বুধবার, ২২ জুন, ২০১১

গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করাই আজ সবচেয়ে বড় চ্যাতলেঞ্জ ~ অজয় দাশগুপ্ত

গণতন্ত্রের জন্য, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার স্বার্থে দীর্ঘ সংগ্রামের ফলশ্রুতিতেই পশ্চিমবাংলায় গঠিত হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারগত ৩৪ বছর ধরে গোটা দেশে বামফ্রন্টের পশ্চিমবাংলাই ছিল গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অধিকারকে সুরক্ষিত ও সম্প্রসারিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। বামফ্রন্ট সরকার ছিল মানুষের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী।
  
কৃষকের জমি ও ফসলের অধিকার, ক্ষেতমজুরের মজুরি অধিকার, বর্গাদার-পাট্টাদারের চাষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রক্ষায় বামফ্রন্ট সরকারই ছিল গ‌্যারান্টি। শ্রমিক-কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, মালিকপক্ষের সঙ্গে বেতনসহ বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের জন্য দর কষাকষির অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক-অধ‌্যাপকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছিল বামফ্রন্ট। বামফ্রন্টের পশ্চিমবাংলায় শ্রমিকের দাবি ও অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে মালিকের হয়ে পুলিস গিয়ে গুলি চালায়নি, বরং সরকার শ্রমিকের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর দাবি আদায়ে বাধ্য করেছে মালিককে। সংখ‌্যালঘু মানুষের সম্প্রীতির পরিবেশে সমমর্যাদায় জীবন অতিবাহিত করার নজিরবিহীন নিশ্চয়তা দিয়ে ছিল এই বামফ্রন্ট সরকার। আদিবাসী জনগণ, তফসিলী জাতি, আর্থিক ও সামাজিকভাবে অনগ্রসর মানুষকে সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে, অরণ্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের অরণ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গোটা দেশে সামনের সারিতে ছিল বামফ্রন্ট সরকারই। নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ, ছাত্র-যুব-মহিলাসহ সমাজের সব অংশের মানুষের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, তাকে সম্প্রসারিত করা এবং অর্জিত অধিকার রক্ষা করাই ছিল বামফ্রন্ট সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও কর্তব্য।

        কী ছিল বামফ্রন্টের আগের পশ্চিমবাংলা? মানুষের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অধিকারকে কেড়ে নিয়েছিল আজকের তৃণমূলের পূর্বসুরী কংগ্রেসের নেতৃত্বে সরকার। স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষকে নিয়ে লড়াই করেছেন, জেল খেটেছেন, লাঠি-গ‌্যাস-গুলি খেয়েছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন বামপন্থীরাই। দীর্ঘ কংগ্রেস শাসনে বামপন্থীরাসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার কখনই পায়নিপ্রতিটি অধিকারই লড়াই করে অর্জন করতে হয়েছে। তার জন্য এমনকি  জ্যোতি বসুসহ কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাম দলগুলির শীর্ষনেতাদের, এমনকি বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামীদেরও কংগ্রেস আমলে বারবার বিনা বিচারে কারাযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪ বছরে বিরোধীদের প্রতি এই ধরণের অগণতান্ত্রিক আচরণের একটিও নজির নেই।

   কৃষকদের জমির অধিকার, নিজের জমিতে ফসলের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে লড়াই বামপন্থীরা লড়েছে, তা আজো পশ্চিমবাংলাসহ দেশের গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তেভাগার আন্দোলন হয়েছিল বামপন্থীদের নেতৃত্বেই। ছয়ের দশকে জমির আন্দোলন আরো তীব্র আকার নেয়। ১৯৬৭ সালে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার এবং ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার সেই জমির আন্দোলনকে সহায়তা করেছিলো। ক্ষমতা দখল করার জন্য জমি নিয়ে যারা বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার করেছে, সেই তৃণমূল বা তাদের পূর্বসুরীরা কখনো জমির আন্দোলনের ধারেকাছে ছিল না, ছিল উল্‌টোদিকেই। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারে এসেই পাট্টা রেকর্ড করে, বর্গা রেকর্ড করে ভূমিহীনদের জমির অধিকারকে আইনসম্মত করেভূমি সংস্কারের সেই কর্মসূচী গত ৩৪ বছর ধরেই চলেছে। এমনকি সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের আমলেও প্রায় ১২ হাজার একর জমি গরিব ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিলি হয়েছে। সারা দেশে সবচেয়ে বেশি ভূমি সংস্কার হয়েছে পশ্চিমবাংলায়। তথ্যেই প্রমাণিত বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিসংস্কার কর্মসূচীর ফলে আদিবাসী, তফসিলী জাতি এবং সংখ্যালঘু মানুষই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন।

     বামপন্থীদের নেতৃত্বে বাস্তুহারা মানুষের আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, ট্রামভাড়া বৃদ্ধি আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলন, জমির আন্দোলন, আধা-ফ‌্যাসিবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এরাজ্যে গঠিত হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। এরাজ্যে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারকেও তাই প্রতিষ্ঠিত করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত এরাজ্যে কংগ্রেসী আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসে খুন হয়েছিলেন প্রায় ১১০০ সি পি আই (এম) নেতা ও কর্মী। ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত বিনা বিচারে আটক আইন প্রয়োগে, মিথ্যা মামলায়, হাজার হাজার সি পি আই (এম) নেতা ও কর্মীকে বছরের পর বছর জেল খাটতে হয়। শিক্ষক, অধ্যাপক, উপাচার্য, সরকারী কর্মচারী, খেতমজুর, কৃষক, শ্রমিক, মহিলা, আইনজীবী, চিকিৎসকসহ সব অংশের মানুষের ওপর নেমে আসে খুন, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলা, বরখাস্ত হন অনেক সরকারী কর্মী ও শিক্ষক। সন্ত্রাসের জন্য অনেকে কাজে যোগ দিতে পারেননি। ১৯৭৫ সা‍‌লে অভ্যন্তরীণ জরুরী অবস্থার ২০ মাসে বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার, বাক্‌ স্বাধীনতা হরণ, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, যথেচ্ছ পুলিসী অত্যাচার, সভা-মিছিল-আন্দোলন নিষিদ্ধ করা ইত্যাদি গণতন্ত্র-ধ্বংসের কোনো আয়োজনই কংগ্রেস বাকি রাখেনি। সমাজবিরোধী, পুলিস, কারখানার মালিক ও জোতদার ও কায়েমী স্বার্থের ছিল পোয়াবারো। রাজনৈতিক ও ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের ব্যাপক হারে ছাঁটাই করা হয়। পুলিসের সাহায্যে কংগ্রেসী গুণ্ডারা মালিকদের দ্বারা পুষ্ট হয়ে অনেককে কাজে যোগ দিতে দেয়নি। এই মালিকরা এবং স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ অনুপস্থিতির অজুহাতে তাঁদের ছাঁটাই করে দেয়। কোর্টের আদেশ সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের কাজে যোগ দিতেও দেওয়া হয়নি। অসংখ্য ট্রেড ইউনিয়ন অফিস দখল করে নেওয়া হয়। বাসস্থান থেকে উৎখাত হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার বামপন্থী কর্মী-সমর্থক পরিবার।

   কিন্তু ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারে এসে কোনো প্রতিহিংসা যাতে না হয়, তা যেমন সুনিশ্চিত করেছিল, তেমনি বিনা শর্তে রাজনৈতিক মতামত নির্বিশেষে সব দলের রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিয়েছিলমুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন ১৭০০ নকশালপন্থী ও কংগ্রেসী বন্দী। ১৯৭২-৭৭ সালে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অনেককে মিসা ও অন্যান্য আটক আইনে এবং ফৌজদারি মামলায় জেল খাটতে হয়েছিল। এই বন্দী কংগ্রেসীরাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে চালু প্রায় ১০ হাজার ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। 'মিসা'য় আটক ২১৮ জনকে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জরুরী অবস্থার সময় যে সব দমনমূলক ব্যবস্থা জারি করা হয়েছিল সব প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। বাক্ স্বাধীনতা, মতামত ও বিরোধিতা করার অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা; সভা-সমিতি ও সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং আন্দোলনের স্বাধীনতা বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে সুনিশ্চিত করে। রাজনৈতিক কারণে যে সব শিক্ষক ও সরকারী কর্মীদের কংগ্রেস আমলে বরখাস্ত করা হয়েছিল তাদের কাজে পুনর্বহাল করা হয়। বামফ্রন্টবিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলিকে পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার দেওয়া হয়।

ভূমি সংস্কার কর্মসূচী যেমন গরিব ভূমিহীন কৃষকের জমির অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, গ্রামের মানুষের আয় বেড়েছে, অর্থনৈতিক অধিকার এসেছে, তেমনি পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার ফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গ্রামের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার গোটা দেশের মানুষের সামনে পঞ্চায়েতে নজির গড়েছে বামফ্রন্টের পশ্চিমবাংলাই। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণেও মডেল হয়েছে এরাজ্য। ১৮বছরের ভোটাধিকার, মহিলাদের পঞ্চায়েত ও পৌরসভায় আসন সংরক্ষণেও নজির গড়েছে বামফ্রন্টের পশ্চিমবঙ্গ। শান্তি, সুস্থিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সব সময় সামনে থেকেছে এরাজ্য।
আজ যখন পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকারের বদলে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখন গত ৩৪ বছর ধরে তিল তিল করে অর্জিত এই অধিকার রক্ষার লড়াই করাই রাজ্যের মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় চ‌্যালেঞ্জ।