বৃহস্পতিবার, ১৩ মে, ২০১০

পৌরভোটের অ্যাজেন্ডা ~ দুর্জয়

'আবারো এসে গেছে। মিউনিসিপ্যালিটি/কর্পোরেশন নির্বাচন। ২০১০। এক পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচন। যে সময়ে দাঁড়িয়ে এক অলীক পরিবর্তনের স্বপ্ন বিক্রি করছে এক মহাজোট। কি বললেন? জোট ভেঙ্গে গেছে? তৃণমূল একা লড়ছে? নাহ! ভুল বললেন। জোট আছে। এবং আক্ষরিক অর্থেই মহাজোট আছে, যে জোটে সামিল ধান্দাবাজ বুদ্ধিজীবি থেকে শুরু করে কংগ্রেসের হাত ধরে বড় বড় আমেরিকান কোম্পানীগুলো অবধি। এই রে! নিশ্চয়ই ভাবছেন, পুরসভা ভোটে আবার আমেরিকা কেন? সিপিএম গুলোর কি আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই? আছে দাদা, আছে। কিন্তু আমাদের কাজের থেকেও আরও আরও বেশী করে যারা আছে, তাদের অস্বীকার করি কি করে? কি করে ভুলি, টিভি চ্যানেলে কংগ্রেস নেতা নির্বেদ রায়ের সদম্ভ ঘোষনা, যে ২০০৮ এ পরমানু চুক্তির মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে বামফ্রন্ট ইউপিএর থেকে সমর্থন উঠিয়ে নেবার পরে কংগ্রেস 'ন্যাশনাল অ্যাজেন্ডা' নিয়েছে, যে সিপিএম কে উচ্ছেদ করতে হবে, এবং তার জন্য সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য কোনও পদ্ধতিই তারা বাদ দেবে না। কি করে ভুলি, আমেরিকার জিই, ওয়েস্টিংহাউসের মত সংস্থার পরমানু চুল্লী বানানোর পরে তাতে দুর্ঘটনা ঘটলে যে ক্ষতিপুরন দেবার কথা, তা যথাসাধ্য কম করে দেশের কোষাগারের টাকা বিদেশী কোম্পানীর মুনাফায় পরিনত করার জন্য সংসদে কংগ্রেসের মরিয়া চেষ্টা, এবং তার বিরুদ্ধে বামফ্রন্টের মরিয়া লড়াই? সিপিএম টিকে থাকলে যাদের ক্ষতি, তাঁরা এবারেও মরিয়া, যেমন ছিলেন পঞ্চায়েত ভোটে, যেমন ছিলেন লোকসভা ভোটে, যেমন আছেন পৌরসভা ভোটে। আর যে কারনেই, সচেতন ভাবে, টিভি চ্যানেল থেকে সংবাদপত্রের পাতায় রোজই গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, একটা পৌরভোটের কি অ্যাজেন্ডা।

পৌরসভা কি করে? পুলিশ প্রশাসন কে নির্দেশ দেয়? চোর ধরে? ডাকাত মারে? নাকি জমি অধিগ্রহন করে? কিছুই করে না। যেটা করে, সেটা হল, নাগরিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলি দেয়। রাস্তা, জল, জঞ্জাল সাফাই, নাগরিক সৌন্দর্যায়ন ইত্যাদি কাজ। লোডশেডিং পৌরসভা করে? না করে না। লোডশেডিং কেন হচ্ছে, সেটা অন্য প্রশ্ন, সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। আপাতত ভাবা যাক, বিরোধীদের মুখে যে দাবিগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে, সেগুলো কেন মোটেই পৌরসভার সাথে কোনওভাবেই যুক্ত নয়। এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে, এবং সেটিই সত্যি। বামফ্রন্টের পরিচালিত পুরবোর্ডগুলো কাজ করেছে। যে যে কাজ গুলো তাদের করার কথা ছিলো, সেই সেই কাজগুলো তারা সাফল্যের সাথেই করেছে। অতএব, সেগুলো নিয়ে কিছু বলার নেই, আর তাই, পুরভোটের অ্যজেন্ডা সাঁইবাড়ি, নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, রাজ্যে সিপিএমের সন্ত্রাস। সিপিএমের সন্ত্রাস টা কি রকমের তা জানতে গেলে একটা তথ্যই যথেষ্ট, যে গত লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে, এক বছরে, শুধু মাত্র জঙ্গলমহলেই তৃণমুলী-মাওবাদীদের হাতে খুন হয়েছেন ২১০ জন সিপিএম কর্মী।

শ্যামবাজারের নির্বাচনী সভায় তৃণনেত্রী ঘোষনা করলেন, পুরভোটে তাঁরা জিতলে তিন মাসের মধ্যেই বিধানসভা ভোট করে দেবেন! কি মানে দাঁড়ালো? সাংবিধানিক সঙ্কট ছাড়া নির্বাচিত সরকার ভেঙ্গে দেওয়া সম্ভব নয়। পাশাপাশি, মুলায়ম সিঙ্ঘ কেন্দ্রীয় সরকারে যোগ দেবার বাসনা প্রকাশ করার পরে, সরকার কে বিভিন্ন ভাবে বিপাকে ফেলা মমতার চোখরাঙ্গানিকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা সোনিয়া গান্ধীর হাতের মুঠোয়। এমতাবস্থায়, সাধের জোট ভেঙ্গে দেওয়া মহিলার অবাস্তব বায়নাক্কা প্রণব মনমোহন মেনে নেবেন, এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। হাতে থাকে একটিই মাত্র উপায়, সেটা হলো দায়িত্ব নিয়ে সাংবিধানিক সংকট তৈরি করা। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, যে পৌরসভা নির্বাচনের পরে পশ্চিমবঙ্গে নৈরাজ্যকে সর্বকালীন সেরা উচ্চতায় নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করছেন মমতা, শ্যামবাজারের ঘোষনা যে পরিকল্পনার সামান্য প্রকাশ মাত্র। এবং সে কাজে যে তৃণমুল রীতি মত দক্ষ, সে কথা বুঝতে গেলে সিপিএম হতে হয় না। গত কয়েকমাসে রাজ্যজুড়ে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য তৈরি করে তৃণমুল প্রমান করেছে, ক্ষমতায় এলে তারা '৭২-'৭৭ এর কংগ্রেস কে ছাপিয়ে যাবে। সন্ত্রাস তৈরি করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

অন্যতম বললাম কেন? কারন, অন্যতর লক্ষ্যও আছে বইকি। তৃণমুল সাংসদ কবির সুমনের বক্তব্য শুনলেই তা জলবৎ তরলং হবে। কি বলেছেন সুমন? "খাও খাও খাও... শুধু খাওয়া আর খাওয়া" দক্ষিণ ২৪ পরগণায় আর পুর্ব মেদিণিপুরে সরকারী টাকার লুঠ চলছে, তৃণমুলের নেতা থেকে কর্মী, সব্বাই সরকারী টাকা লুটে যাচ্ছেন। লুটপাট আর হিস্যার সঙ্ঘাতে একের পর এক পঞ্চায়েতে, সমিতিতে আনা হচ্ছে অনাস্থা, যে হিস্যা কম পাচ্ছে, সে লোক জন জোগাড় করে অনাস্থা ডেকে দিচ্ছে অন্যের বিরুদ্ধে। আইলার ত্রান শিকেয় উঠেছে, অশান্ত নন্দীগ্রাম এখনও অশান্ত, লুটের টাকার বখরা নিয়ে তৃণমুলের মারামারিতে প্রশাসনিক বন্দোবস্ত শিকেয় উঠেছে, এক গোষ্ঠি মাওবাদীদের সুপারি দিয়ে খুন করে দিয়েছে আরেক গোষ্ঠীর মাথা নিশিকান্ত মন্ডল কে। হাবড়ায় রক্তদান শিবিরে বোমা মেরে কংগ্রেস কর্মী বাপি চৌধুরীকে খুন করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতি-মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সাট্টা-ডন তৃণমুল কর্মী। বৈদিক ভিলেজে জমি ডাকাতি করে বুড়ো আঙ্গুল ফুলিয়েছে তৃণমুল বিধায়কের ভাই, তারপরে খুন খারাপি করে বেপাত্তা হয়েছে সে। চলছে লুঠ। নেত্রী নিজের মন্ত্রক কে লুটে যাচ্ছেন এমন ভাবে, যেন, 'কাল' বলে কিছু নেই, যা লোটার আজই লুটে নাও। রেলের টাকা লুটে যাচ্ছে কাক- আঁকিয়ে চিত্রকর থেকে জীবনমুখী গায়ক। রেলের টাকায় ভাড়া হচ্ছে  নেত্রীর ধামাধরা টিভি চ্যানেলের ওবি ভ্যান, সরকারী অনুষ্ঠান হয়ে উঠছে তৃণমুলের প্রচার সভা। আর পাশাপাশি, অন্ধকারে রয়ে যাচ্ছে সিঙ্গুরের সব হারানো চাষীরা, যাঁদের মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে লুটে পুটে খাচ্ছে কিছু শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী আর প্রতারক মানবাধিকার কর্মীরা। রেল কে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির খেলায়। কেউ কি ভেবে দেখেছেন, যে গরম তো আগেও পড়েছে, এমন ব্যপক বিদ্যুত ছাঁটাই গত কুড়ি বছরে হয়নি কেন? কেন কোল ইন্ডিয়ার মত কেন্দ্রীয় সংস্থা লিখিতভাবে তাদের বাৎসরিক রিপোর্টে দাবি করছে, যে রেল তাদের থেকে কয়লা নিয়ে বিদ্যুতকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে টালবাহানা করছে নিয়মিত, যার ফলে কোল ইন্ডিয়ার কয়লার গুদামে কয়লা রাখার জায়গা নেই, তাএর কয়লা খন বন্ধ করে দিতে হয়েছে? অন্তর্ঘাত করে রাজ্যের বিদ্যুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো হচ্ছে, আর তার ফলাফল যে লোডশেডিং, সেই লোডশেডিঙ্গের অন্ধকারে যে তৃণমুল কর্মীটির ছোট্ট মেয়েটাও পড়াশোনা করতে পারছে না, তাঁদেরো কি এ সব ভেবে দেখতে মানা?

এ হেন প্রেক্ষাপটে পৌর নির্বাচন। পৌরসভার ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন টিভির ক্যামেরা। 'উন্নয়ন হয়নি', একথা বলতে গিয়ে আমতা আমতা করছেন তৃণমুল স্তরের তৃণমুল/কংগ্রেস কর্মীরাও, নেত্রীর মতো নির্জলা মিথ্যা শিখে উঠতে পারেন নি হয়তো তাঁরাই। নিঃসন্দেহে বেড়েছে নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য, নিঃসন্দেহে বেড়েছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা। তাই, টিভির চ্যানেল থেকে খালচোর আঁকিয়ের ভাষনে, বিকিয়ে যাওয়া সাংবাদিকের নগ্ন-নির্লজ্জ কলম থেকে শুরু করে  নাট্যকারের বান্ধবীর অশালীন চিৎকারে বারংবার উঠে আসছে ফ্যাসীবাদের পুনর্প্রতিষ্ঠার দাবি।

একটু ভাবুন। কিসের পরিবর্তন চান? কেন চান। বামফ্রন্টের পরিবর্তনে আরো ভালো বিকল্প হতে পারে একটিই, সেটি হল উন্নততর বামফ্রন্ট। কথা বলুন, পৌরপিতার কাজে ভুল থাকলে ধরুন, ধমকে দিন। আরও উন্নয়নের দাবীতে সরব হোন। ওয়ার্ড কমিটি সহ বামফ্রন্টের প্রবর্তিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলিকে আরোও সবল করুন। দেখুন, ভাবুন।

স্বচ্ছতার পক্ষে ভোট দিন। শান্তির পক্ষে ভোট দিন। সবার উন্নয়নের জন্য ভোট দিন।

আপনার ওয়ার্ডে, বামফ্রন্ট প্রার্থীটিকেই ভোট দিন। সুসংহত নাগরিক পরিষেবার ধারা অব্যাহত রাখুন।'