খেতে, সে সব খেতে খেতে মুখ পচে গেছে। তার চেয়ে চালভাজা অনেক স্বাদু আর কুড়মুড়ে। বাজিতপুর থেকে ওদের ঘরে ধান আর চালের বস্তা আসে, আমি দেখেছি। ঠাকমা বালিখোলায় খই ভাজে, মুড়ি বানায়, চালভাজা বানায়। আমার মুড়ি খেতে খুব ভালো লাগে, চালভাজায় আরো বেশি স্বাদ। আমি দৌড়ে
হাঁপাতে হাঁপাতে ওদের রান্নাঘরের দালানে বসে চালভাজার বাটি হাতে নিয়ে বললাম, 'ও ঠাকমা, জানো, ইন্নান বোডে কত লোক এসেছে। কাল সন্ধ্যেবেলা তো ছিলোনা। এই লম্বা লম্বা দাড়ি ওদের। কারা গো ওরা? এখানে কেন এসেছে?'
ঠাকমা চুপ করে রইলেন, মুখটা বিরক্তি মাখা।
'ও ঠাকমা, বলোনা, ওরা কারা? তুমি দেখেছো?'
'দেখেছি, দেখেছি। ওরা মুসলমান'।
'মুসলমান কী গো ঠাকমা?'
'পাকিস্তানের লোক'।
'ও। পাকিস্তান কোথায় ঠাকমা? ওখানকার লোক এখানে এসেছে কেন? বলোনা'।
'জানিনা। তোর বাবা মাস্টার, বাবাকে জিগ্যেস করিস। এখন খা, খেয়ে পড়তে বোস'।

বাবা টিউশানির ছাত্রছাত্রী পড়াচ্ছে, তাকে এখন এসব নিয়ে বিরক্ত করা যাবে না। মা উনুন ধরাচ্ছে ফুঁ দিয়ে দিয়ে, সাদা সাদা ধোঁয়া উঠছে, ধরে গেলে ধোঁয়া চলে যাবে, তারপরে রান্না হবে, বাবা ভাত খেয়ে ইস্কুলে যাবে, মা-র হাতে এখন একদম সময় নেই। আমি বই নিয়ে পড়তে বসলাম ঠিকই, কিন্তু পড়ায় মন নেই। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাইরে ইউনিয়ন বোর্ডের মাঠে লোকগুলো ত্রিপল খাটাচ্ছে। সার্কাস পার্টি নাকি? সার্কাসের জন্যে তো অনেক বড়ো মাঠ লাগে, ইস্কুলের মাঠের মত। এই মাঠে তো বেশি লোক ধরবে না। ঠাকমা যে বললো এরা মুসলমান। সেটা কী?

সারাদিন প্রশ্নটা মনের মধ্যে ঘুরঘুর করতে লাগলো। সন্ধ্যেবেলা শ্যামলকাকু্র সাথে বারান্দায় দ্যাখা হতেই পাকড়াও করলাম। সামনেই রাস্তার ওপারে ইউনিয়ন বোর্ডে তখন অনেকগুলো ছাউনি পড়ে গেছে। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম, 'শ্যামলকাকু, ওখানে যে লোকগুলো এসেছে তারা কে গো? ঠাকমা বললো ওরা নাকি মুসলমান, পাকিস্তানের লোক'।
'হুঁ', শ্যামলকাকু মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললেন, 'ঠাকমা অনেকটা ঠিকই বলেছেন মিঠুবাবু। তবে এখন আর ওটা পাকিস্তান না, বাংলাদেশ'।
'বাংলাদেশ কোথায় কাকু? আমাদের এই দেশটা বাংলাদেশ না? আমাদের ইস্কুলে যে প্রেয়ারে গান হয়, বাংলার মাটি, বাংলার জল?'
'হুম। গানটা জানো কে লিখেছেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যখন লিখেছিলেন, তখন একটাই বাংলা ছিল। এখন দুটো ভাগ হয়ে গেছে। একটা বাংলাদেশ, আর একটা, মানে আমাদেরটা পশ্চিমবঙ্গ, ওয়েষ্ট বেঙ্গল'।
'কেন ভাগ হয়ে গেছে কাকু? কে ভাগ করলো? ওরা কেন মুসলমান? দাড়ি আছে বলে? আমরা কেন মুসলমান না? আমার বাবা যে দাড়ি কাটে রেজার দিয়ে, না কাটলে কি বাবাও মুসলমান হয়ে যাবে? তুমি যে বললে এখন আর পাকিস্তান নেই, বাংলাদেশ, কখন পাকিস্তান ছিল?'
আমার প্রশ্নের শেষ নেই। একটা প্রশ্ন করে থেমে যাওয়ার পাত্র আমি নই। এক সময়ে যতগুলো প্রশ্ন আমার মাথায় আসবে সবগুলো হড়হড় করে বমি না করে দিলে আমার শান্তি হয় না। মা, ঠাকমা, যমুনা কাকিমা, ফুটিপিসি কেউ আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে চায় না, সবাই বলে, থাম তো বাপু, মেলা বকাস নে।

আমার ভরসা হল বাবা, বাবার অগাধ ধৈর্য। আর শ্যামলকাকু। কাকু তো শুধু প্রশ্নের উত্তর দেন সব হাসিমুখে, তাই নয়, তার সঙ্গে গিয়েগার গল্পও শোনান। কিছুদিন আগে আমাকে লাল রঙের একটা তিনচাকার সাইকেল কিনে দিয়েছেন, সামনে প্যাডেল, সেটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমি বাড়িময় ঘুরে বেড়াই। অঞ্জলিকাকিমার শরীর খারাপ। মা বলছিল ওদের ঘরে নাকি আমার একটা ভাই আসবে।
আমি আবার বলে উঠলাম, 'বলো না কাকু, পাকিস্তান কী করে বাংলাদেশ হয়ে গেল?'
কাকু বললেন, 'ভুলে গেলে মিঠুবাবু, সেই একদিন আমরা রাত্রিবেলা এখানে বসে গল্প করছিলাম। আর মোটরসাইকেলে করে একটা লোক মাইকে ঘোষণা করতে করতে চলে গেল' ...

বিদ্যুৎ চমকের মত আমার মনে পড়ে গেল সেই ঘটনা। তখনো আমার ইস্কুলে যাওয়া শুরু হয়নি। রাত্রে বারান্দায় বসে শ্যামলকাকুর গিয়েগার গল্প শুনছিলাম। অনেকেই তখন শুয়ে পড়েছে, পাড়াঘরে লোকজন বেশি রাত অবধি তো জেগে থাকে না। চারিদিক শুনশান। রাস্তায় বাতি জ্বলছে টিমটিম করে। এদিক ওদিক দু একটা নেড়িকুত্তার কুঁই কুঁই বা ঘেউ ঘেউ ছাড়া কোন শব্দ নেই। লাস্ট বাস চলে গেছে। হঠাৎ রাস্তার আলো ঝুপ করে নিভে গেল। আর একটু পরে দূর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এল। আওয়াজটা ক্রমেই বাড়তে থাকল, আর বুঝতে পারলাম মাইক নিয়ে কে একটা ঘোষণা করতে করতে এগিয়ে আসছে। খুব দ্রুত আওয়াজটা জোর হয়ে কাছে এসে গেল, আবার আস্তে হয়ে দূরেও চলে গেল। মোটরবাইকে মনে হল দুটো লোক, একজনের হাতে লাউডস্পীকারের মত একটা চোঙা, সে শুধু বলে চলেছে, লাইট নিভিয়ে দিন, লাইট নিভিয়ে দিন, লাইট নিভিয়ে দিন।

আমাদের গল্প বন্ধ হয়ে গেল। শ্যামলকাকু বললেন, 'চলো মিঠুবাবু, আমরা ঘরে গিয়ে আজ শুয়ে পড়ি। গল্পের বাকিটুকু কালকে হবে'।
আমার তো উঠে যাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই। গল্প ছেড়ে উঠে যাওয়া যায় নাকি? কিন্তু শ্যামলকাকু উঠে চলে গেলেন আমাকে আমাদের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে। পরদিন সন্ধ্যে থেকে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে দেখি ঘটাং ঘটাং শব্দ করে বিচিত্র সব যানবাহন যাচ্ছে। গোল গোল চাকাগুলো রবারের না, সেগুলোকে ঘিরে সাইকেলের চেনের মত দেখতে কিন্তু অনেক চওড়া বেল্ট। ঐ বেল্টগুলোই রাস্তার ওপরে ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে আর গাড়িগুলো এগিয়ে যাচ্ছে, চাকাগুলো মাটি স্পর্শও করছে না।
সেদিন সন্ধ্যে থেকেই সব ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। আমি শ্যামলকাকুর ঘরে এসে গেছি গল্পের বাকিটুকু শোনার জন্যে। জিগ্যেস করলাম, কাকু, কী হয়েছে বলোতো আজ?
কাকু বললেন, 'যুদ্ধ লেগে গ্যাছে। দেখলে না, রাস্তা দিয়ে ট্যাঙ্ক যাচ্ছে'।
'ট্যাঙ্ক কোথায় যাচ্ছে কাকু? কোথায় যুদ্ধ? ওর মধ্যে কারা আছে?'
'ওর মধ্যে আছে সৈন্য। ওরাই তো যাচ্ছে যুদ্ধ করতে। শত্রুরা যাতে জানতে না পারে যে ওরা এই পথ দিয়ে যাচ্ছে, তাই কাল বলে গেল, লাইট নেভাও। লাইটে তো ওরা দেখে ফেলতে পারে, তাই না?'
আমার কাছে তখন যুদ্ধ মানেই রামায়ণ-মহাভারত। আমি শ্যামলকাকুকে জিজ্ঞেস করলাম, 'কার সাথে কার যুদ্ধ কাকু? ওদের কত অক্ষৌহিণী সৈন্য আছে? বাঁদরও আছে নাকি? কদিন আগে মা বড়ি শুকাতে দিয়েছিল রোদে, জানো কতগুলো বাঁদর এসে খেয়ে গেছে, ওরা কেন যুদ্ধে যাচ্ছে না?'
কাকু বললেন, 'না, এটা তো পুরাণের গল্পের মত যুদ্ধ না। তোমাকে নেতাজী সুভাষের গল্প বললাম যে সেদিন। সেই যে নেতাজী ছদ্মবেশ ধরে দেশ থেকে বিদেশ চলে গেলেন, তারপর বিদেশ থেকে সৈন্যবাহিনী নিয়ে এসে ব্রিটিশের সঙ্গে যুদ্ধ করলেন, এটাও সেই রকম স্বাধীনতার যুদ্ধ। আমাদের পাশের যে দেশ, ওখানকার মানুষেরা চায় স্বাধীনতা। তাই তারা যুদ্ধ করছে'।

... সেই ঘটনা, সেই পুরনো সংলাপ, মাত্র এক দেড় বছরের পুরনো, আমার সব মনে পড়ে গেল। আমি বললাম, 'ও, সেই ট্রাঙ্ক দিয়ে যুদ্ধ করলো ওরা, আর তারপর জিতে গিয়ে স্বাধীন হয়ে ওরা বাংলাদেশ হয়ে গেল?'
'হুম, ঠিক। তবে ট্রাঙ্ক না, ওগুলোকে বলে ট্যাঙ্ক'।
'ওহো, তাই তো। ট্রাঙ্ক মানে তো হাতির শুঁড়, না কাকু? তো ঐ বাংলাদেশের মানুষ এখানে কেন এসেছে?'
'কেন এসেছে, তা তো জানি না মিঠুবাবু। যুদ্ধে তো শুধু সৈন্যরাই মারা যায় না, অনেক নিরীহ মানুষও মারা যায়। ওদেরও হয়তো কেউ কেউ মারা গেছে। হয়তো তারাই চাষবাস বা চাকরি বাকরি করত। তাছাড়া রেডিওতে শুনেছ নিশ্চয় যে, আমাদের এখানে যখন ঝড় তুফান হয়, অনেক সময় ওখানে সেগুলো আরো বড়ো আকারে হয়। অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয় মানুষের। তখন জীবনধারণের জন্যে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় উঠে যেতেই হয়। এই যে আমরা, তোমার বাবা, আমি আমরাও তো বড়ো হয়েছি অন্য জায়গায়, এখন চাকরির জন্যে এখানে চলে এসেছি। আমাদের বাবা মা-রা তো কেউ এখানে থাকেন নি'।

কেন জানি না, আমাদের সঙ্গে ওদের আমি ঠিক মেলাতে পারলাম না। সারাদিন রোদের মধ্যে ওরা ত্রিপল টাঙাচ্ছিল। মেয়েরাও ছিল ওদের মধ্যে, অজন্তা কুঠির গায়ে হেলান দিয়ে বসে। সঙ্গে অনেকগুলো বাচ্চাও। শ্যামলকাকু ওরকম করে রোদের মধ্যে ত্রিপল টাঙাতে পারবেন? অঞ্জলিকাকিমা ঐভাবে মাঠের মধ্যে পা ছড়িয়ে বসে, যাঃ, হতেই পারে না। আমার মা যেখানে সেখানে বসে পড়তে পারে, একগাদা গোবর হাত দিয়ে চটকায়, কিন্তু অঞ্জলিকাকিমা অনেক অন্যরকম। ওদের ঘরে বিছানাটা কী পরিপাটি। অঞ্জলিকাকিমা স্নো মাখেন, তা থেকে কী সুন্দর গন্ধ বেরোয়।

মাঠ জবরদখল হয়ে যাওয়ায় পাড়ার বাচ্চাকাচ্চাদের মাথায় হাত। ডাঙ্গুলি খেলার জায়গা নেই। মাঠের মধ্যে সাত আটটা ছাউনি, তার মধ্যে গাদা গুচ্ছের লোক। কে যেন মাকে বলছিল, 'আর বলবেন না বৌদি, হেগে মুতে ছিরকুট করে রেখেছে'।

আমাদের প্রাইমারী স্কুলে ক্লাশ ওয়ান আর টু সকালে ক্লাশ হয়, ওদের ছুটি হয়ে গেলে থ্রী-ফোর। আমি স্কুলে যাই বাবা চলে যাওয়ার অনেক পরে। সপ্তাখানেক পর একদিন সকালে বাবা বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে, রাস্তায় চার-পাঁচটা পুলিশ। ওদের সঙ্গে কথা বলছে একটা সবুজ লুঙি পরা লোক, তার লম্বা দাড়ি। নিশ্চয় ইউনিয়ন বোর্ডে যারা আস্তানা গেড়েছে, তাদের কেউ। লোকটা পুলিশকে কিছু বললো, আর পুলিশটা একটা ডান্ডা দিয়ে ফটাস করে ওর মাথায় মারলো। লোকটা মাথা চেপে বসে পড়লো মাটিতে, আর পুলিশটা ওর পেটে মারলো এক লাথি। আমি দূর থেকে ওর করুণ আর্তনাদ শুনতে পেলাম।
একা একা আমার বাইরে যাওয়া বারণ, আমি দৌড়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে মাকে খুঁজতে লাগলাম। কোথাও খুঁজে না পেয়ে গেলাম পাশের ঘরে। শ্যামলকাকু কলেজে চলে গেছেন, অঞ্জলিকাকিমা শুয়ে। ওকে ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে না ভেবে ভেতর বাড়িতে গিয়ে দেখতে পেলাম বাড়িওয়ালা দাদুকে। 'ও দাদু, শীগগির দেখবে চলো, পুলিশে একটা মুসলমান লোককে কী মার মারছে। ঐ যে মাঠে যারা এসেছে, ওদের লোক। ওকে কেন মারছে দাদু, ও কী করেছে? তুমি যাও না, পুলিশটাকে বলো না ওকে না মারতে। ও দাদু...'
'আমি জানি না দাদুভাই ও কী করেছে। আমার কথা কি পুলিশ শুনবে? শুনবে না'।

দাদু আমার কথা শুনেও উঠলো না। আমি আবার ফিরে এলাম আমার ঘরের জানলার কাছে। এর মধ্যেই পুলিশগুলো চলে গেছে গাড়ি নিয়ে। মাটিতে পড়ে কাতরানো সেই লুঙিপরা লোকটাকেও আর দেখতে পেলাম না।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ইউনিয়ন বোর্ডের মাঠ ফাঁকা। একটা মানুষও নেই, নেই একটা ত্রিপলও। যে রকম ভোজবাজির মত ওরা এসে হাজির হয়েছিল, সে রকমই যেন উবে গেছে দৃশ্যপট থেকে।

এই যে একটু আগে আমাদের গ্রাম মাজদিয়াকে অজ পাড়াগাঁ বললাম, এটা নিতান্তই বাড়িয়ে বলা। পারিপার্শ্বিক আর গ্রামগুলোর তুলনায় মাজদিয়া বেশ বর্ধিষ্ণু জনপদ। ট্রেনে চেপে সোজা কলকাতা চলে যাওয়া যায়। যদিও আমাদের এখানে কয়লার ইঞ্জিনের ট্রেন, ঢিকুস ঢিকুস করতে করতে চলে আর কথায় কথায় দাঁড়িয়ে পড়ে, তবু কোনোমতে রাণাঘাট পেরোলেই ইলেক্ট্রিক, আর হুশ করে আর দু'ঘন্টায় শিয়ালদা। আমি অবশ্য ট্রেনে তখনো বেশিদূর যাইনি, বাবা মা-র
সঙ্গে রাণাঘাট হয়ে একবারই গেছি তাহেরপুর, সেখানে জ্যাঠামশাই আর ছোটকাকা থাকে। কিন্তু জিতেনকাকু কলকাতার কাছেই কোথায় চাকরি করেন, উনি তো রোজ সকালে উঠে ট্রেনে করে যান, রাত্রে বাড়ি ফেরেন। বাবা বলছিল, ইংরেজরা প্রথম ভারতবর্ষে যে রেললাইন পাতে, সেটা ছিল বোম্বে থেকে পুনা, আর দ্বিতীয়টাই আমাদের এইটা। ফরাক্কায় গঙ্গার ওপর ব্রিজ বানানোর আগে উত্তরবঙ্গমুখী সব ট্রেন এই লাইন দিয়েই যেত। আমার জন্মের কাছাকাছি কোন সময়ে দার্জিলিং মেল আর ঢাকা মেল একই লাইনে এসে প্রবল অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল মাজদিয়াতেই, বহু লোক মারা গেছিল, সে কাহিনী অনেকেই জানে। পরে জেনেছি এই ট্রেনপথে রবীন্দ্রনাথও গেছেন, তাঁর 'নৌকাডুবি' উপন্যাসে বগুলা ষ্টেশনের কথা লেখা আছে। মাজদিয়ার পরের প্ল্যাটফর্মওয়ালা ষ্টেশনই তো বগুলা। 'আসামী হাজির', 'সাহেব বিবি গোলাম' খ্যাত ঔপন্যাসিক বিমল মিত্রের পৈতৃক ভিটেবাড়ি কাছেই ভাজনঘাট গ্রামে, উনি এই ট্রেনে যাতায়াত করতেন, আর বাড়ি ফেরার পথে ষ্টেশনের কাছে ভীমের দোকানের সন্দেশ খেতেন, লেখা আছে তার লেখা গল্পেই। ভীমের দোকান থেকে তো বাবাও মিষ্টি কেনে।

আর এই বাস চলার জন্যে যশোর রোড। আমাদের বাড়ির সামনে থেকে বাস ধরলে চলে যাওয়া যায় কৃষ্ণনগর, সেখানে আমার মামার বাড়ি। পুজো আর গরমের ছুটিতে সেখানেই যাওয়া। তারপর প্রাইমারী স্কুল আছে, যেখানে আমি পড়ি। হাই স্কুল আছে তার পাশেই, ইংরেজ আমলে বানানো, সেখানে বাবা পড়ায়। একটা কলেজ আছে, শ্যামলকাকু-মানসকাকু সেখানে অধ্যাপক। রেল ষ্টেশনের কাছে একটা সিনেমাহল, তার নাম চিত্রবাণী, সেখানে সিনেমা দেখা যায়, দিনে তিনটে শো। নতুন সিনেমা এলেই রিকশা করে একটা লোক মাইক হাতে বলতে বলতে যায়, আজ থেকে চিত্রবাণী সিনেমার রূপালি পর্দায় সগৌরবে চলিতেছে নাচে-গানে ভরপুর অশ্রুসজল সামাজিক ছবি চাওয়া পাওয়া। শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেছেন মহানায়ক উত্তমকুমার ও সুন্দরী অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। অন্যান্য মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন বিকাশ রায়, জহর রায়, কালী ব্যানার্জী, পাহাড়ী সান্যাল ও আরো অনেকে। নৃত্যে বোম্বের অতিথি শিল্পী মিস জোজো। এই 'মিস জোজো'টা দুবার বলতো। আর বাকি সব চলিত ভাষায় বললেও 'চলিতেছে'টা সাধুভাষা। রাস্তা দিয়ে চলে যেত সেই রিকশা, বারোটা-তিনটে, তিনটে-ছ'টা, ছ'টা-ন'টায় শো বলতে বলতে। তার পেছনে ছুটে ছুটে যেত একগাদা কাচ্চাবাচ্চার দল।

তাহেরপুরে সেই যে জ্যাঠামশাই আর কাকার বাড়ি গেছিলাম, সে তুলনায় আমাদের মাজদিয়া তো স্বর্গ। সেখানে কিছুই নেই এসব, পাকা রাস্তাও নেই। আমাদের অনেকটা রাস্তা গরুর গাড়িতে যেতে হয়েছিল। আমাদের এখানে রিকশা চলে। শুধু ডাক্তার-বদ্যির যা অভাব। ইস্কুলের কাছে একটা হোমিওপ্যাথি ডাক্তারখানা, সেখানে মা আমাকে নিয়ে যায় শরীর খারাপ হলে। ঐ ডাক্তারটা মাকে 'মা' বলে ডাকেন, আর আমার হাতের নাড়ি টিপে ধরে চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ ধরে দ্যাখেন। তারপর একটা সুটকেসের মত বাক্স খুলে ওষুধ বের করে কয়েকটা গুলির পুরিয়া বানিয়ে মার হাতে দ্যান। রেলষ্টেশন পেরিয়ে আর একটু গেলে ননী লাহিড়ীর ডাক্তারখানা, উনিই একমাত্র অ্যালোপ্যাথি ডাক্তার এ অঞ্চলে। খুব রাশভারি লোক, কথায় কথায় রোগীদের গালমন্দ করেন। আমি দু'একবার গেছি, বোতল নিয়ে যেতে হয় ওখানে। উনি মিকচার বানিয়ে বোতলে ঢেলে দেন, আর গঁদের আঠা দিয়ে বোতলের গায়ে একটা খাঁজকাটা কাগজ সেঁটে দেন। ওই কাগজের খাঁজ অনুযায়ী এক একবারে এক এক দাগ খেতে হবে। কেমন বোঁটকা গন্ধ ওর ওষুধে, আর ভীষণ তেতো। আমার একটুও ভাল লাগেনা অ্যালোপ্যাথি ওষুধ খেতে। এর চেয়ে হোমিওপ্যাথির গুলি অনেক ভালো।

সকালে ছাত্র পড়িয়ে বাবা যখন খেতে বসে, আমিও বাবার পাশেই বসে পড়ি। বাবা চটপট খেয়ে স্কুলে চলে যায়, আমার ততক্ষণে দু তিন গ্রাস মাত্র ভাত মুখে উঠেছে। বাবা স্কুল চলে গেলে বাবার পাতেই মা খেতে বসে যায়। মা'র খাওয়া শেষ হয়ে গেলেও আমার তখনো প্রায় সবই পাতে পড়ে। আমাকে খাওয়ানো নিয়ে মা নাজেহাল হয়ে যায়। কিন্তু যত সময়ই লাগুক, খাবার নষ্ট করা চলবে না, সব শেষ করে আমাকে তবে উঠতে হবে।

বাড়ির বাইরে অবশ্য আমার চেহারা একটু অন্যরকম। যশোর রোডে বাস চললেও খুব ঘনঘন নয়। একটা বাস চলে গেলে পরেরটা অন্তত আধঘন্টা পরে। সাইকেল আর রিকশাই বেশি, তবে বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার জন্যে কখনোই বিপজ্জনক নয়। আমি প্রথম প্রথম অন্য কারো সঙ্গে একসাথে যেতাম। ছোটি পরীক্ষায় ফেল করে এখনো নীচু ক্লাশে পড়ে, ওদের স্কুল সকালে। আমারটা পরে শুরু হয়, আমি একা একাই চলে যেতে পারি। পায়ে যে চটি পরে স্কুলে যাই, সেটার একপাটি পা দিয়ে ছুঁড়ে দিই আগে। হেঁটে সেটার কাছে পৌঁছে গেলে সেটা পরে নিয়ে অন্য পাটিটা একই রকমভাবে ছুঁড়ে দিই। ফলে একপাটি চটি সবসময় আমার আগে আগে চলে। এই রকম যেতে যেতে কখনো সেটা পড়ে যায় রাস্তার কোন জল জমা গর্তে, বা কাদায়। রাস্তায় ঘষা লেগে ছিঁড়েও যায়। চারমাসে তিনবার চটি পালটানো হয়ে গেল। মা আর কত চটি কিনে দেবে? আমি এর পর থেকে খালি পায়েই স্কুলে যেতে লাগলাম।

এক এক দিন স্কুলে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আমার মনে পড়ে যেত, কোন একটা হোমটাস্ক করা হয়নি। তখন আর করার সময়ও নেই। আমি কেঁদে বাড়ি মাথায় করতাম। স্কুলে না যাওয়ার বাহানা শুরু হয়ে যেত। মা কিন্তু এ ব্যাপারে ভয়ঙ্কর কঠোর, যাই করো, স্কুলে যেতেই হবে। আমি মা'কে টানতে টানতে নিয়ে যেতাম সেদিন, স্যারকে বলে দেওয়ার জন্যে, যে আমার হোমটাস্ক হয়নি। কোন দরকার ছিল না, প্রাইমারীতে আমার মেধার জন্যে না হলেও চেহারার জন্যে গায়ে কেউ হাত তুলতেন না। তবুও এ রকম মাঝে মাঝেই হত।

কারো সাথে মিশতে পারতাম না, সবাইকে ক্লাশে কানমলা দিতে হত, ফলতঃ আমার কোনো বন্ধু ছিল না। ক্লাশের পান্ডা বরুণ, সে অলরেডি বার দুয়েক ফেল করে ক্লাশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে, আমাকে একদিন বললো, ভগবান দেখবি?

ইউনিয়ন বোর্ডের মাঠে দুর্গাপুজো-কালীপুজো হয়, কিন্তু এখন তো পুজোর সময় নয়। আমি বরুণকে বললাম, এখন কী পুজো?
বরুণ বললো, 'পুজো না। আমি জানি, কী করে ভগবান দেখা যায়। দেখবি?'
'দ্যাখা'।

'এখানে কোথায় দ্যাখাবো? ইস্কুলে ভগবান দ্যাখা যায় নাকি? আর সবার সামনে ভগবান কখনো আসে না। শোন, বাড়িতে এক নিরিবিলি জায়গায় চুপিচুপি যাবি যেখানে কেউ দেখতে না পায়। একটা শুকনো গামছা নিবি সঙ্গে। তারপর ঐখানে গিয়ে ওই গামছাটা দিয়ে একশো আটবার কপালে ঘষবি, আর প্রতিবার 'হরেকৃষ্ণ হরেরাম, দ্যাখা দাও ভগবান' এইটা বলবি। বুঝলি? ভালো করে চেপে ঘষতে হবে'।
'তাহলে কী হবে?'
'তোর কপালে একটা চোখ খুলে যাবে, সেটা দিয়ে ভগবান দেখতে পাবি। কী বলতে হবে মনে থাকবে?'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ'। আমি মনে মনে শ্লোকটা একবার স্মরণ করে নিলাম। এর চেয়ে কত বড় বড় পদ্য আমি গড়গড়িয়ে বলতে পারি আমি। বীরপুরুষ মুখস্ত। আর এই একলাইন মনে রাখতে পারবো না? এরা পারে না বলেই তো আমার কাছে কানমলা খায়।
'কতবার বলবি, মনে আছে?'
'একশো আটবার'।

আমার তৃতীয় নয়ন দেখে মা শিউরে উঠলো। 'এটা কী করে হল? পড়ে গেছিলি কোথাও?'

একশো আটবার ঘষে কপাল ছিঁড়ে যাবার পর আমি চোখে সর্ষেফুল দেখলাম, কিন্তু ওটাকে ভগবান বলে মেনে নিতে পারিনি। তাই ভাবছিলাম গুণতিতে কি ভুল হল? মন্ত্র তো ঠিকই বলেছি, ওই সামান্য পাঁচটা শব্দ, ওর আর কী ভুল হবে। তাই আরো বার পঁচিশেক এক্সট্রা ঘষে যখন দেখলাম আর ঘষা যাচ্ছে না মোটেই, গামছাটা ছোঁয়ালেই ভীষণ ব্যথা লাগছে, তখন রণে ভঙ্গ দিলাম। ততক্ষণে বুঝে গেছি বরুণ আমায় ঠকিয়েছে। কিন্তু মাকে তো আর বলা যায়না আমি ঠকেছি।

মা কিন্তু ডিটেকটিভ। আমার মুখ থেকে কী করে কথা টেনে বের করতে হয়, তার পুরো ফর্মুলা মা'র জানা। ফলে গড়গড় করে সব বলে ফেলতেই হল। মায় সেই অকুস্থলের কথা, যেখানে গিয়ে কম্মোটি করেছি। খুকুদের ঘরের সিঁড়ির নীচে কয়লার গাদা থাকে, ওখানে সকালে ছাড়া কেউ যায় না। ওটাকেই উপযুক্ত মনে হয়েছিল আমার।
কপালে দগদগে ঘা হয়ে গেল। যমুনা কাকিমা গরম জলে ধুয়ে অ্যান্টিব্যাক্ট্রিন লাগিয়ে দিতেন বেশ কিছু দিন।

এর পর বরুণকে কানমলা দিতে হলে আমি বেশ জোরে জোরে দিতাম। ওর অবশ্য তাতে কিছু যেত আসতো না। ততদিনে ও ঐ ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু অন্ততঃ কিছুটা অপমান যে হত, সেটা জানতে পারলাম আরো মাস ছয়েক পরে।

দুষ্টুবুদ্ধি থাকলেও বরুণের ক্রিয়েটিভিটি কম। স্কুলে ও আবার আমাকে ফাঁদে ফেলার জন্যে বললো, 'ভগবান দেখবি?'

আমি কি আর সেই ফাঁদে পড়ি? বললাম, 'শুকনো গামছা দিয়ে একশো আট বার ঘষা তো? নাঃ, তুই দ্যাখ'।

'না রে, ওটা না। ওটা তো একটা ঠাট্টা ছিল। তুই করেছিলি নাকি? দেখি দেখি, ও এই তো, তোর কপালে দাগ। আরে, আমি তো তখন ঠাট্টা করেছিলাম'।
'তাহলে? কী করলে ভগবান দ্যাখা যায়? বাড়িতে নিরিবিলি জায়গা খুঁজে ছুরি দিয়ে হাত কাটলে?'

'না, না, ওসব কিছু করতে হবে না। এতো কষ্ট না। আমি এখানেই দ্যাখাতে পারি'।

'তো দ্যাখা'।

বরুণ ওর দু'হাত দিয়ে আমার দু'হাত ধরে দু'তিনবার আস্তে আস্তে ঘুরপাক খেলো। তারপর স্পীড বাড়িয়ে আমাকে জোরে বাঁইবাঁই করে ঘুরাতে লাগলো। আমার পা দুটো শূন্যে উঠে গেল। এভাবে দশ বারো বা তারো বেশি রাউন্ড ঘুরিয়ে ও হঠাৎ আমার হাত দিলো ছেড়ে। আমি দূরে গিয়ে ছিটকে পড়লাম। একটা পাথরের টুকরোয় আমার মাথাটা ঠুকে গেল। আশেপাশে সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে আমাকে মাটি থেকে তুলতে ছুটে এলো। মাথায় হাত দিয়ে যেই দেখলো টপটপ করে রক্ত পড়ছে, অমনি সব পগার পার।

মা সন্ধ্যেবেলায় ব্যান্ডেজ বাঁধা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো, 'তুই এত বোকা কেন রে মিঠু? এত যে পড়া পারিস, সবাই তোর কত প্রশংসা করে, আর তুই বোকার মত ভগবান দেখতে যাস বারে বারে। যে যা বলে তাই বিশ্বাস করে ঠকিস'।

আমার জ্বর এসে গেছিলো। শরীরের কিছু বেকায়দা হলেই আমার জ্বর এসে যায়। মাথায় প্রবল ব্যথা। কপাল দপদপ করছে। তার মধ্যে মা'র ঐ কথা আমার কানে দৈববাণীর মত লাগলো। আমি দুটো জিনিষ হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছি এতদিনে। ভগবান বলে কিছু নেই, সব ধোঁকা। আর মা ঠিক বলেছে। আমি অন্যের কথা শুনে আর কিছুতেই চলবো না। যে যা বলে বলুক, আমি আমার যা ঠিক মনে হবে, তাই করবো এখন থেকে।