বুধবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১৪

প্রতিষ্ঠান্ন ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

যা যা ছিল এলিট মধ্যবিত্তের নিজস্ব অভিজ্ঞান, সবই কালের গতিতে ম্লান। ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন সে'ও তো নিভন্ত প্রায়।

তবে আদৌ সাহিত্য নিয়ে এত মধ্যবিত্ত কচকচি কেন? নতুন মধ্যবিত্তর তো রয়েছে আইপিএল, এল ক্লাসিকো। ক্লাসিক্যাল পানুচর্চা বা প্যানপেনে টিভি সিরিয়াল। এখন সব অশৈলী কাণ্ডই জিও মানে গভর্নমেন্ট অর্ডারে ঘটে নইলে এনজিওরা ঘটায়। 

এ' দু'টির যে কোনও একটি থাকতেই হবে উদ্যোগের মূলে। তথাকথিত 'প্রতিষ্ঠান'ই একমাত্র 'প্রতিষ্ঠান্ন' দেবে এ'টা নেহাত বাতিল এক বস্তাপচা ধারণা। এই ধর্মযুদ্ধে মতান্তরে এই অধর্মযুদ্ধে কেউই অপ্রতিষ্ঠান নয়। বড় পত্রিকা ছোট পত্রিকা সকলেই 'প্রতিষ্ঠান'।সব খানেই সেই প্রসাদ নামের কল্পিত উচ্ছিষ্ট পাবার উমেদারির প্রতিযোগিতার আসর। 

হ্যাঁ, পাঠকসংখ্যা একটা ব্যাপার বৈকি। সেই পাঠক নোবেল প্রাইজের কমিটিতে থাকেন না। নোবেল চুরি করেন না। আন্দাজ করি ইদানিং সাহিত্যও পড়েন না। ছাপার অক্ষরগুলি গল্পের ছদ্মবেশে, প্রবন্ধের রাজপোষাকে, খাট-সাহিত্য আর খাঁটি সাহিত্যের মাঝামাঝি কোনও এক অবস্থানে দোদুল্যমান থাকে যদিও বা, কবিতার পাতাগুলোকে স্বয়ং কবিও নিজের লেখার পাতাটি ছাড়া গ্রাহ্য করেন না। তবু ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা দেখতে কার না ইচ্ছে করে। তাই সম্পাদককে ছাপার অক্ষরে চেতাবনি দিতে হয়, পকেটে কবিতা গুঁজে দিয়ো না কেউ… টেলিফোন তদবির নিষিদ্ধ …ইত্যাদি।

'সম্পাদক'এর কাজটুকু নিশ্চিত ভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক। কোন লেখাটি পত্রিকার মানবর্দ্ধক, কোনটি বিজ্ঞাপন সংগ্রাহক, কোনটি পারস্পরিক পিঠ চুলকানোর আসর থেকে লব্ধ, কোন লেখাটি পঞ্চবানবিদ্ধ, এই এত সব বিবেচনা করে যে প্রতিষ্ঠান তারই নাম সম্পাদক, সে তথাকথিত 'বড়' বা পাতিরাম রিজেকটেড আতিপাতি যে কোনও পত্রিকারই হোক না কেন। ব্যবসা, যশলোভ আর পাঠকসংখ্যা ছোট বড় সবার টার্গেট।টাটা বিড়লা আম্বানি বড় তাই লড়াইহীন নরক, আর পাড়ার ঘাম ঝরানো মুদি দোকানি ক্ষুদ্র সংগ্রামী ভাই আমার, এরকম প্রলেতারিয়েত ভাবনা অলীক।

বামেদের গাঁ ছাড়া করার মহান কাজটাই তারুণ্যের প্রতীক ছিল বুঝি? তবে কেন ধন্দ লাগে যখন শুনি যে সে' কাজে ব্রতী পশুখামারের তরুণ তুর্কী ঘোড়ারা ভোটের মরশুমে খেপ খাটতে গেছে অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের হয়ে? লিটল ম্যাগাজিনের 'নন্দীগ্রাম' সংখ্যাও কি কম দেখা গেছিল সে সময়? সবটাই প্রতিষ্ঠান আর তার দখলদারির খেলা।

তাই বলি কে প্রতিষ্ঠানের মুখ আর কে মুখোস, কার কোঁচড়ে ডলার আছে আর কার মুঠোতে ছড়ানোর যোগ্য খইটুকুও নেই, এ তর্ক স্থগিত রেখে যে যতটুকু লিখতে পারে লিখে যাক। কেউ লেখা চাইবে। কারওর দরজায় মাথা খুঁড়তে হবে। আডৌ কেউ না ছাপলেও নেট আছে। 

ও হো বলতে ভুলেছি। নেটজগতও তো অংশত প্রাতিষ্ঠানিক আজকাল। মানে ওই নেটজিনে লেখক হিসেবে প্রবেশাধিকার, ছাপা কাগজের মতই রিজার্ভড। হে যশোকামী লেখক। হিংসে করে লাভ নেই।ভেবে দেখলে সে'টাও দরকারি এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ষোলো আনার ওপর আঠার আনা।

পার্থ, ফললাভের আশা কোরো না। মুখ ও মুখোস দুই প্রতিষ্ঠানই মৃত। একমাত্র জীবিত তুমি। তুমি সব্যসাচী। অক্লান্ত দু'হাত সমানে চলতে থাকুক।

আর তোমার অস্ত্র হোক তোমার জাগ্রত অর্দ্ধজাগ্রত অথবা ঘুমন্ত কিন্তু স্বপ্নবিদ্ধ সেরিব্রাম।

এ প্রপঞ্চে ~ অমিতাভ প্রামাণিক

এবার ভোটে সবার ঠোঁটে ঝুলছে এ প্রশ্নটা,
দিদি এবার কার কপালে দেবেন যে ভাইফোঁটা!
সেটা জানবে বলে –

সেটা জানবে বলে সদলবলে টিভির রিপোর্টারে
সুযোগ পেলেই মাইক হাতে খুব জ্বালিয়ে মারে!
দিদির সময় আছে?

দিদির সময় আছে এসব গাছে এক্ষুণি জল ঢালার?
বিয়ের আগেই কেউ কখনো কাউকে পরায় মালা!
যত দুষ্ট লোকে

যত দুষ্ট লোকে তাই দুচোখে লাগিয়ে নিয়ে ঠুলি
দিনদুপুরে রাস্তাঘাটে গাইছে ব্রজবুলি!
তাতে বয়েই গেল –

তাতে বয়েই গেল! ও ভাই, হ্যালো, শখ যদি সব জানার,
লিখছো না ক্যান উন্নতি এই রাজ্যে ষোল আনা!
তোরা অন্ধ সেজে

তোরা অন্ধ সেজে হনুর লেজে লাগিয়ে তারাবাতি
এঁড়ে গরুর দুধ দু'তে চাস, ছিলিস ভালো তাঁতী!
তার রাখিস খেয়াল?

তার রাখিস খেয়াল, ভিট্‌রে শেয়াল, গেয়ে হুক্কাহুয়া
ভোটের বাজার গরম করিস উড়িয়ে দিয়ে ধুঁয়া!
সব গেলিই ভুলে

সব গেলিই ভুলে তোর মাশুলে জমিয়ে সিকি-আনি
জেলখানাতে রাখছি পুষে সুদীপ্ত-দেবযানী!
ওদের আর্ট গ্যালারি

ওদের আর্ট গ্যালারি গয়না-শাড়ি আংটি-পলা-শাঁখা
সব বিলাবো; আর্ট তো আমার, কয়েক কোটি টাকা!
তোরা সব পাবি রে

তোরা সব পাবি রে, আস্তে ধীরে, যার যত চাই খুশি –
ছিবড়ে হওয়া মাংসটা, তার হাড্ডি আমিই চুষি!
এবার ভোটের পরে

এবার ভোটের পরে বন্ধ ঘরে ডাকবে তো নিশ্চয়ই।
বলবে ডেকে, সাপোর্টটা দাও, এইখানে টিপসহি!
তখন বলব হেসে

তখন বলব হেসে, আমার দেশে লক্ষ নরনারী
আমায় শুধায় ফ্রীতে কবে চড়বে রেলের গাড়ি!
ওদের মুখটা চেয়ে

ওদের মুখটা চেয়ে অলপ্পেয়ে মন্ত্রীসভায় হানা
দিয়ে আবার বাগিয়ে নেব রেলদপ্তরখানা!
তাতে বুঝলে ভায়া

তাতে বুঝলে ভায়া এই বেহায়া রাজ্য যাবে ফুলে –
শিলান্যাসে ভরিয়ে দেবে মদন আরাবুলে!
যেমন আগেও করা!

যেমন আগেও করা বন্যা খরা তছরুপে বর্ষণে
ভাইরা আমার রেসপন্স দেয় হুমকি ও ধর্ষণে!
ওরা আমার পোষা

ওরা আমার পোষা, ফলের খোসা চিবিয়ে হাঁকে জোরে,
রাজ্যে কোথায় কী হয়েছে চৌত্রিশ বচ্ছরে!
এটাই মন্ত্র ওদের

এটাই মন্ত্র ওদের, এর জোরে ঢের বাগিয়ে নেওয়া আসন
দ্রৌপদীদের সামলে রাখে দু-চারটে দুঃশাসন!
ওরে, সব সাজানো –

ওরে সব সাজানো তোমরা জানো এই শাড়ি, নীল পাড়ে
হাওয়াই চটির সংসারখান টানছি আমি ধারে!
আমি শিল্পী মানুষ

আমি শিল্পী মানুষ চৈনিক-রুশ সব ব্যাটাদের পাতে
ছাই দিয়ে ডান্স করছি এখন শারুখ খানের সাথে!
এটা চেঞ্জ না তো কী?

এটা চেঞ্জ না তো কী, এ আমলকি, চিবাও একটু পরে
জল খেলে মুখ মিষ্টি হবেই, তদ্দিনে ঝরঝরে
তোদের ভবিষ্যৎও!

তোদের ভবিষ্যৎও আরও কত উঠবে ফুলে ফেঁপে
আমার চ্যানেল, আমার কাগজ সব দেখাবে ছেপে!
তোরা সেই বুঝে দে

তোরা সেই বুঝে দে পরম জেদে চুন চুনকে, গুণে
ভোটটা তাপস-দেব-বাইচুং শতাব্দী-মুনমুনে!
এদের গ্ল্যামার কত

এদের গ্ল্যামার কত আর উদ্ধত বুক ভেসে যায় জলে
বই বানাবো এদের নিয়ে দেখবি বসে হলে!
এদের মেকাপ দিয়ে

এদের মেকাপ দিয়ে খুব সাজিয়ে ছাড়ব এক এক জনা
চিত্ত-নিবেদিতা-বিবেক সুভাষ-রবীন্দ্রনাথ!
তখন বুঝবি তোরা

তখন বুঝবি তোরা দুষ্টু ছোঁড়া, লাগিস আমার পিছু!
কী যায় আসে কোনটা, জেনে কাঁঠাল নাকি লিচু!
ওরে, সাজানো সবকিছু ...
ওরে, সাজানো সবকিছু ...

২রা বৈশাখ ১৪২১
১৬ই এপ্রিল ২০১৪

রবিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৪

হাল্লা যখন যুদ্ধে চলেন ~ সোমনাথ রায়

হাল্লা যখন যুদ্ধে চলেন চ্যানেল জুড়ে ঢিচক্যাঁও
পোখরান আর কেওনঝোড়ে ম্যাকিনসেতে মিশ খাও
হিন্দি পাকি ক্রিকেটম্যাচে ক্ষান্তবুড়ির ঠানদি
দল ভারি হয় শব মিছিলে, স্বপ্নে ছিলেন গান্ধি
একশ ভাইয়ের কেউ ছাড়িনি খেমের রুজের পাঁচগ্রাম
অক্ষৌহিনী হত্যালীলায় বাবরি ভাঙি, রামরাম-
যুদ্ধ যখন 'হল্লা বোল'-এর, সংখ্যালঘুর ঘরদোর
সব জ্বলে যায়, বেস্টবেকারি- অউশটিশের অফশোর
ট্রোজান অশ্ব, খোঁজ আন বশ্য বক্সাইটের সম্ভার
পার করেগা সালোয়া জুদুম আব কি বারের সরকার।।

ভোটের ছড়া ~ অমিতাভ প্রামাণিক

ভোটের কুকুর ঘেউ ডেকেছে,

ভোটের বিড়াল মিউ বলে।
তাতেই কাঁপে ভোটারছানা
ভয়ভীতিতে, বিহ্বলে।

পাড়ার দাদা ডিগবাজি খায়,
আস্তে বলে বৌদিকে –
ভোট না দিলেই কেচ্ছা তোমার
ছড়িয়ে দেব চৌদিকে।

অবশ্য ঐ রোগ যে তোমার,
দিচ্ছি আমি টোটকা না?
ধাপ্পা তো নয়, চাইছি শুধু
ছাপ্পা তোমার, ভোটখানা।

ভোটটা দিলেই রাস্তা হবে,
ইস্কুল হবে, নিউ কলেজ –
তোমার বরের চাকরি হবে, 
জল আসবে গো টিউকলে।

ওদের পাটি-র সব ভুলভাল,
নিম গাছে কি শিম ফলে?
ভোটটা দিও বৌদি তুমি
আমার পাটির সিম্বলে।

ভোট পেরোলেই এসব দাদা
কোথায় হাওয়া, ফুক্কা, হুঁ!
ভোটের গরু হাম্বা ডাকে,
ভোটের শিয়াল হুক্কা-হু!

১৩ই এপ্রিল ২০১৪


দুইখান কতা ~ প্রকল্প ভট্টাচার্যয়

-দাদা, ভোট আসচে হুনলুম?
-হ্যাঁ, তাতে তোমার অসুবিধে কোথায়?
-না, মানে, যদি এই একই পোধানমন্তি থাকেন, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি নতুন কেউ হ'ন, তা'লে দুইখান কতা আছে।
-নতুন কেউ ই হবেন।
-ওই একই পাটির না অন্য পাটির? যদি একই পাটির কেউ হ'ন, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি অন্য পাটির কেউ হ'ন, তা'লে দুইখান কতা আছে। 
-অন্য পার্টিই তো মনে হচ্ছে।
- তা কত্তা বিজেপি, না আপ? যদি আপ হয়, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি বিজেপি হয়, তা'লে দুইখান কতা আছে।
-মনে ত হচ্ছে বিজেপিই হবে।
-ওহো, তা'লে পোধানমন্তি কে হবেন, আদবানি না মোদি? যদি আদবানি হ'ন, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি মোদি হ'ন, তা'লে দুইখান কতা আছে।
-মোদিজীই তো হবেন নির্ঘাত।
-তিনি কি সত্যিই ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র করতে চাইবেন? যদি চেয়ারে বসে পোতিহ্যুতি ভুলে যান, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি ভুলে না যান, তা'লে দুইখান কতা আছে।
-ভুলবেন কেন! নিশ্চয়ই সেটাই চাইবেন!
-আচ্ছা, সেটা কীভাবে চাইবেন? হান্তিপূর্ণভাবে, নাকি তালিবানি কায়দায়? যদি হান্তিপূর্ণভাবে হয়, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি তালিবানি কায়দায় হয়, তা'লে দুইখান কতা আছে।
-উনি এবং ওনার দলবল তো শান্তিপূর্ণ নয়, তালিবানি কায়দাতেই বিশ্বাসী, যা দেখছি শুনছি!
-তা'লে হালার ভোটই দিমু না!!

রবিবার, ৩০ মার্চ, ২০১৪

আমার বাপের শখ..... ~ তমাল রাহা

ক্ষেত খামারে বাপ খেটে যায়

দুইটা টাকার লাগি,
পড়াশুনায় খবরদার 
দিস নি রে ভাই ফাঁকি..

বইটা মুখে লেগেই ছিল 
বাইরে খেলার মাঠ,
এভাবেই করলাম শেষ
স্কুল-কলেজ এর পাঠ।

টেট পরীক্ষায় বসি যখন,
ভাসে বাপের মুখ
চাষার ব্যাটা মাস্টার মশাই
শুনতে ভারী সুখ, 
বাপটো লাঙ্গল চালায়েছে
সুখ ভরা ওর বুক।

পাতার পরে পাতা লিখি 
কলম নিয়ে হাতে,
বাপের লাঙ্গল বুক চিরে যায়
ধনেখালির মাঠে।

টেট এর লিস্টি দেখতে গেলুম, 
আমার বাপ এর ত'রে
ঘরে ফিরা বাপটো আমার
শুধায় বারে বারে,
মাস্টারির কিছু হইলো কি ঠিক?
কইলি না তো মোরে!

বৈলবো কি আর বাপটু আমার 
বাক্যি না আর সরে...
ক্যামনে বলি বাপটারে আর 
নেয় নি ওরা মোরে।

সুখের কথা বুকেই থাকে
বাপ এর মনে ব্যথা,
বৈলব কাকে? নই যে আমি
নেতা বাপের ব্যাটা !

চাষার ব্যাটার মাস্টারির 
শখটা ছিল ভারী...
জীবন টা তাই হঠাত থামে 
দিলাম এবার দাঁড়ি।

পড়বে যখন আমার চিঠি
আমি-ই অনেক দূরে 
গলায় দড়ির দাগটা দেখে 
কাঁদছে বাপটু জোরে....

এই জনমে আমার বাপের 
মিললো নাক সুখ, 
শখ মিটলো যাদের বাপের...
তাদের ভালো হোক ।

শনিবার, ২৯ মার্চ, ২০১৪

​আসল ও সুদ ~ লোপামুদ্রা মিত্র পাল

আসলের থেকেও সুদের মোহ বেশী। জগত জুরে ফ্রী র যে রমরমা তা কি অনস্বীকার্য ? আমাদের ছোটবেলায় খালি পয়লা বৈশাখের আগে যা চৈত্র সেল দেখতাম কিম্বা গান্ধী জয়ন্তী বা দুর্গাপুজোয় খাদি থেকে রিবেট। কিন্তু এমন আগ্রাসী "ফিরি" র চক্কর ছিল না তখন। কথায় বলে ছেলেমেয়ের থেকে নাতি-নাত্নির আদর বেশি তা ওই আসলের থেকে সুদের কদর বেশি সেই সুত্রানুসারেই। সেতো অনবরতই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। আমাদের যা যা করতে মানা করা হোতো তা অবলীলায় নাতি – নাতনি দের করতে দেওয়া হয়। যাক এ লেখা তা নিয়ে নয়।

প্রথম কলকাতায় এসে মাসির কল্যানে ফ্রি র সাথে পরিচিতি। মাসি পাড়ার গনেশের দোকান থেকে আটা কিনে প্রথম সত্যেন্দ্র ছাতুর প্যাকেট ফ্রি পেয়ে ফ্রি ওয়ার্ল্ডে জয়যাত্রা শুরু করে। বাড়িময় সে কি উৎসাহ – উদ্দীপনা !! এক মাসের ছাতু ফ্রি পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা? বাবা শুনে বললেন " লেগে থাক, এই করে করেই একদিন বাড়ি- গাড়ীও ফ্রি তে হবে।" তার পর থেকে মাসি নিবিড় অধ্যাবসায়ে স্তেইনলেস স্টিলের চামচ, সাবান, শ্যাম্পুর পাউচ, কলম, মুখে মাখার লোশন, ব্যাটারি এরূপ নানাবিধ প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় জিনিশ পেয়েছে।

আমার পূর্বোক্ত কোম্পানিতে হটাত একদিন একজন বসের কাছে জলদি ছুটি চাওয়ায় সবাই চেপে ধরে কারন জানতে। কিছুতেই বলতে রাজী হয় না। অনেক সাধ্য- সাধনার পর জানা যায় যে সিনেমা দেখতে গিয়ে এক লাখ টাকার লটারির টিকিট ফ্রি পেয়েছিল। আজ ফোন করে তারা জানিয়েছে যে লটারি লেগেছে। বিকেল ৫ টায় অমুক হোটেলে যেতে বলেছে। আমরা কজন জোর - জবরদস্তি করে ওর ঘাড় ভেঙ্গে আরসালানের বিরিয়ানি সাঁটিয়ে দিলাম সেদিন যাবার আগে, বস ও ছিল। নয়ত আর্লি লীভ আপ্রুভ করবে না হুমকি দিয়েছিল। তা যাক পরদিন সে এল কাঁচুমাচু মুখে। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেল কতৄপক্ষ এক লাখ টাকার ইন্স্যুরেন্স গছিয়েছে হাজার টাকার প্রিমিয়ামের বদলে আর সাথে অবিশ্যি একটা কাচের বাটির সেট "ফ্রি" মিলেছে।

এরকম হরেক কিস্যা ফ্রি নিয়ে। আমার বাড়ি বালতিতে ছয়লাপ, পা ফেলার জায়গা নেই। নামকরা ডিটারজেন্টের সাথে প্রতিবার বালতি দেয় আর প্রতিমাসে একটি করে নীল বালতি আমার প্রাপ্তি ঘটে । প্রথমে দুটো বাথরুমে বালতিতে ছেয়ে ফেললাম। তারপর ব্যাল্কনিতে বালতির মনুমেন্ট বানালাম। তাও তারা ফ্রি বন্ধ করল না আর বদলালও না। তখন আর কি করি একে তাকে ধরে বালতি গছানোর ধান্দা করি। মা কে দুটো গছানোর পর যেই তৃতীয়টা গছাতে গেছি, মা বলল খবরদার, হ্যাঁরে তোর কি আমায় দেওয়ার মতো আর কিছুই নেই? মুঝ্যমান হয়ে পরলাম। তারপর উপায় ঠাউরেছি মাসোহারা তো দেই, মাসোহারার সাথে ওই বালতি ফ্রি। তাতে খামখা চটে গেল। অভিমান করে বলল মাসোহারাও চাই না। কী বিপদ!!! কাজের দিদি দের গোটা কয়েক করে দেবার পর তারাও আর নিতে রাজী হয় না। সেদিন এক ভদ্রমহিলা এসেছিলেন আমাদের বাড়ি, তিনি সুগারের রোগী। প্লেট ভর্তি মিষ্টি সাজিয়ে দিলে তিনি বেশ খুশি হন। কারন ভালবাসাও মেটে আর নিজের হাতে পাপ ও করতে হয় না। তাকে খেতে দিয়ে বালতির কথা পাড়লাম। মিষ্টি গলায় আটকে বিশম খেয়ে একশা। সন্দিহান হয়ে আমার দিকে তাকাতে লাগলেন। বললেন তোর কি মাথা খারাপ? আমি বালতি বয়ে বেহালা যাব !!! আমি বললাম হয় নি তবে অচিরেই হবে। অবশেষে মুস্কিল আসান – " কাবাড়িওয়ালা" নতুন এলে পুরনো বেচে দাও। খেতাব ও পেয়েছি " বালতি বউদি" ।

এবার আসি পিসির গল্পে। নামকরা শপিং মলে কেনাকাটায় মোবাইলে কথা বলার জন্য টক টাইম সহ সিম ফ্রি। এদিকে নেই মোবাইল। তাতে কি ফ্রি তো বটে । ধরিয়ে দিতে বরং চটে গেল। বললেন আরো একটা জিনিষ পেয়েছি-৫০,০০০ টাকার বেড়াবার কুপন। সেই নিয়ে কদিন কি আলোচনা। যাই হোক নির্ধারিত দিনে পিসি – পিসু দুই বয়স্ক মানুষ গরমের রোদে ভাজা হতে হতে ট্যাক্সি ভাড়া করে গিয়ে সেই কুপন আনলেন খুশিতে গদগদ হয়ে। বাড়ী ফিরে শর্তাবলি পড়ে বেড়াবার ইচ্ছেয় ইতি টানলেন। বোধহয় গ্রীষ্মে রাজস্থান, বর্ষায় চেরাপুঞ্জী, শীতে কাশ্মীরে , এরকম ই কিছু ছিল। তাছাড়াও খাওয়া – দাওয়া ও ট্রান্সপোর্ট এই প্যাকেজ বর্জিত, বিলাস কর আলাদা, ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভ্রমন করতে হবে ইত্যাদি ও প্রভৃতি।

বাবাকে নিয়ে গেছি নামকরা ব্র্যান্ডের টি সার্ট কিনে দেব। গিয়ে দেখি ৭৫% ফ্রি মানে রিবেট , আর সেদিনের জন্য আরও এক্সট্রা ২০% ফ্রি। মানে টোটাল ৯৫% ফ্রি। তাতে দাম দাঁড়াচ্ছে ৩৫০ টাকা। বাবা ফস করে বলে বসলেন এই জামার আসল দাম ৭০০০ টাকা। এরা তো গাঁটকাটা । যত বলি খুব ভাল ব্র্যান্ড, ওরকম বলতে নেই। কে শোনে কার কথা। শেষমেশ তড়িঘড়ি সম্মান বাঁচাতে বেড়িয়ে পড়ি দোকান থেকে কিছু না কিনেই।

সবচেয়ে রোমহর্ষক ও করুন ঘটনা দিয়ে "ফ্রি" তে ইতি টানি। মা একদিন একতা পুচকি পেপার কাটিং নিয়ে খুব উত্তেজিত। তাতে লেখা আছে কুপন নির্বাচিত কয়েকটি মুদির দোকানে দেখালে ২০ কেজি বিস্কুট "ফ্রি" । অভিভুত হয়ে বললেন এদ্দিনে বুঝি ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন। সবাইকে বলে বেড়াতে লাগ্লেন আমার ফ্রি বাতিক নিয়ে ঠাট্টা !! লেগে থাকলে কি না হয়। সামনেই বোনের বিয়ে ছিল। আমার দূরদর্শী বর শ্বশুরের পয়সা বাঁচাতে পরামর্শ দিল বড় টিন কিনতে। অতিথি- অভ্যাগতের চা এর সাথে একটা বড় খরচের সুরাহা হল। এয়ার টাইট টিন কেনা হল ও যথাসময়ে বাবা চেনা রিক্সাওয়ালা ও দুটো বড় থলি সহযোগে বেশ খানিকটা ঠেঙ্গিয়ে ঐ নির্বাচিত দোকানে গেলেন। ঘণ্টা খানেক পড়ে ফিরলেন। হাতের থলি তে কিছুটি নেই। আমরা উৎকণ্ঠিত । হুমড়ি খেয়ে সমস্বরে জিজ্ঞেস- " দিল না আজ?" বাবা বললেন দিয়েছে। কোথায় ?? কোথায় ?? পকেট থেকে স্যাতান খবরের কাগজে মোড়া দুটো ন্যাতান মেরী বিস্কুট বার করে বললেন , "এই যে" আমাদের ছ-জোড়া চোখ ঠিকরে বেরচ্ছে। বাবা ফের বললেন, "ওটা ২০ গ্রাম লেখা ছিল, তোমার মা ভুল করে ২০ কেজি দেখেছেন। আর এর জন্য আমায় অত দুরের দোকানে গিয়ে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হল।"

শুক্রবার, ২৮ মার্চ, ২০১৪

ক্রিকেট ~ অমিতাভ প্রামাণিক

​ক্রিকেটে ছিল আমার জন্মগত দূর্বলতা। ছোট্ট মারফি রেডিওটা কানে চেপে ধরে মাঝরাতে শুনতাম – না না দেখতাম – সবুজ মখমলি সাবাইনা পার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে আমার স্বপ্নের নায়ক সুনীল, ক্লাইভ লয়েড তাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে চারটে স্লিপ আর দুটো গালি দিয়ে। ছোট্ট চেহারার সুনীলের দিকে ধেয়ে আসছে দৈত্যাকৃতি জোয়েল গার্নার। রেডিওতে শোঁ শোঁ আওয়াজের মধ্যে শোনা যাচ্ছে নরোত্তম পুরীর গলায়, ইন কাম্‌স্‌ গার্না, রাইট আর্ম ফ্রম ওভা দা উইকেট। গার্না বোল্‌স্‌, স্লাইটলি ওভা-পিচ অন দ্য অফ্যান মিড্‌ল্‌। গাভাস্কা ড্রাইভ্‌স্‌ অ্যান্ড ড্রাইভ্‌স্‌ স্ট্রেট অ্যাজ দ্য বল গোজ স্ট্রেট পাস্ট দ্য বোলার অল অ্যালং দ্য কার্পেট ফর ইয়েট অ্যানাদা ফোর। আমি শিহরিত হতাম। মনে হত ইস্‌, যদি লর্ড ক্লাইভের বিরুদ্ধেও এমন রুখে দাঁড়াতো নবাবের টীমের কেউ।

তারপর টিভি এল। দূরদর্শন। মাঠ থেকে সরাসরি সম্প্রচার। স্কুল-কলেজে যেতে না হলে খেলা থাকলে টিভি আমার দখলে, যদিও মনে হত মাঠে সবসময়ই বৃষ্টি হচ্ছে। ঝিরঝিরি সাদা-কালো স্ক্রীনে কে ব্যাট করছে, কে বল, সব বুঝে নিতে হত। অদম্য উৎসাহে আমি অ্যান্টেনা ঘোরাতাম ছাদে, যদি আর একটু পরিস্কার আসে ছবি, আর নীচ থেকে কেউ চেঁচিয়ে বলত, উল্টোদিকে ঘোরা, আর একটু, আর একটু, না না উল্টো, হ্যাঁ, আর না, যাহ –

টিভিতে খেলা ঠিকমত দেখা যাক না যাক, আস্তে আস্তে রেডিওতে খেলা শোনা বন্ধ হয়ে গেল।

রবিবারে খেলা থাকলে তো আমায় আর পায় কে! নড়লেই পাছে আউট হয়ে যায় কপিলদেব, সেই ভয়ে স্থির হয়ে থাকতাম। চান করতে যাওয়ার তাড়া দিত মা। খাওয়া শেষ করতাম গোগ্রাসে।

দুটো বাজলেই হঠাৎ লিখে দিত, এবার খেলা দেখাবে দু-নম্বর চ্যানেলে, কেননা এখানে এখন হবে খবর। মূক ও বধিরদের জন্যে। একজন গোঁফওয়ালা ষন্ডামার্কা লোক হেঁড়ে গলায় আস্তে আস্তে পড়ত সেই খবর, আর এক সুদর্শনা যুবতী হাতের বিভিন্ন মুদ্রায় তা প্রকাশ করত। যত ইচ্ছেই থাক আর রাগ হোক, আমার তক্ষুণি দু-নম্বরে যাওয়া হত না। ততক্ষণে আমাদের দুটো বাড়ির পরে থাকতো যে চক্রবর্তী কাকু, তার মেয়ে ঝিমলি এসে বসে যেত মেঝেয়। খবর 'শুনতে'।

ঝিমলিদের বাড়িতে টিভি ছিল না। ওকে পেছন থেকে খুব জোরে ডাকলেও কিচ্ছু শুনতে পেত না। ঝিমলি সব কথা বলত ওর মায়াময় চোখ দুটো দিয়ে। হাতের মুদ্রা দিয়ে অক্ষর শেখার ব্যাপারটা ওকে কেউ শেখায়নি। হিন্দী বা ইংরাজী ও কিছুই জানত না। আমাদের বাড়িতে রবিবারে দুপুর দুটোয় যে খবর, সেটাই সম্ভবত ওর একমাত্র শিক্ষা। কী বুঝত কে জানে। একঘন্টা হাঁ করে তাকিয়ে থাকত টিভির দিকে, আমার খেলা-দেখার চেয়েও অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে। খবর শেষ হলেই চুপচাপ উঠে চলে যেত।

আমার মা ঝিমলিকে খুব ভালবাসত। পাড়ার অন্যান্য কাকিমা-পিসিমারাও। পাড়াগাঁয় নর্মাল ইস্কুলই সে রকম নেই, তায় আবার বোবা-কালাদের! ঝিমলির লেখাপড়া শেখা হল না তাই।

অথচ প্রকৃতির নিয়মে বসন্ত এসে গেল তার শরীরেও। ফ্রক থেকে শাড়ি হল একদিন। পাড়ার ছেলেরা দোলের দিন ওর সাথে যা করত, তাকে সভ্যতা বলে না। ঝিমলি বুঝত না ওর কী করা উচিত, বা হয়ত বুঝত কিন্তু ওর প্রতিবাদও তো মূক। শান্ত, সমাহিত প্রকৃতির ঝিমলিকে আমার মাঝে মাঝে দেবী মনে হত। মনে হত, ঈশ্বর অত্যন্ত রূঢ় এই যুবতীটির প্রতি। সমবয়েসী আর পাঁচজনের মত ওরও কেন একজন প্রেমিক থাকবে না?

চক্রবর্তী কাকু স্ট্রোক হয়ে মারা যান একদিন মাঝরাতে। আমার শোবার ঘরের দরজায় দুমদুম শব্দ করে জাগিয়ে দিয়েছিল ঝিমলি। অন্ধকার রাত, দরজা খুলে ঝিমলিকে দেখে কিচ্ছু বুঝতে পারি নি। ও মুখ দিয়ে শব্দ বের করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। তারপর আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ওদের বাড়ি।

সেই প্রথম হাত ধরা। আর সেই শেষ।

পাড়ার কয় ঘর যজমান, এই ছিল ওদের পরিবারের আয়ের উৎস। পুজোপার্বণ তো মেয়েদের দিয়ে হয় না। হলেও মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয় জোরে জোরে, সংস্কৃতে। একজন বোবা-কালা অশিক্ষিতা যুবতীর কাজ নয় এটা।

মাসখানেক পরে তাই শহরে ওর মামার বাড়ি চলে গেল ওরা। কাকিমা সেলাই টেলাই করতেন, বড়ি-আচার-পাঁপড় এই সব টুকটাক বানাতেন শুনেছি। ভিটেবাড়ি বিক্রি করে দিতে আরো কয়েকবার এসেছিলেন, ঝিমলি আর আসে নি।

দেশে রঙিন টিভি এল। হাজারটা চ্যানেল এল। এখন আর খেলার মাঝে ফট করে মূক-বধিরের খবর শুরু হয়ে যায় না। আর দেখি না রুকাবট কে লিয়ে খেদ হ্যায়।

শুধু কোন এক প্রত্যন্ত বসন্তের রবিবারে জমিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সেরে হাতঘড়িটার দিকে তাকাতে দেখি বেলা দুটো বাজে। সময় থমকে যায়। গলার কাছে কী একটা আটকে যায় যেন।

জীবন গড়িয়ে গেছে। পাঁচিলে শুকিয়ে গেছে রোদে দেওয়া ফ্রক-স্কার্ট-শাড়ি। কোথায় হারিয়ে গেছে রেডিও, ক্রিকেট।

আর কিছু স্বপ্নময়ী নারী।

২৮শে মার্চ ২০১৪

রবিবার, ২৩ মার্চ, ২০১৪

এই দেশ, এই সমাজ ~ অনির্বাণ মাইতি

ভ্রুণ গুলো সব মেয়ে হয়ে যায় 
বড্ড তাড়াতাড়ি
বয়স বাড়ার দেমাক লাগে 
রাজহংসীর গ্রীবায়
আমায় সেসব পাগল করে 
আমায় সেসব ভাবায়

মেয়ে গুলো সব লাশ হয়ে যায় 
বড্ড তাড়াতাড়ি 
কর্ষিত হয় ধর্ষিত হয় 
পুরুষ নামের সেবায় 
আমায় সে শব পাগল করে
আমায় সে শব ভাবায়


শনিবার, ১৫ মার্চ, ২০১৪

আজ আমাদের ন্যাড়া-পোড়া, কাল আমাদের দোল: কিঞ্জল ঘোষ

বড় হওয়াটা আধা শহর এক জায়গায়, যদিও পিন্‌ কোডে কলকাতা-৬০। টালি আর টিনের চালের-ই ম্যক্সিমাম্‌ ছাওয়া। বাদামতলা থেকে গড়াগাছা তেঁতুলতলার মাঠ অবধি ছিল আমার জগৎ। ‘হারামজাদা’ শব্দটাকে জানতাম আদরের-ই ডাক হিসেবে। আদরটা সত্যি-ই ছিল। এই ডাক্‌টা বড় মিঠে করে ডাকতে পারত ছোড়দিদা। পাড়ার ছোটপিসি। একটা পৌনে পাঁচ ফুটের টিঙটিঙে শরীর থেকে কি করে যে অমন পাড়া কাঁপানো আওয়াজ বের’ত, আজ-ও রহস্য। কালোকুলো আজীবন আইবুড়ো মানুষটা একটা আন্‌কোয়েশ্চনেব্‌ল হেজিমনি এবং সময় বিশেষে ডমিনেন্স্‌ বজায় রাখত গোটা পাড়ায়। আমার ঠাম্‌ কে বৌদি বলে ডাকত, যাবতীয় ফাই ফরমাশ হাসিমুখে করে দিত। বদলে গোপাল-জর্দা পানেই এক মুখ হাসি।
হাওয়া বাতাস লাগলে নুন-পোড়া, জল-পড়া, পক্সের দয়া হলেই পোড়া-শিবের তেল, আর আমাদের ন্যাড়া-পোড়ায় ন্যাড়া-গাছ বাঁধার জন্য শাড়ির ছেঁড়া পাড়, সর্বদা মজুত থাকত। এবং আমাদের ন্যাড়া-পোড়ার পাতা পাহারা দেবার জন্য অমন বিশ্বস্ত প্রহরী ইন্দো-পাক্‌ সীমান্তেও পাওয়া যাবে না। সরু সরু হাতে ওই শাবল চালানো যে দেখেনি, এক মাত্র সেই “অবলা নারী” শব্দটা বলতে পারে। নতুন পয়সার বারফাট্টাই দেখলেই স্ট্যন্ডার্ড লাইন ছিল ছোড়দিদা’রঃ “এ ছেলে বাঁচলে হয়”। ভোটের দিনের চা আর ভোটের আগের যত্ত জ্বাল দিয়ে আঠা। ছানি পড়ার পর একবার ভোট দিতে গিয়ে ব্যালট্‌ পেপার নিয়ে প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে গিয়ে বক্তব্যঃ “আঁট্‌কুড়ির ব্যাটা... কাস্তে হাতুড়ি নেই ক্যন্‌ রে?” সিম্বল দেখিয়ে দেওয়ার পর ভোট্‌ দিয়ে বের’নোর সময় সেই প্রিসাইডিং অফিসারের মাথায় হাত বুলিয়ে “বেঁচে থাক বাবা। আমি তোর মার বয়সি। গালাগাল করেছি বলে কিছু মনে করিস না, তোর পর্‌মায়ু বাড়বে”। আজ ছোড়দিদাদের ইঁট বার করা বড় বড় আড়াইখানা ঘর আর পেঁপে গাছ, নিম গাছ কিচ্ছু নেই। জি প্লাস, সেভেন্‌ অ্যাপার্ট্‌মেন্ট্‌, তলায় গ্যরেজ্‌ স্পেস্‌।
আমাদের ঠিক যেই সময়টা আড় ভাঙার, বই-পড়া এনলাইটেন্‌মেন্ট ফলানোর, আমার ঠিক সেই বয়সে ছোড়দিদা’র চোখে বা কানে আমি গেলেই আমার “মেলেচ্ছপনা” নিয়ে নাক সিঁটকিয়ে বলতঃ “চার মাসে ডায়েরি (ডায়ারিয়া) হয়ে ও ছেলে মরো মরো। তবে থেকে কোল্‌ করেছি। ফেলতে তো আর পারি না। মরুগ্‌গে যাক...” শেষের ক’টা দিন জানালা দিয়ে আমাকে দেখলেই চালভাজা খাওয়াতে বলত। কে কেমন আছে, যানতে চাইত যাদের ম্যাক্সিমাম-ই বহু আগে মারা গেছে। আর একটা কথা বলতঃ “মোচ্ছব বেশি হলেই মন্বন্তর আসে রে...”। অযত্নে অপ্রাসঙ্গিক মৃত্যু হল তার চার বছর আগে।
হ্যালোজেন্‌ ভেপারের এত আলো এখন, ন্যাড়া-পোড়ার আর প্রয়োজন নেই অশুভের অগ্নি-নিরঞ্জনের। আমরাও আর তালে তালে তালি দিতে পারব না “আজ আমাদের ন্যাড়া-পোড়া কাল আমাদের দোল... পূর্নিমাতে চাঁদ উঠেছে”।

বৃহষ্পতিবার, ১৩ মার্চ, ২০১৪

অভিমানী রাধা ~ অনামিকা

পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছি, সাক্ষী মিডিয়া ফটো।
গাছে তুলে তবু কেড়ে নিলে মই? গল্পটা খটোমটো।
প্রধানমন্ত্রী করবে বলেছ, সবই কি কথার কথা?
দিল্লির সব দামাল ছেলের বিশ্বাসঘাতকতা…
প্রাণে বড় দাগা দিয়েছে আন্না, কান্না এসেছে চোখে।
সারদা থাকলে নতুন দিল্লি ভরাতাম লোকে লোকে।
ন্যান্সি বলেছে, পরোয়া কোরো না। আমরাই দেব ডলার।
সারা ভারতকে ধাপ্পার কত কথাই যে ছিল বলার।
হাওয়াই চটির তলায় আমার সততা বিজ্ঞাপন
নতুন প্রেমিক তাতেই তো তুমি হয়েছিলে উন্মন।
আজকে কী হল? কিচ্ছু না বলে হঠাৎ ছাড়লে হাত।
মুকুল ডেরেক তোমাকে বোঝাতে হয়ে গেছে কুপোকাত।
তুমি বলেছিলে সাপ্লাই দেবে একশ' ক্যান্ডিডেট
হাসতে হাসতে সকলের নাকি ব্যথা হয়ে গেছে পেট।
এত হেনস্থা? প্রেমিক তোমাকে বোঝাব আগামীকাল
আমি হিটলার কত নৃশংস… কত ধানে কত চাল।


url.jpg

শনিবার, ৮ মার্চ, ২০১৪

নারীদিবস ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য়্য

কালনাগিনী কামড়াল পায়, মরল লখা বিষে,
হায় বেহুলা, ভাগ্যেতে তোর চিরকালের দাগা।
সমাজ তোকেই দুষবে শুধু, চোদ্দ বা চল্লিশে,
চাঁদ বেনেরা ফাঁদ পাতে, তুই এমনই অভাগা!!

যমের সাথে যুদ্ধ করে চাইলি হতে সতী,
সাবিত্রীরে, কোণ পাপে তোর এমন হল বিয়ে?
সত্যবানকে না বাঁচালে কীই বা হতো ক্ষতি?
পারবি সুখে করতে কি ঘর মরণ স্বামী নিয়ে?

সীতা রে, তুই জন্মদুখিন। এই ছিল কপালে!
রাজরাণী হায়, কাল কাটালি অরণ্যে, পাহাড়ে!
সুরক্ষা তোর পারলনা রে করতে। তারই ফলে
করল তোকেই দোষের ভাগী, মারল অবিচারে!

এই আমাদের দেশ, এখানে তোদের বলে নারী।
যুগে যুগেই পুরুষ পায়ের তলায় দ'লে,
মহানতার সাজ পরিয়ে রাখবে, বলিহারী!
বাঁচতে যদি চাস, এখনই ওঠ দাবানল জ্বলে!!