মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০০৯

জোট বাধো, তৈরি হও... ~ বিমান বসু

জোট বাধো, তৈরি হও... কমরেড বিমান বসুর আহ্বান

পৃথিবীর ১৯৫টি স্বাধীন দেশের মধ্যে মানবোন্নয়নসূচকে আমাদের প্রিয় দেশ ভারতের অবস্থান ১৩২। অথচ আমাদের ভারত প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদ এবং মানব সম্পদে ভরপুর একটি দেশ। সঠিকভাবে জনগণের স্বার্থে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা উন্নয়নের কর্মসূচী বাস্তবে রূপায়িত করলে মানব সম্পদ উন্নয়নের সূচকের এই পরিণতি হতো না।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর আমরা ৬১ বছর পার করে এখন ৬২ বছরে পদার্পণ করছি। এই দীর্ঘ সময় পার করে এখনও আমাদের দেশ কৃষিতে স্বয়ম্ভর হতে পারলো না, শিল্পোন্নত দেশ হিসাবে পরিণত হলো না, দেশের মানুষের দারিদ্র্য ঘুচলো না এবং এখনও আমাদের নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে অভিযান শেষ হলো না।

এই সবই হয়েছে জনস্বার্থবিরোধী, পুঁজিবাদী পথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনার ফলশ্রুতিতে। কারণ ভারত রাষ্ট্র বৃহৎ পুঁজিপতিদের নেতৃত্বে পুঁজিপতি-জমিদারদের শ্রেণীশোষণের যন্ত্র। যারা ক্রমশ বৈদেশিক লগ্নীপুঁজির সঙ্গে সহযোগিতা করছে ভারতে পুঁজিবাদী পথে উন্নয়নকে পরিচালিত করতে। স্বাভাবিকভাবে বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে তার প্রভাব থেকে ভারত মুক্ত থাকতে পারে না।

যদিও একথা সত্য ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)সহ দেশের বামপন্থীরা বিগত বেশ কিছু বছর ধরে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সংস্থা, বীমা, নবরত্নসহ রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রায় সবই বিরাষ্ট্রীয়করণের পরিকল্পনাকে প্রতিরোধ করতে পেরেছে। যদি এসব বেসরকারী হাতে চলে যেত, তাহলে ভারতের অর্থনীতি একেবারে তাসের ঘরের মতো ভেঙে যেতো। আমাদের বিরোধী অর্থনীতিবিদরা এখন স্বীকার করছেন। সি পি আই (এম) এবং বামপন্থীরা সংসদে এবং সংসদের বাইরে বেসরকারীকরণের নীতির প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে এ কাজ না করতে পারলে, বিশ্বের অর্থনীতির সঙ্কটে সমস্ত কুফল আমাদের দেশের উপর পরোক্ষভাবে পড়তো। এইসব হওয়া সত্ত্বেও অপ্রত্যক্ষ প্রভাব আমাদের অর্থনীতির উপর পড়েছে। আমাদের বিদেশে রপ্তানি বাণিজ্য চূড়ান্তভাবে আক্রান্ত। ইতোমধ্যে প্রায় ১২-১৩ লক্ষ রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনের কাজে যুক্ত মানুষ কর্মচ্যুত হয়েছেন। রপ্তানি বাণিজ্য আরো মার খাবে। ইতোমধ্যে বণিকদের সংগঠক অ্যাসোচেম লক্ষ্ণৌ করে দেখেছে নতুন অর্থনৈতিক বর্ষে আগামী ৩ সাড়ে ৩ মাস পরে ভারতে কর্মরত প্রায় ১ কোটি মানুষ কর্মচ্যুত হবেন। এমনিতেই আমাদের দেশে কয়েক কোটি মানুষের বেকারীর জীবনযন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দরদাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। শহরাঞ্চলে গরিব মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। আবার গ্রামের কৃষক যা ফসল ফলান তাঁরা দামে মার খাচ্ছেন। অন্যদিকে ঋণের জোয়ালে আবদ্ধ হয়ে দেশের লক্ষ লক্ষ কৃষক প্রতিবছর আত্মহত্যাই তাঁদের বাঁচার একমাত্র পথ হিসাবে বেছে নিচ্ছেন। তথাপি গরিব মানুষের জন্য গণবণ্টন ব্যবস্থাকে দেশব্যাপী গড়ে তোলা হচ্ছে না। যা রয়েছে তাকেও ভেঙে ফেলার প্রচেষ্টা চলছে।

এই অবস্থায় কংগ্রেস নেতৃত্বে ইউ পি এ সরকার ভারত-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদন করলো এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করলো। আবার মিথ্যাপ্রচার শুরু করলো সি পি আই (এম) ও বামপন্থীরা ভারতের গ্রামে গ্রামে পারমাণবিক বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে বাধা সৃষ্টি করছে। এটা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ২০৩০ সালে পারমাণবিক বিদ্যুতের জন্য চুল্লি ব্যবহার করলে তা দেশের বিদ্যুতের চাহিদার মাত্র ৮% সরবরাহ করার ক্ষমতা অর্জন করবে। আর এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ তৈরি করা যেমন ব্যয়বহুল, অনুরূপভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীকে তাপবিদ্যুৎ (কয়লার ভিত্তিতে) তার থেকে অনেক বেশি দাম দিয়ে কিনতে হবে। জলবিদ্যুতের প্রায় ৩ গুণ ব্যয় করতে হবে। ‍‌যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন সাধারণ মানুষের সাহায্যে আসবে না, তা করেই বা লাভ কী?

ভারত রাষ্ট্রের এই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক নীতি যা কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউ পি এ জোট সরকার পরিচালনা করছে অতীতে যা বি জে পি’র নেতৃত্বে এন ডি এ সরকার পরিচালনা করেছে তার ফলশ্রুতিতে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযন্ত্রণা বাড়ছে বৈ কমছে না। আর স্বাভাবিকভাবে পুঁজিপতিদের সৃষ্ট সঙ্কটের বোঝা শ্রমিক, শ্রমজীবী জনগণ, গরিব কৃষক ও সাধারণ নিম্নবিত্তদের ঘাড়ে স্থানান্তরিত করে চলেছে। এই অবস্থায় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে বাধ্য। এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র মৌলবাদী শক্তি, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি ও সন্ত্রাসবাদী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে দেশের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, ২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর, সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে সব ধরনের দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়ার শক্তি, মৌলবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তথাকথিত মাওবাদীদের মিলিত কর্মসূচীতে রাজ্যজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা চলছে। কৃষির সাফল্যকে সংহত করে কৃষির বৈচিত্র্যকরণের কর্মসূচীকে প্রসারিত করে রাজ্যে শিল্পবিকাশের সরকারী প্রচেষ্টা বানচাল করার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে অশুভ শক্তির জোট মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এই অশুভ জোট বামফ্রন্ট সরকারের বিগত দিনের সাফল্যকে খাটো করে দেখিয়ে উন্নয়নকামী সব ধরনের কর্মসূচী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আবার নতুন করে বাংলাকে ভাগ করার জন্য উত্তরবঙ্গে দার্জিলিঙের গোর্খাল্যান্ডের দাবিকেও সমর্থন করছে, সমর্থন করছে কামতাপুর ও গ্রেটার কোচবিহারের দাবিকে। আবার রাজ্যের পশ্চিমাংশে পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়াকে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সাথে যুক্ত করে গ্রেটার ঝাড়খণ্ডের দাবিকে সমর্থন করছে।

এইসব চক্রান্তমূলক রাজ্যবিরোধী ও রাজ্যবাসীর শত্রুতাকারী কর্মসূচীকে পরাস্ত করতে রাজ্য বামফ্রন্টের নেতৃত্বে সমস্ত স্তরের গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে সচেতনভাবে ঐক্যের দৃঢ়প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গে জনস্বার্থবাহী কর্মসূচী রূপায়ণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিকল্পে বামফ্রন্ট ও বামফ্রন্ট সরকারকে শক্তিশালী করতে এবং আমাদের রাজ্যসহ সারা দেশের জনগণের মৌলিক দাবিগুলিকে সোচ্চার করতে সংসদে বামফ্রন্টের শক্তিবৃদ্ধি এই মুহূর্তে জরুরী কর্তব্য। এই কাজ করতে তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস ও বি জে পি-সহ সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীলদের মুখের মতো জবাব দেওয়ার জন্য এক্ষুনি প্রয়োজন আরো বেশি মানুষের সমর্থন, প্রয়োজন গ্রাম-গঞ্জ-শহর-বস্তিতে এবং গরিব মানুষের পাড়ায় পাড়ায় নিবিড় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি। আরো প্রয়োজন লোকসভার ৪২ আসনের প্রায় ৬৩ হাজার বুথে (অক্সিউলারিসহ) বুথ সংগঠনকে মজবুত করে গড়ে তুলে বুথের এলাকায় মানুষের কাছে বামফ্রন্টের রাজনৈতিক প্রচার ধারা পৌঁছে দেওয়া।

নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বিরুদ্ধে শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে লোকসভার ৪২টি আসনে বামফ্রন্ট প্রার্থীদের জয়ী করার শপথ গ্রহণ করুন।