সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১১

জপেন দা জপেন যা ~ জয়দেব বসু


"জপেন দা" উৎপল দত্ত দ্বারা সৃষ্ট একটি চরিত্র। তিনি অবিবাহিত, দেখতে খেঁকুটে, আধ-ময়লা পায়জামা ও ফতুয়া পরেন। সারাক্ষণ শসা চিবোন , বই পড়েন আর গুটিকয় শিষ্যের কাছে মাকর্সবাদ কপচান। এই কাল্পনিক চরিত্র জপেন দা-কে নিয়ে উৎপল দত্ত-র বই: "জপেন দা জপেন যা", যা বাম রাজনীতি ও সংস্কৃতির সম্বন্ধে আমাদের আলো দেখায়। আমি শুধু "জপেন দা" নামটা নিয়েছি, চরিত্রও পুরোটা না। এবার কী দাঁড়িয়েছে তা আপনারাই বলতে পারবেন। লেখাটি সম্ভবত ছাপা হবে কৃত্তিবাস পত্রিকার বইমেলা সংখ্যায়।

কাকে চাই জানো? জানো না,
কী কোরে জানবে, যা নোনা
আজকাল এই শহরের কোলাহল;
কাফে-ডি-মোনিকো, টাইগার হল,
সর্বত্রই শপিং-মল,
যাকে দেখি, শুনি সেই নাকি স্বচ্ছল!

স্বচ্ছলতার 'সূত্র কোথায়
খুঁজতে খুঁজতে বনস্থলীর
সব ক'টি ঘাট পেরিয়ে এলেম,
সামনে' বাড়ি, গরিব বাড়ি, ভাঙছে;
উঠছে শপিং-মল!

ল্যাপটপ আর মাইক্রো-আভেন,
বাবা মরে গেলে 'শান্তি-হাভেন';
দাদা গো, বিকেলে কোথায় যাবেন?
--শপিং-মল।

সব পাওয়া যায়, ডায়াপার থেকে
পেঁপে আর কাঁচকলা,
চালের দামটি বাড়লে যাদের
ফাঁস লেগে যায় গলায়,
তারা আজকাল সাহিত্যেরও সীমানার বাইরে।
ফলে ওইসব আলফাল ছেড়ে নিজেরটা ভাই রে

বলি শোন, আমি গেছিলাম এক বাঙালির নববর্ষে,
দুয়ারেই দেখি সহাস্যমুখ, একেবারে নটবর সে।
মানে বুঝিস না? চাপও নিস না। শান্ত হয়ে তো বোস,
ঢুকে দেখি: কেনা আর বেড়ানোটা জাস্ট সমার্থকোষ!
এরই ফাঁকে-ফাঁকে চোখ নাচানাচি….সে থাক, সে কথা থাক…
সত্যি বলতে আমিও তো ঢুকে কিছুটা রুদ্ধবাক!
সেটা যাই হোক নটবর শেষে বরনারী এক এলেন,
কী বলবো ভায়া, সেই যে আমরা সিনেমায় এক 'হেলেন'
দেখেছি দু-চোখে মিনিট তিনেক, স্বপ্নে কয়েক মাস….
নাঃ অত নয়, একটু পরেই ত্বকের দীর্ঘশ্বাস
কসমেটিক্স-কে চিরে-চিরে এলো, এরপর আর কী?
শুধু একটাই প্রশ্ন: বলুন, ঠিক পছন্দ কী?

মিলটা হলো না, তাই না?
কী করবো, মিল হয় না,
অমন ক্লিষ্ট মুখের সামনে।
অস্বাস্থ্যকর বাচ্চার দুধ
যারা বেচাচ্ছে, সেইসব চুদ-
মারানির টাকা আমি তো কখনো খাই না!
তাই ভ্যাবাচ্যাকা বললুম:
কী-কী পাওয়া যায়, বলুন?
উত্তর খুব সোজা ও সাপ্টা: ঘুরে দেখবেন, চলুন…।
দেখলাম আর কিনলাম।
হিসেবটা খুব স্পষ্ট,
কেউ কেনে তার মুখে রং দেখে
কেউ দেখে তার কষ্ট।

সবটাই 'পরী-কল্পনা',
সহজ মিলটা এবার বসাই, আমারও তো পরিকল্পনা
ছিলো কিছু, তবে গরিব পরীর সুরাহা কিছুটা কোরে
জানতে চেয়েছি, আর কিছু নেই?
একটু নিকটে সরে, সে বলেছে কিছু ঘনিষ্টভাবে,
'আর কী লাগবে বলুন? একটু পরেই ফাঁকা হবো আমি
চাইলে কোথাও চলুন ….?'
মাইরি, আমার থোবড়াটা দেখ, উৎপল দা যে কী….
এমন একটা স্ট্যাম্প মেরে দিলো—ক্যালানের ভঙ্গী!
তবু যে কী এক ….. কী যে এক হয়ে গেলো ….

গেলুম সে মেয়ে নিয়ে…..

'প্যারামাউন্ট' সে কখনো দেখে নি, ভাবতে পারিস তোরা,
'রাজ'-এর কচুরি দূরে থাক, কফি হাউসের পকোড়াও!
ময়দান চেনে কিন্তু,
আমিও জপেন, জানি তো কীভাবে বিন্দুর থেকে সিন্ধু
গড়ে ওঠে শ্রম-উদবৃত্তি বা উৎপাদনের খেয়ালে…..
শক্ত হচ্ছে? ঘেঁটেও দিচ্ছি? আচ্ছা আচ্ছা, একালের
লব্জেই বলি, ময়দান এক সেমিয়-সেমানটিক্স…..
আচ্ছা রে বাবা, মানে ময়দান, তখন বিকেল, রিস্ক
নেই বলে যাওয়া গেলো।
বসা হলো এক পাষাণ-সোপানে, চুল তার এলোমেলো,
আমি আড়চোখে, সেও ইয়ে তাই….এমন সময় ঠিক—
সামাজিক সব সম্পর্কের আসল কথায় ক্লিক।
মার্ক্স যাকে…বেশ , ঠিক আছে রে বাবা, কিন্তু তো জিজ্ঞাসা
মানছি: বড্ড অসহায় আর মানছি বড্ডো আশার,
আসলে কখনো বাতাস যে বয়, বয় কীনা বোঝা যায় না…
আসলে, পুরুষ—বয়স হচ্ছে—এক দিন বোঝে আয়নায়….
স্বীকার করে না, তবুও তো বোঝে, এটা এক অপমান….
মার্ক্স যাকে ….না না, কিছু বলেন নি; আসলে এ উপমান।
আশাহত জিজ্ঞাসা:

'একটা ভদ্র চাকরি দেবেন?'

আহা কী যে এক খাসা
প্রশ্ন করলো নষ্ট এবং ভ্রষ্ট এ ভাঙা বঙ্গে,
গায়ক-নায়ক-লেখক-পাঠক প্রত্যেকে যার সঙ্গে
ফিট কোরে যায় আমরা কিংবা ওরা-র একটা খাঁচায়,
চাপা agenda সব্বার আছে, নইলে কে-কাকে বাঁচায়!
সেখানে 'চাকরি', আল্লাহ রহিম, তদুপরি 'ভদ্র'!

নেই, জানি নেই। নেই।
সংলাপ আর স্তব্ধতা ময়দানে,
কাকের হাগু-তে মাখা যত সব শহিদের সোপানে।
আমি তাকে শুধু এইটুকু বললাম:
'না।
ভদ্র জীবন দিতে পারি; তবে ভদ্র চাকরি না।'

--'চাকরিই না! বাবা তো দুঃস্থ, মা অসুস্থ, বোনটা…'
আশাহত তার মুখ দেখে মজা পেয়ে বলি: 'তবে কোনটা
হারিয়ে গিয়েছে পথের বাঁকেই? ঘাবড়ে গিয়ে সে তাকায়,
এবং বলি ও বলতেই থাকি মাথার ঠিক না-থাকায়:
'বোনের কথাটা ঢপ, ঠিক বলো? আসলে তোমার বোন নেই;
পুরো ব্যাপারটা বোনলেস, তাই বলতে তোমার লোন নেই।
সমাজের কাছে, বিবেকেরও কাছে, থাকাটা তো শুধু টিঁকে?'

শুনেই হঠাৎ সোজা হাঁটা দিলো ভিক্টোরিয়ার দিকে…..

আমারও তো কোনো চান্স নেই যাতে চেয়ে রবো অনিমিখে!
হাঁপাতে-হাঁপাতে ছুটলাম,
চেপে ধরে দেখি, শুধু জল…. সেই চোখের জলের নাম নেই।

শালা, এই হলো মেয়েদের নিয়ে প্রবলেম!
শসা খেতে-খেতে ভেবেছি জীবনে যা খুশি তা হোক, নয় প্রেম।
কীসের প্রেম রে? মার্ক্স কি কখনো….(কাশি)….
আরে না, ওটা তো বলে দেখলাম, ভালোবাসাবাসি-টাসি
না-হলে কি কোনো শ্রমিক কখনো…. বলি নি তো, বলেছি কি?
মার্ক্স কি কখনো শ্রমিক ছিলেন? আমিও শ্রমিক নাকি?
ওটা তো একটা জৈব….যাক সে চোখের জলের সামনে
কী যেন একটা হয়ে গেলো, যেটা হয়ে গেলো সেটা কী?

নাঃ, ভাবনার অবকাশ আর ছিলোনা বলেইছি।
বলি নি? তাহলে বললাম।
আমার গায়ের ঘেমো ফতুয়াটা—সেখানেই নাক মুছলো।
ঘেন্না যে কেন করলোনা সেটা এই কয়মাসে বুঝি…..
কেন মানে? গাধা, সব কথাই কি বলা যায় সোজাসুজি?
বউ যদি নাক খোঁটে পাশে বসে সেটাও যে কেন মিষ্টি…
না, ঠিক তা নয়, চোখেই পড়ে না, এইটুকু বলি, দৃষ্টি
কেমন যে হয়ে গেছে আজকাল…..
ও! তোদেরকে বলি নি?
আমি তো আজকে তিন মাস হলো…. এত বছরেও টলিনি,
সেটা বল? তবে সেই যে ওনার বোনটিকে দেখলাম…..
না রে, বোন কোনো ঢপ নয়, সে যে সত্যিই ওর বোন….
কার? মানে দিদি….বড়ো শ্যালিকার, ও-হো-হো আমার টোন
থেকে বুঝিস নি? নাকটাক মুছে দিদি নিয়ে গেলো বাড়ি।
গিয়ে দেখি: ওরে বাবা! তরুণীটি আমার ইচ্ছে-গাড়ি!
দেখতে যে কোনো জেনি মার্ক্স, সেটা বলা হবে ভুল বাৎ;
আমি কি জেনি-কে দেখেছি নাকি? এ পড়ে সুধীন্দ্রনাথ।

আর তো কিছুতে কিছু না। শীর্ষেন্দুর 'লিচু' না।
আসলে লিচুই, ঘটনাচক্রে হয়ে গেছে কাঠঠোকরা;
আমি তো জানিস: ফুল নই। এক মরা কাঠ। এত ছোকরা
থাকতে কেন যে আমিই এলেম তার এই পোড়া ভাগ্যে!
এসে অবশ্য ভালোই লাগছে, তার যা লাগছে, যাক গে…

না না, দিদি আসে। প্রতি সপ্তাহে। সমস্যাটা কী জানিস?
ফি-হপ্তায় ছেলে পালটায়, কে যে তার সম্ভাব্য…..
ভাববো, কথাটা সময় পেলেই মন দিয়ে ঠিক ভাববো।
আপাতত এতে কী বল?

এ-টুকু মানুষ এখনো সে আছে, চায় না আমার সম্বল।

একবার শুধু একান্তে পেয়ে বলেছিনু সেই কথা:
'আমার গায়ে যে নাক-টা মুছলে, তার কেন অন্যথা?'
মৃদু হেসে দিদি বললো:
'ছ্যা-ছ্যা করলি না/ জাপ্টে নিলি না, তাতেই মনটা চললো
ব্যাকে, যাকে বলে বোন-উদ্দেশে। দেখলাম, তোরা ম্যাচড।
আর কোনো কথা আছে?'

আমি বললাম: 'একী ঠিক হলো, পাবো না কখনো কাছে?'

চঞ্চল চোখ স্থির হয়ে এলো। বললো: জপেন, শোনো,
মধুনিশি ভোর হয়ে গেছে কবে, খবর রাখো কি কোনো?
কারা তোমাদের মারছে এবং মারছেই শুধু মারছে…..
বন্ধু বলো বা কমরেড, তারা কোথায়-কোথায় হারছে?'

বুকে ছাঁৎ করে উঠলো।
ঘরে ঢুকলাম, বউ দেখলাম: পুরোনো পোঁটলা বাঁধছে।
আমায় দেখেই বললো: 'দিলাম পাঞ্জাবি-পায়জামা,
যদি কাজে লাগে তাই নিয়ে যাও বিয়ের দুলটা আমার,
সঙ্গে দিলাম বই আর ক'টা কয়েল মারতে মশা,
খাবারের কোনো দরকার নেই, তোমার তো সেই শসা।'
সময় এখানে নির্বাক। আমি যা বলবো তাই অসার।

তবু যেই গেছি বলতে,
চোখের প্রদীপ দপ করে ওঠে ওস্কানো কোনো সলতেয়,

ঠোঁটে তর্জনী, সে বললো কোনো বাতাসের ভোলা স্বরে:
'যে ভোলে ভুলুক, আমি ভুলিব না কোটি মন্বন্তরে….।'