বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০০৯

জমে থাকা স্বপ্নেরা ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

জীবনের বেশ কয়েকটা বছর পেরিয়ে আসার পর, ইদানিং বড় অদ্ভুত একটা অনুভুতি মাঝে মাঝে মন কে আচ্ছন্ন করে রাখে। একজন সাধারন ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালি হিসেবে, জীবনে যা যা পাওয়ার থাকে, সেগুলো মোটের ওপর হয়ত পেয়েছি। নিজের ছোট্ট একটা বাড়ি, সংসার, সন্তান, চাকরি। সমাজে মোটামুটি একটা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু চিন্তা এসে মন কে বিকল করে দেয় সাময়িক ভাবে। কলেজ জীবনের কিছু রোম্যান্টিক স্বপ্ন। দিন বদলানোর স্বপ্ন, সমাজ নতুন করে গড়ার স্বপ্ন। মাঝে মাঝে ভাবি, সেই স্বপ্ন গুলো কি শেষ হয়ে গেল নিজের মধ্যে? অফিসে, পাড়ায় বা আড্ডায় সিপিএম – কংগ্রেস নিয়ে ঝগড়া হলে তো কোমর বেঁধে নেমে যাই। ব্রিগেড কিম্বা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মহামিছিলে নিয়মিত যোগ দি। এমন কি মাঝে মধ্যে ঝোঁকে পড়ে কয়েক টা বিপ্লবী পদ্য টদ্য ও লিখে বন্ধুদের পিঠচাপড়ানি পেয়ে যাই। কিন্তু নিজের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, এই কি সব? এর বাইরে বেরনো যায় না? আদর্শটা কি তবে ভোটের বাক্সে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ল? এমনটা তো কথা ছিলো না। ১৯৬৪ সালে যখন নতুন পার্টি তৈরি হল, সে সময়ে রাজনৈতিক ঘোষনাপত্রে বলা হয়েছিল, “মেহেনতি মানুষের নেতৃত্বে জনগনতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে পার্টি লড়াই করবে” এবং যতদিন পর্যন্ত না এই বিপ্লব সংগঠিত করা যাচ্ছে, ততদিন, মধ্যবর্তি ব্যবস্থা হিসেবে পার্টি, “যেখানে যেখানে সম্ভব, প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা হাতে নেবে, এবং বুর্জোয়া রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকে মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। একই সময়ে, ভুস্বামী এবং বুর্জোয়া শাষিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারন মানুষ কে শিক্ষিত করা হবে”। কেরালা ও পশ্চিম বাংলায় ষাঠের দশকের শেষ থেকে এরকম একটা স্থিতিশীল সরকার গড়ার চেষ্টা চলেছে। এবং প্রথম বার ১৯৭৭ সালে পশ্চিম বাংলায় এই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে।

যদি পশ্চিম বাংলাকে হিসেবের প্রথমে রাখি, তাহলে দেখবো ১৯৭৭ সালে, বামফ্রন্ট সরকার গঠনের অব্যবহিত পরেই অপারেশন বর্গার মাধ্যমে ভূমিসংস্কারের ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়। এই প্রসঙ্গে দুটি শব্দের একটু ব্যাখ্যা দিয়ে রাখি। জোত শব্দটি আমাদের সাহিত্যে এসেছে কম, কিন্তু পত্র পত্রিকায় প্রায়শঃই আমরা এই শব্দটির মুখোমুখি হই। জোত অর্থ খুব সহজে বলতে গেলে বলতে হয় জমি। চাষ যোগ্য জমি। যদিও জোতদার এর সরাসরি অর্থ জমিদার করার একটু অসুবিধে রয়েছে। কারন বাংলায় জমিদার শব্দের অর্থ সাধারন ভাবে জমির মালিক বোঝানো হয় না। ব্রিটিশ সরকারের চিরস্থায়ী বন্দোবস্থের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা এই দেশে জাঁকিয়ে বসে। জমিদার রা এক ধরনের সামন্ত প্রভু। কিন্তু গ্রাম্য সমাজে জোতদার কে জমিদারের শ্রেনী তে ফেলা যায় না সব সময়। জমি হয়ত অনেকেরই আছে, তবে কথাটা হলো, যাঁরই জমি আছে, তিনিই জমিদার নন। কিন্তু জোতদার হতেই পারেন। তেমনি ভাবে আসে বর্গাদার শব্দটা। যাঁদের জমি-জিরেত কিছু বেশি, তাঁরা নিজেরা চাষ করতে পারেন না। লোক লাগিয়ে চাষ করতে হয়। যাঁদের এই কাজে লাগানো হয়, মোটের ওপর তাঁরাই হলেন বর্গাদার। বামফ্রন্ট সরকার ভূমি সংস্কারের প্রথম ধাপ হিসেবে ভূমিহীন চাষীদের নথীভুক্ত করা হয়, এবং উর্ধসীমার ওপরে থাকা জমি বাজেয়াপ্ত করে ভুমিহীন চাষীদের মধ্যে বিলি করা হয়। লক্ষ্য করার মত বিষয় হলো, গ্রাম্য সমাজ কে একটা স্পষ্ট দাগ টেনে দু ভাগে ভাগ করা হলো। একদল যাঁদের আছে, একদল যাঁদের নেই। মার্ক্সবাদের একদম গোড়ার কথা। এই দাগ টানার মানেই শ্রেনী বিভাজন স্পষ্ট করা, এবং শ্রেনী সংগ্রাম শুরু করা। শ্রেনী সংগ্রামে লড়তে লড়তেই মানুষ অধিকার বোধ সম্পর্কে সচেতন হয়, এবং অধিকার ছিনিয়ে নিতে শেখে। ফলস্বরুপ লক্ষ্য করুন, আজ এই বাংলায় ৮৭% জমি রয়েছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের হাতে এ হলো প্রত্যক্ষ্য ফলাফল। এই লড়াইয়ের আর এক পরোক্ষ ফলাফল, স্বাধীনতার পরবর্তী কালেও টিঁকে থাকা গ্রামীন সমাজের সামন্ততান্ত্রিক অংশগুলো নির্মূল হয়। অর্থাৎ মানুষ লড়তে লড়তেই নিজেদের শিক্ষিত করেছেন, পথ চিনেছেন। নিজেদের অগ্রগতির পক্ষে ক্ষতিকারক, প্রতিক্রিয়াশীল অংশকে চিহ্নিত করেছেন, এবং লড়াই করেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে তার পরে। ভূমি সংস্কার মানে কি শুধু জমি ভাগ করা? আগে যে জমির মালিক ছিলো এক জন, এখন হয়ত ৫০ জন। যেখানে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা ছিল শতকরা ৮০%, এখন হয়ত সেটা নেমে ৩০% হয়েছে। কিন্তু জমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তো বদলায়নি। শুধু অনুপাতের কিছু হের ফের হয়েছে। সামন্ততান্ত্রিক পরগাছা হয়ত সাফ হয়েছে, কিন্তু তার জায়গায় জাঁকিয়ে বসেছে এক নতুন সৃষ্টি হওয়া “কুলাক” সম্প্রদায়। এঁরা জমি পেয়েছেন ৭৭ সালের পর। যতক্ষন সরাসরি স্বার্থে হাত পড়েনি, ততদিন কিন্তু এনারাই গ্রাম বাংলায় লাল ঝান্ডা উড়িয়ে রেখেছেন। কিন্তু যেদিন পরিবর্তনের আঁচ এসে গায়ে লাগলো, সেদিন শিবির বদলাতে এতটুকু সময় লাগেনি কারোর। কারন টা খুব সোজা। ৭৭ সালের কাটা দাগটা ফিকে হয়ে গেছে। যাঁরা সেদিনের বিপ্লবী অংশ, আজ তাঁদের অনেকেই কিন্তু পরিবর্তন কে স্বাগত জানাতে পারছেন না। কেননা, তাঁদের আশঙ্কা, যে টুকু তাঁরা পেয়েছেন, সে টুকু ও না যায়। তাহলে কি আজ যাঁরা বিপ্লবের অগ্রনী অংশ, কাল তাঁরাই প্রতিক্রিয়াশীল? তা কখনোই হতে পারে না। আসলে, শ্রেনী সংগ্রাম একটা অবিরাম চলতে থাকা লড়াই। বিপ্লবের অংশ। ভূমিসংস্কারের শুধুমাত্র একটা পর্য্যায় কিছুটা শেষ করেই থেমে যাওয়াটা হলো সবচেয়ে বড় ভুল। এক্ষেত্রে ভূমিসংস্কারের পরবর্তী পর্যায় গুলো পর পর চলে এলে হয়ত এই অবস্থা হতো না। অর্থাৎ শ্রেনী – সংগ্রাম তীব্রতর হবার বদলে প্রায় থেমে গেছে। আজকের গ্রাম বাংলার দিকে তাকান। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বসুন। দেখবেন, অপেক্ষাকৃত পশ্চাদপদ এলাকা গুলোতে লাল দুর্গ অটুট। কিন্তু হুঘলি, দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া বা পূর্ব মেদিনীপুরের মতো অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন জেলা গুলোতে পার্টির ভরাডুবি ঘটেছে। খোঁজ করে দেখুন, আজকে যাঁরা ঘাসফুলে ছাপ মারলেন, তাঁদের অনেকেই কিন্তু কয়েক মাস আগেও কাস্তে – হাতুড়ি ছাড়া অন্য কিছু তে ছাপ মারার কথা ভাবতেও পারতেন না। কেন এই পরিবর্তন এটা নিয়ে পার্টি কি কিছু ভেবেছে? বাহ্যিক প্রচার এবং আঙ্গিকে তো তার কোন প্রমান দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। জনগনতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে নির্বাচন কে গুরুত্ব দিতেই হবে, কিন্তু কেমন জানি মনে হচ্ছে নির্বাচনটাই প্রধান। বহু বছর যাবৎ বিপ্লবের কথা শুনিনা। কেন শুনিনা? তাহলে কি বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে গেছে? শ্রেনী সংগ্রাম সমাপ্ত? আমরা শ্রেনীহিন সমাজ গড়ে ফেলেছি? তা তো নয়। তাহলে আজ সরকারের ধুয়ো তুলে বিপ্লবের দাবী কে পেছনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কেন? রাজ্যসরকার যতই বামফ্রন্টের পরিচালিত হোক, এই সরকার আসলে ভারত সরকারের একটা অংশ। এবং তার চরিত্র বুর্জোয়া – প্রতিক্রিয়াশীল। সেটা ভুলে গেলে চলবে না।

কমরেড মাও এর একটা কথা আজ মনে পড়ে যাচ্ছে লিখতে বসে। সেটা হলো প্রতিটি কম্যুনিস্ট আদতে একজন বিপ্লবী। আজকে যদি “পরিবর্তিত পরিস্থিতি” তে পার্টি তে “বিপ্লব” কথাটা পেছনের সারিতে চলে গিয়ে থাকে, তাহলে প্রকৃত কম্যুনিস্টরাও আজ বোধহয় পেছনের সারি তে। উনিশ তম পার্টি কংগ্রেসএর দিকে তাকান। কংগ্রেস শেষ হবার পর কেন্দ্রীয় কমিটি এবং পলিটব্যুরো সদস্যদের শ্রেনীবিন্যাস লক্ষ্য করুন। বলতে পারেন কতজন এসেছেন সরাসরি শ্রমিক এবং কৃষক পশ্চাদপট নিয়ে? যতদুর মনে পড়ছে দলীয় মুখপত্র “পিপল্‌স ডেমোক্রাসি” তে সদস্যদের শ্রেনীবিন্যাস সর্ম্পকিত তথ্য দিয়ে একটা লেখা বেরিয়েছিলো। আমার তথ্যসূত্র সেটাই। মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন কৃষক নেতা কিম্বা কারখানার তেলকালি মাখা ছাড়া ধোপদুরস্থ ধুতি পাঞ্জাবি পরা শ্রমিক নেতা কি ভাবে শ্রেনী স্বার্থ রক্ষা করবেন সেটা আমার মাথায় ঢোকেনা। তবে আশার কথা যে একেবারে নেই তা নয়। রাজস্থানে পার্টি দুর্দান্ত ভাবে কৃষক আন্দোলন পরিচালনা করেছে। তার ফল ও পেয়েছে বিধানসভা নির্বাচনে। অন্ধ্রপ্রদেশেও তাই। সেখানে নকশালপন্থি বহু মানুষ এসে সামিল হয়েছেন পার্টির সঙ্গে। খাম্মামে পার্টি যে লড়াই টা দিয়েছে, সেটা ভোলার নয়। আর সবার ওপরে রাখছি পার্টির রাজনৈতিক দলিলকে। সেখানে কোনোপ্রকার দ্বিধা নেই। সমস্যা যে টুকু সামনে এসে দেখা দিয়েছে সে সমস্যা প্রতিটি কম্যুনিস্ট পার্টির সামনেই আসে। আজকের সুশীল সমাজ এবং একশ্রেনীর পার্টি নেতাদের সংশোধনবাদ সম্পর্কে সেই চল্লিসের দশকেই সাবধান করে দিয়ে গেছেন আন্তোনিও গ্রামশী। মাও বলেছিলেন বিপ্লবের পরেও বুর্জোয়ারা উৎখাত হতে চায় না। তারা আশ্রয় নেয় কম্যুনিস্ট পার্টির ভেতরে, আর জাঁকিয়ে বসে আমলাতন্ত্র। তার ফলাফল তো চোখের সামনেই রয়েছে। সোভিয়েত ইঊনিয়ন কে ভেঙে পড়তে দেখেছি আমরা। ক্ষমতার অলিন্দে থাকা একটা সুবিধেবাদী অংশ আশ্রয় নিয়েছে পার্টি তে। দরকার একটা জোরদার অভ্যন্তরিন লড়াইয়ের। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া একটা অংশই কিন্তু সব নয়। মনে পড়ে যায় অসংখ্য মুখ, যেখানে প্রখর আদর্শবোধ ফুটে বেরোয় চোখের দৃষ্টি তে। এই অসংখ্য মুখগুলোই পিছু টেনে ধরে রাখে। এরাও পার্টি। টয়োটা চড়া নেতাদের থেকে এঁদের সংখ্যা যে অনেক বেশি। আর এনারাই আমার প্রকৃত কমরেড। কাজেই হতাশার কোনো জায়গা নেই। লড়াইটা কঠিন মানছি। কিন্তু ভেবে দেখুন, যে পার্টি একদিন স্লোগান দিয়েছে “এ লড়াই বাঁচার লড়াই, এ লড়াই জিততে হবে”, তার ঝাণ্ডার তলায় যে কোনো লড়াই ই লড়া যায়।

সব শেষে বলি, পার্টির কেউ যদি আপনার মতে ভুল করে থাকে, তবে ছেড়ে দেবেন? কেন কমরেড? পার্টি টা আপনার নয়? গা ঝাড়া দিন কমরেড। লাল ঝান্ডা ডাকছে আপনাকে।