বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০১৭

অস্ট্রিয়া ভ্রমন - প্রদীপ্ত প্রতিম পাল


৯ই মে - ১৩ই মে

অস্ট্রিয়া বলতে আমি আমার ছেলের মনে যে দুটো ছবি চিরকাল জেগে থাকবে তা হল - ইনসব্রুক প্রাডলার স্ট্রাসে তে অল্টপ্রাডল হোটেল আর সালজবার্গ আরিবোনাস স্ট্রাসে তে হোটেল এরিনা আর মনে থাকবে আশ মিটিয়ে সঙ্গ দেওয়া আল্পস্ কে আর আছে ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে চলা ট্রাম, অমায়িক মানুষ, সবুজ কার্পেটে মোড়া country side আর কিলো কিলো অক্সিজেন
আমার ভ্রমণের আইটিনেরারি তে আগে ঢুকেছে ইতালি তারপর অস্ট্রিয়ার বিমান খুঁজতে ট্রানসেভিয়ার সাইটে গিয়ে যখন দেখলাম ১৫ই মে থেকে একমাস আইন্দহোফেন এয়ারপোর্ট বন্ধ থাকবে তখন তড়িঘড়ি টিকিট কাটতে হল তারপর বুকিং.কম- গিয়ে ইনসব্রুক সিলপার্কের কাছে হোটেল - এসব একের পর এক সারা গেল সালজবার্গ এরিনা হোটেলর খোঁজ আমার সহকর্মী বিশালের থেকে পাওয়া - এরকম সেরা জায়গায় একটা -তারা হোটেলে থাকা সত্যিই একটা সুন্দর অভিজ্ঞতা

ওরা ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়



- ওরা যে কি হারে সংখ্যায় বাড়ছে বাবা... ভাবা যায় না ...

- কে আবার বাড়লো এই সাত সকালে? পোকা? আরশুলো?

- উফ্‌ , তোমাদের মত লোকের ইগনোরেন্সেই এই হাল হয়েছে

- আমি? আমি আবার কি করলুম রে? আমি তো কাগজ পড়ছি

- ধুত , ওই কাগজই পড়ো আর চা ই খাও। অবসর জীবন......

- এত মাথা গরম করিস না তো। বোস এখানে। আজ তোর আপিসও নেই, তাড়াও নেই

- মেজাজটাই খাট্টা হয়ে গেল বাবা...

- খাট্টা? টক বলা যায় না?

- বুঝছোনা বাবা, সব শব্দে সেই জোরটা নেই। ভাষার ছুৎমার্গ থেকে বেরোও এবারে। আর মেজাজ খারাপ করে দিওনা তো, কাগজ পড়ো। আমি চট করে জামা কাপড় ছেড়ে একটু বাজার যাই

- বোস না, আজ তো রবিবার

- পাঁঠার দোকানে লাইন প্রতি সেকেন্ডে কি হারে বাড়ছে সেটা খেয়াল আছে তোমার? তার ওপর এই উটকো পাবলিকটা। নির্ঘাত জঙ্গী টঙ্গী হবে।

- জঙ্গী? বলিস কি রে?

- প্রথমটা বুঝিনি জানো। পার্কের মাঠে দৌড়ের পর আমি একটা বেঞ্চে ১০ মিনিট বসি। পরশু দিন দেখি একটা লোক বসে। বয়স্ক, সাদা পাজামা পাঞ্জাবি, ওই পঞ্চাশ পঞ্চান্ন বছর বয়স হবে, বেশ কাঁচা পাকা দাড়ি গোঁফ। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা।

- সেটাই জঙ্গী? বোমা ছিল পকেটে?

- আঃ বাবা, ডাইল্যুট করো না তো, শুনতে ইচ্ছে না থাকে আমি চলে যাচ্ছি।

- আহা, চটিস কেন? বল বল। আমি আর কিছু বলছিনা।

- আমি পাশে বসতেই লোকটা এক গাল হেসে বললো ওম-শান্তি-শান্তি-শান্তি......

- ওম শান্তি বলা জঙ্গী? বজরং দল নাকি?

- বাবা ... প্লিজ ...

- আমি মুখে কুলুপ। বলে যা।

- আমি একটু দেঁতো হেসে উঠে এলাম...

- প্রশ্ন চলবে?

- চলতে পারে

- তার পর কি হলো?

- বলছি... গতকাল গিয়ে দেখি পাবলিক আবার বসে আছে। আমি তাকাইনি ভাল করে। কিন্তু বেঞ্চে বসতেই লোকটা আবার বলল লেট দ্য পিস বি উইথ ইউ।

- জেডাই নাইট নয় তো? স্টার ওয়ারে ...... না না, ওরকম করে তাকাস না। তুইও স্টার ওয়ার ফ্যান। জানি। তোকে ৬ বছর বয়সে দেখতে নিয়ে গেছিলাম।

- তুমি একটা ইয়ে বাবা...

- আগে বাঢ়ো জওয়ান

- আজও গিয়ে দেখি শয়তানটা বসে আছে। তখনো অবশ্য বুঝিনি লোকটা ইয়ে

- ঘটনাটা কি ঘটল?

- হারামজাদা আজ এক গাল হেসে বলে কিনা আস-সালাম আলাইকুম... ভেবে দেখো, লোকটা আসলে কি সেটা দুদিন বুঝিনি, এই আমাদের এলাকায়, পাড়ার মধ্যে ঢুকে বসে আছে। ডেঞ্জারাস ...

- আমি তো ডেঞ্জার কিছু দেখলুম না রে

- দেখলে না? ব্যাটা আসলে কি বুঝলে না? পাকিস্তানের স্পাই। আই-এস ও হতে পারে। কিম্বা তালিবান। ঘরশত্রু বিভিষন তো বটেই। ব্যাটা মির্জাফরের বংশ

- কিন্তু কথা থেকে ধরতে হলে, তোর "খাট্টা" শুনে তোকেও তো ইউপি কিম্বা বিহারি ভাবা যেতে পারে

- "খাট্টা" আর "আস-সালাম আলাইকুম" এক হলো তোমার কাছে? এই তোমাদের ইগনোরেন্সেই এরা এতটা বাড় বেড়েছে।

- প্রথম দিন লোকটা কি বলেছিল?

- বলল "ওম শান্তি শান্তি শান্তি", আর গত কাল বলেছিল  লেট দ্য পিস বি উইথ ইউ।

- দুটোর মানে কি কাছাকাছি?

- প্রায় একই মানে। একটা আমাদের সংস্কৃত, অন্যটা ইংরিজি

- আর আজ যেটা বলল?

- "আস-সালাম আলাইকুম"? কে জানে? দাঙ্গা-হাঙ্গামা - খুন খারাপি - জেহাদ - গাজী টাজী কিছু একটা হবে।

- অনেক ছোটো বেলায় শোনা যদিও , তবুও মনে আছে, আস-সালাম-আলাইকুম মানে হল তোমাদের শান্তি লাভ হোক।

- মানে?

- মানে কিছুই না, ভদ্রলোক তোকে তিন দিন তিন ভাষায় একই কথা বলেছেন। তুই শেষেরটার মানে জানতিস না বলে ওনাকে জঙ্গী......... ওই দেখো...... চললি কোথায়? আরে.........।

শুক্রবার, ২৪ মার্চ, ২০১৭

দেশপ্রেমিক ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

যদি দেশপ্রেমিক হাসে
বরফজলে নুন মিশিয়ে স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসে
বাচাল কবি তীর্থে যাবে পর্বতে, সন্ন্যাসে
মুলতুবি হোক বিধানসভা তাণ্ডবে, উল্লাসে।।

যদি দেশপ্রেমিক পড়ে
হাজার পাতার থিসিস লিখুক গোমূত্রে, গোবরে
চাপাতি আর ত্রিশূল কোথায় চেঁচায় ঘুমের ঘোরে
ফলবে কথা বিজ্ঞজনের, অক্ষরে অক্ষরে।।

যদি দেশপ্রেমিক ছোটে
বসপা, সপা, কংগ্রেসি, আপ হারবে সবাই ভোটে
ডিমনি বুঝি এমনি হবে পাঁচশ, হাজার নোটে
ব্যাখ্যা সবই বেদেই আছে, পদ্ম হাজার ফোটে।।

যদি দেশপ্রেমিক কাঁদে
বিরোধী সব কৌটো নিয়ে হাজির প্রতিবাদে
মুর্গী, মাটন নিষেধ বলে রাজমা, চাউল রাঁধে
বলেন রাজা ঘুম আসেনা দেশের বোঝা কাঁধে।।

যদি দেশপ্রেমিক বলে
দেখবে জিও সিম দিচ্ছে নানান শপিং মলে
মাসি পিসি যাত্রা দেখে ভাসায় চোখের জলে
উন্নয়নের জোয়ার দেশে নোটবন্দীর ফলে।।

যদি দেশপ্রেমিক রাগে
সময়মত আইটি রিটার্ন ফাইল করিস আগে
বাঁদর ওঠে তেল মাখানো বাঁশের অগ্রভাগে
পুঁজির খোঁজে মন্ত্রী ছোটেন মস্কো থেকে প্রাগে।।

তুচ্ছ ভেবে দেশপ্রেমে করলে অবহেলা
টিকি , দাড়ির আসল নকল প্রণামী, চালকলা
দারিদ্র আর অর্থনীতির নানান গণ্ডগোলে
ধর্ম থাকুক, ত্রিশূল থাকুক, আগেই রাখি বলে।।

রবিবার, ১৯ মার্চ, ২০১৭

নির্বাচন'ই শেষ কথা নয় ~ সুশোভন পাত্র

১ কোটি ৮০ লক্ষ প্রাথমিক সদস্য। ৮৯,১০৪ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক। ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৪০১টি বুথ কমিটি। ছটি মান্ডলিক কমিটির মাধ্যমে সৰ্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়। ৪০৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে ৮,১৩৮ কিলোমিটার 'পরিবর্তন যাত্রা'। ৭৭টি মহিলা সম্মেলন। ৮৮টি যুব সম্মেলন। ১৪টি প্রাদেশিক বণিক সম্মেলন। ২০০টি অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায় ও দলিত সম্মেলন। ৭৫টি জেলাতে ৩,৫৬৪ কৃষক সভা। শেষ ৬ মাসে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ৩৪টি 'কমল মেলা।' ১,৬৪৯টি মোটর সাইকেল মিছিল। ২,৮০,২৬৭টি গ্রামসভা। ৮,৫৭৪টি পথ নাটিকা। অ্যাড এজেন্সির পরামর্শে রাজ্যের প্রথম সারির সমস্ত প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন। ভিডিও ভ্যানে সব বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ৫৮ হাজার শো। ৭৫টি ভার্চুয়াল 'ভিডিও রথে'র মাধ্যমে শহরে শহরে 'মন কি বাত'। ৫,০৩১ জনের সোশ্যাল মিডিয়া টিম। চারটি ফেসবুক এবং একটি টুইটার হ্যান্ডল। ১০,৩৪৪ হোয়াটস অ্যাপ গ্ৰুপ। ক্যাবিনেট সহ প্রধানমন্ত্রীর হাই প্রোফাইল উপস্থিতি। ব্যক্তিগত অনুদান হিসেবে ১৬,৯১,৭২,৩১৫ টাকা অর্থ সংগ্রহ। 
এই সবটা মিলিয়ে একটা 'ইলেকশন ক্যাম্পেন'। বি.জে.পি'র 'ইলেকশন ক্যাম্পেন'। এই সবটা মিলিয়ে একটা নির্বাচনী রণনীতি। উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনী রণনীতি।    
রাজপুত অধ্যুষিত হিরণওয়াড়া গ্রামে এস.পি'র প্রাপ্ত ভোট ৭, বি.এস.পি'র ১৪, আর বি.জে.পি'র ৭৯০। ব্রাহ্মণ ভূস্বামী সংখ্যাগুরু এবং গুরুত্বপূর্ণ দলিত উপস্থিতির ভাণ্ডডা গ্রামে এস.পি'র প্রাপ্ত ভোট ৯, বি.এস.পি'র ১৫৬, আর বি.জে.পি'র ৫৭০। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জালালাবাদ বি.জে.পি'র প্রাপ্ত ভোট ২৩, এস.পি'র ২৩১, বি.এস.পি'র ৪৫৩। ৩৫% যাদব জনসংখ্যার মেনপুরী বিধানসভায় আবার বিপুল ভোটে বিজিত এস.পি। গ্রামের পর গ্রাম, বিধানসভা পর বিধানসভা এই  একই বাঁধা ধরা 'প্যাটার্নের' প্রতিলিপি। সাধারণ মানুষের নির্বাচনী কড়চা'তে উঠে আসেনি ইশতেহারের অনুচ্ছেদ, পাত্তা পায়নি অর্থনীতির যুক্তি-তক্ক, ব্যালট বক্সে জমা পড়েনি ইস্যু ভিত্তিক মেরুকরণ। বরং ই.ভি.এমে কোথাও যুদ্ধ হয়েছে হিন্দু-মুসলিম'দের। কোথাও ব্রাহ্মণ-দলিত'দের। কোথাও আবার জাঠ-যাদব'দের ¹ ² । 
এই সবটা মিলিয়ে একটা ব্লু-প্রিন্ট। বি.জে.পি'র ব্লু-প্রিন্ট। এই সবটা মিলিয়ে একটা 'প্রোপাগান্ডা'। বি.জে.পি'র 'প্রোপাগান্ডা'। যার ক্যাসকেডিং এফেক্ট একটা নির্বাচনী জয়। বি.জে.পি'র উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী জয়।  
ইরম শর্মিলা'র রাজনৈতিক দল 'প্রজা'র আহ্বায়ক এবং নির্বাচনী পদপ্রার্থী এরেন্দ্র লেইচম্ম। হাভার্ডের অর্থনীতির স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আর ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের বিলাসী চাকরি; দুটোই ছেড়ে মাটির টানে ফিরেছিলেন মনিপুরের নির্বাচনী রাজনীতিতে। প্রচারের সময় ঘুরে বেড়িয়েছেন, সবার কথা শুনেছেন, নিজের কথা বলেছেন। সবশেষে  ১১ তারিখ প্রণামী বাক্সে দক্ষিণা জুটেছে ৫৭৩টি। প্রজা'র অন্য মহিলা পদপ্রার্থী মাইতেই মুসলিম নাজিমা বিবি। নিছকই প্রাণোচ্ছল সামাজিক কর্মী। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক হাজার পারিবারিক নির্যাতনের শিকার মহিলার মামলা লড়ছেন, মনিপুরের দুঃস্থ নারী'দের জন্য গড়ে তুলছেন আস্ত একটা 'হোম'। অনলস নির্বাচনী প্রচারও করেছিলেন এই নাজিমা বিবি। সর্বসাকুল্যে ভোট জুটেছে ৩৩টি    ³ । 
২রা নভেম্বর, ২০০০ ম্যালম, মনিপুর। ভারতীয় সেনা নির্বিচার গুলি চালিয়ে হত্যা করল ১০ জন যুবক কে। পরের দিনই  প্রতিবাদী অনশন শুরু করেছিলেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তরুণী -ইরম শর্মিলা। আত্মত্যাগ আর দৃঢ়তার প্রতীক সেদিনের ইরম শর্মিলা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন আফস্পা'র বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মুখ। মনিপুরের মানুষের চোখের মনি। বিশ্বের 'লৌহ মানবী' ⁴ । টানা ১৬ বছর পর অনশন ভেঙ্গে যেদিন ইরম শর্মিলা বলেছিলেন "আমিও বেঁচে থাকতে চাই। বিয়ে করতে চাই। ভালবাসতে চাই। কিন্তু সবার আগে নির্বাচনী রাজনীতি'তে এসে আফস্পা'র মত কালা আইনের নিরসন করতে চাই" -সেদিনই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল মনিপুর। নাগা, কুকিস, পাইতে, দেস উপজাতি অধ্যুষিত প্রবল চড়াইয়ের পার্বত্য এলাকা হোক বা মাইতেই হিন্দু সংখ্যাগুরু আপাত সমতল -গেঁয়ো যোগীকে ভিখ দেয়নি প্রবল পুরুষতান্ত্রিক মনিপুর ⁵। বি.জে.পি-কংগ্রেসের শক্তিশালী 'মেথডিক্যাল প্রোপাগান্ডার' কাছে ইরম শর্মিলা এবং তাঁর নির্বাচনী রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা কে বাণের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে মনিপুর। উত্তরপ্রদেশের পৌরাণিক হস্তিনাপুরে যেখানে বহুজন মুক্তি পার্টির 'দুর্যোধন'ও পেয়েছে ৮৫৩ ভোট ⁶, সেখানে ইরম ইরম শর্মিলা কে গুণে গুণে ৯০টা ভোটে দিয়েছে মনিপুর। 
আসলে এই নির্বাচনী রাজনীতি তে, টানা ১৬ বছর নাকে নল গুঁজে অনশন করে, আফস্পা'র মত কালা আইনের বিরুদ্ধে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে, ইরম শর্মিলা'ও হারতে পারে। আবার এই নির্বাচনী রাজনীতি তেই, ৯'র দশকে মেলোড্রামাটিক বাংলা সিনেমায় চোখের জলে ঘর ভাসিয়ে দেওয়া সন্ধ্যা রায় ড্যাং ড্যাং করে লোকসভায় অন্দরে পৌঁছে  গিয়ে নিশ্চিন্তে হাই তুলতে পারে। আর পারে বলেই যে দেশে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ ক্ষুধার্ত বাস করে ⁷, যে দেশে ২৭ কোটি মানুষ এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে দরিদ্র সীমার নিচে বাঁচে ⁸, যে দেশে প্রতি বছর ১৪,০০০  কৃষক ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করে ⁹, যে দেশের ৩০% শিশু অপুষ্টিতে ভোগে ¹⁰, যে দেশে ৬০.৪ কোটির ঘরে শৌচাগার নেই ¹¹, যে দেশে ৭.৫ কোটির ঘরে পরিস্রুত পানীয় জলই নেই ¹², সেই দেশেরই সাধারণ মানুষই আবার বৃহত্তম গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করে বেছে নেয় ৮২% কোটিপতি সাংসদ ভর্তি এক সংসদ কক্ষ। সেই দেশেরই সাধারণ মানুষই নিজের এবং দেশের নিরাপত্তার সমস্ত দায়িত্ব এমন সংসদ কক্ষের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন যে সংসদ কক্ষের শতকরা ৩৪%'র বিরুদ্ধে রয়েছে খুন, ধর্ষণ, কিডন্যাপিং কিম্বা দাঙ্গার মত ফৌজদারি মামলা ¹³ । 
আসলে নির্বাচনী রাজনীতি কোন ফ্লুক নয়, আবেগ কিম্বা আত্মত্যাগের প্রদর্শনী নয়। নির্বাচনী রাজনীতি আদর্শের ভারমাপক দাঁড়িপাল্লা কিম্বা ক্লাসিক্যাল 'শ্রেণী সংগ্রামের' আয়নায়ও নয়। বরং নির্বাচনী রাজনীতি একটা জটিল গাণিতিক বিজ্ঞান। নির্বাচনী রাজনীতি একটা কার্যকরী কৌশলের বাস্তবায়ন। নির্বাচনী রাজনীতি একটি সম্পূর্ণ সাংগঠনিক 'মেশিনারি'। নির্বাচনী রাজনীতি একটা 'প্রোপাগান্ডা'। শুধু ইরম শর্মিলার আত্মত্যাগ কিম্বা লেনিন-স্তালিন'র 'কি করিতে হইবে' দিয়ে এই নির্বাচনী রাজনীতি তে জয় নিশ্চিত হয় না। লোহা দিয়ে লোহা কাটতে ইউ মাস্ট হ্যাভে 'কাউন্টার প্রোপাগান্ডা'। ইউ মাস্ট হ্যাভে বেটার প্রোপাগান্ডা। এটাই নির্বাচনী রাজনীতি। টেক ইট, অর লিভ ইট।














শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

না মানে না ~ সঞ্জয় ঘোষ

এখন মধ্য দুপুর
পথের তিনটি কুকুর
দেখছে, হাসছে, চাটছে
ভাদ্র সোহাগে ভাসছে।

তোমার নেইতো বিচার
বোশেখ, ভাদ্র, আষাঢ়
সমান লোলুপ তুমি
সাজাও বধ্যভূমি।

গলিতে, গুদামে, ঝোপড়ায়
দুপুরে, রাত্রে, সন্ধ্যায়
নয়, নব্বই, উনিশ
সবই ভোগের জিনিষ!

কুরে কুরে খাও তার
মাংস, মজ্জা, হাড়
খোবলানো চোখদুটি
সাধ স্বপ্নের ছুটি!

আমারও তো কিছু ছিল
রঙিন খেলনাগুলো,
লাল ফিতে, ঘাস ভিজে
আকাশ সাজাবো নিজে!

আকাশে একটি মুখ
নিবিড় গোপন সুখ,
পুরুষ মানে তো প্রেমও!
আজ ভুলে গেছি সেও।

ভুলিনি, করিনি ক্ষমা
আমি নির্ভয়া, মনোরমা
তোমাকে বিঁধবো শেষে
অভিসম্পাতে, বিষে!
 
 
 
 
শিলাটা সরাও, লাগছে
ভীষণ বমি পাচ্ছে!
আমি তো বলছি 'না'
শুনতে পাচ্ছো না?

বাতাসে বাজছে 'না'
কেউ শুনতে পাচ্ছো না?

#NoMeansNO!

বুধবার, ৮ মার্চ, ২০১৭

বিরক্তিকর ~ নীলাঞ্জন গুহ মাজুমদার


- কি বিরক্তিকর দেখেছেন!

- কোন ব্যাপারটা বলছেন বলুন তো?
- আরে, এই যে আপনার চোখের সামনেই তো দেখছেন!
- চোখের সামনে তো দেখছি "হিংসা কোরো না, তোমারও হবে" লেখা আছে কালো ধোঁয়া ছাড়া ট্রাকটার পেছনে!
- আরে মোলো যা! আমি বলছি, ওই ওদের কথা! ওই যে দাড়িগুলো ঝুলছে, অদ্ভুতভাবে!
- ও আচ্ছা! হ্যাঁ, এই খাসিগুলো আসলে এখানেই ঘাস খেতে ছেড়ে রাখে। কিন্তু খাসির মাংস তো অত্যন্ত উপাদেয় জিনিস মশায়! বিরক্তিকর কেন হবে?!
- আপনি কি ইচ্ছে করে আমাকে হ্যাটা করছেন?!
- পাগল হয়েছেন! সেরকম কোনো ইচ্ছেই আমার নেই!
- তাহলে বুঝেও বুঝছেন না কেন?
- মাইরি বলছি, যেটুকু বললাম, তাছাড়া আর কিছু বুঝতে পারছি না বলেই বুঝছি না! আপনি বরং একটু খোলসা করে বললে সুবিধে হয়, নাহলে এখুনি আমার মাথা ধরে যাবার সম্ভাবনা!
- সামনের ওই মিনি ট্রাকগুলো দেখুন।
- দেখলাম।
- কি দেখলেন?
- বেশ কিছু লোক গাদাগাদি করে বসে আছে, আর লাফাতে লাফাতে গাড়িটা যাচ্ছে। ওইটেই বিরক্তিকর।
- কেন? আপনি তো ওই গাড়িতে বসে লাফাচ্ছেন না!
- আচ্ছা মুশকিল হল! আমি সেকথা বলছি না!
- তাহলে কি বলছেন?
- ওই ছাগলদাড়ি, লুঙ্গির উপর লম্বা ফতুয়া, মাথায় একই সাদা টুপি - জাস্ট অসহ্য!
- আপনার থেকে টাকা পয়সা নিয়েছে নাকি কেনার জন্যে?!
- আপনি মাইরি বেকার ঘোরাচ্ছেন ব্যাপারটা! আমার ওদেরকেই সহ্য হয় না!
- সেটা ঠিক! আমাদের থেকে পশুপাখিরা অনেক ভালো, এটা আমিও মানি।
- আপনি ওদের সঙ্গে আমাদের তুলনা করলেন?
- না, মানে, আমরা সবাই হোমো স্যাপিয়েন্স বলেই জানতাম!!
- আমি সেটা বলছি না আপনি ভালো করেই জানেন! ওদের এই অশিক্ষিত আচার-বিচার একেবারেই সহ্য হয় না! যেখানে সেখানে ভীড় করবে, রাস্তাঘাটে চলা যাবে না, নোংরা করবে! দেখুন না, কিভাবে অসভ্যের মত তাকিয়ে আছে এদিকে!
- এইটাই আপনার বিরক্তির কারণ?
- কেন, ভুল কিছু বললাম?
- আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করি?
- করুন...
- দুর্গাপুজোয় ভীড় হয় রাস্তায়। গোটা কলকাতা আর শহরতলি অচল হয়ে যায়। আপনার বিরক্তি লাগে তো?
- কিসের সঙ্গে তুলনা করছেন!! আশ্চর্য!
- শিবের মাথায় জল ঢালতে একগুচ্ছ লোক মাইলের পর মাইল রাস্তাঘাট নরক গুলজার করতে করতে তারকেশ্বর যায়। আশা করি তখনও আপনার বিরক্তি লাগে?
- আপনি বুঝছেনই না ব্যাপারটা।
- প্রশ্নের উত্তরটা দেবেন কি?
- এই প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় নাকি!! অদ্ভুত সব মিনিংলেস প্রশ্ন আপনার! আপনি আসলে কোনদিকে বলুন তো?
...
...
- আসুন, আপনার নামার সময় হয়েছে...
- চলুন, আবার কাল দেখা হবে।
- অবশ্যই! যদি আপনার বিরক্তি না লাগে।
- কি যে বলেন! আপনার সঙ্গে বিরক্তি কেন লাগবে?!
- কাল আমি ছাগলদাড়ি, মাথায় টুপি, আর লুঙ্গির উপর ফতুয়া পরে আসব। তাই বললাম...

শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

রাষ্ট্র ~ সাক্যজিত ভট্টাচার্য্য

"ফ্রানজ কাফকার বিশ্রুত উপন্যাস 'দ্য ট্রায়াল'-এ নায়ক জোসেফ কে একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে  উঠে দেখেছিল  তার ঘরে পুলিশ। তার অপরাধের বিচারের  জন্য আদালতের শমন নিয়ে এসেছে। জোসেফ কে  জানত না তার অপরাধ কী। পুলিশ, আদালত, আমলাতন্ত্র সকলের কাছে প্রশ্ন করলেও উত্তর মেলে না।  এদিকে বিচার চলতে  থাকে নিজের নিয়মে। আর এই প্রক্রিয়াতেই আস্তে আস্তে কে-র ব্যক্তিগত জীবনে, সম্পর্কে, এমনকি শোবার ঘরে পর্যন্ত রাষ্ট্র ঢুকে পড়ে। তার গতিবিধি, চলাফেরা, কার সাথে সে মেলামেশা করছে সবকিছুর হিসেব অলক্ষ্যে পৌঁছে যেতে থাকে  আদালতের কাছে। 

জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা এই বছরের জানুয়ারি মাসে বস্তারে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের তদন্ত করছিল। এক রাত্রিবেলা  সংস্থার সদস্য  এবং পরিচিত মানবাধিকার কর্মী বেলা ভাটিয়ার ছত্তিশগড়ের  বাড়িতে জনা তিরিশ সশস্ত্র দুষ্কৃতি হানা দেয়। তারা হুমকি দেয় বেলাকে এই মুহূর্তে এই রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে হবে। কথা না শুনলে বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে এবং মেরে ফেলা হবে বেলার আদরের  পোষ্যটিকে। বারবার বেলা ভাটিয়া জিজ্ঞাসা করেন তাঁর অপরাধ কী। উত্তর মেলেনি। চলতে থাকে অকথ্য গালিগালাজ।  নিরুপায় বেলা পুলিশ ডাকেন। পুলিশ আসে, সঙ্গে আসেন  গ্রামের সরপঞ্চ। এবং বেলা সবিস্ময়ে দেখেন, পুলিশ এবং সরপঞ্চ দুজনেই দুরে দাঁড়িয়ে মজা দেখার ভঙ্গীতে গোটা ব্যাপারটার পর্যবেক্ষণ করছে। বেলার বাড়িওয়ালিকে দিয়ে পুলিশের সামনে দস্তখৎ দেওয়ানো হয় যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনি দায়ীত্ব নিয়ে বেলাকে বাড়িছাড়া করাবেন। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। বাড়ির মালিক এবং তাঁর ছেলেদের স্থানীয় থানায় ডাকা হয় এই ঘটনার পরদিন। পুলিশ শাসায় যে বেলা এই অঞ্চল না ছাড়লে তার ফলাফল ভাল হবে না।  

ঠিক একই  পদ্ধতিতে এর আগে ভয় দেখিয়ে অথবা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে   বস্তার থেকে বার করে দেওয়া হয়েছিল সাংবাদিক মালিনী সুব্রমণিয়াম, আইনজীবি শালিনী ঘেরা এবং ঈশা খাণ্ডেলওয়ালকে। এঁরা সকলেই জগদলপুর লিগাল এইড নামক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত  ছিলেন। বস্তারের ডিআইজি এসআরপি কাল্লুরির নেতৃত্বে পুলিশবাহিনীর দমনমূলক কার্যকলাপ, হত্যা, ধর্ষণ, মিথ্যে কেসে মাওবাদী অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেওয়া ইত্যাদি  ডজন ডজন অভিযোগ  নিয়ে এই লিগাল এইড বহুদিন ধরেই সরব। এই কারণে  কিছুদিন আগেই বস্তার পুলিশের পক্ষ থেকে এই লিগাল এইডের নেতৃত্বের কুশপুতুল পোড়ানো হয়েছিল। যদিও প্রতিটি নিগ্রহের ঘটনার পরেই পুলিশ হয় হীরন্ময় নীরবতা পালন করেছে, নাহলে সব দায় চাপিয়েছে স্থানীয় দুস্কৃতিদের উপর। 

নাজিব আহমেদ। জে এন ইউ-র ছাত্র ছিল। গত বছরের ১৫ই অক্টোবর হস্টেলে রাষ্ট্রীয় বিদ্যার্থী পরিষদের কিছু সদস্যদের সঙ্গে তার রাজনৈতিক বচসা হয়েছিল। সেই দিন থেকেই নাজিব নিখোঁজ। তার বন্ধুরা এবং পরিবারের তরফ থেকে দিল্লি পুলিশ ও সরকারের কাছে বারবার আবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি। গত ২৯শে জানুয়ারি নাজিবের বাড়িতে দিল্লি পুলিশের প্রায় ৫০ জনের একটি দল হানা দেয়। তারা বাড়ি ঘর তছ্নছ করে, সমস্ত ঘরের আসবাবপত্রের  ছবি তুলে নিয়ে যায়, এবং বাড়ির সদস্যদের ঠারেঠোরে হুমকি দেয় মামলা প্রত্যাহার করার জন্য। নাজিব যে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এরকম কথাও বলা হয়।  এমনকি নাজিবের নব্বই বছরের বৃদ্ধ মাতামহও পুলিশি নিগ্রহের হাত থেকে রেহাই পাননি। যথারীতি দিল্লি পুলিশ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার  করে ঠাণ্ডা গলায় জানিয়ে দিয়েছে যে তদন্তের স্বার্থেই যা হবার হয়েছে। 

ঘটনাগুলো কি অভিনব? না, এগুলো আজ প্রথম ঘটছে না। পুলিশ বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গলা তোলার ফলে হেনস্থা হতে হয়েছে, এরকম অভিযোগ বিজেপি অথবা কংগ্রেস, কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের আমলেই কম নয়। কিন্তু যে জিনিসটা অভিনব, সেটা হল প্রায় শৈল্পিক দক্ষতায় নাগরিকের শোবার ঘরে রাষ্ট্রের ঢুকে পড়া। মানতেই হবে, এই দক্ষতার আমদানি করেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। এর আগে এই সমস্ত কাজ হত অনেক মোটা দাগে, খুন জখমের মাধ্যমে ।  তাই সেগুলোর বিরুদ্ধে গলা চড়ানোটাও ছিল অপেক্ষাকৃত সহজ। এখন সম্ভবত রাষ্ট্রব্যবস্থা বুঝে গেছে যে  প্রতিবাদীর  শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বইয়ে দিতে গেলে সূক্ষ মনস্তাত্বিক চাপটুকু অনেক বেশি কার্যকরী।  উপরের ঘটনাগুলো  তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। 

বেলা ভাটিয়ার বাড়িতে আক্রমণ করেছে কারা? পুলিশ? মোটেও না। পুলিশ বরং চক্ষুলজ্জার খাতিরে হলেও একবার এসেছিল। আক্রমণ করেছে কিছু স্থানীয় গুণ্ডা। পুলিশের সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে  তাদের সম্পর্ক থাকার কথা নয়। আক্রমণ হয়েছে রাত্রিবেলা, ঠিক যে  সময়টাতে মানুষ সবথেকে ক্লান্ত থাকে, থাকে মানসিকভাবে অগোছালো। লক্ষ্যণীয়, আক্রমণকারীর দল কিন্তু বেলাকে প্রাণে মারবার হুমকি দেয়নি। বরং হুমকি দিয়ে গেছে যে বেলার কুকুরটাকে মেরে ফেলবে। এই প্রায় অ্যাবসার্ড একটা হুমকি যে মানসিকভাবে একজন মানুষকে কী  ভয়ংকরভাবে দুমরে মুচড়ে ফেলে, সেটা তাঁরাই বুঝবেন যাঁদের  পোষ্য আছে।  বেলাকে প্রাণে মারার হুমকি দিলে সেটা বরং অনেক চেনা ছক হত, তার মোকাবিলাও তেমনভাবেই করা যেত। কিন্তু একটি অবোলা জীবকে হত্যার দায়ভার নেবার যে মনস্তাত্বিক চাপ, বেলার মত  সংবেদনশীল সমাজকর্মী সেটা স্বাভাবিকভাবেই নিতে পারবেন না। এখানেই শেষ নয়। পুলিশ বেলার বাড়িওয়ালিকে হুমকি দিল যাতে বাড়ি ফাঁকা করে দেওয়া হয়। নিশ্চয়, পুলিশ তো বেলার ভালর জন্যেই এই কথা বলেছে, যাতে তাঁর কোনো অনিষ্টসাধন না হয়! মনে রাখতে হবে, বস্তারে পুলিশবিরোধী আন্দোলন শুরু হবার কয়েক মাসের মাথাতেই 2015 সালে একইভাবে পুলিশ চাপ দিয়ে বেলাকে আগেও একবার নিজের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছিল। তখনো শোনা গিয়েছিল যে পুলিশ নাকি বেলার নিরাপত্তার জন্যই এটা করেছে। 

নাজিবের ক্ষেত্রেও, একটি সাধারণ বাড়িতে রাত্রিবেলা পুলিশ হানা এবং নব্বই বছরের বৃদ্ধকে হেনস্থা করা আসলে  মনস্তাত্বিক ছকটিকেই অনুসরণ করছে। সমাজের দুর্বল এবং আত্মরক্ষায় অক্ষম অংশটিকে নিগ্রহের মাধ্যমে বিপক্ষকে নুইয়ে দেবার পদ্ধতিটি চেনা । এবং পদ্ধতিটার প্রয়োগ করা হচ্ছে তথাকথিত আইনের গণ্ডীর মধ্যে থেকেই। পুলিশ কোনো  আইন ভাংছে না, কাউকে পিটিয়ে মারছে না, প্রাণে মারার হুমকিও দিচ্ছে না। এগুলো না করে শুধুমাত্র মানসিক নির্যাতন করতে করতে রাষ্ট্র ঢুকে যাচ্ছে আমাদের অন্দরমহলে।  তাকে পুরোদমে সহায়তা করছে আমলাতন্ত্র। এবং তাই খুব মসৃণ গতিতে মালিনী সুব্রমণিয়ামদের বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা তুলে নাস্তানাবুদ করা হয়। বেলা ভাটিয়াকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নিজের বাড়ি ছাড়তে হয়। এবং খুব শান্ত গতিতে, যেন কিছুই হচ্ছে না এমন ভাব নিয়ে জগদলপুর লিগাল এইডের একাধিক সক্রিয় কর্মীর পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন আটকে যায়, অথবা রেশন কার্ড জালিয়াতি করার অভিযোগে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। কোনো বেআইনি পথ অবলম্বল না করে এবং এক ফোঁটাও বিতর্ক না বাড়িয়ে রাষ্ট্র প্রমাণ করে দিচ্ছে তার দাঁতের ধার। একে খুব উন্নতমানের ফ্যাসিবাদ না বললে আর কাকে বলা হবে? 

আর সংবাদমাধ্যমগুলির ভূমিকা? জরুরী অবস্থার সময়ে সংবাদপত্রের ভূমিকা নিয়ে লালকৃষ্ণ আদবাণি বলেছিলেন "তাদের ঝুঁকতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল, আর তারা হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছিল"। বর্তমানে জরুরি অবস্থা জারি করবার  আর  দরকার পড়ছে না। রাজনৈতিকভাবে অশান্ত অঞ্চলে কোনো  নক্সালপন্থী দলের নেত্রী গেলে বাংলার বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রটি মড়াকান্না জুড়ে দিচ্ছে "ভাঙ্গরে নক্সালদের অনুপ্রবেশ"! যেন নক্সালদের ওখানে যাওয়া  বেআইনি কোনো ঘটনা!  জেএনইউ-র অধ্যাপিকা নিবেদিতা মেনন যখন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন কাশ্মীরকে বলপূর্বক ভারতের অংশ করে রাখার যৌক্তিকতা কতখানি, সংবাদমাধ্যমগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিবেদিতাকে দেশদ্রোহী প্রমাণ করবার জন্য। মানুষের গতিবিধি, স্বাধীন মতামত, এমনকি কার সাথে মেলামেশা করা হচ্ছে সেই জিনিসগুলির ওপর প্রায় গোয়েন্দার মত নজর রাখছে সংবাদমাধ্যম। আর এভাবেই তারাও চমস্কি কথিত 'সম্মতি নির্মাণের' রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার হিসেবে সফলভাবে  ঢুকে পড়ছে আমাদের অন্দরমহলে। 

কাফকা জানতেন, ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। যদি একদিন  মাঝরাতে গুণ্ডারা আপনার দরজায় কড়া নাড়ে, অথবা সকালে যদি একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখেন আপনার সংগ্রহের 'দাস ক্যাপিটাল'টি হাতে নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসা করছে আপনি মাওবাদী কি না,  বুঝবেন এই ভারতবর্ষে  বেলা ভাটিয়া কোনো বিচ্ছিন্ন নাম নয়। আর মনে রাখবেন, জোসেফ কে-র বিচারের রায় ছিল মৃত্যুদণ্ড। এবং মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সে নিজের অপরাধ জানতে পারেনি। "

আরেক রকম পত্রিকার ফেব্রুয়ারি মাসের সম্পাদকীয়, যেটা আবার ঘটনাচক্রে আমারই লেখা। লেখবার সময়েও ভাবতে পারিনি কয়েকদিনের মধ্যেই আমার জীবনেও এটা সত্যি হয়ে যাবে। পুলিশের এফআইআর, আইন আদালত ইত্যাদি তো ছেড়েই দিলাম, আমার ব্যক্তিগত জীবন, আত্মীয় স্বজন এবং বান্ধবীদের নিয়ে পর্যন্ত রসালো কেচ্ছা, প্রায় পর্নোগ্রাফি লেখা, এগুলো আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এগুলো সবই ঘরের অন্দরমহলে রাষ্ট্রের সহস্র চোখ ঢুকে যাবার একটা পদ্ধতি। যে কাজে শামিল হিন্দুত্ববাদীরা এবং তাদের অন্যান্য কিছু সহযোগী । কাজেই কাল যদি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার দুই বছরের আগে করা একটা আলটপকা কমেন্টের স্ক্রিনশট হাতে নিয়ে পুলিশ আমার দরজাতে কড়া নাড়ছে আর জিজ্ঞাসা করছে আমার আইএসআই কানেকশন আছে কি না, তাহলে বুঝতে হবে ভারতরাষ্ট্রের গৈরিকীকরণ সম্পূর্ণ । Eppur si muove? ahimè, la terra è morto!

আ মরি উর্দু ভাষা ~ অবীণ দত্তগুপ্ত

আজ থেকে বেশ কিছুদিন আগে আমার এ লেখা লেখার কথা । যেদিন বাপ্পামামার কাছ থেকে স্রেফ প্রচ্ছদ দেখে মান্টোর এই অনুবাদ খানা এনেছিলাম , তার দুদিনের মধ্যেই লেখা উচিত ছিল । অন্তত ২১শে ফেব্রুয়ারি । নাহ্‌ । দিনান্তের ক্লেদ সঞ্চয়ে আর প্রতিদিনের সর্বশক্তিমানের সাথে যুদ্ধে , সে সময় পাওয়া যায় নাই । আজ পেলাম তাই লিখি । এই লেখার পুরোটার জন্যই আমি মান্টোর অনুবাদক আতিশ তাজিরের কাছে ঋণী । 

আতিশের মা এবং বাবা যথাক্রমে ভারতিয় এবং পাকিস্থানি পাঞ্জাবি । আতিশ দিল্লীতেই বড় হয়েছে । আতিশের বাবা মা এবং দাদু উর্দুতে কবিতা লিখতেন । দাদুর একটি কবিতার খাতা আতিশ পেয়েছিল উত্তরাধিকারে । কিন্তু আতিশ উর্দু জানে না, অথচ উর্দুতেই লুকিয়ে ইতিহাস । অতএব ডাক্‌ পড়ল জফর মুরাদাবাদির । মুরাদাবাদি অবশ্যই মুরাদাবাদে থাকতেন বলে , আসল নাম কেউ জানে না । এটা ২০০৪এর কথা । 

জফর মুরাদাবাদে এসছিলেন , যখন তার বয়স ২১ । সালটা ১৯৬১ , এবং তখনো উনি কবি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন । আর কবি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন বলেই না মুরদাবাদে , গালিবের শহরে , উর্দু কবিদের দেশে আসা । জন্ম কোথায় , তাতে কি বা যায় আসে ?? কর্ম মুর্দাবাদে । মির , ঘালিব , মোমিন আর দাঘ-এর মতো কবির জন্মস্থান কেউ না জানুক , কর্মস্থান মুরাদাবাদ সক্কলে জানে । অতএব জফর-ও এসেছিলেন । এসেছিলেন তখন , যখন উর্দুতে কবিতা পাঠ হলে , লোকে হল ভরে শুনতো । এসেছিলেন তখন , যখন উর্দু কবি কোন ডায়নোসারের সমোগত্রিয় শব্দবন্ধ ছিল না । জফর এসেছিলেন । জফর রাজনীতি বুঝতেন না । বুঝলে জানতেন উর্দু , ভারতের ত্যাজ্য ভাষা । 

সেই ৪৭এর পরের থেকেই পাকিস্থান , উর্দুর সাথে ইস্লামিক্‌ রাস্ট্রকে এক করে দেওয়ার প্রচেষ্টা আরম্ভ করেছিল । অথচ যে সমস্ত ভুখন্ড পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত , তাদের একটিতেও উর্দুর কোন প্রভাব ছিল না । উর্দু ছিল ভারতের নিজস্ব , পুরানি দিল্লী - মুরাদাবাদ তদ্‌সম-তদভব অঞ্চলের ভাষা । ফায়েজের মতো কবিরা ,উর্দুকে পাঞ্জাবে হাত ধরে নিয়ে এসেছিলেন বললেও ভুল বলা হবে না । কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণ বসত ভারত সরকার , উর্দু ভাষা থেকে দূরে সরতে শুরু করলেন , কাছে এগোতে থাকলো পাকিস্থান । জফররা কেবল ছিলেন বিলুপ্ত প্রজাতি , ভারত বা উর্দু কোনটাই ছাড়তে পারলেন না । 

এরপর ভারতের সরকার আস্তে আস্তে দেবনাগরীর মতো একটি লিপিকে যতো এগোতে থাকলেন , ততো পেছোতে থাকলো জফরের ভাষা । কিন্তু তবুও ভারতের অসামান্য মিলিয়ে দেওয়া , এবং বৈচিত্রের সংস্কৃতি উর্দুকে খুন করতে দিল না । বাঁচিয়ে রাখলো সিনেমা , বাঁচিয়ে রাখলো বোম্বাই। আজ অব্দি , বলিউডি সিনেমায় একজন যাত্রীকে মুসাফির্‌ বা একটি ষড়যন্ত্রকে সাজিস্‌ বলা হয় । এবং এটা বলার জন্য বর্ডারের দুপারের মানুষকে কোন আলাদা মনোযোগ দিতে হয় না । ভাষা এমনি-ই বেঁচে থাকে । কিন্তু এটুকু স্রেফ এটুকু দিয়েই কি কবি বাঁচে ?

কবি যদি হন গুলজার বেঁচে যেতেই পারেন , অথবা কাইফি আজমি । তারা অন্যমানের , অন্য ধাতুর মানুষ । উর্দু শব্দের সাথে হিন্দী শব্দ (সিলি হাওয়া ছু গয়ি -সিলা বদন্‌ ছিল্‌ গিয়া অথবা সারে জাহান্‌ সে আচ্ছে হিন্দোস্তা হামারা ।) কজনই বা মিলিয়ে কাঁপুনি ধরিয়েছে ।  জফর এদের মতো ছিলেন না । অথবা হয়তো ছিলেন , কিন্তু তিনি নিজের লিপি ভয়ঙ্কর ভালোবাস্‌তেন । আপনাকে যদি বলা  হয় - "রোমান অক্ষরে বাংলা লিখুন " - আপনি খুশি হবেন ?? জফর নিজের লিপি ছাড়া কবিতা লিখতেন না । উনি বিশ্বাস করতেন , "মেজাজ লুকিয়ে আছে লিপিতে" । এবং এই একটি বাক্যের জন্যই না চিনে না জেনে ভালোবেসেফেলেছি । 

সে যাই হোক , প্রথমে কবিতা লিখতেন উর্দু স্ক্রিপ্টে , তারপরে গান-ও তাই । চোখের সামনে দিয়ে ওনার ভাষার দুনিয়া শ্মশান হয়ে গেল । উনি কোথাও পালিয়ে যান নি । মনে করতেন উর্দুর গন্ধ লুকিয়ে ভারতের বৈচিত্রের মাটিতে । ভারতেই লড়ে গিয়েছেন ভাষার জন্য । প্রতিক্ষন । সাত-সাতটি পি এইচ ডি থিসিস্‌ লিখে দিয়েছেন ভাড়ায় , উর্দুতে । নিজেকে বলতেন "ইন্টেলেকচুয়াল মারসিনারি " । আতিশকে পড়াতে এসছিলেন যখন, প্রথম শর্ত ছিল "আগে লিখতে জানতে হবে , তারপর পরতে" । সপ্তাহে পাঁচ দিন, তিন ঘন্টা প্রতিদিন , ভাষা শেখাতেন পাঁচ হাজারে । সালটা ২০০৪ । আতিশ একদিন ওনার বাড়ি গেছিলেন । ঈদ ছিল সেদিন । দেওয়াল ময় পেচ্ছাপ আর রাস্তাময় সদ্য ব্যায় হওয়া রক্তের গন্ধ ঢেকে গিয়েছিল , জফরের উইন্‌ সিগারেটের গন্ধে । একটা অস্থায়ি সিড়ি টপকে , ৯ফুট বাই ৮ফুটের ঘর । সেখানেই , জফররা চারজনে থাকেন, কাপড় টানা বাথরুম । ঘরের অর্ধেক ভর্তি বই । বড় ছেলে কারাখানায় ঘুমায় রাতে । ঘষ্টানো সব্জেটে দেওয়ালে পিঠ ঠাসিয়ে বসে , নতুন কবিতা পড়ছেন জফর । উইন সিগারেট হাতে , জফরকে ভাষা শহিদের মতোই দেখতে ।  যেমনটা দেখতে ছিলেন বাংলাদেশের আব্দুস্‌ সালাম বা আব্দুল জাব্বার ।

বুধবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

ভাল ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


- বাপুজির টিফিনকেকের ওপর চার চামচ পোর্ট ওয়াইন ঢেলে খেয়ে দেখেছিস? অমৃত। রন্ধ্রে রন্ধ্রে রস

- রস? রসের নামে ছাইপাঁশ খাবেন কেন স্যার?

- কেনো রে? তুই বুঝি এসব চাখিসনি! ন্যাকামো হচ্ছে? মেয়ে বলে তুই এক্কেরে লবঙ্গলতিকা বুঝি?

- না,  মানে সেরকম ঠিক….

- সত্যি করে বল দিকি

- গেল বছর দোলের দিন স্যার, দাদারা খাচ্ছিল,  একবার উঠেছিল, আমি গিয়ে বোতল থেকে এক চুমুক….

- সে কি রে? সোজা বোতল থেকে? বলিস কি?

- জ্বলে গেছিল স্যার, গলা বুক জ্বালা, কি ভয়ংকর, চোখে অন্ধকার দেখছি

- তার পর? অজ্ঞান হয়ে গেলি?

- যেতাম, কিন্তু দাদা এমন থাবড়া মারল… জানেন, আমি কলেজে পড়ি তাও আমাকে একরকম করে বদমাশ টা

- বুঝেছি। তার মানে খাসনি।

- হি হি। খেয়েছি। পরে। সন্ধ্যেবেলা। ওই বজ্জাতটাই স্প্রাইটের সঙ্গে মিশিয়ে, লেবু চিপে কিসব করে দিল। কি ভাল।

- তোর দাদাটা তোকে সত্যি ভালবাসে।

- আপনি বাসেন না?

- আমি? আমি তো তোর মাস্টার

- মাস্টাররা ভালবাসে না ছাত্রীদের?

- সে তো আমি…. তোদের সবাইকেই…. মানে…ইয়ে

- তোতলাচ্ছেন কেন?

- কই?  তোতলাইনি তো? আমি কি ইয়ে?

- আপনি আমাকে ভয় পান স্যার?

- তুই একটা পুঁচকে মেয়ে, তোকে ভয় পাবো কেন?

- পান তো, নইলে বিকেলে আমি ফোন করে আসব বললুম, আর আপনি কেমন প্যাঁচার মত গলা করে ব্যাস্ত আছেন বললেন

- তুই কি সে কথা শুনলি? ধেই ধেই করে হাজির হলি।

- আর আপনি আমাকে মাখন দিয়ে চা, থিনারুট বিস্কুটে মধু, পান্তা ভাতে চানাচুর, হুইস্কিতে ভেজানো ধানি লংকা, বাপুজির কেকে পোর্ট ওয়াইন এই সব গল্প করছেন

- তুই বুঝি পড়তে এসেছিস? বই খাতা কই? ব্যাগ কই?

- আপনি অত্যন্ত বাজে একটা লোক

- জানি তো। তাই এসব গপ্প করছি

- আমি সেই কথা বলিনি। আপনি সব বোঝেন। বোঝেন না?

- কাঁসিও ভাল ঢাক্‌ও ভাল,
টিকিও ভাল টাকও ভাল,
ঠেলার গাড়ী ঠেল্‌‌তে ভাল,
খাস্তা লুচি বেলতে ভাল,
গিট্‌‌কিরি গান শুনতে ভাল,
শিমুল তুলো ধুন্‌‌তে ভাল,
ঠাণ্ডা জলে নাইতে ভাল,
কিন্তু সবার চাইতে ভাল-
পাউরুটি আর ঝোলা গুড় ।

- মানে?? এ আবার কি?

- সুকুমার রায় পড়িসনি বুঝি? ভাল রে ভাল, সব ভাল। এত কিছু ভাল। মানুষকে ভালবাসা ভাল। কিন্তু ওই যে - "সবার চাইতে ভাল পাউরুটি আর ঝোলা গুড়"

- কিচ্ছু বুঝিনা আপনার হেঁয়ালি।

- ওই পাউরুটি আর ঝোলাগুড়েই ভাল থাকি রে। থাকতে হয়। আধবুড়ো বয়সে পেটে পোলাও কালিয়া সহ্য হবে না।

সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

মেয়ে ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

তোমরা যখন কথায় কথায় খিস্তি মারো, স্পষ্ট
আমরা একই বললে কথা, তখন আবার "নষ্ট"!
পুরুষমানুষ করলে নেশা, আঃ উহ্‌, সো কুল,
আমরা যদি একই জিনিস করি তখন, ভুল।
তুমি ফেরো অ-নে-ক রাতে, তোমার শুধুই কাজ...

একই সময় ফিরলে মেয়ে, তখন সে নিলাজ। 
এত রকম ধ্যানধারণা, কত প্রভেদ আছে
শুধু, মানুষ হতে পারছি না আর পরস্পরের কাছে...।

শুক্রবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

সময় ~ সৌমিক দাশগুপ্ত

​কে বনে ফুল পাড়ে? (কিশলয়)

গঞ্জের জমিদারের নাম কী? (সহজপাঠ)

রামের কাছে ৩০ টাকা আছে। সে ৫ টাকার ডাল, ১ টাকার আলু, ৪ টাকা ৪০ পয়সার সরষের তেল আর ৬০ পয়সার ডিম কিনলো। তার কাছে কত টাকা থাকবে? (নব গণিত মুকুল)

পুরোনো প্রস্তর যুগে কী কী অস্ত্র ব্যবহার হত? (ইতিহাস)

সালোক সংশ্লেষ এ গাছ কোন গ্যাস গ্রহণ করে? (প্রকৃতি বিজ্ঞান)
.
.
.
.

Draw a CPU and point the components.

What is RAM?

Name the currency of Russia, South Korea and Japan.

What is the funtion of Retina?

Whar is reflection?

Why the Parrot of Bukhara told the marchent to meet his friends at India?

ইয়ে, দুটোই ক্লাস থ্রী র অ্যানুয়াল পরীক্ষার কোশ্চেন পেপার।

তিরিশ বছর আগের আর পরের।

শনিবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০১৭

যাদবপুরে তো আমরা ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

দূরে দূরে শুধু ঘাস তৃণমূল মাঝে মাঝে কিছু পদ্ম
নেতা মন্ত্রীরা প্রাতরাশ করে বিশ্রাম নেন সদ্য;
যত বেয়াদব চুপ হয়ে গেছে,হেসে হেসে কন পার্থ
মাকুদের যত কায়দাকানুন নিমেষে করেছি ব্যর্থ;
আলিমুদ্দিনে ইয়েচুরি সাথে সূর্য বিমান বুদ্ধ
বলেন কিহবে ভারি ডামাডোল সব পথ অবরুদ্ধ ;
একরোখা কিছু একুশ বাইশ ক্ষমতা যৎসামান্য
যাদবপুরের পড়ুয়া তো তারা, চিন্তা ভাবনা অন্য;
তাদের পাশেই আর্টস ফ্যাকাল্টি, অনেক ছাত্রছাত্রী
মিটিং মিছিল পোস্টারে সব মুখরিত দিনরাত্রি ;
মন্ত্রী বলেন এস এফ আই যদি জিতে যায় কোন চান্সে
আমিও দেখিস পি এইচ ডি পাব,জার্মানি নয় ফ্রান্সে;
এরা গাঁজাখোর, গোলমাল করে তবু মনে জাগে ধন্ধ
রূপাদি বলেন ওদের গায়ে তো সাম্যবাদের গন্ধ;
নতমুখে ফেরে কেন্দ্র রাজ্য নেতারা হোমরা চোমরা
ক্ষমতায় তুমি যতদিন আছ, যাদবপুরে তো আমরা।।

যাদবপুর আর্টস ফ্যাকাল্টি নির্বাচনে জয়ী ছাত্রছাত্রীদের অভিনন্দন।।

বৈষম্য ~ সুশোভন পাত্র

​গত বছর, পিকনিকে গিয়েছিলাম দশজনে। সকালে বেগুনী মুড়ি। দুপুরে সরু চালের ভাত, মুগের ডাল, খাসি মাংস আর রসগোল্লা। সব মিলিয়ে, মাথাপিছু ৩০০ টাকা। নিজেরাই রাঁধলাম। নিজেরাই খেলাম। ফিরতি পথে 'বাজারে' সব দোকানের ধার মেটালাম। ছিল ৩,০০০। খরচা হল ৩,০০০। নো লস। নো গেন।
এবারও গিয়েছিলাম। একই জায়গা, একই মেনু, একই দশই। এবার 'বাজার' থেকে চাল-ডালের সাথে 'পণ্য' হিসেবে ১২০০ টাকায় কানাই রাঁধুনির 'শ্রমটাও কিনলাম'। শেষ বেলাতে জুটল আরও দুই হাফপ্যান্টের বন্ধু। মাথাপিছু ৪২০ করে ৫,০৪০ টাকা 'পুঁজি' হিসেবে আগেই জমা রাখলাম। আমি তখন 'পুঁজিপতি'। আমার তখন পকেট গরম। কানাই কে বললাম "১,২০০'তেই দশ নয় বারো জনের রান্না করতে হবে। না পারলে বল, গোপাল রাজি আছে।" নোয়াপাড়ার গোপাল আজকাল 'বেকার রাঁধুনি'। 'নাই মামা'র থেকে কানা মামা ভালো' ফর্মুলায় কানাই রাজি হল। এবার আমরা আড্ডা মারলাম, তাস খেললাম, আর কানাই কে দিয়ে রান্না 'করালাম'। প্রথম দশজনের রান্না কানাই'র 'আবশ্যিক শ্রম'। আর বাকি দুজনের রান্না কানাই'র 'উদ্বৃত্ত শ্রম'। জমিয়ে খেয়ে, কানাই কে ১,২০০ দিয়ে, 'বাজারে'র ৩,৬০০ মিটিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম; পকেটে তখনও ২৪০ টাকা পড়ে। এই ২৪০, 'উদ্বৃত্ত মূল্য'। এই ২৪০ আমার 'প্রফিট'। এই ২৪০ দিয়ে আমি গোল্ডফেল্ক কিংস'র আস্ত একটা প্যাকেট কিনলাম। আর রাতে কানাই'র 'প্রাপ্য মূল্যে' আমার 'ব্যক্তিগত সম্পত্তি' ঐ গোল্ডফেল্ক কিংস' ফুঁকে ওড়ালাম।
শ'খানেক বছর আগে ছুঁচলো দাড়ির টেকো লোকটা মস্কো তে বসে যখন লিখছিলেন "বিকাশের যে স্তরে শ্রমশক্তি নিজেই পণ্য তাকে বলে পুঁজিবাদ"¹ ; তখনও কানাই রান্নাই শেখেনি। তারও পঞ্চাশ বছর আগে গাল ভর্তি দাড়ি আর মাথা ভর্তি চুল নিয়ে আরেক ভদ্রলোক যখন ব্রাসেলস বসে লিখছিলেন "শ্রমই সকল সম্পত্তির উৎস। এই শ্রমের শোষণেই পুঁজিবাদে সম্পত্তির বিপুল কেন্দ্রীভবন এবং বৈষম্য অবশ্যম্ভাবী" ² ; তখনও গোল্ডফেল্ক কিংস বাজারেই আসেনি। তখনও গ্রেট ব্রিটেনের ১৭-ব্রডস্ট্রিটে অক্সফামের অফিস গজায়নি ³ । সেই অক্সফাম যারা প্রতিবছর নিয়ম করে 'পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান আর্থিক বৈষম্য' নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক করে। 'গরীব হটাও' যজ্ঞের রিপোর্ট লেখে। রাষ্ট্রপ্রধান'দের অসম্ভব বৈষম্যের ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করে। ২০১৬'তে অক্সফাম লিখেছিল "বিশ্বের প্রথম ৬২ জন ধনী ব্যক্তির মোট সম্পদ বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যার সম্মিলিত সম্পদের সমান" ⁴ । আর ২০১৭'তে 'ইকনমি ফর ১%' রিপোর্টে বলেছে "বিশ্বের প্রথম ৮ জন ধনী ব্যক্তির মোট সম্পদ বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যার সম্মিলিত সম্পদের সমান " ⁵।
এদেশে সংখ্যাটা ৫৭। মাত্র ঐ ৫৭ জন ধনকুবেরর মোট সম্পদ এদেশের গরীবতম ৭০% মানুষের সম্মিলিত সম্পদের সমান। আর মাত্র ১% ধনী অংশের পকেটে এদেশের ৫৮% সম্পদ। ৯১'র আর্থিক সংস্কারে যেদিন দেশের 'হটডগ' বাজার পৃথিবীর জন্য মুক্ত হল, করতালি তে মুখরিত হয়েছিলো লন্ডন থেকে লোনাভেলা, কেন্ট থেকে ক্যাওড়াতলা। আর আজ দেশ জোড়া উন্নয়নের চোটে গত ২৫ বছরের প্রতি বছরে, দেশের গরীবতম ১০%'র আয় যেখানে বেড়েছে গড়ে ২,০০০, সেখানে দেশের ধনীতম ১০%'র আয় বেড়েছে গড়ে ৪০,০০০ ⁶। গত ১৫ বছরে দেশে যে ১৪৪ ট্রিলিয়ন নতুন সম্পত্তি তৈরি হয়েছে তার ১১১.৩ ট্রিলিয়নই ঐ প্রথম ১০%'র উদরস্থ হয়েছে। আর বাকি ৩২.৭ ট্রিলিয়ন জুটেছে বাকি ৯০%'র কপালে। "ট্রিকল ডাউন পলিসি"র দয়ায় ৯১'এ বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ ক্ষুধার্তের ঠিকানা ছিল যেখানে ভারত, এখন তা বেড়ে এক-চতুর্থাংশ। ৯১'এ বিশ্বের মোট নিরক্ষরতার ৩২.৬% ঠিকানা যেখানে ছিল ভারত, ২০১৪ তে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫.৬৫% ⁷ ⁸।
অক্সফাম বলেছে, ভারতের ব্যাপক আর্থিক বৈষম্যের মূলে সর্বস্তরের শ্রমিকের প্রাপ্য মজুরির বঞ্চনা। অক্সফাম জানে না, সারাবিশ্বে দৈনিক দুই ডলারের কম রোজগার করা শ্রমিকের সংখ্যা যেখানে গড়ে ২৮%, আমাদের দেশে ৫৯% ⁹। অক্সফাম বলেছে, সমাধানের পথ শিক্ষা ,স্বাস্থ্যে সরকারী বিনিয়োগ বৃদ্ধি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। অক্সফাম জানে না, গত বছর বাজেটে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাখাতে ১৩,৬৯৭ কোটি এবং উচ্চশিক্ষা খাতে ৩,৯০০ কোটি সরকারী বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে ¹⁰। ১৫%'র ছাড়া বাকিদের জন্য ফেলোশিপ 'ডিসকন্টিনিউ'র সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ¹¹। অক্সফাম জানে না, ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের রিপোর্টে এদেশের ৭৮% স্বাস্থ্য ব্যবস্থারই আজ বেসরকারিকরণ হয়েছে ⁸। অক্সফাম জানে না, লেবার ব্যুরোর রিপোর্টে গত বছর এদেশে রেকর্ড হারে বেকারত্ব বেড়েছে ¹² । অক্সফাম বলেছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও কর ফাঁকির সিঁড়ি বেয়েই এদেশের ধনকুবের'দের রমরমা। অক্সফাম জানে না ; এদেশ ললিত মোদীর। এদেশ বিজয় মালিয়ার। এদেশের সরকার মুকেশ আম্বানির। এদেশের আইন গৌতম আদানির। এদেশের হাইকোর্ট সলমন খানের। এদেশের 'কর্পোরেট পলিসি' হাজার-কোটির ট্যাক্স ছাড়ের।
স্তালিনের নাম শুনলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে আপনি উঠতেই পারেন, সোভিয়েতের প্রশংসায় 'অ্যানিম্যাল ফার্মের' অর্গাজমে স্বর্গসুখ আপনি পেতেই পারেন, বলিভিয়ার নিবিড় অরণ্যে ঐ দাড়িওয়ালা গ্ল্যামারাস ডাক্তার ছেলেটার মৃত্যুর প্রতি নিরাসক্ত আপনি থাকতেই পারেন, তীব্র শৈত্য প্রবাহে রেড আর্মির লং-মার্চ কিংবা পাভেল করচাগিনের ইস্পাত কঠিন লড়াই কে ব্যঙ্গ আপনি করতেই পারেন, এমনকি ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিনের দাড়ির থেকে রামদেবের দাড়িই আপনার বেশি পছন্দ হতেই পারে; কিন্তু গীতার 'শ্লোক' থেকে কোরানের 'সূরা' হয়ে বাইবেলের টেস্টামেন্ট -কোথাও এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের অর্থনীতির বিশল্যকরণী আপনি খুঁজে পাবেন না। পুঁজিবাদী বাজারে হিন্দু-মুসলমানের ক্যালোরির আলাদা হিসাব কষতে আপনি পারবেন না। মুক্তবাজারের মুনাফা তে ব্রাহ্মণ-দলিত'র 'উদ্বৃত্ত শ্রমের' পার্থক্য আপনি করতে পারবেন না। ধর্মের বুলি কপচে দু'বেলা দু'মুঠো ভাতও আপনি জুটিয়ে দিতে পারবেন না। কারণ বাস্তব এটাই যে আপনার-আমার শ্রম যে আজ 'বাজারের পণ্য'। বাস্তব এটাই যে শ্রমের শোষণেই পৃথিবী জোড়া সম্পদের এই যে প্রবল বৈষম্য। আর বাস্তব এটাই যে ধর্মশাস্ত্র বা অ্যাডাম স্মিথের 'দি ওয়েলথ অফ দি নেশন'র পুঁজিবাদী মুক্ত বাজারে নয়; দাড়ি বুড়োর 'দাস ক্যাপিটাল'ই বন্দী আছে অর্থনীতির সাম্য।

1. https://www.marxists.org/archive/lenin/works/1916/imp-hsc/

2. https://www.marxists.org/archive/marx/works/subject/quotes/


3. https://en.wikipedia.org/wiki/Oxfam

4. https://www.oxfam.org/.../bp210-economy-one-percent-tax...

5. https://www.oxfam.org/.../bp-economy-for-99-percent...

6. https://scroll.in/.../embargoed-jan-16-00-01gmt-57...

7. https://www.youtube.com/watch?v=Wtzs4lygpA0

8. http://timesofindia.indiatimes.com/.../artic.../54822103.cms

9. http://www.reuters.com/article/idUSDEL218894

10. https://cpim.org/.../do-saal-janta-behaal-modi-government...

11. https://www.youtube.com/watch?v=lpUrKAomkqU

12. http://indianexpress.com/.../unemployment-india-paints.../

শনিবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০১৭

আগুন জ্বলবে ~ সঞ্জয় ঘোষ

অশীতিপর শীত বুঝি আজ
গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে
ছোট পাপ আর বড় পাপগুলো
সহজ আড়াল খুঁজছে।

আড়ালে আড়ালে কানাকানি শুধু
পাপ মিশে যায় পুণ্যে
কিছু তার নাকি মনগড়া আর
বাকিটা খু্ঁজতে হন্যে।

ধৈর্য ঠেকেছে তলানিতে আজ
পাপের পাহাড় জমছে
কিছু ছোট কিছু হিমালয়সম
সবাই আড়াল খুঁজছে।

ঠগকে খুঁজতে গাঁ উজার হয়
কাকে ছেড়ে কাকে ধরবে?
এই পতন তো আমাদেরও দায়
তবে কী আগুন জ্বলবে?

দেশলাইটা খোয়া গেছে তাই
চকমকিটাকে খুঁজছি
কোন পাপ ঠিক কতটা দাহ্য?
নিজের সাথেই যুঝছি।

দেশপ্রেম ~ সুশোভন পাত্র

দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা, অভাব-অভিযোগ নির্বাচনী ভাষণে ভালো করে মিশিয়ে নিন। মিশ্রণে প্রতিশ্রুতি'র পাহাড় গুলে, 'আচ্ছে দিনের' বিজ্ঞাপনে ১০ মিনিট ম্যারিনেট করে রাখুন। এই ফাঁকে জনগণের ক্ষোভের আগুনে পিৎজা স্টোন সহ ওভেন ৪৫০ ডিগ্রিতে প্রি-হিট করুন। মিশ্রণ ফুলে ফেঁপে উঠলে; জে.এন.ইউ'র ভিডিও দিয়ে পুরু করে বেলে ফ্ল্যাটব্রেড বানিয়ে ফেলুন। ফ্ল্যাটব্রেডের উপর ৫৬ ইঞ্চি পুরু সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের প্রলেপ লাগিয়ে, পাকিস্তানের সঙ্গে তু-তু-ম্যা-মা'র বার্বিকিউ আর মিডিয়ার টক শো'র হম্বিতম্বি কুচিকুচি করে সাজিয়ে, কাশ্মীরের পেলেট গান আর মোজোরেলা চিজ ছড়িয়ে, জাতীয় পতাকা'র টপিংস দিন। শেষে জাতীয় সঙ্গীত চালিয়ে, ওভেনের পাশে ঠাই দাঁড়িয়ে, ২০ মিনিট বেক করুন। সবদিকে সমান বেক হলে 'চিজ বেসড দেশপ্রেম পিৎজা'য় পরিবারের সব্বাই ভক্তিভরে পেটপূজা করুন। এবার ডিনার শেষে, বিছানায় রতি ক্রিয়া সেরে, নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যান। কারণ সীমান্তে জওয়ানরা আপনার নিরাপদ ঘুম নিশ্চিত করতেই তো দাঁড়িয়ে আছেন। এখন দুঃস্বপ্নে যদি দেখেন আপনার পিৎজা-পাৎসা'র জীবনে, আমার যুদ্ধ-যুদ্ধ ফ্যান্টাসিজমে আর আমাদের বর্ডার সিনেমা দেখে বগল বাজানোর অভ্যাসের আড়ালে জওয়ানরা আধপেটা খেয়েই দাঁড়িয়ে আছেন; খবরদার 'দেশদ্রোহীর' মত দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকারের দিকে আঙুল তুলে বসবেন না যেন। বরং হালকা পাশ ফিরে, নরম বালিশে মাথা রেখে, আবার ঘুমনোর চেষ্টা করুন। কারণ 'দেশপ্রেম' এই সরকারের পৈতৃক সম্পত্তি। জওয়ান'দের ভাবাবেগ লেপা জাতীয়তাবাদের ব্যবসা করা এই সরকারের পুরনো অভ্যাস।
তেজ বাহাদুর জওয়ান'দের ক্ষুধার্ত এবং আধপেটা রাত্রি কাটানোর অভিযোগ এনেছেন ¹। 'হুইসেলব্লোয়ার' কে শায়েস্তা করতে, তাঁর 'বেয়াড়া অতীতের' পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে বি.এস.এফ প্রধান, তেজ বাহাদুর কে তৎক্ষণাৎ বদলি করে দিয়েছেন ² । স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নিয়মমাফিক তদন্তের ঘোষণা করেছে ³ । আর প্রধানমন্ত্রী'র দপ্তর ডাস্টবিনের শোভা বর্ধনের জন্য সেই তদন্তের রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে ⁴ । ঠিক যেমন ২০১৬'র জুলাইয়ে ডাস্টবিনের শোভা বর্ধন করেছিল ক্যাগের সেই রিপোর্ট, যে রিপোর্টে বলা হয়েছিল ইন্ডিয়ান আর্মি জওয়ানদের খাবারে পর্যাপ্ত সবজি ও ফল সরবরাহ করছে না, বলা হয়েছিল ৬৮% জওয়ানই খাবারে গুনগত মান সম্পর্কে 'অসন্তুষ্ট', বলা হয়েছিল বাৎসরিক ১,৪৪০ কোটির আর্মি রেশনের গুণমানে 'অত্যন্ত নিম্ন' এবং আনা হয়েছিল ২২ কোটির আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ  ⁵ ⁶ । অবশ্য আর্মি তে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছিল ২০০৪'ও যখন লেফটেনেন্ট জেনারেল সাহনির'র বিরুদ্ধে সিয়াচেনের জওয়ান'দের মেয়াদ বহির্ভূত রেশন সরবরাহ'র তথ্যপ্রমাণ সামনে আসে ⁷, কিম্বা ২০০৭'ও যখন লেফটেনেন্ট জেনারেল দাহিয়া'র বিরুদ্ধে লাদাখের জওয়ান'দের ফ্রোজেন মিটের টেন্ডারে আর্থিক তছরুপরে অভিযোগ ওঠে ⁸ । আর এখনও কান পাতলেই শোনা যায় যে দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসার'রা আর্মি রেশন' সস্তায় পার্শ্ববর্তী দোকানদার'দের বিক্রি করেন ⁹ । 
ডিমনিটাইজেশেন দুর্নীতি মুক্ত হয়নি আর্মি। হওয়ার কথাও ছিল না। কারণ শুধু লিকুইড ক্যাশে এদেশের দুর্নীতির হিসেবে হয় না। শুধু ৫০০/১০০০'র নোটই এদেশে দুর্নীতি করতে শেখায় না। দুর্নীতি করতে শেখায় এদেশের রাজনীতি। দুর্নীতি করতে শেখায় এদেশের অর্থনীতি। দুর্নীতি করতে শেখায় এদেশের গোটা সমাজ ব্যবস্থা। আপনার অন্ধ দেশপ্রেমের বশংবদতায় এই দুর্নীতি বন্ধ হবে না। আপনার প্রশ্নহীন আনুগত্যে এই দুর্নীতি'র সমাধান হবে না। তাই যেদিন সীমান্তের জওয়ান'দের জরুরী ক্যালোরি'র জরুরী প্রশ্নের সমাধানের সঙ্গে আপোষ করে, এদেশের বিদেশ মন্ত্রী টুইটে ই-কমার্স সংস্থা আমাজন কে, পাপোষে জাতীয় পতাকা অবমাননার অপরাধে ভিসা বাতিলের হুমকি দিয়ে 'দেশপ্রেম' জাহির করেন, সেদিন তাঁকে প্রশ্ন করা জরুরী যে, কোথায় ছিল আপনার দেশপ্রেম যখন আপনার স্বামী স্বরাজ কৌশল ললিত মোদীর ওকালতি করতেন ¹⁰, কোথায় ছিল আপনার দেশপ্রেম যখন লন্ডনের পাঁচতারা হোটেলে আপনি ললিত মোদীর সাথে ডিনার সারতেন ¹¹, কোথায় ছিল আপনার দেশপ্রেম যখন 'সনাতনী শিক্ষা' ছেড়ে আপনার মেয়ে কে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি করতেন ¹² ? জাতীয় পতাকার অবমাননা সেদিনও হয়েছিল যখন সাংবিধানিক সভা তিরঙ্গা কে পতাকার রং হিসেবে বেছে নেওয়ার বিরোধিতা করে আর.এস.এসের মুখপাত্র 'অরগানাইসার', ১৯৪৭'র ৩১'শে জুলাই এবং ১৪'ই অগাস্ট 'হিন্দুস্তান' ও 'হুইদার' নামে দু-দুটো তাবড় সম্পাদকীয় ছেপেছিল ¹³ । জাতীয় পতাকার অবমাননা তখনও হয়েছিল যখন প্রথম এন.ডি.এ ক্ষমতায় আসার আগে কোনদিন সংঘের হেড কোয়ার্টারে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়নি ¹⁴ । জাতীয় পতাকার অবমাননা সেদিন হয়েছিল যখন দ্বিতীয় সংঘচালক এম.এস গোলওয়ালকার নাগপুরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন " তিরঙ্গা নয়, আমরা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি একদিন গোটা দেশ গেরুয়া পতাকার কাছেই ঠিক নতজানু হবে" ¹⁵। জাতীয় পতাকার অবমাননা সেদিন হয়েছিল যেদিন মহম্মদ আখলাখের খুনি কে  তিরঙ্গায় ঢাকা হয়েছিল ¹⁶। জাতীয় পতাকার অবমাননা সেদিনও হয়েছিল যেদিন তিরঙ্গা মোড়া জওয়ান'দের কফিন নিয়ে কেলেঙ্কারি হয়েছিলো।  আর জাতীয় পতাকার অবমাননা প্রতিদিনই হয়, যখন ট্রাফিকে বিলাসবহুল গাড়ির জানলায় দু-টাকার বিনিময়ে জাতীয় পতাকায় মোড়া খেতে না পাওয়া শৈশব বিক্রি হয়।
তাই দেশপ্রেম যদি দেখাতেই হয় তাহলে প্রশ্ন করুন, ২৮.৭ কোটি নিরক্ষর দেশবাসী সাক্ষর হবে কবে?  প্রশ্ন করুন ৬২.৬ কোটির ঘরে শৌচাগার তৈরি হবে কবে ¹⁷? প্রশ্ন করুন সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকের পেটের খিদের সুরাহা হবে কবে? প্রশ্ন করুন হনুমানথাপ্পার মত ঋণের দায়ে আত্মঘাতী কৃষকরাও ক্ষতিপূরণ পাবে কবে? জওয়ানদের পাশে যদি দাঁড়াতেই হয় তাহলে জিজ্ঞেস করুন, কাশ্মীরের দাবার বোর্ডে জওয়ানদের বোড়ে বানিয়ে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি বন্ধ হবে কবে? জিজ্ঞেস করুন সার্জিক্যাল স্ট্রাইক কে নিজেদের সাফল্য বলে প্রচার করা সরকার জওয়ান'দের জরুরী পুষ্টি নিশ্চিত করবে কবে? জিজ্ঞেস করুন, উগ্র জাতীয়তাবাদ জিগিরে ক্ষুধার্ত দেশবাসীর রাজনৈতিক ফায়দা তোলা বন্ধ হবে কবে? সরকার বিরুদ্ধে কথা বললেই 'দেশদ্রোহী' দাগিয়ে দেওয়ার অভ্যাসে লাগাম পড়বে কবে? জওয়ান'দের পাশে যদি দাঁড়াতেই হয় তাহলে আগে আয়নার সামনে দাঁড়ান। জওয়ান'দের পাশে যদি দাঁড়াতেই হয় তাহলে আগে যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। কারণ রক্তে লেখা ইতিহাস সাক্ষী, যুদ্ধ যারা চায়, তাঁরা যুদ্ধে যায় না। আর যারা যুদ্ধে যায়, তারা যুদ্ধ চায় না।।



















শুক্রবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০১৭

বিশ্বাস ~ সঞ্জয় ঘোষ

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু
তর্কে বহুদূর
গান বেজেছে কোরাসে, তাতে
মেলাতে হবে সুর।

মেলাতে হবে সুর আর
মানতে হবে কথা
দেশটা তো আর তোমার নয়
তাদের মাথাব্যথা।

তাদেরই মাথাব্যথা তাই
সারাটা দেশ জুড়ে
রাজা উজির বাদ্যি বাজান
তোমরা সবাই বোড়ে।

রাজা যেন অনন্ত লোভ
ভুবনগ্রাসী খিদে!
না-বলা না-পারা যন্ত্রণাটা
বোড়ের বুকে বিঁধে।

তবুও সবাই বোড়ে যে নয়
সেটাই আসল জোর
বিশ্বাসে মেলেনা বস্তু
তর্কে কাটে ঘোর।

*ঋণস্বীকার - আসাদ ইকবাল সুমন এর দুটি লাইন

শুক্রবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১৭

লজ্জা ~ স্বর্ণালী ইসাক

আমার প্রোফাইলের সকল মহিলাদের উদ্দেশ্যে আমার এই পোষ্ট, আমি আপনাদের কিছু বলতে চাই,,,,,
 কিছু অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়,,, কিছু স্বীকারোক্তিও বলতে পারেন। করতে হবে,তাছাড়া তো আর উপায় দেখছি না। ব্যাঙ্গালোরের "Mass molestation" এর ভিডিওগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর থেকে এটাই মনে হচ্ছে বারবার। 
তাহলে শুনুন, তখন আমি 15, বাবা সদ্য কিছুমাস হয়েছে মারা গেছেন।মা ট্রমাটাইজ্ড। কথা বলা বন্ধ,নড়াচড়া করেন না,ঘরে বসে থাকেন, আর চোখের জল বেরোতে থাকে শুধু। এমতাবস্থায়, কিছু জরুরী ব্যাঙ্কসংক্রান্ত কাজের জন্য আমি আমার এক আত্মীয়ের শরণাপন্ন হই। ইনি আমার বাবার থেকেও বয়সে বড় এবং শিশুকালে এনার কোলেপিঠে চড়েছি অনেক। বলাই বাহুল্য 15 বছরের আমি ব্যাঙ্কসংক্রান্ত কাজের কিছুই বুঝিনা। উনি ওনার বাড়িতে(পাশের পাড়াতেই) ডাকায় আমি সেখানে যাই। সেদিন তিনি একলা ছিলেন এবং আমায় চমকে দিয়ে তিনি আমায় আক্রমণ করেন। ঘটনার আকষ্মিকতায় বিহ্বল হয়ে আমি কিছু মিনিটের জন্য কেমন স্তব্ধ হয়ে যাই, আর সেই সুযোগে উনি আমার পোষাক এদিক ওদিক কিছুটা ছিঁড়ে ফেলতে সমর্থ হন। কয়েক মিনিটের বিহ্বলতা কাটাতেই আমি বাঁচার জন্য চিৎকার আর লাফালাফি শুরু করি। তাতে আমায় জলের জগ,দরজার খিল, এবং চড়-লাথিও মারা হয়। তারপর সেই দরজার খিলটা দিয়েই ওনার মাথা ফাটিয়ে আমি নিজেকে কোনোক্রমে বাঁচিয়ে বেড়িয়ে আসি ওনার বাড়ি থেকে। জামা ছেঁড়া,মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত আহত আমি ও পাড়া থেকে নিজের বাড়ি অবধি কাঁদতে কাঁদতে দৌঁড়ে এসেছিলাম। কিন্তু বাড়ি ঢুকে দেখি অসুস্থ মা ছাড়া কেউ নেই।আমি বারান্দাতেই শুয়ে পড়ে থরথর করে কাঁপছিলাম। মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। খুব জলতৃষ্ণা পাচ্ছিল কিন্তু ওঠার শক্তি ছিল না।কী অপমান লাগছিল।শরীরের যেটুকু জায়গায় ওই আত্মীয় হাত দিতে সমর্থ হয়েছিলেন, সেসব জায়গা কেটে বাদ দিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। স্তন,মুখ,কোমর,,,, ,মনে হচ্ছিল,খাবলে মাংস তুলে ফেলে দিলে বোধহয় ওই স্পর্শজনিত অপমান কিছুটা কমে। ইতিমধ্যে বাড়ির সবাই আধ ঘন্টা পর দল বেঁধে কোথাও থেকে এসে আমার উপর চড়াও হলেন। আমায় বলা হোল আমি নাকী সেই আত্মীয়ের কাছে টাকা চেয়েছি আর না পাওয়ায় ওনার মাথা ফাটিয়েছি। আমার ছেঁড়া জামা, মুখে অতটা আঘাত দেখেও কারো কিচ্ছু সন্দেহ হয়নি। আমি ওই ছেঁড়া জামা পরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, আর বিজ্ঞচোদেরা সামনে দাঁড়িয়ে শালিসি করে যাচ্ছেন। কেউ একটা গামছা অবধি এগিয়ে দেননি নিজেকে ভালোভাবে ঢাকতে। তার উপর নোংরা কথা। একবারও আমার কথা কেউ বিশ্বাসও করেননি,কারণ করতে চাননি। প্রথম 20-25 মিনিট জানেনতো দিদিরা,,,  আমার খুব লজ্জা লাগছিল। ছিঁড়ে যাওয়া জামার জন্য। হাত দিয়ে বামস্তনের ছেঁড়া দিকটা ঢাকতে চাইছিলাম।আরেকহাত দিয়ে পেটের কাছের ছেঁড়া টা।কুঁকড়ে বেঁকে দাঁড়িয়েছিলাম। 26 নম্বর মিনিট থেকেই কিছু একটা হতে লাগল। আমি আস্তে আস্তে সোজা হতে লাগলাম। কারণ আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম যে, আমার কষ্টের দাম এই মূহুর্তে কারো কাছে নেই। আমার সত্যি অভিযোগটা এদের কাছে মিথ্যা। হাত দিয়ে শরীর আড়াল করার চেষ্টা ছেড়ে দিলাম।বুঝলাম এখন নিজের কথা এদের শোনাতে গেলে এদের বাধ্য করতে হবে শুনতে।এখন লড়াই করে সারভাইভ করার সময়,এখন শরীর নিয়ে ব্যস্ত হলে চলবে না। সব লজ্জা,ঘেন্না,কষ্ট সাইডে রাখলাম জোর করে, না, সেসব শরীর-মন ছেড়ে চলে যায়নি তখনো,জাষ্ট সাইডে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তারস্বরে চিৎকার করে সব বলতে লাগলাম। জিনিসপত্র ভাঙতে লাগলাম। আরো কিছু লোক জমা হয়ে গেল। ততক্ষণে ফাটা মাথা সেলাই সেরে সে আত্মীয় হম্বিতম্বি করবেন ভেবে এসে গেছিলেন।গেট পার হতে দেখেই আমি শাবল নিয়ে ওনাকে তাড়া করি।তখন কিচ্ছু করতে পারিনি যদিও।ওনাকে ধরার আগেই সবাই আমায় ধরে নিয়েছিল,বরং যারা ধরেছিল,তাদেরই আহত করেছিলাম।ভয়ঙ্কর সীন ক্রিয়েট হল। কিন্তু এতে একটা লাভ হয়েছিল,, আর কোনো আত্মীয় আমার দিকে আঙ্গুল তোলার সাহস দেখাননি। আর সেই সুওরের বাচ্চাও বাড়ি বেচে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। 
 আমার বাপ শিখিয়েই গেছিলেন, "সব পরিস্থিতির একটা প্যাটার্ণ হয়, সেই প্যাটার্ণটা বোঝ, আর সেই অনুযায়ী নিজের শরীর মন তৈরী করে সারভাইভ কর,পরিস্থিতির প্যাটার্ণ টা ধরতে পারলে আর তার গোলামী করতে হয়না"। -- এটার মানে আমি তখন বুঝিনি যখন বাপ বলেছিলেন। এইদিন বুঝেছি যখন না বুঝেই আমি বাপের পরামর্শ পালন করে ফেলেছিলাম। 
.
        এতো হ্যাজ দেওয়ার একটাই কারণ, তা হল, আমি আপনাদের প্রত্যেকটা মহিলাকে এটা বলতে চাই যে , আপনাদের নিজেদের শরীরটা নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? সারাক্ষণ নিজের শরীর আগলাতে গিয়ে যে ঠিক করে লড়তে পারেন না, তা কী দেখেছেন? আমি ব্যাঙ্গালোর কান্ডের ভিডিওগুলো দেখছিলাম। মেয়েগুলো বুক বাঁচাতে ব্যস্ত ছিল, নিজের যেটুকু শক্তি ছিল, সেটাও কাজে লাগাতে পারল না বুক,পাছা আর যোনী বাঁচাতে গিয়ে। অথচ মিনিটখানেকের মধ্যে ঘটনার আকষ্মিকতা সামলে যদি ঘুরিয়ে একটা মুখে ঘুষি বা নিদেনপক্ষে চোখে আঙ্গুলও ঢুকিয়ে দিতে পারত, তাহলেও বেঁচে যেত ওই মেয়েটি যাকে দুজন বাইকারোহী আক্রমণ করেছিল। তা না করে সে বুক গার্ড করে নীচু হয়ে গেল, তখন ওই জানোয়ারের বাচ্চাগুলো পিছন থেকে ওর জামায় হাত ঢুকিয়ে হেনস্থা করল।
যাদেরকে এক দল জানোয়ার ছেঁকে ধরেছিল, তাদের লড়াই করাটা কঠিন ছিল জানি, তবু শরীর বাঁচাবার চেষ্টায় কুঁকড়ে বসে না পড়ে ঘুরে হাত চালালে সেক্ষেত্রে অনেক আগেই সেফ হতে পারতেন তাঁরা।
"এরকম কেন হবে?" "এই অব্যবস্থার মানে কী?" এই প্রশ্ন সবাই করবেন, করছেন। একটা লোম্বাও ছেঁড়া যাচ্ছে না তাতে অপরাধীদের। লড়াই করুন।প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। আপনাদের নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছোঁয়া এত সোজা কেন জানেন? কারণ আপনারা ভাবেন স্তন, যোনী ,পেট এসবে আপনাদের "শ্লীলতা" থাকে। শরীরের আবার শ্লীল অশ্লীল কী বাঁড়া? আমাদের  শরীরের প্রতিটা স্কোয়ার ইঞ্চ আমাদের। হাত ধরে টানলেও ঘুরে মারুন, স্তনে খামচালেও তাই। একটা বালের সমাজ এতদিন আপনাদের স্তন, যোনী আর নিতম্বসর্বস্ব করে রেখেছে। আর আপনাদেরও লজ্জা করেনা যে আপনারা তাই হয়েই বেঁচে আছেন? রাস্তায় জামা কাপড় এদিক ওদিক হলে লজ্জা, পোষাকে মাসিকের দাগ লাগলে লজ্জা, কেউ হিসি করতে বসতে দেখে নিলে লজ্জা ..... এদিকে কনুই ছুলে গেলে সমস্যা নেই, কেউ ধাক্কা মেরে লাইন থেকে সরিয়ে নিজে ঢুকে গেলে সমস্যা নেই(যতক্ষণ না সেই ধাক্কাটা স্তন বা পাছায় লাগছে) ইত্যাদি। আপনারা নিজের শরীরের কয়েকটা অঙ্গে এত বন্দি কেন এটাই হেকা বুঝতে পারে না। ফাঁকা রাস্তায় কেউ টেনে জামা খুলে দিতে চাইলে নিজেই নিজের জামা খুলে নিয়ে তাতে রাস্তার ঢিল,আধলা ইঁট কুড়িয়ে ঢুকিয়ে জামাটাকে সৌরভ গাঙ্গুলীর ষ্টাইলে ঘুরিয়ে মুখ আর মাথা লক্ষ্য দে মার, দে মার। ছাড়েন কেন? আপনারা এত দিনেও বোঝেন নি যে আমাদের মেয়েদের এই শরীর সংক্রান্ত লজ্জাটা আসলে জানোয়ার চামড়াখেকোদের অস্ত্র? 
,
আমি ওসব বড় বড় নারীবাদী বালবিচি বুঝি না, বুঝতেও চাইনা। কোথাও একটা ধর্ষন, শ্লীলতাহানি হবে, আর ফেবু জুড়ে "প্যাট্রিয়ার্কাল","প্যাট্রিলিনিয়াল" ইত্যাদি শব্দের চোদনামী শুরু হবে। হা হুতাশ, কান্নাকাটি।মোমবাতি মিছিল, আরো কত বালবিচালি। এসব বালের জিনিস খালে দিন। লড়তে শিখুন। স্তন, যোনীকে শরীরের আরো 5 টা অঙ্গের মতো স্বাভাবিক নিতে শিখুন। হাত আর মন খুলে একবার মেরে দেখুন। ধর্ষকরা ভয় পাবে, পিছোবে। আমি আদারে বাদারে জঙ্গলে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াই। ইউপি বিহার বেল্টে অনেকবার অনেক অসভ্যতার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু ওই লজ্জা কম থাকায় বেঁচে বেড়িয়ে এসেছি। গায়ের জোর,শারীরিক শিক্ষার থেকে বেশী কার্যকরী হল লজ্জাহীনতা। 
আক্রমনকারীর মুখ চোখ ফাটিয়ে বিচি ফিচি থেঁতলে তার ওই যন্ত্রনাবিদ্ধ শরীরের সামনে ব্রা খুলে দাঁড়ান। আপনাদের অনাবৃত উর্ধাঙ্গ সামনে পেয়েও যখন জানোয়ারগুলোর চোখে শুধু মাথা আর বিচিফাটা যন্ত্রনা আর মুখে কাতর গোঙ্গানি শুনবেন। অদ্ভুত closure পাবেন,মানসিকভাবে সুস্থ থাকবেন। ইয়ার্কী ভাববেন না, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।   নিজেকে ভালবাসুন, নিজের জন্য লড়ুন। ছিঁড়ে দিন নারীমাংসলোভীদের মুখ,চোখ আর লিঙ্গ। যা করবার করুন কিন্তু দয়া করে আর অসহায় হয়ে পড়ে থাকবেন না। এ লাটক আর নেওয়া যাচ্ছে না। পায়ে ধরছি।
I love u all <3  blessed be )o(

মমতা আপনিই ~ সুশোভন পাত্র

নিউটনের ঘরের কেয়ারটেকার সেদিন পরিচারিকা কে পই পই করে বলেছিলেন, "ডিমটা সেদ্ধ করে, বাবুকে খাইয়ে, তবেই আসবি।" কিন্তু গবেষণায় বিঘ্ন ঘটবে বলে, নিউটন নিজেই ডিম সেদ্ধ করে, সময়ে খেয়ে নেবার আশ্বাস দিয়ে তাঁর পরিচারিকা কে ফেরত পাঠিয়ে দেন। একঘণ্টা পর পরিচারিকা এসে দেখেন,  সসপ্যানে রিষ্ট ওয়াচটা সেদ্ধ হচ্ছে আর নিউটন উনুনের সামনে ঠাই দাঁড়িয়ে, হাতে ধরা ডিমের দিকে তাকিয়ে সময় দেখছেন।
টিকিট চেকার টিকিট চাইতেই আইনস্টাইন অনেক খুঁজেও টিকিটটা পেলেন না। টিকিট চেকার আইনস্টাইনকে চিনে বলেছিলেন, "আরে প্রফেসর, আর খুঁজতে হবে না। আমি নিশ্চিত আপনি টিকিট কেটেছেন।" কাতর স্বরে আইনস্টাইন বলেছিলেন, "না, না খুঁজতে তো হবেই। ওটা না পেলে আমি জানব কি করে কোথায় যাচ্ছি!"
ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের পথিকৃৎ নিউটন ডিমের বদলে ভুল করে রিষ্ট ওয়াচ সেদ্ধ করেছিলেন। থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সের জাদুকর আইনস্টাইন টিকিট আনতে ভুলেছিলেন। আর দিল্লীর মসনদ দখলের দিবাস্বপ্নে মশগুল আমাদের মুখ্যমন্ত্রী স্বরচিত ইতিহাসটাই ভুলে গেছেন। আসুন দায়িত্বশীল কামাল হাসানের ভূমিকায় সদমা সিনেমার শ্রীদেবীর যত্ন নিন। কর্তব্যপরায়ণ নাগরিক হিসেবে তাঁর কৃতকর্ম স্মরণ করিয়ে দিন।  
জরুরী অবস্থায় সিদ্ধার্থশংকর রায়ের তাঁবেদারি করে, জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির বনেটে নেচে ¹, ইন্দিরা হত্যার সহানুভূতির ভোটে প্রথম সাংসদ হয়ে ², শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন আনন্দবাজারের হবু 'অগ্নিকন্যা'। ধর্মীয় মেরুকরণের চ্যাংড়ামি তে জাতীয় রাজনীতিতে দ্রুত উঠে আসছে বি.জে.পি ³ । 'লৌহ পুরুষ' রথে চেপে, বাড়ি বয়ে বলে আসছেন 'মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে'। অযোধ্যায় জুটছেন কর-সেবকরা। ৯২'র ৪ঠা ডিসেম্বর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শহীদ মিনারে জনসভা ডাকল বামফ্রন্ট। আর সেদিনই সিধো-কানহু ডহরে সভা করে 'ইন্ডিয়া ইয়ুথ কংগ্রেসের' সাধারণ সম্পাদিকা মমতা বললেন, ''সব সি.পি.এম'র ষড়যন্ত্র। বি.জে.পি অযোধ্যায় কিছুই করতে পারবে না। আসলে সি.পি.এম আমাদের আটকাতেই ক্যাডার জড়ো করছে" ⁴ ।  ৯৭'র ডিসেম্বরে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত মমতা'ই জোটসঙ্গী প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "বি.জে.পি তো  অচ্ছুৎ নয়" ⁵।  বাস্তবেই ছুৎমার্গ শিকেয় তুলে ৯৮'র লোকসভা ভোটে‍‌ তৃণমূলের হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গে খাতা খুলল বি.জে.পি। আর ৯৯' এ এন.ডি.এ'র শরিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন রেলমন্ত্রী ⁶।
ম্যাডাম, আজ আপনার বি.জে.পি কে 'সাম্প্রদায়িক' মনে হচ্ছে? কিন্তু আপনিই তো বি.বি.সি'র সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন বি.জে.পি নাকি তৃণমূলের "ন্যাচারাল অ্যালি" ⁷? গুজরাট দাঙ্গার সময়ে আপনি বাজপেয়ী সরকারে মন্ত্রী ছিলেন না ⁶?  সংসদ যখন গুজরাটের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করছে তখন সরকারের পাশে দাঁড়াবার আশ্বাস দিয়ে বাজপেয়ী কে আপনি চিঠি লেখেননি ⁸? তবে যে আপনারই সাংসদ কৃষ্ণা বসু তাঁর 'অ্যান আউটসাইডার টু দি পলিটিক্স' বইয়ে লিখেছেন, লোকসভায় যেদিন গুজরাটে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়ে ভোটাভুটি হচ্ছে সেদিন আপনিই নাকি এন.ডি.এ সরকার কে ভোট দেবার হুইপ জারি করেছিলেন ⁹? আপনিই তো দাঙ্গা পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের পর নরেন্দ্র মোদী কে অভিবাদন জানিয়ে পুষ্পস্তবক পাঠিয়েছিলেন ¹⁰। আপনিই তো ২০০৪'র লোকসভা এবং ২০০৬'র বিধানসভা নির্বাচনে বি.জে.পি'র সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন ⁴ । 
ম্যাডাম, আজ আপনি বলছেন আর.এস.এস 'ভয়ঙ্কর'? আর ২০০৩'র ১৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে 'পাঞ্চজন্য'র অনুষ্ঠানে আপনি সংঘ নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ''আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আপনারা দেশকে ভালোবাসেন। আপনাদের ১% সাহায্যে আমরা কমিউনিস্টদের সরাতে পারবো।'' মনে পড়ে গদগদ আর.এস.এস নেতারা আপনাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ''হামারি পেয়ারি মমতাদি সাক্ষাৎ দুর্গা'' ¹¹?  এই তো সেদিন 'দুর্গার' সাফল্যে খুশি হয়ে আর.এস.এস'র রাজ্য মুখপত্র 'স্বস্তিকা' সম্পাদকীয় তে লিখেছিল "দায়িত্বশীল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বে দুঃশাসনের অবসান" ¹² । এই তো সেদিন আর.এস.এস'র জাতীয় মুখপত্র 'ওর্গানাইজার' স্বর্ণাক্ষরে উত্তর-সম্পাদকীয় তে ছেপেছিল, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের সেই বিরলতম প্রজাতির রাজনীতিবিদ যিনি আর্থিক ভাবে সৎ। দেশে তাঁর মতই রাজনীতিবিদ প্রয়োজন" ¹³ ।
সাইকো-অ্যানালিস্ট গিরিন্দ্রশেখর বসু কে একদিন তাঁরই এক রোগী বললেন "স্যার, গতরাতে স্বপ্নে দেখেছি আপনি নর্দমায় পড়ে গেছেন; আর আমি আপনাকে অনেক কষ্টে ওঠাতে চেষ্টা করছি।" গিরিন্দ্রশেখের মুচকি হেসে বলেন, "আমি অত্যন্ত আনন্দিত আপনার সাহায্য পেয়ে। কিন্তু নর্দমায় আমাকে ফেলেছিল কে?" ম্যাডাম, আপনার রাজত্বে যখন গত পাঁচ বছরে পাঁচ গুন বেড়েছে আর.এস.এস'র শাখার সংখ্যা ¹⁴, আজ যখন অনাহারে মরা চা শ্রমিকের রাজ্যে যাদবপুরে 'গরু পূজার' ছ্যাবলামি করছে মাথায় গোবর ভর্তি সন্তানরা, আজ যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে তিন তালাকের সমর্থন জানাচ্ছে আপনারই মন্ত্রীরা, আজ যখন হাজিনগর থেকে ধুলাগড়ে ধর্মের নামে ঘরে ঘরে দাঙ্গার আগুন ছড়াচ্ছে আপনার ভাইরা; তখন  রাজনীতির অঙ্ক কষতে সিদিকুল্লা-তোহা সিদ্দিকী'দের মাথায় তুলে রাখছেন আপনি? মোহন ভাগবত'দের কলকাতায় সভা করে বিষ ছড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছেন আপনি? বি.জে.পি-সংঘ বিরোধিতায় ভেকধারী খড়গহস্ত হওয়ার তামাশা করছেন আপনি? গোটা রাজ্য কে ধর্মীয় মেরুকরণের বারুদে সাজিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে মুজরা দেখছেন আপনি? আগে বলুন তো মাননীয়া, নিজের আঁচল দিয়ে এদ্দিন এরাজ্যে আর.এস.এস আগলে রাখল কে?  বলুন সম্প্রীতির বাংলায় বি.জে.পি'র বীজ বপন করেছিল কে? নিজের গোয়ালে, নিজের আঁচলে, লুকিয়ে দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছিল কে? আমি আনন্দিত আজ আপনি বি.জে.পি-সংঘের বিরোধিতা করছেন। কিন্তু আগে বলুন তো ঐ নর্দমায় আমাদের ফেলেছিল কে?   
একদিন মার্ক টোয়েন সকালবেলা শার্ট পরতে গিয়ে দেখলেন শার্টে বোতাম নেই। একটার পর একটা, তিনটে শার্ট বার করে পরতে গিয়ে দেখেন সব সার্টেই একটা করে বোতাম নেই। রাগে অকথ্য গালিগালাজ করতে করতে মার্ক টোয়েনে যখন চতুর্থ শার্টটা বের করছেন, তখন তাঁর রুচিশীল স্ত্রী, সব শুনে, স্বামীকে অপ্রস্তুত করার জন্যেই প্রত্যেকটি গালিগালাজ স্পষ্ট করে আবার উচ্চারণ করলেন। মার্ক টোয়েন সেটা শুনে বলেছিলেন, "তোমার শব্দগুলো সব ঠিকই আছে, কিন্তু... ইমোশনটা মিসিং।"
ম্যাডাম,  আজ আপনি বি.জে.পি -সংঘের বিরোধিতা করছেন বটে।  কিন্তু ঐ যে... ইমোশনটা মিসিং।















রবিবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৭

নববর্ষের স্মৃতি ~ অমিতাভ প্রামাণিক

আমার ছোটবেলার নববর্ষের স্মৃতি এখনকার তুলনায় একেবারেই আলাদা।

মাজদিয়ায় বড়দিন বা নতুন বছর বলে কিছু ছিল না। শীতকাল, তাই সন্ধ্যেবেলা খেজুরের রস পাওয়া যেত। রবিবারে বুধবারে খেজুরের গুড়ের হাট বসত ইস্কুলের সামনের রাস্তায় আর তার পাশের মাঠে। দূর দূর থেকে লোক আসত সাইকেলের হ্যান্ডেল আর কেরিয়ারে বা গরুর গাড়িতে গুড়ের ভাঁড় সাজিয়ে। রাস্তা চলা সহজ হ'ত না, সাইকেল থাকলে তো আরো মুশকিল। ব্যাপারীরা লোহার লম্বা শিক ভাঁড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে চেক করত ভাঁড়ের তলায় বাজে গুড়ের পাইল দেওয়া কিনা। দরাদরি হ'ত। লাইন দিয়ে লরি দাঁড়িয়ে থাকত, বিকেলের পড়ন্ত রোদে সেগুলো ভাল কোয়ালিটির গুড়গুলো তুলে নিয়ে রওনা হ'ত। আমরা জানতাম - ওরা যাচ্ছে কলকাতায়, দিল্লীতে, আমেরিকায়। আমরা না পাঠালে ওখানকার মানুষ তো নলেন গুড় কী, তা জানতেই পারবে না। 

তবে এর সাথে পয়লা জানুয়ারির কোনো সম্পর্ক নেই। পঁচিশে ডিসেম্বরেরও। যদি কোন কারণে সে বছর মামার বাড়ি কৃষ্ণনগরে যেতাম ওই সময় - মাঝে মাঝে যেতাম - তবে তার মধ্যে কোনোবার চার্চে বেড়াতে যাওয়া হ'ত। কৃষ্ণনগরের গীর্জা বেশ পুরনো আর বেশ বড়, সে সময় মেলার মত ভিড় হ'ত। মনে আছে একবার, তখন আমি বেশ ছোট, সেখানে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম। মাকে খুঁজে না পেয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে মাইকওলার কাছে গিয়ে বলেছিলাম, বলে দাও না, আমার মা হারিয়ে গেছে।

কেক নামক বিচ্ছিরি খাদ্যটি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে চোখেই দেখিনি। 

তখন ক্যালেন্ডার ইয়ারই ছিল আমাদের অ্যাকাডেমিক ইয়ার। পুজোর সময় ছুটি থাকত একমাস, ভাইফোঁটার পর স্কুল খুললেই অ্যানুয়াল পরীক্ষা। তার রেজাল্ট বেরোতো ডিসেম্বরে। হেড মাস্টারমশাই সুসিতবাবু প্রত্যেক ক্লাসে গিয়ে পাশ করা ছাত্রদের নাম ঘোষণা করতেন। বাবা ঐ স্কুলেরই শিক্ষক ছিলেন, জীবনেও কোনদিন আগে থেকে বলতেন না আমার রেজাল্ট কেমন। ধুকপুকুনিটুকু জেগে থাকত হেডস্যারের মুখ থেকে নিজের নাম শোনা পর্যন্ত। 

অবশ্য পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলেই মা এর ওর বাড়ি থেকে চেয়ে আনত পরের ক্লাসের অঙ্কবই। সকালে ঘুম থেকে তুলে সামনে বাড়িয়ে দিত তবলা বাঁয়া। আমি লেপের মধ্যে নিজেকে ঢেকে দু চারবার ধা তেরেকেটে মেরে আবার শুয়ে পড়ার ধান্দা করতেই মা চেঁচিয়ে উঠত তোলা উনুনে কয়লা সাজাতে সাজাতে। তাই আরো দু চারবার বাজাতে হ'ত ধা তেরেকেটে ক্রেধা তেরেকেটে ধিন্না কত্তা। উঠে তুষের চাদরে নিজেকে পেঁচিয়ে আভা না বিভা দাঁতের মাজন বাঁহাতের তালুতে ঢেলে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে দাঁত মালিশ করতে করতে চলে যেতাম বাসরাস্তার ধারে। হলুদ নরম রোদ উঠত তখন। রাস্তার ধারে কাঠ আর পুরনো খবরের কাগজ জ্বেলে হাত পা সেঁকত কেউ কেউ, আমি তার পাশে গিয়ে বসতাম। ইস্কুল ছুটি, তাই বাবার টিউশনির ছাত্ররাও তখন পড়তে আসত না। 

তখন আমাদের খেলা ছিল সিগারেটের বা দেশলাইয়ের খাপের ছবি দিয়ে তাস খেলা। মাটির ওপরে একটা বিন্দু, সেটা হচ্ছে এখনকার কম্পিউটারের ভাষায় 'হোম'। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা লোহার কড়াইভাঙা চাকতি - যার মাপ বারো থেকে ষোলো বর্গ-ইঞ্চি, সেটা চালা হ'ত এমনভাবে, যাতে সেটা কুড়ি বাইশ মিটার দূরের কোনো এক জায়গায় এমনভাবে বসানো যায়, যাতে যে পরে চালবে, সে কিছুতেই তার চার-আঙুলের প্রস্থের দূরত্বে ফেলতে না পারে। চেলে নিজেকেই বুঝে নিতে হ'ত কতটা কঠিন জায়গায় চাকতিটা বসেছে। সেইমত তার ওপর একগোছা তাসের চ্যালেঞ্জ, মানে তুমি এর ঘাড়ে চাকতি বসালে আমি তোমাকে এতগুলো তাস দেব। চ্যালেঞ্জার কখনো সেই চ্যালেঞ্জ নিত, আর বসাতে পারলে জিতত, না বসাতে পারলে ততগুলো নিজের তাস গুনে দিত তাকে। সে চ্যালেঞ্জ না নিয়ে প্রথম চালা চাকতিধারীকে হোমে ফিরে আসার চ্যালেঞ্জও জানাতে পারত। এই খেলা চলত যতক্ষণ না একপক্ষ নিজের সব তাস হেরে যেত। সঙ্গে যত তাস আছে, তাকে বলা হ'ত হাত-প্যান্ট-পকেট। লোকজন চোট্টামো করে নিজের অঙ্গের বিচিত্র সব জায়গায় তাস লুকিয়ে রাখত। হাপ্প্যানপকেট ডেকে জিতলে বের হ'ত সেই সব তাস। সে নিয়ে মারামারিও হ'ত। 

কত বিচিত্র রঙের আর ডিজাইনের সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বাক্স ছিল তখন। এখন আর দেখি না, সব উঠে গেছে। 

ডান্ডাগুলি বা লাট্টু খেলা হ'ত ইউনিয়ন বোর্ডের মাঠে। কাঁচের গুলি দিয়েও খেলা হ'ত খোলা জায়গায় বা দেওয়ালের ধারে। অনেক জন মিলে খেললে সেই গুলি চালা হ'ত কুলোয় ঢেলে। কুলো জিনিসটাই এখনকার বাচ্চারা হয়ত চোখে দেখেনি। 'ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো' বললে কী বলা হচ্ছে, তা বোঝাতেই সব্বোনাশ। ক্রিকেট খেলা হ'ত, অবশ্যই টেনিস বলে - আমরা বলতাম ক্যাম্বিস বল। রবার ডিউস নামে এক শক্তপোক্ত রবারের বল পাওয়া যেত, তার লাফানি দুরন্ত। প্যাড-গ্লাভ্‌স্‌ লাগিয়ে আসল বলে ক্রিকেট খেলার সঙ্গতি আমাদের ছিল না, তাই মাঝে মাঝে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে ঐ রবার ডিউস। তখনকার ফুটবল এখনকার এই নিটোল স্ফেরিক্যাল ছিল না। চামড়ার গোলকের মধ্যে ভরা থাকত রবারের গোলক, তার মুখে নল লাগানো। চামড়ার গোলকের এক জায়গায় কাটা থাকত, তার দুপাশে বোতাম লাগানোর মতন ঘর করা। নলে হাওয়া ভরা হ'ত, আর তারপর নলটা চেপ্টে ভাঁজ করে চামড়ার গোলকের মধ্যে ভরে জুতোর ফিতে বাঁধার মত সেই চামড়ার কাটা জায়গাটা বাঁধা হ'ত। বল পুরনো হয়ে গেলে সেই কাটা জায়গাটা বিচ্ছিরি রকম ফেটে যেত, তার তার মধ্যে থেকে রবারের ফুলানো বল আবের মত উঁচু হয়ে বেরিয়ে থাকত। আমরা অবশ্য বাতাবিলেবুর বল লাথানোর পরে সেই বল পেলেই উল্লসিত হয়ে তাই নিয়ে পেলে-র মত ড্রিবলিং করতাম। 

ইস্কুলের মাঠে স্যাররা ব্যাডমিন্টন খেলতেন। ছাত্র-শিক্ষক মিলে ভলিবল খেলত। একপাশে বাস্কেটবলও খেলা হ'ত কখনো কখনো।  

তবে বাড়ি ফিরে আমি সাধারণত অঙ্ক বইটা নিয়ে বসতাম। দোসরা জানুয়ারি নতুন ক্লাসে গিয়ে বসার একটা আনন্দ ছিল। ক্লাস শুরুর আগেই চার পাঁচটা চ্যাপ্টার আমি নিজে নিজেই করে ফেলতে পারতাম। তখন আর পুরনো বইটা ভাল লাগত না। নতুন ক্লাসে উঠলে নতুন বই এনে দিত বাবা, স্কুল থেকে বিক্রি হ'ত বঙ্গলিপি খাতা। 

আমরা একত্রিশে ডিসেম্বরের শীতের রাতে অন্য রাতের মতই রুটি-তরকারি-মাছের ঝোল খেতাম, শুয়ে পড়তাম রাত দশটার মধ্যেই। পয়লা জানুয়ারি ঘুম ভাঙত ভোরবেলা মা'র ডাকেই, যদিও তার অনেক আগে থেকেই বাবা বিছানায় বসে বসেই আবৃত্তি শুরু করে দিত - ওঁ পার্থায় প্রতিবোধিতাং ভগবতা নারায়ণেন স্বয়ম্ / ব্যাসেন গ্রথিতাং পুরাণমুনিনা মধ্যে মহাভারতম্‌ ...