বৃহষ্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০১৪

প্রজ্ঞা থাপার ছোট্ট জীবন ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

প্রজ্ঞা থাপা ক্লাস টেনের ছাত্রী। স্কুলে খেলাধুলোয় রীতিমত নাম আছে তার। পড়াশোনাতেও প্রজ্ঞা পেছিয়ে নেই সে কোনো ভাবে। বাবা থাকেন দেশের বাইরে, বাহরিনে। প্রজ্ঞা দেশের বাড়িতে মা কল্পনা থাপা আর দাদুর সঙ্গে থাকে আর ইটাহারির স্থানীয় মর্নিং স্টার স্কুলে পড়ে। মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার, তেমন অস্বাচ্ছন্দ কিছুই নেই। এই মেয়েটি ২০১৪ সালের ৯ই জুলাই খবরের শিরোনামে চলে এলো।

রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত লিখেছিলেন "ফুটবল"। একটা নাটক। সে নাটক কতজন দেখেছেন জানিনা, কিন্তু সে নাটকে দেখানো হয়েছিলো এক দায়িত্বজ্ঞানহীন এক হিংস্র আক্রমন। সে নাটকের সমসাময়িক ঘটনা ১৯৮০ সালের ১৬ই আগস্ট, যেদিন ইডেনে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল খেলায় দাঙ্গায় ১৬ জন মারা গিয়েছিলেন। তার পরে সামান্য কিছু হইচই হয়েছিলো। দু দলের সমর্থক দের খেলার সময় আলাদা আলাদা বসানোর ব্যবস্থা হয়েছিলো। সে ব্যবস্থা এখনো আছে। লিগের প্রথম বড় খেলায় এখনো লোকে জিজ্ঞেস করে – "আমাদের কি ১ নম্বর আর ২ নম্বর? নাকি তিন চার দিয়েছে আমাদের?"। অনেকটা তফাত করে বসানো। ঘেটোর মত। মাঝখানে কাঁটাতার, অস্ত্র নিয়ে পুলিশ। ১৯৯৮ সালে দুই বন্ধু অফিসে একসঙ্গে ঢপ মেরে আইএফএ শিল্ডের ফাইনাল দেখতে গেছি একই ট্যাক্সিতে চড়ে, ভাড়া ভাগাভাগি করে। কিন্তু মাঠে পৌঁছে ও গেলো ওদিকে, আর আমি গেলাম এদিকে। এক সঙ্গে বসে খেলা দেখা গেলো না, কারন দু জন দু দল কে ভালোবাসি। এসব তো থাকবেই। মাঠে ঢোকার আগে, দুজনে দুজনকে "অল দ্য বেস্ট" জানাতেও ভুলিনি।

ফুটবল ভালোবাসি বলেই না দলকে ভালোবাসি, ফুটবলে উৎসাহ না থাকলে আর এ দল, ও দলের প্রশ্নই আসবে কেন? মনে আছে, আরো অনেক ছোটো বেলায়, বাবার হাত ধরে সন্ধের মুখে মিস্টির দোকানে যাচ্ছি মিস্টি কিনতে। বড় খেলায় জিতলে বাবা এক হাঁড়ি গরম রসগোল্লা কিনে খাওয়াতো লোকজন কে। আর এটাকে বলতো মধুরেন সমাপয়েৎ। সেদিন পাড়ার আর একটি ছেলেকে দেখে, খেলায় হারা নিয়ে একটা টিটকিরি মেরেছিলাম দোকানের সামনে। আমি তখন ক্লাস থ্রী কি বড়জোর ফোর। কান থেকে ঠোঁট ঝন্‌ঝন্‌ করে উঠেছিলো বিরাশি সিক্কা থাপ্পড়ে। মিস্টির ফরমায়েশ তদ্দন্ডেই বাতিল। কানের কাছে গম্ভীর স্বর শুনেছিলাম বাবার – "নিজেকে কখনো মোহনবাগান সমর্থক বলে পরিচয় দিওনা"। সারা জীবন অসম্ভব ফুটবল পাগল একজন মানুষের কাছে ধীরে ধীরে শিখেছি, খেলাকে কি ভাবে ভালোবাসতে হয়। প্রতিপক্ষকে কি ভাবে সন্মান দিতে হয়। খেলায় জয় মানে নির্মল আনন্দ। অহংকার বা জীঘাংসা নয়। পরাজিত পক্ষ, কেবলমাত্র প্রতিপক্ষ, কখনই আজকের খবরের কাগজের ভাষায় শত্রুপক্ষ নয়। আজকে জিতলে, কালকে হারতেই হবে তার কাছে। এটাই খেলা। আর হেরে যাবার স্বাদ, আপনার প্রতিপক্ষের চেয়ে ভাল আর কেউ জানবেনা, কেননা খেলায় সকলকেই হারতে হয়েছে। আমাদের অফিসে আমরা একটা প্রথা চালু করেছিলাম। যাদের দল খেলায় জিতবে, তারা অন্যদের খাওয়াবে। এই খাওয়ানোর মধ্যে দিয়ে দেখতাম জেতার ঝুঠো অহংবোধ আর হারের ঝুঠো গ্লানির পরিসমাপ্তি হতো। ২০০৬-০৭ পর্য্যন্ত এটা চলতে দেখেছি।

গতকাল একটি ছেলের প্রশ্ন – "আমি কি তাহলে গায়ে পতাকা জড়িয়ে আগুন দিয়ে পুড়ে মরব? ব্রাজিলের খেলা ভালো লাগাটা কি আমার অপরাধ? কেন আমার ওপর এই হিংস্র আক্রমন? এর পর তো বাড়িতে ঢুকে মারবে"। না, বাংলার রাজনীতি নয়, ভোট নয়, সমাজবিরোধী আক্রমন বা সাম্প্রদায়ীক সন্ত্রাস নয়। একটা খেলার ফলাফল, এবং তৎপরবর্তী কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ছেলেটিকে এই ভাবে মানসিক অত্যাচার সয়ে সকলের চোখের আড়ালে লুকিয়ে গুটিয়ে থাকতে হচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায়, অফিসে, স্কুল কলেজে সর্বত্র এই হিংস্র আক্রমন। তবে বোধহয় সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে ফেসবুক , হোয়াট্‌স্‌অ্যাপ জাতীয় সামাজিক মেলামেশার জায়গা গুলো। আমাদের দেশে শুনি ক্রিকেট হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। সে নিয়ে আমার নিজের কোনো সন্দেহ নেই। কিছু দিন আগে আইপিএল শেষ হলো। গোটা দেশ সেই নিয়ে মেতে ছিলো। ক্রিকেটের বিশ্বকাপ যখন হয়, তখন দেখেছি, কি চরম উৎসাহ, উন্মাদনা, উত্তেজনা। কিন্তু যেটা দেখিনি সেটা হলো এই হিংস্রতা। সত্যি দেখিনি। বরং অন্য দলের খেলোয়াড় ভালো খেললে তার প্রশংসা শুনেছি। খেলায় হার জিত নিয়ে টিটকিরি দেখেছি, উল্লাস দেখেছি, স্বপ্নভঙ্গ দেখেছি। কিন্তু কোথাও শুনিনি, কেউ এই ভাবে অন্যজনের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। এটা অন্য খেলায় হয় না।

আমাদের পাড়ায় বিশ্বকাপের ঠিক আগে থেকে দেখলাম বড় বড় রঙিন পতাকা ঝুলছে। কতগুলো নীল সাদা, সে গুলো আর্জেন্তিনার, আর কতগুলো হলুদ সবুজ সে গুলো ব্রাজিলের। দেখে খুব ভালো লাগলো, যে আমাদের এখানে ফুটবলের নামে লোকজন কতটা মেতে উঠেছে। ব্রাজিল বা আর্জেন্তিনা খেলায় জেতার পর মাঝরাতে পটকা ফাটা শুনেও ভালো লাগছিলো, কিন্তু সেই সঙ্গে খারাপ লাগছিলো, যে এই যে বিশ্বকাপে ক্যামেরুন খেলছে, গত বছর দিল্লিতে যখন এই ক্যামেরুনকে হারালো ভারত, তখন একটাও পটকা ফাটলো না। একটাও তেরঙ্গা ঝান্ডা উড়লো না। ফেসবুক হোয়াটস্‌অ্যাপ ছয়লাপ হয়ে গেলো না সুনিল ছেত্রি বা সুব্রত পালের ছবিতে। পেছিয়ে থেকেও সমতা ফিরিয়ে এনে ভারত হারালো বিশ্ব ফুটবলের এক সাড়া জাগানো শক্তিকে, কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি, যাঁরা এই লেখা পড়ছেন, তাঁদের সিংহভাগ ভারতেই এই সাফল্যের কথা জানেনই না। আমি নিচে লিঙ্ক দিলাম, গোটা খেলা, এবং টাইব্রেকারের।
প্রথমার্ধ – https://www.youtube.com/watch?v=qM7DK0pwYVw
দ্বিতীয়ার্ধ – https://www.youtube.com/watch?v=mZXFJFp5b0k
টাইব্রেকার - https://www.youtube.com/watch?v=MZ6O-7yRkTo

আবার অন্যদিকে এই বছরের গোড়ায় কাঠমান্ডুতে যখন ভারত নেপালের কাছে ১-২ গোলে হেরে গেলো, সেদিন সন্ধ্যায় অফিসে বসে মনে হচ্ছিলো অনেক অনেক অনেক কিছু যেন হারিয়ে গেল। অনেক স্বপ্ন আবার গোড়া থেকে দেখতে শুরু করতে হবে। পেছিয়ে গেলাম যেন আমরা। রাত্রে কিছু খেতে পারিনি সেদিন বাড়ি গিয়ে। আমি এবারেও নিশ্চিত, এ লেখা যাঁরা পড়ছেন, তাঁদের সিংহভাগ এ খেলার খবর ও রাখেন না।

তাহলে ব্রাজিল আর্জেন্তিনা নিয়ে এই সাংঘাতিক রেশারেশির উৎস কোথায়? দয়া করে এটা বলবেন না যে এই দুটো দেশের কিছু ইশ্বরতুল্য খেলোয়াড়ের জন্যই এই রেশারেশি। খেলোয়াড়ের খেলা ভালো লাগলে তিনি যে দলের জার্সিই পরুন, তাঁর খেলা ভালো লাগতে বাধ্য। সেখানে ব্রাজিল আর্জেন্তিনা আসেনা। আর তা ছাড়া এই দু দেশ বাদে অন্য দেশে তেমন কোন খেলোয়াড় নেই, এটাও মানতে পারছিনা। আমার দেখা এই উত্তেজনা তৈরির নেপথ্যে সংবাদ মাধ্যম। আমাদের দেশের এবং গোটা উপমহাদেশেরই সংবাদ মাধ্যম ব্রিটিশ মিডিয়ার লেজ ধরে চলে। সেই নোংরা মিডিয়াকে অনুসরন করেই এরা কৃত্ত্রিম উন্মাদনা তৈরি করছে। লোকের উন্মাদনা যত জাগবে (পড়ুন লোকে যত "খাবে") ততই বিজ্ঞাপন আর ততই বিদেশ ভ্রমন, পত্রিকার বিক্রি। বাকি দায়......নেই। আমার যতদুর মনে পড়ছে এই জিনিষের শুরু ১৯৮৬ থেকে আজকাল পত্রিকার হাত ধরে। আর ১৯৯০ আর ৯৪ সালে কুৎসিত আর পরিকল্পিত ভাবে উন্মাদনা ছড়ানো হয় আমাদের এখানে।

বিদেশি ফুটবল সারা বছর দেখা যায় টিভিতে। তার কতটুকু নিয়ে লোকে এখানে মাতামাতি করে? কিছু উচ্চমধ্যবিত্ত কিশোর তরুন হয় ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, বার্সিলোনা নাহলে রিয়েল মাদ্রিদের সাপোর্টার বলে দাবী ও করে নিজেদের। ওই পর্যন্তই। রেশারেশি বা হিংশ্র উন্মাদনা দেখিনি, যা দেখি ব্রাজিল আর্জেন্তিনা নিয়ে। ফুটবল ভালোবাসলে এনারা নিশ্চিত নিজের দেশের খবরটুকু রাখতেন। ভালো খেলোয়াড়দের ভালোবাসলে নিশ্চিত ভাবেই মেসি বা নেইমার দুজনের খেলাই এনাদের ভালো লাগতো। পেলে আর মারাদোনা নিয়ে ঝগড়া না করে তাঁদের পাশে রিভেলিনো , দি স্তেফানো বা পুসকাসের ছবিও লাগাতেন। মারাদোনার সম্পর্কে একটা কথা বলি, গোটা পৃথিবীর কয়েকশো কোটি মারাদোনা ভক্তের মধ্যে আমিও একজন। আর নিজের অন্তর থেকে মারাদোনা খেলাকে শ্রদ্ধা করি। তাই সেই ৮৬ সালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলার পরের দিন সকালে প্রচন্ড অভিমান করেছিলাম মারাদোনার ওপর। হ্যান্ডবল তো সবাই করে। তুমি সেটা গৌরবান্বিত করতে চাইলে কেন মারাদোনা? তুমি তো ওরকম গোল আরো দিতে পারো। বলনা ভুল হয়ে গেছে। তুমি তো রক্ত মাংসের মানুষ। ১৯৯৪ তে মারাদোনার ডোপ টেস্টে ধরা পড়ার পর মনে হয়েছিলো মাটি সরে যাচ্ছে পায়ের নিচে থেকে আমার। আমার কাছে ভগবানের মত এই লোকটা কেন ড্রাগ নেবে? আমাদের মত ভক্তদের চিৎকার কি কানে পৌঁছয়না তোমার মারাদোনা? কেন অন্য উত্তেজনা লাগে? উঠতে বসতে শুনতে হয়েছে তখন, ওইতো তোদের মারাদোনা, ড্রাগ নেয়। আমি আজও মারাদোনার ফুটবলের সেই ভক্তই আছি। সেই যাদুতেই আচ্ছন্ন আছি। শুধু মানুষ মারাদোনার ভক্ত আর নেই।

ব্রাজিল আর্জেন্তিনার রেশারেশিও আমার মাথায় ঢোকেনা। ব্যক্তিগত ভাবে আমি লাতিন আমেরিকান ঘরানার ফুটবলের ভক্ত। ছোটো ছোটো পাস, বুদ্ধিদীপ্ত আক্রমনাত্মক ফুটবল। গতি পরিবর্তন হয়ে চলেছে সব সময়। বল দখলে রাখার অসাধারন মুন্সিয়ানা। আর ভালো লাগে দলগত খেলা। ব্যক্তি নির্ভর হলে আমার ভালো লাগে না। শুধু ব্রাজিল আর্জেন্তিনা নয়, আমার ভালো লাগে চিলি, কলম্বিয়া এমনকি মেক্সিকোর খেলাও। উরুগুয়ে কে কেমন মনে হয় যেন কিছুটা ইয়োরোপ ঘেঁসা খেলা। যেমন স্পেন ও পর্তুগালের খেলায় আবার লাতিন আমেরিকান ঘরানা অনেকটা কাজ করে। আমার তো এই দুই দেশ জিতলেই ভালো লাগে। রেশারেশিটা সত্যিই মাথায় ঢোকেনা আজও। এখানে দেখি, মেসি ভালো মানেই নেইমার খারাপ, সে খেলার অভিনয় করে। মারাদোনা কোকেন নিয়ে ৯৪ সালে বিশ্বকাপ থেকে নির্বাসিত মানেই পেলে ও ড্রাগের ব্যবসা করে। এই ধরনের বিতন্ডা। খেলা নিয়ে ঘরানা নিয়ে, দক্ষতা নিয়ে কখনো কোনো আলোচনা দেখতে পেলাম না। আমাকে ফোন করে একজন জানতে চাইলো গত পরশু আমি ব্রাজিল না আর্জেন্তিনা। কারন আমার ফেসবুকের পোস্ট থেকে নাকি সে ঠিক বুঝতে পারছে না আমি আসলে কি। আমি বললাম আমি মোহনবাগান আর ভারত। ঠিক বুঝতে পারল বলে মনে হলো না।


নেপালের প্রজ্ঞা থাপা ক্লাস টেনের ছাত্রী। স্কুলে খেলাধুলোয় রীতিমত নাম আছে তার। পড়াশোনাতেও প্রজ্ঞা পেছিয়ে নেই সে কোনো ভাবে। চাকরির কারনে তার বাবা থাকেন দেশের বাইরে, বাহরিনে। প্রজ্ঞা দেশের বাড়িতে মা কল্পনা থাপা আর দাদুর সঙ্গে থাকে আর ইটাহারির স্থানীয় মর্নিং স্টার স্কুলে পড়ে। মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার, তেমন অস্বাচ্ছন্দ কিছুই নেই। এই মেয়েটি ২০১৪ সালের ৯ই জুন খবরের শিরোনামে চলে এলো। ব্রাজিল হেরে যাবার পর, সকাল বেলা মেয়েটি ঘরের মধ্যে ঢুকে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলো। প্রজ্ঞা নিজের ছোট্ট জীবন শেষ করে দিয়ে এমন এক জগতে চলে গেলো, যেখানে সম্ভবতঃ ব্রাজিল আর্জেন্তিনার রেশারেশি নেই। মেসি না নেইমার এই তর্ক নেই। ফুটবলই নেই। কিন্তু বাহরিনে কর্মরত প্রজ্ঞার বাবা আর তার মা, নিজের একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর জন্য নিজেদের কি ভাবে স্বান্তনা দেবেন? দিতে পারবেন কি? এই মৃত্যু, এই চলে যাওয়ার কি মানে থাকতে পারে? কারা দায়ী এর পেছনে? ফুটবল দায়ী? ব্রাজিল দায়ী হেরে যাবার জন্যে? জার্মানি দায়ী হারাবার জন্যে? আর্জেন্তিনা দায়ী রেশারেশির জন্যে? নাকি এই অর্থহীন রেশারেশি যারা তৈরি করলো ব্যবসার স্বার্থে তারা দায়ী? ও জোগো বোনিতো - এই সুন্দর খেলা। একে অসুন্দর করবার কোনো অধিকার দেওয়া হয়নি কাউকে। যাঁরা জেতা হারা মানেন না। যাঁরা খেলার সৌন্দর্য্য না দেখে অন্য পক্ষের ওপরে অর্থহীন নোংরা আক্রমন করেন তাঁদের অপরাধ বন্ধ হওয়া দরকার। তার জন্যে দরকার, সত্যিকারের ফুটবল যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁদের এগিয়ে এসে আমাদের এখানে একটা ফুটবল সংস্কৃতি তৈরি করা। বিদেশের মাঠে, দু দলের সমর্থক পাশাপাশি দু দলের জার্সি পরে খেলা দেখতে পারেন যদি, তো এখানে আমাদের এই হিংস্রতার অর্থ কি? আর কোনো প্রজ্ঞা যেন অকালে ঝরে না যায়। আসুন, ফুটবলকে ভালোবাসি। হলুদ সবুজ সাদা নীল এসব যেন ফুটবলকে ভালোবাসার পথে বাধা না হতে পারে। আর প্রানপনে সমর্থন করতেই হয় যদি, সমর্থন করুন নীল জার্সির ভারতকে। আজ যদি ভারতীয় ফুটবল তেমন কিছু করতে না পেরে থাকে, তাহলে আসুন, কিছু করি, যাতে করে এক দিন নীল জার্সি পরে হাতে তেরঙা নিয়ে আমরাও গ্যালারি মাতাতে পারি। 

বুধবার, ৯ জুলাই, ২০১৪

ফুলেকা - ২০১৪ ~ রাজ সাহা

​চোখ ফুটতেই খেলাধুলা শুরু। খেলনাবাটি, গাড়িগাড়ি আরও কতো কি। তারপর জানলাম আরেকটা খেলা আছে ফুটবল। বল নিয়ে খেলা। মাথা দিয়ে ভাবতে হয়, চোখ দিয়ে দেখতে হয়, হাত না লাগিয়ে দৌড়ে গিয়ে গোলে মারতে হয় অন্যদলকে কাটিয়ে। খেলতাম আমরাও। তারপর জানলাম এটাই নাকি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলা। আর পুরো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফুটবল-দল ব্রাজিল। তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড় হলো পেলে। যিনি নাকি বিশ্বকাপেও হ্যাট্রিক করেছেন।

আমাদের ক্লাবের মাঠের বড় পর্দায় দেখলাম জায়ান্টস অফ ব্রাজিল। একেবারে সিনেমা। মারপিট আছে, চোট্টামি আছে আমাদের মতো, তারচেয়েও বড় কথা ড্রিবল আছে, শিল্প আছে, স্বপ্ন আছে। সে দেশের সমর্থকেরা গোলা ফাটানোর জন্যে ঘরবাড়ি বিক্রি করে মহাদেশ পার করে জাহাজে করে অন্য দেশে পাড়ি দেন। হেরে যাবার পর তাঁদের হাতে থাকে স্রেফ ভিক্ষার ঝুলি, কান্নাতো নিত্যদিনের সঙ্গী। কারন ব্রাজিল দেশটা আমাদের চেয়েও তখন নাকি গরিব।

সেইদেশও আমাদের মতো ইউরোপীয়দের দেশ ছাড়া করে স্বাধীন হয়েছে অথচ তারা গোটা বিশ্বকে অস্ত্র দিয়ে নয়, যুদ্ধ দিয়ে নয়, রাজনৈতিক কুটকচালি দিয়ে নয়, স্রেফ খেলা দিয়ে শাসন করেন। সবাই তাঁদের পেছনে দৌড়ায়, তাঁরা এগিয়ে যান খেলে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে। সেই ছাপ থাকতো তাঁদের খেলাতেও, তাঁরা ফেয়ার প্লে অর্থাৎ মারপিট না করে স্রেফ খেলার আনন্দেই খেলেন এবং জেতেন সেই সুস্থ প্রতিযোগিতায়।

ইংল্যান্ডে যেবার বিশ্বকাপ হয় সেবার তাঁরা পারেন নি। সেবার নাকি স্রেফ ইংরেজদের চোট্টামির জন্যেই অনেক ভালো দল প্রতিযোগিতা থেকে হারিয়ে যান। কিন্তু, চ্যালেঞ্জ ছিল জুলেরিমে কাপ জেতার। যে তিনবার জিতবে সেই কাপ চিরজীবনের জন্যে তাঁদের। সেই লড়াই ব্রাজিল জিতে নেয়। এবং গোটা বিশ্বে নিজের দেশের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে নেয়। তখনো মারাদোনা তথা আর্জেন্টিনা বিশ্বফুটবলের মানচিত্রে আসেন নি।
সেই স্বপ্নে ভারতবর্ষের একটা ছোট্ট শিশু মশগুল হয়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ছিল এবং অবশ্যম্ভাবী ছিল। কারন এই খেলা ছিল দেশকাল, বর্ণ, রাজনীত, যুদ্ধ সবকিছুর উর্ধে। স্রেফ ভালবাসার অন্তিম বহিঃপ্রকাশ।

জায়ান্টস অফ ব্রাজিল দিয়ে শুরু, তারপর জিকো অর্থাৎ সাদা পেলে, এডিনহো, সক্রেটীস, কারেকা, অ্যালেমাও, ফালকাও, জুনিয়রকে দিয়ে সরাসরি দেখা ব্রাজিলের ম্যাজিক। না সেবার ব্রাজিল পারে নি জিততে। কিন্তু মন ভরিয়ে দিয়েছিল তাঁদের খেলোয়াড়ি শিল্পে। ঢেউয়ের মোট আছড়ে পড়া বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে। এবং একেরপর এক গোলের সম্ভাবনা তৈরি করা। কোনদিনই তাঁরা ডিফেন্সে বিশ্বাসী ছিলেন না। বরং একটা গোল খেলে ৪টে গোল করার মানসিকতায় মাঠে নামতেন। আবার একই কথা বলি, খেলার আনন্দে খেলতেন ফলে তাঁদের খেলা ছিল স্বপ্নময় সুন্দর।

জেতার জন্যে কিছু দল বিধ্বংসী খেলা খেলে, যার বেশিরভাগই ইউরোপীয়। সেই দলের নাম বলে আর বিড়ম্বনা বাড়াতে চাই না। তবে তাঁরাও জেতে। কিন্ত,শুধু খেলাটুকুই জেতে। মন জিততে পারে না। কালোচামড়ার প্রতি সাদা চামড়ার শোষণের লড়াইতে চিরকাল জিতে এসেছে, সেখানে এই খেলাটুকুই হচ্ছে সান্ত্বনার জায়গা। এবং বৃহত্তর মানবিকতার লড়াই। যা গোটাবিশ্বের আপামর জনতার হয়ে লড়েছে, ব্রাজিল। এবং স্বপ্নপুরন করেছে ব্রাজিল। আমাদের কিছু না করতে পারা জীবনের এটাই ছিল একটা সান্ত্বনার জায়গা। যেখানে ব্রাজিল বলে দেয় "যে সব ক্ষেত্রেই ওরা সেরা নয়, ওঁরা যেখানে সেরা সেটাই একমাত্র মোক্ষ নয় আমাদের জীবনে"।

তাই ব্রাজিলকেই সমর্থন করে ফেলেছি অজান্তেই। ভালবেসে ফেলেছিও অজান্তেই। যথার্থই ভালবাসা বলতে বাধা নেই, কারন এখানে চাওয়াপাওয়ার হিসেবটা নেই। তবে কি কিছুই চাই নি?

চেয়েছি, বারবার চেয়েছি, প্রতিবার প্রমান করতে যে ব্রাজিলই শ্রেষ্ঠ, কিন্তু খেলার অমোঘ নিয়ম এমনই যে এই খেলায় যে কোন দুটো দলের সবসময়েই একদম ৫০-৫০ সম্ভাবনা থাকে। সামান্যতম সুবিধা কেউ আগেপরে পায় না। সেখানেই ফুটবল আলাদা। শ্রেষ্ঠ খেলা ফুটবল।

তিলতিল করে গড়ে তোলা ভালবাসার প্রাসাদ আজ চূর্ণ জার্মানির অতর্কিত আক্রমণে। আজ ব্রাজিল ৭-১ গোলে হেরে যাওয়াতে কি প্রমান হয়? আমার জ্ঞ্বান সীমিত, তবু বলতে পারি যে ৮৪বছরের বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে লজ্জাজনক হার। আমার মনে প্রশ্ন উঠে আসে, যে তাহলে কি সৃষ্টিশীল ফুটবলের ধারক ও বাহকের দিন শেষ? এবার শুরু নতুন অধ্যায় যেখানে কেবলই ট্যাকটিকস ও পরিকল্পনা মাফিক খেলার জয় হবে? তাহলে সেটা কি খেলা হবে নাকি রোবটের লড়াই হবে। হয়তো কেউ কেউ বলবেন, কেন আর্জেন্টিনা, হল্যান্ড, উরুগুয়ে, চিলি, স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, পেরু, ক্যামেরুন, জাপান এদের খেলায় কি শিল্প নেই? আমি বলবো আলবাত আছে। মানুষ এতবড় মূর্খ হতে পারেনা যেখানে মারাদোনা স্বয়ং আছেন। তিনিও ফুটবলে শিল্পের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় [আমার মতে]। মারাদোনা মানেই স্বপ্ন। কিন্তু সেতো শুধু মারাদোনা। তাঁর দেশ আর্জেন্টিনা আমার মনে সেইভাবে দাগ কাটেনি। মারাদোনার আবির্ভাবের আগেই আমার মনের গাঁটছড়া বাধা হয়ে গেছে ব্রাজিলের সঙ্গে, গোটাদেশটার সঙ্গে। সেখানে মারাদোনাকে আমি কুর্ণিশ করতে পারি। তাকে প্রণাম করে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে পারি। কিন্তু ভালবাসতে পারি শুধু ব্রাজিলকেই। আমার অক্ষমতা ক্ষমা করবেন আশাকরি।

আলোচনার খাতিরে ধরে নিচ্ছি, যদি ব্রাজিলের স্বপ্নের দিন শেষ। কিন্তু তাতেও অন্যান্য দলের কোন ফায়দা হচ্ছে না। একটা মহীরুহ যদি উপড়ে যায়, সেইসঙ্গে একটা গোটা ইকোসিস্টেম ধ্বংস হয়ে যায়। সেই জেতা কখনই আনন্দের হতে পারে না। বরং, লড়াই করে জেতার স্বাদই আলাদা।

আরমাডিলো-ফুলেকা আর ব্রাজিলের ফুটবল এক সাথে কাব্যিক পরিণতি দিচ্ছে এই বিশ্বকাপের খেলায়। এই অসহায়তা কাউকেই আনন্দ দিতে পারে না বোধহয়। হয়তো আর্জেন্টিনা জিতবে, কিম্বা জার্মানি, অথবা নেদারল্যান্ড। যেই জিতুক সেই দেশকে অনেক দায়িত্ব নিতে হবে। যদি হয় হোক আরেক নতুন অধ্যায়ের সূচনা, ক্ষতি নেই। তাকেও সসম্মানে স্বাগত জানাই।
---------------------------------------------------------------
আর যারা গতবার স্পেনকে সাপোর্ট করেছিলেন, এবার জার্মানিকে করছেন, কিম্বা ২০০৬এ ফ্রান্সকে করেছিলেন এবার অন্য কাউকে করছেন, কিম্বা ২০০২তে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেছেন এবার হয়তো নেদারল্যান্ডকে করছেন তাঁরা হয়তো ফুটবলের অনেক কিছুই জানেন যা আমার মতো সাধারণ মানুষ জানেই না। কিন্তু তাঁদেরকেও আমি ক্ষমা করে দিলাম, ব্রাজিলের লজ্জাজনক পরাজয়ে নখ বাজাচ্ছেন আর গোটা ফেসবুক দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন "তোর ব্রাজিল কি করলো রে" বলে... বেচারারা এতো কিছু জানলো, কিন্তু ভালবাসতে জানলো নে এখনো...

মঙ্গলবার, ৮ জুলাই, ২০১৪

​ওস্তাদের মার শেষ রাতে ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

তাহার পর কি হইলো তাহা বিশ্ববাসী দেখিয়াছেন। দেখিয়াছেন গগনভেদী অট্টরোল। দেখিয়াছেন লুটিয়ে পড়া খেলোয়াড় ও বাকিদের হা-হুতাশ। পরের দিন দেখিয়াছেন উল্লাস ও স্বপ্নভঙ্গ। স্মৃতিরোমন্থন ও খিস্তি খেউড়। কিন্তু কি ঘটিয়াছিলো সেখানে?

তখন শেষ রাত। জমাট অন্ধকারে টিভি নামক বৈদ্যুতিন মাধ্যমের পর্দায় চোখ বিশ্ববাসীর। বিষুব অঞ্চলের উষ্ণতায় যোগ হইয়াছে খেলার উত্তেজনা। একখানি বল ও তাহার পিছনে বাইশ জন খেলোয়াড় তিন জন রেফারি, আর কোটি কোটি মানুষের চোখ দৌড়াইতেছে। দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিম প্রান্তের দেশ কলম্বিয়া গনরাজ্যের লাল টুক্‌টুকে জার্সি পরা হুয়ান ক্যামিলো জুনিগা ও একই মহাদেশের পূর্বপ্রান্তের দেশ ব্রাজিল প্রজাতন্ত্রের দশ নম্বর জার্সিধারী এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে বল দখলের লড়াই তে প্রানপনে দৌড়াইতেছেন। খেলা তদবধি আশি মিনিটের কিছু অধিক গড়াইয়াছে। খেলোয়াড়রা ঘর্মাক্ত ও পরিশ্রান্ত। তৃষ্ণায় ছাতি ফাটে। দর্শকাসনের উন্মাদনা খেলোয়াড়দের প্রতিটি রোমকূপে প্রবেশ করিতেছে। জুনিগার দল খেলায় এক গোলে পিছাইয়া আছে।

জুনিগা আরো জোরে দৌড়াইলেন। এই মহতি সভায় পরাজিত হইয়া মাথা নিচু করিয়া দেশে ফিরিতে কে চাহিবে? সামনের ব্রাজিলীয় তরুন অতিশয় চতুর। বল দেখিতে দিতেছে না। কেবল আড়াল করিয়া আছে। জুনিগা স্টেডিয়ামের ওপরে চলিতে থাকা অতিকায় ঘড়ির দিকে চাহিলেন। টিক্‌ টিক্‌ করিয়া সময় বহিয়া যাইতেছে। এই ব্রাজিলীয় বিচ্চুর খপ্পর হইতে বল দখল করিতে হইবে। কিন্তু ধিরে ধিরে বিচ্চু বলটি কে আরো দূরে লইয়া যাইতেছে। আকাশ বাতাস কাঁপিতেছে দর্শকের গর্জনে। তা বলে কি মাথা নোয়াইতে হইবে? ইশ্বর , হে ইশ্বর, সর্বশক্তিমান, দয়াময়, তুমি কি সহায় হবে না ? এই আর্তি কি তোমার কর্ণকুহরে পৌঁছাইতেছে না? হে দয়াময়, হে পিতা, আজ এই আর্তের সহায় হও। পথ দেখাও , পথ দেখাও প্রভু। আর পারিলেন না, জুনিগা এক মুহুর্ত চোখ বন্ধ করিলেন। ইশ্বরের পায়ে নিজেকে সমর্পন করিলেন।

মুহুর্ত পরে, জুনিগা চোখ খুলিলেন জুনিগা। গগনভেদী কর্ণপটবিদারী চিৎকার কোথায় যেন মিলাইয়া গেল, আলোকোজ্জ্বল স্টেডিয়াম তাঁর চোখে পড়িলনা, ক্লান্তি শ্রান্তি তৃষ্ণা সব যেন মিথ্যা হইয়া গিয়াছে। শুধু চোখের সামনে জুনিগা দেখিতে পাইলেন ইশ্বরের নির্দেশ। তাঁর বানী। দয়াময় সর্বশক্তিমান ইশ্বর তাঁর সহায়। আর পারিলেন না, দু চোখ ফেটে আবেগের অশ্রু বেরিয়ে এলো জুনিগার। প্রতিটি রোমকূপে হর্ষ ও উত্তেজনা ফুটিয়া বাহির হইতেছে। জুনিগা দেখিলেন জ্বলজ্বলে হলুদ রঙের উপর স্পষ্ট লেখা ইশ্বরের নির্দেশ – "নে মার"। তার নিচে লেখা ১০। জুনিগা আর থাকিতে পারিলেন না। তিনি তো শুধু ক্ষুদ্র মানুষ, ইশ্বরের ইচ্ছাই সব। তিনিই সর্বনিয়ন্তা। জুনিগা হাঁটু উঠাইলেন।

১০ বার মারার নির্দেশ ছিলো। তবে কিনা ইশ্বরের মার বলে কথা। বাকি ৯ খানি প্রয়োজন হয় নাই। ওস্তাদের মার শেষ রাতে দেখিয়াছি আমরা।

শুক্রবার, ৪ জুলাই, ২০১৪

রচনাঃ বিশ্বকাপ ফুটবল ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য়

​ভূমিকাঃ বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। নামে বিশ্বকাপ হলেও এতে ভারত সহ বিশ্বের অনেক দেশকেই খেলতে দেওয়া হয় না। তবে তার জন্য ভারতীয়দের, বিশেষ করে বাঙ্গালিদের এই খেলা দেখার উতসাহের কিছু খামতি পড়ে না। যে সব দেশের ম্যাপে অবস্থান কোথায় বা রাজধানীর নাম কী তারা জানে না, সেইসব দেশেরও অন্ততঃ তিনটে খেলোয়াড়ের নাম তারা জানে, যে গোল দেয়, যে গোল বাঁচায় আর যে বিপক্ষের খেলোয়াড়দের কামড়ায়।

খেলার নিয়মকানুনঃ খেলাগুলি গভীর রাতে হয়, যাতে সিরিয়াল দেখায় কারো কোনো বাধা না পড়ে। খেলার নিয়ম খুব সহজ, একটা বল-এ লাথি মেরে অন্য দলের গোলপোস্টে ঢোকানো। কিন্তু খেলোয়াড়রা প্রায়ই বলে লাথি না মেরে অন্য খেলোয়াড়দের লাথি মারে। মারামারি বন্ধ করবার জন্য একজন বাঁশি মুখে মাঠের ভিতরে আর দুজন পতাকাওয়ালা লাঠিহাতে মাঠের বাইরে ঘোরে। বাঁশিওয়ালার কাছে লাল-হলুদ কার্ড থাকে, মাঝে মাঝে একটা একটা করে সবাইকে দেখায়। এটা আসলে বাঙ্গালিদের সেরা ফুটবল ক্লাবকে সম্মান জানাতে। যদি কোনোবার মোহনবাগান দল লীগ বা শিল্ড জেতে, তাহলে সেইবার বিশ্বকাপে বাঁশিওয়ালারা সম্ভবতঃ সবুজ-মেরুণ কার্ড বার করে দেখাবে।

যে দল বেশীবার বল গোলপোস্টে ঢোকাতে পারে, তারা বিজয়ী হয়। অন্যের গোলপোস্টে বল ঢোকাতে না পেরে অনেক খেলোয়াড় নিজের গোলপোস্টেও বল ঢোকায়। নব্বই মিনিট খেলা হয়। যদি দু'দলের গোল সমান হয়, এবং একদল কে বিজয়ী করতেই হয়, তখন বাঁশিওয়ালা একটা দলকে পেনাল্টি দেয়। তাতেও নিষ্পত্তি না হলে তারা খেলতেই থাকে, যতক্ষণ না একটা দলের গোলসংখ্যা বেশী হয়।

পা দিয়ে মারতে না পারলে মাথা দিয়েও বল মারা যায়, তবে গোলকিপার এবং ভগবান ছাড়া হাত দিয়ে বল মারার নিয়ম নেই।

উপসংহারঃ একমাস ধরে এই হুজুগ চলে। তারপর সব দেশের খেলোয়াড়রা যে যার দেশে ফিরে যায়। যারা চ্যাম্পিয়ন হয়, তাদের একটা হলুদ ব্যাঁকাত্যাড়া লম্বাটে ফুলদানী দিয়ে বোঝানো হয় যে অটাই বিশ্বকাপ। তখন তাদের মধ্যে অনেকে রাগ করে প্রতিজ্ঞা করে যে পরের বার তারা আর খেলতে আসবেনা, বা এলেও চ্যাম্পিয়ন কিছুতেই হবেনা।

মঙ্গলবার, ২৪ জুন, ২০১৪

কিছু উপলব্ধি - মহাভারত- ১ ~ তমাল রাহা

আমি কিছুটা confused …. মহাভারত নতুন করে পড়ছিলাম । আর ভাবছিলাম আমার দেখার চোখ টাই কি বাঁকা? মহাভারত কে মানলে, এসব so called conscious ব্যপারটা বেশ স্থুলো বলেই মনে হয়। ভদ্রতা ও সদাচারে নিবদ্ধ আমরা , কিন্তু একটু সত্যের মুখোমুখি হলে কেমন লাগে? ঠিক বেঠিক এর হিসেব করে কে? সমাজ?

অর্জুনরা ততোদিনে মরে-টরে গেছে । তখন অর্জুনের ছেলের ছেলে জন্মেজয় রাজা। হঠাৎ চব্বিশ হাজার শ্লোকের বিশাল এক বই নিয়ে হাজির দ্বৈপায়ন-এর শিষ্য বৈশম্পায়ন। এসে বললেন, ¨রাজা মশাই, এই নিন। ….গুরু দ্বৈপায়ন লিখেছেন আপনার বংশের গৌরব গাথা¨। রাজা জন্মেজয় তখন খুশিতে আত্মহারা। ...বললেন ¨campaigning চালু করো, সবাই জানুক কতো বড় বংশের উত্তরাধিকারী আমি¨। সবাই জানলো , শুনলো মহাভারতের কথা। সবাই ধন্য ধন্য করে উঠলো। কিন্তু কেউ কি প্রশ্ন করলো যে এটা বীরগাথা না যথেচ্ছ যৌনাচার এর কাহিনী?

আমার কাছে মহাভারতের central character ঋষি দ্বৈপায়ন, যাকে আমরা ব্যাসদেব বলে জানি। গল্পের শুরুতেই নিজের জন্মকাহিনী ….. মহাভারতের প্রথম যৌনাচার …..নিজের মা-কে দিয়ে শুরু, তারপর ব্যাসদেব কিন্তু কাউকে ছাড়েন নি। প্রথমে ব্যাসদেব নিজে, তারপর কুন্তী, পরে দ্রৌপদী …. মাঝে প্রচুর খুচরো আর শেষে বেচারা অর্জুন …….

মৃগয়া করতে গিয়ে মহারাজ শান্তনুর সাথে আলাপ হয়েছিলো গঙ্গার। অল্পদিনের জানাশোনা।কিন্তু তাতেই কি? শর্ত ছিলো গঙ্গা কে কোনো কাজে বাধা দেওয়া যাবে না। তার বদলে রাজা শান্তনু পাবেন একটু ইয়ে-র স্বাদ।আটটি পুত্র হলো (শোনা যায় তারা শাপভ্রষ্ট অষ্টবসু)। বাচ্ছা হয়, আর গঙ্গা তাদের ভাসিয়ে দেন ( প্রমান লোপাটের চেষ্টা?)। রাজামশাই আর পারলেন না। এবার বাধা দিলেন। গঙ্গা তখন রাজা শান্তনু কে দেবব্রত (পরবর্তীকালের ভীষ্ম) নামে এক পুত্র সন্তান দিয়ে বললেন ¨একে রাখো, আমি চললাম ¨। বোঝো কান্ড !

সত্যবতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে পরাশর মুনি একবার নৌকায় সত্যবতীর সঙ্গে মিলিত (ধর্ষণ বলা যাবে না!) হয়েছিলেন। সেই মিলনের ফলে ব্যাসদেবের জন্ম হয়।যমুনা দ্বীপে জন্ম হয়েছিল বলে ব্যাসদেবের অপর নাম কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন। কিন্তু পরাশর মুনির আশীর্বাদে সত্যবতীর কুমারীত্ব নষ্ট হয় নি। 
ওদিকে গঙ্গার শোকে আবার রাজা শান্তনু বিষাদগ্রস্ত। বেশ কিছুদিনের অভ্যেস, হঠাত করে একা হয়ে যাওয়াটা ঠিক জমছিলো না। আলাপ হলো সত্যবতীর সাথে।সত্যবতীর রূপে মোহিত হয়ে মহারাজা শান্তনু তাঁকে বিয়ে করেন।শর্ত একটাই, দেবব্রত রাজা হতে পারবে না। দেবব্রত তখন বেশ বড়ো , বুঝলো বাপের জ্বালা। অগত্যা আত্মবলিদান … বাপের বিয়ে বলে কথা !

সত্যবতী ও শান্তনুর বিচিত্রবীর্য ও চিত্রাঙ্গদ নামে দুই পুত্র হয়। ইন্দ্রিয়পরায়ণ বিচিত্রবীর্য এই দুই স্ত্রীর সাথে অপরিমিত যৌনাচারে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং অকালে নিঃসন্তান অবস্থায় যক্ষ্মারোগে মৃত্যুবরণ করেন। চিত্রাঙ্গদ ও বেশিদিন বাচলেন না। বংশ লোপ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায়, সত্যবতী ভীষ্মকে এই বিধবা'র গর্ভে সন্তান উৎপাদন (এর চেয়ে ভালোভাষায় বলার ক্ষমতা নেই, পাঠক-পাঠিকারা মাফ করবেন) জন্য অনুরোধ করলে- ভীষ্ম সত্য রক্ষার্থে সে অনুরোধ প্রত্যাখান করেন। কি করে করবেন ! শপথ করেছেন নিজেও রাজা হবেন না, সন্তান-ও বানাবেন না , কারণ তারাও রাজা হতে পারবে না। 
এরপর ভীষ্মের কাছে অনুমতি নিয়ে সত্যবতী তাঁর প্রথম পুত্র ব্যাসদেবকে ব্যাসদেবকে ডেকে বললেন ¨বাছা, বংশ রক্ষা করতে হবে। বিচিত্রবীর্য তোমার ভাই , এখন তো সে নেই, তাই ভাতৃবধুদের সাথে একটু ইয়ে করে আমায় রক্ষা করো¨। সত্যবতীর অনুরোধে ব্যাসদেব বিচিত্রবীর্যের স্ত্রী অম্বিকা আর অম্বালিকার সাথে মিলিত হন। মিলনকালে ব্যাসদেবের ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখে অম্বিকা সবসময় চোখ বন্ধ করে ছিলেন। সেই কারণের অম্বিকার গর্ভে উৎপন্ন সন্তান ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হন। এরপর মাতৃআজ্ঞায় ব্যাসদেব আবার অম্বালিকার সাথে মিলিত হন। এবার সন্তান অন্ধ হওয়ার ভয়ে অম্বালিকা সব সময় তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু ভয়ে অম্বালিকা পাণ্ডুবর্ণ হন বলে- এর একটি পাণ্ডুবর্ণের সন্তান জন্মেছিল। এই সন্তানের নাম রাখা হয়েছিল পাণ্ডু। এরপর সত্যবতী অম্বিকাকে পুনরায় ব্যাসের কাছে গমন করতে আদেশ করলে- অম্বিকা তাঁর এক রূপসী দাসীকে ব্যাসের কাছে পাঠান। ব্যাসের ঔরসে এই দাসীর গর্ভে বিদুরের জন্ম হয়। এই দাসী ব্যাসদেবের সাথে সানন্দে মিলিত হন। ফলে বিদুর হয়েছিল শারীরিকভাবে ত্রুটি মুক্ত।

সাধুপুরুষ হলে কি হবে? ব্যাসদেব তো ততোদিনে অন্য জিনিসের আস্বাদ পেয়ে গেছেন ! একবার ব্যাসদেব সুমেরু পর্বত থেকে নিজ আশ্রমে ফিরে একবার যখন হোমের আয়োজন করছিলেন, সে সময় ঘৃতাচী নামক এক অপ্সরা উপস্থিত হন। ঘৃতাচীকে দেখে ইনি অত্যন্ত কামাবিষ্ট হন। ব্যাসদেবের এরূপ অবস্থা দেখে ঘৃতাচী শূকপাখির রূপ ধরে পলায়ন করেন। কিন্তু ব্যাসদেবের প্রবল কামনার কারণে তাঁর বীর্যস্খলন হয় এবং তা অরণির উপর পতিত হয়। ব্যাসদেব উক্ত অরণি মন্থন করতে থাকলে একটি পুত্রের জন্ম হয়। ঘৃতাচী শূক পাখির রূপ ধরে পলায়ন করেছিলেন বলে- ব্যাসদেব এর নাম রাখেন শূক। 
বাজারে ধর্মের ষাঁড় ছেড়ে দেবার একটা লোকায়ত প্রথা আছে। নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভিতর এইসব ষাঁড়েরা ঋতুবতী গাভীদের নিষিক্ত করে।ব্যাসদেব কে বেশ ধর্মের ষাঁড় বলে মনে হয় না? এখনো কৃষি প্রধান এলাকার এটাই প্রচলিত প্রজনন বিদ্যা। ঋতুবতী গাভীদের ডিম্বাণুর সাথে ধর্মের ষাঁড়দের শুক্রাণুর নিষিক্ত করণের এই ক্রিয়া প্রক্রিয়াকে ঋষি ক্রিয়া বলতে পারেন। তাই সংস্কৃত ভাষায় নির্দিষ্ট গোয়ালহীন ধর্মের ষাঁড়দের ঋষভ বলা হয়। আশারাম্ বাপু দের আর দোষ দেই কি করে , ওরা তো এই ঋষি ক্রিয়া কেই এগিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন?

এবার কুন্তী …...
ছোটবেলায় (?) দুর্বাসা মুনি কুন্তিকে বর দিয়েছিলেন যে, যে-কোনও দেবতাকে আহবান করে তিনি তাঁর সন্তান ধারণ করতে পারবেন। ছোটবেলাতেই ব্যাপারটা test করে রেখেছিলেন তিনি। মানে ওই আর কি, বাজার থেকে নতুন ইনস্ট্রুমেন্ট কিনলে নেড়েচেরে নেওয়া, এই আর কি ! কুন্তী মণ্ত্রের সত্যতা পরীক্ষা করার সূর্য্যদেব কে বেছে নিলেন। ফলত, সুর্য্যবাবুর সাথে একটু আধটু ইয়ে হলো আর কি ! হলো কর্ণের জন্ম। আমরা পেলাম এক বীরপুরুষকে, কিন্তু মা কুন্তী অস্বীকার করলো ছেলেকে। এই জায়গায় বলব যে সত্যবতী বেশ সাহসী ছিলেন, ব্যাসদেব এর পরিচয় গোপন করেন নি। কুন্তী পারলেন না …… কিন্তু পরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে কর্ণ - এর কাছে গিয়ে গিয়ে বাবা-বাছা করার সময় অবশ্য লজ্জা পান নি ! 
পাণ্ডু কুন্তিভোজের পালিতা কন্যা কুন্তী ও মদ্ররাজের কন্যা মাদ্রীকে বিবাহ করেন। একবার মৃগয়াতে গিয়ে পাণ্ডু মৈথুনরত মৃগকে শরাঘাত করায় মৃত্যুমুখী মৃগ (আসলে মৃগরূপধারি কিন্দম-নামা মুনি) পাণ্ডুকে অভিশাপ দেয় যে, মৈথুনে লিপ্ত হলেই পাণ্ডুর মৃত্যু হবে। তাই পান্ডুবাবুর বিয়ে-থা হলেও জীবনে ওই ইয়ে ব্যাপারটা নিয়ে বেশ চাপ ছিলো। আবার সেই সঙ্গে বংশরক্ষার দায়-ও আছে ! কি সমস্যা ! কিন্তু ব্যাসদেব সব plan করে রেখেছিলেন।ওই যে আগেই বললাম, ছোটবেলায় পাওয়া দুর্বাসা মুনির আশীর্বাদ ! কুন্তী পাণ্ডুর ইচ্ছায় ধর্ম, পবন ও ইন্দ্রকে আহবান করে যথাক্রমে যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনকে জন্ম দিলেন। পাণ্ডুর ইচ্ছায় তিনি সপত্নী মাদ্রীকে শিখিয়ে দিলেন কি করে দেবতাকে আহবান করতে হয়। বললো ¨ কার সাথে ইয়ে-টিয়ে করবি বল, ব্যবস্থ্যা করে দিচ্ছি ¨। কিন্তু ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেলো । মাদ্রী বুঝল যৌবনের যা জ্বালা তাতে একটা দিয়ে হবে না। অশ্বিনীকুমার ভাইরা ছিল জমজ। সে অশ্বিনীকুমার-দ্বয়কে আহবান করে নকুল ও সহদেবকে জন্ম দিলো।

বংশরক্ষার ব্যাপার তা তো মিটলো ! কিন্তু ওই ইয়ে ব্যাপারটা নিয়েই সমস্যা ! পান্ডু রাজা হলে কি হবে, মানুষ তো! কিছুদিন বাদে কামার্ত হয়ে অভিশাপ উপেক্ষা করে মাদ্রীর সঙ্গে মিলনকালে পাণ্ডুর মৃত্যু হয়। মাদ্রীর ছিল কম বয়েস, self control ব্যাপারটা তো আশা করা অন্যায় !

পাণ্ডবদের বাবা নিয়ে যত গোলযোগ, কর্ণ সম্বন্ধেও তত-বেশীর ভাগ, কারণ তিনি কানীন। মেরে পাস বাপ হ্যায়। তা কর্ণর কাছে বাপ ছিল না বলে সে রাজকন্যে পেল না। কি জ্বালা মাইরি ! ভীষ্মের বিয়ে করা হলো না বাপ থাকার জন্যে আর কর্ণের না থাকায় ! বেচারা বেশ দ্রৌপদী কে টার্গেট করেছিল ! কিন্তু কর্ণ কে হারিয়ে অর্জুন দিব্যি বাজী জিতে গেল ! আদতে বাকি ভাইরা দ্রৌপদীর ভাগ পেলেও, কর্ণ বেচারা সেটাও পেলো না ! আসলে পান্ডবদের legal বাবা রাজা ছিলো, কর্ণের legal বাবা তো সারথী ! তাই আইনের লড়াইটা ছিলো অসম।

এবার আসি দ্রৌপদীর কথায় ….
পুরাকালে নাকি এক সুন্দরী মেয়ে বিয়ে না হবার জন্য কান্নাকাটি করছিল, তখন মহাদেব এসে তাকে বর দিতে বলায় সে পাঁচবার বলে দেয় তার ভাল বর লাগবে। মহাদেব তো পাগলা বাবা ! পাঁচবার তথাস্তু বলে দিলো ! ব্যাস আর যায় কোথায় , বাবা মহাদেব এর বর বলে কথা ! সেই মেয়ের পাঁচজন স্বামী হয় পরবর্তী জন্মে। ঠিক ধরেছেন, সেই মেয়েই দ্রুপদ রাজের কন্যা, দ্রৌপদী। আর প্রত্যেকবার প্রতিটি স্বামীর সাথে মিলনের সময় কৃষ্ণা (দ্রৌপদীর আরেক নাম) কুমারী হয়ে যেত ব্যাসদেবের আশীর্বাদে। মানে কি সুন্দর সেটলমেন্ট ! ভাবাই যায় না। পুরুষের ভোগের জন্য একটা মেয়েকে দিয়ে যতরকম এক্সপেরিমেন্ট করা সম্ভব তাই করে গেছেন ব্যাসদেব। তবে পাঁচস্বামীর সংসার করাটা দ্রৌপদীর জন্য কতটা প্রীতিকর কিংবা ভীতিকর সেটা সেই জানতো !

পাঁচ-পাঁচটা স্বামী, কিন্তু বস্ত্রহরণে বাঁচালো কিন্তু কেষ্টবাবু ! তাহলে এই পাঁচটা লোক করতো কি ? শুধুই মস্তি ? যদিও শোনা যায় ভীমসেন কিছুটা প্রতিবাদ করতো কালেভদ্রে, কিন্তু জুয়াড়ি যুধিষ্টির এর জন্যে গর্জনটা বর্ষণে পরিনত হতে পারে নি। 
যাই হোক, কেষ্টবাবু এলেন …….
আকাশ ভরে উঠল সোর
মেঘের ঘোর জলের তোড়
মন্ত্রপড়া অন্তরাল
দিলো না তবু সাড়া
অসম্ভব দ্রৌপদীর অন্তহীন শাড়ি।(দ্রৌপদীর শাড়ি/বুদ্ধদেব বসু)

অথচ আশ্চর্য, অথচ মুক্তি পেয়েই দ্রৌপদী ধৃতরাষ্ট্রের কাছে পাশা খেলায় হেরে বন্দি হয়ে থাকা সমস্ত পাণ্ডবের মুক্তি চেয়ে নিলেন ! ব্যাস, গেলাম রমণীর 'সর্বংসহা ধরিত্রী' রূপ ! দ্রৌপদী দুর্বল ছিলেন? কিন্তু পরের পরের অধ্যায় এ দেখি দ্রৌপদীর প্রতিহিংসা। মহাভারতের যুদ্ধ , কীচক হত্যা সবই তো দ্রৌপদীর প্রতিহিংসা ! অথচ সামাজিক অন্যায় মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্রৌপদী দুর্বল ! কেন ? এটা নিয়ে অন্যত্র আলোচনা করার ইচ্ছে রইলো।

দ্রৌপদীর বিয়ের ঘটনাটি মহাভারতের একটি উল্লেখযোগ্য অসাধারণ ঘটনা। পঞ্চস্বামীর স্ত্রী হওয়া এ যুগেও সম্ভব কি না, তা ভাববার বিষয়। দ্রৌপদী কি স্বেচ্ছায় এই বিয়ে মেনে নিয়েছিল? আসলে ব্যাসদেব একটা ব্যবস্থ্যা করেই রেখেছিলেন। ওই পূর্বজন্মের মহাদেব এর আশীর্বাদ এর কথা টা বলছি ! আসলে নারীর ভাগ্য শতজন্মেও দেবতার তথা পুরুষের করতলগত থেকেই যায়। দ্রৌপদী প্রথমে প্রথমে রাজি ছিলেন না। ধর্মপুত্র যুধিষ্টির তাকে জটিলা নামে এক গৌতমীর গল্প শোনালেন, যিনি একসঙ্গে সাতজন ঋষির ঘর করেছিলেন। যুধিষ্টির এর রিপুজনিত তাড়না একটা তো ছিলই ! তাই ব্যাপারটাকে justify করার চেষ্টা , এই আর কি ! দ্রৌপদী finally রাজি হলেন। মেনে নিয়েছিলেন কি ? আসলে, পৃথিবীর ইতিহাস রচনা করেছে সমাজের বা রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান পুরুষ। তাই ইতিহাসের নাম 'His story ' তথা 'History…. প্রতিভা বসু মন্তব্য করেন, দ্রৌপদী 'যেন খেলার বল। একের কাছ থেকে (যাচ্ছে) অপরের কাছে।' আসলে দ্রৌপদী তো বহুবল্লভা, নাথবতী অনাথবত-- পঞ্চপান্ডবের সম্পত্তি। দ্রৌপদীর কিন্তু স্বেচ্ছা বা স্বেচ্ছাচারের জায়গা ছিল না… একদল কামুক এবং একজন উদাসীন প্রেমিকের প্রেমে পরে সমাজাচারই তাঁকে উদাহরণের দলে এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ত্ব বানিয়ে ছেড়েছিল।

আর অর্জুন …...
অর্জুন বীরত্ব দেখিয়ে তো দ্রৌপদী কে বিয়ে করে আনলো। এদিকে কুন্তী বললেন যে যা এনেছ সব ভাইয়েরা ভাগ করে নাও! একদম ফুলটু কেস মাইরি! তখন পান্ডবেরা গোল টেবিল বৈঠকে বসে একটা ভদ্রলোকের চুক্তি করল যে দ্রৌপদী প্রতি ভাইয়ের কাছে এক বছর করে থেকে সংসার করবে। যদি সেই সময় অন্য কোন ভাই তাকে দেখে ফেলে তবে সেই ভাইকে বারো বছর ব্রম্ভচারী (এইখানে শর্ত আছে, ব্রহ্মচারী শুধু দ্রৌপদীর ক্ষেত্রে, হা হা হা, মানে অনন্য রমনীতে দোষ নাই!) হয়ে বনবাসে যেতে হবে।

এই নিয়মের বলি হয়ে গেল অর্জুন (নাকি advantage নিলেন?)। গরু-চোরেরা ব্রাহ্মণ-এর গোরু নিয়ে ভাগছিল দেখে তারা অর্জুনের কাছে এসে বিচার চাইল। ওদিকে অর্জুনের অস্ত্র ছিল যুধিষ্ঠিরের ঘরে, অর্জুন রাজধর্ম পালনের জন্য সেই নিয়ম সত্ত্বেও ঘরে ঢুকে (ঘটনাচক্রে সেখানে ছিল যুধিষ্টির, সঙ্গে দ্রৌপদী ) অস্ত্র নিয়ে গরুচোর ধরতে বেরিয়ে গেল (আর কিছু দেখেও ফেলেছিলো বোধহয় !)। হলো চুক্তিভঙ্গ।

চুক্তিভঙ্গ করার দায় মাথায় নিয়ে বনবাসে চলে গেল।এখানে প্রশ্ন ওঠে অর্জুন এর এই কাজটা কি intentional ছিলো? কারণ হিসেবমত যুধিষ্ঠিরের পর ভীম তারপরে পালা ছিল অর্জুনের। মুখে না বলুক, আদতে অর্জুন তো মানুষই ছিল। দ্রৌপদী তো আসলে তারই বীরত্বের দ্বারা প্রাপ্ত। সেখানে বারোয়ারি হয়ে গেল, আর তার নম্বর আসতে লাগল দু ভাইয়ের পরে, এটা অভিমান ছিল না তো আসলে? নাকি দ্রৌপদী যখন দুভাইয়ের ঘরে থাকবে তখন ঘরছেড়ে বেরিয়ে বাইরে অন্যকিছু করার ছক ছিল? কারণ ঘরছাড়া অবস্থাতেই উলুপী, চিত্রাঙ্গদা, সুভদ্রাকে বিয়ে করে সে ….মাঝখান থেকে গালি খেলো কুকুরে …..


শুক্রবার, ৬ জুন, ২০১৪

দিদি ও বোন ~ শঙ্খ করভৌমিক

 
খবরে এবারের আকর্ষণ-
গলাতে ফাঁস বাঁধা দিদি ও বোন।

ওই তো, শুনে নাও কান পেতে
উড়োজাহাজ নামে ধানক্ষেতে।

নেত্রী বক্তৃতা দিলেন খুব।
শুনল মন দিয়ে মানুষ চুপ।

সবুজ-লাল-নীল হরেক দল
গাছের খেয়েদেয়ে কুড়োয় ফল

আসল মাথাব্যথা নির্বাচন
দড়িতে ঝুলে থাক দিদি ও বোন।

বুধবার, ৪ জুন, ২০১৪

বেঁচেই আছি বাবা ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

নানারকম গুজব রটেছিল…

আদৌ বেঁচে রয়েছি কি না আজও
সে'টা বুঝতে হুকুম দিল রাজা
আজ উৎসব… যেমন খুশি সাজো।

টিকিট দেবে স্থানীয় কোতোয়ালি
সবাই জড়ো রাজবাড়ির মাঠে
ভাঁড় সেজেছি… সেজেছি রাজকবি
কেউ নাচব, কারওর মাথা ফাটে।

লাঠি মেরেছে? আমরা দেখিনি তো!
কাতার দিয়ে ঢুকেছি সার্কাসে
গানের তালে কোমর দোলে… দোলে…
তথাকথিত তারকাদের পাশে।

হাসপাতালে বোকার মত শোয়া
তাদের নিয়ে কেই বা মাথা ঘামায়
রাজার স্নেহে পরিপ্লুত ভাবে…
আহা! তবু তো প্রভু ডেকেছে আমায়।

টান পড়েছে গলার বকলস-এ
যত্নে সাড়া দিয়েছি… 'ঘৌ'…' তাতে।
বেঁচে যে আছি সে'টা প্রমাণ করে
দিব্যি আছি মারে ও মৌতাতে।

রবিবার, ১ জুন, ২০১৪

প্রদীপের দৈত্য ও জনৈক ~ অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায়

প্রদীপের দৈত্য: হুকুম করেন বস্, আলাদিন ঠিক মতো ইউজ করতে পারে নি।
জনৈক: আলাদিন পারে নি কেন ?
প্রদীপের দৈত্য: প্রদীপের ফেয়ার ইউসেজ পলিসির একটা ব্যাপার আছে.... কাইন্ড অফ ওয়াইম্যাক্স
জনৈক: আমি আমার ইচ্ছা বলবো ?
প্রদীপের দৈত্য: ইয়াপ
জনৈক: ভারতকে পাকিস্তান দখল করার ক্ষমতা দাও।
প্রদীপের দৈত্য: আপনি কি আলাদিনের মত গাড়ল ?
জনৈক: কেন ?
প্রদীপের দৈত্য: এই আল-ফাল চাওয়ার জন্য প্রদীপ ঘষে কেউ ?
জনৈক: ওহ, সরি...
প্রদীপের দৈত্য: দেশের উন্নতির জন্য কিছু চান....দেশপ্রেম নেই নাকি ?
জনৈক: ওকে... সবেতেই ১০০% বিদেশী বিনিয়োগ এনে দেশকে উন্নত করার শক্তি দাও....
প্রদীপের দৈত্য: ইয়ে, ভারত কবে নাগাদ পাকিস্তান দখল করলে আপনার সুবিধা বস্ ?
জনৈক: সে কি .... ১০০% বিদেশী বিনিয়োগ..উন্নত দেশ......?
প্রদীপের দৈত্য: ১০০% বিদেশী বিনিয়োগে দেশের উন্নতি আমার বাপেও পারবে না বস্ ............
...................আমি তো স্রেফ প্রদীপের দৈত্য...
জনৈক: আপনার বাপ কোনখানের দৈত্য ?
প্রদীপের দৈত্য: হারিকেনের।
জনৈক: বাহ, দাদা ?
প্রদীপের দৈত্য: হ্যাজাক বাতির। নেক্সট জেনারেশন অবশ্য অন্য পেশায় পালিয়েছে । এবার আমি পালাই ?

শনিবার, ৩১ মে, ২০১৪

রম্য রচনা ৩ - ( উন্নয়ন চলছে ,রাস্তা বন্ধ ) ~ অবিন দত্তগুপ্ত

স্বপনদার সাথে আলাপ,বছর ৪এক আগে । শুক্রবার রাতে, বেলেঘাটায় এক বন্ধুর বাড়ি গেছি কোন এক অবভিয়াস নিমন্ত্রন রক্ষার্থে । খালপাড় থেকে রিক্সায় ৫ মিনিট (বেলেঘাটা টাইমলাইন অনুযায়ী মিনিট ১২ ) । স্বপনদা রিক্সা চালাত । যে সময়ের কথা বলছি তখন অসংখ্য জায়গায়, সৈনিকরা পরাক্রান্ত ( তবুও আমার শুক্রবার বদলায়নি ) ,কিন্তু বেলেঘাটায় (রিক্সায় বসা) আমার আর (রিক্সা টানা) স্বপনদার লাল ঝান্ডা তখনো পত্‌ পত্‌ করছে । এক জায়গায় দেখি হঠাতি রাস্তা বন্ধ,কাঁটা তারের বেড়া । স্বপনদা(নাম তখনো অজানা ) , কয়েক সেকেন্ড থেমে রিক্সার মুখ ঘোরালো । দুদিন আগে এসছিলাম, হঠাৎ পরিবর্তনে অবাক হয়েই জানতে চাইলাম " এটা কবে থেকে ? কেন ? " । গম্ভির গলায় জানালেন "উন্নয়ন চলছে ,রাস্তা বন্ধ । "

অবভিয়াস নিমন্ত্রনে,অবভিয়াস ভাবেই গৃহকর্তা তখনো অনুপস্থিত । সেই সুযোগেই স্বপনদার নাম জানা । যেখানে কাঁটাতার তার অন্য পাড়ে-ই আমার স্বপ্নের ঝান্ডা উড়ছিল । স্বপনদা জানালেন, ওটাই নাকি ভবিষ্যতের ঠিকানা,ওনাদের পার্টি অফিস,এবং ওদিকেই খালপাড়,ওদের বস্তি । জানালেন , বছরের পর বছর ধরে ঐ খালপাড় উচ্চবিত্তের উলটো দিকের কোঠা বাড়িকে , সকালে ঝি, সারাদিনে রিক্সা আর রাতে মেয়েমানুষ জুগিয়েছে । ওনারা শুনেছেন, কোঠা বাড়ির মেয়েরা আজকাল বস্তি ফেসিং ফ্ল্যাট পছন্দ করেন না, কোঠা বাড়ির বাবুরা আজকাল ছোট দোকান, প্যাচপ্যাচে কাদায় বাজার করা পছন্দ করেন না । মল-মুত্র কিসব অত্যন্ত প্রয়োজনীয় । তাই উন্নয়ন প্রয়োজন,অতএব রাস্তা বন্ধ।

গৃহকর্তার মিসড্‌ কল ,ততক্ষনে ওনার ফেরার খবর জানান দিয়েছে । অতএব ব্যাস্ত আমি,মধ্যবিত্ত আমি, বিরক্ত হয়েই জানতে চাইলাম " এতো কিছুর পর-ও ঐ ওদিকে, তোমাদের দিকে লাল ঝাণ্ডা ওরে কেন ? "
একগাল হেসে, বিড়িটা ধরিয়ে উত্তর দিলেন " ওইটুকুই যা আছে । তোমাদের শহর,আমার-ও--- জানিয়েছিল যে ঝান্ডা । যে ঝান্ডা কাঁধে 'আমি মানুষ' জেনেছিল আমার বাপ,সেই ঝান্ডাই ওই বন্ধ ভাঙ্গবে । " রিক্সার প্যাডেলে চাপ দিয়ে, ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতের এক ভুবনজয়ী হাসি নিয়ে স্বপনদা বলে গেছিল " যে মিছিলে তোমরা সবার আগে হাঁটো, সেই মিছিলের একদম শেষে আমরা যারা... যাদের দেখাই যায় না, মিছিলটা কিন্তু তাদের । মিছিলটা কিন্তু খালপাড়ের । কোঠাবাড়ির যারা,তারা বিভীষণের জাত। ওরা লাল ঝান্ডার নয় । ওরা ঠিক কেটে পড়বে । শেষের সেই মিছিল,আমাদের,খালপাড়ের,রিক্সার, মজুরের,বেশ্যার, মানুষের মতো মানুষের। লাল ঝান্ডা আমাদের ঝাণ্ডা । আমরা আছি,ঝান্ডা আছে । " ..

আর দেখা হয়নি ।

সোমবার, ২৬ মে, ২০১৪

রম্য রচনা -- ২ ~ অবিন দত্তগুপ্ত

( Utsav দার লেখা একটি গল্প অনুপ্রাণিত )

বহুদিন পর আজ আবার উনি আসবেন । এক বিশাল মঞ্চ বাঁধা হয়েছে। রাস্তায়, ছাঁদে, জানলায় জানলায়,পুকুরের পাশে,ফুটপাথে তিল ধারনের জায়গা নেই । শেষ যখন এসেছিলেন, তখন সর্বত্র শ্মশানের নিরবতা ছিল । উনি আগুন জ্বালিয়েছিলেন। স্বপনের গান গেয়েছিলেন। সেদিন-ও এমনি ভিড় ছিল । সেদিন ভিড় পরিণত হয়েছিল লাভাস্রোতে । সেই গনগনে লাভাই,স্বপ্ন জিতেছিল । তারপর আস্তে আস্তে, উনি জনপদ থেকে হারিয়ে গিয়েছেন । পাহাড়ের উপরে এখন ওনার বাড়ি । আজ যখন সেই স্বপ্ন, বাজারে কিলোদরে বিকোচ্ছে , তখন ওনার আসার খবরে চাঞ্চল্য স্বাভাবিক ।

শেষ পর্যন্ত উনি এলেন । পাহাড় বেয়ে নেমে এসে,এক-ই ভঙ্গিতে মঞ্চে উঠলেন। বলতে শুরু করলেন । ভিড় যেন কোন কিছু খুঁজছিল। কিছু একটা,যা আগে ছিল,এখন নেই । অসহিষ্ণু ভিড় আস্তে আস্তে দেখতে শুরু করেছে ---- ওনার পোশাক এখন ভিড়ের পোশাক নয়,ওনার ভাষ্য এখন ভিড়ের কথা নয়,ওনার মন এখন আর ভিড়ের শরীরে থাকে না । আস্তে আস্তে ভিড়,নড়তে শুরু করল। পুকুর পাড়ের,ভাঙ্গা পুলের পাশে, মঞ্চে নয় মাটিতে দাঁড়িয়ে, এক যুবক অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। ভিড় তাকে ঘিরতে শুরু করল ।

মঞ্চের উপর থেকে উনি ভিড়কে দেখছেন । মনে হচ্ছে ভিড় যেন কিছু একটা হারিয়েছে।আগে ছিল, কিছু একটা ---এখন নেই । উনি আস্তে আস্তে দেখতে পেলেন--- ভিড় তার ভাষ্য শোনার কান হারিয়েছে,হারিয়েছে তার মনে নৈকট্য। হয়তবা ভিড়ের পুরনো মনটাই হারিয়ে গিয়েছে। উনি দেখতে পেলেন ভিড় তার মুখ ঘুরিয়েছে পুকুর-পাড়ে,পুলের দিকে। কেউ একজন অনর্গল কথা বলছে । চেষ্টা করলেন মানুষটাকে চিনতে,আলাদা করতে পারলেন না। ভিড়ের মানুষ ।

চশমার কাঁচটা মুছে উনি আবার দেখার চেষ্টা করলেন। এবার দেখতে পেলেন। অবাক হয়ে দেখলেন ,পুলের পাশে দাঁড়ানো বছর ২২এর যুবক তো উনি নিজেই। বিস্মৃত যৌবনের উনি । আগুন ঝড়ানো উনি। তার হারিয়ে ফেলা ---আমি ।মঞ্চের উপড়ের আজকের উনি,অতিতের নিজের সাথে লড়াই-এ জিততে গলার পর্দা চড়ালেন । তবুও ভিড় ক্রমশই সরে যেতে থাকলে, উনি চিৎকার করতে চাইলেন ।আওয়াজ বেরল না। গলা দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে । ভিতরের রক্তক্ষরণ অবশ্য শুরু হয়েছে বহুদিন । উনি জল চাইলেন । কেউ শুনতে পেল না । ভিড় তখন আগুন দেখতে --- পুলমুখি ।

রবিবার, ২৫ মে, ২০১৪

একটি শেক-উলার পদ্য ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

স্লিপ খান তিন ভাঁড়, রাম, গড, আল্লা।

চৌপর দিনভর চলে দেওয়া পাল্লা।
কঞ্চির মন্দির, মসজিদ, চার্চে,
ভক্তির ঘোমটায় ভন্ডামি বাড়ছে।
চুপ চুপ! ঐ দ্যাখ ধম্মের ষণ্ড,
দ্যায় খালি শাস্তি, কাজে অপোগন্ড!
ব্যবসাই চলছে, শাস্তর আউড়ে,
ঘোর কলি, হায় হায়, ম্যাঁয় কঁহা যাউঁ রে!!

শনিবার, ২৪ মে, ২০১৪

নজরুলের প্রতি ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের নাইতে মানা।
জাতের এই বজ্জাতি আজ কাজীরও নয় অজানা!
বাগানের গাছ মুড়িয়ে উঠবে নতুন বাড়ি,
পালালো কাঠবিড়ালি, খুকুদের সঙ্গে আড়ি!
দুর্গম গিরি্র ভয়ে (লোকে আজ চালাক ভারি)
বাড়ি থেকে বেরোয় না কেউ, হুঁশিয়ার হে কান্ডারী!
দেখবি জগতটাকে? টিভি তো আছেই ঘরে!
দে তাদের গা ধুইয়ে, মিছে যারা তক্কো করে!
কী বলিস? কামাল পাশা? ইন্ডোর গেম কি কোনও?
বিদ্রোহী, আঙ্গুল চোষো, আর আমার গপ্পো শোনো!!