শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০০৯

কংগ্রেস নয়, বি জে পি নয়, লক্ষ্য তৃতীয় শক্তির সরকার ~ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য




আমাদের মূল লক্ষ্য কেন্দ্রে একটি বিকল্প সরকার গঠন করা। অর্থাৎ কংগ্রেসও নয়, বি জে পি-ও নয়। বাম, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক শক্তির বিকল্প সরকার। এর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর এজন্যই এবারের নির্বাচনে বামপন্থীদের নিজেদের জমিকে শক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরী। গণশক্তি-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বল‍‌লেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এরাজ্যে বিরোধীদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ, নীতিহীন জোট, রাজ্যকে ভাঙার ষড়যন্ত্র নিয়ে যেমন আলোচনা করেছেন, তেমনই সরকারের উন্নয়নের বিভিন্ন দিক, অভিমুখ উঠে এসেছে কথোপকথনে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অতনু সাহা

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে প্রথম প্রশ্নটাই ছিল এবারের লোকসভা নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে কারণ গত পাঁচ বছরের রাজনৈতিক ঘটনাক্রম বহুমুখী প্রথমত সাম্প্রদায়িক বি জে পি-কে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে কংগ্রেসের ইউ পি এ জোটকে শর্তসাপেক্ষে বাইরে থেকে সমর্থন জানালো বামপন্থীরা সেই শর্ত ছিল সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী মেনে চলা। কংগ্রেস মানেনি। উলটে আমেরিকার কাছে নতজানু হয়ে কংগ্রেস দেশকেই বিকিয়ে দিচ্ছে তাই জানতে চাইলাম এবারের নির্বাচনে বামপন্থীদের বক্তব্যের মূল অভিমুখ কী?

উঃ এবারের লোকসভা নির্বাচনে বামপন্থীদের মূল লক্ষ্য একটি বিকল্প সরকার তৈরি করা। কংগ্রেসও নয়, বি জে পি-ও নয়। এখন বলা যায়, বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক আঞ্চলিক দলগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবার সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে হবে।

প্রঃ .... এই আঞ্চলিক দলগুলোর অবস্থান কী এক জায়গায় থাকবে?


উঃ এখানেই বামপন্থীদের দায়িত্ব। তৃতীয় বিকল্প গড়ে ওঠার যে সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাকে কর্মসূচীগত ঐক্যের ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হবে। যার ভিত্তিতে চলবে এই সরকার। এই ঐক্যের ভিত্তি হবে শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, সংখ্যালঘু এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বার্থে কাজ করার কর্মসূচী। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করা, রা‍‌জ্যের হাতে আরও ক্ষমতা দেওয়া। তৃতীয়ত, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে বলিষ্ঠভাবে রূপায়িত করা। এবং চতুর্থত, স্বাধীন বিদেশনীতি। অর্থাৎ আমেরিকার দিকে ঝুঁকে পড়া বিদেশনীতিকে আবার নিজের পায়ে দাঁড় করানো। এই চারটি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে সরকার গড়াটাই বর্তমান পরিস্থিতির দাবি। যার বাস্তবতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, নির্বাচনের পর আরও হবে।

প্রঃ আরেকটা বিষয়, ভয়ঙ্কর আর্থিক মন্দা, বিশ্বজোড়া এই সঙ্কট
এবারের নির্বাচনে তার গুরুত্ব কতটা? বামপন্থীদের ভাবনায় তার থেকে দেশকে বাঁটচানোর রাস্তা কী?
উঃ বিশ্ব আর্থসঙ্কট অবশ্যই এবারের নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। যেহেতু কংগ্রেস বা বি জে পি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনুসৃত তথাকথিত নয়া বিদেশনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায় না, তাই সঙ্কটের ছাপ আমাদের দেশেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কর্মসঙ্কোচন হচ্ছে, কর্মী ছাঁটাই হচ্ছেন। রপ্তানির বাজারে মন্দা, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প থেকে তথ্য প্রযুক্তি সবই আক্রান্ত। এ‍ই সঙ্কটের মুখোমুখি হতে পারবে কোন্‌ সরকার? কোন্‌ সরকার পারবে দেশের অর্থনীতিকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে? কংগ্রেসও নয়, বি জে পি-ও নয়, তা পারবে একমাত্র তৃতীয় বিকল্প সরকারই।

প্রঃ এই সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে বামফ্রন্ট সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটা কী একটা বিকল্প দিশা হিসাবে ধরা যেতে পারে?
উঃ একটা রাজ্য সরকারের ক্ষমতা খুবই সীমাবদ্ধ। দেশের আইন, আর্থিক নীতির চৌহদ্দির মধ্যেই কাজ করতে হয়। তবু এই সঙ্কটের মুখোমুখি যতখানি সম্ভব রাজ্যের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা আমরা করেছি। ৫১০৬ কোটি টাকার একটা বিশেষ ব্যয়-বরাদ্দ করেছি। যার মধ্যে দিয়ে পরিকাঠামো নির্মাণ শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে এবং কর্মসংস্থানের মত বিষয় অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কেন্দ্রীয় সরকারও একটা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। সারা দেশের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা। প্রথমত, এটা যথেষ্ট নয়, দ্বিতীয়ত, এই ব্যয় বরাদ্দের অভিমুখটা গরিব সাধারণ মানুষের দিকে নয়। এখানেই ওদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য। এখানেই বিকল্পের লড়াই।

প্রঃ গত কয়েকটা নির্বাচনেই দেখা গেছে, কংগ্রেস নয়, বি জে পি, কোন্‌ বিপদটা বড়? নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে এবারও কী তেমন বিষয় সামনে চলে আসতে পারে?
উঃ প্রথমেই ফারকটা বুঝে নেওয়া ভালো। এবারের নির্বাচনের প্রশ্ন কংগ্রেস এবং বি জে পি’র বিকল্প হিসাবে তৃতীয় শক্তির সরকার তৈরি করা। বি জে পি-র মৌলবাদী বিপদতো আছেই। কিন্তু কংগ্রেসও আমেরিকার সঙ্গে যে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ গড়তে চায় তার বিপদও কম নয়। তাই আমাদের লক্ষ্য দু’পক্ষকেই পরাস্ত করা।

প্রঃ আরেকটা প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে উঠে আসছে বাইরে থেকে হলেও যেহেতু ইউ পি এ সরকারকে বামেরা সমর্থন করেছিল, তাই ওদের খারাপ কাজের দায় বামপন্থীদেরও আপনি এই বিষয়টি সম্পর্কে কী বলবেন?
উঃ এটা ঠিক যে, গতবার কংগ্রেসের জোটকে আমরা সরকার গড়তে সমর্থন দিয়েছিলাম, বলা ভালো দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আর তা করেছিলাম একটিই কারণে, তাহলো সাম্প্রদায়িক বি জে পি, আর এস এসের কাছ থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু কংগ্রেসের কোন জনবিরোধী কাজ আমরা সমর্থন করিনি, প্রতি পদক্ষেপে বিরোধিতা করেছি। শেষপর্যন্ত পারমাণবিক চুক্তির প্রশ্নে এক অসম্ভব পরিস্থিতি সৃষ্টি করলো কংগ্রেস। তখন বাধ্য হয়েছিলাম সমর্থন তুলে নিতে। দেশের মানুষ এটা বুঝেছেন। বর্তমান মার্কিনী অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থায় মানুষ আরও বুঝছেন আমাদের মার্কিন বিরোধিতার কেন প্রয়োজন ছিল।

প্রঃ গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে তৃতীয় শক্তি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে কংগ্রেস বি জে পি-র আক্রমণের মূল লক্ষ্যও হয়ে উঠেছে তৃতীয় শক্তি কিন্তু তৃতীয় শক্তি কী সত্যিই সংহত? সত্যিই বিকল্প সরকার দিতে সক্ষম হবে?
উঃ তৃতীয় ফ্রন্ট সত্যিই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে শক্তি এবং সংখ্যার বিচারে। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। কর্মসূচীর ভিত্তিতে একে আরও সংহত করতে হবে। সেই আলোচনা শুরুও হয়েছে। নির্বাচনের পরেও সেই আলোচনা হবে। সঠিক কর্মসূচীর ওপর দাঁড়ালেই বিকল্প সরকার গড়ে তোলা সম্ভব। বামপন্থীরা এই কর্মসূচীর ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। কোন বিশেষ দল বা নেতাকে নয়।

প্রঃ দেখুন, এখনই পরিষ্কার বলে দেওয়া যায় নির্বাচনের পরেও জোট গঠন প্রক্রিয়া চলবে সব শিবিরেই ইউ পি এ এবং তৃতীয় শক্তি দু’দিকেই এটা সমান সত্যি এতে সুবিধাবাদী রাজনীতির জন্ম নেবে কী? বামপন্থীদের অবস্থান কী হবে?
উঃ হ্যাঁ, এটা ঠিক যে নির্বাচনের পর জোট গঠনের প্রক্রিয়া আরও সুস্পষ্ট চেহারা নেবে। ইউ পি এ আরও ভাঙবে, এন ডি এ ভাঙবে। এই ভাঙাভাঙির মুখে যে নতুন শিবিরের জন্ম হবে তাকে কর্মসূচীগত ঐক্যে রূপান্তরিত করতে হবে। না হলে সেটা হবে সুবিধাবাদ। এখানেই বামপন্থীদের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব আমরা পালন করবো।

প্রঃ তেমন পরিস্থিতিতে কী বামপন্থীরা সরকারে যাবে?
উঃ পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিচার করে, তারই পটভূমিতে ঠিক করতে হবে আমরা সরকারে যাব কিনা।

প্রঃ যদিও লোকসভার নির্বাচন, কিন্তু এরাজ্যে বিরোধীরা রাজ্যের ইস্যুগুলোই বলে যাচ্ছে আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
উঃ আসন্ন নির্বাচন লোকসভার হলেও, এরাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকার এবং বিরোধী দলগুলোর অবস্থান নির্বাচনী লড়াইয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশেষ করে রাজ্য উন্নয়নের পথে চলবে না দাঁড়িয়ে থাকবে? কৃষির সাফল্য থে‍‌কে শিল্পায়ন কী সঠিক রাজনীতি নাকি বিরোধীদের ধংসাত্মক বিরোধিতাই সঠিক? রাজ্যকে উত্তরে-দক্ষিণে ভাঙাভাঙির যে ষড়যন্ত্র, সেই বিষয়ে মানুষের মনোভাব কী তা তো নির্বাচনী লড়াইতে আসবে। কিন্তু যেহেতু লোকসভা নির্বাচন অতএব দেশের সরকার কী হবে, তার নীতি কী হবে তা প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু মুশকিল হলো এনিয়ে আমাদের রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের তেমন কোন কথা শোনা যায় না। কখনও কংগ্রেসের বক্তব্যই ওদের বক্তব্য, কখনও বি জে পি-র বক্তব্যই ওদের বক্তব্য।

প্রঃ এবার তো তৃণমূল জোট করেছে কংগ্রেসের সঙ্গে আপনি এই জোটকে কীভাবে দেখছেন?
উঃ বিরোধীদের এই জোট সম্পর্কে বলা যেতে পারে, কংগ্রেস তাদের দুর্বল অবস্থা থেকে খড়কুটো ধরে বাঁচতে চাইছে। আর সেজন্য সর্বভারতীয় একটা দল নিজেদের নীতি স্বার্থ বিসর্জন দিয়েও তৃণমূলী জোটের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। অস্তিত্ব রাখার চেষ্টা বলা যেতে পারে একে। কংগ্রেস জোট করেছে ঠিকই কিন্তু তারা এখনও নিশ্চিত নয়, অতীতের মতো তৃণমূল আবার বি জে পি শিবিরে ফিরে যাবে কিনা। দেখা গেছে, এই নীতিহীন অবস্থানই কংগ্রেসকে বারে বারে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নীতিহীন জোটের এটাই হয় অনিবার্য ফলাফল।

প্রঃ কিন্তু তৃণমূল তো আগে থেকে নানা রঙের পতাকাধারী দলের সঙ্গে জোট করে বসে আছে...
উঃ হ্যাঁ, সেতো আরও মারাত্মক। কংগ্রেসও সেটা জানে। চরম দক্ষিণপন্থী থেকে চরম বামপন্থী সবরকম দলের সঙ্গেই তৃণমূলের কোথাও প্রকাশ্য, কোথাও অপ্রকাশ্য সমঝোতা আছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী, সন্ত্রাসবাদী সমস্ত শক্তিকেই ওরা ওদের জোটে জড়ো করেছে। এটা এরাজ্যের গণতন্ত্রের পক্ষে, উন্নয়নের পক্ষে বড় বিপদ। এসব মানুষ দেখছেনও।

প্রঃ এধরনের জোট সম্পর্কে, ওদের কার্যকলাপ সম্পর্কে রাজ্যের মানুষ নিশ্চয়ই বুঝছেন কিন্তু ওদের নৈরাজ্যের কার্যকলাপ এরাজ্যের কতটা ক্ষতি করেছে?
উঃ বিরোধীদের নৈরাজ্য সৃষ্টি, রাজ্যের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে খানিকটা প্রশ্ন চিহ্ন যে টেনেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু মূলত আমরা তাকে অতিক্রম করেই এগচ্ছি, ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাব। শিল্পের জন্য পুঁজি আসছে, এই সঙ্কটের মধ্যেও আসছে।

প্রঃ বিরোধীদের এই নৈরাজ্য সৃষ্টি, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ রাজ্যের ক্ষতি করেছে এটা যেমন বাস্তব, আবার অনেকে মনে করেন প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল আরও দৃঢ় পদক্ষেপের কথা বলছেন অনেকেই আপনি কী মনে করেন?
উঃ একথাটা আমিও বিভিন্নভাবে শুনেছি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল। যেমন ধরা যাক সিঙ্গুরের ক্ষেত্রে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম জনসমর্থনের ভিত্তিতেই কারখানাটি হোক। কারখানা, কর্মসংস্থান এটাইতো আমাদের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বিরোধীরা তা হতে দেয়নি। এই সময়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের লালগড় অঞ্চলে যে অবস্থার সৃষ্টি করেছে, বলা যেতে পারে, তৃণমূল-মাওবাদীরা আমাদের ধৈর্য পরীক্ষা করছে। কিন্তু আমাদের চেষ্টা ছিল এবং এখনও আছে, শুধু প্রশাসন নির্ভর নয়, রাজনৈতিকভাবেই সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই সমস্যার মুখোমুখি হওয়া। ২০০৭-এ নন্দীগ্রামেও কিছু মানুষ ভুল বুঝলেন। ওখানে আমাদের শিল্প গড়ার পরিকল্পনা কী, রাসায়নিক শিল্প, পেট্রোকেমিক্যাল এসব বোঝানোর আগেই অন্য ঘটনা ঘটতে শুরু করলো। আমরা তখনই জমি অধিগ্রহণ না করার সরকারী সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিই। তা সত্ত্বেও টানা একবছর সেখানে কেন একের পর এক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে চললো, মানুষ এখন তা বুঝতে পারছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন তৃণমূল-মাওবাদীদের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল। এইসব অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতে আমাদের আরও সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন আছে।

প্রঃ এসব ঘটনায় সরকারের শিল্পায়ন নীতি কী কিছুটা থামকে দাঁড়িয়েছে? মনে হতে পারে, অবস্থা কিছুটা থিতু হোক, ততোক্ষণ ধীরে চলো এটা কী সরকারের এখনকার মনোভাব
উঃ না, বিন্দুমাত্র নয়। সরকারের শিল্পায়ন নীতি দাঁড়িয়ে যায়নি। বিগত এক বছরে যে বিনিয়োগ হয়েছে, কিংবা আগামী এক বছরের জন্য যে বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো এখন আমরা বিবেচনা করছি, তাতে থমকে যাবার মতো অবস্থা যে হয়নি তা স্পষ্ট। কিন্তু সরকারের মনোভাবের দিক থেকে একথা বলতে পারি, জ‍‌মি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন পরিকল্পনা আরও নিখুঁত করা দরকার, তার জন্য যেটুকু সময় লাগছে তা লাগবে। বলতে পারেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী থেকেই আমাদের এই সতর্ক ব্যবস্থা।

প্রঃ মাওবাদীদের কার্যকলাপ, সন্ত্রাসবাদীদের সক্রিয় হয়ে ওঠা গোটা রাজ্যেই উদ্বেগ তৈরি করছে প্রশাসন কি ভাবছে, পার্টি কী করবে?
উঃ ঠিকই, এটা উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। আমাদের রাজ্যের পশ্চিমে ঝাড়খণ্ড রাজ্যকে ব্যবহার করতে পারছে বলে এই লাগোয়া অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালাচ্ছে। তাদের একটা অংশ আবার প‍‌শ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়াকে ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। এসমস্ত ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য প্রশাসনকে আরও তৎপর করা। কিন্তু সর্বোপরি রাজনৈতিক সমাবেশের মধ্যে দিয়ে একে নির্মূল করা।

প্রঃ উত্তরেও সমস্যা বাড়ছে আরেকটা বিষয় সমস্ত ক্ষেত্রেই দেখা যা‍‌চ্ছে এদের সঙ্গে রয়েছে তৃণমূল....
উঃ হ্যাঁ, তা তো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে তৃণমূল। এরাই এই শক্তিগুলোকে একত্রিত করছে। দার্জিলিঙ আসছে লালগড়ে। লালগড় যাচ্ছে দার্জিলিঙে। সকালে লালগড় ফোন করছে তৃণমূল দপ্তরে, রাতে ফোন যাচ্ছে ঝাড়খণ্ডে, মাওবাদী ডেরায়। সতর্ক থেকেই এর মোকাবিলা করতে হবে। এরাজ্যের মানুষও বুঝছেন কতটা বিপজ্জনক ওরা।

প্রঃ একইসঙ্গে সংখ্যালঘু কিংবা আদিবাসীদের বিভিন্ন ইস্যু তুলে তাদের বিভ্রান্ত করারও চেষ্টা চলছে বিরোধীরা একে ব্যবহার করতে চাইছে ভোটে এই বিষয়টা আপনি কিভাবে দেখছেন?
উঃ একটা জিনিস স্পষ্ট হচ্ছে দার্জিলিঙ হোক বা কোচবিহার, পশ্চিম মেদিনীপুর কিংবা সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কোন এলাকাই হোক, একটা পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে এই অংশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা, বামবিরোধী করে তোলা। কিন্তু একটা বিষয় জোর দিয়ে বলা যায়, ৩০ বছর অতিক্রম করে আদিবাসী কিংবা তফসিলী সম্প্রদায় অথবা সংখ্যালঘু মানুষের জীবনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। জমি পেয়েছেন, শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে, কর্মসংস্থানও বেড়েছে। কিন্তু সেটা সবক্ষেত্রে আশানুরূপ নয়। আমরা চেষ্টা করছি। যদিও এখনই সব পরিবর্তন ঘটে যাবে তা আমরা মনে করি না। যেমন আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলো অতীতের চেহারা থেকে বর্তমানে অনেক পালটে গেছে। জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তুলনামূলক বিচারে তাদের পিছিয়ে পড়া অবস্থাকে বিরোধীরা ব্যবহার করতে চাইছে। আমরা বিশ্বাসী, সঠিকভাবে আমাদের কর্মসূচীগুলো রূপায়ণ করতে পারলে, রাজনৈতিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতে পারলে, বিরোধীদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। অতীতেও তা হয়েছে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী কিংবা তফসিলী সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাম শিবিরে ছিলেন, এখনও আছে। নির্বাচনী ফলাফলেও তার প্রতিফলন ঘটবে।