রবিবার, ২৬ জুন, ২০১১

খেরোর খাতা ~ অবিন দত্তগুপ্ত


"কখনো সময় আসে জীবন মুচকি হাসে/ঠিক যেন পড়ে পাওয়া চো‍‍‌দ্দো আনা"

     মাঝে মাঝে এমনটা হয়।ফেলে আসা কোনো কিছু ফিরে পেতে ইচ্ছে করে।অনেক দিন না ছোয়া কোনো পুরোনো ভালোলাগাকে ছঁুয়ে দেখতে ইচ্ছা করে।আমার ক্ষেত্রে এই ইচ্ছেগুলো মূলত দিনান্তের ক্লান্তির পর আমায় জুড়ে বসে।

      আজ সেরকমই একদিন।সারাদিনের ক্লেদ সঞ্চনের শেষে আজ হঠাৎই সেই পেছন ফেরার ক্যারাটা মাথার ভেতর তাণ্ডব নেত্ত আরম্ভ করলো।এখন সমস্যা হলো এাই যে এই নির্বাসনা,যেখানে আমার জামা-জুতো আর দু চারটে বই ছাড়া নিজস্ব বলতে কিছুই নেই,সেখানে "পুরানো" পাই কোথায়।হঠাৎ চোে পড়লো একটা ধুলো মাখা লাল ডায়েরি।কোনো কোনো শীতের সকালে কুয়াশাঢাকা সমস্ত কিছু নিজের বড় নিের বলে মনে হয়;তেমনি ওই ডায়েরিটা -- আড়াই বছরের নির্বাসনে যার উপর কোনোদিন
ও চোখ পড়েনি,ওকেই বড্ডো আদরের মনে হলো।হাতে তুলে নিলাম।

     পাতা ওল্টাতে গিয়ে প্রথমেই লক্ষ্য করলাম অনেকগুলো পেজ স্টেপল করা।তারপর বাবার হাতের লেখা।আর কি লেখা তাতে -  না কোন অসুখের জন্য ঠিক কোন ওষুধটা খাওয়া উচিত। বাঁদরের থেকে উদ্ভুত প্রজাতি আমরা,সুতরাং বাঁদরেরই মতো অকারণ অনুসন্ধিৎসা শিরায় শিরায়।ছিঁড়ে ফেল্লাম স্টেপল করা পেজগুলো।
লেখা রয়েছে ;
পূজা ২০০৪
২০/০৯;
--------
গুড্ডুর প্যান্ট -> ৬৫০
গুড্ডুর টি-শার্ট-> ০২৫০
গুড্ডুর শার্ট -> ৩৫০
গুড্ডুর (ইনার্স) -> ৪০
শাড়ি বাবদ নাড়ুকে (ফার্স্ট ইনস্টলমেন্ট) -> ৩০০০
মাতৃবস্ত্রালয় (তুতুন) -> ১৫০০
মায়ের শাড়ি -> ৫০০
বাবার ফতুয়া + লুঙ্গি -> ০৩৫০
.
.
.
সোনালি রেস্টুরেন্ট -> ৭৫
বাসফেয়ার -> ২০
রিক্সা -> ৫
বেশ কিছুদূর পরে এসে পুজোর দিনের খরচগুলো পড়লাম।অক্ষরে অক্ষরে তুলে দিচ্ছি
০৬/১০/০৪ (আজ সপ্তমী)
--------------
১.রিক্সা -> ২৪.০০
২.বাস ->৫.০০
৩.মিষ্টি -> ৫৩.০০
০৭/১০/০৪ (আজ অষ্টমী)
--------------
১.কাগজ ->৩.০০
২.সিগারেট ->২২.০০
৩.মাংস ->১২০
৪.মদ ->২০০
৫.গুড্ডু ->৫০
৬.গুড্ডু (ওর মাকে দেওয়া ও জানেনা) -> ২০০
এরপর আরো অনেক অনেক।
             পড়তে পড়তে ফিরে গেছিলাম আমাদের পুরানো দিনগুলিতে।পোদদার-পার্কের দু কামরার ঘর।দাদু-ঠামি একটায় আর আমরা তিনজন আরেকটায়।সত্য যুগ থেকে কাঠের দরজায় লাগানো 'U'শেপের ছিটকিনিটা তখনো বিশ্বস্ত।অফিস ফেরতা বাবা পকেটের আধুলি-চারআনা-একটাকা গুলোকে ক্যামেরার ফিল্মের কৌটোয় ভরে রাখতো।আর ওই ফিল্মের কৌটোগুলোকেই পাখির চোখ করতাম-আমি..বাপের সুপুত্র।তখন প্রেম চলছিল যে!বাড়ি থেকে ফোন করা মানা সুতরাং পাবলিক বুথ।প্রচুর
কয়েনের দক্কার।

             কিন্তু সব ছাপিয়ে মনে পড়ে যায় ওই েমে নেয়ে আসা মানুষটার একা ডায়েরিতে নিত্য দিনের হিষেব লিখে রাখার  ঘটনাটা।আমি ছোটবেলায় মাকে জিগ্যেস করেছি " মা...বাবা অত কি লেখে?". মা হেসে উত্তর দিয়েছিলো " আগে বিতা লিখতো,স্বপ্ন লিখতো....এখন খেরোর খাতা"
             স্বচক্ষে কোনোদিনও  সেই মহামূল্যবান খাতাটি দেখে উঠতে পারিনি।সব সময়েই তা রেখে দেওয়া হয়েছিল,আমার চোখের আড়ালে।আজ দেখতে দেখতে অনেক কথা স্বচ্ছ হলো।প্রতিদিন বাঁচতে গিয়ে রোজ দুপুরের স্বপ্নগুলো কেন হারিয়ে যাচ্ছে,বুঝতে পারিনি.............বুঝলাম।মাসের শেষে গোল্ড ফ্লেক যখন শুধুই ফ্লেক হয়ে গেছে তখন কপালে হাত দিয়ে ভেবেছি " কি বাজে খরচাটাই না করলাম!!"।বুঝলাম..আমার কোনো হিষেবই ছিল না।আসলে আমরা বেহিষেবির মতো খরচা করেছি এমন অনেক কিছু..যা কিভাবে পেয়েছি,খরচের ব্যস্ততায় তা মনে রাখার প্রয়োজন-ও বোধ করিনি।একটা দুটাকার নোট বাঁচানোর জন্য যে লোকটা পিচের রাস্তায় রীতিমতো ডাইভ মেরেছিলো.....তাররি সন্তান,তার "সব পেয়েছি" সন্তান অবলীলায় হারাতে পারে মোবাইল,মূল্যবোধ,প্রেম,সম্পর্ক্য..........

            বাবার হাতের লেখায় ডুবে যাছ্ছিলাম।খেরোর খাতাও-যে এত্তো রোম্যান্টিক হতে পারে,এমন ধারণা ছিলনা! ডুবতে ডুবতে  হিষেব করলাম নিজের জীবনে 'চোদ্দ আনা' স্বপ্নকে নিলাম তুলে দিয়ে ভদ্রলোক খরিদ করেছেন তার সন্তানের দু-আনা বেঁচে থাকা।
                                  বড্ড বেহিষেবি বাবা আমার