বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০০৯

সময় ~ সোমশুভ্র



ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় সামনের গাড়িও ভাল করে দেখা যায় না। নীরাদের ট্যাক্সিটা ছুটে চলেছে বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। নীরা চুপ করে বসে আছে বাবা মা র মাঝখানে। আজ অনেকদিন পর সে বাড়ি ফিরছে তাই তার খুব আনন্দ, কিন্তু সেই খুশির মেঘকে ঢেকে দিয়েছে অন্য এক বড় আঘাত। শুভ্রকে খুব বেশি করে মনে পড়ছে তার। সেই পুরানোস্মৃতিগুলো আজ বারবার তার মনের আঙিনায় আসাযাওয়া করেই চলেছে। চোখের জল আটকাবার বৃথাই চেষ্টা করছে সে।


শুভ্রর সাথে নীরার প্রথম আলাপ ট্রেনে। নীরা তখন প্রথম বর্ষের ছাত্রী।বাবা মা ভাইএর সাথে পুরী বেরাতে গিয়েছিল। আলাপ হয় শুভ্রর পরিবারের সাথে।সাধারণ সহযাত্রীদের মধ্যে যেটুকু কথোপকথন হয়, সেরকমই কিছু হয়েছিল ২টো পরিবারের মধ্যে।তারও কম কথা হয়েছিল শুভ্র র নীরার মধ্যে।


সেই কথাগুলো আজও নীরার পরিষ্কার মনে আছে।সারাদিনের নানা কাজের মধ্যে,মনে পড়ত শুভ্র।তারপর র কোনো যোগাযোগ ছিলনা ওদের মধ্যে….একদিন প্রায় ৩মাস পরে হঠাত দেখা হয় গড়িয়াহাটের মোড়ে। কিছুক্ষণ ২জনই চুপ ।তারপর কথা বলতে বলতে কখন বিকেল থেকে অন্ধকার নেমে এসেছে, বুঝতেই পারেনি ২জনের কেউই।


সেই দিন থেকে নীরার পৃথিবীতে সাদর অর্ভথন‌্যা হয় শুভ্রর।দুজনের চোখে তখন একটা সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন।কেটে যায় ২বছর।কিছু ভাললাগা কিছু খারাপলাগা স্মৃতি জুড়ে যায় তাদের জীবনের সাথে।


শুভ্র চাকরি পায় ১টি আর্ন্তজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সঃস্থায়।নীরা তখনও কলেজে। কাজের চাপ কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি করে দুজনের মধ্যে। সকাল বেলার ফোনে কথাটা, এখন কাজের চাপের গ্রাসে চলে গেছে।কিন্তু রোজ রাতের বেলা ঘরে ফিরে শুভ্র নিয়ম করে ফোন করে নীরাকে।কাজের চাপ, দিনের দিন বেরেই চলেছে। আগে যেমন ইচ্ছে করত শুভ্রর ,বাড়ি গিয়ে নীরার কথা শুনতে ,এখন যেন সারাদিনের ক্লান্তি সেই ইচ্ছাটাকেও পিষে মেরে ফেলছে। কিন্তু নীরাকে সে কথা বোঝায় কার সাধ্য। অগত্যা রোজ “সময় নেই” বলে চলে মান অভিমানের পালা।র তার সাথে চলে সময়ের খোঁজ। নীরা দিনের পর দিন আরও বেশি করে একা হয়ে যায়।সারাদিনের প্রতীক্ষা তাকে অস্থির করে তোলে। মনের গভীরে অভিমানের মেঘ ক্রমশ ঘন থেকে ঘনতর হয়।তবে যার জন্য এই অভিমান তার কোনো ভ্রুক্ষেপনেই তাতে।কিম্বা উপলব্ধি করেও এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সুন্দর ভাবে,কারণ সে জানে নীরাকে বোঝানো বৃথা।র এত সময় কোথায়? মাঝেমাঝে নীরার অশ্রুমিশ্রিত কন্ঠ শুভ্রকে আত্মবিশ্লেষণের একটা সুযোগ করে দেয় মাত্র; সত্যি কি সে পালটে যাচ্ছে? নীরাকে সে আজও ভালবাসে; এটা সে নিজে বিশ্বাস করে ,নীরাও জানে সেটা জানে…….. তবে এখন ৩বছর কেটে যাওয়ার পর এই কথাটাই নীরাকে বোঝানোর জন্য সময় দিতে হবে?


মেনে নেওয়া র মানিয়ে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে কোনো্রকমে বন্ধুর পথ দিয়ে চলছিল সর্ম্পকটা। নীরা কি করবে ভেবে পায়না! যত দিন যায় শুভ্র যেন অচেনা হয়ে যাচ্ছে তার কাছে। তার ছোটো ছোটো খুশি, আনন্দ, দুঃখ --- যেগুলোর সঠিক মূল্যায়ন একমাত্র শুভ্রর কাছে হত, আজ যে সেগুলোতে ধূলো পড়ে গেলেও শুভ্র একবার ফিরেও তাকায় না।সত্যি সময়ের এত অভাব? নাকি তার সাথে ইচ্ছারও অভাব!! এই প্রশ্ণ যতবার নীরার মনে আসে, দু চোখ ভরে আসে জলে। বেশি কিছুতো নয়, শুধু একটু সময়ই তো চেয়েছে সে --- খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছে কি?


প্রায় ৪মাস পরে শুভ্র সাথে দেখা করার কথা ছিল নীরার।সকাল থেকে বৃষ্টি পরেই চলেছে,থামবার কোনো লক্ষণ নেই। নীরা কিছুটা উত্তেজিত। একটা ক্ষীণ আশঙ্কাও আছে, বৃষ্টি না আবার বারিয়ে দেয় তার প্রতীক্ষাকে।নীরার মোবাইল বেজে ওঠে। ওপাশে শুভ্রর কন্ঠ ভেসে ওঠে ”আজকে কি র বেরবে এই বৃষ্টির মধ্যে?” নীরার উত্তর” হ্যাঁ”। অগত্যা ঝিরঝিরে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্যাচপ্যাচে কাঁদায়, জল ডিঙিয়ে, প্যান্ট গুটিয়ে যেতে হবে, দেখা করতে নীরার সাথে। এভাবে অফিস যাওয়া - মানা যায় তবুও, কিন্তু ওর সাথে দেখা করার জন্য এতও ঝক্কি পোয়ানো…….. মনে মনে খুব বিরক্ত হয় শুভ্র।অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেরতে হয়।মাঝে মাঝে নীরাকে খুব অবুঝ লাগে শুভ্রর। নীরা যেন দিনদিন কেমন বদলে যাচ্ছে। কথায় কথায় শুভ্রকে ভুল বোঝাটা যেন স্বভাবে দাড়িয়ে যাচ্ছে। অন্যমণস্ক ভাবে হাটছিল শুভ্র…….সামনের জল ভর্তি খন্দটা খেয়াল ই করেনি শুভ্র।টাল রাখতে না পেরে সোজা রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের চেষ্টার পর আস্তে আস্তে দাঁড়ায় শুভ্র। পায়ে অসহ্য ব্যাথা। কোনরকমে খুড়িয়ে খুড়িয়ে বাড়ি ফেরে। বেশ অনেকটাই কেটে গেছে হাঁটুর কাছটায়। পা ধুয়ে কোনরকমে খাটে এসে বসে। নীরার জন্যই এইসব হল……..মারাত্মক রাগ হয়েছিল নীরার উপর।” একটা স্বার্থপর অবুঝ মেয়ে, কী হত আজ দেখা না করলে? কে জানে কতদিন ভুগতে হবে, এই ব্যাথা নিয়ে।”


প্রায় ২ঘন্টা হতে চলল নীরা অপেক্ষা করছে। ঝিরঝির করে বৃষ্টি হয়েই চলেছে।বারবার রিঙ হয়েই “no answer” হয়ে যাচ্ছে শুভ্রর ফোন। নীরা অস্থির হয়ে ওঠে। ”শুভ্র কি তাহলে ভুলে গেল? না কি কিছু অঘটন ঘটল?” একরাশ আশঙ্কা ভীড় করে আসে নীরার মনে। বারবার ফোন করতেই থাকে সে। রিঙ হয়েই যাচ্ছে, হঠাতই ওপার থেকে ভেসে ওঠে শুভ্রর গলা। ”sorry, তুমি রাগ করলেও আমার কিছু করার নেই, আমি যেতে পারছিনা। রাস্তায় পড়ে গিয়ে পায়ে লেগেছে, হাঁটার ক্ষমতা নেই।” নীরা বলে “এতক্ষণ ফোন ধরছিলেনা,আমি খুব চিন্তা করছিলাম, কি করে পড়ে গেলে? একদম হাঁটতে পারছ না?” কর্কশ গলায় উত্তর আসে “ আমার বন্ধুরা দেখতে এসেছে আমাকে, ওদের সাথে কথা বলছিলাম। ফোন অন্যঘরে ছিল, শুনতে পায়নি।র আমার সত্যি হাঁটার ক্ষমতা নেই--- বিশ্বাস করার হলে কর ,নাহলে আমি কি করব বল? এই বৃষ্টি কাদায় না বেরলে, তোমার শান্তি হচ্ছিল না----- ভালবাসার প্রমান দিতে পারছিলাম না তোমাকে। এখন খুশি ...... র কিছু জানার আছে?” ফোন কেটে দিয়েছিল নীরা।দু চোখ ভেসে গেছিল জলে। চুপ করে দাড়িয়েছিল কিছুক্ষণ। মেনে নিয়েছিল তারই দোষ। কি আর করার আছে তার মেনে নেওয়া ছাড়া। বাড়ির দিকে বাস ধরার জন্য রাস্তা পার করে অন্যপাশে আসে।

প্রায় ১মাস কেটে গেছে।আজকে নীরাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে হসপিটাল থেকে।বাস থেকে নামতেগিয়ে পা হড়কে পড়ে, মারাত্মক ভাবে যখম হয়েছিল সে। একে একে সবাই এসে দেখে গেছে তাকে, কিন্তু শুভ্র আসেনি। নীরার স্থির বিশ্বাস ছিল শুভ্র নিশ্চয় জানে না এইসব ।তাই আজ ফোন করেছিল শুভ্রকে ।ওপাশে শান্ত গলায় প্রশ্ণ”কেমন আছ?” নীরা মৃদু হেসে বলে “ভাল, তো্মার পায়ের ব্যাথা কেমন আছে?” শুভ্র “ ও ঠিক আছে? তো্মায় কবে ছাড়বে হসপিটাল থেকে?” নীরা অবাক , “তুমি জানতে? তাও একদিন ও এলে না?” শুভ্র” কি করব বল? এত কাজের চাপ ,একদম সময় পায়নি,তবে একটা ভাল খবর আছে তো্মার জন্য, বলত কি?” নীরা একটু থেমে বলে “জানিনা,তুমি বল?” শুভ্র” আমার onsite যাওয়া টা ফাইনাল হয়ে গেছে,পরের মাসেই। তুমি খুশি?” নীরা “হ্যাঁ, খুব খুশি। মা ডাকছে, আজ বাড়ি ফিরব।”