সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০০৯

হুল ~ পারিজাত ভট্টাচার্য্য

৩১ আগস্ট, ১৯৫৯ সালে, শহীদ মিনার ময়দানে, খাদ্যের দাবীতে এবং খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের অপসারণের দাবিতে প্রায় তিন লক্ষ্যাধিক ছাত্র, যুব, শ্রমজীবি মানুষের জমায়েত হয়েছিলো। এবং সরকারের স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধ সেই জমায়েতই মিছিল এর ওপর পুলিস নারকিয় অত্যাচার করেছিলো। পুলিস সেই মিছিলের ওপর গুলি চালায়। পরের দিন অর্থাৎ ১ লা সেপ্টেম্বর সেই পুলিসী অত্যাচারের প্রতিবাদে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটি ছাত্রদের ওপরেও পুলিস গুলি চালায় , এবং পরবর্তি পর্যায়ে সরকার কলকাতা এবং শহর তলিতে ১৪৪ ধারা জারি করেছিলো এবং ২ রা সেপ্টেম্বর থেকে কলকাতা এবং হাওড়া তে সেনা নামানো হয়। পুলিস এবং সেনা-আধাসামরিক বাহিনীর অত্যাচারে ৮০ জন শহীদ হন এবং অন্তত ২০০ জন মানুষ নিখোঁজ হন। ২৯ শে সেপ্টেম্বর বিধানসভাতে খাদ্য আন্দোলনের শহীদের প্রতি ১ মিনিট নিরবতা পালন করতেও বিরোধিতা করেছিল কংগ্রেস এবং তার সঙ্গিরা। ২২ শে সেপ্টেম্বর থেকে জেলায় জেলায় ছাত্ররা আইন অমান্য শুরু করেন। ২৬ শে সেপ্টেম্বর সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে খাদ্য আন্দোলনের শহীদদের স্বরণে স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়।

উল্লেখ্য ২৮ শে সেপ্টেমবর ১৯৫৯ সোমবার রাজ্য বিধানসভাতে বিধান রায়ের মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে কমরেড জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে অনাস্থা প্রস্তাব রাখা হয়। কমরেড জ্যোতি বসু তার ভাষনে সরকার পক্ষ্যকে জুক্তি-তর্কে ধরাশায়ী করে ফেলেন। বস্তুত, এই ঘটনা হবার অন্তত ২ বৎসর আগের থেকে রাজ্যে এই খাদ্য সঙ্কটের বিরুদ্ধে সি পি আই এম সাধারণ মানুষ কে পাশে নিয়ে আন্দোলন, সংগ্রাম সঙ্ঘঠিত করে আসছিলো এবং সরকারকে বার বার সচেতন করা সদিচ্ছা নিয়ে শ্রী বসু সরকারের এর ভ্রান্ত এবং একপেশে পূজিবাদী ব্যাবস্থার তোষণমূলক নীতি বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। রাজ্যেরর আইনসভাতে রাজ্যের মন্ত্রীদের স্বৈরাচারী ভূমিকা এবং নানান ছল-চাতুরি-ধুর্ততা-কপটতা- দুর্নীতি, তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য সেই সময়, মানে কংগ্রেস সরকারের রাজ্যে দ্বিতিয়বার মন্তৃত্বের সময়্কালে , রাজ্য মন্ত্রীমন্ডলির বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ এনে আইন ও বিচারমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় পদত্যাগ করেছিলেন। ওই সময়ে এবং অন্তত তার পরে, ২৭ শে মার্চ , ১৯৫৮ সালে রাজ্যের বিধাসভার মন্ত্রীমন্ডলীর বিরুদ্ধে বিরোধীদের পক্ষ্য থেকে অনাস্থা প্রস্তাব রাখেন শ্রী বসু। ১৯৫৮ সাল, চারিদিকে দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া। বিধানসভাতে বিরোধীদের প্রশ্নবাণে খাদ্যমন্ত্রী দিশেহারা। প্রশ্নোত্তরে স্পস্টভাষায় তিনি বলছেন যে কন্ট্রোল অর্ডারের ২২/২৩ টাকা দরে বিক্রি হয়, এর থেকে বেশী কি করে হয়, তা তিনি জানেন না। এমনকি তিনি এটাও স্বীকার করলেন যে তিনি খাতাপত্র বা হিসাবপ্ত্র দেখার প্রয়োজনিতা মনে করেন না, এবং হোলসেলের উপর সরকারের অধিকার থকলেও রিটেল বিক্রির ওপর সরকারের কিছু করনীয় নেই। অনেকটা সুরাবর্দী সরকারের আমলে যে দুর্ভিক্ষ্য হয়েছিলো, সরকারের সেই নিরপেক্ষ্য নিরুপায় হবার প্রবৃত্বি, তখন কংগ্রেসীরা প্রাদেশীক সভাতে চুপ থাকতেন। ১৯৫৮-১৯৫৯ সালের এই দুর্ভিক্ষের ভয়ানক অবস্থানকালে, বামপন্থীরা বা বিরোধিরা সরকারকে বারবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন খাদ্যসামগ্রির উঁচু-নীচু দর বেধে দিতে কিন্তু প্রফুল্লবাবু বলেছিলেন যে এখানে সরকারের কিছু ক্ষমতা নেই। কমিউনিস্টরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে যখন নতুন চাল উঠেছিল, সেই চাল কিনে নিয়ে সমস্ত জেলায় গুদামজাত করে রাখার জন্যে, কিন্তু সরকার তা না করায়, কালোবাজারী শুরু হয়ে যায় এবং তখনই চালের দাম, ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। সরকার পক্ষ্য থেকে বলা হয় যে এই খাদ্যসঙ্কটের সময়তে কেন্দ্রীয় সরকার টাকা দেবে না। এবং সরকার ৭৫ ভাগ মিল মালিকদের হাথে খাদ্যসামগ্রী ছেড়ে দিয়েছিলেন ফ্রী মার্কেটিং এর নাম করে। ফলে চালের দাম হয় আগুন। লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ যখন অনাহারে- অর্ধাহারে তখন এই আর্থনৈতিক পান্ডিত্যের আড়ালে ছিলো সুকল্পিত এক পরিকল্পনা। সিদ্ধার্থবাবু একে বলেছিলেন ইন্স্যানিটি কিন্তু শ্রী বসু বলেছিলেন যে দেয়ার ইস এ মেথড ইন দিস ম্যাডনেস। এই সব মিলমালিকদের হাথে যে খাদ্য সামগ্রী ছেড়ে দেওয়া হয় এর পেছনে ছিলো নির্বাচনী তৎপরতা। কংগ্রেস সরকার কে টিকিয়ে রাখার জন্যে বিপরিতে লক্ষ্য লক্ষ্য টাকা পার্টি ফাণ্ডে দান। দেশের বা বাংলার সার্বভৌমত্ব্যকে বিসর্জন দিয়ে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমানো এবং কিছু কিছু আশীর্বাপূষ্ঠমানুষের সম্পদ বৃদ্ধি। এই বাংলার কংগ্রেস প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে বলেছিলেন, শিল্পের ক্ষেত্রে তারা কিছু করবেন কিন্তু প্রথম বার তারা ব্যার্থ। দ্বিতিয়বার আসার সময়তে একই প্রতিশ্রুতি, তাতে নিট ফল, একটা কোক ওভেন প্ল্যান্ট এবং তিনটি স্পিনিং মিল। এই ছিলো তাদের শিল্পের প্রতিশ্রুতি। শিল্পের ব্যাপারে তারা এগোতে পারলেন না , আর সেখানে প্রাইভেট সেক্টর শতকরা ৯৯ ভাগ শিল্প দখল করে বসে আছেন। তাঁরা বড়লোক থেকে বড়লোক হচ্ছেন আর দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে, অথচ এদের অপর সরকার হস্তক্ষেপ করেনি। গ্রামের কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। কামার, কুমোর তাঁতী সকলে ধ্বংসপ্রাপ্ত। অজয় মুখার্জি তার সেচ ব্যাবস্থা নিয়ে বড় বড় ভাষণ দিতেন কিন্তু তার তথ্য ছিলো ভুলে ভরা। প্রথম টার্গেট প্ল্যান অনুযায়ী ১১ লক্ষ্য একর এবং সাথে আরো ৬ লক্ষ্য একর সেচ ব্যাবস্থা করার। কিন্তু প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে দেখা গেলো মাত্র ২ লক্ষ্য একর জমিতে করা হয়েছে। খাদ্যে হাওড়াকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্যে প্রস্তাবিত কেন্দুয়া খাল , ব্রীটিশ আমল থেকেই প্রস্তাবিত রয়ে যায়, সে আর বাস্তবায়িত হয় না। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে খাদ্যে ওনারা বাংলাদেশকে , ভারতবর্ষকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবেন। অর্থাৎ খাদ্যের প্রয়োজনে দেশ থেকে টাকা বাইরে না যায়। অথচ প্রকৃত ভূমিসংস্কার জমিদার বা জোতদার দের জন্যে । জমি বা ল্যান্ড রিফর্মের কথা আর না বলাই ভালো। সরকার থেকে বলা হলো যে কৃষকদের জমির মালিক করার জন্যে ৬ লক্ষ্য জমির ব্যাবস্থা করা হবে। তা কমতে কমতে সেই প্রতিশ্রুতি১ লক্ষ্যে তে এসে ঠেকলো। পরে নাকি তাঁরা ৪৮ হাজার বিঘা পেয়েছেন। যে লক্ষ্য লক্ষ্য কৃষক তাদের বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে যে জমি চাষ করতেন, তাঁরা যখন জমি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলো তখন তাদের জন্যে সরকারের প্রতিশ্রুতি তাদের নির্বাচন ইস্তেহারের আস্তাকুডেই রয়ে গেলো। সেই বছরেই অর্থাৎ ১৯৫৮ তেই সরকার মানে বাংলা সরকার চালের ব্যাপারে একটা নাকি জোনাল সিস্টেম করে ফেললেন। কানোরিয়া ২ লক্ষ্য মণ চাল আনবার ব্যাবস্থা করেছিলেন শ্রী প্রফুল্ল সেনের সাথে। কারণ তিনিই চালের ব্যাবসাদার। বাইরে থেকে কৃষকরা তো আর নির্বাচনী কাজে চাঁদা দিতে পারবেন না, তাই কানোরিয়ার সাথে ওই ব্যাবস্থা। পান্নালাল সারোগি, ইনি প্রফুল্ল সেনের বেনামদার। কংগেসী ফান্ডে আগের বার নির্বাচনে ১ লক্ষ্য ৫০ হাজার টাকা এনার দান। কংগ্রেস ভবন বোধহয় যেটা থেকে তৈরি হলো। তুলসীরাম রাইস মিল, বীরভূম--- সাড়ে পাঁচ হাজার মণ চাল, এটা শ্রী গোপিকাবিলাস সেন ব্যাবস্থা করে দিয়েছিলেন। সরস্বতী রাইস মিল বীরভূম, তিন হাজার মণ, ইত্যাদি। রানী অব হেতমপুর- ইনি চালের ব্যাবসাদার নন, ওনাকেও পারমিট দেওয়া হয়। সবই গত ইলেকসনের সমঝতা আর কি। সত্যি ভোট বড় বালাই। ১৯৫৬-৫৭ সালে সাড়ে ছয় কোটি টাকা ফেমিন বাজ়েটে ধরা হয়েছিলো এবং তখন ঘাটতি ছিলো ৩ লক্ষ্য টন খাদ্যশস্য, কিন্তু অবাক ব্যাপার, ১৯৫৮-৫৯ সালে যখন রাজ্যে খাদ্য ঘাটতি সাড়ে সাত লক্ষ্য টন, তখন বাজ়েটে টাকা বরাদ্দ্য মাত্র ৫ কোটি ১৪ লক্ষ্য ৪০ হাজার টাকা। সেবার আবার যদি নির্বাচণী বছর হতো তাহলে বোধহয়, রাজ্য সরকার ১০ বা ২০ কোটি বরাদ্দ করতেন। তারা ব লতেন না যে টাকা নেই বা কেন্দ্রীয় সরকার টাকা দিচ্ছেন না। আগেও বলা হয়েছে যে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে কংগ্রেস বলেছিলেন যে দেশ কে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ন করবো এবং বাইরে থেকে খাদ্য আমদানি করা হবে না। কিন্তু তার পর বলা হলো, ১২ লক্ষ্য টন প্রতি বছর খাদ্য আমদানী করতে হবে প্রতি বছর এবং ৬০ লক্ষ্য টন দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে সারা ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে। তারপর আবার শোনা গেলো, যে প্লানিং কমিশন নাকি বলছে, প্রতি বছর ১২ এর জায়গায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ্য টন খাদ্য আমদানি করতে হবে। ১৩৩ কোটি টাকার মেশিনারী পাইভেট সেক্টরে আনতে দেওয়া হয়েছে, তা নাকি না আনলেও চলতো। মেশিনারী মর্ডানাইজেশন, ন্যাশানালাইজেসন এমন জায়গায় করতে যাওয়া হয়েছে তা নাকি না করলেও চলতো। এইবার সরকার বলতে থাকলো তাঁদের নাকি ফরেন এক্সচেঞ্জ কমে যাচ্ছে তাই লোক ছাঁটাই করো এবং লোক ছাটাই করতে হয়েছে দেশকে নষ্ঠ করে, সরকারের দূরদর্শিতার , সদিচ্ছার অভাবে এবং জনবিরোধী নীতির দরূন। কৃষি ব্যাবস্থা সাথে খাদ্যের নিরাপত্তার ব্যাবস্থা, খাদ্য সঞ্চয়ের ব্যাবস্থায়ে সরকারের দূরদর্শিতার অভাব দরূন এই টার্গেট তৈরি করা মূর্খামী এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রনোদিত। পরবর্তিকালে আরো আর্থনৈতিক সঙ্কটের বোঝা তারা চাপিয়েছেন সাধারণ মানুষের ঘাড়ে, পরোক্ষ্য ট্যাক্সের মাধ্যমে, জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে, ইনফ্লেশন করেছেন, মূদ্রাস্ফীতি হয়েছে, মাল উৎপাদনের হিসেব না করে নোট ছাপিয়ে গেছেন এবং ফলত পরিকল্পনা খাতে হিসেব আরও ৯৫০ কোটি টাকা বেড়ে যায়। সেই সময়তে মানে ১৯৫৩-৫৪ সালে একটি নতুন বই, প্রফেসর পাল এয়ন্ড বার্ট আমেরিকান একোনোমিস্ট বলেছেন- দি পলিটিকাল একোনমি অফ গ্রোথ করতে that fifteen per cent of national income could be invested without any reduction in mass consumption. আরো লেখা- “ what is required for this purpose is fullest attainable mobilization of the economic surplus that is currently generated by the country’s economic resources. This is to be found in the more than twenty five percent of Indian’s national income which that poverty-ridden society places at the disposal of its unproductive strata. এর মতে টাকা কোথায় পাওয়া যাবে না টাকা পাওয়া যাবে সেই সব আনপ্রোডাকটিভ স্ট্রাটা থেকে অর্থাৎ তখনকার সোসাইটিতে যাঁরা পূজিপতি, ধনী, যাদের টাকা কোনো প্রোডাক্টিভ কাজে নিয়োগ হয়না এবং যাদের হাথে জাতিয়ো আয়ের শতকরা ২৫ ভাগ। ১৯৫৩-৫৪ সালের জাতিয় আয়ে ন্যাশনাল ইনকাম ওয়েজেস এয়ান্ড স্যালারিজে আছে ২৮৯০ কোটি টাকা, অথচ প্রফিট এয়ান্ড ইন্টারেস্ট এতে ৩০২০ কোটি টাকা মধ্যে ১৫৮৫ কোটি টাকা আসছে এগ্রিকালচারাল প্রপার্টি বড়ো বড়ো জোতদার, জমিদার থেকে তাদের মধ্যে এই টাকা থাকছে। অথচ ঐ ২৮৯০ কোটি টাকা এভাবে জাতিয়ো আয় যেগুলি বাড়তো সেগুলি যদি জনসাধারণের বা জন হিতে , খাদ্যের মধ্যে ভর্তুকি ইত্যসদির মধ্যে বা তাদের জন্যে ব্যায়িত হতো তাহলে হয়তো সেই প্রোডাকটিভ স্রাটার উন্নতি সাধন করা সম্বব হতো এবং এই প্রক্রিয়ায় জাতিয় অর্থনীতিতে স্বচ্ছলতা অবশ্যই আসতো। সেই বিপথের দিনে , দেশের বা রাস্ট্র নায়কেরা ক্যাপিটালিস্ট সিস্টেমের মধ্যে প্রথিত চরম অব্যাবস্থা এবং সঙ্কট পরিলক্ষিত করতে পারেন নি, এবং বিগত উন্নত দেশগুলি থেকে আর্থনোইতিক মন্দার করাল ছায়ায় অনিবার্য ফল থেকেও শিক্ষালাভ করতে পারেনি। ১৯৫৮ সালের কংগ্রেস সরকারের দ্যার্থ ভাষায় প্রচার ও অভিমত। গ্রামের নাকি উন্নতি সাধন হয়েছে, মানে গ্রামীন অর্থনীতিতে। কৃষির ব্যাপারে কথা ছিলো যে তাঁরা ৯ লক্ষ্য ৩২ হাজার টন উৎপাদন করবেন, কিন্তু ১৯৫৬ - ৫৭ সালে ওয়েস্টবেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্ল্যানিং কমিশনের কাছে যে রিপোর্ট দিয়েছেন তাতে তাঁরা বলেছেন যে ৮৪ হাজার টন করতে পেরেছেন এবং ১৯৫৭-৫৮ সালে তাঁরা করতে পেরেছেন ১ লক্ষ্য ২৭ হাজার টন বেশী । কোথায় ৯ আর কোথায় ১ আর এই ভাবেই নাকি ওনারা পরিকল্পনাকে স্বার্থক করেছেন । ১৯৫৪ সালে কিছু সারপ্লাস হয়েছিলো কিন্তু সেই সারপ্লাস টা হয়েছিলো প্রয়োজনমতন এবং সময় মতন বৃষ্টিপাত। তার মধ্যে কোনো পরিকল্পনা-টরিকল্পোনা ছিলো না আর সেবার ৭ লক্ষ্য টন বাড়তি হয়েছিলো কিন্তু ১৯৫৮ সালে দেখা যায় যে তখন রাজ্যে সাড়ে সাত লক্ষ্য টন ঘাটতি! এই ভাবেই দেখা যায় ১৯৫৭ সালে ঘাটতি ৪ লক্ষ্য টন, ১৯৫৫ এতে ৫ লক্ষ্য ৪০ হাজার টন, ১৯৫৩ তে ২ লক্ষ্য ৪২ হাজার টন এবং ১৯৫২ তে ৫ লক্ষ্য ৮২ হাজার টন। অন্তত ৯ লক্ষ্য একরে সেচ ব্যাবস্থা সুনিশ্চিত করার কথা ছিলো কিন্তু ১৯৫৮ সাল অবধি মাত্র সাডে তিন লক্ষ্য একর জমিতে সেচ ব্যাবস্থায় জল দিতে পারা গেছে। ময়ূরাক্ষী থেকে ৬ লক্ষ্য একর জমিতে জল দেবার কথা ছিলো কিন্তু ৬ লক্ষ্যের টার্গেট ১৯৫৮ তে ৪ লক্ষ্যে নেমে এসেছে। এই তো ছিল তখনকার পরিকল্পিত গ্রামের উন্নতি এবং দেশ কে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবার ব্যাবস্থা। তখনকার কংগ্রেস সরকারের প্রচারিত সায়ন্টেফিক কৃষিব্যাবস্থা প্রনোয়নের দাবী দেখলে অদ্ভূত লাগে। ১৯৩৭-৩৮ সালে প্রতি একরে ১২.১৮ ফসল হতো, ১৯৫৩-৫৪ সালে হয়েছে ১৩.৪৮, ১৯৫৪-৫৫ সালে হয়েছে ১০.৪০, ১৯৫৫-৫৬ সালে ১১.১১, অর্থাৎ ১৯৩৭-৩৮ সালে যা ছিলো ফলন তাও ১০ বছরের রাজ্ব্যত্বে কংগ্রেসের চমৎকার কৃষি অর্থনীতিতে অর্ধগত। তৎকালিন পশ্চিমবঙ্গে ১ কোটি ১৯ লক্ষ্য একর জমিতে ফসল হতো তার মধ্যে ১৮ লক্ষ্য একর জমিতে দুই ফসল হতো এবং ১ কোটি একর জমিতে খালি একফসল হতো তার বেশী কিছু হতো না। যখন সরকার বলছিলো ইস্টবেঙ্গল থেকে লোক আসছে, তখন কিন্তু সেই জমিগুলিকে সরকার উদ্যোগ নিয়ে দো-ফসলি করতে পারতেন, এপার-ওপার সবাইকে তারা খাওয়াতে পারতেন। এমোনিয়া সালফেট সার তখন ৪০ হাজার টন প্রয়োজন পশ্চিমবাংলায়, ১৮ হাজার টনের বেশী ব্যাবস্থা করতে পারেনি সরকার। প্রকৃত ভূমিসংস্কার তো দূর অস্ত, নেই অল্প সুদে কো-অপারেটিভ ব্যাবস্থায়, দীর্ঘমেয়াদী ঋণ। কংগ্রেস সরকারেরই ফোর্থ ইভ্যালুয়েসন রিপোর্ট কি বলে - “The major portion among the under – privileged groups is constituted by the agricultural labourers and no improvement is noticed in their economic or social conditions. There has been no activity in the C.D.P movement for the specific benefit of the people. On the contrary the gradual rise in the prices of essential commodities has aggravated their economic condition and they feel also that some rich people who get project contracts and the big cultivators have become richer as a result of making profits in contracts and the increase in the yield of agricultural produce due to the availability of irrigation water from the Mayurakshi Project and a rise in agricultural prices.” মুখ্যমন্ত্রীর এবং তার সরকারের বড় বড় আশ্বাস, সি ডি পি এবং ই এস ব্লক করে দেশের মধ্যে একটা রিভলিউশন নিয়ে আসবেন। দশ বছর ধরে তখন ওনারা রাজ্বত্য করেছেন, দেশের কি রকম রিভলিউশন হয়েছে খাদ্যের বা অন্য জনকল্যানমুলক কাজে। হ্যাঁ , রিভলিউশন ওনারা সত্যি করতে পেরেছিলেন, সংসদীয় গনতন্ত্রের গলা টিপে, তাকে নিষ্পেশন করে, কারণ সংসদীয় গনতন্ত্রের সঙ্কটের জন্যে কখনো জনগনের পক্ষ্য দায়ী নন, দায়ী সবসময় শাসক গোষ্টি , ইতিহাস অন্তত তাই প্রমান করে। বিধানসভাতে কমিউনিষ্টরা ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৯ সালে তাই সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব রেখেছিলেন । সরকার জনগনের ওপর অত্যাচার করেছিলো, নীপিডন করেছিলো, সরকার যাদের সেই পচা চাল খাইয়েছিলো, বাধ্য করেছিলো তাদের ১৯ টাকা কন্ট্রোল দরে চাল কিনতে যে চালের দাম হয়ে গিয়েছিলো ৩২ টাকা, তাদের কন্ট্রোল ওর্ডারের ফলে। জনগন তাই সঙ্ঘঠীত হয়েছিলো সবরকম গনতান্ত্রীক শক্তির নেত্রত্বে। এবং সাথে সাথ দিয়েছিলো কমিউনিষ্ঠ পার্টী। সরকার বহুরকম দমননীতি চালিয়েছিলো, এই খাদ্য আন্দোলন কে ধ্বংস করতে। সরকার নানারকম কারণ দেখিয়ে তাদের পক্ষের সমর্থন আদায় করতে চেষ্টা করলো, যথা অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, উদবাস্তুদের আগমন, পাট চাষ বেশী হাওয়ায় ধানের উৎপাদনে জমির পরিমান কমে যাচ্ছে ইত্যাদি কিন্ত তাদের নানান রকম বাহানা, জনগনের কাছে ধোপা টিকলো না। কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বারো বছরের বেশী রাজত্ব করছিলেন, কিন্তু তাদের আট বছর পরিকল্পনাতে শতকরা তিন ভাগের বেশী জলসেচের ব্যাবস্থা করতে সরকার ব্যার্থ। শতকরা আটাশ ভাগ জমিতে এক ফসল হয়, দুই ফসল হয় না। গড়পড়তা বিঘা প্রতি সাড়ে তিন মন ধান উৎপাদন হচ্ছে। এই অঙ্ক থেকে তাই বোঝা যায় যে যুদ্ধের আগে ১৯৩৯ সালে যা অবস্থা ছিল, উৎপাদনের ব্যাপারে কংগ্রেস আমলে তা গড়পড়তা কমে গেছে। এইসব তথ্য উন্মোচন করতে না দিয়ে সরকার নানান রকম বাহানা অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, উদ্বাস্তু আগমন ইত্যাদি বলে নিজের দোষ ঢাকতে চাইছিলো যা জনগনের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। সরকারের অপদার্থতা, চরম ব্যার্থতা, চরম গাফিলতি এবং দুর্নীতি মানুষের চক্ষুগোচরে প্রতিয়মান হয়েছিলো। রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিবৃতিতে কোনোরকম সামঞ্জস্য ছিলো না। পন্ডিত নেহেরু, শ্রী জৈন, শ্রী পাতিল ই ত্যাদি, এঁনারা বলেছিলেন যে খাদ্য সঙ্কট অন্য ব্যাপার, খাদ্যের যথেষ্ট উৎপাদন হয়েছে, দেশের কোথাও খাদ্য সঙ্কট নেই, পশ্চিমবঙ্গ যা সাহায্য চেয়েছিলো তার অতিরিক্ত পেয়েছে, তাহলে কে সত্যি কথা বলছে, রাজ্য সরকার না তাদের রাজনৈতিক মদতপূষ্ট কেন্দ্রীয় সরকার? কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিলো আর ঘাটতি নেই, তাহলে কেনো তখন ৩৪-৩৫ টাকা মন চাল কিনতে হয়েছিলো। আসলে ব্ল্যাক মার্কেটে অনেক খাদ্যসামগ্রী চলে গেছে, ইলেকশন ফান্ড কে সুনীশ্চিত করা দরূন। সাধারণ মানুষ সেটা বুঝেছিলেন। তারা প্রতিবাদ করবেন না, আন্দোলন করবেন না, তাহলে কি তারা নতজানু হয়ে সরকারকে প্রনাম করবেন ?

পশ্চিমবঙ্গে একর প্রতি ধানের ফলন গত ১৪ বছরে বাড়েনি এবং মোট আবাদী জমির সেচপ্রযুক্ত গত দুই পরিকল্পনাতে শতকরা ২০-২১ ভাগ থেকে শতকরা ২৪-২৬ ভাগ হয়েছিলো মাত্র। পুরানো জমিদারী প্রথার অবসান হয়েছিলো ঠিকই কিন্ত খুব কম সংখ্যক কৃষক জমির মালিকানা পেয়েছিলেন এবং হাজার হাজার কৃষক জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিলেন। বেশীর ভাগ জমিদার জোতদারেরা নিজেদের বা নিজ আত্মীস্বজনের নামে জমি লিখিয়ে নিয়েছিলো এবং অনেক জমি বেনামে করে নিয়েছিলো, সেখানকার কৃষকদের লেঠেলবাহীনি এবং কংগ্রেসের পূলিসবাহীনি দ্বারা উচ্ছেদ করে। পশ্চিমবঙ্গের গনতনন্ত্র প্রিয়মানুষ, সংগ্রামের মহান ইতিহাসে স্মৃতিতে গর্বিত সর্বাসাধারন , এই তঞ্চকতা ধরে ফেলেছিলেন, গর্জে উঠেছিলেন তাঁরা, সরকারের নানা দমননীতি প্রয়োগ স্বত্ত্বেও , তাঁরা গনসংগ্রামের পথ নিয়েছিলেন। সংসদীয় গনতন্ত্রে তাঁদের যতটুকু সীমাবদ্ধতা ছিল, তার মধ্যে থেকেই তারা ১৯৬৭ সাল এবং তার পরেও জয়যুক্ত করেছিলেন গরীব, শ্রমজ়ীবি মানুষের শ্রেনীবন্ধু কমিউনিষ্ঠ পার্টি এবং তাদের বামপন্থী জ়োটকে। কংগ্রেসীরা নানান ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেই যুক্তফ্রন্ট সরকারকে দুই বার , অসংবিধানিক ভাবে, অগনতান্ত্রীক ভাবে অপসারিত করেছিলো, কমিউনিষ্ট এবং তাদের জোট সঙ্গীদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে, কিন্তু ছাই দিয়ে আগুন চাপা রাখা যায়নি। সংগ্রাম, প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিলো, প্রতিবাদের আগুন দাবানল হয়ে হায়নাদের ষড়যন্ত্র জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিলো। ১৯৭৭ সালে আসলো মানুষের বহুপ্রতিক্ষিত বামফ্রন্ট সরকার, মানুষের দুঃখ্য নিবারণের জন্যে এবং এখনো আমরা, এই রাজ্যের মানুষ, শ্রমজীবি মানুষ, কৃষক ভাইয়েরা, ছাত্র, যুব , মহিলা এই সুসংঘঠিত সরকারের সদিচ্ছায়, সুপরিকল্পনায় (নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও)৩ ২ বছরের বেশী শাসনে , গর্বিত, সন্তুষ্ট এবং সমৃদ্ধ।


এই প্রবন্ধের কিচ্ছু তথ্য কমরেড জ্যোতি বসুর সেইসময়কার রাজ্যে বিধানসভাতে প্রতিবাদী ভাষণ এবং অনাস্থা প্রস্তবের ভাষণ থেকে সংগৃহিত ।