মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১২

ভূত ~ অমিতাভ প্রামানিক

শহরে থাকার এক সমস্যা হচ্ছে, অন্ধকার ঠিকমতো উপলব্ধি করা যায় না। নিকষ কালো ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, যেখানে চোখ খুলে রাখা আর বন্ধ রাখার মধ্যে কোন তফাৎ নেই, তার এক আলাদা সৌন্দর্য আছে। এখানে মাঝরাতেও কোত্থেকে একফালি আলো হানা দেয় আঁধারের রাজত্বে, আর তার সেই অধরা মাধুরীর ছন্দ-লয়-তাল কেটে খানখান হয়ে যায়।
যখন ক্লাশ ইলেভেনে পড়তাম, আমাদের স্কুলের শিক্ষক নিতাইবাবুর কাছে রাত্রে অঙ্ক শিখতে যেতাম। আমাদের বাড়ি থেকে স্য
ারের বাড়ি খুব কাছে নয়, আবার খুব দূরেও নয়। একটা হ্যারিকেন আর বই-খাতা সঙ্গে থাকত। আর বর্ষার সময় একটা ছাতা। আমাদের বাড়ি থেকে শুরু করে কিছুদূর গেলে পাড়া শেষ, মানে ঘরবাড়ি নেই, সরু কাঁচা রাস্তা ধরে পেরোতে হত একটা ঘন বাঁশ-জঙ্গল, তার পরে একদিকে ফাঁকা মাঠ, অন্যদিকে একটা পুকুর, সেটা পেরিয়ে গেলে একপাশে একটা পুরনো ইঁটভাটা আর অন্যপাশে একটা গরুর ভাগাড়, যেখানে মাঝেমধ্যে মরা গরু পড়ে থাকত আর একগাদা হুঁদো হুঁদো চেহারার শকুন আর কুকুর তাদের ক্ষুন্নিবৃত্তি করত সেই অবশেষ থেকে। এইগুলো পেরিয়ে গেলে আর একটা পাড়া এসে যেত, আর একটা বড় রাস্তা, সেটা ধরে কিছুটা গেলেই স্যারের বাড়ি।

ঐ পুকুরটাতে পাড়ার দু'একটা বাচ্চা ছেলে ডুবে মারা গেছে। ঐ বাঁশঝাড়ে নাকি মাঝে মাঝেই সাদা কাপড় পরা প্রেতিনীরা ঝুলে থাকে, অনেকেই বলত। খুব ছোটবেলা থেকে আমি ঈশ্বরে অবিশ্বাসী বলে এসবে পাত্তা দিই নি। বাদুড়ের মত এক ধরণের প্রাণী, আমরা বলতাম ভাম, বাঁশের মাথায় বসলে তার ভারে বাঁশ অনেকটা নুয়ে যায়। সেটা হুট করে উড়ে গেলে ফটাস করে বাঁশটা আবার সোজা হয়ে যায়, তাতে কারো ভয় পেয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। তাছাড়া আমি দেখেছি বেশ কিছু সাদা রঙের ঘুড়ি, তাদের কোনটার ইয়াব্বড় ল্যাজ, ঐ বাঁশঝাড়ের ডগায় লটকে আছে। পেত্নী না ছাই!

সেদিনও টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল, তার আগে কদিন তো তুমুল বৃষ্টি। রাত্রি দশটার আগে স্যার ছাড়তেন না, সেদিন কী মনে হতে সাড়ে ন'টাতেই ছেড়ে দিলেন। আর যারা পড়তে আসতো, তারা ঐ পাড়াতেই থাকে, ওরা চলে গেল। আমি আমার গলিতে ঢুকলাম। আমার এক হাতে হ্যারিকেন, তার কাঁচটা ইতিমধ্যে কালো হয়ে গেছে। অন্য হাতে অঙ্কখাতা, মোটা কেশব নাগ আর ছাতা। ভাগাড়টা পেরিয়েই বুঝতে পারলাম রাস্তায় কাদা প্রায় হাঁটু সমান হয়ে গেছে। পরণে পাজামা, সেটা হাঁটুর ওপর পর্যন্ত গোটানো, কিন্তু হতচ্ছাড়া মাঝে মাঝে ফস করে একটু নেমে যায়, তাই হ্যারিকেন ধরা হাতে সেটাও সামাল দিতে হচ্ছে। হাওয়াই চটিটা গেঁথে যাচ্ছে, কাদার সঙ্গে তার গলাগলি সম্পর্ক তো। বাধ্য হয়ে চটি খুলে হাতে নিতেই হল, কিন্তু হাত তো মাত্র দুটো।

একেবারে যাতে হাঁটু অবধি ডুবে না যাই, তাই রাস্তার একেবারে বাঁ সাইড ধরে আসছিলাম, ঢোলকলমীর বেড়া ধরে ধরে। হয়তো কাদার গভীরতা বিঘৎখানেক কম সেই দিকে। হঠাৎ বাঁ হাতটা গিয়ে পড়লো একটা কম্বলের মত নরম কিছুর ওপর, আর একটা তীব্র জ্বলুনি অনুভুত হতেই আমি ডানদিকে সেই থকথকে দইয়ের মত কর্দমশয্যায় পপাত ধরণীতল। 
ঢোলকলমীর রাজ্যে হঠাৎই এক হতভাগা সজনে গাছ, আর তার গায়ে বিশাল এশিয়ার ম্যাপের মত লাখখানেক শুঁয়োপোকার দঙ্গল। আমার হাত পড়েছে সেই বিভীষিকাময় রাজ্যে।

আমি উল্টাতেই টিমটিমে হ্যারিকেনটা দেহ রাখলো। অসম্ভব জ্বলুনির মধ্যে আমি টের পেলাম অনন্ত নরকের মত আমি এক অন্ধকার পাতালে শুয়ে আছি। ঘোর অমাবস্যা, আকাশে কালো মেঘ, ঢোলকলমীর পাতায় বৃষ্টি পড়ার শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। নিজের হাত পা-ও দেখা যাচ্ছে না।

কোনক্রমে উঠে দাঁড়ালাম। কোনদিকে হাঁটবো কিছুই বুঝতে পারছি না। আবার সেই শুঁয়োপোকার রাজ্যে অনুপ্রবেশের কোন বাসনা নেই। কিন্তু যাবো কোথায়? কীভাবে?
মিনিট দশেক চললো ট্রায়াল-এরর। তারপর দৈব অনুগ্রহেই হয়ত দেখতে পেলাম অনেক দূর থেকে একটা আলোর শিখা এগিয়ে আসছে। যাক, ভাগ্য ভালো। আলোটা অনেক কাছে এগিয়ে এলে আমি আওয়াজ দিলাম, কে? আমার দিকে এক পলক তাকালো সেই আলোকধারী, তারপর গঁ গঁ শব্দ করে কাদার বুকে লুটিয়ে পড়লো সে। আর তার ওই অবস্থা দেখে আমিও। আবার...

বাড়ি ফিরতে রাত্রি হয়েছিল অনেক। আমাকে দেখে কারো পক্ষে ভূত ভাবা মোটেও অসঙ্গত ছিল না। বিশেষতঃ যারা ভূত দেখেনি আগে। নিতাইবাবু এই ঘটনা জেনে এর পর থেকে আমাকে সকালের ব্যাচে আসতে বলে দিলেন।

অন্ধকারের করাল গ্রাসে না পড়লে আলোর মহিমা ঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। আমরা আলোতেই অভ্যস্ত, দিন হোক বা রাত। ঠিক এই মুহূর্তে আমি চাইছি একটা ঘন অন্ধকার পৃথিবী, না, দরজা-জানালা বন্ধ করা একটা কুঠরি নয়, আলোহীন একটা ঘুমন্ত প্রকৃতি। অন্ধ নাবিকের মত আমি তার বুকের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে চাই সারা রাত্রি ধরে, সূর্যোদয়ের পথে।