মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০০৯

কোন দিক সাথী, কোন দিক বল…কোন দিক বেছে নিবি তুই…


চতুর্দশ লোকসভা নির্বাচনের শেষে ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকার তৈরীর সময় বামদলগুলো তাদের সমর্থন করেছিলো ৬টি common minimum programme-এর ভিত্তিতে:
  • সরকার, ধর্মের নামে যারা দাঙ্গা বাঁধায়, তাদের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে লড়বে।
  • শান্তিতে থাকবে সাধারণ মানুষ।
  • প্রতি বছর আর্থিক উন্নতি হবে গড়ে ৭-৮%, বেকাররা চাকরী পাবে।
  • গায়ে গতরে খাটা কৃষক আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শ্রমিকের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে।
  • মহিলারা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-আইনি ইত্যাদি সবরকমভাবে সুরক্ষিত থাকবেন।
  • পড়াশোনা থেকে চাকরী-বাকরি সবকিছুতেই সবরকমভাবে সুযোগসুবিধা পাবেন পিছিয়ে পড়া মানুষেরা।
  • ছোট ব্যবসায়ী থেকে বৈজ্ঞানিক বা ইঞ্জিনিয়ার সকলের উন্নতির জন্য সাহায্য করবে সরকার।
সব শেষে বলা হয়েছিলো “The UPA makes a solemn pledge to the people of our country: to provide a government that is corruption-free, transparent and accountable at all times, to provide an administration that is responsible and responsive at all times… The UPA is committed to the implementation of the CMP. This CMP is the foundation for another CMP—collective maximum performance.”

সমস্যা হল, common minimum programme-এর মধ্য কাজ করার, তাকে ইমপ্লিমেন্ট করার যে সদিচ্ছা বামদলগুলির মধ্যে ছিলো, তা সরকারের মধ্যে ছিলো না। আর তাই, বামপন্থীরা যখন বিকল্প অর্থনীতি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, সরকার তখন নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে প্যাকেজ আর প্রকল্প ঘোষনার মধ্যে। সাধারণ মানুষ রয়ে গেছেন দারিদ্র আর হতাশার ঘেরাটোপে। একই সময় বামপন্থীরা আন্দোলন করে গেছেন বিভিন্ন ইস্যুতে:
  • পেট্রলের দাম কমানোর দাবিতে।
  • নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমানোর দাবিতে।
  • পেনশনের টাকা শেয়ারে খাটানোর বিরুদ্ধে।
  • ভারত-আমেরিকার সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে।
  • ১২৩ এগ্রীমেন্ট বাতিলের দাবিতে।
  • ব্যাঙ্ক, বিমা, রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পগুলিকে বেসরকারি হাতে তুলে দেবার বিরুদ্ধে।
আমাদের রাজ্যে আমরা দেখলাম শিল্পায়নের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে এক জোট হয়েছে তৃণমূল, স্বঘোষিত মাওবাদি, কংগ্রেস, বিজেপি, ঝাড়খণ্ড মুক্তিমোর্চা থেকে শুরু করে সমস্ত কম্যুনিস্ট বিরোধী শক্তি। যারা ৫ থেকে ১০, এমনকি বাইশ ফসলী জমির কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। ৫ বা ১০ বা বাইশ ফসলী জমি হয় কিনা আমাদের জানা নেই। আমরা যা জানি, তা হল পশ্চিমবঙ্গে মূলতঃ আমন আর বোরো ধানের চাষ হয়। বীজ থেকে চারা বেরোতে সময় লাগে একুশ দিন। চারা পোঁতা থেকে ধান তোলা অবধি সময় লাগে প্রায় তিন মাস। একবার ধান তোলার পর কিছুদিন জমিকে ফেলে রাখতে হয়। অর্থাৎ যা দাঁড়ালো, বছরে দুবার চাষ করতেই লাগে প্রায় সাত থেকে আট মাস। বাকি থাকে চার মাস। এই চার মাসে কুমড়ো-আলু-সর্ষে-ঝিঙে-বেগুন-পটল সব একসাথে চাষ অসম্ভব? “জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো”-র যে কঠিন তত্ত্বটি খাড়া করা হচ্ছে, সেটা হয়েছে বলেই রুখা মাটির জেলাগুলো ছাড়া বাকি প্রায় সব জমিতেই একাধিক ফসল ফলে। আমরা মনে করি শিল্পায়ন জরুরীসত্তরের দশকের শেষ থেকে এই রাজ্য নির্ভরশীল ছিলো কৃষি এবং কৃষিজাত দ্রব্যের ওপর - নজিরবিহীন অপারেশন বর্গা এবং বোরো ধানের দৌলতে৷ ২০০৪ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৬ লক্ষ বর্গাদার রেজিস্ট্রেশন হয় - সংখ্যাটা ভাগচাষীদের ৮৬%-এর কাছাকাছি৷ গোটা দেশের সাড়ে তিন শতাংশ জমির অধিকারি পশ্চিমবঙ্গে রিডিস্ট্রিবিউটেড জমির অনুপাত দেশের ২০% - বামফ্রন্ট সরকারের একটা বিরাট সাফল্য৷ এর পাশাপাশি শুরু হয় নতুন ধরণের বীজ ব্যবহার করে বোরো চাষ - ছোট জমিতে এই চাষের সাফল্যের পিছনে অপারেশন বর্গার অবদান বিরাট৷ কৃষক সভার ৩৫০০ এর ওপর শহিদের ভুমিকাও ভুলবার নয় এই অপারেশন বর্গার পিছনে। আজ ৮৪% জমি ছোট কৃষকের হাতে, যেটা ৯৮% এর মত পরিবার সারা বাংলা মিলিয়ে। এই সাফল্য-ই আজকে একটা নতুন সমস্যার সৃস্টি করেছে, ছোট কৃষকের পরিবারের জন্যে জমির পরিমান একই আছে, কিন্তু পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে জমির ওপর চাপ বাড়ছে, কৃষিক্ষেত্রতে উদ্বৃত্ত শ্রম বাড়ছে।

“All this led to prosperity and growth in rural West Bengal. Land reforms, especially tenural security, provided the farmers the incentive to work harder. Boro technology helped them raise multiple crops with higher yields. Decentralisation of rural power ensured social stability and security so crucial for growth. West Bengal emerged as the largest rice producing state in India contributing more than 15 per cent of national production. During the 1980s boro cultivation grew at an average annual rate of 12 per cent and overall foodgrains at a rate of 5.5 per cent.”
- Development and Displacement, Abhirup Sarkar, Economic and Political Weekly, 21st April, 2007

আশির দশকের কৃষিক্ষেত্রের অগ্রগতি ক্রমশ: স্লথ হয়ে আসে নব্বইয়ের দশকে - বেশ কিছু কারণে৷ সংক্ষেপে বলতে গেলে বোরো ধানের জন্যে নতুন জমির অভাব, জলের অভাব ইত্যাদি কারণে ফলন কমতে শুরু করে৷ দ্বিতীয়ত: পুরনো মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির জন্যে এ রাজ্য থেকে চাল রপ্তানির সীমাবদ্ধতা৷ এর সাথে যুক্ত হয় এই রাজ্যে পড়তি চাহিদা থেকে পড়তি দাম৷ এসবের ফলে কৃষিজীবির সংখ্যা ৩৮% থেকে কমে দাঁড়ায় ২৫%-এ, ১৯৯১ থেকে ২০০১ - এই দশ বছরের মধ্যে৷ পশ্চিমবঙ্গে আরও বড় একটা সমস্যা ছিলো - মানুষ এবং জমির অনুপাত অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় খুবই কম - অনেকটাই দেশভাগের কারণে৷ দেশভাগের সময় ভারতের উত্তরপশ্চিমে উদ্বাস্তুদের মুভমেন্ট ছিলো দুইদিকেই - অনেকে পাঞ্জাব ছেড়ে পাকিস্তানে চলে গেছেন, অনেকে ওদিক থেকে পাঞ্জাবে এসেছেন৷ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এটা ওয়ানওয়ে ট্রাফিক, এবং এই সমস্যা আজও রয়েছে - ফলত: জমি এবং মানুষের অনুপাতটা বেশ অ্যালার্মিংভাবে কমছে, আজও, এবং একই সাথে মাথাপিছু ফলন৷

“The problem got worse over time with an incessant inflow of people into the state from neighbouring countries and states continuing even today. The productivity of West Bengal agriculture is not very low. In fact, in foodgrains production it ranks right below Punjab and Haryana in terms of production per hectare. But if that production is divided by the number of heads dependent on land, the per capita availability is certainly low.” - Development and Displacement, Abhirup Sarkar, Economic and Political Weekly, 21st April, 2007

এর মানেটা দাঁড়ালো এই - যে প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা ভূমিসংস্কার এবং বোরো বিপ্লবের পরেও নতুন শতকের শুরুতে চাই আরো অনেক কিছু - পার ক্যাপিটা কনজাম্পশন, রুরাল আনএমপ্লয়মেন্ট রেট, গ্রামে পাকা বাড়ির সংখ্যা, বা বিদ্যুত - সবেতেই আমাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে। এদিকে এগিয়ে চলার একটা উপায় কৃষিক্ষেত্রে আরো বিনিয়োগ এনে কনট্র্যাক্ট ফার্মিং চালু করা - যদিও সেখানে উদ্বৃত্ত কৃষকদের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন এসে যায়৷ বাকি রইলো দ্বিতীয় উপায় - শিল্পায়ন৷ যদিও এর অর্থ কৃষিক্ষেত্রকে উপেক্ষা নয়৷ এখানে আমাদের লক্ষ্য হল কৃষিক্ষেত্রের বাইরে আরো অনেক সম্ভবনা তৈরী করা - কারণ অত্যন্ত খারাপ ল্যাণ্ড-টু-ম্যান অনুপাতের জন্যে পশ্চিমবঙ্গে যাতে কৃষির ওপর চাপটা প্রবল। আমাদের লক্ষ্য এই চাপটা ধীরে ধীরে কমানো, পুরোপুরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল লোকেদের একটা অংশকে অন্য পথে নিয়ে আসা - কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে।

দুটো বাস্তব সত্যকে মানতেই হচ্ছে -

(১) ৭৭ সালের পরে যে জমি জোতদারদের হাত থেকে কেড়ে পরের জমিতে চাষ করা আধমড়া কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, বংশবৃদ্ধি এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে ভাগ হতে হতে তা ক্রমশঃ ছোট হয়েছে। পাশাপাশি, সব চাষীর ছেলেমেয়েরা এখন শুধু চাষবাস করে সংসার চালাতে চাইছে না। আজ শিক্ষা তাদের শহরমুখী করে তুলেছে চাকরীর খোঁজে।

(২) পশ্চিমবঙ্গে আজ এত স্কুল-কলেজ। প্রতি বছর শুধু ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হচ্ছে কয়েক হাজার। আমাদের এই সব ছেলেমেয়েদের হাতে কাজ তুলে দিতে গেলেও তো শিল্প চাই। তা না হলে আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা যাবে ভিন-রাজ্যে। আর আমরা, দিন কাটাবো অনন্ত প্রতীক্ষায়…

অতএব, আমরা শিল্প চাই। সব স্তরের মানুষের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যেই শিল্প প্রয়োজন। আর তাই, ক্ষমতা তুলে দিতে চাই তাদেরই হাতে যাদের সেই সদিচ্ছাটুকু আছে। যদিও বিশ্বাস করি না এইভাবে সমাজের সব স্তরের মানুষের আমূল পরিবর্তন সম্ভব। তার জন্যে দরকার সমাজটাকেই বদলে ফেলার। এটা সেই প্রক্রিয়ারই অঙ্গ।