রবিবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২০

এন-আর-সি যদি ১০০ বছর আগে হত ~ নির্মাল্য সেনগুপ্ত

ভারতে এন-আর-সি যদি ১০০ বছর আগে হত তাহলে সেই সময়কার বিখ্যাত লেখকরা তাদের গল্পে কিভাবে ব্যবহার করতেন? 

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ

ধু ধু করিতেছে সেতুপুরের মাঠ। সোনালী বালির উপর চিকিচিকি দেখিয়া অপু ভাবিল, বাহ দিদিকে ডাকিয়া আনিলে ভাল হইত৷ দুর্গা এ যাবৎ অনেকবার তাহাকে বলিয়াছে যে সোনারঙা বালির খোঁজ লইয়া আনিলে অপুকে সে তাহার সঞ্চয় থেকে দুইখানি কড়ি দেবে৷ ওই কড়ির উপর অপুর বড়ই লোভ। সে একখানি গাছের ডাল ভাঙিয়া লইয়া বালির উপর নকশা কাটিতে ব্যস্ত হইল৷ হরিহর কখন আসিবে সে জানে না৷ অপেক্ষা করা ছাড়া এখন উপায়ও নাই৷ দলিল সম্মন্ধে অপু মা'কে জিজ্ঞেস করিয়া উত্তর মেলে নাই কোনও৷ সর্বজয়ার মুখে সে শুনিয়াছে সুদূর দিল্লী নামক কোনও এক গ্রামে নরেন্দ্র মোদী নামক এক রাজা আছেন৷ তিনি প্রজাদের দলিল দেখিতে চান, নহিলে সবাইকে দেশছাড়া করিবে৷ অপু দিদিকে জিজ্ঞেস করিয়াছিল, "দিদি, তবে কি আমাদের নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যেতে হবে? সতুদারাও যাবে?" দুর্গাও এর উত্তর দিতে পারে নাই৷ 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ 

বৃষ্টি থামার কোনও নাম নেই আজ দুপুর থেকেই৷ ডাঁই করা ঘাসের উপর, চাল থেকে চুঁইয়ে টপ টপ করিয়া জলের ফোঁটা পড়িয়া পচা গন্ধ বাহির হইয়াছে বেশ৷ ঘরের ভিতর আদুড় গায়ে শুইয়া আছে মালতী৷ ঘরের ভিতরেও যে সুবাস ছড়াইতেছে তা বলিতে পারি না৷ মালতীর পায়ের কাছে ঘায়ের উপর মাছি ঘুরিতেছে ভনভন৷ সনাতন পাগলের মত ঘরের আনাচে কানাচে খুঁজিয়া যাইতেছে কিছু। মালতী ড্যাবড্যাব করে তাকিয়া রইয়াছে সনাতনের দিকে৷ তাহার পিঠের পেশী ওঠানামা করিতেছে জোরে জোরে। চোখেমুখে ভয়ের ছাপ৷ ঠোঁটের কাছে অল্প বিস্কুটের গুঁড়ো লাগিয়া আছে এখনও৷ সনাতন বলিল, "কাগজ না পেলে ভিটেমাটি চাটি হবে বুঝেচ? অমন করে দেখচ কী? তোমার ভয় লাগে না?" 
মালতী খিলখিলিয়া হাসিয়া ওঠে। বলে, "যেখানেই যাই, যাব তো তোমার সঙ্গেই৷ আমাকে একা ফেলে পালাবে ভেবেচ নাকি? তা হবে না বাপু..." 

জীবনানন্দ দাশঃ 

একটা চুরুট জ্বালিয়ে মাল্যবান চেয়ারে বসে জানলার দিকে তাকাল। মিহি কোনও সুর ভেসে আসে ওই বাড়ি থেকে৷ সে সুরে কোনও কথা নেই, আকুতি নেই, আলো নেই। আলো কোনওদিন নিজের জীবনে চায়ওনি মাল্যবান। উৎপলা কি চেয়েছে? এই দুর্দিনেও উৎপলা শুয়ে থাকে৷ কেবল শুয়ে থাকে৷ জঙ্গলে আগুন লাগলেও যেমন সজারুর দল ভুলে যায় নদীর দিকে ছুটে চলার কথা। ঝাঁক ঝাঁক শকুন উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করে পোড়া মাংসের গন্ধ নাকে আসার, সেই তীব্র মোদ্দাফরাসের ন্যায় কিছু হিংস্র হায়না দাপিয়ে বেড়ায় হলুদ ফুলের মধ্য দিয়ে। বাতাসে বাতাসে ছাইয়ের সঙ্গে ফুলকি সখা পাতায় কখনও সখনো৷ মাল্যবান ভাবে৷ মিহি সেই সুরের তালে তালে তার চোখের সামনে কোনও কাগজের অবয়ব ফুটে ওঠে। অমিত শাহ কি জানে তার কথা? তার এই অন্ধকার ঘরের ভিতর উৎপলার এক মুহূর্তের ভালবাসার আখাঙখা, অথবা ভালবাসা নয়, শুধু বেঁচে থাকা। একটা অন্ধকার ঘরের ভিতর, সামান্য বেঁচে থাকা ইচ্ছে। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরঃ 

আমি ভাবিতাম, দেশছাড়া হওয়ার আশঙ্কা বুঝি শুধু আমার। আর কারও হৃদয়গহ্বরে তেমন কোনও উৎকণ্ঠার কারণ, তাহাদের উতলা করিতে পারে নাই আজও৷ তবু আজ এত লোকের সমবেত কণ্ঠস্বর আমাকে সামান্য একটু বল দিল৷ শুস্তা নদীটির উপলমুখরিত পথে নর্তকীর ন্যায় জলবারি, নৃত্য করিয়া চলিয়া যাইতেছে ক্রমাগত। নদীর কিনারে শৈলপদমূলে জড়ো হইয়াছে প্রায় দেড়শত লোক। গগনভেদী কণ্ঠে তাহারা সোচ্চারিত হইতেছে "হাম ছিনকে লেঙ্গে আজাদী..." 

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ 

ব্যোমকেশ সযত্নে খবরের কাগজটি পাট করিয়া টেবিলে রাখিল। একটি সিগারেট জ্বালাইয়া অন্যমনস্ক ভাবে তাকাইয়া রহিল কাগজটির দিকে৷ 

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, "কী হল? নতুন কোনও কেস পেলে?" 

বাইরে হ্যারিসন রোডের উপর নবোদবুদ্ধ নগরীর পথে মানুষের ঢল৷ আমাদের এই বসিবার ঘরটির গবাক্ষপথে রাস্তার কিয়দংশ দেখা যায়। কাতারে কাতারে মানুষ নাগরিক আইনের বিরুদ্ধে মিছিলে পথ হাঁটিতেছে। 

ব্যোমকেশ আমার প্রশ্নে সজোরে মাথা নাড়াইয়া কহিল, "আমি একটি পণ করেছি অজিত। যতদিন না সরকার এই আইন ফিরিয়ে নিচ্ছে, সরকারের কোনও কেসে ব্যোমকেশ বক্সী মাথা ঘামাবে না।" 

সত্যজিত রায়ঃ 

লালমোহনবাবু উত্তেজিত স্বরে বললেন, "বলেন কী মশাই! এই এন.আর.পি আইন সত্যিই লাঘু হবে নাকি?" 

আমি আড়চোখে ফেলুদার দিকে তাকালাম৷  রাস্তায় এত যানজট এর আগে আমরা দেখিনি৷ লালমোহনবাবুর সাম্প্রতিক উপন্যাসটা প্রায় ২০০০ কপি বিক্রি হওয়ায় তিনি আমাদের চাঙোয়া নিয়ে চলেছেন। সামনের লরিটা থেকে বেরোনো কালো ধোঁয়া মাঝেমধ্যেই গাড়ির উইন্ডস্ক্রীন কালো করে দিচ্ছে। 

"ওটা এন-আর-সি। এন-আর-পি নয় লালমোহনবাবু। আর হ্যাঁ, লাঘু হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ করতে দেবে না৷" 

"সেটাই তো।" লালমোহনবাবু উত্তেজিত হয়ে সিটের পিছনে একটা পেল্লাই ঘুষি চালিয়ে বললেন, "একি ইয়ার্কি নাকি মশাই। আমার ভোটার আইডি আছে, ভোট দিয়েছি, এখন বলছে সেটা আমার প্রমাণপত্র নয়? ভাই তপেশ, তুমিই বল, এ কী সম্ভব?" 

শিবরাম চক্রবর্তীঃ 
বাড়ি থেকে বেরিয়েই হর্ষবর্ধন ভাবিত হন। ভাইকে ডেকে বলেন, "হ্যাঁ রে গোবরা, ধর আমাদের ধরে ক্যাম্পে ঢুকিয়ে দিল। তারপরে কলকাতা ফিরতে পারব তো আবার?" 

গোবর্ধন বললে, "অত ভেব না তুমি৷ আসামে আমাদের সবাই চেনে৷ তোমারও গোটা আসাম নখদর্পনে৷ একটা কাগজ তুমি জোগাড় করতে পারবে না?"
"তা চেনে বইকি। যুদ্ধেও তো গিয়েছি আমি। যাইনি নাকি? এবার বলবে যে ডিটেনশন ক্যাম্পে যাও? এমন টেনশনে কি ফেলতে পারবে আমাদের?" 

" না না।" তুমি ভয় পেও না দাদা। বাড়ির দলিলের বন্দোবস্ত করে আমরা আমাদের বস্তিতে ফিরে আসব৷ চিন্তা হয় শিব্রামবাবুকে নিয়ে।" 

"তাকে নিয়ে আবার কিসের চিন্তা?" হর্ষবর্ধন মাথা নেড়ে বলেন, "তার আবার চিন্তা কী? তার পিছুটান বলতে তো বোন আর ভাইপোরা। সম্পত্তি বলতে তার আছে কী? ওই বইগুলো? সে নাহয় বই নিয়েই উনি বাংলাদেশে ফিরে যাবেন। এমনিও এখানে কেউ পড়ে না৷" 

"এমন বোল না৷ বন্ধু হয় কিনা আমাদের? তার জন্যেও নাহয় একটা কাগজ বের করে ফেলি আমরা। বলব, উনি হলেন বৌদির ভাই। কেমন হয়?"
"মন্দ বলিসনি তা। তবে এইসব ঝক্কি আমার পোষায় না বাপু। এইসব বন্ধ করলেই ভাল হয় সবথেকে৷ মোদীর জন্যে আমোদই করতে পারছি না শান্তিতে৷" 

"ঠিক বলেছ দাদা। তোমার সর্বধর্ম সমন্বয়ের পরিবর্তে এই ধর্মসর্বস্ব ঝঞ্ঝাট। এ কি ভাল লাগে বল?"

শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

ফ্যাসিজম সম্পর্কে দুটো একটা কথা যা আমি জানি ~ বিষাণ বসু

১. সর্বত্রই, ফ্যাসিস্টরা শাসনক্ষমতায় আসেন বিপুল জনসমর্থন নিয়ে - অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভোটে জিতে বা তেমনই কোনো "গণতান্ত্রিক" পদ্ধতিতে। জনসমর্থন আদায়ের পরেই সেই সমর্থন যে কোনো দলের পক্ষে নয়, স্রেফ একজন শাসকের প্রতি - যিনি সমর্থনকে একটি বিশেষ আইডিওলজির প্রতি সমর্থন ও ফ্যাসিস্ট লীডার ব্যক্তিটি যে সেই আইডিওলজির সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি - এই ভাবনার নির্মাণপ্রক্রিয়ার শুরু হয়।  

২. "গণতান্ত্রিক" পদ্ধতিতে নির্বাচিত হলেও, ফ্যাসিবাদী সরকার যত দ্রুত সম্ভব গণতন্ত্রের পরিসরটি সঙ্কুচিত করে ফেলেন। 

৩. ক্ষমতায় আসার সময় তো বটেই, ক্ষমতায় থাকাকালীনও, দেশের একটা বড়ো অংশের মানুষ ফ্যাসিবাদী সরকারকে সমর্থন করেন।

৪. এই সমর্থকদের বেশীর ভাগই সরকার যে ফ্যাসিস্ট, সেইটা চিনে উঠতে পারেন না - তাঁদের সমর্থনের যুক্তি থাকে বিভিন্নধরনের - এইভাবে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন যুক্তিক্রম নিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের সমর্থনে থাকেন, অনেকসময় নিজের অজ্ঞাতেই। তাছাড়া, ফ্যাসিস্ট শাসকমাত্রেই বহুরূপীর দক্ষতায় প্রয়োজন অনুসারে "যখন-যেমন-তখন-তেমন যাকে-যেমন-তাকে-তেমন" ধাঁচে নিজেদের মুখ্য এজেন্ডাকে লুকিয়ে উপযোগী পছন্দসই এজেন্ডা খাড়া করতে পারেন।

৫. এইসব সমর্থকেরা যুক্তিতর্ক বা আলোচনার পথ ধরে নিজেদের ভ্রান্তি সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন, এমন নজির নেই। যতক্ষণ না পর্যন্ত নিজেরাই ফ্যাসিবাদী আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, ততক্ষণ সমর্থন জারি থাকে। 

৬. একমাত্র ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর এঁদের সামনে পুরো ছবিটা স্পষ্ট হয় - এবং তখন এঁদের সম্বিত ফেরে - এই সমস্ত অপকর্মের সাথে নিজেদের সমর্থন জড়িত ছিল ভেবে যারপরনাই লজ্জিত হন - কিন্তু, সে অনেক পরের কথা।

৭. দেশপ্রেম আর ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয় - যদিও, দ্বিতীয়টি দাঁড় করানোর জন্যে প্রথমটির যুক্তি ব্যবহৃত হয়।

৮. ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদের রেটোরিক যেহেতু ঘৃণা আর বিদ্বেষ ছাড়া দাঁড়াতে পারে না, কাজেই শত্রুর নির্মাণ অনিবার্য - সে শত্রু, সাধারণত, দেশের বাইরের। কিন্তু, দেশের মধ্যেকার ঘৃণা আর বিভাজন ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্যসিদ্ধির মুখ্য উপায়। তাহলে? সমাধান, দেশের একটি বড় অংশকে দাগিয়ে দেওয়া হয় বিদেশী শত্রুর সহকারী হিসেবে। এইটা একটা উপায়।

৯. স্বচ্ছলতার মুহূর্তে ফ্যাসিবাদের উত্থান হয় না - হয়, আর্থিক সঙ্কটের পরিস্থিতিতে। সেই সঙ্কটের পরিত্রাণের পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় দেশের একটা অংশের মানুষকে শায়েস্তা করা - দেশের মধ্যে ঘৃণা আর বিদ্বেষ জিইয়ে রাখার এ আরেক পথ।

১১. ফ্যাসিবাদী প্রবণতার প্রতিবাদ করতে গেলেই অতীত টেনে উদাহরণ দেওয়া ফ্যাসিস্ট শাসক ও তার সমর্থকদের বড় অস্ত্র - সে উদাহরণ প্রায়শই কাল্পনিক, অতীত প্রায়শই নির্মিত - বর্তমানের ভয়াবহতা ভোলাতে শোনানো হয় দেশবিদেশের ততোধিক ভয়াবহতার গল্প - শাসক সবসময়ই নিশ্চিত থাকেন, জনগণের স্মৃতি বেশীদিন টেকে না - আর সমর্থকদের কথার সুর দেখে সেই নিশ্চয়তা যে কতোখানি বাস্তবসম্মত, তার প্রমাণ মেলে।

১২. ইতিহাস তো বটেই, একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, এমনকি আর্থসামাজিক পরিসংখ্যান বা তথ্যও এমন সুচতুর দক্ষতার সাথে নির্মিত হয় - নিতান্ত গভীর অনুসন্ধানের মানসিকতা ব্যতীত বাস্তব পরিস্থিতির আন্দাজ পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। আর, অর্থনৈতিক দুরবস্থা নেহাতই প্রকট হয়ে গেলে, অতীত রাজনীতি বা নির্মিত শত্রুকে দায়ী করার পথ তো থাকেই। 

১৩. ফ্যাসিজমের প্রতিবাদ মানেই দেশের বিরুদ্ধে যাওয়া - প্রতিবাদী মাত্রেই রাষ্ট্রদ্রোহী - রাজনৈতিক বিরোধী মানেই দেশের শত্রুর এজেন্ট - ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মানেই দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দেওয়া - এই সব প্রচারই ফ্যাসিবাদের সনাতন কার্যপ্রণালী ও বহুপরীক্ষিত অস্ত্র।  

১৪. শিক্ষিত ও চিন্তাশীল মানুষদের একাংশ ফ্যাসিস্ট শাসকদের পাশে থাকলেও, তাঁদের গরিষ্ঠ অংশই দাঁড়ান বিপরীতে। অতএব, উচ্চশিক্ষিত ও চিন্তাশীল মানুষেরা যে আদতে দেশের কাজে আসেন না, সেই বার্তা বিভিন্ন পথে আমজনতার মনে ঢোকাতেই হয় - কায়িক শ্রমই দেশের উন্নতির চাবিকাঠি ও মানসিক শ্রম বা বিদ্যাচর্চা অলস সময়যাপন মাত্র - এই এজেন্ডা ফ্যাসিস্ট শাসকের বড় অস্ত্র।

১৫. দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের বৃহদংশ শাসকের পাশে থাকেন - সংবাদমাধ্যম বা তদনুসারী পথ তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন ও শাসকের পক্ষে প্রচার জারি রাখেন - অন্তত ততোদিন পর্যন্ত, যতোদিন না দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এমন তলানিতে ঠেকছে যাতে তাঁদের ব্যবসার বাজার সঙ্কুচিত হতে হতে একেবারে শেষ দশায় পৌঁছায়।  

আপাতত, এই ক'টা পয়েন্ট নিয়ে ভাবতে থাকুন।

মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২০

বর্গী এলো দেশে ~ অনির্বাণ অনিক

চাইর দিকে লোক পলাঞ ঠাঞি ঠাঞি।
ছর্ত্তিস বর্ণের লোক পলাএ তার অন্ত নাঞি।।
এইমত সব লোক পলাইয়া জাইতে।
আচম্বিত বরগি ঘেরিল আইসা সাথে।।
মাঠে ঘেরিয়া বরগী দেয় তবে সাড়া।
সোনা রুপা লুটে নেএ আর সব ছাড়া।।
কারূ হাত কাটে কারূ নাক কান।
একি চোটে কারূ বধএ পরাণ।।
ভাল ভাল স্ত্রীলোক জত ধইরা লইআ জাএ।
আঙ্গুষ্ঠে দড়ি বাঁধি দেয় তার গলাএ।।
একজনে ছাড়ে তারে আর জনা ধরে।
রমনের ভরে ত্রাহি শব্দ করে ।।'

কার লেখা জানেন? কোন ঘটনার বর্ণনা জানেন? পলাশী যুদ্ধের বহু বছর আগে এক বাঙালি কবি গঙ্গারামের লেখা। "হিন্দু পাদ পাদশাহী" অর্থাৎ হিন্দু সাম্রাজ্য গড়ার নামে মারাঠা ভাস্কর পণ্ডিত এবং তার দলবলের বর্গী আক্রমণে সেদিন সমগ্র  বাংলাদেশ  ও বাঙালি ছারখার হয়ে গিয়েছিল। বার বার বাংলা আক্রমণ করে কত বাঙালিকে যে খুন করেছিল, কত বাঙালি নারীকে যে ধর্ষণ করেছিল, কত লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ লুঠ করেছিল তার ইয়ত্তা নেই। একবার না , বার বার। বাংলার গ্রামে গ্রামে, মাঠে প্রান্তরে বছরের পর বছর তাদের আক্রমণে  নেমে এসেছিল শ্মশানের স্তব্ধতা। ৪ লক্ষ বাঙালির খুনে সেদিন লাল হয়ে গিয়েছিল বাংলার প্রান্তর। কয়েক সহস্র বাঙালি মহিলাকে লুঠ করে "হিন্দু পাদ পাদশাহীর" যোদ্ধারা যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সেদিনের বাঙালি কবি গঙ্গারামের বর্ণনায় প্রতিফলিত হয়েছে সেদিনের নির্মম বাস্তবতা।  "খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে/বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে" গানে মায়ের আকুতিতে ধরা পড়েছে সেদিনের বাঙালির অসহায়তা। 

অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই, বিদেশী আক্রমণকারীর ধর্ম দেখে "মুসলিম" বিচার করে নির্মমতার যে বিবরণ জনমানসে খাড়া করা হয় তার ১% শিহরণের ন্যারেটিভ "হিন্দু পাদ পাদশাহীর" নির্মমতার ক্ষেত্রে কোনদিন তৈরী করা হয়নি। 

শনিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২০

প্রোটোকল ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য


দিল্লির  রাজা,সঙ্গে পেয়াদা সাথে সভাসদবর্গ
হবিদা বলেন আপনি তো স্যার ভারতবাসীর গর্ব।
এগোচ্ছে দেশ হইহই করে আপনি একাই একশো 
আরে রামরাম সিপিএম বাম হারামির হাতবাক্স।
দিলুদা হবিদা করে খুনসুটি ধনকর পান দুঃখ 
ভাবেন এসব ইনসাল্টিং কাঁটা বেধে অতি সূক্ষ্ম। 
ওদিকে তখন কিছু তিনোমূল গড়িয়াহাটার মঞ্চে
রাজাজি হাঠাও স্লোগান তুলেছে বিরিয়ানি খেয়ে লাঞ্চে।
রাজাজি শুধালো হাকিম সাহেব এসব যা শুনি সত্যি
হবিদা বলেন এসব গুজব নিউজ পেপার ভর্তি।
আছে সি বি আই, সাথে দেশি গাই দিলুদার মুখে স্বস্তি 
বিরোধীরা পাজি অপবাদ দেয় এসব সেটিং দোস্তি।
কত গ্যাড়াকল সাথে প্রোটোকল রাজভবনের কক্ষে
বাবু বলিলেন বুঝেছ উপেন পানি এসে যায় চক্ষে।।

সব চরিত্র কাল্পনিক 😐

দিল্লী পুলিশ ~ সমীক মুখোপাধ্যায়

প্রফেটের কাছে ক্ষমা চেয়ে - 

(যদি) দিল্লি পুলিশ নাচে-
খবরদার এসো না কেউ হেড আপিসের কাছে ;
চাইবে নাকো ডাইনে বাঁয়ে চাইবে নাকো পাছে ;
চার পা তুলে থাকবে ঝুলে পদ্মফুলের গাছে !

      (যদি) দিল্লি পুলিশ আসে-
      খবরদার! খবরদার! গ্রন্থাগারের পাশে
      টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটবে, লাঠির বাড়ি কাঁধে ;
      দু হাত তুলে বলতে হবে, 'জয় শ্রীরাম' আর 'রাধে' !

(যদি) দিল্লি পুলিশ হাঁচে -
আনুগত্যের ছাপ পড়বে হস্টেলের ঐ কাচে ;
মুখের ওপর রুমাল বেঁধে আসবে এবিভিপি ;
মাথার খুলি দু-ফাঁক হলেও উদাস দিল্লি-সিপি।

      (যদি) দিল্লি পুলিশ ছোটে-
      সবাই যেন তড়বড়িয়ে জানলা বেয়ে ওঠে ;
      ভাবলে কথা শাহীন বাগের চলবে নাকো মোটে;
      ভবিষ্যতের গাঁড় মারবে এফআইআরের চোটে !

 
(যদি) দিল্লি পুলিশ ডাকে-
সবাই যেন জগ্‌গু ভিসির পায়ের নিচে থাকে ;
দেশপ্রেমের ঘণ্ট বেটে মাথায় মলম মাখে ;
গরম চাটু ঘষতে থাকে অমিত শাহের নাকে !

      তুচ্ছ ভেবে এ-সব কথা করছে যারা হেলা,
      দিল্লি পুলিশ জানতে পেলে বুঝবে তখন ঠেলা ।
      দেখবে তখন কোন্‌ কথাটি কেমন করে ফলে,
      আমায় তখন দোষ দিওনা, আগেই রাখি বলে ।

হিন্দু রাষ্ট্র ~ মধুশ্রী বন্দোপাধ্যায়

আমি চাই না ভারতবর্ষ হিন্দু রাষ্ট্র হোক। 

আমি চাই না ভারতবর্ষ হিন্দু রাষ্ট্র হোক, কারণ আমি এই দেশকে ভালবাসি। 

আমি ভালবাসি এই দেশের প্রাচীন দর্শন, তার ইতিহাস, তার প্রাগিতিহাস। ভারতবর্ষের ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, জাতি, জ্ঞান - কোনকিছু একমুখী নয়। একরূপ নয়।

ধর্মে সে একেশ্বর, নিরীশ্বর, বহু-ঈশ্বরবাদী। বৈদিক উপনিষদ ও বেদ-বিরোধী বৌদ্ধধর্ম, দুই দর্শনেরই জন্ম ভারতবর্ষ। 

আর হরপ্পার মূর্তিপূজা মিশ্রিত হয়ে গেছে মূর্তিপূজাহীন বৈদিক দর্শনের সাথে। তার সাথে এসেছে চার্বাকপন্থী লোকায়ত দর্শন।

যখন এই দেশে জ্ঞানচর্চার পথ ছিল সুগম তখন আরও বিভিন্ন চিন্তার সমাবেশ হয়েছে। তারা শুধু বিশ্বাস করত না। তারা গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চাইত। জানতে চাইত, উত্তর খুঁজত পৃথিবীর প্রাচীনতম, জটিলতম প্রশ্নগুলির। 

মানুষ তখন জীবনে ইচ্ছামত ধর্ম পরিবর্তন করতে পারত। এই দেশের প্রথম রাজারা বারেবারে ধর্ম পরিবর্তন করেছে। অশোক করেছে, তার বাবা করেছে, তার ঠাকুরদা করেছে। 

ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে মারবার দুই হাজার বছর আগে এই দেশে এক মহাপুরুষ উচ্চারণ করেছেন, 'এই মহাবিশ্ব এক continuum, আগে ছিল, এখনো আছে।' তার জন্য তাকে কেউ পুড়িয়ে মারে নি। 

এই দেশে কোন কিছু একমুখী নয়, পড়তের উপরে আছে পড়ত। 

এদের সবাইকে নিয়ে ভারতবর্ষ টিঁকে আছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বন্ধ হলে, আলোচনা ও চর্চা বন্ধ হলে সেই দেশ শুকিয়ে যাবে। 

ভারতবর্ষের মানুষের শরীরে আছে আফ্রিকান শিকারী-সংগ্রাহক, ইরানীয় শিকারী-সংগ্রাহক, ইন্দো-ইউরোপীয় পশুপালক, অস্ট্রো-এশিয়াটিক কৃষিজীবী, তিব্বতী-বর্মী মাতৃতান্ত্রিক গোষ্ঠীর জীন।
এই উপমহাদেশ ছাড়া এতো মিশ্রণ পৃথিবীর কোন দেশে, কোন অঞ্চলে নেই। 

এই দেশের মানুষ কথা বলে আদিম প্রোটো -জারোয়া, প্রাচীন দ্রাবিড়ীয়, সুললিত বৈদিক সংস্কৃত, অস্ট্রো-এশিয়াটিক, সিনো-তিব্বতী ভাষায়।

প্রশ্ন চাই, প্রশ্ন বন্ধ করা যায় না।

জাবালি প্রশ্ন করেছেন, বুদ্ধ করেছেন, মহাবীর, চার্বাক ও আজীবিক মতবাদ প্রশ্ন করেছে। যেই দেশ, যেই জীবনচর্চা, যে ধর্ম, যে জাতি প্রশ্ন করে না, শুধু মেনে নেয়, শুধু বিশ্বাস করে তার ধ্বংস অনিবার্য। আজ না হয় কাল।

হিন্দু রাষ্ট্র, ধর্ম রাষ্ট্র ভারতবর্ষকে করে তুলবে মৌলবাদী, এক মুখী। তখন প্রশ্ন উঠবে নারীদের নিয়ে, জ্ঞানের চর্চা নিয়ে, জাত নিয়ে, খাদ্যাখাদ্য নিয়ে। আমি সেই ভারত চাই না।

আমি ভারতবর্ষের ধ্বংস চাই না। 

আমি ভারতবর্ষের সাথে পাকিস্তানের তুলনা চাই না। পাকিস্তান এক দুর্ভাগা দেশ। তার দুই নোবেল লরিয়েটকে সে দেশ থেকে তাড়িয়েছে। তার মা-বোনেরা কাপড়ের আড়ালে বন্দী। আমি তাদের প্রতি গভীর সহানুভূতিশীল। আমি চাই না আমার দেশের মেয়েরা ধর্মের নামে বন্দী হোক।

উল্লেখ করছি নবম শতকের জৈন দার্শনিক জীনসেনের উক্তি, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাজাগতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান তার গ্রন্থ কসমসে এটি উল্লেখ করেছেন -

" Some foolish men declare that a creator made the world. The doctrine that the world was created is ill-advised, and should be rejected. If god created the world, where was he before creation? If you say he was transcendent then, and needed no support, where is he now? "

নবম শতকের ভারতীয় দার্শনিক যিনি প্রচলিত মতবাদ, গতেধরা চিন্তার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, আমেরিকান জ্যোতির্বিদ বিংশ শতকে বই লিখেছেন তার উক্তি স্মরণ করে, কোন ইউরোপীয়র নয়। 

এটাই ভারতের শক্তি; যেদিন থেকে সে ধর্ম রাষ্ট্র হবে সেদিন থেকে সে পিছন  দিকে হাঁটতে থাকবে। 
যেমন এখন হাঁটছে, প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম পীঠস্থান - কত আশা জাগানো আতার্তুকের তুরস্ক।  

সকল মানুষকে প্রশ্ন করতে হবে - রাষ্ট্রকে, অবিজ্ঞানকে আর সবচাইতে বেশি করে করতে হবে নিজেকে।

Madhusree Bandyopadhyay
11/01/2020

রবিবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২০

এনারসি ~ ডঃ কৌশিক দত্ত

সাগরমেলার আগে বাবুঘাটে একটা  ক্যাম্প হয় সন্ন্যাসী আর তীর্থযাত্রীদের জন্য। সেখানে আমি যাই সুযোগ পেলে। আগে যেতাম ভারত চিনতে। এখন তার সঙ্গে অন্য কিছু আকর্ষণও থাকে। সেখানে বাবাজি আসেন প্রায় প্রতিবছর। আমার যে গণিতজ্ঞ বন্ধুটি তাঁর বিশেষ অনুরক্ত, তিনি খবর দেন, "বাবাজি এসে গেছেন।" মানুষটির সারল্য এবং সদানন্দ ভাব আমাদের টানে। ঝাঁকড়া কোঁকড়ানো চুল, এলোমেলো দাড়ি। গায়ে ময়লা চাদর। ক্যাম্পের ভেতরে যেখানে আরামদায়ক তাঁবু হয়, সেখানে থাকেন না। ক্যাম্পের ঠিক বাইরে একটা গাছতলায় খড় বিছিয়ে ধ্যানাসনে বসে থাকেন। সেখানেই রাত্রিবাস। মনকে স্থির করার জন্য এনার গঞ্জিকা প্রয়োজন হয় না, যোগের মাধ্যমেই পারেন। মেলার ক্যাম্পে তীর্থযাত্রীদের জন্য খাবারের বন্দোবস্ত থাকে। কেউ রুটি তরকারি এনে দিলে খান মাঝেমাঝে। অন্য কোনো সামগ্রী গ্রহণ করতে দেখিনি। একবার একজন একটা কম্বল দিয়েছিল লাল রঙের ফুল আঁকা। শীতের রাতে তিনি সেটা আমাকে দিয়েছিলেন। গায়ে দিয়ে বাড়ি চলে যাও, পরে অন্য কাউকে দিয়ে দিয়ো। এই ছিল নির্দেশ। আমি কম্বল গায়ে মেট্রোয় চড়েছি সেই একবারই। বাবাজি কথা বলেন খুব কম লোকের সঙ্গে৷ ঘটনাচক্রে আমাদের সঙ্গে বলেন। কথাগুলো সাধারণ্যে আলোচ্য নয়। 

এন আর সি হলে বাবাজির নাম উঠবে না, কারণ তাঁর কোনো কাগজই নেই। গোবর্ধন অঞ্চলে একসময় একটি আশ্রম কুটির বানিয়েছিলেন। সেটা ঝড়ে ভেঙে যাবার পর ওঁর মনে হল কৃষ্ণ বলছেন, এসব ঘরদোর ভালো না। প্রকৃত গৃহত্যাগী সন্ন্যাসীকে নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র দেবার হিম্মত রাষ্ট্রের এখনো হয়নি। কিন্তু তাঁর দেশ, মাটি, আকাশ কেড়ে নেবার ক্ষমতা অবশ্যই আছে। এন আর সি হলে বাবাজি কয়েদ হবেন। "সি এ এ", যা নাকি হিন্দুদের রক্ষাকবচ, তা এই হিন্দু সন্ন্যাসীর কাজে আসবে না, কারণ তিনি বাঙলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে আসেননি। তিনি জন্মসূত্রে ভারতীয়। 

"তাহলে কী হবে বাবাজি?" 

"কিষণ ভগবান জানে।" হাসেন বাবাজি। "আরে বো কানহাইয়া বড়া অটোমেটিক হ্যায়। সব জান লেতা হ্যায়।"

বোঝা গেল। সন্ন্যাসীর প্রাণে ভয় নেই, কারণ সেখানে কৃষ্ণ আছেন। হয়ত কারাগারেই তিনি কৃষ্ণের সাক্ষাৎ পাবেন, যেমন পেয়েছিলেন দেবকী-বসুদেব। কারাগারটি যে আদতে কংসের, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকবে না। কারাগারে কৃষ্ণ আবির্ভূত হলে কংসের কী গতি হয়, তাও আমরা জানি। তবু আমরা সামান্য মানুষ। বাবাজির জন্য চিন্তা হয়। যদি দেখি এন আর সি-র পর আর তিনি সাগরমেলায় আসছেন না… 

ও হরি! তখন আর কেই বা আসবে মেলায়? তীর্থযাত্রীদের যা দেখেছি এত বছর ধরে, কটা কাঠকুটো বস্তায় নিয়ে গঙ্গা মাঈয়ার ভরসায় বেরিয়ে পড়েছে রাজস্থানের গ্রাম থেকে… কীভাবে ফিরবে জানে না, কাগজপত্র না থাকায় এরা অনেকেই পাকিস্তানি বলে চিহ্নিত হবে। সন্ন্যাসীদের কথা তো ছেড়েই দিলাম। নিরঞ্জনী আখড়া, জুনা আখড়া, ভোলা গিরির আশ্রম উজাড় হয়ে যাবে। হৃষিকেশ, বদ্রিনাথ, নর্মদার তীর থেকে পুলিশ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে সহস্র সন্ন্যাসীকে। থাকবে শুধু মোদী-আম্বানি-আদানি-শাহী। আমেরিকা, সৌদি আরব থেকে তাঁরা আমদানি করবেন শকুন। রপ্তানি করবেন ভারতবর্ষ।

রবিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৯

সত্যি কি বহু বাঙালি অনুপ্রবেশকারী? ~ বাঁচার লড়াই

সত্যি কি বহু বাঙালি অনুপ্রবেশকারী?? Census কি বলে??

যদি পশ্চিমবঙ্গে গত ৩-৪দশক ধরে কোটি কোটি লোকজন ঢুকে কার্ড পেয়ে বসবাস শুরু করে থাকেন তাহলে এই রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার  (population growth rate) সারা দেশের তুলনায় বেশি হত, তাই তো? হিন্দু বাঙাল অথবা মুসলমান কারুর না কারুর  জনসংখ্যা তো খুব বাড়বে? কারণ  তাহলে জন্ম-মৃত্যু বৃদ্ধি ছাড়াও immigrationর জন্যেও অনেকটা যোগ হবে। তাই না?? ...এইটা এমন একটা hypothesis যেটা সহজেই পরীক্ষা করা যায়.....😊... 
শীতের ছুটির দুপুরে এইটা একটু দেখাই যায়। census তথ্য তো হাতের কাছেই আছে.... 😊 গুগল থেকে বেরোল 1981, 1991, 2001 আর 2011র census। আর ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে রিপোর্ট।

পশ্চিম বঙ্গ জনসংখ্যা:
1981: 54580647.
1991: 68077965
2001: 80176197
2011: 91276115

বৃদ্ধির হার: 
(1981-91) : 24.7%;  (1991-2001) :17.8%;  (2001-2011) :13.8%. 
কি দেখছেন? হার বাড়ার কোন লক্ষণ নেই। দিব্বি কমছে। গত তিন দশক ধরে কমছে। 

আচ্ছা , বাঙালি হিন্দুরা? তাদের জনসংখ্যা  কেমন?
1981: 42005266
1991: 50866624
2001:58104835
2011: 64385546
বাঙালি হিন্দুর বৃদ্ধির হার কেমন?
(1981-91) 21.1%; 
(1991-2001) 14.2% ;  (2001-2011)  10.8 %. 
আবার দেখুন। কমছে। গত তিন দশক ধরে কমছে। কুড়ি বছরে 21 থেকে 10এ নেমেছে। 

মুসলমানগুলোর দেখি। জনসংখ্যা
1981: 11740297
1991: 16075836 
2001: 20240543
2011: 24654825 
বাঙালি মুসলমানের বৃদ্ধির হার?
(1981-91) 36.9%; 
(1991-2001)  25.9% ;  (2001-2011) 21.8 %. 
এও কমছে! 36 থেকে 21শে নেমেছে।

এবার এর পাশে সারা দেশের হিসেব ফেলুন। জাতীয় স্তরে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার।
1981 (24.1%), 1991 (22.7%), 2001 (19.9%), 2011 (16.8%) 
মুসলমানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার।
1981 (30.9%), 1991 (32.9%), 2001 (29.5%), 2011 (22.6%)

কি দাঁড়াল ব্যাপারটা? ওরা যতই বলুক, 

১. গত ৩০-৪০ বছরে ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিশ্চিতভাবে কমছে।  কোন সন্দেহ নেই।

২.   গত ৩০-৪০ বছরে পশ্চিমবঙ্গ'র  জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সর্বভারতীয় গড়ের থেকেও বেশি কমেছে।  জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পশ্চিম বঙ্গ একদম one of the best. 

৩. বাঙালি হিন্দু আর বাঙালি মুসলমান দুজনেই জাতীয় গড়ের থেকে কম । 1991 থেকে বাঙালি হিন্দুরা ব্যাপারটা কন্ট্রোল আনতে ভাল শুরু করেছেন, 2001 থেকে বাঙালি মুসলমানরা। আর এটা কিছুটা বোঝাও যায়। উত্তর ভারতের অনেক লোকের থেকে বাঙালি ঘরে কম ছেলেমেয়ে হয় কি না?না না কারনে বাঙালি এই বিষয়ে বেশি সচেতন, সে তো নিজেদেরকেই আমরা চিনি।

৪.  কোটি কোটি লোক বর্ডার পার করে এলে ফলাফল যে অন্য রকম হত বুঝতেই পারছেন।

৫. যাদের ঝগড়া লাগানো কাজ তারা বলতেই পারে যে বর্ডারের পাশের জেলাগুলো'র জনসংখ্যা ভাল করে দেখতে হবে।আচ্ছা, তাই হোক।  পরিসংখ্যান তো আছেই। প্রথমেই যেটা নজরে আসে সেটা হল এই জেলাগুলির কোন নির্দিষ্ট প্রবণতা নেই। কোন কোন জেলায় বৃদ্ধির হার পশ্চিমবঙ্গের গড় হারের থেকে বেশি ( যেমন উত্তর দিনাজপুর, মালদা ); কোন কোন জেলায় গড় হারের চেয়ে কম  ( যেমন নদীয়া, দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার ). আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, যে জেলায় হিন্দুদের বৃদ্ধির হার বেশি, সেখানে মুসলমানদের বৃদ্ধির হার ও বেশি; যেখানে হিন্দুরা কম সেখানেও মুসলমানরাও কম।  

৬. এই বৃদ্ধির হার কি ভাবে কমে যাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গের গড় মহিলার total fertility rate (এক মহিলার জীবনে কটা ছেলেমেয়ে হয়) দেখলেও বোঝা যায়। গোটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। এই ব্যাপারে কেরলা যে  আরেক দারুন সচেতন রাজ্য সবাই জানি। এই দেখুন । পাশাপাশি পঃবঃ, কেরলা আর উত্তর প্রদেশ দেখুন। 

হিন্দু TFR: wb (1.64), up (2.67), kerala (1.42), India (2.13)

মুসলমান: wb (2.08), up (3.10), kerala ( 1.86), India (2.61)। UP (আর বিহার , রাজস্থান...) উচিত বাঙালি আর মালায়লিদের  দেখে শেখা!! আমরা সব ব্যাপারেই মুসলমানদের দোষ দিই। কিন্তু দেখুন, বাঙালি মুসলমান মহিলার চেয়ে বেশি বাচ্ছা হয় UP হিন্দু মহিলার !!

৭. তাহলে ব্যাপারটা ধর্মভিত্তিক নয়। রাজ্য ভিত্তিক। পড়াশোনা, মহিলাদের শিক্ষা, রাজ্যের সার্বিক চিন্তাভাবনার পরিবেশের সঙ্গে চলে। সারা পৃথিবী জুড়ে who আর unicef  জানিয়েছে যে যত মহিলারা  শিক্ষিত হবেন, কাজকর্ম চাকরিবাকরি করবেন তত এক গাদা ছেলেমেয়ে হওয়া কমে যাবে। আর দেখুন, পঃবঃ আর কেরলা সেই প্রগতিশীল পথেই হেঁটেছে। আর বাঙালি মুসলমানরা যে এখনো পিছিয়ে আছে তার অন্যতম কারণ মহিলাদের মধ্যে অশিক্ষার হার এখনো বেশি । তবে শিক্ষা বাড়ছে। বাইরে বেরোচ্ছেন। পরিবারের দায়িত্ব নিচ্ছেন। censusএ তার ফল দেখাই যাচ্ছে। একই জিনিস পঃবঃ 'র জেলাগুলির জন্যেও প্রযোজ্য।  মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর গড় শিক্ষার হার কম; অন্য জেলায় বেশি।  আর এ বিষযে বেস্ট হল কলকাতা - শিক্ষার হার সর্বোচ্চ, হিন্দু এবং মুসলমান দুজনেরই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে কম; কলকাতার  মুসলমানদের তো  হিন্দুদের থেকেও কম! 

৯. তার মানে কি এই যে কেউ আসেনি? নিশ্চয়ই এসেছেন। পেটের দায়ে এসেছেন । আত্মীয়স্বজন ডেকেছেন চলে এসেছেন। আর বাঙালি তো দুবার দেশভাগ-ভোগা জাত, এই কষ্ট আর কে বুঝবে?? কিন্তু, যাবতীয় সমীক্ষা পরিষ্কার দেখিয়ে দিচ্ছে যে এমন বিশাল সংখ্যায় কেউ আসেননি যে পশ্চিমবঙ্গের জনমানচিত্র আমূল পাল্টে যাবে। ওটা ভোটের জন্যে ঢপ! ওই 15 লাখ আর গরুর দুধে সোনার মত আরেকটা গাঁজা! তাই, বাঙাল-ঘটি-বামুন-লেড়ে -কায়েত-বদ্যি-নমশূদ্র সবাইকে অনুপ্রবেশকারী না বলে নিজেরা তো ভাল করে নিজের রাজ্যে বার্থকন্ট্রল করতে পারে !!

রবিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৯

ফ্যাসিবাদ এবং প্রফেসর শঙ্কু! ~ সংগ্রাম চ্যাটার্জী

এই শীতের মরসুমে যখন গোটা দেশ ক্রমাগত জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদের কালো ছায়ার মোকাবিলায় উত্তপ্ত হচ্ছে ক্রমাগত, ঠিক সেই সময়েই রিলিজ করল প্রফেসর শঙ্কু'র এল ডোরাডো! ফলে এই সময়েই এই লেখাটা পোস্ট করতে ইচ্ছে হল। মূল লেখাটা অনেক বড়, প্রকাশিত হয়েছিল এই বছরের শারদীয়া পর্বে। সেটাকেই কেটে ছেঁটে এইটে হল। এটাও কম বড় না! তাও পারলে পড়েই দেখেন...

১)
স্বর্ণপর্ণী ১

"মাই ডিয়ার শঙ্কু— তোমার মহৌষধ বিশ্বের হীনতম প্রাণীর উপকারে আসবে এটা আমি চাইনি, চাইনি, চাইনি।"
চেনা অংশ? না চিনতে পারলে বলেই দিই— এটা সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত শঙ্কু কাহিনী 'স্বর্ণপর্ণী' থেকে নেওয়া। গল্পটা কার্যত শেষ হচ্ছে এই কথাটার পরেই। 
গল্পটা যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের বিরক্তির উদ্রেক না করেই যাঁরা পড়েন নি এখনও— তাঁদের জন্যে একটু বলে দেওয়া ভালো—
প্রেক্ষাপটে ১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাস, অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর ঠিক কিছুটা আগে। ফ্যাসিস্ট হিটলারের নাৎসী বাহিনী তখন জার্মানির একচেটিয়া শাসক। জার্মানি জুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে ইহুদীদের চিহ্নিত করে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানানোর কাজটা! সেই সময়ে জীবনদায়ী ওষুধ 'মিরাকিউরল' আবিষ্কারের পর জার্মানি গিয়ে তা দিয়ে এক জার্মান ইহুদী অধ্যাপকের জীবন বাঁচান প্রফেসর শঙ্কু। খবরটা জানাজানি হতেই ব্ল্যাকশার্ট বাহিনীর মাধ্যমে খোদ গোয়রিং (নাৎসী বাহিনীর 'নাম্বার টু', হিটলারের পরেই যার স্থান!) তুলে নিয়ে যায় শঙ্কুকে। উদ্দেশ্য— নিজের চিকিৎসা, এবং ঐ মহৌষধ নাৎসী বাহিনীর কুক্ষিগত করা। সেই পরিস্থিতিতে কীভাবে ঐ ইহুদী পরিবারটিকে দেশত্যাগ করতে সাহায্য করে তাদের জীবন রক্ষা করলেন, কীভাবে নিজের জীবন বাঁচালেন এবং সর্বোপরি কীভাবে গোয়রিং এবং গোটা নাৎসি বাহিনীকে ঐ মহৌষধ 'মিরাকিউরল' দেওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেলেন প্রফেসর শঙ্কু— এই নিয়েই এই গপ্পো!
প্রথমে যে অংশটা কোট করেছি সেটা আরেকবার পড়ে দেখুন। ফ্যাসিস্টদের সম্পর্কে সত্যজিৎ লিখছেন— "বিশ্বের হীনতম প্রাণী"।

২)
ফেলুদা এবং প্রফেসর শঙ্কু

এটা ঠিকই যে বাঙালি পাঠকের কাছে তুলনায় সত্যজিতের ফেলুদা কাহিনী অনেক বেশিই জনপ্রিয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে প্রথম শঙ্কু কাহিনী 'ব্যোমযাত্রীর ডাইরি' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬১ সালে, অর্থাৎ ফেলুদারও আগে। এর ঠিক পরে পরেই প্রকাশ পেয়েছিল ছোটদের জন্যে লেখা গল্প 'বঙ্কুবাবুর বন্ধু'। তার আরো প্রায় বছর চারেক পর আত্মপ্রকাশ ঘটে ফেলুদার।
ফেলুদার কাহিনীগুলোয় সরাসরি রাজনীতি প্রায় আসেনি বললেই চলে। যেটুকু এসেছে সে' একমাত্র 'টিনটোরেটোর যীশু'তে। কিন্তু সেটাও ঐ একইভাবে ফ্যাসিস্ট এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েই। তবে এখানে জার্মানি আর হিটলারের বদলে পটভূমিকায় ইতালি, অর্থাৎ মুসোলিনি।
যাঁরা ঐ উপন্যাসটা পড়েছেন, তাঁদের পক্ষে মনে করা সহজ যেখানে ঐ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র চন্দ্রশেখর সম্পর্কে বলতে গিয়ে ভগওয়ানগড়ের রাজা ভূদেব সিং বলছেন—
"মুসোলিনি তখন ইটালির একচ্ছত্র অধিপতি। বেশির ভাগ ইটালিয়ানই তাকে পুজো করে। কিন্তু কিছু বুদ্ধিজীবী— শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকার, সংগীতকার— ছিলেন মুসোলিনি ও ফ্যাসিস্ট পার্টির ঘোর বিরোধী। চন্দ্র ছিল তাদেরই একজন। কিন্তু তার ছেলেই শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়। তার এক বছর আগে কার্লা মারা গেছে ক্যানসারে। এই দুই ট্র্যাজেডির ধাক্কা চন্দ্র সইতে পারে নি। তাই সে দেশে ফিরে আসে। ছেলের সঙ্গে সে কোনও যোগাযোগ রাখেনি।"

সত্যজিৎ রায়ের ফেলু কাহিনীগুলোর মধ্যে এই  'টিনটোরেটোর যীশু'তেই একমাত্র ফ্যাসিবাদের প্রতি সত্যজিতের তীব্র ঘৃণা সরাসরি প্রকাশ পেয়েছে। আর সম্ভবতঃ কোথাওই না। অথচ ঠিক এর উল্টোদিকে আরেকটু কমবয়সীদের জন্য সৃষ্ট চরিত্র' প্রফেসর শঙ্কু'র একাধিক কাহিনীতে বারবারই এসেছে সত্যজিতের এই মনোভাব। মোট ৩৮ টা পূর্ণাঙ্গ এবং দুটি অসম্পূর্ণ শঙ্কু কাহিনীর খবর আমরা জানি। এর মধ্যে ঐ 'স্বর্ণপর্ণী' ছাড়াও আরো অন্ততঃ গোটা চারেক ক্ষেত্রে তা পরিষ্কার ভাবেই দেখা গিয়েছে।
প্রথম শঙ্কু কাহিনী 'ব্যোমযাত্রীর ডাইরি'র প্রায় ১৩ বছর পরে লেখা 'ডক্টর শেরিং-এর স্মরণশক্তি'তে সরাসরি ফ্যাসিবিরোধিতা না থাকলেও, শঙ্কু কাহিনীতে সম্ভবতঃ এই প্রথমবার সত্যজিতের যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের প্রকাশ দেখা গেল। 'বি এক্স ৩৭৭' নামক আণবিক মারণাস্ত্রের ফর্মুলা যুদ্ধ ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁচ্ছানোর আগেই কীভাবে সেই ফর্মুলা ধ্বংস করা সম্ভব হল— সেই নিয়েই এই গপ্পো।
এর ঠিক পরের শঙ্কু কাহিনীই 'হিপনোজেন', যেখানে প্রথমবার শঙ্কু মোকাবিলা করছে এক ভয়ংকর ডিক্টেটরের— উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আলেকজান্ডার ক্রাগ। বিজ্ঞানী, বা বলা ভালো অপবিজ্ঞানী। লক্ষ্য— একদিকে মৃত্যুর পরে পুনরুজ্জীবন, আবার আরেকদিকে সেই বেঁচে ওঠার এবং বেঁচে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে গোটা পৃথিবীর একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করা। যার হাতিয়ার— একটা আবিষ্কার, একটি গ্যাস। নাম হিপনোজেন। যে গ্যাসের একটিমাত্র কণা একজন মানুষকে ২৪ ঘন্টা সম্মোহিত বা হিপনোটাইজড্ করে রাখতে সক্ষম! আর সত্যিই তো, "লোকের মন একবার দখল করতে পারলে তাদের উপর কর্তৃত্ব করতে অসুবিধা কোথায়?"
অনবদ্য চরিত্রায়ণ এক ডিক্টেটরের। চেনা লাগছে না?

এর পরের একাধিক শঙ্কু কাহিনীতে সরাসরি ফ্যাসিস্টদের প্রতি মনোভাব চিত্রিত করেছেন সত্যজিৎ। যেমন ধরুন 'শঙ্কুর কঙ্গো অভিযান'। এখানে এক জায়গায় পরিষ্কার উল্লেখ আছে বুখেনওয়ালড্ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এবং সেই ক্যাম্পে ইহুদি বন্দিদের উপর অত্যাচারের। ঐ উপন্যাসেই শঙ্কুর জবানিতে লিখছেন সত্যজিৎ— "আমি অবাক হয়ে দেখছি হাইমেনডর্ফের দিকে। চোখে ওই ক্রূর দৃষ্টি, ওই ইস্পাত শীতল কন্ঠস্বর— একজন প্রাক্তন নাৎসীর পক্ষে মানানসই বটে।"

এর আরও প্রায় এক যুগ পরের লেখা 'শঙ্কু ও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন'। পটভূমি আবারও জার্মানি, এবং এবার ফোকাসে নিও-নাৎসীরা। আবারও দ্বন্দ্ব শুভ-অশুভের মধ্যে, এবং পরিশেষে নিও নাৎসী নেতা রেডেলকে নিও ফ্যাসিস্ট থেকে নতুন জীবনে পাঠানো, অমানুষ থেকে মানুষে রূপান্তরিত করা। যার পরিণতিতে শঙ্কুর জবানিতে লেখা হচ্ছে— "যতদূর মনে হয় হিটলারপন্থী দল এবার নিশ্চিহ্ন হবে।" 
এর বছর দুয়েক পরের লেখা 'স্বর্ণপর্ণী'।

৩)
স্বর্ণপর্ণী ২

'স্বর্ণপর্ণী' উপন্যাসটা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯০ সালে। এরপর আরও দুটো শঙ্কু কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু দুটোই অসম্পূর্ণ। ফলে এটাই শেষতম সম্পূর্ণ শঙ্কু কাহিনী।
ঘটনা পরম্পরা দেখলে আবার এটাই শঙ্কুর প্রথম কাহিনী! পুরোটাই ফ্ল্যাশব্যাকে বিবৃত। অন্য শঙ্কু-কাহিনীগুলো রোজনামচা আকারে, ডাইরির একের পর এক দিন ধরে এগিয়ে চলা কাহিনী। আর এইটেতে ডাইরির পাতা একটা দিনেই (১৬ জুন) আটকে, নিজের জন্মদিনে স্মৃতিচারণ করার ঢংয়ে বিবৃত গপ্পো।
জীবনসায়াহ্নে এসে স্মৃতিচারণা শঙ্কুর (বা হয়তো  সত্যজিতেরও)। এই স্মৃতিচারণার ফর্মেই লেখা হল শঙ্কুর সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী। কোনোরকম ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা না, সরাসরি ফ্যাসিস্ট জার্মানির কথা। সরাসরি সেই মানবতার শত্রুদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং সর্বোপরি সরাসরি "বিশ্বের হীনতম প্রাণী" ফ্যাসিস্টদের সামান্য একটু হলেও হারানোর কাহিনী। মানবতার জয়ের কাহিনী।
__________________________

সত্যজিৎ দেখে যেতে পারেন নি ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের দিনটিকে, যেদিনটা আমার দেশের ইতিহাসে এক মোটা কালো লাইন টেনে দিয়েছে। সত্যজিতের দেখার প্রশ্নই নেই এখনকার এই NRC-CAA'র পর্বটা। কিন্তু জেনেছিলেন ইহুদীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানানোর ন্যূরেমবার্গ আইনের কথা। দেখেছিলেন গোটা বিশ্ব জুড়ে নিও ফ্যাসিস্ট প্রবণতার সাময়িক হলেও মাথাচাড়া দেওয়াটাকে। দেখেছিলেন নিজের দেশে সংঘ পরিবারের ক্রমশ বাড়বাড়ন্তকে।

একেবারে ছোটদের জন্য লেখা শঙ্কু কাহিনী। সবচেয়ে বেশি দিন যারা থাকবে, সবচেয়ে বেশি লড়াই যাদের করতে হবে মানবতার শত্রুদের বিরুদ্ধে— তাদের জন্যে লেখা। তার জন্যই আরেকবার ইতিহাস থেকে শেখার জন্য এবং আশার পক্ষে, মানবতার পক্ষে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে ইতিহাস থেকে শেখার জন্যেই বোধহয় একদম শেষ লগ্নে 'স্বর্ণপর্ণী'র মত লেখাটা আসে...

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মিছিল ~ শতাব্দী দাস

লাল পতাকার পিছনে তো অনেক বার হেঁটেছি। কিন্তু লক্ষ্য করেছেন কি, যে রাগী ছেলেমেয়েগুলো স্বাধীনতা দিবস এলেই 'আমি তো দেশদ্রোহী' থিমে স্টেটাস দেয়, তাদের হাতে কাল জাতীয় পতাকাও ছিল? 

তাদের আগেও বলেছিলাম, দেশ বিজেপির বাপের নয়,  গোসন্তানদের উপর রাগ করে তিরঙ্গার অধিকার ছেড়ে দিতে নেই । বোঝাতে পারিনি৷  বিজেপি দায়িত্ব নিয়ে বুঝিয়ে দিল। ধন্যবাদ বিজেপি। 

লক্ষ্য করেছেন কি, প্রধানমন্ত্রী যে 'পোষাকের' হাতে শুধু পাথর দেখেন, সে পোষাকের হাতেও কাল জাতীয় পতাকাই ছিল? কাল ছিল প্রকৃত অর্থেই জাতীয় পতাকা রিক্লেইম করার দিন৷ কোনো বাধ্যতামূলক স্বাধীনতা দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবস পালনে তিন-রঙা  ততটা খোলতাই হয় না, যতটা কালকের মিছিলে হয়েছিল। 

 লক্ষ্য করেছিলেন কি, এখানে-ওখানে দুয়েকটা রামধনু নিশানও উড়ছিল?  মানে সাতরঙা জেন্ডার স্পেক্ট্রামের মানুষজন নিজেদের 'দেশ' বুঝে নিতে এসেছিলেন! 

লক্ষ্য করেছিলেন কি  ' মন্দ যে সে সিংহাসনে চড়ে'-র পরের লাইন হয়ে গেছে 'মোদী দূর হঠো'? লক্ষ্য করেছিলেন কি, ওরা রাস্তায় আটকে পড়লেই বৃত্ত রচনা করে নিচ্ছিল, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নাচছিল? লক্ষ্য করেছিলেন কি, এস এন ব্যানার্জি রোডে ম্যাটাডোরের মাথায় বসা স্থানীয় শিশু ওদের নাচের তালে তালি দিয়েছিল? 

লক্ষ্য করেছিলেন কি, রাস্তা  যেন কলেজ ক্যান্টিন? চা আসছে, বাদামভাজা, সিগ্রেট...কিছু অ্যান্টি ন্যাশনাল দোকানদার বিনে পয়সাতেও চিপস বিস্কিট খাইয়েছেন! কাউন্টারে সিগ্রেট খেয়েছি অনেক, কাউন্টারে এগরোল এই প্রথম।  সেই রোল যে হাতে দিয়ে গেল, তাকে চিনিনা। তাকে যে দোকানী দিয়েছিল,  পয়সা নিয়েছিল কি  সে-ও? 

দুটো মিছিলে হেঁটে ক্লান্ত পা টেনে মেট্রোয় ঢুকছি। গালে 'নো এনআরসি' দেখে পুলিস বলছে,  'বেশ করেছ'!  পুলিশের জন্য কষ্ট হয়। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় থাকলে এই পুলিসকেই ফাইবারের লাঠি দিয়ে মিছিল পেটাতে হত। 

বাড়ির স্টেশন।  যে লটারি টিকিটওয়ালাকে কোনোদিন লক্ষ্য করিনি, সে গালের লেখা দেখে বলল, 'থ্যাঙ্ক ইউ'। প্রথমবার  জিগ্যেস করলাম, 'নাম কী আপনার?' একটি হিন্দু নামই বলল। 

 বাড়িতে 'নো-এন-আর-সি' গালে একটা চুমু খেল সাতবছর, 'নো সি-এ-এ' গালে আরেকটা। টিভিতে দেখলাম, মহামান্য দিলীপবাবু রামচন্দ্র গুহ সম্পর্কে বলছেন, 'কে বুদ্ধিজীবী আর কে নয়, তা সরকার ঠিক করবে।' স্পষ্ট ফ্যাসিবাদী উচ্চারণ। 

ফ্যাসিবাদ  ঘেন্না করি, ফ্যসিবাদ ভয় পাই। কিন্তু শীতের মিছিলের এমন সে আগুন, সেই মুহূর্তে আমি আর সাতবছর দু'জনেই এক বোকা অপোগণ্ডের কথায় ফ্যাক করে হেসে ফেললাম!

মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

আপনি কি হিন্দু? ~ সুশোভন পাত্র

এক্সকিউস মি! আপনি কি হিন্দু? তাহলে চাপ নেবেন না প্লিজ। বিজেপি ক্ষমতায় থাকতে কোন বাপের ব্যাটার হিম্মত হবে না হিন্দুদের একইঞ্চি ক্ষতি করার!
দেখলেন না কেমন কায়দা করে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে বাংলাদেশ-পাকিস্তান-আফগানিস্তানে ধর্মীয় উৎপীড়নের শিকার 'হিন্দু শরণার্থীদের' নাগরিকত্ব দেওয়ার বন্দোবস্ত করে দিল। মাস্টারস্ট্রোক! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বলছেন "দেশ জুড়ে NRC হবে।" হুইস্কি অন দি রক্স। জাস্ট ভাবুন, কাল সকালে পশ্চিমবঙ্গে NRC চালু হচ্ছে। এক লহমায় আপনি-আমি, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষ রাজ্যের ৯কোটি মানুষ অ-নাগরিক হয়ে যাচ্ছে। ঘরে রাত জেগে চলছে পুরনো নথি জোগাড়ের চিরুনি তল্লাশি। আপনি অফিস-স্কুল-কাছারি ছেড়ে, আপনার বৌ ছোলার ডালটা সেদ্ধ করতে ওভেনে বসিয়ে, আপনার বুড়ো বাপ হাঁপানি নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে, আপনার মা বাতের ব্যথা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে, দিনের পর দিন সরকারী অফিসের চক্কর কাটছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের সম্ভাব্য নথি হাতে নিয়ে আর পরিচয় হারানোর দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে। কি থ্রিলিং ব্যাপার তাই না? আমার তো মশাই ভেবেই কেমন একটা রোমাঞ্চ হচ্ছে! আর আপনার?
জমা দেওয়া নথি বিজেপির পছন্দ হলেই কেল্লাফতে। আপনি হলেন গিয়ে 'নাগরিক'। আর বাদ পড়লে 'অ-নাগরিক'। ঐ যেমন আসামে বাদ পড়া ১৯লক্ষের ১২ লক্ষই হিন্দু। কিন্তু আপনি একদম ঘাবড়াবেন না! মনে মনে ১০৮বার বলবেন 'মাস্টারস্ট্রোক।' তারপর সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে আবেদন করবেন। সিম্পল! 
ধরুন আপনি ৫পুরুষ ধরে এদেশে আছেন, রেশন তুলেছেন, পড়াশুনা করেছেন, চাকরি পেয়েছেন, এমনকি এই লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি কে ভোটও দিয়েছেন; কিন্তু নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি আপনি গুগল সার্চ করেও জোগাড় করতে পারেন নি। তাহলে আর কি? 'পুরানো সেই দিনের কথা' ভুলে গিয়ে, নতুন সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে আবেদন করে, জাস্ট স্বীকার করে নিতে হবে যে আপনি এতদিন এদেশে ছিলেন 'অবৈধ শরণার্থী' হয়ে আর বাংলাদেশ-পাকিস্তান-আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছিলেন ধর্মীয় নিপীড়নের তাড়া খেয়ে। ব্যাস! তারপর ধর্মীয় নিপীড়নের ছোট্ট একটা প্রমাণ ঠুকে দিলেই ল্যাঠা চুকে গেলো। এবার বিজেপির আশীর্বাদ পেলেই আপনি কমপক্ষে ৫বছরের জন্য হয়ে যাবেন 'বৈধ শরণার্থী'। মানে ছিলেন 'নাগরিক' হবেন 'বৈধ শরণার্থী'। কিউট ব্যাপার না? হিন্দু হয়ে এইটুকু স্যাকরিফাইস করবেন না মশাই? কাম-অন। মনে রাখবেন বিজেপি ক্ষমতায় থাকতে কোন বাপের ব্যাটার হিম্মত হবে না হিন্দুদের একইঞ্চি ক্ষতি করার!
অমিত শাহ বলেছেন, নাগরিকত্ব আইনে সংশোধনের ফলে "লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি" মানুষ উপকৃত হবেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার হিসেব, সুবিধা পাবেন গোটা দেশে মাত্র ৩১,৩১৩ জন। ২৫,৪৪৭ জন হিন্দু, ৫,৮০৭ জন শিখ, খ্রিস্টান ৫৫ জন, ২ জন বৌদ্ধ, ২ জন পার্সি। তা শুধুমাত্র এই ৩১,৩১৩ জন মানুষ কে নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য দেশের ১৩২ কোটি মানুষ কে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়াটা কি মশা মারতে কামান দাগার আদর্শ উদাহরণ হিসেবে স্কুলের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে? এরকম প্রশ্ন যদি কেউ করে তাহলে বুঝবেন সে 'দেশদ্রোহী'। হিন্দু হিসেবে আপনার কর্তব্য চোখ-কান বন্ধ রেখে, বুদ্ধি-বিবেক বেচে দিয়ে, দিনের দু-বার গোমূত্র সেবন করে, বিজেপির উপর পূর্ণ আস্থা বজায় রাখা। 
আপনার নোট বাতিল মনে নেই? আচ্ছা বুকে হাত রেখে একজনও হিন্দুর নাম আপনি বলতে পারবেন যাকে নোট বাতিলের সময় ATM-র লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল? পারবেন না। কারণ, হিন্দুরা তো তখন শীতের সকালে ব্যালকনির মিঠে রোদ্দুরে বসে গ্রিন টি খাচ্ছিল আর ব্যাঙ্ক গুলো হিন্দুদের বাড়ি বয়ে নগদ জোগান দিয়ে গিয়েছিল। সে RBI যতই বলুক নোট বাতিলে কোন কালো টাকা উদ্ধার হয়নি, জাল নোট ধরা পড়েনি, দেশকে ক্যাশলেশ করা যায়নি। রঘুরাম রাজন যতই চিৎকার করুক নোট বাতিলে কারও কোন লাভ হয়নি। খবরদার বিশ্বাস করবেন না। কারণ আপনি চোখের সামনে দেখেছেন নোট বাতিলের পরই জয় শাহ'র কোম্পানির রেভিনিউ বেড়েছিল ১৬,০০০%। আর অমিত শাহ পরিচালিত সমবায় ব্যাঙ্কে জমা পড়েছিল দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩,১১৮ কোটির বাতিল নোট। তাহলে কোন হরিদাস পাল বলে যে নোট বাতিলে হিন্দুদের লাভ হয়নি? এঁরা দুজন কি হিন্দু নয়? বললাম না, বিজেপি ক্ষমতায় থাকতে কোন বাপের ব্যাটার হিম্মত হবে না হিন্দুদের একইঞ্চি ক্ষতি করার!
নিন্দুকে বলছে, দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার নাকি ৪.৫%। ৬বছরে সর্বনিম্ন। এতে কি হিন্দুদের কোন ক্ষতি হচ্ছে? এক্কেবারেই না। হিন্দুদের জিডিপি তো মোদীজি আলাদা করে ক্যালকুলেশন করছেন। এই যে দেশে বেকারত্বের হার ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ। কি ভাবছেন হিন্দুদের বেকারত্বের জ্বালায় ভুগতে হচ্ছে? এক্কেবারেই না। দেশে হিন্দু বেকার গ্যালিলিও নিজেও দূরবীন দিয়ে খুঁজে পাবেন না। এই যে অটো-মোবাইল সেক্টরে সেল ২১বছরে সর্বনিম্ন, কারখানার ঝাঁপ পড়ছে। এই যে ঋণের দায়ে দেশে ১২হাজার কৃষক বছরে গড়ে আত্মহত্যা করেছ। চেষ্টা করলেও এতে আপনি একজনও ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু শ্রমিক-কৃষক দেখাতে পারবেন না!
রাম রাজত্বে বাজারে পেঁয়াজের ১৫০টাকা/কেজি বিক্রি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু হিন্দুরা আজকাল পেঁয়াজ ফ্রিতেই পাচ্ছে। উচ্চ-শিক্ষার ফিস দেশে আশঙ্কাজনক ভাবে বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু হিন্দুদের তো কলেজে ফ্রিতেই অ্যাডমিশন দিচ্ছে। বিদেশি অপশক্তির হাঙ্গার ইনডেক্সে ভারতে ১১৭ দেশের মধ্যে ১০২-এ ঠিকই, কিন্তু গুপী-বাঘার মত তালি ঠুকলেই সরকার হিন্দুদের মণ্ডা-মিঠাই সাপ্লাই দিচ্ছে। গ্যাস সিলিন্ডারে এক্সট্রা ভর্তুকি দিচ্ছে, PF-এ বর্ধিত হারে সুদ বসাচ্ছে। এমনকি হিন্দুদের পাম্পের আশে পাশে দেখতে পেলেই সরকার ধরে বেঁধে সস্তায় গাড়িতে পেট্রোল-ডিজেল ফুল টাঙ্কি করে দিচ্ছে। 
বিশ্বাস না হলে সম্প্রতি ফোর্বসে প্রকাশিত ১০০জন ধনীতম ভারতীয়দের তালিকা দেখুন। ৮ধাপ উঠে দ্বিতীয় স্থানে আছেন গৌতম আদানি। আর এই নিয়ে টানা ১২বছর প্রথম স্থানে মুকেশ আম্বানি। ২০১৪-২০১৯, মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি ১.৬৮লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে ৩.৬৫লক্ষ কোটি হয়েছে। বৃদ্ধির হার ১১৮%। আর  গৌতম আদানির সম্পত্তি ৫০.৪ হাজার কোটি থেকে বেড়ে ১.১লক্ষ কোটি হয়েছে। বৃদ্ধির হার ১২১%। তাহলেই বুঝুন, আদানি কিম্বা আম্বানির মত হিন্দুরা মোদীজির আশীর্বাদে এই পাঁচ বছরে কত্ত উন্নতি করেছেন। 
ও! বাই দা ওয়ে, আপনিও তো মশাই হিন্দু। তা এই ৫ বছরে মোদীজির আশীর্বাদ আপনার সম্পত্তি কত শতাংশ বেড়েছে? ১১৮%? ১২১%? না অমিত শাহ'র ব্যাটা জয় শাহর মত এক্কেরে ১৬,০০০%?

শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯

নিজের দেশে রিফিউজি হব? ~ পিপল্‌স স্টাডি সার্কেল

"নিজের দেশে রিফিউজি হব? : প্রশ্নোত্তরে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) ও নাগরিকত্ব বিল (সিএবি)" (প্রকাশক পিপল্‌স স্টাডি সার্কেল, নভেম্বর ২০১৯) থেকে কিছু তথ্য --

পশ্চিমবাংলায় এনআরসি কি আদৌ প্রয়োজন?

সারা রাজ্যের মানুষকে যদি এখন সত্তর বছরের পুরনো দলিল দেখিয়ে নিজেদের নাগরিক প্রমাণ করতে হয়, তাহলে জনজীবনে ঘোর সংকট তৈরি হবে। কে "সন্দেহভাজন নাগরিক" আর কে সাচ্চা নাগরিক, সেই নিয়ে সমাজে ব্যাপক ভীতি আর বিভেদ তৈরি হবে। এসব করে মানুষের কী লাভ হবে? বর্তমানে আমাদের রাজ্যে ৯ কোটি ৩৯ লাখ মানুষের আধার কার্ড আছে, ৬ কোটি ৯৭ লাখ মানুষের ভোটার তালিকায় নাম আছে। এছাড়াও রেশন কার্ড, প্যান কার্ড, পাসপোর্ট, ব্যাংকের খাতা ইত্যাদির মত কোনও না কোনও পরিচয়পত্র বেশিরভাগ মানুষের কাছেই আছে। এটাই তো নাগরিকত্বের জন্য যথেষ্ট। এর ওপর আবার একটা জাতীয় পরিচয়পত্র বানানোর কোনও প্রয়োজন তো নেই-ই। উপরন্তু ২০০৩-এর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের মত একটা উদ্বাস্তু-বিরোধী একুশে আইনের অধীনে কোনওরকম এনপিআর, এনআরসি, বা এনআরআইসি প্রক্রিয়া চালানোর সর্বাত্মক বিরোধিতা করা দরকার। এই আইনটাকেই বাতিল করতে হবে।
       
বিজেপি বলছে হিন্দুদের ভয় নেই। আগে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বা সিএবি পাশ করা হবে, তারপর এনআরসি হবে। এই সিএবি (ক্যাব) বিল ব্যাপারটা কি?

মোদী সরকার ২০১৬ সালে এই বিলটা আনে। এই বিল অনুযায়ী পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের মধ্যে কেউ হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, শিখ বা খ্রিস্টান হলে তিনি আর ২০০৩-এর নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের সংজ্ঞা মোতাবেক "অবৈধ অভিবাসী" হিসেবে গণ্য হবেন না, এবং ছ'বছর এদেশে থাকার পর ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন। কিন্তু এই দেশগুলি থেকে আসা উদ্বাস্তুদের মধ্যে কেউ যদি মুসলমান হন তাহলে তিনি এই ছাড় পাবেন না, তাঁকে "অবৈধ অভিবাসী" হিসেবেই গণ্য করা হবে। 

তার মানে ক্যাব বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন/বিল সমস্ত হিন্দু উদ্বাস্তুদের ভারতীয় নাগরিক বানিয়ে দেবে?      

ভুল প্রচার। সিএবি (ক্যাব) বিল কাউকেই সরাসরি নাগরিকত্ব দেবে না। অন্যের মুখের কথা না শুনে নিজে সরকারের পাতা থেকে ডাইনলোড করে পড়ে দেখুন। বিল কী বলছে? বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুদের "অবৈধ অভিবাসী" অর্থাৎ বিদেশি হিসেবে গণ্য করা হবে না, শরণার্থী হিসেবে দেখা হবে। এটুকুই বিলের বক্তব্য। ধরে নিলাম সংসদে বিল পাশ হল, ধরে নিলাম বিল আইনও হয়ে গেল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাংলাদেশ থেকে এতদিন ধরে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুরা সঙ্গে সঙ্গে ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন। তাঁরা শরণার্থী হিসেবে ভারতে থাকার আইনি সুরক্ষা পাবেন, এইটুকু। তাঁদের পুলিশ তক্ষুণি জেলে পুরে দেবে না বা বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেবে না।

কিন্তু নাগরিকত্ব পেতে হলে আপনাকে প্রমাণ দিতে হবে আপনি ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত হয়ে ভারতে এসেছেন। ধরা যাক, আপনার পরিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৯৬৫ সালে এসেছিল। ১৯৬৫-এর পর ৫৪ বছর চলে গেছে। এত বছর পর প্রমাণ করতে পারবেন যে ৫৪ বছর আগে পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মের কারণে অত্যাচারিত হয়েছিলেন? মানুষ তো এদেশে নানা কারণে এসেছেন। অনেকেই চাকরি বা রোজগারের কারণে এসেছেন। অনেকেই জ্ঞাতি-গুষ্টি বা গ্রামের লোক চলে আসাতে এসেছেন। অনেকে এসেছেন দাঙ্গার কারণে। অনেকে এসেছেন ভয়ে। অনেকে এসেছেন নিরাপত্তার খোঁজে। অনেকে সরাসরি নিপীড়িত হয়েও এসেছেন। কিন্তু সেই অত্যাচারের সেলফি অথবা লাইভ ভিডিও তুলে ফেসবুকে তো আপলোড করে রাখেননি। সে সময়ে থানায় ডায়েরি তো করেননি। কীসের প্রমাণ দেবেন? দ্বিতীয় কথা হল এই যে আপনাকে নাগরিকত্বের জন্য ছ'বছর পর আলাদা আবেদন করতে হবে। সেই আবেদন সরকার খারিজও করতে পারে। 

তার মানে কী দাঁড়াল, একবার ভেবে দেখুন। এতদিন আপনি ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড, বিপিএল কার্ড ইত্যাদি এতগুলো কাগজের সাহায্যে ন্যূনতম নাগরিক অধিকারটুকু পাচ্ছিলেন। বিলের এক খোঁচায় নাগরিক থেকে শরণার্থী হবেন। তারপর ছ'বছর পর নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবার ভিক্ষে করতে যাবেন সরকারের কাছে। এ এক বিরাট ধাপ্পা। এতে হিন্দু উদ্বাস্তুদের চরম ক্ষতি আর নাগরিক অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়া ছাড়া আর কিছু নেই।

তাহলে মোদী সরকার সিএবি (ক্যাব) বিল পাশ করাতে চাইছে কেন?

সিএবি (ক্যাব) বিল পাশ করানোর একটাই উদ্দেশ্য। গোটা দেশে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিভেদ আর মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি করা। এই বিলে যেভাবে ইসলাম বাদ দিয়ে সমস্ত ধর্মের নাম নেওয়া হয়েছে, সেটা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান বিরোধী। মানুষে মানুষে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা কানুন করা যাবে না এটা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মৌলিক কথা। এর উল্টোদিকে হেঁটে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করার আইন বানানো চলে না।

কেন্দ্রীয় সরকার যদি সত্যিই আমাদের পড়শি দেশগুলির সমস্ত নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের শরণার্থী হিসেবে ভারতের নাগরিকত্ব দিতে উদ্যোগী হত, তাহলে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানে থাকা আহমদী, সুফি সহ সংখ্যালঘু বা গৌণধর্মের যে মুসলমান গোষ্ঠীগুলি আছে, তাঁদের কথাও বিলে রাখত। যে নাস্তিকরা ধর্ম বিশ্বাস করেন না বলে সারা উপমহাদেশ জুড়ে আক্রান্ত, যে মুক্তমনা-রা ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার, তাঁদের কথাও বিলে থাকত। তাছাড়া এই বিলে মায়ানমার (বার্মা), নেপাল, ভূটান আর শ্রীলঙ্কার নাম বাদ কেন? কারণটা সহজ। মায়ানমারে রোহিঙ্গারা আক্রান্ত এবং তাঁরা মুসলমান। আক্রমণকারীরা বৌদ্ধ। নেপাল বা ভুটান থেকে যে গোর্খারা এসেছেন তাঁদের ক্ষেত্রেও মুসলমানদের আক্রমণকারী হিসেবে দেখানো যাবে না। তাই এই দেশগুলি বাদ। 

তাছাড়া, ভারতের পড়শি দেশগুলিতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন শুধুই ধর্মের নামে হয় না, ভাষা বা জাতিগত কারণেও হয়। যেমন শ্রীলঙ্কা থেকে নিপীড়িত হয়ে অনেক তামিল উদ্বাস্তুরা ভারতে এসেছেন। তাঁদের এই আইনের আওতায় আনা হয় নি কেন? বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও রাজাকার বাহিনী যে অত্যাচার চালিয়েছিল, সেটা তো ধর্মের ভিত্তিতে ছিল না। ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালিদের ওপর দমন হয়েছিল এবং বাঙালি মুসলমানেরা চরম নিপীড়নের শিকার হন। সে অত্যাচার থেকে পালিয়ে কোনও বাঙালি মুসলমান যদি ভারতে এসে আশ্রয় নিয়ে থাকেন, তাহলে তিনিও শরণার্থীর মর্যাদা পাবেন না কেন?

বোঝাই যাচ্ছে যে বিজেপি সরকার তার সাম্প্রদায়িক মুসলিম-বিদ্বেষী মতাদর্শ অনুসারেই এই বিলটা নিয়ে এসেছে। গরিব হিন্দু উদ্বাস্তুদের মিথ্যে আশা দিয়ে ঠকিয়ে বিষাক্ত হিন্দু-মুসলমান বিভাজন তৈরির কল ছাড়া এই বিলকে আর কী বলবেন?  
        
বিজেপি বলছে এগুলো বিরোধীদের অপপ্রচার। সিএবি (ক্যাব) বিল দিয়ে যে হিন্দু উদ্বাস্তুদের কোনও উপকার হবে না তার সরকারি প্রমাণ আছে?

প্রমাণ আছে। ২০১৬-র ক্যাব বিল নিয়ে একটি যৌথ সংসদীয় কমিটি (জেপিসি) আড়াই বছর ধরে আলাপ-আলোচনা এবং বিতর্ক চালিয়েছিল। বিতর্কে বিরোধী দলেরা নানা রকম প্রশ্ন করে, কেন্দ্রীয় সরকার তার জবাব দেয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সমস্তটা নিয়ে জেপিসি রিপোর্ট সংসদে পেশ হয়।

এই জেপিসি রিপোর্টের ৩৯ এবং ৪০ পাতার প্রতিটি বাক্যে যেন উদ্বাস্তুদের দুর্ভাগ্য জ্বলন্ত অক্ষরে লেখা। সরকারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে কীভাবে নাগরিকত্ব আবেদনের সত্যি-মিথ্যে যাচাই করা হবে, আর কোন উদ্বাস্তুরা এই আইনের সুবিধে পাবেন? তারা জবাব দেয় যে এ দেশে আসার আগে থেকেই যে উদ্বাস্তুরা জানিয়ে রেখেছেন যে তাঁরা অত্যাচারিত হয়ে পালিয়ে এসেছেন এবং যাঁদের লং টার্ম ভিসা দেওয়া হয়েছে, শুধুমাত্র তাঁদেরকেই এই আইনের সুবিধে দেওয়া হবে। নতুন করে এখন যাঁরা নিজেদের অত্যাচারিত হওয়ার ইতিহাস জানাবেন, তাঁদের কেসগুলো ইনটেলিজেন্স বুরো এবং রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা "র" (RAW)-এর গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখবেন। এই আধিকারিকদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে মোট কতজন মানুষ এই আইনের সাহায্যে নাগরিকত্ব পেতে পারেন? তাদের জবাব, "হিন্দু – ২৫,৪৪৭, শিখ – ৫,৮০৭, খ্রিস্টান – ৫৫, বৌদ্ধ – ২, পার্সি -২, সব মিলিয়ে সারা দেশে ৩১,৩১৩ জন"। এটা আমাদের কথা নয়, সরকারের জবাব। জেপিসি কমিটির সদস্যরা আইন বিভাগের আমলা-মন্ত্রীদের জিজ্ঞেস করেছিলেন যে দেশজুড়ে শুধুমাত্র ৩১,৩১৩ জন মানুষ এই আইনের উপকৃতের আওতায় আসবেন, না সংখ্যাটা পরে বদলাতেও পারে? এতে সরকারের জবাব, মোট ওই ৩১,৩১৩ জনকেই নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। বাকিদের বরং বিদেশি ট্রাইবুনাল এর সামনে হাজিরা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কাগজ নকল করে নাগরিকত্ব পান নি। 

তার মানে যদি সিএবি (ক্যাব) বিল পাশ হয়, তাহলে সারা ভারতে মাত্র ৩১,৩১৩ জন উদ্বাস্তু এখন নাগরিকত্ব পাবেন। আর ২০০৩-এর একুশে আইনটার ফাঁদে বানানো এনআরসি-র ছাঁকনিতে যে ১৯ লক্ষ মানুষ আসামের নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, তাঁদের জন্য কাঁচকলা। এছাড়া নতুন করে যে মানুষেরা ২০০৩ আইনের "বেআইনি অভিবাসী"-র ফাঁদে পড়ে নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়বেন, তাদের জন্যও কাঁচকলা। তাঁদের ভাগ্যে থাকবে ট্রাইবুনাল, কোর্টকাছারি, ডিটেনশন ক্যাম্প আর আবেদন-নিবেদন। 

তাহলে নাগরিকপঞ্জি বা ক্যাব করে কোনও লাভ নেই। কয়েকজন অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়লেও তাদের বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব না। খালি সাধারণ মানুষকেই হয়রানি করা হবে। তার ওপর ভারতীয়দের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে। মোটের ওপর এটা বলা যায়? 

হ্যাঁ। ২০০৩-এ পাতা ফাঁদে এনআরসি-র ছাঁকনিতে ধরা যদি পরেন, তবে ২০১৬-এর নাগরিকত্বের কল আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। আসামের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এটাও শিখলাম যে যদি কোনওক্রমে আপনার নাম একবার নাগরিকপঞ্জিতে উঠেও যায়, তাহলেও শান্তি নেই। দেশপ্রেমিকরা সন্দেহ করে নালিশ করলে আবার সে নাম বাদও পড়তে পারে। দেশপ্রেমিকদের সন্দেহের ভিত্তিতে আপনার পিছনে নালিশের ফেউ এবং ঝুটা অবজেকশন দু'টোই লাগতে পারে। তারপর "র"-এর গোয়েন্দা বাহিনী এবং "ইন্টেলিজেন্স বুরো" আপনার ঠিকুজি কুষ্ঠি ঘাঁটতে বসবে। সবশেষে পড়ে থাকবে একটাই প্রশ্ন। বাঙাল বেলতলায় যায় কয়বার? 

এনআরসি আর ক্যাব নিয়ে মিথ্যে প্রচারটা বুঝলাম। কিন্তু একটা খটকা আছে। পশ্চিমবাংলায় কি সত্যিই দু' কোটি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী আছেন? 

না, এটা বিজেপি-র ছড়ানো গুজব। আসলে "বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী"-দের কোনও নির্দিষ্ট তথ্য বা সংখ্যা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নেই। ২০১৮-র সেপ্টেম্বরে তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা স্পষ্ট করে লিখিত ভাবেই এটা জানিয়ে দেয়।

সিটিজেন আইন ও এনআরসি ~ রোহন কুদ্দুস

যে মুসলমান সহনাগরিকের দিকে পাঁথর ছোঁড়েন, যে মুসলমান রাস্তায় আগুন জ্বালান, যে মুসলমান ক্যাবের বিরোধিতায় ভাঙচুর করেন, তাঁদের উসকানি দেয় রাজনীতি। সেই রাজনীতি, যা সংখ্যালঘুদের উন্নতির কথা আওড়ে তাদের বোড়ে হিসাবে ব্যবহার করে নিজের গদি টিকিয়ে রাখতে চায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে এ রাজ্যে মুসলমানদের কী উন্নতি হয়েছে সে সম্পর্কে আমার স্পষ্ট ধারণা নেই, কিন্তু সংখ্যাগুরু সমাজ থেকে তাদের আলাদা করে এনে তাদের প্রতি রাজ্যের অবশিষ্ট মানুষের অবিশ্বাস তৈরিতে মমতা পুরোপুরি সফল। রাজ্যটা তিনি সোনার থালায় বসিয়ে বিজেপি-র হাতে তুলে দিচ্ছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ যা মুসলমানদের নিয়ে করেছেন, বিজেপি সেই একই জিনিস হিন্দুদের নিয়ে করছে। আমার ছোটবেলায় 'ভোটব্যাঙ্ক' কথাটা মুসলমান শব্দের সঙ্গে জুড়ে ছিল। এখন দেখি সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু সবাই ভোটব্যাঙ্কে পরিণত হয়েছে। ফলে মূল্যবৃদ্ধি থেকে বেকারত্ব, অর্থনীতির বৃদ্ধির হার থেকে কৃষকের দুর্দশা-- এসব নিয়ে একজোট হয়ে রাজাকে প্রশ্ন করার মতো মানুষ আর অবশিষ্ট নেই। তার ওপর বস্ত্র, বাসস্থান, খিদে-- এগুলোর থেকেও আরও গভীরে গিয়ে নাগরিকত্ব নিয়ে সংশয় মানুষের মনে ঢুকিয়ে দিয়ে রাজা নিশ্চিন্ত।

ক্যাবের ফলে হিন্দু 'শরণার্থী'রা নিরাপদ, ফলে ক্যাব সমর্থন করাই যায়-- এমন আগুনে হাত না সেঁকাই ভালো। ক্যাব কোনও বিচ্ছিন্ন আইন নয়। এর প্রয়োগ করা হচ্ছে আসামের এন আর সি-তে বিজেপি-র প্রতি তৈরি হওয়া অবিশ্বাসকে প্রশমিত করতে। আর এই এন আর সি কাকে ঘরছাড়া করবে আমরা কেউই জানি না। আবার ক্যাব মুসলমান 'রিফিউজি'দের প্রত্যাখ্যান করবে, অতএব মুসলমান হিসাবে রাস্তায় নামা দরকার, এমন চিন্তাও পাশে সরিয়ে রাখা আশু প্রয়োজন। ক্যাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হোক ধর্মনির্বিশেষে। মানুষের একজোট হওয়া জরুরি, তৃণমূল বা বিজেপি-- দু-দলেরই ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে 'না' বলা জরুরি। রাজ্যটা 'নারায়ে তকবির' আর 'জয় শ্রীরাম'-এর মধ্যে ভাগ হয়ে গেলে আগুন জ্বলবে সাধারণ মানুষের ঘরে, এই সহজ সত্যিটা আমাদের মাথায় ঢুকছে না!

রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

খেলা~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

এই যে দেখছ বধ্যভূমি, এবং সে'টার পাশেই ভাগাড়…
ঘাবড়িও না, সমস্তটাই বিরাট একটা পরীক্ষাগার।
এই যে কোথাও এনকাউন্টার, অন্য কোথাও জ্বলছে চিতা।
উদ্বাহু কেউ হাসছে... কাঁদছে। সমর্থন আর বিরোধিতা। 

নিয়ম এবং কানুনগুলো ভুল বোঝানোর দুই মুখো সাপ।
কোন দিকে যে বাড়ায় ফণা, কখন শাস্তি, কখন যে মাপ!
সাক্ষী লোপাট করতে পারলে যায় মুছে যায় সকল সাক্ষ্য। 
বুঝতে বুঝতে বছর গড়ায়, বিচার যখন করঞ্জাক্ষ!

নিপুন নাট্যমঞ্চে তখন গড়িয়ে যাচ্ছে নতুন পালা।
কলরবেই সার্থক হয় তার্কিকদের কর্মশালা।
চালাক অভিনেত্রী লুকোয় 'কাস্টমার'এর সেই থিয়োরি। 
প্রভাববিহীন ভাবতে থাকে... আজকে সকল দোষ কি ওরই?

এর ভেতরে বাঁচতে গেলে বাছতে হবেই একটা পক্ষ
দু চোখ বুজে কানামাছি যেমন খোঁজে নিখুঁত সখ্য।
বাক্য শানায়, যুক্তি বানায়, সব পক্ষই। অকাট্য তা।
ডেমোক্রেসির আনাচ ঘুরে উড়তে থাকে আইনি চোথা।

এবং খেলা শেষের পরে, সেই বোকাটা বুঝতে থাকে,
চালাক রাষ্ট্র খাচ্ছে মধু, সময় খাচ্ছে সময়টাকে।

শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

ধর্ষণ, শ্রেণী ও এনকাউন্টার ~ অনির্বান মাইতি

আপাতত হায়দ্রাবাদ ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের নিয়ে নেটিজেনরা দুই ভাগে বিভক্ত। একদল দুই হাত তুলে আশীর্বাদ করছে সিস্টেমকে, আর একদল সিস্টেমের প্রতি ঘৃণা উগরে দিচ্ছে। আমি যেহেতু অত্যন্ত ধান্দাবাজ একজন লোক, আমি দুইদিকের বক্তব্যকেই আংশিক সমর্থন যুগিয়ে চলেছি। এই ডিবেটগুলো আমি পছন্দ করি কারণ এগুলোর মাধ্যমে ক্রমশ ঘটনার মোড়ক খুলছে। অনেক কিছু সামনে আসছে।

ধর্ষকরা সমাজের ঘৃণ্যকীট তাদের মৃত্যুতে কোন দুঃখ নেই বরং এই ভেবে ভালো লাগছে যে চারটি নষ্ট হয়ে যাওয়া মানসিকতা এই পৃথিবী থেকে মুছে গেল। কিন্তু এতে উক্ত মানসিকতা নষ্ট হয়ে গেল না। এখনো রাস্তায় ঘাটে মহিলারা নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে পারে সেরকম আশা করা যাচ্ছে না। এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রয়োজন, আসুন আলোচনা করি।

সারা দেশের ধর্ষকদের প্রথমেই আমি দুইটি ভাগে ভাগ করে নেই, ১) প্রিভিলেজড ধর্ষক ২) আনপ্রিভিলেজড ধর্ষক। হায়দ্রাবাদে যারা নিহত হল তারা আনপ্রিভিলেজড ধর্ষক গোত্রীয়, এরা সমাজের নিচু স্তরের ধর্ষক। যারা অন্ধকারে লুকিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তাদের গন্ডীর মধ্যে এসে পড়া প্রিয়াঙ্কা রেড্ডিকে পেয়েই কর্ম সম্পাদন করেছে। দিল্লীর ক্ষেত্রেও এদেরই দেখা গেছিল। সারা ভারতবর্ষ তোলপাড় করে ফেলা দুটি ধর্ষণ কান্ডই আনপ্রিভিলেজড ধর্ষকদের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছিল। এই তোলপাড়ের ব্যাপারটা অপারেট করে মূলত মিডিয়া। তারা ক্রমাগত ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষকে চাগিয়ে তোলে, উত্তেজিত করে, মানুষের হয়ে তারাই দাবী ছুঁড়ে দেয়। মানুষ সেইমত প্রতিক্রিয়া জানাতে জানাতে যায়। কিন্তু এই মিডিয়ায়ই আবার নিজেদের সংযত করে ফেলে প্রিভিলেজড ধর্ষকদের ক্ষেত্রে। উন্নাও বা এরকম হাজারটা ধর্ষণ কান্ড এর প্রমাণস্বরূপ দেওয়া যেতে পারে। মানু্ষ ও প্রিভিলেজড দের ভয় পায়। দুম করে এদের শাস্তিবিধান করতে পারে না। কিন্তু অসুখটা যেহেতু ধর্ষণ, আর অসুস্থ যেহেতু প্রিভিলেজড এবং আনপ্রিভিলেজড উভয় পক্ষই সেহেতু এক পক্ষের শাস্তিতে অসুখটা ফুরোচ্ছে না। বরং প্রিভিলেজডদের মনে এই সাহসটুকু ঢুকছে যে শাস্তি পেলে ওরা পাবে, আমরা সেফ। আমরা হয়তো অনেকেই ভুলে গেছি সুপ্রীম কোর্টের চিফ জাস্টিসের বিরুদ্ধেও একটি মেয়ে মলেস্টেশনের অভিযোগ এনেছিল। তারপর সেই অভিযোগ কোথায় যেন হারিয়ে যায়। সেই বিচারপতিই রামমন্দির বিতর্কের অবসান করেন তার ঐতিহাসিক রায় এ।

এবার কথা হল মানুষ যাবে কোথায়? করবে কী? উন্নাও এর অপরাধীরা ছাড়া পেয়েই মেয়েটিকে জ্বালিয়ে মেরে দিল। এর আগেও গাড়ি চাপা দিয়ে মেয়েটিকে মারার চেষ্টা হয়েছে। যেহেতু উন্নাও এর ধর্ষক দেশের শাসকদলের ঘনিষ্ঠ, সেহেতু হায়দ্রাবাদ নিয়ে আমরা যতটা উত্তেজিত, উন্নাও নিয়ে ততটা নই। কিন্তু ক্রমাগত ভিক্টিমের ওপর আক্রমণ করে এই প্রিভিলেজড ধর্ষক প্রমাণ করছেন যে তাঁরা কিন্তু "সেফ"। আর একজন ধর্ষক যেখানে সেফ সেখানে আমরা কী করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারি? যতদিন একজন ধর্ষক জীবিত থাকবে ততদিন কী করে আমাদের ভরসা ফিরতে পারে?

এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট সাজ্জনার কে দিয়ে ঘটনার পুনঃনির্মাণ এ পাঠানোর সময়েই প্রশাসন কী ঠিক করে ফেলে নি কী ঘটতে চলেছে? আমরা তো এমন আইন চেয়েছিলাম যার ইমপ্লিমেন্টেশনের মাধ্যমে ধর্ষণ নামক অভিশাপ থেকে মানুষ মুক্ত হয়। অপরাধীদের হত্যার মাধ্যমে সেই আইন প্রতিষ্ঠার পথ ব্যহত হল না? কারণ কেসটাই তো বন্ধ হয়ে যাবে এবার। হায়দ্রাবাদে অপরাধীর মৃত্যু, উন্নাও এ ভিকটিমের মৃত্যু দুটো ধর্ষণ সংক্রান্ত কেস বন্ধ হওয়া ভারতে ধর্ষণ বিরোধী শক্তিশালী আইন প্রতিষ্ঠার পথে কত বড় বাধা হল সেটা নিয়ে আলোচনা উঠবে না? দিনের শেষে লাভবান হল তো প্রিভিলেজডরাই।

অনেকে বলছেন নিজের ঘরে রেপ হলে বুঝতে কেন এই এনকাউন্টারকে সমর্থন করছি। কাউন্টারে এটাও সত্যি যে নিজের ঘরে এনকাউন্টার হলে বুঝতে কেন আমরা রেপ এবং এনকাউন্টার দুটোরই বিপক্ষে। আপনি ক্ষেত্রবিশেষে এনকাউন্টার এর সমর্থক হতে পারেন না। হয় আইন অথবা এনকাউন্টার যে কোন একটার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। আমার দুই মামাকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার অপরাধে পুলিশ বাড়িতে ঢুকে তাদের মায়ের সামনে গুলি করে মেরেছিল ৭২ সালে। আমি যদি এনকাউন্টার সমর্থন করে ফেলি তাহলে এই ঘটনাকেও সমর্থন জানাতে হয়। কারণ আইন না হলে এনকাউন্টার যে কোন একটাই বেছে নিতে পারেন আপনি। আর এনকাউন্টারকে বেছে নিলে প্রিভিলেজডরা যে কোনদিনই শাস্তি পাবে না সে ব্যাপারে নিঃসংশয় থাকুন। আর আরো বেশি আশঙ্কিত হোন এই ভেবে যে শুধু প্রিভিলেজড ধর্ষকে ভর্তি পৃথিবী আরো কত ভয়ঙ্কর হতে পারে।

***একটা কথা সবাই মাথায় রাখুন, গণতন্ত্রের শর্ত এই যে আমরা সকলেই সহমত না হয়েও যেন আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি। এমন কিছু করবেন না, যাতে আলোচনা ঘেঁটে যায়।

শনিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৯

পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন ~ রৌহীন ব্যানার্জি

তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?

আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, কড়ি নিন্দার সাথে আশীর্বাণী পাঞ্চ করিয়ে খাইয়েছি তোকে। সমস্ত বিরোধী দল, বিরোধী জাতকে বলেছি সরে যাও, নরেন এখন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার খেলা খেলবে।

তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?

মঞ্চে আদবাণী, মুরলী মনোহরদের সাইড করে সবার আগে বসতে দিয়েছি তোকেই। রেডিওতে সবার আগে মন কী বাত। তোর যখন উড়তে ইচ্ছে হয়েছে, হাজার কোটির বিমান দিয়েছি তোকে, সাজতে ইচ্ছে করলে দশ লাখি স্যুট। সারা পৃথিবী ঘুরে বেরিয়েছিস তুই, আমরা অনাহারক্লিষ্ট মুখে তোকে শুভযাত্রা বলেছি বারবার।

তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?

তুই রেডিওয় বক্তৃতা দিবি, জাতির উদ্দেশে ভাষণ, ঘন্টার পর ঘন্টা এটিএম এর লাইনে দাঁড়িয়ে তার দাম মিটিয়েছি আমরা। তুই অর্থনীতির কোমর ভেঙেছিস ইচ্ছামত, আমরা বলেছি সিয়াচেনে পাহারা দিচ্ছে সৈন্য। তুই জি এস টি র নামে ধ্বংস করেছিস ছোট ব্যবসা, আমরা বলেছি এসব দুর্নীতি দমন, দেশের জন্য ত্যাগ। তুই দুই কোটি বেকারকে পকোড়া ভাজতে বলেছিস, আমরা বুঁদ হয়েছি চপশিল্পের স্বপ্নে।

তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?

তিনশোর কমে তোর আসন যেন না থাকে তা নিশ্চিত করেছি আমরা। তুই একের পর এক নির্বাচিত সরকার ভাঙিয়েছিস অমিতকে দিয়ে, আমরা চাণক্য বলে চিৎকার করে পাড়া মাৎ করে দিয়েছি। তুই আখলাক, আফরাজুল, পেহলুদের খুনের পর খুন করিয়ে গেছিস, আমরা বলেছি স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। উন্নাও, কাঠুয়া, লক্ষ্ণৌ, হায়দরাবাদ - তুই ধর্ষকদের আশ্রয় দিয়ে গেছিস, আমরা বলেছি বিরোধিদের ফ্রাসট্রেশন। বেকারত্ব পৌঁছেছে সর্বোচ্চ হারে, বৃদ্ধি তলানিতে, আমরা বলেছি মন্দা নয়। পেঁয়াজের দাম একশো টাকা হলে বলেছি কদিন পেঁয়াজ খাবেন না।

তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?

তোর বন্ধু মুকেশ, গৌতম ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে নিয়েছে হাজার হাজার কোটি - আমরা বলেছি তুলে দাও অলাভজনক ব্যাঙ্ক। তোর প্রিয় মেহুল, নীরব, বিজয়, ললিতেরা পালিয়েছে লন্ডনে, আমরা বলেছি ফেরৎ আসবেই কালো টাকা। দাউদের টাকায় সরকার গড়তে চেয়েছিস মহারাষ্ট্রে, আমরা বলেছি ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে। ভাইপো জয় লক্ষ কোটি চুরি করে হয়ে গেছে বিসিসিআই সেক্রেটারি, আমরা সৌরভ গাঙ্গুলিকে বশংবদ ভৃত্যের মত দাঁড় করিয়ে দিয়েছি পিছনে। তোর প্রিয় মোটাভাইকে দিয়েছি ক্লিনচিট - "নোবডি কিলড জাস্টিস লোহিয়া" বলে।

তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?

তোর জন্য বিচারবিভাগ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে উপেক্ষা করে মান্যতা দিয়েছে ধর্মীয় "বিশ্বাস" কে। তোর জন্য বাতিল হয়ে গেছে রাফালের তদন্ত। তোর জন্য আমরা বিনা দোষে ঢুকে পড়েছি ডিটেনশন ক্যাম্পে, মুখে তুলে নিয়েছি ফলিডলের শিশি - শুধু তুই নিশ্চিন্তে সাম্প্রদায়িক তাস খেলবি বলে। তোরই জন্য মেনে নিয়েছি দেড়শো দিন বিচ্ছিন্ন থেকে কাশ্মিরে বয়ে যাবে উন্নয়নের জোয়ার। শুধু তোরই জন্য গলায় দড়ি দিতেও দ্বিধা করেননি সহস্র কৃষক।

তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?

তোরই কথা ভেবে আমরা আজও স্বপ্ন দেখি, নাগপুর একদিন ভারতের ন্যুরেমবার্গ হবে। তোর শরীরে সোনালি গয়নার মত আদর করবে রোদ্দুর রায়ের স্বপ্ন। আচ্ছে দিন আসবেই ভারতভূমিতে।

পিতৃতান্ত্রিক ধর্ষণ সংস্কৃতি ~ শতাব্দী দাস

বর্তমান ভারতে হিন্দু-মুসলিম মিলে হাতে হাত ধরে তাহলে একটি কাজই সম্পন্ন করতে পারে। ২৬ বছরের একটি মেয়ের গণধর্ষণ। তারপর পুড়িয়ে দেওয়া। এ আদিম বিকারই সাম্প্রদায়িক সমন্বয় ঘটায়, এমনকি বিজেপির ভারতেও। 

কেউ বলছেন, হায়দ্রাবাদ হজম করে ওঠা গেল না, তারপরেই রাঁচি...তারপরেই কলকাতায় কালীঘাট...এ কী! হঠাৎ গণধর্ষণের মরশুম শুরু হল নাকি? 

তাঁদের জানাই, গণধর্ষণের মরশুম বছরভর চলে, স্ট্যাটিস্টিক্স বলছে। কিন্তু যেহেতু একটি নির্মম গণধর্ষণের খবর ভেসে উঠেছে, তাই এখন কিছুদিন সংবাদপত্রগুলো গণধর্ষণের খবর বেশি কাভার করবে। এমনিতে এসব রোজই ঘটে। রোজই। 

যাঁরা (ধরে নিচ্ছি প্রচণ্ড আঘাত পেয়েই) হায়দ্রাবাদের মেয়েটির উপর ঘটে যাওয়া নির্মমতার গ্রাফিক বর্ণনা দিচ্ছেন, তাঁদের অনুরোধ, এটা করা বন্ধ করুন। আমরা খবরের কাগজে পড়ে নিয়েছি।  না, 'বারবার পড়ে আমার অসুস্থ লাগছে' ধরণের কোনো ব্যক্তিগত কারণে নয়। দেখা গেছিল, জ্যোতির মৃত্যুর পর যোনিতে রড-টড ঢুকিয়ে দেওয়ার ঘটনা আরও বেশ কিছু ঘটেছিল। কে জানে,  এইবার পুড়িয়ে দেওয়াটাই ট্রেন্ড হবে কিনা! 

আর হ্যাঁ, এবার ফাঁসিবাদীরা জেগে উঠবেন৷ 'ফাঁসি দাও, লিঙ্গকর্তন করো, জনসমক্ষে কোরো' ইত্যাদি শোনা যাবে।  ধর্ষকের মানবাধিকার নিয়ে কি আমি   চিন্তিত?  না।।

 আমি শঙ্কিত, কারণ আজ যাঁরা ফাঁসি চাইবেন, তাঁদেরই কাল  রেপ জোক বলতে শুনব, রেপ রেটরিক ব্যবহার করতে শুনব। এঁরা বলবেন, ভারতের ক্রিকেট টিম তো বাংলাদেশকে রেপ করে দিল! এরা সামান্য ঝগড়া হলেই প্রতিপক্ষের মাকে চুদে দিতে চাইবেন৷ একে আমরা 'রেপ কালচার' বলি। ধর্ষণ সংস্কৃতি৷ যেখানে রেপ আসলে এতই সামান্য ঘটনা যে তাকে নিয়ে মস্করা চলে। মস্করার প্রতিবাদ  যারা করে, তারা  'ফেমিনিস্ট কিলজয়'। আমরা রেপ কালচারে বাস করি। এখানে মুড়ি মুড়কির মতো রেপ ঘটবে, এ আর আশ্চর্য কী? 

ধর্ষক এই সমাজ থেকেই স্বাভাবিক ভাবে  উদ্ভুত। তারা বহিরাগত নয়।  তারা শিং-লেজ-নখ বিশিষ্ট আজিব প্রাণী নয়। কিংবা ওরকম জন্তু আসলে সবার মধ্যেই থাকতে পারে, পিতৃতাতন্ত্রিক জলহাওয়ায় বাড়তে পারে তারা। জান্তবতার দায় হাতে গোণা কয়েকজন ধর্ষকের উপর চাপিয়ে তাদের শূলে চড়িয়ে দিলেও কাল থেকে আমি বা আমার মেয়ে  এই কারণেই নিরাপদ নই৷ আর ঠিক এই কারণেই সম্পূর্ণ ধর্ষণ সংস্কৃতির বিরোধিতা করা কর্তব্য মনে করি। এ'কারণেই স্বেচ্ছায়
 'ফেমিনিস্ট কিলজয়'। 

  কালিঘাটের ভিখারি মেয়েদুটির ধর্ষণ  যারা ঘটিয়েছে, তাদের বয়স তের ও চোদ্দ। এদের ভিতরে জন্তুকে জাগিয়ে তোলার দায় আপনি ও আপনার পিতৃতান্ত্রিক ধর্ষণ সংস্কৃতি  ঝেড়ে ফেলতে পারবে তো?

ভারতবর্ষ ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

একটা বেঞ্চে ধরুন পাশাপাশি বসে আছে ওরা। পেশেন্ট নম্বর এক। মহিলা মাঝবয়সী, মাছের বাজারে প্রতি সপ্তাহেই দেখি। সামান্য পয়সার বিনিময়ে মাছ কেটে কুটে দেন। সেটাই পেশা। মাছ কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলে ফিনকি দিয়ে রক্ত। জল দিয়ে ধোয়ার পরে রুমাল বের করে বেঁধে দিলাম। মাছের বাজারে ফার্স্ট এইড আর কি বা হবে। হাসপাতালে যেতে বললাম। সেলাই লাগবে। মহিলার দু চোখ দিয়ে অঝোরে জলের ধারা। কেন মাসি কাঁদছো কেন। খুব ব্যথা ? ব্যাথা নয় বাবু। সেলাই মানেই তো সাত দিন কাজ বন্ধ। রোজগার বন্ধ। খাবো কি ?

পেশেন্ট নম্বর দুই। বছর দশেক এর একটি বালিকা। বেআইনি বাজি কারখানায় ততোধিক বাজি বানাতে গিয়ে মুখের ওপরেই ফেটেছে। চোখ মুখ আগুনে ঝলসে গেছে। পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছে। চোখটা বোধ হয় বাঁচবে না। সঙ্গে আসা স্বামী পরিত্যক্ত মায়ের আরো বড় চিন্তা, পরিবারে রোজগারের একটা লোক কমে গেল।

বেঞ্চে বসে থাকা তিন নম্বর। সতেরো আঠেরো বছরের কিশোর। গ্যারেজে কাজ করে। হেড মিস্ত্রির হেল্পার। কালি ঝুলি মাখা কিশোরটি কে সেই নিয়ে এসেছে। গাড়ির তলায় শুয়ে কাজ করছিল। জ্যাক উল্টে গিয়ে গোটা গাড়িটা তার সমস্ত ওজন নিয়ে পায়ের ওপরে পড়েছে। দুটো পাই বিশ্রী রকম থেঁতলে গেছে। একটা পা সম্ভবতঃ এমপুট করতে হবে। হেড মিস্ত্রির আকুল জিজ্ঞাসা, পা টা কোনভাবেই বাঁচানো যাবে না ডাক্তারবাবু ? পা চলে যাওয়া মানে তো বেকার হয়ে যাবে আবার।

পেশেন্ট নম্বর চার। চব্বিশ পঁচিশ এর যুবক। এ কাঁদছে না। ক্লান্ত দেহটা নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। জন্ডিস হয়েছে, আমাদের ভাষায় ইফেক্টিভ হেপাটাইটিস। অন্ততঃ একমাস বিশ্রাম নিতে হবে এই পরার্মশ শুনে একটু বাদেই ছেলেটার মুখ থমথমে হয়ে যাবে। কেনরে ছেলে ?  বিএ পরীক্ষা দেব ডাক্তারবাবু। অভাবের সংসারে লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্য রোজ সকালে আপনাদের বাড়িতে খবরের কাগজ বিলি করি একটা সাইকেল নিয়ে। বিশ্রাম মানে কাজটাই চলে যাবে। শুধু রোজগার না। পড়বো কি করে ? 

বেঞ্চের পাঁচ নম্বর ব্যক্তি মাঝবয়সী লোক। চিন্তা ভাবনায় বয়সের থেকে বেশি বুড়ো লাগছে। টিবি রোগ ধরা পরতে শপিং মলের সেলস ক্লার্ক এর চাকরিটা গেছে। দু মাস তো ওষুধ খেলাম ডাক্তারবাবু।  আমার অসুখটা কি এখনো ছোঁয়াচে ? একবারটি লিখে দেবেন আমি সেরে গেছি। যদি চাকরিটা আবার ফিরে পাই ?

হাসপাতালের আউটডোর/এমার্জেন্সির বেঞ্চে বসা কয়েকটা লোক। মানুষ। পেশেন্ট আমাদের কাছে। আসলে এক টুকরো ভারতবর্ষ। ডাক্তারের অপেক্ষায় আছে। কখন সেই ধন্বন্তরীর দেখা পাওয়া যাবে। যিনি দেখা দিলেই সব ভালো হয়ে যাবে। ঠিক হয়ে যাবে। 

আউটডোর/ ইমারজেন্সিতে আজ আমার যে বন্ধু বসবেন গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে এই ভারতবর্ষ কে দেখতে, তার ভূমিকায় একবার নিজেকে কল্পনা করে দেখবেন একটি বার ? স্টেথো ঝুলিয়ে ডাক্তার সেজে সারিয়ে তোলা যাবে তো এই ভারতবর্ষ কে ?

কাটা হাত, পোড়া মুখ, ভাঙা পা, বেড়ে যাওয়া লিভার, ফোপরা ফুসফুস নিয়ে ভারতবর্ষ বসে আছে পাশাপাশি। কাছাকাছি ঘেঁষাঘেষি করে। অপেক্ষায় আছে। আমার আপনার অপেক্ষায় ।

রবিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৯

জামুন কা পেড় ~ অরিজিৎ গুহ

বেলা আর বাতুল এর গল্প শুনেছেন? অনেকেই শোনেন নি হয়ত। আসুন শুনে নি। গল্পটা আমরা শুনছি বোম্বের প্রসিদ্ধ ফরাস রোডের এক তওয়াইফের মুখ থেকে।
    বেলা ছিল রাওয়ালপান্ডির কাছের একটা গ্রামের মেয়ে। ক্লাস ফোরে পড়ত। বাবার খুব আদরের মেয়ে ছিল। এগারো বছর বয়স। আর কয়েকবছর পরেই হয়ত গ্রামেরই কোনো গরীব ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত, তারপর সুখে ঘরকন্না করতে পারত। 
    কিন্তু হঠাৎ করেই কী হল, একদিন আল্লাহ হো আকবর বলে একদল লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল বেলার বাড়ির ওপর। বেলার বাবাকে তরোয়ালের কোপে ধর থেকে মুন্ডুটা আলাদা করে দিল, মায়ের স্তন কেটে দিল, আর আরো যেসব হিন্দু বাড়ি ছিল সব বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল। গ্রান্ট রোডের এপারে ফরাস রোডে জিন্নাহ্ সাহেব কোনোদিনও আসবেন না। শরিফ আদমিরা কখনো গ্রান্ট রোড ক্রস করেন না।কিন্তু জিন্নাহ্ সাহেব একবার যদি বেলার সাথে দেখা করতেন, তাহলে হয়ত বেলাকে বোঝাতে পারতেন বেলার সাথে যা হয়েছে তা করার অধিকার কোরাণে কোনো মুসলমানকে দেয় নি। 
    বেলা এরপর পালিয়ে চলে আসে রাওয়ালপিন্ডি। সেখানে এক মুসলিম দালাল ওকে নিজের হেপাজতে করে নেয়। সেই দালালের থেকে আরেক দালাল ওকে কিনে নেয়। তারপর বেলার ঠাঁই হয় ফরাস রোডের তওয়াইফখানায়। বেলার মুখটা যদি জিন্নাহ্ সাহেব দেখতে পেতেন, তাহলে বুঝতেন 'মাসুমিয়াত কি কোই মজহব নেহি হোতি'। এক সরল নিষ্পাপ বাচ্চা মেয়ের মুখ। সেই মুখে ধর্ম লেখা নেই। সেই মুখে হিন্দুস্তান পাকিস্তান লেখা নেই। সেই মুখ হিন্দু মুসলিম শিখ ইসাই যে কারো মুখ হতে পারে। জিন্নাহ্ সাহেবের বাংলোতে যে বেলার চিৎকারের আওয়াজ পৌঁছায় না!

   বাতুল থাকত জলন্ধরের কাছের এক গ্রামে। বাবা খুবই গরীব। মুটে মজুরি করে চালায়। অনেকগুলো দিদি আর ভাইদের নিয়ে তার মধ্যেও শান্তিতে থাকত ওরা। বাতুলদের গ্রামে 'নমাজ আদা' করার কোনো হুকুম ছিল না। বাতুল কোনোসময়ে জিন্নাহ্ সাহেবের গল্প শুনেছিল। সেই থেকে জিন্নাহ্ সাহেবকে খুব পছন্দ করত। গলায় একটা লকেট ঝুলিয়েছিল জিন্নাহ্ সাহেবের ছবি দিয়ে। 
    হিন্দুস্থান পাকিস্থান ভাগ হওয়ার পর বাতুল স্লোগান দিয়ে ফেলেছিল পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে। ঠিক যেরকমভাবে পাঁচ ছ'বছরের বাচ্চা কোনো কিছু না বুঝেই ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে ফেলে, সেরকমই আরকি। 
   সেই স্লোগান শুনে গ্রামের জাঠরা এসে প্রথমে ওর বাবার জামা কাপড় খোলাল, তারপর মুখে পেচ্ছাপ করল, তারপর বাবার বুকে ছুরি ঢুকিয়ে দিল। দিদিদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলে গেল আড়ালে। 
   এরপর বাতুলকে যখন এক হিন্দু দালালের থেকে ফরাস রোডের ওই তওয়াইফ কিনে নিল, তখন সে দেখেছিল বাতুলের সারা গায়ে আঁচড় কামড়ের দাগ।  পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তো অনেক পণ্ডিত মানুষ আর উনিও অনেক শরিফ আদমি। তাই উনিও কখনো ফরাস রোডের তওয়াইফখানায় ঢুকবেন না কোনোদিন। কাজেই বাতুলকেও দেখতে পাবেন না কোনোদিন। যদি দেখতে পেতেন, তাহলে হয়ত উনি বোঝাতে পারতেন যখন বাতুলের সাথে এরকম হচ্ছিল, তখন ঋকবেদ স্তম্ভিত হয়ে গেছিল। গুরু গ্রন্থসাহিব বোবা হয়ে গেছিল। কারণ দুই কিতাবের কোথাও যে লেখা ছিল না বাতুলের সাথে এরকম ব্যবহার করার কথা।
    নেহেরুজি'র বাংলোতে যে বাতুলের চিৎকারের আওয়াজ পৌঁছায় নি। নেহেরু জি কী করবেন!

 কৃষণ চন্দর যখন 'এক তওয়াইফ কি খৎ জিন্নাহ্ সাব অউর নেহেরু জি কো' লিখেছেন তার কিছু আগেই আজাদি এসেছে। কিন্তু তাও বারেবারে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে গেছেন কৃষণ চন্দর।
    'মহালক্সমী কা পুল' গল্পে মহালক্সমী পুলের পাশে বসবাসকারী নিম্নবিত্ত শ্রমিক বস্তির যে ছবি এঁকেছেন তার প্রতিটা ছত্রে লুকিয়ে রয়েছে ভদ্র সভ্য উচ্চবিত্তদের প্রতি বিদ্রুপ। 
   পুলের পাশে মিল মজদুররা তাদের নিজেদের নিজেদের চওলে থাকে। পুলের ওপর ওদের স্ত্রীদের শাড়ি শুকোতে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ছটা শাড়ি শুকোতে দেওয়া হয়েছে। শান্তাবাঈ এর ফ্যাকাসে বাদামী রঙের শাড়ির পাশে যে শাড়িটা ঝুলছে শুকোতে দেওয়ার জন্য, সেই শাড়িটাও পাঠকদের চোখে ফ্যাকাসে বাদামী রঙই মনে হবে। কিন্তু কথক, যিনি একজন পয়ষট্টি টাকা মাইনের ক্লাস টেন পাস করা ক্লার্ক, যখন থেকে শাড়িটা দেখেছেন তখন সেটার রঙ ছিল গাঢ় বাদামী। পুরনো হয়ে রঙ হাল্কা হয়ে হয়ে সেটা ফ্যাকাসি বাদামী রঙে পর্যবসিত হয়েছে। তার পাশে রয়েছে মিল থেকে বহিষ্কৃত শ্রমিক ঝাব্বুর স্ত্রী লোড়ির শাড়ি। লোড়ির শাড়ির পাশে ঝুলছে মঞ্জুলার শাড়ি। সব থেকে ঝকমকে শাড়ি ওটা। কারণ মঞ্জুলার কয়েকমার আগে বিয়ে হয়েছে আর বিয়ের শাড়িটাই ঝুলছে। মঞ্জুলার স্বামী কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। মঞ্জুলার পাশে শেষ সে শাড়িটা ঝুলছিল সেটা ছিল বুড়ি মা। যার ছেলে সিতু এখন জেলে। সরকার থেকে যখন হরতাল বে আইনি ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন সিতুরা জুলুস বের করেছিল হরতালের সমর্থনে। পুলিশ থেকে মহালক্সমি পুলের পাশের চওলে গুলিবৃষ্টি চলে। সবাই ভয় পেয়ে নিজের নিজের চওলের দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে যখন সব শান্ত হয়ে যায় তখন দেখা যায় সিতুর মা গুলি খেয়ে মরে পড়ে আছে। বুড়ি মানুষ, হয়ত তাড়াহুড়ো করে নিজের খোপরে ঢুকতে পারে নি। সেই লাল শাড়িটা এখন পরে সিতুর বৌ। সিতু হরতাল করার জন্য জেলে রয়েছে।
    একটু পরই মহালক্সমী পুলের ওপর দিয়ে 'ওয়াজির এ আজম' মানে প্রধানমন্ত্রীর কনভয় যাবে। প্রধানমন্ত্রীর চোখেও সেই ঝোলানো শাড়িগুলো চোখে পড়বে না। যতক্ষণ না প্রধানমন্ত্রীর কনভয় যায় ততক্ষণ ধরে সেই শান্তাবাঈদের কলোনির গল্প শুনিয়েছেন কৃষণ চন্দর। 
   যুবতী শান্তাবাঈ, বৃদ্ধা জীবনা বাঈ বা কথকের মধ্যবয়সী স্ত্রী সবার গল্প মোটামুটি একইরকমের। প্রতি পদে অর্থের হাহাকার, ছোট্ট ছোট্ট সাধ আহ্লাদ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ না হওয়ায় জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা আর তারই সাথে কুসংস্কার, সব যেন একসাথে হাত ধরাধরি করে রয়েছে। সবার শাড়িগুলো একসাথে যখন পাশাপাশি উড়তে থাকে তখন প্রত্যেকের শাড়ির রঙগুলো আর আলাদা করে চেনা যায় না।
   প্রত্যেকের গল্প বলতে বলতেই কখন যে প্রধানমন্ত্রীর কনভয় চলে যায় বোঝাও যায় না। আসলে কনভয় তো এই মহালক্সমী পুলের পাশে দাঁড়াবে না, প্রধানমন্ত্রীর অত ঠেকাও পড়ে নি। কিন্তু ওই ছ'টা শাড়ি যেন ভারতবর্ষের লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিদিনের গল্প বলে যায়।
   ১৯৩৬ সালে যখন প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন তৈরি হয় প্রেমচন্দকে সভাপতি আর সাজ্জাদ জাহিরকে সম্পাদক করে, তখন সেই সংগঠন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইকবাল আর নজরুলের আশীর্বাদ ধন্য হয়ে ওঠে। উর্দু সাহিত্য সেই সময়ে মোটামুটি আগের অবাস্তব আবেগের জায়গা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে বাস্তবের মাটিতে। 
    প্রথম সম্মেলনে আহম্মদ আলি, আলি আব্বাস হুসায়নী, মুলকরাজ আনন্দ, খাজা আহমেদ আব্বাস, শওকত সিদ্দিকে, গোলাম আব্বাস, আহমেদ নাদিম কাশমী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য নাম হলেও চারজন যারা পরবর্তীকালে উর্দু সাহিত্যের স্তম্ভে পরিণত হয়েছিলেন তারা হলেন সাদাত হাসান মান্টো, রাজিন্দার সিং বেদি, ইসমাত চুঘতাই আর কৃষণ চন্দর। বলা যায় এই চারজন উর্দু সাহিত্যকে শাসন করেছেন। তবে বাকি তিনজন যেমন চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক জগৎ নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করেছেন কৃষণ চন্দর আবার চিরকাল সাহিত্য রচনা করে গেছেন শোষিত শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে। প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের পতাকা সার্থক ভাবে বয়ে নিয়ে গেছেন। মান্টোর মতই দাঙ্গা আর দেশভাগকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
    'গাদ্দার' গল্পে বৃদ্ধ বুলাকি শাহ চারিদিকের শয়ে শয়ে পড়ে থাকা লাশের মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে কী যেন খুঁজতে থাকে। বৈজনাথের কন্ঠে চমকে উঠে বলে 'আমি মুসলমান। আমাকে মেরো না।' জবাবে বৈজনাথ যখন বলে মুসলমান হলে এখানেই তোর লাশ ফেলে দেব, তখন উত্তরে বুলাকি শাহ জানায় আমি বুলাকি শাহ। বৈজনাথ এবার আশ্চর্য হয়। গ্রামের সব থেকে বড় মহাজন বুলাকি শাহ! বৈজনাথ জিজ্ঞাসা করে এখানে কী করছ? ততক্ষণে বুলাকি শাহ ভয় কাটিয়ে উঠেছে। বলে সব তো মরে পড়ে রয়েছে এখানে। আমার পরিবারেও কেউ বেঁচে নেই, সম্পত্তিও সব লুঠপাট হয়ে গেছে। শুধু মেয়েটা বেঁচে রয়েছে। তা মেয়েটাকে তো বিয়ে দিতে হবে। যা পাচ্চি এখান থেকে সোনাদানা তাই হাতিয়ে নিচ্ছি পকেট থেকে। তুমিও এসো না। যা পাব ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়ে নেব।
    স্তম্ভিত হয়ে যায় বৈজনাথ। মানুষ কোথায় নামতে পারে ভেবে! বুলাকি শাহ বলে মেয়ের বিয়ের যৌতুক ছাড়া কেউ তো মেয়েকে বিয়ে করবে না।
    দেশভাগ আর দাঙ্গার নানারূপ দেখেছেন কৃষণ চন্দর। বরাবর গল্প বলেছেন নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া গরীব মানুষের। তাঁদের দুঃখ দুর্দশা, লড়াই করা হেরে যাওয়া এবং আবার জানকবুল লড়াই এর জন্য উঠে পড়া, এই গল্পই শুনিয়ে গেছেন। তেলেঙ্গানা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে 'রোটি কাপড়া মকান' এক অদ্ভুত গল্প। 
   খাজা আহমেদ আব্বাস যখন সিনেমা করবেন বলে ঠিক করলেন, তখন বাংলার বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' আর 'জবানবন্দি' এই দুটো নাটকের গল্প শোনা হয়ে গেছে। ৪৩ এর মন্বন্তরকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন আব্বাস। এরপর কৃষণ চন্দরের 'অন্নদাতা' গল্পে পড়ে ঠিক করলেন তিনটে গল্পকে একসাথে নিয়ে একটা সিনেমা বানাবেন বাংলার ৪৩ এর মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে।
    যথা সময়ে 'ধরতি কে লাল' সিনেমা তৈরি হল আইপিটিএ র সব রথী মহারথীর সাহায্যে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিও পেল সেই সিনেমা। এটাই একমাত্র সিনেমা যা আইপিটিএর নিজস্ব প্রযোজনায় তৈরি। সেখান থেকেই ফিল্ম জগতের সাথে যোগাযোগ তৈরি হয় কৃষণ চন্দরের। 
   এক সময়ে সিনেমার স্ক্রিপ্ট আর গল্প লেখার পেছনে এত সময় দিতে হয়েছিল যে তাঁর নিজের গল্পে সেই প্রভাব পড়েছিল। গল্পের ধার গেছিল কমে। 
    নীহাররঞ্জন গুপ্তের লেখা 'উত্তর ফাল্গুনি' হিন্দি স্ক্রিপ্ট 'মমতা' কৃষণ চন্দরেরই লেখা। এছাড়াও অসিত সেনের আরেকটি সিনেমা 'সরাফত' যেখানে ধর্মেন্দ্র হিরো ছিল তার গল্পও কৃষণ চন্দরের। কিন্তু তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন যে সিনেমার জগতে থাকলে তার গল্পের মান নেমে আসছে। অবশেষে ছেড়ে দিলেন সিনেমার জগত। ১৯৭৭ এ যখন মৃত্যু হয় তখন হাসপাতালে তার বেডের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দ্বিতীয় স্ত্রী  সালমা সিদ্দিকি। লিখতে শুরু করেছিলেন নতুন একটি গল্প। কয়েক লাইন লেখার পরই ঢলে পড়েন মৃত্যুর মুখে। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে নিভে যায় উর্দু সাহিত্যের এক স্তম্ভ কৃষণ চন্দরের জীবন দীপ। 
   
    ১৯৭৭ এ মৃত্যু হলেও একজন লেখক কতটা প্রভাবশালী হতে পারেন তার পরিচয় পাওয়া গেছে এই ২০১৯ এ এসে। গত মাসে এক সার্কুলার জারি করে আইসিএসসি বোর্ডের দশম শ্রেনীর সিলেবাস থেকে 'জামুন কা পেড়' বলে একটি গল্প বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। গল্পটিতে খুব তীক্ষ্ণভাবে মজার ছলে ভারতের ব্যুরোক্রেসির প্রতি, লাল ফিতের ফাঁসের প্রতি প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। সরকারের সেসব পছন্দ না হওয়াই স্বাভাবিক। কাজেই আজও কৃষণ চন্দর কতটা প্রাসঙ্গিক বোঝা যায়।

    ১৯১৪ সালের আজকের দিনেই অর্থাৎ ২৩ শে নভেম্বর জন্ম হয়েছিল কৃষণ চন্দরের।

শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯

শওকত আজমী ~ অরিজিৎ গুহ

শওকত আর কাইফির যখন বিয়ে হয়, তখন শওকতের বয়স খুবই অল্প। সাংসারিক কোনোরকম অভিজ্ঞতাই নেই প্রায় বললেই চলে। স্বামী কাইফি কমিউনিস্ট পার্টির হোল টাইমার। পার্টির দেয় ভাতাতেই চালাতে হত সংসার। পার্টি থেকেই ওদের জন্য একটা কমিউন দেওয়া হয়েছিল যেখানে আরো তিনটে পরিবারের সাথে বোম্বেতে মাথা গোঁজার ঠাই হয়েছিল। 
   কাইফি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যের সাথে সাথেই ছিল প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। আর যুক্ত ছিল আইপিটিএ র সাথে। বাকি যে তিনটে পরিবার ছিল তারাও ছিল আইপিটিএর সদস্য। কাজে কাজেই অরঙ্গাবাদ থেকে আসা কিশোরী শওকতের থিয়েটার আর স্টেজ শো'র প্রতি আগ্রহ বেড়ে ওঠে। নিজেও যুক্ত হতে চায় থিয়েটারের সাথে। আর্থিক অনটনও একটা কারণ ছিল অবশ্য। থিয়েটার করলে কিছু অতিরিক্ত আয় করা যেত। 
   থিয়েটার করতে করতেই জড়িয়ে পড়লেন বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। আইপিটিএ'র সদস্যপদও ততদিনে নেওয়া হয়ে গেছে শওকতের। সন্তান হওয়ার পর সন্তানের পরিচর্যার সাথে সাথে অভিনয়ও চলতে থাকল। স্বামী কাইফি আজমি ততদিনে কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন সাহিত্য সমাজে। সিনেমার গানের লিরিক লিখে রোজগার বাড়তে শুরু করেছে। 
   আস্তে আস্তে একার হাতে সংসার আর ছেলে মেয়ে সামলে অভিনয় জগতে নিজের একটা স্বীকৃতি জোটাতে সক্ষম হলেন শওকত কাইফি বা শওকত আজমি। বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে স্বামীর পরিচয়ও কাজে দিয়েছিল অবশ্য এক্ষেত্রে। আস্তে আস্তে স্বছলতা এলো সংসারে। সেই সময়েই তাঁরা উঠে এলেন জুহুতে।
     
     মেয়ে শাবানাকে অভিনয় জগতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা ছিল মায়ের। চারের দশকের শেষদিক থেকে ২০০২ এ কাইফি আজমির মারা যাওয়া অব্দি দুজনের সম্পর্ক শুধুমাত্র দাম্পত্য সম্পর্কই ছিল না। দুজনেই ছিলেন দুজনের কমরেড। 
   সব থেকে কাছের কমরেড ২০০২ এ মারা যাওয়ার ১৭ বছর পর শেষ হল আরেক কমরেডের জার্নি। কিছুক্ষণ আগে মারা গেলেন শওকত কইফি বা শওকত আজমি। আজকের বলিউডের অনেকেই হয়ত এসেছেন ইতিমধ্যে শ্রদ্ধা জানাতে বা আসবেন, কিন্তু তাঁদের অনেকেই সেই আইপিটিএ'র লড়াইয়ের দিনগুলোর কথা জানবেন না।

   কমরেড শওকত আজমি লাল সেলাম।

সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯

শুভ চৌর কার্তিক পূজা ~ কৃষ্ণা সর্বরী দাশগুপ্ত

--'যাত্রা দেখে আলেন বুঝি, মাঠান?' প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে গেলেন নিভাননী। হেমন্তের ভোর। সবে আলো ফুটছে। সে আলোয় যেটুকু ঠাহর হয়, তাতে মনে হল, বারান্দায় চাদর মুড়ি দিয়ে চেয়ারে বসে আছে যেন কেউ। প্রশ্নটা তারই। হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে আসছিলেন তিনি। পাড়ার বাকি মেয়ে-বউরা পিছনে পড়ে গেছে। চেয়ার ছেড়ে ইতিমধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে লোকটা। হাতের কাঁসার গেলাসটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে বলল," একটু চা করে খেয়েছি। তা' আমি কায়েতের ব্যাটা, রান্নাঘর অশুদ্দু করিনি আপনের।"
--"কিন্তু তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না, বাবা--"
--"চেনার কথাও নয়, আজ্ঞে। আমি চোর।" বিনীতভাবে কথাটা বলেই বারান্দার কোন থেকে কাপড়ের পুঁটলিটা তুলে নিয়ে একলাফে নিমেষে ধাঁ হয়ে গেলো লোকটা। নিভাননী ততক্ষণে সিঁড়িতেই বসে পড়েছেন ধপ করে।
কর্তা ঘুম থেকে উঠে সব শুনে বললেন," বাঃ, বেশ সপ্রতিভ চোর তো! পাকা চোরকে কেমন হতে হয়, জানো? শূদ্রকের 'মৃচ্ছকটিকে' শর্বিলক নামে আর এক চোরই বলে দিয়েছে সে কথা। সে হবে আক্রমণে বিড়াল, পলায়নে হরিণ, লুঠে বাজ, গৃহস্থ জেগে না ঘুমিয়ে, তা শুঁকে বোঝায় কুকুর, চলনে সাপ, স্থিরতায় পর্বত, গতিতে পক্ষীরাজ,পর্যবেক্ষণে গরুড়, কেড়ে নিতে চিতা আর শক্তিতে সিংহের তুল্য।" এদিকে ঘরে ঢুকে নিভাননীর তখন মাথায় হাত।, রান্নাঘরের বাসন বেবাক ফাঁকা করে গেছে এযুগের শর্বিলক। মৃচ্ছকটিক শোনার চেয়ে তাঁর কাছে জরুরি এখন, দুপুরে ভাত বাড়ার জন্যে কলাপাতা কেটে আনা।
চুরি ব্যাপারটা গৃহস্থের কাছে সুখকর না-হতে পারে, কিন্তু একে চৌষট্টি কলার অন্যতম বলে স্বীকৃতি দিয়ে জাতে তুলে দিয়েছেন  বাৎস্যায়ন। বাকি সব বিদ্যার মতো এই চৌর্যকলাও যে রীতিমত গুরুসঙ্গ করে 'অধ্যয়ন' করতে হত, তার প্রমান, 'ষন্মুখকল্পম' বা 'চৌরচর্যা'র মতো চৌরশাস্ত্র। এই 'ষন্মুখ' বা ষট মুখ হলেন দেবসেনাপতি, কুমার কার্তিকেয়। তস্করকুল 'শুভকাজে' হাত দেবার আগে ছয় মুখ, বারো হাত, সোনার বরণ এই সুদর্শন দেবতাটিকেই যথাবিহিত আরাধনা করে। "ওঁ বন্দেঅহং মহাত্মানং ময়ুরোপরি সংস্থিতম। / বিশ্বেশং শত্রূহন্তারম দ্বাদশাস্ত্রৈচ শোভিতম।/ তপ্তকাঞ্চনবর্ণাভম নানালংকারভূষিতম।/ ষন্মুখং পুত্রদায়কম তস্করাধিপতিম সুরম।" একদিকে যিনি সুরলোকের রক্ষক, অন্যদিকে তিনিই   চোর চূড়ামণি ।
তস্কর সমাজে গোত্রভেদ অতি প্রবল। ডাকাতের সঙ্গে সিঁধেল চোরকে, ছিঁচকের সঙ্গে গাঁটকাটাকে গুলিয়ে ফেলা সেখানে অমার্জনীয় অপরাধ। ডাকাতিতেপ্রাধান্য পায় পেশিশক্তি আর নৃশংসতা, তুলনায় চুরির কারুকাজ অনেক বেশি। চৌর্যকর্মটি নির্বিঘ্ন করতে শাস্ত্রমতে চোরকে মারণ, উচাটন, স্তম্ভন, বশীকরণ ও শান্তিকর্ম এই পাঁচটি তান্ত্রিক আভিচারিক ক্রিয়া করতে হত বটে, কিন্তু সচরাচর খুনির তকমাটি তারা এড়িয়েই চলত। চুরিবিদ্যায় হাতেকলমে শিক্ষার ছবি পাই মনোজ বসুর 'নিশিকুটুম্ব'তে। .
'...ঘরে ক'জন?
-- দু-জন।
--ঠিক করে বলছ বটে?
-- হ্যাঁ, দু'রকমের নিশ্বাস ঘরের মধ্যে। দুরকম ছাড়া তিনরকম নয়, একরকমও নয়। তবে মানুষ নয় দুজনাই, একটি ওর মধ্যে বিড়াল। বিড়াল ঘুমুলে ঘু-উ -উ একটা শব্দ হয়।
--সাবাস বেটা। কী মানুষ,দেখি বলতে পারিস কিনা।
--মেয়েমানুষ। সধবা।
--পুরুষ নয় কেন? সধবাই বা কেন?
--পাশ ফিরলেই চুড়ির আওয়াজ। বিধবা বা পুরুষ হলে হাতে চুড়ি থাকতনা।
কিন্তু এমন চোরচক্রবর্তী তো সকলে হয় না। কোথাও আবার বুদ্ধিতে গৃহস্থ তাকে হারিয়ে দেন। একা মহিলা ঘুমিয়ে আছেন কোলে শিশুটি নিয়ে। চোরের খুটখাট শুনে বুকের মধ্যে হাতুড়ি পড়ে। কিন্তু চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করার বোকামিটি না করে মরীয়া হয়ে শুধু একটু অভিনয় করলেন তিনি। পাশের কোলবালিশে আপাদমস্তক চাদর মুড়ে ফিসফিস করে (যা পাশের ঘরে শোনা যায়) বললেন, "শুনছ, ঘরে মনে হয় চোর ঢুকেছে। ওঠ শিগগির। তোমার পিস্তলটা কি বালিশের তলায় নাকি দেরাজে তুলে রেখেছ আবার? কতবার বলেছি লোডেড বন্দুক নাগালের মধ্যে বাচ্চার নাগালের মধ্যে রাখবে না। নাও ওঠ এখন। প্রাণের মায়া বড় মায়া। বালিশে মাথা রেখেই একাকিনী টের পান, 'অতিথি'র নিঃশব্দ নিষ্ক্রমণ।
সে একটা সময় ছিল, যখন চোরেদের মধ্যে সিঁধেলরা ছিল কুলীন। শিক্ষাশেষে গুরুর আশীর্বাদধন্য সিঁধকাঠি হাতে পাওয়াই ছিল যৌবরাজ্যে অভিষেক। শ্মশানের কয়লা আর রক্ত দিয়ে রাক্ষসমুখ, নারীমুখ, মৎস্যমুখ, চাঁদ, সূর্য বা পদ্ম এঁকে সেই বরাবর সিঁধ কেটে ঢুকতে হবে। ওস্তাদেরা বলতেন, সিঁধ এমন হবে যে পরদিন প্রতিবেশী চোরের বাপান্ত করলেও সিঁধের প্রশংসায় যেন পঞ্চমুখ হন।  সিঁধ কেটে প্রথমেই মাথা গলিয়ে দিতে নেই। আগে নকলি বা পুতুল ঢুকিয়ে ভিতরের পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে প্রথমে গলাতে হবে পা। তারপর সন্তর্পণে এমন ভাবে গলিয়ে দিতে হবে শরীর। বরাত খারাপ হলে তার আগেই গৃহস্থ যদি পা ধরে ফেলে তাহলে মুশকিল। একজন ধরা পড়লে পুরো দলটাই ধরা পড়ে যেতে পারে, সেই ভয়ে কোন সময় হতভাগ্য চোরটির পরিচয় হাপিস করতে তার মাথাটাই কেটে নিয়ে গেছে স্যাঙাতরা এমন নজিরও আছে।
কথায় বলে, 'চোরে কামারে দেখা হয় না'। চৌর্যশাস্ত্রের বিধিই তাই। কামারের ঘরে চুপি চুপি এসে কাঁচা টাকা রেখে সিঁধকাঠির বরাত দিয়ে চলে যাবে চোর। নির্দিষ্ট সময় পরে ঠিক সেখানেই তৈরি থাকবে কাঠি। ক্রেতা-বিক্রেতা সাক্ষাৎ হওয়া মানা। ঘুমপাড়ানি মন্ত্রবলে ঘরের মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে চোর যখন ঢুকবে তার সঙ্গে থাকবে আলোর পোকা আর বীজ। পোকা ডানার ঝাপটায় প্রদীপ নিভিয়ে দেবে। মাটিতে টাকাকড়ি, সোনাদানা পোঁতা থাকলে মন্ত্রপূত বীজ সেখানে পড়লে ফুটে যাবে ফটফট করে। চোখে মায়াকাজল লাগিয়ে অদৃশ্য হওয়া বা চুরিতে কেউ বাধা দিলে গুপী গায়েনের মন্ত্রী মশাইয়ের মতো 'থেমে থাক' বলে তাকে স্থানু করে দেওয়ারও তন্ত্রবিধি রয়েছে শাস্ত্রে।
সিঁধ কাঠি আবার শহরে অচল। রাত দুপুরে খড়খড়ি জানালার তলা দিয়ে ঢুকে আসে লম্বা লগি। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ছেলে-ছোকরারা কাটা ঘুড়ি ধরে যা দিয়ে, তেমনি। সত্তরোর্ধ বৃদ্ধা বিছানা থেকে দেখেন, সে লগির চলন সিধে তার আলনাটির দিকে। বাটা খুলে একটি পান মুখে দিয়ে তিনি ধীরেসুস্থে গিয়ে জেঁকে বসেন লগির ওপর। চোর পড়ল বিপাকে। লগি নড়ে না কেন দেখতে কার্নিশে উঠে সোজা বুড়ির সঙ্গে চোখাচোখি -- "ওমা, হারু! তুই আবার চুরি ধরলি কবে থেকে?" হারু ততক্ষণে লগি-টগি ফেলে দে-ছুট! বুড়ি চিনে ফেলেছে। আজকে চোর হলেও তারও একটা টুনটুনির বইয়ের শৈশব ছিল। ঊর্ধশ্বাসে পালাবার সময় সেই বইয়ের ঝাপসা হয়ে যাওয়া স্মৃতির পাতা থেকে যেন জ্যান্ত হয়ে ওঠে পান্তা বুড়ির অবয়ব। পান্তা চোরকে শিক্ষা দিতে যে কিনা হাঁড়িতে শিঙি মাছ, উনানে বেল, দোরে গোবর আর ঘাসে ক্ষুর রেখে দিয়েছিল। হারুর বোধের মধ্যে কোথায় যেন পাড়ার এই খুনখুনে ঠাকমা আর পান্তাবুড়ি একাকার হয়ে যায়।
চোরেদের কথা উঠলে আশপাশে সকলের ঝুলি থেকে চোর-পাকড়ানো, চোর-তাড়ানো বা নিদেন চোর-পালানোর এক-আধটা গল্প উঁকি দেবেই। তারমধ্যে রোমহর্ষক ভয়ের গল্পের পাশাপাশি থেকে যান পঞ্চার পিসে, যিনি নাকি পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আলোয় ঘুম চোখে আয়নায় নিজের গেঞ্জিপরা চেহারা দেখে চোর সন্দেহে গুটিগুটি এগিয়ে রামধাক্কা খেয়েছিলেন আলমারিতে। শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে পিসি চিৎকার জোড়েন, "পাকড়ো পাকড়ো , চোর হ্যায়।" পিসে তার মুখে হাত চাপা দিয়েও থামাতে পারেন না। রঘুর বোন-ভগ্নিপতি জামাই-ষষ্ঠীতে এসেছে। পাশাপাশি দু'ঘরের মাঝে একটিই বাথরুম। মাঝরাতে জামাই সেখানে যেতে গিয়ে শাশুড়ির ঘরের শিকল তুলে খুলতে ভুলে গেছে। ওদিকে দরজা খুলছে না দেখে মা-ছেলে ভাবল, নির্ঘাত চোর পড়েছে। ছেলে রাম ভীতু। বলল, "দাঁড়াও, আমরা সজাগ আছি দেখলে চোর পালাবে। রাত আড়াইটায় তবলা টেনে নিয়ে বাজাতে বসল রঘু। রাতের নিস্তব্ধতা খান-খান করে তবলার বোল পিলে চমকে দিল গোটা পাড়ার।
সময়ের সঙ্গে চুরিও তার চরিত্র বদলেছে। সাইবারক্রাইমের হাইটেক শিল্পসুষমা মানুষকে সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে অনায়াসে। নব অবতারে সিঁধ হয়েছে গ্যাস-কাটার, কংক্রিট থেকে ইস্পাত কিছুই তার অভেদ্য নয়। আরও মহিমময় হয়েছে সাহিত্যে চুরি -- কুম্ভীলকবৃত্তি। তার বাড়বাড়ন্তে দোসর হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াও। তবে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক চুরি বোধহয় সেটি যা চোরকে বিন্দুমাত্র ধনী না করেও তার শিকারকে করে দেয় নির্ধন, নিরালম্ব। নিছক স্বার্থসিদ্ধির জন্যে বেমালুম লোপাট হয় ব্যক্তির সম্মান।  মনে পড়ে ওথেলো নাটকের সেই দীর্ঘশ্বাস – "But he that filches me my good name / Robs me of that which not enriches him / And makes me poor indeed."
আজ সাতসকালে এই চোর-চর্চার মূলে আছেন চৌর্য কূলাধিপতি কুমার কার্তিক। বাঙালির মাসাধিককাল লম্বা পুজো-মরসুম আজ শেষ হচ্ছে তাঁর আরাধনা দিয়ে।
শুভ চৌর কার্তিক পূজা!
তথ্যসূত্র:  
 চৌর্যসমীক্ষা -- ডঃ পুরীপ্রিয়া কুনডু 
 নিশিকুটুম্ব -- মনোজ বসু

রবিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৯

অসাম্য ~ মধুশ্রী বন্দোপাধ্যায়

পুরানো দিনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে? সত্যি করে? 

ষাট সত্তর দশকে কলকাতা শহরে কটা বাড়িতে ফ্রিজ ছিল? ল্যান্ড লাইন ফোন ছিল? ছিল পাম্পের জল? ক'জনা গিয়েছেন বেসরকারি নার্সিং হোমে চিকিৎসার প্রয়োজনে? কজন বাড়িতে এসি মেশিন চালিয়ে নিদ্রাসুখ উপভোগ করতেন? আর গাড়ি চালিয়ে উইকেন্ড ট্যুরে যেতেন? কজনের বাড়িতে আলাদা একটা ঘর ছিল শুধুমাত্র বসবার প্রয়োজনে? তার সাথে চিন্তা করুন বছরে, দু-বছরে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ। 

এগুলো এখন ভারতীয় মধ্যবিত্তর জীবন ধারণের অপরিহার্য অংশ। 

এখন দেশে মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ফুরফুর করে হাওয়ায় উড়ছে। আছে কিছু অবসর, বাড়িতে আছে ফাঁকা জায়গা, আছে পার্সোনাল স্পেস। এসব কিছু ছিল না তখন। তবু আমরা এত ক্ষুব্ধ কেন? সত্যি কথা বলতে আমাদের ক্ষুব্ধ হবার কোন কারণ নেই। 

আমাদের দেশের মধ্যবিত্তর অবস্থার উন্নতি হয়েছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে, প্রায় উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি। আবার আমরা পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর সব সুবিধাও পাই। এই যেমন প্রায় সবার বাড়িতে গড়পড়তা দুজন সাহায্যকারি আছেন। বাড়ির কাজ প্রায় কিছু করতে হয় না।

নয় দশকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম তখন কোন এক কনফারেন্সে যোগদান করতে গিয়েছিলাম বার্সেলোনাতে। গিয়ে দেখি, ওমা, এ যে শুধু ছেলেদের রাজত্ব। পরে বুঝলাম, পরিবার সন্তান রেখে কনফারেন্স করা তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশের নারীর পক্ষে যতটা সুবিধাজনক ততটা নয় উন্নত দেশের মেয়েদের পক্ষে। এতে অবশ্য নেচে উঠবার কিছু নেই। এটা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ওদের দেশে তবু আয়ের কিছুটা সমতা আছে, আমাদের নেই। আমরা প্রয়োজনে দু চারটে কাজের লোক রেখে যেতে পারি এদিক-ওদিক।

পৃথিবীতে দারিদ্র্য মোটে কমছে না। আর দুস্তর ব্যবধান হয়ে যাচ্ছে দরিদ্র ও ধনীর মধ্যে। প্রথম ১০% এর ধন বৃদ্ধি পাচ্ছে অতি দ্রুত। আমি আপনি আছি ওই ১০% এ। নিচের ছবিটা দেখুন।  আমাদের দেশের মত অসাম্য আর কোন দেশে এত দ্রুত বাড়ছে না। 

দক্ষিণ এশিয়াতে পৃথিবীর অধিকাংশ দরিদ্র, অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত, রুগ্ন, স্বাস্থ্যহীন, মৃত শিশু, বালিকা বধূ আর যা যা খারাপ ব্যাপার হয়  - সব আছে সবচাইতে বেশি। 

তবে এদের আমরা দেখি না, এরা থাকে অদৃশ্য। এরা অদৃশ্য হতে হতে আমাদের চোখে মিলিয়ে গেছে। এক সময়ে কিন্তু ছিল। দেওয়ালে দেওয়ালে ছিল।

আমাদের গল্প, কথা, মেসেজ ফরওয়ার্ডে, কোথাও এরা নেই। সেখানে আছে রাম মন্দির, হিন্দু মুসলমান, এই সব। 

ওরা যেভাবে চলাতে চান আমরা ঠিক সেই ভাবেই চলি যে। আমাদের নিজেদের নেই কোন কথা, নেই চিন্তা। তাই আমাদেরও ওভাবেই চলতে ভাল লাগে। 

ওই বিশাল দরিদ্র, মূর্খ মানুষের কোন দায় কেউ নেয় না, কেউ নেবে না। 

এই বেশ ভাল আছি। এই বেশ ভাল আছি।

Madhusree Bandyopadhyay
10/11/2019

অযোধ্যা রায় ~ ডঃ রেজাউল করীম

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মোট ১০৪৫ পাতার। সেসব পড়তে ও পড়ে বুঝতে অনেক সময় লাগবে। এই রায়ে অনেক ফাঁকফোকর আবিষ্কার করে সমালোচনা হবে। প্রশংসা হবে, নিন্দা হবে। সেসব ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাক। অনেকদিন পর একটা সমাধান এসেছে। মন্দির মসজিদ পিছনে ফেলে সামনের দিকে তাকাতে হবে। 
যারা হতাশ হয়েছেন তাঁদের বলি, এই রায় শুনে আমার বিখ্যাত হোদায়বিয়ার সন্ধির কথা মনে হয়েছে। যুযুধান "মুসলিম পক্ষ" যে পাঁচ একর জমি পেয়েছেন সেখানে এমন কিছু করুন যা বিশ্বের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে। দেশে হাজার হাজার মসজিদ আছে।অনেকে আবেদন করছেন, আর মসজিদ না বানিয়ে সেখানে একটি হাসপাতাল বা বিশ্ববিদ্যালয় হোক। এই দাবী অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও বর্তমান সময়ের যুগোপযোগী দাবী। এই জমিতে গড়ে উঠুক নালন্দার মত একটি বিশ্বমানের শিক্ষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র। এর নাম যেন কোন রাজা বাদশার নামে না হয়।  এর দায়িত্ব দিন ইরফান হাবিব, ,সায়েদা হামিদ, জোয়া হাসান, জে কে ফয়জান, মালিক জাফর মাহমুদ, হামিদ আনসারি প্রভৃতি  মুক্ত মনের শিক্ষাবিদদের। আজিম প্রেমজি শিক্ষার জন্য হাজার হাজার কোটি খরচ করছেন। তাঁর সাহায্য নেওয়া হোক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হোক অমর্ত্য সেনকে যিনি তিল তিল করে নালন্দার পুনর্জন্ম দিতে সাহায্য করেছেন। 
এ আমার একান্ত ব্যক্তিগত মত। কিন্তু মুসলিমদের নিয়ে এ দেশে যে কুৎসিত রাজনীতি হয়, অন্য ধর্মের অনেক মানুষ যে মুসলিমদের সম্পর্কে ভুল ধারনা পোষণ করেন তা দূর করার একটি সুবর্ণ সুযোগ পাওয়া গেছে। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করুন। নাহলে, মুসলিম সেমিনারিদের হাতে পড়ে আরেকটি দেওবন্দ গড়ে উঠলে তা এই সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত হানিকর হবে।

শনিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৯

কাজ একটা পুঁজিবাদী ষড়যন্ত্র ~ দেবরায়া মুখোপাধ্যায়

আমি বহুদিন ধরেই একটা কথা বলি – "কাজ একটা পুঁজিবাদী ষড়যন্ত্র। এই কাজ করতে করতে মরে যাওয়াটা একটা পুঁজিবাদী ষড়যন্ত্র"। 

শুনে আমার সহকর্মীরা হাসে। কেউ কেউ আমাকে পাগল বলে। কেউ বিশ্বাস করে না।

বিশ্বাস করুন, আমি একফোঁটা মিথ্যে বলিনা।

সভ্যতার গোড়ায় মানুষকে বেঁচে থাকতে উদয়াস্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হতো। শুধু বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু মানবসভ্যতার শুরুর থেকেই পথ চলা শুরু করেছে বিজ্ঞান, এবং তার ঘাড়ে চেপে প্রযুক্তি। প্রতি পদক্ষেপে তারা মানুষের কাজের বোঝা নিজেদের কাঁধে নিয়ে নিয়েছে, কমিয়েছে মানুষের পরিশ্রম, পরিশ্রমের প্রয়োজনীয়তা।

এর সাথে পুঁজি বা বাজারের বা অর্থনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নিকষ স্বভাব। তাদের একমাত্র কাজ মানুষের জীবনকে সহজ করা, মানুষের পরিশ্রমের বোঝা লাঘব করা।

সেই সভ্যতার শুরু থেকে এই সহস্র সহস্র বছর মানুষের সাথে পথ চলে আজ বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাতে তার উপকারিতার সমবণ্টন হলে পৃথিবীর মানুষের দিনে গড়ে দু'ঘন্টার বেশি কাজ করতে হওয়ার কথা নয়।

সত্যিই দরকার নেই। অবিশ্বাস্য শোনালেও সেটা সত্যি।

আমি আমার অজ্ঞতার ফলে পরিসংখ্যানটা বাড়িয়েও বলে থাকতে পারি, কারণ আমি বিজ্ঞানী বা প্রযুক্তিবিদ নই। আমি সঠিক জানিনা বর্তমানে প্রযুক্তি বা বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। ওই সময়টা দৈনিক দেড় ঘন্টা বা এক ঘন্টাও হতে পারে। আমি নিশ্চিত ওটা দু'ঘন্টার বেশি নয়।

কিন্তু তা হয় না। সমস্যাটা বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিতে নয়। সমস্যাটা বাজার-কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে। সমস্যাটা আমাদের ভাবনায়।

বুঝলেন না তো?

আচ্ছা, একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলছি। ধরুন একটা কারখানায় ১০০ জন শ্রমিক প্রতিদিন ৮ ঘন্টা কাজ করেন। মানে দৈনিক ৮০০ ম্যান-আওয়ারের* কাজ হয়। মালিকের মুনাফা নিশ্চিত করতে ওটার প্রয়োজন।

এবার বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য সেই কারখানার মালিক নামমাত্র খরচে এমন একটা প্রযুক্তি সেই কারখানায় নিয়োগ করলেন যার ফলে ৪০০ ম্যান-আওয়ারের কাজ সেই প্রযুক্তি করে দেবে।

ফলে সেই ১০০ জন শ্রমিকের গড়ে দৈনিক ৪ ঘন্টা উদ্বৃত্ত হয়ে গেল, কিন্তু মালিকের মুনাফার পরিমাণ (প্রফিট মার্জিন) একই থাকলো।

ভাবুন এবার। ৪০০ ম্যান-আওয়ার উদ্বৃত্ত।

কি মনে হয়? মালিক কি করবেন? সেই ১০০ জন শ্রমিককে বলবেন যে এখন আর তোমাদের দিনে ৮ ঘন্টা কাজ করার দরকার নেই? তোমরা দিনে ৪ ঘন্টা কাজ করো আর বাকি বেঁচে যাওয়া ৪ ঘন্টা নিজের বউ বা গার্লফ্রেন্ডের সাথে প্রেম করতে, কবিতা লিখতে, ছবি আঁকতে, গল্পের বই পড়তে, বা নিছক ল্যাদ খেতে ব্যবহার করো?

ভাবতে পারছেন? সম্ভব এটা?

না, আমরা সবাই জানি সেটা সম্ভব নয়। মালিক ওই ১০০ জনের মধ্যে ৫০ জনকে ছাঁটাই করে দেবেন আর বাকি ৫০ জনকে বলবেন দিনে ৮ ঘন্টা কাজ চালিয়ে যাও। 

এর ফলে তিনি বিজ্ঞান/প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে যে লাভটা এলো সেটা সম্পূর্ণ একাই ঘরে তুললেন। ওনার মুনাফার জন্য দরকারি ৮০০ ম্যান-আওয়ারের ৪০০ ম্যান-আওয়ার প্রযুক্তি দিয়ে দিল, বাকি ৪০০ ওই ছাঁটাই না হওয়া শ্রমিকরা। ৫০% শ্রমিকের চাকরি গেল, আর বাকি ৫০%কে সেই আগের মতোই দিনে ৮ ঘন্টা কাজ করে যেতে হলো।

সমস্যাটা এখানেই।

এই সমস্যাটাও সহস্র সহস্র বছর ধরে একই থেকে গেছে। বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে এর কোনো পরিবর্তন হয়নি।

সমস্যাটা শুধু পুঁজির বা সম্পদের সমবণ্টনের নয়। সমস্যাটা বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির থেকে লব্ধ উপকারিতার পুঁজির কুক্ষিগত হয়ে যাওয়াটাও। সমস্যাটা বহুমাত্রিক।

আজ পৃথিবীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে তার উপকারিতার সমবণ্টন হলে সত্যিই মানুষকে গড়ে দিনে দু'ঘন্টার বেশি পরিশ্রম করতে হবে না। মানবসভ্যতার বাকি যা কাজ দরকার তা বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি করে দেবে।

আমার আপনার অনেক সময় উদ্বৃত্ত হয়ে যাবে আমরা নিজেরা যা পছন্দ করি তার পেছনে দেওয়ার জন্য। পরিবারকে, শখকে, নেশাকে অনেক বেশি সময় দিতে পারব। 

পাশ্চাত্যের সভ্য এবং সম্পদশালী দেশগুলোতে এই নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও শুরু হয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইউরোপের অনেক দেশেই শ্রম-সপ্তাহ এবং শ্রম-দিবস কমিয়ে আনা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে কাজ করতে বাধ্য করাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে।

মাইরি বলছি, এক ফোঁটাও মিথ্যে বলিনি যখন বলেছি "কাজ একটা পুঁজিবাদী ষড়যন্ত্র"!

শুধু আমাদের মতন নয়া-উদারনৈতিক পুঁজিবাদ-শাসিত দারিদ্র্য-জর্জরিত দেশেই ছোটবেলা থেকে আমাদের শেখানো হয়েছে কাজ করতে করতে মরে যাওয়াটাই আমাদের অলঙ্ঘনীয় ভবিতব্য। এর বাইরে ভাবতে আমাদের শেখানো হয়নি।

আপনারা বরং আরেকটু পড়াশুনো করুন। আরেকটু ভাবুন। চোখগুলো খুলুন।

________________________________________

*"ম্যান-আওয়ার" কথাটা লোকের বোঝার সুবিধার জন্য ব্যবহার করলাম। নারীবাদী এবং জেন্ডার-অ্যাক্টিভিস্টরা ক্ষমাঘেন্না করে দিন। আমার পেশাদার ব্যবহারিক জীবনে আমি পার্সন-আওয়ারই ব্যবহার করি।