বুধবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৯

ইসলামিক মৌলবাদ ~ অনির্বাণ অনীক

১৯৫৮ সাল, কায়রোর রাজপথ । মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসছেন গামাল আবদেল নাসের। মিশরের জননায়ক । হাসছে মঞ্চের সম্মুখের সারিবদ্ধ জনতা । দিচ্ছে হাততালি । জনতার মুখরিত সখ্যের নদীতে ভেসে চলেছেন সুপুরুষ নাসের । ধুয়ে দিচ্ছেন মুসলিম ব্রাদারহুডের খোয়াবনামা । কবছর আগেই কায়রো শহরে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুড । বোমা বিস্ফোরিত করে তোলপাড় করেছে থিয়েটার , হোটেল , নাইট ক্লাব , মিউজিয়াম - আধুনিক সভ্যতার যত বিজয়রথ । না , তখনো মুজাহিদিনদের পেছনে আমেরিকা এসে হাজির হয়নি । বারবাক কারমাল , নাজিবুল্লাহদের পশ্চিমী মদতপ্রাপ্ত ইস্লামিস্টদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দিন তখনো বহু দূর । জনতার সামনে নাসের দিয়ে চলেছেন মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতার সাথে তাঁর মোলাকাতের জবানবন্দী । বলছেন - ব্রাদারহুডের নেতা তাকে প্রস্তাব দিয়েছেন মিশরের প্রতিটি নারীর হিজাব পরিধান বাধ্যতামূলক করতে । তিনি উত্তর দিয়েছেন - আপনার মেয়েটিকে সেদিন দেখলাম মেডিসিন পড়তে যাচ্ছে । মাথায় হিজাব দিতে তো দেখলাম না । ব্রাদারহুডের নেতা দুঃখ করে বলেছেন তাকে পশ্চিমী ভাবধারা থেকে বাগে আনতে তিনি ব্যর্থ । তাই ভবিষ্যতের নারীদের আধুনিক সভ্যতার প্রভাবমুক্ত করতে তাঁর চাই বাধ্যতামূলক হিজাব । মিশরের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নাসেরের হাতেই বর্তায় সেই গুরুদায়িত্ব । নাসের শুনে হেসেছেন । বলেছেন - আপনি একটি মেয়েকেই হিজাব পরাতে অপারগ , আর আমাকে বলছেন দেশের লক্ষ লক্ষ মেয়েকে হিজাব পরাতে বাধ্য করতে ? হাততালিতে মুখরিত হয়ে উঠলো সভাস্থল । অস্তাচলে যেতে থাকা সূর্যের আলোর ধারায় নীল নদের বুকে তখন গোধূলির স্নিগ্ধ রং ।

আসুন টাইম মেশিনে চড়ে ঘুরে আসি বিংশ শতকের সূচনায় আঙ্কারার রাজপথে । বিজয়রথ ছুটিয়ে চলেছেন কামাল আতাতুরক । বন্ধ করছেন আরবি নাম রাখার চল । মাতৃভাষার নরম আলোর ছটায় আলোকিত করছেন মানুষের মন । আরবির পরিবর্তে বাধ্যতামূলক করছেন মাতৃভাষা শিক্ষা । মোল্লা, মৌলবি , ইসলামিক শিক্ষার পরিবর্তে বাধ্যতামূলক করছেন আধুনিক শিক্ষা । প্রবল প্রতিবাদের মুখেও উদ্ধত মেরুদণ্ডের ঋজুতা । এনলাইটেনমেন্টের আলোয় ধুইয়ে দিচ্ছেন ১৪০০ বছর আগের অন্ধকার ।

দেখে নি ৫'এর দশকের সূচনার ইরান । জনতার জয়ধ্বনিতে মুখরিত শত শত বছরের ইতিহাস বিজড়িত তেহরানের রাজপথ । ভারতের সাথে শত শত বছরের সুখে দুঃখে জড়িয়ে থাকা প্রাচীন পারস্য । রক্তপতাকায় ঢেকে গেছে শহরের প্রতিটি প্রান্তর । জনতার বিপুল সমর্থনে জয়লাভ করেছেন বামপন্থী মোসাদেগ । তখনো অজানা , আমেরিকার চক্রান্তে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ক্যু-দেতা । কিছুদিন বাদেই অপসারিত হবেন সেদিনের ইরানীয় গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা মোসাদেগ । অধিষ্ঠিত হবেন মার্কিন মদতপুষ্ট কিন্তু সেকুলার শাসক পারস্যের শাহ । আর বছর পঁচিশেক বাদেই সেকুলার সংস্কারে ক্ষুব্ধ হবে ইসলামিক নেতৃত্ব । ধর্মীয় কঠোরতা রূপায়নের তাগিদে অর্থনৈতিক সমস্যার উপর ভর করে উঠে আসবে সবুজ পতাকার ঢল । ইরানের মাটিতে নিশ্চিনহ হবে রক্তপতাকারও শেষ অস্তিত্ব । আমেরিকা বুঝে যাবে চিলি , ভিয়েতনাম বা মেক্সিকোর পথ নয় । পারস্যের শাহের মত ক্যু-দেতা করে বসিয়ে দেয়া সেকুলার বিকল্প নয় , মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বে বামপন্থা হঠানোর সেরা ঢাল ইস্লামিজম ।

গুটি গুটি পায়ে চলে এসেছি ৮'এর দশকের আফগানিস্তান । প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত গান্ধার । স্বপ্ন দেখছেন বারবাক কারমাল - স্বপ্ন দেখছেন নাজিবুল্লাহ - রুক্ষ শুষ্ক মাটিতে ১৪০০ বছর আগের বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে আধুনিকতার আবাদ । আফগান ইস্লামিস্টরা সন্ত্রস্ত । আমেরিকাও সন্ত্রস্ত - না আধুনিকতার আবাদের জন্য নয় । ওরা কমিউনিস্ট । ওরা সোভিয়েতের সহযোগী । কোল্ড ওয়ারের সময় । পাক-আফগান-রুশ-ভারত সীমান্তে সে এক ভয়ানক বিষয় । ততদিনে বুঝে গেছে আমেরিকা । মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বে বামপন্থা হঠানোর সেরা ঢাল ইস্লামিজম । মুজাহিদিন , তালিবান । আমেরিকার প্রিয় পাত্র । নাজিবুল্লাহর দেহটা ল্যাম্পপোস্টে ঝোলার দিনে যারা নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পাতায় মুক্তিযুদ্ধের অগ্রদূত ।

চলে এল সেই দিন । মডারেট ন্যাশনালিস্ট বা বামপন্থী শক্তিগুলোর হাত থেকে লড়াইটা চলে গেল ক্রমশ ইস্লামিস্ট এক্সট্রিমিস্টদের হাতে । প্যালেস্টাইনের ইয়াসের আরাফতদের হাত থেকে কর্তৃত্ব চলে গেল হামাসের হাতে । আফগান ওয়ারের পর মুজাহিদিনদের অধক্ষেপ ঢুকে পড়ল ভারতের কাশ্মীরেও । মডারেট ন্যাশনালিস্টদের হাত থেকে হুরিয়ত হয়ে ঢুকে পড়ল লস্কর ই তইবারা । বদলে গেল আন্দোলনের চরিত্র ।

এবার আমেরিকা ব্রিটেনদের এই কূটকচালী না থাকলে কি ইসলামী মৌলবাদ থাকত না ? নিশ্চয় থাকত । ইসলামিক মৌলবাদের কার্যকারিতা , মানুষের উপর তার প্রভাব ইত্যাদি আঁচ করেই তো এই শক্তিগুলি এককালে নিজ নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থ পূরণের স্বার্থে ইসলামিস্ট দানবের সাথে হাত মিলিয়েছিল । ওয়াহাবী , সালাফী, দেওবন্দী বিবিধ নামের কট্টর গোষ্ঠীগুলির মধ্যেই রয়েছে মৌলবাদের বীজ । ৭১'এর আগের পূর্ব পাকিস্তান , পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মাটিতেও হয়েছে ভয়াবহ মৌলবাদের চাষ , সন্ত্রাসের আবাদ । রক্তাক্ত হয়েছে বাঙালী জাতিটাই । এর সূচনায় তো নেই পশ্চিমী মদতের কোন অবদান । ভিয়েতনামে আমেরিকা বৌদ্ধ মৌলবাদ দিয়ে কাজ হাসিল করার চেষ্টা করেনি । কিউবাতে ক্রীস্টান মৌলবাদ দিয়ে কমিউনিজম প্রতিহত করার চেষ্টা করেনি । অথচ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বে সহযোগী তার ইস্লামিজম । কিন্তু , ইসলামিক দানবের অস্তিত্ব থাকলেও এদের দেশগুলির অভ্যন্তরেই গত শতকের মধ্যভাগ থেকে যে সেকুলার/সমাজতান্ত্রিক/ জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলি বৃদ্ধি পাচ্ছিল তারা অন্তত লড়াইটা করতে পারত । বর্তমানে সেই শক্তিগুলি বিধ্বস্ত ।

সম্প্রতি আমেরিকা পুণরায় ইরানের তেলের ভাণ্ডারের দখল নিতে উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছে । 
"ইরান কে ভাতে মারার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চারপাশে এক দৃশ্যমান ও শক্তিশালী প্রভাব বলয় তৈরি করেছে।কার্যত সামরিক, আর্থিক ও সাংস্কৃতিক অবরোধ তৈরি করেছে । মূল লক্ষ্য ইরানকে আর্থিক ও কূটনৈতিক ভাবে নিঃসঙ্গ করা। ভারত, চীন, জাপান, তুরস্ক, মেক্সিকো, ইতালি, গ্রিস,দক্ষিণ কোরিয়াকে কার্যত হুমকি দিয়ে ইরানের থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার জন্য চাপ দিতে শুরু করেছে।ভারতকে যেহেতু জ্বালানির জন্য ইরানের ওপর নির্ভর করতে হয় ,এককথায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করা সম্ভব নয়।দ্বন্দটা এখানেই।একদিকে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্রমশ মজবুত হয়েছে।চায়না ,পাক ইকোনোমিক করিডোর ভারতের কাছে তার স্বার্বভৌমত্বের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ।পাশাপাশি সুদীর্ঘ দিন ধরে চাবাহর বন্দরকে দিল্লি নিজেদের ভুসামরিক স্বার্থের জন্য ব্যবহার করার প্রস্তুতি নিয়েছে।ইরানের থেকে জ্বালানী কেনা বন্ধ করার অর্থ মধ্যএশিয়ার ওপর কতৃত্ব ও পাক চীন দ্বিপাক্ষিক অক্ষের পাল্টা জোট হিসেবে ইরান-আফগানিস্তান-ভারতের মৈত্র দুর্বল হওয়া।"

" ইরানে যুদ্ধের দামামা বাজলে আপনি আক্রান্ত হবেন কি করে?উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন সংঘাতের অর্থ সেই যুদ্ধে সৌদি , সংযুক্ত আমিরশাহীর মতো দেশগুলোর যুদ্ধে আর্থিক ভাবে জড়িয়ে পড়া।সেদেশের তেলের উৎপাদনের মূল্য বাড়লে আপনার আমার রান্না ঘরে তার প্রভাব পড়বেই।পড়তে বাধ্য। শুধু তাই নয়, মনে রাখবেন আফগান ওয়ারের পর মুজাহিদিনদের অধক্ষেপ ঢুকে পড়েছিল ভারতের কাশ্মীরেও । বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের চরিত্র । বাড়িয়েছিল আপনার দেশেরই প্রতিরক্ষা বাজেট । সাম্রাজ্যবাদ , নয়া ঔপনিবেশিক শক্তি শুধু রান্নাঘরে হানা দেয় না,কৌশলে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ায়।তার কোপ পরে স্বাস্থ্য,প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা হয়ে জনমুখী প্রকল্পে।"

বামপন্থী মোসাদেগকে অন্যায় ভাবে অপসারিত করে আমেরিকা যে বদমাইশির সূচনা করেছিল সেই মুকুটে যুক্ত হতে চলেছে আরেকটি নতুন পালক ।

পুনশ্চ - আপনি কমিউনিজমের সমালোচনা করতেই পারেন । কমিউনিস্ট দেশে গণতন্ত্রের অভাব নিয়ে আলোচনাও করতে পারেন (মানে অন্য দেশেও গণতন্ত্রের বহু সমস্যা দেখা যায় , কিন্তু অন্য দেশে আছে বলে কমিউনিস্ট দেশে গণতন্ত্রের অভাব থাকবে সেটাও কোন কাজের কথা না ) । আলোচনা করতেই পারেন আরব ন্যাশনালিস্ট বা কমিউনিস্ট শক্তিগুলির বিশ্ব বাজার থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকাটা ইন দ্য লঙ রান আদৌ কোন ফলপ্রসূ বিষয় ছিল কিনা । আপনি সাম্প্রতিক কালের এক শ্রেণীর বিপ্লবী বাম লিবেরাল শক্তির ইসলাম-প্রেম নিকষিত-হেম'এর সমালোচনাও করতেই পারেন । কিন্তু সেই কারণে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির ইস্লামিস্ট দানবের সাথে হাত মিলিয়ে পথযাত্রাটি তো অস্বীকার করতে পারবেন না । ইস্লামিজমকে অস্বীকার করা যেমন অপরাধ , তেমনি এই সত্য স্বীকার না করাটাও সত্যের অপলাপ । মুক্তচিন্তার সাথেই বৈরিতা ।


গ্রামীণ চিকিৎসকদের না নিয়ে সবার জন্য স্বাস্থ্য-এর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা যাবে না ~ পুণ্যব্রত গুণ

১৯৭৭-এ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আলমা আটায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিষেবা নিয়ে এক কনফারেন্সে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা '২০০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য'-এর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল অর্থাৎ সকল দেশের সরকার ঐ সময়ের মধ্যে নিজ নিজ দেশের সমস্ত নাগরিকের স্বাস্থ্যরক্ষার দায়িত্ব নেবে। আলমা আটার ঘোষণা পত্রে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ভারত। ২০০০ খ্রীষ্টাব্দের পর ১৫ বছর কেটে গেছে, তবু আমাদের দেশে এই লক্ষ্য অধরা।  

এমনই এক প্রেক্ষাপটে দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আগে ২০১০-এ ভারতের যোজনা কমিশন সবার জন্য স্বাস্থ্য-পরিষেবা নিয়ে এক উচ্চ-স্তরীয় বিশেষজ্ঞ দল (High Level Expert Group on Universal Health Coverage) নিয়োগ করে। পাব্লিক হেলথ ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়ার প্রধান ডা শ্রীনাথ রেড্ডির নেতৃত্বাধীন এই বিশেষজ্ঞ দল ২০১১-এ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে তার সুপারিশ পেশ করে। 

উচ্চস্তরের বিশেষজ্ঞ দল যেসব বিষয় নিয়ে বিবেচনা করে, সেগুলো এরকম—
1. মানব সম্পদের প্রয়োজন
2. চিকিৎসা-পরিষেবা নাগালে আনা
3. ব্যবস্থাপনায় সংস্কার
4. জনসমুদায়ের অংশগ্রহণ
5. ওষুধপত্র নাগালে আনা
6. স্বাস্থ্য-পরিষেবায় অর্থের যোগান
7. সামাজিক যে বিষয়গুলো স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে।
 
এই উচ্চ-স্তরীয় বিশেষজ্ঞ দল ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ অর্থাৎ সবার জন্য স্বাস্থ্য-এর সংজ্ঞা নিরূপণ করেন এভাবে—আয়ের স্তর, সামাজিক অবস্থান, লিঙ্গ, জাতি বা ধর্ম নিরবিশেষে দেশের যে কোন অংশে বসবাসকারী সমস্ত ভারতীয় নাগরিকের জন্য যথাযথ খরচের, দায়বদ্ধ ও সঠিক, নিশ্চিত গুণমানের স্বাস্থ্য-পরিষেবার (উন্নয়নমূলক, প্রতিরোধমূলক, নিরাময়মূলক ও পুনরবাসমূলক) সমান লভ্যতা নিশ্চিত করা, ব্যক্তিদের ও জনসমুদায়গুলোকে স্বাস্থ্যের বৃহত্তর নির্ণায়কগুলোকে নির্ধারণ করে এমন জনস্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া—, সরকার এসব স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত পরিষেবার ব্যবস্থা করবেন এবং নিশ্চিত করবেন, যদিও সরকারই একমাত্র পরিষেবাপ্রদানকারী হবেন—এমনটা নয়।

সরবজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার যে নির্দেশক নীতিগুলো উচ্চ-স্তরীয় বিশেষজ্ঞ দল স্থির করেন, সেগুলো এরকম—
• পরিষেবা সবার জন্য, 
• পরিষেবা সবার জন্য সমান, 
• কাউকে বাদ দেওয়া হবে না আর কারুর প্রতি বৈষম্য করা হবে না,
• পরিষেবা হবে যুক্তিসঙ্গত ও ভালো গুণমানের, 
• আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকবে,
• রোগীর অধিকারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া হবে, 
• সরকারী স্বাস্থ্য-পরিষেবা মজবুত করা হবে,   
• পরিষেবায় দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা থাকবে, 
• নীতি-নির্ধারণ ও পরিচালনায় জনসমুদায়ের অংশগ্রহণ থাকবে।

তাঁরা সরকারী পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বলেন কেন স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সংস্কার জরুরী—
 যাঁদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাঁদের ৪০%-এরও বেশী ক্ষেত্রে চিকিৎসা করাতে ধার নিতে হয় বা সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়।
 গ্রামীণ এলাকায় ১৮% ও শহরী এলাকায় ১০% অসুখের কোনও চিকিৎসা হয় না।
 গ্রামীণ এলাকার ১২% ও শহরের ১% বাসিন্দা চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছতেই পারেন না।
  ২৮% গ্রামবাসী ও ২০% শহরবাসীর চিকিৎসা করানোর পয়সাই নেই।
  হাসপাতালে ভর্তি মানুষদের ৩৫%-এরও বেশী হাসপাতালের খরচের ভারে দারিদ্রসীমার নীচে চলে যান।
  জনসংখ্যার ২.২%-এর বেশী হাসপাতালের খরচের ভারে গরীব হয়ে যান।
  নাগরিকদের অধিকাংশ যাঁরা স্বাস্থ্য-পরিষেবার সুযোগ নিতে পারেন না তাঁরা কম আয়ের মানুষ।

গ্রাম-শহরের বৈষম্যের কথা বলতে গিয়ে তাঁরা দেখান—
৮০% ডাক্তার,৭৫% ডিস্পেন্সারী, ৬০% হাসপাতাল আছে শহরে। পাশকরা ডাক্তারের ঘনত্ব যেখানে শহরে ১০০০০ মানুষ-পিছু ১১.৩ জন, সেখানে গ্রামে ১০০০০ জনে ১.৯।
 
বিশেষজ্ঞ-দল সমস্ত নাগরিকের জন্য সারবজনীন স্বাস্থ্য-পরিষেবার প্যাকেজ-এর কথা বলেন, যাতে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর চিকিৎসা-পরিষেবা থাকবে, সরকার যার খরচ যোগাবে। তাঁরা বলেন—এক বিশেষজ্ঞ দল মাঝে মাঝে প্যাকেজের উপাদানগুলো ঠিক করবেন, রাজ্যভেদে প্যাকেজের উপাদানে পার্থক্য থাকতে পারে।

চিকিৎসার খরচ ও আর্থিক সুরক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দলের বক্তব্য ছিল—
• কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলো মিলে স্বাস্থ্যখাতে সরকারী ব্যয় বর্তমানের জিডিপির ১.৪% থেকে বাড়িয়ে দ্বাদশ পরিকল্পনার শেষে অন্তত ২.৫% এবং ২০২২-এর মধ্যে অন্তত ৩% করা উচিত।
• ওষুধ কেনায় সরকারী ব্যয় বাড়িয়ে বিনামূল্যে অত্যাবশ্যক ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
• চিকিৎসা-পরিষেবার অর্থের মূল উৎস হবে সাধারণ কর, সঙ্গে যাঁরা মাইনে পান বা আয়কর দেন তাঁদের মাইনে বা করযোগ্য আয়ের অনুপাত হিসেবে অতিরিক্ত বাধ্যতামূলক অর্থ।

স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য মানব সম্পদ সম্পর্কে উচ্চ স্তরীয় দলের সুপারিশ—
• পরযাপ্ত সংখ্যায় বিভিন্ন স্তরে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী নিশ্চিত করা হোক, গুরুত্ব পাক প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা।
• গ্রামীণ ও আদিবাসী এলাকায় ASHA-র সংখ্যা দ্বিগুণ করা হোক, জনসংখ্যার ১০০০ পিছু ১ থেকে বাড়িয়ে ১০০০ পিছু ২।
• মাঝারি স্তরের স্বাস্থ্য কর্মী চালু করা হোক—গ্রামীণ উপকেন্দ্রগুলোতে ব্যাচেলর অফ রুরাল হেলথ কেয়ার (BRHC) প্র্যাকটিশনার ও শহরের উপকেন্দ্রগুলোতে নার্স প্র্যাকটিশনার। 

আমরা যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা দেখি তাহলে দেখব প্রতি ১০০০০ মানুষ পিছু ২৫ জন চিকিৎসাকর্মীর সুপারিশ করা হয়েছে—অর্থাৎ ডাক্তার, নার্স, দাই, ইত্যাদি, কতজন কি তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। আমাদের দেশে এই সংখ্যা ১০০০০জনে ১৯ জন (প্রশিক্ষিত ও অপ্রশিক্ষিত মিলিয়ে)। পাশ-করা ডাক্তারের সংখ্যা যদি দেখি তা হয়—১০০০০জনে ৬ জন। গ্রামে যেখানে ১০০০০ জনে পাশকরা ডাক্তারের সংখ্যা ৩.৯ জন, সেখানে শহরাঞ্চলে ১৩.৩ জন অর্থাৎ প্রায় চারগুণ বেশী। দেশের প্রায় ৫ লক্ষ মেডিকাল গ্র্যাজুয়েটের তিন-চতুর্থাংশ শহর বা শহরের আশেপাশে কাজ করেন, যেখানে দেশের এক-তৃতীয়াংশেরও কম মানুষের বাস। আর গ্রামীণ জনতার সামান্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবাটুকুও নেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে।

উত্তর প্রদেশের গ্রামাঞ্চলে এক সার্ভেতে দেখা যায়—মাত্র ৬% রোগীর চিকিৎসা করেন এমবিবিএস ডাক্তার, ২৮%-এর AYUSH ডাক্তার আর ৬৬%-এর চিকিৎসা হয় অপ্রশিক্ষিত গ্রামীণ চিকিৎসকদের হাতে।

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণার পাথরপ্রতিমা ব্লকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়—সেখানকার জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ, সরকারী ডাক্তারের সংখ্যা ১০ জনেরও কম, অথচ গ্রামীণ ডাক্তার প্রায় ৪০০ জন। একজন অসুস্থ শিশুকে সরকারী ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয় অধিকাংশ সময় নদীপথে, সময় লাগে ৪ থেকে ৬ ঘন্টা। ফলে ৮৫% অসুস্থ শিশুকেই চিকিৎসা পেতে হয় গ্রামীণ ডাক্তারের কাছে। 
 
২০০৯-এ পশ্চিমবঙ্গের তিনটে জেলায় সার্ভে করে দেখা যায় ৫৪% গ্রামীণ মানুষ গ্রামীণ চিকিৎসকদের দ্বারা চিকিৎসিত হন। খুব সম্প্রতি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কলেরা এন্ড এন্টেরিক ডিজিজেজ (NICED)-এর এক সমীক্ষক-দল দেখেন মালদা জেলার গ্রামবাসীদের অর্ধেকেরও বেশী সাধারণ রোগের জন্য গ্রামীণ ডাক্তারদেরই সাহায্য নেন। 

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিসংখ্যানটা মোটামুটি এরকম—পাশকরা ডাক্তার আছেন প্রায় ৪৩ হাজার। সবার কাছে স্বাস্থ্য-পরিষেবা পাশকরা ডাক্তারের মাধ্যমে পৌছাতে হলে দরকার আরও ৬৫ হাজার ডাক্তার, বর্তমান হারে ডাক্তার তৈরী হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ২০৫৫ সাল অবধি। 

আর সমস্ত স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য পাশকরা ডাক্তার কিন্তু জরুরীও নয়। জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশন (NRHM)-এর টাস্ক ফোর্স ২০০৭-এর রিপোর্টে বলে—মারক রোগগুলোকে প্রতিহত করার জন্য উঁচু মানের ডাক্তারী দক্ষতা বা দামী রোগ-নির্ণয় প্রযুক্তির দরকার হয় না। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়েই এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়। আসল সমস্যা হল মানুষের কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য-পরিষেবা না পৌঁছনো। 

এমবিবিএস-এর চেয়ে কম সময় যাঁরা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, তাঁদের ডাক্তারী দক্ষতা নিয়ে এক পরযবেক্ষণের কথা বলি। পাব্লিক হেলথ ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়ার কৃষ্ণ ডি রাও এই সমীক্ষাটা করেন ছত্তিশগড়ের এক এলাকায়। ছত্তিশগড় ও আসাম হল দেশের দুটো রাজ্য যেখানে কম সময়ের ডাক্তার তৈরীর কোর্স চালু করা হয়। অবশ্য ডাক্তার বলা হয় না, ছত্তিশগড়ে বলা হয় রুরাল মেডিকাল এসিস্টেন্ট বা আরএমএ। দেখা যায় প্রাথমিক পরিষেবায় যে রোগ বা সমস্যাগুলো দেখা যায় সেগুলো সামলাতে এমবিবিএস ডাক্তার ও আরএমএ-রা সমান দক্ষ। কম দক্ষ AYUSH চিকিৎসকরা। প্যারামেডিকাল কর্মীরা সবচেয়ে কম দক্ষ। 

বর্তমান সময় থেকে অনেক বছর পিছিয়ে যাই, নজর রাখি প্রতিবেশী দেশ চীনে। চীনে পাশ্চাত্য মেডিসিনের প্রথম স্কুল স্থাপিত হয় ১৮৮১ সালে। ১৯৪৯-এ শোষণমুক্তির আগে সে দেশে মেডিকাল কলেজ ছিল মাত্র একটা, ১৯১৬-এ স্থাপিত পিকিং ইউনিয়ন মেডিকাল কলেজ। সেই কলেজ থেকে ১৯২৪ থেকে ১৯৪২ অবধি পাশ করে বেরোনো মেডিকাল গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন, তাঁরাও মূলত বিদেশী শাসক-শোষকদের সেবায় লাগতেন। ১৯৪৯-এর পর কিন্তু শ্রমিক-কৃষকের সরকার সমস্ত নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্ভব করেছিল, তা সম্ভব হয়েছিল আধুনিক ডাক্তারদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণহীন গ্রামীণ চিকিৎসকদের যুক্ত করে। 

পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ চিকিৎসকদের যুক্তিসঙ্গত চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত করার কাজ করে সোসাইটি ফর সোশ্যাল ফার্মাকোলজি রুরাল মেডিকাল প্র্যাকটিশনার্স' এসোশিয়েশনের সঙ্গে। কাজ করে বাঁকুড়ার আমাদের হাসপাতাল, বীরভূমে লিভার ফাউন্ডেশন। 

প্রশিক্ষিত গ্রামীণ চিকিৎসকদের ওপর এক সমীক্ষা চালান ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি-র অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। দেখা যায়—তাঁদের চিকিৎসাপদ্ধতির মানোন্নয়ন হয়েছে, ভুল ওষুধের ব্যবহার কমেছে, রোগীদের ক্ষতি কম হচ্ছে, রোগীরাও তাঁদের ওপর আস্থা স্থাপন করছেন।  

জয়পুরের ইন্সটিটিউট অফ হেলথ ম্যানেজমেন্ট রিসার্চ-এর বরুণ কাঞ্জিলাল গ্রামীণ চিকিৎসকদের নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন বহুদিন। তাঁর সুপারিশ হল—সমস্ত গ্রামীণ ডাক্তারদের নথিভুক্ত করা হোক। তাঁদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক যাতে তাঁরা যুক্তিসঙ্গত ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা করতে পারেন এবং নিজের সীমা কতোটা তা বোঝেন। তাঁদের সরকারী প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হোক, যাতে তাঁরা সরকারী ডাক্তারদের নজরদারিতে কাজ করতে পারেন। 

আমরাও মনে করি—গ্রামীণ চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য-পরিষেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার মধ্যে দিয়েই চিকিৎসা-কর্মীর অভাব পূরণ হতে পারে, কিছুটা বাস্তবায়িত হতে পারে সবার জন্য স্বাস্থ্যের স্বপ্ন। 

তাছাড়া গ্রামীণ তরুণ-তরুণীদের যথাযথ স্বল্পকালীন ট্রেনিং দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে তৈরি করেও প্রাথমিক চিকিৎসার কাজ অনেকটা করানো যায়। এই বিষয়ে আমার সংগঠন শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ প্রায় দেড় দশক ধরে কাজ করে যাচ্ছে। আমার আরেক সংগঠন সুন্দরবন শ্রমজীবী হাসপাতালও প্রত্যন্ত দ্বীপে  তরুণ-তরুণীদের ট্রেনিং দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী রূপে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। আমাদের অভিজ্ঞতা আর আমাদের স্বপ্নের কথা বলব পরে কখনও।     

লেখক পরিচিতিঃ ডা পুণ্যব্রত গুণ এমবিবিএস শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সংগঠক ও স্বাস্থ্যের বৃত্তে পত্রিকার সম্পাদক।

রবিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৯

বিজেপির কৃতিত্ব ~ কৌশিক দত্ত

ভোটের আগে বিজেপির হয়ে একটু প্রচার করি। ভারতের ইতিহাসের গৌরব গাথা, পাশ্চাত্য সভ্যতার চেয়ে আমাদের এগিয়ে থাকার কাহিনি, যা স্বদেশপ্রেমে আমাদের মথিত করবে। 

গণেশের হেড ট্রান্সপ্লান্ট, কুবেরের জেট প্লেন ইত্যাদির কথা আমরা জানি। এসব হল প্রাচীন ভারতের গৌরব। আজ বলতে চাই যে মধ্যযুগেও ভারত ছিল সর্বাগ্রগামী। আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর দেশ আমেরিকা কী করে এই জায়গায় পৌঁছল? কারা আমেরিকা তৈরি করেছে? কারা সেখানে পৌঁছে দিল সভ্যতার আলো? এসবের যে উত্তর আপনারা দেবেন, তা ভ্রান্ত। মিথ্যেবাদী ইউরোপীয়রা আপনাদের ভুল শিখিয়েছে। সঠিক উত্তর জানুন। আমেরিকার পত্তন করেছেন ভারত মায়ের মহান সন্তানেরাই। তার মধ্যে আবার বাঙালিদের ভূমিকা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। (এই কারণে বিশ্ব বাঙলার কপিরাইট হোল্ডার এবং বাঙলা পক্ষের যোদ্ধারা ক্রেডিটের একাংশ বিজেপির থেকে নিজেদের দিকে টেনে নিলে সেই অঘটনের জন্য কোং দায়ী নহে।) আপাতত আমাদের প্রতিপাদ্য প্রমাণ করতে অল্প কয়েকটি ঐতিহাসিক উদাহরণ দেব, যা থেকে ব্যাপারটা জলের মতো 'পোস্কার' হয়ে যাবে৷           

১) বাঙলায় শ্রীরাম পাঁচালি (যা রামায়ণের অনুবাদ হিসেবে সমধিক পরিচিত) রচনা করেন সাধক কবি কৃত্তিবাস ওঝা। তাঁর জেঠতুতো ভাই শ্রীনিবাস। শ্রীনিবাসের মেজো ছেলের নাম ছিল কলমবাস। তিনি প্রথম জেন্ডার ইকুয়ালিটি প্রতিষ্ঠাকল্পে বেহুলার কায়দায় কলার ভেলায় চড়ে সাগরে ভেসে পড়েন। ভাসতে ভাসতে তিনি চলে যান পশ্চিমে। সেখানে কিছু দ্বীপ আবিষ্কার করে দেশপ্রেমিক কলমবাস তার নামকরণ করেন পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ।  

২) কলমবাসের কৃতিত্বে অনুপ্রেরিত হয়ে কৃষ্ণনগরের মহারাজার শ্যালক তথা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুড়শ্বশুরের অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ একটি আম আঁটির ভেঁপু বাজাতে বাজাতে দ্বীপপুঞ্জ ছেড়ে নিকটবর্তী মহাদেশের মূল ভূখণ্ডে উপস্থিত হন। সেদেশের প্রাচীন বাসিন্দারা বিচিত্র বাদ্যযন্ত্রটি দেখে কৌতূহল প্রকাশ করছেন মনে করে শ্যালক মহাশয় ব্যাখ্যা দাখিল করেন, "আমেরই গো ভেঁপুটি।" বাস্তবে রেড ইন্ডিয়ানদের দলপতি আগন্তুকের নাম জানতে চাইছিলেন। এই উত্তর পেয়ে তিনি ধরে নেন অতিথির নাম আমেরিগো ভেসপুচি৷ সেই নামটিই তাঁদের থেকে ইউরোপীয়দের কানে পৌঁছায় এবং ইতিহাসে স্থায়িত্ব লাভ করে। এই ঘটনার ফলেই মহাদেশটির নাম হয় আমেরিকা। 

৩) অতঃপর শীলভদ্র এবং বলভদ্র নামে নামে দুই ভাই সেখানে যান। শীলভদ্র মধ্য আমেরিকার এক দুর্গম অঞ্চলে পদার্পণ করেন। তাঁর আগমনের পূর্বরাত্রে সেখানকার রাজা স্বপ্নাদেশ পান, নতুন রাজা আসছেন, তাঁর হাতেই তুলে দিতে দেশের শাসন ভার। রাজা পরদিন ভোরবেলা উঠে "এল শীলভদ্র, এল শীলভদ্র…" বলতে বলতে নগরের সিংহদুয়ার অভিমুখে ছুটে যান এবং শীলভদ্রের পাদবন্দনা করে তাঁর মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দেন। সেই ঘটনা থেকে দেশটির নতুন নাম হয়, "এল শীলভদ্র।" দেবভাষা না জানা ইস্পাহানিদের উচ্চারণ প্রমাদে যা আজ "এল সালভাদর"। 

৪) বলভদ্র ছিলেন উত্তম রাঁধুনি। আমেরিকার পশ্চিম উপকুলে একটি মনোরম স্থানে তিনি প্রথম আমেরিকানদের কালি জিরা (কালো জিরে) ফোড়ন দিয়ে রান্না করা শেখান। সেই থেকে রাজ্যটির নাম হল কালিফোড়নিয়া। বলভদ্রের নামে একটি নগরের নাম হয় বেলভেদর।     

৫) ওয়াশিংটন যে পঞ্জাব দা পুত্তর ওয়াহে সিং তনবীরের নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত, তা নিশ্চয় নতুন করে কাউকে বলে দিতে হবে না। 

এরকম অজস্র উদাহরণ আছে, কিন্তু এখন খিদে পেয়েছে। তাই আজ এটুকুই।

শুক্রবার, ১২ এপ্রিল, ২০১৯

হল্লা বোল ~ অরিজিৎ গুহ

কমরেড সফদার হাশমি
দিল্লির সেন্ট স্টিফেন কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রটি পড়াশোনার ফাঁকেই কিভাবে যেন জড়িয়ে পড়েছিল এসএফআই আর আইপিটিএ র সাথে। পড়াশোনার পাশাপাশি চুটিয়ে চলত নাটকে অভিনয়। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর যখন সিপিআই(এম) এর সদস্য পদ পেল তখন নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি শুরু হয়ে গেছে কবিতা লেখা, নাটক লেখা, বাচ্চাদের জন্য গল্প লেখা। ৭০ সালের একটা পথ নাটক কাঁপিয়ে দিয়েছিল দিল্লি আর আশেপাশের অঞ্চল। একজন রাজা, তিনি যেখানেই যান, সাথে তাঁর সিংহাসনটা নিয়ে ঘোরেন। যদি কখনো সেটা বেহাত হয়ে যায় সেই ভয়ে। ইন্দিরা গান্ধীর কুর্সির প্রতি আশক্তিকে ব্যঙ্গ করে 'কুর্সি, কুর্সি, কুর্সি' নাটকটা নিউ দিল্লির বোট ক্লাবের লনে প্রতি সপ্তাহে অভিনীত হত। সেখান থেকেই উঠে আসে 'জন নাট্য মঞ্চ' বা সংক্ষেপে 'জনম' গ্রুপ তৈরি করার চিন্তা ভাবনা। ৭৫ সাল অব্দি জনম একের পর এক পথ নাটক করে গেছে যেসব নাটকের মূল সুর ছিল শ্রমজীবী মানুষ৷ সাধারণতই পছন্দ হয় নি শাসকদের। ৭৫ এ এমার্জেন্সি ঘোষণা করার পর দেশে সমস্ত রকম রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিটি বন্ধ করে দিতে হয়। সাথে সাথে রাজনীতির গন্ধ যেখানে রয়েছে সেসবও বন্ধ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই জনমের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়৷ সেই সময়ে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে গাঢ়োয়াল ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেয় সফদার হাশমি। এমার্জেন্সি উঠে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসে মানুষের মাঝে রাস্তায়। শুরু হয় 'আওরত', 'মেশিন' ইত্যাদির মত যুগান্তকারী পথ নাটক।
   ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের ঝাণ্ডাপুরে লোক ভেঙে পড়েছে সিআইটিইউ আর কিষান সভার উদ্যোগে শ্রমিক আর কৃষকদের দুর্দশা নিয়ে তৈরি পথনাটক 'হাল্লা বোল' দেখার জন্য৷ ইতিমধ্যে নাটকটার কথা ছড়িয়ে পড়েছে দিল্লি ছাড়িয়ে উত্তর প্রদেশের দারিদ্র্য সমন্বিত বিভিন্ন অঞ্চলে। খেটে খাওয়া মানুষ তাঁদের প্রতিদিনের লড়াইকে উঠে আসতে দেখছে নাটকের দৃশ্যে। কিন্তু মানুষকে এভাবে প্রভাবিত করলে যে কায়েমী স্বার্থে আঘাত লাগবেই! সেই কায়েমী স্বার্থের আঘাত তারা ফিরিয়ে দিল সফদারকে পিটিয়ে মেরে। কংগ্রেসি গুণ্ডাবাহিনী নাটকের ওপর হামলা চালাল। গাজিয়াবাদ মিউনিসিপালিটি নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী রামানন্দ ঝা এর সমর্থনে চলছিল সেই নাটকের শো৷ কংগ্রেসি প্রার্থী মুকেশ কুমারের গুণ্ডার দল নৃশংসভাবে পেটাল নাটকের দলকে। ঘটনাস্থলে সাথে সাথেই মারা গেল নেপালী অভিনেতা রাম বাহাদুর। সফদারকে ভর্তি করা হল রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে। সেই রাতে হাসপাতালে এসে হাজির হয়েছিল সফদারের বন্ধু সহমর্মীরা। হাসপাতাল লাগোয়া পার্ক আর বাস স্ট্যান্ড সেদিন ভরে গেছিল মানুষে। শুধু মানুষ আর মানুষ। সফদার হাশমির টানে ছুটে এসেছে সবাই। ছুটে এসেছিল তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, কিন্তু লোকের প্রবল বিক্ষোভে তিনি আর ঢুকতে পারেন নি ভেতরে।  মৃত্যুর সাথে লড়াই করে পরদিন মারা যায় সফদার। থেমে গেছিল কালের কন্ঠ। কিন্তু থামানো যায় নি হাল্লা বোলকে। দুদিন পর সেই একই জায়গায় সফদারের বন্ধু কমরেড ও স্ত্রী মলয়শ্রী হাশমি কমরেডের মৃত্যু শোক নিয়েই মঞ্চস্থ করে হাল্লা বোল। 
   সফদার বা সফদারদের আসলে মৃত্যু হয় না। ১২ ই এপ্রিল জন্মদিনটা আসলে ছুঁতো, সফদারদের মনে রাখার জন্য জন্মদিন সব নয়। আনন্দ পটবর্ধন কবিতা লিখেছিলেন সফদারের স্মৃতিতে

'বাবরি মসজিদ ভাঙতে তুমি দেখো নি
তুমি দেখো নি তার পরের হিংসা আর ঘৃণাকে
তুমি রামাবাঈ আর অন্যান্য দলিতের মৃত্যু দেখো নি
পরমাণু বোমার জন্য দেশের আকুলতা তুমি দেখো নি
২০০২ এ গুজরাটের সাম্প্রদায়ীক হিংসা তুমি দেখো নি
প্রতিবেশি পাকিস্তানে তালিবানের উৎপত্তি তুমি দেখো নি
আর এখানে তুমি হত্যাকারীর রাজ্যাভিষেক দেখো নি
আমরা যারা এখনো বেঁচে রয়েছি তারা এগুলো সব দেখেছি
কিন্তু তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না।'

"So you missed the demolition of the Babri Masjid
And the violence and hate that followed
You missed Ramabai and other Dalit massacres
You missed your nation's love for the atom bomb
In 2002, you missed the Gujarat pogrom
And in neighbouring Pakistan you missed
The creation of the Taliban and here
This year you missed the coronation of killers

We who survived you missed none of these
We missed you."

কমরেড সফদার হাশমি অমর রহে

সোমবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৯

মিসিং গার্লস ~ স্বাতী রায়

        এক

শেষরাতের আধোঘুমের সর চোখের উপর লেগে থাকার সময়ে নানান স্তরের স্বপ্ন আসে। সে স্বপ্ন অনেকটা মেঘের উপর ভাসতে থাকা, আলতো দোলায় নেমে আসার মত। স্বপ্নভেলায় ভেসে ভেসে শিশিরে ভেজা নরম ঘাসের উপরে নেমে আসার ঠিক আগেই আজ  টানা কলিং বেলের ডিং ডং আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো ডঃ সাম্যদর্শী বর্ধনের। কেউ মরিয়া হয়ে বেল টিপেই চলেছে। ধরমর করে ঘুম ভেঙে উঠে কোনো মতে রাতপোশাকের উপরে হাউজকোট টা চাপিয়ে নিয়েই দরজা খুলতে ছুটলেন। দরজা খুলতেই দড়াম করে পায়ের উপর উপুর হয়ে পড়লো ফুলিয়ার বাবা মা। পাশের বস্তির ফুলিয়ার মা এ বাড়ির ঠিকে কাজ করে আর বাবা টোটো চালায়। ষোড়শী ফুলিয়া এবার মাধ্যমিক পাশ করেছিলো। চটকদার সাজুনি ফুলিয়াকে কাল বিকেল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। এই নিয়ে এ বছর পঞ্চম মেয়েটি কারো সাথে পালিয়েছে। হ্যাঁ এরকমই হয় এই বস্তিতে। বছরে আট দশটি মেয়ে পালিয়ে বিয়ে থা করে নেয়, বছর ঘুরতে ক্ষয়াটে চেহারা, কোলে বাচ্চা নিয়ে ফিরে এসে ফ্যামিলি ট্রেন্ড অনুযায়ী কারো বাড়িতে কাজে লেগে পড়ে। কেউ কেউ ফেরেনা আর। পুলিশ কিছুদিন খোঁজখবর করে অন্যান্য গুরুতর কাজের চাপে এদিকে সময় দিতে পারেনা, দিন আনা দিন খাওয়া লোকজন গুলিরও অত সময় থাকে না যে রোজ গিয়ে  থানায় ধর্না দেবে। ফলতঃ পুলিশ ও বস্তিবাসী দুই পক্ষর কাছেই এরা মিসিং গার্ল হয়ে থেকে যায়। 

দুই

আজ বছর পনেরো ধরে এই বস্তিতে একটি ফ্রি স্কুল চালান ডঃ বর্ধন। অনেক অনিচ্ছুক, হত-দরিদ্র পরিবারের বাচ্চাদের পড়াশোনা করায় উদ্বুদ্ধ করে মূলস্রোতে ফিরিয়ে এনে সরকারী স্কুলে পাঠিয়েছেন তিনি। পড়াশুনায় অপেক্ষাকৃত ভালো ও ইচ্ছুক দের আর্থিক সাহায্যও করে থাকেন। নিজের নার্সিংহোমে সপ্তাহে পাঁচদিন কাজ করার পর বাকি দুটি দিন তিনি সম্পূর্ণ ভাবে নিয়োজিত করেন এই বস্তিবাসীদের উন্নয়নে, মানে তাঁর একার পক্ষে যতটা সম্ভব। তাঁকে দেখে আরও কিছু কলেজস্টুডেন্ট এগিয়ে এসেছে এই মহান কাজে তাঁর অংশীদার হয়ে। বস্তিবাসী ও প্রতিবেশীদের কাছে এই ডাক্তার ঈশ্বরের আরেক রূপ। বাবা মেয়ের সংসারে কাজ খুব বেশী কিছু নেই। বছর বারোর মেয়ে জোনাকি কে নিয়ে এই গোটা দোতলা বাড়িতে থাকেন তিনি। জোনাকি কথা বলতে পারেনা, কিন্তু অসম্ভব ট্যালেন্টেড বাচ্চা। দুর্দান্ত ছবি আঁকে ও গিটার বাজায়। মা নেই বলে জোনাকির মনের সব খবর ডঃ বর্ধনকেই রাখতে হয়। 

তিন

"হামি কুছু জানিনা ডাগতার বাবু, হামার বিটিয়াকে আপনি ঢুণ্ডিয়ে দিন।" সেই সকাল থেকে বসে এই একই কথা সুর করে বলে কেঁদেই চলেছে ফুলিয়ার মা। এতদিন ধরে এত কিছু বলে বুঝিয়েও লাভ হয়নি এই উঠতি বয়েসের মেয়ে গুলোর। কী বলবেন ভেবে না পেয়ে খানিক থমকে ডঃ বর্ধন জিজ্ঞাসা করলেন "আচ্ছা পুলিশে রিপোর্ট করেছো তো?"
"পুলিশ তো বল্লো দেখ কার সাথে পালিয়েছে, একবছর বাদেই পেট করে ফিরে আসবে"। "আমার ফুলিয়া পালায়নি বাবু, কেউ উকে ধরে লিয়ে গ্যাছে।"
একটু নড়ে বসে জিজ্ঞাসা করলেন "কি করে জানলে?"
"ফুলিয়া বলছিলো একটা হিরো কাটিং ছেলে উকে দেখে, পিছে পিছে স্কুল তক যায় গো বাবু" 
"আর কী বলেছিলো ফুলি?" 
"বলেছিলো উ পড়বে, অনেক বড় হবে, আপনার মত ডাগতার হবে বাবু। ফুলিয়া রেএএএএ" 

চিন্তিত মুখে উঠে দাঁড়ালেন ডঃ বর্ধন। এ বস্তির বাচ্চা থেকে বুড়ো অবধি সব্বাইকে তিনি চেনেন। হিরোপানা ছেলেটা কে? 

"ঠিক আছে, তোমরা বাড়ি যাও, আমি দেখছি কী করা যায়।" বলে ড্রাইভার কে গাড়ি বের করতে বললেন। লা মার্টস এ জোনাকি কে নামিয়ে দিয়ে নার্সিং হোম চলে যাবেন তিনি।

সিটে বসে মেয়ের রেশম রেশম চুলে ভরা মাথাটা ঘেঁটে দিয়ে বললেন সিট বেল্ট টা লাগিয়ে নাও জনাই। বাধ্য মেয়ের মত সিট বেল্ট বেঁধে ভাসা ভাসা চোখের জনাই সামনের রাস্তায় মন দিলো। হ্যাঁ, সব শুনতে পায় সে, হয়তো একটু বেশীই শুনতে পায়। নিস্তব্ধ দুপুরের পাতা ঝরে পড়া বা হিমেল রাতের শিশিরের শব্দও জোনাকির কানে ধরা পড়ে। 

চার

খুব উচ্ছাসের সাথে গাড়িতে বসে বাবাকে তার ইনভিটিশন লেটার টা দেখালো জোনাকি। ব্যাঙ্গালোরে একটি মিউজিক কনফারেন্সে ডাক পেয়েছে সে। তার করা কম্পোজিশন সিলেক্টেড হয়েছে বলে টিচার ও তার বন্ধুরা সব্বাই দারুণ খুশী। হাত পা নেড়ে চোখের ইশারায় বাবাকে এটাই বলছিলো জোনাকি। হঠাৎ বাবার পিছনে গাড়ির জানালা দিয়ে দেখলো একটি খুব সুন্দর দেখতে ছেলে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। খুব ঠাণ্ডা, নির্মম একটা দৃষ্টি। 

বাড়ি ঢোকার সময় আবার ফুলিয়ার বাবা ও মা - বারান্দায় হেলান দিয়ে শূন্য চোখে তাকিয়ে বসে ছিলো। ডাগতার সাবের গাড়ি ঢুকতে দেখে হুড়মুড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো দুজনে। হাতে একটা প্রায় দোমড়ান ছবি। একমাথা মেটে সিঁদুর পরা ফুলিয়া, পাশে সেই খুব সুন্দর দেখতে ছেলেটি। আবেশে ফুলিয়ার চোখ বুজে আছে, গলায় কানে ঝুঠো সোনার গয়না। ছবি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডঃ বর্ধন বললেন "বলেছিলাম"! 

পাঁচ

শহরের বাতাসে শীতের ছোঁয়া লাগছে। ফুলিয়ার গল্প চাপা পড়ে গিয়ে সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। ডঃ বর্ধনের স্কুলে নতুন কিছু স্টুডেন্ট এসেছে। তার মধ্যে চারটি মেয়ে। বয়স ১২-১৪র মধ্যে। শোয়ার জন্য তৈরি হয়ে রাত সাড়ে এগারোটায় জানলা বন্ধ করতে গিয়ে জোনাকি দেখলো দরজা খুলে কে একজন চোরা পায়ে এগিয়ে আসছে। চুপি চুপি দরজা খুলে একতলায় নেমে এলো সে। বাবার ঘর থেকে হালকা কথার চাপান উতোর শোনা যাচ্ছে। মিনিট খানেক সেখানে কাটিয়ে থমথমে মুখে নিজের ঘরে ফিরে গেলো জোনাকি। 

ঘণ্টাখানেক বাদে নিজের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন ডঃ বর্ধন, সঙ্গে একটি খুব সুন্দর দেখতে ছেলে। হাতে তার পেট মোটা একটি খাম। "কয়েকদিনের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে যাও, নতুন পাখি পেলে ডেকে নেবো। এখন দিন কয়েক ফুলিয়াকে যে সিডেটিভ টা দিয়েছিলাম সেটাই অঞ্জুকেও খাইয়ে রাখবে। খুব দরকার না পড়লে আমায় ফোন করবেনা।" বলতে বলতে তাকে গেট খুলে বের করে দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকতে গিয়ে ডঃ বর্ধন দেখলেন তার ঘরের সাদা দেওয়ালে চারকোল দিয়ে পাকা হাতে সদ্য আঁকা নিটোল একটি নারীমূর্তি, নীচে লেখা ১০৯৮। 

জনাইয়ের ঘর থেকে মৃদু ভেসে আসছে - "জানি সে কোথায়, এই শহরের কোন বাগানে সে হয়ে আছে ফুল।
প্রতি সন্ধ্যায়, পাপড়ি মেলে দিয়ে সে আবার ভোরে ঝরা বকুল।"... 

শুক্রবার, ২৯ মার্চ, ২০১৯

ভোট ~ সুশোভন পাত্র

পাত্তা দেওয়ার মত বামপন্থী'দের প্রার্থী তালিকায় কি আছে মশাই? না আছে চমক, না আছে গায়ক, না আছে নায়ক। প্রার্থী তালিকা হবে তৃণমূলের মত। ভোজ বাড়ির পাতের শুরুতেই রায়গঞ্জে মার্কা মারা সঙ্ঘ পরিবারের ক্যাডার থাকবে। ডাল-ভাতের পর শুক্তোর সাথে মাঝ পাতে মতুয়া'দের ধর্মীয় ভাবাবেগ চটকে দেওয়ার রেসিপি থাকবে। ঘরে ছেলে ঢুকিয়ে দেওয়া সাংসদের এক্সচেঞ্জ অফারে, আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের কোকাকোলা খাওয়া প্রার্থীর কনটেম্পোরারি টাচ থাকবে। দক্ষিণবঙ্গে কোলেস্টরেল কে ভেংচি কেটে শিঙ্গাড়ার সাথে ঘুষ খেতে অভ্যস্ত'দের টিকিট জুটবে। আর্থিক দুর্নীতি তে অভিযুক্ত জেল ফেরত আসামীরা তালিকায় জামাই আদর পাবে। সংসদে ১১% উপস্থিতির রেকর্ড নিয়ে 'মহানায়ক' আবার ভোট চাইবে। আর শেষ পাতে মাস্টার শেফের ট্রাম্প কার্ডে গ্ল্যামার দুনিয়ার চমচম কেষ্টদা'দের প্লেটে নকুলদানা হয়ে গড়াগড়ি খাবে। মিমি কি খেলেন, নুসরত কি পরলেন -স্টুডিও তে ঘণ্টাখানেক বসবে। অবশ্য গৃহপালিত হলেই যে মিডিয়ার মেরুদণ্ড থাকতেই হবে এমন তো মাথার দিব্যি দেওয়া নেই। সরকারী বিজ্ঞাপন পেলে সরীসৃপও তো পোষ মানে।  
পাত্তা দেওয়ার মত বামপন্থী'দের ইশতেহারে কি আছে মশাই? ইশতেহার হবে এন্টারটেনমেণ্ট প্যাকেজের মত। রামমন্দিরের সুড়সুড়ি দেবে। কাশ্মীর নিয়ে গসিপ করবে। এনআরসি নিয়ে চিমটি কাটবে। ১৫ লক্ষ ঢুকিয়ে দেওয়ার হিসেব কষবে। বছরে ২কোটি চাকরির গরু গাছে চড়বে। কোথায় হালকা করে বগলের নিচে চুলকে দিয়ে পাকিস্তান নিয়ে তিনটে প্যারাগ্রাফ নামাবে, তা না, বামপন্থী'রা ইশতেহারে কৃষক-শ্রমিক-বেকার'দের নিয়ে পাতা ভরিয়ে পাড়া মাথায় তুলেছে। মাসিক ৬হাজার বার্ধক্য ভাতা চেয়েছে। জনস্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ৫% করার গাজন গেয়েছে। কি আহাম্মক বলুন দেখি? আরে, ভোটের মুখে গাজন গাইতে হলে রামের নামে গাও, তা না, আবার সর্বজনীন গণবন্টন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাঁদুনি গাইছে? শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৬% করতে বলে কেত্তন করছে? ধনী'দের সম্পদের উপর ট্যাক্স বৃদ্ধি চাইছে? মগের মুল্লুক নাকি? স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতে জিডিপির ১১% ব্যয় করলে, ফি-বছরে সরকারী কোষাগার থেকে লক্ষ কোটির কর্পোরেট ট্যাক্স ছাড় দেওয়ার হিসেবটা কি অরুণ জেটলির খাতায় কে সি নাগ এসে মিলিয়ে দিয়ে যাবে? আর ধনী'দের সম্পদের উপর ট্যাক্স বাড়ালে আম্বানি-আদানি'দের মালাই চেটে চর্বি জমানো নেতা গুলো কি না খেতে পেয়ে মরবে? যতসব!    
ভুলেও বামপন্থী'দের ভোট দেবেন না। ক্ষমতার লোভ নেই। লাল বাতির গাড়ি চাপার জন্য জিভে জল নেই। কুর্সির শাহানশাহ খুঁজতে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রোমাঞ্চ নেই। ২০০৪-এ লোকসভা নির্বাচনে ৬১টা আসন জিতে একটাও মন্ত্রিত্ব নিল না মশাই। আদর্শ, সততা, প্রত্যয়, নীতিনিষ্ঠতা? কি করবেন এসব নিয়ে? পাঁপড় ভাজবেন? মনে নেই, সেদিন যখন পরিষ্কার বামপন্থীদের ছাড়া নতুন সরকার গঠন অসম্ভব, ওমনি বাজপেয়ী সরকারের বিলগ্নীকরণ মন্ত্রকের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে এ বি বর্ধন বলেছিলেন, 'ভাড় মে যায়ে উয়ো মন্ত্রক, অর উসকা মন্ত্রী।' ব্যাস, ঐ দুটো লাইনেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল আগামী ৫ বছরের রাজনীতির অ্যাজেন্ডা। ভেইল, নালকো -একের পর এক শিল্পে, শ্রমিকদের জঙ্গি মেজাজ আর ধর্মঘটের জেরে বিলগ্নী করতে নেমেও গুটিয়ে যায় কেন্দ্র। বামপন্থী'দের চাপেই তৈরি হয়ে কমন মিনিমাম প্রোগ্রাম। হাতি-ঘোড়া কি ছিল সেই প্রোগ্রামে? 
ছিল বলতে কিছু পিকচারের ট্রেলর। আজ গোটা দেশ জুড়ে চাষিরা যখন বারবার ফসলের ন্যায্য দাম চেয়ে পথে নেমেছেন, ঋণ মকুবের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন, ৫রাজ্যের ভোটে কৃষক অসন্তোষের যে পিকচার নরেন্দ্র মোদীরা দেখেছেন, সেই পিকচারের ট্রেলর। লোকে বলে, স্বামীনাথন কমিশন। আজ গোটা দেশ জুড়ে শ্রমিকরা যখন বারবার ন্যায্য মজুরি চেয়ে পার্লামেন্ট স্ট্রিট স্তব্ধ করে দিয়েছেন, সামাজিক নিরাপত্তার দাবিতে হরতাল করেছেন, ৫রাজ্যের ভোটে শ্রমিক অসন্তোষের যে পিকচার নরেন্দ্র মোদীরা দেখছেন, সেই পিকচারের ট্রেলর। লোকে বলে, অর্জুন সেনগুপ্ত কমিশন। ছিল বলতে, সবার জন্য ১০০ দিনের কাজের আইন, আদিবাসী'দের জন্য অরণ্যের অধিকার আইন, গার্হস্থ্য হিংসা বিরোধী আইন, তথ্যের অধিকার আইন। ছিল মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ দাবি, রুগ্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার পুনরুজ্জীবনের দাবি। মাত্র ৬১টা আসন পেয়েই দেশের রাজনীতির অ্যাজেন্ডাই পুরো বদলে দিয়েছিল। কি বিপজ্জনক ব্যাপার ভাবুন!   
ভুলেও বামপন্থী'দের ভোট দেবেন না। সাংসদ করতে হলে মরশুমি মুনমুন সেন কে করুন, বাঁকুড়ার গরমে প্রচারে যেতে যিনি নতুন সানস ক্রিম খুঁজবেন। সাংসদ করতে হলে মিমি-নুসরত কে করুন, যাঁদের ভোটে জিতিয়ে দিলেই নিয়মিত সিনেমার পর্দায় দেখতে পাবেন। সাংসদ করতে হলে অর্জুন সিং, অনুপম হাজরা কে করুন, যাঁদের ভোটে জিতিয়ে দিলেই তৃণমূল-বিজেপির দড়ি টানাটানি দেখতে পাবেন। কৃষক আত্মহত্যা করে মরছে, মরুক; আপনি বরং গণেশের শুঁড়ের প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে ভাবুন। শ্রমিক না খেতে পেয়ে মরছে, মরুক; আপনি বরং গোমূত্রে ভেষজ গুন খুঁজুন। দেশের বেকারত্বের হার ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ, হোক না; ভোটে আপনার অ্যাজেন্ডা কিন্তু মন্দির-মসজিদ আর গোমাতা। 
বামপন্থীরা ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ানো স্পিসিস। বামপন্থীরা ঠিক আজকের মতই, ভোটের পরেও পেট্রোল-ডিজেলের-গ্যাসের দামে আপনার হেঁশেলে টান পড়লেই লাল ঝাণ্ডা নিয়ে রাস্তায় নামবে। বামপন্থীরা ঠিক আজকের মতই, ভোটের পরেও কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম চেয়ে মাইলের পর মাইল পথ হাঁটবে। বামপন্থীরা ঠিক আজকের মতই, ভোটের পরেও শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি চেয়ে পার্লামেন্টে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার হুমকি দেবে। বামপন্থীরা ঠিক আজকের মতই, ভোটের পরেও ধর্মের নামে মানুষ খ্যাপানোর বিরুদ্ধে এলাকায় শান্তি মিছিল বের করবে। বামপন্থীরা ঠিক আজকের মতই, ভোটের পরেও আপনার বেকার ছেলের কাজের দাবিতেই রাত জেগে অনশন করবে। বামপন্থীদের না আছে চমক, না আছে গায়ক না আছে নায়ক। বামপন্থীরা ম্যাড়ম্যাড়ে। বামপন্থীরা সাদাকালো। বামপন্থীরা আপনার আমার মতই খুব সাধারণ। তাই একদম পাত্তা দেবেন না। আর পাত্তা দিলেও, ঐ যে বললাম ভুলেও বামপন্থী'দের ভোট দেবেন না।

বুধবার, ২৭ মার্চ, ২০১৯

অনশন ও স্ট্র্যাটেজি ~ অমিতাভ প্রামানিক

- দিদি, কেসটা কিন্তু দিন দিন জটিল হয়ে যাচ্ছে। 
- কোন কেস রে?
- এই যে অনশন। এতগুলো ছোঁড়াছুঁড়ি এতদিন ধরে অনশন করছে।
- ওরাম অনশন আমি অনেক করেচি। আমার রেকট আছে। ওদের কতদিন হয়েচে?
- না দিদি, আপনার রেকর্ড ভেঙে গেছে। তার চেয়েও চিন্তার হচ্ছে, আগে এসব নিয়ে কেউ বিশেষ মাথা ঘামাচ্ছিল না, এখন কিন্তু অনেক বড় বড় লোক ওদের হয়ে কথা বলছে।
- কে বড় বড় লোক? বিস্যোবাংলায় আবার বড় বড় লোক কোতায় দেকলি?
- না দিদি, শঙ্খ ঘোষ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সবাই ওদের হয়ে লিখছে।
- আরে রাখ। ওদের কাজই ওই, বাজে বকা। ওসব নিয়ে তোকে মাথা ঘামাতে হবে না। নেক্সট ইয়ারে দুটোকে একটা করে বিস্যোস্যি দিয়ে দিস আর মুখটা বন্ধ রাখতে বলিস। 
- কিন্তু দিদি, ফট করে এই ছোঁড়াছুঁড়িদের কেউ যদি ইয়ে হয়ে যায়?
- কিয়ে হয়ে যায়? আমি তো ছাব্বিশদিন অনশন করেচিলাম, ইয়ে হয়ে গেচিলাম?
- না, আপনার তো রাত্তিরে সব ফিট করা থাকত। এদের তো কিছু নেই।
- আরে রাখ। অনশনে কেউ ইয়ে হয় না। গান্ধীজি তো হরদম অনশন করত, ইয়ে হয়েচে? ঐ যে বুড়োভাম, কী যেন নাম, হ্যাঁ হ্যাঁ হাজারে, আন্না হাজারে, আমার খালি হাজরা হাজরা মনে হয় –
- কেন দিদি, কালিঘাট থেকে তো অনেক দূরে থাকে, হাজরা হাজরা কেন মনে হয়?
- কী জানি! কেন মনে হয় বলতো?
- লোকটা ড্রামাবাজ বলে? 
- মানে ঘুরিয়ে আমাকে ড্রামাবাজ বললি? যাগগে, ঐ লোকটা তো কতায় কতায় অনশন করে, ইয়ে হয়েচে? 
- কেন দিদি, যতীন না কে যেন – 
- বাঘা যতীন? ওর কেসটা আলাদা। ও তো অনেকদিন টেনেছিল কিস্যু না খেয়ে। জলও টাচ করেনি। ওরাম করলে তো মরবেই। 
- কিন্তু দিদি, আমি খবর যা পাচ্ছি, এদের কয়েকজন কিন্তু বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
- পরুক। এসব নাটক আমার অনেক দ্যাকা আচে। কাগজে লিকচে?
- না দিদি। কাগজ সবগুলোতে বলা আচে, কেউ যেন এসব ফালতু জিনিস খবর না করে। আপনি যেমন বলেছিলেন। 
- এবার যা, গিয়ে বল, সামনের বিষ্যুৎবার থেকে ছোট ছোট খবর করতে।
- কেন দিদি? সামনের বিষ্যুৎবারে কী? 
- এতদিন আমার সঙ্গে থেকে কী শিকলি, ছোঁরা? সব কিচুর টাইমিং আচে। আগেরবার যে অনশন করেচিলাম, টাইমিংটা কেমন ছিল বল? লোকজন বেশিদিন কিচু মনে রাকতে পারে না। ভোটের ঠিক আগে যেটা হয়, সেই বুজে ভোট দ্যায়। 
- এটাও তো ভোটের মুখেই দিদি। এতে কেস গড়বড় হয়ে যাবে না?
- সেই জন্যেই তো বলচি, এবার খবরের কাগজে আস্তে আস্তে জিনিসটা ছাড়তে বল।
- তাতে তো লোকে ওদের ফরেই চলে যাবে, দিদি। 
- আরে ধুর, তুই ওসব বুজবি না। ওদের চারটে ছুঁড়িকে যদি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ধরিয়ে দিই ভোটের ঠিক আগে আগে, তাহলে ... কী বুজলি? 
- আরে দিদি, তুমি জিনিয়াস। কাগজে খবর হবে – মহানুভব নেত্রী নিজের উদ্যোগে কর্মসংস্থান করলেন অসুস্থ ছাত্রীদের সাহায্যার্থে। শিক্ষাক্ষেত্রে নজির গড়ল বিশ্ববাংলা। ফাটাফাটি। ভোটে কে ঠেকায়! 
- অত উল্লাস দেখাতে হবে না। অনুব্বতদের রেডি রাকিস। ইলেকশন কমিশনের মাকড়াগুলোকে কোতায় কোতায় ঘোরাতে নিয়ে যাবি তার লিস্টি করেছিস? করিসনি একোনো? যা ফোট আমার সামনে থেকে ...

শুক্রবার, ২২ মার্চ, ২০১৯

মাস্টারদা ~ চন্দন দাস

নেত্র সেনের 'খুনী' কে?
সাভারকারের নামে বিমানবন্দর কেন?

আজ মাস্টারদার জন্মদিন। কিন্তু আজ আগে একজনের মৃত্যুর কথা বলবো ---নেত্র সেনের মৃত্যুর কথা। 
নেত্র সেন খেতে বসেছিল। তখন রাত। তবে বেশী নয়। তার স্ত্রী খাবার বাড়ছিলেন। এমন সময়ে ঘরে এক কিশোর ঢোকে। কোন কিছু বোঝার  আগেই কিশোরটি দায়ের এক কোপে নেত্র সেনের মুন্ডুটা ঘাড় থেকে নামিয়ে দেন। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি!
নেত্র সেন ধরিয়ে দিয়েছিল মাস্টারদাকে। তাই নেত্র সেনের 'শাস্তি'। কিন্তু দুটি প্রশ্নের সমাধান আজো হয়নি। নেত্র সেনকে শাস্তি দেওয়া সেই অগ্নিকিশোর কে ছিলেন? নাম জানা যায়নি। যিনি জানতেন সম্ভবত সেই নেত্র সেনের স্ত্রীকে দিয়ে কিছু বলাতে পারেনি ব্রিটিশ! 
নেত্র সেন সেই মহিলার স্বামী ছিলেন। কিন্তু সূর্য সেন? স্বপ্নের মানুষ, ভালোবাসা, মুক্তির স্বপ্নের নায়ক। এক কিশোরের পরিচয় গোপন করে মহিয়সী হয়ে ওঠা সেই মহিলার নাম? ইতিহাস মনে রাখেনি। 
এখন সেই সর্বাধিনায়ক সূর্য সেনের নামে শহরতলির একটা সাধারন মেট্রো স্টেশন। সাভারকারের নামে সমুদ্রের ধারে বিমানবন্দর! 
তুমি কে হে? কী তোমার ভূমিকা দেশের জন্য লড়াইয়ে? স্বাধীনতা সংগ্রামে কী করেছো তুমি? স্বাধীনতা সংগ্রাম মানে তুমি তো বাবর, হুমায়ুন, আকবরের বিরুদ্ধে লড়াই বুঝেছো, বুঝিয়েছো চিরকাল। ফাঁকতালে ব্রিটিশের সঙ্গে বোঝাপড়া। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিন দখলদারি, দাদাগিরি, তেলের ভাণ্ডারের লোভে দেদার, দু' কান কাটা বোমাবাজি — তুমি তো দেখতেই পাও না। 
সব গডসের ভাইবোন। সবসময় সমস্যা থেকে নজর ঘুরিয়ে দেবে। 
কী করেছিল তোমাদের নেতা 'বীর সাভারকার', আন্দামানের জেলে? ১৯১৩-র চিঠিটি মনে আছে? ব্রিটিশ সরকারকে কী লিখছেন 'বীর' সাভারকার? ''...অন্যভাবে যা পাওয়া যেতে পারে সে তুলনায় আমাকে জেলে আটকে রাখলে কিছুই পাওয়া যাবে না। শক্তিশালীর পক্ষেই একমাত্র ক্ষমাশীল হওয়া সম্ভব। কাজেই অনুতপ্ত সন্তান পিতৃতুল্য সরকারের দরজায় ছাড়া আর কোথায় ফিরে যাবে? মহামান্য হুজুর অনুগ্রহ করে বিষয়গুলি বিবেচনা করবেন এই আশা রইল।''
স্বাধীনতা সংগ্রামীর অনুতাপ। তাও আবার ব্রিটিশের কাছে। তাঁর অনুগতদের কাছে এখন কিনা দেশপ্রেমের সংজ্ঞা শিখতে হচ্ছে?
আর একজন? মাস্টারদা। লন্ডনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন মানুষটি, সঙ্গীদের নিয়ে। গ্রেপ্তার হয়েছেন। মুচলেকা দেননি। জাত-পাত-বোষ্টম-মুসলমান কিচ্ছুটি কোনদিন বিচার করেননি। জেলবন্দী সূর্য সেন সম্পর্কে লিখছেন তাঁর সহকর্মী, পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট নেত্রী হয়ে ওঠা কল্পনা দত্ত —''জেলে গিয়েও দেখি মাস্টারদা চুপ করে নেই। তিনি জানতেন, তাঁর ফাঁসি সুনিশ্চিত, তাই তিনি সমস্ত কাজ বুঝিয়ে দিতেন তারকেশ্বর দস্তিদারকে কাঠগড়ায় বসে। তাঁর ধারণা ছিল — তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি হবে না। শুধু কাঠগড়ায় বসে নয়। জেলের ভেতরেও। ...মাস্টারদা একদিন আমাকে বললেন— জেল থেকে বেরিয়ে এসে শহীদদের জীবনী প্রকাশ করবার চেষ্টা করি যেন আমরা। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও তাদের কথা তিনি ভুলতে পারেননি।''
এই লোকটি আমার ধমনীতে। আমাদের ঐতিহ্য। দেশপ্রেম ও মুক্তির স্বপ্ন আমাদের সম্পদ। তোমরা সাভারকারের ধ্বজাধারী, 'স্বাধীনতার' বানিয়া। তোমাদের কী যোগ্যতা আছে দেশপ্রেমের ব্যাকরণ শেখানোর?

বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৯

এসএসসি অনশন ~ প্রতিভা সরকার

প্রশ্ন তো উঠতেই পারে ওয়েট লিস্টে যারা তাদের কেন চাকরি হবে? মেইন লিস্টে যারা আছে তাদেরই হলো না যখন এখনও? ওয়েট লিস্ট অনশনে বসে পড়লেই হলো? মামদোবাজি !! 

দোলের দিন পাড়ায় প্রভাতফেরি হল। কী সুন্দরী সব মহিলা, সুবেশ পুরুষ, খোল দ্বার খোলের সঙ্গে অভিজাত পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছেন। যে তরুণের বাইকে চেপে প্রেস ক্লাবে যাচ্ছিলাম সে বলল,দেখছেন রাস্তাও লালে লাল, আর আবীরের গন্ধমাখা। 

অসাধারণ গদ্য আর কবিতাও সারাদিনে পড়লাম কিছু। সত্যি অসাধারণ।  এমনকি যেখানে ছেলেমেয়েরা অনশনে বসেছে সেখানেও বাঁধানো বেদীর মস্ত গাছে নতুন কচি পাতা। শুধু বাইশ দিনের উপোসে শুকনো মুখগুলোতে বসন্ত অনুপস্থিত। হাতে প্ল্যাকার্ড, রোদ এড়াতে ছাতা আর ফুটপাথে বিছানো ত্রিপলের ওপর ক্ষিদে আর আশাভঙ্গের অভিঘাতে শুয়ে আছেন যারা, তারা এ দেশের হবু শিক্ষক ! 

অজস্র মেয়েরা অনশন করছেন। ধারেকাছে লেডিজ টয়লেট নেই, আর্মি এরিয়া বলে ত্রিপল খুলে দেয় বার বার, রাতের হাওয়ায় অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য ভেসে আসে, একজন নয়, দুজনের গর্ভপাত হয়েছে, দ্বিতীয়জনের পারিবারিক সম্মানবোধ সে কষ্ট তাকে নীরবে গলাধঃকরণ করিয়েছে, তবু তারা লড়ছেন। ছেলেদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অনশন করছেন আজ বাইশদিন। আমার পাশে বসা মেয়েটির মুখ বড় মলিন। জিজ্ঞেস করে জানলাম সে হাসপাতালফেরত। অক্সিজেন নেওয়া শেষ হতেই আবার এসে বসেছে।অঙ্কের এম এস সি মেয়েটির প্রশ্ন, সরকার যে বলে বিজ্ঞানের শিক্ষক নেই বলে এতো পদ খালি, আমরা তবে কারা ?  
             
 প্রথমেই যে প্রশ্ন তোলা তার উত্তরেই লুকিয়ে আছে গোটা ব্যাপারখানার ব্যাখ্যা। শুনুন তবে, গোটা পশ্চিমবঙ্গে মোট কতো স্কুলটিচারের পদ খালি আছে তার কোন ঘোষণা হয়নি। অথচ স্কুল সার্ভিস কমিশনের গেজেট অনুযায়ী চূড়ান্ত মেধা তালিকা প্রকাশের ১৫দিন আগে আপ টু ডেট ভেকেন্সি জানাতে তারা বাধ্য। অনশনকারীরা জানাচ্ছেন নিজের নিয়ম নিজেই ভাঙছে সব সরকারি সংস্থা। ২০১৭ মে মাসে রেজাল্ট বেরলো, নিয়মানুযায়ী উচিত ছিল ২০১৭র এপ্রিল অব্দি কতো শূন্যপদ আছে তার তালিকা প্রকাশ করা। কিন্তু বাস্তবে করা হল ২০১৫ অব্দি। মাঝের দুবছর কি উবে গেল ? 

নিয়ম হয়েছিল ১ঃ ১ঃ ৪  রেশিওতে নিয়োগ হবে। অর্থাৎ ১০টি সিট থাকলে ১৪ জনকে ডাকবে, ১০ জন এমপ্যানেল্ড হবে, আর ৪ জন থাকবে ওয়েটলিস্টে। তার মানে ১০০ জনে ৪০ জন থাকবে ওয়েট লিস্টে। সেখানে দেখা যাচ্ছে ১০০ পদের ওয়েট লিস্টে রাখা হয়েছে ২৫০/৩০০ জনকে। এই বেনিয়মগুলো না হলে আমরা আজ রাস্তায় শুয়ে থাকতাম না, সখেদে বলে লক্ষ্মীকান্তপুরের তরুণটি। তার প্রশ্ন গত ৭ বছর রিক্রুটমেন্ট হয়নি, ভেকান্সিগুলো গেল কোথায়? 
এছাড়াও অঙ্কিত অধিকারীসংক্রান্ত ঘটনা, টাকাপয়সার লেনদেন, আরো অনেক বেনিয়ম নিয়ে কথা বলতে তারা দৃশ্যতই বিব্রত বোধ করছে। কারণ মঞ্চটিকে অরাজনৈতিক রাখতে হবে তো। কিন্তু মুখ খুললেই যে জড়িয়ে যাচ্ছে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল। সান্ত্বনা দেবার সাধ্য ছিল না, তাদের ফান্ডে অল্প সাহায্য আর সমবেদনার প্রকাশ ছাড়া এ শর্মার আর কোন সাধ্যই নেই। 
তবু ফিরতি পথে পাশ দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে যাওয়া দেড় কোটি টাকার গাড়ি, উড়ালপুলের ওপর থেকে পাঁচতারা হোটেলের কালো কাচ ফুঁড়ে তার সুসজ্জিত অন্দরমহল দেখতে দেখতে ফিরতি আমি-র কানে বাজতে লাগলো এক তরুণের আক্ষেপ - একটা সিস্টেম গড়ে উঠতে এতো সময় লাগে, আর সেই সিস্টেমকে ধ্বংস করে দিতে কতো অল্প সময় ! মদ খেয়ে মরলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়, আমরা অনশনে মরলে কি হবে ?  

আমার কথা যাদের বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হবে না, তাদের দোলের চূড়ান্ত শুভেচ্ছা জানিয়েও বলি, আমাকে মিথ্যুক এবং অনশনকারীদের ষড়যন্ত্রী প্রমাণের জন্যও তো ওদের কাছে আপনার একবার যাওয়া উচিত, ওদের বক্তব্য শোনা উচিত। 

আর যারা আমার কথা যুক্তিযুক্ত মনে করলেন তাদের অনেক ভালবাসা। কল্লোলিনী কলকাতার যে হৃদয় আছে তা প্রমাণে আপনাকে যেতেই হবে, দাঁড়াতে হবে ওদের পাশে। বাইশদিন না খেয়ে থাকা ছেলেমেয়েগুলোর চকোলেট, স্যান্ডউইচের দরকার নেই, মনোবল আর লড়াকু চেতনার বড় দরকার। 

আর দেরি করবেন না, সাথী ।

বুধবার, ২০ মার্চ, ২০১৯

ডাঃ রেজাউল করিম-এর প্রার্থীপদ ~ ডাঃ বিষাণ বসু

আমার মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই প্রথমবার ভোটে দাঁড়ালেন একজন চিকিৎসক-নেতা। হ্যাঁ, আমি ডাক্তার রেজাউল করিমের কথা বলছি।

না, আমি একবারের জন্যেও ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে ডাঃ সূর্যকান্ত মিশ্র বা ডাঃ রামচন্দ্র ডোম, এমনকি ডাঃ কাকলি ঘোষ দস্তিদার বা ডাঃ মমতাজ সঙ্ঘমিত্রা অথবা ডাঃ নির্মল মাজি, কারো কথাই ভুলে যাচ্ছি না।

আমার বক্তব্য, এঁদের পরিচিতি রাজনীতিক হিসেবে। এঁদের সাফল্য বা ব্যর্থতার দায়ও ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই, বা সমষ্টিগতভাবে তাঁদের দল বা দলের রাজনীতির।

কিন্তু, এক এবং একমাত্র চিকিৎসক-আন্দোলন থেকেই উঠে এসে রাজনীতির আঙিনায় পা রাখার নজির, অন্তত এই রাজ্যে, আর নেই।

তিন কি চার দশক আগে, বিশেষ করে বাম দলগুলিতে, এক বিশেষ আন্দোলনের ঘরাণা থেকে নেতা উঠে আসার প্রচলন ছিল। মানে, কৃষক ফ্রন্ট বা শ্রমিক ফ্রন্ট। এই রাজ্যে, সরকারি বাম দলের প্রভাব কমে আসার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত এই দুই উজ্জ্বল স্রোতের ক্ষীয়মানতা। কলকাতা শহরকেন্দ্রিক ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের হাতে যে মুহূর্তে বাম আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হল, সেই মুহূর্তেই তাঁদের শেষের শুরুটি সূচিত হয়েছিল, এমনটাই মনে করি। পরবর্তীকালেও, অন্যান্য দলেও, বিশেষ একটি আন্দোলনের ফ্রন্ট থেকে নেতা নির্বাচিত হওয়ার নজিরটি বিরল হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষিতে, ডাঃ রেজাউল করিমের উঠে আসাকে ব্যতিক্রম ধরা যেতে পারে।  

যাঁর প্রত্যক্ষ কোনো দলীয় রাজনীতির অতীত নেই। থাকা সম্ভবও নয়, কেননা তিনি সরকারি চাকরি করতেন। দলমতনির্বিশেষ এক চিকিৎসক আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হিসেবেই তাঁর উত্থান। বর্তমান পরিস্থিতিতে, চিকিৎসকদের যদি একটি সুবিধাভোগী শ্রেণীর অন্যতম হিসেবে না ভেবে বিশেষ একটি আক্রান্ত শ্রেণী হিসেবে যুক্তিসঙ্গতভাবে ধরা হয়, বা অন্তত আক্রান্ত শ্রেণীর অন্তর্গত একটি গোষ্ঠী হিসেবে ভাবা হয়, তাহলে সেই চিকিৎসকদের সার্থক প্রতিনিধি হিসেবে ডাঃ করিমের চেয়ে উপযুক্ত কোনো নাম, এই মুহূর্তে, মাথায় আসে না।

এরই সাথে সাথে, তাঁর আন্দোলন শুধুমাত্র চিকিৎসকদের স্বার্থটুকুই যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে, এই ধরনের মায়োপিক নয়। কেননা, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি বলে, চিকিৎসকদের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে, বা চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, সাধারণ মানুষকে পাশে না পেলে চলবে না। আর, রোগী-চিকিৎসকের এই অবিশ্বাসের মূলে রয়েছে সাধারণ মানুষের মনে চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অসহায়তা, এবং সেই অনিশ্চয়তা-অসহায়তারও মূলে চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ। 

অতএব, ডাঃ রেজাউল করিমের জনমুখী আন্দোলন মুখ্যত সবার জন্যে স্বাস্থ্যের দাবীতে আন্দোলন, সবার সামর্থ্যের মধ্যে স্বাস্থ্যের দাবীতে আন্দোলন।

স্বাধীনতার পর সাতটি দশক পার হয়ে গেলেও, একটিও সাধারণ নির্বাচন লড়া হয়নি সবার জন্যে স্বাস্থ্যের দাবীকে সামনে রেখে। স্বাস্থ্যচিকিৎসা প্রথম দশটি ইস্যুর অন্যতম, এমন কোনো দলীয় নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোও চোখে পড়েনি কোনোদিন।

দেশের প্রথম সারির সবকটি দলের জনগণের স্বাস্থ্য বিষয়ে এমন প্রকাশ্য অনীহা বা অবজ্ঞার উল্টোপিঠেই থাকে চিকিৎসক ও রোগীকে যুযুধান প্রতিপক্ষ হিসেবে খাড়া করা। এরাজ্যের বাম দলগুলিকে ধন্যবাদ, যে, তাঁরা নির্দল প্রার্থী ডাঃ রেজাউল করিমকে সমর্থন জুগিয়ে এই গড্ডালিকা প্রবাহের বিপরীতে প্রথম পদক্ষেপটি নিলেন।      

ডাঃ করিম জিতবেন কি জিতবেন না, সেই প্রশ্ন ভিন্ন। কেননা, নির্বাচনের সমীকরণ ভারি জটিল বিষয়। এবং, এদেশের নির্বাচনে, বিশেষ করে এই বাজারে, শিক্ষিত ভদ্রলোকের জয়ের সম্ভাবনা প্রথম থেকেই কমে যায়, কেননা খেউরের লড়াইয়ে তাঁদের অদক্ষতা লক্ষ্যণীয়। আর, একথা মাথায় রাখতে হবে, পিপল গেট দ্য লিডার দে ডিজার্ভ। কাজেই…..  

কিন্তু, তাঁর প্রার্থী হওয়া বা প্রচার-পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে সবার জন্যে স্বাস্থ্যের দাবী কিছুটা সামনের সারিতে আসতে পারবে, কিছুটা মান্যতা পাবে, এই দাবী প্রকৃতঅর্থেই জনসাধারণের মধ্যে থেকে উঠে আসা জনসাধারণের দাবী হয়ে উঠতে পারবে, এইটাও খুব বড় পাওনা।

সেইদিক থেকে বিচার করলে, ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বা ফলপ্রকাশের বহু আগেই, ডাঃ রেজাউল করিম ও তাঁর অ্যাজেন্ডাটি জিতে গিয়েছে। 

আপনিও গর্ববোধ করুন, কেননা অ্যাজেন্ডাটি আপনারও।

সোমবার, ১৮ মার্চ, ২০১৯

Revolution Recounted ~ সম্রাট চক্রবর্তী

ভালো আছেন অর্ণব দাম ?ও বিপ্লবী অর্নব বাবু?আইআইটি ড্রপ আউট অর্ণব।আপনি মেধাবী ছিলেন।মাওবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী তরুণ।মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের স্থিতধী তাত্ত্বিক ।

জঙ্গল মহলে বিপ্লবের আশায় পা রাখেন।মুক্তাঞ্চল গড়বেন।সে প্রায় এক দেড় দশক আগের কথা।'যুদ্ধে হেরে'বা মন জগতে পরিবর্তনের ফলে যে কারণেই হোক রাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন।এখন ইতিহাসে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর।পোস্ট গ্র্যাজুয়েট।স্টেট এলিজিবিলিটি টেস্ট পরীক্ষায় মুন্সিয়ান দেখিয়েছেন।কারান্তরালে দেশের কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অভিনন্দন অর্ণব।উর্ফ আকাশ বা বাতাস বাবু।আকাশ ,বাতাসের কথায় মনে পড়লো!তিলক টুডুর কথা।অর্নবের কমরেডরা ছাত্র ফেডারেশনের এই ছাত্র কর্মীর মাথায় খুব কাছ থেকে গুলি করে।আধমরা তিলকের রক্তাক্ত দেহের পাশে বসে মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত খেয়েছিল।এক দশক অতিবাহিত।কে জানে তিলক বেঁচে থাকলে আজকে হয়তো কোনও প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষার জন্য তৈরি হতেন!অথবা ছবি মাহাতো।একুশ জন বিপ্লবী ধর্ষণ করে যাঁকে পুঁতে দিয়েছিল জঙ্গলে!তার সন্তানরাও নিশ্চই অর্নবের সাফল্যে খুশি হবে।সহ নাগরিকের সাফল্য প্রত্যেকটি মানুষকে উদ্দীপ্ত করে।প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার লড়াই!প্রতিকূল পরিবেশ।সৌম্যজিত বসু ,পার্থ বিশ্বাসের পরিবারের মত প্রতিকূল।স্কুল শিক্ষক সৌম্যজিত ,কলকাতা পুলিশের কর্মী পার্থর পরিবার অবশ্য এতটা সৌভাগ্যবান ছিলেন না।শুধু করোটির একটা অংশ আর কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল।সঙ্গে গুটি কতক হাড়গোড়।শল্কু সোরেদের বাপ মায়েদের থেকে একটু কম সৌভাগ্যবান।পোঁকায় কাটা পঁচা গলা লাশের জায়গায় শুধু খুলি আর হাড়গোড়।হায়দ্রাবাদের গবেষণাগার থেকে 'ফলাফল' জানতে দীর্ঘ প্রতীক্ষা তাঁদের পরিবারের লোকেদের।কঙ্কাল গুলো তাঁদের পরিবারের প্রিয়জনের তো!ভালো থাকুন অর্ণব।

মানস চক্ষে দেখতে পাচ্ছি অধ্যাপক অর্ণব ইতিহাসের ক্লাসে সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাস ব্যাখ্যা করছেন।শ্রেণী বিপ্লব, ক্লাস ইক্যুয়েশন, কায়িক ও বৌদ্ধিক শ্রমের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীদের সামনে দন্ডায়মান।ছেলেমেয়েরা গণতন্ত্র, প্রলতাড়িয়েত সমাজে রাজবন্দীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ছেন অধ্যাপক অর্নবের দিকে।একের পর এক প্রশ্ন বানে বিপন্ন অর্ণব ঢোক ঢোক করে ঠান্ডা জল খেলেন।যে জল টুকুও ১৫বছরের তিলক টুডু পায় নি।বিপ্লবীরা অবশ্য বেসক্যাম্পে যাবার আগে আধমরা তিলকের গলার কন্ঠনালী কুচুৎ করে কেটে 'শ্রেণী শত্রুর রক্তে' হাত রাঙিয়ে বিপ্লবের উদ্বৃত্তের মূল্য উশুল করে দিয়েছিলেন।অর্ণবের পরীক্ষার খাতায় শিক্ষকের কলমের লাল দাগের মত যা বিরলতম।'শ্রেণীশত্রু
ভাগচাষীর' মেধাবী পুত্রের  রক্ত।একটু লাল সেলাম হবে না কমরেড?

শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৯

অনশন চলছে ~ হাবিব বাপি

আগে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় পাশ করলে চাকরি হত। এখন পড়াশুনা করতে হয়। ফর্ম ফিলাপ এর জন্য আন্দোলন করতে হয়। রিটেন একজ্যাম দেওয়ার জন্য আন্দলন করতে হয়।  রেজাল্ট বের করার জন্য, ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য, মেরিট লিস্ট পাব্লিশ করার জন্য কেস অথবা আন্দোলন করতে হয়।  কাউন্সেলিং এবং জযেনিং এর জন্য আবার আন্দোলন করতে হয়। 

৫-৬ বছরের একটা প্রসেস।  যার মধ্যে পড়াশুনো ৬ মাস আর বাকি সাড়ে ৫ বছর আন্দোলন, কেস এবং অনশন করতে হয়।  

অনশন এখনো  চলছে ।

মঙ্গলবার, ১২ মার্চ, ২০১৯

হিটলারের জুমলা ~ অরিজিত মুখার্জী

সরকারি জুমলার একটা গল্প বলি শুনুন।

১৯৩৮ সালের কথা। তার বছর কয়েক আগে, সঠিকভাবে বলতে গেলে ১৯৩৩ সালের জানুয়ারি মাসে অ্যাডলফ হিটলার প্রথমবার জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে ডাক পান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট, ফিল্ড মার্শাল হিন্ডেনবার্গের কাছ থেকে। প্রথমে ছিলো কোয়ালিশন, কিন্তু অচিরেই একে একে সবাইকে সরিয়ে, অন্য দলগুলোকে বেআইনি ঘোষণা করে, লেবার ইউনিয়ন বাতিল করে সেখানে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট বা নাৎসি পার্টির একমাত্র সংগঠন বসিয়ে হিটলার জার্মানির একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন। রাইখস্ট্যাগ তখন ছিলো নাম কা ওয়াস্তে, রাবারস্ট্যাম্প মাত্র। গোয়েবলস তখন প্রোপাগান্ডা মিনিস্ট্রির সর্বেসর্বা, তাঁর ইশারায় দেশের সমস্ত সংবাদমাধ্যম পরিচালিত হত - তিনিই বলে দিতেন কবে কোন খবর কীভাবে লিখতে হবে। সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটি অবধি - সর্বত্রই ন্যাশনাল সোশ্যালিজমই একমাত্র এবং আবশ্যিক বিষয়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ানো হত জার্মান সায়েন্স, জার্মান হিস্টরি, জার্মান জাতিগত তত্ত্ব ইত্যাদি - নামীদামী যে অধ্যাপক বা সংস্কৃতি কর্মীরা এ পথে হাঁটতে চাননি, তাঁদের তখনই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো শুরু হয়ে গেছে, কখনো খুন করাও। এর মধ্যে বার্লিন এবং অন্যান্য শহরে লাইব্রেরির সমস্ত বই জ্বালিয়ে দেওয়ার মত ঘটনাও ঘটে গেছে।

তো যেটা বলছিলাম - সাধারণ জার্মানরা কিন্তু কঠিন অবস্থা সত্ত্বেও বেশ মানিয়ে নিয়েছিলো, কারণ জাতীয়তাবাদের হিস্টিরিয়া হিটলার সফলভাবে চালাতে পেরেছিলেন, বিশেষ করে ভার্সাই চুক্তির ফলে জার্মানীর দুরবস্থা আর তা কাটানোর জন্যে লীগ অফ নেশনস থেকে বেরিয়ে আসা, এমনকি অসামরিক ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত রাইনল্যান্ডে জার্মান সৈন্য পাঠানো - বিভিন্ন প্লেবিসাইটে জার্মানরা ঢেলে হিটলারের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। হ্যাঁ, গেস্টাপোর ভয়ে অনেকেই হয়তো না-কে হ্যাঁ লিখেছেন, কিন্তু তাতেও এই বিপুল সমর্থনকে অস্বীকার করা যায় না।

এই সময়ে, হিটলার, সাধারণ জার্মান কর্মীদের মধ্যে আরও জনপ্রিয়তার লক্ষ্যে একটি "জনসাধারণের গাড়ি" তত্ত্ব বাজারে আনেন। গোদা বাংলায়, সমস্ত জার্মান কর্মীদের জন্যে সহজলভ্য গাড়ি তৈরী হবে, তার দাম থাকবে ৯৯০ মার্ক, অর্থাৎ তখনকার হিসেবে ৩৯৬ ডলার। তৈরী হয় ভোকসওয়াগন - যার আক্ষরিক অর্থ - "পিপলস কার"। বলা হয় (হিটলারের নিজস্ব দাবীও তাই) যে অস্ট্রিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ডঃ ফার্ডিন্যান্ড পোর্শের করা বীটলসের ডিজাইনে হিটলার অবদান ছিল। এবারে বেসরকারি কোনো সংস্থার পক্ষে ওই দামে গাড়ি বানানো সম্ভব নয় – তাই হিটলারের নির্দেশে তৈরী হল সেই সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গাড়ি তৈরীর কারখানা, একটি সরকারী সংস্থা, যার মাথায় হিটলার বসালেন নাৎসি পার্টির লেবার ফ্রন্টকে। বলা হল এই কারখানা থেকে প্রতি বছর  পনেরো লক্ষ গাড়ি বাজারে আসবে। গোয়েবলসের দল প্রচারে নেমে পড়লো এই নিয়ে, বছরে পনেরো লক্ষ গাড়ি, কোথায় লাগে ফোর্ড কোম্পানি? লেবার ফ্রন্টের তরফ থেকে কারাখানা শুরুর জন্যে পাঁচ কোটি মার্ক দেওয়া হল। কোথা থেকে এলো এই টাকা? সেই যে হিটলার ট্রেড ইউনিয়নের বদলে নাৎসি সংগঠন বাধ্যতামূলক করলেন - তাদের তো সাপ্তাহিক চাঁদা দিতে সমস্ত কর্মীকে - তাই দিয়েই তৈরী হয়েছিল লেবার ফ্রন্টের "ফান্ড"।

এবার আসরে নামলেন ডঃ রবার্ট লে, যিনি জার্মানিব্যাপী লেবার ফ্রন্টের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি কর্মীদের জন্যে আনলেন একটা নয়া স্কিম - অনেকটা গাড়ির দামের দরুণ সপ্তাহে একটা ইনস্টলমেন্ট - সমস্ত কর্মীকে এই টাকা দিতে হবে প্রতি সপ্তাহে - যতটা সে পারবে - দশ বা পনেরো মার্ক করে। এই টাকা জমে যখন ৭৫০ মার্ক হবে, তখন সেই কর্মী একটা রসিদ পাবে অর্ডার নম্বর সহ, তাতে লেখা থাকবে যে কারখানা থেকে গাড়ি বেরোলেই সেই কর্মী একটি গাড়ি পাবে। এভাবে জার্মানির সমস্ত কর্মীর কাছ থেকে কয়েক বছর ধরে তোলা হল লক্ষ লক্ষ মার্ক।

বলাই বাহুল্য, ভোকসওয়াগনের কারখানা থেকে নাৎসি শাসন চলাকালীন একটিও গাড়ি রাস্তায় বেরোয়নি। ১৯৩৯ সালের পয়লা সেপ্টেম্বের জার্মান ট্যাঙ্কবাহিনী পোল্যান্ডের বর্ডার বেরোয়। ততদিনে ভোকসওয়াগনের কারখানা গাড়ির কারখানা থেকে বদলে হয়ে গেছে যুদ্ধাস্ত্র তৈরীর কারখানা। "জনসাধারণের গাড়ির" তত্ত্ব দেখিয়ে জার্মান কর্মীদের কাছ থেকে সংগৃহীত লক্ষ লক্ষ মার্ক গাড়ির বদলে কাজে লাগলো যুদ্ধাস্ত্র তৈরীতে, আর তার পরের কথা আর কাউকে বলে দেওয়ার দরকার নেই। আমরা সবাই জানি সেই গল্পটা।

শেখার বিষয় এইটাই যে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর "গ্র্যান্ড স্কিম" গুলোও এরকমই জুমলা। 

যেমন ধরুন "প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা"। চাষীদের কাছ থেকে ফসল বীমার জন্যে টাকা নেওয়া হয় যাতে খরা, বন্যা, অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের জন্যে চাষীদের ক্ষতি আটকানো যায়। ২০১৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই স্কিম চালু করেন। আরটিআই সুত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যাচ্ছে ২০১৪-১৫ বা ২০১৬-১৬ সালে (অর্থাৎ, নতুন চালু করা স্কিমের আগের বছরে), যখন পুরনো ফসল বীমা চালু ছিলো, তখনকার তুলনায় ইনসিওরেন্স প্রিমিয়াম বেড়েছে ৩৪৮% (১০,৫৬০ কোটি থেকে বেড়ে ৪৭,৪০৮ কোটি)। এবং হাতে গোণা কয়েকটি বেসরকারি বীমা সংস্থা, রিলায়েন্স যাদের মধ্যে অন্যতম, ২০১৬-১৭ সালে মুনাফা করেছে ৭০০০ কোটি টাকার, যেখানে গড়ে ক্ষতিগ্রস্ত চাষী খরিফ মরসুমের জন্য পেয়েছে মাত্র ১০,০০০ টাকা। নাম আসবে আরো অনেক স্কিমের - যেমন এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট, প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি, স্বচ্ছ ভারত, স্মার্ট সিটি ইত্যাদি - সবই দেখা যাচ্ছে জুমলা। ভোকসওয়াগন কারখানার মত এখানেও স্কিমগুলো তৈরী যাদের উদ্দেশ্যে, তারা কিন্তু যে তিমিরে ছিলো সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। ১৯৩৮ সালে কর্মীদের দেওয়া টাকায় তৈরী হয়েছিলো যুদ্ধাস্ত্র। আজ ভারতে চাষী বা কারখানার শ্রমিকদের টাকায় কর্পোরেটপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী তুষ্ট করছেন কখনো আম্বানিকে, কখনো আদানিকে।

এটা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝবো, ততই মঙ্গল।

[Source: The Rise and the Fall of the Third Reich, William Shirer]

সোমবার, ১১ মার্চ, ২০১৯

৫৬ ইঞ্চি ~ দেবতোষ দাস

শ্রীশ্রীভূষণ্ডি কাগায় নমঃ। 

শ্রী কাক্কেশ্বর কুচকুচে। ৪১ নং গেছোবাজার, কাগেয়াপটি। আমরা হিসাবি ও বেহিসাবি, খুচরা ও পাইকারি, সকল প্রকার গণনার কার্য বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করিয়া থাকি। আমরা সনাতন বায়সবংশীয় দাঁড়ি কুলীন, অর্থাৎ দাঁড়কাক। 

কিন্তু গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমাদের পাণ্ডা অকাল-পক্ক দণ্ডবায়স শ্রী কাক্কেশ্বর, স্মার্টবোমের সার্জিকাল আঘাতে অকাল-অক্কা হওয়াতে, গণনা আপাতত স্থগিত আছে।
 
অমনি গাছের ফোকর থেকে বেরিয়ে এক দেড়েল বুড়ো বলল, ১০ দিন পার হয়ে গেল, এখনও হিসেবটা হয়ে উঠল না? তারপর কয়েকখানা রঙিন কাচ দিয়ে বারবার চারপাশ দেখে দরজির ফিতেটা বার করল। তারপর হাওয়ায় খানিক মাপ-টাপ নিয়ে বলল, ছাতি যখন ৫৬ ইঞ্চি, বন্দুকও যখন ৫৬ মানে একে ৫৬, তখন লাশও ৫৬ হবে! 

একটা তকমা-আঁটা পাগড়ি-বাঁধা কোলা ব্যাং রুল উঁচিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ভুল হিসেব! মানহানির মোকদ্দমা! শামলাপরা কুমির সর্দিবসা মোটা গলায় বলতে লাগল, ধর্মাবতার হুজুর! এটা মানহানির মোকদ্দমা। সুতরাং প্রথমেই বুঝতে হবে "মান" কাকে বলে। মান মানে কচু। 

সেই শুনে হিজিবিজবিজ হেসে বলল, একজনের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার কোটের নাম ছিল 'বিমুদ্রাকরণ'। তার জুতোর নাম 'অবিমৃষ্যকারিতা'। তার গাড়ুর নাম ছিল 'পরমমিত্রোঁওওও' – কিন্তু যেই তার বাড়ির নাম দিয়েছে 'কিংকর্তব্যবিমূঢ়' অমনি ভূমিকম্পে বাড়ি-টাড়ি সব পড়ে গিয়েছে।
 
তাই দেখে ব্যাকরণ সিং-এর ব্যা-ব্যা করে কী জোশ! থেকে থেকে চিৎকার করছে, যুদ্ধ চাই! যুদ্ধ! ছাগল ফুঁপিয়ে বলল, যুদ্ধে আমার সেজোমামার আধখানা কুমিরে খেয়েছিল, বাকি আধখানা মরে গেল দেশপ্রেমে! তারপর? ছাগল বলল, তার আর পর কী? আমিও মনের দুঃখে ফাইলগুলো খেয়ে ফেললাম! 

তবে আপাতত গণনা স্থগিত। দণ্ডবায়স প্রয়াত। তার জন্য খানিক নীরবতা পালন করা যেতে পারে। কতটা? এই ৫৬ ইঞ্চি!

মঙ্গলবার, ৫ মার্চ, ২০১৯

দেশদ্রোহী ~ শঙ্কর কুমার দাস

পাকিস্তান-চিন-রাশিয়া-কিউবা-ভেনেজুয়েলার দালালদের কুৎসিত অতীতটা একটু জানবেন না?

১) মুজফ্ফর আহমেদ - মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় ব্রিটিশ সরকার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়,যার মধ্যে ৩ বছর সেলুলার জেল এ কাটে।স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

২) গণেশ ঘোষ-চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের অন্যতম নায়ক।সূর্য সেনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জালালাবাদ পাহাড় এ লড়াই করেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে।১৬ বছর সেলুলার জেলে সশ্রম কারাদণ্ড । পরবর্তী কালে সিপিআই MLA,
৩ বারের জন্য ও সিপিএমের M.P.

৩) কল্পনা দত্ত- প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর সহোযোগিনী এবং চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অন্যতম মুখ।৬ বছর এর দ্বীপান্তর।ফিরে এসে কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগ দেন ও ভোটে দাঁড়ান।

৪) সুবোধ রায় - চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন,জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে কনিষ্ঠতম সৈনিক।
১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়, যার মধ্যে ৬ বছর সেলুলার জেল। সিপিএম রাজ্য কমিটি সদস্য আজীবন।

৫) অম্বিকা চক্রবর্তী- চট্টগ্রাম বিদ্রোহের জন্য ১৬ বছর সেলুলার জেলে সশ্রম কারাবাস।স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগদান ও নির্বাচিত MLA.

৬) অনন্ত সিং - চট্টগ্রাম বিদ্রোহের জন্য ২০ বছর (১৬ বছর সেলুলার জেলে) সশ্রম কারাবাস। স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগদান।

৭) শিব ভার্মা - ভগৎ সিংএর সহযোগী। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় একসাথে গ্রেপ্তার হন।ভগৎ সিং এর ফাঁসি হয় ও এনার যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর আন্দামানে।১৭ বছর পর ফিরে যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে।পরে সিপিএম উত্তর প্রদেশ রাজ্য কমিটির সেক্রেটারি।

৮) হরেকৃষ্ণ কোনার- ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ এর জন্য ৬ বছর আন্দামানে এ দ্বীপান্তর। আন্দামানে বিপ্লবীদের নিয়ে কমিউনিস্ট কনসোলিডেশন গঠন ও পরে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রধান মুখ।

৯) লক্ষী সায়গল - আজাদ হিন্দ বাহিনীর রানী ঝাঁসি রেজিমেন্ট এর ক্যাপ্টেন।আজাদ হিন্দ বাহিনীর হয়ে ইমফল ও কোহিমা ফ্রন্টে লড়াই করেন।স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টি তে আসেন। আমৃত্যু সদস্য ছিলেন।

১০, ১১, ১২ ) জয়দেব কাপুর , অজয় ঘোষ ও কিশোরীলাল- ভগৎ সিংএর সহযোগী লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় একসাথে গ্রেপ্তার হন এবং যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয় আন্দামান সেলুলার জেলে। স্বাধীনতার পর মুক্তি পেয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।

১৩) সতীশ পাকড়াশী - মেছুয়াবাজার বোমা মামলায় ১০ বছর এর জন্য সেলুলার জেল। ফিরে এসে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও সিপিএম বিধায়ক।

১৪) পি সি জোশি- মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন, যদিও মেয়াদের আগে মুক্তি পান। ৩ বছর কাটান সেলুলার জেলে, কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম জেনারেল সেক্রেটারি।

১৫)অরুণা আসাফ আলী - ১৯৪৬ এর নৌ বিদ্রোহের সংগঠক কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ৬৬ টা যুদ্ধ জাহাজ ও ১০০০০ নৌ সেনা নিয়ে গড়ে ওঠা ব্রিটিশ বিরোধী যে বিদ্রোহ কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার পিছন থেকে ছুরি মারায় অঙ্কুরে বিনাশ পায়। এই বিদ্রোহী দের মধ্যে আরো অনেক কমিউনিস্ট ছিলেন যারা ব্রিটিশ এর গুলিতে মারা যান, উৎপল দত্তের 'কল্লোল ' নাটকে এর বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

১৬) বি টি রণদিভে - ১৯২৫ থেকে ১৯৪২ , ১৭ বছর ধরে ব্রিটিশ সরকার এর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কৃষক শ্রমিক কে সংগঠিত করেছেন। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নৌ বিদ্রোহের সমর্থনে সারা ভারত ব্যাপী হরতাল সংগঠিত করেন ও ব্রিটিশ সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করেন। স্বাধীনতার পর সিপিআই এ, পরে সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটি তে।

১৭) ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ - ১৯৩৪ - ১৯৪২ ব্রিটিশ সরকারের ' ওয়ান্টেড লিস্ট' এ প্রায় গোটা যৌবন তাই আত্মগোপন করে কাটিয়ে দিয়েছেন। পরে কেরালার প্রথম কমিউনিস্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী।

১৮, ১৯ ) বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর-- ছাত্রাবস্থায় পালিয়ে যান জার্মানি তে ইন্ডিয়ান ইনডিপেনডেন্স লীগ এর বার্লিন কমিটি এর সদস্য হয়ে ভারত বর্ষের বিপ্লবীদের অস্ত্র যোগান দেওয়ার দায়িত্ব নেন।
হিটলারের নাত্সি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাবাস জার্মানিতেই।কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

২০ ) শওকত উসমানী- মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান অভিযুক্ত।কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

এইরকম কুৎসিৎ অতীত একমাত্র বামপন্থী দেশদ্রোহী দেরই আছে।

আর কারো আছে নাকি???

আর থাকবেই বা কেন?
ওরা তো দেশপ্রেমী!

অনেক তো 'দেশদ্রোহী' সিপিএমের কুৎসিত অতীতের কথা তো জানলেন।এবার জানুন সত্যিকারের 'দেশপ্রেমিক'দের কথা।

১)মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর(আরএসএসের দ্বিতীয় স্বরসঙ্ঘচালক) : "হিন্দুরা ব্রিটিশদের সাথে লড়াই করে তোমাদের শক্তি খরচ না করে,আসল শত্রু মুসলমান,খ্রিস্টান আর কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করো।"

২)বিনায়ক দামোদর সাভারকর('হিন্দুরাষ্ট্র' বই-এর লেখক এবং হিন্দুত্ব আইডিওলজির জনক) : ইংরেজ সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়ে লেখেন যে তিনি আর কোনও দিনও ব্রিটিশ বিরোধী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেবেন না।

৩)নাথুরাম বিনায়ক গডসে(আরএসএসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা) : জীবনে কোনওদিন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ না নিলেও গান্ধীজীকে খুন করেন[প্রসঙ্গত,গান্ধীজীর আদর্শকে সমর্থন করিনা,তবে তাঁকে খুন করাটাও ঘৃণ্যতম অপরাধ বলেই মনে করি]।

৪)অটল বিহারী বাজপেয়ী(আরএসএস নেতা,পরবর্তীকালে বিজেপির টিকিটে জিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী) : ১৯৪২সালে ভারতছাড়ো আন্দোলনের সময় উত্তরপ্রদেশের বটেশ্বর গ্রামে ব্রিটিশ সরকারের রাজসাক্ষী হয়ে অসংখ্য বিপ্লবীকে ইংরেজ সরকারের কাছে ধরিয়ে দেন।

৫)শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (আরএসএস নেতা তথা বিজেপির প্রাণপুরুষ) : ১৯৪৭ সালের ২রা মে ভাইসরয় মাউন্ট ব্যাটেনকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন ভারত ভাগ পরে করা হলেও ক্ষতি নেই কিন্তু বাংলাকে যেন অবিলম্বে ভাগ করা হয়[যে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল রাস্তায় নেমে এসেছিলেন]।

৬)কে বি হেডগেওয়ার (আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা) : ১৯৩০সালে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় দেশবাসীকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের তেরঙ্গা পতাকা বর্জনের আহ্বান জানিয়ে সত্যাগ্রহ সহ ব্রিটিশ বিরোধী সমস্ত আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে আহ্বান জানান।

এই ইতিহাস জানতে 'দেশদ্রোহী বাম' ঐতিহাসিকদের লেখা পড়ার প্রয়োজন নেই।
'দেশভক্ত আরএসএস বিজেপি'র নিজস্ব ইতিহাস বইগুলোই যথেষ্ট।

শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০১৯

বালাকোট ~ পুরন্দর ভাট

বিশ্বব্যাপী সংবাদ সংস্থা, এসসিয়েটেড প্রেস বলছে তাদের সাংবাদিকদের ২৬ তারিখ সকালবেলাই বালাকোটের সেই কুখ্যাত পাঁচতারা টেররিস্ট ক্যাম্প, যা ভারতীয় বায়ুসেনা বোমা মেরে ধ্বংস করে দিয়েছে, সেখানে নিয়ে গেছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। সঙ্গে পাকিস্তানি মিডিয়ার সাংবাদিকরাও ছিল। এসসিয়েটেড প্রেসের সাংবাদিকরা সেই পাহাড়ে কিছু উপড়ে পড়া গাছ আর দুটো ভাঙা মাটির বাড়ি ছাড়া কিছু দেখতে পায়নি। (লিংক:  https://www.apnews.com/e64d72f76c4f475493e4d41501ebab06 )

চলে আসা যাক আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল রক্ষণশীল সংবাদপত্র, ওদের মালিক হলো কুখ্যাত ফক্স নিউজের মালিক - রুপার্ট মারডক। ওরা ট্রাম্প সমর্থক, খোলাখুলি ইসলাম বিদ্বেষী না হলেও কেউ ওদের ইসলামপন্থী বলে প্রশংসা করতে পারবে না। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটা সম্মানীয় পত্রিকা, ফক্স নিউজের মত নয়। তো সেই ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও জানাচ্ছে যে বালাকোটে যেখানে বোমা ফেলা হয়েছে সেখানে কিছুই নেই কয়েকটা গাছ ছাড়া। (লিংক: https://bit.ly/2TphqtS )

একই কথা বলছে নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং লন্ডনের টাইমস। ইংল্যান্ডের গার্ডিয়ান পত্রিকাও সন্দেহ করছে যে ফাঁকা জঙ্গলে বোমা ফেলেছে বায়ুসেনা। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে যে পাকিস্তানে বহুদিন যাবৎ বড় বড় টেররিস্ট ক্যাম্প বন্ধ হয়ে গেছে, যা আছে তা হলো ছোট ছোট টেররিস্ট সেল যারা কয়েকদিন পর পর জায়গা বদলায়। বালাকোটে, এক দশক আগে জঙ্গি ঘাঁটি থেকে থাকলেও এখন কিছুই নেই। (লিংক: https://nyti.ms/2GLbe9B , https://www.thetimes.co.uk/article/india-bombs-terror-camp-inside-pakistan-9cggx6lmt )

বিবিসি, সিএনএন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট - তাবর তাবর সংবাদমাধ্যম ঘেঁটেও কোথাও পেলাম না যেখানে তারা পাঁচতারা জঙ্গিঘাঁটির কথা বিশ্বাস করেছে।

একমাত্র আলজাজিরা বালাকোটের কাছে জৈশে মোহাম্মদ পরিচালিত একটা ছোট মাদ্রাসার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। সেখানে জঙ্গি প্রশিক্ষণ হোক না হোক, অন্তত জঙ্গি রিক্রুটমেন্ট যে হত সেইটা ধরে নেওয়াই যায়। কিন্তু সেই একচালা মাদ্রাসা কোনোভাবেই সুইমিং পুল শোভিত পাঁচতারা জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির বলা যাবে না এবং সেই মাদ্রাসাটি অক্ষতই আছে, বোমার আঘাত লাগেনি। জেহাদী মতবাদে দীক্ষা দেওয়ার জন্য এরকম ছোট ছোট মাদ্রাসা গোটা পাকিস্তান অকুপাইড কাশ্মীরে ভুরি ভুরি আছে, তাই এটা খুব হাই প্রোফাইল টার্গেট বিশ্বাস করাও কঠিন। (লিংক: https://bit.ly/2H5B7QO )

এতগুলো রিপোর্ট দেখেও আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই ভক্তদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দেশ, জেহাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি লড়াই করা দেশ - ইজরায়েলের সংবাদমাধ্যম ঘাঁটলাম। বায়ুসেনা যে বোমাগুলো ফেলেছে সেগুলোও তো ইজরায়েলি, ওরা নিশ্চই পাঁচতারা সন্ত্রাসবাদী ক্যাম্পের কথা লিখবে। ইজরায়েলের সব থেকে বড় সংবাদপত্র হারেতজের ওয়েবসাইটে গেলাম। কিন্তু কী আশ্চর্য ওরাও বলছে যে বালাকোটের সেই পাহাড়ে দু চারটে কুঁড়ে ঘর ছাড়া কিছু নেই!! (লিংক:  https://bit.ly/2Nyf06O )

এবার আমি পড়লাম বিপদে। কাকে বিশ্বাস করবো? বিশ্বের সেরা সংবাদমাধ্যমগুলোকে, যাদের সাংবাদিকরা ভুরি ভুরি পুলিতজার পুরস্কার পায় নির্ভীক সাংবাদিকতার জন্য, নিজেদের প্রাণ সংশয় করে যারা সংবাদ জোগাড় করতে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যায় হামেশা - সেই সব সংবাদমাধ্যমকে? নাকি ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোকে, যারা স্টুডিওয় বসে, ভিডিও গেমের ফুটেজ, পুরোনো ছবি, কুৎসিত গ্রাফিক্স সাজিয়ে বোমায় মৃতের সংখ্যা ২০০-২৫০-৩০০ বলে হাঁকাচ্ছে? আমি দেশদ্রোহী হতে চাই না তাই ভারতের সংবাদমাধ্যমকেই বিশ্বাস করলাম। বিশ্বাস করতেই হবে কারণ বিশ্বাস না করলে মেনে নিতে হয় যে ৪৪ জন সিআরপিএফ জওয়ান, দুজন পাইলটের বদলায় আমরা শুধু কিছু গাছ মেরেছি।

আজকে দেখলাম অনেকে ইমরান খানের প্রশংসায় গদগদ কারণ সে বলছে যে শান্তি চাই, বায়ুসেনার পাইলট অভিনন্দনকে বিনা শর্তে মুক্তি দিয়েছে সে। তাদের বলবো যে ৪৪ জন সিআরপিএফ জওয়ান, দুজন বায়ুসেনা পাইলট - এই সংখ্যাগুলো ভুলবেন না । ৪৬ জনের কফিনের সামনে দাঁড়ালে ইমরান খান কত শান্তির বাণী শোনাতেন তা আমার জানা আছে। প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেললে সহজেই মহান সাজা যায়। 

আমাদের এই ব্যর্থতা জন্য কিন্তু বায়ুসেনা একেবারেই দায়ী নয়। অন্ধকারে ৫ হাজার ফিট ওপর থেকে বোঝা সম্ভব নয় কোনটা জঙ্গি ঘাঁটি কোনটা নয়। বায়ুসেনাকে টার্গেট দিয়েছিল আমাদের গোয়েন্দারা, তারা সেই মত দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে বোমা ফেলে এসেছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে এই গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বে অজিত দোভাল নামের এক অপদার্থ। ভুলে গেলে চলবে না যে এই অজিত দোভাল গোয়েন্দা বিভাগের সব স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দিয়ে মোদি নামক এক চূড়ান্ত অপদর্থের পায়ে তাকে সপে দিয়েছে, যাতে করে দেশের নিরাপত্তা, তার সামরিক নীতি - সবকিছু থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে পারে বিজেপি।

মোদির মত অপদার্থ সত্যিই খুব কম হয়। সারা মিডিয়া কিনে নেওয়ার পরও নিজের অপদর্থতা লুকোতে পারছে না। ভারত পাকিস্তানের সাথে খোলাখুলি যুদ্ধে যেতে পারবে না এটা অর্ণব গোস্বামীও জানে আর ভারতের পক্ষে জেহাদী জঙ্গি দিয়ে পাকিস্তানের সাথে ছায়াযুদ্ধ করাও সম্ভব না। উপায় একটাই - কূটনৈতিক চাপ। ভারত সোজাসুজি দাবি করতে পারতো মাসুদ আজহারকে ইন্টারপোলের হাতে যতক্ষণ না তুলে দিচ্ছে পাকিস্তান ততক্ষণ কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে না। সারা বিশ্বে পাকিস্তানকে শুধু মাসুদ আজহারের ইস্যুতেই একলা করে দেওয়া যেত, সমস্ত রাষ্ট্রকে দিয়েই চাপ দেওয়ানো যেত যাতে মাসুদ আজহারকে ইন্টারপোলের হাতে তুলে দেয়। সেটা করতে গেলেই ইমরান খানের বিচি শুকিয়ে যেত কারণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে বহু মাসুদ আজহারের ভক্ত রয়েছে। কিন্তু সেই কূটনৈতিক লড়াই মোদি সেদিনই হেরে গেছে যেদিন পাকিস্তানকে বিপুল সাহায্য ঘোষণার পরদিনই সৌদি রাজপুত্রকে এয়ারপোর্টে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে। 

তাই আজ এই বিরাট ব্যর্থতা ও অসহায়তার মাঝে, ভারতীয় মিডিয়ার পাঁচতারা জঙ্গি ঘাঁটিতে ২০০-৩০০ জঙ্গির লাশ গোনা ছাড়া আর কিছুই করার নেই আমাদের। অবস্থা এতটাই করুন যে সেনাবাহিনীর তিন প্রধানকে বিবৃতি দিতে হচ্ছে প্রকাশ্যে, যাতে সেনাবাহিনীর মনোবল না নষ্ট হয়ে যায়।  এই ব্যর্থ সরকারকে ছুঁড়ে না ফেললে আরো বেইজ্জত হবে দেশ।

বৃহস্পতিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯

নেশান ওয়ান্টস টু নো ~ অভিজিৎ মজুমদার

সন্মুখে সম্ভাব্য মৃত্যুসমুদ্র দেখিয়া অর্জুন কম্পিতকন্ঠে কহিলেন, "হে কেশব। আমার হস্ত শিথিল হচ্ছে, আমি গান্ডীব ধরে রাখতে পারছি না। আমার শরীরে কম্পন অনুভব হচ্ছে, সর্বাঙ্গে স্বেদনি:সরণ হচ্ছে। এ যুদ্ধ আমার পক্ষে সম্ভব নয়, মধুসূদন। তুমি আমায় পথ দেখাও।" 

অর্জুনের বিচলিত অবস্থা দেখিয়া বাসুদেব স্থিরকন্ঠে কহিলেন, "হে সখা, শান্ত হও। তোমার মত স্থিতধী পুরুষের এমন নার্ভাস ব্রেকডাউন সাজে না। যদি তুমি এই যুদ্ধে জয়লাভ কর তবে সসাগরা ধরিত্রীর অধীশ্বর হবে। আর যদি বীরগতি লাভ কর, তবে লোকে তোমার ছবি নিয়ে ভোট চাইবে। অতএব আত্মসংবরণ কর।"

অর্জুন কৃষ্ণর কথায় বিশেষ আশ্বস্ত হইলেন না। সংশয়াচ্ছন্ন কন্ঠে বলিলেন, "নিজের মৃত্যু নিয়ে শঙ্কিত নই গিরিধর। কিন্তু দুরাত্মা দুর্যোধনকে শাস্তি দিতে গিয়ে এই অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের প্রাণ নেওয়া কি জাস্টিফায়েড? শান্তি কি যুদ্ধ অপেক্ষা অধিক কাঙ্খিত নয়?"

কৃষ্ণ কহিলেন, "চুপ, চুপ। মিত্র, এমন বাক্য মুখেও এনো না। লোকে শুনলে তোমায় তো দেশদ্রোহী বলবেই, তোমার সাথে সাথে আমাকেও আরবান নক্সাল বলে দাগিয়ে দেবে। নাও, মুখ খোলো, দু-দাগ রাস টক্স খেয়ে নাও। নার্ভ চাঙ্গা হবে। এবার ভালো করে শোনো। আমি তোমায় যুদ্ধের অবশ্যম্ভাব্যতা নিয়ে কিছু উপদেশ দেব। এই উপদেশ মানুষ যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন যুদ্ধকে জাস্টিফাই করতে ব্যবহার করবে। ইয়দা ইয়দা ভোট উপস্থিত হবে, তখন তখন এর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হবে।"

এতৎ বলিয়া শ্রীকৃষ্ণ তাঁহার দুইহাত প্রসার করিয়া এক অপূর্ব মায়াজাল সৃষ্টি করিলেন। চতুর্দিক এক সুগন্ধী ধূম্রে আচ্ছন্ন হইল। সেই ধূম্রজালের ভিতর হইতে শোনা গেল এক জলদগম্ভীর স্বর, "ইফ ইউ আর নট ইন ফেভার অফ ওয়ার, ইউ আর উইথ দেম। ইফ ইউ আর ইভেন্ থিংকিং অফ পীস, ইউ আর উইদ দেম। নাও টেল মি, আর ইউ উইদ দেম? টেল মি,টেল মি। নেশন ওয়ান্টস টু নো.."

অর্জুন সেই মোহক কন্ঠের জাদুকরীতে অভিভূত হইয়া পুনর্বার গান্ডীব ধারণ করিলেন। ভীমসেন কৃষ্ণের দিকে তাকাইয়া চক্ষু মারিলেন। বাসুদেব স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে স্মিত হাসিয়া আপনার সারথিকার্যে মনোনিবেশ করিলেন। 

বাকি গল্পটা তো আপনারা জানেনই।

বুধবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯

যুদ্ধ ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

যুদ্ধ
রূদ্ধ
দুনিয়া
শুদ্ধ

লন্ড
ভন্ড
পাগলা
ষন্ড

বুদ্ধি
শুদ্ধি
গুলিয়ে
রদ্দি

রক্ত
ভক্ত
বোঝানো
শক্ত

কষ্ট
নষ্ট
বিরোধ
স্পষ্ট

যুদ্ধ
রুদ্ধ
শুদ্ধ
চিন্তা
 
রুদ্ধ
যুদ্ধ
মুক্ত
চিন্তা

মুনাফা কার? ~ আর্কাদি গাইদার

ইংরেজিতে একটা শব্দবন্ধ রয়েছে -a gift that keeps on giving. একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের শাসকরা এরকম একটা উপহার আবিষ্কার করেছে - low scale conflict বা ক্ষুদ্র আকারের সংঘাত।এ যেন সোনার ডিম দেওয়া হাঁস, হাঁসটাকে যতদিন বাঁচিয়ে রাখা যায়,ততদিন সোনার ডিম দেবে।ইজরায়েলের প্যালেস্তাইন, রাশিয়ার চেচনিয়া,আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য,ভারতের কাশ্মীর,এই সংঘাতগুলো দীর্ঘকালীন সময় ধরে চলছে,তার প্রধান কারণ এটাই যে এই সংঘাতগুলো মিটিয়ে ফেলায় মুনাফা নেই।

মুনাফা।একশো বছরেরও বেশি সময় আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে রাশিয়ার লেনিন নামে একজন লোক একটা তিন প্যারাগ্রাফের নোট লিখেছিলেন।নাম ছিলো 'কার লাভ' (who stands to gain)?নোটে বলা ছিলো যে,যে কোন ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে গেলে সেই ঘটনার সরাসরি অংশগ্রহণকারী কারা,কারা তার স্বপক্ষে বা বিপক্ষে গলা ফাটাচ্ছে,কারা প্রতিক্রিয়ার তত্ত্ব এনে জনমানসকে প্রভাবিত করবার চেষ্টা করছে, এই বিষয়গুলোর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে মুনাফা কার? তাই কাশ্মীরের সংঘাতের পেছনে কারণ খুঁজতে একশোটা বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে, হাজারটা তর্কে অংশগ্রহণ করা যেতে পারে, কিন্তু এর সমাধান খুঁজতে গেলে অন্যতম যে প্রশ্নটাকে এড়ানো চলবে না, তা হলো - মুনাফা কার? ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠীর মাথাদের, যারা এই কাশ্মীরের মতন উপদ্রুত অঞ্চলের বাসিন্দাদের ক্ষোভকে মূলধন করে তাদের মধ্যে থেকে নিজেদের সংগঠনের সদস্যদের সাপ্লাই লাইনের যোগানের ব্যবস্থা করে?পাকিস্তান এবং ভারতের শাসকগোষ্ঠীর,যারা নিজেদের দেশের যে কোন সমস্যার থেকে নাগরিকদের নজর ফেরাতে কাশ্মীর এবং বর্ডারের সংঘাতকে ব্যবহার করে? আমাদের দেশের হিন্দু মৌলবাদীদের, যারা কাশ্মীর (মুসলমান সন্ত্রাসবাদী) এবং পাকিস্তান (মুসলমানদের দেশ) এর ইস্যুকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনীতির দিকে ঝোল টানতে? চীন, যার কাশ্মীর এবং বর্ডার অঞ্চলে বিশাল বিনিনিয়োগ রয়েছে পরিকাঠামোর স্তরে, ব্যবসা এবং সামরিক ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করতে?

না। প্রধান মুনাফা এদের না।এরা তো স্রেফ একটি সংঘাতের আনুষাঙ্গিক সুবিধে উপভোগ করে।আসল মুনাফা তাদেরই, যাদের নিয়ে সেই ১৯১৩তেও লেনিন তাঁর প্রবন্ধ লিখেছিলেন।অস্ত্র ব্যবসায়ীদের।বিশ্বে এই মুহুর্তে সামরিক খাতে খরচা হলো ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার।সর্ববৃহৎ অস্ত্র রপ্তানি করা দেশ কে? আমেরিকা।

আর সর্ববৃহৎ অস্ত্র আমদানি করা দেশ? ভারত।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের মধ্যে 'মোস্ট হেভিলি মিলিটারাইজড জোন' কাশ্মীরের সংঘাত যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন মুনাফা করবে এই ব্যবসায়ীরা।মুনাফা করবে রাফায়েল বিমান বেচে, বোফর্স বেচে। দুদিকের লোককেই অস্ত্র বেচবে তারা। ডিজিটাল যুগে অস্ত্র মানে শুধু গোলা বারুদ বন্দুক না, সাইবারসিকিউরিটি এই সামরিক শিল্পের এখন এক অন্যতম অংশ।তাহলে শান্তিচুক্তি করে,গোল টেবিল বৈঠক করে, বা উলটো দিকে নির্ণায়ক যুদ্ধ করে এই সমস্যা মিটিয়ে ফেলা তো ব্যবসায়ীদের পক্ষে ক্ষতিকর।ওষুধ কোম্পানিগুলোর মতনই, অস্ত্র কোম্পানিরাও জানে, সুস্থ বা মৃত মানুষে মুনাফা নেই। মুনাফা আছে খালি অসুস্থ মানুষে।

তাহলে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায়, যে কাশ্মীর নিয়ে ভারতের বা পাকিস্তানের আসলে যে বিদেশনীতি, বা সামরিক নীতি, তা আদতে ভারত বা পাকিস্তান নামক জাতিরাষ্ট্রের নীতিই না।তা হলো ব্যবসায়ীদের কর্পোরেট নীতি, সেই নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আমেরিকা আছে, চীন আছে, ইজরায়েল আছে, বা বলা ভালো এই দেশগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ আছে। স্বাধীন বিদেশনীতি আসলে সোনার হরিণ, ওটা নাগরিকদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে, জাতিরাষ্ট্রের নীতি আসলে কর্পোরেটদের মুনাফার নীতি। প্রায় দশ বছর আগে ইংরেজি সংবাদপত্র গার্জেনে একটি লেখা বেরিয়েছিলো, যে নেশন স্টেটের এক্সপেরিমেন্ট শেষের পথে, নেশন স্টেটের শবদেহের ওপর কর্পোরেট স্টেটের নির্মাণ চলছে। যদিও শবদেহটাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়নি বা কবর দেওয়া হয়নি, নাগরিকদের বোকা বানাতে ওইটূকু রাখতেই হবে।

আমরা যারা নিজেদের যুক্তিবাদী, প্রগতিবাদী এবং গণতান্ত্রিক স্রোতের অংশ মনে করি, তাদেরকেও এই ভারত, পাকিস্তান, চীন, আজাদ কাশ্মীরের গোলকধাঁধার মধ্যে থেকে নিজেদের আখ্যানকে বার করে আনতে হবে, তৈরি করতে হবে সঠিক আখ্যান, বারবার বলতে হবে মুনাফাবাজদের কথা, যেই মুনাফাবাজদের ব্যালেন্স সীট মেলাতে পুলওয়ামাতে মরতে হয় ৪৪ জন দরিদ্র পরিবারের জওয়ানকে, বা গত ২০ বছর ধরে শয়ে শয়ে ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের, গুলি খেতে হয় কাশ্মীরের বাসিন্দাদের, বারবার চিহ্ণিত করতে হবে সেই গোষ্ঠীকে যাদের মুনাফা বাড়াতে অস্ত্র কেনা হয় আমাদের পয়সা দিয়ে। মোদী, যুবরাজ সালমান, দোভাল, ইমরান খান, এরা আদতে গ্লোরিফায়েড ব্রোকার।এদের মালিক আম্বানি, লকহিড মার্টিন, বোয়েইং, আমেরিকা, ইজরায়েল, ফ্রান্স - সেই চক্রটা যাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স বলেছিলো। এই চক্রকে চিহ্নিত করা প্রথম কাজ - নাহলে এদের মুনাফার স্বার্থে এরকম আরও অনেক পুলওয়ামা হবে, আর আমরাও মেকি জাত্যাভিমান আর দেশপ্রেমের আখ্যানে ভেসে গিয়ে ধ্বংস হবো।

বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯

চুমুৎকার রিভিজিট ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

চুমু খায় রাজা রানী, সেনাপতি সৈন্য
জ্যাঠা বলে এতো স্রেফ চিন্তার দৈন্য;
বিপ্লবী চুমু খায় , অবিচল লক্ষ্যে
একে তাকে টেনে নেয় ভালোবেসে বক্ষে;
বিজ্ঞানী চুমু খায় সুদে ভগ্নাংশে
কিছু চুমু নিষিদ্ধ খানদানি বংশে!
চুমু খেলে শিক্ষক, গার্জেন ক্রুদ্ধ
বিক্ষোভ অবরোধ সারা দেশ শুদ্ধ;
গবেষক চুমু খায় পেপারে কি থিসিসে
সাল্মান বলে হাম কম নেহি কিসি সে;
গায়কের কিবা দোষ চুমু দিলে ভক্ত
চুন বালি সিমেন্টে প্রেম পাকাপোক্ত;
চুমু খায় প্রমোটার ক্যাডার কি আমলা
নমো বলে রাগা তুই মহাজোট সামলা!
পুটিনেও চুমু খায়, চুমু খায় ট্রাম্পে
লঙ্কায় গিয়ে কেউ জেতে হাইজাম্পে;
কবিগন চুমু খায় বসন্তে ফাগুনে
প্রকাশক সুখে থাকে পোকা কাটা বেগুনে;
চুমু খায় মন্ত্রীরা ছোট বড় নেতারা
সুরে গানে চুমু খায় করতাল দোতারা;
চুমু খায় ব্যবসায়ী গোয়ালা কি বেকারে
পুস্তকে লেখা থাকে চুমু শত প্রকারে;
রাশিয়ান চুমু নাকি ফিকে লাল উদাসী
চুমু নাকি কিস হয় আজ যারা প্রবাসী;
ধার্মিক চুমু খায় চুপিচুপি গোপনে
মাধবীকে চুমু খেল তপাদার স্বপনে;
চুমু নাকি নিষিদ্ধ লেখা আছে শাস্ত্রে
বুমেরাং হবে দেখ নিজেদের অস্ত্রে!
ব্যস্ততা সারাদিন মৌলবি পুরুতে
কেউ থাকে আড়ষ্ট চুম্বন শুরুতে;
গুণধর চুম্বনে মহা পারদর্শী
থাকে কেউ ধান্দায় হাতে ছিপ বড়শি;
চুম্বন অশ্লীল সেন্সর বিধানে?
কি যে আছে কার মনে জনগন কি জানে!
চুমু খায় চাঁদ মামা টিপ দেয় কপালে
দু কলম লিখে দেব শুধুশুধু খ্যাপালে।।

শুক্রবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯

সিবিয়াই ~ অমিতাভ প্রামাণিক

রোব্বারের সন্ধে। অমিতভাইকে টা টা করে দিয়ে মোদিজি 'মদীয়' বাসভবনে খাড়ি-শক্কর কি চায় আর দুটো ফাফরা নিয়ে সোফায় বসে টিভিতে আস্থা চ্যানেলে অনুকূল ঠাকুরের 'জয় রাধে রাধে কিষ্ণো কিষ্ণো গোবিন্দ গোবিন্দ বলো রে' দেখছিলেন। অমিতভাই চালু মাল, প্রিয়াঙ্কা ফিল্ডে নামতেই ওর বরের পেছনে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেট লেলিয়ে দিয়েছেন। পাঁচ-পাঁচটা বছর গেল, এতদিন রবার্ট ভদ্র রবারের মত নমনীয় ভদ্র বালক ছিল। তার আগে, মানে আগের ইলেকশনের আগে অবশ্য সে ছিল এক নম্বর ইস্যু। কং পার্টির স্ক্যামস্টারদের পাশাপাশি তার নামও রোজ খবরের প্রথম পাতায় আর যাবতীয় প্রি-ইলেকশন জনসভায় শোনা যেত। ইলেকশনে জিতে যেতেই সব ধামাচাপা। আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে, এখন আবার রবার্টকে নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া হবে। রবার্টের তুলসীপাতা কতটা ধোয়া, সেই জানে। জনগণের টাকা কেউ চুষে নেয় বছর বছর। জনগণ কাগজে দ্যাখে, তার পেছনে আছে অমুক। কেউ অবশ্য জেলে যায় না। জনগণের টাকা চক্কর কাটে খবরের কাগজে আর ইলেকশনের র‍্যালিতে। 

অনুকূল ঠাকুরের বংশধর শ্রীশ্রীবড়দা ভুঁড়ি পেতে বসে পৈতেটা ধরে হাওড়া-শিয়ালদা করতে করতে টিভির পর্দা জুড়ে বিরাজ করছেন। পেছনে 'জয় রাধে রাধে' গান বাজছে। সেদিকে তাকিয়ে মোদিজি ফোঁস করে এক বড় নিঃশ্বাস ফেললেন। রামদেব তো তাও ভুঁড়িতে ঢেউ খেলাতে পারেন, ইনি স্রেফ ঐ ওঁচা একটা গান গেয়েই এ রকম একটা বিজনেস বানিয়ে ফেললেন! হেড অফিস দেওঘর। বাঙালি নাকি বিজনেস বোঝে না! বোঝে, বোঝে। তাঁর নিজের যে চায়ের বিজনেস ছিল, চা-টা আসত কোথা থেকে? ঐ বাংলা-আসাম দেশেরই তো চা। এখন অবশ্য বাংলায় চায়ের চেয়ে চপটাই বেশি চলছে বিজনেসের জন্যে। মোদিজি চপ জিনিসটা তেমন খাননি। কেমন খেতে, ঢোকলা-ফাফরার চেয়ে ভাল কি? বাংলার দিদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে। দিদি তো মোদি বলতে অজ্ঞান। জনসভা হলেই মোদি-মোদি করে কানের পোকা বের করে দেন।

ভাবতে ভাবতেই ফোন। দিদিরই ফোন। 

- কেয়া করতা হ্যায় মোদিজি? বসে বসে ছাস পি রাহা হ্যায়? এদিকে বিগেড মে ক্যা হুয়া আপকো পাতা হ্যায়? বামফন্ট নে বিগেড পুরা ভর দিয়া। ম্যায় ডিম্ভাত দেকে যো নেহি কর পায়া ও রুটি তরকারি সে কর লিয়া। 

- তো আপকা ক্যা, দিদিইইই? আপ তো মেলে মে মোদি মোদি করকে মেরা দিমাগ চাটোগি। আব দেখো কিৎনা প্যাডি মে কিৎনা রাইস। 

- ও সব বাৎ ছোড়ো মোদিজি। বাদ মে দিখা যায়েগা। অব বাতাও হাম ক্যা করেঙ্গে? হাম এ বামফন্টকো সহ্য নেহি কর সকতা হ্যায়। কোই হেমবম বোলকে এক মহিলা ডায়লগ মারকে গিয়া, উসকো বহুৎ হাততালি মিলা। এ হামদম মুঝে বরদাস্ত নেহি হোগা। কুছ উপায় বাতাইয়ে। 

- ম্যায় ক্যা উপায় বাতায়ুঙ্গা দিদিইই? উপায় তো আপকো মালুম হ্যায়। আপ তো ইলেকশন ভি ঠিক তরে সে হোনে নেহি দেতে হ্যায়। 

- উফ, ফির ইলেকশন ইলেকশন করকে মুঝে সাতাও মৎ। কুছ বোলো।

- ক্যা বোলুঁ দিদিইইই?

- অ্যায়সা কুছ বোলো, যাতে এ বিগেড কা নিউজ লোগো তক না পৌঁছায়। কাল পেপারমে ও নেহি আনা চাহিয়ে। আপ কুছ করো না। আপকা হাত মে তো সিবিয়াই হ্যায়। 

- সিবিয়াই হ্যায় তো ক্যা? বামফ্রন্ট মে স্ক্যাম হ্যায় কিধর? লোগ হি নেহি হ্যায় তো স্ক্যাম। বঙ্গাল মে স্ক্যাম কা পুরা ফিল্ড তো আপ কা হাথ মে। বামফ্রন্ট কা কিসকা পিছে সিবিয়াই ডালুঁ, দিদিইইই?

- আরে ধুর, উসকা নেহি, মেরে পিছে ডাল দো। ম্যায় দেখ লুঙ্গি ক্যা কর সাকতা হুঁ। ডামা হোগা রাতভর। সুবে লোগ বিগেড ভুল যায়গা। পেপারমে ডামা কা খবর ছাপেগা। 

- ক্যা বোল রহী হো, দিদিইইই? আপ ভুবনেশ্বর যানে কে লিয়ে তৈয়ার হ্যায়? ম্যায়নে শুনা হ্যায় কি ও জেল মে টয়লেট আচ্ছা নেহি হ্যায়। ছ্যাৎলা পড় গয়া, ইসি লিয়ে হাওয়াই চটি ভি স্লিপ কাটতা হ্যায়।

- আরে ধুর, ভুবনেশ্বরে আমি মরতে যাব নাকি? আচ্ছা, ঠিক হ্যায়, এ বাৎ ছোড়ো। অব মুঝে ইধারকা লোগ দিদি নেহি, পিসি বোলতা হ্যায়। আপ সিবিয়াই কো বোল দো কলকাত্তা সে পিসিকো উঠানে কে লিয়ে। 

- ফির? 

- ফির বাদ মে দিখা যায়েগা। আব মেরা পাস টাইম নেহি হ্যায়। বুকফেয়ার চল রাহা হ্যায় মেরা অনুপ্পেরণা সে। আপ তো কিতাব-সিতাব পঢ়তে ভি নেহি হো, লিখতে ভি নেহি। মেরা সাত সাত নয়া কিতাব হ্যায়। এ লেকে সাতাশিটা হুয়া। আপ তো খাতা ভি নেহি খুলা, ওদিকে চিল্লাতে হো মেরা নামমে খিল্লি উড়াকে। সাতাশি কিতাব এ জনম মে পঢ়া ভি নেহি হোগা। মেলে মে নয়া সাতকা মোড়ক উন্মোচন হোগা এক এক করকে, গোপাল বৈঠা হ্যায় চেয়ার-টেয়ার মুছকে। বিগেডবালা ভি উধার গিয়া হ্যায়। আভি ভেজো সিবিয়াই। কোলকাতা মে যো অফিসার হ্যায় উস্কোই ভেজ দো। দিল্লি সে লানেকা টাইম নেহি হ্যায়। বোল দো নীল শাট পহনকে ফটাফট যাকে পিসিকো উঠা লো। ফির ম্যায় দেখতা হুঁ, কী করা যায়। ম্যায় যো করেগি, আপ চুপচাপ দেখতে রহেনা, ফট করকে ফোর্স মোর্স নেহি ভেজনা মোদিজি। খুব খারাপ হো যায়েগা।

- এ ক্যা বাৎ হুয়ি দিদিইই। উধার কেজরি হামে ডাঁটতে হ্যায়, ইধার আপ হামে ডাঁটতে হো। ডাঁট খাকে খাকে মেরা তো সারে খানা ডাঁটা য্যায়সা লাগতে হ্যায়। 

- ইসি লিয়ে তো সেম জোক বোল বোলকে ছিবড়ে কর ডালা। মেরা য্যায়সা নয়া নয়া শুনাও। নেক্সট উইক সরস্বতী পূজা হ্যায়। আ যাও বাংলা মে, মা কি পুজো করো তো পেট মে থোড়া বিদ্যা আয়েগা। মন্ত্র বোলুঁ ম্যায় ইয়ে বসন্ত্‌ উৎসব কা? সরসোতি মোয়াভাগে –

- নেহি নেহি, রহনে দিজিয়ে। ম্যায় সিবিয়াই ভেজ রহা হুঁ। সিবিয়াই, সিবিয়াই – 

(পরবর্তী ঘটনা সোমবারের আনন্দবাজারে পড়েছেন নিশ্চয়)

মঙ্গলবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯

আমরা - ওরা ~ সুশোভন পাত্র

'আমরা', 'ওরা' পার্থক্যটা চোখে পড়ছে? রাজ্যে আট বছর ক্ষমতায় নেই বামপন্থীরা। মিডিয়ার ভাষায় বামপন্থীরা 'ফিনিশ'। কেতাদুরস্ত নবান্নের মালকিন বলেছেন, 'সিপিএম খুঁজতে দূরবীন লাগবে'। আম্বানি-আদানির মালাইয়ে কব্জি ডুবিয়ে চর্বি জমানো অমিত শাহ'দের খোয়াবনামা, 'কমিউনিস্ট মুক্ত দেশ গড়বেন'। গত এক দশকে রাজ্যে প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হয়েছেন বামপন্থীরা। সালকু সরেন, অজিত লোহার, পূর্ণিমা ঘড়ুই থেকে শুরু করে, সুদীপ্ত-সইফুদ্দিন হয়ে হালফিলের কাকদ্বীপ -বামপন্থীদের রক্তে প্রতিদিন ভিজেছে বাংলার মাটি। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পার্টি অফিস, জবরদখল গন সংগঠনের হাজারো দপ্তর, ঘরছাড়া অসংখ্য কর্মী-সমর্থক। লেনিনের মূর্তি থেকে জ্যোতি বসুর নামাঙ্কিত ফলক, ভিটে-মাটি থেকে শুরু করে মা-বোনদের ইজ্জত -মদ্যপ লুম্পেন বাহিনীর হাতে রক্ষা পায়নি কিছুই। দলদাস প্রশাসনের কাছে 'আমাদের' ব্রিগেডের জন্য নুন্যতম সহযোগিতা পাওয়া যায়নি, ইউনিয়নের রক্তচক্ষু তে যথেষ্ট গাড়ি জোগাড় করা যায়নি, প্রবল শীতে রাত্রি বাসের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা যায়নি, সকলের মুখে দু-মুঠো খাবার তুলে দেওয়া যায়নি। 
'ওঁদের' ব্রিগেডে 'পাগলু' ড্যান্স'র আকর্ষণ ছিল। আগের রাতে খিচুড়ি মাংসের পাত পড়ে ছিল। মদের বোতলের চুইয়ে পড়া মাদকতা ছিল। সানগ্লাসের আড়ালে ভেঙ্কটেশ ফিল্মের ভাড়া করা টলিউড তারকাদের ভিড় ছিল। মাথায় অক্সিজেনের কমে যাওয়া কেষ্ট-বিষ্টু সংগঠক ছিল। বাঁকুড়ার গরমে ভোটের প্রচারের জন্য নতুন 'সানস ক্রিম' খোঁজা মুনমুন সেনের মত সাংসদ ছিল। সরকারী প্রকল্পে সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন ছিল। হুমকি ছিল, ধমকি ছিল। মঞ্চে ২৪দলের নেতাদের ভজকট ভিড় ছিল। কৌন বানেগা প্রধানমন্ত্রীর  মিউজিক্যাল চেয়ার কম্পিটিশন ছিল। আর 'আমাদের' ব্রিগেডে সরজমিনে মানুষ ছিল। নেতা নয়, নীতি বদলের ডাক ছিল। জান কবুল, মান কবুল লড়াইয়ের শপথ ছিল। আপামর বাংলার মেহনতি মানুষের চোখে স্বপ্ন ছিল। নতুন লড়াই'র রসদ ছিল। 'আমাদের' ব্রিগেডে প্রাণ ছিল।
'আমরা', 'ওরা' পার্থক্যটা চোখে পড়ছে? রাজ্যে ব্যাঙের হাঁচি হলেও সিবিআই তদন্ত চেয়ে তখন পাড়া মাথায় তুলতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টানা বাহাত্তর দিন পুলিশ-প্রশাসনের প্রবেশ নিষিদ্ধ তখন নন্দীগ্রামে। বিরোধী নেতা-সাংসদ'দের মদতে বে-আইনি অস্ত্রের পাহাড় জমছে তখন নন্দীগ্রামে। একদিনে সিপিএম'র ২৫টা পার্টি অফিসে আগুন জ্বলছে তখন নন্দীগ্রামে। নিয়ম করে শঙ্কর সামন্ত'দের লাশ পড়ছে তখন নন্দীগ্রামে। প্রশাসনের ডাকা সাত-সাতটা শান্তি বৈঠকে যোগ দিলো না তৃণমূল। ৯'ই ফেব্রুয়ারি  মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হেড়িয়ার জনসভায় বলেছিলেন "মানুষ না চাইলে ক্যামিকাল হাব হবে না নন্দীগ্রামে। অধিগ্রহণ হবে না এক ইঞ্চি জমিও।" তবুও নন্দীগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে সিপিএম'র 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের' দ্বিতীয়বর্ষ পূর্তির জনসভাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন বলেছিলেনে "নন্দীগ্রামের গণহত্যার সিবিআই তদন্ত চাই।" মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবী মতই সিবিআই তদন্তও হয়েছিল। পেটোয়া আইপিএস দিয়ে তথ্যপ্রমাণ লোপাট করতে হয়নি, পুলিশ পাঠিয়ে তদন্তকারী সিবিআই অফিসারদের গ্রেপ্তার করতে হয়নি, প্রশাসন কে রাস্তায় বসিয়ে মেট্রো চ্যানেলে শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে ধর্নার নামে রকবাজি করতে হয়নি। 
দিদি-মোদীর সেটিং-এ ঝুলিয়ে রেখে নয় বরং ২০১৪'তেই নন্দীগ্রামের ঘটনার চার্জশিট জমা দিয়েছিল সিবিআই। সিপিএম'র 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের' কোন নিদর্শনই খুঁজে পায়নি সিবিআই। তালপাটি খালে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে 'সিপিএম'র হার্মাদ বাহিনীর হাতে পা চিরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া একটাও শিশুরও লাশ খুঁজে পায়নি সিবিআই। গোটা নন্দীগ্রাম ঘুরে একটাও 'স্তন কাটা মহিলা' খুঁজে পায়নি সিবিআই। 
'আমরা', 'ওরা' পার্থক্যটা চোখে পড়ছে? বছর দশ আগে, একটা স্টিং অপারেশনে, নন্দীগ্রামের সিপিআই'র প্রাক্তন বিধায়ক মহম্মদ ইলিয়াসের হাতে প্রায় জোর করেই গুঁজে দেওয়া হয় ১০,০০০ টাকা। বিধানসভায় স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিশ আনেন নারদা ঘুষ কাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত 'পাঁচ লাখি' সৌগত রায়। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সেদিন পদত্যাগ করেন ইলিয়াস। বহিষ্কৃত হন পার্টি থেকেও। মানসিক অবসাদে আজ কোন রকমে বেঁচে আছেন ইলিয়াস। দু-বিঘা জমি বেঁচে চিকিৎসার খরচা চলে। বিধায়কের পেনশন চলে সংসার। পরে অবশ্য সিবিআই জানিয়েছিল ইলিয়াস নির্দোষ। আর ওদের সেই স্টিং অপারেশনর সাজানো সাংবাদিক শঙ্কুদেব পণ্ডা ও নাটের গুরু শুভেন্দু অধিকারী আজ চিট ফান্ডের আর্থিক তছরুপের দায়ে সিবিআই'র খাতায় অভিযুক্ত। জনাব শুভেন্দু বাবু জানলে দুঃখ পাবেন যে গত রোববার ইলিয়াসের ছেলেও এসেছিলেন ঐ ইনকিলাবি ব্রিগেডে।   
মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ৫কোটি টাকা দিয়ে সতেরোটা কমিশন গড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।সিপিএম'র নেতাদের পিণ্ডি তর্পণের দিবাস্বপ্নে বিগলিত বুদ্ধিজীবীরা কমিশন'কেই দরাজ সার্টিফিকেট বিলিয়ে বলেছিলেন "এহি হ্যা রাইট চয়েস বেবি।" কিন্তু শত চেষ্টা করেও আজ পর্যন্ত জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তো দূরের কথা, একজন বামপন্থী নেতারও কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেননি দিদিমণি। ৩৪ বছরের একটা দুর্নীতিও প্রমাণ করতে পারেননি দিদিমণি। আর আজ কান টানলে  মাথা আসার সূত্রে নিজেই পথে বসেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শাগরেদ আমলার কেঁচো খুড়তে কেউটে বেরিয়ে যাবার ভয়ে সিঁটকে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী। লজ্জার মাথা খেয়ে নৈতিক জয়ের গল্প ফাঁদছেন মুখ্যমন্ত্রী। কথায় আছে, চোরের মায়ের বড় গলা। 
আর আমাদের মা ছিতামনি সরেন। যে ছিতামনি সন্তান কে শহীদ হতে দেখেও লাল ঝাণ্ডার রাজনীতি করেন। প্রবল অসুখ নিয়েও ব্রিগেড আসার জন্য শিশু সুলভ ঝোঁক ধরেন। বয়সের ভারে ন্যুজ হয়েও দেওয়াল জুড়ে কাস্তে-হাতুড়ি আঁকেন। এরকম অসংখ্য ছিতামনি-দেবলীনা-ইলিয়াসদের ঠিকানা এই লাল ঝাণ্ডা। যারা পেটে গামছা বেঁধে নিঃস্বার্থে রাজনীতি করেন। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পার্টির ডাইরেক্টিভস অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন। যাদের কোনদিন কোনও স্টিং হয়নি। একটা ঘন্টাখানেক হয়নি। মিডিয়া ফুটেজ দেয়নি। এনারাই স্বচ্ছ রাজনীতির মুখ। আমাদের আদর্শ। আমাদের ভরসা। আমাদের নেতা। আর যে রাজনীতি, যে রাজনৈতিক দল ঘুষখোর ক্ষমতা লোভীদের দল চালানোর দায়িত্ব দেয়, দুর্নীতিবাজ'দের নেতা-মন্ত্রী বানিয়ে মাথায় তুলে নাচে, ফাঁদে পড়লে আঁচল দিয়ে আগলে রাখেন তাঁদের আমরা ঘেন্না করি। আমাদের গর্ব, আমাদের সাধ্যমত, আমরা সেই রাজনীতির বিরুদ্ধেই লড়াই করি।

দিদির Ten son ~ অনির্বান মাইতি

দিদির আমার দশটি ছেলে
করছিল দেশ জয়
একটি গেল হসপিটালে (মদন)
রইল বাকি নয়।

এখন দিদির নয়টি ছেলে
পেরোয় না চৌকাঠ
একটি খেলো CBI এ (রজত)
রইল বাকি আট।

আটটি ছেলে ভীষন রকম
করছিল উৎপাত
একটি হল বহিষ্কৃত (আরাবুল)
রইল বাকি সাত

সাত জনাতে হাপুসনয়ন
বুকের ভিতর ভয় 
একটি খেলো ঘুমের বড়ি (কুনাল)
রইল বাকি ছয়।

শেষ ছয়টির একটি ছেলে
আগাম না পেয়ে আঁচ
হঠাৎ করে অ্যারেস্ট হল (টুম্পাই)
রইল বাকি পাঁচ।

আজকে দিদির পাঁচটি ছেলের 
একটি পগার পার
নবান্নে আর বসবে না কাক (শুভাপ্রসন্ন)
রইল বাকি চার।

দিদি আমার কাঁদল আবার 
খোদার দয়া নাই 
হাসপাতালের বাছা আমার (মদন রিভিজিটেড) 
ধরল সিবিআই।

শেষকালে এই চারটে ছেলের 
ভয়েই কাটে দিন
একটি পেল ইডির নোটিস (শঙ্কুদেব)
রইল বাকি তিন 

বাদবাকি ওই তিন ছেলেরও 
কপাল হল ফুটো 
একটি গেলো পাল্টি খেয়ে (মুকুল)
আর তো বাকি দুটো :(  

আর বাকি দুই, খোদায় মালুম
বিশ্ব বোকাহাঁদা
গোলাপ কাঁটায় পাল ও গেল (তাপস)
রইল পালের গোদা।

শেষ ছেলেটি আগলে রেখে (রাজীব)
যেমন নয়নমনি
মেট্রো চ্যানেল অবস্থানে
গুমড়ে কাঁদেন উনি

.......

সোমবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯

তলব ~ আর্যতীর্থ

।তলব।

কে কাকে তলব করে বুঝে লাভ নেই 
আমরা তো শুয়ে আছি মাটি জাপটেই।
একে ধরে ওকে ধরে তাকে করে জেরা
সিরিয়াল হেন শুধু বাড়ে গল্পেরা।
পরোয়ানা নিয়ে চলে এত হইচই,
কেউ জানে গরীবের টাকা গেলো কই?
ফেরত পাবে না জানি, পায়না এ দেশে
তারিখ পে তারিখরা অনন্তে মেশে
 তদন্ত চালু থাকে ঠিক ইতিউতি,
কোন কোন গায়ে লেপা ঘুষের বিভূতি,
সে কথা নানান মুনি বলে নানামতে,
প্রলেপ পড়ে না তবু অভাবের ক্ষতে।
গিয়েছে কাদের টাকা , হারিয়েছে ভিড়ে,
যে আঁধারে কাল ছিলো আজও সে তিমিরে,
কেউ মরে গেছে ঝুলে, কেউ ফলিডলে,
 রাজনীতি সব ভুলে দাবা খেলে চলে..

কে কাকে তলব করে বয়ে গেছে ভারী
তুমি,আমি এলেবেলে আদার ব্যাপারী।

আর্যতীর্থ