সোমবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৮

নেতাজী, বাড়ি আছো? ~ রজত শুভ্র বন্দোপাধ্যায়

নেতাজী, বাড়ি আছো?
"জয় হনুমান" ফেলছে না আর সাড়া,
হঠাৎ দ্বারে তেনার কড়া নাড়া – 
নেতাজী, বাড়ি আছো?

হুশপুশিয়ে বাড়ছে তেলের দাম,
গৌসেনাদের চিৎকারে হাড় হিম,
শুকিয়ে যাচ্ছে শ্রমিক, চাষীর ঘাম,
মাথায় ধরে ঝিম –
নেতাজী, বাড়ি আছো?

দিন চলে যায়, বেড়েই চলে ক্লেশ,
লোন বাগিয়ে সবাই যে দেশ ছাড়া,
জমাট দেহে আবছা ঘুমের রেশ,
সহসা কড়ানাড়া - 
নেতাজী, বাড়ি আছো?

( ২২-১০-২০১৮)

.

[With due apologies to Shakti Babu]

শনিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৮

ফুটবল মাঠ ~ অর্ক ভাদুড়ী


একটা ফাঁকা ফুটবল স্টেডিয়ামে বসে থাকার কথা কথা বলেছিলেন এডুয়ার্দো গালিয়েনো। খেলা শুরুর সময় সেন্টার লাইনের মাঝখানে ঠিক যেখানটায় বল রাখেন রেফারি, সেখানে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে বলেছিলেন। মনখারাপের দিনে আমি এমন বসে থেকেছি, বহুবার। বাবা মারা যাওয়ার দিন বসেছি, প্রেমিকা চলে যাওয়ার দিন বসেছি। প্রিয়তম মানুষকে ছেড়ে আসার পর, বড্ড বেশি ঠকে যাওয়ার পর, বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার পর— বসেছি। যেদিন শেষবারের মতো বেরিয়ে এলাম পার্টি অফিস থেকে, গলি পেরনোর পর শেষবারের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিলাম রংচটা প্রাণের নিশান, সেদিনও বসেছি। ফাঁকা স্টেডিয়ামের মাঝমাঠে বসলে মনে হয়, মাটি থেকে উঠে আসছে মায়ের আঁচলের মতো গন্ধ। মাটি মাটি, বিকেল বিকেল। সেই গন্ধ আমায় ছেড়ে যাবে না কখনও। আমিও যাব না তাকে ছেড়ে।
দু'পাশে দু'টো গোলপোস্ট, জাল নেই। হাজার হাজার চেয়ার, শব্দহীন। কোথাও কোনও আওয়াজ নেই, উত্তেজনা নেই, চিৎকার নেই। উল্লাস-কান্না-গালাগালি কিচ্ছুটি নেই। একটা আস্ত ফাঁকা স্টেডিয়ামের ঠিক মাঝখানে আমি বসে থেকেছি, একা।
ফুটবল ঠিক যেন মরে যাওয়া বাপমায়ের মুখ, যে আমার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটে। আমি ধর্ম বদলে ফেলতে পারি, মতাদর্শ বদলে ফেলতে পারি, নাম বদলে ফেলতে পারি, দেশ-বাড়িঘর-প্রেম-সম্পর্ক সবকিছু বদলে ফেলতে পারি, শুধু প্রিয় ফুটবল দলের নাম বদলায় না কখনও। বদলানো যায় না। ফুটবল রক্ত-ঘাম-হাড়েমাংসে মিশে যায়।


আমার দাদু আর দিদা একে অন্যকে প্রথম দেখেছিল মনুমেন্টের নীচে। চল্লিশের দশক। রশিদ আলি দিবসের মিছিল ফেরত দিদাকে উয়াড়ি ক্লাবের প্র্যাকটিশ সেরে বাড়ি ফেরার পথে দাদু যখন প্রথম দেখে, তখন ময়দান জুড়ে নেমে এসেছে কনেদেখা বিকেল। তারপর মেঘে মেঘে বেলা বেড়েছে। মোহনবাগানের খেলা থাকলে কমিউনিস্ট পার্টির কার্ড হোল্ডার আমার দাদু মাঠে যাওয়ার আগে ঠাকুরঘরে ঢুকত একবার। সেদিন সকাল থেকে উচাটন। উল্টো করে বিড়ি ধরত, তাতে মোহনবাগানের শনি কেটে যায়। শুনেছি, ফুটবলের মাঠ থেকে ছেলেরা ঢুকে পড়ত ব্রিটিশবিরোধী মিছিলে। পুলিশ তাড়া করত, ঘোড়সওয়ার পুলিশ।

শুনেছি, দেশভাগ। শুনেছি, দাঙ্গা। আমাদের কলেজ স্ট্রিটের বাড়ির আশেপাশে তখন গোপাল মুখার্জির রাজত্ব। ইতিহাস যাঁকে মনে রেখেছে গোপাল পাঁঠা নামে। অনেক পরে গোপালবাবু সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি, ওঁর ঈশ্বর ছিলেন সুভাষচন্দ্র আর মন্দির মোহনবাগান। তখন অবশ্য সকলেই প্রায় মোহনবাগান। এগারোর স্মৃতিতে ভর করে ওড়ে স্বাধীনতার বিজয়কেতন। দাদুর বন্ধু নাসিমসাহেব মহামেডান ক্লাবের কর্তা ছিলেন। ইস্টবেঙ্গল তখনও সে অর্থে বড় দল নয়। দেশভাগের পর আচমকা বদলে গেল শহরটা। অদ্ভূত ধরণের বাংলা বলা হাজার হাজার লোক ভিড় করল শিয়ালদহ, হাওড়া স্টেশনে। আগে শহরে বাড়িওয়ালারাই তোয়াজ করতেন ভাড়াটিয়াদের। এবার ভাড়া পাওয়ার মতো বাড়ি মেলাই হয়ে উঠল দুষ্কর! কোথায় যাবেন এত মানুষ! কোথায় মাথা গুঁজবেন! শহরের আদি বাসিন্দাদের একাংশের অনুযোগ, লাখ লাখ উদ্বাস্তুর ভিড় শহরটাকে নোংরা করে তুলছে। কথাটা মিথ্যেও তো নয়। যে মানুষের থাকার জায়গা নেই, যাকে সাত পুরুষের ভিটে থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে, সে শুরু করল জবরদখল। বাগানবাড়ি, ফাঁকা জমি, খালপাড়— সব। হাতে হাতে বসতি গড়ে উঠল। জঙ্গল সাফ হল। তৈরি হল দরমার বেড়া দেওয়া স্কুলঘর। সন্ধ্যা গড়ালে সেই দাওয়ায় আড্ডা বসল— 'আমাদের পুকুর আছিল, পুকুরে মাছ আছিল, বাগান আছিল! কত গাছ, কত গরু, কত দুধ! আর এখন……।' কেউ বিশ্বাস করে না সে সব কথা। হাভাতের প্রলাপ। অফিসকাছারিতে খিল্লি হয়। কয়েকজন বুদ্ধিমান আগে থেকেই আঁচ বুঝে প্রপার্টি এক্সচেঞ্জ করে ঠাঁই পেয়েছে ভদ্রপাড়ায়। তাদের মুখেও মাঝেমধ্যে ফেলে আসা ঐশ্বর্যের গল্প। সে নিয়ে হাসাহাসি। ভাষাটাও যেন কেমন! খিল্লি। এই সব শুনে গজরাতে থাকা বরিশালের মানুষ, ঢাকা, বিক্রমপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ, ফেনি, রংপুরের মানুষ ফুটবল ময়দানে ঢুকে পড়ল। সুরেশ চৌধুরির ক্লাবের হয়ে গলা ফাটাল। গালাগালি দিল। রোজকার জীবনের হাজার না-পাওয়া মুছিয়ে দিল লাল-হলুদ জার্সির নায়করা। জন্মের কয়েক দশক পর নতুন করে জন্মাল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব।


ফুটবলের ঠিক কত শতাংশ ওই চৌকো মাঠটায় খেলা হয়? জানি না। সেন্টার লাইন পেরিয়ে, কর্ণারের দাগ পেরিয়ে ফুটবল ঢুকে পড়ে জীবনের রঙ্গমঞ্চে। প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে। ফুটবল এই দুনিয়ার সব হেরে যাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে রাখার অভিজ্ঞান। কখনও কখনও মৃত্যুরও বটে। সাদা চামড়ার তাড়া খেয়ে ঝোপজঙ্গল পেরিয়ে পালাতে পালাতে রঙিন মানুষেরা একটা আস্ত ফুটবল দর্শনের জন্ম দিতে পারে। দুনিয়া কাঁপানো বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে শত্রুপক্ষের সৈন্যের সঙ্গে ফুটবল খেলা যায়। বন্ধ কারখানার শ্রমিকের ছেলে ঘাস উঠে যাওয়া এক টুকরো জমিতে ড্রিবল করতে করতে টপকে যায় তার স্কুলে না যাওয়া শৈশব, প্রেমিকাকে হারিয়ে ফেলার ক্ষত। যে ছেলেটির চাকরি চলে গিয়েছে, যে বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পায় প্রিয় দলের গোলে। মানুষকে মেরেও ফেলে ফুটবল। পুড়িয়ে পুড়িয়ে আংরা করে দেয় তাকে।
মনে করুন উরুগুয়ের কিংবদন্তী আবদিয়ন পোর্তেকে। আজ থেকে প্রায় ১০৮ বছর আগের কথা। ১৯১০ সাল। পোর্তে খেলতেন মাঝমাঠে। প্রথম বছর কোলন ক্লাব। সেখানে এক বছর কাটিয়ে লিবের্তাদ ক্লাবে। তারপর ১৯১১ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত একটানা নাসিওনাল ক্লাবে। ১৯১৭ সালে সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা উরুগুয়ের অন্যতম নায়ক পোর্তেকে আদর করে সমর্থকেরা ডাকতেন 'এল ইন্দিও' বলে। ক্লাবের হয়ে ২০৭টি ম্যাচ খেলা, ১৯টি ট্রফি দেওয়া পোর্তের জীবনটা বদলাতে শুরু করল আঠেরো সালেই। সে বছর বুড়ো কিংবদন্তীর বদলি খুঁজে নিলেন কর্তারা। তাঁকে রিজার্ভ বেঞ্চে পাঠিয়ে প্রথম দলে চলে এলেন আলফ্রেদো সিবেচি। বসে থাকতে থাকতে ভিতরে ভিতরে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষক হয়ে গেলেন পোর্তে। ঘন্টার পর ঘন্টা অনুশীল করলেন, নিংড়ে দিলেন নিজেকে। লাভ হল না। ৪ মার্চ, ১৯১৮। শেষ ম্যাচ খেললেন নাসিওনালের হয়ে। দল জিতল ৩-১ গোলে। কিন্তু পোর্তে গোল পেলেন না। বুড়ো, বাতিল হয়ে যাওয়া ঈশ্বরের দিকে সমর্থকেরা টিটকিরি ছুঁড়ে দিলেন। বললেন, 'ও এখন একটা কচ্ছপকেও কাটাতে পারে না।' মাথা নীচু করে সবকিছু মেনে নিলেন হেরে যাওয়া, শেষ হয়ে যাওয়া কিংবদন্তী ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার।


ম্যাচের পর অনেকগুলো ঘন্টা পেরিয়ে গিয়েছে। অবসন্ন, একা পোর্তে একটা ট্রামে উঠলেন। তখন মাঝরাত। গন্তব্য, এস্তাদিও গ্রাণ পার্কে সেন্ট্রালে— নাসিওনাল ক্লাবের তাঁবু। ক্লাব শুনশান, একটা আলোও জ্বলছে না। বাইরে বসে ঢুলছেন একজন সিকিউরিটি গার্ড। পোর্তে ধীর পায়ে মাঠের ঠিক মাঝখানে পৌঁছলেন। গালিয়েনো যেমন বলেছিলেন, তেমনই। বসে পড়লেন সেন্টার লাইনের মাঝখানে। মাথা নীচু। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলেন চুপ করে। তারপর পকেট থেকে রিভলভার বের করলেন। মাথায় ঠেকিয়ে ট্রিগার টিপলেন।
গুলির আওয়াজ কেউ শুনতে পায়নি। পরদিন সকালে স্টেডিয়ামে হাঁটতে এসেছিলেন সেভরিনো কাস্তিত নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁর কুকুরই প্রথম দেখতে পায় এল ইন্দিও'কে।


অনেক পরে গালিয়েনো লিখেছিলেন, 'ফুটবল মাঠই হল সেই জায়গা, যেখানে অতীত এবং বর্তমানের দেখা হয়ে যায়। তারা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হয়। পরস্পরকে বুকে টেনে নেয়।'

বুধবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৮

আড্ডা ও বাঙ্গালী ~ সমরেন্দ্র দাস


বহু চেষ্টা করেও ইংরেজিতে 'আড্ডা'র একটা জুতসই প্রতিশব্দ জোগাড় করা গেল না। বুদ্ধদেব বসু অবশ্য আরও কয়েকধাপ এগিয়ে গোটা পৃথিবীর কোনও ভাষাতেই 'আড্ডা'র আদৌ কোনও প্রতিশব্দ আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছে, পৃথিবীর অন্য দেশে আড্ডার মেজাজ নেই, বা থাকলেও তার জন্য যথোচিত পরিবেশ নেই। উন্নাসিক কেজো লোকেরা মনে করেন, যাঁরা কাজের মানুষ তাঁরা আড্ডা মারেন না, কিন্তু আমাদের প্রতিটি মুহূর্তই যদি শুধু কাজের হয়ে উঠত তা হলে কী নিছক যান্ত্রিকতাতেই ভরে যেত না জীবন?

স্বয়ং রাজশেখর বসু আড্ডার অর্থ লিখেছেন 'কু-লোকের মিলনস্থান'। অথচ কে না আড্ডা মেরেছেন বলুন তো! আর যাঁদের কথা বলতে যাচ্ছি তাঁদের অকর্মণ্য কিংবা কু-লোক বলি এমন সাধ্য আছে কার?

বুদ্ধদেব বসু কি লিখছেন পড়ুন, "ছেলেবেলা থেকে এই আড্ডার প্রেমে আমি আত্মহারা। সভায় যেতে আমার বুক কাঁপে, পার্টির নামে দৌঁড়ে পালাই, কিন্তু আড্ডা!! ও-না হলে আমি বাঁচি না। বলতে গেলে আড্ডার হাতেই আমি মানুষ। বই পড়ে যা শিখেছি তার চেয়ে বেশি শিখেছি আড্ডা দিয়ে।"

আড্ডার ফসল মহাভারত!

মহাভারতের কথা ধরা যাক, একেবারে গোড়াতেই ব্যাসদেব জানাচ্ছেন– একদিন নৈমিষারণ্যে সারা দিনের কাজ শেষে মহর্ষিরা সবাই সমবেত হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় একটু আড্ডা মারছিলেন। হঠাৎ ঋষি লোমহর্ষণের ছেলে সৌতি এদিক সেদিক ঘুরে সেখানে এসে হাজির হলেন। তাঁর আবার বৈঠকি ঢঙে গল্প করার অভ্যেস। সুযোগ পেয়ে তিনিও বলে গেলেন তাঁর নানা অভিজ্ঞতার কথা, আর মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনে গেলেন বাকি সবাই। আড্ডা যখন ভাঙল দেখা গেল মহাভারতের আঠারোটা পর্বই নাকি বলা হয়ে গিয়েছে। ম্যারাথন আড্ডার ইতিহাসে এটাই সম্ভবত দীর্ঘতম।

এই ঘটনা থেকে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় তিনটি সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, এক, আড্ডার একটা ইতিহাস আছে এবং তা সুপ্রাচীন। দুই, শুধু বখাটে ছোকরা নয়, মুনি-ঋষিরাও আড্ডা দিতেন। তিন, আড্ডা থেকে মহাভারতের মতো মহাকাব্যও সৃষ্টি হতে পারে।

গ্রিসেও আড্ডা!

সত্যজিৎ রায় তাঁর 'আগন্তুক' ছবিতে কিন্তু আড্ডার উদ্ভাবনকে বাংলা বা ভারত ছেড়ে গ্রিসে নিয়ে গেছেন। তিনি মনে করেন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিস দেশের অ্যাথেন্সের জিমনেসিয়ামে অনেক উন্নত মানের আড্ডা হত। সে যুগে অ্যাথেন্সবাসী একই জায়গায় শরীর ও মনের এক্সাসাইজ করতেন। ওই সব আড্ডায় আসর জমাতেন সক্রেটিস কিংবা প্লেটোর মত বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। আর সেই আড্ডা থেকে সৃষ্টি হত উন্নত মানের শিল্পসাহিত্য ও  জ্ঞানবিজ্ঞানের ধারনা।

রসদ-জোগানদার

প্রত্যেক আড্ডাতেই দু-একজন এমন থাকেন যাঁদের রসদ-জোগানদার বলা যেতে পারে। এঁরা হলেন আড্ডার প্রাণপুরুষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং আড্ডার বিচারে নানা রসদ-জোগানদার পাওয়া যাবে। এঁদের কেন্দ্র করেই আড্ডা আবর্তিত হতে থাকে। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় তাঁর সময়ের ভিত্তিতে তাঁর দেখা সেরা পাঁচ রসদ-জোগানদারের নাম বলেছেন এই রকম – দাদাঠাকুর, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী (বুড়োদা), নলিনীকান্ত সরকার, কাজী নজরুল ইসলাম এবং অধ্যাপক বিশ্বপতি চৌধুরি। আড্ডার আসরে দাদাঠাকুরকে যিনি প্রত্যক্ষভাবে না দেখেছেন তিনি নাকি জীবনের একটা মধুরতম স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বুদ্ধিদীপ্ত সরস আলাপে অগ্রগণ্য প্রেমাঙ্কুর আতর্থী ছিলেন আলাপচারী শিল্পীদের রাজা। একই ভাবে বিদ্রোহী নজরুল আড্ডার আসরে ছিলেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ, তিনি নাকি তখন কড়িকাঠ ফাটানো হাসি হাসতেন।

আড্ডার স্থান-কাল-পাত্র, সঙ্গে আড্ডাবাজেরা

আড্ডার জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা কালের দরকার হয় না। যখন তখন যেখানে সেখানে আড্ডা শুরু হতে পারে। খোলা আকাশের নিচে খেলার মাঠে, পুকুর ঘাটে, নদীর ধারে, লেকের পাড়ে, চায়ের দোকানে, পার্কে গাছের ছায়ায়, বসার বেঞ্চে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, আড্ডা বসতে পারে। আবার আড্ডা হতে পারে বারান্দায়, ঘরের ভেতরে, ছাদের ওপরে, অফিসের কমন রুমে, কলেজের ক্যান্টিনে, খাওয়ার টেবিলে, হোটেলের লবিতে, রেস্টুরেন্টে, কফি শপে, বইয়ের দোকানে, পত্রিকা দপ্তরে, রঙ্গমঞ্চের পিছনে– কোথায় নয় বলুন তো?

বিশ্ব তো কোন ছাড়, গোটা ভারতে বাংলার মতো এমন আড্ডাস্থল ও আড্ডাবাজ কোথায়! এবারে কিছু সেরা আড্ডাস্থল ও আড্ডাবাজের হালহদিশ নিয়ে খোঁজখবর করা হল। এর পরেও বাকি থেকে গেল অসংখ্য আড্ডাস্থল, বাদ পড়ে গেলেন টেনিদা, ঘনাদা বা ব্রজদার মতো রসদ-জোগানদার এবং হাবুল, ক্যাবলা ও প্যালার মতো অগন্য চরিত্র। তাঁদের সবার কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

বাড়ির আড্ডা

কলকাতার নানা বাড়ি আড্ডার সুবাদে বিখ্যাত হয়ে আছে। এই প্রসঙ্গে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির 'দক্ষিণের বারান্দা'র কথা বলা যায়। সেখানে নানা ধরনের আড্ডা হত। রোটেনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাক্ষাৎ এই বারান্দাতেই।

বঙ্গীয় কলা সংসদের আড্ডা বসত অবনীন্দ্রনাথের বৈঠকখানায়। কখনও চৈতন্য লাইব্রেরিতে।  সেখানে আসতেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অন্নদাপ্রসাদ-সহ সমসাময়িক প্রায় সকল শিল্পী। এই বৈঠকি আড্ডার কোনও সময় ছিল না। নন্দলাল বসুর হাতিবাগানের বাড়িতে আড্ডা দিতে আসতেন তত্কালীন নামী–দামি প্রচুর শিল্পী। ১৯১৯ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত হেমেন্দ্রকুমার মজুমদারের উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটের বাড়িতেও চিত্রশিল্পীদের একটি আড্ডা গড়ে উঠেছিল।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁর ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সের বাড়ির প্রতি রবিবারের আড্ডায় হাজির হতেন কলকাতার বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, প্রবীন ও নবীন সাহিত্যিক দল। বেলা সাড়ে এগারোটা-বারোটা থেকে শুরু হয়ে তিনটে-সাড়ে তিনটে অবধি গড়াত সেই আড্ডা।

কালীঘাটে সদানন্দ রোডে থাকতেন কবি অরুণ মিত্র। তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত আড্ডার আসর বসত। নিয়মিত আসতেন বিজন (গোষ্ঠ) ভট্টাচার্য। গৃহকর্তা সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ছিলেন তাঁর বড় মামা। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত এই আসরে এসেছেন অনেকেই। যেমন, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিনয় ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শম্ভু মিত্র, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সত্যেন্দ্রনাথ রায়, গোপাল ঘোষ, স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য প্রমুখ। ততদিনে 'অরণি' পত্রিকার প্রকাশ ঘটে গেছে। তার সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যয়, রাম বসু, সিদ্ধেশর সেন-এর মত কবিরা। পরবর্তীকালে এই আড্ডা ৪৬, ধর্মতলা স্ট্রিটে ফ্যাসিস্ট-বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের দপ্তরে সরে যায়। এখানে মাঝে মধ্যে আসতেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, চিন্ময় সেহানবিশ, সুধী প্রধান প্রমুখ। ধর্মতলার অফিস থেকে বেরিয়ে অরুণ মিত্র, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিজন ভট্টাচার্য, স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়রা বাড়ি ফেরার পথে ট্রামের সেকেন্ড ক্লাসে বসেও আড্ডা দিতেন। চলত যৌথ গান। পরবর্তীকালে অরুণ মিত্রদের সদানন্দ রোডের এই বাড়ি গণনাট্য সংঘের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।        

রবি ঘোষের বাড়ি ছিল একটা ছোটখাটো আড্ডার বাজার। সেখানে নিয়মিত আসতেন শর্মিলা ঠাকুর-সহ নানা রসিকজন। আড্ডা দেওয়ার ব্যাপারে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মন। একসময় প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই নাকি তাঁর বাড়িতে ম্যারাথন আড্ডার আসরে বসতেন 'এক্ষণ' পত্রিকার সম্পাদক নির্মাল্য আচার্য, আই পি টি-র নির্মল ঘোষ, অভিনেতা রবি ঘোষ প্রমুখ।

প্রথমে লেক অ্যাভিনিউ, পরে ৩ লেক টেম্পল রোড এবং একেবারে শেষে ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডে থাকতেন সত্যজিৎ রায়। বাড়ি বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বাড়ির আড্ডারও স্থানবদল হয়েছে। রবিবার সকালের রায়বাড়ির আড্ডায় উপস্থিত থাকতেন বিভিন্ন পেশার লোকজন। আসতেন রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, কমলকুমার মজুমদার, ডি জি কিমারের বেশ কিছু সহকর্মী, অমল সোম, কালীকিঙ্কর রাহা, বংশী চন্দ্রগুপ্ত, অশোক বসু, সৌমেন্দু রায়, পূর্ণেন্দু বসু, নিমাই ঘোষ, দুলাল দত্ত, টিনু আনন্দ, রবি ঘোষ, তপেন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। প্রতি রবিবারে না হলেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মাসে অন্তত দুটি রবিবারে আসতেন। এই আড্ডার প্রধান আকর্ষণ ছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়। সস্ত্রীক আসতেন চিদানন্দ দাশগুপ্ত। কিছুদিন এসেছেন ও সি গাঙ্গুলি কিংবা হরিসাধন দাশগুপ্তও। সকাল নটা-সাড়ে নটা থেকে শুরু হওয়া আড্ডা গড়াত বেলা একটা-দেড়টা পর্যন্ত। সেখানে শুধু যে গুরুগম্ভীর আলোচনা হত তা কিন্তু নয়, কামু মুখোপাধ্যায় বা রবি ঘোষের হালকা রসিকতা উপভোগ করতেন স্বয়ং সত্যজিৎ থেকে শুরু করে বাকি সবাই। নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে আসত সুরভিত দার্জিলিং চা, ডালমুট ও বিস্কুট। কখনও শিঙারা বা চপ। অন্দর সামলাতেন বিজয়া রায় স্বয়ং।


মেসবাড়ি

কলকাতার আড্ডার ইতিহাস নানা মেসবাড়ির ভূমিকাও আছে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পশ্চিম কোণে 'সাকি' মেস। সেখানে থাকতেন মুকুল গুহ। তাঁর লেখা থেকে জানা যাচ্ছে, সেখানে নাকি আড্ডার তাণ্ডবনৃত্য চলত। মেসে থাকতেন শিল্পী প্রতাপচন্দ্র চন্দ, খেলোয়ার অজয় দাশগুপ্ত, ভাষ্যকার শরদিন্দু দত্ত-সহ অনেকেই। ছন্নছাড়া অথচ আন্তরিক এই আড্ডায় নিয়মিত আসতেন প্রসূন মিত্র, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, শঙ্কর ঘোষ। আসতেন দেবব্রত বিশ্বাস (জর্জদা)ও।

মির্জাপুরে ত্রিপুরা হিতসাধিনী হলের পাশে একটি মেসবাড়িতে তেলেভাজা আর মুড়ি সহযোগে আড্ডায় হাজির থাকতেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, গোকুল নাগ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে। এই আড্ডাকে অনেকে বলতেন কল্লোলীয় আড্ডা।

পত্রিকা দপ্তর

ভাবা যায়, মানসী পত্রিকার অফিসে আড্ডা মারতেন নাটোরের মহারাজ জগদানন্দ রায়! আর আড্ডার মৌতাত জোগান দিতেন বিখ্যাত দুই রাশভারি ব্যক্তিত্ব – প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ও রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। এই আড্ডার দ্বিতীয় অধিবেশন নাকি হত নাটোরের রাজবাড়িতে। আর তা শেষ হতে হতে রাতের তৃতীয় প্রহর হয়ে যেত, যখন শহর নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

পটুয়াটোলার লেনের একটি ছোট্ট দোতলা বাড়ির একটি ছোট্ট ঘরে 'কল্লোল'-এর জন্ম এবং সেটাই ছিল আড্ডাঘর। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, পবিত্র গাঙ্গুলি থেকে শুরু করে অনেকেই আসতেন সে আড্ডায়। তাছাড়া সমসাময়িক 'শনিবারের চিঠি'-র আড্ডার কথাও সর্বজনবিদিত। 'কল্লোল' ও 'শনিবারের চিঠি'- এই দুই আড্ডার রেষারেষি এক সময় নাকি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোয় তাঁর বাড়িতে দুই দলকে ডেকে সাহিত্যের প্রথম 'সামিট মিটিং'-এর ব্যবস্থা করেছিলেন। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের লেখায় 'কল্লোল'-এর আড্ডার কিছু কিছু হদিশ পাওয়া যায়।

'বঙ্গশ্রী' পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে  সন্ধের দিকে আড্ডার আসর জমে উঠত। আসতেন যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, কবিশেখর কালিদাস রায়, জগদীশ গুপ্ত, শিবরাম চক্রবর্তী, বন্দে আলি মিঞা, হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়, রাসবিহারী মণ্ডল, শক্তিপদ রাজগুরু, শুদ্ধসত্ত্ব বসু, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়, প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়, দুর্গাদাস সরকার প্রমুখ। 'অর্থনীতি, সমাজনীতি, বেকারত্ব, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, গ্রহ-নক্ষত্র, স্বপ্নতত্ত্ব, ধর্ম ও দর্শন, চিত্রকলা, যাদুবিদ্যা, কৃষিবিজ্ঞান, ভূ-তত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, সঙ্গীত, মঞ্চ ও চিত্রাভিনয়, নারীপ্রগতি, বিবাহ ও লোকচরিত্র প্রভৃতি সবই ছিল আড্ডার আলোচ্য বিষয়; সঙ্গে কিছু টীকা-টীপ্পনি হাস্যরস।'

'যুগান্তর' পত্রিকা দপ্তরের কেন্দ্রমণি ছিলেন পরিমল গোস্বামী। আসতেন দাদাঠাকুর, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল, বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়, মণীশ ঘটক (যুবনাশ্ব) ইত্যাদি ব্যক্তিত্ত্ব। এইরকম পত্রিকা দপ্তরের আড্ডা হত আরও অনেক জায়গায়। যেমন, 'দৈনিক নবযুগ' পত্রিকায় কাজি নজরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত আড্ডার আসর।

কলেজ স্ট্রিটের একটা এঁদো বিশাল বাড়ির এক কোণের এক চিলতে ঘরে ছিল 'চতুষ্কোণ'-এর অফিস। দেয়ালের দিকে দুটি ছোট ছোট টেবিল, দুটো চেয়ার আর সামনে গোটা আটেক চেয়ার। এখানেও দারুণ আড্ডা জমত। আসতেন তত্কালীন লিটল ম্যাগাজিনের লেখক ও কবিকূল।

আড্ডা হত 'পরিচয়' পত্রিকা দপ্তরেও। থাকতেন বিষ্ণু দে, সুধীন দত্ত, গোপাল হালদার, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখার্জি এবং পরবর্তীকাল দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, দেবেশ রায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সিদ্ধেশ্বর সেন, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রমুখ।

'কৃত্তিবাস'-কে ঘিরে একসময় উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল বাংলা সাহিত্যে। শক্তি-সুনীল-সন্দীপন-শ্যামল-দীপক-সমরেন্দ্র-শরৎ-ভাস্কর-বেলাল এবং আরও অনেক তত্কালীন তরুণ তুর্কীর সেই জমাটি আড্ডা তো ইতিহাস হয়ে থাকবে।

প্রকাশনা দপ্তর  

বিংশ শতকের প্রথমদিকে কলেজ স্কোয়ারের পিছন দিকে ছিল 'বুক-কোম্পানি' নামে এক বইয়ের দোকান। ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে বই আসত এখানে। পেছন দিকে গুদামঘরে নতুন বইয়ের বিচিত্র গন্ধের মাঝে জাহাজ থেকে আসা বাক্স ভর্তি বই আর মেঝেতে ছড়ানো মোটা মোটা কাগজকে আসন বানিয়ে আড্ডা দিতেন ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কিংবা প্রমথ চৌধুরির মতো ব্যক্তিত্ব। বুক-কোম্পানির ভেতরের ছোট্ট একটা ঘরে আড্ডা দিতেন মালিক গিরিনবাবু, আনন্দবাজারের সুরেশচন্দ্র মজুমদার এবং আরও অনেকে।

মিত্র ও ঘোষের দোকানে আড্ডা দিতে আসতেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমল মিত্র, নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নীহারঞ্জন গুপ্ত প্রমুখ। স্বয়ং গজেন্দ্রকুমার মিত্র মহাশয় তো থাকতেনই।

এম সি সরকারের দোকানের আড্ডার কথা অনেকেই জানেন। মধ্যমণি ছিলেন মালিক সুধীরচন্দ্র সরকার, বাইরে গম্ভীর প্রকৃতির হলেও অন্তরে তিনি ছিলেন শিশুর মতো। বহু শিল্পী ও সাহিত্যিককে সেখানে দেখা যেত। আসতেন প্রবাসী সম্পাদক কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়, তুষারকান্তি ঘোষ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রবোধ কুমার সান্যাল, শিবরাম চক্রবর্তী, মনোজ বসু, ভবানী মুখোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ মিত্র, সুশীল রায় এবং আরও অনেকে।

থিয়েটার

থিয়েটারের রঙ্গমঞ্চের আড়ালে আড্ডা দিতেন অভিনেতা শিশিরকুমার ভাদুড়ি। সমাজের তাবড় হোমড়া-চোমড়াদের সঙ্গে সেই আড্ডার দুর্নিবার আকর্ষণে ছুটে আসতেন স্বয়ং শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও। আড্ডাধারীদের কাছে শিশিরকুমারের পরিচয় ছিল সুধাদা নামে। শোনা যায়, শরত্চন্দ্রের ইচ্ছে ছিল বিস্ময়কর ও বিচিত্র ব্যক্তিত্বের সুধাদার চরিত্র অনুসরণে কোনও সাহিত্য সৃষ্টির।   

পরবর্তীকালে নাট্যকার ও পরিচালকদের আড্ডা বসত শ্যামবাজারের মোড়ে পবিত্র পাঞ্জাবি রেস্টুরেন্টে। আশেপাশের রিহার্সাল রুম থেকে রিহার্সাল সেরে বিভাস চক্রবর্তী কিংবা অশোক মুখোপাধ্যায়ের মতো গ্রুপ থিয়েটারের পরিচালকরা আড্ডায় আসতেন। নাটক নিয়ে আড্ডা হত।

রেষ্টুরেন্ট ও কফি হাউস

কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস যেন আড্ডার মক্কা। কোন আড্ডাবাজ এখানে আড্ডা দিতে আসেননি সেটাই বিস্ময়ের। বছরের পর বছর ধরে বাঙালির আড্ডা-মানচিত্রে কফি হাউস এক ও অদ্বিতীয় হয়ে রয়েছে। এই আড্ডার একটা চিত্র দিই।

পঞ্চাশের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে জাঁকিয়ে বসে থাকতেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, হিরণ সান্যাল, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়েরা। আরও কিছু পরে যুক্ত হলেন শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, শঙ্কর দে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, উত্পলকুমার বসু, দীপক মজুমদার, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, বেলাল চৌধুরি, অরবিন্দ গুহ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শেখর বসু, রমানাথ রায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, নিখিল সরকার, সুব্রত চক্রবর্তী, ভাস্কর চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত-সহ আরও অনেকে। এই সময়কার মহিলা আড্ডাবাজদের মধ্যে কৃষ্ণা মিত্র, মীনাক্ষী সরকার, সন্ধ্যা বসু, প্রণতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম করা যেতে পারে। টেবিল ভাগাভাগি করে আড্ডা হত তখন। রবিবার বেলা ১০-১১টা নাগাদ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আড্ডা দিতেন নির্মাল্য আচার্যের সঙ্গে। তাঁদের ওখানেই আসতেন চিত্তরঞ্জন ঘোষ, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, কেয়া চক্রবর্তী কিংবা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়।

যাঁদের কথা লিখলাম এঁরা যে সবাই প্রতিদিন আড্ডায় আসতেন এমন নয়, তা ছাড়া কেউ কেউ হয়ত কলকাতার বাইরেও থাকতেন। কিন্তু সময় ও সুযোগ মিললে তাঁদের এই তীর্থস্থান একবার ঘুরে দেখা চাই-ই চাই। এই ছিল আড্ডাবাজদের মনের অন্দরের কথা। আর সেই আড্ডার ধারা আজও অব্যাহত আছে।

রাধাপ্রসাদ গুপ্তের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে, ১৯৪৫-৪৬ সালে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ কফি হাউসে জমাটি আড্ডা বসত। এখানে লাঞ্চের সময় নিয়মিত ভাবে যাঁরা আড্ডা দিতে আসতেন তাঁরা হলেন – সত্যজিৎ রায়, কমলকুমার মজুমদার, চঞ্চলকুমার চট্টোপাধ্যায়, পৃথ্বীশ নিয়োগি, বংশী চন্দ্রগুপ্ত, হরিসাধন দাশগুপ্ত, কালিসাধন দাশগুপ্ত, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, সত্যেন মৈত্র, সুভাষ ঘোষাল, কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রনেন রায়, প্রতাপ রায়, জেড এইচ (বান্টি) খান প্রমুখ। মাঝে মধ্যে দেখা যেত পরিতোষ সেন, শুভো ঠাকুর, প্রদোষ দাশগুপ্ত, গোপাল ঘোষকেও। একটা টেবিলে নাকি নিয়মিত এসে আড্ডায় মাততেন তত্কালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চিফ সেক্রেটারি-সহ সব বড় বড় আমলারা।

এই আড্ডা নিয়ে রাধাপ্রসাদ গুপ্ত লিখছেন, '.. সেই টেবিলে যে দুনিয়ার কত জিনিস নিয়ে কতরকমের আলোচনা হত তার কোনও ইয়ত্তা ছিল না। .. হলিউড আর বিলিতি ফিল্ম ছাড়া ইউরোপীয় চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের আড্ডায় যে সব সে সময় কথাবার্তা হত তখন ভারতের অন্য জায়গায় বিদগ্ধ বাবুরা তা নিয়ে ভাবতেই শুরু করেন নি। .. ' ফিল্ম সোসাইটি তৈরির ভাবনা প্রথম সেখানেই শুরু হয়েছিল। 'দি রিভার' ছবির স্যুটিং চলাকালীন স্বয়ং জা রেনোয়া ওই আড্ডাস্থলে বারকয়েক আসেন। আসতেন মৃনাল সেন, অম্লান দত্ত, হামদি বে, গৌরকিশোর ঘোষ ছাড়াও রবি সেন, সমর সেন, অশোক মিত্র, শেখর চট্টোপাধ্যায়, উত্পল দত্ত প্রমুখ।

দেশপ্রিয় পার্কের 'সুতৃপ্তি', কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের 'বসন্ত কেবিন' কিংবা উত্তরের 'ফেভারিট কেবিন'-এ চায়ের কাপে তুফান তোলা আড্ডা জমত। আড্ডা হত দক্ষিণের 'স্যাঙ্গুভ্যালি'-তেও। সুতৃপ্তি-র রবিবারের সকালের চমৎকার আড্ডায় জমায়েত হতেন মূলত দক্ষিণ কলকাতায় থাকা লেখকরা। শংকর চট্টোপাধ্যায়, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্র আচার্য, প্রলয় সেন প্রমুখ।

শিল্পী ও সাহিত্যিকদের কাছে এসব ছিল নিজস্ব ভুবন। গড়িয়াহাটার মোড়ে 'পানিয়ন' বলে একটি রেস্টুরেন্টে জমাটি আড্ডার আসরে মধ্যমণি ছিলেন কমলকুমার মজুমদার। আসতেন উত্পল দত্ত, রবি ঘোষ, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, এন বিশ্বনাথন, শেখর চ্যাটার্জি। কমলকুমারের আকর্ষণীয় কথায় উঠে আসত শিল্প-সাহিত্য-ইতিহাস-ভূগোল ও আরও নানা বিষয়।

চা দোকান

কত অসংখ্য অকিঞ্চিত্কর চা-এর দোকানে যে কত মহান আড্ডা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। একটা উদাহরণ।

কালিঘাট ট্রাম ডিপোর উল্টোদিকে এক চায়ের দোকানে আড্ডা দিতেন সাগরময় ঘোষ। দক্ষিণ কলকাতায় থাকেন এমন অনেক সাহিত্যিক সেখানে জমায়েত হতেন নির্ভেজাল আড্ডার লোভে। যেমন, চেতলা থেকে বিমল মিত্র, ট্রাম ডিপোর উল্টোদিকের অমৃত ব্যানার্জি রোড থেকে রমাপদ চৌধুরি, চারু অ্যাভিনিউ থেকে হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় আর ব্যতিক্রমী ব্যাঙ্কের কেরানি কিন্তু সাহিত্যানুরাগী বিশুদা ওরফে বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়। আশ্চর্য হলেও যেটা সত্যি তা হল এই বিশুদাই ছিলেন আড্ডার মধ্যমণি। সন্ধে সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে সবাই এসে হাজির হতেন সেখানে। আর রবিবারে নিয়মিত ভাবে আড্ডা বসত সকালবেলায়। সকালের আড্ডায় আসতেন শচীন বন্দ্যোপাধ্যায় বা স্বরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়।

পার্ক

কলকাতার নানা পার্কে আড্ডা হত। এখনও হয়। একটা উদাহরণ দিই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমল কর আনন্দবাজার দপ্তর থেকে বেরিয়ে আগের মতো কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের বসন্ত কেবিনে না গিয়ে তরুণ ও মধ্যবয়সি লেখকদের সঙ্গে কার্জন পার্কের সবুজ ঘাসের ওপরে বসে আড্ডা দিতেন। তার আগে কে সি দাশের চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়া হত। বেশির ভাগ দিন বিমল কর নিজেই চায়ের দাম মেটাতেন। সেই আড্ডায় থাকতেন সমরেশ মজুমদার, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, সুধাংশু ঘোষ, সত্যেন্দ্র আচার্য, প্রলয় সেন, অভ্র রায়, সুব্রত সেনগুপ্ত, রমানাথ রায়, শেখর বসু, কণা বসু মিশ্ররা।

চিত্রশিল্পীদের আড্ডা  

পার্ক স্ট্রিটে বেঙ্গল ল্যান্ড হোল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন বা জমিদার সভার ঘরে ছবির প্রদর্শনীর পাশাপাশি নিয়মিত আড্ডা দিতে আসতেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূলত সুভো ঠাকুরের উদ্যেগে গঠিত 'ক্যালকাটা গ্রুপ'-এর ৫, এস আর দাস রোডের ঠিকানায় রথীন মৈত্র, প্রাণকৃষ্ণ পাল, নীরদ মজুমদার, প্রদোষকুসুম দাশগুপ্ত প্রমুখ শিল্পীদের আড্ডায় ভিড় করতেন শাহেদ সুহরাবর্দী, জন আকুয়িন, বিষ্ণু দে, বিনয় সরকার, নীহাররঞ্জন রায়, স্নেহাংশুকান্ত আচার্য।

ধর্মতলার মোড়ে জি সি লাহার দোকানের উল্টোদিকে অধুনালুপ্ত 'নিউইয়র্ক সোডা ফাউন্টেন'-এ ছিল চিত্রী আর ভাস্করদের প্রাধান্য। শুভাপ্রসন্নের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে যে সেখানে নিয়ম করে আসতেন গনেশ পাইন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে এসেছেন মুস্তাফা মানোয়ার, সাহাবুদ্দিন, কামরুল হাসান। তাছাডা় তখনকার তরুন চিত্রীদের মধ্যে সেখানে নিয়মিত দেখা যেত রবিন মণ্ডল, সুহাস রায়, সুনীল দাসদেরকে। 'সোসাইটি অফ কনটেম্পোরারি'র সদস্যরা, ক্যালকাটা পেন্টার্সদের প্রায় সব সদস্যদেরই আনাগোনা ছিল এই ঠেকে।' অনিয়মিত ভাবে আসতেন অহিভূষণ মালিক, শ্যামল দত্তরায় কিংবা গৌরকিশোর ঘোষ।

আকাশবাণী

একসময় 'আকাশবানী'কে ঘিরে বিস্তর আড্ডা হয়েছে। তখন বাঙালির সাংস্কৃতিক  কর্মকাণ্ডের অন্যতম শরিক ছিল 'আকাশবানী' দপ্তর। কবিতা সিংহ জানাচ্ছেন, 'দাদাঠাকুর ছিলেন এই আড্ডার ধূমকেতু জ্যোতিষ্ক। এলেই মাত।'  সেখানে যাঁরা আসতেন তাঁদের অনেকেই ছিলেন অন্তরাল এবং মঞ্চের সেলিব্রিটি। যেমন ধরুন, হীরেন্দ্রনাথ বসু, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, বাণীকুমার, মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, পঙ্কজকুমার মল্লিক, রাইচাঁদ বড়াল, সুরেশ চক্রবর্তী, কাজি নজরুল ইসলাম প্রভৃতি। আর এঁদের ডাকে মধ্যে মধ্যে আড্ডায় এসে হাজির হতেন পরিমল গোস্বামী, সজনীকান্ত দাস, নিরোদ সি চৌধুরি, এন কে জি, নলিনীকান্ত সরকারের মতো ব্যক্তিত্ব। এই আড্ডায় বসে গান বাঁধতেন নজরুল। নতুন নাটকের মহড়া দিতেন বাণীকুমার-বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। 'আর চলত পান আর চা। চা আর পান। চাপান-উতোর। উতোর-চাপান।'

আড্ডা দিতে দিতেই একদিন কেয়া চক্রবর্তীকে দিয়ে পড়িয়ে নেওয়া হয় চার চরিত্রের একটি কাব্য নাটক। বিমল মিত্রকে দিয়ে গাওয়ানো হয় গান।

প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ হিসেবে চিত্র পরিচালক প্রভাত মুখার্জি, অভিনেতা বিকাশ রায়, অতুল মুখোপাধ্যায়, সবিতাকুমার মিত্র মুস্তাফি প্রভৃতি এবং প্রোডিউসার হিসেবে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, ভি জি যোগ, দীপালি নাগ চৌধুরি, লীলা মজুমদার প্রমুখ আসতেন। এঁরা এলে কাজের পাশাপাশি আড্ডাও হত। 'যুববাণী' দপ্তরে আড্ডা মারতে আসতেন তখনকার নতুন প্রজন্ম।

দীপ্তেন্দ্রকুমার সান্যাল চমত্কার 'পান' করতে পারতেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একদিন খুব বাজে (অকথ্য তেতো) চা এল। দীপ্তেন্দ্রবাবুর মন্তব্য ছিল এইরকম –

"যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই

যাহা পাই তাহা 'চা'ই-ই না।"

কৃতজ্ঞতাঃ কলকাতার আড্ডা (সমরেন্দ্র দাস সম্পাদিত)

(লেখাটি 'আজকাল সুস্থ' পত্রিকার অক্টোবর ২০১৫ সংখ্যায় কভার স্টোরি হিসেবে প্রকাশিত হয়। কভার স্টোরির বিষয় ছিল 'আড্ডা'।)

মঙ্গলবার, ২ অক্টোবর, ২০১৮

পানি ~ ডা: রেজাউল করীম

সম্প্রতি একজন লিখেছেন যে "বাংলা ভাষায় জল কি করে যেন পানি হয়ে গেল"। আসলে পানি শব্দটি খাঁটি তৎসম শব্দ পানীয় থেকে এসেছে বলে শ্রী দীনেশ চন্দ্র সেন মহাশয় লিখেছেন। বাংলা ভাষা নিয়ে ছুৎমার্গ না করলেও বাংলা শব্দ ভাণ্ডারে বিদেশী ভাষার পরিমান মাত্র ৭শতাংশ বলে ভাষাচার্য্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন। ৩৩০০০ হাজার শব্দে তিনি মাত্র ২৫০০ বিদেশী শব্দ পেয়েছিলেন। 
অধুনা সমাজে প্রাত্যহিক সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার হয়েছে। তারা কেউ ধর্ম সাম্প্রদায়িক নন, ভাষা সাম্প্রদায়িক। আত্ম সচেতন বাঙালী তাই ভাষা নিয়ে সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছে। অনেকে তথাকথিত মুসলমানী শব্দ যথাসম্ভব পরিহার করার চেষ্টা করছেন। এর ভালমন্দ বিচার করার ক্ষমতা ও রুচি কোনটাই আমার নেই। কিন্তু, তবু বলবো ভাষার ভেতর হিন্দু-মুসলিম খোঁজা একরকম পশ্চাদ-যাত্রা। মিশ্র শব্দের ঐতিহাসিক যুক্তি আছে, তা অস্বীকার করা পুরোপুরি বোকামি।
একটা কাল্পনিক কথোপকথন উল্লেখ করে মিশ্র ভাষা নিয়ে আলোচনা করা যায়। 
-আনাজের দাম খুব বেড়েছে। বাজারে যেতে ভয় করে । কারখানায় লকআউট। বঙ্কিমবাবু টেবিল থেকে খবরের কাগজ খানা খুলে খুব মন দিয়ে শেয়ার বাজারের উঠানামা দেখতে থাকলেন।মাগ্গি-গণ্ডার বাজারে আখরোট কাঠের টেবিলটাও এবার বেচে দিতে হবে।  নাকের উপর চশমাখানা সেঁটে বেশ তরিবত করে খবরের আগাপাস্তালা খুঁজলেন। না: যতরাজ্যের বাজে ছাইপাঁশ কেচ্ছা, আসল খবরের নাম ও নিশান নেই। আরে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, সেটা নিয়ে লেখ! তবে বুঝবো এলেম আছে! তা নয়, যতসব বেআক্কেলে বদমাশ!রান্নাঘর থেকে থলেটা নিয়ে সাইকেলে করে বাজারের দিকে চললেন। ফতেমা বিবির কাছে শাকটা কেনেন। আজ আর ইচ্ছা করলো না। পাউরুটির দোকানে গেলেন। সেখান থেকে গেলেন আনারস কিনতে। বালতিটা কদিন ধরে ফুটো হয়ে গেছে। মেথরটা নতুন বালতির কি ছিরি করেছে। বাজার হল। এবার আদালতে যেতে হবে। আইন কানুন জানে এমন একটা উকিল জোগাড় হয়েছে। মুসাবিদা তৈরী, শুধু দস্তখত বাকি। দেওয়ানী মামলা, দারোগা-পুলিশের ব্যাপার নেই, কিন্তু মহকুমা আদালতের মুন্সেফকে কব্জা করা যায় না। বঙ্কিমবাবু আলমারী খুলে তুরুপের তাসটি বার করতে গিয়ে আলপিনের খোঁচা খেয়ে খেই হারিয়ে তোশকের উপর বসে পড়লেন। 
এই কাল্পনিক কথোপকথনে কমপক্ষে পন্চাশটি বিদেশি ও মিশ্র শব্দ আছে। আর হ্যাঁ, কাকা, বাবা ও বিবি শব্দগুলি তুর্কি শব্দ। বাবু ফার্সি। বিদায় শব্দটি আরবী। বাবা শব্দটি আরবী থেকে তুর্কিতে প্রবেশ করেছে। বই শব্দটিও যতদূর জানি আরবী। সুনীতিবাবু বলেছেন বাংলা ভাষায় মাত্র ৪০টি তুর্কি শব্দ আছে, কিন্তু প্রতিটিই মোক্ষম।

রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

নবাবের বাঘ শিকার ~ দ্বৈপায়ন ঘোষ

নবাব সাহেবকে ডাকা হয়েছে বাঘ মারতে। মানুষ খুব রেগে গেছে। এদেশে, বিদেশে সই সাবুদের হিড়িক উঠেছে, আবার তা সময়ের নিয়মে কমেও গেছে। ফেসবুকেরর দৌলতে এক শ্রেণীর মরসুমি সংরক্ষণ-পন্থী তৈরি হয়েছে, যাদের সময় সময় দাবী পায়। আবার দাবী জানানোর সাথে সাথে সেই দাবীর চাপ কমতে কমতে দাবী বন্ধ হয়ে যায়। তারপর নতুন দিন, নতুন দাবী পাওয়া। আগের দিনের দাবী ফ্ল্যাশের জলে ধুয়ে সারা। এই যেমন বছর তিনেক হবে, জোর দাবী পেল উস্তাদ (T-24) নিয়ে। হ্যাশ ট্যাগ আন্দোলন, #Free_Ustad, #Boycott_Ranthambore ইত্যাদি। উস্তাদ আজও উদয়পুরের খাঁচায় আর রণথম্ভোরের দুর্গের সামনে পুরনো দাবী ধুয়ে জনগণ ক্যামেরা হাতে আগের মতই। নবাব সাহেব নিয়েও একই রকম হতে চলেছে বিষয়টা। এখনই দাবীর বেগ কমতে শুরু করেছে, তাই এই বেলা কিছু কথা বলে রাখি, কদিন পরে আর এই কথা গুলর relevance থাকবেনা।
কে এই নবাব সাহেব, আর মানুষ তার উপর রেগেই বা গেল কেন? মহারাষ্ট্রে এক বাঘ মানুষ মারছে। দুবছরে ১৩ জন মানুষকে মেরে খেয়েছে এই জংলী বাঘ (T-11)। কি আর করা যাবে? জঙ্গল কেটে বাঘের ঘড়ে মানুষ ঢুকছে, বাঘে-মানুষে টানাটানি তো হবেই। টানাটানির জোর ইদানীং যা বেড়েছে, দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার যোগার। তাই অবিলম্বে বাঘ ও মানুষকে দুরে সরাতে হবে। Football মাঠে ঝগড়া বাধলে যেমন refereeরা করে। মহারাষ্ট্রের PCCF লোক ডাকলেন। মধ্যপ্রদেশ থেকে পশু চিকিৎসকরা এলেন, আর এলেন নবাব সাহেব। নবাব সাফাত আলী খান, বাড়ি হায়দ্রাবাদ, একজন পেশাদার শিকারি। বছর দুই আগে বিহারে তিন দিনে ২৫০ নীলগাই খুন করা কীর্তিমানদের একজন এই নবাব। তার কীর্তি তাতেই সীমিত নয়। বেআইনি অস্ত্রের কারবারে ধরা পরেছিলেন নব্বইয়ের দশকের গোঁড়ায়। ২০০৫ এ আবার ধরা পরেন বেআইনি shooting expedition এর দায়ে। অস্ত্র ও বণ্যপ্রাণের বেআইনি ব্যবসার নবাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তাঁর private property তে high profile client দের trophy hunting এর সুযোগ করে দেন। দুবছর আগে হিমাচল প্রদেশে এক মানুষখেকো বাঘ শিকারে নিযুক্ত হয়ে দুটো নিরপরাধ চিতাবাঘ মেরে নিজের trophy cabinate সমৃদ্ধ করেছেন এই নবাব। বার বার ওঠা অভিযোগের মধ্যে আছে নবাবের কুখ্যাত trophy hunter হওয়ারই ইঙ্গিত। এহেন কুখ্যাত শিকারিকে তবু বার বার ডেকে আনে আমাদের রাষ্ট্র ও তার ব্যবস্থা, কখনও আমলাতন্ত্র আবার কখনও বিহারের JD(U) বিধায়ক। আমরা প্রতিবাদ করি দুদিন, আবার সব ভুলে যাই।
ছবি সংগৃহীত...

প্রশ্ন ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী


আর কার কার কাছে মাথা নীচু করতে হবে বলো
তালিকা তৈরি হোক এক ... দুই ... তিন ... চার ... পাঁচ ...
কোন মৃতদেহ দেখে, না দেখার চারু ভান করে
সযত্নে পালাতে হবে। দোষনীয় কাদের ছোঁয়াচ!

কোন মন্ত্র উচ্চারণ নিষিদ্ধ  ... থাকব নীরবে
তোমার নির্দেশ পেলে ঠিক কোন গান গাইতে হবে।
বলো হে সমস্ত বলো, মুঠোভরা আছে কত ভয়?
বর্তমান জেনে নিক ভবিষ্যৎ কত অনিশ্চয়! 

মানচিত্রে এঁকে দাও এ স্বদেশ কতটা প্রবাস।
তবে না শাসক তুমি। তবেই না আমি ক্রীতদাস!

একটাই "কিন্তু" আছে এই গল্পে, সেটা তুমি জানো
তোমার এই রাজ্যপাট, ক্ষমতায় সাজানো গোছানো
সমস্ত অর্থহীন, যদি আমি এ'খানে না থাকি ...

গণতন্ত্র বলে দাও, আর কত খাজনা দেওয়া বাকি?

শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

মাঝেরহাট ব্রিজ ও নীল-সাদা ধ্বংসস্তূপ ~ কাজল মল্লিক



সম্প্রতি মাঝেরহাট ব্রিজের ভেঙে পড়া বাস্তবের ট্র্যাজেডির পাশাপাশি গুরুত্ত্বপূর্ণ প্রতীকী মূল্য বহন করে | কয়েক বছর ধরে যে একের পর এক সেতু ও উড়ালপুল ভেঙে পড়ছে, এবং ব্রিজের তলা দিয়ে বা ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় শহরবাসীর যে হঠাৎ করে সেসব কথা মনে পরে যাচ্ছে ও সে প্রযুক্তির কিছু না বুঝেও অসহায়ভাবে ব্রিজের শরীরের দিকে তাকাচ্ছে এ যাত্রা বেঁচে যাবে কিনা বোঝার জন্য এই ব্যাপারটা এই সময়ের একটি যুগচিহ্ন মাত্র, একটি শক্তিশালী যুগচিহ্ন | 

বস্তুতঃ, রাজ্যের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় প্রায় সবকিছুই ভেঙে পড়েছে | অন্য সবকিছু ভেঙে পড়ার দৃশ্য যদিও ব্রিজের মতো অতটা নাটকীয় ও ট্র্যাজেডি অতটা অকস্মাৎ ও তাৎক্ষণিক নয়, সেসব ভেঙে পড়া অনেক ক্ষেত্রেই উপড়ে আনার চেষ্টা করছে আরো অনেক গভীর শিকড়, তাদের অভিঘাত আরো অনেক গভীরে নিহিত |

এই সরকার আসার পরে প্রথমেই যেটা ভেঙে পড়েছে সেটা গণতন্ত্র | গণতন্ত্র শব্দটা বড়, তাই একটু ভেঙে বোঝা দরকার | একদিকে গেছে সরকার ও তার প্রধানকে প্রশ্ন করার অধিকার | খবরে আসা কিছু উদাহরণ সবারই মনে আছে, ডাক্তার শ্যামাপদ গড়াই দিয়ে শুরু, তারপর সারের দাম বাড়ছে কেন জিগেস করে কৃষক শিলাদিত্য, পার্ক স্ট্রিটকাণ্ডে কিছু একটা অপরাধ হয়েছে বলে মনে হয় শুধু এইটুকু বলার জন্য পুলিশ অফিসার দময়ন্তী সেন, রাস্তাঘাটে নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে প্রশ্ন করে প্রেসিডেন্সির ওই ছাত্রী, ডেঙ্গু-কে অজানা জ্বর লিখতে না চেয়ে ডাক্তার অরুণাচল দত্তচৌধুরী, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি | এছাড়া খবরের বাইরে থাকা অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত যেখানে বিরোধী রাজনীতি করার "অপরাধে" হুমকি প্রলোভন আক্রমণ ও মিথ্যা মামলার সামনে পড়তে হচ্ছে অসংখ্য রাজ্যবাসীকে |

গণতন্ত্র ভেঙে পড়ার আরেকটি সহজবোধ্য দিক হচ্ছে নির্বাচন উঠে যাওয়া | কোথাও কোথাও সরাসরি, যেমন ইস্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় অফিসের বিভিন্ন কমিটি ইত্যাদি | নির্বাচন উঠিয়ে দাও বা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দাও আর ততদিন দলীয় লুটের রাজত্ব বজায় রাখো | আর বড় নির্বাচনগুলো, বিধানসভা পৌরসভা পঞ্চায়েত, যেগুলো আক্ষরিকভাবে উঠিয়ে দেওয়া মুশকিল, সেগুলো কার্যত উঠিয়ে দাও | প্রথমে ভয় দেখাও যাতে লোকে বিরোধীদলের প্রার্থী হতে না চায়, তাতে যাদের বাগে আনা যাবেনা তাদের দলীয় কর্মী তথা গুন্ডা দিয়ে মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দাও (পুলিশ ঠুঁটো জগন্নাথ, সুতরাং কিছু বলবে না বা গুন্ডাদেরই সাহায্য করবে), তাতেও না হলে ভয় দেখিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করাও | এরপর তো নির্বাচনের দিন তাণ্ডব আছেই - হাতে বালা গলায় মালা কোমরে বন্দুক মুখে শাসানি নিয়ে নেতা থেকে ক্যাডার সবাই নেমে পড়বে | আর যাদের নামার কথা অর্থাৎ পুলিশ তাদের দেখা যাবেনা! এরপর নির্বাচন কমিশনকে নালিশ জানালে তারা সাকুল্যে আড়াইখানা বুথে পুনর্নির্বাচন করবে যেগুলোয় আবার সেরকম গোলমাল হয়নি! আর যেহেতু বড় দেশ, তাই এই সবকিছুর পরও কতিপয় বিরোধী প্রার্থী জিতবে | তাদের জন্য শেষ অস্ত্রটি ছাড়া হবে - যারা এতো বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ঝুঁকি নিয়ে এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ভোটে জিতলো, কোনো এক আশ্চর্য কারণে তারা ভোটের দু-চারদিন পরেই "উন্নয়নে" মুগ্ধ হয়ে দল পাল্টে তৃণমূলে যোগ দেবে !

দ্বিতীয় যেটা এই সরকারের আমলে উঠে গেছে সেটা প্রশাসন | আগের অংশেই পরিষ্কার, ভোটের সময় বা অন্য যেকোনো সময়, তৃণমূলের গুন্ডারা যাই করুক, পুলিশ কিছু বলবেনা, এটাই দস্তুর | অন্যান্য "স্বাধীন" কমিশন ফমিশন যা আছে - নির্বাচন মানবাধিকার মহিলা ইত্যাদি - যাদের আদতে সরকার বেআইনি বেপরোয়া কিছু করছে কিনা এটাই দেখার কাজ, সেখানে সব পেটোয়া লোক বসানো আছে, তারা সব দেখেশুনে বলবে কিছু হয়নি |

এরপর যেটা ভেঙে পড়েছে সেটার গুরুত্ত্ব আরও অনেক ব্যাপক, শিকড় অনেক গভীরে | সেটা মূল্যবোধ | আমাদের সমাজে আর যাই হোক কিছু সাধারণ মূল্যবোধ টিকে ছিল, যেমন চুরি করা খারাপ, লোক ঠকানো খারাপ, মিথ্যে কথা বলা খারাপ ইত্যাদি | তৃণমূলের কল্যাণে এখন সেসব উঠে গেছে | তাই ক্যামেরার সামনে ঘুষ নিতে গিয়ে ধরা পরেও নেতারা – ডাক্তার অধ্যাপক থেকে ডকের মাফিয়া – হাসতে হাসতে ঘুরে বেড়াচ্ছে | প্রথমে বললো ভিডিও জাল, তারপর সেটা পরীক্ষা করে ঠিক প্রমাণ হওয়ায় বললো টাকা নিয়েছি ঠিকই, কিন্তু ও অনুদান, তারপর কিছু বলাও ছেড়ে দিলো, কারণ এই জমানায় ওসবে কিছু এসে যায়না | সারদা রোজ ভ্যালির টাকা কোথায় গেলো সে তদন্ত তো চলছে চলবে, পুলিশ প্রমাণ নষ্ট করতে সাহায্য করবে, বিজেপি নিজের স্বার্থে তৃণমূলকে হাতে রাখতে তদন্ত শেষ করতে দেবেনা, আর তার মধ্যে প্রান্তিক সর্বস্বান্ত মানুষের মিছিল বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যাবে | আর "ইস্ট জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের" "ডক্টরেট"-এর হাত ধরে যে যাত্রার শুরু, সেখানে প্রতি পদে মিথ্যা বলাটাকে তো আর কোনো অন্যায় বলা যায়না | চুরি করা, লোক ঠকানো, মিথ্যে বলা এসব যে আগে ছিল না তা নয়, কিন্তু অপরাধীরা আগে অন্তত ধরা পড়লে বুক ফুলিয়ে ঘুরতো না, লজ্জায় মুখে অন্তত একটা কাপড় ঢাকা দিতো, এখন এই সমস্ত অপরাধীরাই – পাড়ার গুন্ডা চোর ডাকাত – ক্ষমতায়, সেই কাপড়টা উঠে গেছে, কারণ সাধারণ মূল্যবোধ ভেঙে গেছে | এই মূল্যবোধ ভেঙে যাওয়ার আরও অনেক দিক আছে, কয়েকটা কিঞ্চিৎ সূক্ষ্ম, যেমন নির্লজ্জ আত্মপ্রচার, ইত্যাদি | দিকে দিকে অনুপ্রেরণার হোর্ডিং আর ছবি, এমনকি রবীন্দ্র সদন  নন্দনের সামনেও বিশাল ফলক, নবরূপে চত্বরের উন্মোচন করলেন মুখ্যমন্ত্রী, ইত্যাদি আরো অসংখ্য উদাহরণ | এই পাগলের মতো আত্মপ্রচারে মনের যা ক্ষতি আর দৃশ্যের যা দূষণ হয়, সেটা বোঝা শাসকদলের নেতানেত্রীদের মানসিক ক্ষমতার অনেক যোজন ওপর দিয়ে যায়, বলাই বাহুল্য, কিন্তু প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় রাজ্যবাসীকে | সৌভাগ্যবশতঃ আর সব গেলেও অন্তত হিউমার-নামক বস্তুটি এখনো বাঙালিকে ছেড়ে যায়নি, তাই এই সব ব্যাপার নিয়ে সামান্য কৌতুক রচনাই বাঙালির বাঁচার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও সে-ব্যাপারে হিসেবে সামান্য গোলমাল হলে অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্রর হালও হতে পারে! উদাহরণ আরো অসংখ্য দেওয়া যায়, তালিকা দিতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে, তার প্রয়োজন নেই, বুদ্ধিমান পাঠক বুঝে নেবেন |

আমাদের চোখের সামনেই ভেঙে পড়লো আমাদের রুচি, জ্ঞান ও নান্দনিকতার বিচার | এটা মূল্যবোধের সঙ্গেও যুক্ত | যে যার পছন্দ মতো গান শুনবে, বই পড়বে, সেটা আরেকজনের পছন্দ হোক বা না হোক, এটা চিরকালই ছিল | কিন্তু ভুল তথ্য, ভুল ও কদর্য ভাষা-ব্যবহার, বাছাই-করা রদ্দি সংস্কৃতির এমন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মহোৎসব আগে কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না (সিদ্ধার্থ রায়ের আমল দেখিনি তবে শুনেছি সেও এক ভয়ঙ্কর সময় ছিল, যাঁরা দেখেছেন তাঁরা বলতে পারবেন বর্তমান সময়ের সঙ্গে কতটা  তুলনীয়) | ডহরবাবু দিয়ে শুরু, তারপর তো তালিকা দিয়ে শেষ করা যাবে না, সঙ্গে আবার সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে বহুল প্রচারিত সব কবিতাও আছে | যেন অশিক্ষা অজ্ঞানতা অপসংস্কৃতির একটা মহোৎসব চলছে | যে কোনো জিনিসে উৎকর্ষের জন্য যে পরিশ্রম করতে হয়, এই সাধারণ মূল্যবোধটাই ধাক্কা খেয়েছে | প্রায় এই জায়গায় পৌঁছেছে বাংলার সংস্কৃতি যেন সরকারের নেতা নেত্রীরা বলতে চাইছেন জানার থেকে না-জানা ভালো, বোঝার থেকে না-বোঝা ভালো, ঠিক ভাষার থেকে ভুল ভাষা এমন কি খিস্তি-গালাগালিও ভালো, ইত্যাদি | যতক্ষণ ভয় দেখিয়ে, মিথ্যা প্রচার করে, গুন্ডা লেলিয়ে ভোটে জেতা যাবে ততক্ষণ এটাই চলবে | ইতিহাসে লিখে রাখার মতো তলানিতে এসে পৌঁছেছি আমরা!

ক্ষমতার লোভে একেবারে দায়িত্ত্ব নিয়ে ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি | তোষণের নির্লজ্জ ও হাস্যকর সব পদক্ষেপ করা হচ্ছে, সিদ্দিকুল্লা থেকে ইদ্রিস আলী - মৌলবাদীদের সচেতনভাবে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, ভারতের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তিন তালাক তুলে দেওয়ার প্রতিবাদ করা হয়েছে সম্ভবত একমাত্র তৃণমূল নেতাদের থেকে | আবার মাঝে মাঝে উল্টোপক্ষর জন্য হনুমান জয়ন্তী, ব্রাহ্মণ ভোজন ইত্যাদি | পুরো পরিবেশটার মধ্যে ধর্ম ও ধর্মচিহ্নের দৃষ্টিকটু বাড়াবাড়ি ও উস্কানি | এই রাস্তায় তৃণমূলের দোসর জুটেছে বিজেপি, কখনো তৃণমূল আগুন জালে বিজেপি হাওয়া দেয়, কখনো উল্টোটা | মানুষের বিরুদ্ধে অমার্জনীয় অপরাধ করে চলেছে নিজেদের ক্ষমতার দৌড় আরেকটু দীর্ঘায়িত করার স্বার্থে |

এই যখন অবস্থা, যে দেশে গণতন্ত্র ভেঙে পড়েছে, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, মূল্যবোধ ও রুচি ভেঙে পড়েছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নড়বড় করছে, যে দেশে জোরে চেঁচিয়ে মিথ্যা বলে দিনকে রাত ও তিলকে তাল করাটাই দস্তুর, যে দেশে এমনকি পুলিশ অফিসারের অপরাধকে অপরাধ বলা বা ডাক্তারের ডেঙ্গুকে ডেঙ্গু বলার অধিকারটাও ভেঙে পড়েছে, সে-দেশে একটা সেতু ভেঙে পড়াটা আর বেশি কী? যেকোনো সভ্য সমাজে চুরির ফলে, অবহেলায় একটা উড়ালপুল ভেঙে এতো ক্ষয়ক্ষতি একটা জাতীয় লজ্জার কারণ হতো, সরকার ও নেতাদের দীর্ঘদিন জবাবদিহি করতে হতো, কিন্তু আজকের বাংলায় এটা একটা প্রতীকমাত্র, সমাজের যা কিছু গুরুত্ত্বপূর্ণ সব ভেঙে পড়ার একটা প্রতীক | আমরা এখন একটা ধংসস্তূপের তলাতেই বাস করছি, নীল সাদা রং করা একটা ধংসস্তূপ, আর সেই ধ্বংসস্তূপের ওপরে দাঁড়িয়ে নৃত্য করছে কিছু রাজনৈতিক ভূত |

---------------------------------------------

স্বেচ্ছাচারী, অত্যাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত শাসককূল ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়েই চেয়েছে গল্পটা এখানেই শেষ হোক, কারণ তাদের কোনো নৈতিকতাবোধ বা জনদরদ নেই | তারা আরো চুরি করে আরো মানুষ মেরে আইনের চোখ এড়িয়ে দীর্ঘজীবন লাভ করতে চায়, কেউ কেউ হয়তো অমরও হতে চায়! কিন্তু এখানেই ইতিহাসের মজা, গল্পটা কখনোই এখানে শেষ হয় নি ! এবং এক্ষেত্রেও হবে না | যতজনকে রাষ্ট্র মারতে চাইবে, ধরতে চাইবে তাদের একটা অংশ প্রতিবাদের নিশানে রূপান্তরিত হবে | অম্বিকেশ মহাপাত্র বা কানহাইয়া কুমাররা একা নয়, তাদের পেছনে মিছিল আছে | জনতা এমনিতে হাড়হাভাতে, রাজনৈতিক গুন্ডারা দেখে ভাবে টোকা দিলেই পরে যাবে, পরে যায়ও অনেকদিন | তারপর যেদিন রুখে দাঁড়ায় সেদিন কেষ্ট হাকিম মদন মেয়র থেকে শুরু করে কোনো দাদা দিদি পার পায় না, সে তার ছাতি ছাপ্পান্ন ইঞ্চি হোক, আর ডিগ্রি ইস্ট জর্জিয়ার হোক | এখানেও সেদিন এলো বলে !

মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

খান আব্দুল গাফফার খান ~ শিবানন্দ পাল

খান আব্দুল গাফফার খান।
নামটা বর্তমানে খুব একটা পরিচিত নাম নয়। 
৩১ শে আগস্ট, ১৯৩৪ বোলপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সাত সকালে যাত্রীদের কৌতূহল ছিল গুরুদেব কি শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন? কিন্তু তখন কলকাতা যাবার কোনও ট্রেন ছিল না। ট্রেন তো চলে গেলো। তাহলে? জানা গেল, তিনি একজন অতিথিকে রিসিভ করতে এসেছেন। 
কে সেই মান্যগণ্য অতিথি! যার জন্যে স্বয়ং গুরুদেব নিজে উপস্থিত স্টেশনে? 
বর্ধমানের দিক থেকে একটি ট্রেন এসে বোলপুরে থামল। দেখা গেল রেলগাড়ির একটি তৃতীয় শ্রেনির কামরা থেকে নামছেন এক দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ পাঠান যুবক। তাঁকে দেখা মাত্র রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে গেলেন, ৪৪ বছর বয়স্ক যুবক নত হবার চেষ্টা করতেই ৭৩ বছরের কবিগুরু তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। 
খান যুবক না হলেও এমন কিছু মধ্যবয়স্ক নন তিনি। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের চেয়েও দু বছরের ছোট। সেদিনের ওই মানুষটিই হলেন খান আব্দুল গাফফার খান। 
সর্বত্যাগী ফকির, খুব সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে রয়ে গিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই দিনগুলিতে ভারতের মানুষ তাঁকে চিনতেন 'সীমান্ত গান্ধী' হিসেবে। এই মানুষটি শান্তিনিকেতনের কথা শুনেছিলেন গান্ধিজির কাছে। শুনেছিলেন কবিগুরু বোলপুরের কাছে একটি গ্রামে গরীব মানুষের উন্নয়নের জন্যে একটি সংগঠন ও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। পেশোয়ার থেকে তাই বড়ো পুত্র আব্দুল গনিকে পাঠিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া শিখতে। পুত্রের মাধ্যমে তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথের যোগসূত্র। ১৯৩৪ সালে হাজারিবাগ জেল থেকে মুক্তি পেতেই তিনি বাংলায় আসতে চেয়েছেন। তাঁর আন্তরিক ইচ্ছে কবিগুরুর সাথে একটিবার দেখা করার। 
প্রথমে পাটনা গিয়েছিলেন বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের কাছে। তখন তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী একজন কংগ্রেস কর্মী। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। পাটনা থেকে শান্তিনিকেতনে খবর পাঠালেন- খান আবদুল গাফফার খান দেখা করতে চান রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। তাঁর আগ্রহ শ্রীনিকেতন সম্পর্কেও। 
স্টেশন থেকে কবিগুরু তাঁকে প্রথমে নিয়ে এলেন বিশ্বভারতীর লাইব্রেরী প্রাঙ্গণে। সেখানে সমবেত আশ্রমিক, ছাত্রছাত্রী ও অন্যান্যদের সামনে 'অতিথি'র পরিচয় করিয়ে বললেন, খান সাহেবের শান্তিনিকেতন সফর আশ্রমবাসীদের জীবনে স্মরণীয় ঘটনা। তিনি যখন কারান্তারালে গিয়েছেন, পুত্রকে পাঠিয়েছেন এখানে লেখাপড়া শেখার জন্য। এতেই প্রমাণ মেলে বিশ্বভারতীর প্রতি তাঁর কতখানি আস্থা ও মমত্ববোধ আছে। তাঁর অনুভুতি আমাদের স্পর্শ করেছে। 
গাফফার খান একদিনের বেশি শান্তিনিকেতনে থাকতে পারেন নি। একদিনেই তিনি শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের প্রতিটি বিভাগ ঘুরেছেন দেখেছেন, নিজের চোখে। পরের দিন শান্তিনিকেতন ত্যাগের আগে সকালে উদয়ন প্রাঙ্গণে কবি তাঁর সংবর্ধনার আয়োজন করেন। সেখানে বাংলা হরফে লেখা তাঁর ভাষণ কবি উর্দুতে পাঠ করেছিলেন। "থোরেসে অরসেকে লিয়ে অপ হামারে ইহা তসরিফ লায়ে হৈ ...।"
নিজের হাতে খসড়া করা সেই ভাষণে কবি বলেছিলেন, "অল্পক্ষণের জন্যে আপনি আমাদের মধ্যে এসেছেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্যকে আমি অল্প বলে মনে করিনে। আমার নিবেদন এই যে, আমার এ কথাকে আপনি অত্যুক্তি বলে মনে করবেন না যে আপনার দর্শন আমাদের হৃদয়ের মধ্যে নতুন শাক্তি সঞ্চার করেছে। প্রেমের উপদেশ মুখে বলে ফল হয় না, যারা প্রেমিক তাদের সঙ্গই প্রেমের স্পর্শমান। তার স্পর্শে আমাদের অন্তরে যেটুকু ভালবাসা আছে তাঁর মুল্য বেড়ে যায়। 
অল্পক্ষণের জন্যে আপনাকে পেয়েছি কিন্তু এই ঘটনাকে ক্ষণের মাপ দিয়ে পরিমাপ কড়া যায় না। যে মহাপুরুষের হৃদয় সকল মানুষের জন্য, সকল দেশেই যাঁদের দেশ তাঁরা যে কালকে উপস্থিত মতো অধিকার করেন, তাঁকে অতিক্রম করেন, তাঁরা সকল কালের। এখানে আপনার ক্ষণিক উপস্থিতি আশ্রমের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে রইলো"। 
সংবর্ধনার উত্তরে গাফফার খান সেদিন বলেছিলেন, "গুরুদেব" তাঁকে যে আন্তরিক সংবর্ধনা জানিয়েছেন, তাতে তিনি অভিভুত। এখানে আশার আগে যা শুনেছিলেন, নিজের চোখে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর চেয়েও মহৎ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কবি এখনে যে আদর্শ অনুসরন করেছেন, তাঁর ভিত্তিতে ভারত উন্নতির পথ খুঁজে পাবে। ধর্মের অপবাখ্যার মধ্য দিয়েই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে, এর জন্যই ভারতের জনগনের আশা আখাঙ্খার পূর্ণতায় বাধা আসছে। 
গাফফার খান শান্তিনিকেতন থেকে চলে যাবার পর রবীন্দ্রনাথ একটি পত্রে তাঁর সম্পর্কে গান্ধিজিকে লিখেছিলেন- 'এক অকপট সরলতার' মানুষ। রবীন্দ্র প্রয়াণের খবর পেয়ে এই মানুষটি পেশোয়ার থেকে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানিয়েছিলেন, 
 Peshaar 12th Aug. 1941
Dear Mr. Tagore,
 I am deeply grieved to hear of the sad demise of Gurudev. In him India has truly lost the greatest philosopher, poet and a nationalist. I heartily condole with you in your sad bereavement. May God bless his soul and give strength in your preasent trial. 
Yours sincerely, 
Abdul Ghaffar Khan
পঁইত্রিশ বছর পর গাফফার খান আবার শান্তিনিকেতন এসেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ৭৯। ক্লান্তিময় বার্ধক্য জাঁকিয়ে বসেছে শরীরে। পাকিস্থান সৃষ্টির ১৭ বছরের মধ্যে ১৫ বছর কেটেছে তাঁর কারাগারে। তিনি 'হিন্দু ও বিশ্বাসঘাতক' এই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ। অধিকাংশ সময় নির্জন কারাগার, নয়ত নজরবন্দি। ১৯৬৪ সালে স্বেছা নির্বাসন বেছে নিয়েছিলেন আফগানিস্থানের একটি ছোট গ্রাম জালালাবাদে।স্থির করেছিলেন সেখানেই বাকি জীবন কাটাবেন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজির জীবন দর্শন সম্বল করে। 
১৯৬৯ সালে গান্ধি জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সভাপতি জয়প্রকাশ নারায়ণ তাঁকে ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানান।তিনি সে অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারেন না। স্বাধীনতা প্রাপ্তির বাইশ বছর পর বিপর্যস্ত স্বপ্ন ও আদর্শ আর ভাঙা মন নিয়ে তিনি ভারতের মাটিতে পা রেখেছিলেন। দিল্লিতে নেহেরু কন্যা প্রিয় ইন্দুকে বলেছিলেন তাঁকে যেন শান্তিনিকেতন যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। 
শান্তিনিকেতন কেন?
মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, কেন জানো? ১৯৩৪ সালে প্রথম যখন যাই, গুরুদেবের কাছ থেকে স্নেহ ভালবাসা পাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। 
১৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৯। আগের মতোই রেলের একটি তৃতীয় শ্রেনির কোচ মধ্যরাত্রে বোলপুর স্টেশনে এসেছিল তাঁকে নিয়ে। বাকি রাত সেটি সাইডিং-এ রেখে দেওয়া হয়। গাফফার খান সেখানেই ছিলেন। পরদিন ১৫ ডিসেম্বর সকাল আটটায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে যান শান্তিনিকেতনে। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় উদয়নের সেই ঘরে, যে ঘরে ৩৫ বছর আগে রবীন্দ্রসান্নিধ্যে কেটে ছিল তাঁর একটি দিন।
তারপর তাঁকে বিশ্বভারতীর আম্রকুঞ্জে চিরাচরিত ধারায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। 
উত্তরে সেদিনও বলেছিলেন, ৩৫ বছর আগে আমি যখন প্রথম এখানে এসেছিলাম গুরুদেবের যে স্নেহ, ভালবাসা পেয়েছি তা আমার অন্তরে আজও বিরাজমান।
তিনি আশ্রমিকদের হোস্টেল, কলাভবন, বিচিত্রা দেখেন। বিচিত্রায় একটি কাঠ খোদাই মানবমূর্তির সামনে দাঁড়ালে তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে নামে। বারবার চোখ কচলে মূর্তিটি পরখ করেন। এ মূর্তি যে গড়েছেন তাঁর পুত্র নন্দলাল শিষ আবদুল গনি। 
তিনি ঘুরলেন শ্রীনিকেতন। বহু মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন তাঁকে দেখতে। ছোট একটি বক্তৃতাও দেন। ফেরার পথে উপাচার্য কালিদাস ভট্টাচার্যর কাছে সাঁওতাল পল্লী দেখাবার অনুরোধ করলেন। 
তাঁকে নিয়ে যাওয়া হোল ভুবনডাঙ্গায়। সাঁওতালদের সাথে গাফফার খান মিলিত হলেন। জানতে চাইলেন, স্বাধীনতার আগে যেমন আপনাদের দিন কাটত, তাঁর কি কোনও পরিবর্তন হয়েছে? স্বাধীনতা কি আপনাদের জীবনের স্বাদ বদলে দিতে পেরেছে? 
দোভাষীর মাধ্যমে তিনি যে জবাব পেয়েছিলেন তাতে তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছিলো। হায় গুরুদেব! হায় স্বাধীনতা! 
বুক ভরা আক্ষেপে শুধু এক টুকরো শান্তি ছিল তাঁর শান্তিনিকেতন সফর। ১৯৮৮-র ২০ জানুয়ারি তিনি প্রয়াত হন।


বুধবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৮

তারপর কি হোল ~ আর্কাদি গাইদার

'তারপর একদম অন্তিমলগ্নে এসে ওরা মরিয়া হয়ে উঠলো। আর মরিয়া হলেই মানুষ হিংস্র হয়ে ওঠে। টিক্কা খানের তত্ত্বাবধানে শুরু হলো 'অপারেশন সার্চলাইট'। বেছে বেছে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকারদের তালিকা বানানো হলো। সিদ্ধান্ত হলো, একসাথ এদের সবাইকে নিকেশ করতে হবে। বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মকে যেন বুদ্ধির চর্চা করানো, প্রশ্ন করা শেখানো, ভাবানোর জন্যে কেউ না থাকে। যারা ভাবতে পারে না, প্রশ্ন করতে পারে না, তারা বাধ্য, অনুগত প্রজা হয়ে থাকবে।'

'তারপর কি হলো?'

'তারপর ওরা রাতের বেলায় অন্ধকারে এলো। সরকারি উর্দি পড়া এক দল আর উর্দি ছাড়া তাদের চ্যালাচামুন্ডারা। ঘরে ঘরে ঢুকে তালিকা মিলিয়ে শুরু করলো ধরপাকড়। চোখে কাপড় বেধে, পিছমোড় করে হাত বেধে, একে একে নিয়ে যাওয়া হলো রায়েরবাজার, মিরপুর, রাখালপাড়া, মহম্মদপুরের টর্চার ক্যাম্পে।'

'কাদের নিয়ে গেলো?'

'দেশদ্রোহীদের। তখন তো দেশ মানে পাকিস্তান। তাই যারা পাকিস্তান বিরোধী তারাই তো দেশদ্রোহী। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর হুমায়ুন কবীর, জ্যোর্তিময় গুহঠাকুরতা, গোবিন্দচন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, রশিদুল হাসান, সিরাজুল হক খান। ছিলেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্রকার জাহির রায়হান। ছিলেন সংগীতশিল্পী আলতাফ মেহমুদ। ছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, আইনজীবি এবং ছত্তিসগড়ে দীর্ঘদিন মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী সুধা ভরদ্বাজ।'

'ছত্তিসগড়? দাঁড়াও দাঁড়াও, আমরা তো অপারেশন সার্চলাইট..'

'ছিলেন দলিত আন্দোলনের কর্মী প্রফেসর আনন্দ তেলতুমড়ে। ছিলেন কবি ভারভারা রাও। আরও ছিলেন সাংবাদিক গৌতম নভলাখা। যিনি গত একবছর ধরে অনুসন্ধান করে একের পর এক লেখায় রাফায়েল স্ক্যামের তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন।'

'রাফায়েল স্ক্যাম? দাদু, তুমি কিসব বলছো?'

'এখানে শেষ না। তারপরে ছিলেন উত্তরবাংলার চা বাগানের চা শ্রমিক সমন পাঠক। ছিলেন উত্তর ৩৪ পরগনার শ্রমিক নেতা আহমেদ আলি খান..'

'আরে দাঁড়াও তো। বাংলাদেশ থেকে কোথায় চলে এলে! তোমার বয়সের সাথে সাথে মাথাটা গেছে! সব গুলিয়ে ফেলছো।'

'গুলিয়ে ফেলছি? না না। গোলাচ্ছি না। কিচ্ছু গোলাচ্ছি না।'

রবিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৮

একটি অবাস্তব, কষ্টকল্পিত, তৃতীয় শ্রেণীর, মেলোড্রামাটিক গপ্পো ~ বিষাণ বসু


ডিসক্লেইমার -

১. লেখাটা সাইজে বড়ো। অন্তত ফেসবুকের আন্দাজে। মাঝপথে গালি দেবেন না।

২. শিরোনামের প্রতিটি বিশেষণ সত্যি। কোনো বিনয়ঘটিত নয়।

৩. লেখাটি প্রমথনাথ বিশীর একখানি ছোটোগল্প দ্বারা অনুপ্রাণিত। না, অনুপ্রাণিত নয়, একেবারে নির্লজ্জভাবে ঝেড়ে দেওয়া। যাঁরা গল্পটি পড়েছেন, তাঁরা জানেন। বাকিরা দুধের স্বাদ ঘোল নয়, পিটুলিগোলা জলে মেটানোর ব্যর্থ প্রয়াসে ব্রতী হোন।

৪. বাংলা সিরিয়াল বন্ধের মতো একটি জাতীয় ক্রাইসিসের হাত থেকে আমাদের বাঁচানোর জন্যে আমরা মহান নেত্রীর প্রতি চিরঋণী রইলাম। মালদার গণি খান ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রছাত্রীরা, অনশনরত ডাক্তারেরাও একদিন নেকনজর পাবেন, এই আশা নিয়ে আসুন, সিরিয়াল দেখি।

আর, ও হ্যাঁ, গল্প শুরু করি।

তিন বন্ধু।

একজন শিক্ষক, আরেকজন ডাক্তার। তৃতীয়জন সাধারণত টিভি সিরিয়ালে, আর মাঝেমধ্যে সিনেমার পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে থাকেন।

সেই স্কুলজীবনের পরে দেখা হচ্ছে আজ। এর মধ্যে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। উন্নয়নের জোয়ারে রাজ্য ভেসে গিয়ে সারা দেশ ভাসবো ভাসবো করছে। পাহাড়-জঙ্গলমহল ছেড়ে খাস কলকাতা শহরও হাসছে।

ঘনঘোর বাম আমলে কবি জানিয়েছিলেন, "সে বড়ো সুখের সময় নয়, সে বড়ো আনন্দের সময় নয়…", কিন্তু, এখন দিন বদলেছে। উজ্জ্বল এই সময়ে, তিন বাল্যবন্ধু ঠিক করেছিলেন, যে, তাঁরা দেখা করবেন, ছেলেবেলার মতো হইহুল্লোড় করবেন, অন্তত একটিদিনের জন্যে।

বেশ কথা। কিন্তু, দেখা করা যায় কোথায়? কারোর বাড়িতে হলে চলবে না, কেননা, বৌ-ছেলেমেয়ের সামনে কৈশোরে ফিরে যাওয়াটা একটু মুশকিলের। অতএব, শপিং মল। আইডিয়াটি অভিনেতা-বন্ধুরই। তাছাড়া, বিগত এক-দুইদশকে বাঙালীজীবনে আধুনিকতার মহৎ প্রসার ঘটার দরুণ, সামনে একটু গেলাস না থাকলে বন্ধুরা আড্ডা মারতে পারেননা, অথবা সুরাহীন আবহে কথাবার্তা বলতে থাকলেও তা আড্ডা বলে মেনে নিতে পারেন না। কাজেই, একটি শপিং মলের বারেই মিলিত হচ্ছেন আজ সেই তিন বন্ধু।

প্রথমেই একটু খটাখটি হয়ে যাচ্ছিলো। ডাক্তার বা অভিনেতা, নিজের পয়সায় মদ্যপানের অভ্যেস এঁদের থাকে না বললেই চলে। কাজেই, বিল কে মেটাবে, শুরুতেই এই আলোচনায় গেট টুগেদার প্রায় ভেস্তে যাওয়ার যোগাড়। শেষ পর্যন্ত, সমান শেয়ারের সমাধানসূত্রে সবাই সম্মত হয়েছেন।

হ্যাঁ, আসুন, আলাপ করিয়ে দিই।

ওই যে, আটপৌরে পোশাকে, একটু সঙ্কুচিত, আসছেন বরুণ। স্কুলশিক্ষক। বিগত পঞ্চায়েতে গণতন্ত্রের অবাধ উৎসবের হ্যাংওভার কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তারপর থেকেই রাত্রে ঘুম হয়না ভালো, মাঝেমধ্যেই চমকে চমকে ওঠেন। রামদেব-সদগুরু ইত্যাদি অনেক করেছেন, তাও স্ট্রেস কাটছেনা। তাছাড়া, যেকোনো সরকারি কর্মচারীর মতোই, তিনিও সুখী মানুষ নন। 

বরুণের ডানদিকে তরুণ। পেশায় চিকিৎসক। স্যুটবুট পরিহিত। হাসপাতাল থেকে সোজা আসছেন। কাজেই, পুরোদস্তুর ফর্মাল পোষাকে। বরুণের চাইতে বছরপাঁচেকের বড়ো দেখতে লাগছে তরুণকে, যদিও দুজনে সেই নার্সারি থেকেই সহপাঠী।

আর, ওই যে অরুণ। অভিনেতা। আলাপ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আশাকরি। যুগপুরুষ আশারাম সিরিয়ালে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। তাছাড়াও সন্ধ্যের দিকে টিভির বিতর্কসভায় প্রায়শই হাজির থাকেন। আজ পরণে জিন্স-টিশার্ট। চোখে সানগ্লাস। সানগ্লাসের ওপার থেকেই নজর রাখছেন, সবাই তাঁকে চিনতে পারছেন তো!!

আমি বুঝতে পারছি, আপনি উশখুশ করছেন। ভাবছেন, আজ আমি আর কতোক্ষণ হ্যাজাবো। অথবা, আপনি অলরেডি লাইক দিয়ে পরের পোস্ট চলেই গ্যাছেন।

তাই, চলুন, একটু ফার্স্ট ফরোয়ার্ড করে এগিয়েই যাই।

আপাতত, এখন তিনজনেরই নেশার পারদ চড়েছে। সামান্য কথাতেই বেশী হেসে উঠছেন প্রত্যেকেই। তাঁদের কথোপকথন যদি তাঁদের মুখের ভাষায় দিতে যাই, তাহলে আমার বর্তমান ফ্রেন্ডলিস্টের আদ্ধেক বন্ধুবান্ধবী আমার লেখা পড়া ছেড়ে দেবেন। কাজেই, প্লীজ, একটু এডিটেড ভার্সানেই খুশী থাকুন।

তিনজনের মধ্যে বরুণের মুখের হাসিটা যেন ততো উজ্জ্বল নয়। সে একটু যেন সঙ্কুচিত। বন্ধুদের চোখ এড়ায় না সেটা। তাদের বিস্তর চাপাচাপিতে, নাকি সুরার নেশায়, অবশেষে, সে মুখ খোলে।

"শোন, একটা বড়ো আঘাত পেয়েছি। না, তোরা যেমন ভাবছিস, তেমন কিছু নয়। প্রেমটেম কিছু নয়। বরুণাকে আমি এখনও তেমনই ভালোবাসি, যেমন বাসতাম প্রথম আলাপের সময়। ছেলেটাও আমার চোখের মণি। কাজেই…..

"আসলে, হয়তো, আমারই ভুল। পড়ানোটাকে আমি কখনোই চাকরি ভাবিনি। ভাবতাম, আমরা, মানে শিক্ষকেরা জাতির মেরুদন্ড। ভাবতাম, সমাজে আমাদের রোল একটা আলাদা ধরণের। আমাদের দায়িত্ব অনেক।

"কিন্তু……

"একদিন, একটা বিয়েবাড়িতে গিয়ে আমার ধারণা বদলে গ্যাছে। আর, সেই বদলটার সাথে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছিনা।

"বিয়েবাড়ি। পাশের টেবিলের আলোচনা কানে আসছিলো। জানিসই তো, মফস্বলের একটি স্কুলে আমি পড়াই।

"প্রথমজন বললো, জানিস তো, অমুক গ্রামের মাস্টারটা বিষ খেয়েছে। আমি বুঝলাম, রমেশের কথা হচ্ছে। হ্যাঁ, রমেশ। পাশের গ্রামের স্কুলে পড়ায়। একই সাথে জয়েন করেছিলাম চাকরিতে। খুব ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও বেশ ভালোভাবেই চিনতাম। পঞ্চায়েত ভোটের ডিউটি পরবর্তী চাপ-অপমান অসহ্য হওয়ায় রমেশ বিষ খেয়েছে শুনেছিলাম। কাজেই, বলতে লজ্জা নেই, একটু কান পেতেই আলোচনা শুনছিলাম।

"একজন, শুনি, বলছে, শালা টিচারটা মরেছে, বেশ হয়েছে। কোনো কম্মের নয়। আমার ভাইটা টেট-এর জন্যে দশ লাখ লাগিয়ে বসে আছে। চাকরিটা হচ্ছে না। এরকম দুদশটা মরলে যদি কিছু হয়। না, রমেশ এখনো মারা যায়নি। কিন্তু, এমন শুভেচ্ছা বর্ষণে চমৎকৃত হলাম 

"পাশের লোকটা সেই সুরেই বললো, আরে, এই সব টিচারগুলোই হারামী। ইস্কুলে পড়ায় না, পরীক্ষায় নম্বর দেয়না, খালি টিউশনির ধান্দা। জানোয়ার একটা। ওই যে একটা মাল মরলো না ভোটের বাজারে রেললাইনের ধারে, ওইরকম করে শালারা ইঁদুরের মতো মরলে তবে ঠিক হয়।"

"আরেকজন বললো, আমাদের সময় যেসব টিচার ছিলেন, দেবতুল্য মানুষ সব। এগুলো তো শিক্ষক নামের কলঙ্ক। পড়ানোর নাম নেই, কাজে নিষ্ঠা নেই, খালি পয়সার নেশা আর ডিএ বাড়ানোর আন্দোলন। অপদার্থ সব।"

"দ্যাখ, আগেই বললাম, রমেশকে আমি চিনি বহুবছর। ছাত্র-অন্তপ্রাণ। স্কুল আর ছাত্র, এর বাইরে ভাবতেই পারতোনা। সিধে মেরুদন্ড। কোনো রাজনৈতিক নেতাকেই তোয়াক্কা করতো না। স্কুলের পরেও বস্তিতে গিয়ে গরীব বাচ্চাদের পড়াতো নিয়মিত।

"ভাব একবার, তাকে নিয়ে এমন কথা!!! এই অবস্থাতেও, তাকে নিয়ে এই অনর্গল বাজে কথায়, কেউ এতোটুকু প্রতিবাদ করছে না!! তাহলে, আমার পেছনে কী বলবে?"

অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে, বরুণ একটু থামতেই, নাকি থামার আগেই, কথা শুরু করে তরুণ।

"আরে, ছাড়। তোর তো অন্য লোকের গল্প। আমার নিজের অভিজ্ঞতা শোন।

"খুড়তুতো-জ্যেঠতুতো-পিসতুতো ভাইয়েরা সবাই মিলে গ্রুপ পিকনিক। হইহই ব্যাপার। আমবাগানে। পুকুরের পাড়ে।

" যেমন হয়, ছুটির দিনে আরো অনেক পার্টি একই ভেনুতে হইচই করছে, বাচ্চারা খেলছে।

"আমরা ভাইয়েরা, যেমন হয়, বোতল খুলে বসেছি। আর, যেমন হয়, সাড়ে এগারোটার মধ্যেই আমি আউট। একটু নাটক করার জন্যে, অরুণ, জানিসই তো, শুধু তুইই নোস, আমারও নাম আছে।

"তা সেইদিন, নৌটঙ্কি করার জন্যে, গিয়ে দাঁড়িয়েছি এক্কেবারে পুকুরের পাড়ে। আর, একেবারে শোলের ধর্মেন্দ্রর স্টাইলে বলতে শুরু করেছি, গাঁওয়ালোঁ, আজ এইখানে আমি যদি পুকুরে পড়ে যাই, তাহলে, দেশ হারাবে এক উদীয়মান প্রতিশ্রুতিবান ডাক্তারকে।

"কথা শেষ হওয়ার আগেই, মাইরি, বললে বিশ্বাস করবি না, দৌড়ে এলো একটা অপরিচিত ছেলে। বোধহয় অন্য কোনো পিকনিক পার্টি থেকেই। মুখে খিস্তি। খানকির ছেলে ডাক্তার, শালা তোদের মরাই ভালো। বলে এক ধাক্কায় আমাকে ফেলে দিলো পুকুরের মধ্যে। 

"সত্যি বলছি, মেজদা টাইম করে ঝাঁপিয়ে না বাঁচালে আমি এতোদিনে ছবি বিশ্বাস হয়ে যেতাম।

" আরো খারাপ লাগে ভাবলে, ছেলেটাকে কেউ তেমন করে কিছু করলো না। অনেকেই বললো, ছেলেটি নাকি পরিষ্কার মনের। অন্যের বিপদে আপদে ঝঁপিয়ে পড়া নাকি ওর অভ্যেস। অসুস্থ মানুষের জন্যে টাটা ভেলোর দৌড়ানোয় ওর জুড়ি মেলা ভার। ভীষণ পরোপকারী নাকি ছেলেটি। এখানকার ডাক্তারদের চেহারা জানতে ওর কিছু বাকি নেই। আজ একটু মালফাল খেয়ে হয়তো বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে, কিন্তু ইত্যাদি ইত্যাদি।"

গল্প বলতে বলতে, তরুণ শিউরে উঠলো।

দুজনের কথার শেষে, একটু অবশ্যম্ভাবী নীরবতা।

অরুণ গলাখাঁকারি দেয়। কথা শুরু করে।

"আমি তোদের দুজনেরই মানসিক সিচ্যুয়েশান বুঝি। এও বুঝি, তোরা মানুষের উপর বিশ্বাস হারাচ্ছিস। কিন্তু, দ্যাখ, বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।"

অরুণের এই উচ্চাঙ্গের বাণী-কন্ঠস্বর-বাচনভঙ্গির সাথে, সান্ধ্য টিভির সুবাদে, কেউই অপরিচিত নয়। তাই, দুজনের কেউই, বিদ্যাসাগরের ব্যাপারটা শুধরোতে যায় না। তাছাড়া, আশেপাশের টেবিল থেকে, বেশ কয়েকটি উৎসুক মুখ উঁকিঝুঁকি মারছে, সেইটাও ব্যাপার।

ঈষৎ জড়ানো গলায়, অরুণ চালিয়ে যায় - 

"না, অভিজ্ঞতাটা সরাসরি আমার নয়। তবে আমি সেখানে ছিলাম। ঘটনাটা তোদেরও মনে থাকতে পারে, কেননা মিডিয়া খুব কভার করেছিলো।

"হ্যাঁ, আমি বুবুদা আর পর্ণাদির ঘটনাটা বলছি। জানিসই তো, বুবুদা-পর্ণাদির মধ্যে একটা ইন্টুসিন্টু ছিলো। তার কতোটা সত্যি, আর কতোটা সিনেমার পাবলিসিটির জন্যে, আমিও জানি না পুরোপুরি।

"তা সেইসময় জয়তু বাবা শিবনাথ বইয়ের শ্যুটিং চলছে। সেই হিট গানটা। ড্রিম সিকোয়েন্স। আইটেম নাম্বার টাইপের। বল বল বলরে কোকিল, তুইই হবি আমার উকিল। চারবারেও শট ওকে হয়নি। বুবুদার মটকা গরম। পর্ণাদির সাথে জোর খ্যাঁচাখেঁচি লেগে গ্যাছে। প্রায় কাঁচা খিস্তাখিস্তির যোগাড়। জানিসই তো, পর্ণাদি রাগলে পুরো কর্পোরেশনের ড্রেন।

"এইসব ঝগড়া-ঝামের সময়, কী করে কেউই দ্যাখেনি ঠিক, বুবুদা গ্যাছে লেকের মধ্যে পড়ে। অমনি, কী বলবো মাইরি, শ্যুটিং দেখতে আসা পাব্লিক, মিডিয়ার লোক সব্বাই মিলে জলে ঝাঁপ দিয়েছে। সে কী সীন, বলে বোঝাতে পারবোনা।

"মিডিয়ার মধ্যে যারা ঝাঁপিয়েছে, তাদের মধ্যে তিনজন আবার সাঁতার জানতো না। পিওর আবেগের বশে ঝাঁপিয়েছে। মিডিয়ার মাল তো জানিস, ঝাঁপাবে আগে, তলিয়ে দেখবে পরে। দুজন আবার ক্যামেরা নিয়েই ঝাঁপিয়েছে। সে এক কেলো মাইরি।

"এদিকে, বুবুদা তো ডুবসাঁতারে এক্সপার্ট। ও তো এইসব সীন দেখে ডুব দিয়ে উল্টোপারে উঠেছে। কিন্তু, বাকি মালগুলো সব জলটল খেয়ে একাকার।

" তো সেইদিন দেখলাম, মানুষের আবেগ ভালোবাসা কী জিনিস। আর, একটা বড়ো শিক্ষা পেলাম। তুমি যদি মানুষের জন্যে কাজ করো, মানুষের কাছে থাকো, মানুষের পাশে থাকো, মানুষও তোমাকে ভালোবাসবে। তোমার জন্যে জান লড়িয়ে দেবে।

"ওইটাই বড়ো ব্যাপার ভাই। মানুষের ভালোবাসা পাওয়া।"

এরপরে আর কথা চলে না।

সন্ধ্যে গড়িয়ে রাতও বাড়ছে। 

অরুণকে চিনতে পেরে, তার এই অনির্বচনীয় কাহিনী শুনে, টেবিলের চারপাশে বেশকিছু সুবেশ-সুবেশার ভিড়ও জমেছে। রেস্তোরাঁর পেপার-ন্যাপকিন বাড়িয়েও দিচ্ছে কয়েকজন, সইয়ের আশায়। লাজুক মুখে অরুণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তরুণ আর বরুণ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বাইরে তখন নীলসাদা আলোয় ধোয়া এক উন্নততর রাত্রি। হোর্ডিং-প্ল্যাকার্ড অথবা মানুষের মুখ, সব্বার মুখে হাসি ছাড়া অন্যকিছুই দৃশ্যমান নয়।

বাড়ির পথে যেতে যেতে, দুজনের মনেই ঘুরতে থাকে অরুণের কথাগুলো।

আর, হঠাৎই মনে হয়, যাঃ, একদম ভুল হয়ে গিয়েছে দুজনেরই। জিজ্ঞেস করা হলো না তো, ঠিক কী করলে মানুষের পাশে থাকা হয়!! ঠিক কেমনভাবে মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায়!!!

অভিনয়, শুধু অভিনয় আর জৌলুশই কি সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর একমাত্র পথ?

শুক্রবার, ১০ আগস্ট, ২০১৮

অসুস্থ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ~ বিষান বসু

তিনটে ঘটনা। গত এক সপ্তাহের মধ্যেই।

১. কলকাতা থেকে চারশো কিলোমিটার দূরে। উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদ। প্রাইমারী হেলথ সেন্টার। ডাক্তার আছেন। আর বিশেষ কিছু নেই। হার্ট এট্যাকের জটিল রোগীর চিকিৎসা সম্ভব কিনা সেখানে, বুঝতে ডাক্তারি পড়তে হয় না। এমন এক রোগী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এলে, চিকিৎসক রেফার করেন সরকারি সুপারস্পেশ্যালিটি হাসপাতালে। রোগী সেইখানে পৌঁছানোর আগেই মারা যান। পরিজন চড়াও হন চিকিৎসকের উপর। নৃশংস মার। লাথিঘুঁষি। এমনকি, ধাতব টেবিল দিয়েও। ডাক্তারবাবু, নিজেই, সুপারস্পেশ্যালিটি হাসপাতালে ভর্তি।

২. খাস কলকাতা। ঢাকুরিয়া আমরি হাসপাতাল। ক্রনিক এলকোহলিক এক যুবক। বয়স কুড়ির কোঠায়। অত্যধিক মদ্যপানজনিত প্যানক্রিয়াটাইটিস। সাথে মাল্টি-অরগ্যান ফেইলিওর। অনেক চিকিৎসার শেষে রোগীর মৃত্যু। পরিজন বিক্ষুব্ধ। ডাক্তাররা খুনী। গ্রেফতার চাই, সম্ভব হলে যাবজ্জীবন বা ফাঁসি। প্রকাশ্য রাজনৈতিক মদতে চলতে থাকে অবরোধ। চিকিৎসকেরা হাসপাতাল থেকে বেরোতে পারেন না অনেক রাত্রি অবধি। পুলিশ-র‍্যাফ নীরব দর্শক।

৩. ভার্চুয়াল দুনিয়া। ফেসবুকে। একটি ছবি। ঝাঁচকচকে এক করিডোর। বসার জায়গা। কেউ বসে নেই অবশ্য। জনশূন্য সেই সুদর্শন করিডোরের নীচে ক্যাপশন। না, বিদেশ নয়, এয়ারপোর্টও নয়। বনগাঁর সরকারি হাসপাতালের ছবি এটি। একজন আবার অত্যুৎসাহী হয়ে, শঙখ ঘোষের লাইন বদলে, লিখে ফেলেন, "দেখ খুলে তোর ত্রিনয়ন/ রাস্তাঘাটে, হাসপাতালে, দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন"। অবশ্য, উন্নয়ন যে রাস্তাঘাট পার হয়ে হাসপাতালে ঢুকে পড়েছে, এই নিয়ে, বোধ হয়, সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসকেরা দ্বিমত হবেন না। কিন্তু, থাক সে কথা।

তিনটে ঘটনা। আপাতবিচ্ছিন্ন। যোগসূত্রহীন।

কিন্তু, আসুন না, একটু গভীরে যাই।

শুধু ঝাঁচকচকে করিডোর দিয়ে হাসপাতাল হয় না। হলে ভালো হয় নিশ্চয়ই, কিন্তু, না হলেও চলে। আসল কথা, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। তার ব্যবস্থা কতোটুকু?

চকচকে সুপারস্পেশ্যালিটির গল্পের পর অনেক বছর পার হলো। সুপারস্পেশ্যালিস্ট মিললো কি? ডাক্তার ছাড়াই অত্যাধুনিক চিকিৎসা!! উন্নয়নে বিশ্বাসী হলেও, এতোটা হজম হবে কি?

কিন্তু, ডাক্তার নেই কেন?

উলটো প্রশ্ন করি? ডাক্তার থাকবে কেন?

সরকারি চাকরিতে সুযোগসুবিধা, এখন, নামমাত্র। থাকার ব্যবস্থা প্রায় নেই। হাসপাতালের পরিকাঠামো নড়বড়ে। বিল্ডিং নয়, বাকি যন্ত্রপাতি-ওষুধ এইসবের কথা বলছি। যন্ত্র থাকলেও টেকনিশিয়ান নেই। আর নিরাপত্তা? হাসাবেন না, প্লীজ।

মাইনে? মহারাষ্ট্র সরকার, প্রত্যন্ত এলাকায় ডাক্তার নিয়োগের জন্যে মাসিক তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত বেতন ধার্য করেছেন। এখানে, মেরেকেটে পঞ্চাশ হাজার। এমডি-ডিএম করার শেষে এই মাসমাইনেতে ডাক্তার পাওয়া তো স্রেফ আকাশকুসুম।

এরপরেও ডাক্তাররা সরকারি চাকরি করতে চাইতেন। কেননা, অনেকেই, সাধারণ মানুষের কথা ভেবে, সনাতন আদর্শে উদবুদ্ধ হয়ে ডাক্তারিটা করতে চাইতেন। আর, এখনো চান। হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন, লাখ-লাখ টাকা উপার্জনের লোভে, বা হীরের চচ্চড়ি খাওয়ার আশায় সবাই এলাইনে আসেন না। কিন্তু, বর্তমানে, স্বাস্থ্যআমলাদের আশ্চর্য তুঘলকি সিদ্ধান্তে, সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারি কঠিন হয়ে উঠেছে। সাথে সাথে রয়েছে কিছু লুম্পেননেতার দাদাগিরি। সম্মান আর সরকারি ডাক্তারি, প্রায় পরস্পরবিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

আর, সরকারি চাকরিতে উচ্চশিক্ষার যে সুযোগ বা অধিকার ছিলো, সরকারবাহাদুর তার সঙ্কুচনে চেষ্টার ত্রুটি রাখছেন না। তারসাথে, চাকরি ছাড়তে চাইলে আবেদন প্রত্যাখ্যান, সঙ্গে এতোবছর চাকরির সুযোগসুবিধে হারানো।

অতএব, সরকার বিজ্ঞাপন দিয়েও ডাক্তার পাচ্ছেন না।

সমস্যাটা, বা অসন্তোষের কারণ, সরকার জানেন না, এমন নয়। কিন্তু, তাঁরা ভোট চান, ভোটের জন্য অর্থ চান। সমাধান নয়।

প্রথম, ভোট। ডাক্তারেরা সংখ্যায় হাতেগোনা। ভোটের হিসেবে তাঁদের না আনলেও চলে। কিন্তু, স্বাস্থ্যপরিষেবায় সরকার সচেষ্ট নন, এই বার্তা গেলে, ভোটের রাজনীতিতে বিপদ আছে। তাই, চকচকে বিল্ডিং, নিত্যনতুন শিলান্যাস। সাথে ফাটা রেকর্ড। চেষ্টা করেও ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না। মিডিয়াও এই মেসেজই প্রচার করে চলেছে। স্বভাবতই, মানুষের কাছে বার্তা যাচ্ছে, সরকার চাইলেও, ডাক্তারদের অনুৎসাহের কারণেই সদিচ্ছা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ক্ষোভের অভিমুখ সেই চিকিৎসকের প্রতি।

দ্বিতীয়ত, পার্টি ফান্ড। ভোটের খরচ। না, এখানে হিসেবটা ততোখানি সরলরৈখিক নয়। বোঝানোর চেষ্টা করি তাও। মানুষের অসুখবিসুখ তো হবেই। হাসপাতালে যেতে হবেই। বিশেষত, এমন দেশ, যেখানে প্রিভেনটিভ মেডিসিন বা রোগপ্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগ প্রায় নেই। তা, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে মানুষ চিকিৎসা চাইবেন না, এমন তো নয়। অতএব, লাভ কার? আজ্ঞে হ্যাঁ, বেসরকারী স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের।

সব বেসরকারী পরিকাঠামো একই নয়। মফস্বল বা ছোটো শহরে বেশ কিছু ছোটো নার্সিং হোম আছে, যেখানে সাধ্যের মধ্যে সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত ছিলো, বা এখনও আছে। ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট আইনের প্যাঁচে ফেলে তাদের নাভিশ্বাস তোলার ব্যবস্থা হলো। অনেকেই ব্যবসা গুটিয়েছেন। আবার, কিছু বৃহৎ বেসরকারী স্বাস্থ্য-কনগ্লোমারেট, জেলায় ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে, অধিগ্রহণের চেষ্টাও করছেন। কলকাতা শহরে চিকিৎসাব্যবস্থা, এখন, প্রায় পুরোপুরিই, কর্পোরেট দখলে। আগামী এক দশকে, জেলা শহরেও এই চিত্রই দেখা যাবে।

কাজেই, শেষ পর্যন্ত, জয় হোক কর্পোরেটের। এঁদের অশ্বমেধের ঘোড়া আটকায়, এমন বুকের পাটা কার!!

একটু ভেবে দেখুন, দশ বছর আগেও, বাবা-কাকা অসুস্থ হলে, আপনি ছুটতেন অমুক ডাক্তারবাবুর কাছে। রোগ জটিল হলে, অমুক নামী ডাক্তারের চেম্বারে। এখন কিন্তু, আপনি আর ডাক্তারের নাম খোঁজেন না, আপনি যান নামী হাসপাতালে। পার্থক্যটা কিন্তু অনেক।

হাসপাতালের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত চেম্বারে যে ডাক্তারবাবু আপনাকে দেখলেন, তিনিও জানেন, আপনি মোটেই তাঁর কাছে আসেন নি, এসেছেন সেই হাসপাতালের ভরসায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে আপনার সেই রোগীকে পাঠিয়েছেন মাত্র। তিনি যদি রোগীপরিজনকে সন্তুষ্ট ক্রেতা হিসেবে সার্ভিস না দিতে পারেন, তারসাথে হাসপাতালকে যথেষ্ট ব্যবসা দিতে না পারেন, তাহলে কিন্তু পরের বার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীকে পাঠাবেন, একই হাসপাতালে, পাশের চেম্বারে অপেক্ষারত ডাক্তারের কাছে। আবার, কোনো ডাক্তারবাবু, যদি নিজগুণে রোগীদের কাছে পছন্দের হয়ে ওঠেন, তাহলে কর্তৃপক্ষ, সচেতনভাবেই, রোগীদের অন্য ডাক্তারের কাছে পাঠাতে থাকেন। হ্যাঁ, ডাক্তারকে ইনসিকিওর রাখা বা ডাক্তারকে কখনোই হাসপাতালের ব্র‍্যান্ডের চেয়ে বড়ো হতে না দেওয়া, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ঘোষিত নীতির মধ্যেই পড়ে।

মনে রাখবেন, এই কর্পোরেট হাসপাতালগুলিতে সবচেয়ে আদরের কর্মী কিন্তু কোনো ডাক্তার নন। এঁদের নয়নের মণি মার্কেটিং স্টাফ। অর্থাৎ, যাঁরা হাসপাতালে রোগীর জোগান অব্যাহত রাখেন। মার্কেটিং-এর অনেকেই ডাক্তারদের চাইতে অনেকটাই বেশী আয়ও করে থাকেন।

কিন্তু, সরকারের ভূমিকা এখানে কী?

এখনো বলে দিতে হবে? নাঃ, আপনি দেখছি একেবারেই নাদান!

এক, ডাক্তাররা যদি সরকারি চাকরিতে না যান, তাহলে যাবেন কোথায়? আইনের মারপ্যাঁচে ছোটো চেম্বারের দিন শেষ। অতএব, কর্পোরেট। দেশে ডাক্তারের ঘাটতি থাকলেও, কর্পোরেট ম্যানেজমেন্টের সামনে চাহিদার তুলনায় ডাক্তারের জোগান বেশী, মানে যেমনটি তাঁরা চান। ইনিসিকিওর ডাক্তারদের একাংশ আপোস করতে রাজিও থাকেন। কর্পোরেট ব্যবসার রমরমা এভাবেই।

দুই, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাটি ভেঙে পড়তে দিয়ে কর্পোরেট হাসপাতালে রোগীর জোগান নিশ্চিত করা।

আর, এর পরে, সরকারবাহাদুর যদি হাসপাতাল চালাতে অপারগ হয়ে, পাব্লিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ করার কথা বলেন, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। টেনশন করবেন না, সুখের সেইদিন আর বেশী দূরে নয়।

এতো প্রাপ্তির শেষে, কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবসায়ীরা যদি খুদকুঁড়ো ভরে দেন দলীয় তহবিলে, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে!!

হ্যাঁ, এরপরেও কর্পোরেট হাসপাতালে বিল দেখে অবস্থান-বিক্ষোভ চলবে। মিডিয়া ডেকে ক্যামেরার সামনে বেসরকারী হাসপাতালের কর্তাদের চমকানো চলবে। কেননা, পাছে চিকিৎসাব্যয়ে ঘটিবাটিবেচা মানুষের ক্ষোভ সরকারের পানে ধেয়ে আসে, সেই সম্ভাবনাটি অঙ্কুরেই বিনাশ করা। প্লাস, রুটিন ভেট আসার মাঝে এইটুকু ব্ল্যাকমেইলিং না হলে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে হাতখরচা আসবে কোত্থেকে!

আপনি হয়তো অতো ভেবে দেখেন না। খামোখা অতো ভাবতে আপনার বয়েই গ্যাছে।

কিন্তু, যদি একবার ভেবে দ্যাখেন।

সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার প্যাঁদানোতে নির্বিকার থেকে, আপনি কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাটিকেই ভেঙে পড়তে দিচ্ছেন।

আর, অন্যদিকে, কোনো বেসরকারি হাসপাতাল কিন্তু লোকসানে চলে না। রাজনৈতিক দলের কাছে তোলা পৌঁছানো বা ভাঙচুরের পর মেরামতি, ঘুরপথে খরচ জোগান পরের রোগীরাই।

কেমন হবে, সেই পরের রোগীটি আপনাকেই হতে হয়?

রাজনীতির কারবারি আর স্বাস্থ্যব্যবসায়ী, তাঁদের কিন্তু সেটিং হয়েই আছে।

আপনার?

মঙ্গলবার, ৭ আগস্ট, ২০১৮

চা বাগানে ধর্মঘট ~ আর্কাদি গাইদার

বীরপাড়া টি এস্টেট: ৩২(৪৭)
গাংগুরাম টি এস্টেট: ২৩(৪৮)
ডিমডিমা টি এস্টেট: ৩৩(৫১)
মধু টী গার্ডেন: ৩৪(৫০)
রেড ব্যাংক টি গার্ডেন: ৩০(৫২)

প্রথম সংখ্যাটা হলো এই বাগানগুলোতে অভুক্ত থেকে অপুষ্টিতে কতজন চা শ্রমিক মারা গেছেন। ব্র‍্যাকেটে গড় বয়স। এগুলো স্রেফ কয়েকটা বাগানের হিসেব। 

২৭৩ - এটা হলো উত্তরবাংলার টি এস্টেটের সংখ্যা।

৩৫১ - মূখ্যমন্ত্রী যে হুংকার দিয়েছেন উনি এক্ষুনি আসামে চলে যাবেন বাঙালীদের রক্ষা করতে, এই সংখ্যাটা সেই আসামের চা বাগানের নির্ধারিত দৈনিক মজুরী।

১৫৯ - এই সংখ্যাটা রাজ্যের একজন  চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরী।

১৭২ - লাগাতার আন্দোলনের পর রাজ্য সরকার মধ্যস্থতা করে এই সংখ্যাটা দৈনিক মজুরী নির্ধারিত করেছে।

২৩৯ - শ্রমিকরা যে দৈনিক মজুরীর দাবিতে আন্দোলন করছে।

২৪,০০,০০,০০০ - চা শ্রমিকদের ন্যায্য প্রফিডেন্ট ফান্ডের মূল্য যা সামগ্রিক ভাবে ৫৫ টা চা বাগানের মালিকরা ফাঁকি দিয়েছে।

২০১৬ - এটা হলো সেই সাল যবে থেকে সমস্ত চা বাগানে সরকারি রেশন ব্যাবস্থা বন্ধ।

৪ - এটা হলো তত বছরের সংখ্যা যত বছর ধরে বাগানগুলোয় গ্র‍্যাচুইটি বন্ধ।

৪ - এটা হলো উত্তরবাংলার সমস্ত চা বাগানের থেকে ধর্মঘটে সামিল হওয়া শ্রমিকদের লাখে সংখ্যা।

১৩ -  সরকার এত টাকা দৈনিক মজুরী বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

 ৮৫০০ - মূখ্যমন্ত্রীর পুরনো মাইনে।

২৭,০০১ - বিধানসভায় বিল পাশ করিয়ে মাইনে বাড়ানোর পরে মূখ্যমন্ত্রীর নতুন মাইনে।

০ - এখনো অবধি টিভি চ্যানেলে এত মিনিটের কভারেজ দেওয়া হয়েছে এই ধর্মঘটকে।

০ - এখনো অবধি চা শ্রমিকদের নিয়ে কলকাতায় বিকেলের চায়ে চুমুক দিতে দিতে এত মিনিট কেউ মাথা ঘামিয়েছেন।

ওহা! ওস্তাদ তাজ বলিয়ে ~ তাপস দাস

তাজমহলের সামনে ওস্তাদ জাকির হুসেন বলতেন-"ওহা! ওস্তাদ ওহা! তাজ বলিয়ে।" বাড়িতে আপ্যায়ন মানেই চা। চা মানেই বাগান। রোমান্টিক আনাগোনা । বাগান মানেই কুলি কামিন। সাগিনা মাহাতো। চা বাগান মানেই লক আউট। গলা চিরে চিৎকার- " দিনু পরছ্ । দিনু পরছ্ । হুনদই ন। হুনদই ন। মিনিমাম ওয়েজ দিনু পরছ্।

সারে চার লক্ষ শ্রমিক। প্রায় কুড়ি থেকে পঁচিশ লক্ষ পেটের পরিবার। ২৭৮টি বাগান। উত্তরবঙ্গ। ২০১৬ সালে গত ১০০ বছর থেকে চলতে থাকা রেশন বন্ধ করেছে সরকার। এমন কোন বাগান নেই যেখানে বিদ্যুৎ. লকড়ি, বিজলি,স্বাস্থ্য শিক্ষা কোনটার দায়িত্ব পালন করছে সরকার । ২০১৪ সালে শেষ ত্রিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী ১৩২ টাকা দৈনিক মজুরি। মাজাক আর কি! ১৭ তে চুক্তি শেষ। শ্রমিকেরা মেনে নেয় নি। ২০১৪ সালে থেকে চলছে জয়েন্ট ফোরামের নেতৃত্বে আন্দোলন । ২০১৮ সালে ২৩ শে জুলাই থেকে ছিল শ্রমিকদের ঘোষিত বাগান ধর্মঘট। শ্রমিকেরা থেমে যায়। সরকার অনুরোধ করে। শ্রমিক সরকারকে সময় দেয় ৩০শে জুলাই পর্যন্ত। রাজ্যে যে উন্নয়নের সরকার চলছে, মিটিং হবে উত্তর কন্যায়।

৬ই আগস্ট। আজ ছিল ত্রিপাক্ষিক বৈঠক, শিলিগুড়ির সাধের উত্তর কন্যায়। নজিরবিহীন ভাবে এই প্রথমবার কোন সরকার শ্রমিকদের সাথে কোন আলোচনা না করে করেই একতরফা ১৭২ টাকা দৈনিক মজুরি ঘোষণা করে, কোন রকম আলোচনা, সৌজন্য না দেখিয়েই, একতরফা ভাবে ত্রিপাক্ষিক সভা ভেঙ্গে চলে যায়। অতীতে যা কখনও হয়নি, কোন সরকারের আমলে। 

তাহলে এবার শ্রমিকেরা কী করবে ? জয়েন্ট ফোরাম কী করবে? ঘরে ফিরবে ? সহ্যের একটা সীমা থাকে।

না। উত্তর কন্যায় অবস্থান চলছে। চলবে। চলবে যতক্ষণ পর্যন্ত, সরকার আবার ত্রিপাক্ষিক সভা পুনরায় ডেকে শ্রমিকদের সাথে আলোচনায় বসা পর্যন্ত। ততক্ষণ পর্যন্ত । অনির্দিষ্ট কালের জন্য। পেটের টানে লাগাতার আন্দোলন।

বাগানে বাগানে ধর্মঘট।

বাগানের হাজারে হাজারে কুলি কামিন, শ্রমিক মার্চ করবে উত্তর কন্যা শিলিগুড়ির দিকে।

বাকিটা ইতিহাস বলবে। খালি পেট থেকে দলা পাকানো বেরিয়ে আসা স্লোগান বলবে।

P. S উত্তরকন্যার গেট বন্ধ করে দিয়ে খাবার জল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। ভিতরে আটকে রয়েছে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে গিয়ে অবস্থান শুরু করা চা শ্রমিক নেতৃত্ব। পুরো ফ্যাসিস্ট কায়দায় আটকে ফেলা হল সব নেতৃত্বকে। কাউকে বার হতে দেওয়া হচ্ছেনা। খাবার, জল সরবরাহের ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জীবন জীবিকার যুদ্ধে চা শ্রমিকদের পক্ষ নিন। রুটি রুজির লড়াইয়ের পক্ষ নিন।

প্রশ্ন কোরোনা ~ আর্যতীর্থ

( আবার রোগীর মৃত্যুতে তান্ডব রায়গঞ্জের হেমতাবাদ প্রাথমিক সাস্থ্যকেন্দ্রে!)




ও কেন মারেনি প্রশ্ন কোরোনা, সিলেবাসে মার ছিলো না,
রোগী দেখে রোজ গাল খেতে হবে, এই জ্ঞান তার ছিলোনা।
অথচ এ দেশে সবচেয়ে যদি অকুলান কোনো পেশা হয়,
সেটা ডাক্তার, দিন চলে যায় জীবন ও জীবিকা মেশানোয়।

অদ্ভূত দেখো, কোটি মামলার যেখানে পাহাড় জমেছে,
সেখানে উকিলি স্ট্রাইকের চোটে কেজো দিনগুলো কমেছে
মৌন সেখানে সব আদালত, লাভ নেই ফরিয়াদে,
মুখরতা শুধু ফিরে আসে ঠোঁটে ডাক্তারী প্রতিবাদে।

এক ডাক্তারে রোগী সামলায় এগারো হাজার করে,
( উচিত হাজারে একজন থাকা , 'হু' য়ের হিসেব ধরে।)
ক্লান্তিতে চোখ জুড়িয়ে আসলে, বিশ্রাম নেওয়া মানা,
পান থেকে চুন খসলে কি হবে বহুকাল থেকে জানা।

ডাক্তার ধরে ফেসবুকে যারা গণপিটুনির পক্ষে,
অসুখবিসুখে তারা যায় কোথা জিজ্ঞেস করি লোককে।
পুজোপার্বণ ঝঞ্ঝাবাদল বাছো না যে কোনোদিন,
রোজ থেকে যায় স্টেথোদের কাছে কিছু জীবনের ঋণ।

আপনারা, যাঁরা ডাক্তার মেরে ফেরেন বীরের মতো,
কালিদাস হয়ে নিজেদেরই দেন আগামীকালের ক্ষত।
চিকিৎসা হলে ওষুধই কেবল হয়ে যেতো নেটে তবে, 
বাড়তি যেটুকু , এখন ভাগ্যে ক্রমে অকুলান হবে।

যাকে আজ তুমি দিলে বেধড়ক , সত্যি বা ফেসবুকে 
সে ছাড়াও আরো হাজার বৈদ্য খোলসে পড়লো ঢুকে।
যত বড় হও অমুক তমুক অথবা নেতার শিষ্য,
ইচ্ছেবিহীন চিকিৎসা জেনো ভিখারীর মতো নিঃস্ব।

ও কেন মারেনি প্রশ্ন কোরো না, সিলেবাসে সে তা শেখে নি,
অশ্রু বাঁচিও তাদের জন্য, আগামীকে যারা দেখেনি।