বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০০৯

পঞ্চদশ লোকসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিত ও আমাদের কর্তব্য ~ নিরুপম সেন



আসন্ন লোকসভা নির্বাচন, এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগ্রাম। দেশ ও রাজ্যের সামগ্রিক বিষয়গুলি বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতেই বামফ্রন্ট নির্দিষ্ট স্লোগানকে সামনে রেখে এই সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে।

 ৫০ শতাংশের বেশি মানুষের ধারাবাহিক সমর্থন বামফ্রন্টের প্রতি

বিগত কয়েক দশক বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিচালনা করছে। এই সময়কালে বহুবার বিবিধ আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছে বামফ্রন্ট। বামফ্রন্টের নেতা-কর্মীরা অপরিসীম ধৈর্য, অধ্যাবসায়, বীরত্ব এবং অসীম সাহসিকতার সঙ্গে সেই আক্রমণকে মোকাবিলা করার মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাপকতর অংশের সমর্থনকে বামফ্রন্টের পক্ষে ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছেন। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি অঙ্গরাজ্যে একাদিক্রমে প্রায় ৫০ শতাংশ অথবা তার বেশি জনসমর্থন নিয়ে এভাবে সরকার পরিচালনার অধিকার আর কোন রাজ্যে, অন্য কোন রাজনৈতিক দল বা ফ্রন্টকে জনগণ দেয়নি। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবাংলার বামফ্রন্ট সরকার এবং বামফ্রন্টের দলগুলি মানুষের চেতনাকে এমন একটি পর্যায়ে উন্নীত করতে পেরেছে, যে কারণে মানুষের ভোটদানের অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আমাদের রাজ্য, যে-কোন রাজ্যের তুলনায় অনেক এগিয়ে।

রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশের ফলেই এই উত্তরণ। আমাদের রাজ্যে যে-কোন নির্বাচনেই ৮০ শতাংশের নিচে ভোটদানের হার থাকে না। এ-রাজ্যে মোট ভোটারের কখনো ৮৫ শতাংশ, কখনো ৯০ শতাংশ, এমনকি ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত মানুষ স্ব-স্ব ভোটাধিকার প্রয়োগ করে থাকেন। এই যে বিপুল সংখ্যক মানুষ তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, তার ৫০ শতাংশ বা তার বেশি শতাংশ মানুষের সমর্থনে বামফ্রন্ট এ-রাজ্যে বিগত ৩২ বছর ধরে বিভিন্ন নির্বাচনী সংগ্রামে জয়লাভ করে আসছে। এমনকি বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনেও। যে নির্বাচনকে ঘিরে সারা রাজ্যে, সারা দেশজুড়ে এমন প্রচার তীব্রভাবে তোলা হয়েছে যে, পশ্চিমবাংলার বামফ্রন্ট সরকার গণভিত্তি হারিয়েছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে সমস্তরকমভাবে তীব্র আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়, তীব্র কুৎসা, তীব্র অপপ্রচার। বামফ্রন্টের মধ্যেও কিছুটা অনৈক্যের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। এইরকম তীব্র আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়েও মানুষ যেমন রেকর্ড হারে ভোট দিয়েছেন, তেমনই প্রদত্ত ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি ভোট বামফ্রন্টের অনুকূলেই এসেছে।

 বামফ্রন্ট থেকে গরিব মানুষকে বিচ্ছিন্ন করতে হীন, ভয়ঙ্কর, বহুমুখী অপপ্রচার

এতো বহুমুখী আক্রমণ বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে আগে কখনও সংগঠিত হয়নি। আগেও বহু আক্রমণের মুখোমুখি সি পি আই (এম) তথা বামফ্রন্ট হয়েছে। শারীরিকভাবে আমাদের নিশ্চিহ্নকরণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই সময়কালে যেভাবে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে আক্রমণগুলি নামিয়ে আনা হয়েছে ও হচ্ছে, সেই আক্রমণের মূল লক্ষ্য হলো বামফ্রন্ট এবং তার নেতৃত্বে যেহেতু সি পি আই (এম), সুতরাং সি পি আই (এম) থেকে গরিব মানুষকে বিচ্ছিন্ন করা। এবং এর জন্য সমস্তরকম হীন ও ঘৃণ্য কৌশল, সমস্তরকম মিথ্যাচার অবলম্বন করা হচ্ছে।

শুধু বামফ্রন্টের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে এই কাজ করা হচ্ছে তাই নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মিথ্যাচার, হীন-ঘৃণ্য কৌশল মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য আমাদের রাজ্যের প্রচার মাধ্যমগুলির একটি বড় অংশ বেনজিরভাবে নেমে পড়েছে। এবং সে প্রচার দেশজুড়ে, পৃথিবীজুড়ে করা হচ্ছে। এমনকি আগে কখনও ঘটেনি। এইরকম এক ভয়ঙ্কর আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে বামফ্রন্ট এই নির্বাচনী সংগ্রামকে পরিচালনা করছে।

 এই হীন প্রচার দোদুল্যমান একটা অংশকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করছে

পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরে আমাদের রাজ্যে উপনির্বাচন হয়েছে। তাতে মিশ্র ফলাফল হয়েছে। কিন্তু এতদ্‌সত্ত্বেও এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যে, ‘বামফ্রন্টের বড় বিপর্যয় হয়েছে’। এরমধ্যে, পুরুলিয়ার পারা বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিগত নির্বাচনে বামফ্রন্টের পক্ষে যে সমর্থন ছিলো তার থেকে এবার সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা ঠিক যে, নন্দীগ্রামে আমরা পরাজিত হয়েছি। দক্ষিণ ২৪ পরগণার বিষ্ণুপুর পশ্চিমে আমাদের পরাজয় ঘটেছে। ২০০৬-এর নির্বাচনে বামফ্রন্টের পক্ষে এই আসনে ছিল ৪৪ শতাংশ ভোট। কংগ্রেস ও তৃণমূলের যুক্ত ভোট ছিল ৫২ শতাংশের কিছু বেশি। উপনির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল থেকে একথা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কিছু মানুষকে ওরা আমাদের দিক থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। একটা দোদুল্যমান অংশ যাঁরা গত নির্বাচনে আমাদের সমর্থন করেছিলেন, তাঁদের একটা অংশ বর্তমানের যে ঘটনাবলী এবং তার ভিত্তিতে যে তীব্র হীন অপপ্রচার, তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এবং বামফ্রন্টের বিপক্ষে গেছেন। এটাকে নিয়েও তীব্র প্রচার হচ্ছে যে, বামফ্রন্টের ভিত টলে গেছে।

 সমস্ত ধ্বংসাত্মক শক্তি বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে

সারা রাজ্য জুড়ে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে অতিদক্ষিণ থেকে অতিবাম—সমস্ত শক্তিকে জোটবদ্ধ করার এক ভয়ঙ্কর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই সময়কালের মধ্যে যে যে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, সে সিঙ্গুরের ক্ষেত্রে, নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রে, লালগড়ের ক্ষেত্রে, গোর্খাল্যান্ডের প্রশ্নে, গ্রেটার কোচবিহারের প্রশ্নে—যে-কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী, বিভেদকামী, ধ্বংসাত্মক আন্দোলন—সমস্ত আন্দোলনেই বামফ্রন্টের বিরোধী শক্তি যুক্ত। কোথাও পরোক্ষভাবে মদত, কোথাও প্রত্যক্ষ মদত। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির পটভূমিতে দাঁড়িয়েই আমরা এই নির্বাচনী সংগ্রামে শামিল।


 বিরোধীদের প্রচারে অনুপস্থিত রাজনীতি, শুধুই তীব্র ভিত্তিহীন কুৎসা, অগ্রগতির অন্ধ বিরোধিতা

এবারে বিরোধীদের প্রচারের ধরণটা এমন যে, যেখানে রাজনীতি অনুপস্থিত। তাদের প্রচারের একমাত্র অভিমুখ হলো, বামফ্রন্ট এবং তার নেতৃত্বে থাকা সি পি আই (এম)-র বিরুদ্ধে কুৎসা। কোন নীতিগত প্রশ্নে আক্রমণ নয়, সে সর্বভারতীয় প্রশ্নে হোক বা রাজ্যের প্রশ্নে হোক। এদের কোন বিকল্প কর্মসূচী নেই। এ রাজ্যে বামফ্রন্ট যা কিছু করবে, ওদের তারই বিরোধিতা করতে হবে এবং সমস্ত আক্রমণ বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত করতে হবে। বিরোধী শক্তি, ধ্বংসাত্মক শক্তি বামফ্রন্টের সমস্তরকম উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের অদ্ভুতভাবে বিরোধিতা করছে, যার পিছনে কোন যুক্তি কাজ করে না।


কলকাতাতে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো করিডরের শিলান্যাস হলো। সে সম্পর্কে বিরোধী নেত্রী বললেন, ‘‘একটা শহরে আবার ক’টা মেট্রো হয়! এসব ধাপ্পা।’’ এটা যে একজন নেতা বা নেত্রী বলতে পারেন এটাই আশ্চর্যের! একটা শহরে যে একাধিক রেললাইন হতে পারে এবং সেটাই যে পৃথিবীর বেশিরভাগ বড় শহরে আছে এটাও তাঁর অজানা! অদ্ভুত কথা।


সমস্ত বিষয়ে ভিত্তিহীনভাবে বামফ্রন্টকে আক্রমণ করতে হবে এটাই বিরোধীদের মূল লক্ষ্য! কংগ্রেস একদিকে বলছে উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হবে না, আর যিনি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বাধা দিচ্ছেন তাঁর সঙ্গেই নির্বাচনী আঁতাত করছে।
জাতীয় কংগ্রেস একথা বলে যে, সারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা নাকি বদ্ধপরিকর। কোথায় গেল তাদের নীতি? কোথায় গেল তাদের আদর্শ? আমরা দেখলাম, সিঙ্গুরের টাটা মোটরসের জন্য যে সর্বদলীয় সভা হলো, প্রদেশ কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর দাবি মতো এ-সভা ডাকা হয়, সেই সভাতে কংগ্রেস গিয়ে তৃণমূলের পক্ষে বক্তব্য রেখে এলো—শিল্পায়নের বিরুদ্ধে, উন্নয়নের বিরুদ্ধে। এরা আবার উন্নয়নের কথা বলে! এই কংগ্রেস, তীব্র উন্নয়নবিরোধী, প্রগতির বিরোধী, অগ্রগতির বিরোধী, তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ওরা এখন নীতি-নৈতিকতাহীন নির্বাচনী জোট করেছে।


 যুক্তি-আদর্শহীন একটি রাজনৈতিক দলকে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে সামনে আনা হচ্ছে


যুক্তিহীন, পুরোপুরি বাস্তবতাবর্জিত, কোন রাজনৈতিক মতবাদের অস্তিত্ব নেই, মস্তিষ্কের কোন স্থিরতা নেই, এইরকম এক নেত্রী ও এইরকম একটা দলকে সামনে নিয়ে আসার সবরকম চেষ্টা হচ্ছে, বামফ্রন্টের বিরেধিতায়। এমন একটা দিন নেই যেদিন বামফ্রন্টের কোন নেতা বা কর্মী খুন হচ্ছেন না। গ্রামাঞ্চলে গরিব মানুষের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। আদিবাসী নেতা-কর্মীদের ওপর, তাঁদের পরিবারের ওপর আক্রমণ হচ্ছে, গ্রামের গরিব কৃষক পরিবারের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। এসমস্ত নারকীয়, নৃশংস আক্রমণ, খুনের ঘটনা সংবাদমাধ্যম সামনে আনছে না। একান্তই প্রচার করতে হলে অত্যন্ত গুরুত্বহীনভাবে প্রচার করছে কিংবা বিকৃতভাবে প্রচার করছে, মিথ্যার মোড়কে প্রচার করছে। মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে খুনের চেষ্টা—কোন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সৌজন্যের খাতিরেও কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করা হলো না। কিন্তু দুষ্কৃতীদের খোঁজে তল্লাশি চালানোর বিরুদ্ধে সকলে একযোগে পথে নেমে পড়লেন!

বামফ্রন্টের কর্মী-নেতারা খুন হলে তাঁদের আত্মীয়-পরিজন গ্রামের মানুষ শোকাহত হয় না? কান্নায় ভেঙে পড়ে না? সন্তানরা বেদনায় হাহাকার করে না? বাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে তাঁদের নিঃস্ব করলে কারো কষ্ট হয় না? এমন এক একপেশে প্রচার করা হচ্ছে যে, বামফ্রন্টের কর্মী-নেতা, সি পি আই (এম)-র নেতা-কর্মীদের খুন হওয়াটাই স্বাভাবিক, এটা খবরের কোন বিষয়ই নয়। কেন এই আক্রমণ? এ কি কেবল সি পি আই(এম)’র বিরুদ্ধে? এ বিষয়টিই মানুষের উপলব্ধিতে আনতে হবে।


 কোন নীতিতে দেশ চলবে তা নির্ধারণের জন্যই লোকসভা নির্বাচন

লোকসভা নির্বাচন কোন স্থানীয় ইস্যুতে হয় না। সামগ্রিকভাবে দেশ কোন পথ ধরে চলবে, কোন নীতিতে দেশ পরিচালিত হবে তারই লক্ষ্যে এই নির্বাচন। যে পথে এই দেশকে গত পাঁচ বছর ধরে চালানো হয়েছে, সেই পথেই দেশকে চলতে দেওয়া হবে কি হবে না—এই প্রশ্নেই এই নির্বাচন। গত লোকসভা নির্বাচনের পরে ভারতের রাজনীতিতে যে শক্তির বিন্যাস ঘটেছিল তাতে বামপন্থীরা বর্ধিত ভূমিকা পালন করতে পেরেছে, যার মূল উৎস ছিল পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও কেরালায় বামপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি। আমরা এমন একটা শক্তি অর্জন করেছিলাম যা কেন্দ্রে নীতি গ্রহণের প্রশ্নে বামপন্থীদের হস্তক্ষেপ করার একটা সম্ভাবনা, একটা সুযোগ করে দিয়েছিল। এবং গোটা ভারতের রাজনীতিতে এই প্রথম, বামপন্থীদের ভূমিকার কারণেই অর্থনৈতিক মত ও পথকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এন ডি এ এবং তারপরে ইউ পি এ সরকারের গৃহীত নীতিগুলির জনবিরোধী, ভয়াবহ চেহারা ও ভয়াবহ পরিণতির চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বামপন্থীরা এই সময়কালের মধ্যে একটা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। ভারতের রাজনীতিতে বামপন্থীদের এই অবদানের দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই অবদানের জন্যই কেন্দ্রীয় সরকার জনবিরোধী নীতিগুলির বাস্তবায়নে পুরোপুরি সফল হলে যে ভয়ানক বিপর্যয় ঘটতে পারতো, তার থেকে ভারতের মানুষকে কিছুটা পরিমাণে হলেও রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। বামপন্থীদের এই অন্যতম প্রধান ভূমিকার কথা মানুষের উপলব্ধির মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। বামপন্থীদের এই ভূমিকার কারণেই এবং যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ বামপন্থীদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি, সেহেতু এ-রাজ্যের ওপর, বামফ্রন্ট সরকারের ওপর সমস্ত আক্রমণ শাণিত করে বামশক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। যাতে সারা দেশজুড়ে জনবিরোধী, দেশবিরোধী নীতিগুলি অবাধে কার্যকরী করতে পারা যায়।


 এ-রাজ্যসহ সারাদেশে বামপন্থীরা এ সময়কালে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে


বর্তমান সময়ে আমরা যখন বলছি যে, মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিই প্রধান লক্ষ্য, তখন কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহীত নীতিতে কর্মসংস্থান হ্রাসই হয়ে দাঁড়ালো মূল লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার দুটি কাজ করছে, এক : সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, মতাদর্শগত লড়াই, অর্থনৈতিক নীতিকে পরিবর্তনের লড়াই ; আর দুই : এরকম একটা অবস্থায় দাঁড়িয়ে যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির কারণে কর্মসংস্থান হ্রাস ও কর্মচ্যুতি ঘটছে তার বিপ্রতীপে এ-রাজ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লড়াই জারি। এ-রাজ্যে যাতে আমরা এই বিকল্প পথে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না ঘটাতে পারি তার জন্যই গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে, নানানভাবে আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে।

আমরা বারংবার বলি যে, বেশিরভাগ মানুষের আয় যদি বৃদ্ধি না পায় তাহলে অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারিত হবে না। আর অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারিত না হলে দেশীয় শিল্প তার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। অন্য দেশের ওপর তাকে নির্ভর করতে হবে। সুতরাং এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যে-নীতি দেশের বেশিরভাগ মানুষের আয় বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। অভ্যন্তরীণ বাজারকে প্রসারিত করবে। যার ওপরে ভিত্তি করে এখানে শিল্প গড়ে উঠবে, হাজার-হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ওরা এরই বিরুদ্ধে যাবতীয় নীতি গ্রহণ করছে।


 কেন্দ্রীয় সরকার গৃহীত উদার অর্থনীতির ফলেই আজ তীব্র সঙ্কট

১৯৯১ সালে কেন্দ্রে কংগ্রেসের নরসিংহ রাও-এর সরকার, যে সরকারে অর্থমন্ত্রী ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, নয়া উদার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করার পর থেকে বিগত ১৫-১৬ বছর ধরে দেশে তা প্রয়োগ হয়ে চলেছে। তা যে এরকম একটা সর্বনাশা পথে যেতে বাধ্য, যা আমরা বামপন্থীরা বারবার বলেছিলাম, তীব্র প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলাম—তা যে কতখানি সঠিক তা আজকে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারছেন। বর্তমানে উদার অর্থনৈতিক নীতিতে বিশ্বজোড়া সঙ্কট। আমেরিকার লেম্যান ব্রাদার্স-এর মতো নামকরা ব্যাঙ্ক এবং আরও অনেক ব্যাঙ্কে রাতারাতি লালবাতি জ্বলে গেল। ব্যাঙ্ক ফেল করার প্রধান কারণ হলো, ব্যাঙ্ক যাদের টাকা ধার দিয়েছে, তারা সে টাকা শোধ করতে পারেনি বা করেনি। ব্যাঙ্কের হাতে যে বিপুল টাকা জমেছিল সে টাকা ব্যাঙ্ক বেপরোয়াভাবে ঋণ দিয়েছে। তাড়াতাড়ি বেশি মুনাফার লক্ষ্যে মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের টাকা ফাটকাবাজিতে বিনিয়োগ করেছে। বেশিরভাগ মানুষ যেহেতু গরিব, বাজারের বাইরে তাই অল্প সংখ্যক মানুষ, যারা ধনী, তাদের ভোগের চাহিদা আরও বাড়িয়ে একটা কৃত্রিম বাজার তৈরি করার লক্ষ্যে ঋণ দেওয়া, আর এর মধ্যে দিয়ে ব্যাঙ্কের মুনাফা বৃদ্ধি করার চেষ্টা মানুষকে বেশি বেশি করে ঋণ নিতে উৎসাহিত করা। ধার করে ভোগ করার নীতি। উদার অর্থনৈতিক নীতির মূল কথাই হলো, ব্যাঙ্কগুলি থেকে সরকারী নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া এবং ব্যাঙ্কের খুশিমতো তাকে ব্যবসা করতে দেওয়া। সাধারণভাবে আমরা জানি, সাধারণ মানুষের টাকা ব্যাঙ্ক জমা রাখে এবং কোনো উদ্যোগে—চাষের কাজে, শিল্পের কাজে, অন্য কাজে ধার দিয়ে সে টাকা খাটায়। আমানতকারীকে যে সুদ দেওয়া হয় ঋণগ্রহীতাকে তার থেকে বেশি সুদ ব্যাঙ্ককে দিতে হয়— এভাবেই ব্যাঙ্ক ব্যবসা করে। সুতরাং ব্যাঙ্কের টাকা বিনিয়োগ হবে উৎপাদনে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।


কিন্তু উদার অর্থনৈতিক নীতিতে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদিত সামগ্রী কেনার মানুষের সংখ্যা কমছে। যেভাবে অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন তা হয়নি। ফলে নতুন প্রযুক্তিতে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগে যে উৎপাদন তা কেনার মানুষের সংখ্যা সীমিত। ফলে সম্পদের কেন্দ্রীভবন হচ্ছে। সেজন্য কল-কারখানাতে বিনিয়োগ আর তেমন লাভজনক মনে করলো না ব্যাঙ্কগুলি। ফলে বেসরকারী ব্যাঙ্কগুলি রিয়েল এস্টেট তৈরিতে, গাড়ি কিনতে, ভোগ-সামগ্রী কিনতে ঋণ দিতে আরম্ভ করলো কম সুদে। গৃহনির্মাণের জন্য কম সুদে ব্যাপকভাবে ঋণ দেওয়া শুরু হওয়ার ফলে বাড়ি তৈরির উপাদানগুলির, জমির দামও বাড়তে আরম্ভ করলো। ফলে যারা রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা বা তার উপাদান তৈরির ব্যবসা করে তাদের শেয়ারের দাম বাড়তে লাগলো। এর ফলে কিছু কলকারখানাও গড়ে উঠতে শুরু করলো। প্রথম দিকে সবাই উৎসাহিত। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি শেয়ারের ব্যবসায় নেমে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে শেয়ারের দাম চড়িয়ে দিলো। শেয়ার, ঋণপত্র কেনাবেচার ব্যবসাই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির মূল লক্ষ্য দাঁড়ালো, শিল্পে কলে-কারখানায় বিনিয়োগ নয়। এমন সময় দেখা গেল যারা ঋণ নিয়েছে তারা ঋণ শোধ করতে পারছে না। রাতারাতি ঋণ আদায়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি মর্টগেজ সম্পত্তি বিক্রি করতে বাজারে নেমে পড়লো। একসময় অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যখন সবাই বিক্রেতা, ক্রেতা কেউ নেই। ফলে এই সমস্ত সম্পত্তির দাম হু হু করে পড়তে থাকলো। ফলে ব্যাঙ্ক যে টাকা খাটিয়েছিল তা জলে গেল। ঋণ আদায় করা অসম্ভব হয়ে গেল। ফলে ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হয়ে গেল। আর এইসব ব্যাঙ্ককে বাঁচানোর জন্য সরকার এগিয়ে এলো। কিন্তু এর ফলে অনৈতিক ক্ষেত্রে এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হলো।


ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হওয়ার কারণে কল-কারখানাগুলির হাতেও পুঁজি অসম্ভব হ্রাস পেলো, নতুন করে অর্থ পাওয়ারও উপায় নেই। অন্যদিকে বাজার সম্প্রসারিত না হওয়ার কারণে ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি। ফলে উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। বিশাল সংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাইও শুরু হলো। তিনের দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যে ধরণের অর্থনৈতিক সঙ্কট হয়েছিল বর্তমানের অর্থনৈতিক সঙ্কট তার থেকেও অনেক ব্যাপক ও গভীর। ১৯৯১-এর পর থেকে সারা পৃথিবীতে বেকারী যে ব্যাপক হারে বেড়েছে তা অতীতে কখনও ঘটেনি। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল(আই এম এফ) হিসেব করে বলেছে, যে এই সময়কালে ৬.১ শতাংশ বেকারিত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে সারা পৃথিবীতে মোট উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে।


২০০৭-এ যেখানে ১৭ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষ কাজ হারায়, সেখানে ২০০৯ সালের শুরুতেই ২৩ কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমাদের দেশেও এর প্রভাব মারাত্মক। কেন্দ্রীয় সরকার নয়া উদার অর্থনৈতিক নীতি কায়েম করার সময় বলেছিল দেশে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করা হবে বিদেশের বাজারে। সস্তায় পণ্য উৎপাদন এবং তা বিদেশের বাজারে বিক্রি করার জন্য আমদানি-রপ্তানির ওপর যে সমস্ত বিধিনিষেধ ছিল, সেসব শিথিল করে দিয়ে বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। এরজন্য বিপুল সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হলো, আমদানি শুল্ক ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হলো। দেশের অর্থনীতিকে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হলো।


আমরা, বামপন্থীরা তীব্রভাবে বলেছিলাম — দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে সম্প্রসারিত না করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ সঙ্কট সৃষ্টি হবে। রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের মতো অনুন্নত দেশগুলির মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা হবে, আর ধনতান্ত্রিক দেশগুলি আমাদের আরও শোষণের সুযোগ পাবে। কিন্তু উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলি যাতে আমাদের দেশ থেকে সস্তায় কাঁচামাল পায়, আর তাদের দেশের উৎপাদিত উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হয়, তারজন্য এদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। অল্প কিছু মানুষ, যাদের কেনার ক্ষমতা আছে তাদের ভোগ-বিলাস পণ্যের চাহিদা বাড়ানোর উদগ্র প্রচার চালানো হলো।

ধনতন্ত্র সম্পর্কে কার্ল মার্কস বলেছেন, ‘‘প্রয়োজনের তালিকা ফাঁপিয়ে তুলে, অমানবিক, অস্বাভাবিক, কৃত্রিম, বহুরূপী, বিবেকবর্জিত ক্ষুধাকে প্রণোদিত করে ধনতন্ত্র।’’ এর থেকে সত্য কথা আজকের এই মুহূর্তে আর কিছু হতে পারে না।

সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী এই নীতিসমূহের তীব্র বিরোধিতায় একমাত্র বামপন্থীরাই

আমাদের দেশের সরকার চেয়েছিল যে, দেশের ব্যাঙ্ক, বীমাক্ষেত্রকে বিদেশী বড় বড় কোম্পানি যাতে কিনে নিতে পারে তার জন্য আইন সংশোধন করতে। আমরা, বামপন্থীরা সংসদে সেই আইন প্রণয়নে বাধা দিয়েছিলাম। কেননা এটা হলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থা বহুজাতিক সংস্থার কব্‌জায় চলে যাবে। আর সেই অর্থ নিয়ে সারা পৃথিবীজুড়ে ফাটকাবাজি খেলবে। এতে দেশের মানুষের ভয়াবহ সর্বনাশ হবে। আমরা এই অপপ্রয়াস প্রতিহত করেছি। সংবাদমাধ্যমে আমাদের ‘রক্ষণশীল’ বলে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। আর এখন খোদ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর বলছেন, ‘‘যে সঙ্কটে সারা ধনতান্ত্রিক দুনিয়া পড়েছে তার ততখানি প্রভাব এখনও ভারতে আসেনি, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই যে, ভারতের আর্থিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এখনও অনেক শক্তিশালী।’’ আর এ-জন্য যাদের প্রধান অবদান তা হলো বামপন্থীদের।


কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক নীতির তীব্র বিরোধিতা আমরা বামপন্থীরা করছি, দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষায়। পেট্রোপণ্যের দাম বৃদ্ধির বিরোধিতা করলাম আমরা। কেন্দ্রীয় সরকার বললো, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। বলা হলো, তেলের চাহিদা জোগানের তুলনায় বেড়েছে বলে দাম বাড়ছে। আপাতভাবে মানুষ একথা সত্যি ভাবতে পারেন। কিন্তু আসল চিত্র কি? অপরিশোধিত তেলের দাম একসময় বাড়তে বাড়তে ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে গিয়ে দাঁড়ালো। বর্তমানে সেই দাম নেমে ৫০ ডলারের নিচে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং চাহিদা বেড়েছে বলে তেলের দাম বেড়েছে, একথা ঠিক নয়। আসলে তেলের বড় বড় কোম্পানি তেলের দাম নিয়ে ফাটকাবাজির মাধ্যমে বাড়িয়ে দিয়েছিল। দাম যখন অনেক বাড়লো তখন মজুত তেল বাজারে বিক্রি করলো এবং তাতে বিপুল পরিমাণে মুনাফা অর্জন করলো। অর্থাৎ বেশি মুনাফার জন্য ফাটকাবাজি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিলো।
ঠিক একইভাবে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম হু হু করে বেড়ে গেলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ বললেন, ‘‘চীন আর ভারতের মানুষ বেশি খাচ্ছে বলে দাম বেড়ে যাচ্ছে।’’ সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের দেশের খাদ্যসঙ্কট মেটানোর জন্য, আমাদের দেশের চাষীদের কাছ থেকে যে দামে ধান বা গম কিনেছিলো তার থেকে বেশি দাম দিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে গম আমদানি করেছিল। আসলে আমাদের দেশে কয়েকটি বড় বড় ব্যবসাদার ধান-চাল গমের বাজার কব্‌জা করেছিল। আর আজ চাষীরা উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দাম নেই বলে মাথায় হাত দিয়ে বসেছে। আসলে গোটা পৃথিবীর অর্থনীতিকে ফাটকাবাজরা নিয়ন্ত্রণ করছে।


পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে ফাটকাবাজিতে, উৎপাদনে নয়

বিদেশী কোম্পানিগুলি আমাদের দেশের শেয়ার মার্কেটে এভাবে ১৮ বিলিয়ন ডলার অর্থ ফাটকাবাজিতে লগ্নী করেছে। আমরা এর তীব্র আপত্তি করেছিলাম। বলেছিলাম, ফাটকাবাজিতে নয়, বিদেশী পুঁজিকে শিল্পে, উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে হবে। ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট-এর মূল অভিমুখ হওয়া দরকার এটাই। যা নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসবে, উন্নত শিল্প তৈরি করবে। ফলে দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ফাটকাবাজিতে খাটানোর জন্য পুঁজি আমদানির তীব্র বিরোধিতায় আমরা। আর কেন্দ্রীয় সরকার ফাটকাবাজিতে পুঁজি আসাকেই প্রাধান্য দিলো। এখন সেই বিদেশী পুঁজি হঠাৎ করে তাদের কেনা শেয়ারবাজারে ছেড়ে দেওয়ায় শেয়ারের দাম হু হু করে পড়ে গেছে। বহু কোম্পানি প্রায় ডকে ওঠার মতন অবস্থা। এবং এভাবেই গোটা দেশের অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত এবং এরই ভয়াবহ পরিণতি আমরা লক্ষ্য করছি।


আমাদের দেশের মতো এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ভয়ঙ্কর বিপর্যয় নেমে এসেছে। কেননা এদেশগুলির অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৪৭ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি হয়। বিদেশে রপ্তানি যখন মার খেয়েছে তখন দেশগুলির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও বিপর্যন্ত হয়েছে। এখন সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, ভারতে নতুন কর্মসংস্থান তো দূরের কথা, কেন্দ্রীয় সরকারের এই নীতির কারণে এবছর ১ কোটি মানুষ কাজ হারাবেন। যদিও যতখানি সঙ্কট হওয়ার কথা ছিল ততটা হয়নি, কেননা বিপর্যয়ের অপপ্রয়াসের কিছুটা বামপন্থীরা রুখে দিতে পেরেছিল।
কেন্দ্রীয় সরকার চেয়েছিল যে, রাজ্য সরকারী, কেন্দ্রীয় সরকারী, আধা সরকারী কর্মচারী যারা পেনশন ভোগ করেন তাঁদের পুরো টাকাটাই বেসরকারী সংস্থাকে দিয়ে দিতে, পেনশন ফান্ড ম্যানেজ-এর নামে। এই টাকা তারা শেয়ার বাজারে খাটাতো। আমেরিকাতে এই ব্যবস্থা করাতে কয়েক লক্ষ মানুষের পেনশনের টাকা হাওয়া হয়ে গেছে। আমরা এই অপপ্রয়াস প্রতিহত করেছি।
ইউ পি এ সরকারের এই ভয়ঙ্কর সর্বনাশা নীতির বিরুদ্ধে একমাত্র আমরা, বামপন্থীরাই সংসদে ভিতরে ও বাইরে অবিরাম লড়াই করেছি। লড়াই করেছি সাধারণ মানুষের স্বার্থকে রক্ষা করার জন্যই।


শুধু অর্থনীতিই নয়, ক্ষতিকারক প্রভাব দেশের রাজনৈতিক অবস্থানেও

কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহীত নীতির কারণেই শুধুমাত্র দেশের অর্থনীতিই নয়, রাজনীতিও প্রভাবিত। আই এম এফ, বিশ্ব ব্যাঙ্ক শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নীতিই নির্ধারণের হাতিয়ার নয়, দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণেরও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতের মতো দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করাও উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশের লক্ষ্য। ভারতের বাজারকে দখল করার উদ্দেশ্য হলো পুঁজিবাদী দেশের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে হবে। এবং এজন্য দেশের রাজনীতিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।


দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকাতে পরমাণু বিদ্যুৎ তৈরির যন্ত্রপাতির বাজার নেই। কারণ খোদ আমেরিকাতে বিগত ২৩ বছরে কোন পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। সুতরাং ঐ যন্ত্রাংশ বিক্রির জন্য আমাদের মতো দেশের বাজার তাদের চাই এবং পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করাতে পারলে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামও বিক্রি করা যাবে। এজন্যই পারমাণবিক চুক্তি। এজন্য কতকগুলি শর্ত আরোপ করা হলো। ভারতের বিদেশনীতি কেমন হবে, কোন দেশের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে ভারত, তার জন্য চুক্তি; কোনরকম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা যাবে না, সমস্ত গবেষণাগারে আমেরিকা নজরদারি করতে পারবে ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় সরকার বললো, আমাদের দেশে বিদ্যুৎ-এর দারুণ সঙ্কটের প্রেক্ষিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ না হলে চলবে না, সুতরাং ঐ চুক্তি করতেই হবে। ৬০ বছরেরও বেশি দেশ স্বাধীন হয়েছে, আজও দেশের সকল মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। কে দায়ী? আমরা, বামপন্থীরা একথা বলিনি যে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ চাই না। বলেছিলাম, আমাদের মতো গরিব দেশে এখনও পর্যন্ত যে পরিমাণ কয়লার ভাণ্ডার মজুত আছে, সেই মজুত ভাণ্ডারকে নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির বিপুল সুযোগ আছে। সে বিদ্যুৎ-এর দাম হবে সস্তা। আর ইতোমধ্যে আমাদের দেশে যে কাঁচামাল পাওয়া যায়, থোরিয়াম, গবেষণার মাধ্যমে তাকে ভিত্তি করে পরমাণু বিদ্যুৎ তৈরির পথে যেতে পারবো। এই চুক্তি আসলে আমেরিকার বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য।

আমেরিকা তো এভাবেই ইরাককে ধ্বংস করেছে। ইরানেও একই কাজ করছে। আফগানিস্তানে আগ্রাসন নামিয়ে এনেছে। আমাদের মতন বহু ধর্মাবলম্বী দেশে নিরপেক্ষতার আদর্শকে যেমন মেনে চলতে হবে, তেমনি এমন কোন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আঙিনায় নেওয়া উচিত হবে না যার দ্বারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মানসিকতা আহত হয়। আজ বিশ্বে মার্কিনী ভূমিকা সেই লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে, আর আমাদের দেশ তখন মার্কিনীদের রণনৈতিক মিত্র হতে চাইছে দেশের বৈদেশিক নীতির অভিমুখ মার্কিনীদের দিকে চালিত করা হচ্ছে। যারা মার্কিনী মদতে প্যালেস্তিনীয়দের উৎখাত আর জঘন্য হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, ভারত সরকার সেই ইজরায়েলের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে।

আজ সারাদেশে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ হচ্ছে। বহু সাধারণ মানুষ বিগত কয়েক বছরে এই আক্রমণে নিহত হয়েছেন। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তি এই ধরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে। একথা আজ ভাবার সময় এসেছে, আমাদের দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি, কি বৈদেশিক ক্ষেত্রে, কি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, এই শক্তিকে উৎসাহিত করছে কিনা।

বামফ্রন্ট ও সংখ্যালঘু স্বার্থ


এখন পশ্চিমবঙ্গে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হচ্ছে যে, বামফ্রন্ট সংখ্যালঘুদের স্বার্থ দেখে না। ভাবটা এই যে, সারা ভারতে সংখ্যালঘু মানুষ খুবই সুখে আর এরাজ্যে দারুণ অবহেলিত। সাচার কমিটির রিপোর্ট তো গোটা ভারতের প্রেক্ষিতে। সাচার কমিটিতে বলা আছে যে, গোটা ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ পশ্চাদ্পদ। এখানে একটি গুরুতর প্রশ্ন এই যে, দীর্ঘদিন ভারতে কোন দল শাসনক্ষমতায়? সে দল তো কংগ্রেস। কংগ্রেস আর তার থেকে জন্ম নেওয়া তৃণমূল বলুক যে, গোটা ভারতে এতদিন ধরে তারা সংখ্যালঘুদের জন্য কি করেছে?


ভারতের বামপন্থীরা ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক শক্তি নেই যারা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে শুধু মুখে প্রচার করে না, বুকের রক্ত দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রক্ষা করে। আমাদের রাজ্যে ৫০ শতাংশ মানুষ মুসলিম, তফসিলী জাতি ও আদিবাসী। এঁদের সিংহভাগই গ্রামের মানুষ। এঁরাই গ্রামের গরিব মানুষ। এরা এককালে ছিলেন জমিহারা। কেউ কেউ জমিদার-জোতদারদের লেঠেল। আজ গ্রামের সেই মানুষই রাজ্যের ভূমিসংস্কারের ফলে যে সবচেয়ে বেশি উপকৃত, এ-সত্য অস্বীকার করার কোন ক্ষেত্রই নেই। আজ গ্রামের ৮৪ শতাংশ জমি ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকের হাতে—একথার অর্থ হলো, এই ৮৪ শতাংশ জমির সিংহভাগ আছে মুসলিম, তফসিলী জাতি ও আদিবাসী মানুষের হাতে। এ বিষয়টি সাচার কমিটির রিপোর্টে প্রতিফলিত হয়নি।

আমরা আরও উন্নয়ন চাই। যেসব গ্রামে মুসলিম, তফসিলী জাতি, আদিবাসী মানুষ, পশ্চাদ্পদ মানুষ আছেন, সেখানে আরও উন্নয়ন করতে হবে। উন্নয়নের অর্থ হলো, সেই গ্রামে রাস্তা করতে হবে, স্কুল তৈরি করতে হবে, হাসপাতাল তৈরি করতে হবে; সেই এলাকাকে কেন্দ্র করে কলকারখানা গড়ে তুলতে হবে। আর কংগ্রেস-তৃণমূল তো এই উন্নয়নেরই বিরুদ্ধে। জমি যাবে তাই রাস্তা করা যাবে না, খাল কাটা যাবে না, কল-কারখানা স্কুল-কলেজ করা যাবে না, এমন কি বিদ্যুতের খুঁটিও পোতা যাবে না, এই দাবিতে বিক্ষোভ হচ্ছে।

লালগড়ে কিছু আদিবাসী মানুষকে ভুল বুঝিয়ে রাস্তা কাটানো হলো। তারমানে রাস্তা তো হয়েছে। সবচেয়ে পশ্চাদ্পদ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য, উন্নয়নের গতিধারায় তাঁদের যুক্ত করার জন্য পিচের রাস্তা হয়েছিল। সেই রাস্তা কাটা হলো। সে রাস্তা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আসছিল, আদিবাসী ডাক্তার ও নার্স তার মধ্যে ছিলেন। গোটা অ্যাম্বুলেন্সকে উড়িয়ে দেওয়া হলো, যাতে প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকায় আতঙ্কে কোন ডাক্তার বা নার্স আর চিকিৎসা করতে যেতে না পারেন। এরাই আবার বলছে, বামফ্রন্ট আদিবাসীদের জন্য কিছু করেনি। দাবি তোলা হয়েছে এলাকায় প্রশাসন, পুলিস কেউ থাকতে পারবে না—আর সেই দাবিকে সমর্থন জানানো হচ্ছে!

উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ওদের চোখে ‘অপরাধ’


বামফ্রন্ট সরকার জমি দিয়েছে গরিব কৃষককে। তার মধ্যে মুসলিম, তফসিলী জাতি, আদিবাসী মানুষ সবথেকে বেশি। আমরা পশ্চাদ্পদ এলাকা চিহ্নিত করে উন্নয়নের পরিকল্পনা করেছি। এজন্যই মুর্শিদাবাদে বিদ্যুৎ-কারখানা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে; সাগরদিঘিতে বিশাল কারখানা তৈরি হয়েছে; দক্ষিণ ২৪ পরগণার বুক চিরে প্রসারিত রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আমরা শিল্পায়নে সঠিকভাবে উদ্যোগ নিয়েছি ব্যাপক কর্মসংস্থানের জন্য। হাজার হাজার মানুষের কাজ সৃষ্টির চেষ্টা করা কি অন্যায়? রাস্তা তৈরি করা, সম্প্রসারিত করা, গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করা, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করা যদি ‘অপরাধ’ হয়, তাহলে সে ‘অপরাধ’ আমাদের করতে হবে। মানুষকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তাঁরা কোন্ পক্ষ অবলম্বন করবেন।

বক্রেশ্বরে ওরা বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা তৈরিতে তীব্র বাধা দিয়েছিল। বামফ্রন্টের যুবরা এরজন্য রক্ত দিয়েছে। আজও ওরা বাধা দিচ্ছে, কারখানা করতে দেবো না বলছে। আর আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে উন্নয়নের স্বার্থে, ব্যাপক যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কল-কারখানা করতেই হবে। মানুষকেই ঠিক করতে হবে যে, অসংখ্য যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পায়ন হবে, কি হবে না। দেশটা ফাটকাবাজদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, না কি সঠিক নীতির রূপায়ণের ভিত্তিতে দেশের মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন।

 সঙ্কটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা যাতে জাগ্রত না হয় সে-জন্য তৈরি করা হচ্ছে মানুষে মানুষে অনৈক্য

যদি বামপন্থীরা দুর্বল হয় তাহলে জনগণের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, দেশের অগণিত বেকার যুবক-যুবতীদের স্বার্থে, গরিব মানুষের স্বার্থে যে লড়াই চলছে, তা শক্তিশালী হতে পারে না। স্বনির্ভর হয়ে এ-দেশ গড়ে ওঠার, ভারতের শিল্প বিকাশ, সারা বিশ্বে ভারতের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর যে লড়াই আমরা, বামপন্থীরা করছি, তা নির্ভর করছে বামপন্থীরা আরও বেশি শক্তি অর্জন করতে পারবে কিনা তার ওপর।


গোটা দেশকে একটা ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এবং যতো সঙ্কট বাড়ছে, মানুষ কাজ হারাচ্ছে, তত মানুষকে বিভেদের রাস্তায় নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এ-এক ধরণের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। ক্রমবর্ধমান এই সঙ্কটের মোকাবিলা মানুষ করতে পারবে না, যদি নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়, বিভক্ত হয়ে যায়।

মানুষের মধ্যে ধর্মকে কেন্দ্র করে বিভাজন তৈরি হচ্ছে, আদিবাসীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে, আসামে ছোট ছোট উপজাতি গোষ্ঠী অন্তর্কলহে লিপ্ত। সবাই বলছে আলাদা রাজ্য চাই। আসামকে ভেঙে মণিপুর, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল হলো। সেখানে তারা শান্তিতে আছেন? অ-অসমীয়া মানুষ দলে দলে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসছেন। কারণ তাদের কোন নিরাপত্তা নেই। বিহার ভেঙেছে, মধ্যপ্রদেশ ভেঙেছে—কি অবস্থা ঝাড়খণ্ডে, বিহারে, ছত্তিশগড়ে বসবাসকারী আদিবাসীদের। তারা কি স্বর্গরাজ্য বানিয়েছে? যে ঝাড়খণ্ডে কার্যত কোন সরকারই নেই—অরাজকতাই সেখানে আইন, তার সঙ্গে পশ্চিমবাংলার তিন জেলাকে যুক্ত করার দাবি তোলা হচ্ছে। এ কি আদিবাসীদের স্বার্থে ? আজ কংগ্রেস-তৃণমূল তাদেরই সঙ্গে জোট বেঁধেছে। মহারাষ্ট্রে বাঙালী, বিহারীদের তাড়ানোর স্লোগান তোলা হয়েছে, আক্রমণ করা হচ্ছে। এসব আমরা এ-রাজ্যে হতে দিতে পারি না।

 এরাজ্যে এক ভয়ঙ্কর শক্তিকে সামনে আনা হচ্ছে


এরাজ্যে যে শক্তি এর পক্ষে, তার ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আজ সমস্ত প্রতিক্রিয়ার শক্তি একত্রিত হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা থাকলে তবে তো উন্নয়ন! মানুষের ঐক্যই তো উন্নয়নের ভিত্তি। মানুষকে বিভাজিত করলে, মানুষে মানুষে অবিশ্বাস, অনৈক্য সৃষ্টি করলে উন্নয়ন হতে পারে না। এক ভয়ঙ্কর চক্রান্ত চলছে গোটা রাজ্য জুড়ে। গোর্খাদের বিচ্ছিন্ন করা, রাজবংশীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী পথে নিয়ে যাওয়া, আদিবাসী বিকাশ মঞ্চ করে তাদের আলাদা করা, রাজ্যটাকে ভেঙে আরও টুকরো টুকরো করা। এই বিভেদ কি আমরা চাই!

বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে এই সর্বনাশা শক্তিকে এরাজ্যে সামনে আনা হচ্ছে। যে শক্তি মাওবাদীদের সঙ্গে, নকশালদের সঙ্গে, সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে, মুসলিম মৌলবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। যে শক্তি অন্যদিকে কংগ্রেসের সঙ্গেও হাত মিলিয়েছে।

 গরিব মানুষের ঐক্যকে ভেঙে, বামফ্রন্ট থেকে দূরে সরানোর অবিরাম চক্রান্ত

এবারের লড়াই অত্যন্ত কঠিন, কেন না রাজনীতিটা অত্যন্ত জটিল হয়ে গেছে। রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার একটা বিকল্প অভিমুখে, জনগণের স্বার্থকে একমাত্র বিবেচ্য হিসেবে গণ্য করে সমস্ত কর্মসূচী রূপায়িত ও বাস্তবায়িত করছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহীত সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী নীতিগুলির কুপ্রভাব প্রতিনিয়ত এ-রাজ্যের ওপরও পড়ছে। যেমন, বি পি এল-এর তালিকা তৈরি সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি, যা নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে অনেক ক্ষোভ আছে। আমরা এটার বিরুদ্ধে, কিন্তু আমরা বাধ্য হচ্ছি এটা করতে। কেন্দ্রীয় সরকারকে আমরা বারবার বলেছি যে, যে দেশের ৭৭ ভাগ মানুষের আয় দৈনিক ২০ টাকারও কম সে-দেশে কোন্ মানুষ গরিব, আর কোন্ মানুষ ধনী, তা বাছতে যাওয়া অবাস্তব পরিকল্পনা। আমাদের দাবি, সমস্ত মানুষকেই সর্বজনীন গণবণ্টন ব্যবস্থার সুবিধায় আনতে হবে। কিন্তু এভাবেই গরিব মানুষকে ওরা বিভাজিত করতে চাইছে। অন্ত্যোদয় যোজনা, অন্নপূর্ণা যোজনা, ইন্দিরা আবাস যোজনা, আম্বেদকর যোজনা— এইসব ক্ষেত্রেও কোন না কোন ব্যক্তি বা পরিবারকে চিহ্নিত করতে হয় যে সুবিধাটা পাবে। এক গ্রামে হয়তো এমন ৫০টি পরিবার আছে, যাদের সবাইকেই এ সুবিধা দেওয়া উচিত। অথচ কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়মে দিতে হবে ৫ জনকে। ৫টি পরিবারকে চিহ্নিত করার ফলে ৪৫টি পরিবার বিরূপ হচ্ছে। যদি খুব বিবেচনাপ্রসূতও এই চিহ্নিতকরণ হয়, তবুও এ ক্ষোভ হবেই। এটাই তো চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। আমরা এই নীতির বিরোধী। একটি অঙ্গরাজ্যের সরকার হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের এই প্রকল্প এখানেও রূপায়িত করতে হবে, না হলে যেটুকু টাকা গরিব মানুষের কাজে লাগতো তাও ফেরত যাবে। আমরা বারবার বলেছি, প্রাপক নির্বাচনের কাজটি যথাযথভাবে করতে হবে। তবুও কিছু ত্রুটি থেকে যাচ্ছে একাজে। এর সুযোগই বিরোধীরা গ্রহণ করছে। এরকম একটা নির্বাচনী লড়াইয়ে এই বিচ্ছিন্ন বিষয়গুলিকেই সামনে এনে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।


মূল যে বিষয়, মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আয় বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় সরকার তার জন্য কোন চেষ্টা করছে না। বামপন্থীদের চাপের জন্যই ইউ পি এ সরকার ১০০ দিনের কাজের ভিত্তিতে গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প চালু করতে বাধ্য হয়েছিলো।

 সন্ত্রাসের শক্তি কারা ?

এই সময়কালের মধ্যে আর একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা দরকার। অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে এই প্রতিক্রিয়াশীল, ধ্বংসাত্মক শক্তি কোথাও কোথাও খানিকটা মাথা তুলতে পেরেছে, সক্রিয় হয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে, এরা সব নতুন করে তৈরি হচ্ছে। এরা ছিলো, সুপ্ত ছিলো। গত ৩২ বছরে প্রতিটি ভোটেই ৩৫-৪০ শতাংশ মানুষ তো বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ৪-৫ শতাংশ মানুষ আজকের এই পরিস্থিতিতে নৈরাজ্য সৃষ্টিতে প্ররোচনা দিচ্ছে নানানভাবে। এই অংশকে নানানভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে, চাঙ্গা করা হচ্ছে। তাদের যেকোন অপরাধকে সমর্থন করা হচ্ছে। এটাই সমাজবিরোধী শক্তি। এর পাশাপাশি বামফ্রন্টের কর্মীদের কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে গরিব মানুষের একাংশের মধ্যে যে বঞ্চনার মনোভাব আছে তাকেও বামফ্রন্ট বি‍‌রোধিতায় ব্যবহার করা হচ্ছে।

উন্নয়নের ধর্মই হলো যে, তা মানুষের চাহিদার ক্রমাগত বৃদ্ধি ঘটায়। উন্নয়নের কোন শেষ নেই। এই পথেই আজ গরিব মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নানান চাহিদা বেড়েছে —এটাই বামপন্থীদের বড় পাওনা। মানুষের এই চাহিদাই তো আমরা বাড়াতে চেয়েছি এবং তা পেরেছি। এটাই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। সেই শর্তের ভিত্তিতেই বিগত ৩২ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে গরিব মানুষকে উন্নয়নের প্রবাহে নিয়ে আসা গেছে, আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা গেছে। এরই ফলে মানুষের মধ্যে আরও চাহিদা বেড়েছে। বিরোধী দল মানুষের এই আত্মমর্যাদাকেই ধ্বংস করতে চায়। গোটা সমাজকে মেরুদণ্ডহীন, স্তাবকে পরিণত করতে চায়। এখান থেকেই ফ্যাসিবাদের উদ্ভব হয়। যে দলে কোন অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নেই, কোন সদস্যের কোন কথা বলার অধিকার নেই, সেই দল কখনও কোন দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা দিতে পারে না। যে গণতন্ত্রকে বামফ্রন্ট প্রসারিত করেছে, বিকশিত করেছে, গরিব মানুষের যে অধিকারবোধ জাগ্রত হয়েছে তার মধ্যে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিসমূহের বিরুদ্ধে যে অবিরাম লড়াই জারি আছে, তাকে দমন করার জন্যই বামফ্রন্টের শক্তি খর্ব করে এক ভয়ঙ্কর শক্তির ক্ষমতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা চলছে। তবেই শাসক শ্রেণীর কার্যসিদ্ধ হবে। আর সেই লক্ষ্যেই এই নির্বাচনে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে সমস্ত রকম আক্রমণ শাণিত করা হচ্ছে।
আমাদের রাজ্যে অনেক সমস্যা আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র বামফ্রন্টই পেরেছে এবং পারে গরিব মানুষের ঐক্যকে রক্ষা করে ক্রমে সেই লক্ষ্যে সংগ্রাম পরিচালিত করতে, অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে এবং যারা বিভেদের রাজনীতি করছে তাদের পরাজিত করতে।

 এ-নির্বাচনে আমাদের মূল লক্ষ্য

লোকসভা নির্বাচন এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই। এ-নির্বাচনে গোটা দেশের স্বার্থের প্রশ্ন যুক্ত, আর সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকতেই হবে বামপন্থীদের। কংগ্রেস এবং বি জে পি উভয়েই জানে যে, কোন দলই এমন সংখ্যক আসন পাবে না যাতে তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে সংসদে। এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে আবার একটি কোয়ালিশন সরকার ভারতে ক্ষমতায় আসবে। এই কোয়ালিশন কেমন হবে, কি চরিত্র হবে, কি ভূমিকা পালন করবে এটাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ইতোমধ্যে সারা দেশে রাজ্যে রাজ্যে দুই জোটই ভাঙতে শুরু করেছে। এ আই ডি এম কে, তেলুগু দেশম, বি জে ডি বি জে পি-র সঙ্গ ত্যাগ করেছে। এরা কংগ্রেসের সঙ্গেও নেই। বিহারে লালু যাদব-পাশোয়ান কংগ্রেস ছেড়েছেন। উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে কংগ্রেসের সাম্প্রতিক মিতালীও সঙ্কটে। এর মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটছে। মানুষ অন্য এক বিকল্পের সন্ধানে। না বি জে পি, না কংগ্রেস। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বামপন্থীদের দায়িত্ব অনেক বেশি। দেশকে ধর্মনিরপেক্ষতার পথে, স্বনির্ভরতার পথে, স্বাধীন বিদেশ নীতির পক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলিকে সামনে রেখে আর ‍‌‍‍‍‌এক বিকল্প পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এই তৃতীয় শক্তির যে সরকার তৈরি হবে প্রধান চারটি স্তম্ভের উপর ভর করে। এই সরকারের প্রথম দৃষ্টিভঙ্গিই হবে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ও আদর্শকে শুধু প্রতিশ্রুতিতেই নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করা। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বিকাশ অবশ্যই চাই, তবে তা হবে স্ব-নির্ভর অর্থনীতির ভিত্তির উপরে। তৃতীয়ত, যতবড় শক্তিশালী দেশই হোক, তার সামনে নতশিরে নয় বরং মাথা উঁচু করে জোটনিরপেক্ষ বিদেশ নীতিকে অনুসরণ করা। চতুর্থত, দেশের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার প্রশ্নে ভাষা, সংস্কৃতির মর্যাদাদানে যত্নবান এক সরকার। বামপন্থীদেরই এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। সমস্ত দেশপ্রেমিক শক্তিকে পাশে পেতে হবে। এবারের নির্বাচন সেই লক্ষ্যেই। তাই সমস্ত আক্রমণকে মোকাবিলা করে, সাধারণের প্ররোচনা এড়িয়ে মানুষের মধ্যে আমাদের পৌঁছাতে হবে। বামপন্থী শক্তির বিকাশে আমাদের রাজ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই আক্রমণ হবে— আমাদেরও প্রস্তুত হতে হবে ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে-গঞ্জে, বস্তিতে, স্কুলে, কলেজে সর্বত্রই।