বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১৬

বোদ্ধাদেবের নির্বুদ্ধিতা ও একটি টকটকে লাল স্টেগোসরাসের অপমৃত্যু ~ অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়

হাজার হাজার বছর আগে যখন পৃথিবী অন্য রকম ভূগোল নিয়ে অবস্থান করতো - ঠিক তখনকার কাহিনী এটি। সেই প্রাগৈতিহাসিক দুনিয়ায় এক উপমহাদেশ ছিল যার নাম ছিল রংবং। সেখানে দানবাকৃতি সবুজ গাছপালার মধ্যে বিচরণ করতো নানা রকম ডাইনোসর, আর তাদের বিবর্তনও সাথে সাথে ঘটে চলেছিল। এটি একটি অসাধারণ স্টেগোসরাসের গল্প যার নাম ছিল লালু। কেন মশাই, কুকুর, বেড়াল, বাঁদরের নাম থাকতে পারে, আর স্টেগোসরাসের নাম থাকতে পারে না? প্রথমে স্টেগো নাম দেব ভেবেছিলাম, কিন্তু স্টেথো-স্টেথো শুনতে লাগছিল আর গা গোলাচ্ছিল বলে লালু নামটাই রাখলাম। এই নামের পেছনে আরো একটা কারণ আছে, বলছি দাঁড়ান...
এখন মনে হতেই পারে এই স্টেগোসরাস অসাধারণ কিসের? প্রথমতঃ, সে ছিল টকটকে লাল, ঠিক ধরেছেন - লালু নামটা এই জন্যেও মানানসই। দ্বিতীয়তঃ, তার স্বভাবটি ছিল খুবই পরোপকারী - সে নিজে শাকপাতা খেয়ে থাকত, আর আশেপাশের অন্যান্য জন্তুজানোয়ার যারা শাকপাতা খেত (যেমন ম্যামথ, ব্রকিওসরাস ইত্যাদি) তাদের রাতের বেলা পাহারা দিত। কেউ বলে নি লালুকে, কিন্তু লালু তাও পাহারা দিত, সবাই শান্তিতে আর নিরাপত্তায় থাকলে তার লম্বা প্লেট-লাগানো ল্যাজটা তিড়িংতিড়িং করে লাফাত, সেটা লালুর খুব ভালো লাগত। তাই সে পাহারা দিত, আর সবাইকে নিরাপদ রাখত।
তৃতীয়তঃ, তার একটা গভীর সংবেদনশীল মনও ছিল, ছোট জানোয়ার, কীটপতঙ্গদের সে খাওয়াত জল থেকে শ্যাওলা আর আরো কি সব হাবিজাবি উদ্ভিদ তুলে এনে। এই ভাবে বেশ চলছিল, প্রায় ২৫-৩০ বছর লালু রংবং-এর প্রাণী ও উদ্ভিদকুলকে সুখে শান্তিতে রেখেছিল, ফলে সবাই তাকে ভালবাসত, আর আদর করে লাল সেলাম ঠুকত।
ইতিমধ্যে রংবং-এ এসে হাজির হল একগাদা টেরোডাকটিল। তারা আকাশ থেকে এসে চোখের সামনে যাকে পেত তুলে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলত আর খাওয়ার পরে বিষাক্ত বিষ্ঠা ত্যাগ করে যেত রংবং-এর জঙ্গলে। অতিষ্ঠ হয়ে বাকিরা সবাই লালুকে বললো - "তোর তো প্রচুর গায়ের জোর, যা না গিয়ে এই আপদগুলোকে বিদেয় করে আয়।"
সব শুনে লালু চড়তে আরম্ভ করল সেই পাহাড়ের গা বেয়ে যার ওপরে টেরোডাকটিলের দল থাকত। হতভাগারা আবার নিজেদের নাম দিয়েছিল "মুক্ত বিহঙ্গ" আর পাহাড়টাকে বলতো "কং ফ্রেশ" কারণ পাহাড়ের গুহায় ফ্রেশ কিং কং পাওয়া যেত। এখন রাগে আরো লাল হয়ে গিয়ে লালু পাহাড় চড়তে লাগল। চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে লালু দেখত পেল মুক্ত বিহঙ্গদের দলপতি মোহন বিহঙ্গকে। মারামারি করবে বলে যেই না এগিয়ে গেল সাথে সাথে মোহন বিহঙ্গ ততোধিক মোহন স্বরে লালুকে বলল - "এসো, এসো বোদ্ধা, তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।" অবাক লালু পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল, মোহন বলে উঠল - "তোমাকে আমরা সবাই চিনি বোদ্ধা হিসেবে, তুমি আমাদেরও রাজা হতে পারো।"
অবাক লালু বলে - "কিভাবে?" মোহন বললো - "গুটিকতক শর্ত আছে, আর একটা সহজ পরীক্ষা দিতে হবে।" লালু - "তা সে শর্তগুলোই না হয় আগে শুনি।" মনমোহিনী হাসি হেসে মোহন - "এক - তোমাকে ওই নীচের জঙ্গলের হতভাগা জন্তু জানোয়ার কীট পতঙ্গগুলোকে ত্যাগ করতে হবে; দুই - ওদের আমরা যাতে সহজেই টপাটপ গিলে খেয়ে ফেলতে পারি সেই জন্যে তোমাকে সাহায্য করতে হবে, তুমি রোজ সন্ধ্যেবেলা ওদের পশুসভা, নির্বাচন বা কিছু একটা বলে নদীর ধারে ডেকে নিয়ে আসবে, বাকিটা আমরা বুঝে নেব; তিন - কেউ যদি কোন প্রশ্ন করে তাহলে তুমি বলবে - "বিপ্লব নামের এক মোহিনী সাতরঙ্গা পাখী আসবে, আর সে আমাদের খাওয়া, দাওয়া, থাকার সব দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে দেবে।" তারপরেও যদি কোন বেয়াদব ঝামেলা করে তাকে কান ধরে জঙ্গলের বাইরে বার করে দিয়ে আসবে। এইভাবে পাঁচ বছর চালাও, তারপরে তোমাকে একটা ছোট পরীক্ষা দিতে হবে। তারপরেই তোমার নামে এই পাহাড়কে আমরা লালপাহাড় বলে ডাকব, তুমি হবে আমাদের অবিসংবাদী দেবতা, তোমার নতুন নাম হবে বোদ্ধাদেব। রাজী আছো?"
লালুর শক্ত প্লেটলাগানো ল্যাজটা একেবারে ঝোড়ো হাওয়ায় পাতা নড়ার মত দুলতে লাগল আনন্দে। লালু বুঝতে পারল ডাইনোসর কুলে তার নাম অমর হয়ে যেতে চলেছে। সে মুক্ত মোহন বিহঙ্গর কথামত চলতে লাগল, জঙ্গলের জানোয়ার শেষ হয়ে যেতে লাগল, টেরোডাকটিলদের বিষ্ঠায় গোটা রংবং দূষিত হয়ে গেল, আর লালুর সঙ্গীসাথীরা সব তাকে ছেড়ে চলে গেল অন্য জঙ্গল খুঁজতে। কিন্তু লালুর মাথার ভূত নামল না, তাকে যে বোদ্ধাদেব হতে হবে!
পাঁচটা বছর কেটে গেল, লালু কথা রাখল, লালু মোহনের ইশারায় সব কাজ করে খুশী করে দিল আর গভীর মমতায় মোহন বিহঙ্গ রংবং-কে প্রায় শ্মশানে পরিণত করে দিল। ঠিক পাঁচ বছর শেষ হওয়ার পরে লালু গেল মোহনের কাছে, বলল - "মোহন, আমি আর পারছি না, এবারে কি পরীক্ষা দিতে হবে বল, আমাকে বোদ্ধাদেব হতেই হবে।" মোহন বলল - "খুব সহজ, আমরা যে রকম এই পাহাড়ের ওপর থেকে ডানা মেলে উড়ে যাই, তোমাকেও সেটা শিখে ফেলতে হবে, তুমি অর্ধেক দেব হয়েই গেছ, এটা শিখে নিলেই বোদ্ধাদেব, আগামীকাল এসো, তোমাকে শিখিয়ে দেব।"
মনের আনন্দে দ্বিগুণ জোরে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে লালু রংবং-এ ফিরলো আর তার মাকে বলল সব কথা, মা অনেক চেষ্টা করল লালুকে বোঝানোর যে স্টেগোরা উড়তে পারে না, প্রকৃতি তাদের সে ক্ষমতা দেয় নি, কিন্তু লালু মানল না। লালুর বন্ধুদেরও মুক্ত বিহঙ্গেরা একে একে খেয়ে নিয়েছে এর মধ্যে, ফলে তাকে বোঝানোর আর কেউই নেই রংবং-এ। সকাল হতেই লালু উঠে গেল পাহাড়ের মাথায়, সেখানে মোহন অপেক্ষা করছিল তার জন্যে, যেতেই তাকে নিয়ে চলে গেল পাহাড়চূড়োর ধারে। সেখানে নিয়ে গিয়ে বলল - "কোন ব্যাপার নয়, লাফিয়ে পড়ো, গা ভাসিয়ে দাও, একটু বাদেই দেখবে তুমি উড়ছো, আর তারপরেই তুমি বোদ্ধাদেব।" লালু লাফিয়ে পড়ল, গা ভাসিয়ে দিল...
..............................................................
(এই গল্পের সাথে যারা আজকের রংবং নির্বাচন ফলাফলের মিল খুঁজে পাচ্ছেন - তাদের অনুরোধ আজকের মাথামোটা লালুদের কং ফ্রেশ পাহাড় থেকে নামিয়ে নিয়ে আসুন বুঝিয়ে সুঝিয়ে, নয়তো তারাও কিন্তু ডাইনোসরদের মত প্রাগৈতিহাসিক হয়ে যাবে একের পর এক লাফ মেরে মেরে)

বুধবার, ১৮ মে, ২০১৬

চল রাস্তায় ~ অমিতাভ প্রামাণিক

​​চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড, এই ভোট-টোট সব থামলে
আহা, ডিমফ্রাই কত সুন্দর যবে লোক কয় তারে মামলেট।
ক্যানে চা'র জল, প্যানে ছ্যাঁকছোঁক, ভুলে টেটে ফেল, নাকি পাশটি
চল হৈ হৈ করে খুলি চল গিয়ে তেলেভাজা ইন্ডাস্টি।
চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড...

ভুখা পথঘাট, পাড়া নির্জন, চেনা দাদা যায় অটোরিকশ'য়,
মুখে যা কিছু বলুক সবলোক, পেটে প'লে তবে কিনা পিঠে সয়!
শুধু গুড় জল খেয়ে চলে বল? শুধু পিছনে আছোলা বাঁশটি -
চল হৈ হৈ করে খুলি চল গিয়ে তেলেভাজা ইন্ডাস্টি।
চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড ...

পোষা কুকুরের মত ঘেউঘেউ, যারা সন্ধ্যেয় নিতো হপ্তা
তারা কবে হলো এত ঝিনচ্যাক, চড়ে জেটপ্লেন-হেলিকপ্টার!
কেউ ঝরে গিয়ে ফের ফিরে চায়, কেউ হাসপাতালেই থার্স্টি!
চল হৈ হৈ করে খুলি চল গিয়ে তেলেভাজা ইন্ডাস্টি।
চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড ...

শনিবার, ১৪ মে, ২০১৬

তোর নামতা ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

তুই এক্কে তুই, তুই দু'গুনে কার?
ফাগুন বুকেই আগুন জ্বালাস, এস্পার ওস্পার!
তুই তিরিক্ষে হোস, তুই চারে সন্তোষ,
মরশুমি তোর মনের খবর জানতে চাওয়াও দোষ।
পাঁচ তুইয়ে তুই আলো, ছটায় তাই জানালো,
তুই হলি ভোর, আলতো আদর, শিহরণ জমকালো
তুই সাত্তেই থাক, আটকে আমায় রাখ,
তোর জিম্মায় জীবন চাবি, হাত ধরে সাতপাক!
তুই নাহলেই নয়, দশা কেমন হয়,
ভাবতেও পারছিনা, সোনা, স্বপ্নেও পাই ভয়!

বৃহস্পতিবার, ১২ মে, ২০১৬

(মিছিলের আগে) যে কবিতা লাল কাপড়ে লেখা হবে ~ সৌম্যজিৎ রজক

সুশীল খন্ড 

'বুদ্ধিজীবী'তে গিজগিজ করছে অডিটোরিয়াম। মঞ্চে হাত নাড়া চলছে। চলছে বক্তৃতা ও টীকাটিপ্পনী। 'বুদ্ধিজীবী'রা জানেন, শুধুমাত্র তাহাই পবিত্র যাহা ব্যক্তিগত। মানুষের ভিড় তাঁহাদের পক্ষে আন-হাইজেনিক। ব্রিগেড ক্ষতিকারক এবং হকার ভর্তি ফুটপাথ 'নোংরা'। যদিও গ্রামের হাট 'বুদ্ধিজীবী'দের কাছে রোমান্টিসিজমের উপাদান। আর গ্রামের লোক 'সাইলেন্ট সাব-অল্টার্ণ'।

ওরা এমনটা যে ভাবেন সেটাও শ্রেণি-নিয়ন্ত্রিত। যতই লাফ-ঝাঁপ করুন; শেষ অব্দি মধ্যবিত্তের স্বভাবই তো এই। ছৌ-শিল্পী খুন হলে ওঁরা চুপ থাকবেন। খেতমজুরের জমি কেড়ে নিলে চুপ থাকবেন। শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নিলেও রা কাড়বেন না। তবে শ্রমিক, খেতমজুর আর প্রান্তিক শিল্পীরা এসে নগর কলকাতার রাজপথ দখল করলেই ওঁরা চিৎকার করে উঠবেন; দোহাই দেবেন ট্রাফিক-জ্যামের। এঁদের পছন্দ-

                                             "ক্ষমতার আশেপাশে চক্কর, এবং সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট"

                                                            (জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহারঃ পাঁচ; জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার)।

গরিব-গুরবো মেহনতি মানুষ মানেই বিপদ। তাই দূরে রাখো ওদের। 'বুদ্ধিজীবী'র নোটবই থেকে দূরে রাখো। কবিতার ব্যকরণ নিয়ে ভাবো,ভাবো ছন্দ-শিল্পরূপ নিয়ে। কবিতা থেকে দূরে রাখো মানুষকে। 'বুদ্ধিজীবী' তাই রায় দিয়েছেন বারেবারে, জীবনের জন্য নয়; শিল্প নিখাদ শিল্পেরই জন্য। দায়  নেই তার কোনও আর। জীবনের কাছে, ভবিষ্যের কাছে।

 

হার্মাদ খন্ড 

অডিটোরিয়ামে ঢুকে পড়ল একটি ছেলে; ব্যাগে যার লালঝান্ডা, গায়ে মিছিল ফেরত ঘাম আর প্রত্যয়। সাথে সাথে ধিক্কার জানাল কলাকৈবল্যবাদীরা। রে রে করে উঠল।

 

আর যদি দেখা যায়, মিছিলেরই কথা লিখে ফেলেছে সে! তখন? তার কবিতা ছাপতে অস্বীকার করবেন মহান গণতান্ত্রিক প্রকাশক। 'কবি' – এই বিশেষণ তাহলে তার জন্য নয়। ছেলেটির জন্য বরাদ্দ থাকবে 'হার্মাদ' আর 'ক্যাডার' শব্দ দুটো। আমাদের এই কমরেডও, নিশ্চয়, এরকমই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন। তাই তো, প্রথম কবিতার বইতেই, তিনি লিখেছেন ...

"... মারুন, কাটুন আর কুচিকুচি করুন আমাকে, আমি এভাবেই শুরু করব লেখা। কবিতার ভার নিয়ে আমার সত্যি কোনও মাথাব্যথা নেই শ্বৈলেশ্বরদা, ওগুলা ছাড়ান দেন, মিডিলকেলাস আজো বাকি আছে চেনা?...

পারেন তো ক্ষ্যামা দিন। নাইবা বলুন 'কবি'।... যতক্ষণ তবু এই সি পি এম পার্টি রয়ে যাবে, কলম ঘষটানো আর যে কোনও কবিতা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করা নিছকই অলীক। আমরা ক্যাডার, এটা জানেন নিশ্চয়।"

                                                                                                                   (উন্মোচিত চিঠি ; ভ্রমণকাহিনী)।

প্রসঙ্গত মনে রাখা জরুরি, বাজারের কাগজগুলো 'ক্যাডার' শব্দটি যেভাবেই ব্যবহার করুক; শব্দটার আসল মানেটি যারা জানেন তাদের কাছে কম্যুনিস্ট পার্টির ক্যাডার হওয়াটা গর্বের। আর কিছু নয়।

 

যাইহোক, 'বুদ্ধিজীবী' কোনও শ্রেণি নয় কখনই। প্রতিটি শ্রেণিরই কিছু বুদ্ধিজীবী থাকে। যেমন থাকে প্রতিটি শ্রেণির নিজস্ব পার্টি আর যোদ্ধা। আমাগো বাংলায় শ্রমিক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীর সংখ্যাটা কোনও কালেই কম নয়; যারা এই শ্রেণির কথা বলেছেন, গান গেয়েছেন। আপোষহীনভাবেই। তবে এত রাগ, এত জোর, এত অভিমান জয়দেব বসুকে আলাদা করেই চেনায়। 'প্রতিহিংসা'র বৈধতা নিয়ে এত তীব্র সওয়াল এঁকেই মানায়। শ্রেণির প্রতি, শ্রেণির শক্তি – কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতি, পার্টি-শৃঙ্খলার প্রতি গর্ববোধ ও ভালোবাসা বারেবারে ছলকে উঠেছে শব্দে, এঁর কবিতায়। নিজেকে 'ক্যাডার' বলে প্রকৃতই স্পর্ধিত হতেন তিনি। নাম আর পদবির মাঝে 'হার্মাদ' শব্দটা পুরে নিতে মজা পেতেন। আর ছিল হিম্মত; যার কিছুই নেই হারাবার তার যেরকমটা থাকে। নাহলে কবিতা লিখতে আসা কোনও তরুণ, এ বাংলাতেও, প্রথম কবিতা-বই উৎসর্গ করে 'ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)'কে? তখনও কবি-সমালোচক-পাঠক মহলে নেই কোনও 'স্বীকৃতি' (পরে যেটা পেয়েছেন)! আপনি তো জানতেন, বাংলা কবিতার জগতে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর রাজনৈতিক বাচন মানে কী এবং সেটাই শেষ কথা! প্রথম বইয়ের 'উৎসর্গ পৃষ্ঠা'টাই যথেষ্ঠ কারণ হতে পারত আঁতুড় ঘরে আপনায় খতম করে দেওয়ার জন্য। তবু কী দুঃসাহস কমরেড!

 

শুনেছি, এস এফ আই-এর রাত জেগে অবস্থান ছিল সেদিন। সে রাতেই দুজন কমরেড দেখে ফেলেছিল ব্যাগের ভেতর একটা খাতা। খাতা খোলা হয়। পাওয়া যায় টাটকা নতুন কিছু কবিতা, যা এতদিন লুকিয়ে রাখতেন জয়দেব বসু। কাউকে জানাতেন না। খবর গেল রটে। কবিতাগুলোও, বোধহয়, মুখে মুখে গেল ছড়িয়ে! ব্যাস! আর কখনো সঙ্কোচ করেন নি। লজ্জা পান নি, কবিতা লেখেন বলে। ভয় পান নি, কবিতায় 'সমাজতন্ত্র' আর 'মিছিল' শব্দদুটো লিখে।

 

কবিতা লিখেছেন কমরেডদের সাথে 'রাতপাহারা'র অভিজ্ঞতা নিয়ে। লিখেছেন মধ্যবিত্তের স্বপ্নের আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী চেহারার অ্যানাটমি-

"ওরা ডিজনিল্যান্ডে যায়

আরও নানাবিধ করে বায়না

ওরা পশুদের ভালবাসে

তবে, কালো লোকেদের চায়না

             ...

ওরা ভোট দেয় দুটি দলকে

ভোট নিয়মিত দিয়ে যায়

যারা সৌদিতে সেনা রাখে

রাখে দিয়েগো-গার্সিয়ায়

             ...

ওরা চাকরি রাখার চিন্তায়

কী করবে ভেবে পায়না

ওরা গণতন্ত্রও মানে

তবে, অন্যের দেশে চায়না"

                                                                                      (আপনি কি আদর্শ মার্কিন নাগরিক হতে চান? ; আলাদিন ও আশ্চর্য প্রদীপ)।

প্রেমের কবিতাও লিখেছেন। তবে সেসব কবিতা, ভুলেও, আরচিসের কার্ডে কোট করা হবে না কখনো –

" ... আমার তো মনে হয় কৃষক আন্দোলনে মেয়েটিরও সমর্থন আছে। তোমাকে বলেছে কিছু এ বিষয়ে? রোহিতাশ্ব, অকারণ তোমার এই পুচ্ছ নাচানো দেখে ব্রহ্মতালু জ্বলে যায়। সিরিয়াস হও ভাই। তুমি কি চালাবে কথা? বোলো, আমি কুঁড়ে তবু এখনো বাতিল নই। তেমন সময় এলে আশা করা যায় আমাকেও পুলিশ ধরবে। ভালো মেয়েদের তবু বিশ্বাস করতে নেই খুব। কম্বল ধোলাই খেয়ে আমি যদি কোনোদিন মুখ খুলে ফেলি, তখন আমায় ঘৃণা করবে তো? পারবে তো সে মেয়েটি, বিচ্ছেদ চাইবে তো? জেনে নিও রোহিতাশ্ব। সেই বুঝে বাড়িতে জানাব। "

                                                                                                                                                 (পূর্বরাগ ; ভ্রমণকাহিনী)।

অথবা, সেই লাইনটা যা মিছিলে স্লোগান দিতে দিতে এস এম এস করেছিল আমাদের আরেক কমরেড ...

                                                           " গঞ্জের নাম শ্রেণিসংগ্রাম, মেয়েটির নাম কু। "

                                                                                                                ( কু, ভ্রমণকাহিনী)।

কবিতা সম্বন্ধে প্রিতিষ্ঠিত ধারণাগুলোকেও তছনছ করে করে গেছেন জয়দেব। কবিতার লাইন সাজানোর চিরাচরিত নিয়ম মানেন নি বহু-বহুবার। ইস্তেহার লেখার মতোই টানা গদ্যে (run on) কবিতা লিখেছেন অজস্র। জয়দেব বসুর এইরকমের কবিতাগুলো বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক-একটা মাইলফলক এবং বিদ্রোহ। স্বতন্ত্র, নতুন যে কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন তিনি, তা আমাদের কবিতাকে কতটা অক্সিজেন দিয়েছে - সেকথা 'বিশুদ্ধ কবিতা' বা 'পবিত্র শিল্প'-এর মন্ত্র আওড়ানো বুদ্ধিজীবীরাও জানেন, নিশ্চয়। তাই কবি জয়দেব হার্মাদ বসুকে ওঁরাও অস্বীকার করতে পারেন  নি। পারেন নি বাতিল করে দিতে। উল্টে মেনে নিতে হয়েছে তাঁর শক্তি। শিল্পের জোরেই শিল্পের পরীক্ষাতেও তিনি জিতে গেছেন। উৎপল দত্ত, সলীল চৌধূরীর মতো।

 

মার্কসবাদীরা জানেন 'শিল্প'-এর সঙ্গে 'রাজনীতি'র বিরোধ নেই কোনও। বরং শিল্পের দাবি পূরণ না করলে, যতই বিপ্লবের কথা থাক, কবিতা-গান-ছবি সবই জায়গা পায় ডাস্টবিনে। এবং উল্টোটাও সত্যি। প্রতিক্রিয়ার প্রোপাগান্ডায় শিল্পসৌন্দর্য যতই সুচারু হোক, ইতিহাস তাকে বাতিল করবেই। জয়দেব বসু, তাই, লিখে যান "জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার''।

"এবার অন্যভাবে কবিতা বানানো যাক – এসো, লেখাপড়া করো,

কবিতা লেখার আগে দু'বছর পোস্টার সেঁটে নেওয়া ভালো,

কায়িক শ্রমের ফলে বিষয় মজবুত হয়- এবং, সমান ভালো

রান্না শেখা, জল তোলা, মানুষের কাছাকাছি থাকা।

পার্টি করার থেকে বিশল্যকরণী আর কিছু নেই কবির জীবনে, আমি

অভিজ্ঞতা থেকে এই পরামর্শ দিয়ে যেতে পারি।"   

                                                                                      (জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহারঃ এক; জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার'')।

সাহিত্য মধ্যবিত্তদের জন্য নয়। কবিতা লেখা আয়েসের নয়, পরিশ্রমের কাজ। হ্যাঁ, কবিতা লেখা আসলে 'কাজ'। চাষ করার মতোই, বাড়ি বানানোর মতোই। অর্থাৎ, মানিক ব্যানার্জি যেমন বলতেন নিজেকে – 'কলম-পেষা মজুর'। তেমনই জয়দেব বসু।

 

আপোষহীনতাই মজুরের সহজাত মনোভাব। শ্রমিক-কবিরও। গণতন্ত্রের কেন্দ্রিকতার প্রশ্নে আপোষ নেই। নীতির প্রশ্নে মধ্যবর্তী কোনও রাস্তা নেই।

 

যাদের বিশ্বাস নেই তাঁরা পড়ে দেখুক।

আমরাও এই আগুন ঝলসানো সময়ে,আসুন, পড়ে ফেলি আরেকবার। জয়দেব বসুর কবিতা। পোস্টারে লেখার মতো নতুন কোনও লাইন, হয়ত, খুঁজে পেয়ে যাব।

বুধবার, ১১ মে, ২০১৬

আমার পাওয়া প্রথম প্রপোজাল ~ শ্রুতি গোস্বামী

আজকাল ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেম দিবস থেকে শুরু করে ব্রেক আপ দিবস সবই পালন হচ্ছে, ফেসবুক এর দৌলতে কে কার প্রেমিকা কে কি কিনে দিল, কি খাওয়াল, কোথায় শোওয়ালো, কবার ভালবাসি বললো, সব ই জানা যাচ্ছে। যাকে বলে, প্রাইভেট বলে আর কিসসু রইল না। সবাই চায়, লোকে তার ব্যপার নিয়ে, সে পার্সোনাল হোক, কি পাব্লিক, ইন্টারেস্ট দেখাক। কি করলাম, সেটা আসল না। ছবি তুলে দেখালাম কিনা, সেটাই আসল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা এই প্রেম আর বিচ্ছেদ এর মধ্যে আছে প্রপোজাল ডে। আমরা চিরকাল যেটা জানতাম, প্রপোজ মানে বিয়ের প্রস্তাব, সেটা এখন পালটে দাঁড়িয়েছে প্রেমের প্রস্তাব। তাই সই। আজকাল বিয়ে হবে কিনা সেই নিয়েই কেও আর শিয়র নয়। তা এমন ই এক প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে আজকের লেখা।

তখন ক্লাস ফাইভ। সকালে কোনো রকমে স্কুল করে ফিরে খেয়ে দুপুর কাটতে না কাটতেই বাইরে খেলতে বেরিয়ে যেতাম। আমার সাথে প্রায়ই সবসময় থাকতো মণি, একই ক্লাস এ আমরা। বাকিরা সবাই পড়াশোনা করতো বলে দেরী তে বেরতো। আমাদের সেসবের বালাই নেই। দুপুর টা গল্পের বই পড়ে কাটিয়ে বিকেলে খেলা। সে কাট ফাটা রোদই হোক কি বৃষ্টি। আমরা জনা আটেক মেয়েরা খেলতাম। এক ই স্কুল, সামনের পেছনের পাড়া, বয়েস ও ওই এক দুবছরের এদিক ওদিক। আমাদের ওখানে দুজন ছেলে ছিল, দুজনের ই ডাক নাম রাণা। তা আমাদের বয়েসী যে ছিল তাকে আমরা ছোট রাণা আর আমাদের চেয়ে বয়েসে এক বছরের বড় যে ছিল,তাকে আমরা ডাকতাম বড় রাণা বলে। ছোট রাণা প্রায়ই আমাদের সাথে খেলতো, একা ছেলে। বড় রাণা বিকেলে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াত রাস্তায়, মাঝে মাঝে ছোট রাণা কে আওয়াজ দিত, আমাদের সাথে খেলছে বলে। ওর তাতে বয়েই যেত। তা সে দিনকে তখনো বাকিরা বেরয়নি, আমি আর মণি রাস্তায় হাঁটছিলাম,গল্প করছিলাম। দেখলাম বড় রাণা বেশ কয়েকবার সাইকেল নিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত করলো। কিছুক্ষণ পরে আমরা রাস্তায় হাঁটা বন্ধ করে আমাদের বাড়ির সামনে ছোট ফাঁকা জায়গা তে এসে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছি। জায়গাটার পাশেই একটা সরু পিচ রাস্তা,তারপরে ড্রেন আর তারপরে বিশাল খেলার মাঠ। বিকেলে মাঠে কাছের এক ক্লাবের ছেলেগুলো ফুটবল খেলত। বহুবার বল এসে আমাদের গায়ে লেগেছে, আমরাও খেলছিলাম, রেগে মেগে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি বল দূরের মেইন রাস্তায়। যাইহোক, বড় রাণা মেইন রাস্তা ছেড়ে এবারে বাড়ির সামনে পিচ রাস্তায় সাইকেল নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকলো:" এই বান্টি শোন।" আমি আর মণি দুজনেই ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যপার।
" আমার তোর সাথে দরকারী কথা আছে। একটু এদিকে আয়।"
দুজনেই এগতে বলে: " মণি র আসার দরকার নেই। ওকে একটু যেতে বল।"
শুনেই মাথা গরম হয়ে গেল। মণিও ঝাঁঝিয়ে উঠলো:" কেন রে? ও আমার বন্ধু। তোর যা বলার আমাদের দুজনের সামনেই বলতে হবে। কি এমন বলবি যে আমি থাকতে পারবোনা?"
আমিও ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। কি দরকার? তবে কি ও আমাদের সাথে খেলতে চায়, সেটা বলার জন্য ডাকছে? নাকি আমরা খেলার সময়ে ওকে মেইন রোড এ সাইকেল চালাতে বলি সেই নিয়ে? খেলার জায়গায় বহুবার ওর সাইকেল এ আমরা ধাক্কা খেয়েছি। সেই নিয়ে বেশ কয়েকবার রাগারাগি হয়েছে। তবে কি সেটা নিয়ে বলবে?
উপায় না দেখে রাণা বললো: " তোকে বলার ছিল যে তোকে আমি পছন্দ করি।"
আমি হাঁ করে চেয়ে রইলাম। বাপের জন্মে এরকম কথা শুনিনি। পছন্দ করে মানে? আমার সাইকেল টা চালাতে চায়? মনে পড়লো কিছুদিন আগে আমার নতুন বি এস এ এস এল আর দেখে রাণা বলেছিল সাইকেল টা ভাল।বলেছিলাম রেসিং সাইকেল, রেস করবি নাকি? মুখ ভেটকে বলেছিল আমি মেয়েদের সাথে রেস করিনা। জ্বলে গিয়েছিল, বলেছিলাম ছেলেদের সাথে তো পারবিনা,আমার সাথে চেষ্টা করে দেখ,আস্তে চালাবো। তাতে বেশ চটে গেছিল। তাহলে কি সাইকেলের লোভে এসব বলছে? নাকি পড়াশোনার ব্যাপারে কিছু বলতে চাইছে? কিন্তু ও আমার চেয়ে এক ক্লাস সিনিয়ার। স্কুল ও আলাদা। নাহ। সেটা কারণ নয়।এরকম বলার মানে কি? মাথায় কিছুই ঢুকছেনা।

মণি বুঝে গেছিল। ও হেসে মুখ বেঁকিয়ে বলে " হুঁহ পছন্দ করিস! আয়নায় নিজের মুখ টা দেখেছিস? সাইকেল চালাচ্ছিস তাই চালা। পাকামো মারিস না। প্রেম করার শখ হয়েছে! স্কুল এ কি এই সব শিখছিস নাকি! "

রাণা রেগে গেলে একটু তোতলাতো। বললো" তো তো তোকে বলেছি নয় দূ দূ দূরে যা নাহলে চুপ থাক। তুই কে?"

আমার মাথায় তখন ঢুকলো! আচ্ছা এই ব্যপার! চড়াৎ করে মাথাটা গরম হয়ে গেল। আমাকে পছন্দ করে? আমি কি সাইকেল না বই না জিনিস যে আমাকে পছন্দ করছে? সাহস তো কম না? আমাকে পছন্দ করার কারণ কি? আমাদের সাথে খেলে না বন্ধুত্ব নেই কিছুনা, মুখ উঠিয়ে বলতে চলে এল! এত সাহস!
" তোর যা বলার বলে ফেলেছিস? এবারে যা। চল মণি।"
এগতে যাব, রাণা সাইকেল নিয়ে আমার রাস্তা আটকে দাঁড়ালো।
" তোর উত্তর টা পেলাম না। তুই আমাকে পছন্দ করিস না করিসনা?"
মাথায় তখন আগুন জ্বলছে। এত বড় আসস্পদ্দা! আবার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছে! মুখ বেঁকিয়ে বললাম" তোকে পছন্দ করার মতন আছে টা কি? যা তো। বেকার সময় নষ্ট করাচ্ছিস।"
আবার এগতে যাব, আবার সাইকেল নিয়ে রাস্তা আটকালো।
" ভাল হচ্ছেনা রাণা। রাস্তা ছাড়বি? "
" না ছাড়লে কি করবি?"
" দেখবি কি করবো?"
" হ্যাঁ দেখা!"
ওমনি আমি রাণার সাইকেল টা দু হাতে চেপে ধরে ওকে সমেত ঠেলতে ঠেলতে রাস্তার পাশে মাঠের আগে ড্রেন টাতে নিয়ে গিয়ে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম। ও বসে ছিল। টাল খেয়ে আদ্ধেক ড্রেন এ আদ্ধেক টা সাইকেল সমেত মাটিতে ঠেকে।
পেছনে মণির অট্টহাস্য।
হাত ঝেড়ে বললাম:" আর ফের যদি রাস্তা আটকাতে আসিস, এর পরে সাইকেল ভেঙে তোর মার কাছে দিয়ে আসবো। আর খবরদার আমাকে পছন্দ করতে আসবিনা।

রাণা তখনো ওই ভাবেই আদ্ধেক ড্রেন এ সাইকেল নিয়ে, হকচকিয়ে গেছে। কি করবে কি বলবে বুঝতে পারছেনা।
মণি শেষে যাওয়ার আগে বলে গেল: " নে এবার ড্রেন এ শুয়ে শুয়ে পছন্দ কর মেয়ে।"

তখন বুঝিনি, ওটা প্রোপোজাল ছিল। ওই বয়েসে এর চেয়ে বেশি ম্যাচিউরিটি ছিলনা। কি আর করা যাবে! তবে থাকলেও ছেলেটির কপালে যে দুর্ভোগ থাকতই, সে নিয়ে আজ ও সন্দেহ নেই।

সোমবার, ২ মে, ২০১৬

জোট নিয়ে এতো প্রশ্ন কীসের? ~ রাহুল পান্ডা

জোট নিয়ে এতো প্রশ্ন কীসের?

প্রফেট সুমন মানসিক ভারসাম্য খোয়াতে পারেন, শ্রীজাতকে চা খাওয়াতে পারেন কমল হাসান, রকস্টার রূপম সুর দিতে পারেন মমতার লিপে, তাহলে জোট হবে না কেন?

আপনি বলবেন ইতিহাসের প্রশ্নে, আদর্শ-এর প্রশ্নে।

হাসালেন মশাই।

ইতিহাস মানেই ঐতিহাসিক ভুল।

আর আদর্শ একটা তাত্ত্বিক ভালোলাগা মাত্র। শিক্ষিত লোকের ইনফ্যাচুয়েসান বলতে পারেন। কিন্তু তাকে ভালোবাসা ভাবলে ভুল হবে। আদতে যা দেখছেন তা স্থিতিশীলতার বোরখা মাত্র। পায়ের তলায় যদ্দিন মাটি আছে, তদ্দিন গোড়ালি গেঁথে বিস্তর বাতেলা দেওয়া যায়। কিন্তু একবার হড়কালে, আপনি এবং আপনার তত্ত্ব সবই বিক্রি আছে। দু গণ্ডা ফুটো কড়িতে তখন আপনাকে ওই আদর্শশুদ্ধ বাগবাজারে কিনে বন্দরে বেচে দেওয়া যায়।

আসলে সবই পেটের ধান্ধা। পেট থাকলে আপনি আছেন, না থাকলে আপনি নেই।

ঠিক যেকারণে এই মুহূর্তে আমার একমাত্র চাহিদা একটা চাকরি। চাকরি ছাড়া কোনকিছু নিয়েই আমি কনসার্নড নই। বিএড করে বসে রয়েছি, এম ফিলের খাতায় নাম লেখানো আছে, কিন্তু আমি খুশি নই। খুশি নই, কারণ আমি ইনসিকিওর্ড। ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, ইংরেজি জানি না, বাবা রিটায়ার্ড করে যাবেন আজ বাদে কাল। তখন কে বাঁচাবে আমাকে?
এই সরকার আমাকে চাকরি দেবে বলে আজ পাঁচ বছর ঘোরাচ্ছে। এসএসসি একবার, টেট একবার, সুপার টেট একবার, বিচিত্র ফ্যাকড়া তুলে বিচিত্রতর সমস্যা আমদানি করছে। শিক্ষামন্ত্রী টুকলি করে পিএইচডি করছেন এবং যে রেটে পার্থলীলা শুরু করেছেন, তাতে বোঝাই যাচ্ছে পরীক্ষাটা তিনি করাবেন না।

তাহলে আমি যাবো কোথায়? আমার মতো আরও কয়েক লক্ষ ছেলে-মেয়ে তারা যাবে কোথায়? এই যে প্রতিবাদী, স্বাধীন তাত্ত্বিক বামবিরোধী বুদ্ধিজীবী, এর উত্তর আছে আপনাদের কাছে? নেই।

বামফ্রন্ট সরকার ৩৪ বছরে কী করেছে আমি জানি না। কিন্তু শেষ একদশক এসএসসি-টা ঠিকঠাক নিয়েছিল। নিপাট সাধারণ বাড়ির, মাঝারি মেধার হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে সেসময় চাকরি পেয়েছে। একটা সুনিশ্চিত ভরসা ছিল, আর কিছু না হোক এসএসসি আছে। সেই ভরসার জায়গাটা পরিকল্পিতভাবে এই সরকার নষ্ট করেছে। আর তার বদলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিয়েছে ভিক্ষান্ন। বেকার ভাতা, যুবশ্রী। কে চায় এসব?  ক্ষমতা থাকলে চাকরি দিন। নইলে ফুটুন।

সুতরাং জোটে ভোট না দেওয়া ছাড়া আমার উপায় কী দাদা? একটু বলবেন?

পুনশ্চ: সফদর হাসমী আর এসএসসি দুটো গোলাবেন না দাদা। প্রথমটা বিরিয়ানি, দ্বিতীয়টা ডালভাত। একটা লাক্সারি, একটা নেসেসিটি।

রবিবার, ১ মে, ২০১৬

শিল্প চাই কি চাই না ~ সুশোভন পাত্র

পশ্চিমবঙ্গে ২০১১'র বিধানসভা নির্বাচন চলছে। তখন একটা কলেজে অস্থায়ী পোস্টে শিক্ষকতা করি। ৬ দফায় নির্বাচন। তিনদফা ভোটগ্রহন হয়ে গেছে। ঠিক আজকের দিনে, মানে ১লা মে কলেজ খোলা। অবশ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হঠাৎ রক্ত পতাকা উত্তোলন করে, ৮ ঘণ্টা কাজের দাবীতে শ্লোগান দিয়ে, শ্রমিক দরদী হওয়ার কোন যৌক্তিকতাও নেই। অগত্যা কলেজ গেলাম।
সেমিস্টারের শেষের দিক। ইন্টারনাল পরীক্ষার নাম্বার তোলা, ট্যাবুলেশন, স্যাম্পল কোশ্চেন পেপার রেডি  আর সাথে কিছু প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা। বছরভর, 'ফর্মাল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড অটোমাটা' নামক অত্যন্ত ভজকট সাবজেক্ট থিয়োরিতে পড়ানোর দরুন এইচ.ও.ডি আমার উপর সদয় হয়েই প্র্যাক্টিক্যালের আপাত সহজ ক্লাস লোড ব্যাল্যান্স করেছিলেন। মাইক্রোবাইলোজি ডিপার্টমেন্টের ডেটা স্ট্রাকচারের ল্যাব। সিলেবাসও তুলনামূলক ভাবে ছোট এবং সহজ। 
তা সেদিন ওদের পরীক্ষা। ভাইবা নিতে গেলাম, সঙ্গে জাহির দা। ওদের আবদার, ভাইবাতে কোর্সের প্রশ্ন ছাড়াও ওদের পছন্দের একটা বিষয়ে, আমাদের পছন্দের একটা প্রশ্ন করতেই হবে। প্রত্যেক কে। ওদের পছন্দের বিষয় সাধারণত, ক্রিকেট, সিনেমা, কম্পিউটার গেমস কিম্বা ফুটবল। আউট অফ দি ব্লু এক ছাত্র বলল "স্যার, পছন্দের বিষয়ঃ রাজনীতি।" আমি আর জাহির দা একে অপরের দিকে তাকালাম। কথায় কথায় নির্বাচনের কথা উঠতেই ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, "তোর কোন কনস্টিটুয়েন্সি রে?"
-"যাদবপুর, স্যার"। জাহির দা বলল, "তাহলে তো মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র। ভোট তো হয়ে গেছে"। ছেলেটা সদম্ভে, নিজের তর্জনী আমাদের দিকে তুলে, ভোটের কালি দেখিয়ে বলল, "এক্স মুখ্যমন্ত্রী। সেই ব্যবস্থাই করে এসেছি। উই হ্যাভ ভোটেড হিম আউট।" ১৩'ই মে আরও অনেকের সাথে আমার ছাত্রেরও স্বপ্নপূরণ করেছিলো। যাদবপুরে হেরেই গিয়েছিলেন বুদ্ধবাবু। হয়ে গিয়েছিলেন 'এক্স'ও।
কলেজ ছেড়ে নতুন চাকরিতে জয়েন তার পরেপরেই। বেশ যোগাযোগ ছিল অনেকর সঙ্গেই, এই ছাত্রর সঙ্গেও। খবর পাই তারাও কর্মজীবন শুরু করেছে। আর আমারও বেড়েছে অন্য লায়াবিলিটিস। ফলে যোগাযোগটা ক্রমশ ক্ষীয়মাণ হলেও, এখন 'স্যার' থেকে 'দাদা' ডাকেই আমরা উভয়পক্ষ বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এই সবকিছুর মধ্যেই, সময়ের নিয়মে কাল যাদবপুরে আবার একটা ভোট হয়ে গেলো। আগের বারের থেকে শীতলে, নীরবে আর ফ্ল্যাশ লাইটের আড়ালে। কাল সন্ধেবেলা মোবাইলে একটা অজ্ঞাত পরিচয় নাম্বারের ফোন তুলে চমকে গেলাম। সেই ছাত্রই ফোন করেছে। বেশ কিছুদিন পর। বলল "আগের বারের ভুলের ক্ষমা হবে কিনা জানিনা। কিন্তু এবার তার প্রায়শ্চিত্ত অবশ্যই করলাম। এটা জানাতেই ফোন করেছিলাম, দাদা।"
১১'র নির্বাচনী ফলাফলের পর বুদ্ধবাবু বেশ কিছুদিন চলে গিয়েছিলেন অন্তরালে। প্রকাশ্য কর্মসূচী করতেনই না। তারপর দীর্ঘদিন পর ফিরে এসে চণ্ডীপুরের এক জনসভায় বলেছিলেন "শিল্প ছাড়া রাজ্য এগোতে পারে না। আজ হোক বা কাল রাজ্যের মানুষ কে এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে যে, শিল্প চাই কি চাই না।" 
ঐ ছাত্র ১৩'তেই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এখনও বেকার। ভিনরাজ্যে চাকরি হয়, কিন্তু পছন্দের হয় না। না, ১৩'ই মে বুদ্ধবাবু জিতলেই বা বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলেই সে সহ বাংলা ১ কোটি বেকারের চাকরি হতই এমন 'মমতাময়ী' দাবী আমার নেই। হয়ত এই ১৯'শে মে তার 'ভুলের' 'প্রায়শ্চিত্ত' করবে হয়ত করবে না। নির্বাচনের অমোঘ নিয়মে হয়ত তার এবারও স্বপ্নপূরণ হবে হয়ত হবে না। কোনও দল হারবে। কেউ জিতবে। শুরু হবে পোস্টমর্টেম। কিন্তু এই পাঁচবছর সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে অভিজ্ঞতা দিয়ে ভাত আর বিরিয়ানির পার্থক্য করতে শিখিয়ে যাচ্ছে। টাটা-সালিম-সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-জমি অধিগ্রহণ এসব বিষয়ে আপনি বুদ্ধবাবু, তাঁর পার্টির বিরোধিতা করতেই পারেন। 'আমরা ২৩৬ ওঁরা ৩৬'র মিডিয়া রচিত গল্পে ঔদ্ধত্য'র মহাভারত আপনি লিখতেই পারেন, বুদ্ধবাবু একের পর এক 'ভুল স্বীকারে' পার্টির মধ্যেও বিরাগভাজন হওয়াতে, সেই আপনিই মশকরা করতে পারেন, 'দুর্বলতা' খুঁজতে পারেন, 'ড্যামেজ কন্ট্রোলের অপচেষ্টা' বলে উড়িয়ে দিয়ে, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর পুলিশ কে 'চাবকানোর' ধমকি তে বীরত্ব আর শালীনতাও খুঁজে নিতে পারেন। কিন্তু কি আশ্চর্য দেখুন, এখনও, এবারও, নির্বাচনে ঐ ছাত্রের মত আপনিও ঐ বুড়োটারই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। 'শিল্প চাই কি চাই না'? 'সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-শালবনীর' কারখানা থেকে ধোঁয়া উড়বে না গরু চরবে? চপ-তেলেভাজা শিল্প হবে না উইপ্রো আই.বি.এম ন্যানো বেরোবে? রাজ্যের হাজার শিক্ষিত যুবকরা চাকরি করবে না বেকারই থাকবে? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর আপনাকে দিতেই হবে। আজ কিম্বা কাল। বিকস, ২০১১ কিম্বা ২০১৬। দি কোশ্চেন রিমেনস সেম...

শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৬

বৃষ্টির পূর্বাভাষ ~ দীপাঞ্জন গুহ

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তাঁর অননুকরণীয় বাচনভঙ্গিতে কারুর সম্পর্কে বলেছিলেন যে সে কী করে বলবে, তার তো কোলে ছেলে? প্রসঙ্গ ছিল কোনো একটা বিষয়ে প্রতিবাদ করা যে ব্যাপারে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি অপারগ কারণ তার কোনো একটা নাছোড় পিছুটান বা ভালনারেবিলিটি আছে |  "কোলে ছেলে" ছিল চূড়ান্ত ব্যক্তিগত পিছুটানের প্রতীক |

বাংলার চলতি বিধানসভা ভোট এই সাধারণভাবে সত্যি অসাধারণ অবলোকনটিকে মিথ্যা প্রমাণিত করেছে |

সেদিন হালিশহরে একটি সাড়ে তিন বছরের বাচ্চা মেয়েকে লাঠি দিয়ে পেটায় শাসক দলের গুণ্ডারা! কারণ বাচ্চাটির পরিবারে বিরোধী সমর্থক আছে! অবাক হবেননা না বন্ধুগণ, কারণ গতকালই ভাঙরে একটি দশ বছরের বাচ্চাকে বেধড়ক পিটিয়ে ক্ষেতের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল কারণ সেই নাকি শাসক দলের "পোস্টার ছিঁড়েছে" |

অবাক হন এর পরের খবরটিতে  | হালিশহরের ওই বাচ্চাটির মা গুণ্ডাদের হুমকি উপেক্ষা করে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে গিয়ে ভোট দিয়ে এসেছেন!

বাংলায় এখন রাজনৈতিক তর্কের কোনো পরিসর নেই, যেটা আমাদের এই কদিন আগেও ছিল | যেমন ধরুন কৃষিজমিতে শিল্প হওয়া উচিত কিনা; হলে জীবিকা-হারাদের কী হবে, না হলে জমি আসবে কোথা থেকে, সেজ হওয়া কাম্য কিনা, হলে কী শর্তে, ভর্তুকি দেওয়া ঠিক কী না, ইত্যাদি | এই ধরনের প্রশ্নের এখন কোনো পরিসর নেই কারণ রাজনীতির মঞ্চ দখল করেছে গুন্ডা আর চোরাকারবারীরা, যে চোরাকারবার শুরু হয়েছিল ভুয়ো ডকটরেট ডিগ্রি দিয়ে আর সারদা নারদ পেরিয়ে প্রতিদিনের ব্যবসার সর্বশেষ নিদর্শন জাল ছবি দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন, কৃতিত্বে শাসক দলের সাংসদ ! বালি মাফিয়া, কয়লা মাফিয়া, সিন্ডিকেট মাফিয়া, ওয়াগন-ব্রেকার তো ছেড়েই দিলাম | এদের হাত থেকে মুক্তি এবং ন্যুনতম গণতন্ত্রের আশাই (যাতে কার্টুন ফরওয়ার্ড করে আর সারের দাম বাড়ছে কেন জিজ্ঞেস করে অন্তত জেলে যেতে না হয়) এখন মূল ইস্যু, তাই রাজনৈতিক প্রশ্ন আপাতত তোলা আছে | এমনকি একদম হালের প্রশ্নও হালে খুব একটা পানি পাচ্ছেনা, যথা বহু কষ্টে প্রতিষ্ঠিত কমিশনগুলোকে, স্কুল সার্ভিস কলেজ সার্ভিস পাবলিক সার্ভিস, প্রায় তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা হলো কার স্বার্থে, পঞ্চায়েতের অধিকার প্রশাসন দিয়ে খর্ব করা হচ্ছে কেন, শিল্পের ব্যাপারে রাজ্যের জমি নীতিটা ঠিক কী, চা-বাগানের জীবন-মরণ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান কী, চাষীরা দাম পাচ্ছেন না কেন, ডোল-পলিটিক্সকে আদৌ কোনো উন্নয়ন বলা যায় কিনা, ইত্যাদি |

এই খরতাপ, লু-বওয়া বৈশাখের বাংলায় আপাতত এই প্রশ্নগুলো তোলা আছে | কারণ চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে ঘুষ খাওয়া, প্রধান শিক্ষিকাকে যোগ ছোঁড়া, পুলিশকে চর মারা, ক্রমাগত প্রকাশ্য সভায় বিবিধ হুমকি দিয়ে চলা নেতারা কলার তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে | দেখা যাচ্ছে শুধুমাত্র বিরোধী পোলিং এজেন্ট হওয়ার "অপরাধে" খুন হলেন তিনজন, ক্রমাগত হামলা অব্যাহত | আর শেষ অবধি দেখা গেল যে দুটি শিশুকে আক্রমণ করলো ঠ্যাঙ্গারেরা |

গল্পটা এখানেই শেষ করার ইচ্ছা ছিল শাসকের | কিন্তু হলো কই! 

সাড়ে তিন বছরের মেয়ে মার খাওয়ার পর তাকে কোলে নিয়ে ভোট দিলেন হালিশহরের দেবশ্রী ঘোষ, শুধুমাত্র ভোট দিতে যাওয়ার "অপরাধে" দুর্বৃত্তরা দুটো হাত লাঠি দিয়ে মেরে ভেঙে দেওয়ার পর আরো জেদ নিয়ে ভোট দিলেন গয়েশপুরের পলিটেকনিক শিক্ষক শিবু দাস ও তাঁর স্ত্রী টুলটুল দাস, ছমাস আগের অজস্র দুর্বৃত্তের রক্তচোখকে জবাব দিতে ভোর থেকে লাইন দিয়ে ভোট দিলেন বিধাননগরের বাসিন্দারা, কাল তিরিশ তারিখ ওই ভাঙরের মার খাওয়া দশ বছরের শিশুটির পরিবারও হয়ত ভোট দেবে |

অসংখ্য বুথ দখল, ভয় দেখানো, ছাপ্পা চলছে | কিন্তু প্রতিরোধও চলছে | এই নির্বাচনের এটাই প্রধান পাওনা, ফল যাই হোক |

গ্রীষ্ম প্রচন্ড | কিন্তু বৃষ্টির পূর্বাভাষ আছে!

রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৬

মা মাটির উন্নয়ন ~ মাহফুজ আলম

মাননীয় অভিরূপ সরকার সমীপেষু,

আপনি গত তেইশ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকাতে ক্যানো মা-মাটি'র সরকার সরকারী কর্মচারীদের ডিএ দিচ্ছেনা সেইটে বোঝাতে গিয়ে কিছু যুক্তি দিয়েছেন আর লাস্টে কয়েছেন যে আগের সরকার নাকি প্রছন্নভাবে মধ্যবিত্তের পক্ষে ছিল এবং আপনারা খোলাখুলিভাবে গরিবের পক্ষে। গোটাটা পড়ে সেই গরিবের ভাষাতে আপনাকে কটা মন ভালো করা রেজ্জাকীয় সাব-অল্টার্ন ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেসনের নমুনা দিতে যারপরনাই ইচ্ছে করছিল। দিচ্ছিনা, কারণ আপনি একে 'সুশীল', তার উপরে 'বুদ্ধিজীবি' এবং সর্বোপরি পে কমিশনের চেয়ারম্যান (যদিও লেখাটা পড়ে বোঝা গেছে যে সরকারে এলে আপনি ডিএ দেওয়ার নামে কাঁচকলা দেখাবেন)।

আপনি অর্থনীতি'র পন্ডিত লোক, আপনার ডিগ্রি ইস্ট জর্জিয়া থেকে আসেন নি, আপনার পিএইচডি টাও যাদবপুরের কি নর্থবেঙ্গলের কেউ টুকে দেন নি- এতদূর নিয়ে আমাদের কারুরই কোনো দ্বিমত নেই।

এখন রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়, সুতরাং কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেওয়া সম্ভব নয়, অ্যাদ্দূর সব্বাই জানি। এইটে বকার জন্য আপনার জ্ঞান দেওয়াটা জরুরী নয়। এট্টু সমস্যা থেকে যাচ্ছে পরের অংশটা নিয়ে, যেখানে আপনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে ডিএ না দিয়ে আপনারা সেই টাকায় গরিবের উন্নয়নে খরচ করেছেন।

আপনার ধরে নেওয়া হিসেবে সরকারী অনুদানপ্রাপ্ত ক্লাবের সংখ্যা সাড়ে-পাঁচ হাজারের বেশি হবেনা। এইটে ডাহা মিথ্যে কথা সার। ২০১৫ তেই সরকারী অনুদানপ্রাপ্ত ক্লাবের সংখ্যা ৭০০০। ২০১২ সালে অনুদান দেওয়া শুরু হয়েছিল ১৫.৫ কোটি টাকা দিয়ে, ২০১৫-১৬ তে সেটা দাঁড়িয়েছে ১৫০ কোটি টাকায়। এই হিসেবে গত তিন বছরে ৩০০ কোটির বেশি টাকা ক্লাবগুলোকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। আর ইয়ে, ২০১৫-১৬ বাজেট বক্তব্যে অমিত মিত্র সগর্বে জানাচ্ছেন যে সাহায্যপ্রাপ্ত ক্লাবের সংখ্যা ১৪০০০। আপনার জন্য প্রামাণ্য লিঙ্কগুলোও থাকছে (http://indianexpress.com/article/cities/kolkata/didi-doles-out-rs-105-cr-for-clubs/, http://indiatoday.intoday.in/story/west-bengal-polls-mamata-banerjee-tmc-left-cpm/1/622050.html )

এখন যদি বুঝিয়ে দ্যান যে এই ক্লাবগুলোকে টাকা দিয়ে কোন গরিবের কিভাবে উপকার হয়েছে তাহলে উপকৃত হই।
অথবা, অনুষ্ঠান বাড়ি করে ভাড়া দিয়ে টাকা রোজগার আর বাৎসরিক পূজোটা ভালো করে করা ছাড়া এই টাকায় বাংলার কোন খেলার উন্নতি হয়েছে সেইটে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে বোঝালেও হবে। এবং হ্যাঁ, ক্লাবগুলো সবই কিন্তু তৃণমূলের নেতা-চামচাদের বাছা। সত্যিকারের যে কটা ক্লাব খেলোয়াড় তৈরী করে তাদের পাত্তাই দেওয়া হয়নি।

ক্লাবের ছেলে আর কর্তাদের দিয়ে ভোটের সময় বিরোধী ভোটারদের চমকানোটা কি গরিবের উন্নয়নের মধ্যে ধরেছেন? তাহলে অবশ্যি, আপনি দিদিমণির দুষ্টু ভাই। কিস্যু বলার নেই।

আপনি লিখেছেন যে উৎসব বাবদ খরচ হয় বছরে আরো চল্লিশ কোটি টাকা। সিরিয়াসলি সার, আপনার অ্যাত্তো জ্ঞান, রাতে ঘুম হয় তো?

শুধু কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেই কত খরচ হয় আপনার ধারণা আছে? ২০১৪তেই সেরা সিনেমা'র জন্য প্রাইজ মানি ছিল ৫১ লাখ টাকা। অফিসিয়ালদের মতে খরচ ছাড়িয়েছিল ২০ কোটি টাকার বেশি (নিউজ লিঙ্ক http://www.telegraphindia.com/1141107/jsp/frontpage/story_19008855.jsp )। 

অবশ্যি নিন্দুকেরা বলে যে সেবার টাকা যুগিয়েছিলেন সুদীপ্ত সেন যার অনিদ্রার রোগ সারাতে দিদিমণি'র লেখা কবিতার বইগুলো থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করা হত।

মুখ্যমন্ত্রী তার 'মিনি-মহাকরণ' এর নামে জেলায় জেলায় যে বিশাল এসি প্যান্ডেলে রাজসভা চালান, গোটা জেলার কর্তাব্যক্তিরা এসে হাজির হয়, ঢালাও খাওয়া-দাওয়া হয়।তার খরচ জানেন? গড়ে ৭০-৭৫ লাখ টাকা। এও শোনা যায় যে সে প্যান্ডেলের বরাত নাকি এক নির্দিষ্ট ঘেসোকেই দেওয়া হয়।

কটা মেলা হয় বছরে তা জানেন আপনি?  আপনার অর্থমন্ত্রীও গুণতে পারেন নি। তিনিও বাজেট বক্তব্যে 'Dance Drama Festival, Mati Utsav, Natya Mela, Bangla Sangeet Mela,Children's Film Festival, Tele Award, Paschimbanga Charukala Utsav' এইগুলোর নাম লিখে তাপ্পর শেষে 'etc' বসিয়েছেন (সোর্স- ওয়েস্ট বেঙ্গল বাজেট স্পিচ, ২০১৫-১৬, পেজ-৫০)।

যাকগে, মেলাগুলোর আয়োজন করে মূলতঃ বিভিন্ন সরকারী দপ্তর। এর মধ্যে তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর প্রধান, এইটা নিশ্চয়ই জানেন। তাদের বাজেট-বরাদ্দ দেখলেই মেলার খরচের হিসেব পাওয়া সম্ভব। অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র তার বাজেট বক্তব্যে জানিয়েছেন যে ২০১৪-১৫ সালে তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৬৫ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ সালে সেইটে বাড়িয়ে করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। ক্রীড়া আর যুবকল্যাণ দপ্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৫২ কোটি টাকা, সেইটে বাড়িয়ে ৩৪০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এরমধ্যে সবটা নিশ্চয়ই মেলার জন্যে খরচ হয়না। কিন্তু বড় অংশটা নিশ্চয়ই হয়। তাহলে এই খরচগুলো মিলিয়ে আপনার গপ্পে দেওয়া মাত্তর চল্লিশ কোটির হিসেব তো জাপানী তেল দিয়েও দাঁড়াচ্ছেনা সার।

বাজেটের লিঙ্কটা দিলাম না। আপনি সরকারী লোক। নিশ্চয়ই নেটে সার্চ মারলেই পেয়ে যাবেন। যেটা জানার সেটা হল এই গুচ্ছের টাকা উড়িয়ে সঠিকভাবে ঘেসো-ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কন্ট্রাক্ট পাইয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিভাবে গরিবের উন্নতি হয়েছে সেইটা বোঝাবেন প্লিজ।

আপনি লিখেছেন যে বিস্তর উন্নয়ন হয়েছে। বলছেন যখন তখন নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও হয়েছে। MNREGA বা সোজা বাংলায় একশো দিনের কাজের হিসেব দেখছিলাম যাতে প্রায়শই রাজ্যসরকার নিজেদের এক নম্বর বলে দাবী করে থাকেন। স্টেট ওয়াইজ রিলেটিভ পারফরম্যান্স অনুসারে পশ্চিমবঙ্গ এইমুহুর্তে ১০ নম্বরে। মিজোরাম,অরুণাচল, জম্মু-কাশ্মীর, নাগাল্যান্ড, আসাম, পাঞ্জাব,বিহার, ছত্তিশগড় আর সিকিমের পিছনে। লিস্ট অনুযায়ী, নথিভুক্ত তফশিলীদের ৪১% কে এখনও কাজ দেওয়া যায় নি। এবং ১৫ দিনের মধ্যে টাকা মেটানো হয়েছে মাত্র ২৫.৬১% কে। দারুণ গরিব প্রেম, তাই না?
(রেগার লিঙ্ক- http://164.100.129.6/netnrega/st_weightage_drill.aspx?lflag=eng&fin_year=2015-2016&source=national&labels=labels&Digest=+WYLWwx19OhhVOg6q39p/g
)

বড়বাজারের উড়ালপুলটার কথা ভুলবেন না সার। বাম আমলে টেন্ডার হয়েছিল, তাই আপনাদের যুক্তিতে আপনাদের সরকারের আমলেও বামেরাই সেতুটা বানিয়ে যাচ্ছিল আর কি। ২৭ জনের  প্রাণ গিয়েছে। পরে বেরিয়েছে যে সেতুর মালমশলা সরবরাহ করতেন এক ঘেসো নেতার ভাইপো। দেখার দায়িত্বে কমিটিতে ছিলেন একাধিক ঘেসো নেতা। এক নেতা টিভিতে বলেওছেন যে তিনি জানতেন নকশায় গলদ আছে কিন্তু রাজ্যসরকারের খরচ বাড়বে বলে চেপে গেছিলেন।

মাত্র ২৭টা প্রাণ...উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে তার কিইবা দাম বলুন? আফটার অল, ওরা সিপিএমের আমলে জন্মেছিল নিশ্চিত।

গুচ্ছের রাস্তা আর বাড়িঘর অকারণে নীল-সাদা রঙ হয়েছে। নিন্দুকদের মতে সে রঙও নাকি এক ঘেসোর দোকান থেকেই কেনা হয় বিনা টেন্ডারে। এতে ঠিক কি উন্নয়ন হয়েছে বলবেন?

গত আর্থিক বছরে কুড়ি জন মত চাষী দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেছেন। চা বাগানে অনাহারে মৃত্যুমিছিল বেড়েই চলেছে।

এই খেলা-মেলার টাকা, নীল সাদা রঙ করার টাকা- এসবের একটা অংশ দিয়ে এই দেনার দায়ে বিকিয়ে যাওয়া চাষী, অনাহারে ধুঁকতে থাকা চা বাগানের শ্রমিক-এদের একটু সাহায্য করা যেত না সার?
আপনার গরিব দরদী সরকারের ফিরিস্তি'র তাড়া কাগজ তৈরী আছে জানি কিন্তু কাজের কাজ কি হয়েছে?

আপনি লিখেছেন যে বেতন খাতে রাজ্য সরকারের খরচ কমেছে। ২০১৪-১৫ আর্থিক বছরে বাজেটের বরাদ্দের ৩১.৭% খরচ হয়েছে বেতন বাবদ। আমি অর্থনীতির ছাত্র নই, তবু এটুকু বোঝা যাচ্ছে বেতন খাতে খরচ কমা মানে রাজ্য সরকারের কর্মী সংখ্যাও কমেছে। অবসরপ্রাপ্তদের জায়গাতে আর স্থায়ী নিয়োগ হয়নি।

এদিকে আপনার মুখ্যমন্ত্রী ভোটের বাজারে বকে বেড়াচ্ছেন যে তিনি নাকি ৬৮ লাখ বেকারকে চাকরি দিয়েছেন। এবার ৬৮ লাখ চাকরি দিলে বেতন খাতে খরচ বাড়া উচিত। কিন্তু আপনার হিসেবে তো খরচ কমেছে।

তাহলে? মিথ্যে কথাটা কে বলছেন বলুন তো? আপনি না আপনার মুখ্যমন্ত্রী?

আপনি লিখেছেন যে ডিএ না দিয়ে সেই টাকায় আপনার সরকার সার্বজনীন উন্নতিতে হাত দিয়েছে। এখন সার্বজনীন উন্নতি বলতে আপনি কি বোঝেন সেইটে জানতে ইচ্ছে করছে। ভোটের হিসেবে দেখা যাচ্ছে ঘেসো পার্টির নেতাদের সম্পত্তি অনেকের ক্ষেত্রেই কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার গুণ বেড়েছে, এটাই কি সার্বজনীন উন্নতি?

চাষীরা ধানের সহায়ক মূল্য পাচ্ছেনা।কিষান মান্ডিগুলো গড়া হয়েছে লোকালয়ের মূল বাজারের বাইরে। সেখানে কেউই যায়না। দেনার দায়ে আলু চাষীরা আত্মহত্যা করছেন, এইটাই কি সার্বজনীন উন্নতি?

পাঁচ বছরে কাগজে কলমে ছাড়া কোনো বড় ও ভারি শিল্প গড়ে ওঠেনি যাতে বিকল্প কর্ম-সংস্থান হতে পারে। এটাই কি সার্বজনীন উন্নতি?

সারদা কেলেঙ্কারিতে এটা জলের মতন স্পষ্ট যে গরিব দরদী সরকারের নেতারা গরিবের টাকা লুটের সাথে যুক্ত ছিলেন। কদিন আগেও এক চিটফান্ডের মালিককে দিদিমণির ভাইপো'র পাশ থেকে ধরা হয়েছিল।সত্তরের উপর মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। সর্বস্বান্ত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এটাই কি আপনার সার্বজনীন উন্নতি?

সরকারী স্কুল শিক্ষা আপনার মতে অদক্ষতার নজির। সেই স্কুলের চাকরিকে সামনে রেখে গরিব দরদী সরকারের নেতারা প্রাইমারি আর টেট নিয়ে লাখ লাখ বেকারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন। আপনাদের শিক্ষামন্ত্রী অব্দি বলতে বাধ্য হয়েছেন যে যারা যারা চাকরি দেবার নাম করে টাকা নিয়েছেন তারা যেন টাকা ফেরত দেন। এটাই কি আপনার সরকারের সার্বজনীন উন্নতি?

আপনার গাঁজাখুরি'র আরেকটা উদাহরণ দিচ্ছি। সরকারী স্কুলে বেসরকারী স্কুলের থেকে কুড়িগুণ ছেলে মেয়ে পড়ে। এইটেতে আপনার ভারি দুঃখ হয়েছে নির্ঘাৎ। কারণ, স্কুলশিক্ষাটাকে বেসরকারি করণ করা গেলোনা। আপনি লিখেছেন, 'কিন্তু সমস্যা হল, সরকার বিপুল টাকা স্কুল শিক্ষায় খরচ করা সত্ত্বেও পড়াশোনার পিছনে স্কুল পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত খরচ কমছে না। দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের স্কুল পড়ুয়াদের গড় ব্যক্তিগত খরচ সারা ভারত গড়ের খুব কাছাকাছি, এবং পশ্চিমবঙ্গের পড়ুয়ারা যে টাকাটা  স্কুল-বেতনের খাতে বাঁচাচ্ছে তার থেকে বেশি তাদের খরচ হয়ে যাচ্ছে প্রাইভেট কোচিং-এ। এর মানে, সরকার শিক্ষায় এত বেশি খরচ করা সত্ত্বেও ছাত্ররা স্কুল থেকে ঠিকমত শিখতে পারছে না। এত খরচ করেও কিন্তু শিক্ষাপ্রাপ্তির নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের স্থান সারা ভারত গড়ের কাছাকাছি। অর্থাৎ একই জায়গায় পৌঁছনোর জন্য সারা ভারতের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গকে সরকারি ও ব্যক্তিগত খরচ মিলিয়ে অনেক বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এটা অদক্ষতা।'

এবার আপনার এই ফালতু কথাগুলোর জবাব দিই। ভারতে Right of Children to Free and Compulsory Education Act বলে একটা আইন হয়েছিল ২০০৯ সালে যাতে স্পষ্ট করা বলা হয়েছে ১৪ বছর বয়স অব্দি এলিমেন্টারি এডুকেশন হবে অবৈতনিক। অর্থাৎ, স্কুলে কোনো বেতন নেওয়া হবেনা।খরচটা বহন করবে কেন্দ্র এবং রাজ্য (শতাংশ অনুপাতে প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রই ৬৫% খরচ দেয়) ।কিন্তু পড়াশুনোর তো কিছু আনুসঙ্গিক খরচ থাকেই এবং সেটা গোটা দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। রাজস্থানের ক্লাস সেভেনের ছেলেটাকেও খাতা পেন কিনতে হয় এ রাজ্যের আমডাঙ্গার ছেলেটার মতন। তাহলে পশ্চিমবঙ্গের স্কুল পড়ুয়াদের গড় ব্যক্তিগত খরচ সারা ভারত গড়ের খুব কাছাকাছি হবে এতে আশ্চর্য হবার মতন কিছু আছে কি?

নাকি, আপনারও ধারণা এরাজ্যে স্কুলের গোটা টাকাটাই মন্ত্রীসভার কারুর পৈতৃক সম্পত্তি থেকে আসে?

প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভরতা বাড়ছে। তার কারণ হল প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে বাচ্চাদের নামিয়ে দেওয়া। সব্বাইকে সব কিছুতে ফার্স্ট হতে হবে।এইটে এক ধরণের সামাজিক অসুস্থতা। আপনি তার দায় দিচ্ছেন স্কুলের উপর। আমি বলছিনা যে সরকারী স্কুলে খুব পড়াশুনো ভালো হয়। একটা পার্সেন্টেজ শিক্ষক নিশ্চয়ই ফাঁকিবাজ। কিন্তু বেশিরভাগ খারাপ হলে তো সরকারী স্কুলের প্রতি এত নির্ভরতাই থাকতো না।

একটা হাইস্কুলে একজন মাস্টারমশাইকে দিনে কটা ক্লাস নিতে হয় সেটা আপনার জানা আছে? একটা হাইস্কুলে একজন মাস্টারমশাইকে কম করেও সপ্তাহে ২২-২৫ টা ক্লাস নিতে হয়। এর বাইরে প্রভিসনাল ক্লাস থাকে।দিনে কম করেও পাঁচটা, মোট দুশো মিনিট। প্রতি ক্লাসে গড়ে কম করেও পঞ্চাশের উপর ছেলে-মেয়ে। চল্লিশ মিনিটের ক্লাসে সবাইকে ঠিকঠাক দেখানো সম্ভব?

উত্তর হচ্ছে না। তাহলে আরো সেকশন বাড়াতে হবে। আরও শিক্ষক লাগবে।
কিন্তু শিক্ষক তো আপনারা নিয়োগ করবেন না। কারণ আপনার মতে 'অদক্ষতার একটা উদাহরণ স্কুলশিক্ষা।'

কিন্তু একইসাথে ঢালাও বেসরকারী বিএড আর ডিএড কলেজের পারমিশন দিয়ে যাবেন। মাঝে মধ্যেই স্কুলে শিক্ষক নেবো বলে বিজ্ঞাপন দেবেন। হাজার হাজার গরিব ছেলে মেয়ে জমি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা দিয়ে এসব কলেজ থেকে বিএড ডিএড পাশ করে বেরিয়ে এসে দেখবে যে আপনি বক্তিমে ফলাচ্ছেন যে 'অদক্ষতার একটা উদাহরণ স্কুলশিক্ষা' তাই এখানে আর শিক্ষক নিয়োগের দরকার নেই, বরং সেই টাকা দিয়ে সার্বজনীন উন্নয়নের নামে দিদিমণি'র আরও কটা ঢাউস ফ্লেক্স টাঙানো হোক।

পারলে নিজের মুখটা একবার আয়নায় দেখুন। ভালো থাকুন।

শনিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৬

আনন্দমার্গী ~ সুশোভন পাত্র

ইমাম আলি কে চেনেন? আজকের এই তৌহিদুল ইসলাম, ফজলে হক, দুখিঃরাম ডালের মতই ইমাম আলি কেও সেদিন মোড়া হয়েছিলো ঐ কাস্তে হাতুড়ির লাল শালুতেই। তখন বিহারের কলিয়ারির শ্রমিক বস্তি গুলোতে লাল ঝাণ্ডার দাপট বাড়ছে ক্রমশ। ঝরিয়া, কেশারিয়া, পিপড়ার অলিগলিতে তখন 'কমরেড' ডাক কানে বাজছে। সকাল আটটার ট্রেনে জ্যোতি বসু কে স্বাগত জানাতে সেদিন পাটনা প্লাটফর্মেই হাজারো মানুষ। পোস্টার-ফেস্টুন আর 'ই-কি-লা-ব'র তুমুল শ্লোগানে ছয়লাপ ষ্টেশন চত্বর। হঠাৎ চলল গুলি। লক্ষ্যভ্রষ্ট বুলেট গিয়ে বিঁধল ইমাম আলির বুকে। আততায়ী মিলিয়ে গেলো জনস্রোতে। হাসপাতাল যাবার আগেই শহীদ হলেন ইমাম আলি। 'কমরেড' ইমাম আলি। পরে গোয়েন্দা দপ্তর জানালো, আততায়ী ছিলেন 'আনন্দমার্গী'। কদিন পর পাঞ্জাব সীমান্তে পাকিস্তান থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে গিতে বিএসএফের হাতে ধৃত দুই মার্গী যুবকের স্বীকারোক্তি, তাঁদের সংগঠনই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত। আসলে গেঁয়ো যোগী যেমন ভিখ পায় না, লাল শালুতে মোড়া লাশেরও তেমন, 'সিপিএম'র গণহত্যার' মত, প্রথম পাতায় ৬০ পয়েন্টের হেডিং হয় না।          
১৯৫৫'র ৯'ই জানুয়ারি বিহারের জামালপুর অঞ্চলে প্রভাত রঞ্জন সরকার ওরফে 'আনন্দমূর্তি' ওরফে 'বাবা'র হাত ধরে জন্ম এই 'আনন্দমার্গ'র। স্বঘোষিত ধর্মগুরু প্রমাণের তাগিদে শুরু হল বাবার নিত্য বচন। বাবার শিব দর্শন, শৈশবে বাঘের পিঠে জঙ্গল ভ্রমণের অলৌকিক সব কাহিনী। আনন্দমার্গ'র সর্বক্ষণের কর্মী হতে তখন দীক্ষা লাগে। পোশাকি নাম পড়ল 'অবধূত'। মার্গের রাজনৈতিক কর্মসূচী পরিচালনার জন্য তৈরি হল, 'প্রাউটিস্ট ব্লক অফ ইন্ডিয়া'। তাদের মুখপত্র 'প্রাউট' ঘেঁটে জানা যায় বাবা'র  অনন্য বিচারধারা। "অহিংসা উপর ভিত্তি করে আধ্যাত্মিকতা মানবতার কোন উপকারেই আসবে না", "ভারতবর্ষের গণতন্ত্রে নিরক্ষর ও অশিক্ষিতদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া উচিত", "কমিউনিজম মানুষ কে জন্তুতে পরিণত করে" ইত্যাদি।  স্বৈরতান্ত্রিক এবং ধর্মগোঁড়া এই বাবার লালিত পালিত গুপ্ত আধ্যাত্মিক সংগঠন যে পরবর্তী সময় জ্যোতি বসু ছাড়াও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী আব্দুল গফুর, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এন এন রায় কে হত্যার ব্যর্থ ষড়যন্ত্রের করবে , এমনকি রেলমন্ত্রী ললিতনারায়ন মিশ্র হত্যাও করবে এতে আর  আশ্চর্য কি? বলদ দিয়ে তো আর হাল চাষ হয় না ।
ক্রমশ ভক্ত এবং মার্গের অভ্যন্তরেও বাবা'র বিরুদ্ধে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়। ১৯৭১'এ কলকাতার 'ধর্ম মহাচক্র'র পর 'আনন্দমূর্তি'র স্ত্রী উমা সরকার ও প্রাক্তন অবধূত, 'প্রাউটের' অর্থসচিব নওল কিশোর আনন্দমার্গের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করলেন। নওল কিশোর তাঁর 'আনন্দমার্গঃ সয়েলিং  দি সাফরন রব' বইয়ে লেখেন 'গুরুর বিরুদ্ধে জেহাদের অপরাধে ৩৬ জন আনন্দমার্গী কে ছোটনাগপুরের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে পেট চিরে, চোখ উপড়ে হত্যা করা হয়।' পরে ঐ মামলায় অভিযুক্ত অন্য এক অবধূত মাধবানন্দ'ও আদালতে জানান 'গুরুর নির্দেশে তিনি নিজেই ১৮ জন অবধূত কে হত্যা করেছেন।' আবার ১৯৭৩'র ৯'ই এপ্রিল মার্গের পক্ষে থেকে প্রচার করা হল যে বিহারের বিধানসভার সামনে দিভিয়ানন্দ অবধূত 'স্বেচ্ছা আহুতি' দিয়েছেন। ২৪শে এপ্রিল দিল্লিতেও আবার 'স্বেচ্ছা আহুতি'। পরে পুলিশি তদন্তে অবশ্য প্রমাণ হয় তাঁদের আসলে জ্যান্ত জ্বালিয়ে মারা হয়েছিল।
পুরুলিয়া ও বিহার সীমান্তে জয়পুর ও ঝালদা ২ নং ব্লকের আদিবাসী, সরকারী ও রায়তি জমি মিলিয়ে হাজার একর জমি বেআইনি ভাবে দখল করতে উদ্ধ্যত হয় এই মার্গীরা। ১৯৯০'র ১৮ই এপ্রিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুফতি মহম্মদ সঈদ লোকসভা তে এক বিবৃতিতে মার্গীদের বিরুদ্ধে জমি হাতিয়ে নেওয়ার এই সত্যতা স্বীকার তো করেনই সাথে পুরুলিয়ার বাঁশগড়ের জঙ্গলে বিদেশ থেকে আমদানি করা বে-আইনি অস্ত্র মজুতের অভিযোগও করেন। ১৯৯৫'র ডিসেম্বরর বিমান থেকে পুরুলিয়া অস্ত্র-বর্ষণ কাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত কিম ডেভি তাঁর সাক্ষ্যতেও আনন্দমার্গীর বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে আমদানি করা বিপুল বে-আইনি অস্ত্রের কথা উল্লেখ করেন এবং জানান ঐ বিমানেই ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক আনন্দমার্গী দয়ানন্দ অবধূত।      
এতো কিছু পরও ১৯৮২'র ৩০শে এপ্রিল বিজন সেতুতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ১৭ জন মার্গী মারা যাওয়ার ঘটনা  ন্যক্কারজনক। 'ছোট্ট' , 'সাজানো ঘটনা' বা 'বিরোধীদের চক্রান্ত'  নয় বরং  ৪ঠা মে, সিপিএম রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত জানান "আনন্দমার্গীর ঘটনাতে আমরা গভীর ভাবে উদ্বিগ্ন। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি। প্রকৃত ঘটনার সঠিক তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি দেওয়া হোক।"  সিপিএম বিধায়ক শচিন সেন, কান্তি গাঙ্গুলি প্রমুখের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়, বিচারও শুরু হয়। কিন্তু ঠিক কি কারণে আনন্দমার্গীরা সেদিন ঢাল তরোয়াল মড়ার খুলি নিয়ে মিছিলের অনুমতি চেয়েছিল? অনুমতি না থাকলেও তাহলে কেন সেদিন ঐ মিছিল  হয়েছিলো? কেন পরবর্তী সময় আনন্দমার্গীরা আদালতে সাক্ষ্য প্রমাণ দিতে অস্বীকার করলেন? তাঁদের ধারাবাহিক অনুপস্থিতির কারণে যে মামলা বাতিল হল তাঁর দায় কার? 'সিপিএমের গণহত্যা' প্রমাণের এমন সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারালেন কেন? না এটাও ছিল ছোটনাগপুরের জঙ্গলের মতই অন্তর্দলীয় হত্যালীলা?  কিম্বা  দিল্লী-পাটনার অবধূত'দের মত 'স্বেচ্ছা আহুতি'?
২০১১'র আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলার শিরা ফুলিয়ে প্রতিশ্রুতি দিতেন "৩৪ বছরের সমস্ত গণহত্যার তদন্ত করবেন। কমিশন বসাবো"। তাহলে কেন "বিজনসেতুর সিপিএম'র গণহত্যার" প্রায়শ্চিত্ত হল না? কেন  ১৭ জন মার্গীর 'অতৃপ্ত আত্মা' বিচার পেল না? কেন সিপিএম'র কেউ জেলে গেলো না? হোক না একটা গণহত্যার সাচ্চা হিসেব নিকেশ। তৌহিদুল ইসলাম থেকে ইমাম আলি। অজিত লোহার থেকে শালকু সরেন। ঝর্না মান্ডি থেকে রোহিত ভামুলা। হোক সেটা, ইতিহাসের পাতা থেকেই। যে ইতিহাস আত্মবলিদানের। যে ইতিহাসের পাতা বামপন্থীদেরই রক্তে ভেজা। যেখানে জমাট রক্তের রং লাল। শুধুই লাল...

শুক্রবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৬

হাজার লেনিন ~ অনামিকা মিত্র


একটা লেনিন কাগজ কুড়োয়, ঝরতি এবং পরতি
একটা লেনিন ...রক্ত বমি ,হাসপাতাল -এ ভর্তি,
একটা লেনিন ইস্কুল -ছুট ,অনেক রাস্তা হেঁটে
একটা লেনিন বাদাম জোগায়, ট্রেন -যাত্রীর পেটে ,
একটা লেনিন ভর-সন্ধ্যায় ,গলির মুখে ছিনতাই
একটা লেনিন ধুঁকছে নেশায় ,ঝিমোয় সারা দিন টাই ,
একটা লেনিন ,প্রমোটরের বাধ্য কেয়ার টেকার
একটা লেনিন শিক্ষা শেষে ,বিষন্ন -মুখ বেকার ,
একটা লেনিন গলায় দড়ি .."আলু -র তত দাম নেই "
একটা লেনিন চায়ের দোকান, বন্ধ মিলের সামনেই,
আমরা হাজার - লক্ষ্ লেনিন ,আমরা কবে ভাববো -
লেনিন মানে সত্যি বাঁচা ,বেঁচে থাকার কাব্য !

মঙ্গলবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৬

যো ডর গ্যায়া সমঝো মর গ্যায়া ~ সুশোভন পাত্র

কিংসমিড,ডারবান, ২০০৭। স্টুয়ার্ট ব্রডের ওভারের প্রথম বলটা, ওয়াইড লং অন বাউন্ডারির উপর দিয়ে উড়ে গেছে গ্যালারির পিছনে। দ্বিতীয় বলে, কব্জি মোচড়ানো ফ্লিকটা আছড়ে পড়ল ডিপ স্কয়ার লেগের গা ঘেঁষা বিল্ডিং'র কার্নিশে। ক্যামেরার লেন্স তখন জুম করেছে অনুতপ্ত ফ্লিনটফের মুখ। তৃতীয় বলের পর সাইড চেঞ্জ। এবার রাউন্ড দা উইকেট। আর এবার, ডিপ এক্সট্রা কভার। চতুর্থ বলের পর শর্ট মিড উইকেট থেকে দৌড়ে এসে বোলার কে পরামর্শ দিয়ে গেলেন ক্যাপ্টেন কলিংউড। অতঃপর ফিল্ডিং চেঞ্জ। পঞ্চম ও ষষ্ঠ বলের আগে একে একে বলার কে সাহস দিয়ে গেলেন লিউক রাইট, পিটারসেনরা। কিন্তু কোন কিছুই সেদিন রাজসিক যুবরাজ কে ক্রিকেটের ক্যানভাসে ধ্রুপদী রূপকথার ছবি আঁকা থেকে আটকাতে পারেনি। এক মহাপুরুষ বলেছিলেন, "তুমি যাহা চিন্তা করিবে, তাহাই হইয়া যাইবে। যদি তুমি নিজেকে দুর্বল ভাবো, তবে দুর্বল হইবে; তেজস্বী ভাবিলে তেজস্বী হইবে।" ভারতবর্ষের বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে এই 'ভাববাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রশ্নাতীত না হলেও অনেক সময়ই ক্রিকেট কেবলই 'মনস্তাত্ত্বিক'। আপনি যেখানে চাইবেন বোলার ঠিক সে-খা-নে-ই বল করবে। নাহলে ইংলিশ বা হাতি ওপেনিং ব্যাটসম্যান, ক্রিস ব্রডের, এই ছেলে, যে এখন ইংল্যান্ড ক্রিকেটের মেরুদণ্ড, টি২০ ক্যাপ্টেন, সে কিনা  ছ-খানা বলই নিয়ম করে হয় হাফভলি না হয় ফুলটসে সাজিয়ে দিলেন। আরে টি-২০ ক্রিকেটের স্লগ ওভারে বল করতে যাওয়ার আগে, আমাদের পাড়ার গাবলু অবধি আপনাকে পই পই করে বলবে "আর যাই কর বাছা, ফুলটস আর হাফভলিটা দিস না"। আসলে নার্ভাসনেস দাদা, নার্ভাসনেস। এটাই হল অন ফিল্ড নার্ভাসনেস। গব্বর সিং বেঁচে থাকলে বলতেন "যো ডর গ্যায়া সমঝো মর গ্যায়া।" তখন আপনি যতই ভাবুন ইয়র্কার দেবেন ঠিক দেখবেন ফুলটস পড়ে গেছে। যতই ভাবুন বাউন্সার দেবেন দেখবেন হাফভলি পড়ে গেছে। আর যতই ভাবুন সিপিএম কে বাঁশ দেবেন দেখবেন, মুকুল উল্টো গাইছে, ম্যাডাম ক্ষমা চাইছেন, বৌ-বাজারের মোড়ে স্লিপ ও টাং'এ ভাইদের পথে বসিয়ে বলছেন "আগে জানলে টিকিটই দিতাম না"
তা ম্যাডাম, লজ্জার মাথা খেয়ে, না হয় ধরেই নিলাম যে আপনি আগে কিছুই জানতেন না। কিচ্ছুটি না। আপনি একেবারে শিশুর মত নিষ্পাপ। ফুলের মত কোমল। তা এবার তো জানেন? না হয় প্রার্থী তালিকা ঘোষণাই হয়ে গেছে, কিন্তু ডিয়ার 'অগ্নিকন্যা' ওরফে 'সততার প্রতীক' ওরফে 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়', আপনি যদি সত্যি কাউকে প্রার্থী হিসাবে নাই চান, তাঁদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে খড়গহস্তই হন, তা হলে তো শুভেন্দু বাবুর মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের এখনও তো সময় আছে। হোক প্রত্যাহার। গোটা রাজ্য বয়ে বেড়িয়ে, হেলিকপ্টার হাঁকিয়ে, আপনিই তো বলে বেড়াচ্ছেন, ২২০'র বেশি আসন সহ জয় নাকি নিশ্চিত। তা আপনার তো দয়ার শরীর ম্যাডাম, দিন না ছেড়ে ঐ গোটা পাঁচ-সাতটা সিট। সমুদ্র থেকে দু-বালতি জল তুলে নিলে আর কিই বা যায় আসে বলুন। আপনার সম্মানও বাঁচবে। সততা পারদও চড়চড় করে ঊর্ধ্বগামী হবে। আর একান্তই যদি এসব কিছুই করা না যায়, তাহলে তোয়ালা খ্যাত শ্রী শোভন বাবু কে দিন তো মেয়র পদ থেকে সরিয়ে। করুন স্থাপন একটা জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। আরে বাবা কলকাতা পৌরসভা নির্বাচনের তো নিশ্চয় আর প্রার্থী ঘোষণা হয়নি। তাই না?
ইংল্যান্ড তখন ঘরোয়া ক্রিকেটে টি-২০'র আঁতুড় ঘর পেরিয়ে এসেছে। সে ম্যাচে কিছু টি-২০ স্পেশালিষ্ট নামিয়েছিল। কি হাবভাব তাঁদের। কি সব ভয়ঙ্কর নাম। ড্যারেন ম্যাডি, দিমিত্রি ম্যাসকেরেনাস। বলছে, কেউ নাকি ছয় মারার স্পেশালিষ্ট তো কেউ  ইনসুইং'র। ঠিক যেন অনুব্রত আর আরাবুল। কেউ গুড় বাতাসা, কেউ চড়াম-চড়াম। কিন্তু দুঃখ হল, এতো কিছুর পর দিদি এখন আমাদের নার্ভাস স্টুয়ার্ট ব্রড। প্রথম তিন দফার পরই লুস বল দিতে শুরু করেছেন। বুদ্ধিজীবীরা নির্বাচন কমিশনে দৌড়ে গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। ক্যাপ্টেন এসে পিঠ চাপড়ে সাহস দিচ্ছেন। দিদি সাইড চেঞ্জ করছেন। রিষ্ট ব্যান্ড ঘাম মুছছেন। নতুন করে ফিল্ডিং সাজাচ্ছেন। আজ বর্ধমান তো কাল এন্টালি দৌড়চ্ছেন। কিন্তু যেই রান আপ শেষে বল করছেন, সেই হয় হাফভলি না হয় ফুল্টস। ছ দফা ওভারে এবার একটা নো বল'ও হবে। আর নো বলে তো আবার ফ্রি হিট। দিন ফ্রি হিটে স্টেপ আউট করে ।বাপি এবার বাড়ি যা...

রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৬

চিক্কুস ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

লাল মোরাম বিছানো রাস্তা। গাড়ি গেলে খরখর করে শব্দ হয়।
অবশ্য গাড়ি আর ক'টা! স্কুল ট্রিপ বা মার্কেটিং ট্রিপের ভ্যান, নয়তো বাবার অফিসের এম ডি মাঝেসাঝে এলে।
রাস্তার দু'ধারে কৃষ্ণচূড়া দেবদারু আর নাগকেশর গাছ। তার তলায় রঙ্গন, সিনোয়ারি, বাবলা, লজ্জাবতীর ঝোপ। ওইখানে বহুরূপীগুলো লুকিয়ে থাকে আর মাঝে মাঝে ঘাড় তুলে দেখে কে এলো। মাঝে মাঝে টকটকে লাল রঙ, ভেলভেটের মতো গা, ছোট্ট মাকড়সা দেখা যায়। তুড়ুক তুড়ুক করে কাঠবিড়ালি লাফায়। ফড়িং ওড়ে। একটু ভিজে জায়গায় শামুক থাকে।
  রাস্তা দিয়ে এগোলে কলোনীর গেট। পাশে বুগনভিলিয়া। তার ছায়াতে ফোল্ডিং চেয়ারে বসে থাকে সিকিউরিটি কাকু। আমি ছিপটি হাতে রাস্তায় দাগ টানতে টানতে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাই। কাকু আমাকে চেনে, হাসে। এখন গরমের ছুটি। সকালেই আমার পড়াশোনা শেষ করে বেড়াতে বেরোই। হাতে থাকে ছিপটিটা। নতুন কোনো ফুল, নতুন কোনো পাতা পেলে কুড়িয়ে আনি। দুপুরে বাবা ভাত খেতে আসলে দেখাই। গোল নুড়ি পেলে মা-কে এনে দিই। মা সাজিয়ে রাখে।
এইরকমই একদিন হাঁটতে হাঁটতে কলোনীর বাইরে দেখি একটা জটলা। কয়েকজন লোক একটা বাচ্চা বাঁদরকে ঘিরে বসে আছে। মায়ের কোল থেকে নাকি পড়ে গেছে, ভয়ে জুলজুল করে তাকাচ্ছে। আমাকে দেখেই আমার কোলে উঠে পড়লো। সবাই বলল, তাহলে ওটা আমার কাছেই থাক। আমিও নিয়ে চলে এলুম বাড়ি। মা খুব খুশী, বাবাও এসে খুশী হল। ছোট প্লাস্টিকের ডিশে একটু দুধ দিতে চুকচুক করে খেল। জল খেল। আর আমার কোলে উঠে বসে রইল। আমি নাম দিলুম জুলজুল। বাবা নাম দিল মাঙ্কিম্যান। মা নাম দিল চিক্কুস। মায়ের দেওয়া নামটাই রয়ে গেল। 
এইভাবে চিক্কুস আমাদের বাড়ি এল। আমার একটা সারাদিনের সঙ্গী হল। বিস্কুট দিলে অনেকটা মুখে পুরে গালের একপাশে রেখে দিত। রাত্তিরে আমাদের বাইরের চৌবাচ্চার পাশে একটা বস্তা নিয়ে মাথায় ঘোমটার মতো টেনে ঘুমোতো। তখন ওকে দেখতে লাগতো ঠিক একটা বুড়ো দাদুর মতো। সেই সময় ওকে জাগিয়ে দিলে রেগে দাঁত খিঁচোত খুব! চান করতে চাইত না। আমি ওকে ধরে বাগানে জলের পাইপ দিয়ে চান করাতুম। নখ কেটে দিতুম। আমার কাছে খুব শান্ত হয়ে থাকতো। মা একটা প্যান্ট সেলাই করে দিয়েছিল, ল্যাজের জায়গায় ফুটো। সেটা পরে ঘুরতো।
তারপর আমার স্কুল খুলে গেল। সারাদিন আর দেখতে পেতুম না চিক্কুসকে। বিকেলে আমি ফিরলেই লাফিয়ে এসে জড়িয়ে ধরতো। মা বলতে শুরু করতো ওর সারাদিনের গল্প। বদমায়েশীর নালিশ করলে চিক্কুস চুপ করে বসে থাকতো, মাথা নীচু। যেন কতো অনুতাপ। অনুতাপ কথাটা বাবা শিখিয়েছিল আমাকে।
আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো, বদমায়েশিও বাড়তে লাগল। রাস্তায় কুকুরগুলোর সঙ্গে খেলতো, কাঠবিড়ালি দেখলে তাড়া করে জামগাছে, পেয়ারাগাছে উঠে যেত। একদিন দরজা রঙ করবার জন্যে সবুজ রঙের কৌটোটা উল্টে সারা গায়ে মাখলো, ঘরময় করলো। সেদিন ওকে কেরোসিন তেল দিয়ে চান করাতে হলো। টেবিলে পেয়ারা বা কলা রাখলেই এসে খেয়ে নিত। বকলে মাথা নীচু করে থাকতো, আবার যে কে সেই। বাথরুম পেলে টয়লেটে যেত, শিখিয়ে দিয়েছিলুম। মাঝে মাঝে দেখতুম উদাস হয়ে বসে আছে, হয়তো ওর মায়ের জন্যে মন কেমন করতো...
তারপর কলোনীর অন্য কাকুরা নালিশ করতে আরম্ভ করলো। চিক্কুস নাকি ওদের বাড়ি গিয়ে সব নষ্ট করছে! লোকের চাপে ওকে বেঁধে রাখা হোত। করুন স্বরে কাঁদতো, আমার মায়া হোত। খুলে দিতুম। আবার বদমায়েশি করতো, আবার নালিশ আসতো।
  এর মধ্যে আমাকে একটা বড় ইস্কুলে ভর্তির পরীক্ষা দিতে হোল। সেখানে নাকি হস্টেলে থাকতে হবে! চিক্কুসকে একদিন বললুম, যে আমাকেও ওর মতো মা বাবাকে ছেড়ে থাকতে হবে। ও কী বুঝল কে জানে, আমাকে জড়িয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। ওকে ভদ্র করবার যতোই চেষ্টা করতুম, ও আরও বাঁদর তৈরি হছিল। সেই সময়েই ঘটলো দুর্ঘটনাটা। বাবার অফিসের ডিরেক্টরের ছোট্ট নাতি এসেছিল বেড়াতে। আমাদের কোয়ার্টার্সের সামনে দিয়ে হাঁটছিল। নতুন ছেলে দেখে চিক্কুস তেড়ে গেছিল, ভয় পেয়ে ছেলেটা দৌড়ে পালাতে গিয়ে পড়ে গেল। হাঁটু ছড়ে গেল। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গিয়ে সে বানিয়ে বললো চিক্কুস নাকি ওকে আঁচড়ে কামড়ে দিয়েছে! বাবাকে ডেকে ডিরেক্টর বললেন, বাঁদরটাকে এখনই বিদায় করতে। বাকিরাও সায় দিল। যারা চিক্কুসের খেলা দেখে মজা পেত এতদিন, তারাও একে একে নালিশ করতে লাগলো। আমরা অবাক হয়ে দেখলুম।
সেই ডিরেক্টরই এক রবিবার ফোন করে ব্লু ক্রসের গাড়ি ডেকে পাঠালো। সেদিন আমরা সকাল থেকে কেউ কিচ্ছু খাইনি। চিক্কুসও খায়নি। ভ্যান থেকে দুজন কাকু নামতেই চিক্কুস পালিয়ে গাছের ওপর উঠে পড়লো। কিছুতেই নামছিল না। শেষে আমি গিয়ে ডাকলুম, তখন নেমে এল। আমার কোলে উঠে আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। একজন কাকু ওকে কী একটা ইঞ্জেকশন দিল, ঘুমের ওষুধ নাকি। চিক্কুস একটু কেঁপে উঠে আমাকে আরো জড়িয়ে ধরলো। আমি দাকলুম, "চিক্কুস! চিকাই!" জুলজুল করে তাকালো, সেই একদম প্রথম দিনের মতো। কী যেন একটা বলতে চাইল। তারপর আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল আমার কোলে। আমি ওর পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলুম।
ব্লু ক্রসের কাকুটা বাবাকে বলল, আমরা ওকে যখন খুশী গিয়ে দেখে আসতে পারব। কিন্তু তাতেও বাবা খুব কষ্ট পাচ্ছিল। মা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেই বসেছিল। কাকুটা আমার কোল থেলে যত্ন করে চিক্কুসকে নিলেন, একটা নরম তোয়ালে জড়িয়ে ভ্যানে তুললেন। দরজা বন্ধ হল, তারপর চিক্কুসের জামগাছের তলা দিয়ে, পেয়ারা গাছের পাশ দিয়ে, সেই লাল রাস্তা দিয়ে খরখর শব্দ করে ভ্যানটা...
...আর লিখতে পারছি না...

বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬

সাঁইবাড়ি ~ সুশোভন পাত্র

ঐ ২০১২। রাস্তার কোল ঘেঁষে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে লেনিন। কার্ল মার্ক্স আর এঙ্গেলস খাবি খাচ্ছে পিছনের নর্দমার হাঁটু ভর্তি জলে। ফোট ফ্রেম সহ স্তালিন হামাগুড়ি দিচ্ছে রাস্তায়। জ্যোতি বসুর মুখে লেপা আলকাতরা। সাদা-কালো কাকাবাবুর ছবিতে পেচ্ছাবের বিশ্রী গন্ধ। সাবল দিয়ে ভাঙ্গা গেটের তালাটা ছুঁড়েই ভাঙ্গা হয়েছে টিভিটা। মেঝে ভর্তি ভাঙ্গা চেয়ার-টেবিল। উপরের তাকটা থেকে মাঝে মাঝে গায়ে এসে পড়ছে মেম্বারশিপ ফর্মের টুকরো গুলো। গোটা ঘর তছনছ। আর বাইরে, এককোণে, তখনও, আগুনে পুড়ছে কিছু জরুরী কাগজপত্র আর গোটাকতক লাল পতাকা। হার্মাদ সিপিএমে'র ৩৪ বছরের বা তারও আগের 'গণহত্যা'র বদলা নিয়ে, জোনাল পার্টি অফিসে, 'গণতন্ত্রে'র নিদর্শন রেখে গেছেন, একালের 'সততা'র পূজারীরা। পাড়ার মোড়, রাস্তা-ঘাট, চায়ের ঠেক স্পিকটি নট। লোকাল পুলিশ আরও স্পিকটি নট। অ্যাপলিটিক্যাল, নিরপেক্ষ, মধ্যপন্থী, সুশীল, বুদ্ধিজীবী,কবি, টেক্সাসের বাঙালি টেকনোক্র্যাট, ম্যানচেস্টারের প্রবাসী চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, আরও আরও স্পিকটি নট। আসলে নন্দীগ্রাম থেকে মরিচঝাঁপি, আনন্দমার্গী থেকে নেতাই'র 'গণহত্যার' কাণ্ডারি সিপিএম'র প্রতি নিখাদ জনরোষ দাদা। 'গণহত্যা' বলে 'গণহত্যা'? সেই সাঁইবাড়ি দিয়ে শুরু। ভয়ানয়-ভয়ঙ্কর। সে কি মশাই আপনার সাঁইবাড়ি মনে নেই? সাঁ-ই-বা-ড়ি? 

৭০'র উত্তাল বাংলা।একদিকে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার বাংলা। 'লাঙ্গল যার জমি তার' আর 'বেনামি জমি দখল রাখো, দখল রেখে চাষ কর' শ্লোগানে মুখরিত বাংলা। আর অন্যদিকে, যুক্তফ্রন্ট সরকার, রাষ্ট্রপতি শাসন, মুক্তিযুদ্ধের তাপে তেতে ওঠা বাংলা। বিকল্প জোটের সুশীল ধাড়া কে সঙ্গে নিয়ে, ১৬'ই মার্চ পদত্যাগ করলেন অজয় মুখার্জি। সিপিএম'র নেতৃত্বাধীন সংখ্যাগরিষ্ঠ যুক্তফ্রন্ট কে সমর্থন করতে অস্বীকার করল ফরওয়ার্ড ব্লক, এসইউসিও। ১৩ মাসের মধ্যেই আবারও মুখ থুবড়ে পড়ল দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার। বাংলা কংগ্রেসের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিবাদে, বিপিটিউসি সহ অন্যান্য গণ সংগঠনের ডাকে, পরেরদিন রাজ্য জুড়ে ধর্মঘট পালিত হবে। 

ধর্মঘটের সমর্থনে, ১৭'ই মার্চ সকালে বর্ধমানে তখন আদিবাসী ও কৃষকদের লাল ঝাণ্ডার লম্বা মিছিলে হঠাৎ আক্রমণ। শুরু হল ব্যাপক বোমাবাজি। ছত্রভঙ্গ জনতা প্রতিরোধের রুদ্ররূপ দেখে গুণ্ডারা তখন ঐ সাঁইবাড়ি'র আশ্রিত। জনতার সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে নিহত হলেন মলয় সাঁই, প্রণব সাঁই এবং জিতেন রায়। অবশ্যই নিন্দনীয় এবং অনভিপ্রেত। কিন্তু কারা এই মলয় সাঁই, প্রণব সাঁই? রবীন্দ্র-নজরুল-বিবেকানন্দ নাকি? না ধোয়া তুলসী পাতা? না, বরং, কংগ্রেস জমানাতেই পিডি অ্যাক্টে অভিযুক্ত জেল ফেরত দাগী আসামী। তাঁদের জামিনের প্রাক শর্তই তো ছিল বর্ধমান শহরে প্রবেশ নিষিদ্ধতা? তাহলে কেন এবং কার মদতে তাঁরা সেদিন এসেছিলেন বর্ধমান শহরে? কোন পুণ্য কাজটা করতে এসেছিলেন? 

তৎকালীন রাজ্যপাল ধরমবীর অবশ্য সেদিন সন্ধ্যেতেই ছুটে গিয়েছিলেন সাঁইবাড়ি তে। সিপিএম'র 'গণহত্যা'। জব্বর ব্যাপার। তা বেশ, সাঁইবাড়ি, না হয় 'গণহত্যা'। আর ঐ দিনই হুগলির ত্রিবেণীর কেশোরাম রেয়নে শ্রমিক নেতা ননী দেবনাথ সহ পাঁচজনের এনকাউন্টার? টুকরো টুকরো করে ফার্নেসে ছুঁড়ে ফেলা লাশ? রাজ্য জুড়ে আরও ১৫ জন বাম কর্মীদের খুনের জমাট রক্ত? হবে নাকি 'গণহত্যা' নিয়ে একটা ঘণ্টা খানেক স্যার? ২২'শে এপ্রিল, মঙ্গলকোটের গরিব খেতমজুর মীরপাড়াতে গর্ভবতী পুস্পরানি মাঝির উপর সিআরপিএফ'র নির্মম অত্যাচার, তুলসী মাঝির কোল থেকে ছুঁড়ে ফেলা শিশুর আর্তনাদ, ডাব বাগদী থেকে শুরু করে ৮০ বছরের ইন্দুমতী মাঝির শ্লীলতা হানি, কুয়োয় ফেলা শ্যাম দাসীর চার বছরের সন্তানের নিথর মৃতদেহ। তখনও আঁতুড় ঘরের চৌকাঠ না ডিঙানো কিম্বা দুগ্ধপোষ্য, আজকের 'সততা'র পূজারী ভাইরা, হোক না 'গণহত্যার' একটা হিসেব-নিকেশ। 

সাঁইবাড়ি কাণ্ডে, ঐ দিনই, দুপুর সাড়ে বারোটায়, দিলীপ কুমার ভট্টাচার্যর অভিযোগের ভিত্তিতে, বর্ধমান থানায় প্রায় ১৫০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রুজু হয়। ঐ অভিযোগে নাম না থাকলেও, ডিডিআই আসানসোল পরে বিনয় কোঙার নাম যুক্ত করে, মোট ১১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। ৭৩'এ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বর্ধমান আদালত মামলাটি আলিপুরের সাব ডিভিশনাল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে স্থানান্তরিত হয়। ৭৭'এ সরকার ফৌজদারি কার্যবিধির ৩২১ ধারা মতে আবেদন করলেও বিচারপতি গীতেশরঞ্জন ভট্টাচার্য মাত্র চারজন অভিযুক্তর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের অনুমতি দেন। পরে পাবলিক প্রসিকিউটার একটি চিঠি এনেক্সচার রূপে জমা দেন তাতে দিলীপ কুমার ভট্টাচার্য পরিষ্কার লেখেন যে- তিনি প্রত্যক্ষদর্শী নন। তৎকালীন কংগ্রেসের জেলা সম্পাদক নুরুল ইসলামের অভিযোগ পত্রে সাক্ষর করেছেন মাত্র। চার্জশিটের অপর সাক্ষী ইতিকা দত্ত আদালত কে জানান তিনি ঐ সময় শহরেই ছিলেন না। মৃত মলয় সাঁই ও প্রণব সাঁই'র জীবিত ভাই বিজয় সাঁই, ভগ্নী স্বর্ণলতা যশ ও ভগ্নীপতি অমলকান্ত যশও বিচারপতি কে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করলে, বিচারপতি আবেদন মঞ্জুর করে সমস্ত অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস করেন।

প্রতীকী তে কিম্বা পৌত্তলিকতায় আমার কোন বিশ্বাস নেই। তাই স্তালিনের হামাগুড়ি, লেনিনের ডিগবাজি, মার্ক্সের খাবি খাওয়াতেও আমার কিছুই যায় আসে না। ছবি টাঙ্গালেই যেমন পার্টি অফিসে যেমন জ্যোতি বসুর আত্মা ভর করে না, দাঁড়ি রাখলেই যেমন রবীন্দ্রসঙ্গীত আসে না, চে'র টি শার্ট পরলেই যেমন বলিভিয়ার জঙ্গলে বিপ্লব হয় না, হাওয়াই চটি পরে ঘুরলেই যেমন কেউ 'সততার প্রতীক' হয়ে যায় না, ২১শে জুলাই'র মঞ্চে পাগলু নাচিয়ে যেমন 'শহীদ দিবস' পালন হয় না, চোখ বন্ধ করে ট্রাফিক লাইটের নিচে নাচতে শুরু করলে যেমন সেটা ডিস্কো লাইট হয়ে যায় না, ঠিক তেমনই গলার জোরে 'সাঁইবাড়িও 'গণহত্যা' হয় না। গণহত্যার হিসেব-নিকেশ যদি করতেই হয়, তাহলে হোক সেটা, ইতিহাসের পাতা থেকে। যে ইতিহাস আত্মবলিদানের। যে ইতিহাসের পাতা বামপন্থীদেরই রক্তে ভেজা। যেখানে জমাট রক্তের রং লাল। শুধুই লাল...

শনিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৬

সখী, খিস্তি কাহারে কয় ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

"খিস্তি" শব্দটির ভিতরেই কিরকম একটি অনেক না-বলা ব্যঞ্জনা রহিয়াছে। খানিক নিষিদ্ধতা, খানিক ভীতি এবং যৎপরোনাস্তি ঘৃণা- এইসব মিলিত হইয়াই বোধহয় একেকটি বিশেষ শব্দ অসাধারণ অর্থবহ হইয়া উঠে এবং যেকোন মানুষের কর্ণপটাহে তথা মানসসাগরে নিদারুণ যাতনা সৃষ্টি করিতে সমর্থ হয়। কিন্তু সত্যই কি তাই? নাকি সময়, অবস্থান, মানসিকতা এবং ব্যক্তিবিশেষে কোন একটি শব্দের অর্থের তারতম্য ঘটে?
সর্বাগ্রে এই আমার কথাই ধরি। শিশুকাল হইতেই "বইপোকা " হইবার সুবাদে তথাকথিত বড়দের, অতি-বড়দের বই-ও পড়িয়া ফেলিয়াছিলাম। পীতাভ, শুভ্র বা নীলাভ, বই পড়িবার ক্ষেত্রে কোনরূপ বর্ণবৈষম্য না থাকার ফলে আমি জাগতিক প্রায় সমস্ত রকম চলতি অশ্রাব্য গালিগালাজ সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করিয়া ফেলিয়াছিলাম অল্প বয়সেই। তথাপি মুশকিল ছিল যে, কিছুতেই একটি অশালীন শব্দও আমার মুখ গহ্বর হইতে নির্গত হইতে চাহিতনা। মনে মনে ভাবিতাম, বলিব, এই বার ঠিক বলিব, তথাপি কার্যকাল উপস্থিত হইলে কোন্‌ বারাঙ্গনার সন্তান যে আমার কণ্ঠরোধ করিয়া ফেলিত তাহা ভাবিয়া পাইতামনা। শুধু যে বলিবার সমস্যা ছিল তাহা নহে, কেহ কুবাক্য উচ্চারণ করিলেও রীতিমতন  শিহরিয়া উঠিতাম।   এমতবস্থায়, এক সুন্দর স্বর্নালী সন্ধ্যায় এক বালক-বন্ধু ইতিহাসে পঁচিশে পাঁচ পাইল এবং সমস্ত সম্পর্কের মাতা-ভগিনী করিয়া শিক্ষিকাকে শ্যালিকা সম্বোধন করিয়া বসিল। আমি যথারীতি চমকাইয়া উঠিয়া তাহাকে নিরস্ত করিবার চেষ্টা করিতেই বিকট মুখব্যাদান করিয়া আমাকে ভ্যাংচাইয়া আমার প্রাপ্ত পূর্ণমানের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনপূর্বক সে আমাকে জানাইল যে এরূপ সম্বোধনই শিক্ষিকার প্রাপ্য, এবং যেহেতু ইহাতে আমার একটিও যৌনকেশ উৎপাটিত হইতেছে না সেহেতু নীরবতা পালনই আমার পক্ষে শ্রেয়!
অদ্যপি সকলেই জ্ঞাত আছেন যে বাঙালী  নারী কদাচ এরূপ বাচালতা সহ্য করেনা। সুতরাং আমিও ক্রোধে অন্ধ হইয়া, সমস্তরকম শিষ্টতা বিসর্জন দিয়া 'মূর্খ -সঙ্গমকারী'  বলিয়া তাহার হাত মোচড়াইয়া দিয়া দ্রুতপদে সেই স্থান ত্যাগ করিলাম। বালক-বন্ধুটি বিস্ময়াহত হইয়া স্থাণুবৎ হইয়া রহিল। "আমি তখন নবম শ্রেণী"।
সেই শুরু।
তাহার পর কলিকাতার রাজপথ দিয়া বহু জল প্রবাহিত হইয়াছে। আমিও বেশ অনেকগুলি বসন্ত পার হইয়া আসিয়াছি। মাতা ঠাকুরানী যাহা ছিলেন এবং মাতা ঠাকুরানী যাহা হইয়াছেন- তাহার মধ্যে সহস্র যোজন ব্যবধান। অদ্য নানাবিধ কুবাক্য অনায়াসে উচ্চারণ করিতে পারি এবং কী আশ্চর্যের ব্যাপার, এতটুকু পাপবোধ হয়না। শুধুমাত্র তাহাই নহে, উপরোক্ত শব্দাবলী আর তদ্রূপ অশালীন বলিয়াও বোধ হয়না। অবশ্য বহু ব্যবহারে তরবারির শাণিত ফলা-র তীক্ষ্ণতাও হ্রাসপ্রাপ্ত হয়, আর ইহা তো নিতান্তই আমার নিজস্ব শালীনতা বোধ!
যাহা হউক, এক্ষণে গৌরচন্দ্রিকা যথেষ্ট হইয়াছে, পূর্বোক্ত আলোচনায় ফিরি। "খিস্তি", এক অর্থে প্রকৃত সাম্যবাদের প্রবক্তা। যে খিস্তিসকল নগণ্য  রিক্‌শাওয়ালা  দিয়া থাকেন, সেই একই ভাষা আপনি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রকোষ্ঠে বসিয়া আপনার ঊর্ধতন কর্মচারীর প্রতি প্রয়োগ করেন। বলাই বাহুল্য, যে catharsis-ও অভিন্ন দুই ক্ষেত্রেই। আবার, সামান্য দুইটাকা খুচরা না দিতে পারার হেতু অটো ওয়ালা  যে মুহূর্তে আপনার চৌদ্দ গুষ্টির গুহ্যদ্বারের  একশত আট করিতে থাকেন, তখন যেরূপ মনোবেদনা বোধ করেন, সেই একই বাক্য যখন কোন বন্ধুবর প্রয়োগ করে তখন সেরূপ প্রবল প্রসববেদনা হয়না। ইহার কারণ প্রথমেই উল্লেখ করিয়াছি, ব্যক্তি ও স্থানবিশেষে একই খিস্তির বিভিন্ন অর্থ হইয়া থাকে এবং মনোজগতে তার প্রভাবও ভিন্ন।
একটি উদাহরণ রাখিতেছি; আমার পরম পূজনীয় পতিদেবের এক অভিন্ন হৃদয় বন্ধু, যিনি উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে অতীব সম্মানিত, তাঁহার একটি মহৎ দোষ হইল যে হলাহল-সম আসব সামান্য অধিক পরিমাণে পান করিবার পর তিনি কিঞ্চিৎ অস্থির হইয়া পড়েন এবং তখন তাঁহার বাক্যাবলীর মধ্যে পুরুষের প্রধান অঙ্গটির (অধিকাংশ পুরুষের মতানু্যায়ী উহাই তাহাদের প্রধান অঙ্গ, মস্তিষ্ক নহে) একটি চলিত রূপের প্রয়োগ বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাইয়া থাকে।
অপর এক বন্ধুর নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে কয়েক বৎসর পূর্বে আমার পতিদেব, এবং উল্লিখিত বন্ধুটি তাঁহার গৃহে গমন করেন। উষ্ণ পানীয় সমাপনান্তে যেক্ষণে সকলেই আহারাদিতে ব্যস্ত এবং বন্ধুর মাতৃদেবী স্বয়ং তদারকিতে, সেক্ষণে ইনি হঠাৎ বিগলিত হইয়া গদ্গদ কন্ঠে বলিয়া উঠিয়াছিলেন, (পাঠকের বোধের সুবিধার্থে হুবহু প্রতিলিপি দেওয়া হইল), "মাসিমা, বাঁআ, মাংসটা যা বানিয়েছেন বাঁআ, ওঃ, বহুদিন পরে বাঁআ এমন মাংস খেলাম"।
ইহা শ্রবণ করিয়াও 'মাসিমা' র হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া যে সহসা স্তব্ধ হইয়া যায় নাই, ইহাতেই প্রমাণ হয় যে এই কলিকালেও ভগবান আধা-জাগ্রত অবস্থায় বিরাজমান। ইহাতে আরো প্রমাণ হয় যে কথার মাত্রা হিসেবে, শুধুমাত্র নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশের নিমিত্তও কোন কোন সময় খিস্তি ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যাঁহারা এরূপ করিয়া থাকেন, কাহাকেও মানসিক আঘাত দিবার জন্য নহে, শুধুমাত্র অভ্যাসের বশেই বলিয়া ফেলেন।
যাহা হউক, আরো একটি ব্যাপার হইল যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হওয়ার কারণে নারীজাতির অবমাননা করা হয় খিস্তির মাধ্যমে। উহা লইয়া পৃথক একটি আলোচনা করিবার অভিপ্রায় রাখিলাম।ইয়ে, তেমন গুরুপাক কিছু নহে। 

ক্ষমা? ~ সুশোভন পাত্র

নিভিয়া'র বডিলোশেন নিয়মিত মাখলে নাকি আপনার স্ত্রী'র ত্বক এমন একটা বিশেষ মাত্রায় 'সফট' হবে যে ঘর ছেড়ে আপনার আর অফিস যাওয়াই দায়। ডাভ সাবানের যত্নশীল ব্যবহারে আপনার গালে আবার ফিরে আসতে পারে শৈশবের নরমতা। জনসন অ্যান্ড জনসনের ম্যাসাজ ওয়েলের দ্বি-প্রাহরিক মর্দনে আপনার শিশু পুত্রের পশ্চাদদেশের নমনীয়তা টেক্কা দেবে কাপার্সের কোমলত্ব কে। লোরিয়েলের লাস্যময়ী শ্যাম্পু আপনার মাথার চুল কে করবে গোড়া থেকে শক্ত এবং বাইরে থেকে নরম। আজকাল তো, ক্লোস আপের দয়ায় ৩২ পাটি দাঁত, সিন্ডিকেটের ক্যারিশমায় উড়ালপুলের স্ল্যাব, আর ভোটের বালাইয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সুরও নরম হচ্ছে। কিছুদিন আগেও যিনি সবাইকে "ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে মেপে" নিচ্ছিলেন, "কত ধানে, কত চাল" কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিচ্ছিলেন, পুলিশ কে "চাবকে লাল" করে দিচ্ছিলেন, নিজেকে "রাফ এন্ড টাফ" দাবি করছিলেন, নিজের মার্কশিটে নিজেই ১০০/১০০ বসিয়ে ফেলছিলেন আর গলার শিরা ফুলিয়ে "আমাকে ধমকালে আমি চমকাই, আমাকে বর্ষালে আমি গরজাই", "তুমি বুনো ওল হলে আমি বাঘা তেঁতুল" -- ডায়লগে বাজার গরম করছিলেন, তিনি কিনা শেষে  করজোড়ে ক্ষমা চাইছেন? ভুল স্বীকার করে মানুষের করুণা আর সহানুভূতি ভিক্ষা করছেন?
তা কে আপনাকে ক্ষমা করবে ম্যাডাম? গলায় ছ-খানা টাঙ্গির কোপ খেয়ে মধ্যমকুমারির জঙ্গলে পড়ে থাকা সালকু সরেনের লাশটা? না মাওবাদীদের ফতোয়ায়, বৃদ্ধা বিধবা মা'র শত অনুরোধেও, সালকুর মৃতদেহ সৎকার করতে  সাহস না করা গ্রামবাসীরা? কার সহানুভূতি আপনি চাইছেন? ভালুকবাসা জঙ্গলঘেরা পাথরপাড়া গ্রামের বাদল আহিরের? জ্যান্ত অবস্থায় যার গোটা দেহে গুনগুনে একশ আটটা পেরেক পুঁতেছিল মাওবাদীরা? না, অজিত লোহার, পূর্ণিমা ঘড়ুই, জিতেন নন্দী, প্রদীপ তা, কমল গায়েন, সুদীপ্ত-সৈউফুদ্দিন হয়ে স্বপন মালিকের ১৭৫'র লম্বা তালিকাটা? কে আশীর্বাদ করবে আপনাকে দিদিমণি? সিঙ্গুরের  অনিচ্ছুক কৃষকরা? শালবনী আর নন্দীগ্রামের জমিদাতারা? ৬৮ লক্ষের গল্প শোনা টেট আর এসএসসি'র জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকা বেকাররা? ৫০% বকেয়া ডিএ'র ভুক্তভোগী সরকারী কর্মচারীরা? ফসলের দাম না পাওয়া কৃষকরা? অনাহারে মরা চা-বাগানের শ্রমিকরা? এ রাজ্যের মানুষ আর আপনাকে আশীর্বাদ করে না ম্যাডাম।  বরং গত চার বছরের আপনার স্বেচ্ছাচারিতা কে আর দশ হাজার ক্লাব কে ৩৮৪ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়ে পোষা, আপনার তা-বেদরা-তোলাব-লুম্পেনদের-গুণ্ডা-চোর'দের ঘেন্না করে, ধিক্কার দেয়, জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হয়।
ঐ যেদিন আপনার হেলিকপ্টারটা গাঁয়ের মাঝ বরাবর, মাথার উপর দিয়ে পতপত করে উড়ে গেল, সেদিনই সন্ধ্যে বেলায় বসেছিলাম পার্টি অফিসে। সদ্য বন্ধ হয়েছে শিলাবৃষ্টি। চারিদিক অন্ধকার।পার্টি অফিসে যিনি এসে ঢুকলেন, বয়োজ্যেষ্ঠ'দের সম্বোধনে জানলাম তিনি সবার 'দীনু দা'। অবশ্য বার্ধক্যের ছাপে, মলিন পাঞ্জাবির অবয়বে, হাঁটু অবধি ভাঁজ করা কোমরের ধুতির বাঁধনে, পুরু কাঁচের চশমার চাউনিতে, আর হাতে ধরা শেষ সম্বলের লাঠির ভারে, তিনি বোধহয় 'দিনু জ্যাঠু' হিসেবেই  বেশি মানানসই।চারিদিকের ভ্রু-কুঞ্চিত ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন দেখে বুঝলাম তিনি কনটেম্পোরারি অ্যান্ড্রয়েড কমরেড'দের কাছে বেশ অপরিচিতই। ঘরে ঢুকেই একঘর ভর্তি লোকের সামনে 'দিনু দা' তাঁর গভীর উদ্বেগ নিঃসংকোচে উগরে দিলেন
-মেশিনে না হয় আমি ভোটটা কেস্তায় দিলম, কিন্তু বুঝব কি করে যে আমার ভোটটা কেস্তাতেই পড়ল? অন্য কুথাও চলে যায় যদি?
ভালবাসার আশংকা থেকে নিঃসৃত এই অনর্থক উদ্বেগ কে বাকি সবাই মিলে প্রশমিত করেই তাঁকে একটা মডেল ব্যালটে ভোট দিতে বলা হয়। বোধহয় তাঁর দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতার কথা ভেবেই  এই  অমূলক পরীক্ষা। একঘর লোকের সামনে প্রথম চেষ্টাতেই 'কাস্তেটা' চিনে ফেলে, গর্বের হাসি হেসে, পুরু চশমার ভেতর দিয়ে সবার দিকে ঘুরে, ঘুরে তাকিয়ে 'দিনু দা' বললেন
-৫২ বছর ধরে ভোট দিচ্ছি ব। আর কেস্তা চিনতে লারবো? ইবার তো চিনতেই হবেক। গাঁয়ে হেলিকপ্টারও উড়বেক আর আমাদের ধান গুলাও পচে মরবেক, এইটা তো চলবেক নাই।
আশ্বস্ত 'দিনু দা'র নিশ্চিন্ত প্রস্থানের পরে শুনলাম, আগে নাকি তিনি নিয়মিতই এখানে আসতেন।বসতেন। কাজও করতেন।ভবঘুরে মানুষ। হঠাৎ কি যে হল, আসা বন্ধ করে দিলেন। গত ৮-৯ বছর আর এ পথ মাড়াননি একবারও। আজ এলেন। আবার এলেন। নিজেই এলেন। কে জানে কেন এলেন... 
ম্যাডাম, আপনার তো অপরিসীম ক্ষমতা। এতো শত মন্ত্রী-সন্ত্রী,আমলা,পুলিশ পাইক, বরকন্দাজ, পেয়াদা। আর সামান্য 'দিনু দা'রা কিনা আপনাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করছে? চিড় ধরিয়ে দিল আপনার অহংকারে? হিমালয়সম আত্মবিশ্বাসে? আচ্ছা, আপনি কি ভয় পেয়েছেন ম্যাডাম? তা বেশ করেছেন। ভয় আপনার পাওয়াই উচিত, 'দিনু দা'রা ফিরে আসছে যে, প্রতিদিন ফিরে আসছে, নিজের ঘরে ফিরে আসছে, জোটে বেঁধেই ফিরে আসছে, আপনাকে হারাতেই ফিরে আসছে...

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৬

অমিত মিত্র ~ সাক্যজিত ভট্টাচার্য্য

কুমি কাপুরের লেখা ইমার্জেন্সির ইতিহাসের ওপর বইটা পড়ছিলাম। লেখিকা সাংবাদিক হয়েও তৎকালীন জনসংঘের প্রতি নিজের অনুরাগ গোপন করেন নি। তাতে সমস্যা নেই। তবে একটা ইন্টারেস্টিং অ্যানেকডোট শেয়ার করি।

ইমার্জেন্সির সময়ে সুব্রম্ম্যণিয়াম স্বামী পালিয়ে বেড়িয়েছেন অনেকদিন। স্বামী তখন জনসংঘের টিকিটে এমপি। নানাজী দেশমুখ, মানে তখন জনসংঘের প্রধান, স্বামীর স্ত্রী রোক্সনাকে বলেছিলেন বিদেশে গিয়ে জনসংঘ এবং আর এস এস-এর কর্মীদের ওপর যা যা অত্যাচার হচ্ছে সেগুলো নিয়ে প্রচার করতে। বিশেষত বিদেশের আরএসএস কর্মীদের সাথে যোগাযোগ করতে যারা টাকাপয়সা এবং অন্যান্য সাহায্য দিতে পারেন। রোক্সনা বিদেশে গিয়ে দেখেছিলেন লন্ডনে বসবাসকারী আরএসএস-রা বেশ ভয় পেয়েছেন। সাহায্য করতে রাজী নন। কিন্তু আমেরিকায় আরএসএস কর্মী যারা আছেন তারা প্রচুর হেল্প করেছিলেন। রোক্সনা বিশেষত উল্লেখ করেছিলেন পেনসিলভানিয়ার ফ্র্যাংকলিন মার্শাল কলেজের অধ্যাপক দম্পতির কথা যারা আরএসএস কানেকশন কাজে লাগিয়ে রোক্সনাকে সাহায্য করেছিলেন।

দম্পতির নাম মীরা এবং অমিত মিত্র। দ্বিতীয়জন পরবর্তীকালে পশ্চিমবংগের অর্থমন্ত্রী হন।

(Page 135, The Emergency: A Personal History-Coomi Kapoor, Penguin Viking, 2015)

শুক্রবার, ১৮ মার্চ, ২০১৬

অভ্যেস ~ মধুবনী ঘোষ

সক্কালে দাঁত মাজা, কফি এক কাপ
কার পুলে কথা কম, আপিসের চাপ
ছানাদের টুইশন, রাতে ছোটা পেগ
অভ্যেস হয়ে গেছে নো মোর আবেগ
থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর
অভ্যেস হয়ে গেছে নেতা ঘুষখোর
হাতি পোষা ভোট এলো খরচের ধুম
পাঁচ সাত লাখ নেব কা বোলেগা তুম ?
ভিডিও তুলেছ নাকি বিদেশী টাকায় ?
যতসব ফটোশপ গপ্প পাকায় !
গামছা চাদর আর কাগজ রঙিন
চাপিয়ে অর্থ নেবে সিক্স এলগিন
কে আছিস? ভাল করে গুনে নিস ভাই
ইমপেক্স ব্যাটাদের লবির দোহাই
অভ্যেস হয়ে যাওয়া লোভ চকচকে
অভ্যেসে হাত পাতা চোখের পলকে
নালিশ করবে কাকে? সকলেই চোর
তাদের মায়ের আজ গলার কি জোর !!
দাঁত মাজো কফি খাও সিরিয়াল দেখো
ঘুষ টুশ নিয়ে বাপু বেশি ভেবো নাকো
এগিয়ে বাংলা বেবি হেবি কপচাবে
একদিন খুনটাও অভ্যেস হবে |


বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ, ২০১৬

সোমরা মারান্ডী সরকার হোসেইন ~ দেবযানী ভট্টাচার্য্য

​বাবার নাম - দেলওয়ার হোসেইন।
মায়ের নাম - রুপা সরকার
ছেলের নাম - সোমরা মারান্ডী সরকার হোসেইন
চমকে গেলেন? আমিও গিয়েছিলাম। ছেলেটি এসেছিল মায়ের সাথে। আমার কাছে ইংরাজী পড়বে। আমার বাবা যে ইশকুলে চাকুরী করতেন সেই ইশকুলে পড়ে, ক্লাস নাইন। ওখানকার একজন স্যর পাঠিয়েছেন। ভালো কথা। মায়ের চেহারার সাথে ছেলের চেহারার ভীষন তফাত। ভাবলাম হয়তবা বাপের চেহারা পেয়েছে। নাম জানতে চাইলাম। এবং বিষম খেলাম শুনে। একে অমন নাম তার উপর মায়ের কপালে সিন্দুর হাতে নোয়া, কি কান্ড! ভদ্রমহিলা আমার হতভম্ব চেহারা দেখে বুঝে নিলেন যে আমায় বিষয়টা বোঝানো প্রয়োজন। ছেলে কে কলম কেনার ছুতোয় দোকানে পাঠিয়ে বললেন সব। নিজেরা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। অনেক ঝড় সামলে নিজের নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস অক্ষুন্ন রেখেই আজ সংসার করছেন বাইশ বছর। ছেলেটি কুড়িয়ে পাওয়া। ইঁট ভাটার পাশেই ঘর। এক শিবরাত্রির সন্ধ্যেবেলায় মন্দির থেকে বাবার মাথায় জল ঢেলে ফিরে ছেঁচতলায় পড়ে থাকতে দেখেন সদ্যোজাত শিশুটিকে। পিপড়ে ছেঁকে ধরেছে। ছুটে গিয়ে কোলে নেন। আজ অবধি কোল জুড়ে। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন ভাটায় কাজ করতে আসা আদিবাসী এক মেয়ের উপর ঠিকাদারের সেই বিশেষ মহতী অনুভুতির ফলাফল এই অবাঞ্ছিত প্রাণ। একে নিয়ে দেশে ফেরার উপায় নেই মেয়েটির। তার মরদ জানলে মা বাচ্চা দুজন কেই জ্যান্ত কবর দেবে। সবটা বুঝে ছেলেটিকে নিজেদের কাছেই রাখার সিদ্ধান্ত নেন তারা। শুধু জেনে নিয়েছিলেন নিজের বুকে রাখতে পারলে মেয়েটি কি নাম দিত তার সন্তানের। সেই নামই রেখেছেন। সাথে জুড়ে গেছে নিজেদের পরিচয়। পুরো গল্প বলে এক চোখ পরিতৃপ্তি নিয়ে ভদ্রমহিলা কি বলে উঠলেন জানেন? "দিদিমনি, ও আমার ভোলানাথ। শিবরাত্তিরে আমার ঘরে এসেছে ও। ওকে বুকে করে রাখব চিরকাল। ওর বাবাও ওকে চোখে হারায় জানেন। ভ্যান টেনে সন্ধ্যেবেলা ঘরে ফিরে ছেলে পাশে নিয়ে পড়তে বসায়, নিজে নামাজ পড়ে। ছেলেও বাপের দেখাদেখি নামাজে বসতে চায়। উনি দেননা। বলেন , তুই তো তোর জন্ম কথা সব জানিস বাপ আমার, আদিবাসী দের ধর্ম টাই তো আসলে তোর সেই মায়ের ধর্ম কিন্তু আমরা সেটা তত জানিনে, তাই তোর ধর্ম এখন কেবল পড়াশোনা বাপ, বড় হয়ে নে তারপর পুজো নামাজ যেটা ভালো লাগে করবি, চাইলে দুটোই করবিখন। আবার কিছু না ইচ্ছে করে করবিনা। আমি রা কাড়ব না। কিন্তু লেখাপড়া না করলে পিঠে চ্যালাকাঠ ভাংগব। বলেই ছেলে জড়িয়ে সোহাগ করেন। উনি নাকি মারবেন! তালেই হয়েছে আর কি! দিদিমনি, আপনিই মেরে বকে পড়া আদায় করে নেবেনখন। আপনাকেই ভরসা করে দিয়ে গেলাম।" চলে গেলেন উনি। আসলে আমিই ভরসা পেলাম। বিরাট এক ভরসা। মানুষ জাতটা এখন পুরোপুরি পচে নি। মালাউন মা আর মোস্লা বাপের ঘরে একান্ত আদরে মানুষ তৈরী হচ্ছে এই ভুমিখন্ডের আদিপুত্রের বংশজ। আলি সাহেব, এটাই আপনার ভারতবর্ষ।

বুধবার, ১৬ মার্চ, ২০১৬

আলিমুদ্দিন ~ সুশোভন পাত্র

৩০'শে অগাস্ট আলিমুদ্দিন গিয়েছিলাম। ঐ প্রথমবার। খবরের কাগজে, টিভিতে তো প্রায়ই দেখি-শুনি, 'আলিমুদ্দিন চক্রান্ত করেছে', 'আলিমুদ্দিন ভয় পেয়েছে', 'আলিমুদ্দিন হিমশিম খাচ্ছে', 'আলিমুদ্দিনের কপালে ভাঁজ', 'আলিমুদ্দিন অমুক', 'আলিমুদ্দিন তমুক।' তাই অনেকদিনের সখ ছিল এই 'আলিমুদ্দিন' নামক 'নরকের দ্বার'টাকে একবার দেখবোই। বড্ড ম্যাড়ম্যাড়ে আলিমুদ্দিন, বুঝলেন। কোনও আড়ম্বর নেই। জৌলুস নেই। ঢোকার মুখটায় আলো নেই। ১৫ ফুট লম্বা ৫ হাত পুরু বিশাল প্রাচীর নেই। ব্ল্যাকক্যাট আর জেড ক্যাটাগরির সিকিউরিটি নেই। প্রায় নিশ্চিন্তেই, আপনি পৌঁছে যেতে পারেন একেবারে আলিমুদ্দিনের 'অলিন্দে'। সেই অলিন্দে, যেখানে সর্বদা আড়ি পেতে, নাড়ির খবর জোগাড় করেন আনন্দবাজার-বর্তমান এবং আরও অনেক শ্রী-মান। এমনকি আলিমুদ্দিনের উপরে যে লাল পতাকাটা, যেটাকে স্টার আনন্দের ফুটেজে ২৪X৭ পতপত করে উড়তে দেখেন, সেটাও হাওয়া না দিলে একবারে নেতিয়েই থাকে।
একটা বই'র জন্য অপেক্ষা করছি, টেবিলের অপর দিকে এসে বসলেন সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিহিত এক ভদ্রলোক। লোকে বলে, বিমান বসু। একহাতে লাল চা'র গ্লাসে চা পাতা গুলো তখনও পাতনের নিয়মে থিতিয়ে পড়ছে, আর অন্য হাতে একটা ওষুধ। সৌজন্যের খাতিরেই জিজ্ঞাসা করলাম
-কিসের ওষুধ সুগারের? ভাবলাম বুড়োর বয়স তো হয়েছে সুগারের ঢিলটা নিশ্চয় লেগেই যাবে। ভদ্রলোক হেসে উত্তর দিলেন,
-৭০ থেকে দুধ-চিনি ছাড়াই চা খাচ্ছি। সুগার, প্রেশার আর কোলেস্টরেল কোনটাই আমার নেই। ঐ যে নবান্ন অভিযানের দিন মাথায় মারলো পুলিশ। ওষুধটা নেহাত সেই জন্যই।
ঠিকই তো। যে উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে রাজনীতিতে এসেছেন, একসময় আদিবাসীদের সাথে ঘরে-দাওয়ায় চাটাই পেতে একপাতে ইঁদুর-পোড়া, ব্যাঙ-ভাজা খেয়েছেন, বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন, ছিয়াত্তরে যে বুড়ো গণতন্ত্র ফেরানোর দাবিতে তিনদিন অনশন করেন, ২১ কিলোমিটার হেটে কেশপুরের পার্টি অফিসে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন, তিনি যে চায়ে দুধ-চিনি কবেই ছেড়ে দেবেন, এতে আর আশ্চর্য কি। ভাবনাটা শেষ হবার আগেই উনি পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ধরালেন। বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান, সিপিআইএম'র পলিট ব্যুরো মেম্বার, এত বড় 'হার্মাদ' শেষে কিনা বিড়ি টানছেন? আমি তো টোটাল ট্যান। ভাবলাম, আচ্ছা পায়ে হাওয়াই চটি যদি 'সততার প্রতীক' হয় তাহলে, ঐ একই ত্রৈরাশিকে, হাতে বিড়ি ঠিক কিসের প্রতীক হওয়া উচিত?  ঘড়ি ধরে ১৫ মিনিটের আলিমুদ্দিন অভিযান শেষে ফিরে আসার পথে ১০ সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়ালাম এক জায়গায়। 'ফিরে দেখা'র ডিকটেশন দিচ্ছেন এক ভদ্রলোক। গাল ভর্তি সাদা দাঁড়ি। আমি লেখালিখি করার চেষ্টা করি শুনে বললেন "লেখ। আমাদের যে ভুলের কথা গুলো কেউ লিখতে না, সেগুলোই সাহস করে লেখ।" আচ্ছা এই লোকটার "আমরা ২৩৬ ওরা ৩৬" মন্তব্যে মিডিয়া ঔদ্ধত্য'র মহাভারত লিখেছিল না? তাহলে বর্তমানে অন ক্যামেরা যিনি পুলিশ কে চাবকে পিঠের ছাল তুলে দেবার হুমকি দেন? সেটা কি তাঁর 'ঔদ্ধত্য' না জননেত্রীর মমতা?
পূর্বস্মৃতির বিলম্বিত অবতারণা নিতান্তই উদ্দেশ্য প্রণোদিত। গ্রেট কোলকাতা কিলিংস,  তেভাগা, খাদ্য আন্দোলন, জরুরি অবস্থা, অপারেশন বর্গা আজ না হয় ওল্ড ফ্যাশানড। কনটেম্পোরারি বং' জেনারেশন না হয় সেসব হানি সিং ঢেলে আর সানি লিওনে গুলে খেয়েছেন। কিন্তু ঐ ভয়ঙ্কর ৩৪। কিম্বা এই স্বপ্নের পাঁচ। সেটা তো মডার্ন? তা এই ৩৯ বছরে, স্যামুয়েল ম্যাথুরা আলিমুদ্দিনের ভেতরে কিম্বা বুদ্ধ-বিমান বা ছোট-মাঝারি হার্মাদ গুলোর উপরে স্টিং অপারেশনের জন্য মাত্র ২৩ মিনিট খুঁজে পেলেন না? হোক না একটা স্টিং এঁদের উপরেও। ২৩ মিনিটের। যেকোনো ২৩ মিনিটের।
বছর সাত আগে, একটা স্টিং অপারেশনে, নন্দীগ্রামের সিপিআই'র প্রাক্তন বিধায়ক মহম্মদ ইলিয়াসের হাতে প্রায় জোর করেই গুঁজে দেওয়া হয় ১০,০০০ টাকা। বিধানসভায় জমা পড়ে সেই সিডি। স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিশ আনেন আজকের এই 'পাঁচ লাখি' সৌগত রায়। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে পদত্যাগ করেন ইলিয়াস। আজ ইলিয়াস গুরুতর অসুস্থ। দু-বিঘা জমি বেঁচে তার চিকিৎসা চলছে। সংসার চলে বিধায়কের পেনশনে। আর সেই স্টিং অপারেশনর সাংবাদিক শঙ্কুদেব পণ্ডা ও তার পরামর্শ দাতা শুভেন্দু অধিকারী একবার 'সারদা' আর একবার 'নারদা'। ইলিয়াসের ছেলে আজ জানতে চায় সৌগত বাবু,   আপনি কি স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিশ আনবেন? করবেন ইলিয়াসের মত পদত্যাগ?
রথে চেপে দেশ ঘুরে 'মরেঙ্গে মর জায়েঙ্গে/ মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে'র' চ্যাংড়ামি ও রাজনৈতিক আদর্শের জন্য আমি আডবানী কে অপছন্দ করি এবং বিশ্বাস করি হাওলা কাণ্ডে সিবিআই তদন্তও নিরপেক্ষ ছিল না। কিন্তু তবুও তদন্তের স্বার্থে লৌহপুরুষের অগ্রিম পদত্যাগের সিদ্ধান্ত শ্রদ্ধাযোগ্য। এরকম প্রতিটি রাজনৈতিক দলেই কিছু বিবেকবান, সৎ মানুষ আছেন। যারা আডবাণী-ইলিয়াসের সৎ সাহস ধরেন। বিমানের আত্মত্যাগ ধরেন। যারা পেটে গামছা বেঁধে নিঃস্বার্থে রাজনীতি করেন। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পার্টির  ডাইরেক্টিভস অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন। যাদের কোনদিন কোন স্টিং হয়নি। একটা ঘন্টাখানেক হয়নি। মিডিয়া ফুটেজ দেয়নি। সোশ্যাল মিডিয়া দেওয়ালে ঘুঁটে লেপেনি। এনারাই স্বচ্ছ রাজনীতির  মুখ। এনারাই আমাদের আদর্শ। আমার ভরসা। আর যে রাজনীতি, যে রাজনৈতিক দল এদের অবজ্ঞা করে অবহেলা করে, ঐ ঘুষখোর ক্ষমতা লোভীদের দল চালানোর দায়িত্ব দেয়, নেতা-মন্ত্রী বানিয়ে মাথা তুলে নাচে, ফাঁদে পড়লে আঁচল দিয়ে আগলে রাখেন তাঁদের আমি ঘেন্না করি। আমার গর্ব, আমার অতিক্ষুদ্র সামর্থ্যে, আমি সেই রাজনীতির বিরুদ্ধেই লড়াই করি...

শনিবার, ১২ মার্চ, ২০১৬

চল বাংলায় ~ অমিতাভ প্রামাণিক

চল বাংলায়, লিখি পোস্টার, মাটি মানুষের ম্যানিফেস্টো –
আহা দিনকাল কত নির্মম, রাধা নাচলেও দোষ কেষ্টর।।

চল বাংলায় ...

হাসে জঙ্গল হাসে পর্বত, বাছুরের দল আঁকে স্বস্তিক –
স্বামী ভুলে যায় কে যে তার বৌ, আর কীসে তার জাগে মস্তি।।

চল বাংলায় ...

'জিও পাগলা' বলে ভাগলাম, দেখি ক্ষীর খায় বসে পাগলি;
হাতে কলম চলে বা জলরং, যা বেরোয় সব পাতি, আগলি।
পায়ে নীল স্ট্র্যাপ সাদা ফ্লিপফ্লপ, ধুয়ে জল খায় গোদা পাব্লিক –
আমি ছুটে যাই ভেঙে ব্যাকবোন, খেতে নুন-ঝাল আলুকাবলি।।

চল বাংলায় ...

খোসা ছাড়ানোর মত বললাম – যারা চলমান ফোঁড়া-অর্শ,
তারা রগটা ফুলিয়ে চিল্লায়, ঘরে ঢোকাবে চামচা ধর্ষক।
দ্বারে করাঘাত ক'রে বাড়া ভাত কেড়ে – ভোট চাই, ওহ, লাভলি!
আমি ফেলে দিই স্পাইনাল কর্ড, খেতে নুন-ঝাল আলুকাবলি।

চল বাংলায় ...

সোমবার, ৭ মার্চ, ২০১৬

নারী দিবস ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য

সেই মেয়েটা ট্রেন পেতে রোজ ঘন্টাখানেক
হাঁটে।
রাস্তাতে সব লোলুপ নজর শরীরটা তার
চাটে।
ভীড় ট্রেনে ফের ছোঁকছোঁকানি, যেমন বাজার
হাটে।
কলেজ হোক বা চাকরি, মেয়ের এইভাবে দিন
কাটে।
বিয়ের আগে হাজার বারণ মনেতে খিল
আঁটে।
বিয়ের পরে সুখের নামে ঘেন্না আসে
খাটে।
বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি, তার স্থান চৌ-
কাঠে।
শখ-আহ্লাদ? সবকিছু বাদ। মন উঠেছে
লাটে।
মুখ বুজে স্রেফ হুকুম তামিল, লেখাই যে ল-
লাটে!
ছেলে বিয়োলে পাড়া জুড়োল, হাজারো ঝন-
ঝাটে
'মা' ডাকটুকুন শুনবে, যতোই কষ্টেতে বুক
ফাটে।
সেই ছেলে আজ লায়েক হয়েই আলাদা তল-
লাটে।
বছর বছর নারীর দিবস, সুজ্যি নামে
পাটে।
বন্ধু ক'জন হারিয়ে যায় তেপান্তরের
মাঠে,
সারাজীবন মেয়েটা সেই একলা পথেই
হাঁটে।

দেশপ্রেম পায় ~ সুশোভন পাত্র

​"সবচেয়ে বেশি জোরে কেঁদেছিলেন হারুর ঠাকুরমা। তিনি আবার কানে শোনেন কিছু কম।তাঁকে সবাই জিজ্ঞেস করল, "আপনি এত কাঁদছিলেন কেন?" তিনি বললেন, "আমি কি অত জানি? দেখলুম ঝিয়েরা কাঁদছে, বৌমা কাঁদছে, তাই আমিও কাঁদতে লাগলুম—ভাবলুম একটা কিছু হয়ে থাকবে।"
অতএব হারুর ঠাকুরমার দেশপ্রেম পেলো। এবার জেএনইউ তে পেলো। দেশপ্রেম বড়ই অমূল্য। রেখে ঢেকে খরচা করতে হয়। তাও সবসময় আবার দেশপ্রেম পায় না। মহারাষ্ট্রে কৃষক মরলে পায় না। কন্যাভ্রূণ হত্যা হলে পায় না। লেবার ল রিফর্ম হলে পায় না। ৪৪২ জন কোটিপতি সাংসদ মিলে দৈনিক ২৫ টাকায় 'বিলো প্রভাটির' লক্ষণরেখা টেনে দিলে পায় না। রেভিনিউ ফোরগোন'র নামে কর্পোরেটদের ৬৮,৭১০ কোটি টাকার ট্যাক্স ছাড় দিলে পায় না। কৃষি 'সেস' বসলে পায় না। 'ক্লিন এনভায়ারোমেন্ট সেস' দ্বিগুণ হলে পায় না। প্রত্যক্ষ করে সরকার ১০৬০ কোটি টাকা আয় কমিয়ে পরোক্ষ করে ২০ হাজার বেশী আয়ের কোপ জনসাধারণের উপর চাপালেও পায় না। কিন্তু সিয়াচেনে সৈনিক মরলে পায়। ক্রিকেট মাঠে জাতীয় সঙ্গীত বাজলে পায়। ১৫'ই অগাস্ট দুপুরে টিভি'তে রোজা সিনেমা দেখলে পায়। পি-এফ'এ ট্যাক্স বসলে পায়। মাঝে মাঝে গোবর আর ঘুঁটেতেও পায়।
কিন্তু আম ছাড়া আবার আমাশা হয় না। একটি সংবাদ সংস্থার 'মুড অফ দ্য নেশন' সমীক্ষায় বলছে ২০১৪'য় নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দ করতেন ৫৭% মানুষ, ২০১৬ সালে তা ৪০%৷ ৫১% জানিয়েছেন মোদীর আমলে অর্থনৈতিক অবস্থা একই থেকে গেছে কিংবা আরও খারাপ হয়েছে৷ ৫৮%'র মতে মোদী সরকার মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ৷মূল্যবৃদ্ধি এখন ৫ .৬৯ শতাংশ। এই সরকার যেদিন শপথ নেয়, সেদিন সেনসেক্সের সূচক ছিল ২৪৫৫০৷ এই মুহূর্তে ২৩০০০। বিহার-দিল্লী ছাড়ুন। গুজরাট ও ছত্তিসগড়ে তো খাঁটি দেশপ্রেমের চাষ হয়। সেখানেও পৌরনির্বাচনে দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট বণ্টনকারীদের শক্তি কমেছে৷ উত্তরপ্রদেশে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্রে বিজেপি ৫৮টির মধ্যে ৫০টিতেই হেরেছে৷ এবং গৃহমন্ত্রী রাজনাথ সিং'র কেন্দ্রে ২৮টি আসনের মধ্যে ২৪টিতে৷
লাজুক মধুচন্দ্রিমা কাটলে আগে দাঙ্গা পেত। কনটেম্পোরারি সময়ের লেটেস্ট ফ্যাশন -এখন দেশপ্রেম পায়।
আরএসএস'র প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের 'ফ্রেন্ড ফিলজফার অ্যান্ড গাইড', বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে ১৯৩১'এ মুসলিনির সাথে সাক্ষাৎ করতে ইতালি যান। সেখানে তিনি ফ্যাসিস্ট অ্যাকাডেমি পরিদর্শন করে লেখেন, "আমি অভিভূত। প্রতিটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী বিকাশমান জাতির এই রকম ফ্যাসিস্ট সংগঠনই প্রয়োজন।" অতএব সঙ্ঘে প্রবর্তন হয় ৬-১৮ বছরের বালকদের প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থী উগ্র দেশপ্রেমে মগজধোলাই। পরে গোলওয়ালকার হিটলারের ইহুদি নিধন যজ্ঞের ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছিলেন "জাতিগোষ্ঠীর শুদ্ধতা রক্ষা করতে জার্মানি দেশটাকে সেমেটিক জাতিভুক্ত ইহুদিদের ক্লেদ মুক্ত করেছিলো।" এখন অবশ্য প্রকাশ্যে এই দেশপ্রেমী'দের আর হিটলার-মুসলিনি পায় না। স্তালিন-ক্রুশচেভ পায়। গান্ধী পায়। সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল পায়। সেই গান্ধী, সেই সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল, যিনি ১৯৪৮'র ১১ই সেপ্টেম্বর চিঠি তে লিখেছিলেন "সঙ্ঘের নেতাদের বিষাক্ত ভাষণের জন্য গান্ধী কে হত্যা করা হয়েছে। আর সঙ্ঘের অনুগামীরা তা উৎযাপন করতে মিষ্টি বিতরণ করছে।"
জেএনইউ'র মত সেটাও ছিল ফেব্রুয়ারি। ২৭'এ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৩। জার্মানির বিলাসবহুল হেরেন ক্লাবে ভাইস চ্যান্সেলর ফন পাপেন তখন প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবুর্গের হাতে তুলে দিচ্ছেন দুর্লভ বিদেশী মাদকের স্বর্ণাভ সুরাপাত্র। অন্যদিকে গোয়েবলসের প্রাসাদে, গ্রামাফোনের মৃদুমন্দ আবহসঙ্গীতের সিম্ফনি তে মোহিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কর্পোরাল হিটলার, তাঁর গুণমুগ্ধ স্তাবকদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধারে সম্মোহনী পরিকল্পনার রূপরেখা বর্ণনা করছেন। রাত তখন ১১, ক্রমশ লাস্যময়ী, প্রথম ফোনটা এলো হানফস্টাঙ্গেলের কাছ থেকে। 'রাইখস্ট্যাগে আগুন লেগেছে'। ফুয়েরার কে নিয়ে ঝড়ের গতিতে রাইখস্ট্যাগে পৌঁছে গেলেন গোয়েবলস। নিমেষে সবাই নিশ্চিত হয়ে গেলেন। ফুয়েরার গোটা বিশ্ব কে জানিয়ে দিলেন 'এই কাজ অবশ্যই কমিউনিস্টদের'। গেস্টাপো-চিফ রুডলফের উদ্দেশ্যে গোয়েরিং'র চিৎকার করে 'অ্যাডমিনিসট্রেটিভ ডায়রেক্টিভস', "আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা নয়। কোন ক্ষমা নয়। প্রতিটি কমিউনিস্ট কে এক্ষুনি গুলি করে মারতে হবে।"
রাইখস্ট্যাগের আগুনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা অবশ্য আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু গুলি সেদিন চলেছিল। ঝাঁঝরা হয়ে কমিউনিস্টরা মরেও ছিল। তবুও, তবুও, আজও, কানহাইয়ারা জন্মাচ্ছে, কানহাইয়ারা জন্মেছে, কানহাইয়ারা জন্মাবে...

বুধবার, ২ মার্চ, ২০১৬

আমার স্যার ~ অরুণাচল দত্ত চৌধুরী

আমার স্যার চলে গেলেন। আজ শুধু তাঁর কথা। ডাঃ দেবব্রত সেন। প্রফেসর ডি সেন। দেবু সেন। এমবিবিএস, ডিটিসিডি, ডাবল এমআরসিপি। মেডিকেল কলেজের উজ্জ্বল ছাত্রদের একজন। কিন্তু এ'সব তো তাঁর পোশাকি পরিচয়। আর্তজন (আর ছাত্ররাও) জানত, উনি দেবতা সেন। হ্যাঁ, মমতায় ভালবাসায় মেধায় ও জ্ঞানে স্যার তেমনই ছিলেন। আমরা মানে মুর্খ ভক্তরা আড়ালে বলতাম শনিঠাকুর। মুখ দিয়ে যদি কোনও ডায়াগনোসিস, ভালোমন্দ যা হোক, বেরিয়ে গেল, অন্যথা হবার জো নেই। প্রায় সংস্কারের মত দাঁড়িয়ে গেছিল আমাদের মনে। আমার সহপাঠী ঘনিষ্ঠ বন্ধু অমিতাভর বাবার শরীর খারাপ হল। তেমন মারাত্মক কিছু না। স্যারকে দেখাতে বললেন, ভাল লাগছে না। বেরিয়াম মিল করানো হল। নর্মাল ছবি। স্যার কিন্তু ছবি দেখে আরও গম্ভীর। তখন কলকাতায় এন্ডোস্কোপি সবে শুরু হয়েছে। ডাঃ জালান। রায় বেরোল স্টমাকের ক্যান্সার। ছ'মাসের মধ্যে আমার কলকাতার আশ্রয়, সেই প্রিয় মানুষ, শ্রী বিজয় ভট্টাচার্য চলে গেলেন। এই রকম অসংখ্যবার তাঁর ডায়াগনোসিস আমাদের চমকে দিত। রোগীর জন্য, মানুষের জন্য এমন মমতা সারা জীবনে দ্বিতীয় কারুর মধ্যে দেখিনি।
মেদিনীপুর, বহরমপুর, জলপাইগুড়ি, চাকরি সূত্রে যে'খানে পোস্টিং হয়েছে, সে'খানেই মানুষের চোখে দেবতা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন এই মমতা ভালোবাসা বিছিয়ে। প্রত্যেক জায়গাতেই চেম্বারে চাপ হত খুব। সাহিত্যিক দেবেশ রায় একবার অধুনা লুপ্ত "শারদীয় অমৃত''তে স্যারকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন। তা'তে জলপাইগুড়ির প্রেক্ষাপটে স্যারের চেম্বারে রোগীদের ভিড়ের খুব ভালো ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন । জলপাইগুড়ির সম্পন্ন মানুষেরা সেই কালে কলকাতায় আসতেন বড় রোগব্যাধি হলে। কলকাতায় থাকা তাঁদের পরিচিত কাউকে দিয়ে বা অন্য কোনও ভাবে তথাকথিত বড় ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হত। বলাই বাহুল্য, সাথে সাথে পাওয়া যেত না সেই সব মহার্ঘ অ্যাপয়েন্টমেন্ট। এই যে দেরি হত এটাই ছিল সেই সম্পন্ন মানুষদের স্ট্যাটাস সিম্বল। এদিকে স্যার ছিলেন হাসপাতাল অন্ত প্রাণ। সকাল সন্ধ্যার রাউন্ডতো আছেই, তার সাথে আরও বহুবার যেতেন রোগীর পাশে অশেষ উৎকণ্ঠায়, রোগ বুঝবার আর সারাবার জন্য। হাসপাতালের বেড থেকে পেশেন্ট ভাগিয়ে চেম্বারে নিয়ে যাওয়া দুরস্থান, চেম্বারে তাঁকে পাওয়াই ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। নাম লিখিয়ে ডেট নিতে হত কাজেই। সেই সম্পন্ন মানুষরাও বেশ ভালো সুযোগ হিসেবে নিলেন এই ঘটনাটাকে। তাঁদের স্ট্যাটাসের জন্য প্রয়োজন ছিল লাইন দিয়ে ডেট নিয়ে দেখাতে হয় এমন ডাক্তারের। সেই জন্যেই তো কলকাতা যাওয়া। জলপাইগুড়িতেই যদি সেই লাইন দিয়ে ডেট নিয়ে দেখানোর সুব্যবস্থা পাওয়া যায়, তবে সেই সুবিধা না নেবার কোনও মানে হয় না। শুনেছিলাম জলাতঙ্ক আক্রান্তকে নিজে স্ট্রেচারে তুলতে গিয়ে তাঁকে সেই সময়ে চালু চোদ্দোটা প্রাণান্তকর ইনজেকশন নিতে হয়েছিল একদা। এই স্যারই আবার টিচিংএ পিজিতে এসে, যে হেতু নন-প্র্যাকটিসিং পোস্ট, কোনও প্রাইভেট প্র্যাকটিস করলেন না। সেই প্র্যাকটিস আবার শুরু হবে রিটায়ার করার পর। নতুন করে শুরু করা সেই প্রাইভেট প্র্যাকটিসের গল্পও বর্ণময়। ফিজ, শেষ অবধিও তাঁর কৃতি ছাত্রদের অনেকের চাইতে কম। অন্যরা অর্জুন হলেও আমি ছিলাম একলব্য। স্যারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার চেষ্টাও করিনি। তিনি কিন্তু মনে রেখেছিলেন। মনে রাখার ধরণটাও অদ্ভুত। বললেই বোঝা যাবে। একবার আমার পাঠানো এক পেশেন্টকে কিছুতেই দেখবেন না। কী ব্যাপার? না, 'অতদিন ধরে অরুণাচলকে কী শেখালাম, যে সেই এত সহজ কেসও আমার কাছে রেফার করে?'
অবুঝ স্যারকে বোঝাই কী করে, যে মফসসলের এই অধম চিকিৎসক রোগীর চাহিদাতেই রেফার করতে বাধ্য হয়েছে।
স্যারের সল্ট লেকের বাসায়, রোগীদের কাছ থেকেই শুনেছি, দেখানোর পদ্ধতিটা ছিল কিছুটা অন্যরকম। সকালে আটটা নাগাদ ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হত। পেশেন্ট পিছু একঘণ্টার স্লট। আমার এক রোগী বিকেল চারটেতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। পৌঁছেছেন একটু দেরিতে, মানে চারটে বেজে দশ নাগাদ। স্যার নাকি তাঁকে বলেছিলেন বেজায় হা হুতাশ করে, 'ইস, এত দেরি করে এলেন, আমি দশ দশটা মিনিট কম দেখতে বাধ্য হলাম।' দিনে চেম্বারে দেড়শ'টা করে পেশেন্ট দেখা আমার সহকর্মীরা ভাবতেও পারবে না, এ হেন আপশোষের কথা। খুঁটিয়ে হিস্ট্রি নিয়ে, ক্লিনিক্যাল একজামিনেশন করে, পুরনো কাগজপত্র থাকলে তা' দেখে, প্রেসক্রিপশনে সব কিছু লিপিবদ্ধ করেও শান্তি পেতেন না। এক জাবদা খাতায় নাম তারিখ দিয়ে তুলে রাখতেন সব। বলা তো যায় না, রোগী যদি কোনও কারণে কাগজ হারিয়ে ফেলে!
স্যারের বন্ধু আর ভাইএর মত ছিলেন আমার আর এক শিক্ষক, ডাঃ প্রণব চৌধুরী। তিনি মারা গেছেন বেশ কয়েকবছর আগে। তাঁর কাছে শোনা, তাঁদের ছাত্রাবস্থায় দেবব্রত আর প্রণব কলকাতার চার মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন ওয়ার্ডে কোন বেডে কোন ইন্টারেস্টিং কেস রয়েছে দেখে বেড়াতেন অক্লান্ত। আরজিকর থেকে পার্ক সার্কাসের ন্যাশনাল অবধি অবলীলায় হেঁটে চলে যেতেন মুড়ি বাদাম চিবোতে চিবোতে। কেস দেখবার আর শেখবার লোভে। সেই সব বেড নাম্বার লেখা থাকত তাঁদের পকেট ডায়রিতে।
'মোটর নিউরন ডিজিজ খুঁজছ?'
পকেট ঘেঁটে ডায়রি বার করে হদিশ দিতেন সমসাময়িক উৎসাহী কাউকে,
'উম্‌ম্‌... চলে যাও মেডিকাল কলেজে মতিলাল শীল ওয়ার্ডে ছেচল্লিশ তা না হলে এনআরএস মেডিসিনের পাঁচ নম্বর ফিমেল নইলে ন্যাশনালের একশ সতের নম্বর বেডে। আমি আর প্রণব গত দুদিনে দেখে এসেছি সব ক'জনকে। তবে ন্যাশনালের কেসটার ফাইন্ডিং বেশি। যাবার আগে ভালো করে পড়ে নিয়ো। আর মেডিক্যালের পেশেন্ট হয় তো ছুটি হয়ে যাবে আজকালের মধ্যে।'
এখনকার এমসিকিউ মুখস্তর যুগে এই কাণ্ড কেউ ভাবতে পারে?
মেধার সাথে পরিশ্রম আর অনুসন্ধিৎসা যোগ করলে কী দাঁড়ায় তার উদাহরণ ছিলেন এঁরা।
টুকরো টুকরো কত ঘটনাই যে খেয়াল পড়ছে। একদিন রেফার্ড কেসের ডাক এসেছে অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ড থেকে। আর্জেন্ট লেখা। স্যার আউটডোরে। সাথে আমি। রওনা হলেন আমাকে নিয়ে। গিয়ে দেখা গেল তেমন জরুরি কিছু না। কুড়ি বছর আগে টিবি হয়েছিল। বুকের এক্স-রে তে তার পুরনো দাগ এসেছে সামান্য। এক্ষুনি করণীয় কিছু নেই। তবু রেফার। ডাক্তারি কথ্য ভাষায় যাকে বলে 'ছুঁইয়ে রাখা'। বেড হেড টিকিটে দেখা গেল একজন হাউসস্টাফ এই রেফারটি লিখেছে। স্যার যখন তাকে ডেকে বললেন, 'আর্জেন্ট লিখেছ বলে ব্যস্ত আউটডোর ছেড়ে আমাকে আসতে হল', সে তো হতভম্ব। নিজের ঘাড় থেকে দায়িত্বের বোঝা নামাতে এই আর্জেন্ট লেখাটাই দস্তুর। তাকে সে'রকমই শেখানো হয়েছে।
হাসপাতালে ঢুকতেন সকাল সাড়ে আটটায়। ঘড়ি মেলানো যেত। এরপর রাউন্ড, আউটডোর, রেফার্ড কেস দেখা, আমাদের পড়ানো, এই সব নানান কাজ সেরে বিকেল চারটেতে স্যারের সেকেন্ড রাউন্ড। দিদির ক্যান্টিনে খেতাম আমরা। সেখানের দিদিরা জানতেন চেস্টের চারটে ছেলে দেরি করে আসবে। খাবার রেখে দিতে হবে।
ছাত্রদের মধ্যে জ্যোতিষ্ক যেমন ছিল অনেক, তেমনই আমার মত অলস নিরুদ্যমি মেধাহীন দু'চারজনও জুটেছিলাম। স্যারের কিন্তু আমাদের নিয়ে উদ্যমের কোনও ঘাটতি ছিল না। রোজ দুপুরে ম্যারাথন আউটডোরের পর আমাদের নিয়ে বসতেন স্যার। হয় তো হ্যারিসন অথবা অন্য কোনও টেক্সট বই, নইলে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল যাতে ওয়ার্ডে ভর্তি কোনও রোগীর যে রোগ তার বিবরণ। স্যার প্রায়শই ডাক্তারদের সেই আপ্ত বাক্য মনে করিয়ে দিতেন, 'হোয়াট ইয়োর মাইন্ড ডাসন্‌ট নো ইয়োর আইজ ক্যানট সি'। তার মধ্যেই 'অ্যাই অরুণাচল চোখ ছোট হয়ে আসছে। ঘুমিয়ে পোড়ো না।' তাঁকে তো আর বলা যায় না, অনেকক্ষণ ধরেই আমি বসে বসে ঘুমোচ্ছি। স্যার ভাবতেই পারেন না আউটডোর চলাকালীনও আজ একবার ঘুমের ঢেউ এসেছিল। আমি টয়লেটে গিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে পাঁচ মিনিট ঘুমিয়ে এসেছি।
চেনা শোনা তথাকথিত ক্যাচ কেস, স্টাফের মেসোমশাই, রাজনৈতিক নেতার চিরকুট আউটডোরে এলে আগে দেখে দেওয়া স্যারের ধাতে ছিল না। কতবার দেখেছি, খুব ডাকাবুকো অন্য ডিপার্টমেন্টের কোনও মাস্টারমশাইএর হাত থেকে সাথে আনা রোগীর টিকিট একদম শেষে রেখে জিজ্ঞেস করেছেন স্মিত মুখে, 'দেরি হবে বেশ, আপনি কি ততক্ষণ শুধু শুধু অপেক্ষা করবেন? কোনও দরকার নেই।' মহম্মদ ইসমাইল সিপিআইএমের ডাকসাইটে নেতা, তখন এমএলএ না এমপি, বাইরের বেঞ্চে বসে আছেন টিকিট জমা দিয়ে। স্যারের ওপর অচলা ভক্তি। যত দেরিই হোক, দেখিয়ে ফিরবেন। আজকের মেরুদণ্ডহীন সুপার বা ভিজিটিং যাঁরা ক্ষমতাবান কারওর চিরকুট দেখলে ভয়ে আইসক্রিমের মত গলে যান, তাঁরা ভাবতেও পারেন না সত্যিকারের সততার দাপট কাকে বলে।
বাড়াবাড়ি রকমের কথা বলতেন কিছু কিছু। 'একটা ওষুধ যদি দিয়েছ তবে তুমি রোগ ধরতে পেরেছ। দু'টো দিলে, ইউ আর ইন এ ডায়লেমা। আর তিনটে ওষুধ মানে তুমি কিছুই ধরতে পারোনি।' আমার এক সহকর্মী, বারাসতের বিরাট প্র্যাকটিশনার, ওষুধ লেখেন দশটা থেকে বাইশ তেইশটা। এই সব প্রেসক্রিপশন দেখলে স্যার কী বলতেন কে জানে। স্যার শেখাতেন, রোগীর ইতিহাস ঠিকমত জানতে পারলে পরিভাষায় যাকে বলে 'হিস্ট্রি টেকিং' অধিকাংশ রোগের ডায়াগনোসিস হয়ে যায়। আর বাকিটুকুর জন্য লাগে ক্লিনিক্যাল একজামিনেশন। মানে ইন্সপেকশন, প্যালপেশন, পারকাশন আর অসকালটেশনে বাকিটুকু। খুব সামান্য অংশ পড়ে থাকে যাদের ইনভেস্টিগেশন করে রোগ ধরতে হবে। সিনিয়র শিবদা' বলত ' নিজে প্রত্যেকটা কেস নিজে হাজার দু'হাজারটা করে দেখেছেন। তাই রোগীর মুখের ভাঁজ দেখলে রোগ ধরে ফেলেন।' সত্যিই তাই। মাঝে মাঝে অলৌকিক মনে হত তাঁর সে সব ডায়াগনোসিস।
সেই অলৌকিক এক গল্প বলে শেষ করি।
উনিশশ' সাতাশি সালের ঘটনা। তখন হাসপাতালে হাউসস্টাফ আন্দোলনে স্বাভাবিক কাজকর্ম মোটামুটি স্তব্ধ। বেলা দেড়টা নাগাদ এমারজেন্সিতে এক রোগী ঢুকল। বয়েস বছর বারো।অজ্ঞান। সাথে নাক ডাকার মত শব্দ… আমাদের ভাষায় স্ট্রাইডর। সহজ ডায়াগনোসিস, আপার এয়ার ওয়েতে ফরেন বডি অবস্ট্রাকশন। ই এন টির আরএমও কে কল বুক দেওয়া হল। যদি ফরেন বডি বার করে আনা যায়।
স্ট্রাইকের বাজারে কোথায় কে! এ দিকে রোগীর অবস্থা যখন তখন। কী করা? এমারজেন্সীর ডাক্তার বুদ্ধি বার করলেন। চেস্টে ভর্তি করে দেওয়া যাক। ওরা ডিপার্টমেন্টে অনেকক্ষণ থাকে।
সেদিন ছিল আমাদের আর এক স্যার ডাঃ ডি এন সিনহার অ্যাডমিশন ডে। বেলা তিনটে নাগাদ ডাঃ সিনহা রাউন্ডে এসে রোগীর বিবরণ শুনে, হতাশ ভাবে বললেন, 'কি আর করা। আগামী কাল সকাল সকাল রেফার লিখে ই এন টি সার্জন এনে দেখিয়ো, মানে ততক্ষণ যদি বাঁচে'।
স্যার এলেন বেলা চারটে নাগাদ। উনি খালি নিজের রোগীই নয়, সব রোগীকেই দেখতেন। এই বাচ্চাটার কাছে এসে, সব শুনে, নাকটা কুকুরের(স্যারের কাছে ক্ষমা চাইছি) মত তুলে কী যেন শুঁকলেন বার কতক। তারপর আমার একদা সিনিয়ার হাউসস্টাফ, আলোচ্য সময়ে আরএমও আলোকদা'কে বললেন, 'আলোক, এর প্যান্টটা খোলো তো'। প্যান্ট খোলা হল। ফাইমোসিস। পেচ্ছাপের জায়গাটা… ডাক্তারির ভাষায় যাকে বলে পিনহোল মিয়েটাস। স্যার ব্যাখ্যা করলেন, 'পেচ্ছাপ আটকে ইউরিমিয়া হয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। ওর নিঃশ্বাসের থেকে অ্যাসিডোটিক স্মেল পেলাম এই জন্যেই। চট করে ওপরের তলায় ডায়ালিসিস ইউনিটে পাঠাও। এখুনি ডায়ালিসিস করতে হবে।' পরদিন রাউণ্ডে ডাঃ সিনহা দুঃখিত ভাবে জিজ্ঞেস করলেন,'কী, কতক্ষণ পরে মারা গেল?'। আসলে চিনতেই পারেননি। ডায়ালিসিসে সুস্থ হয়ে সে তো তখন বেডে বসে পাঁউরুটি কলা খাচ্ছে।
আশ্চর্য হয়ে ভাবি, আমরা সবাই ডাক্তার। কই কেউই তো রোগের সেই গন্ধ বুঝতে পারিনি। সেই দাদা আড়ালে মন্তব্য করেছিলেন শুধু, 'হবে নাই বা কেন? দু'হাজারটা অমন গন্ধ শুঁকেছিলেন যে আগে'।
এই এতদিন বাদেও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে স্যারের আলোয় আলো হয়ে ওঠা সেই সব অলৌকিক দিনের কথা ভাবলে।

শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

দুর্গা ও মনুস্মৃতি ইরানি ~ অবিন দত্তগুপ্ত

গতকাল মনুস্মৃতি ইরানির রাজ্যসভার বক্তব্যের একটি অংশ নিয়ে , আমার হাল্কা কিছু অশিক্ষিত সি পি এম সুলভ বক্তব্য আছে । আগে কোট-টা করি ,

"What is Mahishasur Martyrdom Day, madam speaker? Our government has been accused. I miss today Sugata Bose and Saugata Roy in the House - champions of free speech, because I want to know if they will discuss this particular topic which I am about to enunciate in the House, on the streets of Kolkata. I dare them this.
Posted on October 4, 2014. A statement by the SC, ST and minority students of JNU. And what do they condemn? May my God forgive me for reading this.
"Durga Puja is the most controversial racial festival, where a fair-skinned beautiful goddess Durga is depicted brutally killing a dark-skinned native called Mahishasur. Mahishasur, a brave self-respecting leader, tricked into marriage by Aryans. They hired a sex worker called Durga, who enticed Mahishasur into marriage and killed him after nine nights of honeymooning during sleep."
Freedom of speech, ladies and gentleman. Who wants to have this discussion on the streets of Kolkata? "

আচ্ছা প্রথম লাইনে উনি জিজ্ঞেস করেছেন , মহিষাসুর শহীদ দিবস আবার কি ? এবং শেষ লাইনে বলেছেন , এমন কথা কোলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন ?? জোট সঙ্গি সুগত আর সৌগত বাবুর উপর একটু রুষ্ট হয়েছেন , সে হতেই পারেন , ওদের নিজস্ব ব্যপার । এবার ভারতবর্ষের একজন মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী , যদি নিজের দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় প্র্যাকটিসের ব্যপারে সম্পূর্ণ মূর্খ হন , তো দায় কার ? ভারতবর্ষের বিভিন্ন আদিবাসী- মূল নিবাসি জনগোষ্ঠী দুর্গা পুজার সময় মহিষাসুর উপাসনা করেন । তারা মনে করেন , ফর্সা চেহারার দুর্গা আসলে আর্য আক্রমণকারীর রূপক এবং মহিষাসুর ভারতের মুলনিবাসী অনার্য গোষ্ঠীর রাজা , যোদ্ধা । উনি টাইমস নাওএর ছাগল অর্ণব গোস্বামীর উপর এতো ভরসা রাখেন , চ্যানেলে ফোন করে ক্রন্দনরত জেনারেলকে সান্ত্বনা দেন , অথচ টাইমস গ্রুপের কাগজ পরেন না । এই খবর , এর আগে টাইমস অফ ইন্ডিয়াতেই বেরিয়েছে । লিঙ্ক ঃ ( http://timesofindia.indiatimes.com/…/articlesh…/23927688.cms ) । এবং হ্যা কোলকাতা গুজরাট নয় , কোলকাতার মানুষ অসহিষ্ণু নয় । কোলকাতা, ডায়েলেক্টিক বা ডিবেটে ভরসা রাখে । কলকাতায় , আপনি যা ইচ্ছে নিয়ে আলোচনা করতে পারেন , নইলে আপনাদের হনুমান ভাইয়েরা প্রকাশ্যে ঘর বাপসি নিয়ে আলোচনা করে ৮বি থেকে অক্ষত ফিরতে পারত না ।

এবার একটু ডাইগ্রেস করব । মেঘনাদ বধ কাব্য পড়েছেন মনু বাদী ইরানি ? মেঘনাদ কে ? অনার্য রাক্ষসদের সেরা যোদ্ধা , ট্র্যাজিক হিরো । রাক্ষস কারা ? যারা বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে থাকত । আপনার দেশের মূল নিবাসী , পৌরাণিক ভারতবর্ষের আসল বাসিন্দা । তাদের গায়ের রঙ কালো , নাক চোখ থ্যাবড়া । আর্যরা দারুণ দেখতে , চোখা নাক , ফর্সা । কিন্তু আদি ভারতবর্ষে তারা আগ্রাসনকারি । আর আদিবাসীদের তাদের চেহারার কারণে ডেমোনাইজ করার লক্ষেই , তারা রাক্ষস । ঠিক যেমন ডেমোনাইজ আপনারা করে থাকেন । মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী , বামপন্থী মানেই দেশদ্রোহী , লম্বা দাড়ি -বুরখা মানেই সন্ত্রাসের মদতদাতা , দলিত মাত্রেই নোংরা-অচ্ছুত । এই আর্যদের বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে , নিজের বাসস্থান রক্ষার আদিম ভারতের জনগোষ্ঠীর লড়াইয়ের নেতা ছিলেন এই রাবন , মেঘনাদ বা মহিষাসুর । তারা জানতেন , তাদের হেরে যাওয়া মানে তাদের ইতিহাসের বিকৃতি , তাদের গানের বিকৃতি , তাদের সংস্কৃতির বিকৃতি, তাদের ভাষার বিকৃতি । রাবণদের মতোই কালো আফ্রিকার এক সাহিত্যিক বহু বছর পরে , এই কারণেই বলেছিলেন " Until The Lions have their Own Historian , the history of the hunt will always Glorify the Hunter . " যতদিন না সিংহের নিজের ঐতিহাসিক জন্ম নিচ্ছে , ততদিন ইতিহাস শিকারির ছল-চাতুরিকেই গৌরবান্বিত করবে । সিংহের লড়াই কেউ জানতে পারবে না । মাইকেল মধুসূদন ছিলেন সিংহের ঐতিহাসিক । তিনি সিংহের দুর্দমনীয় লড়াই এবং কপটতার কাছে হার স্বীকারের গল্প নথিভুক্ত করে গেছেন । আপনি মধু কবি পড়েন নি , স্মৃতি ইরানি । বাংলার বাচ্চারা ৯-১০ ক্লাসে পরার সময় থেকেই পড়েছে । তাদের মনন আপনার মতো হিন্দুত্ববাদীর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় ।

তা রাবন হেরে যাওয়ার পর কি হল ? বা মহিষাসুর বধের পর কি হল ? ইতিহাস রাবণদের খারাপ এবং আগ্রাসনকারিদের ভালো বানিয়ে দিল । কারণ ইতিহাস লিখলেন বিজয়ীদলের স্তাবক ঐতিহাসিকরা । রাবণদের গোষ্ঠীর , ভারতের মুল নিবাসী মানুষের সংস্কৃতি , তাদের গান , তাদের ভাষা , তাদের বসবাসের অধিকার সব হারিয়ে যেতে লাগল , হু হু করে । ভারতবর্ষের এক ভগ্নাংশ মানুষের বলা হিন্দী ভাষাকে , তাদের মাতৃভাষার উপর চাপিয়ে দেওয়া হল । তারা সরে গেলেন , লোক চক্ষুর অন্তরালে । এমনকি আমাদের বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও , আমি যে ভাষা লিখছি ,সে ভাষাও অনেক আংশেই অন্য ডায়ালেক্টকে একরকম একঘরে করে রেখেছে ।

সে যাই হোক , এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছেন , জে এন ইউ তে এই কর্মসুচীতে বামন্থীরাও অংশগ্রহণ করেছিল কি ? এবং আমরা বাম্পন্থীরা এই বক্তব্য সমর্থন করি কি না ? তার উত্তরে এবং স্মৃতি ইরানির "Freedom of speech, ladies and gentleman. Who wants to have this discussion on the streets of Kolkata? " উত্তরে এটুকুই বলার , দুর্গা পূজা বা অসুর পুজা কোনটাকেই বিরোধিতা বা সমর্থন করে না বামপন্থীরা । তবে হ্যা , বিজয়ীর উৎসব যদি বিজিতের রিচুয়ালকে বেয়াইনি ঘোষিত করতে চায় ,সেক্ষেত্রে বাম্পন্থীরা বিজিতের পাশেই দাঁড়াবে । তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার , নিজেকে প্রকাশ করার অধিকার , তার দুঃখের গানের অধিকারকেই রক্ষা করবে ।

এমনটা নয় , যে মূলনিবাসী মানুষ আমাদের জন্য হাপিত্যেশ করে বসে আছেন । সব হারালেও , লড়াইটা হারান নি । জঙ্গলের অধিকারের জন্য , কখনো বিদেশী শক্তির থেকে কখনো উঁচু জাতের নিষ্পেষণের থেকে আজদির জন্য তারা বার বার যুদ্ধ করেছেন , হেরে গেছেন, আবার যুদ্ধ করেছেন । লড়াই করেছেন বিরসা মুন্ডা , লড়াই করেছেন সিধু-কানহু ,লড়াই করেছেন রোহিত ভেমুলা । পাওনা এটাই ,এখন মূলনিবাসীদের পাশে বামপন্থীরাও লড়াই করছে । ভেমুলার পাশে লড়ছেন ,কানহাইয়া । এবারের ইতিহাসটা আপনারা লিখবেন না মনু স্মৃতি ইরানি । আমাদের-ও ইরফান হাবিবরা আছেন ।

জয় ভীম ।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ ।