রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০০৯

রাগবেন না, উনি এইরকমই বলেন! ~ অনিকেত চক্রবর্তী

আকাশ থেকে পড়লেন বুলা চৌধুরী বললেন, ‘বলেছেন? উনি বলেছেন এমন কথা?’ একটু থেমে, ‘না না আপনি ভুল শুনেছেন এমন মিথ্যা কথা উনি বলতে পারবেন কী করে?’

বুলা চৌধুরীকে বলা গেল, না ভুল শোনেনি কেউই যারা দেখেছে শুক্রবার রাতে স্টার আনন্দ চ্যানেলে স্টুডিওয় বসে তৃণমূলনেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে টোটা রায়চৌধুরী প্রশ্ন করেছিলেন মমতাকে, আপনার ক্রীড়ানীতি কি? উনি তখন তা নিয়ে বলতে শুরু করেই কেন্দ্রে ১৯৯১ সালে ক্রীড়ামন্ত্রী থাকাকালীন তিনি কী কী করেছিলেন, তার আশ্চর্যজনক সব বিবরণ দিতে শুরু করেন, যা আগে তিনি বলেননি যেমন, তিনি নাকি গোটা দেশে ৪৬টা স্পোর্টস আকাদেমি গড়েছিলেন, সল্টলেক স্টেডিয়াম ও নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামেও নাকি তার কন্ট্রিবিউশন আছে...ইত্যাদি ইত্যাদি এরপরই তিনি বলেছিলেন বুলা চৌধুরীকে নিয়ে তিনি বললেন, বুলা আমার কাছে এসেছিল আমি তখন ক্রীড়ামন্ত্রী আমাকে এসে বুলা বললো, ওর অর্জুন পুরস্কার চাই সেই ব্যবস্থা করতে হবে আমি তখন বুলাকে বললাম, নিশ্চয়ই অর্জুন পুরস্কার পাওয়ানোর ব্যবস্থা করবো কিন্তু তার আগে তোমাকে কমনওয়েলথ গেমস থেকে ৬টা সোনা আনতে হবে বুলা এরপরই কমনওয়েলথ গেমস থেকে ৬টা সোনা এনেছিল আমি কমিটমেন্টে বিশ্বাসী কথা রেখেছিলাম ওর অর্জুন পুরস্কার পাইয়ে দিয়েছিলাম...

বিবরণ শুনে বুলা চৌধুরী এবার ক্রুব্ধ কিন্তু অনৃতভাষিণী মমতা ব্যানার্জির এমন প্রচারের জবাব দিলেন আশ্চর্য ঠাণ্ডা মাথায় বললেন, ‘শুনুন, এমন মিথ্যা কথা বানাতে গিয়ে উনি খেয়াল রাখেননি যে আমি কোনোদিন কমনওয়েলথ গেমসে যাই-ই নি দুবার যাওয়ার সুযোগ এসেছিল ১৯৮১ আর ১৯৮৬ সালে ’৮১ সালে প্লেনে ওঠার আগে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর যেতে পারিনি আর ’৮৬ সালে রাজীব গান্ধী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, কমনওয়েলথ গেমসে আমাদের দেশ কাউকে পাঠায়নি বয়কট হয়েছিল তাই যেতে পারিনি আর ৬টা সোনা আনার কথা যেটা উনি বলেছেন, সেটা আসলে ১৯৯১ সালের সাফ গেমসে ব্যক্তিগত কোনো আবদার নিয়ে যাইনি আমি সাফ গেমসে যাওয়ার আগে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে গিয়েছিলাম আমি অন্য ক্রীড়াবিদদের সঙ্গেই কোনো অর্জুন পুরস্কার চাওয়ার কথা ওঠেনি যেকথা উঠেছিলো, তাহলো, উনি বলেছিলেন, বুলা, একটা সোনা অন্তত আনা চাই আমি তাঁকে বলেছিলাম, একটা নয়, আরো বেশি সোনা আনার জন্যই জলে নামবো শেষপর্যন্ত আমি সাফ গেমস-এ ৬টা সোনা জিতি আমি অর্জুন পুরস্কার পাই কিন্তু সেটা ১৯৯০ সালের পুরস্কার এই হচ্ছে ইতিহাস উনি তো ক্রীড়ামন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৯১ সালে অথচ বেমালুম উনি বলে দিলেন যে আমি তাঁর কাছে অর্জুন পুরস্কার পাইয়ে দিতে বলতে গিয়েছিলাম আর উনি পাইয়ে দিয়েছেন...! জলে নেমে সাঁতার কি উনি কেটেছিলেন, না আমি? ছিঃ ছিঃ...’’

বলতে বলতে থেমে যান বুলা চৌধুরী তাঁকে আর বলা গেল না যে, রাগ করবেন না, মমতা এইরকমই শুক্রবার সন্ধ্যায় স্টার আনন্দ চ্যানেলে দু’ঘণ্টা ধরে বসে তিনি এমন সব মিথ্যা, এমন সব চটকদারি বক্তব্য ছেড়েছেন, যা দেখে স্টার আনন্দও বুঝেছে, এই মহিলার ভাবমূর্তি মেরামত করা কঠিন, খুব কঠিন... মমতার দাবি ও কথাবার্তা শুনে সঞ্চালক মশাই-ও হাসি ঠেলে সরাতে পারেননি নেহাত ক্যামেরা তাক করা আছে বলে মুচকি হাসি ঝোলাতে বাধ্য হয়েছেন সবসময় না হলে? হো হো হাসির ফোয়ারা ছুটে যেত স্টুডিওতে...

যেমন, ওই যে ওই কথাটা, মমতা যেমনবললেন, এই যে আপনারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন এখন, কথা বলেন সবসময় এটা কে করেছে? আমিই তো! শ্যাম পিত্রোদাকে ডেকে এনে অপটিক্যাল ফাইবার বসিয়েছিলাম সর্বত্র তারপরই তো মোবাইল ফোনের এমন প্রসার...

যেমন, মমতা বললেন, হাওড়া আর শিয়ালদহকে জুড়ে দিলাম আমিই আগে অনেক ঘুরপথে যেতে হতো আমি করলাম সরাসরি নর্থ থেকে সাউথে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না আমিই তো নর্থ সাউথ জুড়লাম...

যেমন, মমতা বললেন, পাবলিককে ইনভলব্ করে যে উন্নয়ন, সেটাই হলো বিশ্বায়ন...

যেমন, মমতা বললেন, গড়িয়াহাটে ওটা ফ্লাইওভার হয়েছে? নিচটা অন্ধকার এমন ফ্লাইওভার দেখে আমার রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’র কথা মনে পড়ে যায়...

বলেছেন মমতা এমন সব কথা কিন্তু ঘটনা কী? ধরা যাক গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারের কথাই

আনন্দবাজার পত্রিকারই এক বিশেষ সংবাদদাতা দেবাশিস ভট্টাচার্য তাঁর পত্রিকায় মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে ২০০১-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ‘বিজয় কিংবা বিপর্যয়’ শিরোনামে একটা লেখা লিখেছিলেন তাতে তিনি যা লিখেছিলেন, গড়িয়াহাট উড়ালপুল নিয়ে মমতা ব্যানার্জির প্রশস্তিই ছিলো তখন যেমন, ওই লেখার শুরুতেই ছিলো ‘‘দু’হাজারের ডিসেম্বরে এক বিকেলে গাড়িতে গড়িয়াহাট মোড় পেরোচ্ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ...উড়ালপুল তৈরির দাপটে গড়িয়াহাট এখন যেমন সঙ্কীর্ণ, তেমনই দুর্গম ‘কবে শেষ হওয়ার কথা এই ফ্লাইওভার?’ গাড়িতে বসে কথা বলছিলেন মমতা ‘ঠিক আছে কাজ চলুক উদ্বোধন তো করবো আমরা ক্ষমতায় এসে... এই ফ্লাইওভার ওদের আমলে শুরু হলেও ফিতে কাটবো আমি’ হাসি ছড়িয়ে পড়লো নেত্রীর মুখে’’

মমতা তখন ভেবেই নিয়েছিলেন ২০০১-এর নির্বাচনে জিতবেন আর উনি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গড়িয়াহাট উড়ালপুলের ফিতে কাটবেন! সে যাক কিন্তু কথা হলো, তখন তো তিনি ‘নিচে অন্ধকার’ দেখেননি গড়িয়াহাটে! মনে পড়েনি ‘রাশিয়ার চিঠি’র কথা! আজ এসব কথা কেন?

একটাই কারণ ভাবমূর্তি রচনায় মিথ্যাভাষণ চালাতেই হবে তাঁকে এবং তিনি জানেন, যেসব মিডিয়া নতুন করে তাঁর ভাবমূর্তি রচনার দায়িত্ব নিয়েছে, তারা তাকে পালটা এমন কোনো প্রশ্ন করবে না, যা তাঁকে দ্বিচারিতার দায়ে ফেলতে পারে যেমন ধরুন, শুক্রবার সন্ধ্যায় স্টার আনন্দের স্টুডিওয় বসে মমতা ব্যানার্জির একটি দাবির কথা তিনি বলে দিলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বালকোকে বাঁচাতে আমিই সাহায্য করেছিলাম’ বুঝুন! বালকো কারখানার শ্রমিকরা কি শুনলেন সে কথা? কিংবা তাদের পরিবার পরিজন? লক্ষ্য করে দেখুন, মমতা এমন দাবি করার পরও সঞ্চালক তাঁকে এই প্রশ্নটা করলেন না যে, আপনি যখন রেলমন্ত্রী কেন্দ্রের এন ডি এ সরকারে, ২০০৪ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি তারিখেই তো বাজপেয়ী সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বালকো-কে স্টারলাইট নামে একটি বেসরকারী সংস্থার কাছে মাত্র ৫০১ কোটি টাকায় বেচে দিয়েছিলেন তাহলে বালকোকে আপনি বাঁচালেন কোথায়?

এমন সব প্রশ্নের উত্তর মমতা দিতে গিয়ে বিপাকে পড়বেন বলেই, আনন্দবাজারের সাজানো গোছানো স্টুডিওয় সঞ্চালক এইসব প্রশ্ন করেননি কিংবা বালকো তথা রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিলগ্নীকরণের যে নীতি, আনন্দবাজার সেই নীতি পছন্দ করে এবং মমতা ব্যানার্জি কেন্দ্রীয়মন্ত্রী থাকাকালীন ওই নীতি অনুসরণ করেন বলেই হয়তো ওই প্রশ্ন তোলেননি সঞ্চালক বিপদ আছে আরেকটা মজা দেখতে যদি প্রশ্নটা করাও হয়, আগেরদিনই টালা পার্কে প্রকাশ্যে মমতা ব্যানার্জি যেভাবে কিছু সংবাদমাধ্যমকে হুমকি দিয়েছেন, তেমন কিছু যদি বেরিয়ে আসে ওর মুখ থেকে ২০০১ সালের ৩০শে এপ্রিল গাইঘাটায় জনসভায় এই মমতাই তো বলেছিলেন, ‘কিছু পাইয়ে দিতে পারিনি বলেই কিছু কাগজ আমার বিরুদ্ধে লিখছে

নাহলে কত প্রশ্ন করার ছিলো তৃণমূলনেত্রীকে! ওই যে তিনি বললেন, আমরা সুর বদল করি না! তারপরই টিভি চ্যানেলে স্ক্রোল দেখাতে শুরু করলো মমতার সেই কথাটাই কিন্তু সত্যিই সুর বদল করে না তৃণমূল? প্রশ্ন হোক, এবারের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস বা বি জে পি তথা এন ডি এ সম্পর্কে কোনো কথা কেন নেই তৃণমূলের ৮৩ পাতার ইশ্তেহারে? কিন্তু ১৯৯৮ সালে কী ছিলো? সেবার তৃণমূলের ২৭ পাতার ইশ্তেহার ছিলো তাতে কংগ্রেসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে কী লেখা হয়েছিল? পঞ্চম পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছিলো, ‘‘যাঁদের (কংগ্রেস) সেই পবিত্র দায়িত্ব পালনের কথা ছিলো, গান্ধী নেহরু ইন্দিরার আদর্শের বুলি কপচেও তাঁরা ভয়ঙ্করভাবে আপসকামী...পরাধীন ভারতে কোম্পানি বাহাদুরের প্রসাদধন্য একশ্রেণীর বিশ্বাসঘাতকের মতো এঁরাও বাংলার মানুষের সঙ্গে নিরন্তর গদ্দারি করে চলেছেন’’

১৯৯৯ সালের তৃণমূলী ইশ্তেহারে কংগ্রেস দল সম্পর্কে কী লেখা হয়েছিলো? মমতা ব্যানার্জি লিখেছিলেন, ‘‘সি পি এমের সামান্য অনুগ্রহ লাভ করে দিবানিদ্রায় ডুবে থেকেছেন তথাকথিত প্রধান বিরোধী দল — কংগ্রেস নেতারা মানুষের সঙ্গে এরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন প্রতারণা করেছেন বিরোধীদলের মুখোশ পড়ে সি পি এমের অনুগ্রহ নিয়ে মানুষের প্রতিবাদকে বিক্রি করে দিয়েছেন এরা কী করেননি এই মুখোশধারীরা?’’ এরপরই যে তালিকা মমতা দিয়েছিলেন সেই ইশ্তেহারের চতুর্থ ও পঞ্চম পৃষ্ঠায়, তার জবাব দেওয়ার দায় কংগ্রেসেরই ছিলো

সেই ১৯৯৯ সালেরই ইশ্তেহারেও বি জে পি তথা এন ডি এ সম্পর্কে তৃণমূল নেত্রী অষ্টম ও নবম পৃষ্ঠায় যে লেখা লিখেছিলেন, তা-ও একবার দেখা যাক মমতা লিখেছিলেন, ‘‘...কেউ কেউ বলছেন বি জে পি অচ্ছ্যুৎ আমাদের বক্তব্য কোনো দলই অচ্ছ্যুৎ নয় নির্বাচন কমিশন যখন স্বীকৃতি দিয়েছে, মানুষও ভোট দেন, তখন অচ্ছ্যুৎ কেন? আর মসজিদ ভাঙা? বি জে পি যদি দোষী হয়, কংগ্রেসও দায় এড়াতে পারে না কেন্দ্রে তখন ক্ষমতায় ছিলেন নরসিমা রাও সরকার ...অটলবিহারী বাজপেয়ী মাত্র ১৩ মাস ক্ষমতায় ছিলেন...দেশে কোনো দাঙ্গা হয়নি সংখ্যালঘুরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হননি...’’ এই ইশ্তেহারে সোনিয়া গান্ধীকে কটাক্ষ করেই মমতা লিখেছিলেন, ‘‘অটলবিহারী বাজপেয়ী এখন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেশের মধ্যে যোগ্যতম লিখিত ভাষণ পাঠ নয় (অর্থাৎ সোনিয়া গান্ধীর মত নয়), স্বতঃস্ফূর্ত দৃঢ়তায় তিনি দক্ষতার সঙ্গে দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন’’

এতসব কথা তখন এখন ‘ভালো বি জে পি’ আর ‘খারাপ কংগ্রেস’ কারো সম্পর্কেই কোনো কথা নেই এবার নির্বাচনী ইশ্তেহারে সুর বদল নয়? সুর বদল করেন না মমতা ব্যানার্জি? প্রশ্ন ওঠেনি উঠবে না তবে বলি, এসব জেনে রাগবেন না হাসি পাবে এবং হাসুন উনি তো এইরকমই বলেন দেখলেন না, উনি বললেন, ন্যানো কারখানাটা এখান থেকে যে গুজরাটে নিয়ে গেলো টাটারা, সেটা সি পি এম আর বি জে পি-র গেমপ্ল্যান!

হাসুন কমিক রিলিফ হিসাবে ভাবুন রাগবেন না প্লিজ