বুধবার, ৬ জুলাই, ২০১১

“এ মা, রাজা ন্যাংটা” – উলঙ্গ রাজা ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

বল্লে নাকি হুল দিবস। সেরেচে,  সে আবার কি গো? মেরে মুক পরোটা করে দেবে বল্লে, শুনিচি। কিলিয়ে কাঁটাল পাকাবে, সে ও নাহয় দেকিচি। তাই বলে ভাই হুল ফোঁটাবে? তুমি কি ভাই মৌমাচি? দেকে তো মানুষ বলেই ঠাওর হচ্চে। বেশ তেল চুকচুকে, পাকা সোনা বরন। একখানা নেয়াপাতি ইয়ে ও আচে দেকচি। গায়ে কি একটা মেকেচো বলোতো? পার্ক অ্যাভেনিউ কি? না কি কি ওই যে যেটা মাকলে কয়েকটা ধিঙ্গি মতো মেয়ে দৌড়ে আসে, সেইটে? না না, হুল টুল বড্ডো খারাপ কতা। সে ছিলো মেজোতরফের লাটু কত্তা। খেঁটে একগাছা লাঠি নিয়ে কত্ত পিটিয়েচে এককালে। গনা গুন্ডাকে তো সেবার হেদো পার করে দিয়ে এলো ওই লাঠি পেটা করে। তা সে লাটু কত্তাও হুল টুল নিয়ে কাজ কারবার করেনিকো।

 

কি বল্লে? সাঁওতালদের হুল? ও বাবা। ওদের হুল আচে নাকি? অ সেই হুল নেই বলচো? ওরা খেপে গেচিলো গোরাদের ওপর? তা সে তো আমাদের বটঠাকুদ্দাও গোরাদের ওপর খেপেগেছিলো। খেপে গিয়ে স্বদেশী হয়ে গেল। দেশের স্বাধীনতা এনেচে। এক গোরা সায়েব বটঠাকুদ্দা কে - ইউ ইস্টুপিড বলেছিলো। সে কি রাগ। রেগে মেগে ঠাকুদ্দা চরকা কিনে আনলো স্বদেশী মেলা থেকে। সুতো কাটলো, তাই দিয়ে গামচা বুনেও ফেল্লো। সেই গামচা একটু ফাঁকফাঁক বলে অনেক কিচু দেকা যেত, কিন্তু কে শুনবে সে কতা। ওই গামচা পরেই বটঠাকুদ্দা রোজ সক্কাল বেলা পায়...।

 

পিটিয়েচিলো? গোরাদের? ওই সাঁওতালরা? ও বাবা। পুলিস ধরবে তো? ফাটকে দেবে। আর সে কি যে সে ফাটক? গোরাদের জেলে কেউ ঢুকলে আর বেরোয়? ভয় ডর নেই গা? তা কেন গেল এমন খেপে? ইস্টুপিড বলেচিলো নাকি? কেনো মারামারি করে বাপু বুঝিনা। চরকা কেটেও তো স্বদেশী হয়। সেটা করলেই হতো। আর গোরাদের খেপানো কি সোজা কতা? গোরার মার সইতে পারবে? পারেনি? মরে গেচিল? অনেক লোক? তা তো যাবেই। যেমন কম্ম তেমনি ফল। বেশ হয়েচে। ও, হয়নি? ওই মারামারিটাই হুল? ওইটার দিবস? তা ভালো। চাঁদা চাই? বেশি দিতে পারবোনাকো। এই সেদিন দিয়েচি। ভোটে জিতে ফিস্টি কল্লে ছেলে গুলো। বল্লে কাকু ২ কিলো রেওয়াজি মাল আর এক খাম্বা বিলিতির দাম ফেলে দিন, আর আসবোনা। তা দিলাম। আবার চাই? বেশি দিতে পারবোনাকো বলে রাকলুম হ্যাঁ।

 

অ, চাঁদা চাই না? তা চাই টা কি? তুমি, মানে আপনি সরকারি আপিসার? ওরে বাবা। বলেন কি স্যার ? বসুন বসুন। কি খাবেন বলুন। একটু চা বলি? খাবেন না? তাহলে একটু ঠান্ডা? আর চাচা থেকে দু খানা কাটলেট আনাই? ওরে... কে আচিস? না না স্যার, না বল্লে শুনচি না। এ বাড়ি থেকে শুদু মুকে কেউ কখনো যায়নি। আগে একটু ঠান্ডা হোন। ওরে, ও জহর, পাকা টা জোরে করে দে না বাবা। দেকচিস নে, স্যারের মুক খানা লাল হয়ে গেচে গরমে। এ পাকা টা স্যার আমার জ্যাটামশায় কিনেচিলেন অকশনে। খাঁটি বিলিতি। কেবল একটু অয়েলিং করানো হয়নি অনেক দিন। আপনি ভালো করে উঠে বসুন স্যার। পা তুলে দিন।

 

ও কে ডাকবো? জহর কে? ও তো আমার চাকর। বহুকাল আচে এবাড়ি। ওর বাপ দাদারাও ছিলো। বাড়ি? তা থাকে তো এখানেই। মানে, দেশ আচে একটা। ওই পুরুলিয়ার ওদিকে কোতায় যেন। কিচু পবলেম নাকি স্যার? আমি ছাপোষা গেরস্ত মানুষ। ধনেপ্রানে মারা যাবো স্যার। না মানে, ওর নাম ই তো জহর। ডহর? না না, ডহর না স্যার। পদবি? ওর পদবি কি আর মনে রেকিচি আমি স্যার? ও মামনি, দেখ না মা, জহরের পদবি কি? স্যার জিজ্ঞেস করচেন। কি বললি? দাস? জহর দাস? ও, তা হবে। ডহর? না স্যার ডহর বলে তো কাউকে চিনি না। শুনিনি। ওই হুল এর একটা সাঁওতাল নেতা? একটা না? তিনটে নেতা? সিদো, কানহো আর ডহর? তিনজনেই শহিদ হয়েচিলো? বলেন কি স্যার? সে তো আমাদের বিনয় বাদল দিনেশের মতো ব্যাপার। ভারি সাহস তো। ও আপনি সেই ডহর বাবুর পরিবারের লোকজন কে খুঁজছেন? তারা কি স্যার কিচু পাবে সরকারের থেকে? আমাদের জহরের পদবি টা দাস কিনা একটু দেকে বলবো স্যার। বলা তো জায়না, হয়তো ও ই ডহর। যদি হয় , একটু মনে রাকবেন স্যার। আমার নামটা, ওই যে ওকেনে দরজায় লেকা। খাঁটি পেতলের নেমপ্লেট স্যার।

 

এখন তো ছোট পরিবার স্যার। আমার গিন্নি আচেন, আর এই টি আমার কন্যা। নাম বলো মা। কি বললে মামনি? ডহর মানে রাস্তা? না না, শুনলে না স্যার কি বলচেন? ডহর একজন মহাবীর শহীদ। হুল করেচেন। ওই যে শোন, স্যার কি বলচেন। আমাদের মুক্কুমন্ত্রী ও বলেচেন। ডহরের কতা। তাই তো আমাদের স্যারের মতো সরকারি আপিসার রা ডহর বাবুর পরিবার কে খুঁজচেন। না না স্যার। ওর কতায় কান দেবেন না। বাচ্চা মেয়ে, কি বলতে কি বলেচে, তার ঠিক নেই। বলে কিনা, সিদো কানহোর নামে রাস্তা বলে ওটার নাম সিদো কানহো ডহর। ডহর মানে নাকি রাস্তা। আজকাল ইস্কুলে কিচ্চু সেকায় না স্যার। আমাদের শিক্কা-দিক্কা শেষ করে দিয়ে গেচে সব। আপনি ভাববেন না স্যার।ডহর বাবুর কোনো খবর পেলেই আপনাকে দিয়ে আসবো আমি নিজে গিয়ে। শুদু যদি কোন পুরস্কারের ব্যাপার থাকে, একটু দেকবেন স্যার।