রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

হোককলরব ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


ফোর্ট কালিঘাটে, মাটির ৩০ ফুট নিচে খুবই সুরক্ষিত এক বাঙ্কারে, নিজের ঘরে বসে তিনি খবর নিচ্ছিলেন। পাশের ঘরে কয়েকজন খ্যাতনামা প্রযুক্তিবীদ ও ভূবিদ্যাবিশারদ এক খানা অত্যাধুনিক সিজমোগ্রাফ নিয়ে বসে আছেন। সিজমোগ্রাফ, যা ভুমিকম্প মাপে। স্বভাব বশতঃ অধৈর্‍য্য হয়ে তিনি উঠে আসছিলেন বার বার। জিজ্ঞেস করছিলেন
ধরা গেছে? কম্পন ধরা গেছে?

প্রযুক্তিবীদরা ওঘর থেকে হাওয়াই চটির ফট্‌ফট্‌ শুনলেই আরো বেশি করে মন দিচ্ছিলেন কাজে। মুন্ডু যতক্ষন আছে, মুন্ডুর ভয় ও আছে। সর্বহারা-হাভাতে হলে হয়ত ভয় ও থাকতো না।

কিন্তু কোথায় কি? সিজমোগ্রাফের কাঁটা নড়ে না। সাদা কাগজের ওপর শুধুই সমান্তরাল রেখা। ওদিকে কেষ্টাপো (মানে, যে গেষ্টাপোরা অনেকটা কেষ্ট মন্ডলের মত স্বভাব চরিত্রে), সদর দফতরে কর্পুর-কায়স্থ, মানে যে কায়স্থর চরিত্র কর্পুরের মত, মিনিটে মিনিটে রাডার নিরিক্ষন করছেন, আর খবর দিয়ে চলেছেন ফোর্ট কালিঘাটে – মিছিল বিড়লা ছাড়ালো, এবারে পার্ক স্ট্রিট, আরো এগোচ্ছে।

কাঁপছে? কাঁপছে? কাঁপুনি ধরা পড়লো? অধীর হয়ে তিনি আবার হানা দিলেন পাশের ঘরে।
না ম্যাডাম। এখনো কাঁপেনি। ধরা পড়েনি কম্পন।

মিছিল মেয়ো রোড। সিজমোগ্রাগ এখনো নিস্তরঙ্গ। মিছিল এবারে রাস্তায় বসে পড়েছে। আর এগোবে না।

বলিনি? আমি বলিনি? কলকাতা কাঁপবে না আগেই জানতাম। অতই সোজা? বললেই হলো মিছিলে কলকাতা কাঁপাবে?

তৃপ্তির হাসি হাসলেন তিনি। তাঁর ওপরে খবরদারী করবে এত সাহস এই কয়েক হাজার কচি ছেলে মেয়ের? কিন্তু খটকা একটাই। ধোলাই খাবার পরেও হিম্মত হলো কি করে এদের? ধোলাই তো সর্বত্র দেওয়া হচ্ছে। এখানে ওখানে। পাড়ায় পাড়ায়। রাস্তা ঘাটে। প্রতিষ্টানে, মাঠে ঘাটে। আচ্ছা, আজকে এই যাদবপুরের খোকা খুকু দের দেখে আগামী কাল যদি পাড়ায় পাড়ায় শহরে গ্রামে এই জিনিষ শুরু হয়? তাহলে......... তাহলে ??? কপালে বিনবিনে ঘাম, পা গুলো কেমন অসাড় লাগছে। হাঁটু গুলো...... হাঁটু গুলো............

পাশের ঘর থেকে চিৎকার শোনা গেল –
কেঁপেছে কেঁপেছে।

সিজমোগ্রাফের কাঁটা গুলো ভিষন ভাবে কাঁপতে কাঁপতে সাদা কাগজের ওপর হিজিবিজি টেনে লিখে যাচ্ছিলো

"হোককলরব" "হোককলরব" "হোককলরব" "হোককলরব"....


শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

গেঞ্জি পুলিশের সওয়াল-জবাব ~ অনামিকা

গেঞ্জি পুলিশ গেঞ্জি পুলিশ, তোমার হাতে কি?
শক্ত বাঁশের পোক্ত লাঠি, লুকিয়ে রেখেছি।


কে ডেকেছে পুলিশ তোমায়, গভীর হলে নিশি।
-সবাই জানে, তিনিই মহান শিক্ষারত্ন ভিসি।


উর্দি কোথায়? তোমার গায়ে গেঞ্জি, পায়ে চটি।
-বন্ধু, ইয়ে গুন্ডাও যে এসেছিলেন ক'টি।


অমন করে মারলে পুলিশ? ছিঁড়লে গায়ের বস্ত্র?
-কী আর করা।ওরা তো সব মাওবাদী সশস্ত্র।


অস্ত্র কোথায়? গাইছিলো গান। শুনতে পাওনি পুলিশ?
-শিক্ষাই যে অস্ত্র ও'দের, কেমন করে ভুলিস?


শুনতে পাচ্ছো, হাইকোর্টও বলেছে শেম শেম।
-এটাই তোদের ডেমোক্রেসির চূড়ান্ত 'পবলেম'!


ছাত্রীদেরও ডলতে লজ্জা পাওনি পুলিশ ভাই?
-সবগুলো লাইট একসঙ্গে নিভিয়েছিলাম তাই।


ক্যামেরাকেও ভয় করোনি। সত্যি তুমি ভিলেন?
-প্রেসকে মিছে বলতে তিনি শিখিয়ে দিয়েছিলেন।


কে সেই তিনি। বলো পুলিশ, নামটা শোনাও তার।
-বলা বারণ। ডাকনাম তাঁর, মহিলা হিটলার।

শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

তাহলে দাঁড়াল কি? ~ সংগীতা দাশগুপ্তরায়

​একদল বাঘা বাঘা ছেলে মেয়ে একটা নেংটি ইঁদুরকে ঘিরে বিক্ষোভ করছিল এবং আলোচনা করছিল নেংটিকে মেরে তার ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে কতগুলো জুতো বানানো যাবে। নেংটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সিংহসম পুলিশ বাহিনীকে তলব দেয়। পুলিশ আসে সহানুভূতি আর ভালবাসায় বোনা সাদা গেঞ্জী পরে। আসার সময় তারা প্রচুর 'বহিরাগত মাওবাদী' কে দ্যাখে কিন্তু অতিথি দেবো ভবঃ ভেবে তাদের ইগনোর করে ভেতরে চলে যায়। কেউ কেউ অবশ্য ঝটিতি বহিরাগত মাওবাদীদের হাতের অস্ত্রগুলির ছবি তুলে নেয় মোবাইলে যাতে সান্টাকে দেখাতে পারে এই ক্রিসমাসে তাদের ছেলেমেয়েদেরও ওমনি অস্ত্রশস্ত্র চাই। এর পর তারা ক্যাম্পাসে ঢুকে মিষ্টি হেসে ছাত্রদের হাতে মার খায়। অসব্য ছাত্রগুলো আগে পুলিশ-মার খেলা খেলে তারপর নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করে। পুলিশ তখন ওদের খেলে ভেঙ্গে "রাত হয়েছে, শুবি আয়" বলে কোলে করে থানায় নিয়ে যায়।



সম্পূর্ণ ঘটনা শুনে আমাদের মাননীয়া বলেন এসব হল তিল কে তাল করা। এটা উনি ঠিকই বুঝবেন কারন বিরোধী থাকা কালীন উনি তিল থেকে তাল বানিয়ে সে তালের বড়া বানিয়ে বানিয়ে সারাদিন রাইটার্সে ছুঁড়ে মারতেন তাই তাল দেখে তিল চিনে বার করায় ওনার প্রতিভা প্রশ্নাতীত। 

আপাতত উনি ওনার দুই সহচরী নিলীমা ও সফেদা (যাদেরকে ফালতু জনতা জুন আর লকেট বলে ডাকে)কে বলেছেন সব তিল বয়ামে তুলে রাখতে। প্রতিবছর হতভাগ্য কবি, গায়ক, নায়কদের নিয়মমাফিক তিলকাঞ্চনে সেগুলো ব্যবহার করা হবে।

সফেদি কি চমকার পুলিশ খোকারা এখন যাদবপুর, আনোয়ার শাহ, বাইপাস মোড়ে শান্ত হয়ে বসে লোক দেখছেন এবং ভাবছেন ফুটেজে কি রাণীমা আমাকে দেখতে পেলেন? দেখতে পেলে এক কুনকে "লাভের গুড়" তো বাঁধা...
পুঃ - কায়েতের পো এখন ক্যাম্পাসে ঝাঁট দিয়ে বাকি তিল কুড়িয়ে নিয়ে তা পিষিয়ে তেল বার করে দুবেলা রাণীর পায়ে মাখাচ্ছেন... মাঝে মাঝে হাত কেঁপে যাচ্ছে বটে তবে তা ভয়ে না ভক্তিতে তা ঠাকুর জানেন ।

#hokkolorob

বৃহষ্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

জে ইউ ভিসি ~ অমিতাভ প্রামাণিক

​খুকুর 'পরে রাগ করেছো,
ভাংলো বলে তেলের শিশি?
মেরুদন্ড ভাংছে দেখো
ধেড়েখোকা জে ইউ ভিসি,
তার বেলা?

_________________________________________

ভিসির ঘরে ছাত্র ছিল জনা ঊনিশ-কুড়ি।
ভিসি হাঁকেন, ওরে, আমার ল্যাজ গিয়েছে চুরি!
ল্যাজ হারানো? আজব কথা! তাও কি হয় সত্যি?
ল্যাজখানা তো তেমনি আছে, চুল-টুল সব ভত্তি।
সবাই তাঁরে বুঝিয়ে বলে, শুধরে দিয়ে ভুলকে,
আসছে রাণী, ল্যাজ নেড়ে তার চরণ দিও চুলকে ...


রেগে আগুন, তেলে বেগুন, তেড়ে বলেন ভিসি,
ল্যাজ হারালো আমার, তোরা ডাকিস নিরুপিসি!
লতানো পুঁইডাঁটার মত বাঁকানো রামধনু,
এমন ল্যাজ তো রাখতো জানি রামায়ণের হনু।
এ ল্যাজ যদি আমার বলিস, উড়াবো সব খুলি।
এই না বলে ক্যাম্পাসেতে ডেকে নিলেন পুলিশ।



__________________________________________

ছাত্রনিধন-যজ্ঞ চলে, কলকাঠি তার নাড়ছেটা কে?
কোন সাপে খায় দুধকলা সেই মধ্যরাতের বিছনা ফুঁড়ে?
পালিয়ে তোরা বাঁচবি কদিন, ঢিল মেরেছিস যে মৌচাকে -
রাস্তাগুলো সব চিনে রাখ, মিলবে দেখিস যাদবপুরে।

 

বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বলো বাবা বিশ্বকর্মা মাইকি জয়!! ~ শ্রুতি গোস্বামী

বাবা বিশ্বকর্মার পুজোর দিনে কিছু টুকরো টুকরো ঘটনার মন্তাজঃ

১। সকালে বাবার পুজোতে গলা ফাটিয়ে মাইক বাজিয়ে যে গান গুলি বাজছে তার কিছু নমুনাঃ "তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণ যাত্রা যেদিন যাবে","মা গো,ভাবনা কেন,আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে"(সকাল থেকে আমার ঘুমের অশান্তি ঘটিয়ে),"আমায় একটু জায়গা দাও মায়ের মন্দিরে বসি"( বাবার পুজোয় মায়ের গান এ উৎসাহ দেখে বুঝলাম এ রাজ্যে মায়ের আরাধনা এবং শ্লিলতাহানি দুটোই সমান উৎসাহে চলে)। সেই শ্লিলতাহানি ধামাচাপা দিতে ছাত্রদের লাঠি চার্জ করা হয়।পুলিশ এবং গুন্ডাদের আলাদা ট্রেনিং দেওয়া হয় কিভাবে মহিলাদের কে আরেস্ট করতে গেলে তাদের বুকে হাত দিয়ে টেনে হাতকড়া পড়াতে হয়।যাতে মায়ের শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলেরা শান্তি বজায় রাখতে পারে।

২। অফিসে সবাই বাবা কে হাত জোড় করে প্রার্থনা জানালো,৪৯% ডি এ টা এবারে দিয়েই দেওয়া হোক,আর পারা যাচ্ছে না।কেও কেও আবার এক কল এ টেন্ডার ম্যাচিওর করে দেওয়ার আর্জিও জানালো।

৩। আজকে রাজ্য মাতাল দিবসের নাম রাখার প্রচেষ্টার কোনো ত্রুটি দেখলাম না।বাড়ি ফেরার সময় গাড়িতে যেতে যেতে দেখলাম একটি লোক এইচ পি এল লিঙ্ক রোডের পাশে সাইকেল সমেত উলটে পড়ে আছে,এবং সেখানেই শুয়ে শুয়ে মোবাইলে কিসব মেসেজ পাঠাচ্ছে কাওকে।তার ওঠারও ক্ষমতা নেই।

৪। রাস্তার দু ধারে বাবার প্যান্ডেল খাঁ খাঁ করছে,সবাই বাবার নামে এ দু পেগ চড়াতে গেছে।

৫। একটি মাতাল পুরোহিত কে দুটি লোক মোটরসাইকেল এ মাঝখানে চেপে ধরে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও।তাদের বোধহয় তখনও পুজো হয়নি।মাল খেতে ব্যস্ত ছিল।

৬। বলো বাবা বিশ্বকর্মা মাইকি জয়!!

লড়াই চলবে ~ অবিন দত্তগুপ্ত

আজকে কিছুই হয়নি এমন ভাব দেখাতে অস্বস্তি হয় । অতএব লিখি ।

আজকের উপনির্বাচনের ফলাফল খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয় বোধহয়, এবং যা বোঝায় তা দক্ষিনপন্থার সংহত হওয়া এবং বাম্পন্থার পিছু হটা ছাড়া অন্য কিছু নয় । লাখ লাখ মানুষ সর্বস্বান্ত, সরকারি কর্মীরা ডি এ পাচ্ছেন না । পরিবহন শ্রমিকদের মাইনে নেই । কারখানা বন্ধ হচ্ছে , ছাত্র খুন হচ্ছে, মেয়েদের উপর নির্যাতন বাড়ছে , একের পর এক মন্ত্রি চোর প্রমাণিত, কিন্তু এ সব বিষয় ভোট হল না । হল, ধর্মীও বিভাজনের উপর ভিত্তি করে । অর্থাৎ দক্ষিনপন্থা তার পায়ের তলার মাটি শক্ত করল । এই হারটা, রাজনৈতিক । কিন্তু শ্রেণী রাজনীতির হার নয় । কেন ?

কারণ বহুদিন ধরে আমাদের রাজনীতির শ্রেণী অভিমুখটা ভুল । ভুল বলেই , প্রান্তিক মুসলমান চাষি এখনো, আগে মুসলমান ,পরে চাষি । আর ঠিক তাই , একজন চাষির মুসলমান সত্তা আক্রান্ত হওয়ায়, একটি হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলের আগ্রাসন আটকাতে, ক্ষমতাসীন লুম্পেনদের-ই বেছে নিতে বাধ্য হয় । উদবাস্তু আন্দোলনের পরিধির বাইরে যে উদবাস্তু মানুষ, তারা অন্য মানুষের আঁচ পায় না, তারা কেউ মৃত্যুঞ্জয় সেন হয় না, ধর্মীয় বিদ্বেষ বা ধরমগুরুর আইডেণ্টিটি তাদের কাছে মুখ্য পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় ।

অতএব আমাদের ঠিক করতে হবে , আমাদের মিছিলের মুখ কারা । আমাদের,মধ্যবিত্ত আমাদের,মধ্যবিত্ত বাম্পন্থি আমাদের বুঝতে হবে , ঠিক কোথায় আমাদের দাঁড়ানোর কথা । এইটাই সুযোগ, নিজের দিকে আঙুল তোলার । এবার সময় বাম্পন্থি শক্তিকে সংহত করার । শেষ কয় মাস, ট্যাক্সি শ্রমিকদের নিয়ে , উদবাস্তু মানুষকে নিয়ে , সব হারানো মানুষকে নিয়ে, সব হারিয়ে রাস্তায় থাকার রাজনীতি ঠিক।

নিও-লিবদের মুখে লাথি মেরে, এই রাস্তার রাজনীতি , ন্যাংটা ফকিরের রাজনীতি, লালনের রাজনীতি-ই আমাদের নীতির রাজা.. সর্বশ্রেষ্ঠ নীতি ।

লড়াই চলবে ...

মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বাঙালনামা - ২ ~ তমাল রাহা

অনেকদিন বাদে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর একটা সুযোগ পাওয়া গেছে। ফুটবল খেলা যেখানেই থাকি না কেন দেখেছি, দেখি। হয় মাঠে গিয়ে, নয় টেলিভিশন-এর পর্দায়। কিন্তু কলকাতার ফুটবল কে খুব মিস করতাম। কিন্তু গত কয়েকমাস ধরে আমার লাইফ পুরো ঝিঙ্গা-লালা।

বদলে গেছে অনেক কিছুই, আগে ছিল রেডিও, তারপর সাদা-কালো টেলিভিশন, আস্তে আস্তে তাতে রঙের প্রলেপ পরল। আগে সংবাদপত্রে মতি নন্দী, আর এখন ….. থাক সে কথা। আসলে প্রফেশন ব্যাপারটা কে ভালো-না-বসলে কোয়ালিটি ব্যাপারটায় কম্প্রমাইজ করতেই হয়।

দুর্গাপুরে থাকাকালীন মোহনবাগানী বন্ধু বেশি ছিল। কেন জানি না, এইসব মাচা-লোটা, এই শব্দগুলো অজানা ছিল। বাঙাল-ঘটি আর ইলিশ-চিংড়ি র মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তর্ক। বদলে গেছে সত্যি অনেক কিছুই! তখন ময়দানে দুটো কাগজ বেরোতো, মোহনবাগানের খেলার দিন 'গড়ের মাঠ' আর ইষ্টবেঙ্গলের দিন 'অলিম্পিক'। দলবদল আর ক্লাব কেচ্ছা ছাড়া .... ঐ কাগজ গ্যালারীর কাঠে পেতে বসা আর রোদ ঠেকানোর কাজ-ও হতো। আজকাল তো দেখি না আর ….
পাড়ায় একটাই টেলিভিশন, কল্যাণ-দা দের বাড়িতে। কিন্তু মোহনবাগান গোল খেলেই টেলিভিশন বন্ধ। অগত্যা ভরসা রেডিও। রেডিও তা ছিল বহুদিনের সাথী। বারাকপুর এ আসার পরেও শুরুর দিকে টেলিভিশন ছিল না। দল বেঁধে রেডিও শোনা হতো, বাড়ির উঠোনে। বারাকপুর এ আবার বাঙালের সংখ্যা বেশি। আমি, জেঠু, জেঠুর বন্ধুরা আর পড়ার অনেক পোলাপান। মাঝে মাঝে ঠাম্মা বা জেঠিমা এসে জিগ্যেস করতেন "কেডায় গোল দিসে?" ওদের আগ্রহটা ঐখানেই শুরু আর ঐখানেই শেষ। মনে আছে একবার রেডিও তে গোল শুনে শংকর-দার বাবার কি নাচ, খেয়াল-ই নেই যে পরণের লুঙ্গিটা ভুমিসজ্জা নিয়েছে!

বাংলায় ধারাভাষ্য কোনকালেই খুব একটা উচ্চমার্গের ছিল না , কিন্তু একটা অদ্ভূত ভালো লাগা ছিল।

কতকাল হয়ে গেল, বিকেল তিনটে
কাঠের রেডিও, তার নবটা পাল্টে
বন্ধ হলো সবে অনুরোধের গান,
খেলা ইস্ট বেঙ্গল আর মোহনবাগান।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ছোঁয়া আসার পরেও অনেক কে বলতে শুনেছি "ও: জংলার ফ্রি কিকটা মনে আছে (অবশ্য যে দেখেছে সে জীবনে ভুলবে না)। আমাগো বেকহ্যাম লাগতো না।" পাশ থেকে জেঠু মাথা নাড়তেন আর বলতেন সামাদ সাহেবের গপ্পো। দুবার নাকি বারপোস্ট শট লাগার পর রেফারি কে গিয়ে বলেছিলেন, "বারপোস্ট ছোট", তারপর মেপে নাকি দেখা গেল সত্যি তাই ! অব হযে শুনতুম।

আবেগপ্রবণ বাঙালি। তাই ধারাবিবরণী তে সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটত স্বাভাবিক ভাবেই। সেটা বোধহয় ২০০৬, ওয়ার্ল্ড কাপ চলছে তখন। ব্রেজিল ফ্রান্সের কাছে হেরে গেল। টিভি চ্যানেলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষন। একটি চ্যানেলে পিকে-র বক্তব্য - ... কাকা এক একটা স্ট্রেচের দৌড়ে চার-পাঁচটা ডজ, এক একটা ডজে ৬০-৭০ গজ টেনে বেরিয়ে যাচ্ছিল ... (ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্য বোধহয় ১২০-১৩০ গজ, ফ্লো-তে পিকে-র সে সব খেয়াল নেই)। প্রসুন বানার্জী কেও একবার ইস্ট-মোহন ম্যাচ এ হেমন্ত ডোরার এক অনবদ্য সেভ নিয়ে বলতে শুনেছিলাম …. 'একটি অবৈধ গোল বাঁচালেন হেমন্ত"। পিকে -কে অনেকবার দেখেছি খেলোয়ারদের সংগ্রামী মনোভাবকে ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিংহের আত্মবলিদানের সাথে তুলনা করতে। সবই বাঙালির আবেগ।

তবে এই আবেগের শুরু আরো আগে। অজয় বসু কে মনে পড়ে? কথা বলতে বলতে গলার পারদ চড়তো ক্রমশ।

...ফাউল , ফাউউউউল, ফাউউউউউউউউল ….

হ্যাঁ, আমি তিনবার বললুম বটে, তবে ফাউলটা তেমন গুরুতর কিছু ছিল না, পোর্ট ট্রাস্টের ডিফেন্ডার কৃশানুকে হাল্কা ধাক্কা দিয়েছেন যা রেফারির নজর এড়ায়নি। কিন্তু ফাউল করার সময় খেলোয়াড়দের মনে রাখতে হবে মাঠভরা দর্শকদের আবেগের কথা, মনে রাখতে হবে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা থেকে ঘটে যেতে পারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, সামান্য প্ররোচনায় দর্শককূল হয়ে উঠতে পারে উন্মত্ত (গলা চড়ছে), মনে রাখতে হবে উনিশশো আশি সালের ষোলই আগস্ট (গলা আরও চড়েছে), সেদিন যে পাপ আমরা করেছি তার ক্ষমা নেই, (ব্যাকগ্রাউন্ডে তুমুল দর্শকোচ্ছ্বাস অগ্রাহ্য করে) নিরীহ নির্দোষ ফুটবলপ্রেমীদের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল ইডেনের গ্যালারি (গলা এখন তারসপ্তকে) - সে রক্তের দাগ আজও আমাদের হাত থেকে মোছেনি।
(ব্যাকগ্রাউন্ড আওয়াজ কিছুটা থিতিয়ে এসেছে, গলা ফের মন্দ্রসপ্তকে) এসব বলতে বলতে বোধহয় গোল হয়ে গেল ... কে গোল করলেন সুকুমার?

সুকুমার সমাজপতি: অজয়দা, আমার ঠিক সামনে একটা থাম পড়ে যাওয়ায় আমি ঠিক দেখতে পাইনি কে গোলটা করলেন, তবে খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হল কুলজিৎ।

সুকুমার সমাজপতি আবার ৬০ এর দশকে ইষ্টবেঙ্গলে খেলে গিয়েছেন। তো, উনি যখন ভাষ্য দিতেন, কোনো একটা মুভ, আগেথেকে আঁচ করতে চাইতেন ...... ফলে ওনার ভাষ্যতে প্রচুর 'না' থাকতো ...... যেমন .....
--- প্রবীর (মজুমদার) বল ধরেছেন .... সামনে ফাঁকা জমি .... এগোবেন কি ... না .... হাবিব-কে পাস করলেন । হাবিব এবার কি করবেন .... গোলমুখে সেন্টার করবেন ? .... না না ..... সুভাষকে দিয়েছেন .....

সুকুমার সমাজপতি আবার নিজের গা থেকে ইস্টবেঙ্গল গন্ধটাও ছাড়তে পারেন নি ধারাবিবরণীর সময়েও। ওই যে বলছিলাম, বাঙাল-এর (বা বাঙালীর) আবেগ! খেলার বিবরণী দিতে দিতে হঠাত করে চলে যেতেন স্মৃতিচারণে। কথার ফ্লো তে খেয়াল নেই যে ইষ্টবেঙ্গল গোল খেয়েছে রাজস্থান-এর কাছে। গ্যালারি যথারীতি চুপ। হঠাৎ খেয়াল হতে, 'যা তেরি! এ কি কেলো! ইষ্টবেঙ্গল গোল খেয়ে গেল' । পরের দিন কাগজে কমেন্টেটর-এর পক্ষপাতদুষ্ট বিবরনী নিয়ে সমালোচনা।

তবে এব্যাপারে পিকে কে কেউ ধরতে পারবেন না। ইডেনে বড় ম্যাচ। অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে। পি কে, প্রায় মিনিট দশেক স্মৃতি চারণের পর ... ' ... প্রশান্তর সামনে মনোরঞ্জন কতটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বুঝাতে না পারলেও, আমার সামনে একটি বিশাল থাম্বা এবং মুশলধারায় বৃষ্টি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে আবার অলিম্পিকে ফিরে যাই... যে কথা বলছিলাম, ৫৬-তে মেলবোর্নে …

আজ অনেক কথা মাথায় আসছে। আজ CFL এর নির্ধারক ম্যাচ। আমার ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানী বাবলু ভাত্চার্জির কোচিং এ তৈরী টলিগঞ্জ অগ্রগামী।

আজ ইস্টবেঙ্গল জিতলে পর পর পাঁচ বছর CFL জয়ের হাতছানি, অবশই দারুন ব্যাপার। টলিগঞ্জ অগ্রগামী জিতলেও কলকাতার ফুটবল এর পক্ষে ভালো বিজ্ঞাপন। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান , মোহামেডান এর বাইরে কেউ জিতবে। শেষ হযেছিল ১৯৫৮ সালে। বাঘা সোম এর কোচিং এ পিকে ব্যানার্জির ইস্টার্ন রেল। যদি খেলা ড্র হয়? নেপোয় দই মেরে যাবে , মানে ভোম্বল এর মোহনবাগান। ইস্টবেঙ্গল জিতুক মনে প্রাণে চাই। টলিগঞ্জ অগ্রগামী জিতলে "আমি দুঃখ পেলেও, খুশি হব জেনো " ….. চাই না খেলাটা ড্র হোক আর নেপোয় মাঝখান থেকে দই মেরে যাক , আসলে আমি মনে প্রাণে বাঙাল তো !!

রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

পিছনে ফিরে তাকানো - নিলাঞ্জন গুহমজুমদার

ঠিক কোন বয়েস-এ পৌঁছে মানুষ পিছনে ফিরে তাকায়? বার্ধক্যে? না, আমার মনে হয় না। আমরা পিছন ফিরে তাকাই, জখন আমাদের সামনের চলার পথটা খুব কঠিন হয়ে আসে, অথবা আমরা কিছু হারাই, অথবা দুটোই।
...
...
সেই ইঁটপাতা গলিতে খেলা, স্নিগ্ধ বিকেল গুলোতে, আর সন্ধ্যে হলেই মা-ঠাম্মার বাড়ি ফেরার ডাক। রবিবার গুলো অন্যরকম – বাবার বাড়ি থাকা, দুপুরে খাসির মাংসের ঝোল দিয়ে অনেকটা বেশি ভাত খেয়ে ফেলা, আর তারপর একটা লম্বা ঘুম। সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ করে কারুর বাড়িতে আসা, গল্প, আড্ডা – জমজমাট সন্ধ্যে।

তারপর কৈশোর – সেই বড় হবার আনুভুতি, বাঁধন ছেঁড়ার ইচ্ছে, কিছু অন্যরকম করার উত্তেজনা। আর রোমান্টিকতা। সবকিছুতেই ভালো লাগার অনুভুতি, সেই নীল আকাশ, দুরদুরান্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ, শালিক-র কিচির মিচির, বয়ে যাওয়া হাওয়া, তিরতির করে কাঁপা পুকুরের জল, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে পর্যন্ত চলা বন্ধুদের আড্ডা, খোলা আকাশের নিচে। দলবেঁধে পড়তে যাওয়া স্যারেদের কাছে, পড়া, বাড়ি্র লোক-কে লুকিয়ে পড়া-ফেরত আড্ডা, নোটবই দেওয়া-নেওয়া, সেই সুযোগে হাত-র কিছু স্পর্শ, আড়চোখে তাকানো, অল্প লাজুক হাসি, চোখের ভাষায় কথা।

সময় এগিয়ে যায়। যৌবন আসে। দায়িত্ব শব্দটা মাঝে মাঝেই কানে এসে পৌঁছয়, নিজের অজান্তেই বড় হতে থাকি। কৈশোর-র কিছু ভালবাসা পূর্নতা পেতে থাকে, কিছু রয়ে যায় শুধু স্মৃতিতে।কলেজ, অন্য শহর – পৃথিবী-টা বড় হতে থাকে। নতুন মানুষ, নতুন জীবনের স্বাদ, কিছু পুরনো স্বপ্ন, কিছু নতুন। সময় এগিয়ে যায় হু হু করে।

হঠাৎ একদিন, খবর আসে, রোগ আর জ্বরার আমোঘ থাবার গ্রাস করার খবর, হয়েতো বা কোনো প্রিয়জন। বুঝতে পারি, পৃথিবী-টা শুধুই এগোনোর নয় – সেই প্রথম পিছন ফিরে তাকানো। কর্কট রোগ বাসা বাঁধে প্রিয়জন-র শরীরে – জীবনের লড়াই আর তার ক্ষতগুলো সামনে আসতে থাকে।

সংসার বড় হতে থাকে, আর্থিক স্বচ্ছলতাও বাড়তে থাকে। কিন্তু বড় হওয়া জীবন, বড় হওয়া সংসার, কেমন যেন মাঝে মাঝে দুলতে থাকে, ভাঙতে থাকে। কিন্তু জীবন থেমে থাকে না, এগিয়ে যায়। শুধু দিনগুলো কেন যেন আরো দীর্ঘ হতে থাকে, রাতগুলো আরো নিঃশব্দ হতে থাকে।

আর একদিন, হঠাৎই, আকাশে একটা নতুন তারা জুড়ে যায়। আর হাত-টা যখন ঘুমের মধ্যে সেই চেনা আঁচল-টা খোঁজে, ঘুমটা ভেঙ্গে যায় এক ঝটকায়, জামাটা ভিজে যায় ঘামে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, খুঁজি সেই তারা-টাকে, হয়েতো খুঁজে পাই, জানি না, কিন্তু তার আলো আর ঊষ্ণতা আমাকে স্পর্শ করে না আর। বড় ঠান্ডা লাগে – অন্ধকারে।
আরো তারা জন্ম নেয় আকাশে, অন্ধকার আর ঠান্ডাও বাড়তে থাকে, ঘিরে ধরে চারিদিক থেকে।

এরপর, অনেক অনেক দিন পরে, হঠাৎ একদিন আবার সুর্য ওঠে চারিদিক আলো করে, মেঘ সরে যায়। ফিরে আসে ঊষ্ণতা, ফিরে আসে এগিয়ে চলার তাগিদ। পৃথিবী-টা আবার সেজে ওঠে, দিনগুলো আবার আলোকিত হয়, রাতগুলো হয় বর্নময়। জীবনের লড়াই-টা কেমন যেন সহজ হয়ে যায়। তরতর করে এগিয়ে যায় জীবন, সব ক্ষত কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।
সূর্য অস্ত যায়, আবার ওঠে। ঘুম আসে, ঘুম ভাঙ্গে।
একদিন – সূর্য অস্ত গেল।
...
...
খুব মেঘ করেছে। সূর্য-টা আর দেখা যাচ্ছে না।
ফিরে আসছে ঠান্ডা, ঘিরে আসছে অন্ধকার।
সামনের পথ-টা খুব অন্ধকার। কি আছে ওখানে? দুর্বার পাহাড়? অতল খাদ? নির্মম জলহীন মরুভূমি? ঘন কালো অসীম জল?

জানিনা। হারিয়ে গেছে আলো, হারিয়ে গেছে ঊষ্ণতা।
তাই, আজ আবার পিছন ফিরে তাকালাম।

সেই সব শব্দেরা - দীপ্তাণুজ দাশগুপ্ত

কিছু কিছু শব্দ আজ বিপন্নতায় ভোগে,
‘প্রতিবাদ’, ‘প্রতিরোধ’, ‘বুকের আবেগে –
ঋজু হওয়া মেরুদণ্ড’, ‘বুকের পাঁজর’
শব্দগুলো আজও বেঁচে; জীর্ণপ্রায় মনের ভিতর।


যতবার ছুঁড়ে ফেলি- আপসের সব লেন-দেন-,
আমারই রক্তে ভেজে খুন হওয়া শাল্কু সরেন।
মিলে মিশে একাকার কাকদ্বীপ তেলেঙ্গানায়,
শব্দেরা বয়ে চলে দেহ জুড়ে লোহিত কণায়।


যে সকাল চেয়েছিলাম, সে সকাল আসেনি এখনও
গাজা যা পেরেছে আজ, আমরা তা পারিনা কখনো।
তবুও অপেক্ষা করি, পুষে রাখি যত অনুভব-
লড়াইয়ের ময়দানে আমরাই মার্শাল জুকভ।

শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি ~ শ্রেয়সী রায়

​আমার শহরে barricade তুলে কাল,

leaflet দিলে হরতাল হবে বলে ;
ঠোঁটে ঠোঁট রেখে তৈরী আমি ও সে,
barricade জুড়ে লাল পলাশেরা দোলে॥

চুমুর মতন-ই বিপ্লব কাল রাতে -
আলগোছে এসে দরজায় কড়া নাড়ে;
আমার শহর-ও বিদ্রোহ করেছিল,
হাতে হাত রেখে ,
ঠোঁটে ঠোঁট আর চোখে চোখ রেখে-
আগুন অঙ্গীকারে .......

ঝরা পাতা ~ সংগীতা দাশগুপ্তরায়

​শুকনো পাতা মাড়াই না এখন। অথচ ছোটবেলায় বাগানের পাতা মাড়িয়ে হাঁটতে দিব্যি লাগত । অনেক সময় আমগাছের গায়ে লেগে থাকা সবুজ শুঁয়োপোকা ভীষণ বেড়ে যেত বলে মা গোড়ার একটু পাশ করে অনেক পাতা জ্বালিয়ে দিত। আগুনের তাতেই বোধহয় গাছের গা থেকে সবুজ সবুজ শুঁয়োপোকা টুপ টুপ করে খসে পড়ত । ব্যাপারটা এখন একটু নৃশংস শোনালেও তখন কিন্তু তেমন কিছুই মনে হত না। বাগানে ঝরা পাতা ডাঁই করে রাখা হত শুকোলে পুড়িয়ে দেওয়া হবে ভেবেই। একবার শীতের করুন দুপুরে মা পাতায় আগুন দিয়ে দিয়েছে। মিনিট খানেকের মধ্যেই পাতার ঢিবি ফুঁড়ে লাফিয়ে বেড়িয়ে এল মিনুর খুকু। মিনু আমাদের বারয়ারী পুষি। তার খুকু যে শীতের দুপুরে ওই পাতার ডাঁইয়ের মধ্যে ঢুকে বসে আছে তা কে জানে! তবে বেরোতে বেরোতেই বেচারির পিঠ আর ল্যাজের কাছটা একটু বোধহয় পুড়ে গেছিল। সারাদিন ধরে কেঁদে গেল পুষিখুকু আর মিনু সেদিন আর পাড়া বেড়াতে গেল না। সেদিন শিখলাম না দেখে শুনে পাতায় আগুন দিতে নেই। নিচে মিনুর ছেলে মেয়ে নাতিন পুতিনরা থাকতেই পারে...

পুরোনো ব্যাগ ফেলে দেওয়ার আমরা একবার এ পকেট ও পকেট হাতড়িয়ে দেখে নিতাম। মাঝে মাঝে নীলচে মত একটাকা, লাল দুটাকার নোট বা জলতরঙ্গ খাঁজওয়ালা দশ পয়সা পাওয়া যেত। দাদু বলতেন পয়সার ব্যাগ কখনও খালি রাখতে নেই। অন্ততঃ কটা খুচরো পয়সাও থাকা উচিত। তাতে ব্যাগের অভ্যেস থাকে টাকা রাখার। কার্ডে কেনার যুগেও তাই কিছু কাগুজে টাকা বা কয়েন পার্সে রাখাটা অভ্যেসে ঢুকে গেছে। তাতে একটা সুবিধাও আছে। সবসময়েই কোন না কোন ব্যাগে কিছুমিছু টাকা থেকেই থাকে...

নীলকন্ঠ স্যারের কাছে ইংলিশ পড়তাম আমরা। সত্তরোর্ধ মাস্টারমশাইকে ভয় পেতাম না একদম, ভালবাসতাম ভীষণ । ছোট্ট ঘরটাতে ঢুকতাম বিকেলে । একটু পরে জানলার ওদিকে সন্ধ্যে নামত। এদিকে ঘরে ঘরে ধূপ আর প্রদীপের শিখা নিয়ে ঘুরে যেতেন দিদা (স্যারের স্ত্রী) । ধুনোধূপের গন্ধটা ঘরে ঘুরতে ঘুরতেই ঝপ করে লোডশেডিং। দিদা স্যারকে একটা হাতপাখা দিয়ে যেতেন আর আমাদের একটা। গোল হাতলের হাত পাখা আর সে হাতলটা ঢোকানো আর একটা সরু ফাঁপা পাইপের মত হাতলে। দিব্যি হালকা হাতে ঘোরালে তিনশো ষাট ডিগ্রিতে ঘুরত, আমরা সবাই একসঙ্গেই হাওয়া পেতাম। স্যার ওই সময় মুড়ি খেতেন নকুলদানা দিয়ে। একটা ছোট বাটিতে স্যারের মুড়ি আসত আর একটা বড় বাটিতে তেলমাখা মুড়ি আসত আমাদের তিনজনের জন্য। মাঝেসাঝে স্যার হ্যারিকেনের সলতেটা একটু নামিয়ে আমাদের গল্প বলতেন। মানুষের গল্প , মৃত্যুর পরের রহস্যময় জগতের গল্প, বিশ্বযুদ্ধের গল্প কিচ্ছু বাদ যেতনা। কারেন্ট আসার আগেই কোন কোনদিন আমরা পড়া সেরে উঠে পড়তাম । ফেরার পথে একটা বাদামী রঙ্গের ইঁট বার করা বাড়ি ছিল। সে বাড়িতে নাকি নতুন বউ বউভাতের পরদিন গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়েছিল। আমি মৌ আর রিনিদিদি নিজের নিজের পছন্দের ঠাকুরের নাম করতে করতে পেরিয়ে যেতাম বাড়িটা । একচিলতে ওই ঘর, প্রত্যেক সন্ধ্যের লোডশেডিং আর ভুতুড়ে তকমাওয়ালা বাড়ি আমায় শিখিয়েছিল হাওয়া, মুড়ি, ভয় সবই ভাগ করে নেওয়া যায়...

জীবন কত কিছু যে শিখিয়েছে তার হিসেব নেই । জীবন জুড়ে যত মানুষের আনাগোনা, তাদের সবার কাছে কিছু না কিছু শিখেছি। শুধু আজকের দিনটাই নয়। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তেই জীবনের কাছে ঋণী আমি, জীবনের সঙ্গে জুড়ে থাকা বা ছিন্ন হওয়া প্রতিটি মানুষের কাছেও...

শিক্ষক দিবসের শুভকামনা সব্বাইকে ...

বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

আমার পূজো - পারমিতা ব্যানার্জী

জানলার বাইরের নিম গাছটার  পাতার ফাঁক দিয়ে যে নরম রোদ টা আমার ঘরের প্রান্ত থেকে প্রান্ত খেলে বেড়াচ্ছে সেটা আমার খুব চেনা, এই রোদটা প্রথম জানান দেয় পুজো আসছে আমার ছোটবেলায় "পুজো আসছে " এই দুটো শব্দের অর্থ একটু অন্যরকমপুজো আসা মানে বাবার  বাড়ি ফেরা বাবা তখন চাকরিসূত্রে ভূপালে আর আমরা দুই বোন  মা এর সাথে কলকাতায় তখন এইরকম একটা নরম রোদের সাথে বাবার চিঠি আসতপুজোয় বাবার বাড়ি ফেরার চিঠি আর সেই এক টুকরো কাগজ যেন মনের মধ্যে আনন্দের একটা ফড়িং উড়িয়ে দিত বাবা আসা মানেই তো দূপুর জুড়ে দেশ বিদেশের গল্প শোনা নোয়াস আর্ক ,মোজেস এর সমুদ্র ভাগ,চাঁদের পাহাড় এর শংকর,জুলেভার্নের টাইম মেশিনের সাথে প্রথম পরিচয় আমার এই এক একটা দুপুরেইগল্পের পাশাপাশি থাকত নতুন নতুন ধাঁধার এক একটা ধাঁধার জন্য সময় ধার্য থাকত একটা দূপুর বিকেল হলেই উত্তর দিতে হত আর না পারলে বাবা বলে দেবেবাবা যদিও বা আমার না পারার লজ্জায় মুখ ভার দেখে আরো একটু চেষ্টার সুযোগ দিত কিন্তু আমার এক নম্বরের পাজি দিদিটা ঠিক উত্তর বলে দিয়ে জিভ ভেঙিয়ে পালাতো সেটা তো হতে দেওয়া যায়না তাই গল্প শোনার ফাঁকে ধাঁধাটা নিয়েও ভাবতে হত অবশ্য দিদি বা বাবা কাউকেই খুব একটা উত্তর বলে দেওয়ার সুযোগ দিতাম না আমি

"পৃথিবীটাকারবশ"-"পৃথিবী টাকার বশ",তিন অক্ষরের নাম -প্রথম অক্ষর বাদ দিলে গায়েতে পরি ,দ্বিতীয় অক্ষর বাদ দিলে জীবনের শেষ তরী,তৃতীয় অক্ষর বাদ দিলে কামড় খেয়ে মরি -বলত কী? ভাবতে হবেনা বলে দিচ্ছি  -"মশারি"এমন কত শত ধাঁধা আমার বাবার কাছে শেখা ,পুজোর ছুটি শেষ হতেই যেগুলো বন্ধুদের বলে ধাঁধাগিরির বাহবা নেওয়া গল্প আর ধাঁধা ছাড়া আর একটা কাজ বাবা ছাড়া হতই না অষ্টমীর জামা কেনা অষ্টমীর জামা মানে পুজোর সেরা জামাটা সেটা সব সময় বাবার সাথে গিয়েই কেনা হতসব দোকান ঘুরে আমার সব চেয়ে পছন্দের জামাটা বাবা আমাকে কিনে দিতজামা কিনে বাড়ি ফেরার পর মা প্রতিবার জামার রঙ ,সাইজ ,কাপড় ,দাম নিয়ে কিছু না কিছু খুঁত বার করতইআর আমরা আগে থেকেই মা কি কি খুঁত বার করতে পারে সেটা ভেবে রাখতামবাবা বলত মার মত খুঁতখুঁতে মানুষ আর হয়না ,বাবা নাকি এমন কিছু কোনদিন কেনেইনি যার কোনো খুঁত মা খুঁজে পায়নি

অফিস যাবার পথে আকাশের দিকে চোখ পরতেই দেখলাম অসংখ্য সাদা মেঘের ভেলাবাবা আমাকে শিখিয়ে ছিল ওই মেঘেদের মধ্যে থেকে হাতি, ঘোড়া,খরগোশ ,ভাল্লুক খুঁজে বার করা মিশনের মাঠে বসে বাবা মেঘেদের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করত "বলতো খরগোশ টা কোন দিকে "ওহ সে যেন পরীক্ষার প্রশ্নের চেয়েও কঠিনমেঘ গুলো তো স্থির নয়,এক মিনিট দেরী হলেই খরগোশ টা অন্য কিছু হয়ে যাবে ,তাই চোখের পলকে সারা আকাশ তোলপাড় করে খরগোশ টা খুঁজে বার করতে হতো ,আর খুঁজে পাবার পর বাবার চোখের সেই দীপ্তি যেটা বলে দিত "এই না হলে আমার মেয়ে" সেটা ছিল সব পুরষ্কারের সেরা

বাবার চিঠি আসতো মহালয়ার আগের দিন আর বাবা আসতো পঞ্চমীর দিন ভোরে মাঝের এই কটা দিন যেন কাটতেই চাইতনা আর পঞ্চমীর দিন তো সূর্য কে যেন রাহু গ্রাস করতএমনিতে কোনকালেই আমি ভোরে উঠতে পারিনা কিন্তু ওই একটা দিন কাউকে ডাকতে হতনাভোর হওয়ার অনেক আগে থেকেই জানলার ফাঁকটায় চোখ রাখতাম আলোর অপেক্ষায়একটা আলোর রেখা জানলার এপার ওপার হলেই মশারি ডিঙিয়ে দরজা খুলে সোজা ঘরের বাইরে আমাদের বাড়ির পেছন দিকে পাঁচিলের একটা ভাঙ্গা অংশ দিয়ে গলির মুখটা দেখা যেত সেখানেই প্রথম বাবার আসা টা দেখতে পেতাম আর যেই না দেখা ছুট্টে বারান্দা পেরিয়ে তুলসী মঞ্চ পেরিয়ে গেট খুলে বাইরে একবার  তো এভাবেই ছুটতে গিয়ে তুলসী মঞ্চের সামনে পা পিছলে গিয়ে সোজা নাকটা গিয়ে ঠেকলো মঞ্চের গায়ে আর অমনি দরদরিয়ে রক্ত ,বাবার আসাটা আর দেখা হলনা ,বাবা হাত থেকে সুটকেস রাখার আগেই ডাক্তার এলো ঘরে তবে সেবার পুজোটা আরো ভালো কেটেছিল সারাদিন সব কাজ ফেলে বাবা আমাকে গল্প শুনিয়েছিল
ষষ্ঠী থেকে শুরু হত আমাদের পুজো পরিক্রমা সকালের জলখাবার সেরেই বেরিয়ে পরতাম উত্তর কলকাতার ঠাকুর দেখতে এক প্যান্ডেল থেকে আরেক প্যান্ডেল যেতাম পায়ে হেঁটে নতুন জুতোয় পায়ে ফোস্কা পরে একাকার তবু উন্মাদনায় খামতি ছিলনা ঠাকুর দেখার ফাঁকেই চলত নানা রকম রাস্তার খাবার খাওয়া ওই কদিন আর কোনো বাধা নিষেধ ছিলনা

ষষ্ঠী সপ্তমী বাইরের ঠাকুর দেখে অষ্টমীতে পুজোর রুটিনে একটু রদবদল হত অষ্টমীতে মামার বাড়ি সব মামা মাসি মামাতো , মাসতুতো ভাইবোন একত্র হতাম সেজ মামার বাড়িতে,সেখানেই দিদা থাকত সেখানে সারাদিন হইচই করে দুপুরে একসাথে খেয়েদেয়ে সবাই মিলে বেড়িয়ে ঠাকুর দেখে আবার রাতের খাবার সেরে যে যার বাড়ি ফিরতাম এসবের মাঝে আমি কিন্তু থাকতাম বাবার পাশে পাশেই মামা আর মেসো দের সাথে সাহিত্য,সিনেমা ,ক্রিকেট ফুটবল ,রাজনীতি নিয়ে আলোচনা গুলো আমি কিছুটা বুঝে কিছুটা না বুঝে হা করে গিলতাম বিষয় গুলোর চেয়ে আমার নজর থাকত বাবার বাচনভঙ্গির ওপর সব বিষয়ে খুঁটিনাটি খবর রাখত বাবা ,প্রতিটা বিষয়ে বাবার গভীর জ্ঞান সবাই কে মুগ্ধ করত ,তর্কের সময় যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে যেভাবে বাবা দৃপ্ত কন্ঠে নিজের মত রাখত তাতে সবাই হাসি মুখে বাবার যুক্তির কাছে হার মানত আর আমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত সেরা বাবার মেয়ে হওয়ার গৌরবে
পুজোর চারটে দিন আলোর গতিতে কেটে যেত আর তারপর একরাশ বিষন্নতাবাবার ছুটি শেষের সময় লক্ষীপুজোর পর দিন যে বাবা ফিরে যাবে লক্ষীপুজোর দিন বিকেলে যখন বাবা আলমারির মাথা থেকে সুটকেসটা নামতো আমার বুকের ভেতর তখন চাবুক পড়ছে প্রতিবার এইসময় টা চাদরমুরি দিয়ে জোর করে শুয়ে থাকতাম সুটকেস খোলার আওয়াজ টা যাতে কানে না আসে তাই কান দুটো চেপে শুয়ে থাকতাম কিন্তু আওয়াজ পেয়েই যেতামআর গলার কাছে কি যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠত আর তো মাত্র কযেকটা ঘন্টা ,তারপর তো আবার সেই ভোর বেলা,গেট পেরিয়ে ,গলির মোর পেরিয়ে বাবার চলে যাওয়াটা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যাওয়া আর আবার প্রতিক্ষা আরো 'মাসের প্রতিক্ষা আবার চোদ্দটা গরমের দুপুরের গল্প শোনার,বিকেলে মিশনের মাঠে বসে বাবার লেখা কবিতা শোনার আর ফেরার পথে গোল্ডস্পট খাওয়ার

আজ প্রতিক্ষার পালা বাবার চাকরিরতা ,বিবাহিত ,তার সবচেয়ে প্রিয় ছোট মেয়ের সঙ্গে কযেক মুহূর্ত সময় কাটানোরমেয়েটা যে আজ ভিষণ ব্যস্ত চাকরি আর সংসার সামলে সপ্তাহান্তে কযেক ঘন্টার গল্পের জন্য ,কলেজস্ট্রীট ঘুরে কেনা তার নতুন বই এর কালেকশন দেখানোর জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় সারা সপ্তাহতাও কোনো কোনো সপ্তাহে মেয়ের এত তাড়া যে কোনমতে মায়ের সাথে দরকারী কথা সেরেই পালাতে হয়আবার কোনো কোনো দিন ফোন এর ওপারে মেয়ের গলায় "এই রোববার আসতে পারবনা" শুনলে বাবার দীর্ঘ অবসর আরো একটু দীর্ঘ হয়ে ওঠে


পুজোর দিনগুলো আমার এখন ভাগ হয়ে গেছেকিছুটা স্বামীর জন্যে ,কিছুটা শশুরবাড়ির জন্যে রেখে সাকুল্যে একটা দিনের অর্ধেক কাটে বাবার সাথেআর সেই অর্ধেক দিনেই বাবার তোতাপাখির মত পুজো পরিক্রমার গল্প বলা,সবটাই টি.ভি তে,আবার সেই দুই বোনে মিলে ধাঁধার সমাধান করা,নতুন লেখকের গল্পের ,নতুন রিলিজ হওয়া কোনো ভালো সিনেমার সমালোচনা ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই ছোটবেলার ফেলে আসা দিন গুলোতে বাইরে বিসর্জনের কাঁসর ঘন্টার দাপাদাপি ম্লান হয়ে যায় আমাদের বসার ঘরের চার দেওয়ালে