শুক্রবার, ২৬ মে, ২০১৭

বিজেপি আইটি সেল ইন্টারভিউ ~ সতদ্রু দাস

- গুড মর্নিং স্যার। মাইসেলফ মহেশ, ফ্রম হরিণঘাটা।
- মর্নিং। লেখাপড়া কদ্দুর?
- স্যার তিন বার উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছি, তারপর ডিপ্লোমার জন্য চেষ্টা করছি, আশা করছি...
- ওভার-কোয়ালিফায়েড।
- আজ্ঞে?
- ডিপ্লোমা হয়ে গেলে ওভার-কোয়ালিফায়েড হয়ে যেতেন। যাজ্ঞে, কম্পিউটার ব্যবহার কতটা পারেন?
- স্যার ওয়ার্ড, স্প্রেডশিট, পাওয়ার পয়েন্ট, সামান্য ভিডিও এডিটিং আর জা..
- ফটোশপ? পারেন?
- হ্যাঁ অল্প স্বল্প পারি।
- অল্প স্বল্পতে হবে না। এনিওয়ে, ওটা শিখিয়ে দেওয়া হবে। এবার আপনাকে কয়েকটা ছবি আর ভিডিও দেখাবো, আপনাকে বলতে হবে এটা কিসের ছবি আর ভিডিও। রেডি?
- ওকে স্যার।
- ছবি নম্বর ওয়ান। এটা কোন জায়গা?
- স্যার এটা তো দেখে মনে হচ্ছে নিউ ইয়র্কের ম্যানহ্যাটান।
- আপনি শিওর?
- হ্যাঁ, ওই তো এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং।
- ভুল। এটা আমেদাবাদের আশ্রম রোড।
- কিন্তু স্যার...
- নেক্সট, এটা কিসের ভিডিও?
- ইসসস! কী ভয়ংকর! আইসিস জঙ্গি বা মেক্সিকান ড্রাগ ওয়ারের ভিডিও মনে হচ্ছে স্যার। জানেন স্যার মেক্সিকোর ড্রাগ মাফিয়ারা এরকম গলা কেটে ডজন ডজন মানুষকে ঝুলিয়ে রাখে রাস্তার মোড়ে...
- কিন্তু এটাকে কী বলে চালাতে হবে?
- মানে স্যার..
- ধুর! এটাকে বলতে হবে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের হাতে হিন্দু খুনের ভিডিও। আপনার পারফরম্যান্স এখনো অবধি ডিসাপয়েন্টিং। যাই হোক, পরের ছবিটা দেখুন। এটা কি?
- সিপিএমের মিছিল মনে হচ্ছে স্যার। টিয়ার গ্যাস শেল তুলছে হাত দিয়ে।
- তারপর?
- এটাকেও বিজেপির মিছিল বলবো? কিন্তু স্যার পতাকাটা?
- এখানেই তো ফটোশপ স্কিল! সবই বলে দিতে হচ্ছে আপনাকে। পরের ভিডিওটা দেখুন। 
- এটা দেখেছি, উত্তর প্রদেশে দলিতদের হাত কেটে দিচ্ছে ঠাকুররা। এই জাতি দাঙ্গা কবে থামবে কে ...
- আমাদের কাজে কী ভাবে আসতে পারে?
- বুঝলাম না। অখিলেশের আমলের ঘটনা বলবো?
- হুঁ, সেটা বলা যেতে পারে তবে তার চেয়েও ভালো হবে যদি বলেন মুসলমানদের হাতে দলিত খুন।
- লোকে বিশ্বাস করবে?
- বার বার করে বললেই করবে। এই ছবিটা চেনেন?
- হ্যাঁ কি যেন নাম? পুলিশের হেফাজতে মরে গেলো। বাম রাজনীতি করতো। সুদীপ্ত না কি...
- আমরা কি বলবো?
- কি বলবো স্যার? আমরা বামেদের হয়ে প্রচার করবো নাকি?
- উফফ! আপনি তো মহা উজবুক! এর নাম হবে সত্যনারায়ণ আগরওয়াল। এবিভিপির কর্মী। মমতার পুলিশ খুন করেছে। নাঃ আপনাকে দিয়ে হবে না। পরীক্ষায় কোনোদিন টুকেছেন?
- না স্যার। বাবা বলতেন "যা নিজে পারবে তাই...
- বোঝা গেছে। আপনি আসতে পারেন। জয় শ্রী..?
- রাম!
- হর হর..?
- মহাদেব!
- মহাদেব না, মোদি। ওই জন্যই বললাম আপনাকে দিয়ে হবে না। আসুন।

বৃহস্পতিবার, ২৫ মে, ২০১৭

মিছিল ~ কৌশিক দত্ত

অনেক কিছু দেখার ছিল আজ, সেই হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দিন। নকশালবাড়ি হত্যার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেন জাতীয়তাবাদী বিজেপি নগর-পুলিশের সদর দপ্তরে কামান দাগতে নামল, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল না। রাজনৈতিক গুরুত্বে পিছিয়ে না পড়ার তাড়না বড় বালাই, অত দিনক্ষণ খেয়াল রাখা যায় না। হঠাৎ সিদ্ধান্তের পর অল্প দিনে কত লোক জোগাড় করতে পারে, কোথা থেকে এবং কোন ধরণের মানুষ মিছিলে আসেন, সেসব রাজনৈতিক কৌতূহলের বিষয় হলেও আমার আগ্রহ ছিল অন্য কিছু বিষয়ে। 

১) বিজেপি কীভাবে মিছিল করে, ইটপাটকেল ছোঁড়ার পথে যায় কিনা, বিশেষত এমন এক সময়ে যখন কাশ্মীরে পুলিশের দিকে পাথর ছোঁড়া এমনই বড় এক সমস্যা, যার মোকাবিলায় পেলেট গান এবং হিউম্যান শিল্ডকেও সমর্থনযোগ্য প্রশাসনিক পদ্ধতি বলা হচ্ছে তাদের নিজেদেরই তরফে! 

২) পুলিশ কীভাবে মিছিলের মোকাবিলা করে? আগের দিনের মতো পেটানো এবং না পেটানো, দুটোই সমস্যাজনক রাজনৈতিক সংকেত বহন করবে, এরকম পরিস্থিতিতে সরকার ও পুলিশের ভূমিকা দেখার ছিল। 

৩) যাই ঘটুক, বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবির থেকে কেমন প্রতিক্রিয়া আসে, তাও আমাদের গণচরিত্র বোঝার জন্য এক মূলবান উপাদান।  

যা দেখা গেল, তার মধ্যে অপ্রত্যাশিত চমক বিশেষ নেই। জাতীয়তাবাদীরা ইট ছঁড়লেন, সাথে দু-একটা বোমাও। বোমাগুলো নিরীহ ধোঁয়া বোম ছিল, মিছিলে মিশে যাওয়া পুলিশের এজেন্টও ছুঁড়ে থাকতে পারে, কিন্তু ইটপাটকেল ছুঁড়েছে মিছিল (যা আগের দিনও ছোঁড়া হয়েছে) এবং জ্বালানো হয়েছে গাড়ি (যা আগের দিন হয়নি, তবে আগেরও আগে প্রায়শই হত)। সমস্যা হল, আজকের ভারতে বিজেপির মিছিলের এই কাজকর্ম বিভিন্ন উত্তেজনাপ্রবণ এলাকায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে এই জাতীয় হিংসাত্মক কার্যকলাপকে বৈধতা প্রদান করে। সংবাদ পরিবেশনের কৌশলের কারণে হতে পারে, আজ মিছিল বিশেষ দেখতে পেলাম না, শুধু গণ্ডগোলই দেখা গেল।  

পুলিশ খানিক শিখেছে, কায়দা বদলেছে দেখা গেল। মারপিট করেছে, কিন্তু "ডিস্ক্রিশন" ব্যাপারটা রপ্ত করেছে তিনদিনেই। উল্লেখযোগ্য উন্নতি হল সাংবাদিকদের না পেটানো। পুলিশ তার তাৎক্ষণিক সুফলও পেয়েছে। আজ সব চ্যানেলে একজন আহত পুলিশকর্মীর কাতরতার দৃশ্য অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছে। ভদ্রলোকের অবস্থা সত্যি বেশ খারাপ মনে হল, তাঁর আরোগ্য কামনা করি।  

মানুষের প্রতিক্রিয়া আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ। আজ যাঁরা মাথাফাটা যুবকের রক্তাক্ত ছবি দিয়ে পুলিশকে অত্যাচারী বলছেন, ২২ তারিখ তাঁদের দেখেছিলাম "মাকু"রা মার খাওয়ায় উল্লসিত হতে। আবার সেদিন যাঁরা পুলিশের হিংস্রতার প্রতিবাদে আগুন ঝরিয়েছিলেন স্লোগানে কলমে, আজ তাঁদের ভূমিকা অন্যরকম। কেউ সম্পূর্ণ নীরব, কেউ পুলিশের লাঠিচার্জকে ন্যায়সঙ্গত বলে যুক্তি পেশ করছেন, কেউ বিজেপি কর্মীদের আহত হবার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন (বিজেপির অবিমৃশ্যকারী আইটি সেল ফেক ছবি পোস্ট করে তাঁদের হাতে অস্ত্র দিয়েছে), কেউ আবার "চাড্ডি"রা মার খাওয়ায় বেশ আনন্দিত। আবার দুই দিনই পুলিশের ভূমিকাকে যাঁরা নিঃশর্তে সমর্থন করছেন, তাঁরা মূলত তৃণমূল সমর্থক। আর দু'মাস পর তাঁদের মনে পড়বে (প্রতি বছরের মতো) যে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযান করতে গিয়ে পুলিশের মারে আহত হয়েছিলেন তৎকালীন যুকং নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, থ্রি-নট-থ্রি বুলেটের ঘায়ে নিহত হয়েছিলেন ১৩ জন। তখন রাজ্যের তখতে আসীন ছিলেন তাঁরা, যাঁরা তিনদিন আগে শহরের রাস্তায় বেপরোয়া লাঠির শিকার হলেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রশক্তির চরিত্র বদলের জন্য বা অত্যাচারের প্রতিবাদের জন্য রাজনীতি নয় আমাদের; রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মেশিনারিটিকে নিজের স্বার্থে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারাই প্রকৃত লক্ষ্য। নইলে আজ অব্দি বিভিন্ন রাজনৈতিক মিছিলে নানা রঙের পতাকা হাতে নিয়ে অঙ্গ বা প্রাণ হারিয়েছেন যাঁরা, তাঁরা তো সাধারণ মানুষই। তাঁদের রক্ত আনন্দ দিয়েছে যাঁদের, তাঁরাও সেই একই বিরাট ব্র‍্যাকেটের অন্তর্ভুক্ত...  "সাধারণ মানুষ"! 

আবার "পুলিশ"কে রাষ্ট্রের দমননীতির বাহক ভাবতে অভ্যস্ত আমাদের রাজনৈতিক সত্তা উর্দির আড়ালে থাকা ব্যক্তি মানুষটিকে মানুষ হিসেবে চিনতে নারাজ। দলমতনির্বিশেষে তাই আমরা যখন বিরোধী শিবিরে থাকি, মিছিলে থাকি, তখন ব্যক্তি পুলিশ কন্সটেবল বা সার্জেন্টকে রক্তাক্ত লুটিয়ে পড়তে দেখে যুদ্ধজয়ের আনন্দ পাই। অথচ সেই মানুষটি হয়ত মাসের শেষা আমাদের চেয়েও কম মাইনে পাওয়ার জন্য চাকরি বাঁচাতে জ্যৈষ্ঠ-দুপুরে রাস্তায়। সে আর বাড়ি না ফিরলে তার মেয়েটির স্কুলে পড়তে যাওয়া ঘুচবে। উর্দি, কি অপূর্ব কৌশলে, মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেয়! 

বোঝা যায়, "contradiction within the people", আমরা চাই বা না চাই, রীতিমত antagonistic এখনো। মানুষের জন্য ততটা নয়, যতটা কিছু মানুষের প্রতি ঘৃণার বশে আমাদের রাজনীতি। ঘৃণার রাজনীতির ভিত্তিই হল "শত্রু" নির্মাণ, আর "সাধারণ মানুষ" যেহেতু কোনো সমসত্ত্ব দ্রবণ নয়, তাই ব্যক্তি-গোষ্ঠীর স্বার্থের সংঘাতকে অবলম্বন করে "শত্র"র তালিকায় ঢুকে পড়ে কিছু সাধারণ মানুষই। কোনো দলই তাই শেষ পর্যন্ত মানুষকে রিপ্রেজেন্ট করে উঠতে পারে না। অত্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করলেও আনুগত্য বাঁধা পড়ে রঙের কাছে, ভালবাসা হারিয়ে যায় ঘৃণার স্রোতে। 

ঘৃণাকে পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মিছিলে হাঁটতে চাই। আমি নিশ্চিত, সেই মিছিলে কিছু লোক হবে। যাঁরা আজ আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন বা আমার দলীয় আনুগত্যহীনতাকে বিদ্রূপ করবেন, তাঁদেরও কেউ কেউ সেই মিছিলে পা মেলাবেন, স্বপ্ন দেখি।

বুধবার, ২৪ মে, ২০১৭

নবান্ন অভিযান ~ অবীন দত্তগুপ্ত

গতকালের নবান্ন অভিযানের পর থেকে বিভিন্ন মিডিয়া (যারা এতোদিন বোবা কালা হয়ে ছিলেন ) ,তারা হঠাত-ই প্রচণ্ড উত্তাজিত হয়ে উঠেছেন । গত পরশু অব্দি তাদের বক্তব্য ছিল বাংলার রাজনীতি মূলত ধর্ম ভিত্তিক । গত পরশু অব্দি ,প্রতিটি পাড়ায় প্রতিটি অঞ্চলে লাল ঝান্ডার মিছিল-মিটিং নিয়ে , বিশাল বিশাল জেলা ভিত্তিক কেন্দ্রিয় জমায়েত নিয়ে কোন খবর হয় নি । অতএব , ওদের হঠাত করে পাশ ফিরে শুতে অসুবিধা হবেই । বিজেপি- ফিজেপি যে আদতে টাকায় তৈরি হওয়া কাগুজে বাঘ , যার মনিবের নাম তৃণমুল স্বিকার করতে অসুবিধা হবেই । অতএব মানুষের জীবন জীবিকার দাবী নিয়ে তৈরি হওয়া আন্দোলন , যার একটি মৌলিক ধাপ এই নবান্ন অভিযান তা মেনে নিতে (ঢোঁক গেলা অবস্থাতেও) তাদের অসুবিধে হবে এটাই স্বাভাবিক ।সুতরাং লক্ষ লক্ষ মানুষের ব্যারিকেডকে, ১০০ দিনের কাজের প্রাপ্য দাবীর লড়াইকে ,ক্ষেতমজুরের বর্ধিত মজুরির দাবীকে , ফসলের বর্ধিত মুল্যের দাবীকে , বেকারের চাকরীর দাবিকে , শ্রমিকের লক্‌ আউটের বিরুদ্ধের আন্দোলনকে , বিদ্যুতের অনবরত বেড়ে চলা দাম কে এরা স্রেফ পেশী সঞ্চালনের সাথে তুলনা করবে এটাই স্বাভাবিক । আমি তাই আরও একবার নবান্ন অভিযানের মৌলিক দাবীগুলি , যার জন্য মানুষ কাল কুকুরের মতো মার খেলো- বাঘের মতো প্রতিরোধ করলো , শেয়ার করছি । না করলে ইতিহাস ক্ষমা করতো না । পড়লে পড়ুন , না পড়লে - হাল্কা আনফলো ।



আমাদের দাবি:

১। ধান কেনায় বোনাস তুলে দেওয়ার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করো। কুইন্টাল প্রতি ২০০ টাকা বোনাস চাই। ন্যূনতম ৫০ টাকা পরিবহণ খরচ দিয়ে সহায়ক মূল্যে ধান কিনতে হবে। চেক ভাঙানোর হয়রানি বন্ধ করতে নগদে ধান কিনতে হবে। প্রতি গ্রাম পঞ্চায়েতে একাধিক ক্রয়কেন্দ্র খুলতে হবে। অভাবী বিক্রির সময় ধান কেনা হলো না কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও।
২। স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশ মেনে ধান, পাট ও গমের সহায়ক মূল্য স্থির করতে হবে। গম আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক তুলে দিয়ে কৃষক মারার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ কর। হিমঘরে রাজ্য কোটায় সরকারকে আলু রাখতে হবে। রাজ্য সরকারকে কুইন্টাল প্রতি ৭০০ টাকা দরে আলু কিনে চাষিদের সহায়তা করতে হবে।
৩। রবি ও বোরো চাষে বর্গাদারসহ সব কৃষককে ৮ সুদে ব্যাঙ্ক বা সমবায় ঋণ দিতে হবে। মৌজা ভিত্তিক শস্যবিমা চালু করা বর্গাদারসহ সব চাষিকে কৃষি বিমার আওতায় আনতে হবে। পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি বন্ধ কর। কেরোসিনের বরাদ্দ কমানো হলো কেন — কেন্দ্রীয় সরকার জবাব দাও। ছোট-মাঝারি কৃষক ও বর্গাদারদের চাষ জমির বিদ্যুতের লাইন কাটা নয়, ভরতুকি দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং বর্গাদারদের চাষ ও ফসল তোলায় রেগা প্রকল্প চালু করতে হবে।
৪। তিস্তা প্রকল্পের কাজ অবিলম্বে শেষ করতে হবে। পানীয় জলের স্বার্থে ভূগর্ভস্থ জলোত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করো। নদী, খাল, বিল সংস্কার করো। সুন্দরবনের বাঁধ নির্মাণ হচ্ছে না কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও। নদী ভাঙনরোধে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
৫। সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েতে রেগার কাজ চালু করতে হবে। রেগায় বছরে ১০০দিনের কাজ ও দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরি চাই। অবিলম্বে রেগার বকেয়া মজুরি, ভাতা ও অন্যান্য বকেয়া দিতে হবে। ১০০দিনের কাজসহ ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে দুর্নীতির তদন্ত চাই। ৬০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে সব কৃষককে মাসে ৩,০০০ টাকা পেনশন দিতে হবে।
৬। কোনো গরিব মানুষকে খাদ্য সুরক্ষা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। খাদ্য সুরক্ষা থেকে গরিব মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে কেন — রাজ্য সরকার জবাব দাও। খাদ্য সুরক্ষার বরাদ্দ কমানো বা অনিয়মিত হচ্ছে কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও। সকলকে ডিজিটাল রেশনকার্ড দিতে হবে। সব মানুষকে গণবণ্টন ব্যবস্থার আওতায় রাখতে হবে।
৭। সব বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধ করো। মেধা তালিকা প্রকাশ না করে এস এম এস মাধ্যমে নিয়োগ চলবে না। সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে সমকাজে সমমজুরি চালু করতে হবে।
৮। বাস্তুহীনদের বাস্তুজমি দিতে হবে। সমস্ত গৃহহীনদের প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় আনতে হবে।
৯। বনাঞ্চলের অধিকার আইন কার্যকর করতে হবে। আদিবাসীদের জন্য ল্যাম্প সোসাইটিগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।
১০। সব আত্মহত্যাকারী কৃষক পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
১১। দুর্নীতিরোধে সব মানুষ এক হও। সমস্ত চিট ফান্ড, শিলিগুড়ি উন্নয়ন পর্ষদ, নারদ, ব্রিজ কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে এক হও। সাহারা ও বিড়লা ঘুষকাণ্ডের তদন্ত করতে হবে। ব্যাপমসহ কেন্দ্র ও রাজ্যে দুর্নীতির তদন্তকারী কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করো। রাজনী‍‌তিতে দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করো।
১২। রাজ্যে ধর্ষণ, নারী ও শিশু পাচার বাড়ছে কেন — মুখ্যমন্ত্রী জবাব দাও। ধর্ষণ ও পাচারকাণ্ডে যুক্তদের কঠোর শাস্তি চাই। রাজ্যে নিয়ম না মেনে ব্যাঙের ছাতার মতো নার্সিংহোম হলো কেমন করে — স্বাস্থ্যমন্ত্রী/মুখ্যমন্ত্রী জবাব দাও।
১৩। বিকল্প ব্যবস্থা না করে নোট বাতিল হলো কেন — প্রধানমন্ত্রী জবাব দাও। বিদেশি ব্যাঙ্কে জমা টাকা ফেরত এলো না কেন — প্রধানমন্ত্রী জবাব দাও। নোট বাতিলের আগে রাজ্য বি জে পি জানলো কেমন করে — প্রধানমন্ত্রী জবাব দাও।
১৪। ২০১৩ সালের আইন মেনে সরকারকে জমি করতে অধিগ্রহণ হবে। জমি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কৃষক সমাজ জোট বাঁ‍ধো। ভাঙড় আন্দোলনে ধৃতদের বিনাশর্তে মুক্তি চাই। কর্পোরেট হাউসদের হাতে খাস জমি না দিয়ে গরিবদের জমির পাট্টা দিতে হবে। কর্পোরেট হাউসদের ঋণ ও সুদ ছাড় নয় — মাঝারি কৃষক পর্যন্ত সব কৃষকের ঋণ মকুব করতে হবে। ই পি এফ-এর সুদ কমানো চলবে না। কর্পোরেটদের সাথে চুক্তি চাষ বন্ধ করো।
১৫। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ও উভয় মৌলবাদের বিরোধিতায় ঐক্যবদ্ধ হও। সাম্প্রদায়িক ও উভয় মৌলবাদ-নিপাত যাক। উদারনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শামিল হও। সংখ্যালঘু ও দলিতদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘ পরিবারের হামলা বন্ধ করো।
১৬। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের গণতন্ত্র ধ্বংসকারী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। সংবিধান প্রদত্ত গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা চলবে না। রাজ্যে মানুষের গণতন্ত্র হরণ করা হচ্ছে কেন — রাজ্য সরকার জবাব দাও।
১৭। পলাশী চিনিকলের অব্যবহৃত জমি ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।
১৮। জমির মিউটেশন ফি বাড়ানো চলবে না। জমি হাঙরদের রক্ষা করতে দ্রুত জমির চরিত্র বদলের চক্রান্ত বন্ধ কর।

#Banglabiponna

মঙ্গলবার, ২৩ মে, ২০১৭

শ্রেনীযুদ্ধ ~ আর্কাদি গাইদার

আমরা যারা বামপন্থী রাজনীতি করি, আমাদের কাছে একটি অতি পরিচিত শব্দ - প্র‍্যাক্সিস।
প্র‍্যাক্সিস - অর্থাৎ থিওরি এবং প্র‍্যাক্টিস, বেশ মজার জিনিস। একটা বাদ দিয়ে শুধু অন্যটা দাঁড়ায় না।

এই যেমন আজকে নবান্ন অভিযানে ব্রিজে ওঠবার মুখে পুলিশের ব্যারিকেডের কাঠামোটাকে দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে যখন ঝাকানো হয়, পাশে হাত লেগে যায় দক্ষিন ২৪ পরগনা থেকে আগত লুঙি-শার্ট পড়া এক শীর্ণকায় বৃদ্ধ ক্ষেতমজুরের হাতে, দুজনের ঘাম একসাথে  লেপ্টে যায় ওই ব্যারিকেডের ধাতব দেহে, আর ঝাকাতেই থাকি, ঝাকাতেই থাকি, কারন ওই ব্যারিকেডটা ভাঙতে পারলেই একদিন পেড়ে ফেলবো রাষ্ট্রযন্ত্রকে, আর ঝাকাতে ঝাকাতে একটা তাল খুজে পাই সকলে, সেই তালে বারবার মাথার মধ্যে বিদ্যুতের মতন ঝিলিক দিয়ে ওঠে - শ্রেনী।
আর ব্যারিকেডটা ভাঙার পরের মুহুর্তেই যখন পুলিশ শুরু করে লাঠিচার্জ,  তখন প্রাথমিকভাবে পিছু হটবার জন্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। তার মধ্যেই মানুষের স্রোতের উলটোদিকে সাঁতরে আসেন কিছু মানুষ, তাদের দেখে থমকে যায় মানুষ, থমকে যায় পুলিশের লাঠি, ছত্রভঙ্গ লালঝান্ডার ভিড় আবার একটু একটু করে এদের ঘিরে জমাট বাধতে থাকে রাস্তা জুড়ে, যেন চাপ চাপ রক্ত, এবং আবার পজিশন নিয়ে শুরু হয় লড়াই - ভ্যানগার্ড!
কোথা থেকে যেন জড়ো হয়ে যায় ইট, পাথর, চাঙড়, এবং কিছুক্ষনের জন্যে কলকাতার রাজপথ হয়ে ওঠে কাশ্মীর।
হঠাত টায়ার ফাঁটার মতন আওয়াজ করে টিয়ার গ্যাস সেলের বর্ষন শুরু হয়, লাল ঝান্ডা হারিয়ে যায় ধোয়ার মধ্যে, আর চারিদিকে ধ্বনি ওঠে - 'রুমাল ভিজিয়ে মুখে বাধুন কমরেড!' একদল ছাত্র, মুখে রুমাল বাধা, এই ভিড়ের মধ্যেই এদিক ওদিক দৌড়ে তপ্ত টিয়ার গ্যাস শেল সংগ্রহ করে ছুড়তে থাকে পুলিশের দিকে, আর প্রখর রোদে ফিনফিন সিল্কের মতন কাঁপতে থাকা হাওয়া আর ধোয়ায় চোখ নাক জ্বলতে থাকা অবস্থায় হঠাত যেন কলকাতা পালটে হয়ে যায় প্যালেস্তাইন, বা সিয়াটেল।

এরও অনেক পড়ে, হাসপাতালে এমার্জেন্সিতে পাশাপাশি রক্তাক্ত অবস্থায় রুমাল চেপে বসে থাকেন এক বৃদ্ধ পুলিশকর্মী আর এক ছাত্রী। ছাত্রীটি মনে মনে বলতে থাকে - 'আপনি রাষ্ট্রযন্ত্রের চাকরি করেন, আপনার ভূমিকা পালন করেছেন। আমি কমিউনিষ্ট পার্টি করি, আমার ভূমিকা পালন করেছি।' তারপর ফোন বার করে মা'কে ফোন করে - 'তোমরা কোনদিকটায় চলে গেলে? বেশি লাগেনি তো?'

বাইরে রাস্তায় এখন রোদ মরে গিয়ে বিকেল নেমেছে। পিচের ওপর পড়ে রয়েছে রক্ত, ঘাম, টিয়ার গ্যাসের শেল আর ভাঙা ব্যারিকেডের টুকরো। কয়েকটা ছেড়া চটি। একটা প্লাস্টিকের ফ্রেমের চশমা। কলকাতা আজ ফ্রন্টিয়ার সিটি। শ্রেনীযুদ্ধ।

সোমবার, ২২ মে, ২০১৭

বাইশে মে ~ বাল্মীকি ঘোষ

কোনো এক ২১শে জুলাই নিজের দলের সাধারণ কর্মীদের তাতিয়ে দিয়ে পালিয়েছিলেন (যাতে করে পরে লাশের সিঁড়ি বানিয়ে তরতর করে উপরে ওঠা যায়!) 
আজকে "অবলুপ্ত/মৃতপ্রায়" বামদলগুলির আন্দোলনের ভয়ে, পুলিশ নামক উর্দিধারী তৃণমূলী গুন্ডাদের লেলিয়ে দিয়ে, শহর ছেড়ে পালালেন। বাম নেতৃত্ব কর্মীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনে থেকে লড়াই করে গেলেন, পুলিশের লাঠির বাড়ি আর কাঁদানে গ্যাসের যন্ত্রনা কর্মীদের সাথে ভাগ করে নিলেন। লড়াই সাচ্চা হলে আর হাতে লাল ঝান্ডা থাকলে মানুষ পালায়নি কখনো, পালাবেন না । সে তাঁরা নেতা হোন বা কর্মী। বাংলার মানুষের অধিকার অর্জনের লড়াই জারি রইলো।বাম কর্মীরা ২২ মে কে ইতিহাসের পাতায় ঢুকিয়ে দিয়ে গেলেন নিজেদের রক্ত ঝড়িয়ে!
"জননেত্রী" মনে রাখুন:
Those who make peaceful demonstrations impossible, make violent revolutions inevitable!"
#BanglaBiponna
#CholoNabanna

শনিবার, ২০ মে, ২০১৭

তৃণমূল এবং বি জে পি—‘মেড ফর ইচ আদার’

পশ্চিমবাংলায় বি জে পি-আর এস এস-এর ভিত তৈরির জন্যই কংগ্রেস ভেঙে জন্ম হয়েছিল তৃণমূল নামে দলটার। তৃণমূল তৈরির আগে থেকে আজ পর্যন্ত এই দল এবং দলের সুপ্রিমোর গতি-প্রকৃতি একটু তলিয়ে বিচার করলেই সেটা সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে। ঘটনাপ্রবাহ বলছে বি জে পি-আর এস এস 'মুখ', আর তৃণমূল 'মুখোশ'-এর কাজ করে চলেছে বিভিন্ন সময়। যেখানে এবং যখন 'মুখ' দেখিয়ে কাজ হবে না, তখন 'মুখোশ' দেখাও! কিছু লোকদেখানো নাটকবাজি সঙ্গে যুক্ত করো, ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য! আসুন একটু খতিয়ে দেখি: 
• ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর। গোটা বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করে ধূলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলো চারশো বছরের পুরনো বাবরি মসজিদের ইমারতকে। মমতা ব্যানার্জি তখন কংগ্রেসে, কেন্দ্রে নরসিমা রাও সরকারের মন্ত্রী। তখন তো নয়ই, আজও পর্যন্ত টুঁ শব্দটি করেননি বি জে পি-আর এস এস-র এই ঘৃণ্য ধ্বংসকান্ডের বিরুদ্ধে। কেন?
• ১৯৯৬ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর ১৩দিনের সরকারের পতন হলো। গঠিত হলো সংযুক্ত মোর্চার সরকার। এই সময় জাতীয় রাজনীতিতে বি জে পি যখন একেবারে কোনঠাসা, কার্যত আঞ্চলিক দলগুলি যখন বি জে পি-কে একঘরে করে দিয়েছিল, ঠিক তখনই বি জে পি-কে বাঁচাতে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে মমতা ব্যানার্জির। কংগ্রেস ভেঙে তখন তিনি নতুন দল গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তৃণমূল তৈরি হওয়ার আগেই, ১৯৯৭ সা‌লের ডি‌সেম্বর মা‌সে, মমতা ব্যানার্জি্ই প্রথম বলেন, ''বি‌ জে ‌পি অচ্ছুৎ নয়''। ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মানুষদের অনেকেই তখন অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু নতুন দল গড়ার মদতটা কোন জায়গা থেকে এসেছিল, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয়নি। 
• ১৯৯৮সা‌লের লোকসভা ভো‌টে জোট বাঁধ‌লেন বি‌ জে ‌পি-র স‌ঙ্গে। বি জে পি সভাপতি লালকৃষ্ণ আদবানি তখন বলেছিলেন, ''পশ্চিমবঙ্গে বি জে পি-র সঙ্গে তৃণমূলের এই জোট একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।'' নির্বাচনের পর প্রথম এন ডি এ সরকারের রেল মন্ত্রকের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারপারসন হয়ে ক্ষমতার অলিন্দে। ১৯৯৯ সালে আবার বি জে পি-র সঙ্গে জোট, আবার সরকারে, এবার রেলমন্ত্রী।
• ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফয়দা তোলার জন্য এন ডি এ থেকে বের হয়ে এসে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধেন। কিন্তু কলকাতা কর্পোরেশনে সেই সময়েও তাদের সঙ্গে বি জে পি-র জোট পুরোদস্তুর বহাল ছিল। তৃণমূলের সুব্রত মুখার্জি মেয়র এবং বি জে পি-র মীনাদেবী পুরোহিত ডেপুটি মেয়র।   বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর মমতা ব্যানার্জি আবার ফিরে যান এন ডি এ-তে। এবার হন কয়লামন্ত্রী। 
• এন ডি এ আমলেই ২০০২ সালের গোড়াতে হয় গুজরাটে সংখ্যালঘু গণহত্যা, ভারতের ইতিহাসে বর্বরতম ঘটনা। বিশ্বজুড়ে এর নিন্দা হয়েছিল। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি এই হত্যাকান্ডের কোনও প্রতিবাদ করেননি। তখন তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, 'এটা বি জে পি-র অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।' ওই বছরই গুজরাটে বিধানসভা নির্বাচনে বি জে পি আবার জয়ী হলে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ফুলের তোড়া পাঠিয়ে সবার আগে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি।  
• ২০০৩ সা‌লে ১৫ই সেপ্টেম্বর নয়া‌দি‌ল্লি‌তে আর এস এস-এর মুখপত্র 'পাঞ্চজন্য'-র সম্পাদক তরুণ বিজয়ের সম্পাদিত 'কমিউনিস্ট টেররিজম' নামে সংকলন পুস্তক প্রকাশ অনুষ্ঠা‌নে উপ‌স্থিত থে‌কে, মমতা ব্যানার্জিট ব‌লেন, ''ক‌মিউ‌নিস্ট‌দের বিরু‌দ্ধে আপনা‌দের লড়াই‌য়ে আমরা আ‌ছি। য‌দি আপনারা আমায় ১শতাংশ সাহারয্য ক‌রেন, আমরা ক‌মিউ‌নিস্ট‌দের সরা‌তে পার‌বো।'' মমতা ব্যানার্জির আহ্বা‌নে আর এস এস স্বয়ংসেবকরা খুবই উৎসা‌হিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মোহন ভাগবত, মদনদাস দেবী, এইচ ভি শেষাদ্রি-র মত কট্টর হিন্দুত্ববাদী শীর্ষ নেতারা। তাঁদের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠানে মমতা বলেন, ''..আপনারাই হলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক।...কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমি আপনাদের পাশে আছি।'' ‌বি‌ জে পি-র তৎকা‌লীন রাজ্যসভা সাংসদ বলবীর পুঞ্জ, ওই সভা‌তে ব‌লেন,''আমা‌দের প্রিয় মমতাদি‌দি সাক্ষাৎ দুর্গা।''
• আর এস এস-এর অনুষ্ঠানে গিয়ে তাদের 'খাঁটি দেশপ্রেমিক' বলে যে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি, তা কিন্তু স্বয়ংসেবকরা ভোলেনি। গত লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে, ২০১৩সালের ৪ঠা আগস্ট 'সঙ্ঘ পরিবার' টুইট করে জানিয়েছিল যে মমতা সেদিন তাঁদের 'প্রশংসায় পঞ্চমুখ' হয়েছিলেন! মমতা ব্যানার্জির প্রতি সঙ্ঘ পরিবারের কৃতজ্ঞতা এখনও যে ম্লান হয়নি, তা ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরেও তারা জানিয়েছে। 
• ২০০৪-র লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বি জে পি-র সঙ্গেই ছিল। ২০০৪ সা‌লে ৮ই এপ্রিল নয়া‌দি‌ল্লি‌তে বিজে‌পি নেতৃত্বাধীন এন‌ ডি এ-র লোকসভা নির্বাচ‌নের ইশ‌তেহার প্রকা‌শিত হয়। প্রকাশ ক‌রেন অটলবিহারী বাজ‌পেয়ী। ইশ‌তেহা‌রে রামম‌ন্দির ‌নির্মা‌ণের ইস্যু, গো হত্যা বন্ধের মতো বিষয় লেখা হ‌য়ে‌ছিল। আবার সরকা‌রে এলে কয়লাখ‌নি বেসরকারী হাতেণ যা‌বে, সেকথাও বলা হয়েছিল। ‌বি‌ জে ‌পি-র এতগু‌লো ইচ্ছাপূরণের লক্ষ্য উ‌ল্লেখ ক‌রে‌ছি‌ল ওই ইশতেহার। ওইদিন মঞ্চেি হা‌জির ছি‌লেন, এন‌ ডি এ-র ১১টি শ‌রিক দ‌লের মধ্যে মাত্র ৫টি দলের প্রতি‌নি‌ধি। সেই ৫জনের মধ্যে একজন হ‌লেন মমতা ব্যানা‌র্জি। সে‌দিন ইশ‌তেহার প্রকা‌শিত হওয়ার আ‌গেই সম্ম‌তি জা‌নি‌য়ে তাতে সই করে‌ছি‌লেন তি‌নি।
• ২০০৫ সা‌লের ৪ঠা আগস্ট সংসদে প‌শ্চিমব‌ঙ্গে 'অনুপ্রবেশ'-এর অভিযোগ তুলে, এবিষয়ে আর এস এস-র বহুলপ্রচারিত বক্তব্যই আওড়াতে থাকেন মমতা ব্যানার্জিা। আসলে তার মাধ্যমে তিনি সঙ্ঘ পরিবারকে বার্তা দিতে চাইছিলেন: ''আমি তোমা‌দেরই লোক।''
• ২০০৬-র বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূল বি জে পি-র সঙ্গে জোট বেঁধেই এরাজ্যে লড়েছিল। নির্বাচনের পরে ওই বছরের ২৫শে ডিসেম্বর ধর্মতলায় অনশন মঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। বামফ্রন্টবিরোধী যাবতীয় ষড়যন্ত্র, হিংসাশ্রয়ী আন্দোলনে তৃণমূলকে মদত জুগিয়েছে  বি জে পি–আর এস এস।
• এমনকি ২০০৯-র লোকসভা ভোটে এবং ২০১১সালের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূল জোট বাঁধলেও বি জে পি-আর এস এস বামফ্রন্টকে পরাস্ত করতে তৃণমূলের হয়েই যে গোপনে কাজ করেছিল, পরে বি জে পি-আর এস এস-র নেতারা বিভিন্ন প্রকাশ্য সভায় তা বলেছেন। চরম বামপন্থী থেকে উগ্র দক্ষিণপন্থী-মাওবাদী থেকে আর এস এস-সমস্ত শক্তির তখন একটাই লক্ষ্য ছিল বামফ্রন্টকে হটানো। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের পর ২০১২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর তৃণমূল দ্বিতীয় ইউ পি এ মন্ত্রিসভা থেকে সরে যায়।   
• আবার ২০১১-য় রাজ্যে তথাকথিত 'পরিবর্তন'-র পরে মমতা ব্যানার্জিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। মোদী তখনও প্রধানমন্ত্রী হননি। তবু 'কমিউনিস্ট' নিধনের আহ্বানটিই যেন মমতা ব্যানার্জিকে মনে করিয়ে দিয়ে নরেন্দ্র মোদী তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন —''প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে দিন।''
• ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট সরকারের পরাজয়ে উল্লসিত আর এস এস তাদের পশ্চিমবঙ্গ কমিটির মুখপত্র 'স্বস্তিকা'র ২৩শে মে, ২০১১ তারিখের সম্পাদকীয়তে লেখে: ''অবশেষে দুঃশাসনের অবসান।...ইহা স্বীকার করিতেই হইবে, পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী সরকার ও ক্যাডারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁহারই নেতৃত্বে তৃণমূল জোটের এই বিরাট জয়।'' 
• ২০১৩সালে হাওড়া লোকসভা কেন্দ্রের উপ-নির্বাচনে বি জে পি প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। দেওয়ালে বি জে পি প্রার্থীর নাম লেখাও শুরু হয়েছিল। এই অবস্থায় দিল্লিতে বি জে পি সভাপতি রাজনাথ সিংয়ের বাড়িতে হাজির তৃণমূলের প্রভাবশালী সাংসদ, চিট ফান্ড মালিক কে ডি সিং। বি জে পি'র সাধারণ সম্পাদক রাজীব প্রতাপ রুডির উপস্থিতিতে আঁতাত সম্পন্ন। একেবারে শেষ মুহূর্তে বি জে পি প্রার্থীর নাম প্রত্যাহার।  
• ২০১৩সালের পঞ্চায়েত ভোটেও তৃণমূল-বি জে পি সুযোগ বুঝে আঁতাত করেছে। যেমন, পাঁশকুড়ার চৈতন্যপুর-১নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতে বি জে পি-কে সঙ্গে নিয়েই পঞ্চায়েত গঠন করেছে তৃণমূল। প্রধান বি জে পি-র। উপপ্রধান তৃণমূলের! মিনাখাঁ, বামনপুকুর, চৈতল—তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতই চলছে তৃণমূল-বি জে পি-র যৌথ বোঝাপড়ায়, একেবারে প্রকাশ্যে। উদাহরণ আরও আছে।
• সারদাকান্ড চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি এবং নারদ ঘুষকান্ডে এই দুই দলের গোপন বোঝাপড়া দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। ২০১৪সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদী বিভিন্ন বক্তৃতায় চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে অনেক বড় বড় বলেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি, যেমন সি বি আই, ই ডি, এস এফ আই ও কি করেছে? চার বছর ধরে ক্রমাগত টালবাহানা করে এই তদন্ত বিলম্বিত করে চলেছে। 
• ২০১৭ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পর মণিপুরে বি জে পি-র সরকার গড়তে সমর্থন করে একমাত্র তৃণমূল বিধায়ক। আস্থাভোটে বি জে পিকে সমর্থন করার পর ওই তৃণমূল বিধায়ক বলে 'দলের নির্দেশেই সমর্থন।' আজ পর্যন্ত সেই বিধায়ককে তৃণমূল বহিষ্কার করেনি। তৃণমূলের সমর্থনেই সরকার চলছে বি জে পি-র।     
• ২০১৭ সালের ২৯শে মার্চ  রাজ্যসভায় অর্থবিল পাশ করাতে তৃণমূল ওয়াক-আউট করে। রাজ্যসভায় অর্থবিলের বিরুদ্ধে তৃণমূল ভোট দিলে তা অনুমোদন হতো না, বেকায়দায় পড়তো মোদী সরকার। কিন্তু সমস্ত বিরোধী দল ভোট দিলেও তৃণমূল অধিবেশন বয়কট করে ওই বিল অনুমোদনের সুযোগ করে দেয় বি জে পি-কে।
• নারদকাণ্ডের জেরে গঠিত লোকসভার এথিক্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন বি জে পি-র বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি। 'এক্স ফাইলস'-এর ভিডিও ফুটেজে তৃণমূলে যে সব সাংসদকে দেখা গিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখবে এই কমিটি। লোকসভায় নারদা স্টিং অপারেশনের টেপ জমা পড়ার ১বছর বাদেও কোনও পদক্ষেপ নেওয়া তো দুরের কথা, একটি বৈঠকও ডাকা হয়নি। শুধু তাই নয়, রাজ্যসভায় এথিক্স কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেছে স্বয়ং মোদী সরকার।
• প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে নথিপত্র দেওয়ার পরেও চিট ফান্ড মালিক তৃণমূল সাংসদ কে ডি সিংয়ের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকার কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?
• ২০১৬সালের বিধানসভা নির্বাচনেও যে অন্তত ১০০টা কেন্দ্রে বি জে পি প্রার্থীরা বিরোধী ভোট কেটে তৃণমূলকে সহযোগিতা করেছে, কলকাতায় এসে সেকথা বলেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উমা ভারতী। বি জে পি না থাকলে তৃণমূলের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসা যে সহজ হতো না তা মাঝেমধ্যেই বলে থাকেন দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। আর এস এস-র সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত বিধানসভা ভোটের আগে সায়েন্স সিটি প্রেক্ষাগৃহে সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের সভায় খোলাখুলি বলেন, ''আমরা এখানে এমন কিছু করতে পারি না, যাতে কমিউনিস্টরা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।'' 
• তৃণমূলের নীতির কারণেই পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তির বাড়বাড়ন্ত। বি জে পি-র হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে উস্‌কানি দিচ্ছে তৃণমূল, যাতে সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকতাই আরও পুষ্ট হচ্ছে। 
• তৃণমূল শাসনে পশ্চিমবঙ্গে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার আগে বামফ্রন্ট সরকারের সময় বাংলায় আর এস এস-র শাখা ছিল মাত্র ৪৭৫টি। কিন্তু গত ছয় বছরে এই উগ্র সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী সংগঠনটির শাখা পশ্চিমবঙ্গে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৫০টি, যা প্রায় তিনগুণ বেশি। 
• রাজ্যে আর এস এস পরিচালিত প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা বর্তমানে ৩০৯টি। এছাড়া ১৬টিতে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা হয়। আর এরমধ্যে ১৫টি গড়ে উঠেছে গত পাঁচ বছরে। এই তিনশোর বেশি হিন্দুত্ববাদী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৬৬হাজার ৯০ জন। ৫০০টি শিশুমন্দির ও ৫০টি বিদ্যালয়মন্দির (হাইস্কুল) প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে দ্রুত এগোচ্ছে আর এস এস। 
• তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অপসারণ আর এস এস-র লক্ষ্য নয়। আর এস এস মমতা ব্যানার্জির 'আত্মশুদ্ধি' চায়। চায় তৃণমূল কংগ্রেসের 'রিফর্ম'। ২০১৬ সালের অক্টোবরে হায়দরাবাদে তিনদিনের জাতীয় কার্যনির্বাহী বৈঠকে এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১৪ই জানুয়ারি ব্রিগেডের সভাতেও আর এস এস-র সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। 

সংক্ষেপে জন্মলগ্ন থেকে এই হলো তৃণমূলের ইতিহাস। বি জে পি এবং সর্বোপরি আর এস এস-এর হয়ে কিভাবে এই দল কাজ করছে, বি জে পি-আর এস এস কিভাবে তৃণমূলকে টিঁকিয়ে রেখেছে, তা বুঝতে হয়তো একটু সময় লাগ‌বে, কিন্তু তৃণমূল যে বি‌ জে‌ পি-র 'মু‌খোশ' তা মানুষ নিশ্চয়ই একদিন বু‌ঝবেন।  
***************

#TMC_BJP_made_for_each_other #মুখ_ও_মুখোশ

শুক্রবার, ১৯ মে, ২০১৭

বাংলা বিপন্ন! চলো নবান্ন!! ~ সুশোভন পাত্র

মুখ্যমন্ত্রী হয়ে এগারোটা কমিশন গড়েছিল মেয়েটা। বছর ঘুরতেই আরও ছটা। এত কমিশন একসঙ্গে জীবনে দেখেনি রাজ্য বাসী। নবান্নের চোদ্দ তলার প্রথম থাকে সে রাখল 'জমি বণ্টনে অনিয়মে'র তদন্ত কমিশন'দের। রাজারহাটের কমিশন'টাকে জড়িয়ে ধরে সে বলল, তুই আমার তুরুপের তাস। দ্বিতীয় থাকে রাখল সব 'গণহত্যার' কমিশন'দের। ২১শে জুলাই কমিশন'টাকে জড়িয়ে ধরে বলল তোর নাম বুদ্ধ ভট্টাচাজ বধ।
কিন্তু বছর যেতে না যেতেই ঘটে গেল সেই ঘটনাটা; বার সাতেকের নোটিশের প্যানপ্যানানি আর বার তিনেকের জেরার কচকচানির পরেও, জেলে পাঠানো গেল না গৌতম দেব'দের, মনীশ গুপ্ত কে বগল দাবা করেও, স্পর্শ করা গেলো না বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর কেশাগ্র। উল্টে জেলে চলে গেলো মেয়েটার কেষ্ট-বিষ্টু ভাইরা। মদন-কুণাল-সুদীপ-তাপসরা আজ ইতিহাস। নারদের লাইনে ঘুষখোর আরও কয়েকটা। এখন মেয়েটা সেটিং করতে দিল্লী-ভুবনেশ্বর করে বেড়ায় সপ্তাহে-মাসে। রাজনাথ-সোনিয়ার চৌকাঠে মাথা ঠোকে সমান তালে। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে এগারোটা কমিশন গড়েছিল মেয়েটা। বছর ঘুরতেই আরও ছটা।
কমিশনের হাতি পুষতে সেদিন খরচা হয়েছিল রাজ কোষাগারের ৫ কোটি ¹। সিপি(আই)এম'র নেতাদের পিণ্ডি তর্পণের দিবাস্বপ্নে বিগলিত বুদ্ধিজীবীরা কমিশন'কেই দরাজ সার্টিফিকেট বিলিয়ে বলেছিলেন "এহি হ্যা রাইট চয়েস বেবি।" মিডিয়ার ক্যাকাফনি তে সেদিন অনায়াসেই চাপা পড়ে গিয়েছিলো অজিত লোহার-পূর্ণিমা ঘোড়ুই-জিতেন নন্দী'দের লাশের নিস্তব্ধতা। ঠিক যেমন আজ বরকতির লাল বাতি আর রাম নবমীর অস্ত্র মিছিলের ডেসিবেলে অবলীলায় অবহেলিত হচ্ছে কৃষক পরিবারের আর্তনাদ গুলো। ঠিক যেমন আজ প্রাইম টাইমে বড্ড সস্তায় ফেরি হচ্ছে হরিপদ বিশ্বাস'দের নিথর লাশ গুলো।
বর্ধমানের চাষি হরিপদ। চাষের জন্য ধার নিয়েছিলেন লাখ খানেক। তারপর ঐ চেনা চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি। বাজারে আলুর দর নেই, আলুর সংরক্ষণের পরিকাঠামো নেই; অতএব ক্ষেতের আলু পচে নষ্ট, অতএব আবার একবার চাষে লোকসান, এবং অগত্যা দেনাগ্রস্ত হরিপদর গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা। চলতি মরশুমে হরিপদ রাজ্যে ষষ্ঠ ² ³ । শেষ ছ'বছরের ১৭৬তম ⁴ । এ রাজ্যে আলু চাষের খরচা গড়ে ৫০০ টাকা/কুইন্টাল। আর এবছর আলু বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১৪০-৩৪০টাকা/কুইন্টাল। রঙ্গনাথন কমিশনের সুপারিশে সি.এ.পি.সি ধার্য ধানের সহায়ক মূল্য যেখানে ১৪৭০টাকা/কুইন্টাল, সেখানে রাজ্য সরকার চাষি'দের ধান কিনেছে ৮০০-১১৬৬ টাকা/কুইন্টাল ⁵ ।  "নুন আনতে পান্তা ফোরানর সংসারে  এই টাকায় গলায় দেবার দড়ি ছাড়া আর কি বা জুটবে" –ভেজা গলায় বলেছিল কন্দর্বপুরের আরেক আত্মঘাতী চাষি চন্দন পালের ভাই কার্তিক ⁶।
২০১৩'র প্রাথমিক টেটের পরীক্ষা গ্রহণে প্রশাসনের অব্যবস্থার জন্য যেদিন রীতা ট্রেন থেকে পড়ে মারা গেলো, সেদিন আরও ৪৫লক্ষ পরীক্ষার্থী'দের মধ্যে কার্তিকও ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ অবশ্য জানিয়েছিল বৈধ পরীক্ষার্থী ১৭ লক্ষ ১২ হাজার। স্বপ্নের শবদেহ সাজিয়ে বাড়ি ফিরেছিল বাকি ২৮লক্ষ। অভিশপ্ত সেই প্রাথমিক টেটে পাশ করেছিল মাত্র ১.০৭% পরীক্ষার্থী। আর মোট পরীক্ষার্থী'র সাপেক্ষে চূড়ান্ত নিয়োগের অনুপাত ০.৬%। ১৯৯৮ থেকে ২০১০, এরাজ্যে প্রতি বছর এস.এস.সি'র মাধ্যমে নিয়োগ হয়েছিল মোট ১,৮৫,৮৪৫ জন ⁷। পাড়ার মস্তান'দের ৮-১০ লক্ষ টাকার ঘুষ দিতে হয়নি, মেধা তালিকা গোপন রাখতে হয়নি, স্বজন পোষণ আর বেনিয়মের কলঙ্কও বয়ে বেড়াতে হয়নি। ২০১১'তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইশতেহারের ৩৪ পাতায় বলেছিলেন, "প্রতি বছর ২লক্ষ বেকারের চাকরি হবে ⁸।" হয়েছে; ২০০ কোটি দিয়ে ইমাম-মুয়াজ্জিন'দের ভাতা দেওয়া হয়েছে, বছরে ৮০ কোটি খরচা করে ক্লাবে গুণ্ডা পোষা হয়েছে, ৩০০ কোটির বিনিময়ে ঘটি-বাটি, মা-মাটি, ইলিশ-চিংড়ি উৎসবও হয়েছে, শুধু বছর বছর এস.এস.সি'তে নিয়োগটা আর হয়নি, শুধু কার্তিক'দের পেটের ভাতের জোগানটা আর হয়নি, শুধু রীতা'দের লাশের হিসেবটা আর হয়নি ⁹ ।
হিসেবে অবশ্য হয়নি বকেয়া ৫৪% মহার্ঘ্য ভাতারও। হয়নি বলেই বর্তমান মূল্যে রাজ্য সরকারের একজন গ্রুপ-ডি কর্মচারীর প্রতিমাসে ৩,৫৬৪ টাকার প্রাপ্য মহার্ঘ্য ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বছরে প্রায় ৪৩ হাজার। একজন গ্রুপ-সি কর্মচারীর বঞ্চনা প্রায় ৫৭ হাজারের। সরকারী হিসেব অনুযায়ী ৫৪% মহার্ঘ্য ভাতা বকেয়া থাকায় প্রতি মাসে সরকারী কোষাগার পুষ্ট হচ্ছে ৩০০ কোটি বাড়তি  টাকায়। বেড়েছে রাজ্যের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও। ২০১০-১১ আর্থিক বছরের ২১,১২৮ কোটি বর্তমানে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশী, ৪২,৪৯২ কোটি ¹⁰। পাল্লা দিয়ে ছাপ্পা ভোটের শতকরা বেড়েছে, মন্ত্রী বিধায়ক'দের ভাতা বেড়েছে, দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার সামগ্রীর দাম বেড়েছে, চোখের সামনে মুখ্যমন্ত্রীর দন্ত বিকশিত ছবি মার্কা হোর্ডিং'র সংখ্যাও বেড়েছে,  বাড়েনি শুধু আপনার ন্যায্য শ্রমের দামটা, বাড়েনি শুধু আপনার প্রাপ্য মহার্ঘ্য ভাতাটা।  
না, টিভির পর্দার ব্রেকিং নিউজে চিরুনি তল্লাশি করেও আপনি এসব খবর পাবেন না। সর্বাধিক বিকৃত কাগজের পাতায় চোখ রাখলে মনে হবে স্বর্গরাজ্যের সমস্যা বলতে, বিক্রম মদ খেলো কিনা আর লকেট হেলমেট পরল কিনা; দিলীপ ঘোষ জাবর কাটল কিনা, সিদ্দিকুল্লা চ্যাংড়ামি করল কিনা; শাহরুখের কে.কে.আর জিতল কিনা আর নিতা আম্বানি চুলে লরিয়েলের কালার করল কিনা। কিন্তু বিক্রি হয়ে যাওয়া ঘণ্টা-খানেকের চামাচাগিরিতে আর চাটুকার প্রিন্ট মিডিয়ার দিস্তা ভরানো কালিতে অজিত লোহার'দের রক্তের দাগের জায়গা নেই। চন্দন পাল'দের পরিবারের চোখের জলের নোনতা স্বাদের মূল্য নেই। রীতা'দের গতর খাটানো ঘামের গন্ধ নেই।  কিন্তু ওঁদের জন্য একটা লাল ঝাণ্ডা আছে। ওঁদের রক্তস্নাত হয়েই একটা লাল ঝাণ্ডা আছে। ওঁদের চোখের জল মুছিয়ে দিতেই একটা লাল ঝাণ্ডা আছে। ওঁদের ঘামের গন্ধ গায়ে মাখতেই একটা লাল ঝাণ্ডা আছে। আর সেই লাল ঝাণ্ডা বুক দিয়ে আগলে রাখাতে হাজার-লক্ষ 'কমরেড' আছে। যারা পূর্ণিমা ঘোড়ুই-জিতেন নন্দী'দের সাথে একই আকাশ ভাগ করেছিল, একই বাতাসে শ্বাস নিয়েছিল, একই স্বপ্নে রাত জেগেছিল। এই সোমবারটা ঐ কমরেড'দের, এই সোমবারটা হরিপদ বিশ্বাসের, এই সোমবারটা শালকু সরেনের, এই সোমবারটা রীতা দাসের, এই সোমবারটা হক আদায়ের, এই সোমবারটা জবাব চাওয়ার, এই সোমবারটা কেতাদুরস্ত নবান্নে ঐ লাল ঝাণ্ডাটা উড়িয়ে দেওয়ার...












বৃহস্পতিবার, ১৮ মে, ২০১৭

আম্বানির সম্পদ ~ শতদ্রু দাস

বিশ্বখ্যাত বাণিজ্য বিষয়ক পত্রিকা ব্লুমবার্গ আজকেই  তাদের এক রিপোর্টে প্রকাশ করেছে যে মুকেশ আম্বানির মোট সম্পদ ডিসেম্বর ২০১৬ থেকে মে ২০১৭-এর ভেতর বৃদ্ধি পেয়েছে মোট ৭১০ কোটি ডলার। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ মাসে তাঁর সম্পদ বেড়েছে অতটা (১)। সংখ্যাটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো নিঃসন্দেহে, কিন্তু এই সংখ্যাটা ঠিক কতখানি বড় তা বুঝতে গেলে কিছু হিসেব কষে দেখতে হবে। 

সুইৎজারল্যান্ডের বহুজাতিক আর্থিক সংস্থা ক্রেডিট সুইস প্রতিটা দেশের মোট সম্পদের পরিমাণ হিসেব করে প্রতি বছর। তাদের হিসেবে অনুযায়ী ২০১৬-তে ভারতের মোট সম্পদের পরিমাণ হলো ৩ লক্ষ ৯ হাজার কোটি ডলার (২)। সারা দেশের সব মানুষের এবং সরকারের  মিলিত সম্পদের পরিমাণ এটা। এক বছরে এই সম্পদ কতটা বাড়ে? ২০১৫ আর ২০১৬-এর মধ্যে অর্থনৈতিক মন্দা এবং টাকার দাম পড়ে যাওয়ার কারণে দেশের মোট সম্পদের মূল্য ডলারের হিসেবে প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। তাই গত এক বছরের হিসেব ধরে এগোলে অসুবিধে হবে। ক্রেডিট সুইসের তথ্য বলছে যে গত ১৬ বছর ধরে ভারতের মোট সম্পদের গড় বার্ষিক বৃদ্ধির হার ৬.৩%। তাহলে বরং এই গড়টাকেই নেওয়া হোক। যদি ধরে নেওয়া যায় যে ২০১৭ তে মোট সম্পদের বৃদ্ধির হার ৬.৩%-এর আশেপাশে থাকবে তাহলে এই বছর দেশে মোট সম্পদ সৃষ্টি হওয়া উচিত ১৯,০০০ কোটি ডলার। এটা কিন্তু সারা বছরের হিসেব। যদি শুধু পাঁচ মাসের হিসেব ধরি তাহলে এর প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৯০০০ কোটি ডলার সম্পদ বৃদ্ধি হওয়া উচিত। খেয়াল রাখবেন যে এটা গোটা দেশের মোট সম্পদ। এই যদি হয় তাহলে গত ৫ মাসে গোটা দেশে যতটা  মোট সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে তার তার ৮%, অর্থাৎ ৯০০০ কোটি ডলারের মধ্যে ৭১০ কোটি ডলার শুধু একা আম্বানির পকেটে ঢুকেছে। ১২৫ কোটি মানুষের দেশে মাত্র একজনই পকেটস্থ করেছে ৮% সম্পদ। 

ক্রেডিট সুইস তার ২০১৬-এর  রিপোর্টে বলছে যে দেশের মাত্র ০.০৬% মানুষের হাতে রয়েছে দেশের ৩০% সম্পদ। বলাই বাহুল্য যে ওই ০.০৬% মানুষের মধ্যে মুকেশ অম্বানিও একজন। এটা গত বছরের হিসেবে। একজন মানুষই যদি দেশের সৃষ্টি হওয়া সম্পদের ৮% আত্মস্থ করে তাহলে সামনের বছর দেখবেন  ওই ০.০৬% শতাংশ মানুষের হাতে দেশের মোট সম্পদের আরো বেশি অংশ চলে গেছে। 
***************************************************************************

শুক্রবার, ৫ মে, ২০১৭

দেশদ্রোহী ~ সুশোভন পাত্র

এবং স্মৃতি ইরানি মঞ্চে উঠলেন। তখন ২০১৩। তখন ইন্দোর। জম্মু-কাশ্মীরের মেনঢর সেক্টরে দুই জওয়ানের মাথা কেটে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা তখন টাটকা। অতএব 'কিঁউকি শাশ কভি বহু থি' সার্টিফায়েড মেলোড্রামাটিক আর্দ্র ভাষণে তিনি বললেন "পাকিস্তান ঘরে ঢুকে আমাদের জওয়ানের মাথা কেটে নিয়ে যাচ্ছে, আর দিল্লির সরকার হাতে চুড়ি পরে বসে আছে।" সেলিব্রেটির চরম মিসোজিনিস্ট মন্তব্য কে সেদিন করতালি তে ভরিয়ে দিয়েছিল রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ ¹। 
তখন কর্ণাটক। তখন বিরোধী। জম্মু-কাশ্মীরের পুঞ্চ থেকে তখন হেলিকপ্টারে আনা হচ্ছে জওয়ান হেমরাজ আর সুধাকর সিং'র মৃতদেহ। অতএব দ্ব্যর্থহীন বিশুদ্ধ হিন্দি তে সুষমা স্বরাজ জানালেন, "সরকার জবাব দিক। একটা মাথার বদলে দশটা মাথা আসুক।" লোকসভার বিরোধী নেত্রী'র উগ্রবাদী মন্তব্য' সেদিন সিক্সটি পয়েন্ট হেডিং হয়ে চুইয়ে পড়েছিল প্রিন্ট মিডিয়ার লুস মোশেনে ² ।    
তখন গুজরাট। তখন মুখ্যমন্ত্রী। পাকিস্তানের জেলে নৃশংস ভাবে আক্রান্ত সরাবজিৎ তখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে নরেন্দ্র মোদী টুইট করলেন, "পাকিস্তানের অমানবিক কাজের পরেও দিল্লী সরকার অকর্মণ্যের মত ঘুমোচ্ছে।" ৫৬ ইঞ্চির ছাতির প্রশংসায় সেদিন ভেসে গিয়েছিলো কেন্ট থেকে ক্যাওড়াতলা, লন্ডন থেকে লোনাভেলা ³ ।   
প্রভুর 'ইমেজ বিল্ডিং-এ', গবুমন্ত্রী অমিত শাহ সেদিন বলেছিলেন "নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হলে পাক হানাদাররা আর নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রমের হিম্মত করবে না ⁴ ।" সেই নিয়ন্ত্রণ রেখা, যে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর গত সোমবার কৃষ্ণঘাটি এলাকায় জওয়ান পরমজিত সিং ও প্রেম সাগরের মাথা কেটে হত্যা করল পাকিস্তানের 'বর্ডার অ্যাকশন টিম'। সেই পাকিস্তান যে পাকিস্তান কুলভূষণ কে 'গুপ্তচর' সাজিয়ে, ইরান থেকে অপহরণ করে, ফাঁসির আদেশ বহাল রেখে দিল বে-শক ⁵। গত ৩৫ মাসে জম্মু-কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটেছে ১৭২টি, পাকিস্তান অস্ত্রসংবরণ সমঝোতা ভঙ্গ করেছে ১৩৪৩ বার, জওয়ান শহীদ হয়েছেন ১৯৮ জন। শুধু ২০১৬তেই ৬৪ জন। বিগত ৬ বছরে সর্বোচ্চ ⁶ ⁷। এযাবৎ অবশ্য স্মৃতি ইরানি, সুষমা স্বরাজ স্পিক-টি-নট। অমিত শাহ স্পিক-টি-নট। নরেন্দ্র মোদী আরও আরও স্পিক-টি-নট। বশংবদ কর্পোরেট মিডিয়া অবশ্য গুজব ছড়িয়ে সরকারের ড্যামেজ কন্ট্রোলে নিবেদিত।   
ভারতীয় জওয়ান'দের মাথা কেটে হত্যার রিপোর্ট প্রকাশিত হবার বারো ঘণ্টা পর 'আজতক' চ্যানেলে টেলিকাস্ট করল ভারতীয় সেনা নাকি 'প্রতিশোধ নিয়ে কৃপাণ' ও পিম্পলে' পাকিস্তান সেনার আর্মি পোস্ট ধ্বংস করেছে এবং এনকাউন্টার ৭-১০ জন পাকিস্তান সেনারও মৃত্যু হয়েছে'। 'ইন্ডিয়া টুডে', 'ইন্ডিয়া টিভি', 'জি নিউজ' -আগুনের স্ফুলিঙ্গের মত ছড়িয়ে পড়ল গুজব। সোশ্যাল মিডিয়াতে যখন হাজার হাজার শেয়ার হয়ে সেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে ফেসবুকের দেওয়ালে, টুইটারের নিউজ ফিডে কিংবা হোয়াটস অ্যাপের স্ক্রিনে তখন জানা গেলো, 'কৃপাণ' আর্মি পোস্ট আদেও পাকিস্তান আর্মির নয় নয় বরং ভারতের ⁸।  হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকা তে সেনার নর্দান সিনিয়র কমান্ডার সাফ জানিয়ে দিলেন "ভারতীয় সেনা কোনও এনকাউন্টার করেনি, বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশিত খবর ভিত্তিহীন" ⁹। 
মিডিয়ার এই নির্লজ্জ চাটুকারিতা অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রত্যাশিত। দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির কোষাগার পুষ্ট হয়েছে কর্পোরেট ডোনেশেনে। বিনিময়ে সরকারি নীতির মারপ্যাঁচে মুনাফা কুড়িয়েছে কর্পোরেট হাউসগুলো। চক্রাবর্ত নিয়মে কর্পোরেট'দের মালিকাধীন মিডিয়াই তাই গুজব ছড়িয়ে সরকারের ব্যর্থতা আড়ালে প্রতিশোধের রূপকথা পরিবেশন করছে।  
কিন্তু মিডিয়া আপনার হয়ে সরকার কে কখনও প্রশ্ন করেনি যে; জম্মু-কাশ্মীরের এই উত্তাল পরিস্থিতিতে দেশে একটা স্থায়ী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নেই কেন? জিজ্ঞেস করেনি যে বিজেপির দাবি মত ডিমনিটাইজেশান যদি মাওবাদী'দের মেরুদণ্ড ভেঙেই গিয়ে থাকে, তাহলে সুকমা'তে ২৬ জন সি.আর.পি.এফ কে মরতে হল কেন? জিজ্ঞেস করেনি যে, ছত্তিসগড়ে সি.আর.পি.এফ'র চিফের পদ ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে খালি রইলো কেন ¹⁰? প্রশ্ন করেনি যে আদানি গ্ৰুপের ফ্যাক্টরির জন্য জমি অধিগ্রহণের অজুহাতে ছত্তিসগড় সরকার বনজ জমির উপর আদিবাসীদের অধিকারের আইন সম্পূর্ণ বাতিল করেছে কেন? প্রশ্ন করেনি যে জগদলপুর লিগ্যাল অ্যাড গ্রুপ ও আদিবাসীদের নেত্রী সোনি সোরির মুখে সলওয়া জুডুমের উত্তরসূরি 'সামাজিক একতা মঞ্চে'র গুণ্ডারা অ্যাসিড ছুঁড়ল কেন ¹¹? 
সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর, উৎপল দত্ত সাহিত্য অ্যাকাডেমির বক্তৃতায় বলেছিলেন; পথের পাঁচালি দেখে দিল্লীর এক উচ্চপদস্থ আমলা অগ্নিশর্মা হয়ে দেশের গরিবির এই মলিন ছবি সেলুলয়েডে পরিবেশনেই জন্য সত্যজিৎ রায় কে তীব্র ভর্ৎসনা করেন। গোটা বিশ্বের কাছে ভারতবর্ষের মাথা হেঁট করে দিয়েছেন এই অভিযোগে তৎক্ষণাৎ পথের পাঁচালি'র যেকোনো রকম পরিবেশনা বন্ধ করার দাবিও করেন। প্রত্যুত্তরে সেদিন সত্যজিৎ রায় ইস্পাত কাঠিন্যে বলেছিলেন "নীতি প্রণয়নের শীর্ষে  বসে দেশের গরীব'দের এই অবস্থা দেখে যদি আপনার মাথা হেঁট না হয়, তাহলে আমি সেই গরিবি সেলুলয়েডে পরিবেশন করলে নতুন করে ভারতবর্ষের আর মাথা হেঁট হবে না" 
তাই যে সরকার রায়বাহাদুরের অবহেলায় আজ সিয়াচেন থেকে কাশ্মীর, সুকমা হয়ে মহারাষ্ট্রে জওয়ান'রা শহীদ হচ্ছে তারা যদি প্রকৃত 'দেশদ্রোহী' না হয়; তাহলে সেই সরকারের দায়-দায়িত্ব-কর্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করলে নতুন করে আর কেউ 'দেশদ্রোহী' হবে না, সেই সরকারের ব্যর্থ বিদেশনীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন করলে নতুন করে আর কেউ 'দেশদ্রোহী' হবে না, সেই সরকারের ভ্রান্ত কাশ্মীর নীতি বিরুদ্ধে প্রশ্ন করলে নতুন করে আর কেউ 'দেশদ্রোহী' হবে না। জওয়ান'দের শহীদ হওয়ার আবেগ মাখিয়ে, মিথ্যে দেশপ্রেমের বুলি কপচে প্রধানমন্ত্রী কেন নওয়াজ শরিফের সাথে পাকিস্তানে বিরিয়ানি খান  -জিজ্ঞাসা করলে নতুন করে আর কেউ 'দেশদ্রোহী' হবে না। সেনা কে উলুখাগড়া বানিয়ে রাজায় রাজায় যুদ্ধ আর কদিন –জানতে চাইলে নতুন করে আর কেউ 'দেশদ্রোহী' হবে না। তাই প্রশ্ন করুন। একটা নয়, একশোটা করুন। কেন হচ্ছে প্রশ্ন করুন। কাদের দায় জিজ্ঞেস করুন। কবে থামবে প্রশ্ন করুন। কারণ একমাত্র প্রশ্নেই আছে সমাধান। প্রশ্নেই আছে উত্তর। এই জন্যই আজকের ২০০তম বার্থ ডে'র বুড়োটা কবেই বলে গেছে.. "কোশ্চেন এভরিথিং"।এভরিথিং…



​ 







কার্ল মার্ক্স ২০০ ~ পুরন্দর ভাট

কার্ল মার্ক্স্ ২০০ বছরে পড়লেন। বামপন্থীদের কাছে ব্যক্তির গুরুত্ব তার কর্মের ওপর নির্ভরশীল তাই মার্কসের জন্মের দ্বিশত বার্ষিকীতে তার কর্মের কথা বলা,  আলোচনা করাই বামপন্থী প্র্যাকটিস। 

১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হয় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। অর্থাৎ মাত্র ৩২ বছর বয়সে মার্ক্স্ এমন একটা চটি বই লিখে ফেলেন যা মানবসভ্যতার অভিমুখ বদলে দেয়। আমার বয়সও প্রায় একই, সেটা ভাবলে হাসি পায়। ম্যানিফেস্টো রচনা করার পেছনে কারণ কি সেটাও ম্যানিফেস্টোর শুরুতেই আছে। মার্ক্স্ বলছেন "গোটা ইউরোপ মহাদেশ ভূতের ভয় কাঁপছে, কমিউনিজমের ভূত। কেউ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করলেই তাকে কমিউনিস্ট বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে। আর উল্টোদিকে যাদেরকে কমিউনিস্ট বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে তারা প্রভূত সময় ও শব্দ খরচ করছে তাদের ওপর কমিউনিস্ট তকমাকে মিথ্যে প্রমান করতে। অর্থাৎ এই মুহূর্তে গোটা ইউরোপের শাসক শ্রেণীর সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে কমিউনিজম অথচ বাস্তবে কমিউনিজম কি তাই নিয়ে কারুরই কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই, ছায়ার সাথে লড়ছে। তাই এই মুহূর্তে আমাদের দায়িত্ব যে কমিউনিজম কি সেটা পরিষ্কার করে দৃপ্ত কণ্ঠে জানানো এবং যাঁরা সত্যি সত্যি কমিউনিজমের সাথে একমত তাঁদের নিজেদের কমিউনিস্ট বলে আত্ম ঘোষণা করা।"    

ম্যানিফেস্টো নিয়ে দুটো কথা বলার আগে এটা বলা প্রয়োজন যে বেশিরভাগ মানুষ যা মনে করেন সেটা ঠিক নয়,  ম্যানিফেস্টো শুধু মার্ক্স্ এবং এঙ্গেলস মিলে লেখেননি,  বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট কর্মীদের সাথে আলাপ আলোচনা করে ও মতামত গ্রহণ করে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো রচনা করা হয়েছিল। যদিও অবশেষে যে রূপে সেটা প্রকাশিত হয় সেটা মার্ক্স্ আর এঙ্গেলসেরই রচনা। তা ছাড়া, বিষয়টা এরকম নয় যে মার্ক্স্ এবং এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো লিখে ফেললেন এবং সাথে সাথে বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়ে গেলো আর দিকে দিকে বিপ্লব শুরু হয়ে গেলো। মাত্র ৩২ বছর বয়সে  ম্যানিফেস্টো লিখে থাকলেও, মার্ক্স্ তাঁর বাকি জীবন অসংখ্য বই এবং প্রবন্ধ লিখে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর মূল ভাবনাগুলোকে আরো ব্যাপ্ত করেছেন, জনপ্রিয় করেছেন। তা ছাড়া সারা জীবন রাজনৈতিক কার্যকলাপে সরাসরি যুক্ত থেকে বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টিকে বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করেছেন। তবু এই একটি চটি বইয়ের গুরুত্ব ১৫০ বছর পরেও অমলিন। কেন?  

এর খুব সহজ উত্তর হলো যে যে পরিস্থিতি আর যে উদ্দেশ্য নিয়ে ম্যানিফেস্টো লেখা হয়েছিল তা আজও সাংঘাতিক ভাবে বর্তমান। বহুবার বহু জায়গায় এই কথাটা শুনে থাকবেন  তাই বেশি ব্যাখ্যা দেওয়া নিরর্থক। শুধু একটা পরিসংখ্যান দেব। ম্যানিফেস্টোতে মার্ক্স্ বলছেন কমিউনিস্ট পার্টির কাজ হলো মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ শেষ করতে বিপ্লব সংগঠিত করা। তা এহেন কমিউনিস্ট পার্টি কি ধরণের দাবি দাওয়া নিয়ে মানুষের কাছে বিপ্লবের প্রচারে যাবে? ম্যানিফেস্টো বলছে যে খুব সহজ একটা দাবি - সম্পত্তির ওপর ব্যক্তি মালিকানা বাতিল করতে হবে। এই একটা মূল দাবিকে সামনে রেখে এগোলেই হবে কারণ বুর্জুয়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা টিঁকে আছে ব্যক্তি মালিকানার ওপর দাঁড়িয়ে, বুর্জুয়া রাষ্ট্রের মূল কর্তব্য সম্পত্তির ওপর ব্যক্তি মালিকানার অধিকারকে রক্ষা করা। যেহেতু সর্বহারা শ্রেণীর ব্যক্তি মালিকানা বলে কিছু নেই তাই সর্বহারা শ্রেণী এই দাবির বিরোধিতা করবে না। চলে আসা যাক ১৬৫ বছর পেরিয়ে। ২০১৪ সালে ক্রেডিট সুইসের রিপোর্ট দেখাচ্ছে যে ভারতের ধনী ১০% মানুষ ৭৪% সম্পত্তির মালিক এবং নিচের দিকে ৬০% মানুষ মাত্র ৭% সম্পত্তির মালিক। কিন্তু এই সম্পত্তি উৎপাদন এই ৬০% মানুষ ছাড়া অসম্ভব, শ্রম এবং পণ্যের বাজার এই দুটোই ৬০% মানুষ দিয়েই তৈরি। অর্থাৎ ৬০% মানুষের যেহেতু বিশেষ কিছু হারাবার নেই তাই সম্পত্তির ওপর ব্যক্তি মালিকানা তুলে দেওয়ার কথা বললে এদেরও হারাবার কিছুই থাকবে না। বোঝা গেলো কেন ২০১৭ তে দাঁড়িয়েও ম্যানিফেস্টো এতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ম্যানিফেস্টো পড়তে গিয়ে আরেকটা কথা বার বার মনে হয়। ১৯ শতকের মাঝামাঝি দাঁড়িয়েও কতগুলো প্রচন্ড বৈপ্লবিক ধারণা এত দ্যার্থহীন ভাষায়, এতো সাহসিকতার সঙ্গে, এতো দৃপ্ত ভাবে ওখানে উচ্চারিত হয়েছিল বলেই বোধয় এতটা প্রভাব ফেলেছিলো মানুষের ওপর। 

* সর্বহারার উৎপাদিত পণ্য থেকে তাদের বঞ্চিত করেই বুর্জুয়ার বিপুল সম্পত্তি। 
* সম্পত্তির ওপর ব্যক্তি মালিকানা তুলে দেওয়াই বিপ্লবের লক্ষ্য। 
* সর্বহারার কোনো ধর্ম বা জাতি নেই, তাদের একটাই পরিচয় তারা সর্বহারা। ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়গুলো সর্বহারাকে বিভ্রান্ত করে শুধু। বুর্জুয়ারা সেটার সুযোগ নেয়। 
* সর্বহারার কোনো দেশ নেই তাই দেশভক্তি নিয়ে মাথা ঘামানোর কারণও নেই। বিভিন্ন দেশের সর্বহারা শ্রেণী একে অপরের শত্রু নয়, তাদের সকলের শত্রু হলো বুর্জুয়া। 
* সমাজের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীরা বুর্জুয়ার দালালি করে - ডাক্তার, উকিল, সাংবাদিক, দার্শনিক, সাহিত্যিক সকলেই। আইনসভা, আদালত, অথবা ধর্ম যাজকরাও তাই। 
* পরিবারও একটা বুর্জুয়া ব্যবস্থা। সাম্যবাদ প্রতিষ্টিত হলে পরিবারেরও প্রয়োজন থাকবে না। সন্তানের দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র। পুরুষ এবং নারী সন্তানের লালন পালনের ভার থেকে মুক্ত হবে। ভালোবাসা ছাড়া তাদের সন্তানদের প্রতি কোনো দায় দায়িত্ব থাকবে না। 

ভাবুন একবার। ১৫০ বছর আগে একটা রাজনৈতিক দল এগুলোকে তাদের লক্ষ্য বলে ঘোষণা করছে দৃপ্তকণ্ঠে। কে তাদের দেশদ্রোহী বলবে, কে তাদের ওপর ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ তুলবে, কে তাদের ওপর পরিবার ব্যবস্থা  শেষ করে দিয়ে উশৃংখলতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলবে এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামায়নি। 

এই সাহসিকতার হয়তো আজকের দিনে প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেখানে ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সার্বিক ভাবে রক্ষণশীলতার জয় জয়কার চলছে তখন একদম পরিষ্কার ভাবে মানুষের কাছে একদম বিকল্প একটা রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা  তুলে ধরা দরকার।

আমাদের পাড়া ~ স্বাতী সেনগুপ্ত

অনেকদিন ধরেই এটা লিখব ভাবছি লেখা আর হয়ে উঠছিল না। হঠাৎ করেই আজকাল চারপাশে "হিন্দুরা" বেশ নিপীড়িত হাব ভাব করতে লেগেছে। চেনাদের জন্যই বেশি চিন্তা হচ্ছে। এত বছরে কোনদিন জানতেই পারিনি তাদের জীবন এত কষ্টের। 

আচ্ছা রসিকতা থাক না হয়। খুব দরকারি কিছু কথা বলি। দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে আমার বাড়ি। আমার ঠাকুরদা দেশ ভাগের আগেই এপারে ডাক্তারি পড়তে এবং ডাক্তারি করতে চলে এসেছিলেন। তারপরে এদিক ওদিক চাকরি সূত্রে ঘুরে আমার ঠাকুমার বাবার কথা মত এইখানে এসে জমি কিনে বাড়ি বানালেন। আমি কোন ছাড় আমার বাবার ছোটবেলাও ওখানেই কেটেছে। আজকাল আমার খুব সন্দেহ হয় ওখানে সব এলিয়েন রা থাকে। যশোর রোড আর ভি আই পি রোড এর জংশন -এ এই অদ্ভুত জায়গাটার শুরু। একদিকে মসজিদ আরেকদিকে কালি মন্দির। কি বলব মশাই এলিয়েন গুলো ঐ মসজিদ লাগোয়া ফুলের দোকান থেকে ফুল কিনে দুর্গা, কালিপুজা থেকে শুরু করে প্রেম পর্যন্ত করে। ভাবুন দেখি কি আক্কেল। আবার ফুল কিনে যাওয়ার পথে টুকুস করে মসজিদ-এর পীর বাবার কবরে খানিকটা চড়িয়ে ঘটাং করে একটা নমস্কার ঠুকে নেয়। এই এলাকার মুসলিম গুলোও কেমন যেন। প্রত্যেক বছর চাঁদা দিয়ে হিন্দু গুলোর সঙ্গে নেচে নেচে দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে আরও কি কি সব পুজা করে। তা এসব পাগল ফাগল কাটিয়ে ২কিমি মত ভেতরে ঢুকলে আমার বাড়ি। তা বলে না দিলে অবশ্য বুঝবেন না কোনটা হিন্দু বাড়ি আর কোনটা মুসলিমের। এপাড়ার বামুন গুলো আরও অদ্ভুত! মুসলিম, শুদ্র কিসসু মানে না। আমার পাশের বাড়ির ভাইগুলো (এরা আবার পুজা ও করে) সুবেদ আলি কাকাদের বাড়িতেই খাওয়াদাওয়া করত। আমার এক বান্ধবির বাবাও কট্টর বামুন। তাদের বাড়িতে যে রান্না করে সে নাকি অচ্ছুৎ। আমাদের বাড়িতে যে পিসিরা পালা করে কাজ করে এসেছে তারা মুসলিম। বড় দুই পিসি আবার হিন্দু বিয়ে করেছে। তাদের ছেলেমেয়েগুলোর কি জাত? কি ধর্ম? কে যানে বাবা। ওরা নিজেরাও জানেনা। ওদের "বস্তি বাড়িতে" যখন খেলতে যেতাম তখন দেখতাম ওখানে তো হিন্দু-মুসলিম উঠোন গুলোও একাকার। সব চেয়ে ছোট পিসি এখনও আমাদের বাড়িতে কাজ করে। লক্ষিপুজার ভোগ টা ওই রান্না করে।

ঠাকুরদার কাছে দেখতাম গরিব লোক, বস্তি বাড়ির লোক ই বেশি আসত। ঠাকুরদার খাতায় দেখেছি ফীস লেখা থাকত। কোনদিন আড়াই টাকা, কোনদিন পাঁচ টাকা, এইরকম। উনি মারা গেছেন সেই ১৯৯৯ সালে। এখনও লোকে আমায় তাঁর নাতনি বলেই চেনে। কলকাতা আর আগের মত সুরক্ষিত নেই কিন্তু রাত ১২ টার সময়ও যদি ঐ এয়ারপোর্ট ১ নং গেট -এ পৌঁছে যাই তো নিশ্চিন্ত। ওখানের রিকশাওালা কাকু(এখন তো ভাই-এর বয়সিও থাকে) রা ঠিক বাড়ি পৌঁছে দেবে জানি। ওদের মধ্যে কিন্তু বেশির ভাগ-ই মুসলিম। 

ছোটবেলার কয়েকটা ঘটনা বলি। প্রথম টার সময় আমি বোধহয় ৩ বছরের। বাড়িতে পিসিমনি রা এসেছে। খুব হইচই হচ্ছে। পিসিমনি আমার জন্য একটা পুঁচকে চীনামাটির কাপ এনেছে আর তাতে করে আমি প্রথমবার একলা একলা চা খেয়েছি। এমন আনন্দের সময় খেয়াল হল বাবা বাড়িতে নেই। কোথায় গেছে জিজ্ঞেস করায় মা বলল অমুককাকুর (নাম টা একদম ভুলে গেছি) বাড়ি দাবা খেলতে গেছে যেমন ছুটির দিনে মাঝেমধ্যেই যায়। অমনি আমি বাইরে পরার একটা জামা বগলে নিয়ে চুপিচুপি বাগান পেড়িয়ে, ঠাকুরদার রুগি দেখার ঘর পেড়িয়ে বড় গেটের উপরে চড়ে গেট খুলে ছুট (হ্যাঁ রে বাবা গেটের উপরেই চড়তে হত নয়ত হাত পৌঁছাত না।)। রাস্তা তো আমার চেনাই। বেশিদুর নয়। দুটো পুকুর পেড়িয়ে একটা গলি দিয়ে হেঁটে গেলেই অমুককাকুর বাড়ি। আর গেলেই দেখতে পাব বাবা আর সেই কাকু গম্ভির মুখে দাবা খেলছে বারান্দায় বসে। সে যাত্রা সুবেদ আলি কাকুর চোখে পড়ায় বেঁচে যাই। পুকুরে না ডুবলেও হারিয়ে নিশ্চয়ই যেতাম। তখনও আমাকে ঠাকুরদার নাতনি হিসেবে পাড়ার ৩-৪ টে বাড়ি বাদে আর কেউ চিনত না। 

এবারে ১৯৯৯ সাল। আমাদের পরিবারের উপর দিয়ে তখন একটা ঝড় যাচ্ছে। ঠাকুমা পিজি হসপিটালে ভরতি। Pacemaker বসবে। ঠাকুরদা মারা গেছেন সেদিন। আগের দিন রাতে তাঁকেও ভরতি করতে হয়েছে পিজি হসপিটালে। একসময় ওখানে ঠাকুরদা RMO ছিলেন। একা একা বসে আছি দোতলায় খাটের উপরে স্তম্ভিত হয়ে। মৃত্যু আগে ধারেকাছে আসেনি তা নয়, তবে এত আচম্বিতে কোনদিন ছোবল মারেনি। আমার বাড়ির পাশেই থাকে শেফালি। One of my best friends. ও এসে কিছু না বলে আমার পাশে বসেছিল অনেকক্ষণ। ওর বোধহয় ক্লাস ছিল। এক মাস পরেই পরিক্ষা। যাবার আগে সঞ্চয়িতা টা ধরিয়ে দিয়ে গেল। বলল "পড়। সব উত্তর পাবি।" ও মুসলিম। জীবনে আরও অনেক ঝড় দেখেছি কিন্তু ঐ ভাবে আর কেউ কোনোদিন আমার পাশে এসে বসেনি। আমাকে সবাই খুব শক্ত মনের মানুষ বলেই জানে। তাই কেউ কখন আমাকে সান্ত্বনা দেবার কথা মনেও করেনি। ঐ একজনই।

এবারে ২০০২। ঠাকুমা মারা গেছেন। বিশদে যাবনা। বাড়িতে বাবা মা কেউ নেই। অচেনা লোকের ভিড়ে বাড়ি ভরতি। অন্ধকার (power cut) ও হয়ে গেছে। ঐ যে সেই পিসিদের কথা বলছিলাম। যাদের কোলেপিঠে চড়ে বড় হয়েছি। মুসলিম।তাদের মধ্যে একজন, সে আমার ঘরের "দামি" জিনিস সামলায়, আমাকে সামলায়, আমার ভাইকে সামলায়। আর বসে বসে কাঁদে। যতক্ষণ না আমার জ্যেঠু বড়মা (বাবার পিসতুত দাদা বৌদি) এসেছে সে আমাদের পাশ ছেড়ে নড়েনি। যতক্ষণ না বাবা মা এসেছে (প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা বাদে) ততক্ষণ বাড়ি ছেড়ে যায়নি।

তো সেই কথাই বলছি আরকি। নিকুচি করেছে আপনার দেশভক্তির। ওসব রাখুন মশাই। আমার ভক্তি, ভালবাসা তা সব এই মানুষগুলো কে দিয়ে ফেলেছি অনেক আগেই। আপনার মত ঘ্যানঘ্যানে শয়তান দের দেওয়ার মত কিছুই রাখিনি। নিজের ছেলেমেয়ে কেও তো ভাল কিছু শেখাতে পারলেন না জীবনে ঘৃণা ছাড়া। বুড়ো বয়সে আপনাকে দেখবে তো? তা এহেন অদ্ভুত এলিয়েন জায়গাটার নাম ও আবার সুলতানপল্লি। মোরের মাথার নাম শুকুর আলির মোর। তবেই বুঝুন। দেশদ্রহিতা তো আমার রক্তে মশাই। আর সবার রক্তের রঙই আবার লাল। বিশ্বাস করুন দেশে এতগুলো বড় বড় riot হয়েছে তা ওই এলাকায় বসে কিছু বুঝতেই পারিনি। আশাকরি আমার এলাকাটা এইরকমই থাকবে।

বুধবার, ৩ মে, ২০১৭

চিকিৎসা ও হলুদ সাংবাদিকতা ~ দোলনচাঁপা দাশগুপ্ত

আমি চুপ ছিলাম। আছিও। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সব ঘটনা,  দুর্ঘটনা,  ঘাত প্রতিঘাত ঘটে যে চুপ থাকাটাও বড্ড কঠিন আর ক্লেশকর হয়ে ওঠে।  চারিদিকে অজস্র দীনতা আর দিন আনা দিন খাওয়া পাপক্ষয়ের মধ্যে নিজেদের বিকিয়ে দিয়ে আর কতোকাল বসে থাকবো? হলুদ সাংবাদিকতা আজ ঠিক করে দেবে চিকিৎসা বিদ্যার কোন টা ঠিক আর কোনটা বেঠিক?  বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিবাদ করতে গিয়ে  একজন নামকরা কবি ক'দিন আগে তার টাইমলাইনে লিখলেন- 'কেন গাছতলায় বসে অতি সহজেই রুটি অর্জন করবে  ডাক্তার রা? ' বোঝো!  ঘৃণা এবং প্রতিহিংসা কোথায় এবং কতদূর ছড়িয়েছে।  স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বদলাতে চেয়ে চিকিৎসক সমাজের প্রতি বিষ উগড়ে দেওয়া। ইনি কেমন মানুষ?  কবি হবার ন্যূনতম যোগ্যতা নেই। আর এইসব অশিক্ষিত মূঢ় সাংবাদিক?  যারা ইচ্ছাকৃত ভাবে চিকিৎসককে অপরাধী বানান - গর্ভের মৃত সন্তান কে ক্রেনিওটমি নামক পদ্ধতিতে বার করে মায়ের জীবন রক্ষা করেছেন চিকিৎসক অভিজিৎ দাশগুপ্ত।  প্রশংসার বদলে তার নামে প্রত্যেকটি ছাপার কাগজে যে  মিথ্যা হঠকারী সংবাদ পরিবেশন করা হল তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
ফেসবুকে আমার অনেক বিদগ্ধ সাহিত্যিক,  ফিল্মমেকার, শিল্পী,  কবি  বন্ধু আছেন যারা আমার পোষ্ট চুপিচুপি পড়েন কিন্তু জানান দিতে চান না।  তাদের উদ্দেশ্যে বলি আমি নামজাদা চিকিৎসক নই, অন্যান্য গুণ ও কম যাতে কিনা বড় বড় মিডিয়া হাউজে ঝপাঝপ ছবি ও লেখা বেরোবে।  আমি এক অতিসাধারণ ঘরের মেয়ে যে লড়াই করে উঠে এসেছি।  চিকিৎসক হবার আগে এক আত্মসম্মান যুক্ত মানুষ।  পৃথিবীর প্রথম একশো জন ধনী লোকের তালিকায় আমার নাম নেই, সাহিত্যে পুলিতজার বা বুকার আমার দিবাস্বপ্ন,  কান ফিল্ম ফেস্টিভালে ফিল্ম পাঠানো আমার বেড়ালের শিকে ছেঁড়ার মতো ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু এসবে আমি মোটেও দুখী নই। এখন যারা এসব পাচ্ছেন তারা বোধহয় সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষ।তাদের সৃষ্টি তে কিন্ত আমজনতার কষ্ট হতাশা কিছুই ফুটে উঠছে না। মিডিয়াকে তারা চটাবেন না স্বাভাবিক - হয়তো পুরস্কার তিরস্কারে বদলে যেতে পারে। 
আমি শুধু আমার কথা বলিনি। আমির বদলে আমরা পড়ুন। সমাজে চিকিৎসক আর রুগি কিছু আলাদা নন। এখনো।  এতো অন্ধকারেও আলোর রেখা আছে। পুরোটা বিষিয়ে দিতে পারেনি বেনিয়া বহুজাতিকের দল।
আমার শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক স্যার Rezaul Karim এর এই প্রতিবাদ টি পড়ুন। ব্যক্তিগত ভাবে আমি বিপর্যস্ত থাকার জন্য বহুদিন ফেসবুকে আসতে পারিনি। আজ আর চুপ করে থাকতে পারা গেল না। 
আর হ্যা, আপনি যদি সমাজমনস্ক সাধারণ মানুষের পক্ষে থাকেন,  চিকিৎসাব্যবস্থার বদল ঘটানোর স্বপ্ন দেখেন,  যদি সেলিব্রিটি না হন - তবে এই পোস্ট টিকে শেয়ার করুন। 
নয়তো আগামি দিন খুব ভয়ংকর।  লাল সবুজ গেরুয়া যে মৌলবাদী দল ই আসুক না কেন আপনাকে আমাকে কিন্তু চিকিতসকের কাছে যেতেই হবে। 
সাম্প্রতিক কালে চিকিৎসা বিভ্রাটের নানারকম ঘটনায় চিকিৎসক সমাজের দুর্নীতি নিয়ে অনেকেই মুখ খুলছেন- আশার কথা তাদের মধ্যে অনেকেই চিকিৎসক। খবরের কাগজ যে খবর ছাপে তার মধ্যে বিপননের চাপ থাকে, সবকিছুকেই রহস্যময় করতে পারলে ব্যবসায় লাভজনক হয়। আমাদের দেশের সাংবাদিকরা তো আর রবার্ট ফিস্কের মত নয়- যে যুদ্ধের খবর করতে গিয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বেইরুটে গিয়েই জীবন কাটিয়ে দেবেন। তাকে  ফ্যালানজিস্ট স্পেশালিস্ট বললে কম বলা হয়। তিনি মধ্য-এশিয়ার যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ, তিনি প্রায় সব যুদ্ধবাজ, খুনে, গনহত্যাকারী, শান্তিকামী, মানবাধিকার কর্মী সবার নাডী নক্ষত্র চেনেন।  একদিকে  বোমা পডছে তার মধ্যে তিনি রেঁস্তোরায় বসে পাস্তা চিবুতে পারেন। ডালরিম্পলের মনে হয়েছে-"Fisk was...unexpectedly boyish... no amount of kindness could disguise the fact that Fisk was clearly a war junkie, suffering from all the side effects of an addiction to bombs, kidnapping, loud explosions and unhealthy quantity of adrenaline..." তিনি যুদ্ধ-সাংবাদিক, তিনি আদ্যন্ত পেশাদার। তার আড়ালে  যে বিদগ্ধ, স্নেহপ্রবণ মানুষটি লুকিয়ে আছে পেশার সাথে তার আপাত বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু তিনি পেশার মান রক্ষা করার জন্য কোন ঢাকঢাক গুডগুড না করে, যা দস্তুর তাই মান্য করেছেন। আমাদের সাংবাদিক বন্ধুরা বেশীরভাগ কিছু পড়াশোনা করেন কিনা সন্দেহ আছে- কেউ চাকুরি বাঁচানোর জন্য লেখেন, কেউ পাব্লিক কি খাবে সেটা ভেবে লেখেন। প্রায়শ: তাদের কলমে উঠে আসে চিকিৎসক, শিক্ষক বা অন্য পেশাদারদের মানবিকতার মূল্যায়ন বা সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা। তারা নিজেরা কি সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ নন? একজন সাধারন মানুষের দৃষ্টিকোন থেকে কোনটা খবর? সে জানতে চায় তার জীবনধারণের প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু। কোন ভণ্ড রাজনীতিক কি বললেন, কে দল বদল করল, কে রাতবিরেতে রাসলীলা করতে করতে জীবন দিয়েছে তা মানুষের গ্রহনযোগ্য কোন খবর হতে পারে না। অথচ, প্রানধারনের সব গ্লানিকর দিকগুলিই খবরের কাগজের মুখ্য বিষয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার কেবলমাত্র খারাপ দিকগুলিই সাংবাদিক দেখতে পান। সেদিন খবরের কাগজ হাতে নিয়ে আমি অনেকক্ষণ থ হয়ে বসে রইলাম। একটি শিশুর মাথা ছিঁডে ফেলতে হলে কি অমানুষিক শক্তি থাকতে হবে- কারো কি তা থাকতে পারে? ধরুন, চিকিৎসা বিদ্যা নিয়ে আপনার কোন ধারনা নেই কিন্তু সাংবাদিকতার মহান পেশাগত দায়বদ্ধতা আপনার আছে। একটু পড়ে নেওয়া যায়, বহু নামী সাংবাদিক আছেন যারা সুশিক্ষিত তাদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া যায়। আবার ইচ্ছা করলে চিকিৎসকদের কাছ থেকেও জেনে নেওয়া যেতে পারে। অথচ, খবরটি এমন ভাবে পরিবেশিত হল যে চিকিৎসক আসলে মেডিকেল কলেজে বোধহয় খুন করার ট্রেনিং নিয়েছিলেন। তাই শিশুর মাথাটি ধড থেকে আলাদা করে তার শিক্ষা সম্পূর্ণ করেছেন। চারিদিকে শুধু অন্তহীন তমিস্রা, চিকিৎসকরা রক্তচোষা জোঁক, তারা রোগীদের মেরে ফেলছেন। "তারা" বলতে গেলে কতজন লাগে, শতকরা কতজন খারাপ হলে একটি সম্প্রদায়কে খারাপ বলা যায়? কাল যে সাংবাদিকরা একটি বহুচর্চিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভুল ব্যাখা করে জনগনের মধ্যে আতঙ্ক ও চিকিৎসকদের সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্ত করলেন তার ভিত্তিতে কি বলবো সাংবাদিকরা গনশত্রু। 
আমি সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে জানলাম এই সমস্ত ব্যাপারে প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করা যায়। আমাদের আইনী শাখা এবার থেকে যে কোন ধরনের মিথ্যা খবরকে আইনি পথে প্রতিহত করবে। অনিচ্ছাকৃত ভুল, অজ্ঞতা বা নাশকতা ও প্রতিশোধমূলক খবর আইনী পথে প্রতিরোধ করা হবে এ আমরা জানিয়ে রাখছি। পাশাপাশি এটা মনে করিয়ে দিই- আমরা কেউ ত্রুটিহীন নই, আমাদের ভুল হয়, আমাদের ভুল অনেকসময়ে মারাত্মক বা প্রানঘাতী ও হয়। অপরাধ বিজ্ঞানী একজন আমাকে বললেন- অপরাধের মোটিভ থাকে, সেখান থেকে অপরাধীর লাভের সম্ভাবনা থাকবে। একটা ঘটনা ঘটলে প্রথমে দেখা দরকার অপরাধ-ইচ্ছা ছিল কিনা। বিদেশে এ ধরনের ভুল হলে একদিকে মেডিকেল কাউন্সিল অন্যদিকে চিকিৎসকদের পেশাগত প্রতিষ্ঠান সেগুলি নিয়ে দিক নির্ণয় করে। অনেকসময়ে চিকিৎসকদের শাস্তিও হয় কিন্তু খবরের কাগজে গাঁজাখুরি গল্প লিখে গনহিস্টিরিয়া তৈরী করা যায়,  সমস্যার সমাধান হয় না। টক শো গুলোকে তো প্রায় কোন কথায় বলা যায় না, সেখানে চাঁদবদনটি দেখানো আর কিছু চটকদার কথা বলা ছাড়া কিছু হয় না। সুতরাং খাপ পঞ্চায়েতে  চিকিৎসকদের ফাঁসি হতে থাকবে, কেউ আটকাতে পারবে না। এর মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে আসল স্বাস্থ্য সমস্যা- কেন জনস্বাস্থ্য বাজেট কমে, টীকাকরনে কেন অধোগতি, কেন শিশু মৃত্যুর হার কমে না, কেন শয্যা সংখ্যা বাডে না, ক্লাবের জন্য টাকা খরচ হয়,  হাসপাতাল রঙ হয় কিন্তু চিকিৎসা কেন তিমিরে!! গরীব মরলেও খবর হয় না- আজ যদি একজন চিকিৎসক সত্যিকার অন্যায় করে পার পেয়ে যায় আর সংবাদ মাধ্যম জেনেও চুপ করে থাকেন তাহলে বলতে হবে সে পাপের তারা সমান ভাগীদার। যা সত্য ও ইচ্ছাকৃত পাপ তা প্রকাশ করতে হবে। তার জন্য অনুশীলন করতে হবে।
ফিস্ক রূপকথা লেখেন না। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে হাসপাতালে ফসফরাস বোমা মারার পরের ঘটনা শুনুন- in a book filled with horror ...he met a nurse. After the bombardment had ended she had to put several burning babies into a big bucket of water in order to put out the flames. When she took them out half an hour later, they were still burning. Even in the freezing cold of the mortuary they were smouldered. The following morning the doctor took the tiny corpses out of the mortuary for burial". আনন্দবাজার হলে নিশ্চয় লিখতো- নিজের চোখে দেখলাম নার্সটি কচি বাচ্চার সুস্বাদু ঝোল বানাচ্ছিল, পরদিন ডাক্তার প্লেটে সাজিয়ে সেগুলি নিয়ে অদৃশ্য হল। যে নিরাসক্তি নিয়ে কাজ করার কথা আমাদের মহাপুরুষরা বলে গেছেন তার একান্ত অভাব আছে তাই নয়, এদের দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীন। মন প্রস্তুত হবার আগে কলম ধরতে শিখেছে, কলমের সব কালি তাই নিবের বদলে অগঠিত চরিত্র থেকে চুঁইয়ে আসছে। চারিদিকে হতাশাগ্রস্ত মানুষ তাৎক্ষনিক উত্তেজনার খোরাক পাচ্ছে। কিন্তু সমাজ যে অন্ধগলিতে পথ হারিয়ে ফেলছে সে হিসেব কে রাখে?  মনে পড়ে গুরুদেব লিখেছিলেন-"এত বর্তমান অভাব-নিরাকরণ এত উপস্থিত সমস্যার মীমাংসা আবশ্যক হইয়াছে, প্রতিদিনের কথা প্রতিদিন এত জমা হইতেছে যে, যাহা নিত্য, যাহা মানবের চিরদিনের কথা, যে-সকল অনন্ত প্রশ্নের মীমাংসার ভার এক যুগ অন্য যুগের হস্তে সমর্পণ করিয়া চলিয়া যায়, মানবাত্মার যে-সকল গভীর বেদনা এবং গভীর আশার কাহিনী, সে আর উত্থাপিত হইবার অবসর পায় না। চিরনবীন চিরপ্রবীণ প্রকৃতি তাহার নিবিড় রহস্যময় অসীম সৌন্দর্য লইয়া পূর্বের ন্যায় তেমনি ভাবেই চাহিয়া আছে,চারি দিকে সেই শ্যামল তরুপল্লব, কালের চুপিচুপি রহস্যকথার মতো অরণ্যের সেই মর্মরধ্বনি, নদীর সেই চিরপ্রবাহময় অথচ চির-অবসরপূর্ণ কলগীতি; প্রকৃতির অবিরামনিশ্বসিত বিচিত্র বাণী এখনো নিঃশেষিত হয় নাই; কিন্তু যাহার আপিসের তাড়া পড়িয়াছে, কেরানিগিরির সহস্র খুচরা দায় যাহার শাম্‌লার মধ্যে বাসা বাঁধিয়া কিচিকিচি করিয়া মরিতেছে, সে বলে–'দূর করো তোমার প্রকৃতির মহত্ত্ব, তোমার সমুদ্র ও আকাশ, তোমার মানবহৃদয়, তোমার মানবহৃদয়ের সহস্রবাহী সুখ দুঃখ ঘৃণা ও প্রীতি, তোমার মহৎ মনুষ্যত্বের আদর্শ ও গভীর রহস্যপিপাসা, এখন হিসাব ছাড়া আর-কোনো কথা হইতে পারে না।' আমার বোধ হয় কল-কারখানার কোলাহলে .. বিশ্বের অনন্ত সংগীতধ্বনির প্রতি মনোযোগ দিতে পারিতেছে না; উপস্থিত মুহূর্তগুলো পঙ্গপালের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে আসিয়া অনন্তকালকে আচ্ছন্ন করিয়াছে।"

শনিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৭

ভূতের গল্প ~ আরকাদি গাইদার

এটা একটা ভূতের গল্প।

গল্পজুড়ে অনেকগুলো ভূত। ১৮৮৬ সালে হে মার্কেটে আট ঘন্টা কাজের দাবীতে যে শ্রমিকরা ডাইনামাইট ছুড়েছিলো, এবং তারপর যাদের ফাঁসি হয়, সেই শ্রমিকদের ভূত, ডাইনামাইটের ভূত, ফাঁসির দড়ির ভূত। ঠিক ১৯ বছর পরে আবার সেই ডাইনামাইট ব্যাবহার হবে রাশিয়াতে। আবার ফাঁসির দড়িতে ঝুলবে বহু লোক।
ইউরোপের এক ছোট্ট শহর স্যারাএভোতে এক নৈরাজ্যবাদী গুলি চালাবে অস্ট্রিয়ান রাজকুমার ফার্ডিনান্ডকে লক্ষ্য করে। এইরকমভাবেই শুরু হবে বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সমাপ্তিও ঘটবে ঠিক ৮০ বছর পরে, এই একই শহরে। ইউটোপিয়া চেয়েছিলো যারা, তাদের দিকে আঙ্গুল তুলে হাসবে গোটা বিশ্ব। ইউগোস্লাভিয়া ভেঙে টুকরো হবে। ইউটোপিয়ার শবদেহের ওপর মেমোরিয়াল স্টোনের মতন জেগে থাকবে সারাএভোর ভূত।

শতাব্দীর শুরুর দিকেই, জার্মানিতে একদিন ব্রাউনশার্টরা পিটিয়ে মারবে রোজা লাক্সেমবার্গ নামক এক শীর্ণকায় মহিলাকে। তারপর তার দেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হবে। ওয়াইমার রিপাব্লিকের ভূত আকাশে উড়তে উড়তে দেখবে, রাইখস্ট্যাগে আগুন লেগেছে। যে রাতে আগুন লাগবে, তার পরেরদিনই বিভিন্ন খবরের কাগজে খবর হবে, যদিও আগুন লাগবার আগেই প্রেসে কাগজ ছাপা হয়ে গেছে। সেই আগুনের ভূত আবার জ্বলবে গ্যেরনিকায়, যখন ফ্রাঙ্কোকে সাহায্য করতে হিটলার আর মুসোলিনির বিমান বাহিনী গোটা শহরটিকে বোমায় মুড়ে দেবে, আর স্পেনের আকাশে উড়ে বেড়াবে কমিউনিষ্ট আর রিপাব্লিকানদের পোড়া ভূত। তবুও সেই আগুনের ক্ষিদে মিটবে না, আউশউইতজের ফার্নেসে সে জ্বলতে থাকবে ধিকিধিকি করে। আর ফার্নেসের বাইরের ঘরে পড়ে থাকবে ডাই করে রাখা চুল, যা ইহুদিদের মাথা থেকে কেটে জড়ো করা হয়েছে। ঠিক এরকম চুলের পাহাড় পাওয়া যাবে ইস্ট পাকিস্তানের পাকিস্তানি আর্মি ব্যারাকগুলোর মধ্যে। আশেপাশের গ্রামের মহিলাদের তুলে আনবার পরে দিনের পর দিন ধর্ষন করবার আগে তাদের চুল কেটে রাখা হবে, যাতে নিজেদের চুল ব্যাবহার করে ঝুলে পড়ে নিজেরা আত্মহত্যা না করতে পারে। 

গ্রীস, ইতালি আর ইউগোস্লোভিয়ার পার্টিজান ব্রিগেডের হাতে যে রাইফেল দেখা যেতো, ঠিক সেইরকম রাইফেল দেখতে পাওয়া যাবে তেলেঙ্গানার কৃষক রমণীদের হাতে। তাদের ট্রেনিং দেবেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি থেকে পালিয়ে আসা মেজর জয়পাল সিং। তারপর নিজামের রাজাকার আর পটেলের সেনাবাহিনীর হাতে খুন হয়ে যাওয়ার পর সেই রাইফেলের ভূতগুলো ঘুমিয়ে থাকবে বেশ কিছুদিন, যতক্ষন না আবার ভিয়েতনামে আধপেটা খেয়ে থাকা চাষীরা তাদের হাতে তুলে নেয়।

জার্মানিতে, ফ্রান্সে দুই আর তিনের দশকে রাস্তা জুড়ে যে মিছিল আর ব্যারিকেড দেখা যেতো ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে সেই মিছিল আর ব্যারিকেডের ভুতগুলো এলোমেলো হয়ে ঘুরে বেড়াবে ১৯৬৮ অবধি, যখন আবার একদল ছাত্র তাদের জীবন্ত করে তুলবে বার্লিন আর প্যারিসের ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে। 
বার্লিনের দেওয়াল ভেঙে ফেলবার পর স্যুভেনির হিসেবে ইটগুলো সংগ্রহ করবে বহু কালেক্টর। দেওয়ালের ভূত দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। ইটগুলোর ভূতেরা ছত্রাখান সেনাবাহিনীর মতন ছড়িয়ে পড়বে ইউরোপ থেকে সারা পৃথিবী। ইউটোপিয়ার ভুত হাসবে, কারন নিজের অদৃষ্ট সে বহুদিন আগে বুঝেছিলো, যখন তার দেহথেকে পচা গন্ধ বেরোতে শুরু করেছে। কিন্তু দিশেহারা ইটের ভূতগুলোও সবাই শেষ হয়ে যাবে না। 
এরকমই একটা ইট ছোড়া হবে পুলিশকে লক্ষ্য করে, আমেরিকার সিয়াটেল শহরে বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার সামিটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে। 

এরকম বহু ব্যারিকেড, মিছিল, ইট, বুলেট, দেওয়াল, আগুন, কবিতা গানের ভূত উড়ে বেড়াবে পৃথিবীর আকাশে। মাঝেমধ্যে উঁকিঝুকি মারতে থাকবে হাউড পার্কে, কুর্দিস্তান, শাহবাগ চত্বরে।

তারপর অনেক অনেকদিন পরে কোন এক পয়লা মে'র আগের রাতে, নিজেদের বন্ধ দরজার পেছনে নিশ্চিন্তে ঘুমোবে সব রাষ্ট্রনেতা, মিলিটারি জেনারেল, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মালিক,  পাদ্রী, ইমাম, পুরোহিতরা। বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। হাওয়া বইবে মৃদু তালে। হয়তো চাঁদ ঢাকা পড়বে মেঘের আড়ালে।
তারপর খুব মন দিয়ে কান পাতলে শোনা যাবে, কারা যেন ফিসফিস করছে। রাস্তায়, গলিতে, ডকে, কারখানায়, জনমানবশূন্য নদীর তীরে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকবে ভৌতিক সমাগম। ফিসফিসানির আওয়াজ তীব্রতর হবে। শোনা যাবে পায়ে পা মিলিয়ে কারা যেন মার্চ করছে। নিঃশ্বাস ফেলছে। গান গাইছে। কোন এক পয়লা মে'র আগের রাতে ভৌতিক কাগজে, ভৌতিক কালিতে পৃথিবীর প্রতিটা মহাদেশে, প্রতিটা শহরে, প্রতিটা গ্রামে দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটা হবে ভৌতিক পোস্টার। অশরীরী অক্ষরে কারা যেন তাতে লিখে যাবে -  ইউটোপিয়া।

বৃহস্পতিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১৭

অমিতাহারী ~ শুভদীপ ঘোষ জয়

নাহয় আমি গেলাম
শূদ্র বাড়ি খেলাম
দশরথের ব্যাটার মতোন
শম্বুক - যে গোলাম
তাকে তুলে দিলাম জাতে
সব ছবিতে লটকে থাকলো
আমার সাথে সাথে

আগেও আমি গেছি
ফুলিয়ে আমার পেশী
রামের নামে কুরবানিতে
বান্দা রাশি রাশি
আমি কাটতে ভালোইবাসি

তাই
আবার আমি যাবো
লোকজন উসকাবো
জীবের আমি জীবন নেবো
এবার কৃষ্ণ হবো

আছে অনেক গুন
বধ 
করিবে অর্জুন
মারবে এবং মরবে নিজে
যে রক্তে ওই খুন
মিলে ভাসতে ভাসতে যাবে
বিপুলস্রোতা হবে
তার ধারেতেই
পূন-
পূনঃ গড়বো বৃন্দাবন
মরুক মানুষ
বাঁচুক গরু
এটাই
হিন্দুজাগরন

রবিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৭

লেনিন ~ অবীণ দত্তগুপ্ত

আজ সকালে দেখলাম কে একজন লেনিন লিখতে লেলিন লিখে ফেলেছেন । তা নিয়ে খুব হাসাহাসি । তাই লেনিনের বদলে একটা লেলিনের গল্প বলি । অশিক্ষিত গল্প । 

আনোয়ার মণ্ডল , বাড়ি ডায়মন্ড হারবার , বাঘাযতীনে রিক্সা চালান । আমার সাথে প্রথম দেখা ২০১১-র এপ্রিল মাসে । নির্বাচন চলছে তখন । কোন একটা মিছিল থেকে বাড়ি ফিরছি , হাতে একটা লাল টুপি ছিল । রিক্সায় ওঠার পর ঘাড় ঘুরিয়ে বলেছিলো , "এবার হবে নি বাবু । " আমি তর্ক জুড়লাম ,বাড়িতে নামিয়ে বলেছিল " আপনেরে শিক্ষিত মানুষ ,অনেক কিছু জানেন । কিন্তু এবার হবে নি বাবু । হলে আমি খুব খুশি হই । কিন্তু হবে নি । " 

তারপর থেকে অনেক দিন-ই দেখা হয়েছে । যা জেনেছি তার মোদ্দা কথা হলো আনোয়ার কাকু একদম আগ মার্কা সি পি আই এম । গত প্রায় বছর খানেক হয়ে গেল , দেখা হয় না । একদিনের কথা মনে পড়ছে ,সেটা জানাতেই এই গৌরচন্দ্রিকা । বছর দুয়েক আগের কথা ,সে দিনও আজকের মতোই ২২শে এপ্রিল । যাদবপুরের ভাঙ্গা লেনিন মূর্তির জায়গায় , নতুন মূর্তি উদ্বোধন হয়েছে , দুপুরে বাড়ি ফিরছি - আনোয়ার কাকুর রিক্সা । বাড়ির সামনে নেবে ১০টাকা ভাড়া দিলাম । আনোয়ার কাকু একটাটাকা ফেরত দিল  সাথে একটা ৫০ পয়সার লজেন্স । "এটা কি ? "  স্বাভাবিক প্রশ্ন । উত্তর এলো - "আজ লেলিন বাবুর জন্মদিন নে । তুমি দলের নোক , খাও ।" একটু মধ্যবিত্তসুলভ সুপিরিয়োরিটি কমপ্লেক্স থেকে জিজ্ঞেস করলাম , " লেনিন কে জানো ?" আরও অবাক করে উত্তর এলো - "ক্যানে আমাদের জমি দেছিলো !!" আনোয়ার কাকুকে দেখে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল ,আমার এরূপ অজ্ঞানতা তাকে অবাক করছে । তবুও খুচালাম , " লেনিন তোমাকে জমি দিয়েছিলো ? লেনিনের দেশ কোনটা জানো ? লেনিন অনেক দিন হল মরে গেছে । " এবার খ্যাক করে হেসে উত্তর দিল - "সে তো জ্যোতি বাবুও মরে গেছে , প্রভাস বাবুও মরে গেছে ।" 
আমার ঈষৎ হতভম্ব ভাব দেখে আনোয়ার বলে চললেন " তুমি জানো না ,জন্মাও নাই কিনা । লেলিনবাবু জ্যোতিবাবুর পার্টির নেতা ,লাল পার্টির নেতা , আমাদের প্রভাস রায়ের নেতা । আমাদের জমি দিয়েছিল লাল পার্টি । সেদিন লেলিনবাবুর কথা বলেছিল বাবু মন্ডল । বাবু মণ্ডল আমার কমরেট্‌, তুমি চিনো না । বাবুদাও মরে গেছে সে বছর তিন হলো । বাবুদা বলেছিল , লেলিনবাবু শিখাইছে জমির লড়াই ,পেটের লড়াই । লেলিন বাবু অনেএএক বড় নেতা । দেখো না ক্যানে , জ্যোতিবাবুর মূর্তি নাই , লেলিনের আছে । কতোখান বড় নেতা হলি ,তবেই না মরে যাওয়ার এদ্দিন পড়েও উরা ওনার মূর্তি ভাঙ্গে । " 

অতঃপর প্যাডেলে চাপ দিয়ে , লেলিনের দলের নোক আনোয়ার মন্ডলের প্রস্থান ।

বৃহস্পতিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৭

হাজতবাস ~ ফ্যাতারু বজরা ঘোষ

কে য্যানো বলেচিল, বীরের মত ঢুকচি, রাজার মতো বেরুবো, শিবিয়াই কিচ্চুটি কত্তে পাব্বেনা। ... মানে জেলে যাচ্চে খোকারা! উহ, কি তড়পানি শালা। ভাবখান এই য্যানো যতীন দাস কি সুয্যসেন জেলে ঢুকচেন! ও: করেচিস তো চুরিচামারি, য্যানো বিটিশ পিটিয়েছে। শালা, রগড় দেকে ভালই লেগেচিল। তা ভাবলুম, দম যখন আচে, নাহ এ ছেলে ছিঁড়ে দেকাবে! ওমা...

"কপাল আমার বক্ত (মন্দ)
শক্ত দেকে ভাতার নিলাম
হাগে শুদু রক্ত"

তাল ছেঁড়ার খ্যামতা নাই বাল ধরে ঝুলোঝুলি। একন কেঁদেকেটে একশা। আরেক মাল, গাবদা বডি, তিনটে বাঘে খেয়েও শেস কত্তে পারবেনা। বাংলা শিনেমায় নাম ছিল ঢ্যাপোস মতান্তরে আলুসেদ্দ, সেও কাঁদচে। দিদি বাঁচাও, শুকিয়ে যাচ্চি।
জেলের ভাত, লপসী কি জিনিস সে কুনাল বুজে গ্যাচে। গাদাখানিক আই পিল খেয়ে সুইসাইড নাটক কত্তে গেচিল, পেট খালাস করে হেগে মুতে ছড়িয়ে মাট ময়দান। লোকে খিল্লি কচ্চে। একন দেকলাম বই লিকেচে... 'বোন্দিজীবন'। ওই কলেজ ইস্কোয়ারের কোনায় ফ্রিতে মুততে গিয়ে দেকি বোইমেলা হচ্চে, হিসুর লাইন বড় ছিল ভাবলাম এট্টু দেকি একানে কি হচ্চে! লাডূ ফাড্ডু যদি মাগনা মেলে। ওরে সাঁটি এযে বোইমেলা! তকনই দেকলাম তাক আলো করে কালচে মলাটের দুম্বা সাইজের বোই। বোন্দিজিবন। নীচে লেকা কুনাল ঘোস।
বিক্কিরি হতে দেকলুমনা তবে একজন বুদ্দিজিবি পাস থেকে আরেক ঝিংকু শিস্যাকে বললো কুনাল ঘোস অমুককে মনে কোরিয়ে দিচ্চে! আমি সুদোলাম কি নাম বললেন দাদা?
লোকটা অবজ্ঞা নিয়ে বল্লো গ্রামচি, গ্রামচি। নাম সুনেচেন?
হেভি ভেবড়ে গিয়ে বললাম ইয়ে সুনেচি বলে মনে পড়চেনা, পুরো নামটা যদি দাদা বলেন...
আন্তোনিও গ্রামচি।
'আনতো নিয়ে ঘামাচি?'
লোকটা আমায় আকাট চাষা ছাড়া কিচুই ভাবলেনি। হেব্বি দামি পাঞ্জাবি পরেচে অতচ বিড়ি খেতে খেতে চলে গ্যালো
:(
এদের শিগারেট কেনার পয়সা থাকেনা?

আমার জিবে এসব উচ্চারন আসেনা। সেই ভানু বাঁড়ুজ্জ্যে কে তার ভাগ্নে ন্যাপলা বলেচিল না 'মামী হচ্চেন জোয়ান অব আর্ক'
ভানু বললেন জোয়ানের আরক?
ভাগ্নে যত শোধরায়, মামা কন 'আমার কানে দুইটা একই সুনায়'
আম্মো তাই।

হচ্চিল জেলের কতা, কি টেনে ফেল্লুম!
আমিও এট্টা বই লিকবো। সবাই লিকচে, ছাপাচ্চে। নাম ফাটচে।
আমার বই এর নাম হবে হাজতজীবন
মানে জেলে যাইনি কিনা। হাজত অব্দি দৌড়, তাও পাঁচ আইন কেশে। (পাঁচ আইন যারা বুজবেননা তাদের জন্যে পেটি কেস বলচি) রাস্তায় বাংলার পাউচের দর করচিলুম পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। শালা চুল্লুওয়ালা ছিল গাচ হারামি। বলচে ওর মালের দাম বেসি কারন খেয়ে পটকে যাওয়ার চান্সো আচে। আর পটকালেই দু লাক। ক্যাস!
ব্যাস।

ফ্যামিলি দু লাক পাবে এই ভেবে কেউ বেসি দামে চোলাই কেনে? কে বোজাবে?
তবে পুলিশ বাটাম দেয়নি। সুদু বলেচিল ভদ্দোলোক বলে তো মনে হচ্চে ক্যানো খান?
বললাম দু লাক পাওয়ার ধান্দায়। সাব ইনিস্পেক্টার টা খেঁকুরে বুড়ো। সে সালা এমন জবাব পাবে ভাবেনি। ষাঁড়ের বিচির মতো চোকের মনি নিয়ে তাকালো তাপ্পর সোজা হাজতে পাটালো। দেকলাম পলেস্তারা খসা দেওয়ালে কত্ত কি লেকা। 'মালতি আই লাব ইউ' নেতাজি ফিরে এসো, সিবদাস ঘোস জিন্দাবাদ, ওসির মা কে..., হাবিলদার সন্তোষের বোনকে.... ছ্যা ছ্যা। তবে একজন কবিতা লিকেচে। বেস ভাল।

দারোগার ভুরু
চামেলির উরু
দুটোই মোটা,
ভিকিরির পেট
গরাদের গেট
দুটোই ছোটা।

রমনীর মন
আর কালা ধোন
দুইই পাওয়া দায়,
ভুঁইয়া মানোস
মেনে গ্যালো পোষ
অধীর চ্যাঁচায়।

চাম্পি না? টুকে এনেচি তাই।
এসব পড়ে বুজলাম। জেলে গেলেই ক্যানো লেকা পায়। হাগা পাওয়ার মত লেকা পায়। দেশি আমাসার মত হড়হড়িয়ে নামে, কবিতা, গান। এই কদিনের পালদা আর বাঁড়ুজ্যেদা কি কিচু নামালো? বই হয়ে বেরুলে পরবো। তারপর আমিও লিকবো। হাজতজীবন।

জাতপাত ~ সুব্রত ঘোষ

আমরা সদগোপ। হিন্দু মতে শূদ্র। সৎ শূদ্র। গোয়ালা ঘোষ না, চাষা ঘোষ। এসসি ওবিসি নয়, জেনারেল। 'চাষা যে রাস্তায় হাঁটে দশ বছর সে রাস্তায় হনুমান হাঁটে না'- শুনে বড় হয়েছি। তারাশঙ্করের লেখায় পড়েছি, বামুন বাড়ির মেয়েরা বলছে খাবারগুলো ফেলিস না, সকালে সদগোপদের বাড়ির মেয়েদের দিয়ে দিস। ট্র্যাডিশনাল হিন্দু মতে ছোট জাত। গোটা গ্রামটাই সদগোপদের হওয়ায় জাতপাতের ভেদ আম্বেদকরের মত হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি এমন নয়। তবে কিছুটা দেখেছি। বাগদী দুলে মুচি মাহাত পরামানিকরা পাশে থেকেও যে আমাদের চেয়ে নিচু জাতের এমন একটা ধারণা অবচেতনেই তৈরি হয়েছিল দেখে দেখে। কেননা ওরা উঠোন থেকে দুয়ারে ওঠে না, ঘর তো দুরস্থান। কাজ করার সময় ঢুকতে পারে ঘর মুছতে। বাসন মাজতে পারে। কিন্তু একাসনে খেতে পারে না। ওদের থালায় বা হাতে কোন জিনিস একটু উঁচু থেকে ছেড়ে দিতে হয়। খেঁদি বাগদীর বাড়ি আমাদের বাড়ির দশ হাত দূরে। সে ভিক্ষা করেই দিন কাটাত। মাঝে মাঝে দুপুরে খেয়েও যেত বাড়িতে। বয়স হয়েছিল। জল নিতে এলে মা কল পাম্প করে দিত। তখন আমাদের বাড়ির কাজের লোক বলতে ছিল জয়ন্তীদি। একদিন মা ঠাকুরঘরে ব্যস্ত, খেঁদিপিসি এল জল নিতে। তখন জয়ন্তীদি কল পাম্প করে দিতে গেলে সে বলল 'আমি জল নেব না দুলের হাতে।' কেননা দুলেরা নাকি বাগদিদের চেয়েও ছোট জাত। আমাকেই সেদিন কল পাম্প করে দিতে হয়েছিল। অনেক ছোটবেলায়, টু থ্রিতে পড়ি, একদিন ঘোষেদের বাড়ি নিমন্ত্রণ খেতে গেছি। একটা সারিতে বসেছি বন্ধুরা। টেনে তোলা হল আমাদের কয়েকজনকে। বাগদী সাঁওতালদের ছেলেরাই তখন আমার সহপাঠী। বামুন, সঞ্জয়, নিতাই, টিপু। ঐ সারিতে নাকি ব্রাহ্মণরা বসেছে কয়েকজন। বাচ্চা ছিলুম। বুঝিনি। দিব্বি অন্য সারিতে সবাইমিলে খেয়ে চলে এসেছি। বাবার ছোটবেলায় নিয়ম ছিল ভোজ বাড়িতে ব্রাহ্মণে রান্না করবে, ব্রাহ্মণে পরিবেশন করবে। ব্রাহ্মণরা খেতে বসে অনুমতি দিলে অন্যরা বসতে পেত। অনুমতি নিতে হত গ্রামের মোড়লের কাছ থেকে। এখন শুধু প্রথাটা শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ে টিকে আছে। এক টেবিলে বসে বামুন বাগদী খাওয়াটা পরিচিত দৃশ্য। কেউ কাউকে উঠিয়ে দেয় না। তবে অনেকে লোক দেখেই বসে। মানে জাত দেখে। স্কুলে অঙ্গনয়ারিতে খাবে খাবে না করে অধিকাংশই খাচ্ছে। সময় অনেক বদলে গ্রামের পাশে রিলায়েন্সের ফোর জী টাওয়ার বসেছে মানে এই নয় যে আত্মীয় কুটুম্ব পাতাতে শুরু করেছে বামুনে বাগদীতে। তিন দশক আগে সদগোপ ও ব্রাহ্মণ পরিবারের এমন একটি প্রণয় ঘটিত বিয়ের পর গ্রাম ষোলোআনায় মিটিং ডেকে ভট্টাচার্য মশাইকে অনুরোধ করা হয়েছিল জামাইকে স্বীকার করে নিতে। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। জাতের নামে আমরা আলাদা ছিলাম, আলাদাই আছি। সৎ শূদ্রদের মধ্যে কুমার, রায় প্রমুখরা সবচেয়ে উঁচু। কুলিন শূদ্র । এর পরে মিত্তির ঘোষ বোস। শিক্ষিত শূদ্র। কলমে কায়স্ত চিনি/ গোঁফেতে রাজপুত- প্রবাদ ছিল না! তাদের অনেকের পরে আমরা সদগোপরা। তারও পরে 'সানা পানা রাণা/তিন থাকতে মানা।' তারও পরে নাকি বাগদী দুলে ডোম মুচি মেথর ইত্যাদি ইত্যাদি। বামুনদের মধ্যেও ভেদ দেখেছি। পূজারী ব্রাহ্মণরা নাকি নিম্ন শ্রেণীর। অগ্রদানী ব্রাহ্মণরা আরও নিচু। পিণ্ড ভক্ষণ করে কিনা তারা। আরও ভেদ দেখতে চাইলে পাত্র পাত্রীর বিজ্ঞাপন দেখুন আনন্দবাজারে। অনেককাল আগে একবার এই বিষয়ে এক তর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলুম চতুর্বর্ণ বিভাজন ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার ব্যাপারে হিন্দু হিসেবে গর্বিতরা ঠিক কি ভাবছে!! কোন উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেছিলেন বিপক্ষের বন্ধু। এই প্রশ্ন আমার আজও। কোটি কোটি হিন্দু যারা প্রতিদিন জানে যে তারা ছোট জাত, তারা কেমন করে গর্বের সাথে বলবে তারা হিন্দু? সামাজিক ভেদ দূর না করে হিন্দু হিসেবে গর্ব বোধ করা এক ধরণের মুর্খামি। একজন ব্রাহ্মণ বলতেই পারেন তিনি হিন্দু হিসেবে গর্বিত। কারণ এই ব্যবস্থায় তিনিই সবচেয়ে বেশী উপকৃত। আমি বলতে পারি না। কারণ আমি এই ব্যবস্থার শিকার। 

মন্দির নিয়ে একটি নিরামিষ গল্প ~ পুরন্দর ভাট

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে পুরীর মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া নিয়ে ক্যাচাল বেধেছিল। সম্ভবত মিটেও গেছে। ইন্দিরা গান্ধীকে অতীতে এর আগে এই নিয়মের (বা বেনিয়ম) সম্মুখীন হতে হয়েছিল কারন তার বৈবাহিক সম্পর্ক পান্ডাদের পছন্দ হয়নি। স্বাভাবিক। খাপ পঞ্চায়েত আর কাজীর ক্যাঙারু কোর্টের দেশে তেনাদের ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে হবে। এবসলিউট ক্ষমতার অধিকারিণী ভারতেশ্বরী পর্যন্ত পাত্তা পাননি তো, ছোটখাটো নেতা নেত্রী কোনসা ইয়ে, মানে কোউন ক্ষেত কি মুলি?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বা শ্রীমতী ইন্দিরার রাজনীতির চুড়ান্ত বিরোধী হলেও যেকোনো গণতান্ত্রিক মানুষ এই ধর্মীয় পাকামি ও জগদ্দল নিয়মের নিন্দা করবেন। (অবশ্য এক্ষেত্রে সত্যিই ঢুকতে দেওয়া হয়নি এমনটা নয়, একটু গোলযোগ বেধেছিল, সেটা বিরোধীরা গট আপ বলে সন্দেহও করছেন  ;) ) 
যুগ যুগান্ত ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। ঈশ্বর রুষ্ট হবেন কিনা জানা নাই কারণ ঈশ্বর তো ঠুঁটো জগন্নাথ, আক্ষরিক অর্থেই ঠুঁটো। যেমত আল্লাতালাও। তার নিজস্ব ক্ষমতা বলে কিস্যু করবার নাই। পান্ডা মৌলবীদের জন্যে স্বর্গে বসেই তিনি টেন্ডার ডাকেন। এবং বানী দেন এই এই করিতে হইবে। এক পা পিছিয়ে দুই পা আগাইবে, ইত্যাদি। এই মসজিদে কাফের যেতে পারবেনা, সেই চার্চে ঋতুমতী মেয়েরা ঢুকতে পারবেনা, ওই মন্দিরে অন্তজ শুদ্রের প্রবেশ নাই.... ইথার তরঙ্গ বাহিত হয়ে ধর্মগুরুদের কানে বাণী আসে। প্রভু আলো দেখিয়েছেন। প্রয়োজন হলেই তিনি দেন। শুধু টাওয়ার টা আসা চাই। ধর্মগুরুরা দরকার হলেই তাকে টেনে নামান। ডেকে পাঠান। মহম্মদ তো প্রায়ই ডাকতেন। ;)

ঈশ্বর যে ঠুঁঠোই নয় স্রেফ ধ্বজভঙ্গও তা প্রমান করে দিয়েছিলেন কালাপাহাড় স্বয়ং। একধার থেকে পাণ্ডা, পুরোহিতদের কেলিয়েছেন, মন্দির পেলেই হাতুড়ি চালিয়েছেন। হিন্দু মন্দির ভাঙার পেছনে অবশ্য মহান আদর্শ বা লুঠের উদ্দেশ্য ছিলনা (তার সাকরেদরা যথেচ্ছ লুটমার করেছেন)। তিনি এসেছিলেন তীব্র প্রতিশোধস্পৃহায়। কালাপাহাড় যে উচ্চ ব্রাহ্মন ঘরের শিক্ষিত সন্তান ছিলেন ঐতিহাসিক সত্য। সুতরাং ওই বাবর, ঔরংজেবের মতো এক গোত্রে ফেলাও যাচ্ছেনা। :) সেদিন পুরীর পান্ডাদের কি হাল হয়েছিল ইতিহাস সাক্ষী। জগন্নাথের ঠিকাদারেরা মাথায় টুপি পরে, চোগা চাপকান বোরখা পরে, কেউ কেউ হয়ত নুনু কাটিয়ে জান বাঁচিয়েছিল। ধম্মো ফম্মো মাথায় থাক।
বলি, উপাচার, ধুপ, দীপারতি রসাতলে বিসর্জন দিলেও দেবতার ঘুম ভাঙেনি। ভগবান প্রাতঃকৃত্যর টাইমটুকু পাননি। ঝেড়ে দৌড় দিয়েছিলেন।

সকলেই জানেন নিয়ম কানুন কারা বানায়। অলঙ্ঘ নিয়মকেও কলা দেখিয়ে দেন কালাপাহাড়রা। শুধু বুকের পাটা থাকা চাই। ধর্মদ্রোহ মানে গোমাংস বা শুকরমাংস ভক্ষন নয়। আমার কতিপয় বন্ধু অভিযোগ করেন আমি অতীতচারী। কিছু বলতে গেলেই উদাহরণ হিসেবে অতীতে, কবেকার কোন আমলে কি ঘটেছিল টেনে আনি। সেই অভিযোগ ঘাড়ে নিয়ে একটা গল্প বলা যাক। বন্ধুরা একটু ধৈর্য ধরে পড়বেন। মন্দিরে প্রবেশের গল্প। গল্প নয়, বাস্তব ঘটনা।

১৯৪৩ এর শেষার্ধ, আজাদ হিন্দ ফৌজের সদর দপ্তরে বসে নেতাজী কাজ করছেন। দিবারাত্রি পরিশ্রমের ফাঁকে বাইরের কারো সাথে দেখা করার সুযোগ থাকেনা।
এমনি এক দিনে ব্রিজলাল জয়সওয়াল এলেন দেখা করতে তাঁর সাথে। ব্রিজলাল সিঙাপুরের ধনিক ও বনিকশ্রেষ্ঠ। তিনপুরুষ ধরে বর্মা মুলুকে ব্যবসা। আদতে তারা গুজরাটি চেট্টিয়ার ব্রাহ্মণ।
বৃদ্ধ ব্যবসায়ী এসেছেন ফৌজি অর্ডার সাপ্লাইয়ের কথা বলতে। নেতাজী তার কাছে সবিনয়ে একটি আর্জি রাখেন তা হলো অনুদানের। আজাদ হিন্দ ফৌজের ফান্ডে একজন প্রবাসী ভারতীয় হিসেবে এটুকু কি তিনি করবেননা? ব্রিজলাল জানালেন নিশ্চই দান করবেন তিনি। ঠিক তিনি নন, খ্যাতনামা চেট্টিয়ার মন্দির পরিষদই তা দেবে। দেশের স্বাধীনতার জন্যে বুকের রক্ত দিয়ে যারা লড়ছে তাদের এটুকু প্রাপ্য। কিন্তু তিনি চান নেতাজীর জনপ্রিয়তা কে মূলধন করতে। সিংগাপুর প্রবাসী হাজার হাজার ভারতীয়দের চোখে বীর সুভাষচন্দ্র বসু যদি তার মন্দিরে বা ব্যবসাক্ষেত্রে পদধুলি দেন তাহলে.....
নেতাজী বেঁকে বসলেন 'আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক হিসেবে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মন্দিরে যাওয়া তার শোভা পায়না' সুভাষ বোস আর নেতাজি এক ব্যক্তি নন।
ধনকুবের ব্রিজলাল চান তিনি ফৌজি পোষাকেই আসুন, নেতাজীর বেশে, তিনি টাকাটা সর্বসমক্ষে মন্দির চত্বরে দিয়ে দেবেন। আরো চমৎকার হবে নাকি বিষয়টা?
নেতাজী শর্ত রাখলেন তিনি যাবেন তবে সংগে থাকবে শিখ, মুসলিম, খৃষ্টান সহযোদ্ধারা। সবাই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত সৈনিক। এই একটা জায়গায় সকলেই এক।
ব্রিজলাল চুড়ান্ত অসম্মতি দিয়ে জানান দুশো বছরের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যময় চেট্টিয়ার মন্দিরে বিধর্মী কেউ পা রাখেনি! এ সম্ভব নয়। হিন্দু ছাড়া ফটকের ভেতরে কেউ যেতে পারেনা, ব্রাহ্মন ছাড়া ভেতরে গিয়ে দেবদর্শন বারণ, আর পুরোহিত ছাড়া কেউ গর্ভগৃহে প্রবেশ করেনি এযাবৎ!
নেতাজী পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, তাহলে মন্দির কমিটির সাথে ভাল করে আলোচনা করে আসুন ব্রিজলালজি। (১৯৪৩ সালে ব্রিজলাল দান করতে এসেছিলেন সাত লক্ষ টাকা! এখনকার হিসেবে কত হতে পারে?)

পরের দিন ফিরে এলেন ব্রিজলাল। সংগে আরো কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা রাজী হয়েছেন! নিমন্ত্রণ করতে এসেছেন নেতাজীকে। সাথে বাকি সহযোদ্ধা দেরও।

দুশো বছরের সংস্কারকে ছিন্ন করে সিংগাপুর চেট্টিয়ার মন্দির সেদিন খুলে গেল বিধর্মীদের জন্যে!
সিঁড়ির পাশে সুভাষ চন্দ্র বোস খুলে রাখলেন তার মিলিটারি বুট, পাশাপাশি নিষ্ঠাবান খৃষ্টান আইয়ার, ধার্মিক মুসলিম জামান কিয়ানী আর হাবিবুর রহমান।
সুভাষচন্দ্র বোস একজন কালাপাহাড়। জগদ্দল পাষাণ কে আঙুলের টোকায় ঝেড়ে ফেলে দেওয়ার হিম্মৎ দেখিয়েছিলেন পরাধীন, ধর্মনিগড়ে বাঁধা সংস্কারাছন্ন সমাজে।

(কৃষ্ণমাচারী ভাস্করণ, নেতাজীর স্টেনোগ্রাফারের বয়ানে)

চৈতন্যদেবের লাশ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে পুরীর মন্দিরের আসেপাশেই।
অসংখ্য দেবদাসীদের কান্না, ঘাম, রক্ত মিশে আছে পাথুরে দেওয়ালে গাঁথনিতে।
এমন মন্দিরে ঢুকে পূণ্য?

বুধবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৭

হারাধনীর সংসার ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী



হারাধনীর তেরোটা ভাই হাতিয়েছিল টাকা 
সবার চিত্র ফুটেজ করে রেখেছে হুল কাকা। 

টাকা দারুণ মুখরোচক, এবং উপাদেয়
কাজে কাজেই…  দেশের জন্য…  দু'হাত মেলে চেয়ো। 

হাপুসহুপুস গিলবি টাকা, ভরিয়ে ফেলে অন্ত্র।   
বদহজমটি ঘটলে রটাস… এ'সব ষড়যন্ত্র। 

দেশের সেবা? সবাই জানে ওইটি উপলক্ষ্য। 
অর্থ উপার্জনেই লেখা রাজনৈতিক মোক্ষ। 

পড়লে ধরা করবি প্রচার…  ভিডিও সব জাল 
যদ্দিন না কাবার্ড থেকে বেরোচ্ছে কঙ্কাল। 

এবং তখন পাল্টাবি সুর… সবাই নাকি জানত 
উৎকোচ নয়, এ'সব টাকাই নিছক অনুদান তো। 

কে নেই সামিল? মন্ত্রী-সান্ত্রী। মহামহিম নেতাও।  
হারাধনীর আদেশ ছিল দলকে ভোটে জেতাও। 

কেউ গিলেছেন টাওয়েল মুড়ে প্রাতরাশের বেলায় 
বন্দরে এক হাঙর খাচ্ছে দারুণ অবহেলায়। 

ফিজিক্স-টিচার গিলছে টাকা।  মুখে কি? লজ্জাই।   
বেজায় কেতার একটি নেতার ও'সব বালাই নাই। 

ভীতুর চিন্তা… বিষবৃক্ষের ফলটি এ'বার ফলবে। 
আশায় থাকে, মিছিল করে দল যা' বলার বলবে। 

তাদের সাফাই দল জানে সব। আমরা নিছক সভ্য। 
অন্যে বলে কোর্ট কাছারি… করব না মন্তব্য। 

অপরূপ এক মিচকে চেঁচায়… ভুল করেছিস অঙ্কে 
ভুললি কেন করিতকর্মা দুই দু'খানা বোনকে? 

একখানি ভাই আমলা-কোটাল, বিশাল নাকি মাইনে, 
হাই তুলে কয়, ঘুষ পেলে আর অন্য কিছুই চাইনে। 

নাচিয়ে ভুরু এক ভাই কয় ব্যাপার ভারি আইনি। 
সেটিং হলেই প্রমাণ হবে, আমরা কিছু খাইনি।  

নারদ নারদ… সামনে গারদ। হারাধনীর চিন্তা … 
সংখ্যাটা ওই তেরোই…  নাকি বাড়বে পরের দিন তা?

সেটিং বাসনা ~ অরুনাচল দত্ত চৌধুরী



আকাশ মেঘলা, মন বিষণ্ণ,
দামাল ভাইরা তোদেরই জন্য।
চির পবিত্র চৌর্যকার্য।
ইথে ক্যামেরাটি ছিল কি ধার্য? 
আমি ক্ষীর খাই নিট পরিপাটি
ভাই তোরা শুধু চেটেছিস বাটি।
কবি কল্পনা দিয়েছি উস্কে
অনুদান বলি সমূহ ঘুষকে।
সেই তোদেরকে এত হেনস্থা
দেশে আইন নেই? এতই সস্তা?

যে যাই বলুক আনিনি গ্রাহ্যে
পুকুরচুরির এ সাম্রাজ্যে
টেটএ ফেটে যাওয়া পেছন-রত্নে
সততার ক্রীম লাগাই যত্নে।
কাটছি পকেট লুটছি ফায়দা
টেরটি পাবে না, এমন কায়দা।
চাল-সাইকেলে নানা বিভঙ্গে
ভোট মস্করা খেলছি রঙ্গে।
চুরির অর্থে ভরেছে ভাণ্ড
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড  ! 

এরই মাঝে ছায়া। ভারি বিপত্তি।
এফআইআর? দাদা পারিসও সত্যি!
হুকুমটি দিলে দাদা নরেন্দ্র,
নাকে খত, বাদ রাজ্য কেন্দ্র।
মেরুকরণের তুমুল অঙ্কে
কাঁপাবো বাংলা নয়া আতঙ্কে।
অ্যাপেলো কুঠিতে সে কী যে কান্না
প্রাণ কেঁপে গেছে। আর না! আর না!
গোয়াল ভর্তি ভাইএর জন্য
সেটিং করব… হোক জঘন্য।

শেষ সেটিংটি হবে অনন্য…
মেঘবালিকার নিজেরই জন্য।

সোমবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৭

চ্যাপলিন ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

সেলুলয়েড পর্দা জুড়ে
একটা মানুষ খেলার ছলে
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে
দিনবদলের গল্প বলে।।

মুখে কিছুই বলছে না সে
নীরবতাই মুখের ভাষা
একাই তিনি যুদ্ধ লড়েন
হাজার মানুষ, রঙিন আশা।।

ভাল মানুষ, মন্দ মানুষ
রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে
পথের মানুষ পথেই থাকে
হাজার হাজার বছর ধরে।।

তবুও তিনিই স্বপ্ন দেখান
চেনা টুপি,গোঁফ আর স্টিকে
পথ দেখাবেন অন্ধকারে
পূবের আকাশ হচ্ছে ফিকে।।

চার্লস চ্যাপলিন ( ১৬ই এপ্রিল ১৮৮৯- ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭৭)

বুধবার, ১২ এপ্রিল, ২০১৭

রামনবমী , মহরম ও সেকুলারিজম ~ শ্যামাপ্রসাদ কুণ্ডু

আমার কিছু বন্ধু অনুযোগের সুরে আমাকে বলেছেন কেন আমি রামনবমীতে অস্ত্রহাতে মিছিলের নিন্দা করে কিছু লিখছি না। তারা সেকুলারিজম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এ প্রশ্নও তুলেছেন যে মহরমের মিছিলে অস্ত্রহাতে যে উল্লাস দেখা যায় আমি তা সমর্থন করি কিনা। সন্দেহ নেই এসব প্রশ্ন সঙ্গত। আমি এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানি এমন দাবী করি না। জানিনা বলাই সঙ্গত। এইসব প্রশ্নের গভীরে ঢোকার আগে একটা সমীকরণের ব্যাপার বুঝে নেওয়া যাক। এক বন্ধুর বক্তব্যঃ মহরমে যদি অস্ত্র ব্যবহার সঙ্গত হয় তাহলে রামনবমীতে অস্ত্রহাতে মিছিল শোভাযাত্রা সঙ্গত কাজ। আপাত দৃষ্টিতে এই আংকিক যুক্তি অকাট্য। এ প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ল। কার কাছে শুনেছিলাম মনে নেই। গল্পটা এইরকমঃ এক ভদ্রলোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাজারে যাচ্ছিলেন।স্কুলের কাছাকাছি এসে তিনি একটি চেনা ছেলেকে দেখতে পেলেন। মনে পড়ল সেদিন বার্ষিক ফল বেরোনোর কথা। ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন ,’ হ্যাঁরে গনশা, আজ রেজাল্ট বেরিয়েছে?’ সে কথার উত্তর না দিয়ে গনশা বলল,’ তোমাদের প্যালাও ফেল।‘ বল্বাহুল্য গনশা পরীক্ষায় পাশ করে নি কিন্তু প্যালাও ফেল হওয়াতে তার দুঃখ খানিক কমেছে।‘ এই ধরণের যুক্তি আমি খুব ভয় পাই। সেজন্য এসব বিষয়ে লিখতে সাহস করি না। আমরা খুশি হতাম প্যালা ও গনশা দুজনেই ভাল করে পড়াশোনা করে পাশ করলে।

গনশা ও প্যালাদের সংখ্যাধিক্যের দেশে খোলামনে আলোচনা করার বিপদ পদে পদে। একটা যুতসই নঙর্থক বিশেষণে দেগে দেবে গনশারা। এ বিপদ তো আছেই সারাজীবন মাথার উপর ঝুলে ডেমোক্লিশের তলোয়ারের মত। তবুও কথার ডালপালা গজাক। ভাই নিখিল চক্রবর্তী সেক্যুলারিজমের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছে। আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় সেক্যুলার কথাটা সংযোজিত করা আছে। এর প্রকৃত অর্থ কি এবং বাসবে কিভাবে এই নীতি পালিত হয় সে আলোচনায় পরের পর্বে আসব। আপাতত রামনবমী সবিনয়ে দুচারটি কথা বলতে চাই। আমার ভুল হলে সহৃদয় পাঠক/পাঠিকা সংশোধন করে দেবেন। কোনো এক চৈত্রমাসে নবমী তিথিতে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রী রামচন্দ্র ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সে অনেক শতাব্দী আগেকার ধূসর অতীতের কথা। তিনি স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার আর অবতারের জন্মবৃত্তান্ত রহস্যাবৃত হওয়াটাই স্বাভাবিক। মহারাজা দশরথের সন্তান কামনা পূর্ণ হচ্ছিল না। তাই ঋষির নির্দেশে তিনি যজ্ঞ করেন। এর পরের কাহিনী এই রামায়ন-মহাভারতের দেশের সকলেই জানেন।খুব স্বাভাবিক কারণেই সেই সময়ে প্রজারা খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিলেন। তারপর গঙ্গাযমুনা দিয়ে কত যে জলস্রোত প্রবাহিত হয়ে গেছে তার ইয়ত্তা নেই কিন্তু প্রজন্মান্তরের মানুষের মনে রামসীতার কাহিনী পল্লবিত ও জীবন্ত রয়ে গেছে। আজও বিহার, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশ গড়, ঝারখন্ড এবং খোদ দিল্লীতে রামনবমী পালিত হয় আনন্দ, উল্লাশ ও নৃত্যগীতের সমারোহের মাধ্যমে। বাড়িতে বাড়িতে নানারকমের মিস্টান্ন তৈরি হয়, ভিয়েন বসে, অতিথির সমাগম হয়’ শোভাজাত্রা বার করা হয়, মেলা বসে গ্রামে গ্রামান্তরে। নতুন জামাকাপড় পরে বাচ্চারা আনন্দে মেতে ওঠে। রামের প্রশংসায় গীত রচনা হয়, গাওয়া হয় মহল্লায় মহল্লায়, গ্রামে গ্রামে। রামনবমী আসলে বিশ্বাসীদের কাছে এক অনন্ত খুশির উৎসব। বাঙালী হিন্দু ঐতিহ্যপরম্পরায় মাতৃপূজক। শক্তির উপাসক। চৈতন্য প্রভাবে ভক্তিরসে আপ্লুত হয়েছে কখনো। কিন্তু বাঙালী হিন্দু রামভক্ত নয় সেভাবে কোনোদিন। আমরা শিবের গাজন গাই ধান ভানতে, লাঠি খেলাও হয় কোথাও কোথাও কিন্তু রামভক্ত বলে বাঙ্গালীকে চিহ্নিত করা যাবে না। এ প্রসঙ্গ থাক। বলার কথা এই যে রামনবমী-র সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মিছিল শোভাযাত্রা একেবারেই বে-মানান। ধর্মীয় আস্থা ও বিশ্বাসের ‘রাজনীতিকরণ’ ঘটলে তবেই এমন বিসদৃশ ব্যাপার ঘটতে পারে। এটা রাজনীতি-আরোপিত অস্মিতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়। বিপ্রতীপে মহরম একটি অতীব শোকাবহ ঘটনার বেদনার্ত স্মৃতি। শিয়া সম্প্রদায়ের নিষ্ঠাবান বিশ্বাসী মানুষেরা শোক পালন করেন নিজেকে কষ্ট দিয়ে। শোক পালনের সঙ্গেও অস্ত্র প্রদর্শন ও আস্ফালনের কোনো অরগানিক বা আবেগী সম্পর্ক নেই। এখন তো দেখতে পাই অনেকে মহরম পালন করেন ব্যন্ডপার্টী বাজিয়ে তুমুল উল্লাসের সঙ্গে। প্রকৃত ধর্মবিশ্বাসীদের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমি বললেই বা কি হবে। কেউ কি শুনবেন বা ভাববেন? আমাদের হয়ে ভাবার ভাবনাটা যখন ধর্ম ব্যবসায়ী ও রাজনীতি ব্যবসায়ীদের হাতে আমরা স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, ভয়ে বা সম্ভ্রমে ছেড়ে দিই তখন এমনি হয়ে থাকে।

মহরম মাসটি শান্তির মাস হিসাবে চিহ্নিত। অনেকগুলি কথা বলার আছে কিন্তু আমি সে তথ্যের মধ্যে যাব না দুটো কারণে।প্রথমত আমি সব তথ্য জানি না। আবেগ তথ্য নির্ভর নয়। মানুষের ধর্মবিশ্বাস এবং আবেগ এমন এক দুর্জ্ঞেয় মানসভূমির উপর স্থিত যে যুক্তি সেখানে আঁচড় কাটতে পারে না। অনেকের সঙ্গে অনেকদুর পর্যন্ত কথা বলার পর এইরকম উত্তর শুনিঃ ‘ আপনি যা বলছেন তা ঠিক কথা কিন্তু আমি বিশ্বাস করি...’। খুব অসহায় লাগে তখন। এমনকি তথাকথিত শিক্ষিত ও সজ্জন মানুষদেরও এইরকম কথা বলতে শুনি। আংটি পরা , মাদুলি বাবাদুলি বা ঠাকুমাদুলি পরা বা পৈতে প্রথার সমর্থকদের সঙ্গে যুক্তি তর্ক করে দেখেছি শেষ পর্যন্ত তারা বিশ্বাসের নীরেট পাঁচিল তুলে ‘ নো এন্ট্রি ‘ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন। খুব অসহায় বোধ করি। কপালে কতবার যে ঠোকা খেয়েছি তার ইয়ত্তা নাই। তরুণ তরুণী থেকে সব বয়সী বিশ্বাসীদের কাছ থেকেই একই রকম সমাদর(!) পেয়েছি। থেমে গেছি বন্ধুত্ব বজায় রাখার খাতিরে। এরা বেশিরভাগই ভাল মনের মানুষ। আমার দ্বিতীয় কারণ হল আমি একটি হিন্দু পরিবারে জন্মেছি। আমি ধর্ম বিশ্বাসী কিনা সে প্রশ্ন কেউ করে না। এটা আমার নির্বাচন নয় কিন্তু আমার এক ধরণের ID. ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেই একটা সমস্যা এসে পথ আগলে দাঁড়ায়। আবার সেই NO ENTRY বোর্ড ঝোলানো। ‘বলি, তুমি কে হে আমাদের ধর্ম নিয়ে কথা বলার? কোরান হাদিস পড়েছো?’ যদি বলি পড়েছি প্রশ্ন আসেঃ ‘আরবিতে পড়েছো?’ না। আরবি জানি না। তাহলে চুপ করে থাকো। চুপ করে থাকি। আমি তো সংস্কৃতও জানি না এবং বেদ, গীতা, পুরান, উপনিষদ কিছুই সংস্কৃতে পড়ি নি। যারা রামনবমীতে অস্ত্র নিয়ে মিছিল করার উস্কানিদাতা এবং মহরমে ঢাল তলোয়াল নিয়ে মিছিলের ফতোয়া দেন তারা সব পড়েছেন তো? বুঝেছেন তো? মুস্কিল খুব। এই প্রশ্ন করার অপরাধে আমাকে বিপদে পড়তে হতে পারে। কিন্তু প্যালা এবং গনশাদের কাছে প্রশ্নটাও তো করতে হবে। না হলে ওদের কি হবে? ফেলুদা হয়েই তো থাকতে হবে, তাই না? ঈশ্বর আল্লাহ বা গড-কে ঢাল এবং তলোয়ার হিসাবে ব্যবহার করলে আমার মত নীরেট বুদ্ধির মানুষ খুব মুস্কিলে পড়ে যায়।
 সেকুলারিজমের কথায় আসা যাক। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সুন্দর একটা কথা বলেছিলেনঃ যত মত তত পথ। আমি এই কথাটাই এখনকার প্রেক্ষিতে একটু প্যারাফ্রেজ করে ব্যবহার করার অনুমতি চেয়ে নিচ্ছি। এদেশেঃ যত দল তত রকম সেকুলারিজম। অন্যভাবেঃ যত বুদ্ধিমান মানুষ ততরকমের সেক্যুলার। সমস্যাটা একাধারে সেমান্টিক ও পেডাগজিক্যাল। পাঠক/পাঠিকাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারণ এই দুটি শব্দের আভিধানিক বাংলা প্রতিশব্দ আরো বেশি খটমট। কেন বলছি এই কথা সেটা বলি। আমাদের সংবিধানে SECULAR শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ধর্ম-নিরপেক্ষ অর্থে। কি অর্থ ধর্ম-নিরপেক্ষতার? রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকবে না অর্থাৎ রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা আনুগত্য দেখাবে না। ভাল কথা। সমস্যা এখানেও নয়। রাষ্ট্র তো একটি বিমূর্ত ধারণা। রাষ্ট্রের ইচ্ছা বা WILL ব্যক্ত ও প্রযুক্ত হয় বা প্রতিপালিত হয় সরকারের আইনকানুন ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে। যাকে পরিভাষায় বলা হয় Governance বা State craft. বুঝতেই পারছেন ,সহৃদয় পাঠকপাঠিকা, সেমান্টিক ও পেডাগজিতে জড়িয়ে পড়ছে যুক্তি। কিন্তু এর সহজ ব্যাখ্যা দেবার ভাষা আমার জানা নেই। চেষ্টা করা যাক। এই সাংবিধানিক অর্থে আমাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি সবাই ‘সেক্যুলার’। আমি কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের সব দলগুলিকেই এই বৃত্তের মধ্যে ধরে নিচ্ছি। টেকনিক্যালি সবকটি দল( ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলি বাদ দিয়ে ) সেক্যুলার বা আমাদের ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষ। বি জে পি দলের সংবিধান খুলে দেখুন। মজাটা এবং সমস্যার জড়ও এইখানে। একটি শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমেই অর্থপ্রাপ্ত হয়। এমনকি অভিধানেও একাধিক অর্থ দেওয়া থাকে। আমার এক ইংরাজী শিক্ষক বন্ধু দেবনাথ মৈত্রের সঙ্গে আজ প্রথম দুপুরে টেলিফোনে কথা হচ্ছিল BECAUSE শব্দটি Conjunction, adverb না preposition. ও কথা থাক। আমাদের প্যালা আর ওদের গনশা-র কাছে ‘সেক্যুলারিজম’ কথা বা অবধারণাটির মানে কি সেটা জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাশ্মীরের ‘আজাদি’র সমর্থকদের সমর্থন করা সেক্যুলারিজম, তিনতালাকের বিরোধিতা করা ‘সেক্যুলারিজম’ নয় বা সকলের জন্য একই দেওয়ানী ও ব্যক্তিগত আইন প্রবর্তনের দাবী করা ‘সেক্যুলারিজম’ ইমাম ভাতা চালু করলে পুরোহিত ভাতাও দিতে হবে এই দাবী সেক্যুলার দাবী ইত্যাদি নানারকম প্রশ্ন উঠে আসে সামনে। এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে হবে নিরাবেগ সদর্থক যুক্তির মাধ্যমে। আইনের মধ্যে যদি কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের প্রতি পক্ষপাত্মুলক কিছু থাকে সে আইন বদল করতে হবে। গীতা, মনুসমহিতা বা শরীয়তের প্রভাবে যদি রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচার ব্যবস্থা পরিচালিত হয় সেই রাষ্ট্রকে প্রকৃত ‘সেক্যুলার’ রাষ্ট্রের আখ্যা দেওয়া যায় না। আমার তাই মনে হয়েছে আমাদের রাষ্ট্র সর্বধর্ম সমণ্বয়কারী রাষ্ট্র –প্রকৃত প্রস্তাবে সেক্যুলার নয়। ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভাল লাগছে এই জেনে যে কিছু বন্ধু পড়ছেন কষ্ট করে এবং তাদের মতামত ব্যক্ত করছেন। এই বক্তব্যগুলি আমার কাছে খুব মুল্যবান। আমিও শিখছি। এটা অতি বিনয় নয়। এত কিছু জানার বোঝার আছে যে সবসময় তা নজরে পড়ে না। আন্তরিক ধন্যবাদ সকলকে।

আশঙ্কা করেছিলাম শব্দের ডালপালা বেরোবে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রসঙ্গে আসা যাক। আমাদের সংবিধানে secular শব্দটি সংযুক্ত করা হয় সংবিধানের ৪২ তম সংশোধনীর মাধ্যমে। তার মানে এই নয় যে তার আগে আমাদের রাষ্ট্র সেক্যুলার ছিল না।১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাগ ঘটে।সে রক্তাক্ত ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন বেদনা এখনো আমাদের সামূহিক চেতনায় বহমান। খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় সেই অস্থির টালমাটাল সময়ে ভারত রাষ্ট্রকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা যেত। হয়তো সেই সময়কার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সামূহিক আবেগের কাছে তা গ্রহণযোগ্যতাও লাভ করতো। কিন্তু আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আমাদের সেই সময়কার জাতীয় নেতারা আজকের মত ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন না। তাই তারা সংবিধানের প্রস্তাবনায় লিপিবদ্ধ না করেও মৌলিক অধিকার নির্দেশাত্মক নীতিমালার মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের রাষ্ট্র থিওক্রাটিক নয় সেক্যুলার অর্থাৎ রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের পালন পোষণ করবে নাঃ সকল ধর্মাবলম্বী মানুষকে রাষ্ট্র সমান মর্যাদার সঙ্গে দেখবে। ছাড়াও আমার মতে যে কথাটি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ তা হল এই যে ধর্মবিশ্বাস পালন , অনুসরণ ইত্যাদি ব্যাপার একান্তই নাগরিকদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ যদি এথেয়িস্ট বা নিরীশ্বরবাদী অথবা সংশয়বাদী , একেশ্বরবাদী বা দ্বৈতবাদী , অদ্বৈতবাদী বা বহুত্ববাদী হন সে তার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। স্বামী বিবেকানন্দ মায়াবতীতে অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শেষের দিকে। না, এখানে আমি অন্য কোন ব্যক্তি নাম উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করবো না। বিপদ আছে খুব। ভক্তদের আমি খুব ভয় পাই। 

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আমাদের মনে রাখতে হবে।হিন্দু ধর্মশব্দ বা শব্দযুগল আমরা সচরাচর ব্যবহার করি বটে কিন্তু এটি কোনো কোডিফাইড ধর্ম হিসাবে গণ্য হয় না। মাঝে মাঝেই কিছু পরিমাণে হলেও হিন্ধু ধর্মকে কোডিফাই করার চেস্টা হয় নি এমন নয়। কিন্তু বৃহত্তর হিন্দু জীবনবোধ দ্বারা প্রভাবিত মানবগোষ্ঠীর কাছে তা গ্রাহ্য হয় নি। বিবেকানন্দ সহ অনেক এটি বর্ণনা করেছেন একটি জীবন দর্শন বা way of life. রূপে। অন্যান্য সেমেটিক অরগানাইজড ধর্মের মত এই হিন্দু ধর্মের একটিমাত্র সর্বজনমান্য ধর্মগ্রন্থ, একজন প্রফেট বা একজন মাত্র ঈশ্বর একটিমাত্র উপাসনালয় স্বীকৃত নয়। সুতরাং হিন্দুধর্ম রাষ্ট্রধর্ম রূপে গৃহীত হলে এদেশের ধর্ম সংকট আরো বেড়ে যেত। হিন্দু জীবন দর্শনের বৃহত্তর পরিধির মধ্যে একটা সামগ্রিক একাত্মকরণের প্রচেষ্টা যুগ পরম্পরায় চলে আসছে। বিরোধ হয়েছে, সংঘর্ষও হয়েছে আবার সমণ্বয়ের সাধনাও পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে চলেছে। মাঝে মাঝে কোডিফিকেশনের চেষ্টাও হয়েছে তবে সেটা গায়ের জোরে বা রাস্ট্রশক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে নয়। কেন আমাদের রাস্ট্রনেতারা সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটিকে বেছে নিয়েছেন সেটা বোঝার জন্যই এই কথাগুলি বলা। হিন্দুধর্মের তাত্বিক বা আধ্যাত্মিক ভিত্তিভূমি ব্যাখ্যা করার মত জ্ঞানবুদ্ধি আমার নেই। এখানে জন্মান্তরবাদ, জাতিভেদপ্রথা ইত্যাদি প্রসঙ্গ আমি তুলব না। এসব বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা এই আলোচনার পরিধির বাইরে। 
 
হিন্ধুধর্ম সেমিটিক রিলিজিওন থেকে চারিত্রে সম্পূর্ণ আলাদা। হিন্দুরা আত্মার পবিত্রতা (divinity of the soul)- বিশ্বাসী। হিন্দুর বিশ্ব দর্শন সেমিটিক রিলিজিওন-এর বিশ্ব দর্শন থেকে একেবারেই পৃথক। একজন প্রকৃত হিন্দুর কাছে কেউ অচ্ছুৎ নয়। বিশ্বের সকলেই তার নিকট আত্মীয় এবং অতিথিকে সে দেবতার মর্যাদা প্রদান করে। এমনকি দেবদেবীরাও হিন্দু জীবন দর্শনে বিশ্বাসীদের কাছে আত্মীয়- একেবারেঘরের মানুষ এতোটাই ঘরের মানুষ যে তাদের নিয়ে দিব্যি ঠাট্টাতামাশাও করা যায়। সেমিটিক রিলিজিওনে এমনটা কল্পনাও করা যায় না। 

প্রসঙ্গত দার্শনিক কবি রবীন্দ্রনাথেরভারততীর্থকবিতাটির প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।হে মোর চিত্ত পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে এইমহামানবের সাগরতীরেমিলিত হয়েছে পৃথিবীর সকল ধর্ম, জাতি, মত পথের মানুষ। মহাকবির ভাষায় ,’হেথায় আর্য হেথায় অনার্য হেথায় দ্রাবিড় চীন/ শক হুন দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীনহেথায় সবায় হবে মিলিবারে আনত শিরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে
রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের আত্মার স্বরূপ যথার্থ চিনেছিলেন। যেমন চিনেছিলেন ভারত-পথিক রাজা রামমোহন রায়, ভারতীয় নবজাগরণের প্রধান পুরোহিত বলে যাকে আমরা সশ্রদ্ধায় স্মরণ করি। এরা দুজনেই ব্রাহ্ম ছিলেন। কিন্তু ভারতাত্মার স্বরূপ চিনতে ভুল করেন নি এঁরা।ভারততীর্থকবিতায় রবীন্দ্রনাথ উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন এইভাবে-‘মা- অভিষেকে এস এস ত্বরা মঙ্গলঘট হয় নি যে ভরা/ সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে। 

দুঃখের বিষয় মঙ্গলঘট এখনো ভরা হয় নি। আর কখনো হবে কিনা আমরা জানি না। ঢাল তলোয়ার আর লাঠি বন্দুক নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেমঙ্গলঘটভরা হবে না। 
যে সমস্যকে কেন্দ্রে রেখে এই আলোচনা শুরু করেছিলাম তাহল রামনবমী, মহরম ও সেকুলারিজম। অস্ত্রহাতে রামনবমীর মিছিল এবং অস্ত্রহাতে মহরমের মিছিল একদিকে চলতে থাকুক আর অন্যদিকে রাষ্ট্র সেকুলারিজম প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট থাকুক তাহলেই একটা সমাধানের পথ আমরা খুঁজে পাব- এটা নেহাতই অতিসরলীক্রিত ধারণা। সেমিনারে সিম্পোসিয়ামে আলোচিত ও হাতালিত হতে পারে কিন্তু বাস্তবোচিত নয়। কেন নয় সেটা বুঝতে গেলে ইসলাম ধর্মের মুল কয়েকটি কথা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। পবিত্র কোরআন আল্লাহর পবিত্র বাণী ও নির্দেশ। মুসলিম মাত্রেই এই বিশ্বাসে অনড়। হাদিস বা হাদীথ আল্লাহর শেষ নবী হযরত মহম্মদের জীবনাচরণ ও উপদেশাবলীর সংকলন এবং শারিয়া বা শারীয়ত ইসলামিক আইন যা কোরানের নির্দেশ ও শিক্ষা অনুসারে রচিত। একজন বিশ্বাসী মুসলমানের জীবন এই তিনটি মূল আদর্শ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখানে সেকুলারিজমের কোনো স্থান নেই। রবীন্দ্রনাথ বা কাজী নজরুল ইসলাম আবেগী উদারতায় হিন্দু মুসলিম ঐক্যের স্বপ্ন দেখতেই পারেন কিন্তু সেই কাজটা খুব সহজ নয় বাস্তবায়িত করা। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব আইনের শাসনের আওতায় থেকে কিন্তু অরগানিক মিলন সম্ভব নয়। এই বাস্তব কথাটা আমাদের মানতে হবে। পছন্দ করি বা না করি। 
আর একটা কথা। ইদানীং সমাজে যে উগ্রতার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে হিন্দুদের একাংশের মধ্যে তার পিছনে একটা পারসেপশানের ব্যাপার আছে। জওহরলাল নেহরুর আমল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এদেশে সেকুলারিজমের নামে সংখ্যালঘু মুসলিম তোষণ করা হয়েছে এরকম একটা পারসেপশান বা বেদন বা কল্পমূর্তি বেশ কিছু মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল হয়েছে। এদেশের মুসলিম ধর্মনেতারা এজন্য অনেকখানি দায়ী। তথাকথিত প্রগতিশীল ইন্টেলেকচুয়ালরাও এই ধারণা তৈরি করতে পরোক্ষে সাহায্য করেছেন। শাহবানু মামলা, কাশ্মীর নিয়ে এদের তাত্বিক অবস্থান , ইত্যাদি নানা বিষয়ে এদের অবস্থান ও কেন্দ্রীয় সরকারের দোদুল্যমানতা সবকিছু মিলে তালগোল পাকিয়ে এই পারসেপশান সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে অনেক সরল ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকেও বলতে শুনি,’ না, বাপু এতখানি তোষণ ভাল নয়।‘ এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তিন তালাক ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের আপত্তি। শিক্ষিত ও সচেতন মুসলিমদের গরিষ্ঠ অংশ এসব সমর্থন করেন না কিন্তু প্রকাশ্যে তারা মত প্রকাশ করতে চান না। এক ধরণের ভয় কাজ করে। যুক্তি যেখানে শেষ হয় হিংসার শুরু সেখান থেকেই। এই যে সারা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নানারকম আতংকবাদী চক্র হিংসাত্মকো ধ্বংসাত্মক কাজ করে চলেছে তার বিরুদ্ধে মুসলিম ইন্টেলেকচ্যুয়াল বা সাধারণ শিক্ষিত মুসলিমদের বড় অংশ মুখ খোলেন না। এই কারণেও এমন একটা পারসেপশান তৈরি হয়েছে যে এরা বুঝি এসব সমর্থন করেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দেখবেন যে অধিকাংশ মুসলমান শান্তিপ্রিয় এবং তারা এসব মোটেই সমর্থন করেন না কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে ভয় পান। এই ভয় ভাঙ্গাতে পারেন মুসলিম সম্প্রদায়ের চিন্তাশীল মানুষরাই। হিন্দু বা অন্য কোনো ধর্মের লোকেরা এ বিষয়ে যত সমালোচনা করবেন ততই ভয়ের মানসিকতা , অপছন্দ ও হিংসার মানসিকতা আরো তীব্র হবে। আমি রাজনীতির নেতা ও ধর্মব্যবসায়ীদের উপর একেবারেই আস্থাশীল নই। তারা এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। এদেশের ইতিহাসে এর সবথেকে বড় উদাহরণ মহম্মদ আলি জিন্নাহ। আপাদমস্তক সেকুলার এই মানুষটি ক্ষমতার লোভ ও ইতিহাসের হাতছানি উপেক্ষা করতে না পেরে প্রতিষ্ঠা করে গেলেন এমন একটি ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের যার বিষময় ফল আজ পর্যন্ত এই উপমহাদেশের মানুষ ভোগ করে চলেছেন। দুটি গরীব ও উন্নয়শীল দেশ তার জাতীয় সম্পদের একটি মোটা অংশ ব্যয় করছে সেনাবাহিনী পোষার জন্য এবং গোলাবারুদ কেনার জন্য। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মানুষের মঙ্গলের কাজে লাগানো যেত। 
আমাদের বেশিরভাগ মানুষের সেকুলারিজম skin-deep জানি না এর বাংলা কি কোরব। মীটিং, মিছিল, সেমিনার-সিম্পোসিয়াম, প্রবন্ধ কবিতায় আমরা বেশ অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু যেখানে ‘বাঘের ভয়’ সেখানে কিন্তু আমাদের সেকুলারিজমের ‘সন্ধ্যা’ নেমে আসে। এই দেখুন যারা গরু নিয়ে কথা বলতে বেশ উতসাহী তাদের কাছে শুয়োর ‘হারাম’। উচ্চারণ করতেই চাইবেন না। যারা গো-মাতার ভক্ত তাদের যদি বলেন প্রাচীন কালে আর্যরা গরুর মাংস খেত তেড়ে আসবেন তারা। অষ্টমীর সন্দিক্ষণে মোষ বলি দেবার রেওয়াজ আছে এবং তা হিন্দুরাই পালন করেন। রামায়ণ ও মহাভারতে দিগ্বিজয়ের শেষে বিজয়ী অশ ফিরে এলে তাকে বলি দেওয়া হোত ‘অশ্বমেধ’ যজ্ঞ করে। মেধ মানে তো বলি। সে মাংস কারা খেত?  কিন্তু কেউ শান্তভাবে শুনলে তবেই তো যুক্তির কথা বলা যায়!

আসুন আয়নায় মুখ দেখি নিজেদের। দেখা দরকার কে কোথায় দাঁড়িয়ে।সিংহাবলোকন । 
ইংরাজীতে একটা সুন্দর অর্থবহ শব্দ আছে panacea  যার অর্থ সর্বরোগহর একটি ওষুধ। সেকুলারিজম panacea নয়। রাষ্ট্রীয় আদর্শ আর বাস্তবের মানুষের বিশ্বাস ও আচরণ এক কদাচিত হয়। যেমন ‘মীটিং কা কাপড়া’ আলাদা তোলা থাকে তেমনি সেকুলারিজম ধারণাটি আমরা ব্যবহার করি তোলা জামা কাপড়ের মত। আমাদের জীবন চর্চায় ও চর্যায়, বিশ্বাসে ও আচরণে যতদিন না আমরা প্রকৃত সেকুলার হতে পারছি ততদিন নানা রূপে বিরোধের বীভৎস মুখ বারবার বেরিয়ে পড়বে। ভারতবর্ষ এক প্রাচীন উন্নত সভ্যতার ধারক বাহক ও উত্তরাধিকারী। এ দেশের  Ethos  (ইথোজ) বা মর্মচেতনায় উগ্র ধর্মান্ধতা নেই।ধর্মহীনতাও নেই। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে দলবদ্ধভাবে মানুষ এদেশে  এসেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে নানান সভ্যতা, নানান কৃষ্টি । লুটেরারাও এসেছে। আবার লুটপাঠ করে অনেকে চলেও গেছে। বেশিরভাগই স্থায়ীভাবে এদেশের মাটিতে শিকড় গেড়েছে। বিভিন্ন সভ্যতা ও  ধর্মসংস্কৃতির মধ্যে মাঝে মাঝে লড়াই সংঘর্ষ হয়েছে আবার সমান্তরালভাবে একটা সমণ্বয়ের সাধনাও  নিরবচ্ছিন্নভাবে চলেছে। সব মিলিয়ে প্রায় চারশ বছরের মুসলমান শাসন বা পরবর্তী সময়ে একশো নব্বই বছরের ইংরেজ শাসনে এদেশের আপামর জনসাধারণ নিজেদের ঐতিহ্য ও ধর্ম সংস্কৃতি বজায় রাখতে  সক্ষম হয়েছে তার কারণ সনাতন ধর্মের বা হিন্দু জীবন দর্শনের অন্তর্নিহিত শক্তি ও আধ্যত্মিক সম্পদের বলে। যারা এই মূল ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পারেন না তারাই হিন্ধু জীবন দর্শনকে আর একটি সেমিটিক রিলিজিওনের মত কোডিফাই করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। হিন্দু বা সনাতন দর্শনের শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণাই নেই তারাই এই জীবন দর্শনকে ‘হিন্দুয়ায়ন’ করার চেষ্টা করছেন। যদি এরা রাজনইতিক  শক্তির সহায়তায় এই মেটামরফসিস (metamorphosis) করে ফেলতে পারেন সেদিন ভারতবর্ষ আর ভারতবর্ষ থাকবে না। যেটুকু ইতিহাস বুঝি তাতে আমি নিশ্চিত এই অপচেষ্টা সফল হবে না। সতত প্রবহমানা নদীতে বাঁধ দেওয়া যায় না। 


এই আলোচনার উপসংহার টানা খুব কঠিন কাজ। আমার মনে হয়েছে কিছু কথা আছে যা আমাদের পীড়িত, ক্ষুব্ধ ও উদ্বেলিত করে কিন্তু সাহস করে বলতে চাই না। নানা ভদ্র শালীন কথার আড়ালে নিজেদের আসল চেহারা ঢেকে রাখি।অথচ বলা দরকার। আসুন নিজেদের প্রশ্ন করি আমাদের কতজনের খুব অন্তরঙ্গ ‘বিধর্মী’ বন্ধু আছে যাদের আনাগোনা আমাদের অন্দরমহল পর্যন্ত। আমাদের পড়শিকে কতটুকু চিনি আমরা? কতটুকুই বা চেনার চেষ্টা করি? 
নিজ নিজ ধর্মকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ধর্ম রূপে ভাবতে আমরা ভালবাসি। এতে আমি দোষ দেখি না কিন্তু অপরের ধর্ম ও জীবনদর্শন সম্পর্কে কিছু না জেনেবুঝে আলগা মন্তব্য করা থেকেই অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।
অনেকের মুখেই শুনবেন ‘নেড়ে’,’মোছলমান’,’গরু খায়’,’একমাত্র জুতোয় সোজা’ –এই জাতীয় অবমাননাসুচক নিম্নরুচির মন্তব্য যা মানুষকে আহত করে। বিপ্রতীপে,’ কাফির’,’ হিদেন’,’পুতুল পুজক’,’ ‘মালাউন’ জাতীয় অপমানসূচক মন্তব্য। এমনকি তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের মুখেও আমি এসব কথা শুনে থাকি। এখনো। বন্ধুত্ব হবে কি করে? বড়দিনের উৎসবে যোগ দিতে আমরা সানন্দে রাজী হই। ‘হ্যাপী ক্রিসমাস’ আনন্দের সঙ্গে বলি। মুসলিম দোকান গুলিতে বড়দিনের এবং নিউ ইয়ার’স এর কেক প্যাস্ট্রি বিক্রী হয় কিন্তু পুজোর ফুল বাতাসা প্রসাদ বিক্রি হয় না। সিমুই বিক্রী হয় হিন্দুর দোকানে, গরুর মাংস নয়। জবাই না বলির পাঁটা তা নিয়ে আমাদের মধ্যে তুলকালাম বেঁধে যায় । আমি একটা NSS Camp-এ যোগ দিতে গিয়ে এ সমস্যা ভোগ করেছি। রাশানালিটি কাজ করে না। অথচ ঐ ক্যাম্পে সকলেই ছিল কলেজ পড়ুয়া ছাত্র।খুব বিষণ্ণ বোধ করি এসবে। তবুও এটা একটা বাস্তবতা। হিন্দুর পুজোয় যে পুতুলগুলি দেবদেবী রূপে আরাধিত এবং পূজিত হয় সেগুলি ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’র আগে এবং উৎসবের দিনক্ষণ পেরিয়ে যাবার পরে আবার পুতুল। কিন্তু ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠার’ পরের সময়কালে এবং বিশ্বাসীর মানসভুমিতে তাঁরা দেবতা ও দেবী। এই ব্যাপারটা বুঝতে হবে এবং শ্রদ্ধা করতে হবে। ঠিক তেমনি বুঝতে হবে মহরম , ঈদ এবং হজ করা একজন মুসলমানের কাছে কতখানি মূল্যবান। বিশ্বাস এবং আবেগের সাথে যুক্তিতর্কের বিরোধ চিরন্তন। নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষের জীবন থেকে তাদের বিশ্বাস ও আবেগ জোর করে কেড়ে নেওয়া যাবে না। কত ভালই না হোত আমরা সকলেই যদি এইসব অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের রহস্যময় দুর্জ্ঞেয়তা থেকে মুক্ত হতে পারতাম! তা যখন হয় নি বা যতদিন না হচ্ছে ততদিন একে অপরের বিশ্বাস এবং আস্থাকে তাচ্ছিল্য ও ঘৃণা না করে বন্ধুর মত, সুপ্রতিবেশীর মত বোঝার চেষ্টা করা ভাল! একে অপরের উৎসবে শরীক হয়ে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারতাম যদি খানিকটা বন্ধুত্ব বাড়ত! না, আমি রাজনৈতিক ইফতার বা রাজনৈতিক বিজয়া সম্মীলনীর কথা বলছি না। এসব ভন্ডামি তো হচ্ছেই। তাতে মনের দূরত্ব  কমল কই?
মাঠেঘাটে, চায়ের দোকানে, ট্রেনে বাসে নানান আড্ডায় একটা মুখরোচক আলোচনার বিষয় তিন তালাক এবং চারটি বিবাহ। মুসলিম শরীয়ত অনুমোদিত। কোডিফাইড সেমিটিক রিলিজিওনের একটি ইনট্রিনসিক বা মজ্জাগত সমস্যা হোল ধর্ম পুস্তকে যা লেখা আছে তা বদলানো যাবে না। কোরাআনের বাণী বা বাইবেলের বাণী ধ্রুব সত্য। অজর অক্ষয় অমর। অতএব অলঙ্ঘনীয়-sacrosanct
সমস্যার অন্যতম জড় এইখানে। মুস্কিল আরো আছে।বিভিন্ন পন্ডিত বিভিন্ন ব্যাখ্যা এনে হাজির করছেন। কার কথা শুনবেন? একই ধর্মের মধ্যে আবার নানা উপদল সম্পৃক্ত হয়ে আছে। শিয়া ও সুন্নির লড়াইতো একে অপরকে বিনাশ করার চেষ্টায় লিপ্ত। এক গোষ্ঠীর লোক অন্য গোষ্ঠীর মসজিদ ও  উপাসনালয় পর্যন্ত ধংস করে দিতে কুন্ঠিত হচ্ছে না। আলোচনায় এসব কথাও উঠে আসছে সমালোচনা ও হেয় করার মানসিকতা নিয়ে। বিরোধের ও অবিশ্বাসের ক্ষেত্র ক্রমেই বেড়ে চলেছে। 

পৃথিবীর অন্তত একুশটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তিনতালাক বৈধ নয়। পাকিস্তানেও নয়। এক বিশেষ পরিস্থিতিতে চারটি বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ইসলাম ধর্মের জন্মের সূচনাকালে। অনেক অনেকদিন আগে থাকতেই সে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। এই সব মান্ধাতার আমলের প্রথা যে এখনো টিকে আছে তার কারণ মুসলিম পুরুষদের কায়েমী স্বার্থ।