শুক্রবার, ১৩ জুলাই, ২০১৮

কিসান সভার সংসদ অভিযান ~ আর্কাদি গাইদার

রাজস্থান আর মহারাষ্ট্রের পর এবার একেবারে দিল্লির সদর দপ্তরে হানা। 
যারা আমাদের দৈনন্দিন খাবার জোগায়, তারা কেন অভুক্ত থেকে অপুষ্টিতে মরবে বা আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে, সেই প্রশ্ন নিয়ে সংসদ অভিযান।

আমরাও পায়ে পা মেলাতে পারি না ওনাদের সাথে?

এক প্যাকেট সিগারেট
এক প্লেট চাউমিন
হাফ প্লেট বিরিয়ানী
সিসিডির একটা ক্যাপুচিনো
একটা সিনেমার টিকিট
এক পিঠের ট্যাক্সিভাড়া
একটা গল্পের বই
একটা ক্যাডবেরি বোর্নভিল
রবিবারের হাফ কেজি খাঁসির মাংস

ওপরের লিস্টের এই শখ শৌখিনতার মধ্যে যে কোন একটার একবারের যা দাম, সেইটুকু অর্থ দিয়ে আসুন আমরা অন্নদাতাদের পাশে দাড়াই।


সোমবার, ৯ জুলাই, ২০১৮

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাধিকার ~ আর্কাদি গাইদার

৮বির মোড়ে যে সিগারেটের দোকান আছে, সেখানকার সিগারেট বিক্রেতা একবার আমায় বুঝিয়েছিলেন যে সিগারেট বিক্রি করাটাও আসলে একধরনের স্কিলড লেবার। যেটা অধিকাংশ লোকই পারে না।
'এই যেমন আপনি লুজ সিগারেট নেবেন। দোকানদার কি করবে? প্যাকেটের থেকে একটা সিগারেট দু আঙুল দিয়ে টেনে বার করে আপনাকে দেবে। প্যাকেটের ওপরের দিকে থাকে সিগারেটের ফিল্টারের দিকটা। ওই জায়গাটায় আঙুল দিয়ে ধরে বার করবে। আর সেটাই আপনি মুখে দেবেন। ওই ফিল্টারটা তো নোংরা হয়ে গেলো। আসল কায়দাটা কেউ জানেই না। প্যাকেটের এক সাইড হাতের চেটোয় হাল্কা করে মারতে হয়। তখন কয়েকটা সিগারেট লুজ হয়ে একটু বেরিয়ে আসবে। তখন সিগারেটের শরীরটা আলতো করে ধরে টেনে বার করে দিতে হবে। ফিল্টারে আঙুল লাগানো চলবে না।'
প্রচ্ছন্ন আত্মতুষ্টি নিয়ে বলেছিলেন তিনি।

যারা সিগারেট কেনে তারা কি এত ভাবে? আদৌ জানে যে লুজ সিগারেট বিক্রি করতে গেলে প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করবারও আলাদা কায়দা থাকে? জানবার প্রয়োজন আছে কি? কিন্তু তবুও এই দোকানদারের কাছে এই কায়দাটা প্রয়োজনীয়। নিজের জন্যে। তাকে কেউ জোর করে না। সে নিজে তাড়িত হয়ে করছে। নিজেই নিজেকে বাধ্য করছে। Watchmen গ্রাফিক নভেলে Rorschach যেমন বলেছিলো - We do not do it because it is expected, or allowed. We do it because we are compelled.'

যেমন তাড়িত হয়ে অনশনে বসেছে যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা। এডমিশন প্রক্রিয়া পালটালে কিন্তু তাদের ব্যাক্তিগতভাবে কিছু আসবে যাবে না। তাদের তো এডমিশন হয়েই গেছে। তবুও তারা না খেয়ে বসে আছে। কেন? কারন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকারের প্রশ্ন এবং ভর্তি প্রক্রিয়াকে তারা আপন মনে করতে তাড়িত হয়েছে।

আচ্ছা ঠিক কতটা তাড়না থাকলে ৬৬ ঘন্টারও বেশি না খেয়ে থাকা যায়? এর জন্যে কোনটা বেশি লাগে - পেটের জোর না শিরদাঁড়ার জোর? দেখেছি সুস্থ শরীরে একবেলা না খেলেই গা গোলায়। আচ্ছা তার থেকেও বেশি কি গা গোলায় না যখন একদা লোকসভার এবং রাজ্যসভার সাংসদ বলেন যে সরকার আর পদ যাওয়ার পরেই তিনি বিশেষ রাজনীতিতে আস্থা হারিয়েছেন এবং তাই তিনি আপাতত জিমন্যাস্টিক্সের খেলা দেখিয়ে এদিক ওদিক লাফালাফি করছেন? আচ্ছা জিমন্যাস্টিক্সের খেলা আর ডুগডুগির বাজনার সাথে বাদর নাচবার মধ্যে গুণগত ফারাক কি?

মইনুল হাসান, ঋতব্রতরা চকচকে তারা। তাদের দিকে সোমশ্রীরা তাকিয়ে থাকে, তাদের জন্যে পতাকা লাগায়, লোক জড়ো করে। তারা এসে গরম গরম কথা বলে। এরপর তারা হঠাত একদিন তাড়না বোধ করে তৃণমুলে চলে যাওয়ার। আর সোমশ্রীরা তাড়িত হয় ৪০ ঘন্টা অনশন করে অসুস্থ হাসপাতালে চলে যাওয়ার।

প্যাকেট একটাই। কোন সিগারেটটা কিরকমভাবে বেছে বার করা হবে, সেটাই আসল। কতজনই বা তফাত বোঝে। তাও, পার্থক্যটা রয়েই যায়। আর কেউ না জানুক, ওই সিগারেট বিক্রেতা তো জানে।

সোভিয়েত ~ অর্ক ভাদুরী


আমাদের ছোটবেলা জুড়ে ছিল দু'টি অলৌকিক প্লেন, যারা ঠোঁটে মৃত্যুপরোয়ানা ঝুলিয়ে উড়ে গিয়েছিল ওয়র্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দিকে। ঘুমভাঙা কৈশোরে আমরা দেখেছিলাম অতিকায় বাড়ির পেট থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে ধোঁয়া, মৃত্যু আর আগুন। তারপরই শুরু হয়েছিল যুদ্ধ। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ডিনারটেবিলে বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে আমরা দেখতাম জলপাই পোশাক আর ট্যাঙ্ক। দেখতাম, আফগানিস্তান গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, তালিবান গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, আমেরিকা আর আমেরিকার বন্ধু নর্দান অ্যালায়েন্স জিতছে। শুনতাম মোল্লা ওমর নাকি মারা গিয়েছেন। লাদেনকে পাওয়া যাচ্ছে না। আরেকটু বড় হওয়ার পর দেখলাম মাটির নীচ থেকে টেনে বের করা হচ্ছে সাদ্দাম হুসেনকে, লোকটার একমুখ দাড়ি। আমরা দেখলাম দেশে দেশে যুদ্ধের বিরুদ্ধে মিছিল করছে মানুষ। কাগজে পড়লাম সেই মিছিল চিৎকার করছে— ওয়ান টু থ্রি ফোর, স্টপ ইয়োর স্টুপিড ওয়র!

আমরা সোভিয়েত দেখিনি, পূর্ব ইউরোপ দেখিনি। তেভাগা, তেলেঙ্গানা, নকশালবাড়ি, আইপিটিএ, দেশভাগ, ইউসিআরসি— কিচ্ছু দেখিনি। আমরাই প্রথম প্রজন্ম, যাদের ছোটবেলা ছিল বার্বিডলের মতো সুখী, রাংতার মতো ঝকমকে। আমরাই সেই প্রজন্ম, যাদের কাছে বিপ্লব মানে খিল্লি, কারণ ইতিহাস মৃত। স্কুলে পড়ার সময় আমরা শুনেছিলাম, বামফ্রন্টের বিকল্প উন্নততর বামফ্রন্ট আর পুঁজিবাদের বিকল্প পুঁজিবাদ স্বয়ং। শুনেছিলাম, সময় নেই, যা করার করে ফেলতে হবে এখনই। শুনেছিলাম— ডু ইট নাউ। আমাদের বলা হয়েছিল দেওয়াল থেকে শিখতে হবে, দেওয়াল থেকে জানতে হবে। বলা হয়েছিল, দেওয়ালে পিঠ ঠেকার আগে দেওয়াল জুড়ে লিখতে হবে। আমরা লিখেছিলাম— বামফ্রন্ট সরকার, উন্নয়নের হাতিয়ার। আমরা প্রশ্ন করিনি, জানতে চাইনি, ঠিক কবে থেকে, কেন, কীভাবে বামফ্রন্ট সরকার সংগ্রামের হাতিয়ার থেকে উন্নয়নের হাতিয়ারে পরিণত হল! কারা করল এমন? বড় হওয়ার পর আমরা দেখলাম নন্দীগ্রাম। দেখলাম, রাধারাণি আড়ি। দেখলাম, ঝর্ণা মাণ্ডি। আর দেখলাম, কৃষকের অধিকারের কথা বলা মিছিল গিয়ে মিশছে একুশ শতকের নব কংগ্রেসিদের রামধনু জোটে। 

আমরা কোনও কিছুকেই প্রশ্ন করিনি। আমরা জানতে চাইনি এনকেভিডি আর চেকা বিপ্লবের অংশ ছিল কী না! আমাদের প্রশ্ন করার প্রয়োজন পড়েনি, কারণ আমরা জানতাম ভাল করে জয়েন্ট দিতে হবে। তারপরেই প্লেসমেন্ট। এমএনসি আমাকে নিয়ে যাবে সব পেয়েছির দেশে। আমরা জেমস বন্ড দেখতাম। আমরা জানতাম দুনিয়ার কোথাও কমিউনিস্টরা নেই। কমিউনিস্টরা শেষ হয়ে গেছে। ইতিহাস শেষ হয়ে গেছে। আমাদের সদ্য শেখা আঁতলামিতে তা দিয়েছিলেন ফুকুয়ামা। আমরাই সেই প্রজন্ম, যাদের কোনও বিস্ময়বোধ নেই। আমরা অবাক হতাম না, কারণ গোটা দুনিয়াটাই একটা গ্রাম। আমরা জানতাম ইন্টারনেট জানে না এমন কিচ্ছুটি নেই। আমরা কনফিডেন্ট, কারণ পৃথিবীটা এগিয়ে গিয়েছে। লেনিনের মূর্তির গলায় দড়ি দিয়ে টেনেহিঁচড়ে নামানো হয়েছে নীচে। সিনেমায় দেখেছিলাম, অতিকায় লেনিনমুণ্ড ভাসতে ভাসতে মিশে যাচ্ছে আশমানি মেঘে।

লেনিন যেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন, তার ঠিক উল্টোদিকেই একটা বিপজ্জনক বাড়ি। একপাশে অশোকা বার, অন্যপাশে বন্দুকের দোকান। লেনিনের কোট সারাক্ষণ হাওয়ায় ওড়ে। হাওয়া না থাকলেও ওড়ে। লেনিনকে উড়তেই হয়। দিনভর তাঁর পায়ের নীচে বসে থাকে প্রেমিকপ্রেমিকা, আপিসমানুষ। লেনিন দেখেন কাপের পর কাপ লাল চা বিক্রি হচ্ছে, লেবুজল বিক্রি হচ্ছে, আদর আর স্বপ্ন বিক্রি হচ্ছে। ট্রামগুমটির রাস্তা পেরিয়ে এল বৃদ্ধ ট্রাম। 'অফিস যাচ্ছি' বলে বেরিয়ে পড়া বেকার যুবক বিড়ি কেনে। কাঁধভর্তি ধার নিয়ে বসে থাকে একা, চুপচাপ। লেনিন দেখেন, অ্যাডিডাস লেখা টি-শার্ট বিক্রি করছে খিদিরপুরের আমিনুল, ষাট টাকা পার পিস। লেনিন দেখছেন, আকাশে এখন মেঘ, বৃষ্টিবিকেল। রাত সাড়ে ন'টায় লেনিনকে সাক্ষী রেখে ডোরিনা ক্রসিংয়ে এসে দাঁড়ান তিন বয়স্কা যৌনকর্মী। তাঁদের খদ্দের জোটে না বহুদিন। রাত বাড়লে লেনিন মাঝেমাঝে ডানদিকে তাকান— আলোয় আলোয় ঝলমল করছে পার্ক স্ট্রিট। ট্রিঙ্কাসের সামনে আলগোছে হাই তুলছেন বিষন্ন পুলিশকর্মী। কয়েকটা বাইক ছুটে গেল, চিৎকার। লেনিন দেখছেন, ছেলেমেয়েদের সাহসী পোশাক। লেনিন দেখছেন কলকাতা শহরের কামনামদির লিঙ্গের মতো আকাশ ফুঁড়ে উঠছে পুরুষালী ফর্টি টু। লেনিন দেখছেন ম্লানমুখ শহীদ মিনার।

আমাদের আইডল আর তাদের বান্ধবীরা জয়েন্টের প্রস্তুতি নিত পাথফাইন্ডারে। তাদের কলেজ ছিল যাদবপুর, শিবপুর, আইআইটি। নিদেনপক্ষে ফিউচার, গুরু নানক বা জলপাইগুড়ি। কয়েকবছরের মধ্যেই অনেকে চেপে বসত বিদেশগামী প্লেনে, পুজোয় গিফট দিত বিদেশী পুলওভার। আমরা জানতাম উন্নয়ন হচ্ছে, শিল্প আসছে, কেটে যাচ্ছে স্থবিরতা। এটা সেই সময় যখন উষা কারখানার কঙ্কাল ঢাকা পড়ছে সাউথ সিটির আদুরে ঠান্ডায়। আমরা সিনেমা দেখতে যেতে শুরু করলাম মাল্টিপ্লেক্সে। বাড়িতে এসি বসল। আমরা পপকর্ন কিনতাম, খবরকাগজ পড়তাম, বিশ্বাস করতাম— ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর। আমরা শিখে নিয়েছিলাম ধর্মঘট খারাপ, কারণ স্ট্রাইক হলে উন্নয়ন থেমে যায়। বন্ধ্যা বনধ্— কী স্মার্ট শব্দবন্ধ, তাই না?

গরমকালের রাত্তিরে আচমকা কারেন্ট চলে গেলে বড্ড দমবন্ধ লাগে। হাওয়া ঢোকে না, কারণ জানলা বন্ধ— এসি চলছিল। ফ্যান ঘুরছে না, এসি বন্ধ, অন্ধকার। ঘাম হচ্ছে। ভাল করে ঘুম ভাঙার আগেই বমি পায়। দুর্গন্ধ। ঠাকুমার মৃত্যুর দিন তুমুল বৃষ্টি হয়েছিল, সেই সঙ্গে এতোলবেতোল হাওয়া। ইলেকট্রিক চুল্লি কাজ করেনি। ঠাকুমাকে পোড়ানো হয়েছিল কাঠে। মাথা ফাটার শব্দের মতো এই রাত। পোড়া মাংসের গন্ধের মতো। জানলা খুলতে গিয়ে ছিটকিনি পাওয়া যায় না প্রথমে। রাস্তার আলো জ্বলছ না। জলের বোতল নেই। যতটা সাজাতে পারব ভেবেছিলাম, আদৌ সেভাবে সাজবে জীবন? তোমাকে পাব? পরের প্রোজেক্টটায় নেবে তো আমাকে?

দাদার প্লেনে ওঠার আগের দিন বাড়িতে মাংস হয়েছিল। রবিবার সকালে বাবার বন্ধুরা আসত, সেদিন তাদের না করে দিয়েছিল বাবা। আমাদের বংশে এর আগে বিদেশযত্রা বলতে ঠাকুর্দার। ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ষাট সালে না কবে যেন রাশিয়া গিয়েছিল। সেই গল্প শুনে শুনে আমরা বড় হলাম। খুব কিছু আনতে পারেনি— লেনিনের ছবিওয়ালা ব্যাজ, ঠাকুমার জন্য একটা লাল স্কার্ফ আর সোভিয়েত ইউনিয়নের একটা পতাকা। সেগুলোর কথা উঠলেই আমার মনে পড়ে ন্যাপথলিন। আচ্ছা, ন্যাপথলিনের গন্ধ কি বিশ্বায়নবিরোধী নয়?

পিঙ্ক স্লিপ কাকে বলে আমরা জানতাম না। আমরা মানে আমি, বাবা আর মা। বাবার বন্ধুরাও জানত না। হারহারামি এলসিএস'ও না। দাদা কি জানত? জানি না। জানলেও কিছু বলেনি কখনও। যে ছেলেটা এত ভাল চাকরি পেল, বিদেশ গেল, বিয়ে করল, সে একটা গোলাপী স্লিপের জন্য আত্মহত্যা করবে কেন, বুঝিনি। যেমন বুঝিনি গাছগাম্বাট কমিউনিস্টরা ভোগে যাওয়ার পর রাশিয়ায় বেশ্যাবৃত্তি কেন বাড়বে! কেন মানুষ আবার খুনি স্ট্যালিনের ছবি হাতে মিছিল করে, কেন ভোট বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ পায় জুগানভের পার্টি, কেন নীনা আন্দ্রিয়েভাকে কথা বলতে দেওয়া হয় না! তখনও বুঝিনি কাকে বলে রিসেশন!  আমরা বুঝিনি কেন ওয়াল স্ট্রিটে রাত জাগছিল ছেলেমেয়েরা, বুঝিনি কীভাবে ফিলিপিন্সের অর্ধেকটা দখল করে নিল গেরিলারা! বুঝিনি, কৌমচেতনা কেন বার বার পেড়ে ফেলে আমাদের! আমরা বুঝিনি, কিন্তু অনুভব করছিলাম। আমাদের রক্তমাংসে ঢুকে যাওয়া অতীত আমাদের প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছিল। আমরা মারুতির মানেসর কারখানার দিকে দেখছিলাম, খাম্মাম আর মেদিনীপুরের কৃষকের দিকে দেখছিলাম, রাজস্থানের খেতমজুরদের দিকে দেখছিলাম। আমরা তাকিয়ে ছিলাম ফরাসী মুলুকের ধর্মঘটের দিকে, নেপালের মুক্তি সংগ্রামের ওঠাপড়ার দিকে, বেলজিয়ামের শ্রমিক-কৃষক-ছাত্রের মহামিছিলের দিকে। তাকিয়ে ছিলাম দক্ষিণ আমেরিকার দিকে। আমরা বুঝে নিচ্ছিলাম, ইতিহাস কখনও মরে না। মাঝেমধ্যে থমকে দাঁড়ায় মাত্র।

'আমিও আসলে ঘর খুঁজে যাই

খুঁজছ তুমিও, পাচ্ছি টের

যদি পেয়ে যাই আমরা দু'জন

ঘর যেন হয় সক্কলের'

আমি তোমাকে ভালবাসি। তোমার শরীরে শরীর মিশিয়ে আমি পেরিয়ে যাব এই কালসভ্যতার মর্গসন্ধ্যা। তোমার নাভিতে জিভ দিয়ে আমি লিখে দেব পূর্বপুরুষের নাম। তোমার স্তনে দাঁত দিয়ে খোদাই করে দেব বিশ্বাস। তুমিও, তুমিও আমার বুকে-পিঠে-উরুসন্ধিতে-গলায় সাপের মতো, গেরিলার মতো, স্বপ্নদ্রষ্টার মতো লিখে দেবে অনাগত সুদিনের ছবি। তুমি দেখো, তুমি দেখো, ওরা আমাদের শৈশব, কৈশোর লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাবা মা দাদু দিদিমাকে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা অতীতভ্রষ্ট, অন্ধ, কঙ্কালসার হয়ে পড়ে আছি। ওরা যা কিনতে বলছে, কিনছি। যা করতে বলছে, মুখ বুজে করে যাচ্ছি ঠিক তাই। আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে, আমার বমি পাচ্ছে, আমার শিরা উপশিরায় বয়ে যাওয়া রক্ত ঘেন্না করতে বলছে নিজেকে। এ আমি কোথায় এলাম, ভালবাসা! আমার শীত করছে, আমার ভয় করছে! হেরে যাওয়ার ভয়, ছাঁটাই হওয়ার ভয়, ইএমআই দিতে না পারার ভয়। পূর্বপুরুষেরা আমাকে টিটকিরি দেন। তাঁদের গলায় বুলেটের দাগ, শ্রীকাকুলাম। তাঁদের মুখ থ্যাৎলানো, উনষাট সাল। তাঁদের শরীরে কয়েদিপোশাক, বিয়াল্লিশ। তাঁদের বুকের চামড়ায় তপ্ত লৌহশলাকা ঢুকিয়ে রক্ত আর গলা মাংসে খোদাই করে দেওয়া হয়েছে কিছু হরফ, বরানগর। আমি পারছি না। আমি পারছি না। আমি আপ্রাণ ভুলতে চেষ্টা করছি, পারছি না। আমি পারব না। আমি মরে যাব। তুমি আমাকে আদর করো, আমাকে চুমু খাও, চেটে দাও সর্বাঙ্গ আমার। আমার শরীর থেকে মুছে দাও একমেরু শৈত্য এবার।

আমি দেখতে পাচ্ছি প্রিয়তমা, বলশোই থিয়েটারে সন্ধের শো ভাঙছে। রাস্তা আলো করে বাড়ি ফিরছে মলিন পোশাক পরা হাসিখুশি মানুষের দল। কমসোমলের ছেলেমেয়ে একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে ঠারেঠোরে। আমি দেখতে পাচ্ছি পেট্রোগ্রাডের রাস্তায় ফেস্টুন আর ফেস্টুন। এনকেভিডি নেই, চেকা নেই, কেজিবি নেই। তুমি বিশ্বাস করো, বিশ্বাস করো, সত্যিই নেই আর। আমাকে ভদকা এগিয়ে দিচ্ছেন পুতিলভ কারখানার শ্রমিক, আমার পাশে পাশে হেঁটে চলেছে পাভেল ভ্লাসভ, পাভেল কোরচাগিন। বরফ পড়ছে, শীত করছে, আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। আমার জন্য অপেক্ষা করছেন পেলাগেয়া নিলভনা। তাঁর হাতে বাইবেল। সন্ধ্যাপ্রদীপের কসম, জান, আমি তোমাকে ভালবাসি, সকালের আজানের কসম। বরফ বাড়ল। শীত করছে। রাত বাড়লে সাশা আর আন্দ্রেই আসবে। আসবে জয়া, শুরা, ইভান, একপেয়ে আলেক্সিই মেরেসিয়েভ। শ্রমিক আর সৈনিকদের সোভিয়েতের দফতরে হেঁটে যাচ্ছি আমি। আমার হাত ধরো। আমি ইউসিআরসি করা বাড়ির ছেলে, আমি কলোনির সন্তান, এই যৌথযাপনে আমার হক আছে। সোভিয়েতে হক আছে আমার।

শুক্রবার, ৬ জুলাই, ২০১৮

যাদবপুর এবং প্রবেশিকা ~ সৌরিত ভট্টাচার্য্য

আবার বড়ো লেখা। তবে কথাগুলো বলা দরকার ছিল 

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ও কাউন্সিলের স্কুলগুলোতে ইংরেজি পড়ানো নিয়ে এই লেখা। যারা পর্ষদে/কাউন্সিলে পড়েছেন তারা বিষয়টা ভালো বুঝবেন। আর আপনি যদি আমার মতো কলকাতা থেকে অনেক দূরে কোনো একটি ছোট শহরে বা গ্রামের পর্ষদভুক্ত স্কুলে পরে থাকেন তাহলে আরো ভালো বুঝবেন। আমি সকলের কথা লিখছিনা। আমার কথা লিখছি। আমি পড়েছি এমন একটা সময়ে যখন পঞ্চম শ্রেণীতে না উঠলে ইংরেজি পড়া যেতনা। সিপিএমের দূরদর্শিতা আর র্পারদর্শিতা দুয়ের কারণেই আমরা প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত ইংরেজি পড়িনি। আলিপুরদুয়ারের ভালো বাংলা মিডিয়াম স্কুল, ম্যাকউইলিয়াম হাইয়ার সেকেন্ডারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর প্রবেশিকা পরীক্ষার কিছু দিন আগে তরিহোরি করে ইংরেজি আলফাবেট গুলো সঠিক ক্রমে শেখানো হয়েছিল আর একটা গরুর রচনা মুখস্থ করানো হয়েছিল। যদ্দুর মনে পরে ওই গরুর রচনাটাই পরীক্ষায় এসেছিলো। তারপর পঞ্চম শ্রেণীতে অ্যানুয়াল পরীক্ষায় জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ছোট হাতের ও বড়ো হাতের ইংরেজি আলফাবেট সঠিক ক্রমে লিখতে এবং এরোমি আরো কিছু লিখতে যাতে সব মিলিয়ে আমি ১০০ তে ৯০ পেয়ে বাড়ির সকলকে চমকে দিয়েছিলাম। বলে রাখি এটা আমি ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সালের কথা বলছি। এখনো পরিষ্কার মনে আছে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীতে আমাদের জিজ্ঞেস করা হতো সেন্টেন্স কাকে বলে, ভার্ব কাকে বলে, নাউন কাকে বলে ইত্যাদি। মানে, পরিষ্কার সংজ্ঞা দাও। ইংরেজিতে। বইতে এমন বাজে ভাবে সংজ্ঞা লেখা থাকতো, আর যেহেতু বাড়িতে দেখানোরও কেউ ছিলোনা, শিখতেও ইচ্ছে করতো না. এই সংজ্ঞাগুলো স্কুলে বলতে পারলে ভালো, না পারলে হাতে একটা করে বেতের বাড়ি। চিন্তা করে গা কাঁপতো। তাও সংজ্ঞা মুখস্ত হতো না. অনেক সময় বাংলায় বলে দিতাম, তাতেও পার পেতাম না. এরপর ইংরেজিতে নম্বর কমতে কমতে অষ্টম শ্রেণীতে প্রায় ফেইল করে যাই. খুব কঠিন প্রশ্ন তৈরী করা হয়েছিল. বলেই দেয়া হয়েছিল প্রশ্ন কঠিন হবে. তাই ওরাল ও অন্যান্যতে প্রচুর মার্ক্স্ দেয়া হয়েছিল। অ্যানুয়াল পরীক্ষায় ৬০ এ ১২ পেয়েছিলাম। এরপর বাবা একজনের কাছে প্রাইভেট টিউশন পড়তে পাঠালেন. তিনি পরবর্তী চার বছর গ্রামারের দিকটা অনেক শিখিয়েছিলেন। তবে তাও অনেক ভুলভ্রান্তি রয়ে গ্যাছে. এখনো লিখতে ভুল হয়। হয়তো সারাজীবনই হবে. 

আমার সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে যা ইংরেজি পড়ানো হতো তা হলো মূলত এই গ্রামার আর প্র্যাক্টিক্যাল ইংলিশ। এই যেমন ছুটির দরখাস্ত। বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার দরখাস্ত। প্রেসি, রচনা ইত্যাদি। এগুলো কোনোটাই খারাপ নয় তবে কোনোটার প্রতিই স্বাভাবিক ভাবে ভালোবাসা আসেনা। কারণ ওই নম্র বয়সে ভালোবাসা থাকে অনেক বেশি সাহিত্যের সূক্ষ অনুভবের প্রতি বা বিজ্ঞানের চমৎকার উদ্ধাবনের প্রতি। টেকনিক্যালিটিস এর প্রতি ভালোবাসা তৈরী হতে সময় লাগে। আর এই ব্যাপারটাই মধ্যশিক্ষা পর্ষদ গা করেনি। আমাদের মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সাহিত্য ছিল কিছু কবিতা আর কিছু গদ্য আর একটা নাটকের অংশবিশেষ। উচ্চমাধ্যমিকেরটা  মনে আছে তাই বলছি। গদ্যে ছিল কতগুলো রসকষহীন প্রবন্ধর অংশবিশেষ যা এমন কিছু লোকজন লিখেছেন যাদের পরবর্তী পনেরো বছরের সাহিত্যচর্চার জীবনে আর কোনোদিনই বিশেষ ভাবে পাইনি। এ জি গার্ডিনারের 'অন লেটার রাইটিং, লুই ফিশারের 'মাই উইক উইথ গান্ধী',  জ্যাকব ব্রনোওস্কির 'টেকনোলজি  ফর মানকাইন্ড' ইত্যাদি। যাদের পেয়েছি ও যারা একটি বিশেষ সময়ের মেজর ইংরেজি গদ্যকার যেমন ডিকেন্স, হার্ডি, এলিয়ট, ব্রন্টে সিস্টার্স, অরওয়েল, ইত্যাদি সিলেবাসে তাদের কেও নেই. আমি বলছিনা এদের সবাইকে পড়াতে হবে. অন্তত, আমাদের এই নামগুলোর সাথে পরিচিত করে দিন যাতে স্নাতকস্তরের পড়াশোনায় হোঁচট খেয়ে না যাই. যে পাঠ্যবই থেকে এসব পড়তে হতো তাতে কিছু উপরুল্লিখিত লেখকের লেখা ছিল..সেগুলো কোনোদিন পড়তে অনুপ্রাণিত করা হতোনা। যতটুকু দরকার ততটুকুই। প্রশ্ন উত্তর দাও. নম্বর পাও. এগোও। 

এই জ্ঞান নিয়ে আমরা মধ্যে কেউ কেউ আসতাম কলকাতায় যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি, সেন্ট জেভিয়ার্স এর প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে যেখানে জিজ্ঞেস করা হয় সাহিত্য কি, বিজ্ঞাপন কি সাহিত্যের অংশ, জন ডান কে, মিল্টন এর এরপজিটিকা নিয়ে লেখো, দুর্গেশনন্দিনী নিয়ে লেখো, মকবুল সিনেমা নিয়ে লেখো, ইত্যাদি। খুবই চমৎকার লাগে ভাবতে যে কত কিছু সাহিত্যের অংশ. তবে স্কুলের এইটুকু স্টক নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা কোথা থেকে এগুলো নিয়ে লিখবে? কেউ যদি নিজে থেকে পড়াশোনা করে থাকে সে কিছুটা জানবে। তবে ছোট শহরে বা গ্রামে নিজে থেকে পড়াশোনায় বা করবে কি করে? তার জন্য বই পত্র কিনতে হবে, অন্যরকমের গান শুনতে হবে, সিনেমা দেখতে হবে, পারলে বছরে একবার কলকাতা যেতে হবে. কে নিয়ে আসবে। বাবাদের জেনারেশন যারা দেশভাগের পর ওপর বাংলা থেকে এপার বাংলায় এসেছে তারা নিজের জীবন দাঁড় করাতেই সময় গোটা সময়টা বেরিয়ে গ্যাছে। উনাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে এটা বুঝতে যে তাদের নিজের বাড়ি এখন আর নিজের নেই. নতুন জায়গা। নতুন ঘর. পরিবার ছেড়াবেড়া। এখন শুধু নিজেদের বাঁচানো আর টিকে থাকার লড়াই। তাই তাদেরকে দোষারোপ করে লাভ নেই. তাদের থেকেই কেউ কেউ আশেপাশের স্কুলে শিক্ষক শিক্ষিকা হয়েছেন ফলে তারাও নিজের কাজটুকু করিয়ে দিয়েই সমাপ্তি টেনেছেন. আর স্কুলে যদি বাংলা মিডিয়াম হয় তাহলে ছাত্র ছাত্রীকে গোটা স্কুল জীবনে ইংরেজি গ্রামার শেখাতে গিয়েই হিমশিম খেতে হয়েছে. আর ইংরেজি মিডিয়াম এ পড়ার মতো অধিকাংশেরই পয়সা ছিলোনা। ইন ফ্যাক্ট, কিছু জায়গায় তো ইংরেজি মিডিয়ামই ছিল না. আলিপুরদুয়ার শহরে আমার সময় মোটের ওপর একটি নামকরা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল ছিল. তবে তাদের ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা হতে যে তাদের প্রাইভেট টিউশন পড়াবে কারা? তাই অনেকেই ইংরেজি মিডিয়াম থেকে বাংলা মিডিয়াম এ চলে আসতো। আবার অনেক সময় পয়সা ঠেকলেও অনেকে সিপিএম আইডিওলজির জন্য নিজের ছেলে মেয়েদের বাংলা মিডিয়াম এ ভর্তি করাতেন না। আমার জেনারেশনটা এইরকম কিছু 'ঐতিহাসিক' ভুলের শিকার। আমার পরের জেনারেশন এ পর্ষদে/কাউন্সিলে শুনেছি অনেক নম্বর ওঠে. তবে বিভিন্ন সময়ে অনেকের সাথে কথা বলে বুঝেছি সমস্যাগুলো একই রয়ে গ্যাছে। এখনো সেই কয়েকটা গদ্য কবিতা সংক্ষিপ্ত উত্তর ইত্যাদি। অনেক জায়গাতেই সার্বিকভাবে কোনো অনুপ্রেরণা নেই. কোনো গাইডেন্স নেই. এই রকম ইংরেজি (সাহিত্য) শেখানোর পর যখন সেই ছাত্র বা ছাত্রীটি স্নাতকস্তরে পড়তে আসবে আর প্রবেশিকা পরীক্ষায় ধাক্কা খাবে অথবা পরে কোনো এক কলেজে  ভর্তি হয়ে ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস, কবিতা, গদ্য, নাটক পুরোপুরিভাবে পরে উত্তর লিখবে ও হোঁচট খাবে, সে ও তো সকলের মতো ভয় পাবে। ভাববে আমি এতগুলো মার্ক্স্ পেয়েও কিছুই জানিনা। আমায় সকলে বললো আমি কত ভালো, আমি ১০০ তে ৯০, ৯৫ এমনকি ৯৯ পেয়েছি। অথচ এখন ৫৫-৬০ তুলতে পারছিনা। মা বাবা পাড়া প্রতিবেশী বলছে আমি কলেজে উঠে বাজে সঙ্গে তলিয়ে গ্যাছি. এই রকম একটি চরম দৈনন্দিন মানসিক ক্রাইসিস এর সাথে যুক্ত করুন বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর পরীক্ষায় বড়ো প্রশ্নের আধিপত্য, নোট পড়া, টিউশন পড়া, মার্ক্স্ না ওঠা, আর শেষমেশ স্বীকার করা ইংরেজি বড্ডো কঠিন। আমরা দ্বারা হবে না. 

তাই আজ যখন যাদবপুরে এডমিশন টেস্ট পাল্টাও, মার্ক্স্ দিয়ে বিচার করো, সকলকে সুযোগ করে দাও মার্কা পপুলিস্ট রাজনীতি হচ্ছে, তখন এটাই বলতে হয় যে যাদবপুর প্রেসিডেন্সির মান না নামিয়ে মধ্যশিখা পর্ষদে/কাউন্সিলে কলাবিভাগ পড়ানোর অবস্থার উন্নতি করুন। বাংলার মেজরিটিই পর্ষদের স্কুলে পড়াশোনা করে. তাদের গুরুত্ব দিন. খালি কলকাতা কলকাতা করা বন্ধ করুন. কলকাতার বাইরে ভাবুন। ভাবুন কলাবিভাগের সাব্জেক্ট গুলোকে কিভাবে ইন্টারেষ্টিং উপায়ে পড়ানো যায়. সিলেবাসকে কি করে আপটুডেট করা যায়। কি করে স্কুল ও স্নাতকস্তরের শিক্ষায় একটা মিল তৈরী করে যায় যাতে আমরা স্নাতকস্তরে এসে বিশাল এক ধাক্কা খেয়ে না যাই. নজর দিন কি করে ছাত্রছাত্রীকে অনুপ্রেরণা দেয়া যায়.পরিমান মতো শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগ করুন। তাদেরকে শিক্ষিত করুন। তাদের বোঝান যে সকল শিক্ষক শিক্ষিকার নিজের ক্লাসে সকল ছাত্র ছাত্রীকে নাম ধরে চেনা উচিত। এই ছাত্র ছাত্রীগুলোর ভালোবাসা প্রয়োজনীয়তা জানা উচিত। স্টুডেন্ট-স্টাফ রেসিওর দিকে নজর দিন. এক্সট্রা কাররিকুলার একটিভিটি বাড়ান। এগুলোর মধ্যে যদি কিছুও করে থাকেন, তাহলে নজর দিন এগুলো সুষ্ঠভাবে সব জায়গায় পালন করা হচ্ছে কিনা? অবশ্যই স্টুডেন্ট দের থেকে ফিডব্যাক নিন. তারপর নজর দিন স্নাতকস্তরে কিভাবে বেটার করা যায়. আপামর বাংলায় স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা ভালো হলে স্নাতকস্তরে কলেজও ভালো মানের ছাত্রছাত্রী থাকবে। হেলথি কম্পেটিশন হবে. মার্ক্স্ নিয়ে আর ব্যাকডোর দিয়ে কাড়াকাড়ির রাজনীতি কমবে। আর আমাদের মতো অনেক ছাত্রছাত্রীকে কথায় কথায় কলকাতা ছুটতে হবে না, অথবা সারাজীবন হ্যানস্থ হতে হবে না. এগুলো না করে যাদবপুর এডমিশন টেস্ট নেয়া দরকার আছে কি নেই এসব ফালতু বিতর্ক বন্ধু করুন। যাদবপুরের কলাবিভাগ নিয়ে ভাবা বন্ধ করুন। এই বিভাগ রাজ্য স্তরেই নয়, জাতীয় ও আন্তর্জান্তিক স্তরেও সুপরিচিত। তাই সেখানকার শিক্ষক শিক্ষিকারা জানেন তাদের কি করলে ছাত্রছাত্রীদের ও নিজেদের ভালো হবে. মাত্র তো গুটি কয়েক ভালো ইউনিভার্সিটি/কলেজ রাজ্যে পড়ে রয়েছে। তাদের কে তো ভালো থাকতে দিন. তাদের মান মাটিতে নামিয়ে কি লাভ হবে আমাদের?

বৃহস্পতিবার, ৫ জুলাই, ২০১৮

রামায়ন ও ইন্টারনেট ~ অভিজিৎ মজুমদার

টেনিদা একটু গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বলল, বুঝলি সেকালেও ফেসবুক, ইন্টারনেট ছিল।

ক্যাবলা চাপাস্বরে বলল, ওই শুরু হল ঢপের চপ।

টেনিদা হুংকার ছেড়ে বলল, "এ্যাই ক্যাবলা কি বললি রা?"

ক্যাবলা তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলল, "আমি না, প্যালা বলছিল, আসার সময় দেখে এসেছে কালিকায় চপ ভাজছে। তাই বলছিলাম, একটু চপ টপ হলে এই বৃষ্টিতে ভালো হত।"

আমি সবে প্রতিবাদ করতে যাব, এমন সময় টেনিদা উদাস গলায় বলল, "নাহ্ চপ আর খাবো না। বরং নগেনের দোকান থেকে একটু পকোড়া নিয়ে আয়। যা, ক্যাবলা তুইই যা।"

ক্যাবলা কাতর গলায় বলল, "প্যালার আনার কথা তো?"

টেনিদা বাজখাঁই একটা চিৎকার ছেড়ে বলল, "সিয়াচেনে সৈন্যরা দাঁড়িয়ে আছে আর তুই একটু চপ আনতে পারবি না? যাবি না কি এক চড়ে তোর গালদুটো গুয়াতেমালায় পাঠিয়ে দেব?"

হাবুল বলল, "কিংবা গোরক্ষপুরে।"

আমি দেখলাম আমারও কিছু বলা দরকার। একটু মাথা চুলকে বললাম, "কিংবা গোবরডাঙায়।"

বাঙাল হাবুলটা হাড়জ্বালানি হাসি হেসে বলল, "এই প্যালাডা হাফপ্যান্টুলুন ছাইড়্যা ফুল প্যান্টুল পইড়ল, কিন্তু গোমূত্র আর গোবর ছাড়াইয়া আউগ্যাইতে পাইরল না।"

টেনিদা হাবুলের দিকে কটমট করে চেয়ে বলল, "তোদের সাথে এইজন্য কোনও ইম্পর্ট্যান্ট কথাবার্তা চালানো যায় না। হচ্ছিল পকোড়ার কথা, চলে গেলি গোবরে। ক্যাবলা, তুই কি যাবি না কি... ?"

টেনিদার বাড়ানো হাতটা দেখে ক্যাবলা ব্যাজারমুখে উঠে চারটে পকোড়া নিয়ে এল।

ক্যাবলা ফিরতেই টেনিদা ওর হাত থেকে পকোড়ার ঠোঙাটা ছোঁ মেরে নিয়ে আধখানা পকোড়া ভেঙে হাবুল কে আর ক্যাবলাকে দিল। আমিও হাত বাড়িয়েছিলাম, টেনিদার কটমট করে তাকানো দেখে আবার হাত গুটিয়ে নিলাম।

টেনিদা ধোঁওয়া ওঠা পকোড়ায় একটা কামড় বসিয়ে বলল, "আহা। পকোড়া ছাড়া বর্ষাকাল যেন ব্রাজিল ছাড়া বিশ্বকাপ।"

তারপর বলল, "হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম। রামায়নের যুগেও ইন্টারনেট ছিল।"

হাবলা বলল, "মহাভারতে আছিল শুনসিলাম। সঞ্জয় নাকি ফেসবুক লাইভে কুরুক্ষ্যাত্রের যুদ্ধ দেখসিল। রামায়ণ তো তারও আগের কথা। তখনও ইন্টারনেট আছিল?"

টেনিদা একটু উঁচুদরের হেসে বলল, "নষ্ট্রাদামুসের নাম শুনেছিস?"

ক্যাবলা এতক্ষণ হাতের নুন চাটছিল। টেনিদার প্রশ্ন শুনে হাত উঁচু করে বলল, "আমি জানি।"

হাবুল ঘোঁৎ করে একটা নি:শ্বাস ছেড়ে বলল, "তুমি হইত্যাস আমগো গুগুল বাবা। তুমি জানবা না?"

ক্যাবলা হাবুলের কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল, "নষ্ট্রাদামুস ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্রান্সে জন্মেছিলেন। অনেক ভবিষ্যতবানী করে গেছেন। তবে আজকাল লোকে নিজেদের ইচ্ছেমত কথা ওনার মুখে বসিয়ে দেয়। যেমন, ভারতবর্ষে এমন একজন শাসক আসবে যাকে ইউনেস্কো বেস্ট প্রধানমন্ত্রী অ্যাওয়ার্ড দেবে।"

টেনিদা ক্যাবলার পিঠে একটা বিরাশি সিক্কার চাপড় মেরে বলল, "এই জন্যই তোকে এত ভালবাসি।"

আমি বললাম, "কিন্তু তার সাথে রামায়নের সম্পর্ক কি?"

টেনিদা একটা চওড়া হেসে বলল, "সে সব জানতে হলে ওই পাঁঠার মাংসের ঘুগনী যাচ্ছে, চারপ্লেট ঘুগনী নিয়ে আয়। আর হ্যাঁ, শালপাতায় আনবি, প্লাস্টিকের প্লেটে না।"

আপত্তি জানিয়ে লাভ নেই, চুপচাপ নিয়ে এলাম।

টেনিদা এক প্লেট হাবুল আর ক্যাবলাকে ভাগাভাগি করে দিয়ে নিজে তিনটে প্লেট নিয়ে বসল। আমি জুলজুল করে তাকাতে আমায় বলল, "এই বর্ষায় বাইরের খাবার তোর ওই পটল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোল খাওয়া পেটে সহ্য হবে না।"

আমি মনে মনে বললাম, "খাও খাও। সব ভাগাড়ের মাংস। কাল যদি পেট না খারাপ হয়েছে আমার নাম পটলডাঙার প্যালারাম নয়।"



ঘুগনীটা শেষ করে শালপাতাটা আমার দিকে এগিয়ে টেনিদা বলল, "বলতো, রামায়ণ কাকে নিয়ে লেখা?"

শালপাতায় কোণে লেগে থাকা একটুকরো মাংসের কুচি তুলে মুখে দিয়ে বললাম, "কেন, রামচন্দ্রকে নিয়ে।"

টেনিদা একটা পিলে চমকানো হাসি হেসে বলল, "ফুংসুক ওয়াংড়ুর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে আমিও তাই ভাবতাম।"

ফুংসুক ওয়াংড়ুর নাম শুনে দেখলাম সবজান্তা ক্যাবলাও চোখ পিটপিট করে ঘুরে বসল।

-মতলব, বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ফুংসুক ওয়াংড়ু? যার নামে তিনশো বাষট্টিখানা পেটেন্ট আছে?

ক্যাবলার প্রশ্নে টেনিদা চোখদুটো আধা বুজে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, "এই যে গল্পটা তোদের এখন বলব সেটা আমাকে বলেছে তোদের ওই ফুংসুক ওয়াংড়ু। আমি অবশ্য ওকে ফুং বলেই ডাকি। আমরা বুজুম ফ্রেন্ড কি না। এর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা সেই যখন আমি টিবেট গেলাম তখন। ফুং তখন অনেকদিন ধরে একটা জুতো বানানোর চেষ্টা করছে। যেটা পায়ে পড়ে লাফালে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে চলে যাওয়া যায়। একটা জুতো ও বানিয়েছিল বটে, কিন্তু সেটা পড়ে লাফালে হিসেবের থেকে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি আগেই ওটা থেমে যাচ্ছিল। আর বুঝতেই পারছিস, পাহাড়ে ওই হিসেবের গোলমাল মানে সোওজা খাদে। বেচারা খুব মনের কষ্টে ছিল। আমি ভাল করে দেখে বুঝলাম যে স্প্রীংটা ও লাগিয়েছে, সেটা দু মিলিমিটার ছোট। আমি টেনে একটু লম্বা করে দিতেই, জুতোটা একদম পারফেক্ট হয়ে গেল। ফুংসুক তো খুশি হয়ে আমাকে জড়িয়ে টড়িয়ে ধরে বলল, মিস্টার টেনি, ওয়াংশু কুশ থুংপা থুংপা। মানে তিব্বতি ভাষায় থ্যাংকু ভেরি ভেরি মাচ। তারপর বলল, 
তুমি আজ আমার এক অনেক বড় সমস্যা সমাধান করে দিলে। এই জুতোর আধা পেটেন্ট তোমার। জানিসই তো, আমি ফকির মানুষ, আমার কোনও লোভ নেই। তাই আমি ওকে না করে দিলাম। তখন ফুং বলল, ঠিকআছে, মিস্টার টেনি। কিন্তু আমরা তিব্বতিরা বিনা প্রতিদানে কিছু নেই না। তোমাকে এর পরিবর্তে আমি এমন একটা গুপ্ত তথ্য জানাবো, যা কেউ জানে না। এক তিব্বতি গুম্ফার সাধুর কাছে লুকিয়ে রাখা পাঁচ হাজার বছরের পুরনো পান্ডুলিপিতে আমি এটা পড়েছি। এই বলে, ও ওর সিন্দুক খুলে একটা তালপাতার পুঁথি বার করল। সেই পুঁথি পড়ে তো আমার আক্কেল গুড়ুম। এই দ্যাখ সেকথা বলতেও আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।"

ক্যাবলা একটু নাক কুঁচকে বলল, "তুমি কবে তিব্বত ঘুমতে গেলে? আর তিব্বতী ভাষাই বা শিখলে কবে?"

টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে বলল, "সে খবরে তোর কি দরকার রা? আমি চার বছরে চুয়াত্তর বার কোন দেশে কি কাজে যাই, সব কি তোকে বলে যাব? গল্প শুনতে হলে শোন, নয়তো বাদ দে। আমি চললাম।"

হাবুল হাঁ হাঁ করে উঠল। "ছাড়ান দাও, ছাড়ান দাও। পোলাপান।"

-"হুঁ, পোলাপান। এদের ধরে জলপান করে ফেলতে হয়।"

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "ফুংসুক কি বলল?"

-"শোন তবে। রামায়ণ বলতে আমরা কি বুঝি? রামের গল্প, তাই তো? কিন্তু গল্পটা আসলে কাকে ঘিরে বলত?

আমি একটু মাথ চুলকে বললাম, "হনুমান?"

-তোর মুন্ডু। গল্পটা হচ্ছে আসলে সীতাকে নিয়ে। সীতাহরণ হচ্ছে যাবতীয় ঘটনার মূলে। তো এই সীতা কে?

ক্যাবলা বলল, "সীতা মাইয়া জনক রাজার মেয়ে আর রামজীর বিবি।" অনেক বছর পশ্চিমে কাটানোয় ক্যাবলার কথায় এখনো পশ্চিমা হিন্দির টান।

হেঁ, হেঁ করে একটা উচ্চাঙ্গের হাসি হেসে টেনিদা বলল, "সেটাই তো সবাই জানে। কিন্তু ফুংসুক যেটা বলল সেটাই আসল গুপ্তকথা।"

"ফুং তো ওর সিন্দুক খুলে আমাকে পুঁথিটা দিল। কিন্তু, কি বলব তোদের, সেই পুঁথি হাতে নিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ। দেখি, সেই তালপাতার পুঁথিতে মুক্তোর মত হাতের লেখায় গোটা গোটা বাংলায় পুরো রামায়ণ লেখা।"

-"তিব্বতী গুহার পাঁচ হাজার বছরের পুরনো পুঁথিতে বাংলায় লেখা রামায়ণ? খাইসে।" হাবুল চেঁচিয়ে উঠল।

-অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান যখন কলকাতা থেকে ডায়মন্ড হারবার হয়ে তিব্বত পৌঁছন, তখনই তাঁর হাত ধরে তিব্বতে বাংলা ভাষা জনপ্রিয় হয়েছিল। বুঝলি? কিসুই তো জানিস না। ভারতের আসল ইতিহাস টিতিহাস পড়েছিস কখনো? তোর মাধ্যমিকের সার্টিফিকেটখানা একবার দেখতে হচ্ছে।

-হ। একদিন আমরা হক্কলে আমাগো সার্টিফিকেট লইয়া আমু। তোমারডাও কেও কখনো দ্যাখে নাই।

সার্টিফিকেটের কথা তুলতেই টেনিদা হাবুলের পিঠে হাত রেখে বলল, "আহা, চটিস কেন? তোকে আমি কখনো কিছু বলেছি। ওটা ওই সবজান্তা ক্যাবলাকে বলা। দেখছিস না, মুখখানা কেমন পান্তুয়ার মত করে বসে আছে।"

ক্যাবলা ফিশফিশ করে বলল, "সব গাঁজা। বাংলা ভাষার বয়স খুব বেশি হলে হাজার বছর, লিপির বয়স আরও কম। আর অতীশ দীপঙ্কর মারা গেছেন ১০৫৪ সালে।"

টেনিদা ক্যাবলার দিকে চেয়ে একটা করুণার হাসি হেসে বলল, "রামচন্দ্রের জন্মের আগে যদি রামায়ণ লেখা হতে পারে, স্টেশন তৈরী হওয়ার আগেই যদি সেই স্টেশনে চা বিক্রি হতে পারে, তবে বাংলা ভাষার জন্মের আগে কেন বাংলায় লেখা হতে পারে না শুনি?"

টেনিদার উত্তর শুনে ক্যাবলার মুখটা ভেবলে গিয়ে বাসি বেগুনীর মত হয়ে গেল।

টেনিদা একবার আমাদের তিনজনের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার গল্প বলা শুরু করল।

"বুঝলি, সেই পুঁথিতে যা লেখা তাকে রামায়ণ না বলে সীতায়ণ বলাই ভালো। সেখানে কাহিনী শুরুই হচ্ছে জনকরাজার লাঙলে সীতার মাটি ফুঁড়ে উঠে আসা নিয়ে। তারপর আছে সীতার স্বয়ম্বরের বিস্তারিত বর্ণনা। কিভাবে রামচন্দ্র হরধনু ভেঙে সীতাকে নিয়ে এলেন তার গল্প। তারপর শুধু সীতারই গল্প। বনে সোনার হরিণ দেখা, লক্ষ্নণের গন্ডী পেরিয়ে রাবনকে ভিক্ষে দেওয়া, সীতাহরণ, সীতার উদ্ধার থেকে অযোধ্যা ফিরে যাওয়া সব। মায় উত্তরকান্ড পর্যন্ত।"

টেনিদা থামতেই হাবুল বলল, "হগ্গলই তো বোজলাম, কিন্তু ফ্যাসবুক আর ইন্টারনেটের কথা কইসিলা, হেডা কই?"

ক্যাবলাও উত্তেজিত হয়ে বলল, "অওর তুমহারা আঁখ চড়কগাছ কিঁউ হুয়া?"

টেনিদা একবার আমাদের সবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর খানিক চুপ করে থেকে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, "সীতা হল আসলে ডেটা। তোর আমার ব্যক্তিগত তথ্য। আর জনকরাজা? সে হল আসলে আধার।"

ক্যাবলা হাত তুলে বলল, "তার মানে হরধনু হল সিকিউরিটি পাসওয়ার্ড?"

"কেয়াবাত।" বলেই টেনিদা একটা বিরাশি সিক্কার থাবড়া বসাতে যাচ্ছিল ক্যাবলার পিঠে। কিন্তু আগেরবারের অভিজ্ঞতায় ক্যাবলা সুড়ুৎ করে সরে গেল আর থাবড়াটা বোঁ করে ঘুরে পড়ল হাবুলের কাঁধে। হাবুল কোঁত করে চেঁচিয়ে উঠল, "খাইসে, খাইসে।"

টেনিদা সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে বলতে লাগল, "ডাটা একবার হাত বদল হয়ে মালিকের কাছ থেকে গেল আধারের কাছে, তারপর সেখান থেকে পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করে চলে গেল পরের জনের কাছে।"

-"আর ফেসবুক? তুমি যে বলেছিলে ফেসবুকও ছিল?" অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর আমারও কিছু একটা বলা দরকার মনে হল।

-"সোনার হরিণটাই তো আসলে ফেসবুক। এই যে তোরা সকাল সন্ধ্যে এটা ওটা লিংকে ক্লিক করিস "আপনি আগের জন্মে কি ছিলেন" অথবা "আপনি কোন বলিউড অ্যাক্টরের মত দেখতে" জানতে, সেগুলো আসলে কি? সেগুলো তো ওই সোনার হরিণের ফাঁদ। লক্ষ্মণ, যে কি না আসলে তোর ফোন বা কম্পিউটারের ফায়ারওয়াল, তার টেনে দেওয়া গন্ডী যদি তুই নিজেই পেরিয়ে যাস, তাহলে তোর ডাটা তো অন্যের হাতে যাবেই। রাবণ তো আর কিছু নয়, ও হল কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা যে সাগর পেরিয়ে এসে তোর ডাটা চুরি করে পালিয়ে যাবে। তারপর সেই ডাটা উদ্ধার করা কি চাট্টিখানি কথা? পুরো লঙ্কাকান্ড একেবারে। শুধু উদ্ধার করেও কি রক্ষে আছে? ডাটা করাপ্ট হল কি না সেই চিন্তাও তো আছে। তাই গল্পের শেষ হচ্ছে সীতার পাতালপ্রবেশ দিয়ে। অর্থাৎ, নিজের ডাটা নিজের কাছে থাকাই ভালো। বুঝলি কিছু?"

ক্যাবলা গভীর সন্দেহের দৃষ্টিতে বলল, "এইসব ওই পুঁথিতে লেখা ছিল?"

-"তবে কি আমি এই ভর সন্ধ্যেবেলা তোদের গাঁজা দিচ্ছি?"

-"দেখাতে পারবে সেই পুঁথি?"

টেনিদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "সেটাই তো ট্র্যাজেডি রে। সবে পুঁথিটা পড়া শেষ করেছি, এমন সময় শুনি গুড়গুড় আওয়াজ। তাড়াতাড়ি আমি আর ফুং বাইরে এসে দেখি এক বিশাল বরফের স্রোত ওপর থেকে নেমে আসছে। আর দু মিনিট দেরি হলেই আমরা দুজনেই ওর তলায় চাপা পড়ে যেতাম। কোনওমতে প্রাণ নিয়ে ফিরেছি। ওই পুঁথিটা ওই বরফের তলায় চিরকালের মত চাপা পড়ে গেল।"

-তোমরা বাঁইচলা কি কইর্র্যা?

-"ওই যে ফুংসুক ওয়াংড়ুর জুতো। ওটাই তো এ যাত্রা বাঁচিয়ে দিল। একজোড়াই ছিল, তাই আমি পায়ে পড়লাম আর ফুংকে বললাম আমার হাতটা শক্ত করে ধরতে। তারপর একটা লাফ দিয়েই সোজা অন্য পাহাড়ে।"

আমরা সবাই খানিক চুপ করে বসে রইলাম। তারপর ক্যাবলা বলল, "তো এতসব ঘুরিয়ে লেখা কেন? সিধা সিধা লিখলেই তো পারত।"

টেনিদা মুচকি হেসে বলল, "পুঁথিটা তো নষ্ট্রাদামুসের লেখা। ওনার সব কিছু রহস্য করে লেখার অভ্যেস ছিল না? তাই।"

ক্যাবলা বললে, "সব বাজে কথা- বানানো।"

টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে বললে, "বানানো? তোদের এসব গোপন কথা বলাই আমার ভুল হয়েছে।"

এই বলে চাটুজ্জেদের রোয়াক থেকে নেমে টেনিদা পটলডাঙা স্ট্রীট ধরে হনহন করে হাঁটা দিল।

(সমাপ্ত)

মঙ্গলবার, ২৬ জুন, ২০১৮

গওহর জান ~ অরিজিৎ গুহ

দ্বারভাঙ্গার রাজপ্রাসাদে সেদিন ভিড় উপচে পড়ছে।তিল ধারনের আর জায়গা নেই।গণ্যমান্য বিশিষ্ট অতিথিরা সবাই নিজের নিজের আসনে আসন গ্রহণ করে অপেক্ষা করছেন মেহফিলের।রাজা সাহেব এক নতুন চমক দিতে চলেছেন সবার সামনে।কদিন আগে থেকেই এই জন্য রাজসভায় সাজো সাজো রব।আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।সেজে উঠেছে সভা। কলকাতা থেকে নতুন বাঈজি নিয়ে এসেছেন রাজা লক্ষমেশ্বর সিং।সেই বাঈজির গলার মিঠাস আর নাচের ছন্দ নাকি পাগল আর মাতোয়ারা করে দেয় তামাম ইন্সানকে।সবাই অধীর আগ্রহে সেই বাঈজির অপেক্ষা করে যাচ্ছেন।
     রাজা লক্ষ্মমেশ্বর সিং জি প্রবেশ করলেন সভার মধ্যে।মুহুর্তের হইচই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।সবাই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানালেন রাজা সাহেবকে।রাজা সাহেবের ব্যক্তিত্বে সবাই মুগ্ধ হয়ে থাকেন।আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এই রাজা তাদের পূর্বপুরুষদের থেকে চিন্তায় ভাবনায় অনেক এগিয়ে।সেই লক্ষমেশ্বর সিং যখন কলকাতার বাঈজিকে নিয়ে এসেছেন, তখন সেই বাঈজিকে তো অসামান্য হতেই হবে।
   এরপর সভার মধ্যে প্রবেশ করলেন সেই বাঈজি।নাচ আর গান শুরু করবে কি! বাঈজির অসাধারণ রূপেই মুগ্ধ হয়ে গেল প্রত্যেকে।রূপ যেন ফেটে পড়ছে।আর রূপ হবে নাই বা কেন! বাঈজির শরীরে তো আর ভারতীয় রক্ত নয়, বইছে ইউরোপিয়ান রক্ত।বাবা আর্মেনিয়ান ইহুদি উইলিয়াম রবার্ট ইয়োওয়ার্ড আর মা জন্মসূত্রে ভারতীয় ভিক্টোরিয়া হেমিংস।তাদেরই সন্তান অ্যাঞ্জেলিনা পাকেচক্রে হয়ে পড়েছেন তাওয়াইফ।তবে নাচ আর গানের ক্ষেত্রে অ্যাঞ্জেলিনার মায়ের ভূমিকা ছিল অনেক বেশি।নিজে যেহেতু নাচ আর গানের পেশায় যুক্ত ছিলেন।
    গান শুরু করলেন কলকাতার বাঈজি।তন্ময় হয়ে গেল রাজসভা।গানের প্রতিটা মোচড় যেন বুকে এসে বিঁধছে। রাজা নিজেও মুগ্ধ।ডুবে গেলেন সুরের গভীরে।খেয়ালই নেই কখন একটার পর একটা গান গেয়ে চলেছে তাওয়াইফ।অবশেষে ঘোর ভাঙল গান শেষ হওয়ার পর।হাততালি দিতেও ভুলে গেছিলেন রাজা লক্ষমেশ্বর সিং জি।গান শেষ হওয়ার পর রাজা ঘোষণা করলেন 'আজ থেকে আমার রাজ্যের রাজসভার সঙ্গীতবিদ হিসেবে নিযুক্ত করা হল এনাকে'।
      মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে সেই সময়ের সব থেকে শক্তিশালী দেশীয় রাজ্য দ্বারভাঙ্গার সভার সঙ্গীতবিদ হিসেবে নিযুক্ত হলেন অ্যাঞ্জেলিনা উর্ফ গওহর জান।বাবা মায়ের বিচ্ছেদের পর মা ভিক্টোরিয়া হেমিংস বিয়ে করেন খুর্শেদকে এবং নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম গ্রহণ করেন মালেক জান আর মেয়ে অ্যাঞ্জেলিনার নাম হয় গওহর জান।
    আজ থেকে ১৪৫ বছর আগে ১৮৭৩ সালের ২৬ শে জুন উত্তর প্রদেশের আজমগড়ে জন্ম গওহর জানের।গ্রামোফোন কোম্পনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে যার গান রেকর্ড করে।রাগ যোগিয়া গেয়েছিলেন তার প্রথম রেকর্ডে।এরপর প্রায় ৬০০ খানা রেকর্ড বের হয় তার।আজ থেকে ১০০ বছর আগেই গওহর জান সেই সময়ে হয়েছিলেন কোটিপতি।অথচ শেষ জীবনে প্রায় কপর্দকশূন্য হয়ে কাটাতে হয়েছিল মহিশূরের রাজপ্রাসাদে।ওখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।আজ তার জন্মের ১৪৫ তম বছরে গুগলও তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে গুগল ডুডল এ।

শুক্রবার, ১ জুন, ২০১৮

আমারা কিন্তু নজর রাখছি ~ অরুণাচল দত্ত চৌধুরী

নজর রাখছি সরল রেখায়, নজর রাখছি গন্ধ শুঁকে।
নজর রাখছি চক্রপথে, নজর রাখছি বেজার মুখে।

বেসরকারি নজর রাখছি কোন বেয়াদব চেঁচায়, কে ও?
দুঃশাসনিক নজর রাখছে যুধিষ্ঠিরের কুকুর… সে'ও।

নজর রেখে রাজার লেঠেল অবাধ্যদের খুব ঠ্যাঙাচ্ছে।
নজর রাখছি কোথায় কে কে, উন্নয়নকে মুখ ভ্যাঙাচ্ছে।

নজর রাখছি ফিসফিসানি। নজর রাখছি উঁচু গলার।
নজর রাখছি ঠিক কতজন খবর পায়নি মহেশতলার।

নজর রাখছি ব্যঙ্গ করা ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমীদের।
কোন নাস্তিক ঝগড়াতে নেই, রামনবমী এবং ইদের।

ভোটের হিসেব নজর রাখছি।নজর রাখছি প্রশাসনিক।
বাইকে চড়ে নজর রাখছি। নজর রাখছি সুপারসনিক।

নজর রাখছি। রুখতে হবেই ভিন্ন চিন্তা নামের ও' রোগ।
ঠিক সময়ে ঘুরবো আবার নজর রাখা হাওয়া মোরগ।

বুধবার, ২৩ মে, ২০১৮

বেদান্ত ও গণহত্যা ~ পুরন্দর ভাট

তামিলনাড়ুর থুত্থুকুডিতে সতেরো  জন বিক্ষোভকারীকে স্নাইপার দিয়ে গুলি করে খুন করলো পুলিশ। তারা বেদান্তর স্টারলাইট তামা কারখানার দূষণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। এলাকার জল বায়ুতে  ব্যাপক দূষণ করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট একবার জরিমানা করেছিল স্টারলাইটকে। তখন থেকে বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল যে কারখানা ওখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে। সেই দাবি দশ বছর ধরে করেও কোনো ফল হয়নি। তাই গত একশো দিন ধরে ধর্নায় বসেছিলেন এলাকার মানুষ, আজকে তারা মিছিল করে জেলা শাসকের অফিসের দিকে যেতে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। 

এই সেই বেদান্ত, যারা ওড়িশার নিয়ামগীরীতে, খনন করার জন্য হাজার হাজার আদিবাসীকে ভিটে মাটি ছাড়া করার চেষ্টা করেছিল। আদিবাসীরা প্রতিবাদ করলে, তাদের মাওবাদী আখ্যা দিয়ে অকথ্য অত্যাচার নামিয়ে এনেছিল পুলিশ। শেষ অবধি  সব অত্যাচার প্রলোভন উপেক্ষা করে সুপ্রিম কোর্টে জয়ী হয় কোঁধ উপজাতির আদিবাসীরা, প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হয় বেদান্ত। রিয়্যাল লাইফ "Avatar."  

এই সেই বেদান্ত, যাঁরা মাত্র ৫০৭ কোটি টাকা দিয়ে, কেন্দ্র সরকারের লাভজনক সংস্থা ব্যালকোকে কিনেছিলো বাজপেয়ী সরকারের কুখ্যাত "বিলগ্নিকরণ"-এর আমলে। তার বিরুদ্ধে লাগাতার ধর্মঘট করেছিল শ্রমিকরা, লড়াই করেছিল ছত্তিসগড়ের মুখ্যমন্ত্রী অজিত যোগী। লাভ হয়নি, লোকসভায় পাশ হয়ে যায় বিল। একাধিক একাউন্ট্যান্টের মতে যে কোম্পানির দাম হওয়া উচিত ছিল ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি, সেই কোম্পানির দাম মাত্র ১ হাজার কোটি টাকা ধার্য করে ৫১ শতাংশ শেয়ার ৫০৭ কোটি টাকায় বেদান্তকে বিক্রি করেছিল বাজপেয়ী সরকার।  

এইখানেই শেষ নয়। ২০১৪ সালে একটি স্বেচ্ছা সেবামূলক সংস্থা, দিল্লি হাইকোর্টে একটি হিসেবে পেশ করে যে কংগ্রেস এবং বিজেপি, উভয় দলই মোট ১৪ কোটি টাকা চাঁদা পেয়েছে বিদেশী সংস্থা বেদান্তর কাছ থেকে। বিদেশ থেকে পাওয়া মোট চাঁদার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দিয়েছে বেদান্ত, দুটো দলকেই। তখনকার বিদেশী মুদ্রা আইন অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের বিদেশী সংস্থার কাছ থেকে চাঁদা পাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। দিল্লি হাইকোর্টে মামলা হয়। এরপর, ২০১৮-তে এসে কেন্দ্র সরকার এক আইন পাশ করে সংসদে। সেই নতুন  আইন অনুযায়ী বিদেশ থেকে পাওয়া অনুদান বৈধ হয়ে যায়, শুধু ২০১৮ থেকে নয়, ১৯৭৬ থেকে পাওয়া সমস্ত অনুদানকেই বৈধ ঘোষণা করা হয় আইন অনুযায়ী। আইন পাশ করার পর মামলাটা কোর্ট থেকে খারিজ হয়ে যায়, বৈধ হয়ে যায় বেদান্তর কাছ থেকে পাওয়া ১৪ কোটি টাকা রাজনৈতিক অনুদান।  এই সেই বেদান্ত, যার কারখানা বাঁচাতে আজ পুলিশ পনেরো হাজার মানুষের ওপর গুলি চালালো।

এই সেই বেদান্ত, যার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গ্রাম সভার প্রাধান্যকে বাইপাস করার জন্য নতুন আইন আনছে মোদী সরকার, যার জন্য গত বছর কুনি সিকাকা জেলে গিয়েছিল।

সোমবার, ১৪ মে, ২০১৮

প্রহসিত ~ অনামিকা মিত্র

ভাঙছে নদীর পাড় দ্রুত। সশব্দ ভাঙনের কালে
আমরা শুনিনি কানে কিছু। মন দিই টিভি সিরিয়ালে।
এখন নির্বিকার থেকে, কোনও মতে নিজে বেঁচে থাকা
রাজপথে হেঁটে গেলে যাক, যার হাতে জয়ের পতাকা।

উলুখাগড়ারা মরে যাক। রাজা রণদামামা বাজায়।
আওয়াজে 'কথা'রা ঢেকে গেলে, 'জয়'কে দখল করা যায়।
প্রজাদের একটাই কাজ, বেঁচে থেকে রাজার ভজনা।
শুধু কেন মরে যেতে চায়, অবাধ্য বেকুব ক'জনা?

যে'হেতু জীবন একটাই, বেঁচে থাকা দারুন জরুরী
হাসি মুখে থাকার হুকুম। বিদূষক দেয় সুড়সুড়ি। 
শ্মশানে শান্তি থাকে খুব। এইখানে গ্রামে ও শহরে
প্রশ্ন তুলবে পেয়াদারা, কবি কেন রাজনীতি করে?

গণতন্ত্রের মুখোমুখি, দেশ ভরা খুদে হিটলারে।
প্রতিদিন গুণে নেওয়া হয়, ক'টা মাথা আছে কার ঘাড়ে?
মেধাবী মিডিয়া এইখানে সেজেগুজে কচলাবে লেবু
মাঝরাতে বাড়িতে আগুন। মরে যাবে ঊষা আর দেবু।

যে সময়ে মন ভালো থাকে, যে সময়ে সুখ থাকে মনে
মানুষেরা হাসে গান গায়, ভেসে যেতে পারে প্রহসনে।
রাজাদেশ ছড়ায় গুজব। আমরা গুজব খেয়ে বাঁচি।
এখন কি সুখের সময়? আমি কেন প্রহসনে আছি?

পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়ন ~ আর্কাদি গাইদার

সুপ্রভাত।

ভোরের চায়ের সাথে স্টোভে সেঁকা কড়কড়ে পাউরুটির পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া কালো পৃষ্ঠটা জিভে ঠেকিয়ে আস্বাদন করুন পঞ্চায়েত ভোটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হিসেবে কড়কড়ে করে পোড়ানো দুটো মানবদেহ।

কয়লা হয়ে পড়ে আছে কাকদ্বীপের কাছাড়ী বাড়ি(নামখানা) এর বুধখালি গ্রাম পঞ্চায়েতের ২১৩ নং বুথের কমরেড দেবু দাস ও কমরেড ঊষা দাস। রাতেরবেলা জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে দুজনকে। 

কারন তারা সিপিআই(এম) কর্মী।

যেমন জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিলো আফরাজুলকে। 
কারন সে মুসলমান।

আফরাজুলের খুনি শম্ভুলাল রেগরের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন তো? ঘৃনা করেছিলেন তো? করুন। কারন মমতার বাংলায় বসে খুনি মোদীর বিরুদ্ধে গলা ফাটানো যায়, প্রতিবাদী হওয়া যায়, বাহ্বাও পাওয়া যায়। কিন্তু অনেক অনেক দেবু দাস, উষা দাস, হাফিজুল মোল্লা ক্ষয়ে যাচ্ছে এই মাটিতে, কিন্তু ভয়, ভয়, ভয়, ক্রেন দিয়ে টেনেও আমাদের শিরদাঁড়াগুলো সোজা করা যাচ্ছে না।  নৈশব্দের কারফিউ জারি করেছি আমরা প্রত্যেকে নিজেদের ওপর, একের পর এক দেহের ভারে চাপা পড়তে পড়তে শুনতে, দেখতে, বলতে ভুলে গেছি।

আপনারা প্রত্যেকে, হ্যা প্রত্যেকে, আসামী। কারন আপনারা প্রত্যেকে যারা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে, ফ্যাসিবাদের জুজু দেখিয়ে, নিরাপদ অবস্থান রেখে মুখে কুলুপ এটেছেন, আপনারাই এই খুনিদের সক্রিয়করণকারী।

Everyone who is silent is complicit.

বৃহস্পতিবার, ১০ মে, ২০১৮

শঙ্খধ্বনি ~ অরুনাচল দত্তচৌধুরী

এ্যাই শোন, ওই কবির নামটা কে রেখেছিস্ শঙ্খ?
জানিস তোরা, বুঝিস তোরা, উন্নয়েনের অঙ্ক?
আমি ফুঁ দিই পাঞ্চজন্যে, আমিই বাজাই ঢাক
চড়াম চড়াম চড়া আওয়াজ। মুখটি বুজে রাখ।

আমায় যিনি পোষেন, গলার শেকলটি যাঁর হাতে
যাঁর প্রশ্রয় যোগায় সাহস উদ্ধত উৎপাতে
তাঁর ইচ্ছেতেই উন্নয়নকে রাস্তাঘাটে ছেড়ে
একতরফা আবীরখেলা। তুই বলবার কে রে?

সুবোধ যত দামাল ছেলের তিনিই অভিভাবক
বাংলাভাষার মুখাগ্নিতে পাটকাঠি আর পাবক।
যুগ্মরোলের এই খেলাতে তাঁকেই করে মান্য
কবি এবং কবিনীদের যায় জুটে 'উপান্ন'।

বিদ্দ্বজ্জন উন্নয়নের এমন ভাগ্যদোষে
হাত বোলাচ্ছে দাড়িতে, আর কণ্ঠের বকলসে।
লেক টাউনের বিগবেন আর নিউটাউনের টুনি
উন্নয়নের এই যে ঝলক, দেখিসনি কে শুনি!

রাস্তা ঘাটের হাল দেখেছিস? কেমনটি ঝকঝকায়!
রুটিন কাজকে উন্নয়নের পোষাক দিয়ে ঠকায়।
সেই উন্নয়ন তোদের জন্য পাড়ার মোড়ে মোড়ে
শায়েস্তা খান সেজেছে আজ, দেখিসনি কি ওরে?

আজ থেকে শোন শঙ্খ ও নয়। আমিই তোদের জন্য
তাঁর হুকুমে শঙ্খ সেজে, হলাম পাঞ্চজন্য।

শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১৮

আসিফা ~ অনির্বান মাইতি

আজকে সকালে ফেসবুক খুলতেই দেখি আবারো এক ধর্ষণ। সত্যিই বিরক্তি নিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছিলাম একটি স্টেটাসে চোখ গেল। গীতাকে নিয়ে বামপন্থীরা কিছু বলছে না সেই নিয়ে সেখানে দরবার বসেছে।
একটা পরিষ্কার কথা আবারো বলি আসিফার ঘটনা স্বতন্ত্র কয়েকটি কারণে।
১) একজন এম এল এ এবং একজন আই পি এস অভিযুক্ত ধর্ষক হিসেবে
২) ধর্ষণে অভিযুক্তদের বাঁচাতে ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দল থেকে মিছিল করা হয়।
৩) জাতীয় পতাকা কে ধর্ষকের স্বপক্ষে ব্যবহার করা হয়।
৪) আসিফার প্রতি অসম্মানসূচক পোস্টে ভরে গিয়েছিল ফেসবুক তার অধিকাংশই ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠীর লোকেরা করেছিল।
৫)অভূতপূর্ব ভাবে গোটা বার এসোসিয়েশন আসিফার উকিলের বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে কোনঠাসা করে। বার এসোসিয়েশন বিজেপি পরিচালিত।
৬) তদন্তকারী অফিসারকে হিন্দুত্ববাদীরা ক্রমাগত চাপ দিয়েছে তদন্ত না করতে।
বামপন্থীরা আসিফার ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বানায় নি, উপরিউক্ত ঘটনাগুলিই কি যথেষ্ট না কোন ঘটনায় রাজনৈতিক রঙ চড়াতে? তাই আসিফার ঘটনা শুধু বামপন্থী কেন হবে আপামর ভারতবাসীকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।
এবার আসি গীতার কথায়, গীতা মাদ্রাসার ভিতরে নিগৃহীত হওয়ায় হিন্দুকুল কিন্তু আসলে রাজনৈতিক অক্সিজেন পেয়েছেন। গীতার ধর্ষকের জন্য কেউ মিছিল করে নি, কোন ধর্ম তার পাশে দাঁড়ায় নি, কেউ তাকে বাঁচাতে চায় নি, তবে গীতার ঘটনা আর আসিফার ঘটনায় মানুষের প্রতিক্রিয়া এক হবে কি করে? গীতার ধর্ষক সমাজের গণ্যমান্য নন যে তাকে শাস্তি দিতে গোটা দেশকে পথে নামতে হবে, শাস্তি তার হবেই সেটাই কাম্য। যে ঘৃণ্য অপরাধ এরা সকলেই করে চলেছে অবিরত তার শাস্তি চাই।
দয়া করে ব্যালেন্সের খেলা খেলবেন না। মনে রাখবেন দুর্জন শত্রু কখনো চোখে আঙুল দিয়ে ভুল দেখিয়ে দিলে পরিষ্কার বুঝে নেবেন ওটা ফাঁদ, ওদিকে যাবেন না। আর যদি একান্তই খেলেনই তবে ভারতীয় পরিসংখ্যান বলছে কাল গোটা দিনে প্রায় নব্বই টি শিশুর যৌন নিগ্রহ হয়েছে এই দেশে। তাদের সকলের নাম এবং ধর্ম খুঁজে এনে ধর্ম, ধর্ম আর রেপ প্রতিবাদ, রেপ প্রতিবাদ খেলুন, ব্যাপারটা অথেনটিক হবে।

বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৮

কুত্তার বাচ্চা ~ ঋষেণ ভট্টাচার্য্য

গত শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ শেয়ালদায় 9C প্লাটফর্ম ধরে হাঁটছিলাম গঙ্গাসাগর এক্সপ্রেস ধরবো বলে। শনিবার সাধারণত ওটাই ধরি। ট্রেন প্লাটফর্মে দিয়ে দিয়েছে বলে বেশ তাড়াতাড়ি হাঁটছি। প্লাটফর্ম ফাঁকা। আমি ট্রেনের মাঝামাঝি, আর একদম সামনের দিকে জেনারলে উঠতে হবে। কম্পার্টমেন্টে উঠে প্লাটফর্মের দিকেই একটা জানলার ধার পেয়ে গেলাম। ট্রেন ছাড়তে এখনো মিনিট দশেক দেরি। কম্পার্টমেন্টের ভেতর ভ্যাপসা গরম, দুর্গন্ধ, মেঝেতে জল পড়ে লোকের পায়ের ধুলোয় কাদা কাদা ছাপ, মাথার ওপর আলু লঙ্কার বস্তার ঝাঁঝ, এখনো আলো পাখা জ্বালানো হয়নি - সব মিলিয়ে নরক। ফ্রান্স জার্মান ডেনমার্কে আমার মত সাধারণ মানুষ কেমন ভাবে ট্রেন জার্নি করে আর কার কোন পাপে আমি এদেশে জন্মে কি ভাবে ট্রেন জার্নি করি ভাবতে ভাবতে, গন্ধ থেকে বাঁচতে জানলায় মুখ লাগিয়ে প্লাটফর্মের দিকে তাকিয়ে বসলাম।

হঠাৎ দেখি একটা সাদা কালো ছোপ ছোপ নেড়ি কুকুরের বাচ্চা তার খয়রি রঙের মায়ের সাথে খেলছে। মা শুয়ে শুয়ে ল্যাজ নাড়াচ্ছে আর বাচ্চাটা নানাদিক থেকে ছুটে ছুটে এসে মায়ের গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মাও শুয়ে শুয়ে বাচ্চাটাকে হাত পা দিয়ে ধরার চেষ্টা করছে, উল্টে যাচ্ছে, বাচ্চাটাও মায়ের নাগাল ছাড়িয়ে একটু দূরে ছুটে গিয়ে প্রবল বিক্রমে ফিরে এসে আবার মায়ের গায়েই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মা বাচ্ছাটাকে খেলাচ্ছে আবার মাঝে মাঝে দেখে নিচ্ছে লোকজনের যাতায়াতের পথে কেউ যেন মাড়িয়ে না দেয়। বাচ্ছাটাও হুঁশিয়ার, মাঝে সাঝেই দেখে নিচ্ছে সে যেন মায়ের থেকে যেন বেশি দূরে চলে না যায়। কাছাকাছি কোনো বসার জায়গা বা থামের আড়ালে একটু লুকিয়েই আবার মায়ের গায়ে লাফিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়া। আর মায়েরও সেই ল্যাজ নেড়ে নেড়ে বাচ্ছাকে খেলানো। বেশ লাগছে দেখতে।

কতক্ষণ সময় কাটলো জানিনা, দুজন আর.পি.এফ বা জি.আর.পি. স্টাফ একটা কুচকুচে কালো ল্যাব্রাডর নিয়ে ধিরে সুস্থে আমার কম্পার্টমেন্টে এসে উঠলো। ট্রেন্ড ল্যাব্রাডর নিঁখুতভাবে সমস্ত কম্পার্টমেন্ট শোঁকাশুঁকি করে পুলিশদের সাথেই কম্পার্টমেন্ট থেকে নেমে পড়লো। পুলিশ দুটো আমার কম্পার্টমেন্টের সামনেই বসার জায়গায় ল্যাব্রাডরের স্ট্র‍্যাপটা হাত থেকে ছেড়ে, একটু বসলো, হয়তো অনেকগুলো কম্পার্টমেন্ট সার্চ করে ক্লান্ত কিম্বা হয়তো ইন্সট্রাক্সন থাকে ট্রেন না ছাড়া অবধি প্লাটফর্মেই ডিউটি দিতে হবে। ল্যাব্রাডরটাও শক্ত কাঁধে মাথা উঁচু করে সাবধানী ভঙ্গিতে পাশে দাঁড়িয়ে।

এদিকে সেই মা আর বাচ্চার খেলা একটুর জন্য থেমেছে। মা ভীষণ উৎকণ্ঠার সাথে ভারী চেহারার বিজাতীয় কুকুরকে দেখছে। বাচ্ছাটার কিন্তু ভ্রক্ষেপও নেই। মা খেলা বন্ধ করতেই বাচ্ছাটা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো ল্যাব্রাডরটার দিকে। বাচ্ছাটা একটু ভয়ে ভয়ে বিরাট বড়সড় চেহারার ফরেনারকে দেখছে, মাথাটা যতটা সম্ভব উঁচু করা যায় করতে গিয়ে উল্টে পড়লো তার পায়ের কাছে। মাও ওদিকে গা ঝাড়া দিয়ে বসে পড়েছে, আমার হাসি পেলেও তার মা কিন্তু ভীষণ উত্তেজিত - যদি অতো বড় চেহারার কুকুরটা কামড়ে দেয় তার বাচ্ছাকে। পুলিশ অফিসারটিও সাংঘাতিক বিভ্রান্ত। অন ডিউটিতে কি খেলা করা উচিত? নাকি দুধের শিশু দেখলে অন ডিউটিতেও একটু চুমু খাওয়া যায়? অফিসার খুব তাড়াতাড়ি আলগোছে বাচ্ছাটার মাথায় একটা চুমু দিলো। ব্যাস, বাচ্ছাটা পেয়ে গেলো নতুন বন্ধু। এক পাক গড়িয়েই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বাচ্ছাটা ছুট মারলো মায়ের কাছে। মায়ের পিঠে একটা গুঁতো মেরেই আবার ছুট অফিসারের দিকে। ওদিকে জাঁদরেল অফিসারও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ল্যাজ নাড়ছেন, আর মাঝে মাঝে একবার তাঁর হায়ার অথরিটি বা বসেদের দিকে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছেন, তাঁরা কিছু মনে করছেন কিনা। পুলিশ দুটির কোনো ভ্রুক্ষেপও নেই সে দিকে। তারা নিজেদের মধ্যেই গল্পে মশগুল। আমি হাসছি। ভাগ্যিস জাপান ইংল্যাণ্ড অস্ট্রেলিয়ার বদলে ভারতবর্ষে জন্মেছি। তাইতো প্লাটফর্মে স্ট্রে-ডগের বাচ্ছার সাথে পুলিশ কুকুরের খেলা দেখতে পাচ্ছি। মা শুয়ে শুয়ে ল্যাজ নাড়ছে, বাচ্ছাটা ছুটে ছুটে এসে মায়ের ল্যাজ ছুঁয়ে দিচ্ছে, মা ধরতে গেলেই পালাচ্ছে পুলিশ কুকুরটার কাছে। সেও কান নামিয়ে ল্যাজ নেড়েই চলেছে, তার ল্যাজ ছুঁতে এলেই সে বাচ্ছাটার মাথা চাটছে। বাচ্ছাটা আবার ছুটে মায়ের কাছে।

নাইন-সি প্লাটফর্মে সামনের দিকে রেলিং নেই। এই ছোটাছুটি করতে করতেই বাচ্ছাটা হঠাৎ পড়লো লাইনে। মাও এক নিমেষে ঝাঁপ মারলো লাইনে। আমিও ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্মের ধারে গেলাম দেখার জন্য। বাচ্ছাটা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। মা বার দুয়েক বাচ্ছার পেছনে আর পেটে ধাক্কা দিলো মুখ দিয়ে। বাচ্ছাটা কাঠের স্লিপার থেকে লাইনের ওপর দাঁড়ালো, ব্যালেন্স নেই। উল্টে পড়লো। মা চারপায়ে ব্যালেন্স করে লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে। বাচ্ছাটাও উঠলো লাইনের ওপর। মা আবার ধাক্কা দিলো পেছেন দিকে। বাচ্ছাটা উল্টে পড়লো স্লিপারে। আমার বিরক্ত লাগছে মায়ের ওপর, কেন যে ওইটুকু বাচ্ছা কে ঠেলে লাইন থেকে প্লাটফর্মেই তুলতে হবে কে জানে! ওইটুকু বাচ্ছা কি অতটা লাফাতে পারে? ওকে একটু ঘুরিয়ে সামনের স্লোপ দিয়ে প্লাটফর্মে তুলে নিলেইতো হয়! শেয়ালদা স্টেশন, ব্যস্ত লাইন। কখন ট্রেন চলে আসবে আট নম্বরে। আবার ধাক্কাধাক্কি চললো কিছুক্ষণ। লাইন থেকে প্ল্যাটফর্ম, একটা প্রমাণ সাইজ মানুষের বুক সমান উঁচু লাফানো সম্ভব নয় বাচ্ছাটার। এবার মা চেষ্টা করছে মুখে করে তুলে নিতে। মা ভাবলো, বাচ্ছার ঘাড়ের কাছে কামড়ে ধরে লাফিয়ে উঠবে। আমিও নিশ্চিন্ত। কিন্তু হলো না। মা বাচ্ছাটাকে মুখে নিয়ে মুখ উঁচু করে লাফাতে পারছে না। মুখে নিয়ে লাফাতে গেলেই বাচ্ছাটা পড়ে যাচ্ছে মুখ থেকে।

মা লাফিয়ে উঠলো প্লাটফর্মে। পুলিশ কুকুরটার দিকে স্পষ্টভাবে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত গলায় ঠিক দু'বার ডাকলো। সাধারণ চিৎকার নয়, কেমন যেন একটু চাপা গলার আওয়াজ।

শুনেছি ল্যাব্রাডর রেস্কিউ ডগ, গান ডগ। অনায়াসেই বিশাল ওয়েট ক্যারি করতে পারে। চোয়াল অ্যাতোই শক্তপোক্ত যে ভুজের ভূমিকম্পের সময় মাটির ১২ ফুট নিচ থেকে জামার কলার ধরে টেনে তুলতো মৃতদেহ। কিন্তু সে সব নয়, আমি দেখলাম এক অদ্ভুত জিনিস।

মা কুকুরটা একবার সাহায্য চাইতেই তড়াক করে লাইনে নেমে পড়লো ল্যাব্রাডরটা। আর.পি.এফ. বা জি.আর.পি. স্টাফদুটোও অবাক। ট্রেন্ড ডগ কখনো ওভাবে চলে যায় নাকি? ওরা দাঁড়িয়ে পড়েছে অবাক হয়ে। মা কুকুরটা আবার লাফ মারলো লাইনে। ল্যাব্রাডরটার লাফানোতে ভয় কিনা জানিনা, বাচ্ছাটা মারতে গেল এক ছুট, কিন্তু মা টা ঠিক তার আগেই ধরে ফেলেছে বাচ্ছাটাকে। আমি দেখেছি যে কোনো শ্বাপদ দাঁত দিয়ে বাচ্ছার ঘাড়ের কাছটা ধরে তোলে। ঠিক যেভাবে মা এখন বাচ্ছাটাকে ধরে আছে। আর আশ্চর্য, ল্যাব্রাডরটা বিশাল হাঁ করে বাচ্ছাটার পেটের কাছে ধরলো। মা ছেড়ে দিয়েছে বাচ্ছাটাকে। ল্যাব্রাডরটা অবলীলাক্রমে বাচ্ছাটাকে মুখে নিয়ে নিজের দেহটা একদম নিচু করে এক লাফ মারলো প্লাটফর্মে। অবাক কাণ্ড, উঠেও মুখ থেকে নামাচ্ছে না বাচ্ছাটাকে। প্লাটফর্মের ধারে দাঁড়িয়ে আছে লাইনের দিকে তাকিয়ে। এবার মা উঠলো লাফ মেরে। বাচ্ছাটা ছটফট করছে মুখের ভেতর। তাও ছাড়েনা।  দুজন পুলিশের একজন ডাকলো, "জয়!" ল্যাব্রাডরটা তাকালো পুলিশটার দিকে, মুখে বাচ্ছা। নামাবার নামও নেই। মা প্লাটফর্মে উঠে মাঝামাঝি চলে এসেছে। এবার জয় বাচ্ছাটাকে ছাড়লো, একেবারে মার কাছে গিয়ে।

এখন জয় বসেছে  পুলিশ দুটোর পাশে। আবার সেই শক্ত কাঁধে মাথা উচু করে কম্পার্টমেন্টের দিকে তাকিয়ে থাকা, হাজার হাজার লোকের মধ্যে সন্দেহভাজনকে খুঁজে বের করে চিনিয়ে দেওয়া, গাদা গাদা মালপত্রের মাঝে আসল মালকে শুঁকে আলাদা করা।

আমার ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। কি জানি, ওই শেয়ালদার উদ্বাস্তু মা বোধ হয় বাচ্ছাটাকে ওখানেই মানুষ করবে। ট্রেন ছাড়ার পর অফিসার আবার নীল বকলসটা পরে নিয়ে অন্য ট্রেনে ডিউটি করতে উঠবে বা অন্য প্লাটফর্মে টহল দেবে। কিন্তু এই অফিসারের কাছে যখন এক একা অসহায় নারী তার শিশুর জন্য সাহায্য চায়, সেই নারীকে সে রেপ করতে যায় না। বলে না ওটা আমার জুরিসডিক্সান নয়। কিম্বা অসহায়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিশেষ রকম কিছু প্রত্যাশাও করে না। অত্যন্ত দায়িত্বসহকারে তার কর্তব্য পালন করে। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার ভাষা। অ্যাতো অনুন্নত মনুষ্যেতর জীব হয়েও দুটি বিজাতীয় নারী পুরুষ কেমন সুন্দর একে অপরকে সমস্যা বোঝালো আর সমাধান করলো।

আমি জানতাম, পুলিশ ডগ স্পেশালি ট্রেন্ড। তারা কখনই বিশেষ কিছু গন্ধ ছাড়া অন্য কিছুকে পাত্তা দেয়না। অন্য জীবজন্তুর ধারে কাছেও যায় না। তারা অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে থাকে। অনান্য জীবজন্তু থেকে আগত ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণের ব্যাপারেও তারা সচেতন, এমনিই তাদের প্রশিক্ষণ। প্রভুর আদেশ ছাড়া নাকি তারা জৈবিক তাড়নাতেও সাড়া দিতে দ্বিধা বোধ করে। কিন্তু না, তারা চোখ বন্ধ করে আইনের কথা ভাবে না, তারা মানবিক, তাদের বিচারবুদ্ধি সুস্থ। আমাদের মত শুকনো নয়।

আমি কিন্তু অফিস যাওয়া আসার পথে রাস্তার ফুটপাতে বসে থাকা ভিখিরিগুলোকে ঘেন্না করি। দামি সাবান আর পার্ফিউম্ মেখে অফিসে যাই তো - পাগল নাকি! কোনো উদ্ববাস্তুর বাচ্ছা ড্রেনে পড়ে গেলে কোলে করে তুলে আনবো? সময় থাকলে বড় জোর মোবাইলে একটা ছবি তোলা যেতে পারে।

ওটাতো একটা কুকুর, আমিতো আর কুকুর নই।

মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৮

ভাগাভাগি ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

মরল যারা আমার শহিদ,
আর খুনিরা? ও'দের।
প্রেসকে ডেকে বিবৃতি দিই
সফল প্রতিরোধের।

গণতন্ত্রের এই খেলাতে
গোটা কতক লোককে
মরতে সে'তো হবেই বাপু
পৌঁছে যেতে লক্ষ্যে।

জিতলে পরে? ব্যাপক মজা
স্বদেশ লুঠের বখরা
পাবার লোভে ঝকঝকে আজ
দন্ত এবং নখরা।

বিপ্লব? সে কবেই উধাও
ধর্মতাসের কড়চা
সঠিক ভাবে খেললে হবেই
দু'চারটি প্রাণ খরচা।

বাংলার এই ভাগ্যাকাশে 
দর্শন নেই রোদের
ডেডবডি সব আমার ভাগে
অস্ত্র? সে' সব ও'দের।

শনিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৮

ফাতিমা ~ দেবাশীষ সেনগুপ্ত

লক্ষ্নৌ এয়ারপোর্টটা আমার খুব প্রিয়। ছোট্টখাট্টো জাঁকজমক শূন্য একটা এয়ারপোর্ট। সাকুল্যে পাঁচখানা বোর্ডিং গেট, ইতিউতি ছড়ানো বসার জায়গা। দুএকটা খাবারের দোকান, একটা খাদি স্টোর আর একটা চিক্কনের কাপড়ের দোকান। ব্যস, খেল খতম! কেমন একটা ঘরোয়া পরিবেশ। বড় বড় এয়ারপোর্টগুলোর মত গিলে খেয়ে নেয় না।
ফ্লাইট মাত্র পনেরো মিনিট লেট, এখন আর অস্বাভাবিক লাগে না। তায় এ আবার দীর্ঘ দুরত্বের ফ্লাইট! দিল্লী-লক্ষ্নৌ-পাটনা-কলকাতা-বেঙ্গালুরু। আকাশপথে ভারতদর্শন!

বোর্ডিংয়ের পরই মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। আমার পেছনের সারিতেই এসে বসল পাঁচজন ষন্ডামার্কা ভাইয়া গোছের মক্কেল। সাদা শার্ট, চোখে কালোচশমা, গলায় মোটা সোনার চেইন আর মুখে ভকভক করছে বীয়ারের গন্ধ।  
এরা চারপাশের কাউকে মানুষ বলে গন্য করে না। তারস্বরে চেঁচিয়ে কথা বলে, হ্যা হ্যা করে হাসে, মেয়ে দেখলে চোখ দিয়ে গেলে বেহায়ার মত! গোটা উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান জুড়ে ছড়িয়ে আছে এই বলদগুলো।
যাই হোক, আমি বুঝে গেলাম আমার টুকরো ঘুমের দফারফা। তবে কথাবার্তায় বুঝলাম দলটা পাটনায় নেমে যাবে। আপাততঃ ওটুকুই সান্ত্বনা।

টেকঅফের পরেই এইসব ছোটদূরত্বের ফ্লাইটে বিমানবালাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। আধঘন্টার মধ্যে সবাইকে খাবার / জল পরিবেশন করে, উচ্ছিষ্ট সাফ করে ওঠা চারজনের পক্ষে চাট্টখানি কথা নয়। সীটনম্বর অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে নিলেও একেকজনের ভাগে ৩০ / ৩৫ জন প্যাসেঞ্জার তো পড়েই।
আমাদের ব্লকে যে মেয়েটি ট্রলি গড়িয়ে খাবার দিতে শুরু করল সে দেখলাম একটু ধীর স্থির। পেশাদারী হুটোপুটি এখনও রপ্ত হয়নি হয়ত। আমার পিছনের সীটের একভাইয়া তাকে হাত উঁচিয়ে ডাকলো, সে অল্প হেসে অপেক্ষা করতে বলল। দুমিনিট পরই আবার বেল বাজিয়ে ডাক। এবার মেয়েটি বলেই ফেলল - প্লীজ ওয়েট! একেক করে আসছি।
দুমিনিট পরই আবার ডাক, এবার উদ্ধতভাবে - হেই! হ্যালো! শুনো ইধার! 
মেয়েটি এলো খানিকটা - স্যর, ইয়ে রুল হ্যায়। সিরিয়ালী আনা হ্যায় মুঝে।
ভাইয়াজীর মুখটা দেখা গেল না, তবে গলায় ঝাঁজ একইরকম - পানি দেনা জারা।

হ্যাঁ, জল চাইলে দেওয়াই যায়। নিয়ম বা খিদের চেয়ে তেষ্টা সবসময় জরুরী।
মেয়েটা জল হাতে এগিয়ে এলো, আমি ঘাড় ঘোরালাম। একমিনিটের নিস্তব্ধতা, লোকটা একঝলক নজর বুলিয়ে নিল মেয়েটার বুকে আর তারপরই মুখ ঘুরিয়ে - রহনে দিজিয়ে। নেহী চাহিয়ে!
আমি অবাক, আরো দুচারজন ঘাড় ঘোরানো পাবলিকও অবাক! একমুহূর্তের জন্য মনে হল উঠে গিয়ে কষিয়ে চড় বসিয়ে দিই গালে। জল তেষ্টাটা অছিলা ছিল! আসলে কাছে ডেকে দেখার জন্যই তবে ....... ! ছিঃ
কিন্তু পরমুহূর্তেই চোখ চলে গেল ফর্সা মেয়েটার অপমানে প্রায় লাল হয়ে আসা মুখের দিকে। তারপর বুকে বসানো ব্যাজটার দিকে। মনকে আপ্রাণ বোঝাচ্ছি, না হতে পারে না। আগে যেটা ভেবেছিলাম সেটাই ঠিক নিশ্চয়ই।

ভাবতে ভাবতে অজান্তেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছি আমি। গ্লাসটা আমার হাতে ধরিয়ে মেয়েটা টানটান হয়ে দাঁড়াতেই আমার পাশের সর্দারজী হাঁক দিলেন - মুঝে ভী দিজিয়ে পানি। 
প্রায় একইসঙ্গে পাশে বসা তাঁর স্ত্রীও বলে উঠলেন - মুঝে ভি! ওপাশের যে দুজন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিল ঘটনাটা, তারাও বাড়িয়েছে হাত - ওয়াটার প্লীজ! কি সর্বনাশ! এরা সবাই দেখেছে! সবাই বুঝেছে! তাই অন্ততঃ সাত আটজন যাত্রী তেষ্টা না পাওয়া সত্বেও জল চেয়ে খাচ্ছে!
পিছনের সারিতে তখন স্তব্ধতা। অপরাধবোধ? কে জানে! কয়েক সেকেন্ডের ফিসফাসের পর সব চুপ।
মিনিট দশেক পর মেয়েটি আমাদের সারিতে সার্ভ করা শেষ করতেই অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় তার টীমলিডার এসে ট্রলির ভার নিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে সেই পরিচিত গলা - জারা পানি দিজিয়েগা তো!
ঠান্ডা বরফচোখে তাকালো টীমলিডার মেয়েটি, তারপর গলাটা একটু চড়িয়ে ডাক দিলো আগের মেয়েটিকেই - ফতিমা! ইনকো পানি দেনা প্লীজ!
তারপর? তারপর আর কি! ৩৪০০০ ফুট ওপরে একটা ছোট্ট লড়াইতে জিতে গেল একদল মেয়ে!


জাস্টিস ফর আসিফা ~ আশীষ দাস

আমেরিকায় গত কয়েক বছর ধরে একটা আন্দোলন হয়েছিল, "ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার" বলে। একটু খোঁজখবর রাখা লোকমাত্রেই জানবেন আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষ এখনো বেশ ভালই রয়েছে। বিশেষত পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গদের হেনস্থা হবার ঘটনা আকছার হয়। সামান্য ট্রাফিক ভায়োলেশন যেখানে শ্বেতাঙ্গদের সতর্ক করে বা সামান্য জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয় সেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের গ্রেপ্তার করা, কৃষ্ণাঙ্গ কেউ দামী গাড়িতে গেলে চোর সন্দেহে তার কাগজপত্র চেক করা এসব তো রয়েইছে, ২০১৩ সালে এক কৃষ্ণাঙ্গ নাবালকের পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর পর আন্দোলনের তীব্রতা আরো বাড়ে। এবার এই আন্দোলনের সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় #ব্ল্যাকলাইভসম্যাটার বলে একটি ট্রেন্ড চালু হয়। কিছু রাইট উইঙ্গ, মূলত শ্বেতাঙ্গ, এই সময়ে একটি অন্য হ্যাশট্যাগ চালু করে। সেটি ছিল #অললাইভসম্যাটার। আপাত দৃষ্টিতে খুব সত্যি কথা। সবার জীবনেরই দাম আছে। কিন্তু ভেবে দেখুন যেখানে অত্যাচারের শিকার হচ্ছে মূলত কৃষ্ণাঙ্গরা, আন্দোলনটাই সেইজন্য, সেখানে এরকম ভাবে জেনারালাইজ করার কারণ কী? সকল মানবের জীবনের প্রতি ভালবাসা? না এই যে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি পার্টিকুলার অবিচার, সেটাকে লঘু করে দেখানো? একটি নির্দিষ্ট অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে পৃথিবীর সকল অবিচার দিয়ে ঢেকে দেওয়া কি উদ্দেশ্যপ্রাণোদিত নয়? আপনি চাইলে অন্য অবিচারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামুন, নামতেই পারেন। কিন্তু ঘরে বসে থেকে যারা একটা অবিচারের বিরুদ্ধে লড়ছে তাদের আন্দোলনটাকে লঘু করে দিলে আমি বুঝবো আপনি আসলে অবিচারকারীর হাতই শক্ত করছেন।

***

এই একই জিনিস দেখা যাচ্ছে আসিফার ঘটনাটি নিয়ে। এটি রেপ, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করার জন্য ঘটানো পরিকল্পিত রেপ। আপনি এখানে অল রেপিস্ট শুড বি পানিশড বলে সেই কাজটাই করছেন যেটা মডারেট হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টরা করেছিল ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সময়। অবশ্যই অল রেপিস্ট শুড বি পানিশড, আপনি প্রতিটা রেপের পর প্রতিবাদ করুন না। কিন্তু এই রেপটির যে ধর্মীয়-রাজনৈতিক চরিত্র সেটিকে মুছে দেওয়াই যদি আপনার "অল রেপিস্ট শুড বি পানিশড" বলার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আপনিও এক্ষেত্রে সেই মৌলবাদী বর্বরগুলোর হাতই শক্ত করছেন। মনে রাখবেন ধর্ষকের ধর্ম হয়না, কিন্তু ভারতে রাজনীতির ধর্ম হয়। আর এই ধর্ষণটি একটি রাজনৈতিক ধর্ষণ, তাই এখানে ধর্ম নেই হলে এড়িয়ে গেলে হবেনা। যেমন আমেরিকায় সেই কৃষ্ণাঙ্গ নাবালকের হত্যাটি শুধুই পুলিশি গাফিলতি বলে রেসিজমকে এড়িয়ে গেলে সেটা সত্যগোপনই হবে।
আখলাক, পেহলু খান, আফরাজুল হয়ে আসিফা - এটা একটা প্যাটার্ন। এগুলোর বিরুদ্ধে বিশেষ ভাবে সরব হবার কারণ এগুলো র‍্যাণ্ডম অপরাধ নয়, একটা পার্টিকুলার কমিউনিটিকে অপ্রেস করার, ভয় দেখানোর ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।

***

এবার আরেকটা কথা বলে নেওয়া দরকার। আমি কোনভাবেই রেপিস্টকে প্রকাশ্যে থেঁতলে মারা, পুরুষাঙ্গ কেটে লঙ্কা ডলে দেওয়া এসব সমর্থন করিনা। পার্সোনালি আমি ক্যাপিটাল পানিশমেন্টেরও বিরোধী, তবে ভারতে যেহেতু এখন তা চালু আছে তাই সেটা হলে আপত্তি অন্তত করবোনা। ভারতের সংবিধান অনুযায়ীই এই রেপিস্টদেরও বিচার এবং সাজা হওয়া উচিত। বড়জোর ফাস্টট্র‍্যাক কোর্ট বসানো যায় যত শীঘ্র সম্ভব সাজা সুনিশ্চিত করতে। যদি আপনি বলেন "নিজের মা বোনের সাথে হলে কী করতে?" তাহলে আমার উত্তর হবে আমি খুন করে ফেলতে চাইতাম রেপিস্টকে। আর ঠিক এই কারণেই আমার হাতে শাস্তির ভার দেওয়া নেই। কারণ আমি সেই কাজটা করলে সেটা বিচার হত না, প্রতিহিংসা হত। ট্যারান্টিনোর হেটফুল এইট সিনেমায় একটা ডায়লগ আছে। "আ জাস্টিস সার্ভড উইদাউট ডিসপ্যাশন ইস নো জাস্টিস অ্যাট অল" (এক্স্যাক্ট কোট মনে নেই, এরকমই খানিকটা)। অর্থাৎ বিচার এবং শাস্তি তারই দেওয়া উচিত যার মনে আসামীর সম্পর্কে কোন আবেগ নেই। সেই বিচার আসামীর বন্ধু করলে যেমন অবিচার হবার সম্ভাবনা তেমনই আসামীর সম্পর্কে মনে ঘৃণা পোষণকারী করলেও। তাই ধর্ষিতার বাড়ির লোক ধর্ষককে সর্বসমক্ষে থেঁতলে মেরে ফেললে সেটা বিচার না, প্রতিহিংসা। আর প্রতিহিংসাকে বিচারের নামে চালালে কবে যে প্রতি উড়ে গিয়ে শুধু হিংসাকেও বিচার বলে চালানোর চেষ্টা হবে, সেটা নির্ণয় করা অসম্ভব।

ঈশ্বর পৃথিবীর সবথেকে বড় গুজব ~ চিত্রদিপ সোম

ভগবানের অস্তিত্বের দাবীদারদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া কিছু প্রশ্ন-

১) সমস্ত সৃষ্টির পিছনে যদি একজন সৃষ্টিকর্তার হাত থাকে, স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি যদি অসম্ভব হয়, তাহলে  ভগবানের স্রষ্টা কে?  

২) ভগবান স্থান (space) ও সময় (time) সৃষ্টি করেছেন কোন স্থানে বসে এবং কোন সময়ে?

৩) ঈশ্বর কি সাকার না নিরাকার? এক্ষেত্রে কোন ধর্মের কথা  মানবো এবং কেন? 

৪) যদি নিরাকার হন, তাহলে প্রায় সমস্ত ধর্মেই ঈশ্বরকে 'পুরুষ' বলে মনে করা হয় কেন? 'পিতা' সম্ভাষণ করা হয় কেন?  নিরাকারের কি কোনো লিঙ্গ পরিচয় সম্ভব? 

৫) যদি সাকার হন, তাহলে বিভিন্ন ধর্ম যারা ঈশ্বরকে সাকার বলে মানে, তাদের একের বর্ণিত ঈশ্বরের চেহারার সাথে অন্য ধর্মে বর্ণিত ঈশ্বরের চেহারার বিন্দুমাত্র মিল নেই কেন? উদাহরণ হিসাবে হিন্দু ও গ্রীক দেবদেবীদের একটা তুলনামূলক আলোচনা তুলে ধরা যাক।  ভারতীয় দেবদেবীরা চেহারা, পোশাক, ভাষায় পুরোপুরি ভারতীয়, আবার গ্রীক দেবদেবীরা চেহারা, পোশাক, ভাষায় পুরোপুরি গ্রীক। ভারতীয় সব দেবদেবীদের চুলের রঙ ভারতীয়দের মতই কালো, আবার গ্রীক দেবদেবীদের চুলের রঙ গ্রীকদের মতই বাদামী। ভারতীয় দেবীরা ভারতীয় মহিলাদের পোশাক শাড়ি পড়েন, আবার গ্রীক দেবীরা ঝুলওয়ালা গাউন পরেন। কেন?  কেন ভারতীয় দেবীদের পরণে গাউন আর গ্রীক দেবীদের পরণে শাড়ি নেই? কেন গ্রীক দেবতাদের চুল কালো এবং ভারতীয় দেবতাদের চুল বাদামী নয়?  অনান্য ধর্ম সম্পর্কেও একথা খাটে। গ্রীক  দেবরাজ জিউস কেন অলিম্পাস পর্বতে এবং শিব কেন কৈলাস পর্বতে থাকেন?  মাঝে মধ্যে একে অন্যের জায়গায় ঘুরতেও কেন যান না?

৬)  সমস্ত হিন্দু ধর্মের অবতাররা বেছে বেছে ভারতেই জন্ম নিলো কেন? পৃথিবীতে আর দেশ ছিলো না?  তারা ভগবান মানতো না?  নাকি ভারতই সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ ছিলো বরাবর? তাই বারেবারে এই অবতারজন্ম গ্রহন?  অনান্যরা ধোয়া তুলসীপাতা ছিলো? আবার, সমস্ত পয়গম্বররা আরবেই জন্ম নিলো কেন বেছে বেছে?  অন্য জায়গায় মানুষ থাকতো না?

৭) আজ থেকে অত হাজার হাজার বছর আগে, যখন স্বাভাবিক ভাবেই সহজ সরল জীবনযাত্রার কারণে দূর্নীতি আজকের থেকে অনেক কম ছিলো, তখন ভগবান এতবার জন্ম নিলেন। অথচ আজকের এই ভয়ংকর দুর্নীতি, অবক্ষয়ের যুগেও ভগবান জন্ম নিচ্ছেন না কেন? যখন ইথিওপিয়া থেকে কালাহান্ডি দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে ধুঁকছে, না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ, যখন কর্পোরেট কোম্পানীগুলো জল জমি জঙ্গল দখল করে কারখানা তৈরী করছে, যখন মণিপুর, কাশ্মীর,  গুয়াতেমালা বা মায়ানমারে সামরিক বাহিনীর হাতে বারংবার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, তখন ভগবান কোথায় থাকেন?  কেন একবার অবতার হিসাবে জন্ম নিয়ে এর প্রতিকার করার প্রয়োজন মনে করেন না?

৮) ভারতীয়রা সরস্বতী পুজা করে ধুমধাম করে, অথচ ভারতেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী নিরক্ষর মানুষ বাস করে। আবার বছর বছর লক্ষ্মীপুজো করেও পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলির একটা হল ভারত। অন্যদিকে সরস্বতী বা লক্ষ্মীপুজা না করেও পাশ্চাত্যের দেশগুলি আমাদের চেয়ে সম্পদবান, শিক্ষার হার আমাদের চেয়ে অনেক বেশী। কেন?

৯) বিশ্বজগৎ সৃষ্টির ব্যাপারে এক এক ধর্ম এক একরকম বর্ণনা দিয়েছে, এবং তাদের কারো সাথে কারো বর্ণনা মেলে না। এদের যেকোনো একটাকে বিশ্বাস করতে গেলে বাকিগুলিকে অবিশ্বাস করতে হয়। কেন?  এদের মধ্যে কোনটাকে আমি ঠিক বলে ধরব এবং কিসের ভিত্তিতে ধরবো? 

১০) কেন বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বিশ্বসৃষ্টির তত্ত্বের সাথে বিজ্ঞানের বিশ্বসৃষ্টিতত্ত্ব বিন্দুমাত্র মেলে না?  বিজ্ঞান যে ব্যাখ্যা দেয় তার পিছনে যুক্তি ও প্রমান হাজির করে। ধর্মের বিশ্বতত্ত্ব সৃষ্টির পিছনে কোন প্রমান হাজির করা গেছে আজ অবধি?

১১) বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলি পড়লে একথাই মনে হয় যে  ভগবান সরাসরি মানুষ, বিভিন্ন পশুপাখি, গাছপালা ইত্যাদিকে তাদের বর্তমান আকৃতিতে সৃষ্টি করে গেছেন। অথচ আমরা জানি তা সত্য নয়। বিবর্তনের পথ ধরে দীর্ঘ পথ হাঁটার পরে সমস্ত পশুপাখি, গাছপালা তাদের বর্তমান চেহারা পেয়েছে। পূর্বে এদের চেহারা সম্পূর্ণ অন্যপ্রকার ছিলো। এর কোনো উল্লেখ কোনো ধর্মগ্রন্থেই নেই কেন? বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে 'ভগবান মানুষ সৃষ্টি করলেন' বা 'ভগবান বাঘ সৃষ্টি করলেন' জাতীয় কথা থাকলেও 'ভগবান অ্যামিবা সৃষ্টি করলেন' বা 'ভিব্রিও কলেরি সৃষ্টি করলেন' জাতীয় কোনো কথা নেই কেন? কেন কোনো ধর্মগ্রন্থেই নেই ভগবানের 'ডাইনোসর' সৃষ্টির কথা? যারা ধর্মগ্রন্থগুলো লিখেছিলেন তারা না হয় পুরানো দিনের মানুষ, তখনও বিজ্ঞান বা প্রত্নতত্ত্ব এত অগ্রসর হয় নি,  অণুবীক্ষণযন্ত্রও আবিষ্কার হয় নি, তাই এদের অস্তিত্বের কথা জানতো না। কিন্তু ভগবান তো জানতেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ।  এদের সতর্ক করেন নি কেন? 

১২) যে ধর্ম যে অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে, সেই ধর্মের ধর্মগ্রন্থের সৃষ্টিতত্ত্বে শুধু সেই অঞ্চলের স্থানীয় পশুপাখি, গাছপালার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।  কেন হিন্দু ধর্মে বিভিন্ন গাছপালা পশুপাখি ভগবানের সৃষ্টি বলে লেখা থাকলেও লেখা নেই 'ভগবান ক্যাঙ্গারু সৃষ্টি করলেন' বা আরবদের ধর্মে অনান্য পশুপাখির কথা লেখা থাকলেও লেখা নেই 'ভগবান উটপাখি তৈরী করলেন' জাতীয় কথা?  হিন্দুরা সেইযুগে ক্যাঙ্গারুর বা আরবরা উটপাখির অস্তিত্বের কথা জানতেন না, যেহেতু যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুন্নয়নের কারণে  সেইসময়কার মানুষের ভৌগলিক জ্ঞান সীমাবদ্ধ ছিলো। ঠিক আছে। কিন্তু ভগবান তো জানতেন। কেন তাদের সংশোধন করে দেন নি? 

১৩) স্বর্গ এবং নরক জায়গাগুলো ঠিক কোথায়?  আজ বিজ্ঞান বহুগুন উন্নত হয়েছে। কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের জিনিষও আজ আমরা অতিশক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্তের কল্যানে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু স্বর্গ বা নরকটা ঠিক কোনখানে অবস্থিত?  পৃথিবী আর মঙ্গলের মাঝখানে, নাকি বৃহষ্পতি আর শনির মাঝখানে, নাকি এই সৌরজগতের বাইরে কোথাও?  যদি বাইরে হয়, তাহলে ঠিক কোনখানে?  জায়গাটির আয়তন কত?  সেটা কি কোনো গ্রহ?  সেখানে দিন রাত হয় শুনেছি। তারমানে কোনো গ্রহেই অবস্থিত স্বর্গ নরক। তা কোন নক্ষত্র সেখানে বিরাজ করছে, যার চারপাশে স্বর্গ বা নরক নামক গ্রহগুলি ঘুরছে? সেখানকার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর চেয়ে বেশী না কম?  বেশী কম হলে কতগুন বেশী বা কম? সেখানে কটি মহাদেশ বা মহাসাগর আছে?

১৪) সমস্ত ধর্মেই নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নানা তাচ্ছিল্য ও ঘৃণা সূচক উক্তি ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। কেন?  ভগবানও কি তবে পুরুষতান্ত্রিকতার শিকার?

১৫) জীবহত্যায় পাপ হয় না পুন্য হয়?  এ ব্যাপারে আপনার অবস্থান পরিষ্কার করুন। কারণ এক এক ধর্মে এ ব্যাপারে এক এক প্রকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানুষ বিভ্রান্ত হতে বাধ্য।

১৬) মানুষ বা অনান্য প্রাণীরা নাকি পূর্বজন্মের কর্মফল অনুসারে এ জন্মে জন্মগ্রহন করে। অর্থাৎ পূর্বজন্মে ভালো কাজ করলে এ জন্মে মানুষ হয়ে জন্মাবে বা মানুষ হয়ে জন্মে খারাপ কাজ করলে পরবর্তী জন্মে পশু হয়ে জন্মাবে ইত্যাদি। তা পূর্বজন্ম পূর্বজন্ম করে পিছাতে পিছাতে পৃথিবীতে প্রথম যে প্রাণের উন্মেষ ঘটেছিলো, সেটি তার কোন পূর্বজন্মের কর্মফলে পৃথিবীতে এসেছিলো?  আর তাছাড়া মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রানীর তো ন্যায় অন্যায় বোধই নেই। তাদের পাপপূন্য নির্নয় হয় কিভাবে?  কিভাবে নির্ণয় করবেন আমার বাড়ির সজনে গাছটার পাপপূণ্যের খতিয়ান?
     
                                                        
এবার রইলো আস্তিকদের সম্ভাব্য কিছু মন্তব্য ও তার জবাব

১) বহু বিশিষ্ট মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন নিউটন, রবীন্দ্রনাথ ঠকুর থেকে আব্দুল কালামের মত প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিরা।  তারা সবাই ভুল করেছেন?  আপনি একা খালি ঠিক? 

উত্তর- রবীন্দ্রনাথ থেকে আবদুল কালাম,  এদের ঈশ্বরবিশ্বাস কখনোই ঈশ্বরের অস্তিত্বকে প্রমান করে না। এ থেকে এটুকুই প্রমানিত হয় তারা এই কাল্পনিক শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে ব্যক্তিবিশ্বাসের কানাকড়িও মূল্য নেই, যতক্ষন না তা প্রমাণিত হচ্ছে।  এই কারণেই কয়েকশো বছর ধরে কিংবদন্তী বৈজ্ঞানিক হিসাবে পূজিত নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বকে বাতিল করে আইনষ্টাইন নামের এক অজ্ঞাতকূলশীল (সেই সময়) যুবকের আপেক্ষিকবাদ কে আপন করে নিয়েছে বিজ্ঞান। ডালটনের পরমাণুবাদ পরবর্তীকালে পৃথিবী বাতিল করে দিয়েছে, পালটা যুক্তি প্রমানের কাছে তাদের তত্ত্ব হেরে গেছে বলে। 'নিউটন বা ডালটন কিংবদন্তী বৈজ্ঞানিক, অতএব তিনি যাহা বলিবেন তাহাই ধ্রুব সত্য' এই বলে বিজ্ঞান বসে থাকে নি। এভাবেই বিজ্ঞান সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে তোলে। কোপার্নিকাস থেকে গ্যালিলিও মনে করতেন পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে বৃত্তাকার পথে ঘোরে, কিন্তু পরবর্তীকালে কেপলার প্রমান করেছিলেন তারা ঘোরে উপবৃত্তাকার পথে। বিজ্ঞান কোপার্নিকাস গ্যালিলিওর তত্ত্বকে বাতিল করে কেপলারের তত্ত্বকে গ্রহন করেছে। কাজেই ব্যক্তিবিশ্বাস দিয়ে কিচ্ছু প্রমাণিত হয় না। আজ যদি প্রমাণিত হয় রবীন্দ্রনাথ বউকে ধরে পেটাতেন (কথার কথা), তাহলে আমরাও কি চোখ বুজে তাই আদর্শ ধরে নিয়ে যে যার বউকে পেটাতে শুরু করবো?  এরকম অন্ধ গুরুবাদী মানসিকতা হলে তো মুশকিল!

২) সমস্ত ধর্মেই ঈশ্বর বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। ঈশ্বর যদি নাই থাকবেন তাহলে এরা প্রত্যেকেই এক কথা বলেছে কেন? 

উত্তর- হীনযান বৌদ্ধধর্ম ছাড়া সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই ঈশ্বরবিশ্বাসী। যদিও তাদের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য, এমনকি নিজেদের মধ্যেই অনেক স্ববিরোধিতা আছে। কিন্তু তাতেও কিচ্ছু কাঁচকলা প্রমাণিত হয় না। প্রতিটি ধর্মই অমানবিক অজস্র নির্দেশে ভরপুর। ইসলামে আছে স্ত্রীকে বেত্রাঘাত করার বিধান, স্ত্রীকে বর্ণনা করা হয়েছে স্বামীর শস্যক্ষেত্র হিসাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। একই ধরনের বহু খারাপ কথা নারী ও শুদ্রদের সম্পর্কে বলা হয়েছে হিন্দুধর্মেও। সেখানে নারীকে বিষাক্ত সাপের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তারা প্রকৃতিগতভাবে চরিত্রহীনা বলা হয়েছে। শূদ্ররা বেদপাঠ শুনলে কানে গরম সীসা ঢেলে দেবার বিধান রয়েছে।  তা থেকে কচুপোড়া কিছু প্রমান হয় কি?  নাকি 'যেহেতু ধর্মে রয়েছে অতএব তা মান্য' ধরে নিয়ে এগুলোও আমরা ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করা শুরু করবো? 

৩) ধর্মবিশ্বাসী মাত্রেই মৌলবাদী নন। অনেকেই আছেন নিজের ধর্মে আস্থাশীল থেকেও অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। 

উত্তর- ধর্ম বিশ্বাসী মানেই ISIS বা RSS এটাও কোথাও বলে নি কোনো নাস্তিক। এটা যারা বলেন তারা নিজের ধর্মের মৌলবাদে আকন্ঠ নিমজ্জিত। মৌলবাদীদের বলা কথা নাস্তিকদের গায়ে সেঁটে দেবেন না।

৪) ঈশ্বরবিশ্বাস যদি 'ভুল' হবে, তাহলে আজও কেন পৃথিবীর কোটি কোটি লোক ঈশ্বরবিশ্বাসী?  তারা সবাই ভুল?  নাস্তিকদের সংখ্যা তো গুটিকয় মাত্র। 

উত্তর- সারা পৃথিবীতেই ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে। ইউরোপের অনেক দেশেই আজ নাস্তিকরা মোট জনসংখ্যার ৫০% এরও বেশী। একটু দয়া করে গুগল করে দেখে নিন। কিন্তু সেটা যদি নাও হত, পৃথিবীর ১০০% মানুষই যদি ঈশ্বরবিশ্বাসী হত  তাতেও বা হাতিঘোড়া কিচ্ছু প্রমাণিত হত না। 'পৃথিবীর সব মানুষ স্বীকৃতি দেয়, অতএব তা সত্য' এটা বিজ্ঞানের কথা নয়। সত্য কখোনো সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একসময় গোটা পৃথিবীর মানুষ মনে করত পৃথিবী স্থির, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরপাক খায়। গ্যালিলিও প্রমান করেছিলেন তা ভুল। বিজ্ঞান সারা পৃথিবীর কথাকে না মেনে গ্যালিলিওর কথাকে মেনে নিয়েছিলো, কারণ তার পিছনে যুক্তি প্রমান ছিলো। একসময় সারা পৃথিবীর মানুষ মনে করত রোগের কারণ ভগবানের অভিশাপ। প্যারাসেলসাস প্রমাণ করেছিলেন রোগের কারণ জীবানু। বিজ্ঞান প্যারাসেলসাসের তত্ত্বকে গ্রহন করেছে,  সারা পৃথিবীর তত্ত্বকে নয়। এরকম আরো অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। কাজেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে রাজনীতি চলতে পারে, বিজ্ঞান চলে না।

৫) বিজ্ঞান কি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে?  সামান্য একটা এককোষী জীব তৈরী করেও কি বিজ্ঞান দেখাতে পারবে? পারবে না। ঈশ্বরের অস্তিত্বকে শেষ অবধি স্বীকার করতেই হবে।

উত্তর- ধরে নিলাম বিজ্ঞান কৃত্রিম কোষ কেন, এমাইনো এসিডও তৈরী করতে পারে নি। তাতেই বা কি এসে গেলো?  আজ পারে নি, ভবিষ্যতে পারবে। বা হয়ত পারবে না। আজ বিজ্ঞান বহু জিনিষের কারণ খুঁজে বের করেছে যা অতীতে জানা ছিলো না। অতীতে আমরা জানতাম না গাছের পাতা সবুজ কেন, আকাশ নীল কেন। আজ জেনেছি। কিন্তু 'ভগবান আকাশকে নীল রঙে তৈরী করেছে, তাই আকাশ নীল', এটা ধরে বসে থাকলে আমরা কোনোদিনই জানতে পারতাম না আকাশের নীলের প্রকৃত কারণ। তেমনি আজ যা জানি না ভবিষ্যতে তা জানা যাবে। কিন্তু বিজ্ঞানের অসফলতা ভগবানের অস্তিত্বের প্রমান হয় কি করে?  ধরা যাক আমি বললাম রামগোড়ুরের ছানারা বাস্তবে আছে। তারা আকাশে থাকে। কোনো নাস্তিক আমাকে বোঝাতে আসলো এরকম কিছুর অস্তিত্ব নেই। আমি তাকে বললাম 'তোমার বিজ্ঞান একটা কোষও তৈরী করে দেখাতে পারে নি, অতএব এটা থেকেই প্রমান হয় রামগোড়ুরের ছানার বাস্তব অস্তিত্ব আছে'। মানবেন তো সেই যুক্তি?  তলিয়ে ভাবলেই বুঝতে পারবেন এটা আসলে কোনো যুক্তিই নয়। 'রাম পরীক্ষায় পাস করতে পারে নি, অতএব শ্যামকে ফুল মার্কস দিতে হবে' মার্কা বোকা বোকা কথা এটা।

তাই, এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতেই পারি, 'ঈশ্বর হচ্ছেন সর্বকালের সেরা গুজব'। তাই নয় কি বন্ধুরা?

শুক্রবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৮

আসিফা ~ আর্কাদি গাইদার

যারা এখন আসিফার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার বিবরণ পড়ে চমকে উঠছেন, তাদের কাছে অনুরোধ, একে নিছক খুন না ধর্ষণ হিসেবে দেখবেন না। একের পর এক ঘটনাবলী দেখুন।
আসিফা একটি ৮ বছরের শিশু। কাশ্মীরের বাখারওয়াল মুসলিম উপজাতির সদস্য। জম্মুর কাঠুয়া অঞ্চল থেকে এই উপজাতি দলটিকে বিতাড়ন করবার উদ্দ্যেশ্যে তাদের ভয় দেখাতে হবে। তাই আসিফাকে অপহরণ এবং ধর্ষণ। এখানে ধর্ষণ হলো রাজনৈতিক রণকৌশল। বা হয়তো শুধু কৌশল নয়, ধর্ষণই রণনীতি।
এক এক করে দেখি আসুন। আসিফাকে অপহরণ করে তাকে একটি মন্দিরের পুজোগৃহে হাত পা বেধে রাখা হলো প্রায় ৭ দিন ধরে। তাকে ওষুধ খাইয়ে আছন্ন রাখা হলো। বারংবার ধর্ষণ করা হলো। ধর্ষণের সময় অঞ্চল থেকে বাখরাওয়ালদের পলায়ন চেয়ে ধর্ষকরা পুজোআচ্চাও করলো। ধর্ষকরা ডেকে আনলো স্পেশ্যাল পুলিশ অফিসারকে। সেও ধর্ষণ করলো। এরমধ্যে একজন মীরাট থেকে তার বন্ধুকে ডেকে পাঠালো। সে মীরাট থেকে ধর্ষণ করতে চলে এলো। রেপ ট্যুরিজম। এরপর আসিফাকে শ্বাসরোধ করে খুন করা হলো। তারপর তার দেহ ফেলে দেওয়ার আগে শেষবারের মতন আরেকজন ধর্ষণ করলো। এরপর তার মৃতদেহকে বনে ফেলে দিয়ে পাথর দিয়ে মাথা থেতলে দেওয়া হলো।
পুলিশ প্রথমে মিসিং পার্সনস কমপ্লেন নেয়নি। নেওয়ার পর একে একে যখন গ্রেপ্তার করা শুরু করলো তখন অপরাধীদের সমর্থনে মিছিল মোর্চা মিটিং শুরু হয়ে গেলো। হিন্দু একতা মঞ্চ তৈরি হলো। বিজেপির এমএলএ, মন্ত্রী ধর্ষকদের সমর্থনে দাঁড়িয়ে গেলো। মহিলারা ধর্ষকদের সমর্থনে গায়ে আগুন দেওয়ার হুমকি দিলো। হিন্দু একতা মঞ্চ জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল করলো। হ্যা, আমাদের তেরঙ্গা পতাকা কে ওড়ানো হলো ধর্ষণের বিজয়োৎসব পালন করতে। এই গোটা সার্কাসটার পরে যখন কোর্টে চার্জশীট ফাইল করতে গেলো পুলিশ, তখন জম্মু বার এসোশিয়েশনের উকিলরা অবরোধ করে স্লোগান দিলো 'জয় শ্রী রাম'। তারও পরে কোর্টের বিচারপতিরা পুলিশকে ৬ ঘন্টা অপেক্ষা করালো। চার্জশিট তারা নেবে না। ৬ ঘন্টা অপেক্ষারত পুলিশের থেকে শেষমেষ চার্জশিট গ্রহণ করা হলো।
আপনারা ভাবছেন এরকম কেন? ধর্ষকের সমর্থনে কি করে এতগুলো মানুষ মিছিল করে, জাতীয় পতাকা ওড়ায়, জয় শ্রীরাম স্লোগান দেয়? এতক্ষনে তাহলে আপনি সঠিক প্রশ্নটি করেছেন।
পুলিশ, এসপিও, এমএলএ, মন্ত্রী, উকিল, জাজ - এটাই হলো ভারত রাষ্ট্র। আর ওই ৮বছরের শিশু আসিফা - ওটা হলো কাশ্মীর। এই প্রত্যেকটি লোক যারা মিছিল করছে, স্লোগান করছে - তাদের মাথায়, চেতনায়, তাই। তাই জন্যে ওদের কাছে এটা স্রেফ ধর্ষণ নয়, এখানে অপরাধীরা স্রেফ ধর্ষক নয়, আসিফা স্রেফ একটি বাচ্চা মেয়ে না। ওরাও জানে, একদম সবার চোখের সামনে ওরা প্রকাশ করে ফেলেছে ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্র আর কাশ্মীরের সম্পর্কটা ঠিক কি। সেই কাশ্মীর, যেখানে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রত্যেক তিনজন পুরুষের মধ্যে একজন ধর্ষিত। হ্যা ঠিক পড়েছেন, প্রত্যেক তিনজন পুরুষের মধ্যে একজন।
ওরা আসলে ধর্ষকদের স্বপক্ষে মিছিল করছে না। করছে নিজেদের স্বপক্ষে। কারন ওরা জানে, ওরা প্রত্যেকে এই অপরাধে অংশ নিয়েছে। এবং ওরা চায় আপনিও অংশীদার হন। তাই আপনার ধর্মীয়বোধকে উস্কাতে জয় শ্রীরাম, আপনার জাতীয়তাবোধকে উস্কাতে তেরঙ্গা পতাকা।
একটি ৮ বছরের ধর্ষিতা শিশুর মৃতদেহ লড়ছে। লড়ছে শুধু ধর্ষকদের বিরুদ্ধে না, কাশ্মীরে ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে। ওদের তেরঙ্গা, ওদের ধর্ম পক্ষ বেছে নিয়েছে। ধর্ষকের পক্ষ। আপনার তেরঙ্গা, আপনার ধর্ম কোন পক্ষ বাছবে?