Monday, May 20, 2013

গোধুলিয়া থেকে দশাশ্বমেধ - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

জয় বাবা ফেলুনাথ ছবি যখন প্রথম দেখি, তখন কিশোর মনে ফেলুদা আর মগনলাল মেঘরাজের উপস্থিতি বড়ই প্রবল। আর বেশি কিছু চোখে পড়েনি। আমার সেই বয়সে পরিবেশ বেশ দুষিতই ছিলো, মানে বইমেলাটেলা সব কাছেপিঠেই হত, নাগালের মধ্যেসেরকমই একটা বইমেলা থেকে পেয়েছিলাম সত্যজিত রায়ের লেখা বিষয় চলচ্চিত্রপাতা ওল্টাতে ওল্টাতে পড়েছিলাম ফেলুদার সঙ্গে কাশীতেসেই প্রথম কাশীকে চেনা। তারপরে খুঁজে পেলাম, অপুর সঙ্গেও কাশীর যোগাযোগ রয়েছে। সেই থেকে বেনারসের ওপরে একটা টান জন্মে গিয়েছিলো। তার পরে বিভিন্ন ছবি আর লেখায় বেনারসকে পেয়েছি। টোয়েন্টি সেভেন ডাউনবলে একটা ছবিতে বেনারস এসেছিলো একদম শেষে। আর লাগা চুনরি মে দাগছবিতে একদম শুরুতেই। মোটের ওপর সব মিলিয়ে কাশী বা বেনারস বা বারানসি, যাই বলুন, দেখার বড়ই সখ ছিলো। আমার আবার ভ্রমনের ঝুলিটি বেশ বিদঘুটে। হিমালয়ের বরফ, রাজস্থানের মরুভুমি ( থার মরুভূমি থর নয়), কচ্ছের রান, দক্ষিনের মন্দির এমনকি ক্যালিফোর্নিয়াও দেখা হয়ে গেছে । কিন্তু দেখিনি বেনারস। পুরি ও প্রথম গেছি বছর আষ্টেক আগে প্রথম বার। শিলং টিলং তো দেখাই হয়নি। মোটের ওপর ভ্রমনের ঝোলাটা বেখাপ্পা আর জোড়াতাপ্পি দেওয়া। আমি ঘুরেছি হয়ত কিছু জায়গায়, কিন্তু কিছু দেখে তার স্থানমাহাত্য অনুভব করার মত স্পর্শকাতর মন আমার নেই। আমি আধ্যাত্মিক নই, ধর্মের টান আমার নেই। আমি লেখক নই, ভ্রমনকারি নই, ফোটোগ্রাফার নই, বার্ধক্যেও আসিনি এখনো। কাজেই বাঙালির বেনারস ভ্রমনের কোনো কারনই আমার নেই। কিন্তু যাঁরা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তাঁরা এই পর্যন্ত এসে মুচকি হাসছেন। ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের একটা সাক্ষাতকারে শুনেছিলাম, বিসমিল্লাহ বলছেন বানারস যো বনা রস্‌ সেএইবার ঠিক ধরেছেন। রসের খোঁজেই এই অধম ছুটেছিলো কাশী। বেনারস নাকি বিখ্যাত ষাঁড়,পাঁড় অউর রাঁড়এর জন্যে। ষাঁড় তো জানি। পাঁড় হলো বাবা বিশ্বনাথের পান্ডা। আর রাঁড় হলো রূপজীবিনি। কিন্তু আমি গিয়েছিলাম কোন রসের খোঁজে? সঙ্গীত বিষয়ে আমার জ্ঞানগম্মি প্রবাদপ্রতিম। একবার চেন্নাইতে অফিসের অনুষ্ঠানে দু কলি বাংলা গান গেয়েছিলামদক্ষিনি বন্ধুরা স্থির চোখে তাকিয়েছিলেন, আর আমার এক দেশোয়ালি সহকর্মী চুপি চুপি বলেছিলেন, গানখানি রবী ঠাকুরের হলেও সুরে আর গায়কিতে আমার নিজস্বতা স্পষ্ট। কিন্তু এসব ছাড়া রস নেই, সেকথা কে বলেছে? জিলিপিতে রস নেই? রাবড়ি? আর গরম কচুরি কিম্বা গাজরের হালুয়া? যাক। আপনাকে বেশি বোঝাতে হয়নি। আমার বেনারস যাবার কারন সম্পর্কে আপনি তাহলে পরিস্কার।

বেনারসের ধর্মতলা হলো গোধুলিয়ার মোড়। ধর্মতলা বললে হয়তো ঠিক বোঝানো হয়না। ধর্মতলায় চওড়া রাজপথ আছে, ফাইভ স্টার হোটেল আছে, পাতাল রেল, বাস ডিপো আছে। গোধুলিয়ায় এসব কিছুই নেই। কিন্তু গোধুলিয়ার আছে বিটকেল জটআছে থিকথিকে ভিড়, সরু রাস্তা, কান ফাটানো চিৎকার, গানের জগঝম্প, ছাই মাখা সাধু, গরম জিলিপি আর কচুরি, ষাঁড়, ঠেলা গাড়ি, শয়ে শয়ে রিক্সা, বাঙালি ট্যুরিস্টের দোকানে ঢুকে বিকট হিন্দিতে দরাদরি, বিদেশী ট্যুরিস্টের দামি ক্যামেরা আর কামানের মত দেখতে লেন্স ঝুলিয়ে হাঁটা, বৌদ্ধ লামাদের হাসি হাসি মঙ্গোলীয় মুখ, দক্ষিনি তীর্থযাত্রিদের হাত আর জামা ধরে লাইন করে হাঁটা, খাস বেনারসি পুরুত পান্ডার পান খাওয়া ঠোঁটে শুদ্ধ হিন্দি, নিশ্চিন্ত আর ঘুমন্ত পুলিস, ঘাড়ে উঠে পড়া মোটর সাইকেল, কখনো গাড়ি, আর আছে এক হাত অন্তর হোটেলের দালাল আর নৌকার মাঝি। আপনাকে ওপারে নিয়ে যাবার জন্য বড়ই ব্যস্ত। তবে সেটা গঙ্গা না বৈতরণী সেটা তর্কসাপেক্ষ। ফুটপাথ বলে একটা কিছু হয়ত হাজার খানেক বছর আগে ছিলো, কিন্তু এখন সেখানে কেবলই দোকান। সেই দোকানের চালা ভেদ করে পেছনের বাড়ি গুলো দেখার চেষ্টা করা বৃথা। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেছে স্বয়ং সুর্য্যদেব সেখানে ঢুকতে পারেননি, আপনি আমি তো কোন ছার। কিন্তু আধুনিকতা যাবে কোথায়? হাল ফ্যাশনের ঝকঝকে ল্যাপটপ বা ট্যাব, মিউজিক সিস্টেম, ইলেক্ট্রনিক্সের টুকিটাকি সবই পাবেন সূর্যের আলোর মতো সোজা চলবার বালাই নেই, তাই বিশ্বায়ন ঢোকে চোরা পথে। গোধুলিয়া আসলে একটা চৌমাথার মোড়, গঙ্গার দিকে দু পা এগোলেই বাঁ হাতি বিশ্বনাথের গলি, আর সোজা একটূ এগোলেই দশাশ্বমেধ ঘাট। এই রাস্তা হলো দশাশ্বমেধ রোড। যদিও হাঁটা দুস্কর, তবুও হিউয়েন সাং, ঔরঙ্গজেব, মার্ক টোয়েন, বিভুতিভূষন, ফেলুদা, সবাই হেঁটেছেন এ রাস্তায়। তবে কিনা এ স্থল বাবা বিশ্বনাথের খাস জায়গীর, কাজেই নন্দী-ভৃঙ্গী দের কথা না বলে ছাড়ি কি করে? আজ্ঞে হ্যাঁ, মহাকায় কিছু ষাঁড় ও আছেন। দিব্যি নিশ্চিন্তে ঘুরছেন এদিক ওদিক। একটু ক্লান্ত হয়ে পড়লে রাস্তার একদম মাঝখানে আয়েস করে বসে বসে জাবর কাটছেনআয়েস দেখে মনে হতেই পারে, নন্দী মশায় বোধহয় গুলকন্দ-জর্দা দেওয়া মঘাই পানই মুখে পুরেছেন। তবে কিনা রাস্তায় ইতি-উতি প্রাকৃতিক কর্মও করছেন। এক সায়েব কে দেখলাম কয়েক লাখ টাকা দামের এক খানা বিশাল ক্যামেরা বাগিয়ে গোবরের ছবি তুলতেকেন বাওয়া? তোমার দেশে কি গরু বা ষাঁড়ের ইয়ে অন্য রকম দেখতে? নাকি তুমি আমাদের গোবরে তাজমহলের কারুকাজ আশা করছো? ও তো আর কমোডে বসে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে কম্মটি করতে পারে না, আর এখানে এ হোল ওর খাস জায়গা। অগত্যা রাস্তাতেই। তোমাদের গরুর খোঁয়াড় কনক্রিটের। এখানে তো খোলা রাস্তা, ওখানে তো সায়েব, তোমার গরু, তোমার ঘরের ভেতর কম্মটি করে। সে দিক দিয়ে দেখলে আমাদের এনাদের সিভিক সেন্স বেশি

দশাশ্বমেধ রোড দিয়ে গাড়ি চলা নিষেধসে নিয়ম বেনারসি আম আদমী নিষ্ঠা ভরে মানেন। যদিও এনাদের বেশ কয়েক হাজার বছরের নাগরিক জীবন, তবুও ওই রাস্তায় গাড়ি ঢোকাবার মত হিম্মত, কারোর কলিজায় থাকতে পারেনা। রাস্তায় কি কি আছে, তা আগেই বলেছি। তা, সে তো ভারতের বহু রাস্তায়ই আছে। এখানে নতুন কি? নতুন যেটা, সেটা হলো, এ রাস্তায় পা দিয়ে, সবাই একটু বাবা বিশ্বনাথের ভক্ত হয়ে পড়ে বোধহয়, তাই জাগতিক ব্যাপারে কিঞ্চিত অনিহা এসে যায়। ধীর গতি, কেউ সরেনা, নড়ে না, গপ্প জমায়, ষাঁড়ের মতই অলস ভাবে রোমন্থন করে চলে, স্মৃতির। শুধু ব্যস্ততা কিছুটা থাকে কচুরি-মিঠাইয়ের দোকানির আর নৌকোর মাঝির। আইনষ্টাইন বলেছিলেন, সবই আপেক্ষিক। এখানে সেটা কিছুটা আক্ষরিক এবং একটু অন্য অর্থে প্রয়োগ করা যায়। এত ভিড় কিন্তু কেউ ব্যস্ত নয়। অপেক্ষা এখানে গত কয়েক হাজার বছরের ঐতিহ্য। আজ্ঞে হ্যাঁ, আসল ভারতবর্ষের বৈঠকি মেজাজ, এখানে আজও বহাল তবিয়তে বিরাজ করছে। পাশ্চাত্য কুইক টার্নওভারের বর্বরতা এ রাস্তায় এখনো ঢোকেনি। গোধুলিয়া পেরিয়ে দশাশ্বমেধ রোডে ঢুকতেই ডানহাতি এক বিরাট আস্তাঁকুড়। ওদিকে তাকাবেনা। আপনি ওটা দেখতে এখানে আসেন নি। আস্তাঁকুড় কোন দেশে নেই মশায়? সভ্যতা থাকলে সে সভ্যতার পরিষিষ্টও থাকবে প্লাস্টিকের প্যাকেট হয়ে, কখনো ফলের খোসা হয়ে, কখনো অন্য কোন জঞ্জাল হয়ে ওগুলোর জন্য আস্তাঁকুড় আছে বলেই না আপনার ঘরখানা এমন খাশা ঝকঝকে। আর সে জঞ্জাল জড়ো করে জাহাজে চড়িয়ে আটলান্টিক পেরিয়ে আফ্রিকার কোন গরিব দেশে জমা করার মত রেস্ত আমাদের নেই বলে, আমেরিকান ট্যুরিস্ট ভারতের রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্তে নোংরার ছবি তুলতে পারেন। রাস্তার মোড়ে বেশ কিছু পুলিস, কিন্তু তাদের মধ্যেও কেমন যেন বৈঠকি মেজাজ। চৌমাথার ওদিকে রাস্তার দু ধারে কতগুলো খাবারের দোকান। তাতে মিঠাই রাবড়ি আছে, চাট ভান্ডার আছে, এমনকি বাংলায় জলখাবারলেখা একটা দোকানও আছে। আর আছে রাস্তার একদম মোড়ে পানের দোকান। মঘাই পান। কিন্তু ওদিকে যাবোনা। যাবো গঙ্গার দিকে। রাস্তার মাঝামাঝি লোহার রেলিং দিয়ে রাস্তা ডাইনে বাঁয়ে ভাগ করা। রেলিঙের ধার ঘেঁসে দাঁড়িয়ে এক গাদা ঠেলাগাড়ি। তাতে সাজানো হরেক রকম পশরা। তাতে আছে জিলিপি, আছে আমসত্ত্ব, আছে পেঠা বা কুমড়োমেঠাই, আছে বাদাম ভাজা, আছে চুড়ি, জামাকাপড় আরো কত কি। রাস্তার দু ধারেও এরকম জিনিসের দোকান। দশাশ্বমেধের দিকে যত এগোবেন, ততই দোকানের পরিসর ছোট হবে আর বৈচিত্র বাড়বে।

বিশ্বনাথের গলির মুখটায় একটা তোরন। তবে সেটা বোধহয় অতটা পুরোন নয়। সামনে দাঁড়িয়ে দু জন বন্দুকধারী সেপাই। আজকাল ভগবানও নিরাপত্তার অভাবে ভুগছেন। ও গলির ভেতরে আলাদা জগৎ, আর তার আলাদা গল্প। আমাদের আজকের দৌড় ওই দশাশ্বমেধ ঘাট পর্যন্ত।  বিশ্বনাথের গলি পেরিয়ে রাস্তার বাঁ দিকে পড়বে একটা মিঠাইয়ের দোকান। স্বয়ং বাবা বিশ্বনাথের স্নেহধন্য নিশ্চই, না হলে সাদামাটা প্যাঁড়ায় অমন স্বাদ আসতেই পারেনা। এইখানে এসে রাস্তাটা দু ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একটা রাস্তা সরু হয়ে সোজা গিয়ে পড়েছে ঘাটে। সে রাস্তা নোংরার বেহদ্দ, সবজির বাজার আর দুর্গন্ধ। তবে ঘাটে যাবার এটাই সোজা রাস্তা। আর একটা রাস্তা ডান দিকে ঘুরে গেছে। সেদিকটায় বেশ বাজার মত। দু ধারে মনিহারি দোকান সাজানো। রাস্তার মুখেই গোটাকতক পানের মশলার দোকান। আজ্ঞে হ্যাঁ পানে যে মশলা দিয়ে খাই, সেই মশলার দোকান। এমন তার জাঁক জমক, দেখলে মনে হয় যেন গয়নার দোকান। তবে খ্যাতিতে বেনারসি পান, গয়নার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে বইকি। যদিও আমার মনে হলো, বেনারসি মঘাই পানের ঐতিহ্যে যেন কিঞ্চিত ভাটার টান লেগেছে। সে দোকানের পরেই একটা সিঙ্গাড়া কচুরির দোকান। এইখানেই রাস্তার ডান দিকে বাঁক সুরু, আর ঠিক এখানেই আপনার কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকবে একটা সাইনবোর্ড দেখে। রঙচটা লাল রঙের একটা বোর্ড। আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছেন, বিশ্বনাথের গলির ঠিক উলটো প্রান্তে ওটা সিপিআইএমের জোনাল অফিসই বটে। শুনলুম এই বাড়িগুলোর পেছন থেকেই কাশীর বিখ্যাত বাঙালিটোলার শুরু।

যাই হোক, ডান হাতি বাঁক নিয়ে এগোতে থাকলে ক্রমশঃ এ রাস্তাও সরু হয়ে আসে। বেনারসে সাধারনতঃ আর পাঁচটা হিন্দু তীর্থস্থানের মত আমিষ নিরামিষের ছুৎমার্গ নেই। যদিও রাস্তায় রাস্তায় যা বিক্রি হয় তার পনেরো আনাই নিরামিষ। আমিষ রয়েছে বটে, তবে একটু যেন তফাতে, একটু রেখে ঢেকে। গোধুলিয়া থেকে দশাশ্বমেধের রাস্তায় তো একেবারেই নেই। কিন্তু এ রাস্তায় আরো কয়েক পা এগোলে সন্ধ্যের দিকে একটা জিভে জল আনা গন্ধ পা্বেন। ডিম ভাজার গন্ধ। সামনেই দু খানা দোকানে ঝড়ের গতিতে ডিম ভাজা চলছে। ডিম সেদ্ধ ও পাওয়া যাচ্ছে। হাঁসের বা মুরগির, যেমন ডিম চান পাবেন। এরকম নির্ভেজাল ডিমের দোকান আমাদের এদিকে দেখিনি। সামনে রাস্তাটা আবার বাঁহাতি ঘুরে গিয়ে পড়েছে ঘাটের সিঁড়ি তে। সিঁড়ির ঠিক সামনেই একটা ছোট্ট মন্দির। ভেতরে হনুমানের মূর্তি। এ তল্লাটে হনুমান খুবই জাগ্রত দেবতা। সামনে দেখেছিলাম এক সুদর্শন ছোকরা জিন্সের প্যান্ট আর চামড়ার জ্যাকেট পরে দাঁড়িয়ে। পায়ে হাই হিল বুট, পকেট থেকে ঝুলছে হাল ফ্যাশনের রোদচশমা। ছোকরার বাবরি চুল কোঁকড়ানো, থাকে থাকে নেমে এসেছে ঘাড়ের ওপর। পান খেয়ে ঠোঁট দুটি রাঙা লঙ্কা, আর কপালে মস্ত এক খানা সিঁদুরের টিকা। আরো দু পা এগোলে বাঁ হাতি এক খানা চায়ের দোকান। সে দোকানের মালিক ও কর্মী একজনই গম্ভীর মুখের প্রৌঢ়। সম্ভব হলে এ দোকানে একবার চা খেয়ে দেখতে পারেন। কর্পূর আর তুলসীপাতা যে আমাদের চেনা চায়ে এতটা বৈচিত্র আনতে পারে তা আন্দাজ করিনি।

সিঁড়িতে পা রাখলেই ঘাটের চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকে পড়া। এতক্ষনের চেনা রাস্তার সঙ্গে কিন্তু ঘাটের কোন মিল নেই। রাস্তা পুরোপুরি বেনারসি, কিন্তু ঘাট একেবারেই আন্তর্জাতিক। এক আন্তরাষ্ট্রীয় বিমান বন্দর ছাড়া এই এত রকম জাতের জগাখিচুড়ি আর কোথাও দেখিনি। বাঙালি পরিবার আছে, খাস বেনারসের লোকজন আছে, আছে মঙ্গোলিয় মুখের লামা, আছে জাপানি ট্যুরিস্টের দল, আছে একলা আমেরিকান - চরস বা গাঁজার সাহায্যে কিঞ্চিত সাধনাতীত মোক্ষের লক্ষ্যে, আছে উত্তর ইয়োরোপের ইয়া ঢ্যাঙ্গা সোনালী চুলের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আছে ভাষা সমস্যায় পড়া ইতালিয়ান দম্পতি, আছে বাংলাদেশ থেকে আসা আজমিড়ের যাত্রি, আছে পাঠান, তাদের সিলওয়ার মেহেদি রাঙানো দাড়ি সমেত, খুব আশ্চর্য হলেও আছে কিছু আরব ট্যুরিস্ট, প্রধানত সিরিয়ান, এদের নিজেদের খাবারের দোকান ও আছে বেনারসে, আছে কোরিয়ান ব্যাবসাদার, আছে সাধু, আছে আরো সাধু, আধা-সাধু, সাজা সাধু, ভন্ড, দালাল, ভিখিরি, দোকানদার, ফুল ওয়ালি, নাপিত, পূরোহিত আরো কত কে তার ঠিক নেই। তবে এত রকমের লোকজন থাকলেও তাদের উদ্দ্যেশ্য কিন্তু মোটামুটি তিন রকম। প্রথম হলো ভক্তি ও গঙ্গা স্নান। এরাই হলো ঘাটের লোকজনের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশী। এর পর রয়েছে ফোটোগ্রাফারের দল। বিশালাকৃতির ক্যামেরা ও ভিষনদর্শন লেন্স সমেত তারা চারিদিকে ভনভন করছে। একটু সাজু গুজু করা সাধু, উদাস ভিখিরি বা ষাঁড় দেখলেই তারা ময়রার দোকানে মাছির মত ভিড় করে ঠেলাঠেলি করে ছবি তুলছে। এদের সিংহভাগই বিদেশি অথবা বাঙালি। তৃতীয় ভাগে আছে দোকানি, পুরোহিত, দালাল, মাঝি, নাপিতের দল। অর্থাৎ যারা প্রথম দলের ওপরে নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে।


ঘাটের সিঁড়িতে মাঝে মধ্যেই একটা করে চত্ত্বর মতো করা। সেখানে চৌকি পাতা। কিছু জায়গায় বাবাজিরা সেগুলো দখল করে আছেন। কিছু ফাঁকা। বসলে কেউ কিছু বলেনা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামলে ঘাটে লোকসমাগম বাড়ে। আস্তে আস্তে আলো জ্বলে ওঠে। ঘাটের ধাপগুলোতে লোকজন এসে বসতে থাকে। ফুলওয়ালিরা পুজোর ডালি নিয়ে ঘুরছে। একটা ছোট্ট চ্যাঙাড়ি, তাতে গোটা কয়েক ফুল, একটা ছোট্ট প্রদীপ। প্রদীপ জ্বেলে ওগুলো গঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে হয়। এ হলো সন্ধ্যার গঙ্গা পূজো। ভোরবেলায় অবশ্য স্নানার্থীরা কোমরজলে দাঁড়িয়ে, গঙ্গা জলেই গঙ্গাপূজো করেন। ভিড়ের বাড়তে থাকা গুঞ্জন একসময়ে হঠাৎ ধাক্কা খায়। ডুগ্‌ ডুগ্‌ করে ডমরু বেজে উঠেছে কোথাও। এক মুহর্ত পরে তার সঙ্গে যোগ হলো মৃদঙ্গ। বহুমুখি জনসমাগম এক লহমায় অ্যাটেনশন্‌ ভঙ্গি তে তাকালো সামনের চত্ত্বরের দিকে। দেখি সেখানে আবির্ভূত হয়েছেন জনা পাঁচেক পুরোহিত। পরনে পট্টবস্ত্র, উত্তরীয়, কামিজ। বেশ কায়দা করে পরা। বয়স সকলেরই ২৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে। একটা স্ট্যান্ডে মাইকের মাউথপিস লাগানো। সেখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে গান ধরলেন পাঁচজনে এক সঙ্গে। গঙ্গার স্তব জয় জয় গঙ্গে , জয় মা গঙ্গে। অবাক হয়ে দেখুন, চারিদিকে নানা জাতীর মানুষ চুপ করে বসে শুনছেন, এবং গান প্রথম বার অন্তরা ঘুরে এলে, অনেকেই আস্তে আস্তে গলা মেলাতে শুরু করেছেন। যেখানে পুরোহীতরা দাঁড়িয়ে তার ঠিক ডান দিকে একজন মহাকায় প্রৌঢ় একটা মোটা কাছি ধরে প্রানপনে টান লাগালেন। প্রথমটা বোঝা যায়না কি ঘটছে। তারপরে মাথার ওপরে ঢং করে বেজে ওঠে এক মহা্কায় ঘন্টা। তার পর এদিক ওদিক আর অনেক গুলো ঘন্টা বেজে ওঠে। সম্বিৎ ফিরে পেতে একটু সময় লাগে, তার পরে তাকালেই দেখাযায় পূরোহিতরা মাইকের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়েছেন। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখুন, ওনারা আলাদা আলাদা চৌকির সামনে গিয়ে বসেছেন। সেখানে বসানো অতিকায় পিলসূজ প্রদীপ, আরতীর জন্য। আরো কত কি।

এবারে আবার গান আরম্ভ হলো। ঘণ্টা এবারে তালে তালে বাজছে। পূরোহিতরা উঠে দাঁড়ালেন। হাতে একটা বড় আঙটা, যাতে কর্পুরের আগুন জ্বলছে। আঙটার মাপ প্রায় আমাদের ভাত খাবার থালার মতো। এবারে আরম্ভ হলো আরতী। পূরোহীতরা নেচে নেচে আরতী করছেন জ্বলন্ত আঙটা হাতে নিয়ে। প্রত্যেকের এক ভঙ্গি, এক মুদ্রা একই পদক্ষেপ। এতটাই তাল মেলানো, যে এর কাছে হয়ত সোনা জেতা অলিম্পিকের সিনক্রোনাইজড সুইমারও লজ্জা পাবেন। এ নাচের মধ্যে চটুলতা নেই, বরং আছে মনকে আচ্ছন্ন করা ছন্দ। আঙটার পর প্রদীপ, তারপর চামর। চারিদিকের থিকথিকে ভিড় তন্ময়, নিশ্চুপ। মায়ের কোলের বাচ্ছারাও কাঁদেনা। কেন কাঁদেনা, বলতে পারবো না। হয়তো এই অপার্থীব মুহুর্তের স্বাদ তারাও পায়। এ তো যুক্তি দিয়ে বোঝার ব্যাপার না। শুধুই অনুভুতি। এর মধ্যে ধর্ম নেই, ভগবান নেই, বিশ্বাস নেই। আছে শুধু ওই অনুভুতি। জাগতিক বাস্তব সমস্ত কিছুর বাইরে, কিছুর অস্তিত্ব। নিজের সম্পর্কে নতুন করে ধারনা তৈরি হওয়া। একদিকে আমি কে, আমার পরিচয় কি, আমি কোথা থেকে এসেছি এসব কিছু ভুলে যাওয়া, অন্য দিকে এই পরিবেশে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া। আরতীর শেষ। পুরোহীতরা গঙ্গায় ফুল ভাসালেন। ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় একজন পুরোহিতকে কেমন চেনা চেনা লাগলো। ও হরি, এ তো সেই হনুমান মন্দিরের সামনে দাঁড়ানো জিন্স পরা ছোকরা। ঠিক সেই মুহুর্তে আমার মনে হলো, আমরা সকলেই আসলে ওই জিন্স পরা ছোকরা। ওপর থেকে অনেক কিছু পরে আছি। এক এক রকমের আস্তরন। এক এক রকমের অহংকার, যা হয়তো আমার মধ্যে থাকা আসল আমিকেই ঢেকে ফেলেছে। যেদিন সেই আস্তরন, অহংবোধ থেকে মুক্ত করতে পারবো নিজেকে, সেদিন হয়ত চারিদিকের এই জগৎটাই আমার কাছে নতুন করে ধরা দেবে।

ঘাটের সিঁড়ি ধাপে থাপে নেমে গেছে গঙ্গার জল পর্য্যন্ত। ছলাত ছলাত করছে জল। ঠিক এইখানে এসে, বেনারসের যাবতীয় হই হট্টগোল থেমে যায়। এর সীমানা এই পর্যন্ত। এর পরেই আবহমানকালের গঙ্গা। হাজার বছর ধরে এই ভাবে বয়ে চলেছে। শত পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে। যদিও নিজে পাল্টায়নি একটুও। গঙ্গার ওপাড়ে ধু ধু বালিয়াড়ি। পশ্চিম দিকে রামনগর, দেখা যায়না। বেনারসের হইচই কে যেন ব্যালেন্স করে দিয়েছে ওপারের নৈশব্দ আর শান্ত সমাহিত রূপ। বেনারস যদি আবার যাই, তাহলে যাবো ঐ লোভেই, আর পারলে নিজের কয়েকটা আস্তরন খুলে ফেলে।

[যদি কেউ উৎসাহী হন, তাহলে লেখকের অপটু হাতের তোলা কয়েকটি ছবি দেখতে পারেন নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে

Sunday, May 19, 2013

ভাবনা চিন্তা ~ অমিতাভ প্রামানিক

চিত্রশিল্পী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তার নিজস্ব ফেসবুক পেজে আজ লিখেছেন - Tomorrow, on the 20th of May, our Government would complete two years in office.

সংবিধান বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী দলকে পাঁচ বছর শাসন চালানোর ছাড়পত্র দিয়েছে। তবুও পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্যে শাসনে অনভিজ্ঞ এই সরকারকে প্রথম দু বছর অতিবাহিত করার জন্য অভিনন্দন জানাতেই হবে। পরাজিত বামফ্রন্ট দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর গদিতে থেকে সরকারী অফিসকে প্রায় দলের পার্টি অফিস মতোই বানিয়ে বসেছিল বলে অনেকের অভিযোগ। সেই পার্টিকে বিপুল ভোটে হারিয়ে বর্তমান সরকার গদিতে বসার সময় অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন – যাক বাবা, বাঁচা গেল। এবার শান্তিতে বাঁচা যাবে। 

গত দু'বছর তাদের কতজন শান্তিতে বেঁচেছেন, তাদের সংখ্যা বেড়েছে না কমেছে, তার চিত্র আর কিছুদিন পরে পঞ্চায়েত ভোটে জানা যাবে ভোটের মার্জিন থেকে। 

পোস্টটির বাকি অংশে ফিরে আসি। আগাগোড়া ইংরাজীতে লেখা পোস্টটিতে মাত্র দুবার মা-মাটি-মানুষের উল্লেখ আছে, আর বাংলায় দুটো রবীন্দ্রনাথের কোটেশন। তার প্রথমটা হচ্ছে "আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তলে..."। মা-মাটি-মানুষের উদ্দেশেই নিবেদিত রবি ঠাকুরের এই গানের বাণী খুব প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ এখানে। রবিবাবু এই গান ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছিলেন। ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত প্রার্থনা সর্বসাধারণের প্রতি ব্যবহার করলে একটা অতিভক্তির ব্যাপার (কিসের লক্ষণ যেন এটা?) সহজেই চোখে পড়ে। বিশেষ করে যখন একের পর এক ধর্ষণের মত ঘৃণ্য অভিযোগের উত্তরে কেউ 'চক্রান্ত', 'ষড়যন্ত্র' বা 'সাজানো ঘটনা' বলে উড়িয়ে দেয়। তবে কি এটা সেই মানহারা মানবীদের উদ্দেশ্যে সমর্পিত? খোলসা করে বললে পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের সুবিধে হয়। 

দ্বিতীয় কোটেশনটি হচ্ছে "বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল / পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক…"। রবীন্দ্রনাথের এই দুটো লাইন বোঝাই যাচ্ছে অসম্পূর্ণতা দোষে দুষ্ট। বিস্ময়করভাবে এতে বাংলার মা এবং বাংলার মানুষের উল্লেখ নেই। দূরদর্শী কবি বোধহয় জানতেন এমন এক সময় আসবে যখন দৌরাত্ম-নির্ভর বাংলার গদিতে মা আর মানুষের প্রকৃতই অভাব ঘটবে। ওদের পুণ্য হওয়ার বাসনা থেকে তাই তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। 

দু'বার উল্লেখ আছে বিগত চৌত্রিশ বছরের অপশাসনেরও। হতাশ পরিস্থিতি থেকে পরিবর্তনের হাহাকার বর্তমান সরকারকে গদিতে বসিয়েছে। কিন্তু মাথার ওপর করের বোঝা (দু লক্ষ কোটি টাকার), সরকারী শাসনযন্ত্র সকলই বিকল। এই পরিস্থিতি থেকে মাত্র দু বছরে এই সরকার কী দুর্দান্ত ফল ফলিয়েছে তার খতিয়ান দেওয়া আছে এই পোস্টে।

বলা হচ্ছে কৃষি ও কৃষিসংক্রান্ত সেক্টরে, শিল্পে ও সার্ভিসে পশ্চিমবঙ্গের অগ্রগতি ভারতবর্ষের গড় অগ্রগতির দেড়গুণ। এই চার সেক্টরে ভারতের গড় বৃদ্ধি যেখানে ৫%, ১.৮%, ৩.১% ও ৬.৬%, রাজ্য এগিয়েছে সেখানে যথাক্রমে ৭.৬%, ২.৬%, ৬.২% ও ৯.৫% হারে। ফ্যান্টাস্টিক। শিল্পে রাজ্য এগিয়েছে, খুব খুশির কথা। কোন শিল্পে এগিয়েছে, সে প্রশ্ন এখন থাক। অমিত মিত্রের মত গুণী মানুষ যেখানে বসে আছেন, সেখানে ভাল কিছু আশা করা মোটেও অসঙ্গত নয়। গত দু বছরে অমিতবাবুর মুখ দিয়ে কোন কথাই শোনা যায় না, বস্তুত বর্তমান সরকারে তিনি কতখানি গুরুত্ব পান, সে নিয়েই বরং অনেক কথা এদিক ওদিক শুনতে পাওয়া যায়। আগের সরকার কথায় কথায় বলত, বিহারকে দেখুন, আমরা সে তুলনায় কত এগিয়ে। এখন অবশ্য এরা তা আর বলছেন না। বিহার বোধ হয় সব ব্যাপারেই নাক কেটে নিচ্ছে বাঙালীদের। 

এ বছরের রাজস্ব আদায় ৩২০০০ কোটি টাকার, গত বছরের তুলনায় যা ৩০% বেশী। এটা নাকি একটা রেকর্ড। তবে এর মধ্যে ২৬০০০ কোটি টাকা কেন্দ্রকে সুদ দিতেই বেরিয়ে গেছে (কেননা আগের সরকার ধার করেছিল), তাই উন্নয়ন খাতে পড়ে আছে তলানিটুকু।

বলা হয়েছে, বছরে ১০০ দিনের আবশ্যিক কর্মসংস্থান প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গ এখন ভারতের এক নম্বর রাজ্য। এই খাতে যা ব্যয় করা হবে ধরা হয়েছিল, সেই বাজেটেরও ৭% অতিরিক্ত (অর্থাৎ বাজেটের ১০৭%) খরচ করা হয়েছে। আগের সরকার খরচ করত বাজেটের মাত্র ১৭-২৩%। সকলেই জানেন, এই খরচ পুরোপুরি সরকারি যন্ত্র দিয়েই খরচ করা হয়। এই বিপুল অর্থরাশি কার পকেটস্থ হয়েছে, কতটা পেয়েছে দুঃস্থ মানুষ, তা খতিয়ে দেখলে অনেক চিত্তাকর্ষক জিনিস জানা যাবে। 

রাজ্য এখন বোরো চাষে, যাতে কম জলসেচে চাষ হয়, দেশের এক নম্বরে। চাষীদের ধন্যবাদ দেওয়া হয়েছে। চাষীভাই, অভিনন্দন তোমাকে।

রাজ্যে নাকি কর্মসংস্কৃতির তীব্র উন্নয়ন হয়েছে। বাংলা বন্ধ উঠে গেছে। সারা বছরে কর্মহানির পরিমাণ ৭৮ লক্ষ মানব-দিবস থেকে কমে হয়েছে মাত্র ৫ হাজারে। আপনি আমি সকলেই জানি – এটা একটা ডাহা মিথ্যে। চিত্রশিল্পী নিজে কাজের ফাঁকে ছবি এঁকে যে কর্মহানির উদাহরণ রেখেছেন, তা এই খতিয়ানে উঠে আসেনি। বাংলা বন্ধে অংশগ্রহণকারী স্কুল টীচারদের ওপর মাতব্বরির পরিসংখ্যানও এতে নেই। আগের সরকারের শাসনকালে মুহুর্মুহু বাংলা বন্ধের ডাক কারা দিত, সে সম্বন্ধেও মুখে কুলুপ। মিথ্যে কথা বলা একটা অভ্যাস। যে কোন বিষয়ে একটা মিথ্যে প্রমাণ হলেই অন্যগুলো নিয়ে চর্চা করার খুব প্রয়োজন হয় না। দুধওলা সোমবারে দুধে জল মেশালে মঙ্গলবারেও যে মেশাবে, তাতে আর সন্দেহ কী?

পরিশেষে সমাজের সর্বস্তরে – নারী, শিশু, ছাত্র, কর্মী, চাষী, শ্রমিক, মাইনরিটি সম্প্রদায়, মৎস্যচাষী, শিল্পী, স্বাস্থ্যকর্মী – সকলের উন্নয়নসাধনে রাজ্যসরকার নাকি ব্রতী হয়েছেন। হলেই ভাল। 

এই কথাগুলোই লেখা আছে। যা লেখা নেই, তা হল, টাটাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার পর কোন শিল্পসংস্থা পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগে রাজী নয়। যারা আছে, সুযোগ পেলেই কেটে পড়ার উপক্রম করছে। ভারতের ও বিভিন্ন দেশের শিল্পপ্রতিনিধিদের নিয়ে বেঙ্গল লীড্‌স্‌ নামে প্রহসন যে সামগ্রিক রাজ্যবাসীর প্রবল লজ্জার কারণ হয়েছে, তা কহতব্য নয়। ভাষা, প্রাথমিক ভুগোল, ব্যবহারবিধি ইত্যাদি বিষয়ে চূড়ান্ত অজ্ঞ একজনের শীর্ষাসনে বসে থাকা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে ব্যপক সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষিত মহলে। সাম্প্রতিক দুই সুদীপ্ত কাণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নেতৃবৃন্দের সামগ্রিক কোরাপশনের চিত্র জনসমক্ষে চলে এসেছে।

স্বাধীনতার সময় থেকেই বাঙালী সর্বভারতীয় স্তরে উচ্চশিক্ষায় সদাসর্বদাই এক অগ্রণী জাতি। সে গরিমা দিন দিন স্থিমিত হয়ে আসছে। তবু আত্মাভিমানী বাঙালী কতদিন তাদের শাসনের গদিতে এমন মানুষকে (মা-মাটির প্রসঙ্গ থাক) রাখবেন, যিনি কার সাথে কেমনভাবে কথা বলতে হয় তাই জানেন না, সেটাই এখন দেখার।

Wednesday, May 15, 2013

যাযাবর, তার দৃষ্টিপাত আর আমি .... ~ তমাল রাহা


প্রথম পর্ব:

আজও মুখস্ত কথাগুলি, হয়ত আরও অনেক বাঙালী ছেলের মতো, ........:প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা। কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন আলো দেয় না অথচ দহন করে, সেই দীপ্তিহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ হলেন কাণ্ডজ্ঞানহীন হতভাগ্য চারুদত্ত আধারকার।

ভাবা যায়? ...........

বয়সটা তখন ১৬-১৭, বইটা পড়তে পড়তে আমি নিজেকে যে কখন চারুদত্ত ভাবতে শুরু করেছিলাম, নিজেই জানি না! আসলে তখন বয়সটাই ছিল ঐরকম। সুন্দরী দেখলে মনের কোণে কথায় কথায় হেমান্তবাবুর গান বেজে ওঠে " আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি, আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি।"

আর বারবার পরা "দৃষ্টিপাত" এর সেই লাইনগুলো ........ যে নারী, প্রেম তার পক্ষে একটা সাধারণ ঘটনা মাত্র। আবিষ্কার নয়, যেমন পুরুষের কাছে। মেয়েরা স্বভাবত সাবধানী, তাই প্রেমে পড়ে তারা ঘর বাঁধে। ছেলেরা স্বভাবতই বেপরোয়া, তাই প্রেমে পড়ে তারা ঘর ভাঙ্গে। প্রেম মেয়েদের কাছে একটা প্রয়োজন, সেটা আটপৌরে শাড়ির মতই নিতান্ত সাধারণ। তাতে না আছে উল্লাস, না আছে বিষ্ময়, না আছে উচ্ছ্বলতা। ছেলেদের পক্ষে প্রেম জীবনের দুর্লভ বিলাস, গরীবের ঘরে ঘরে বেনারসী শাড়ির মতো ঐশ্বর্যময়, যে পায় সে অনেক দাম দিয়েই পায়। তাই প্রেমে পড়ে একমাত্র পুরুষেরাই করতে পারে দুরূহ ত্যাগ এবং দুঃসাধ্যসাধন।

পড়তাম, আর ভাবতাম প্রেম টা বোধহয় ছেলেদের জিন-এ আছে। তাই প্রেম পেতেই হবে ... যেনতেন প্রকারেণ।

জানি না বাকিরা একমত হবেন কিনা, তবে এই বইটা ছিল qoute -এর খনি। আমার নিজের সৌভাগ্য হয় নি সেভাবে এর সুযোগ নেওয়ার। তবে পরোক্ষ ভাবে কিছুটা হলেও কাজে লেগেছিল। একটু গুছিয়ে লিখতে পারতাম বলে বন্ধুদের অনেকের প্রেমপত্র লেখার ভার ছিল আমার ওপরে। সেখানে চুটিয়ে quote করেছি এই বইটা থেকে। উফফ, সে কি লেখা! আমার বন্ধুরা তো মুগ্ধ হতই, ওদের বান্ধবীরাও নিশ্চয় হতেন!

বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়  (যাযাবর), তার এই উপন্যাসের জন্যে এক অসাধারণ আঙ্গিক বেছেছিলেন। বিলেত ফেরত এক বাঙালী যুবক আসেন দিল্লি তে, ক্রিপস মিশন সম্পর্কে লেখার জন্য। কাজের ফাঁকে সে তার বান্ধবী-কে যে চিঠি লিখত তারই সংকলন এই উপন্যাসের আঙ্গিক। যুবক-এর নাম জানা যায় না। সবাই 'মিনি সাহেব' বলেই ডাকত। কি অসম্ভব সুন্দর বর্ণনা দিল্লি শহরের! আমি দিল্লি অনেক বড় হয়ে গিয়েছিলাম।কিন্তু শহরের অনেক কিছুই চেনা মনে হযেছিল 'মিনি সাহেব' এর দিল্লি-র বর্ণনা পড়ে। কিন্তু, এই লেখার বিষয় 'মিনি সাহেব' এর দিল্লির বর্ণনা নয়। কাজের সুত্রে মিনি সাহেব এর আলাপ হয় এক মধ্যবয়স্ক পুরুষ-এর, নাম চারুদত্ত অধারকার। আমার লেখার উপজীব্য আজ সেই চারুদত্ত অধারকার এর সাথে এক বিবাহিতা বাঙালী রমনীর 'ভালবাসা', কাছে আসা, আবার দূরে সরে যাওয়া। হ্যা, সুনন্দা বানার্জি-র কথাই বলছি, যার প্রেম চারুদত্ত অধারকার-এর জীবনকে দিয়েছিল ঐশ্বর্য্য আর প্রবঞ্চনা দিয়েছিল 'দাহ।

মারাঠি যুবক চারুদত্ত আধারকারের সঙ্গে এক বিবাহিতা বাঙালিনী সুনন্দার প্রেমকাহিনী। সুনন্দাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে আধারকার বাঙলা শিখলেন, পড়লেন রবীন্দ্রনাথ। সুনন্দাও অকুণ্ঠ চিত্তে আধারকারকে দিলেন তাঁর হৃদয়। আর মিনি সাহেব লিখলেন …..উভয়ের উদ্বেলহৃদয়ের গভীর ভাবাবেগ সমাজ-সংসারের সমস্ত ক্ষুদ্রতা ও কলঙ্কের উর্ধে দেবমন্দিরের পবিত্র হোমাগ্নির মত যেন জ্বলতে লাগল।

বিজ্ঞানের চোখে ভালোবাসা- "পেরেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট" "সারভাইভাল স্ট্রাটেজি" "ইনস্টীঙ্কট".... সাহিত্যের চোখে তা- "দিবস রজনী বেদনা"..... ধর্মের চোখে- "ব্যভিচ্যার".... আধ্যাত্মবাদিদের চোখে- "সাধনা"।
ফলে, যা হওয়ার তাই হলো। নিভে গেল সেই আগুনের শিখা। কেন? হ'তে পারে সুনন্দার  মোহমুক্তি …. কিম্বা কলঙ্কের দায়।মিনি সাহেব কি লিখছেন এরপর বান্ধবীকে তাঁর চিঠিতে?.... সে (সুনন্দা) নারী। প্রেম তার পক্ষে একটা সাধারণ ঘটনা মাত্র। আবিষ্কার নয়, যেমন পুরুষের কাছে.....তাই প্রেমে পড়ে একমাত্র পুরুষেরাই করতে পারে দুরূহ ত্যাগ এবং দুঃসাধ্যসাধন

সুনন্দা-কে ভালো লাগত। যদিও কখনই সে  "কালবেলা"-র অনিমেষের মাধবীলতা নয়। তবে ভালো লাগাটা কিন্তু নির্মল। আর, চারুদত্ত তো বাঙালী প্রেমিক-দের রোল মডেল! আসলে চারুদত্ত নাম-টাও বোধহয় এই উপন্যাসের একটা strategic choice ছিল।

স্বভাববসত-ই মিনিসাহেব, স্পষ্টতই পক্ষপাতদুষ্ট।  আর যাযাবর-এ লেখক প্রেম-এ প্রত্যাখ্যাত চারুদত্ত কে দিয়ে বলালেন ... , (আমি) পরিহাসকে মনে করেছি প্রেম; খেলাকে ভেবেছি সত্য। কিন্তু আমি তো একা নই। জগতে আমার মতো মুর্খরাই তো জীবনকে করেছ বিচিত্র; সুখে দুঃখে অনন্ত মিশ্রিত। .....তাদের , ত্রুটি, বুদ্ধিহীনতা নিয়ে কবি রচনা করেছেন কাব্য, সাধক বেঁধেছেন গান, শিল্পী অঙ্কন করেছেন চিত্র, ভাস্কর পাষাণখণ্ডে উত্কীর্ণ করেছেন অপূর্ব সুষমা

হয়ত চারুদত্ত ওই কথাগুলোর মধ্যে খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন সুনন্দা কে হারানোর সান্তনা। হয়ত বা তা ছিল 'মিনি সাহেব' এর চারুদত্ত-র ওপরে অন্ধ ভালবাসার আর মুগ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। বাঙালী কিন্তু চারুদত্ত অধারকার-কে নায়কের সম্মানই দিয়েছে। এযাবৎ অনেক বন্ধু বা পরিচিতকে দেখেছি "চারুদত্ত অধারকার" হতে, বিবাহিত বা অবিবাহিত মহিলার প্রেম-এ পরে। চারুদত্ত অধারকার তো তখন আমারও নায়ক। ভাবতুম, আহা আমি যদি চারুদত্ত-র মত গুছিয়ে বলতে পারতাম! নিদেন পক্ষে 'মিনি সাহেব' এর মত। এত প্রতিভাবান ব্যক্তি কেন তার ভালবাসা-কে পেলেন না, যত ভেবেছি ততই অবাক হযেছি। চারুদত্ত তো তখন সেই ট্রাজিক হিরো! গভীর অভিমান সুনন্দ দেবীর প্রতি ......... আর মনের মধ্যে ওই কথাটাই বারবার ঘুরেফিরে আসত ...

..........:প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা। কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন আলো দেয় না অথচ দহন করে, সেই দীপ্তিহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ হলেন কাণ্ডজ্ঞানহীন হতভাগ্য চারুদত্ত আধারকার।

কোনো কথা হবে না …..

আরেক চারুদত্ত-কে মনে পরে?
শূদ্রক রাজার রচিত 'মৃচ্ছকটিক' নাটকে  দেখা যায় চারুদত্ত নামে একজন সম্ভ্রান্ত ও উচ্চ শিক্ষিত ব্যাক্তি বসন্তসেনা নামে এক বারাঙ্গনার জন্যে শূলে মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করতে গিয়েছিলেন। যাযাবর-এর চারুদত্ত শূলে চড়ে মৃত্যুবরণ না করলেও দীপ্তিহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ  হয়ে হয়ে মরেছিলেন।

বাঙালী প্রেম-এ পরলেও খোজে রবীন্দ্রনাথ কে, আবার বিরহেও …..  আমার চারুদত্ত-এর কথা পড়তে গিয়ে তখন মনে হত সেই লাইন গুলি ….

…........ ছায়া ঘনাইছে বনে বনে,   গগনে গগনে ডাকে দেয়া।
কবে নবঘন-বরিষনে গোপনে গোপনে এলি কেয়া ॥
পুরবে নীরব ইশারাতে   একদা নিদ্রাহীন রাতে
হাওয়াতে কী পথে দিলি খেয়া--
আষাঢ়ের খেয়ালের কোন্‌ খেয়া ॥
যে মধু হৃদয়ে ছিল মাখা   কাঁটাতে কী ভয়ে দিলি ঢাকা।
বুঝি এলি যার অভিসারে   মনে মনে দেখা হল তারে,
আড়ালে আড়ালে দেয়া-নেয়া--
আপনায় লুকায়ে দেয়া-

আহা, চারুদত্ত-র জন্যে যে কত কষ্ট পেয়েছি ওই বয়সে!

বাংলা সাহিত্য আমার মতে শ্রেষ্ট দেবদাস কে জানেন? চারুদত্ত আধারকর।
মিনি সাহেব কিন্তু খুব সুন্দর ভাবে এই আবেগটা পাঠকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন। হ্যা, আমার মধ্যেও। মিনি সাহেব এর মত আমরাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছি তখন ... সত্যি হতভাগ্য চারুদত্ত আধারকার।
একটা সময় তো মনে হয়েছিল খুঁজে বের করি সুনন্দা বানার্জি কে। একবার জিগ্যেস করি "কেন এমন করলেন বলুন তো চারুদত্ত-র সাথে?"

সময় বদলেছে। এখন বয়সটা পাকা। তাই একটু অন্যভাবে ভাবি আজকাল। সুনন্দা বানার্জি-র নিশ্চয় কিছু বাধ্যবাধকতা ছিল। মিনি সাহেব যেটা আমাদের বলেন নি।

এখন আবার মনে হয় একবার সুনন্দা বানার্জি-র সাথে দেখা হলে মন্দ হয় না। তবে এবার কোনো প্রশ্ন করব না। শুধু শুনব, মিনি সাহেব শুধু চারুদত্ত-র কথাটাই বলেছিলেন। সুনন্দা দেবীর কথা কিন্তু শোনা হই নি আমাদের কারো! হয়ত ওনার-ও কিছু বলার ছিল, যা আমরা আজো জানতে পারি নি।  কিন্তু চারুদত্ত আধারকারের বঞ্চনার জন্য সুনন্দা কতটা দায়ী সে বিতর্ক এখনো আমার মনে রয়ে গেছে।

দ্বিতীয় পর্ব

লেখাটা আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। খাপছাড়া ছিল, কিন্তু কিভাবে শেষ করব জানা ছিল না। কিন্তু প্রথম পর্বটা ঘটনা চক্রে গিয়ে পরলো সুনন্দা বানার্জি-র হাতে। জিগ্যেস করতে হয় নি। সুনন্দা শোনালো তার কথা। আসলে সুনন্দ-র কথাগুলো আমায় বার ভাবাল। তাই ভাবলাম যে সুনন্দার ক´থাটাও লেখা দরকার।

সুনন্দা-ও খুঁজছিলেন কাউকে। কিন্তু সে বোধহয় মিনি সাহেবের "চারুদত্ত" নয়। হতে পারে সে "কালবেলা"-র অনিমেষ। এই সুনন্দা লেখাটা পরে বলল, কে বলেছে  যে  নারী মাত্রেই প্রেম-এ উল্লাস নেই? কে বলেছে যে তার কাছে প্রেম নিতান্তই সাধারণ ঘটনা?বিশ্বাস করি না . হ্যা, তবে এটা সত্যি যে নারী স্বভাবজাত সাবধানী ....

ঠিক এই ভাবে ভেবে দেখি নি। তবে একটা প্রশ্ন এলো মনে, নারী যদি সাবধানী হয় তবে শুরুতেই সে সাবধানী ছিল না কেন? নাকি সেটা ছিল চারুদত্ত বা মিনি সাহেব-এর বোঝার ভুল?

… সুনান্দারা ভাবে বোধহয় যে তাদের প্রেম-এ কেউ পরে না। তাই চারুদত্ত-দের সাথে  মেলামেশার সময় তার মাথায় আসে না যে এটা প্রেম। যখন সে বোঝে তখন তখন সে হয়ে ওঠে সাবধানী। কিন্তু যখন তারা সাবধানী হয়, তখন চারুদত্ত-কে বোঝার ক্ষমতাও থাকে না। না, আমি সুনান্দাদের দায়ী করছি না। this just mere ignorance from her side... অকপট স্বীকারোক্তি সুনন্দার ….

ঠিক তা নয়, আমার অপ্রতিরোধ্য দামাল স্বভাব সব উড়িয়ে দিতে চায়, জানো? বোধহয় কেমন একটা নিজের কাছেই লজ্জা পাই। তাই এসব আমল না  দেবার একটা স্বাভাবিক প্রবণতা আছে আমার। হয়ত, আমি চাই নি চারুদত্ত কে ! ভালোলাগা আর ভালবাসার ভেদ করে উঠতে পারি নি। এটাই আমার ভুল ….....
অস্বীকার করি না যে নারীসুলভ সাবধানতা থেকে হয়েছিলাম স্খলিত … ওটা একটা  টানাপোড়েন … টানা আর পোড়েন -এর মাঝে কখনো কখনো  সাবধানতা স্খলিত হয়। আমারও হয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে উপলব্ধি করেছিলাম এ সম্পর্কের কোনো পরিনতি নেই। মেয়েরা পরিনতি চায়। বোধহয় কেমন নিজের কাছেই লজ্জা পেয়েছিলাম ….......

পরের কথা গুলো  মনে দাগ কেটে গেল … সুনন্দা-র গলায় নির্মলেন্দু গুনের কবিতা-টা বড় অদ্ভূত সুন্দর শোনালো …

"বৃথাই বুকে পুষে বেড়াও গ্লানি
বৃথাই তুমি নিজেকে দাও দণ্ড;
দুই খণ্ডে সমাপ্ত যে-বইখানি
তুমি ছিলে মাত্র তার এক খণ্ড!!

… না গ্লানি নেই আমার কোনো। সেই মুহুর্তে  সেই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত।

এরপরই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পরে আজকের সুনন্দা, "কালবেলা"-র অনিমেষ কে কোথায় পাই বলো তো? তাহলে সত্যি আমি প্রেম-এ  পরবো এবার।

আজকের সুনন্দা। যে তার ভালোলাগা আর ভালবাসা কে আলাদা করতে জানে।

আজকের সুনন্দা। যে মিনি সাহেব এর লাগিয়ে দেওয়া ছাপ-এর থেকে বেরিয়ে এসে নিজের মত জানাতে দ্বিধা বোধ করে না।

আমি ভাবি সুনন্দা-রা কি বদলে গেছে? নাকি ´মিনি সাহেব´-এর বোঝার ভুল! কে জানে? …...

Thursday, May 9, 2013

রি ভিজিটেড ~ সৌমিক দাসগুপ্ত

ছিল শুধু মোর নোবেল অ্যাওয়ার্ড, সেটাকেও দিল ঝেড়ে
কপিরাইট ছিল, সেটার ও পিছন দিয়াছে শালারা মেরে ,
কভি নেহী শোচা, ভোটে উইনার, বাজাইবে মোর গান-
গানের সহিত অনুপান হয়ে আসিবে মদ্যপান।
ওরে চারিদিকে মোর, কারাগার ঘোর, কোথা মোর সে অমাত্য ?
শেষে কিনা বাল, ছাড়াইলো ছাল, সঙ্গীতময় 'ব্রাত্য' !
"মাসী" ডাক দিয়া, রাখাল আজিকে, খুঁজিতেছে তব চেম্বার,
তুমি কালীঘাটে, বিজি বড় আজ, সমুখে গুচ্ছ মেম্বার।
'শুভা' ও আজিকে একা এঁকে চলে কাগাসুর তার পটে
তুমি মহারানী, সাধু আজ জানি, এরা আজ ঝাঁট বটে।
কোথা হা হন্ত, চির বসন্ত, ফুটিয়াছে জোড়া ফুল-
মোর গান লয়ে টানাটানি করি, নাই বা ছিঁড়িলে চুল।
কে তুমি পড়িছ আমার কবিতা শতবর্ষের পরে,
কে আজ জানিত, মদনও পড়িবে কৌতুহলের ভরে।
যাহারা আমার মারিল দুম্বা, নিভাইলো মম আলো
ট্র্যাফিকে গাহিয়া, আবাল গুলোর মুখ করিতেছি কালো।



কালো ?? তা সে যতই কালো হোওওওওওওক

আজি হতে শতবর্ষ আগে ৩ ~ অমিতাভ প্রামানিক

তিন – বসন্ত তার গান লিখে যায়



আলফ্রেড নোবেল কে ছিলেন? তাঁর সম্বন্ধে এইটুকু তথ্য প্রায় সর্বজনবিদিত – তিনি একজন বিজ্ঞানী ছিলেন; ডিনামাইট আবিস্কার করেছিলেন; প্রচুর টাকাপয়সা রোজগার করেছিলেন; কয়েকটি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন, যার অর্থমূল্য ও সম্মান পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ। এর বাইরে ওঁকে নিয়ে সে রকম লেখালিখি বাংলায় খুব বেশি বোধ হয় হয়নি।

প্রশ্ন হল, বিজ্ঞানীই যদি ছিলেন, তাহলে সাহিত্যে পুরস্কার দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হলেন কেন?

সাহিত্য কথাটার অর্থ কী? অক্সফোর্ড ইংরাজী অভিধানে লিটারেচার শব্দের অর্থ হচ্ছে লিখিত কাজ বিশেষ করে যা উচ্চতর বা দীর্ঘস্থায়ী মেধার প্রকাশ হিসাবে বিবেচ্য। ওয়েব্‌স্‌টার ডিক্‌শনারী বলছে ফর্ম বা মত প্রকাশের শ্রেষ্ঠত্ব বহনকারী গদ্য বা পদ্যে লেখা এমন রচনা বা রচনাবলী যা স্থায়ী বা সার্বজনীন ধারণা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনুযায়ী সাহিত্য হচ্ছে স্বতন্ত্র উদ্দেশ্যপ্রসূত এবং নান্দনিক উৎকর্ষ ও কল্পনাপ্রবণ রচনার প্রয়োগধর্মী কবিতা বা গদ্যে লিখিত কাজ। 

এই যে অ্যাস্থেটিক এক্সেলেন্স বা নান্দনিক উৎকর্ষের কথা বলা হচ্ছে, ওটা ছাড়া গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস যাই লেখার চেষ্টা হোক, তা সাহিত্য বলে গণ্য হবে না। যে কোন বিষয়ে নান্দনিকভাবে উৎকৃষ্ট লেখা নিজস্ব ধারণায় ঋদ্ধ না হলে সম্ভব নয়। আর এই ধারণা অবশ্যই ছাপ ফেলে একজনের ব্যক্তিগত জীবনচর্চায়, আচরণে, ব্যবহারে। গান্ধীজী বলেছিলেন, আমার জীবনই আমার বাণী, তিনি যদিও সাহিত্যিক ছিলেন না। যে কোন সার্থক সাহিত্যিকের বাণী তার জীবনে প্রতিফলিত হবেই। সেই জন্যেই আলফ্রেড নোবেলের জীবনের কথা সাতকাহন করে বললাম। রবি ঠাকুরের জীবনের কথা বাঙালী পাঠকের কাছে বলার দরকার নেই, তা হবে মার কাছে মাসির গল্প শোনানো।

যারা ভাবছেন, কিন্তু গল্পটা তো রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার পাওয়া নিয়ে, আজ থেকে একশো বছর আগে যা ঘটেছিল, এর সঙ্গে নোবেলের জীবনের কী সম্বন্ধ? তাদের জন্যে বলি, আলফ্রেড নোবেল কোন হেঁজিপেঁজি লোক ছিলেন না। তিনি যে পাঁচখানা মালদার পুরস্কারের কথা তার উইলে লিখে গেছিলেন, তার বিষয় কী করে নির্বাচন করলেন? সায়েন্টিস্ট মানুষ, তিনটে সায়েন্সের বিষয়ে প্রাইজ দিতে ইচ্ছে হল – ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, মেডিসিন বা ফিজিওলজি – মেনে নেওয়া গেল। যুদ্ধে আক্রান্ত রাষ্ট্রসমূহ, হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, তার বিরূদ্ধে লড়ছে কিছু মানুষ, শোনাচ্ছে শান্তির বাণী, তার মধ্যে একজন যার প্রতি আলফ্রেডের ব্যক্তিগত দুর্বলতা ছিল, সুতরাং শান্তি পুরস্কার, তাও মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু সাহিত্য? আর আমাদের এই গল্পটা তো রবি ঠাকুরের পুরস্কার পাওয়াকে কেন্দ্র করেই যেটা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। এ প্রশ্ন কি সঙ্গত নয়, আর সব ছেড়ে আলফ্রেড নোবেল হঠাৎ সাহিত্যে পুরস্কার দিতে গেলেন কেন? কেমন সাহিত্য সেই পুরস্কারের হকদার?

এর উত্তর দেওয়ার আগে একটা কথা বলে নিই। একথা অনেকের জানা, তাও বাঙালি হিসাবে আমাদের একটু দুঃখ হবে এটা জেনে যে, অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে যে পুরস্কার পেয়েছেন তা আদৌ নোবেল পুরস্কার নয়। রবীন্দ্রনাথের লেখা এবং সুর করা গানগুলোই যেমন একমাত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত, পঙ্কজ মল্লিকের সুরে 'দিনের শেষে ঘুমের দেশে' যেমন রবীন্দ্রনাথের রচনা হলেও রবীন্দ্রসঙ্গীত নয়, তেমনি অমর্ত্য সেনের পুরস্কারের নাম 'আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতিতে প্রদত্ত ব্যাঙ্ক অফ সুইডেন পুরস্কার', নোবেল পুরস্কার নয়। ১৯৬৯ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কারের পেছনে অবদান আছে তাঁর দাদার প্রপৌত্র পিটার নোবেলের। অমর্ত্য একজন বিশ্বসেরা অর্থনীতিবিদ, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু আলফ্রেড নোবেল অর্থনীতি বিষয়টির সাথে এতটা সংশ্লিষ্ট ছিলেন না, এই বিষয়ে তিনি পুরস্কার ঘোষণা করেন নি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মধ্যেও তিনি পার্থক্য করে দিয়ে যাননি, ফলে বিজ্ঞানীরাই সাধারণভাবে এই পুরস্কার পেয়েছে, প্রযুক্তিবিদরা নন। গণিতে অসম্ভব পারদর্শী হলেও এই বিষয়ে কেন তিনি পুরস্কার ঘোষণা করেন নি, এটাও একটা প্রহেলিকা। তাঁর একজন জীবনীলেখক মতপ্রকাশ করেছেন, আলফ্রেডের প্রেমিকা তখনকার বিশ্বখ্যাত সুইডিশ গণিতজ্ঞ গোস্তা মিত্তাগ-লেফলারের সঙ্গে প্রেম করছিলেন, তাই নাকি গণিতের পুরস্কারের ব্যাপারে আলফ্রেডের বিতৃষ্ণা! বলা বাহুল্য এটা সর্বৈব ভুল। সুইডেনের রাজা দ্বিতীয় অস্কার অঙ্কশাস্ত্রের ওপর এক পুরস্কার চালু করেছিলেন। হতে পারে আলফ্রেড চাননি এই পুরস্কারের সঙ্গে তার পুরস্কারের অহেতুক প্রতিযোগিতা। তাছাড়া তিনি বিজ্ঞানের যে সমস্ত বিষয়ে পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন, সবগুলোতেই মানবজাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক আবিস্কারের জন্যে। হতে পারে তিনি ভেবেছিলেন গণিতিশাস্ত্র এত তাত্ত্বিক যে তাতে মানবজাতির ব্যবহারিক উন্নয়ন হয়ত সম্ভব নয়। 

আবিস্কারক বিজ্ঞানী হিসাবে পরিচিত হলেও আলফ্রেড নোবেলের সাহিত্যপ্রতিভা কিছু কম ছিল না। তার নিজস্ব লাইব্রেরীতে ১৫০০র অধিক বই ছিল, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের নিজস্ব ভাষায় লেখা ফিক্‌শনের সংখ্যাই বেশি, তার সঙ্গে দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান, কবিতা। আলফ্রেড নিজেও বেশ কিছু সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। যৌবনে তিনি লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা ও দুটো উপন্যাস। প্রথম উপন্যাস, I ljusaste Afrika অর্থাৎ উজ্জ্বলতম আফ্রিকায় যে বছর লেখেন, সে বছরই কলকাতায় জোড়াসাঁকোয় জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ। পরের বছর Systrarna বা ভগিনীরা নামে আর একটি উপন্যাস লেখেন আলফ্রেড। 

আলফ্রেডের সাহিত্যচর্চার শুরুটা কিন্তু ছিল বিচিত্র। ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়া বিশেষ হয়নি। মায়ের সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়ার পর শুরু হয় পড়াশুনা, মূলতঃ গৃহশিক্ষক রেখে। লাজুক, মুখচোরা ছেলেটি নিজে নিজেই ফরাসী ভাষা শিখে নিল ভলটেয়ারের লেখা অনুবাদ করে করে, প্রথমে ফরাসী থেকে সুইডিশ ভাষায়, পরে সেটাকেই আবার ফরাসীতে। সেই ফরাসী অনুবাদ তিনি ভলটেয়ারের মূল লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন। হোমারের মহাকাব্য Odyssey, পুশকিনের Eugene Onegin আর রাশিয়ান ভাষায় লেখা ইভান তুর্গেনেভের Home of the Gentry পড়ে ফেলেন তিনি এই সময়। মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি পাঁচটা ভাষায় গড়গড়িয়ে কথা বলতে পারতেন। ইংরেজ কবি ওয়ার্ডওয়ার্থ, শেলী আর বিশেষ করে বায়রণ তার ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল।

আলফ্রেডের ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে বায়রণের তের খণ্ড সোনার জলে বাঁধানো বই ছিল। তার প্রথম খণ্ডের ভেতরে কোন এক "হ্যারিয়েট"-এর হাতে লেখা একটা চিরকুট পাওয়া যায়, তাতে ফরাসী ভাষায় লেখা চার লাইনের একটা কবিতা। হ্যারিয়েট যে কে, কাকে উদ্দেশ্য করেই বা কবিতাটা লেখা, তা জানা যায়নি। হাতের লেখা আলফ্রেডের মতই, কবিতাটার বাংলা তর্জমা করলে এই রকম দাঁড়ায় –
আমি যখন থাকব না, কোরো
মধুর চক্ষে আমায় স্মরণ –
আমার হৃদয় নিয়ত পূর্ণ
তোমাতে, তার যে নাইকো মরণ।

জীবন সময়ের মতই এক গতিশীল বিস্ময়, প্রতিটি সাহিত্যিক তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকতে চান। রবীন্দ্রনাথের 'তবু মনে রেখো' বা 'আজি হতে শতবর্ষ পরে' মনে পড়ায় না? 

আলফ্রেড বলেছিলেন, যে নিঃসঙ্গ ব্যক্তির কাছে বই আর কালি নেই, সে জীবন্মৃত। সেই যে বার্থাকে লজ্জাবনত মুখে পড়তে দিয়েছিলেন একটা কবিতার কয়েকটা লাইন, সেটা ৩১৯ লাইনের আত্মজীবনীমূলক কবিতা, পুরোটা ইংরাজীতে লেখা। আঠার বছর বয়সে প্রথম প্যারিস যাত্রাকালে লেখা এই কবিতার শীর্ষক "You Say I Am A Riddle". এটা তিনি উৎসর্গ করেছিলেন এক 'lovely girl'কে, যে কিনা পূর্বযৌবনেই 'wedded to her grave'. তার চারটে লাইন এই রকম – 

তুমি বল আমি এক জটিল ধাঁধাঁ, হ্যাঁ, তা বেশ –
আমরা টুকরো সব ব্যাখ্যা-না-হওয়া যত ধাঁধাঁর।
শুরু যার যন্ত্রণায়, গভীর নির্যাতনে শেষ,
কী কাজ আছে যে এর, এই শ্বাস বহমান কাদার?

ধরে নেওয়া হয়, প্রথম যৌবনের এক নিরাশজনক প্রেমের পরিণতি এই কবিতাটি। পরে বার্থাকেও তিনি এটা পড়িয়েছিলেন, এবং সেখানেও সুবিধে করতে পারেন নি! দাদা রবার্ট তার প্রেমিকা পলিনকে এক চিঠিতে আলফ্রেডের সম্বন্ধে লিখেছিলেন যে আলফ্রেডের ধারণা তার প্রেমের কবিতা শুনে নিশ্চয় সুন্দরী ধনী যুবতীরা তারা পেছনে লাইন দেবে!

Night Thoughts নামে ইংরাজীতে লেখা আলফ্রেডের এক কবিতার প্রথম কিছু লাইন বাংলা করলে দাঁড়ায় –

যামিনীর জমকালো নীরবতা মুক্তি
দেয় আবদ্ধ আত্মার যত শৃঙ্খল –
সত্যান্বেষী চোখে ধুলো দিয়ে যুক্তি
স্বপ্নদর্শী হয়ে বলে, আয়, উড়ি চল।
এ কি প্রতারণা – বুঝবো কি কোন দিনও তা –
এত চঞ্চল করে চলে এই চিত্ত!
বন্য, সাহসী এই অধীনতাহীনতা
মনোমাঝে বাসা বাঁধে কিসের নিমিত্ত?

এই কবিতারই এক অংশে আলফ্রেড নিয়ে এসেছে ঈশ্বরকেও। জানতে চেয়েছেন ঈশ্বর কী করে সৃষ্টি হল, কী করে বেড়ে বেড়ে তাঁর এই জাগতিক দাপট, এও কি মধ্যরাতের শৃংখলহীন ধারণার মতই সৃষ্ট হয়ে ব্যপ্ত হয়ে গেছে জনমানসের অভ্যন্তরে? 

সৃষ্টি হয়েছে কার হাতে এই বিশ্ব? 
ধর্ম দেখাবে আঙুল, বলবে, ঈশ্বর!
তবে বলো দেখি তারও কে উপরওলা?
অনন্ত, শূন্য বা বিশৃংখলা?
অমর সত্তা উপ্ত হয় যে বীজে,
মধ্যরাত্রে বেড়ে চলে তারা নিজে,
তারা প্রাণহীন, তবু কী করে সে ইষ্টের
ক্ষমতা, শক্তি সার্বজনীন অদৃষ্টের!

বিজ্ঞান ও ব্যবসা নিয়ে নিয়ত ব্যস্ত নোবেল সময় সুযোগ পেলেই সাহিত্য রচনায় বসে যেতেন। যখনি মনের কোণায় উঁকি দিত, এই বুঝি ব্যবসা লাটে উঠবে – বাবাকে একাধিকবার এরকম ঘটাতে দেখেছেন – তখনি ভেবেছেন ব্যবসা বন্ধ করে পুরোপুরি সাহিত্যের জগতে ঢুকে পড়বেন। প্যারিসে জুলিয়েট অ্যাডাম ল্যাম্বার নামে একজন এক প্রকাশনা সংস্থা চালাতেন, নোবেল ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ। জুলিয়েটের বাড়িতেই তার মোলাকাৎ হয় ভিক্টর হুগোর সাথে, যার প্রতি প্রবল অনুরাগ জন্মে আলফ্রেডের। সম্ভবত এই বাড়িতে তিনি দেখা পেতেন পিয়ের লতি, পল বর্জে আর মোপাসাঁরও। ভিক্টর হুগো প্যারিসের যে পাড়ায় থাকতেন, সেখানেই কয়েকটা বাড়ির পাশে আলফ্রেড সোফির জন্যে একটা বাড়ি কিনে দিয়েছিলেন। শান্তিকামী বার্থার কল্যাণে ফরাসী বিখ্যাত সাহিত্যপত্রিকার সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল আজীবন।

বিভিন্ন ভাষায় আলফ্রেড বেশ কিছু কবিতা লিখে গেছেন, অনেকগুলিরই সাহিত্যমূল্য অপরিসীম। জীবনের শেষপর্বে The Nemesis নামে একটা ট্রাজেডিমূলক নাটক লিখেছিলেন, তাতে অবশ্য বেশ কিছু অংশ আলফ্রেডের বর্ণময় জীবনের সঙ্গে মানানসই নয়। এটির শতাধিক কপি ছাপানো হয়েছিল, কিন্তু মাত্র তিনটি কপি বাদে বাকিগুলি নষ্ট করে ফেলা হয় তার পরিবারের অনুরোধে।

আলফ্রেড নোবেল এমন কিছু উদ্ধৃতি দিয়ে গেছেন, যেগুলো সর্বকালের কোটেব্‌ল্‌ কোটের তালিকায় থাকার মত। তার এই ওয়ান-লাইনারগুলোতে কটাক্ষময় বাক্যের অভ্যন্তরে লুকানো এক ভয়ঙ্কর অপ্রিয় সত্য ছিল। টুইটারের যুগে এইসব লাইনগুলোর মূল্য অপরিসীম। কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি –
• পাকস্থলীকে অনুনয় বিনয় করে খাদ্য হজমে যতটা বাধ্য করা যায়, হৃদয়কে তার চেয়ে বেশি ভালবাসতে বাধ্য করা যায় না।
• কৃষিবিদ্যার পরেই হামবাগ বা ভান হচ্ছে আমাদের সময়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্প।
• আমরা বালির ওপরে স্থাপত্য বানাই; যত আমাদের বয়স বাড়ে, ততই ভঙ্গুর হয়ে যায় এর ভিত।
• সত্যনিষ্ঠ মানুষ সাধারণতঃ একজন মিথ্যাবাদী।
• ন্যায়বিচার একমাত্র কল্পনাতেই পাওয়া সম্ভব।
• সম্মানিত হওয়ার জন্য সম্মানযোগ্য হওয়ার প্রয়োজন নেই।
• চিন্তাই পাকস্থলীর সবচেয়ে খারাপ বিষ।
• হেরো লোকদের প্রধান অজুহাত হচ্ছে বিচারপতিও ওদের মতই একজন।
• অন্যকে সম্মান না দেওয়া আত্মসম্মান হল এমন রত্ন যা দিনে দেখা যায় না।
• আশা হচ্ছে সত্যের নগ্নতা ঢাকবার জন্যে প্রকৃতির ঘোমটা।
• মিথ্যাই সর্বশ্রেষ্ঠ পাপ।
• আমার কাছে বাড়ির অর্থ যেখানে আমি কাজ করি, আর আমি সর্বত্র কাজ করি।
• বই-কালি ছাড়া নিভৃত জীবন একটা মৃত মানুষের জীবন।

জীবন সম্বন্ধে প্রকৃত ও কৌতুকময় ধ্যানধারণা না থাকলে এমন উদ্ধৃতি দেওয়া অসম্ভব।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে সাহিত্য সম্বন্ধে আলফ্রেড নোবেলের নিজস্ব ধারণা আর ব্যক্তিগত আকর্ষণ প্রবলভাবে ছিল। বাবা-মা জোর করে বিজ্ঞান আর ব্যবসায় ঢুকিয়ে না দিলে তিনি বেশ বড়মাপের একজন সাহিত্যিক হতেন, সে রকম ইচ্ছেও ছিল তাঁর। বস্তুতঃ পাঁচটা পুরস্কারের মধ্যে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন আর চিকিৎসাবিদ্যা বা শরীরতত্ত্ব – এই তিনটে বিজ্ঞানসংক্রান্ত বিষয় ছাড়া বাকি দুটোর ক্ষেত্রে তিনি বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন তাঁর উইলে। সাহিত্যের ব্যাপারে তিনি যোগ করেছিলেন এক অতিরিক্ত বিশেষণ, এই সাহিত্য হতে হবে আইডিয়াল বা আদর্শ অভিমুখী। আদর্শের সংজ্ঞা তো আর এক বিতর্কের বিষয়, বিশেষ করে তা যদি হয় সাহিত্যের প্রতিপাদ্য। নোবেল কমিটি তাই আইডিয়ালকে আইডিয়ালিস্টিক বা আধ্যাত্ম-অভিমুখী বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নেয়। হেনরিক ইবসেন বা লিও টলস্টয় বিশাল মাপের সাহিত্যিক হলেও সেই সময়ের বিচারে তাঁদের রচনা আধ্যাত্ম বা আদর্শ-অভিমুখী বলে বিবেচ্য হয়নি, তারা এই পুরস্কারের মনোনয়নই পাননি। 

১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। সাহিত্যে প্রথম এই পুরস্কার পান ফরাসী কবি সুলি প্রুদোম। মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় প্রুদোম সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান, যদিও তার লেখনী সচল থাকে। তার শ্রেষ্ঠ কাব্য হ্যাপিনেস মহাকাব্যের মর্যাদাপ্রাপ্ত, এটা লেখার সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল সাতাশ বছর। পরের বছর এই সম্মান পান জার্মান পণ্ডিত ও ঐতিহাসিক থিওডর মমসেন। জার্মানীর লাইপেজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক পঁয়তিরিশ বছর বয়সে সুইজারল্যাণ্ডের জুরিখে চলে যান। সেখানে তার বাসনা জাগে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীতে রোমের ইতিহাস লেখার। সেই হিষ্ট্রী অফ রোমের জন্যেই তার নোবেল পুরস্কার। নরওয়ের নাট্যকার ইয়র্নস্টার্ণ ইয়র্নসেন ১৯০৩ সালের নোবেল বিজেতা। তার পরের বছর এই পুরস্কার পান যুগ্মভাবে ফরাসী ফ্রেদেরিক মিস্ত্রাল ও স্পেনের হোসে এচেগারাই। পোল্যাণ্ডের ঔপন্যাসিক হেনরিক শিনকিয়েউইচ পান ১৯০৫-এর পদক, পরের বছর ইতালীয় কবি জিওসুয়ে কার্দুচ্চি। ১৯০৭-এর নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইংরেজ সাহিত্যিক রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর জন্ম ভারতের মুম্বইতে। শিশুসাহিত্য দ্য জাঙ্গল কিং তাকে অমর করে রেখেছে। জার্মান দার্শনিক ও সাহিত্যিক রুডল্‌ফ্‌ ক্রিষ্টফ ইউকেন, সুইডিশ ঔপন্যাসিক সেলমা লাগেরহফ, জার্মান সাহিত্যিক ও অনুবাদক পল জোহান লুডুইগ ফন হাইসে, বেলজিয়ান নাট্যকার, কবি ও প্রাবন্ধিক মরিস মেটারলিঙ্ক (ইনি ফরাসী ভাষায় লিখতেন) ও জার্মান নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক গেরহার্ট হাউপ্টম্যান পান যথাক্রমে ১৯০৮ থেকে ১৯১২ সালের পুরস্কারগুলি। সেলমা প্রথম মহিলা নোবেল পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক। আলফ্রেডের ভাইঝি সেলমার লেখা Gosta Berling's Saga নামে এক উপন্যাস আলফ্রেডকে পড়তে দিয়েছিলেন তার জীবিতকালে, যা পড়ে আলফ্রেড মোহিত হয়ে যান, সেকথা তিনি এক বন্ধুকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন।

বারো বছরকে এক যুগ ধরা হয়। নোবেল পুরস্কারের প্রথম যুগের অন্তে দ্বিতীয় যুগের শুরু হল আজি হতে শতবর্ষ আগে যে সাহিত্যপুরস্কার দিয়ে, সেটাই উঠে এল বঙ্গকুলতিলক, আমাদের নিভৃত প্রাণের দেবতা রবীন্দ্রনাথের হাতে। ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক রবীন্দ্রনাথের লেখালিখি অধিকাংশই বাংলায়। গীতাঞ্জলির ইংরাজী অনুবাদ, যার জন্যেই মূলতঃ এই পুরস্কার, মোটেও ততদিনে লেখা রবীন্দ্রনাথ-বিরচিত সমগ্র সাহিত্যের প্রতিনিধি নয়। তা সত্ত্বেও তিনি পিছনে ফেলে দিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে ব্রিটিশ জনপ্রিয় সাহিত্যিক টমাস হার্ডিকে, নোবেল পুরস্কার যার অধরাই রয়ে গেল। জনপ্রিয় ইংরেজ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েট্‌স্‌, যিনি রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির অনুবাদে প্রভূত সহায়তা করেছিলেন এবং হয়ে গেছিলেন কবির বন্ধুদের একজন, তাকেও অপেক্ষা করতে হল আরো এক দশক নোবেল পুরস্কার পেতে। পিছনে ফেলে দিলেন ইওরোপের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও দার্শনিক রোমা রঁল্যা এবং জর্জ বার্ণার্ড শ'কেও। কবির বয়স তখন সাড়ে বাহান্ন বছর। 

এতগুলো নামীদামী ব্যক্তিত্বকে অতিক্রম করে কিভাবে সম্ভব হল এই পুরস্কারপ্রাপ্তি? কোথা থেকে এল পাশ্চাত্য সাহিত্যে অপেক্ষাকৃত অনামী এই কবির প্রতি সমর্থন? সে কাহিনী পরের সংখ্যায়। (ক্রমশ)
 — 

আগের ঃ

এক – বাজিলো কাহার বীণা http://pnachforon.blogspot.in/2013/03/blog-post.html
দুই – যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে http://pnachforon.blogspot.in/2013/03/blog-post_3.html