সোমবার, ২১ মে, ২০১২

পুলিশের পিটুনিতে মরে যাওয়া শিক্ষকের স্মারকলিপি ~ লুৎফর রহমান রিটন

মানুষের জয় হোক, ন্যায় হোক আর শুভ হোক।
আমি এক শিক্ষক, অতিশয় দরীদ্র লোক । 

চিরকাল শিখিয়েছি শুধু হয় সত্যের জয়
মানবের কাছে জানি দানবেরা মানে পরাজয়। 
শিখিয়েছি গুরুজনে চিরকাল দিতে সম্মান
শিখিয়েছি মানবতা নম্রতা মমতার গান।
মানবজন্ম বৃথা যদি তাঁর নাহি থাকে দান— 
শিখিয়েছি দেশ-মাটি-মানুষের কিসে কল্যাণ।

দারিদ্র্য আমাদের চেহারায় এঁকে দেয় ছাপ
পেশাটা মহান তবে এ পেশায় আসাটাও পাপ! 
তাইতো পাপের বোঝা আমাদের কাঁধে চেপে থাকে
নীতি আর আদর্শ আমাদের অনাহারে রাখে।

আমাদের পোশাকেও দারিদ্র্য উঁকি দিয়ে যায়
ছেঁড়া জুতো-স্যান্ডেলে দারিদ্র্য চেপে রাখা দায়!
স্মার্ট নই, বোকাসোকা, ভীতু খুব,শক্তিও কম
চিৎকার করবো যে সে সাহস নাই একদম।

চুপচাপ বেঁচে থাকি, চাওয়া-পাওয়া খুব বেশি নাই 
মানুষ গড়ার কাজ। মাস শেষে সামান্য পাই।
অভাবের দৈত্যটা গরিবের পেটে মারে ঘাঁই। 
কেউ খোঁজ নেয় না তো তিন বেলা খাই কি না খাই! 
একবেলা খেতে পাই! উপোসের আছে অভ্যেস। 
মানুষের ভালো হোক ভালো থাক এই প্রিয় দেশ।

প্রাইমারী শিক্ষক কম দামি খাটো হওয়া লাগে
সবার খাওয়ার পরে ছিটেফোঁটা আমাদের ভাগে!
যুগে যুগে কালে কালে আমরাই অভাবের বলী। 
ভাবলাম আর কতো! এইবার কিছু কথা বলি।
প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আমাদের কোনো গতি নাই 
জায়গা তো একটাই ভাবলাম সেখানেই যাই।
স্মারকপত্র লিখে 'হাসিনা'র কাছে দিয়ে আসি
বলে আসি—মা জননী তোমাকে যে কতো ভালোবাসি!
বিনিময়ে আমরাও সামান্য ভালোবাসা চাই
তা না হলে এজীবনে বাঁচবার কোনো আশা নাই।

অআকখ চিনিয়েছি এবিসিডি শিখিয়েছি যাঁরা
অবজ্ঞা অবহেলা অনাদর কেনো পাবে তাঁরা!
বিনিময়ে কেনো তাঁরা টেনে যাবে অভাবের ঘানি?
জবাব দেবে না কেউ জ্ঞানী আর সুশীলেরা জানি! 

আমার মতোই কিছু শিক্ষক অভাগার দল
ঢাকা এসে জড়ো হই হাতে নিয়ে শেষ সম্বল। 
শহীদ মিনারে এসে সব্বাই সমবেত হই
আমাদেরো দাবি আছে, আমরা আগন্তুক নই।

সামান্য কিছু দাবি মানবিক কিছু কথা লিখে
যাত্রাটা শুরু হলো পিএমের অফিসের দিকে। 
শান্তিপূর্ণ ছিলো আমাদের সেই সমাবেশ 
হইচই ভাঙচুর ছিলো নাকো হিংসার লেশ। 
আচমকা পুলিশের তাণ্ডবে কামানের জল
পথেই ছিটকে পড়ে অনাহারী দেহ দুর্বল!
পুলিশের ছেলেগুলো আমাদেরই প্রিয় সন্তান
শিক্ষক পিতাসম! তাঁহাকেই করে অপমান!
পুলিশের পিটুনিতে শিক্ষক কাঁদে লজ্জায় 
জীর্ণশীর্ণ দেহ রাজপথে গড়াগড়ি খায়!

নির্দয় লাঠিপেটা ভাঙাচোরা শরীরে কী সয়?
জখম আহত গায়ে রক্তের লাল ধারা বয়!
জামার কলার টেনে ঘাড় ধ'রে টানাহেঁচড়ায় 
আমাদের অপমানে রাষ্ট্রের কীইবা আসে যায়?

গরম কামানজল লাঠিপেটা সইতে না পেরে
অপমানে জর্জর অবশেষে গেছি আমি হেরে।
সামান্য শিক্ষক আজিজুর মরে গেছি, হায়-- 
লিখিত এ অভিযোগ পোস্ট করি কোন ঠিকানায়!
প্রধানমন্ত্রী মাগো তোমাকেই চিঠি লিখিলাম
একদিন আমরাই তোমাদের গুরু তো ছিলাম! 

আমাদের ছাত্ররা আছে কতো বড় বড় পদে। 
কেহই তো আসিলি না স্যারদের ঘোর এ বিপদে!
তোদেরকে পিটিয়েছি। বকাঝকা করেছি যে কতো! 
মানুষ হবি রে তোরা একদিন মানুষের মতো।
মানুষ হবি না তোরা? পড়া কেনো রেডি হয় নাই?
বেত দিয়ে পিটিয়েছি, মনে করে আজও ব্যথা পাই। 
আমাদের ছাত্ররা কেউ কেউ আজকে পুলিশ!
মানুষ হলি না তবে! গুরুদের গায়ে হাত দিস!

ক্ষমা করো ঈশ্বর আল্লা ও গড ভাগবান
ছেলেগুলো নাবালক নালায়েক অবুঝ নাদান। 
অভিশাপ দিচ্ছি না, প্রার্থনা করি দুই হাতে-- 
আমাদের ছাত্ররা থাকে যেনো দুধে আর ভাতে... 
অটোয়া ২০মে ২০১২