সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

মেয়ে ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

তোমরা যখন কথায় কথায় খিস্তি মারো, স্পষ্ট
আমরা একই বললে কথা, তখন আবার "নষ্ট"!
পুরুষমানুষ করলে নেশা, আঃ উহ্‌, সো কুল,
আমরা যদি একই জিনিস করি তখন, ভুল।
তুমি ফেরো অ-নে-ক রাতে, তোমার শুধুই কাজ...

একই সময় ফিরলে মেয়ে, তখন সে নিলাজ। 
এত রকম ধ্যানধারণা, কত প্রভেদ আছে
শুধু, মানুষ হতে পারছি না আর পরস্পরের কাছে...।

শুক্রবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

সময় ~ সৌমিক দাশগুপ্ত

​কে বনে ফুল পাড়ে? (কিশলয়)

গঞ্জের জমিদারের নাম কী? (সহজপাঠ)

রামের কাছে ৩০ টাকা আছে। সে ৫ টাকার ডাল, ১ টাকার আলু, ৪ টাকা ৪০ পয়সার সরষের তেল আর ৬০ পয়সার ডিম কিনলো। তার কাছে কত টাকা থাকবে? (নব গণিত মুকুল)

পুরোনো প্রস্তর যুগে কী কী অস্ত্র ব্যবহার হত? (ইতিহাস)

সালোক সংশ্লেষ এ গাছ কোন গ্যাস গ্রহণ করে? (প্রকৃতি বিজ্ঞান)
.
.
.
.

Draw a CPU and point the components.

What is RAM?

Name the currency of Russia, South Korea and Japan.

What is the funtion of Retina?

Whar is reflection?

Why the Parrot of Bukhara told the marchent to meet his friends at India?

ইয়ে, দুটোই ক্লাস থ্রী র অ্যানুয়াল পরীক্ষার কোশ্চেন পেপার।

তিরিশ বছর আগের আর পরের।

শনিবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০১৭

যাদবপুরে তো আমরা ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

দূরে দূরে শুধু ঘাস তৃণমূল মাঝে মাঝে কিছু পদ্ম
নেতা মন্ত্রীরা প্রাতরাশ করে বিশ্রাম নেন সদ্য;
যত বেয়াদব চুপ হয়ে গেছে,হেসে হেসে কন পার্থ
মাকুদের যত কায়দাকানুন নিমেষে করেছি ব্যর্থ;
আলিমুদ্দিনে ইয়েচুরি সাথে সূর্য বিমান বুদ্ধ
বলেন কিহবে ভারি ডামাডোল সব পথ অবরুদ্ধ ;
একরোখা কিছু একুশ বাইশ ক্ষমতা যৎসামান্য
যাদবপুরের পড়ুয়া তো তারা, চিন্তা ভাবনা অন্য;
তাদের পাশেই আর্টস ফ্যাকাল্টি, অনেক ছাত্রছাত্রী
মিটিং মিছিল পোস্টারে সব মুখরিত দিনরাত্রি ;
মন্ত্রী বলেন এস এফ আই যদি জিতে যায় কোন চান্সে
আমিও দেখিস পি এইচ ডি পাব,জার্মানি নয় ফ্রান্সে;
এরা গাঁজাখোর, গোলমাল করে তবু মনে জাগে ধন্ধ
রূপাদি বলেন ওদের গায়ে তো সাম্যবাদের গন্ধ;
নতমুখে ফেরে কেন্দ্র রাজ্য নেতারা হোমরা চোমরা
ক্ষমতায় তুমি যতদিন আছ, যাদবপুরে তো আমরা।।

যাদবপুর আর্টস ফ্যাকাল্টি নির্বাচনে জয়ী ছাত্রছাত্রীদের অভিনন্দন।।

বৈষম্য ~ সুশোভন পাত্র

​গত বছর, পিকনিকে গিয়েছিলাম দশজনে। সকালে বেগুনী মুড়ি। দুপুরে সরু চালের ভাত, মুগের ডাল, খাসি মাংস আর রসগোল্লা। সব মিলিয়ে, মাথাপিছু ৩০০ টাকা। নিজেরাই রাঁধলাম। নিজেরাই খেলাম। ফিরতি পথে 'বাজারে' সব দোকানের ধার মেটালাম। ছিল ৩,০০০। খরচা হল ৩,০০০। নো লস। নো গেন।
এবারও গিয়েছিলাম। একই জায়গা, একই মেনু, একই দশই। এবার 'বাজার' থেকে চাল-ডালের সাথে 'পণ্য' হিসেবে ১২০০ টাকায় কানাই রাঁধুনির 'শ্রমটাও কিনলাম'। শেষ বেলাতে জুটল আরও দুই হাফপ্যান্টের বন্ধু। মাথাপিছু ৪২০ করে ৫,০৪০ টাকা 'পুঁজি' হিসেবে আগেই জমা রাখলাম। আমি তখন 'পুঁজিপতি'। আমার তখন পকেট গরম। কানাই কে বললাম "১,২০০'তেই দশ নয় বারো জনের রান্না করতে হবে। না পারলে বল, গোপাল রাজি আছে।" নোয়াপাড়ার গোপাল আজকাল 'বেকার রাঁধুনি'। 'নাই মামা'র থেকে কানা মামা ভালো' ফর্মুলায় কানাই রাজি হল। এবার আমরা আড্ডা মারলাম, তাস খেললাম, আর কানাই কে দিয়ে রান্না 'করালাম'। প্রথম দশজনের রান্না কানাই'র 'আবশ্যিক শ্রম'। আর বাকি দুজনের রান্না কানাই'র 'উদ্বৃত্ত শ্রম'। জমিয়ে খেয়ে, কানাই কে ১,২০০ দিয়ে, 'বাজারে'র ৩,৬০০ মিটিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম; পকেটে তখনও ২৪০ টাকা পড়ে। এই ২৪০, 'উদ্বৃত্ত মূল্য'। এই ২৪০ আমার 'প্রফিট'। এই ২৪০ দিয়ে আমি গোল্ডফেল্ক কিংস'র আস্ত একটা প্যাকেট কিনলাম। আর রাতে কানাই'র 'প্রাপ্য মূল্যে' আমার 'ব্যক্তিগত সম্পত্তি' ঐ গোল্ডফেল্ক কিংস' ফুঁকে ওড়ালাম।
শ'খানেক বছর আগে ছুঁচলো দাড়ির টেকো লোকটা মস্কো তে বসে যখন লিখছিলেন "বিকাশের যে স্তরে শ্রমশক্তি নিজেই পণ্য তাকে বলে পুঁজিবাদ"¹ ; তখনও কানাই রান্নাই শেখেনি। তারও পঞ্চাশ বছর আগে গাল ভর্তি দাড়ি আর মাথা ভর্তি চুল নিয়ে আরেক ভদ্রলোক যখন ব্রাসেলস বসে লিখছিলেন "শ্রমই সকল সম্পত্তির উৎস। এই শ্রমের শোষণেই পুঁজিবাদে সম্পত্তির বিপুল কেন্দ্রীভবন এবং বৈষম্য অবশ্যম্ভাবী" ² ; তখনও গোল্ডফেল্ক কিংস বাজারেই আসেনি। তখনও গ্রেট ব্রিটেনের ১৭-ব্রডস্ট্রিটে অক্সফামের অফিস গজায়নি ³ । সেই অক্সফাম যারা প্রতিবছর নিয়ম করে 'পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান আর্থিক বৈষম্য' নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক করে। 'গরীব হটাও' যজ্ঞের রিপোর্ট লেখে। রাষ্ট্রপ্রধান'দের অসম্ভব বৈষম্যের ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করে। ২০১৬'তে অক্সফাম লিখেছিল "বিশ্বের প্রথম ৬২ জন ধনী ব্যক্তির মোট সম্পদ বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যার সম্মিলিত সম্পদের সমান" ⁴ । আর ২০১৭'তে 'ইকনমি ফর ১%' রিপোর্টে বলেছে "বিশ্বের প্রথম ৮ জন ধনী ব্যক্তির মোট সম্পদ বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যার সম্মিলিত সম্পদের সমান " ⁵।
এদেশে সংখ্যাটা ৫৭। মাত্র ঐ ৫৭ জন ধনকুবেরর মোট সম্পদ এদেশের গরীবতম ৭০% মানুষের সম্মিলিত সম্পদের সমান। আর মাত্র ১% ধনী অংশের পকেটে এদেশের ৫৮% সম্পদ। ৯১'র আর্থিক সংস্কারে যেদিন দেশের 'হটডগ' বাজার পৃথিবীর জন্য মুক্ত হল, করতালি তে মুখরিত হয়েছিলো লন্ডন থেকে লোনাভেলা, কেন্ট থেকে ক্যাওড়াতলা। আর আজ দেশ জোড়া উন্নয়নের চোটে গত ২৫ বছরের প্রতি বছরে, দেশের গরীবতম ১০%'র আয় যেখানে বেড়েছে গড়ে ২,০০০, সেখানে দেশের ধনীতম ১০%'র আয় বেড়েছে গড়ে ৪০,০০০ ⁶। গত ১৫ বছরে দেশে যে ১৪৪ ট্রিলিয়ন নতুন সম্পত্তি তৈরি হয়েছে তার ১১১.৩ ট্রিলিয়নই ঐ প্রথম ১০%'র উদরস্থ হয়েছে। আর বাকি ৩২.৭ ট্রিলিয়ন জুটেছে বাকি ৯০%'র কপালে। "ট্রিকল ডাউন পলিসি"র দয়ায় ৯১'এ বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ ক্ষুধার্তের ঠিকানা ছিল যেখানে ভারত, এখন তা বেড়ে এক-চতুর্থাংশ। ৯১'এ বিশ্বের মোট নিরক্ষরতার ৩২.৬% ঠিকানা যেখানে ছিল ভারত, ২০১৪ তে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫.৬৫% ⁷ ⁸।
অক্সফাম বলেছে, ভারতের ব্যাপক আর্থিক বৈষম্যের মূলে সর্বস্তরের শ্রমিকের প্রাপ্য মজুরির বঞ্চনা। অক্সফাম জানে না, সারাবিশ্বে দৈনিক দুই ডলারের কম রোজগার করা শ্রমিকের সংখ্যা যেখানে গড়ে ২৮%, আমাদের দেশে ৫৯% ⁹। অক্সফাম বলেছে, সমাধানের পথ শিক্ষা ,স্বাস্থ্যে সরকারী বিনিয়োগ বৃদ্ধি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। অক্সফাম জানে না, গত বছর বাজেটে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাখাতে ১৩,৬৯৭ কোটি এবং উচ্চশিক্ষা খাতে ৩,৯০০ কোটি সরকারী বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে ¹⁰। ১৫%'র ছাড়া বাকিদের জন্য ফেলোশিপ 'ডিসকন্টিনিউ'র সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ¹¹। অক্সফাম জানে না, ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের রিপোর্টে এদেশের ৭৮% স্বাস্থ্য ব্যবস্থারই আজ বেসরকারিকরণ হয়েছে ⁸। অক্সফাম জানে না, লেবার ব্যুরোর রিপোর্টে গত বছর এদেশে রেকর্ড হারে বেকারত্ব বেড়েছে ¹² । অক্সফাম বলেছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও কর ফাঁকির সিঁড়ি বেয়েই এদেশের ধনকুবের'দের রমরমা। অক্সফাম জানে না ; এদেশ ললিত মোদীর। এদেশ বিজয় মালিয়ার। এদেশের সরকার মুকেশ আম্বানির। এদেশের আইন গৌতম আদানির। এদেশের হাইকোর্ট সলমন খানের। এদেশের 'কর্পোরেট পলিসি' হাজার-কোটির ট্যাক্স ছাড়ের।
স্তালিনের নাম শুনলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে আপনি উঠতেই পারেন, সোভিয়েতের প্রশংসায় 'অ্যানিম্যাল ফার্মের' অর্গাজমে স্বর্গসুখ আপনি পেতেই পারেন, বলিভিয়ার নিবিড় অরণ্যে ঐ দাড়িওয়ালা গ্ল্যামারাস ডাক্তার ছেলেটার মৃত্যুর প্রতি নিরাসক্ত আপনি থাকতেই পারেন, তীব্র শৈত্য প্রবাহে রেড আর্মির লং-মার্চ কিংবা পাভেল করচাগিনের ইস্পাত কঠিন লড়াই কে ব্যঙ্গ আপনি করতেই পারেন, এমনকি ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিনের দাড়ির থেকে রামদেবের দাড়িই আপনার বেশি পছন্দ হতেই পারে; কিন্তু গীতার 'শ্লোক' থেকে কোরানের 'সূরা' হয়ে বাইবেলের টেস্টামেন্ট -কোথাও এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের অর্থনীতির বিশল্যকরণী আপনি খুঁজে পাবেন না। পুঁজিবাদী বাজারে হিন্দু-মুসলমানের ক্যালোরির আলাদা হিসাব কষতে আপনি পারবেন না। মুক্তবাজারের মুনাফা তে ব্রাহ্মণ-দলিত'র 'উদ্বৃত্ত শ্রমের' পার্থক্য আপনি করতে পারবেন না। ধর্মের বুলি কপচে দু'বেলা দু'মুঠো ভাতও আপনি জুটিয়ে দিতে পারবেন না। কারণ বাস্তব এটাই যে আপনার-আমার শ্রম যে আজ 'বাজারের পণ্য'। বাস্তব এটাই যে শ্রমের শোষণেই পৃথিবী জোড়া সম্পদের এই যে প্রবল বৈষম্য। আর বাস্তব এটাই যে ধর্মশাস্ত্র বা অ্যাডাম স্মিথের 'দি ওয়েলথ অফ দি নেশন'র পুঁজিবাদী মুক্ত বাজারে নয়; দাড়ি বুড়োর 'দাস ক্যাপিটাল'ই বন্দী আছে অর্থনীতির সাম্য।

1. https://www.marxists.org/archive/lenin/works/1916/imp-hsc/

2. https://www.marxists.org/archive/marx/works/subject/quotes/


3. https://en.wikipedia.org/wiki/Oxfam

4. https://www.oxfam.org/.../bp210-economy-one-percent-tax...

5. https://www.oxfam.org/.../bp-economy-for-99-percent...

6. https://scroll.in/.../embargoed-jan-16-00-01gmt-57...

7. https://www.youtube.com/watch?v=Wtzs4lygpA0

8. http://timesofindia.indiatimes.com/.../artic.../54822103.cms

9. http://www.reuters.com/article/idUSDEL218894

10. https://cpim.org/.../do-saal-janta-behaal-modi-government...

11. https://www.youtube.com/watch?v=lpUrKAomkqU

12. http://indianexpress.com/.../unemployment-india-paints.../

শনিবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০১৭

আগুন জ্বলবে ~ সঞ্জয় ঘোষ

অশীতিপর শীত বুঝি আজ
গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে
ছোট পাপ আর বড় পাপগুলো
সহজ আড়াল খুঁজছে।

আড়ালে আড়ালে কানাকানি শুধু
পাপ মিশে যায় পুণ্যে
কিছু তার নাকি মনগড়া আর
বাকিটা খু্ঁজতে হন্যে।

ধৈর্য ঠেকেছে তলানিতে আজ
পাপের পাহাড় জমছে
কিছু ছোট কিছু হিমালয়সম
সবাই আড়াল খুঁজছে।

ঠগকে খুঁজতে গাঁ উজার হয়
কাকে ছেড়ে কাকে ধরবে?
এই পতন তো আমাদেরও দায়
তবে কী আগুন জ্বলবে?

দেশলাইটা খোয়া গেছে তাই
চকমকিটাকে খুঁজছি
কোন পাপ ঠিক কতটা দাহ্য?
নিজের সাথেই যুঝছি।

দেশপ্রেম ~ সুশোভন পাত্র

দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা, অভাব-অভিযোগ নির্বাচনী ভাষণে ভালো করে মিশিয়ে নিন। মিশ্রণে প্রতিশ্রুতি'র পাহাড় গুলে, 'আচ্ছে দিনের' বিজ্ঞাপনে ১০ মিনিট ম্যারিনেট করে রাখুন। এই ফাঁকে জনগণের ক্ষোভের আগুনে পিৎজা স্টোন সহ ওভেন ৪৫০ ডিগ্রিতে প্রি-হিট করুন। মিশ্রণ ফুলে ফেঁপে উঠলে; জে.এন.ইউ'র ভিডিও দিয়ে পুরু করে বেলে ফ্ল্যাটব্রেড বানিয়ে ফেলুন। ফ্ল্যাটব্রেডের উপর ৫৬ ইঞ্চি পুরু সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের প্রলেপ লাগিয়ে, পাকিস্তানের সঙ্গে তু-তু-ম্যা-মা'র বার্বিকিউ আর মিডিয়ার টক শো'র হম্বিতম্বি কুচিকুচি করে সাজিয়ে, কাশ্মীরের পেলেট গান আর মোজোরেলা চিজ ছড়িয়ে, জাতীয় পতাকা'র টপিংস দিন। শেষে জাতীয় সঙ্গীত চালিয়ে, ওভেনের পাশে ঠাই দাঁড়িয়ে, ২০ মিনিট বেক করুন। সবদিকে সমান বেক হলে 'চিজ বেসড দেশপ্রেম পিৎজা'য় পরিবারের সব্বাই ভক্তিভরে পেটপূজা করুন। এবার ডিনার শেষে, বিছানায় রতি ক্রিয়া সেরে, নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যান। কারণ সীমান্তে জওয়ানরা আপনার নিরাপদ ঘুম নিশ্চিত করতেই তো দাঁড়িয়ে আছেন। এখন দুঃস্বপ্নে যদি দেখেন আপনার পিৎজা-পাৎসা'র জীবনে, আমার যুদ্ধ-যুদ্ধ ফ্যান্টাসিজমে আর আমাদের বর্ডার সিনেমা দেখে বগল বাজানোর অভ্যাসের আড়ালে জওয়ানরা আধপেটা খেয়েই দাঁড়িয়ে আছেন; খবরদার 'দেশদ্রোহীর' মত দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকারের দিকে আঙুল তুলে বসবেন না যেন। বরং হালকা পাশ ফিরে, নরম বালিশে মাথা রেখে, আবার ঘুমনোর চেষ্টা করুন। কারণ 'দেশপ্রেম' এই সরকারের পৈতৃক সম্পত্তি। জওয়ান'দের ভাবাবেগ লেপা জাতীয়তাবাদের ব্যবসা করা এই সরকারের পুরনো অভ্যাস।
তেজ বাহাদুর জওয়ান'দের ক্ষুধার্ত এবং আধপেটা রাত্রি কাটানোর অভিযোগ এনেছেন ¹। 'হুইসেলব্লোয়ার' কে শায়েস্তা করতে, তাঁর 'বেয়াড়া অতীতের' পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে বি.এস.এফ প্রধান, তেজ বাহাদুর কে তৎক্ষণাৎ বদলি করে দিয়েছেন ² । স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নিয়মমাফিক তদন্তের ঘোষণা করেছে ³ । আর প্রধানমন্ত্রী'র দপ্তর ডাস্টবিনের শোভা বর্ধনের জন্য সেই তদন্তের রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে ⁴ । ঠিক যেমন ২০১৬'র জুলাইয়ে ডাস্টবিনের শোভা বর্ধন করেছিল ক্যাগের সেই রিপোর্ট, যে রিপোর্টে বলা হয়েছিল ইন্ডিয়ান আর্মি জওয়ানদের খাবারে পর্যাপ্ত সবজি ও ফল সরবরাহ করছে না, বলা হয়েছিল ৬৮% জওয়ানই খাবারে গুনগত মান সম্পর্কে 'অসন্তুষ্ট', বলা হয়েছিল বাৎসরিক ১,৪৪০ কোটির আর্মি রেশনের গুণমানে 'অত্যন্ত নিম্ন' এবং আনা হয়েছিল ২২ কোটির আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ  ⁵ ⁶ । অবশ্য আর্মি তে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছিল ২০০৪'ও যখন লেফটেনেন্ট জেনারেল সাহনির'র বিরুদ্ধে সিয়াচেনের জওয়ান'দের মেয়াদ বহির্ভূত রেশন সরবরাহ'র তথ্যপ্রমাণ সামনে আসে ⁷, কিম্বা ২০০৭'ও যখন লেফটেনেন্ট জেনারেল দাহিয়া'র বিরুদ্ধে লাদাখের জওয়ান'দের ফ্রোজেন মিটের টেন্ডারে আর্থিক তছরুপরে অভিযোগ ওঠে ⁸ । আর এখনও কান পাতলেই শোনা যায় যে দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসার'রা আর্মি রেশন' সস্তায় পার্শ্ববর্তী দোকানদার'দের বিক্রি করেন ⁹ । 
ডিমনিটাইজেশেন দুর্নীতি মুক্ত হয়নি আর্মি। হওয়ার কথাও ছিল না। কারণ শুধু লিকুইড ক্যাশে এদেশের দুর্নীতির হিসেবে হয় না। শুধু ৫০০/১০০০'র নোটই এদেশে দুর্নীতি করতে শেখায় না। দুর্নীতি করতে শেখায় এদেশের রাজনীতি। দুর্নীতি করতে শেখায় এদেশের অর্থনীতি। দুর্নীতি করতে শেখায় এদেশের গোটা সমাজ ব্যবস্থা। আপনার অন্ধ দেশপ্রেমের বশংবদতায় এই দুর্নীতি বন্ধ হবে না। আপনার প্রশ্নহীন আনুগত্যে এই দুর্নীতি'র সমাধান হবে না। তাই যেদিন সীমান্তের জওয়ান'দের জরুরী ক্যালোরি'র জরুরী প্রশ্নের সমাধানের সঙ্গে আপোষ করে, এদেশের বিদেশ মন্ত্রী টুইটে ই-কমার্স সংস্থা আমাজন কে, পাপোষে জাতীয় পতাকা অবমাননার অপরাধে ভিসা বাতিলের হুমকি দিয়ে 'দেশপ্রেম' জাহির করেন, সেদিন তাঁকে প্রশ্ন করা জরুরী যে, কোথায় ছিল আপনার দেশপ্রেম যখন আপনার স্বামী স্বরাজ কৌশল ললিত মোদীর ওকালতি করতেন ¹⁰, কোথায় ছিল আপনার দেশপ্রেম যখন লন্ডনের পাঁচতারা হোটেলে আপনি ললিত মোদীর সাথে ডিনার সারতেন ¹¹, কোথায় ছিল আপনার দেশপ্রেম যখন 'সনাতনী শিক্ষা' ছেড়ে আপনার মেয়ে কে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি করতেন ¹² ? জাতীয় পতাকার অবমাননা সেদিনও হয়েছিল যখন সাংবিধানিক সভা তিরঙ্গা কে পতাকার রং হিসেবে বেছে নেওয়ার বিরোধিতা করে আর.এস.এসের মুখপাত্র 'অরগানাইসার', ১৯৪৭'র ৩১'শে জুলাই এবং ১৪'ই অগাস্ট 'হিন্দুস্তান' ও 'হুইদার' নামে দু-দুটো তাবড় সম্পাদকীয় ছেপেছিল ¹³ । জাতীয় পতাকার অবমাননা তখনও হয়েছিল যখন প্রথম এন.ডি.এ ক্ষমতায় আসার আগে কোনদিন সংঘের হেড কোয়ার্টারে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়নি ¹⁴ । জাতীয় পতাকার অবমাননা সেদিন হয়েছিল যখন দ্বিতীয় সংঘচালক এম.এস গোলওয়ালকার নাগপুরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন " তিরঙ্গা নয়, আমরা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি একদিন গোটা দেশ গেরুয়া পতাকার কাছেই ঠিক নতজানু হবে" ¹⁵। জাতীয় পতাকার অবমাননা সেদিন হয়েছিল যেদিন মহম্মদ আখলাখের খুনি কে  তিরঙ্গায় ঢাকা হয়েছিল ¹⁶। জাতীয় পতাকার অবমাননা সেদিনও হয়েছিল যেদিন তিরঙ্গা মোড়া জওয়ান'দের কফিন নিয়ে কেলেঙ্কারি হয়েছিলো।  আর জাতীয় পতাকার অবমাননা প্রতিদিনই হয়, যখন ট্রাফিকে বিলাসবহুল গাড়ির জানলায় দু-টাকার বিনিময়ে জাতীয় পতাকায় মোড়া খেতে না পাওয়া শৈশব বিক্রি হয়।
তাই দেশপ্রেম যদি দেখাতেই হয় তাহলে প্রশ্ন করুন, ২৮.৭ কোটি নিরক্ষর দেশবাসী সাক্ষর হবে কবে?  প্রশ্ন করুন ৬২.৬ কোটির ঘরে শৌচাগার তৈরি হবে কবে ¹⁷? প্রশ্ন করুন সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকের পেটের খিদের সুরাহা হবে কবে? প্রশ্ন করুন হনুমানথাপ্পার মত ঋণের দায়ে আত্মঘাতী কৃষকরাও ক্ষতিপূরণ পাবে কবে? জওয়ানদের পাশে যদি দাঁড়াতেই হয় তাহলে জিজ্ঞেস করুন, কাশ্মীরের দাবার বোর্ডে জওয়ানদের বোড়ে বানিয়ে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি বন্ধ হবে কবে? জিজ্ঞেস করুন সার্জিক্যাল স্ট্রাইক কে নিজেদের সাফল্য বলে প্রচার করা সরকার জওয়ান'দের জরুরী পুষ্টি নিশ্চিত করবে কবে? জিজ্ঞেস করুন, উগ্র জাতীয়তাবাদ জিগিরে ক্ষুধার্ত দেশবাসীর রাজনৈতিক ফায়দা তোলা বন্ধ হবে কবে? সরকার বিরুদ্ধে কথা বললেই 'দেশদ্রোহী' দাগিয়ে দেওয়ার অভ্যাসে লাগাম পড়বে কবে? জওয়ান'দের পাশে যদি দাঁড়াতেই হয় তাহলে আগে আয়নার সামনে দাঁড়ান। জওয়ান'দের পাশে যদি দাঁড়াতেই হয় তাহলে আগে যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। কারণ রক্তে লেখা ইতিহাস সাক্ষী, যুদ্ধ যারা চায়, তাঁরা যুদ্ধে যায় না। আর যারা যুদ্ধে যায়, তারা যুদ্ধ চায় না।।



















শুক্রবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০১৭

বিশ্বাস ~ সঞ্জয় ঘোষ

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু
তর্কে বহুদূর
গান বেজেছে কোরাসে, তাতে
মেলাতে হবে সুর।

মেলাতে হবে সুর আর
মানতে হবে কথা
দেশটা তো আর তোমার নয়
তাদের মাথাব্যথা।

তাদেরই মাথাব্যথা তাই
সারাটা দেশ জুড়ে
রাজা উজির বাদ্যি বাজান
তোমরা সবাই বোড়ে।

রাজা যেন অনন্ত লোভ
ভুবনগ্রাসী খিদে!
না-বলা না-পারা যন্ত্রণাটা
বোড়ের বুকে বিঁধে।

তবুও সবাই বোড়ে যে নয়
সেটাই আসল জোর
বিশ্বাসে মেলেনা বস্তু
তর্কে কাটে ঘোর।

*ঋণস্বীকার - আসাদ ইকবাল সুমন এর দুটি লাইন

শুক্রবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১৭

লজ্জা ~ স্বর্ণালী ইসাক

আমার প্রোফাইলের সকল মহিলাদের উদ্দেশ্যে আমার এই পোষ্ট, আমি আপনাদের কিছু বলতে চাই,,,,,
 কিছু অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়,,, কিছু স্বীকারোক্তিও বলতে পারেন। করতে হবে,তাছাড়া তো আর উপায় দেখছি না। ব্যাঙ্গালোরের "Mass molestation" এর ভিডিওগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর থেকে এটাই মনে হচ্ছে বারবার। 
তাহলে শুনুন, তখন আমি 15, বাবা সদ্য কিছুমাস হয়েছে মারা গেছেন।মা ট্রমাটাইজ্ড। কথা বলা বন্ধ,নড়াচড়া করেন না,ঘরে বসে থাকেন, আর চোখের জল বেরোতে থাকে শুধু। এমতাবস্থায়, কিছু জরুরী ব্যাঙ্কসংক্রান্ত কাজের জন্য আমি আমার এক আত্মীয়ের শরণাপন্ন হই। ইনি আমার বাবার থেকেও বয়সে বড় এবং শিশুকালে এনার কোলেপিঠে চড়েছি অনেক। বলাই বাহুল্য 15 বছরের আমি ব্যাঙ্কসংক্রান্ত কাজের কিছুই বুঝিনা। উনি ওনার বাড়িতে(পাশের পাড়াতেই) ডাকায় আমি সেখানে যাই। সেদিন তিনি একলা ছিলেন এবং আমায় চমকে দিয়ে তিনি আমায় আক্রমণ করেন। ঘটনার আকষ্মিকতায় বিহ্বল হয়ে আমি কিছু মিনিটের জন্য কেমন স্তব্ধ হয়ে যাই, আর সেই সুযোগে উনি আমার পোষাক এদিক ওদিক কিছুটা ছিঁড়ে ফেলতে সমর্থ হন। কয়েক মিনিটের বিহ্বলতা কাটাতেই আমি বাঁচার জন্য চিৎকার আর লাফালাফি শুরু করি। তাতে আমায় জলের জগ,দরজার খিল, এবং চড়-লাথিও মারা হয়। তারপর সেই দরজার খিলটা দিয়েই ওনার মাথা ফাটিয়ে আমি নিজেকে কোনোক্রমে বাঁচিয়ে বেড়িয়ে আসি ওনার বাড়ি থেকে। জামা ছেঁড়া,মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত আহত আমি ও পাড়া থেকে নিজের বাড়ি অবধি কাঁদতে কাঁদতে দৌঁড়ে এসেছিলাম। কিন্তু বাড়ি ঢুকে দেখি অসুস্থ মা ছাড়া কেউ নেই।আমি বারান্দাতেই শুয়ে পড়ে থরথর করে কাঁপছিলাম। মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। খুব জলতৃষ্ণা পাচ্ছিল কিন্তু ওঠার শক্তি ছিল না।কী অপমান লাগছিল।শরীরের যেটুকু জায়গায় ওই আত্মীয় হাত দিতে সমর্থ হয়েছিলেন, সেসব জায়গা কেটে বাদ দিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। স্তন,মুখ,কোমর,,,, ,মনে হচ্ছিল,খাবলে মাংস তুলে ফেলে দিলে বোধহয় ওই স্পর্শজনিত অপমান কিছুটা কমে। ইতিমধ্যে বাড়ির সবাই আধ ঘন্টা পর দল বেঁধে কোথাও থেকে এসে আমার উপর চড়াও হলেন। আমায় বলা হোল আমি নাকী সেই আত্মীয়ের কাছে টাকা চেয়েছি আর না পাওয়ায় ওনার মাথা ফাটিয়েছি। আমার ছেঁড়া জামা, মুখে অতটা আঘাত দেখেও কারো কিচ্ছু সন্দেহ হয়নি। আমি ওই ছেঁড়া জামা পরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, আর বিজ্ঞচোদেরা সামনে দাঁড়িয়ে শালিসি করে যাচ্ছেন। কেউ একটা গামছা অবধি এগিয়ে দেননি নিজেকে ভালোভাবে ঢাকতে। তার উপর নোংরা কথা। একবারও আমার কথা কেউ বিশ্বাসও করেননি,কারণ করতে চাননি। প্রথম 20-25 মিনিট জানেনতো দিদিরা,,,  আমার খুব লজ্জা লাগছিল। ছিঁড়ে যাওয়া জামার জন্য। হাত দিয়ে বামস্তনের ছেঁড়া দিকটা ঢাকতে চাইছিলাম।আরেকহাত দিয়ে পেটের কাছের ছেঁড়া টা।কুঁকড়ে বেঁকে দাঁড়িয়েছিলাম। 26 নম্বর মিনিট থেকেই কিছু একটা হতে লাগল। আমি আস্তে আস্তে সোজা হতে লাগলাম। কারণ আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম যে, আমার কষ্টের দাম এই মূহুর্তে কারো কাছে নেই। আমার সত্যি অভিযোগটা এদের কাছে মিথ্যা। হাত দিয়ে শরীর আড়াল করার চেষ্টা ছেড়ে দিলাম।বুঝলাম এখন নিজের কথা এদের শোনাতে গেলে এদের বাধ্য করতে হবে শুনতে।এখন লড়াই করে সারভাইভ করার সময়,এখন শরীর নিয়ে ব্যস্ত হলে চলবে না। সব লজ্জা,ঘেন্না,কষ্ট সাইডে রাখলাম জোর করে, না, সেসব শরীর-মন ছেড়ে চলে যায়নি তখনো,জাষ্ট সাইডে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তারস্বরে চিৎকার করে সব বলতে লাগলাম। জিনিসপত্র ভাঙতে লাগলাম। আরো কিছু লোক জমা হয়ে গেল। ততক্ষণে ফাটা মাথা সেলাই সেরে সে আত্মীয় হম্বিতম্বি করবেন ভেবে এসে গেছিলেন।গেট পার হতে দেখেই আমি শাবল নিয়ে ওনাকে তাড়া করি।তখন কিচ্ছু করতে পারিনি যদিও।ওনাকে ধরার আগেই সবাই আমায় ধরে নিয়েছিল,বরং যারা ধরেছিল,তাদেরই আহত করেছিলাম।ভয়ঙ্কর সীন ক্রিয়েট হল। কিন্তু এতে একটা লাভ হয়েছিল,, আর কোনো আত্মীয় আমার দিকে আঙ্গুল তোলার সাহস দেখাননি। আর সেই সুওরের বাচ্চাও বাড়ি বেচে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। 
 আমার বাপ শিখিয়েই গেছিলেন, "সব পরিস্থিতির একটা প্যাটার্ণ হয়, সেই প্যাটার্ণটা বোঝ, আর সেই অনুযায়ী নিজের শরীর মন তৈরী করে সারভাইভ কর,পরিস্থিতির প্যাটার্ণ টা ধরতে পারলে আর তার গোলামী করতে হয়না"। -- এটার মানে আমি তখন বুঝিনি যখন বাপ বলেছিলেন। এইদিন বুঝেছি যখন না বুঝেই আমি বাপের পরামর্শ পালন করে ফেলেছিলাম। 
.
        এতো হ্যাজ দেওয়ার একটাই কারণ, তা হল, আমি আপনাদের প্রত্যেকটা মহিলাকে এটা বলতে চাই যে , আপনাদের নিজেদের শরীরটা নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? সারাক্ষণ নিজের শরীর আগলাতে গিয়ে যে ঠিক করে লড়তে পারেন না, তা কী দেখেছেন? আমি ব্যাঙ্গালোর কান্ডের ভিডিওগুলো দেখছিলাম। মেয়েগুলো বুক বাঁচাতে ব্যস্ত ছিল, নিজের যেটুকু শক্তি ছিল, সেটাও কাজে লাগাতে পারল না বুক,পাছা আর যোনী বাঁচাতে গিয়ে। অথচ মিনিটখানেকের মধ্যে ঘটনার আকষ্মিকতা সামলে যদি ঘুরিয়ে একটা মুখে ঘুষি বা নিদেনপক্ষে চোখে আঙ্গুলও ঢুকিয়ে দিতে পারত, তাহলেও বেঁচে যেত ওই মেয়েটি যাকে দুজন বাইকারোহী আক্রমণ করেছিল। তা না করে সে বুক গার্ড করে নীচু হয়ে গেল, তখন ওই জানোয়ারের বাচ্চাগুলো পিছন থেকে ওর জামায় হাত ঢুকিয়ে হেনস্থা করল।
যাদেরকে এক দল জানোয়ার ছেঁকে ধরেছিল, তাদের লড়াই করাটা কঠিন ছিল জানি, তবু শরীর বাঁচাবার চেষ্টায় কুঁকড়ে বসে না পড়ে ঘুরে হাত চালালে সেক্ষেত্রে অনেক আগেই সেফ হতে পারতেন তাঁরা।
"এরকম কেন হবে?" "এই অব্যবস্থার মানে কী?" এই প্রশ্ন সবাই করবেন, করছেন। একটা লোম্বাও ছেঁড়া যাচ্ছে না তাতে অপরাধীদের। লড়াই করুন।প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। আপনাদের নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছোঁয়া এত সোজা কেন জানেন? কারণ আপনারা ভাবেন স্তন, যোনী ,পেট এসবে আপনাদের "শ্লীলতা" থাকে। শরীরের আবার শ্লীল অশ্লীল কী বাঁড়া? আমাদের  শরীরের প্রতিটা স্কোয়ার ইঞ্চ আমাদের। হাত ধরে টানলেও ঘুরে মারুন, স্তনে খামচালেও তাই। একটা বালের সমাজ এতদিন আপনাদের স্তন, যোনী আর নিতম্বসর্বস্ব করে রেখেছে। আর আপনাদেরও লজ্জা করেনা যে আপনারা তাই হয়েই বেঁচে আছেন? রাস্তায় জামা কাপড় এদিক ওদিক হলে লজ্জা, পোষাকে মাসিকের দাগ লাগলে লজ্জা, কেউ হিসি করতে বসতে দেখে নিলে লজ্জা ..... এদিকে কনুই ছুলে গেলে সমস্যা নেই, কেউ ধাক্কা মেরে লাইন থেকে সরিয়ে নিজে ঢুকে গেলে সমস্যা নেই(যতক্ষণ না সেই ধাক্কাটা স্তন বা পাছায় লাগছে) ইত্যাদি। আপনারা নিজের শরীরের কয়েকটা অঙ্গে এত বন্দি কেন এটাই হেকা বুঝতে পারে না। ফাঁকা রাস্তায় কেউ টেনে জামা খুলে দিতে চাইলে নিজেই নিজের জামা খুলে নিয়ে তাতে রাস্তার ঢিল,আধলা ইঁট কুড়িয়ে ঢুকিয়ে জামাটাকে সৌরভ গাঙ্গুলীর ষ্টাইলে ঘুরিয়ে মুখ আর মাথা লক্ষ্য দে মার, দে মার। ছাড়েন কেন? আপনারা এত দিনেও বোঝেন নি যে আমাদের মেয়েদের এই শরীর সংক্রান্ত লজ্জাটা আসলে জানোয়ার চামড়াখেকোদের অস্ত্র? 
,
আমি ওসব বড় বড় নারীবাদী বালবিচি বুঝি না, বুঝতেও চাইনা। কোথাও একটা ধর্ষন, শ্লীলতাহানি হবে, আর ফেবু জুড়ে "প্যাট্রিয়ার্কাল","প্যাট্রিলিনিয়াল" ইত্যাদি শব্দের চোদনামী শুরু হবে। হা হুতাশ, কান্নাকাটি।মোমবাতি মিছিল, আরো কত বালবিচালি। এসব বালের জিনিস খালে দিন। লড়তে শিখুন। স্তন, যোনীকে শরীরের আরো 5 টা অঙ্গের মতো স্বাভাবিক নিতে শিখুন। হাত আর মন খুলে একবার মেরে দেখুন। ধর্ষকরা ভয় পাবে, পিছোবে। আমি আদারে বাদারে জঙ্গলে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াই। ইউপি বিহার বেল্টে অনেকবার অনেক অসভ্যতার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু ওই লজ্জা কম থাকায় বেঁচে বেড়িয়ে এসেছি। গায়ের জোর,শারীরিক শিক্ষার থেকে বেশী কার্যকরী হল লজ্জাহীনতা। 
আক্রমনকারীর মুখ চোখ ফাটিয়ে বিচি ফিচি থেঁতলে তার ওই যন্ত্রনাবিদ্ধ শরীরের সামনে ব্রা খুলে দাঁড়ান। আপনাদের অনাবৃত উর্ধাঙ্গ সামনে পেয়েও যখন জানোয়ারগুলোর চোখে শুধু মাথা আর বিচিফাটা যন্ত্রনা আর মুখে কাতর গোঙ্গানি শুনবেন। অদ্ভুত closure পাবেন,মানসিকভাবে সুস্থ থাকবেন। ইয়ার্কী ভাববেন না, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।   নিজেকে ভালবাসুন, নিজের জন্য লড়ুন। ছিঁড়ে দিন নারীমাংসলোভীদের মুখ,চোখ আর লিঙ্গ। যা করবার করুন কিন্তু দয়া করে আর অসহায় হয়ে পড়ে থাকবেন না। এ লাটক আর নেওয়া যাচ্ছে না। পায়ে ধরছি।
I love u all <3  blessed be )o(

মমতা আপনিই ~ সুশোভন পাত্র

নিউটনের ঘরের কেয়ারটেকার সেদিন পরিচারিকা কে পই পই করে বলেছিলেন, "ডিমটা সেদ্ধ করে, বাবুকে খাইয়ে, তবেই আসবি।" কিন্তু গবেষণায় বিঘ্ন ঘটবে বলে, নিউটন নিজেই ডিম সেদ্ধ করে, সময়ে খেয়ে নেবার আশ্বাস দিয়ে তাঁর পরিচারিকা কে ফেরত পাঠিয়ে দেন। একঘণ্টা পর পরিচারিকা এসে দেখেন,  সসপ্যানে রিষ্ট ওয়াচটা সেদ্ধ হচ্ছে আর নিউটন উনুনের সামনে ঠাই দাঁড়িয়ে, হাতে ধরা ডিমের দিকে তাকিয়ে সময় দেখছেন।
টিকিট চেকার টিকিট চাইতেই আইনস্টাইন অনেক খুঁজেও টিকিটটা পেলেন না। টিকিট চেকার আইনস্টাইনকে চিনে বলেছিলেন, "আরে প্রফেসর, আর খুঁজতে হবে না। আমি নিশ্চিত আপনি টিকিট কেটেছেন।" কাতর স্বরে আইনস্টাইন বলেছিলেন, "না, না খুঁজতে তো হবেই। ওটা না পেলে আমি জানব কি করে কোথায় যাচ্ছি!"
ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের পথিকৃৎ নিউটন ডিমের বদলে ভুল করে রিষ্ট ওয়াচ সেদ্ধ করেছিলেন। থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সের জাদুকর আইনস্টাইন টিকিট আনতে ভুলেছিলেন। আর দিল্লীর মসনদ দখলের দিবাস্বপ্নে মশগুল আমাদের মুখ্যমন্ত্রী স্বরচিত ইতিহাসটাই ভুলে গেছেন। আসুন দায়িত্বশীল কামাল হাসানের ভূমিকায় সদমা সিনেমার শ্রীদেবীর যত্ন নিন। কর্তব্যপরায়ণ নাগরিক হিসেবে তাঁর কৃতকর্ম স্মরণ করিয়ে দিন।  
জরুরী অবস্থায় সিদ্ধার্থশংকর রায়ের তাঁবেদারি করে, জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির বনেটে নেচে ¹, ইন্দিরা হত্যার সহানুভূতির ভোটে প্রথম সাংসদ হয়ে ², শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন আনন্দবাজারের হবু 'অগ্নিকন্যা'। ধর্মীয় মেরুকরণের চ্যাংড়ামি তে জাতীয় রাজনীতিতে দ্রুত উঠে আসছে বি.জে.পি ³ । 'লৌহ পুরুষ' রথে চেপে, বাড়ি বয়ে বলে আসছেন 'মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে'। অযোধ্যায় জুটছেন কর-সেবকরা। ৯২'র ৪ঠা ডিসেম্বর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শহীদ মিনারে জনসভা ডাকল বামফ্রন্ট। আর সেদিনই সিধো-কানহু ডহরে সভা করে 'ইন্ডিয়া ইয়ুথ কংগ্রেসের' সাধারণ সম্পাদিকা মমতা বললেন, ''সব সি.পি.এম'র ষড়যন্ত্র। বি.জে.পি অযোধ্যায় কিছুই করতে পারবে না। আসলে সি.পি.এম আমাদের আটকাতেই ক্যাডার জড়ো করছে" ⁴ ।  ৯৭'র ডিসেম্বরে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত মমতা'ই জোটসঙ্গী প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "বি.জে.পি তো  অচ্ছুৎ নয়" ⁵।  বাস্তবেই ছুৎমার্গ শিকেয় তুলে ৯৮'র লোকসভা ভোটে‍‌ তৃণমূলের হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গে খাতা খুলল বি.জে.পি। আর ৯৯' এ এন.ডি.এ'র শরিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন রেলমন্ত্রী ⁶।
ম্যাডাম, আজ আপনার বি.জে.পি কে 'সাম্প্রদায়িক' মনে হচ্ছে? কিন্তু আপনিই তো বি.বি.সি'র সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন বি.জে.পি নাকি তৃণমূলের "ন্যাচারাল অ্যালি" ⁷? গুজরাট দাঙ্গার সময়ে আপনি বাজপেয়ী সরকারে মন্ত্রী ছিলেন না ⁶?  সংসদ যখন গুজরাটের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করছে তখন সরকারের পাশে দাঁড়াবার আশ্বাস দিয়ে বাজপেয়ী কে আপনি চিঠি লেখেননি ⁸? তবে যে আপনারই সাংসদ কৃষ্ণা বসু তাঁর 'অ্যান আউটসাইডার টু দি পলিটিক্স' বইয়ে লিখেছেন, লোকসভায় যেদিন গুজরাটে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়ে ভোটাভুটি হচ্ছে সেদিন আপনিই নাকি এন.ডি.এ সরকার কে ভোট দেবার হুইপ জারি করেছিলেন ⁹? আপনিই তো দাঙ্গা পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের পর নরেন্দ্র মোদী কে অভিবাদন জানিয়ে পুষ্পস্তবক পাঠিয়েছিলেন ¹⁰। আপনিই তো ২০০৪'র লোকসভা এবং ২০০৬'র বিধানসভা নির্বাচনে বি.জে.পি'র সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন ⁴ । 
ম্যাডাম, আজ আপনি বলছেন আর.এস.এস 'ভয়ঙ্কর'? আর ২০০৩'র ১৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে 'পাঞ্চজন্য'র অনুষ্ঠানে আপনি সংঘ নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ''আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আপনারা দেশকে ভালোবাসেন। আপনাদের ১% সাহায্যে আমরা কমিউনিস্টদের সরাতে পারবো।'' মনে পড়ে গদগদ আর.এস.এস নেতারা আপনাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ''হামারি পেয়ারি মমতাদি সাক্ষাৎ দুর্গা'' ¹¹?  এই তো সেদিন 'দুর্গার' সাফল্যে খুশি হয়ে আর.এস.এস'র রাজ্য মুখপত্র 'স্বস্তিকা' সম্পাদকীয় তে লিখেছিল "দায়িত্বশীল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বে দুঃশাসনের অবসান" ¹² । এই তো সেদিন আর.এস.এস'র জাতীয় মুখপত্র 'ওর্গানাইজার' স্বর্ণাক্ষরে উত্তর-সম্পাদকীয় তে ছেপেছিল, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের সেই বিরলতম প্রজাতির রাজনীতিবিদ যিনি আর্থিক ভাবে সৎ। দেশে তাঁর মতই রাজনীতিবিদ প্রয়োজন" ¹³ ।
সাইকো-অ্যানালিস্ট গিরিন্দ্রশেখর বসু কে একদিন তাঁরই এক রোগী বললেন "স্যার, গতরাতে স্বপ্নে দেখেছি আপনি নর্দমায় পড়ে গেছেন; আর আমি আপনাকে অনেক কষ্টে ওঠাতে চেষ্টা করছি।" গিরিন্দ্রশেখের মুচকি হেসে বলেন, "আমি অত্যন্ত আনন্দিত আপনার সাহায্য পেয়ে। কিন্তু নর্দমায় আমাকে ফেলেছিল কে?" ম্যাডাম, আপনার রাজত্বে যখন গত পাঁচ বছরে পাঁচ গুন বেড়েছে আর.এস.এস'র শাখার সংখ্যা ¹⁴, আজ যখন অনাহারে মরা চা শ্রমিকের রাজ্যে যাদবপুরে 'গরু পূজার' ছ্যাবলামি করছে মাথায় গোবর ভর্তি সন্তানরা, আজ যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে তিন তালাকের সমর্থন জানাচ্ছে আপনারই মন্ত্রীরা, আজ যখন হাজিনগর থেকে ধুলাগড়ে ধর্মের নামে ঘরে ঘরে দাঙ্গার আগুন ছড়াচ্ছে আপনার ভাইরা; তখন  রাজনীতির অঙ্ক কষতে সিদিকুল্লা-তোহা সিদ্দিকী'দের মাথায় তুলে রাখছেন আপনি? মোহন ভাগবত'দের কলকাতায় সভা করে বিষ ছড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছেন আপনি? বি.জে.পি-সংঘ বিরোধিতায় ভেকধারী খড়গহস্ত হওয়ার তামাশা করছেন আপনি? গোটা রাজ্য কে ধর্মীয় মেরুকরণের বারুদে সাজিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে মুজরা দেখছেন আপনি? আগে বলুন তো মাননীয়া, নিজের আঁচল দিয়ে এদ্দিন এরাজ্যে আর.এস.এস আগলে রাখল কে?  বলুন সম্প্রীতির বাংলায় বি.জে.পি'র বীজ বপন করেছিল কে? নিজের গোয়ালে, নিজের আঁচলে, লুকিয়ে দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছিল কে? আমি আনন্দিত আজ আপনি বি.জে.পি-সংঘের বিরোধিতা করছেন। কিন্তু আগে বলুন তো ঐ নর্দমায় আমাদের ফেলেছিল কে?   
একদিন মার্ক টোয়েন সকালবেলা শার্ট পরতে গিয়ে দেখলেন শার্টে বোতাম নেই। একটার পর একটা, তিনটে শার্ট বার করে পরতে গিয়ে দেখেন সব সার্টেই একটা করে বোতাম নেই। রাগে অকথ্য গালিগালাজ করতে করতে মার্ক টোয়েনে যখন চতুর্থ শার্টটা বের করছেন, তখন তাঁর রুচিশীল স্ত্রী, সব শুনে, স্বামীকে অপ্রস্তুত করার জন্যেই প্রত্যেকটি গালিগালাজ স্পষ্ট করে আবার উচ্চারণ করলেন। মার্ক টোয়েন সেটা শুনে বলেছিলেন, "তোমার শব্দগুলো সব ঠিকই আছে, কিন্তু... ইমোশনটা মিসিং।"
ম্যাডাম,  আজ আপনি বি.জে.পি -সংঘের বিরোধিতা করছেন বটে।  কিন্তু ঐ যে... ইমোশনটা মিসিং।















রবিবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৭

নববর্ষের স্মৃতি ~ অমিতাভ প্রামাণিক

আমার ছোটবেলার নববর্ষের স্মৃতি এখনকার তুলনায় একেবারেই আলাদা।

মাজদিয়ায় বড়দিন বা নতুন বছর বলে কিছু ছিল না। শীতকাল, তাই সন্ধ্যেবেলা খেজুরের রস পাওয়া যেত। রবিবারে বুধবারে খেজুরের গুড়ের হাট বসত ইস্কুলের সামনের রাস্তায় আর তার পাশের মাঠে। দূর দূর থেকে লোক আসত সাইকেলের হ্যান্ডেল আর কেরিয়ারে বা গরুর গাড়িতে গুড়ের ভাঁড় সাজিয়ে। রাস্তা চলা সহজ হ'ত না, সাইকেল থাকলে তো আরো মুশকিল। ব্যাপারীরা লোহার লম্বা শিক ভাঁড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে চেক করত ভাঁড়ের তলায় বাজে গুড়ের পাইল দেওয়া কিনা। দরাদরি হ'ত। লাইন দিয়ে লরি দাঁড়িয়ে থাকত, বিকেলের পড়ন্ত রোদে সেগুলো ভাল কোয়ালিটির গুড়গুলো তুলে নিয়ে রওনা হ'ত। আমরা জানতাম - ওরা যাচ্ছে কলকাতায়, দিল্লীতে, আমেরিকায়। আমরা না পাঠালে ওখানকার মানুষ তো নলেন গুড় কী, তা জানতেই পারবে না। 

তবে এর সাথে পয়লা জানুয়ারির কোনো সম্পর্ক নেই। পঁচিশে ডিসেম্বরেরও। যদি কোন কারণে সে বছর মামার বাড়ি কৃষ্ণনগরে যেতাম ওই সময় - মাঝে মাঝে যেতাম - তবে তার মধ্যে কোনোবার চার্চে বেড়াতে যাওয়া হ'ত। কৃষ্ণনগরের গীর্জা বেশ পুরনো আর বেশ বড়, সে সময় মেলার মত ভিড় হ'ত। মনে আছে একবার, তখন আমি বেশ ছোট, সেখানে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম। মাকে খুঁজে না পেয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে মাইকওলার কাছে গিয়ে বলেছিলাম, বলে দাও না, আমার মা হারিয়ে গেছে।

কেক নামক বিচ্ছিরি খাদ্যটি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে চোখেই দেখিনি। 

তখন ক্যালেন্ডার ইয়ারই ছিল আমাদের অ্যাকাডেমিক ইয়ার। পুজোর সময় ছুটি থাকত একমাস, ভাইফোঁটার পর স্কুল খুললেই অ্যানুয়াল পরীক্ষা। তার রেজাল্ট বেরোতো ডিসেম্বরে। হেড মাস্টারমশাই সুসিতবাবু প্রত্যেক ক্লাসে গিয়ে পাশ করা ছাত্রদের নাম ঘোষণা করতেন। বাবা ঐ স্কুলেরই শিক্ষক ছিলেন, জীবনেও কোনদিন আগে থেকে বলতেন না আমার রেজাল্ট কেমন। ধুকপুকুনিটুকু জেগে থাকত হেডস্যারের মুখ থেকে নিজের নাম শোনা পর্যন্ত। 

অবশ্য পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলেই মা এর ওর বাড়ি থেকে চেয়ে আনত পরের ক্লাসের অঙ্কবই। সকালে ঘুম থেকে তুলে সামনে বাড়িয়ে দিত তবলা বাঁয়া। আমি লেপের মধ্যে নিজেকে ঢেকে দু চারবার ধা তেরেকেটে মেরে আবার শুয়ে পড়ার ধান্দা করতেই মা চেঁচিয়ে উঠত তোলা উনুনে কয়লা সাজাতে সাজাতে। তাই আরো দু চারবার বাজাতে হ'ত ধা তেরেকেটে ক্রেধা তেরেকেটে ধিন্না কত্তা। উঠে তুষের চাদরে নিজেকে পেঁচিয়ে আভা না বিভা দাঁতের মাজন বাঁহাতের তালুতে ঢেলে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে দাঁত মালিশ করতে করতে চলে যেতাম বাসরাস্তার ধারে। হলুদ নরম রোদ উঠত তখন। রাস্তার ধারে কাঠ আর পুরনো খবরের কাগজ জ্বেলে হাত পা সেঁকত কেউ কেউ, আমি তার পাশে গিয়ে বসতাম। ইস্কুল ছুটি, তাই বাবার টিউশনির ছাত্ররাও তখন পড়তে আসত না। 

তখন আমাদের খেলা ছিল সিগারেটের বা দেশলাইয়ের খাপের ছবি দিয়ে তাস খেলা। মাটির ওপরে একটা বিন্দু, সেটা হচ্ছে এখনকার কম্পিউটারের ভাষায় 'হোম'। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা লোহার কড়াইভাঙা চাকতি - যার মাপ বারো থেকে ষোলো বর্গ-ইঞ্চি, সেটা চালা হ'ত এমনভাবে, যাতে সেটা কুড়ি বাইশ মিটার দূরের কোনো এক জায়গায় এমনভাবে বসানো যায়, যাতে যে পরে চালবে, সে কিছুতেই তার চার-আঙুলের প্রস্থের দূরত্বে ফেলতে না পারে। চেলে নিজেকেই বুঝে নিতে হ'ত কতটা কঠিন জায়গায় চাকতিটা বসেছে। সেইমত তার ওপর একগোছা তাসের চ্যালেঞ্জ, মানে তুমি এর ঘাড়ে চাকতি বসালে আমি তোমাকে এতগুলো তাস দেব। চ্যালেঞ্জার কখনো সেই চ্যালেঞ্জ নিত, আর বসাতে পারলে জিতত, না বসাতে পারলে ততগুলো নিজের তাস গুনে দিত তাকে। সে চ্যালেঞ্জ না নিয়ে প্রথম চালা চাকতিধারীকে হোমে ফিরে আসার চ্যালেঞ্জও জানাতে পারত। এই খেলা চলত যতক্ষণ না একপক্ষ নিজের সব তাস হেরে যেত। সঙ্গে যত তাস আছে, তাকে বলা হ'ত হাত-প্যান্ট-পকেট। লোকজন চোট্টামো করে নিজের অঙ্গের বিচিত্র সব জায়গায় তাস লুকিয়ে রাখত। হাপ্প্যানপকেট ডেকে জিতলে বের হ'ত সেই সব তাস। সে নিয়ে মারামারিও হ'ত। 

কত বিচিত্র রঙের আর ডিজাইনের সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বাক্স ছিল তখন। এখন আর দেখি না, সব উঠে গেছে। 

ডান্ডাগুলি বা লাট্টু খেলা হ'ত ইউনিয়ন বোর্ডের মাঠে। কাঁচের গুলি দিয়েও খেলা হ'ত খোলা জায়গায় বা দেওয়ালের ধারে। অনেক জন মিলে খেললে সেই গুলি চালা হ'ত কুলোয় ঢেলে। কুলো জিনিসটাই এখনকার বাচ্চারা হয়ত চোখে দেখেনি। 'ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো' বললে কী বলা হচ্ছে, তা বোঝাতেই সব্বোনাশ। ক্রিকেট খেলা হ'ত, অবশ্যই টেনিস বলে - আমরা বলতাম ক্যাম্বিস বল। রবার ডিউস নামে এক শক্তপোক্ত রবারের বল পাওয়া যেত, তার লাফানি দুরন্ত। প্যাড-গ্লাভ্‌স্‌ লাগিয়ে আসল বলে ক্রিকেট খেলার সঙ্গতি আমাদের ছিল না, তাই মাঝে মাঝে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে ঐ রবার ডিউস। তখনকার ফুটবল এখনকার এই নিটোল স্ফেরিক্যাল ছিল না। চামড়ার গোলকের মধ্যে ভরা থাকত রবারের গোলক, তার মুখে নল লাগানো। চামড়ার গোলকের এক জায়গায় কাটা থাকত, তার দুপাশে বোতাম লাগানোর মতন ঘর করা। নলে হাওয়া ভরা হ'ত, আর তারপর নলটা চেপ্টে ভাঁজ করে চামড়ার গোলকের মধ্যে ভরে জুতোর ফিতে বাঁধার মত সেই চামড়ার কাটা জায়গাটা বাঁধা হ'ত। বল পুরনো হয়ে গেলে সেই কাটা জায়গাটা বিচ্ছিরি রকম ফেটে যেত, তার তার মধ্যে থেকে রবারের ফুলানো বল আবের মত উঁচু হয়ে বেরিয়ে থাকত। আমরা অবশ্য বাতাবিলেবুর বল লাথানোর পরে সেই বল পেলেই উল্লসিত হয়ে তাই নিয়ে পেলে-র মত ড্রিবলিং করতাম। 

ইস্কুলের মাঠে স্যাররা ব্যাডমিন্টন খেলতেন। ছাত্র-শিক্ষক মিলে ভলিবল খেলত। একপাশে বাস্কেটবলও খেলা হ'ত কখনো কখনো।  

তবে বাড়ি ফিরে আমি সাধারণত অঙ্ক বইটা নিয়ে বসতাম। দোসরা জানুয়ারি নতুন ক্লাসে গিয়ে বসার একটা আনন্দ ছিল। ক্লাস শুরুর আগেই চার পাঁচটা চ্যাপ্টার আমি নিজে নিজেই করে ফেলতে পারতাম। তখন আর পুরনো বইটা ভাল লাগত না। নতুন ক্লাসে উঠলে নতুন বই এনে দিত বাবা, স্কুল থেকে বিক্রি হ'ত বঙ্গলিপি খাতা। 

আমরা একত্রিশে ডিসেম্বরের শীতের রাতে অন্য রাতের মতই রুটি-তরকারি-মাছের ঝোল খেতাম, শুয়ে পড়তাম রাত দশটার মধ্যেই। পয়লা জানুয়ারি ঘুম ভাঙত ভোরবেলা মা'র ডাকেই, যদিও তার অনেক আগে থেকেই বাবা বিছানায় বসে বসেই আবৃত্তি শুরু করে দিত - ওঁ পার্থায় প্রতিবোধিতাং ভগবতা নারায়ণেন স্বয়ম্ / ব্যাসেন গ্রথিতাং পুরাণমুনিনা মধ্যে মহাভারতম্‌ ...

মঙ্গলবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৬

মমতাহীন ~ অনামিকা মিত্র

সিঙ্গুরে যার দহন দেখে চমকেছিলে 
আমিই আবার দগ্ধ হলাম গড়বেতাতে 
নাই বা গেলে আমার জন্য আজ মিছিলে,  
অন্যে গেলে, কেনই বা রাগ করবে তাতে?  

মৌলবাদের সঙ্গে তোমার গট আপ খেলা
মুখোস পড়া শকুনপ্রতিম ভোটশিকারি।  
কুমিরকান্না কাঁদছ না কই, আমার বেলা?   
নজর শুধুই রাজতখতের দখলদারি?  

সাংবাদিক আজ দারুণ বাধ্য টাকার জোরে  
তোমার হাতেও খুব অকৃপণ টাকার থলি 
উন্নয়নের জ্বলছে টুনি গ্রাম-শহরে
আগুননদীর খাত ঢেকে দেয় লোভের পলি। 

চোখ ধাঁধাচ্ছো ভিক্ষে দেবার রকমফেরে
কেউ বিভূষণ, কারওর জন্য ভিক্ষা অন্ন  
অশ্রু বারণ। শুকনো চোখেই কাঁদছে কে রে,
রাজপেয়াদা ঘুরছে তাদের ধরার জন্য।  

তোমার মিথ্যে ভাষণ শোনার ভুল সময়ে 
প্রত্যেকদিন কন্যাশ্রীর শরীর পোড়ে
মেয়ের শোকে কাঁদছে যারা আকুল হয়ে 
তাদের মধ্যে বাঁচব আমি… নতুন করে।

রবিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

দাঙ্গা ~ কৌস্তভ কুন্ডু

১৯৪৭ এ পুরো পরিবার চলে এলেও দাদু থেকে যায় বাংলাদেশে। বরিশালের গৌড় এ। তামাকের ব্যবসা ছেড়ে আসতে রাজী হয়নি। বা ১৯৫০ এ যখন ২০০ জনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাম দা দিয়ে একে একে গলা কাটা হয় তখনও আসেনি, (এটা গল্প নয়, বা গুজব নয়, ১৯৫০ বরিশাল genocide নিয়ে ঘাটাঘাটি করুন এর উল্লেখ পাবেন।) । কিছুতেই ব্যবসা ছেড়ে আসতে রাজী ছিলো না।
তারপর ১৯৭১, গ্রামে গ্রামে রাজাকার বাহিনী তান্ডব চালাচ্ছে । দাদুর মাথার দাম দিয়েছে ১০ হাজার টাকা। একদিন গ্রামের কিছু মুসলমান এসে বলল রাজাকার বাহিনী আসছে, তারাই বলল গ্রামের সব হিন্দুরা বড় গোডাউনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ুক। তাহলে রাজাকার বাহিনী খুঁজে পাবেনা, সুরক্ষিত থাকবে। সেই রাতে ৮২ জন হিন্দু আশ্রয় নেয় গোডাউনে। দাদু ভোরের আলো ফোটার আগে প্রাতঃকৃত সারতে মাঠে যায় । তখন দেখতে পায় মশাল, তরোয়াল নিয়ে ক্ষেতের আল ধরে কারা গোডাউনের দিকে যাচ্ছে । রাজাকার বাহিনী । আর ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই ছেলেগুলো যারা গোডাউনে আশ্রয় দিয়ে বলেছিল আপনারা সুরক্ষিত । প্রাণভয়ে দৌড়তে শুরু করে দাদু, দূর থেকে দেখেছিল গুদামে আগুন লাগানো হচ্ছে। ভোরের দিকে স্টিমার ঘাটে পৌঁছয়, সেখানেও রাজকাররা, কোন হিন্দু কে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। খুন করা হচ্ছে, আর মেয়ে হলে তাদের রেখে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধকালীন খাদ্য হিসেবে । যতদিন যুদ্ধ চলবে ধর্ষণ করা হবে। গ্রামে একসাথে থাকতে গিয়ে নামাজ পড়ার কায়দাটা জানত দাদু। সবার সাথে নামাজ পড়তে বসে যায়। নামাজ পড়তে দেখে সন্দেহ করেনি কেউ, স্টিমারে উঠতে দেয়। তারপর চলে আসে দাদু এদিকে, আর কোনদিন বাংলাদেশে ফিরে যায়নি।
পরে খবর পায় ঐদিন বাকি ৮১ জনকে গোডাউন সুদ্ধু জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয় ।
ছোট থেকে ঘটনাটি শুনে বড় হয়েছি, তারপর একদিন গুজরাত দাঙ্গার বার্ষিকীতে কোন একটা খবরের চ্যানেল গুজরাতের ভয়াবহতার কথা দেখাচ্ছে, দাদু আর আমি দেখেছি, দাদু বলছে "ইসস, মানুষ না হালারপোলা গুলান।" আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম তোমাদের সাথেও তো এরম হয়েছিল বাংলাদেশে। দাদু বলল "হোন, যারা একবার দাঙ্গা দ্যাখছে নিজের চোখে, হে আর দাঙ্গা support করবো না।"
আমি ঘৃণা করি দাঙ্গা, ঘৃণা করি জামাত, ঘৃণা করি বিজেপি ।
ফিরে যায়নি দাদু বাংলাদেশ, একদিন google map খুলে দেখাচ্ছিলাম বরিশাল, দাদু খুশি হয়ে ওঠে । তারপর দুজন মিলে অনেক খুঁজে খুঁজে পেয়ে গেছিলাম নিজেদের ঘর, গৌড় নদীর পাশে........

(Courtesy: Kaustav Kundu )

মঙ্গলবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

নাটক : কল্লোল : (পঞ্চাশ বছর পেরোচ্ছে)

শার্দুল সিং বলে কেউ ছিল না! খাইবার বলে কোনো জাহাজ ছিল না! উৎপল দত্ত ইতিহাস জানেন না। কংগ্রেস কখনো নৌ বিদ্রোহকে স্যাবোতাজ করেনি।* *এই নাটকটা যে চলছে এটা বাংলার পক্ষে লজ্জার। বন্ধ করে দেওয়া হোক। এই সব ছিল নাট্যসমালোচনা, তথাকথিত বড় পত্র-পত্রিকায়।* *শেষে যখন এতেও কাজ হল না,তখন একে একে স্টেট্‌সম্যান ছাড়া সব পত্রিকা বলল বিজ্ঞাপন নেব না নাটকের।

একদম হিংস্র হয়ে এক পত্রিকা বলল, সব পত্রিকা সব নাটকের বিজ্ঞাপন নেয় না।পাল্টা এল তাপস সেন-এর মাথায়।এল টি জি জানাল, সব নাটক সব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয় না। আর তাপস সেন রাতারাতি পোস্টারের বয়ান বানালেন, 'কল্লোল চলছে, চলবে।' ট্রেড ইউনিয়নের কর্মী, ছাত্র-যুব, অন্যান্য নাট্য সংগঠনের জোটের কর্মীদের হাতে হাতে, তারপর দর্শকের হাতে হাতে গোটা পশ্চিমবঙ্গের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে গেল সেই পোস্টার।

এর আগে 'অঙ্গার' আক্রান্ত হয়েছিল মিনার্ভায়। কংগ্রেসী গুন্ডা নেপাল রায়ের নেতৃত্বে কাঁচ ভেঙে 'দেশদ্রোহী' (মানে কং সরকার বিরোধী/ বুর্জোয়া খনি মালিক বিরোধী বলে) নাটককে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে মিনার্ভার পাহারায় থাকত ছাত্র-যুব-শ্রমিকের দল। 'কল্লোল'-এ তাই সুবিধে হল না ও ভাবে গুন্ডামির। ফোন করে ভয় দেখিয়ে, রাস্তায় হেনস্থা করে, জোছন দস্তিদারকে সমর্থনের জন্য মেরে, উৎপল দত্তকে একটি প্রবন্ধের জন্য দেশরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করে 'কল্লোল'-র শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়ার অবিরাম চেষ্টা চলল। শার্দুল সিং চরিত্রাভিনেতা শেখর চট্টোপাধ্যায়কে বারেবারে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়ে দল ভাঙার চেষ্টাও ছিল।

বলরাজ সাহানির মত প্রবীণ আই পি টি এ কর্মী (একদার) অন্য কিছু না পেয়ে নাটকের সঙ্গীতে কেন রাশ্যান, জার্মান নৌ বিদ্রোহের সুর ও গান ব্যবহার হয়েছে তাই নিয়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে ঠুকলেন। তাঁর সাম্প্রতিক জাতীয়তাবাদ উথলে উঠে বলছিল দেশীয় নাটকে দেশীয় সুরই থাকতে হবে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ইন্টারন্যাশনালের জন্ম মনে করিয়ে দিতেই চাপ হয়ে গেল। কম্যুনিস্ট পার্টি ভাঙনের আভ্যন্তরীণ বিতর্কের অংশ এ সব।

সত্যজিৎ-মৃণাল থেকে অজিতেশরা সকলে পথে নামলেন উৎপল দত্ত-র মুক্তির দাবীতে। সারা ভারত থেকে প্রতিবাদ এল। এল বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে। অনেকেই 'কল্লোল'-এর রাজনীতির সঙ্গে সহমত না। কিন্তু শিল্প ও শিল্পীর স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন।* *কলকাতারই আরেক প্রবাদপ্রতিম নাট্যব্যক্তিত্ব একবারের জন্যও ভাঙলেন না তাঁর হিরণ্ময় নীরবতা। প্রতিবাদ করলেন না।

তবু সেদিনকার কং সরকার গণ আন্দোলনের চাপে মুক্তি দিতে বাধ্য হলেন একসময় উৎপল দত্ত সহ অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের। উৎপল দত্ত যখন জেলে তখনও 'কল্লোল' চলেছে। অভিনেতারা যাবতীয় ভয় তুচ্ছ করে কাজ করেছেন। এবং তাঁদের পাহারা দিয়েছে শ্রমিক-ছাত্র-জনতা ঐক্য।

ঠিক এইখানে জনতার শিল্প এবং কম্যুনিস্ট পার্টির সম্পর্ক যেমন করে ফুটে উঠেছিল তা আর কখনো ফুটে ওঠেনি। 'কল্লোল'-এর প্রযোজনা নিয়ে আজ আর লেখার ইচ্ছে নেই। শুধু বলার কথা যে এমন এক ঐতিহাসিক প্রযোজনার পঞ্চাশ বছর কেমন নিঃশব্দেই প্রায় চলে যাচ্ছে। স্বপ্নগুলো সব বদলে গেছে বলে? 'কল্লোল'-এর শেষ দৃশ্যে নাবিকেরা, স্বাধীনতার সশস্ত্র যোদ্ধা পরাজিত নাবিকেরা ক্ষত বিক্ষত দেহ-মন নিয়েও বলতে বলতে যেতেন 'নো সারেন্ডার নো সারেন্ডার'। বাতাসের কানে কি আজ কেউ সেই কথা বলে আর?

শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

হাম্বা ~ সুশোভন পাত্র

হিন্দুকুশের চড়াই পেরিয়ে, ৩২৭ খৃষ্ট-পূর্বাব্দে ম্যাসিডনের দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা আলেকজান্ডার এসে পৌঁছলেন উত্তর-পশ্চিম ভারতে। ক্লান্ত, অবসন্ন, ক্ষুধার্ত বিশাল সৈন্য বাহিনী বিস্তীর্ণ অরণ্য চষে আবিষ্কার করল এক অর্ধচন্দ্রাকার ফল, কলা ¹।  কাঁচা অবস্থায় ভেতরে প্রয়োজনীয় স্টার্চ সরবরাহের তাগিদে ক্লোরোফিল সমৃদ্ধ যে কলার খোসা সবুজ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রঙ বদলে সেটা হয়ে যায় হলুদ। বদলের হিড়িকটা ঠিক আমাদের আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নোট বাতিলের ঘোষণার মত। পাঁজি দেখে আট তারিখ, আট ঘটিকায় সেই যে পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে বললেন -"মিঁত্রো, কষ্ট কেবল দু-দিনের।" জাপান ফেরত সেই দু-দিন বেড়ে হল একমাসের। একমাস এখন একধাক্কায় দিন পঞ্চাশের। আর শাস্ত্রমতে অর্থমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ বাণী, কষ্ট নাকি টেনেটুনে ঐ ছ'মাসের ² । সাইজে ছিল তিল, বদলে হয়ে গেলো তাল।
ডিমান্ড-সাপ্লাই'র অর্থনীতির দুর্বোধ্যতায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হৃদয়ঙ্গম করতে গুজরাটের শাহানশাহর একটু ভুলচুক তো হতেই পারে। প্রজা সকলের দুর্দশার আয়ুষ্কালও অনায়াসে তাই দু-দিন থেকে ছ'মাসে উত্তীর্ণ হতেই পারে। সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী যখন বলছেন দেশজুড়ে 'কালচারাল রিভোলিউশন' চলছে তখন ব্যাঙ্ক-এটিমের লাইনে শ-খানেক কো-ল্যাটারেল ড্যামেজ ঘটতেই পারে ³ ।  কিছু শ্রমিক ছাঁটাই, কিছু আধপেটা কৃষকের আত্মহত্যা, কিছু কন্যাদায়গ্রস্ত বাপেদের হার্টফেলের খবরও কানাঘুষো আসতেই পারে। এমনকি আড়ালে আবডালে ডিমনিটাইজেশনের উদ্দেশ্য-বিধেয়টাই সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। আফটার অল, দার্শনিক হেরাক্লিটাস তো কবেই বলে গেছেন 'বদলই জগতের একমাত্র সত্য' ⁴ । 
প্রধানমন্ত্রীর একমাস আগের ২৫ মিনিটের বক্তব্যে, ডিমনিটাইজেশনের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল 'কালো টাকা উদ্ধার' এবং 'জাল নোটের কারবার বন্ধ।' সেদিন প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যে ১৮ বার 'কালো টাকা' এবং ৫ বার 'জাল নোট' শব্দ-বন্ধ ব্যবহার হলেও, 'ডিজিটাল/ক্যাশলেস ইকোনমির' শব্দ-বন্ধ অনুল্লেখিতই ছিল। শতাংশে শব্দ-বন্ধের গুলোর ব্যবহার ছিল যথাক্রমে, ৭৮.৩%, ২১.৭% এবং ০%। আর গত ২৭শে নভেম্বরের 'মান কি বাত' অনুষ্ঠানে ডিমনিটাইজেশনের ঘোষিত উদ্দেশ্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে, 'ডিজিটাল/ক্যাশলেস ইকোনমির' শব্দ-বন্ধের আমদানি হয়েছে ৭২.৭% হারে, 'কালো টাকা' শব্দ-বন্ধ ব্যবহার কমে হয়েছে ২৭.৩%, আর বেমালুম গায়েব 'জাল নোটের' প্রসঙ্গ ⁵।  আপনি যে এদ্দিন জানতেন দেশে কালো টাকা উদ্ধারের বলশেভিক বিপ্লব হচ্ছে, জাল নোটের বিরুদ্ধে অগ্নিযুদ্ধ চলছে, আদপে তা না, ডিমনিটাইজেশনে নাকি দেশের ইকোনোমি এখন 'ক্যাশলেস' হচ্ছে। ছিল রুমাল, একমাসে হয়ে গেলো আস্ত একটা বেড়াল!
আসলে খোদ আয়কর দপ্তরের তথ্যানুসারে 'লিকুইড ক্যাশে' কালো টাকার পরিমাণ যখন মাত্র ৬%, তখন 'কালো টাকা উদ্ধারের' অজুহাতে ৮৬% ক্যাশের লিগ্যাল টেন্ডার বাতিল; 'ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়ে'র জোগাড় ⁶। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্টে সার্কুলেটেড নোটে জাল নোটের পরিমাণ যখন .০০০৭%, তখন 'জাল নোটের কারবার বন্ধ'র অছিলায় দেশসুদ্ধু  মানুষের ভোগান্তি; 'মশা মারতে কামান দাগা'র ফলাফল ⁷। আর এখন যখন, সমস্ত কালো টাকা'ই বজ্র আঁটুনির ফোস্কা গেরোয় সিস্টেমে ফিরে এসে সাদা হয়ে যাবার সম্ভাবনা ক্রমশ প্রবল হচ্ছে, ⁸ ⁹ এখন যখন মোহালি থেকে কর্ণাটক, উড়িষ্যা থেকে মুম্বাইয়েও নতুন নোট আকছার জাল হচ্ছে,¹⁰ ঘোষণার তিন সপ্তাহ পরেও যখন বাতিল টাকার অঙ্কের মাত্র ১০% পূরণ করা হয়েছে বলে খবর বেরোচ্ছে,¹¹ তখন সাপের ছুঁচো গিলে, প্রধানমন্ত্রীর 'ক্যাশলেস ইকোনমির' অলীক স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা আসলে 'ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া'র উপক্রম।
কাদের ক্যাশলেস ইকোনমির স্বপ্ন দেখাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী? যে দেশের ৯১.২ কোটি মানুষ এখনও ইন্টারনেট পরিষেবাই বাইরে, তাঁদের? যে দেশের মাত্র ১৩ কোটি মানুষ ডেবিট কার্ডে লেনদেন করেন, তাঁদের? না, যে দেশের মাত্র ২.১১% মানুষ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন, তাঁদের? প্রধানমন্ত্রীও কি এই গ্রহেরই, সেই অভাগা ভারতবর্ষের বাসিন্দা, যে দেশে 'ইন্টারনেট পেনিট্রেশন রেট' ২৭%; বাস্তবে কিনা কেনিয়া, নাইজেরিয়া'র থেকেও কম? যে দেশের 'অ্যাভারেজ পেজ লোড টাইম' ৫.৫ সেকেন্ড; আসলে কিনা বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার থেকেও খারাপ? কিম্বা যে দেশে গড়ে প্রতি ১১৭৬ জনের জন্য রয়েছে  মাত্র একটা কার্ড সোয়াইপ মেশিন ¹² ¹³ ? জনাব, আপনার প্যায়ারের শ্যাম আঙ্কলের দেশেও যখন বেচাকেনার ৪৬ শতাংশই হয় ঐ ক্যাশেই, তখন এদেশে 'ক্যাশলেস ইকোনমির' আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে, গাছে তুলে, মইটা না কেড়ে নিলেই কি চলছিল না ¹¹ ?
নিউমেরোগ্রাফিক সংস্থার এন্ট্রেপ্রেনিউর কুলপ্রীত কর, হায়দ্রাবাদের জনৈক ভিক্ষুক কে প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি ভিডিও বানান। ১ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডের ভিডিও তে বিলাসবহুল গাড়ির ভেতরে বসে থাকা ভদ্রমহিলা খুচরোর অভাবে, ভিক্ষুকের কার্ড সোয়াইপ মেশিন ব্যবহার করে ভিক্ষা দেন। প্রধানমন্ত্রী মোরাদাবাদের জনসভায়, তিন বছর আগের সেই ভিডিও হোয়াটস অ্যাপে দেখে, ডিজিটাল ভিক্ষুকের দক্ষতায় আহ্লাদিত হয়ে 'ক্যাশলেস ইকোনমির' তাঁবেদারি করলেন। গরু খোঁজা খুঁজলেও আর একটা রাষ্ট্রনেতাও আপনি পাবেন যিনি, দেশের তাবড় অর্থনীতিবিদ'দের প্রশ্নের উত্তর দেননা, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর'দের উদ্বেগ কে তোয়াক্কা করেন না, সাংসদ কক্ষে উপস্থিত থাকেন না, বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন না; অথচ হোয়াটস অ্যাপে বস্তাপচা স্ক্রিপ্টেড ভিডিও দেখে নিজের ঢাক নিজেই পেটাতে কসুরও করেন না ¹⁴ ।
আর যেমন অন্ধ কানাই, তেমন জুটেছে পাগলা জগাই। প্রধানমন্ত্রী যদি বলেন, 'মিঁত্রো, সব কালো টাকা আছে সুইস ব্যাঙ্কে', বশংবদ পাগলা জগাইরা সমস্বরে ডেকে ওঠেন, 'হাম্বা।' যদি বলেন, 'মিঁত্রো, ক্ষমতায় এলেই প্রত্যেকের একাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা পড়বে', তাঁরা  ডেকে ওঠেন, 'হাম্বা'। প্রধানমন্ত্রী যদি বলেন, 'মিঁত্রো, ডিমনিটাইজেশনে কালো টাকা উদ্ধার হবে', জাল নোট বন্ধ হবে', তাতেও তাঁরা ডেকে ওঠেন, 'হাম্বা'। আর এখন যখন প্রধানমন্ত্রী বলছেন, 'মিঁত্রো, ডিমনিটাইজেশনে দেশের ইকনোমি ক্যাশলেস হবে', এখনও তাঁরা ডেকে উঠেছেন, 'হাম্বা।' বাজি ধরুন, যেদিন রাত্রি ৮ টায়, প্রধানমন্ত্রী টিভির পর্দায়, পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে, জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলবেন "মিঁত্রো, কুছ ভি বোলো, টাট্টি তো হামে বাথরুম মে হি করনা চাহিয়ে", সেদিনও এই স্তাবক পাগলা জগাইরা, সমস্বরেই, সপ্তমে সুরে, প্রাণ ভরিয়ে এবং তৃষা হরিয়ে গেয়ে উঠবেন, 'হাম্বা... হাম্বা...হাম্বা'।

শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

পেক্ষাগৃহে জাতীয় সংগীত ~ সরসিজ দাশগুপ্ত

"জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মরাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ
বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছলজলধিতরঙ্গ
তব শুভ নামে জাগে, তব শুভ আশিষ মাগে,
গাহে তব জয়গাথা।
জনগণমঙ্গলদায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় হে।"

৫২ সেকেন্ড গান গেয়ে নিলাম। আইন সদা পরিবর্তনশীল, আজ প্রেক্ষাগৃহে বাধ্যতামূলক হয়েছে, কাল লেখালেখিতেও হতেই পারে। প্রগতিশীল মানুষ যে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কাজ করবে তা বলাইবাহুল্য, তাই, একটু গেয়েই নিলাম। কি আর যায় আসে। ক্ষতি তো কিছুই নেই। হ্যাঁ, "মানতে ক্ষতি কি", এই যুক্তিতেই তো আজকাল সমস্ত বিতর্ক ধামা চাপা পরে যাচ্ছে। সত্যিই তো, ক্ষতি কি যদি কিছু মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হয় প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে ? হোক না বাধ্যতামূলক, ক্ষতি তো কিছু নেই। মোটের ওপর এইভাবেই শুরু ও শেষ হয় সমস্ত ডান-পন্থী মানুষের যুক্তি। রাষ্ট্রের শাসন মানবে না কোনো ? কেনো সব ব্যাপারে প্রশ্ন করবে, এতো কিসের সমস্যা ? বাড়িতে বাবার শাসন মানোনা ? জানোনা শাসন মানুষ হওয়ার পথে এক অপরিহার্য আনুষাঙ্গিক ? কৈ, সিয়াচেনে -৪০ ডিগ্রী গরমে পাহারারত সৈনিকরা তো প্রশ্ন করছে না ? তোমার তো সবেতেই সমস্যা, দুনিয়ার কোন রাষ্ট্র পারফেক্ট ? এইসব আজকাল যেকোনো আলোচনায় দু-একজন বন্ধুবান্ধব বলেই ফ্যালেন। যেমন কথায় কথায় প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে, আমাদের দেশাত্মবোধে, দেশপ্রেমে, দেশের প্রতি ভালোবাসায়। মৃদুস্বরে ধরুন ভুলবসত বলেই ফেল্লেন, "যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই", ব্যাস, হয়ে গেলেন পাকিস্তান-পন্থী ! হয়ে পড়লেন দেশ-বিরোধী, হ্যাঁ, ওই একটা বাক্যেই একসাথে হয়ে গেলেন, উন্নয়নবিমুখ থেকে এন্টি-ন্যাশনাল হয়ে একদম, জেহাদি অব্দি। তা হোক, ক্ষতি কি ? সার্জিকাল স্ট্রাইকে কয়েকটা কল্যাটেরাল ড্যামেজ হয়েই থাকে।
এই লেখা যখন লিখছি, ইন্টারনেট তখন উত্তপ্ত আলোচনায় ব্যস্ত। তিরিশে নভেম্বর, দুহাজার ষোলোর যুগান্তকারী রায়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ভারতবর্ষের সমস্ত প্রেক্ষাগৃহে ছবি শুরুর আগে বাধ্যতামূলকভাবে জাতীয় সংগীত শোনানো হবে। সত্যিই তো, ক্ষতি কি ? এতে যখন ক্ষতি কিছু নেই, তাহলে আলোচনাতেও ক্ষতি নেই। আসুন, বুঝেনি, কি হলো, কেন হলো, কিভাবে হলো।
ফিরে যেতে হবে, দু হাজার তিন সালে। ফিরে যেতে হবে, বলিউডে। করণ জোহরের "কভি খুশি কভি গম"। চলচ্চিত্রটির একটি দৃশ্যে অভিনেতা শাহরুখ খানের ছেলে, তার ইংল্যান্ডের স্কুলের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে ভারতের জাতীয় সংগীত গাইতেই, প্রথমে শুধু শাহরুখ খানের পরিবার একমাত্র ভারতীয় হিসেবে উঠে দাঁড়ালেও, আস্তে আস্তে ভারতের জাতীয় সংগীতের সম্মানে উঠে দাঁড়ালেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত সমস্ত দর্শক। কিন্তু উঠলেননা প্রেক্ষাগৃহে বসে থাকা দর্শকেরা। যাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, জনৈক শ্যাম নারায়ণ চৌকসি। আধ্যাতিক ও  ধর্ম-কর্মে ব্যস্ত থাকা এই ভদ্রলোক কেন ও কি কারণে হটাৎ চলচ্চিত্র দেখতে গেছিলেন জানা যায়নি, তবে, জানা গেছে তার রাগ এবং দুঃখের কথা। দুইয়ের কেন্দ্রেই ওই উঠে না দাঁড়ানো দর্শককুল। নিজে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বাধা পেয়েছিলেন পেছনে বসা দর্শকদের থেকে, তারপর প্রথমে, প্রেক্ষাগৃহের মালিকের কাছে অনুযোগ, তারপর প্রেক্ষাগৃহের বাইরে সত্যাগ্রহ, তারপর পুলিশের কাছে অভিযোগ। এছাড়াও আরো নানান ভাবে তিনি জনসাধারণকে বোঝানোর চেষ্টা করে এবং সেই চেষ্টায় বিফল হয়ে, শেষে মামলা করেছিলেন, মহামান্য মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টে। প্রতিপক্ষ, কেন্দ্রীয় এবং মধ্যপ্রদেশ সরকারের সাথে সাথে সেন্সর বোর্ড আর চলচ্চিত্রটির প্রযোজকেরাও। যুক্তি ছিল, যেহেতু, ভারতবর্ষের সংবিধানে ও ১৯৭১ সালের ন্যাশনাল অনার এক্টে, জাতীয় সংগীতের অবমাননার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এবং যেহেতু, জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে ব্যবসায়িক লাভ আইনত দণ্ডনীয়, সেহেতু, চলচ্চিত্রর অংশ হিসেবে জাতীয় সংগীতকে রাখা যাবেনা, এবং চলচ্চিত্রটিকে সাময়িক ভাবে বন্ধ করতে হবে, এই বিষয়ে শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া অব্দি। ওনার রিট পিটিশন আদতে ছিল, একটি জনস্বার্থ মামলা।
জাতীয় সংস্কৃতির রক্ষক ও দেশপ্রেমের দায়িত্বে ব্রতী, শ্যাম নারায়ণ চৌকসিকে এচোখেই দেখেছিলেন মাননীয় বিচারপতি দীপক মিশ্র ও এ. কে. শ্রীভাস্তাভের ডিভিশন বেঞ্চ। শ্যাম নারায়ণ চৌকসির অভিযোগের উত্তরে সেন্সর বোর্ড জানায়, ছাড়পত্র দেওয়ার আগে তারা উক্ত চলচ্চিত্রটি দেখেছিলেন, এবং, চলচ্চিত্রটিতে আপত্তিজনক কিছু পাননি। আর, চলচ্চিত্র চলাকালীন দর্শকদের উঠে দাঁড়ানর নির্দেশ দেওয়ার অধিকার যেহেতু সেন্সর বোর্ডের নেই, তাই, তাদের মতে, চলচ্চিত্রটি বিনা বাধায় চলতে দেওয়া উচিত। দর্শক উঠে দাঁড়াবে কিনা, তা দর্শকদের বিচার্য, সেন্সর বোর্ডের না। কিন্তু প্রশ্ন তো দেশের সম্মান রক্ষার, জাতীয় সংগীতের অপমান, আসলে তো দেশের অপমান। তাই এতো সহজে মেটেনি ব্যাপারটা। স্বল্প কোথায় বলতে গেলে, মামলার পুরো আলোচনা হয়েছিল, দুটি প্রশ্নের ওপর, এই চলচ্চিত্রে জাতীয় সংগীতের ব্যবহার দ্যাখানো যায় কিনা, এবং দ্যাখালে, দর্শকদের উঠে দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক কিনা। বিচারের শেষে মাননীয় বিচারপতিদ্বয় রায় দেন যে, উক্ত চলচ্চিত্রে আর জাতীয় সংগীতের ব্যবহার দ্যাখানো যাবেনা, এবং, যতক্ষণনা অব্দি ওই দৃশ্য উক্ত চলচ্চিত্র থেকে বাদ দেওয়া হবে, ততক্ষন চলচ্চিত্রটি, কোনো প্রেক্ষাগৃহে, টিভি চ্যানেলে, ভিডিও ক্যাসেটে ও লোকাল কেবিলে দেখানো যাবেনা। প্রথম প্রশ্নের নেতিবাচক উত্তরের ফলে, দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর আর খোজ হয়নি।
চমকে না গিয়ে, উক্ত চলচ্চিত্রটি যেকোনো মাধ্যমে দেখুন, সেই দৃশ্য আজও সমান সম্মান সহকারে দেখানো হয়ে থাকে। কারণ, যথাযথ কারণে, মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টের ওই রায়কে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট, বাতিল করে দেয় এবং, উক্ত চলচ্চিত্রটি পুনরায় একই ভাবে চলবার অনুমতি পায়।
কিন্তু, চাকা ফিরে আসে, কপালের লিখন খণ্ডানো অসম্ভব, ইত্যাদি ইত্যাদি। তেরো বছর পরে, সুপ্রিম কোর্টে সেই একই শ্যাম নারায়ণ চৌকসির সাথে আবার দ্যাখা হয়ে যায়, মাননীয় বিচারপতি দীপক মিশ্রর। বিষয়ও আবার একই, জাতীয় সংগীতের অবমাননা। কাকতালীয়, নাকি, এক হাতে তালি বাজেনা, সে তর্কে না গিয়েও বলা যায়, ঘটনা হিসেবেই বিরল। তা সে যাই হোক, এবার আর কোনো নির্দিষ্ট চলচ্চিত্র নয়, অন্য কিছু ছোটোখাটো নাম-মাত্র আর্জির সাথে সাথে, সমস্ত প্রেক্ষাগৃহে বাধ্যতামূলকভাবে জাতীয় সংগীত প্রদর্শনের আর্জিও ছিল। মামলায় একমাত্র প্রতিপক্ষ হলো কেন্দ্রীয় সরকার। প্রথম শুনানির দিন, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদ্বয় জাস্টিস দীপক মিশ্র ও অমিতাভ রায়ের ডিভিশন বেঞ্চ, সরকারের বক্তব্য শুনতে চায়, ও সেই মর্মে নির্দেশ দেয়। এর পরেই আসে তিরিশে নভেম্বর, ২০১৬।
তিরিশে নভেম্বর মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট রায় দিলো যে, (১) জাতীয় সংগীতের থেকে ব্যবসায়িক লাভ করা যাবেনা, (২) জাতীয় সংগীত নাটকীয় ভাবে প্রদর্শন করা যাবেনা, (৩) অসম্মান হতে পারে, এমন কোনো ভাবে জাতীয় সংগীত গাওয়া বা লেখা যাবেনা, (৪) ভারতবর্ষের সমস্ত প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র শুরুর আগে বাধ্যতামূলকভাবে জাতীয় সংগীত চালাতে হবে, এবং, উপস্থিত দর্শকেরা উঠে দাঁড়াতে বাধিত থাকবে, (৫) জাতীয় সংগীত চলাকালীন যাতে কোনোরকম বাধা সৃষ্টি না হয় তাই প্রেক্ষাগৃহের দরজা বন্ধ থাকবে, (৬) জাতীয় সংগীত চলাকালীন পর্দায় জাতীয় পতাকার ছবি থাকবে আর, (৭) জাতীয় সংগীতের সংক্ষিপ্ত প্রয়োগ করা যাবেনা।
এই রায় দেয়ার আগে বা পরে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট রায়ের স্বপক্ষে বিশেষ কোনো কারণ দর্শায়নি, বলেছে শুধু একটি কথা। এ দেশের প্রতিটা মানুষের দেশের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত এবং, ব্যক্তিগত অধিকার সম্পর্কিত ভিন্নমতের চিন্তাভাবনার কোনো অবকাশ নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের আইনজীবীরা মামলার বিষয়ে একটি কথাও না বলে, শুধু রায়টি কার্যকর করবার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ থেকেছে, আর কিভাবে তাড়াতাড়ি এই রায় কার্যকর করা যায় সেই নিয়ে বক্তব্য জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আরো বলা উচিত, এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন রায়, যা দুহাজার সতেরো সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারী অব্দি বলবৎ থাকবে।
অর্থাৎ, মামলার শুনানি শেষ হওয়ার আগেই, মামলার মূল আর্জি মেনে নেয়া হলো। এরকম হয়েই থাকে, যখন বাদী এবং বিবাদী দুপক্ষই মামলার মূল আর্জির ব্যাপারে সহমত পোষণ করে। বর্তমান পরিস্থিতে, কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে, ভিন্ন কোনো আশা, ডান ও বাম নির্বিশেষে, আমাদের কারোরই নেই বলেই আমার বিশ্বাস।
শেষের পরেও একটা কিন্তু থেকে যায়। এই রায়ের মূল অংশে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, "অল দি সিনেমা হলস ইন ইন্ডিয়া শ্যাল প্লে দি ন্যাশনাল এন্থেম বিফোর দি ফীচার ফিল্ম স্টার্টস এন্ড অল প্রেসেন্ট ইন দি হল আর অবলাইজড টু স্ট্যান্ড আপ টু শো রেস্পেক্ট টু দি ন্যাশনাল এন্থেম"। অর্থাৎ, একই বাক্যে একবার "শ্যাল" আর আরেকবার "অবলাইজড" ব্যবহার করেছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রথমটি জাতীয় সংগীত প্রদর্শনের প্রেক্ষিতে এবং দ্বিতীয়টি জাতীয় সংগীত চলাকালীন উঠে দাঁড়ানোর প্রেক্ষিতে। এইখানেই প্রশ্ন থেকে যায়, মহামায় আদালতের কাছে যখন "শ্যাল", "ম্যান্ডাটরিলি", "হ্যাভ টু" জাতীয় নানান শব্দ ব্যবহারে কোনো বাধা ছিলোনা, তখন শুধু "অবলাইজড" কেন, যখন "অবলাইজেড" শব্দের আরো বিবিধ অর্থ যেকোনো অভিধানে সহজলভ্য !
"দি আনসার মাই ফ্রেন্ড ইস ব্লোউয়িং ইন দি উইন্ড, দি আনসার ইস ব্লোউয়িং ইন দি উইন্ড"।

তথ্যসূত্র :
১. AIR 2003 MP 233
২. Writ Petition(s)(Civil) No(s). 855/2016

সোমবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৬

যা জানলাম ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

​গত কয়েকদিনে ফেসবুকে যা জানলাম

1. ফিদেল কাস্ত্রোর কয়েক হাজার শয্যাসঙ্গিনী ছিল এবং উনাদের সাথেই তিনি দিন রাত্রি সারাজীবন অতিবাহিত করিতেন।উনার জাঙিয়ার রঙ ছিল লাল।
2. ফিদেল কাস্ত্রো আমেরিকার সৃষ্টি ও ভয়ঙ্কর অত্যাচারী শাসক ছিলেন।
3. ফিদেল কাস্ত্রো যে বেঁচে ছিলেন তা উনার মৃত্যুতে অনেকে জানলেন।(অনেকটা সেই কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল যে সে মরে নাই এর মত)।
4. লেনিন, স্তালিন, মাও, হো চি মিন,কাস্ত্রো,চে, জ্যোতি বসু,বুদ্ধবাবু,নামুদ্রিপাদ, হরকিশেন সিং, কারাত, ইয়েচুরি, মানিক সরকার ইত্যাদি বড় ছোট যাবতীয় কম্যুনিস্ট নেতা, মন্ত্রীরা শয়তান, মানে ভয়ঙ্কর শয়তান, এরা লুম্পেন,মুস্লিম শাসকদের মত অত্যাচারী,নারীলোলুপ।আর নাটের গুরু ছিলেন মার্ক্স, এঙ্গেলস কারন এদের উস্কানিতে দাস ক্যাপিটাল লেখা হয়েছিল যা কিনা বাইবেলের পর পৃথিবীর সর্বাধিক বিক্রীত( বিকৃত ও হতে পারে) পুস্তক।
5. চার নম্বরে উল্লেখিত লোকজন ছাড়া পৃথিবীর আর সব শাসকই কমবেশি ভাল, চরিত্রের দোষ নেই,বিড়ি সিগারেট,মদ টদ খান না( মুসলিম দেশগুলো এই তুলনা থেকে বাদ)।
6. মহা হারামি দেশ হল চিন কারন কম্যুনিস্ট,কিন্তু এক্ষুনি কিছু করার নেই এরা যা সস্তায় মাল দেয় তাই সরকারি অনেক কিছুর বরাত ওদের বস্তায় চলে যায়।
7. গণসংগীত পৃথিবীর সবচেয়ে অখাদ্য গান।এতে কোন সুর টুর নেই,ঘুরে ফিরে লাল সেলাম,লাল সেলাম বলে।
8. হিটলার সম্পর্কে যা কিছু বলা হয় তা অতিরঞ্জিত। তিনি ছিলেন বিশুদ্ধ আর্য ও স্তালিনের থেকে কম মানুষ মেরেছিলেন।
9. আমেরিকা একটি গনতান্ত্রিক দেশ, সেদেশে জনগনের কথা দেশের নেতারা শোনে, জনতা যদি যুদ্ধ বা বোম ফেলতে বারন করে তাই শোনে,ওদেশের যতজন প্রেসিডেন্ট আজ অব্দি এসছেন সবাই ভাল,আর ট্রাম্প তো একটু বেশিই ভাল।
10. আর প্রধানমন্ত্রী যদি বল এ বিশ্বে, এ গ্যালাক্সির,বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে ভাল, সবচেয়ে সাহসী, সবচেয়ে দূরদর্শী, সবচেয়ে ডাইনামিক হলেন মোদীজি।
11. গোবর মাখলে মোবাইলের ভয়ঙ্কর আলফা, বিটা, গামা তেজস্ক্রিয় বিকিরন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
12. প্লাস্টিক মানি চালু করে অবিলম্বে এই নোট সমস্যার আশু সমাধান করা উচিত।( এই আশু আমি নই, এই অর্থ শীঘ্র, এই শীঘ্র আবার পতন নয়)।

এরকমই বিভিন্ন জ্ঞানে রোজই নিজে সমৃদ্ধ হচ্ছি।ভাবছি একটা সঙ্কলন বানালে( এ আবার সেই রসেবশের সংকলন দা নয়) দেশের মূর্খ মানুষের অনেক সুবিধে হয়।

শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৬

কালো টাকা ~ সুশোভন পাত্র

-কিতনে আদমি থে?
প্রশ্নটা আর গব্বর সিং'র ডেরায় রামগড়ে তোলা তুলতে ব্যর্থ চামচা'দের ইন্টারোগেশনে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটা এখন নিকটবর্তী ব্যাঙ্কের সারিবদ্ধ সর্পিল লাইনের দৈর্ঘ্যের। প্রশ্নটা আম জনতার ধৈর্যের। অভ্যাস বশত গব্বর সিং আজও জিজ্ঞেস করেন "আরে ওহ সাম্বা, কিতনে ইনাম রাখে হে রে সরকার হাম পর।" কিন্তু 'পচাশ' তো দূর, সাম্বা আজকাল 'উইকলি লিমিট' হাজার চব্বিশের চার আনাও বাড়িয়ে বলতে সাহস করে না। আসলে সাম্বা বিলক্ষণ জানে, "ইহাসে পচাশ পচাশ কোশ দূর গাঁও মে, যব বাচ্চা রাত কো রোতা হ্যা" তখন মা'রা আর ঘুণাক্ষরেও বলে না "বেটা শো জা নেহি তো গব্বর আ জায়েগা।" বরং বলে "বেটা শো জা, আর নেহি তো কালকের জন্য ব্যাঙ্কের লাইনে গিয়ে দাঁড়াবি যা।" শুনে বাচ্চা তো বটেই, বাচ্চার বাবা'রাও নাকি আজকাল ঘুমিয়ে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রীর খোয়াবনামা কালো টাকা উদ্ধার করবেন। জাল নোটের কারবারে লাগাম টানবেন। তাই নাটকীয় ঘোষণায় প্রটোকলের ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ফুটেজের ঘাস খেলেন। দু'দিনে মুশকিল আসানের আশ্বাস দিয়ে জাপান গেলেন। আর ফিরে এসে গোয়া'তে পঞ্চাশ দিনের অপেক্ষার 'মাস্টারস্ট্রোক' দিলেন। ভক্তরা খুশি। হবু ভক্তরা আরও খুশি। আর পানাম পেপার্সের দুর্নীতি তে নাম জড়িয়ে যাওয়া বলিউডের অতি ভক্তরা আরও আরও খুশি।
দেশ সুদ্ধু মানুষ সকালে ব্যাঙ্ক খোলার অপেক্ষা করছেন। কাজ ফেলে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সামনের ভদ্রলোকের কনুইয়ের গোঁতা খাচ্ছেন। 'বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনীর' জান কবুল মান কবুল লড়াই লড়ছেন। আর বিকেল তিনটের সময় কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারছেন -ক্যাশ শেষ। আপনার রক্ত-ঘাম। আপনার অ্যাকাউন্ট। আপনারই অর্জিত টাকা। অথচ দিনের শেষে আপনারই পকেটটা ফাঁকা। কি ভাবছেন, সরকারের হাত শক্ত করে কালো টাকা উদ্ধারের বলশেভিক বিপ্লব করছেন? জাল নোট কারবার বন্ধ করতে অগ্নিযুদ্ধে নেমেছেন?  উইথ অল ডিউ রেসপেক্ট স্যার, আপনার সে গুড়ে কিন্তু বেজায় বালি।
২০১২'তে সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ডাইরেক্ট ট্যাক্সের চেয়ারম্যান'র নেতৃত্বাধীন উচ্চপদস্থ অফিসার'দের কমিটি 'ভারত ও বিদেশী কালো টাকা মোকাবিলার পথ' রিপোর্টে, অর্থমন্ত্রক কে জানায়, "৫০০ এবং ১০০০'র নোট বাতিল কালো টাকা মোকাবিলার কোনও পথই নয়। কালো টাকার বেশির ভাগটাই আজ বদলে ফেলা হয়েছে সম্পত্তিতে। তাছাড়া নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ব্যাপক খরচা সাপেক্ষ, ব্যাঙ্ক পরিষেবার পক্ষে ক্ষতিকারক। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও শ্রমিক-কর্মচারী'দের মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রেও প্রভূত অসুবিধাজনক।"¹ এই রিপোর্টের সামঞ্জস্যেই আয়কর দপ্তরের তথ্যানুসারে গত আর্থিক বছরেও 'লিকুইড ক্যাশে' কালো টাকার পরিমাণ ৬%। ² আর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্টে  অনুযায়ী দেশে সার্কুলেটেড নোটে জাল নোটের পরিমাণ বর্তমানে .০০০০০৭%। ³ তাই ডিয়ার দাদা এবং বৌদি... সিটব্যাক অ্যান্ড রিল্যাক্স। অযথা ভাবাবেগে ভাসবেন না। বাস্তবের মাটিতে পা রাখুন। দেশে কালো টাকা উদ্ধার হবে, জাল নোটের কারবার বন্ধ হবে -বেশ তো। কিন্তু পরিকাঠামোগত পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাবে ভোগান্তিটা যখন আপনারই, হিসেবটাও তখন কড়ায় গণ্ডায় আপনিই বুঝে নিন। আপনার কাঁধে বন্দুক রেখে রাজনৈতিক প্রচারের বুলেট কারা চালাচ্ছেন সেটাও একটু জেনে নিন। আপনার 'আত্মত্যাগের' আড়ালে কোনও নেপো'রা বেমালুম দই মেরে যাচ্ছে একটু চিনে নিন।   
হনুমান ছাপ শুদ্ধ দেশী রামভক্ত'দের জিজ্ঞাসা করুন, এন.ডি.এ ক্ষমতায় এসেই আর্থিক বছরে বিদেশের ব্যাঙ্কে টাকা পাঠানোর উচ্চসীমা ৭৫,০০০ ডলার থেকে ২৫০,০০০ ডলার করলো কাদের স্বার্থে? ⁴ গত ১১ মাসে এই স্কিমে স্বাভাবিকের তিনগুণ হারে ৩০,০০০ কোটি টাকা বিদেশের ব্যাঙ্কে জমাই বা পড়লো কোন দেশভক্ত'দের?⁵ বন্দর নির্মাণে পরিবেশ বিধিভঙ্গের দায়ে আদানি গোষ্ঠীর ২০০ কোটির জরিমানা গত জুলাই মাসে মাফ করলো কোন সরকার?⁶ স্টেট ব্যাঙ্ক ইন্ডিয়ার খাতা থেকে শোধ না হওয়া ৭ হাজার কোটির বেশি ঋণ মোছা হল কার হুকুমে? ইচ্ছাকৃত ভাবে ঋণ শোধ না করা ৬৩টি সংস্থাকে ছাড় দেওয়া হল কোন তেলো মাথায় তেল ঢালতে? আচ্ছা, বিজয় মাল্যর কিংফিশার এয়ারলাইন্সের অনাদায়ী ১২০১.১৯ কোটির ঋণও মোকুব হবে আর আপনাকে ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড় করিয়ে দেশের কালো টাকা উদ্ধার হবে -এমন পরস্পর বিপরীতধর্মী পাটিগণিত মিলে যাবে কেশব নাগের কোন জাদুতে?⁷
জনাব প্রধানমন্ত্রী, আপনিই বলুন কোনটা সাদা, কোনটা কালো? ২০১৪'র আগে বি.জে.পি'র সর্বভারতীয় মুখপাত্র মীনাক্ষী লেখি সাংবাদিক সম্মেলনে যেদিন  ইউ.পি.এ কে তুলোধোনা করে বলেছিলেন 'ডিমনিটাইজেশনের সিদ্ধান্ত গরীব বিরোধী', সেটা; না আজকে আপনি যে বলছেন, 'এই সিদ্ধান্তে খুশি হয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে গরীবরা', সেটা?⁸ নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নাকি বড় লোকদের 'তেতো ওষুধ', সেটা; না বিজেপির বিধায়ক ভবানী সিং রাজওয়াতের কথায় এই সিদ্ধান্ত নাকি আগাম জানতেন আম্বানি-আদানি'রা, সেটা?⁹ কালো কে জনাব? ব্যাঙ্কের  লাইনে দাঁড়িয়ে মেয়ের বিয়ের টাকা জোগাড় করতে না পেরে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন রাজস্থানের যে ৬২ বছরের প্রৌঢ়, সে; না কর্ণাটকের যে বিজেপি বিধায়কের মেয়ের বিয়েতে খরচা হল ৫৫০ কোটি, সে?¹⁰ সত্যি কোনটা? অর্থমন্ত্রীর কথা মত, সিদ্ধান্ত নাকি দশ মাস আগের পূর্ব পরিকল্পিত, বিপর্যয় মোকাবিলার সমস্ত ব্যবস্থাও প্রত্যাশার থেকেও অগ্রিম সম্পাদিত, সেটা; না সরকারের অপরিণামদর্শিতায় দেশ জুড়ে ন'দিনেই শহীদ হলেন ৫৫ জন, সেটা?¹¹
জনাব প্রধানমন্ত্রী, হোক না সাদা-কালোর সাচ্চা একটা হিসেবে নিকেশ। হোক না সেটা ইতিহাসের পাতায় গিয়ে। হোক না সেটা 'চ্যারিটি বিগনস অ্যাট হোম' দিয়ে। সমস্ত রাজনৈতিক দলের হাজার-কোটির আয়ের উৎসের সাচ্চা একটা তদন্ত চেয়ে। নির্বাচনী প্রচারে কোটি টাকার কর্পোরেট ডোনেশেনের হিসেব কষে। আদানি'দের চার্টার্ড বিমানের ঘুরে বেড়ানোর সাচ্চা বিলের রশিদ নিয়ে। জিও-পে'টিমের পাতা জোড়া বিজ্ঞাপনে মুখ দেখানোর শোকোজ চেয়ে। ভুখা দেশের প্রধানমন্ত্রীর দশ লাখি স্যুটের জবাব খুঁজে। হোক না সাদা-কালোর সাচ্চা একটা হিসেবে নিকেশ সমস্ত লজ্জার মাথা খেয়ে। জরা হাম ভি তো দেখে, আমাদের মাথায় চেপে আজ ইচ্ছেমত ছড়ি ঘোরাচ্ছে যারা, আসলে তাঁদের সাদা কে, আর কালোই বা কারা?

রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৭টা লাশ ~ অবিন দত্তগুপ্ত

যখন এ লেখা লিখছি , তখন রাষ্ট্রায়ত্ত লাশের সংখ্যা ৪৭ । ৫০০-১০০০ এর দেশপ্রেমিক অন্তর্ধান-এর জন্য আপাতত মারা গেছেন ৪৭ জন মানুষ । ৪৭ জন মানুষ ,যাদের বিভিন্ন নাম - বিভিন্ন ভাষা - বিভিন্ন ধর্ম - বিভিন্ন জাত । ৪৭ জন মানুষ ,যাদের প্রত্যেকের শ্রেণী এক । তারা নিম্নবিত্ত , হ্যাভ নট্‌স । এ লেখার কোন অর্থনৈতিক ধার ও ভার নেই । এ লেখা শুধুই ওই ৪৭-এর শ্রেণীকে কুর্নিশ জানানো একটা প্রিভিলেজ্‌ড্‌ হিজিবিজি । এ লেখা ৪৭-এর শ্রেণীর প্রতি হাল্কা অভিমান নিয়ে বলা কয়েকটা কথা মাত্র । সংখ্যা অদ্ভুত । ৪৭ । মুক্তি-পরাধীনতা-আশা-আশাভঙ্গের সঙ্খ্যা । 
যেদিন প্রথম ৫০০-১০০০ বন্ধের নির্দেশ এলো , তার পরেরদিন-ই আমি বাজারের দিকে গেছিলাম । আমার পরিচিত এক ফুল-আলি আছেন বাঘাযতীন বাজারে , তার সাথেই কথা হচ্ছিল । টাকা নিয়ে চুড়ান্ত কনফিউশনে ,ওনার সেদিন একটাও মালা বিক্রি হয় নি । রাতে কি খাবেন , কাল কি করে ফুল কিনবেন , কিনলেও বিক্রী হবে কিনা জানেন না । উনি আমায় বলেছিলেন , "মাত্র এক দুদিনের কষ্ট । যা হচ্ছে, আমাদের জন্যই তো হচ্ছে । দুদিন পরে সব ঠিক হয়ে যাবে , সবাই বলছে । তার পর জিনিসপত্রের দাম কমে যাবে , বড়লোকের টাকা কমবে , আমরা ভালো ভাবে বাঁচতে পারবো । মাত্র দুদিন , আমার ছেলেটাও আজ জন খাটতে পারলুনি দাদা , তাতে কি ! মা-ব্যাটায় আধ পেটা খেয়ে দুদিন ঠিক টেনে দেবো । এমন তো কতো দিন-ই গেছে । তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে । "
আজ নিয়ে প্রায় তিনদিন হয়ে গেলো , উনি আর বাজারে বসছেন না । ৪৭ এর আশা । ৪৭ এর আশাভঙ্গ । 
এর পর পর থেকেই বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন খবর পেতে থাকি । ডায়মন্ডহারবারের কাছে মাছ-এর পাইকারি বিক্রীর একটি বিশাল বাজার আছে । ট্রলার গুলো মাছ ধরে সরাসরি এখানে নিয়ে আসে ,এবং এখান থেকেই ছোট বা খুচরো ব্যবসায়ীরা সেই মাছ কিনে নেন । ওই বিশাল বাজারটা গতকাল বন্ধ হয়ে গেছে । কেন ? প্রশ্নের উত্তর পেলাম ,আমারি এক মালায়ালি বন্ধুর কাছে । সমুদ্রের পারে বাড়ি তার । জানাচ্ছে তার অভিজ্ঞতাও আমার-ই মতো । জেলেরা যে মাছ ধরে আনে ,সেটা কেনার মতো ক্যাশ টাকা খুচরো বিক্রেতাদের বা পাইকারি বিক্রেতাদের নেই । তাই বেশীর ভাগ মাছ পচে যাচ্ছে । এ সম্পর্কে প্রথম যখন সে খবর সংগ্রহ করতে গিয়েছিল ,তখন কেরালার জেলেদের বক্তব্য-ও ,বাঘাযতীনের ফুল-ওয়ালি দিদার মতো ছিল । তারাও ভেবেছিলেন , এক দিন দু দিনের ব্যাপার । দেশের জন্য এটূকু তারা করতেই পারেন । গত আটদিনে কজন জেলে আত্মহত্যা করেছেন, এ খবর জানা নেই । 
একই অভিজ্ঞতা আপনাদের সকলের হয়েছে । ক্ষেতে কাজ করতে যাওয়া ভাগ চাষি থেকে সেলুনে রোজের হিসেবে কাজ করা নাপিত , তারা প্রত্যেকে নিজেদের ভাগের অনেকটা ছেড়ে দিতে চেয়েছে স্বেচ্ছায় ,অনেক কষ্ট সহ্য করে ,আধপেটা খেয়ে । তারা এটা করেছে ,কারণ তাদের শ্রেণী চরিত্র তাদের বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে । তাদের কাছে দ্যাশ কোন ভুখন্ড নয় । দেশ মানে তাদের মতোই মানুষ । ৪৭এর একান্নবর্তী পরিবার । তারা বিশ্বাস করতে চেয়েছে ,এবার অন্তত তাদের দেশকে তারাই নিয়ন্ত্রন করবে । বিশ্বাস করতে চেয়েছে ,বড়লোকের অনৈতিক ঐশ্বর্যের থেকে তাদের প্রাপ্য ভাগ এবার তাদের কপালে জুটবে । তাই তারা সহ্য করেছে । এই কোটি কোটি সাধারণ নামহীন মানুষের অনন্ত সহ্যশক্তির নাম ভারতবর্ষ । মা যেমন নতুন সন্তানের জন্মের সময় ব্যথা সহ্য করে , এরাও তেমন সহ্য করেছে । কিন্তু প্রতিবার মৃত-বিকৃত মাংসের দলা ছাড়া কিছুই প্রসব করতে পারে নি । মুক্তির যন্ত্রণা সহ্য করেছে , বদলে ইনাম জুটেছে আরও বেশী বন্দিত্ব । 
এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো । কিন্তু ৪৭-এর শ্রেণী চরিত্র শুধুই সহ্যের গল্পকথা নয় । ঘৃণাও তার একটি মুল বৈশিষ্ট বৈকি । বড়লোকদের প্রতি ,তাদের অন্যায় ভাবে অর্জিত সম্পদের প্রতি ঘৃণা । যারা তাদের মানুষের মতো বাঁচতে দেয় না , তাদের বৈভবের প্রতি ঘৃণা । যারা তাদের ভুল বুঝিয়েছে - মিথ্যে বলেছে - সেই দালালদের প্রতি ঘৃণা । শ্রেণী ঘৃণা । যে সময় মজুরি না পেয়ে ৪৭ ধুকছে ,আস্তে আস্তে কবর আর চিতার দিকে এগোচ্ছে - সে সময় তারা খবর পেলো এক দালালের মেয়ের বিয়ে হয়েছে পাঁচশো কোটি টাকা খরচ করে । তারা খবর পেলো , দু তিন দিন ভুয়া কথা - কদ্দিন লাগবে কেউ ঠিকঠাক জানে না । তাদের কুর্বানির বিনিময় জিনিসপত্রের দাম যখন কমলো না , তাদের কষ্টার্জিত সেভিংসে যখন ইন্টারেস্ট রেট কমতে আরম্ভ করলো ... ৪৭ জন মারা যাবার পর যখন তাদেরি মতো ৪৭ কোটি দেখতে পেলো একটাও বড়লোকের একটা চুলেও কোন আঁচর পরেনি , তখন তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে । ফুটপাথের উপর ভারী হাতে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায় । তারা ভীরু - তারাই বীর । এরপর তারা ধ্বংশ করে । তারপর তারাই সৃষ্টি করে । আকাশের পাখির মতো - সমুদ্রের মাছের মতো তারা অগণিত । 
আমি আজ আবার বাজার গিয়েছিলাম । পাড়ার সেলুনে ,মুচির দোকানে । আমাদের পাড়ায় যে ছেলেটা একশো দিনের কাজ করে তার সাথেও কথা হয়েছে । একটা নিঃশব্দ ঘৃণা । প্রতারিত হওয়ার যন্ত্রণা তাদের চোখে । মধ্যপ্রদেশে কারা যেন রাগে ফেটে পড়েছে । কেরালা - তামিলনাডুতে আগুন জ্বলছে । প্রতারিত ৪৭-রা , প্রত্যেকটি লাশের হিসেব বুঝতে চাইছে । আর জানলায় নয় । রাস্তায় আগুন লক্‌ লক্‌ করে জ্বলছে ।

রবিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৬

কালো টাকা ~ সুশোভন পাত্র

আইজাক স্যার বলেছেন, 'বাইরের থেকে বল প্রয়োগ না করলে, স্থির বস্তু চিরকাল স্থির এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল গতিশীল থাকবে'। আর বাজারে না খাটিয়ে, ব্যবসা তে না লাগিয়ে ঘরে পুঁতে কিম্বা তোয়ালা মুড়ে লুকিয়ে রাখলে কালো টাকাও চিরকাল কালোই থাকবে। স্থিরই থাকবে। ধারে, ভারে তো বাড়বেই না, বরং মুদ্রাস্ফীতির কালগর্ভে আজকের ষোলআনা দু'দিন পরে বারো আনা হয়েও আপনার কপালে নাচতে পারে। আজ থেকে দেড়শো বছর আগে অর্থনীতির এই মৌলিক সত্যটা অনুধাবন করেই ঐ দাড়িওয়ালা বুড়োটা লিখেছিলেন, 'পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজি জমিয়ে নয় বরং বাজারে খাটিয়েই মুনফা লাভ হয়।' এই জন্যই দেশের কালো টাকার বেশির ভাগটা আজ সিনেমার চিত্রনাট্যের শেষ দৃশ্যের রহস্য উন্মোচনের জন্য কোন ভিলেনের ঘরের নিচে লোকানো নেই। বরং আছে একেবারে আপনার চোখের সামনে। আছে রিয়েল এস্টেট বিজনেসের ইটে, আছে সিমেন্ট গাঁথা অট্টালিকা সেজে, আছে নিউক্লিয়ার ডিলের আস্থা ভোটে বিরোধী সাংসদ কিনে সরকার বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে, আছে বাংলার মানুষের নির্বাচিত পঞ্চায়েত ভেঙ্গে দেবার শাসক দলের ব্রহ্মাস্ত্র হয়ে, আছে নেত্রীর আঁকা ছবি ১ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে পার্টি তহবিলে পৌঁছে দেবার কৌশল হয়ে, আর আছে 'হাওলা'র মত কতশত চ্যানেলে ঘুরে বিদেশের ব্যাঙ্কে জমা হয়ে।  

কালো টাকা মানে শুধু লুকানো টাকার জমে থাকা ভাণ্ডার নয়। কালো টাকা মানে যেকোনো কর ফাঁকি। কালো টাকা মানে যেকোনো অনুমোদিত সীমার বাইরে লেনদেন। ঐ যে মেজিয়ার কয়লা খাদানে ১০০টন কয়লা তুলে খাতায় কলমে ৮০টনের হিসেব দেখালেন -কালো টাকা। পুলিশ কে ঘুষ দিয়ে নদী থেকে দু গাড়ি বালি বেশী তুললেন -কালো টাকা। কালীঘাটের জাগ্রত দেবী কে সন্তুষ্ট রাখতে ভাইদের তোলা দিলেন -কালো টাকা। পার্টি ফান্ডের ১লক্ষর অনুদানে কুড়ি হাজারের রশিদ কাটলেন –ওটাও কালো টাকা। আসলে কালো টাকায় কোন কালো দাগ নেই, আইডেন্টিটি ফিকেশন মার্ক নেই। তাই আপনি হয়ত কালো টাকা দেখছেন প্রতিদিন, হাতেও নিচ্ছেন প্রতিদিন, কিন্তু চিনতে পারছেন না।

আনুমানিক ভাবে, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক রিপোর্ট এবং কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের ৮ তারিখের প্রেস বিবৃতি অনুসারে দেশের মোট কালো টাকা পরিমাণ দেশের জি.ডি.পি'র এক চতুর্থাংশের সমান। অর্থাৎ ২০১৫'র পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের জি.ডি.পি যদি হয় ১২৬.৫ ট্রিলিয়ন, তাহলে ঐ সরল ত্রৈরাশিকেই কালো টাকা ৩৫ লক্ষ কোটি। এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ২০১৫-১৬'র বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী বাজারে নগদ ৫০০ টাকার নোট রয়েছে ১৬৫০ কোটি। আর ১০০০ টাকার নোট ৬৭০ কোটি। যার সম্মিলিত অর্থমূল্য ১৭ লক্ষ কোটির একটু বেশী। সেই টাকারও এক চতুর্থাংশ কালো টাকা ধরে সহজ হিসেবে কষলে, এই নোট বাতিল করার সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ ৪ লক্ষ ২৫ হাজার কোটির কালো টাকা উদ্ধার হতে পারে। আবার ৫০০ বা ১০০০ টাকার নোটের মাধ্যমে বাজার থেকে তুলে নেওয়া অর্থের সম পরিমাণ অর্থ ২০০০ টাকার বা ৫০০ টাকার নতুন নোট ছেপে বদলে ফেলার খরচাও প্রায় ১২ হাজার কোটি। সুতরাং, সবের ধন নীলমণি হয়ে পড়ে রইলো আনুমানিক ৪ লক্ষ ১৩ হাজার কোটি। যা দেশের মোট কালো টাকার মাত্র ১৩%। বাকি ৮৭% কিন্তু যেমন ছিল তেমনই রইলো। রইলো ২৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে বৃহৎ কর্পোরেট'দের বকেয়া ১.১৪ লক্ষ কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণে, রইলো রেভেনিউ ফোরগেনে'র নামে প্রতিবছর বিগ বিজনেস হাউসগুলোকে ছাড় দেওয়া কর্পোরেট ট্যাক্সে, রইলো আর্থিক কারচুপি করে লন্ডনে বসে থাকা বিজয় মালিয়া, ললিত মোদী'দের পকেটে, আর রইলো সুইস ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে।  

এই সত্যিটা প্রধানমন্ত্রীও বিলক্ষণ জানেন। আর জানেন বলেই, ২০১৩'তে গোয়ার বিলাসবহুল হোটেলে বিজেপি'র পার্লামেন্টারি বোর্ডের মিটিং-এ প্রধানমন্ত্রী পদের মনোনয়ন পেয়েই তিনি টুইট করেছিলেন "দেশের একটা বাচ্চা ছেলেও জানে কালো টাকা আছে সুইস ব্যাঙ্কে। আমাদের কি সেটা ফিরিয়ে আনা উচিত নয়?" প্রধানমন্ত্রী বিলক্ষণ এটাও জানেন যে শুধু নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে সেই সুইস ব্যাঙ্কের এক ছটাক টাকাও দেশে ফিরে আসবে না। দীর্ঘসময়ের প্রেক্ষাপটে কালো টাকার রমরমাও ম্লান হবে না। আসলে নোট বাতিল তো ১৯৪৬'এ কিম্বা ১৯৭৮'র জানুয়ারি'তেও হয়েছিল। কিন্তু কালো টাকা'র এই বাড়বাড়ন্ত থামেনি। বরং অর্থনীতির বেহাল অবস্থার খেসারৎ চুকিয়ে পরের সাধারণ নির্বাচনে গো-হারা হয়েছিলো মুরাজি দেশাই'র জনতা সরকার।  

তবুও বেশ হয়েছে নোট গুলো সব বাতিল হয়েছে। আমাদের দু-একদিনের কষ্টে যদি দেশের প্রাসাদসম কালো টাকার কিঞ্চিতও ফিরে আসে, তাহলে না হয় তাই আচ্ছা। গোরু তে ৮০% মানুষের জিন খোঁজা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একদিন যদি জাল নোটের ব্যাপারীদের খুঁজতে বসেন, তাহলে তাই আচ্ছা। 'মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে'র চ্যাংড়ামি করা হিন্দু নেতা, আর তিন তালাকের সমর্থনে ভাষণবাজি করা মৌলবি গুলো যদি একদিন ব্যাঙ্কের লাইনে গা ঘেঁষে রিকুইসিট ফর্ম ভরেন, তো তাই আচ্ছা। অ্যালিস্টার কুকের টিমের বিরুদ্ধে জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিশোধে উদ্যত গোটা দেশবাসী একদিন যদি রাজনৈতিক দল গুলোর আয়ের উৎস জানতে চেয়ে বসে, তাহলে তাই আচ্ছা। কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শত নামজপা ছেড়ে একদিন যদি নিতাই মেলায় অর্থনীতির তর্কের তুফান ওঠে, তো তাই আচ্ছা। কালো টাকার 'হ্যাভ আর হ্যাভ নটসে' দেশটা যদি একদিন আড়াআড়ি ভেঙ্গে পড়ে, তাহলে তাই আচ্ছা। মানুষ যদি ভাবতে শেখে ধর্মের বিভেদ নয় তাঁদের এক সুতোয় বেঁধেছে তাঁদেরই পেটের খিদে, তাহলে তাই আচ্ছা। এই সংখ্যালঘু শাসকদের সঙ্গে সংখ্যাগুরু শোষিত মানুষ গুলোর একদিন...একদিন যদি 'ভীষণ রাগে যুদ্ধ বাঁধে', তাহলে না হয় তাই আচ্ছা। সেদিন নাজিবরা আর ২৮ দিন ধরে নিখোঁজ থাকবেনা সেনোরিটা, সেদিন হয়ত নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের প্যানিকে প্রত্যন্ত গ্রামের তীর্থরাজিরা আর মরবে না সেনোরিটা , সেদিন হয়ত "বড়ে বড়ে দেশো ম্যা অ্যাসি ছোটি ছোটি বাত" আর একটাও হবে না সেনোরিটা…

শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৬

সব অসুবিধাই দু'দিনের ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

​সক্কলকে ধন্যবাদ। গত দুইদিনে আমার নতুন একটা শিক্ষালাভ হলো।
"সব অসুবিধাই দু'দিনের। মুখ বুজে মেনে নিতে হয়। বৃহত্তর সামগ্রিক উন্নয়ন (ধরে নিচ্ছি হবে)-এর স্বার্থে।"
ডায়মণ্ড হারবার রোডে নাকি বহু বছর ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে? নাঃ, কিছু বলিনি।
"সব অসুবিধাই দু'দিনের। মুখ বুজে মেনে নিতে হয়। বৃহত্তর সামগ্রিক উন্নয়ন (ধরে নিচ্ছি হবে)-এর স্বার্থে।"
পুজোর সময় মাইকের দৌরাত্ম! চাঁদার জুলুম! উফফ! না, আমি চুপ।
"সব অসুবিধাই দু'দিনের। মুখ বুজে মেনে নিতে হয়। বৃহত্তর সামগ্রিক উন্নয়ন (ধরে নিচ্ছি হবে)-এর স্বার্থে।"
বৃষ্টিতে জল জমে শহরের অবস্থা শোচনীয়। চলাফেরা বন্ধ, খাওয়াদাওয়া অনিশ্চিত। শাট আপ!
"সব অসুবিধাই দু'দিনের। মুখ বুজে মেনে নিতে হয়। বৃহত্তর সামগ্রিক উন্নয়ন (ধরে নিচ্ছি হবে)-এর স্বার্থে।"
পেট্রলের দাম বাড়ল আবার। সব জিনিষেরই। কীভাবে যে... শশশশশ!
"সব অসুবিধাই দু'দিনের। মুখ বুজে মেনে নিতে হয়। বৃহত্তর সামগ্রিক উন্নয়ন (ধরে নিচ্ছি হবে)-এর স্বার্থে।"
যুদ্ধের পরিস্থিতি ঘনিয়ে আসছে যে! চ্যোপ!!
"সব অসুবিধাই দু'দিনের। মুখ বুজে মেনে নিতে হয়। বৃহত্তর সামগ্রিক উন্নয়ন (ধরে নিচ্ছি হবে)-এর স্বার্থে।অরাজকতা? বিশৃঙ্খলা? অসুস্থতা? অসহায়তা? মেনে নিন সকলে। একদম চুপচাপ।
"সব অসুবিধাই দু'দিনের। মুখ বুজে মেনে নিতে হয়। বৃহত্তর সামগ্রিক উন্নয়ন (ধরে নিচ্ছি হবে)-এর স্বার্থে।"
-----------------
যারা আমাকে এই জ্ঞান দিলেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আমি নিশ্চিত এবার তাঁরাও আর কখনো "উফফ, কী করি!" পোস্ট করবেন না। কারণ, "সব অসুবিধাই দু'দিনের। মুখ বুজে মেনে নিতে হয়। বৃহত্তর সামগ্রিক উন্নয়ন (ধরে নিচ্ছি হবে)-এর স্বার্থে।"

বুধবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৬

কবি ~ শমীক মুখার্জী

কিশোর রবি জোড়াসাঁকো হইতে নির্গত হইলেন। হাওড়া হইতে এখন ট্রেন যায়, পঁহুছানো অসুবিধা হইবে না। মূলরাস্তার নিকটে আসিতেই একটি তোবড়ানো মিনিবাস "পোস্তা-হাওড়া-হাওড়া-হাওড়া" কহিতে কহিতে আসিয়া দাঁড়াইল। সাবধানে আপনার চোগা-চাপকান সামলাইয়া পাদানিতে অর্ধেক ঝুলিয়া দাঁড়াইলেন কিশোর রবি। মিনিবাস ছুটিল হাওড়া ইস্টিশনের দিকে।

অন্যদিন এই সময়ে কিশোর রবির মনে খেলা করিয়া যায় গানের কথামালা, গুঞ্জরিয়া যায় সুরের ভ্রমর। আজ আর সে সব দিকে রবির ভ্রূক্ষেপমাত্র নাই, নতুন বৌঠান দুটি ক্ষীরকদম্ব খাইয়া যাইতে বলিয়াছিলেন, রবি দৃক্‌পাত করেন নাই, সবেগে নিষ্ক্রান্ত হইয়াছেন ঘর হইতে। ... বাবামশায়, যে বাবামশায়কে তিনি এত সন্মান করেন, ঈশ্বরতুল্য মনে করেন, সেই বাবামশায় তাঁহার সঙ্গে এমনটি করিলেন?

ব্যান্ডেল লোকালে আনমনে বসিয়া আছেন রবি। ঝালমুড়ি এবং কচি শসা বিক্রেতারা বহুবার তাঁহার কর্ণের নিকটে বহুবিধ স্বরে তাহাদিগের পসরার গুণগান করিয়া গেল, রবির তাহাতে ভাবান্তর ঘটিল না।

বিকেল তিনটার কিছু পূর্ব্বে রবি চুঁচুড়ায় আসিলেন। একটি রিক্সা লইয়া সটান উপস্থিত হইলেন গঙ্গাতীরবর্তী বাগানবাড়িতে। বাবামশায় আজকাল এইখানেই দিন অতিবাহিত করিতেছেন। একটু পরেই তাঁহার উপাসনার সময় হইবে, তাহার পূর্ব্বেই তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ প্রয়োজন।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ তখন বারান্দায় বসিয়া একটি সদ্য শোনা সঙ্গীত গুণগুণ করিতেছিলেন। নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছো নয়নে নয়নে। তাঁহার এই পুত্র সত্যই প্রতিভাবান। রবি তাঁহার নাড়ির টান, এইবারে গ্রীষ্মে তাহাকে সঙ্গে লইয়া তিনি কার্শিয়াং যাইবেন।

সহসা ধ্যানভঙ্গ হইল মহর্ষির। দরোজার সামনে দাঁড়াইয়া আছে, ও কে? রবি না? রবি, বাবা, কখন এলে? খবর দিয়া আসো নাই তো?

রবি মনে মনে অনেক রোষকষায়িত বাক্যবাণ প্রস্তুত করিয়া আসিয়াছিলেন, কিন্তু আচম্বিতে বাবামশায়ের সম্মুখে দাঁড়াইয়া তাঁহার সমস্ত তেজ উবিয়া গেল, পরিণত হইল অভিমানে। চক্ষের কোণে আসিল জলের বিন্দু। পায়ে পায়ে আগাইয়া গেলেন বাবামশায়ের সম্মুখে।

"কেন, বাবামশায়, কেন? ... দেশের রাজা না হয় এ ভাষা বুঝেন না, আপনি তো বুঝেছিলেন, তবে কেন জেনেশুনে আমাকে এই পাঁচশো টাকার নোট দিয়াছিলেন? গত তিন দিন ধরে সারা কলকাতা ঘুরেছি, কেউ নেয় নি, কেউ নিতে চায় নি। বলছে, কালো টাকা। না হয় না-ই দিতেন, আপনার স্নেহই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল ..."

গলা বুজিয়া আসিল কিশোর রবির। থরথর হাতে চোগার পকেট থেকে একটি পাঁচশো টাকার নোট তিনি আগাইয়া ধরিলেন মহর্ষির দিকে। মহর্ষি স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। নির্জনে এই বাড়িতে তিনি সাধন ভজন করেন, এনডিটিভি দ্যাখেন না। দেশের রাজা যে এত কিছু করিয়া ফেলিয়াছেন, তিনি জানিবেন কেমন ভাবে?

গঙ্গাবক্ষে শীতল হাওয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া ছুটিয়া গেল নৈহাটির দিকে।

শুক্রবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৬

মুক্ত বাজার অর্থনীতি ~ সুশোভন পাত্র

অফিস ফেরত মোড়ের ট্রাফিক'টায় আজকাল প্রায়ই মিনিট দশেক আটকে থাকতে হয়। রাস্তায় তখন ব্যস্ত মানুষের স্রোত, রেড লাইটার গা ঘেঁষে বহুজাতিকের আকাশছোঁয়া বিজ্ঞাপন, দুপাশে গাড়ির কর্কশ হর্ন, ফ্লাই ওভারে আধুনিক সভ্যতার সাক্ষ্য গায়ে মেখে ছুটে চলা পর্যাবৃত্ত মেট্রো, আর শীর্ণ, দীর্ণ কয়েকটা ভিক্ষাজীবীর অসহায়তা। এসবের মধ্যেই সেদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম আকাশে উড়ে যাচ্ছে একদল পাখি। দিল্লীর এই চুলোতে এ'দৃশ্য বিরল বৈকি। চাইলে এখানে মাথার উপরে হাফডজন উড়োজাহাজ দেখতে পাওয়া যায়, প্রাসাদসম ফ্ল্যাট গুলোর মাথায় মোবাইল টাওয়ারের টিমটিম করা লালবাতি গুলোকে শনাক্ত করা যায়, চিমনির একরাশ কালো ধোঁয়ারও হদিশ পাওয়া যায়, কিন্তু রাতের আকাশের কালপুরুষটা খুঁজে পাওয়া যায় না, তর্জনীর ডগা দিয়ে লাইন টেনে সপ্তর্ষিমণ্ডলটা মিলিয়ে নেওয়া যায় না, ডানা ঝাপটে নীল আকাশের বুক চিরে উড়ে যাওয়া পাখির দলের অনাবিল হর্ষধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় না। আসলে আমাদের মত O₃, SO₂ NO₂, মাইক্রোমিটারের পার্টিকুলেট ম্যাটার কিম্বা অ্যারোডাইনামিক্সের বিজ্ঞানটা না বুঝলেও, দিল্লীর  নিকৃষ্টতম বাতাসে প্রতিমুহূর্তের জরুরী নিঃশ্বাস'টাও যে প্রবল বিপজ্জনক পাখিরা সেটা বোঝে। বোধহয় আমাদের থেকে একটু বেশীই বোঝে।দীপাবলির পর গত পাঁচদিন আর একটাও রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকাল দেখেনি দিল্লী। C.S.E'র ডিপাৰ্টমেন্ট জানিয়েছে এই বুধবার সতেরো বছরের জঘন্যতম 'স্মগে' ডুবে ছিল দিল্লী। এপ্রিলে হু, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ু বয়ে বেড়ানোর ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করেছে দিল্লী কে।'এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে'র মাপকাঠিতে বছরে নাকি মাত্র দু'দিন, বুকভরা শ্বাস নেওয়ার মত 'দূষণ মুক্ত' বাতাসের সৌভাগ্য হয় দিল্লীর। তবুও নিশ্চিন্ত, নির্বিকার এই জাহাঁবাজ দিল্লী। আমার যে পরিবেশ সচেতন কলিগ সেদিন বাতাসে CO₂ মিশে যাবার আশঙ্কায় হোটাসঅ্যাপে চিনের সামগ্রী বয়কটের আবেদন জানালেন, সোমবার তিনিই বুক ফুলিয়ে ঘোষণা করলেন "ইস বার চালিশ হাজার কা পটাকা ফোড়া।" আসলে  বয়কটের আবেদনটা পরিবেশ রক্ষার্থে ছিল না। আবেদনটা ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদের হিড়িক তুলতে। আসন্ন অল ইম্পরট্যান্ট তিন বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেশপ্রেম জাহিরের আগুনে খেলায় ফার্স্ট ইনিংসে লিড নিতে। আফসোস শুধু একটাই, আমাদের মাথার উপরের আকাশটা, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা বাতাসটা, এই জাতীয়তাবাদটা বোঝে না, কাঁটাতারে আবদ্ধ দেশপ্রেমের গণ্ডী গুলো চেনে না, জিও পলিটিক্সের জটিল অঙ্ক গুলো কষতে জানে না, তাই চিনের CO₂ আর ভারতের CO₂ তে দূষণের পার্থক্যটাও করতে পারে না।
শুধু আপনার নিঃশ্বাস নেওয়া বাতাসের কম্পোজিশনটাই নয়, বদলে যাচ্ছে আপনার বৃষ্টি মাথায় ফুটবল খেলার অমলিন শৈশবটা, বদলে যাচ্ছে আপনার পাড়া মাথায় তোলা চায়ের দোকানের আড্ডাটা, বিকেলের মা বৌদি'দের পুকুর পাড়ের চেনা ছবিটা, ঘুমনোর আগে গল্পের বই পড়ার আপনার নিখাদ অভ্যাসটা। আসলে বিশ্বায়নের নামে বদলে যাচ্ছে আপনার আশেপাশের গোটা সমাজটাই। পরিবেশে দূষণের মাত্রার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আপনার শয্যাশায়ী মায়ের ওষুধের খরচা, ছেলের কলেজের ফিস, মেয়ের কসমেটিকসের দাম, আপনার মাসকাবারি ছাপোষা ফর্দের দৈর্ঘ্যটা আর মুকেশ আম্বানির মোট সম্পত্তির পরিমাণটা। বর্তমানে যে সম্পত্তির পরিমাণ ২৩.১ বিলিয়ন ডলার। অঙ্কটা আপনার দেশের ১৪টা রাজ্যের, আর বিশ্বের ১৯টা দেশের জিডিপি'র থেকে একটু বেশী। ২০১৩-২০১৫'র আর্থিক বছরে ২৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে বৃহৎ কর্পোরেট'দের বকেয়া মোট অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ১.১৪ লক্ষ কোটি টাকা। অঙ্কটা আপনার রোমান্টিক হানিমুনের নিশ্চিন্ত ডেসটিনেশন, ঐ  নর্থ ইস্টের স্টেট গুলোর সম্মিলিত জিডিপি'র থেকেও একটু বেশি। প্রথম ১৫ জন ধনী ব্যক্তির সম্মিলিত সম্পত্তির অঙ্কটা আজ দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার সম্মিলিত সম্পত্তির থেকে একটু বেশি। আর এই প্রবল আর্থিক বৈষম্যের পরেও অর্থমন্ত্রী তাঁর প্রেয়সী যে অর্থনীতির প্রশংসা করে সন্ধেবেলার সাংবাদিক বৈঠকে নিয়ম করে 'ফিলগুড ফ্যাক্টর' বিলিয়ে দেন তার নাম 'মুক্ত বাজার অর্থনীতি।' এই মুক্ত বাজার জাতি, রাষ্ট্রের পরিসর বোঝেনা। এই মুক্তবাজার বোঝে ডিমান্ড সাপ্লাই রেশিও। বোঝে লো কস্ট প্রোডাকশনের প্রফিট। বোঝে কনজিউমার সারপ্লাসের অঙ্ক। এবং বোঝে বলেই চিনের অর্থনীতির ঠাণ্ডা লাগলে ভারতের বাজারে হাঁচি হয়। বোঝে বলেই গোটা বিশ্বে চিনের পণ্য রমরমিয়ে বিক্রি হয়।
আচ্ছা, লেবার ব্যুরো রিপোর্টে যে দেশের বর্তমানে বেকারত্বর হার শেষ ৫ বছরের সর্বোচ্চ, যে দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং গ্রোথ মুখ থুবড়ে পড়ছে প্রতি কোয়ার্টারে, যে দেশের আটটি শ্রম নিবিড় শিল্পে গত আর্থিক বছরে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ১.৭৫ লক্ষ; একটা হোটাসঅ্যাপ ম্যাসেজ পাঠিয়ে সে দেশের অর্থনীতি উদ্ধার করার কষ্টকল্পনা আপনার বালখিল্যতা মনে হয় না? অরে মশাই, মুক্ত বাজারের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করা আমেরিকাও চিনের পণ্যের আমদানি রোধে চড়া হারে শুল্ক ধার্য করেছে। এবং এতদসত্ত্বেও চিনের সাথে বর্তমানে আমেরিকার ট্রেড ডেফিসিটের অঙ্কটা স্টেগারিং, অঙ্কটা ৩৪৩ বিলিয়ন ডলার।  
অর্থনীতি'তে 'স্বদেশী' ফ্ল্যাবারের দর্শন আমদানির জন্য সংঘের লোকজন দীনদয়াল উপাধ্যায় কে খুব মান্যি যত্ন করেন।প্রধানমন্ত্রী আদর্শগত আনতির জন্য তাঁর নামে যোজনার নামকরণে শ্রদ্ধা তর্পণ করেন, মেক ইন ইন্ডিয়া, স্কিল ইন্ডিয়ার গাল গপ্পো পাড়েন। আর বিজেপি'র ক্যাবিনেট, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সেই 'স্বদেশীয়ানা'র পিণ্ডি চটকে, আপনার জীবনদায়ী ওষুধে ৭৪% আর প্রতিরক্ষা তে ১০০% এফ.ডি.আই'র বিল পাশ করে, আমেরিকার সাথে লজিস্টিক এক্সচেঞ্জের চুক্তি সাক্ষর করে। হিন্দুত্বের আঁতুড়ঘরের গুজরাত সরকার যখন নর্মদার ধারে চিনা ব্রোঞ্জ দিয়ে সর্দার প্যাটেলের মূর্তি গড়ে, সংঘের হেডকোয়ার্টার নাগপুরের মেট্রোতে যখন চিনের কোম্পানি কোচ তৈরির রমরমা ব্যবসা করে, দেশভক্তির সাক্ষাৎ অবতার স্বয়ং মোহন ভাগবতও তখন তাঁর জাতীয়তাবাদী লেজ গুটিয়ে মৌনব্রত পালন করেন। ডিয়ার গোমাতার বাধ্য সন্তানদল, আপনাদের রাজনৈতিক গডফাদার'রাই যখন বাড়ি বয়ে মুক্ত বাজার অর্থনীতির দালালি করেন তখন আপনারা কেন খামকা উগ্র দেশপ্রেমের আমাশয় ভোগেন? মুক্ত বাজারের সাম্রাজ্যে তো এটাই ডায়নামিক্স। মুক্ত বাজার সাম্রাজ্যে এটাই তো নিয়ম। আর এ সাম্রাজ্যের আপাতত চিনই সম্রাট।   টেক ইট অর লিভ ইট…

মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০১৬

আর জন্মের দুষ্টু লোক - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

- সবার আগে আপনার যেটা দরকার মেজর মিত্র, সেটা হলো রেস্ট, কেননা আপনার এই হ্যালুসিনেশন বলুন, স্বপ্ন বলুন এগুলো যদি বাড়তে থাকে তাহলে ইট উইল আ্যাফেক্ট ইয়োর...
- হার্ট। জানি ডক্টর। কিন্তু এই মুহুর্তে আমাকে হার্ট স্পেশালিস্টের চেয়ে অনেক বেশী সাহায্য করতে পারেন একজন সাইক্রিয়াট্রিস্ট, তাই আপনার কাছে...
- দেখুন মেজর, এই যে ছবিতে এই জায়গাটা দেখছেন, এটাকে বলে হিপ্পোক্যাম্পালজাইরাস, এটা আমাদের মেমরি সেন্টর..
- ডক্টর, প্লিজ। এগুলো টেকনিকাল কথা। আমার... আমার ভাল লাগছেনা.. আপনি জানেন না কি চলছে আমার ভেতরে... আমি কি সেরে উঠবো ডক্টর....?
- দেখুন....মেজর.... রিকনসিলিয়েশন একটা উপায় হতে পারে... আগের জন্মের যে জায়গা গুলোর স্মৃতি ফিরে আসছে, সে জায়গা গুলো ভিজিট করলে হয়ত....
- উফফ ডক্টর...  ডক্টর.... ওখান থেকেই..... সেই থেকেই শুরু...
- কোথায়?
- আখনৌর। জম্মুর কাছে। এই বছর খানেক আগে। আমার পোস্টিং হলো ওখানে
- তার পর? তার আগে আগের জন্মের স্মৃতি কি....?
- না না। তার আগে কিচ্ছু ছিলো না.... জানেন.... কিন্তু প্রথম বার বর্ডার পেট্রোলে গিয়েই...
- আপনি জলটা খান মেজর....
- মনে হলো খুব চেনা জায়গা জানেন। আমার পেট্রোলে যাবার কথা নয়। আমার র‍্যাঙ্কের অফিসারেরা যায়না। কিন্তু আমায় কেমন নেশায় পেয়ে বসল ডক্টর...
- তার পর?
- তার পর থেকেই পর্দার মত স্মৃতির লেয়ার গুলো খুলে যেতে লাগল। স্পষ্ট হতে লাগল...
- দেখুন মেজর, ইট ক্যান বি এ কেস অফ দ্বৈত সত্তা। তবে আস্তে আস্তে কোনো একটা সত্ত্বা আর মেমরি ডমিন্যান্ট হয়ে যেতে থাকে
- সেটাই তো ভয় ডক্টর
- কিন্তু আপনি তো বলছেন আগের জন্মের স্মৃতিতেও আপনি সৈনিক
- হ্যাঁ ডক্টর। সৈনিক। ওই পরিবেশ, উর্দী, কম্যান্ড, ডিসিপ্লিন... মনে হতো আমার বহু কালের চেনা...
- কিছু ঘটনা মনে পড়ছে?
- পড়ছে। সেই আখনৌর সেক্টরেই। সেটা ছিল সেপ্টেম্বর। যুদ্ধ শুরু হলো...
- সেপ্টেম্বর? তার মানে সিক্সটি ফাইভ.... 
- আর সেখানেই ট্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে আমার ইউনিট নিয়ে দিনভোর লড়ে গেলাম। ট্যাঙ্ক আটকে রাখলাম... হুকুম ছিল যেন দুষমনের ট্যাঙ্ক এক পা ও না এগোয়
- তার পর?
- ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দুষমন ভারী আর্টিলারি ফায়ার শুরু করল... উফফফফ
- আর ইউ ওকে মেজর??
- ওহ ইয়েস ডক্টর। আমার পা দুটো উড়ে গিয়েছিল। তখনো জ্ঞান ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে সব ঝাপসা। ওখানেই আমি...
- মারা যান। বুঝেছি মেজর। দেশরক্ষার জন্য প্রান দেওয়া। বড় গৌরবের। আপনার কি সেই মৃত্যুভয় ফিরে আসছে?
- আপনি বুঝতে পারছেন না ডক্টর। একটু আগে বললেন না, দ্বৈত সত্ত্বা, যে কোনো একটা ডমিন্যান্ট হয়ে যায় আস্তে আস্তে...
- হ্যাঁ, কিন্তু আপনি তো আগের জন্মেও আর্মিতেই ছিলেন। অসুবিধে কোথায়?

- আর্মিতেই ছিলাম ডক্টর। মেজর সওকত ওসমান। পাকিস্তান আর্মি।