মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

স্বাধীনতা ~ আর্কাদি গাইদার

স্বাধীন ভারতের ধারনা নিয়ে দ্বন্দ্ব বহুদিনের।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ থেকে স্বাধীনতার জন্যে যারা লড়েছিলেন, তাদের প্রত্যেকের মাথার মধ্যে স্বাধীন ভারতের ধারনা সম্পর্কে অবশ্যই আলাদা মতামত ছিলো। ভগত সিং যেই স্বাধীন ভারতের ধারনা মাথায় নিয়ে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েছিলেন, আর গান্ধী যে স্বাধীন ভারতের ধারনা বুকে নিয়ে গডসের গুলি খেয়েছিলেন, তার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। চট্টগ্রামের পাহাড়ে সূর্য সেনের নেতৃত্বে যেই সুবোধ রায়, অম্বিকা চক্রবর্তী, গনেশ ঘোষ আর লোকনাথ বল একইসাথে কাধে কাধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশদের তাক করে রাইফেল ছুড়েছেন, স্বাধীন ভারতে তারাই কংগ্রেস আর কমিউনিস্ট - দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়ে একে অপরের বিরোধী হয়ে রাজনীতি করেছে্ন, ভারত নিয়ে তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে।

আমরা, স্বাধীন ভারতের নাগরিক যারা, প্রত্যেকেই হয়তো আমাদের এই দেশের কাঙ্খিত চরিত্র সমন্ধে ভিন্ন ধারনা পোষণ করি। এবং এই ভিন্ন ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে হয়তো আমরা অনেকেই নিজেদের স্বল্প পরিসরে কোনরকম ভূমিকা পালন করবার চেষ্টা করি। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে, আমরা যারা ধারনার জগতে একে অপরের বিরোধী, তারাই আবার সহযাত্রীও বটে। কারন স্বাধীনতা তো কোন গন্তব্য নয়, স্বাধীনতা তো যাত্রা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে যারা লড়ে স্বাধীনতা আনলেন, তারা একটা অধ্যায় সমাপ্ত করলেন, এবং স্বাধীনতা যাত্রার পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা করলেন। এই অধ্যায়ের অনেক বৈরিতার মধ্যেও একটা ধারনা অবিচল রয়েছে - বহুত্ববাদ। আর এই বহুত্ববাদের বিরোধী ভারতের ধারনা যাদের, তারা কেউই স্বাধীনতার জন্যে বিশেষ লড়াই করেননি, মুচলেকা লিখে আর ব্রিটিশদের দালালি করে সময় কাটিয়েছেন। স্বাধীন ভারতের উদ্দ্যেশ্যে লড়াই করা সৈনিকদের ইতিহাসের ভার যদি আমরা স্বেচ্ছায় বহন করবার দায়িত্ব নিই, তাহলে তাদের ভারতের ধারনা যা এই ইতিহাসের মধ্যে প্রবহমান, তাকে আমরা অস্বীকার করি কি করে?

স্বাধীন ভারতের ধারনার লক্ষ্যে আজকে ভারতের বুকে লং মার্চ করছেন কানহাইয়া কুমার এবং তার কমরেডরা, তাদের সাথেই পা মেলাচ্ছেন সদ্য আন্দামান থেকে ফিরে তেভাগার বিদ্রোহ সংগঠির করা সুবোধ রায়, স্লোগানের কোরাসে গলা শোনা যাচ্ছে মাষ্টারদা সূর্য সেনের।
গুরগাঁও তে মারুতি কারখানার যে শ্রমিকরা ইউনিয়নের অধিকারের দাবিতে স্ট্রাইক করে জেল খাটছেন, তাদের সাথেই জেলের ভেতর  ভগত সিং আর বটুকেশ্বর দত্ত বসে ১৯২৯ এ ট্রেড ডিসপুট এক্ট পাশ করবার দিন এসেম্বলিতে বোম মারবার গল্প শোনাচ্ছেন। 
গুজরাটে আহমেদাবাদ থেকে উনা অবধি দলিতদের মহামিছিলের শেষে জিগ্নেশ মেওয়ানি স্টেজে উঠে যখন দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষনা করছেন - 'তুমহারা মাতা তুম রাখো, হামে আপনি জমিন দো', তখন আকাশে ছোড়া হাজারটা মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের মধ্যে একটা হাত আম্বেদকারের। 
বস্তারে শোনি সোরি যখন কর্পোরেট মাফিয়ার হাতে আদিবাসীদের জল-জমি লুঠের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কোন এক থানায় পুলিশের হাতে অত্যাচারিত হয়ে এক কোনে রক্তাত, ক্ষতবিক্ষত, খুবলে নেওয়া দেহ নিয়ে পড়ে আছেন, তখন ওই একই সেলে বন্দী মিত্রর কোলে নিজের কোলে তার মাথা টেনে নিয়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
আগামী নভেম্বরে দিল্লিতে শ্রমিকদের ধর্ণা এবং লাগাতার ধর্মঘটের আহ্বানের সময় সেই মঞ্চের ওপরেই বসে মুচকি হাসবেন নৌবিদ্রোহের সময় বোম্বেতে ধর্মঘট করা শ্রমিকরা। মঞ্চ থেকে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুড়বেন সাত এর দশকে শিবসেনার হাতে খুন হয়ে যাওয়া কমরেড কৃষ্ণ দেশাই। 
দিল্লি ইউনিভার্সিটির পিঞ্জরা তোড় আন্দোলনের মেয়েরা যখন পুলিশ আর এবিভিপির হাতে মার খাবে দেশদ্রোহী হিসেবে, তখন তাদের সাথে কয়েকটা লাঠির বাড়ি পড়বে প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার আর কল্পনা দত্তর মাথাতেও।
বাংলার বন্যায় যখন ছাত্র, ছাত্রী, যুবক, যুবতীরা ত্রান সংগ্রহ করে পৌছে যাবে জলমগ্ন দুর্গম অঞ্চলে, তখন জলের মধ্যে তাদের হাত ধরে থাকবে ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে ত্রানের কাজ করা পিপলস রিলিফ কমিটির অরুনা আসফ আলি, মুজফফর আহমেদরা।
দেশের দিকে দিকে দাঙাবাজ এবং খুনিরা যখন নখ দাত বার করে ঝাপিয়ে পড়বে, তখন সাধারন মানুষকে প্রতিরোধের তালিম দেবেন ট্রাম শ্রমিক মহম্মদ ইসমাইল, তেলেঙানার সামরিক প্রশিক্ষক মেজর জয়পাল সিং।
গোরখপুরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে খুন হয়ে যাওয়া ৯০টি শিশুর রক্তের হিসেব চাইতে একদিন আগুন জ্বলে উঠবে। খুনিদের কাছে হিসেব চাইতে পৌছে যাবে একদল তরুন তরুনী, তাদের হাতে পিস্তল তুলে দেবেন জেনারেল ডায়ারের ঘাতক শহীদ উধম সিং।

স্বাধীনতা নামক মহাকাব্যের বর্তমান অধ্যায়ে এই নাগরিক চরিত্রগুলো যখন দেশ জুড়ে তাদের ভারতের ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে মাঠে নেমেছে, 'আজাদি'র যাত্রায় সহযাত্রী হয়েছে, তখন আমরা সহনাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার এই যাত্রা কে মহাড়ম্বরে উদযাপন করবো না কেন? আমরা প্রত্যকেই তো লড়ছি এই আজাদির জন্যে - আমাদের ভারতের ধারনা কে রক্ষা করবার জন্যে। এই স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা দেবেন যে প্রধানমন্ত্রী, তিনি এমন একটি সংগঠনের সদস্য যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে শুধু খাতায়-কলমে বিরোধিতাই করে থামেননি, মাঠে নেমে তার বিরুদ্ধে লড়েছেন,  এই দেশের পতাকা, সংবিধান কোনটাকেই স্বীকৃতি দেননি। স্বাধীন ভারতের যাত্রায় পায়ে পা মেলানোর এই সন্ধিক্ষনের মুহুর্তের ডাকে সাড়া দেবো না? 

আজাদির যাত্রা থামবে কেন?

মধ্য আগস্টের কবিতা ~ অনামিকা

কী লাভ বলো এই স্বদেশে 
কে দিচ্ছে কার প্রক্সি, জেনে
সেই তো শেষে মরবে শিশু। 
টান পড়বেই অক্সিজেনে।

তার পরে? খুব তদন্ত আর 
চক্ষু মোছার বসবে আসর
চতুর্দিকে ঢোলশহরত 
লজ্জাবিহীন ঘণ্টা কাঁসর।

ভোট হারলে নেই কুছ পরোয়া, 
দখলদারির শিরশিরানি 
পরস্পরের জেরক্স ছবি, 
কেন্দ্রে রাজা, রাজ্যে রাণী। 

ধর্ম অন্ধ নিদান দেবে 
জাতীয় গান গাইতে মানা
ভোট ভিখিরি এ'সব শুনেও
তুলবে না তার কণ্ঠখানা।

ভোট জিতলেই অগাধ টাকা, 
কাজের যা চাপ! তাই তা' মেলে!
ডিগ্রি পেয়েও কাজ পাবে না… 
মরতে থাকবে বেকার ছেলে।

এ টিম বি টিম খেলায় ব্যস্ত, 
লোক ঠকানোর কুমিরডাঙা।
খুব সেজেছেন ডেমোক্রেসি, 
যদিও তাঁর কপাল ভাঙা।

মাঝ আগস্টে রেড রোড ফের 
তিনটি রঙের বিপুল সাজে 
করবে প্রমাণ আমরা স্বাধীন 
সকালবেলার কুচকাওয়াজে।

অবাধ্য এক স্বপ্নে তবু 
মারছে ঝিলিক যৌথখামার…
সত্তর পার স্বাধীনতার 
সমস্তটাই তোমার আমার।

শুক্রবার, ১১ আগস্ট, ২০১৭

যাদবপুর ও ছাত্রসমাজ ~ আর্কাদি গাইদার

আজ সারারাত যাদবপুর ইউনিভার্সিটি জাগছে। তারা ধর্নায় বসেছে।
কেন? 
কারন আমাদের রাজ্য সরকার একটি নতুন আইন আনছে। সেই আইনে বলা আছে যে কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র ইউনিয়ন বলে কিছু থাকবে না। কোনরকম গনতান্ত্রিক নির্বাচন হবে না। কোনরকম সংগঠনের ব্যানার থাকবে না। 
তাহলে কি হবে?
স্টুডেন্টস কাউন্সিল নামে এক প্রহসন। যেখানে কলেজ কতৃপক্ষ নিজেরা কয়েকজন ছাত্রকে মনোনীত করবে এই কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে। সেই ছাত্রদের দ্বারা গঠির স্টুডেন্টস কাউন্সিল ছাত্র ইউনিয়নের জায়গা নিয়ে তাদের ভূমিকা পালন করবে।

আমাদের রাজ্য সরকারকে কিন্তু কেউ বোকা বলতে পারবে না। তারা জানে যে তাদের এরকম আইনের ব্যাপারে এই রাজ্যের বৃহত্তর ছাত্রসমাজের কিছুই যায় আসে না। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি, এবং আরও কয়েকটা হাতেগোনা কলেজে মোটামুটি গনতান্ত্রিক পরিবেশ কিছুটা হলেও বজায় আছে, সেখানে ছাত্ররা সুষ্ঠুভাবে তাদের গনতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে ভোট দেয়, সংগঠনগুলো ক্যাম্পেন করে, ইউনিয়নের সদস্যরা নির্বাচিত হয়। এর বাইরে শহর এবং জেলার বিভিন্ন কলেজে ছাত্র ইউনিয়ন একটা হাস্যকর ব্যাপার। গত ৬ বছর ধরে তৃণমুল ছাত্র পরিষদ নামক সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন এর ধারনাকে একটি ছেলেখেলায় পরিনত করেছে। কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে ইউনিয়ন মানে তৃণমুলের গুন্ডাদের দাদাগিরি, ঘুষচক্র, গোষ্ঠীদ্বন্দ, মারামারি, তোলা, ছাত্রীদের যৌন হেনস্থা। সুতরাং তাদের কাছে যদি বলা হয় যে রাজনৈতিক ইউনিয়ন উঠিয়ে দিয়ে তার জায়গায় ব্যানারহীন কাউন্সিল আসবে, তারা কোনরকম দুঃখ তো পাবেই না, বরং উলটে আনন্দিত হবে।
এখানে বলে রাখা ভালো, আপনারা বলবার আগেই, যে আগের আমলে বিভিন্ন কলেজে এস এফ আই'র সময় কি স্বর্গরাজ্য ছিলো? একদম না। এই দাদাগিরি, ইউনিয়নের ভোটের নামে প্রহসন, মারামারি এইসব ছাত্র ফেডারেশন বা অন্য কোন রাজনৈতিক ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও ছিলো। কিন্তু তার সাথেও যেটা ছিলো, এসবের মধ্যেই, সেটা হলো কিছুটা হলেও ছাত্র রাজনীতি। মানে ছাত্রদের নিজস্ব দাবিদাওয়া, ইস্যু, শিক্ষাক্ষেত্রের পলিসি, এবং বৃহত্তর সমাজের ইস্যু নিয়ে লড়াই আন্দোলন। এই ইস্যুগুলো নিয়ে মোটামুটি এই দেশের বা রাজ্যের সমস্তরকম ছাত্র সংগঠন, কখনো না কখনো লড়াই আন্দোলনে যুক্ত থেকেছে। এমনকি সংঘ পরিবারের সংগঠন এবিভিপিও বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে লড়াই আন্দোলন করেছে। তাদের সেই ইস্যু বা স্ট্যান্ডের আমি বিরোধী, কিন্তু তার মধ্যে যে রাজনীতি আছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। 
ব্যাতিক্রম একটা মাত্র ছাত্র সংগঠন। তৃণমুল ছাত্র পরিষদ। গত ৬ বছরে রাজ্য বা দেশের কোনরকম ছাত্রদের ইস্যু নিয়ে তাদের কোনরকম লড়াই বা আন্দোলন দেখা যায়নি। এমনকি কোনরকম স্ট্যান্ড বা বিবৃতিও দেখা যায়নি। রিসার্চ গ্রান্ট থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেট, এইসব বিষয়ে নিয়ে তারা কোনদিন মাথা ঘামায়েনি। তারা ব্যাস্ত থেকেছে ঘুষ নিতে, তোলা তুলতে বা ইভটিজিং করতে। এরকম অদ্ভুত একটি 'ছাত্র সংগঠন' গত ৬ বছর ধরে আমাদের রাজ্যের সিংহভাগ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাঁকিয়ে বসে আছে, তার খুব স্বাভাবিক ফল হবে যে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের ধারনা হবে যে এই রাজনীতির থেকে অরাজনীতি ভালো। 
সার্বিক ভাবে আমাদের মধ্যে যেরকম অরাজনীতির ইনজেকশন ফুটিয়ে দেওয়া হয় - দেখো রাজনীতি কত নোংরা, দেখো রাজনীতির কারনে দেশ রসাতলে যাচ্ছে, দেখো পার্লামান্টে কোন কাজ হয় না, দেখো এই তোমাদের গনতন্ত্র, তোমাদের ভোটাধিকার এগুলোর কোন লাভ নেই, অতএব রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করো না, নিজের মতন জীবনযাপন করো, নিজেরটা বুঝে নাও - রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ এই বৃহৎ চক্রান্তের অংশের বাইরে নয়। এবং তাদের সাহায্য করতে গত ৬ বছরের বিভিন্ন কলেজের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস তৈরি রয়েছে।

ইতিহাস শেখায় -  ছাত্ররা সমাজের সমস্ত গুরুত্বপূর্ন লড়াইতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। সেই ছাত্রসমাজকেই যদি রাজনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে দেওয়া যায়, তাদের মাথায় অরাজনীতির পাঠ ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে এই স্থিতাবস্থা বজায় রাখা আরও সোজা হয়ে যাবে। ক্ষমতার কেন্দ্রকে বোকা ভাববেন না। সে জানে, ঠিক কোন কোন পদক্ষেপ পর পর নিলে আস্তে আস্তে সাধারন মানুষ রাজনীতির প্রতি নিস্পৃহ হয়ে পড়বে, এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা সোজা হবে।

তাই যাদবপুর ইউনিভার্সিটিকে শুধু আজকের রাত নয়, এরকম অনেক রাত জাগতে হবে। তাদেরকে এই লড়াইটা পৌছে দিতে হবে রাজ্যের প্রতিটা কোনে, প্রতিটি ছাত্র ছাত্রীর মগজে। এই আইন থাকলো কি গেলো তাই দিয়ে তাদের হার-জিতের বিচার হবে না। মেদিনীপুর বা পুরুলিয়ার কলেজের ছেলে মেয়েগুলো এই লড়াইটাকে নিজেদের লড়াই বলে অনুধাবন করতে পারলো কিনা, সেটাই হবে হার-জিতের আসল মাপকাঠি।


রবিবার, ৩০ জুলাই, ২০১৭

আচ্ছে দিন ~ সুশোভন পাত্র

চুনো-পুঁটি'দের দিন গুলো দুরকম। একদিন, যেদিন আপনি বাজারে গিয়ে দেখেন, পটল ৪০ টাকা/কেজি, শসা ৬০ টাকা, আর টোম্যাটো ৮০ টাকা, যেদিন আপনি পাঁচ-দশ টাকার জন্যও দর কষাকষি করেন; সেদিনটা, 'খারাপ দিন'। আরেক দিন, যেদিন আপনি দেখেন, পটল ৫০ টাকা/কেজি, শসা ৭০ টাকা, আর টোম্যাটো ১০০ টাকা, যেদিন আপনি দাম শুনেই আঁতকে ওঠেন; সেদিনটা 'আরও খারাপ দিন'। দাম বেড়ে যাবে আন্দাজ করে কেজি খানেক শসা যদি আপনি আগের দিনই বেশী কিনে রাখতেন, তাহলে সেটা হতে পারতো আপনার 'মাস্টার স্ট্রোক।' বিজনেসের ভাষায় 'রিস্কলেস ইনভেস্টমেন্ট'। ঐ যে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন বলেছিলেন, "এদেশের বিগ-বিজনেস হাউস গুলো বরাবর রিস্কলেস ইনভেস্টমেন্টের সুবিধা উপভোগ করে" -সেই 'রিস্কলেস ইনভেস্টমেন্ট' ¹ । 
রাঘব-বোয়াল'দের দিনগুলো তিনরকম। একদিন, যেদিন আম্বানি-আদানি'রা ব্যবসায় ইনভেস্ট করে, 'শ্রম ও উৎপাদনের' সম্পর্কের বঞ্চনায় সংশ্লেষিত মুনাফা অর্জন করে; সেদিনটা 'আচ্ছে দিন'। আরেক দিন, যেদিন মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হন এবং নির্বাচিত জনকল্যাণকামী সরকার, রিটায়ার্ড বাপের পি-এফে সুদের হার কমিয়ে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে লক্ষ-কোটি টাকার লোন 'রাইট অফ' করে; সেদিনটা আরও 'আচ্ছে দিন'। আর যেদিন, বিজয় মালিয়া ১৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে ৯,০০০ কোটি টাকা ঋণ বকেয়া রেখে, গোয়ার প্রাইভেট বিচে জন্মদিনে এনরিক ইগলেসিয়াসের 'ব্যালেন্ডা'র' সুরে কোমর দুলিয়ে, প্লেনে চেপে, হুশ করে লন্ডন উড়ে যেতে পারেন, সেদিনটা আরও আরও 'আচ্ছে দিন' ² । 
রাজন বলেছিলেন "সিস্টেমের কাছে যার এতো ধার বাকি, জন্মদিনের পার্টিতে তাঁর এতো অপব্যয়র বিলাসিতা মানায় না। ³" সমস্ত ব্যাঙ্ক কে নির্দেশ দিয়েছিলেন "অন্যায় সুবিধা না দিয়ে এই বিগ-বিজনেস হাউস গুলির অনাদায়ী ঋণ দ্রুত আদায় করতে হবে। ⁴" এরই মূল্য চোকাতেই সেদিন অর্থমন্ত্রীর সাথে 'লো ইন্টারেস্ট রেট' আর মুদ্রাস্ফীতির তু-তু-ম্যা-ম্যা'র অজুহাতে, রাজন কে তাড়িয়ে উৰ্জিত প্যাটেলের ক্ষমতায়নের ঘোলা জলে মাছ ধরে সম্পন্ন হয়েছিলো 'রিস্কলেস ক্রনি ক্যাপিটালিজম' কে বাঁচিয়ে রাখার আস্ত একটা 'মোডাস অপারেন্ডি'। 
আম্বানি'দের 'ব্যালেন্স শিটে' পরঞ্জয় গুহঠাকুরতার নাম উঠেছে ২০১৪'তেই। যেদিন প্রকাশ পেয়েছিল পরঞ্জয় গুহঠাকুরতার "গ্যাস ওয়ার্স" বইটি। নিখুঁত বর্ণনা, অলঙ্ঘনীয় নথি, আর রিলায়েন্সের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা'দের সাক্ষাৎকারে সেদিন দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়েছিল, কৃষ্ণ-গোদাবরী বেসিনের গ্যাস উত্তোলন, নগদীকরণ, বাজারিকরণ নিয়ে আম্বানি'দের বাণিজ্যিক সংঘাতের কালো অধ্যায়। বে-আব্রু হয়েছিল তৎকালীন ক্যাগ, পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আম্বানি'দের ব্যাক-ডোর সখ্যতার 'নেক্সাস'। তিনদিনের মাথায় 'ইচ্ছাকৃত মানহানি'র অভিযোগে ১০০ কোটির ক্ষতিপূরণ চেয়ে পরঞ্জয় কে লিগাল নোটিশ পাঠিয়েছিল রিলায়েন্স ⁵। 
কলম থামেনি পরঞ্জয়ের। বরং অ্যাকাডেমিক জার্নাল ই.পি.ডাব্লিউ'র এডিটরের দায়িত্ব নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী আর্টিকেলে তিনি 'ক্রনি ক্যাপিটালিজম' মুখোশ খুলে দেন। জনসমক্ষে আসে 'আদানি পাওয়ার লিমিটেড' কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মালবাহী জাহাজের খরচ ও কাস্টম ডিউটি সহ ইন্দোনেশিয়া থেকে ৩৩৫০ টাকা/মেট্রিক টন মূল্যে 'স্টিম কয়লা' আমদানি করে ৫৪৯৪ টাকা/মেট্রিক টন মূল্যে বিভিন্ন স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ড গুলিকে বিক্রি করছে। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রীর তথ্যানুসারে যে দুর্নীতির পুঞ্জীভূত অঙ্ক প্রায় ৫০,০০০ কোটি ⁶। শুধু তাই নয়, ২০১৬'র অগাস্টে অর্থমন্ত্রক সংযোজনী এনে এস.ই.জেড এলাকার কোন প্রজেক্টে প্রযোজ্য ট্যাক্সের নিয়ম শিথিল করে এবং রেট্রোস্পেক্টিভ এফেক্টে অতিরিক্ত ট্যাক্স রিফান্ডেবেল ঘোষণা করে। সংসদে সেই সংযোজনী পাশ হবার দু-দিনের মাথায় 'আদানি পাওয়ার লিমিটেড' গুজরাট হাইকোর্টে পি.আই.এল ফাইল করে ৫০০ কোটি টাকার প্রদত্ত ট্যাক্স রিফান্ডের আবেদন করে। এবং ক্রিম অফ দি টপ; উপযুক্ত নথি ছাড়াই হাইকোর্টে সেই আবেদন মঞ্জুরও করে। 'ক্রনি ক্যাপিটালিজমের' নিখুঁত চিত্রনাট্য এবং তার মসৃণ বাস্তবায়ন বোধহয় একেই বলে। শুধু মিসিং ছিল এক চিমটে ট্র্যাজেডি। শেষ পাতে জুটেছে সেটাও। পরঞ্জয় কে ঐ আর্টিকেল লেখার অপরাধে ইস্তফা দিতে বাধ্য করে ই.পি.ডাব্লিউ'র মালিক পক্ষ। ওয়েবসাইট থেকে সরিয়েও নেওয়া হয় আর্টিকেল গুলি। রঘুরাম রাজনের পরে পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা। কট অর্থমন্ত্রক বোল্ড বিগ-বিজনেস হাউস ⁷ ⁸ ⁹ ।  
এবং এর পরেও আপনার মনে হতেই পারে এসব নেহাতই কাকতালীয়। কিন্তু সমস্যা কি জানেন? সমস্যাটা কাকতালীয় ঘটনা গুলোর পৌনঃপুনিকতায়। যেমন ধরুন, ২০১৪'র অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী গৌতম আদানি স্বাক্ষর করলেন কুইন্সল্যান্ড অববাহিকায় কয়লা উত্তোলন প্রোজেক্টে ¹⁰।  কিম্বা ২০১৫'র প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া এবং ফ্রান্স সফরে প্রতিরক্ষা সামগ্রী ম্যানুফ্যাকচারিং'র চুক্তি পেলো রিলায়েন্স ¹¹।  আবার ধরুন, প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে 'আম্বানি পাওয়ার লিমিটেডের' সাথে মৌ সাক্ষরিত হল বাংলাদেশ পাওয়ার বোর্ডের ¹² । ২০১৭'র আমেরিকা সফরে রিলায়েন্স পেল যুদ্ধজাহাজ মেরামতের বরাত ¹³ । আর ইজরাইল সফরে আদানি'রা করল ড্রোন ম্যানুফ্যাকচারিং ডিলের বাজিমাত ¹⁴ ।  
আপনি যখন ব্যস্ত আছেন হিন্দু-মুসলিম-শিখ-ক্রিশ্চানে বাছতে; আপনি যখন চায়ের আড্ডায় প্রতিদিন ঝড় তুলছেন গরু-শুকর-গোবর-ঘুঁটে নিয়ে; মেয়ের টিউশন ফিস, মায়ের বাত, বউ'র আবদার আর নিজের বিয়ার; একটু গুছিয়ে বসে যখন ভাবছেন 'এই বেশ ভালো আছি'; ঠিক তখনই এই সব কিছুর আড়ালেই বাড়ছে সরকার ও বিগ-বিজনেস হাউসের প্রতিদিনের সখ্যতা। বাড়ছে আম্বানি-আদানিরা। বাড়ছে তাঁদের মুনফা। বাড়ছে ৯৯%'র সঙ্গে ১%'র বৈষম্য।  
কাকতালীয় আজ আপনার মনে হতেই পারে কিন্তু, যে দেশে ঋণখেলাপি বিজয় মালিয়া পায়ের উপর পা তুলে নিশ্চিন্তে লন্ডনে বসে থাকেন, যে দেশে ওত্তাভিও কাত্রোচ্চিরা বোফোর্সের পরও কলার তুলে ঘুরে বেড়ান, যে দেশে ওয়ারেন অ্যাণ্ডারসেনরা ভোপালে নির্বিচারে মানুষ মেরে মন্ত্রীদের প্লেনে চেপে পালিয়ে গিয়ে আমেরিকায় নিশ্চিন্তে মরেন, সে দেশে সত্যেন্দ্র দুবেরা বাঁচতে পারে না, রঘুরাম রাজনরা থাকতে পারেন না, পরঞ্জয় গুহঠাকুরতারা লিখতে পারেন না। 
এবার আপনি ঠিক করুন আপনি কোন পক্ষে। ওত্তাভিও কাত্রোচ্চি-ওয়ারেন অ্যাণ্ডারসেন'দের পক্ষে ? না সত্যেন্দ্র দুবে'দের? আম্বানি-আদানি'দের পক্ষে? না রঘুরাম রাজন-পরঞ্জয় গুহঠাকুরতাদের?  ঠিক করুন আপনি থাকবেন কার সাথে? ঐ ১%'সাথে না  ৯৯%'দের সাথে? নিরামিষ নিরপেক্ষতা তো অনেকদিন হল। এবার না হয় পক্ষ নিন। এবার না হয় বদলে দিন।








-- 





মঙ্গলবার, ২৫ জুলাই, ২০১৭

প্রার্থনা ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

নৃত্য যেথা সারমেয়, পুচ্ছ যেথা বাঁকা 
গরু যেথা বোড়ে, যেথা গেরুয়া পতাকা
কেবলই গায়ের জোরে দিবসশর্বরী
দখল মন্ত্র গায়, আহা মরি মরি
যেথা বাক্য তঞ্চকতা ভরা হতে হতে
বক্তৃতা সাজায়, যেথা মিথ্যাকথা স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কালোটাকা ধায়
বিজয় মাল্য সম চরিতার্থতায়
যেথা উচ্চ পতঞ্জলি প্রহেলিকারাশি
বিজ্ঞানের স্রোতঃপথ ফেলিয়াছে গ্রাসি
সংবিধান করেছে শতধা; নিত্য যেথা
আমোদিত মোদী ভুল বোঝানোর নেতা
নিজ হস্তে পাঠ্যবই ঠিক করে পিতঃ,
ভারতকে সে' নরকে করো হে স্থাপিত।

শনিবার, ২২ জুলাই, ২০১৭

আর এস এস এর শত্রু ~ সুশোভন পাত্র

-কটা বাজে খেয়াল আছে? দুপুরের খাবারটা কি তোদের চায়ের দোকানের ঠেকেই দিয়ে আসবো? 

মহাসপ্তমী'র পুণ্য তিথিতে, খাবারের থালা সাজিয়ে মা তখন জাগ্রত এবং সংহারী। অগত্যা ঝাঁটাপেটা এড়াতে, প্রবল বাগবিতণ্ডার ষোলআনা রাজনৈতিক আড্ডার আপাতত ইতি টানলাম। নব্য আর.এস.এস এবং আমার বাল্য বন্ধু'র গায়ে তখনও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় দিল্লীর মসনদ দখলের ঔদ্ধত্যের গন্ধ টাটকা। একমুখ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আর এক আকাশ রয়াব নিয়ে বন্ধু সেদিন বলেছিল 
-ভাই, তোদের কে নিয়েই যা চিন্তা। অন্য রাজনৈতিক দলগুলো কে আমরা জাস্ট ফুঁকে উড়িয়ে দেব। সত্যি বলতে, উই ডোন্ট রিয়েলি কেয়ার অ্যাবাউট দেম।

আলতো হিমেল পরশে মোড়া নভেম্বরের দিল্লী। কেতাদুরস্ত অশোকা হোটেলে বসল 'ওয়ার্ল্ড হিন্দু কংগ্রেস।' তিনদিনের আলোচনার নির্যাস নিংড়ে, আগত প্রতিনিধি'দের হাতে 'থট পেপার' ধরিয়ে জানিয়ে দেওয়া হল, 'হিন্দু সমাজে সবচেয়ে বড় পাঁচ শত্রু'র নাম' –'এম ফাইভ'। না! 'মুসলিম' কিম্বা 'মিশনারি' না! 'এম ফাইভ'র তালিকাতে প্রথম 'এম'; 'মার্ক্সিসিম' ¹। বুঝলাম, বাল্য বন্ধু'র দুশ্চিন্তা নেহাতই বিক্ষিপ্ত নয়। বরং আর.এস.এস'র আদর্শের বাই প্রোডাক্ট হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত।

২০১৪'র ওড়িশার বিধানসভা নির্বাচনে এই 'মার্ক্সসিস্ট'রা ভোট পেয়েছিল মেরেকেটে ৮০,২৭৪। শতকরা ০.৪%। আর বিধায়ক কুড়িয়ে বাড়িয়ে ঐ একটা ² । অথচ গত ডিসেম্বরে, ভুবনেশ্বরে, এমনই একটা ক্ষয়িষ্ণু ডেভিড'দের রাজ্য পার্টি অফিস আক্রমণ করল 'পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল', গোলিয়াথ বি.জে.পি ³ । বুঝলাম, বাল্য বন্ধু'র দুশ্চিন্তা নেহাতই কাকতালীয় নয়। বরং আর.এস.এস যাজকতন্ত্রের ধমনীতে অন্তর্নিহিত আশঙ্কা সূত্রে সংক্রামিত। 

২০১১'র আগে, এই নব্য আর.এস.এস বন্ধুই জোর গলায় বলত, "এই রাজ্যে গরু-ছাগল-ভেড়া-কুকুর যেই ক্ষমতায় আসুক আপত্তি নেই; কমিউনিস্ট'দের তাড়াতে হবে।" কমিউনিস্ট'দের তাড়ানোর সেই মনোবাঞ্ছনা নিছকই উদ্দেশ্যহীন ছিল না। ছিল না, কারণ, গরু-ছাগল-ভেড়া-কুকুরের'ও অধম এই 'কমিউনিস্ট'দের' ৩৪ বছরে, আর.এস.এস-জামত'দের জন্য এ রাজ্যের দরজা নিয়ম করে বন্ধ থাকতো। রথে চেপে 'লৌহপুরুষ'দের 'মন্দির ওহি বানায়াঙ্গে'র চ্যাংড়ামি এ রাজ্যের দুয়ারে এসে থমকে যেতো। ৮৪ কিম্বা ৯২, গোধরা কিম্বা গুজরাট; এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা তখন "দাঙ্গাবাজ'দের মাথা ভেঙ্গে" দেবার হিম্মত রাখতো। লড়াইটা এ রাজ্যের 'হ্যাভ নটস' গুলো জাত নিয়ে নয় পেটের খিদে আর হাতের কাজ নিয়েই করতে জানতো। 

'কমিউনিস্ট'দের' ৩৪ বছরে, ধূলাগড়ে কোনদিন নবী'র জন্মদিনে মিছিল করতে হয়নি। তৃণমূলের গুলশান মল্লিকের মত, ধূলাগড়ে, 'কমিউনিস্ট'দের' কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কে ভোটের জন্য আইন-প্রশাসনের বিধি নিষেধের তোয়াক্কা না করে সেই মিছিল 'হিন্দু পাড়া'র মধ্যে নিয়ে যেতে উস্কানি দিতে হয়নি। আর.এস.এসের মদত এবং আদর্শপুষ্ট 'অন্নপূর্ণা ক্লাবের' ঢিল ছোড়া দূরত্বে ইসলামের পতাকা টাঙ্গিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বারুদ সাজাতে হয়নি ⁴ । এতে ৩৪ বছরে ইসলাম পালনে কোন বাধা হয়নি। কোরানের সূরার পবিত্রতার দুধে একফোঁটা চোণা পড়েনি। বেহেশতের রাস্তা কণ্টকাকীর্ণও হয়নি। 

জীবদ্দশায় মৌলানা ইয়াসিন মণ্ডল, বারাসতে কোনদিন হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় উত্তেজনার লেশ অনুভব করেননি। ইয়াসিন মণ্ডল বাদুড়িয়ার মিলান মসজিদের ইমাম। সেই মিলান মসজিদ, যে মিলান মসজিদের উল্টো দিকের বাড়িটা ১৬ বছরের শৌভিকের। যে বয়সে শৌভিক'দের ঠাকুমার ঝুলি থেকে বেরিয়ে, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী পেরিয়ে, ক্যালকুলাসের অঙ্কে কিম্বা শেক্সপিয়ারের সনেটে বুঁদ হয়ে থাকার কথা, দু-একটা ইনফ্যাচুয়েশন কে প্রেমে বদলে দেবার কথা; আজকাল সেই বয়সে শৌভিক'রা মনে ঘৃণার বিষ পুষছে। নির্দ্বিধায় অন্যের ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত করে আনন্দ পাচ্ছে। বাড়ি বয়ে এক মৌলবাদের খাল কেটে অন্য মৌলবাদের কুমীর আনছে ⁵। 

নেহেরুর ভ্রান্ত মাশুল সমীকরণ নীতির ⁶ বদন্যতায় পূর্ব প্রান্তের রাজ্যগুলোর শিল্প সম্ভাবনার শশ্মানেই সেদিন সেজে উঠেছিল পশ্চিমের রাজ্যগুলো। ব্যবসায়ী'দের বোম্বে হবু 'বাণিজ্যনগরী'। মালিকের মুনফা আর কারখানার উৎপাদনের ত্রৈরাশিকে প্রতিদিন লেখা হচ্ছে শ্রমিক বঞ্চনার ইতিহাস। শোষিত সেই মুটে-মজুর'দের অধিকার আদায়ের ফিনিক্স স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়েছিলো লাল ঝাণ্ডা। ১৯৬৭'র নির্বাচনে বোম্বে জুড়ে ভোট বাড়াল কমিউনিস্ট পার্টি। দক্ষিণ বোম্বে থেকে সাংসদ হলেন কমিউনিস্ট পার্টির শ্রীপাদ অমৃত দাঙ্গে ⁷। ট্রেড ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যে সেদিন প্রমাদ গুনেছিল মালিক-ব্যবসায়ী মহল। শ্রমিক ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে কমিউনিস্ট'দের শায়েস্তা করতে, জরুরী অবস্থায় অন্ধকার দিনে আত্মপ্রকাশ করেছিল শিবসেনা। মালিক'দের টাকা আর কংগ্রেসের ইন্ধনে অল্প কিছুদিনেই নিছক একটা পত্রিকা সম্পাদক থেকে বাল ঠাকরের হয়ে উঠলেন বিষাক্ত রাজনীতির বেতাজ বাদশা ⁸। আর 'অজ্ঞাত পরিচয়' ব্যক্তির ১৬টা গুলি বুকে নিয়ে রক্তাক্ত হলেন শ্রমিক আন্দোলনের পথিকৃৎ 'কমিউনিস্ট' দত্ত সামন্ত ⁹ । 

আসলে 'কমিউনিস্ট'দের সাথে লড়াইয়ে মৌলবাদী'দের বরাবরই একটা মুখোশ লাগে। সেদিনে যে মুখোশের দায়িত্ব কৃতিত্বের সাথে পালন করেছিল শিবসেনা, আজকের বাংলায় সেই গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। তাই 'কমিউনিস্ট'দের' ৩৪ বছরে, যে রাজ্যে কোনদিন চার দেওয়ালের গণ্ডী পেরিয়ে ধর্ম রাস্তার রাজনীতিতে এভাবে বেআব্রু হয়নি, যে রবীন্দ্র-নজরুল-লালনের মাটিতে গুলশান মল্লিক কিম্বা শৌভিক'দের চাষ হয়নি, সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আজকাল মৌলবাদ চাষের জমি উর্বর করতে যত্ন করে লাঙ্গল দিচ্ছেন। 

তবুও আমার গোলিয়াথ বন্ধু আজও 'কমিউনিস্ট' ডেভিড'দের নিয়ে দুশ্চিন্তা করে। করে কারণ, আজও গোটা বিশ্বজুড়েই মৌলবাদী'দের মুখ আর মুখোশ, দুইয়ের বিরুদ্ধেই 'কমিউনিস্ট'রাই বুক চিতিয়েই লড়াই করে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু'দের উপর অত্যাচার কিম্বা পাকিস্তানে বঞ্চিত শ্রমিকের অধিকার, আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষের শিকার কিম্বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ব্যয়সংকোচ নীতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের জোগাড় –আজও দেশে-বিদেশে লাল ঝাণ্ডাই প্রতিদিন পথে নামে। ইতিহাস সাক্ষী এই 'কমিউনিস্ট'দের' জন্যই দুনিয়া একদিন হিটলারের রক্ত চক্ষুর কাছে মাথা নোয়ায়নি, মুসোলিনির কাছে হারেনি। এই 'কমিউনিস্ট'দের জন্যই আজও জীবন বাজি রেখে আই.এস.আই.এস বিরুদ্ধে কুর্দ'দের লড়াই থামেনি। আর এই 'কমিউনিস্ট'দের' জন্যই বাংলার মাটি পাকিস্তান হয়নি, আর গুজরাটও হবেনা। 

আমার গোলিয়াথ বন্ধু দুশ্চিন্তার করে কারণ, ইতিহাস সাক্ষী, আর.এস.এস'র কিম্বা জামাত -দুনিয়ার তামাম ডেভিড-গোলিয়াথের লড়াইয়ে, গোলিয়াথরা কোনদিন জেতেনি। গোলিয়াথরা কোনদিন জিতবে না।









শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০১৭

হাসপাতালের জার্নাল ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

এই জার্নালে, কাব্য ভারাক্রান্ত কিছু দেব না এই রকমেরই ভাবনা ছিল। এমনিতেই মন খুব খারাপ। চাকরিতে ঢোকার সময় অবসরের জন্য আটান্ন বছর বয়স ধার্য ছিল। ভিআরএসএর অধিকারহীন এই চাকরির বাধ্যতামূলক বয়সসীমা বেড়েই চলেছে। এমতাবস্থায় স্বপ্ন দেখলাম জীবনানন্দ দাশ সরকারি ডাক্তার, তাঁর বয়স তেষট্টি পেরিয়েছে। রিটায়ারমেন্টের বয়স হেঁটে যাচ্ছে অনন্তের দিকে।
ঘুম ভাঙতেই কবিকে প্ল্যাঞ্চেটে ডাকলাম। সমান্তর পৃথিবী থেকে নেমে এসে তিনি লিখে দিয়ে গেছেন যা, সে'টুকু নীচে রইল।
------------------------------------------------------------------------

তেত্রিশ বছর ধরে আমি খেলা দেখাচ্ছি সরকারি সার্কাসে
মেডিকেল কলেজ থেকে সত্তরের বিভীষিকা দশক পেরিয়ে
অনেক ঘুরেছি আমি। ইন্টার্নশিপের সেই ধূসর জগতে,
সেখানে একবছর, আশা প্রহেলিকামাখা হাউসস্টাফ শিপেও
সে'খানে ছিলাম আমি। আরও ঘোর অনিশ্চিত চিকিৎসার রিঙএ,
আমি ক্লান্ত বাঘ এক, রিঙমাস্টারেরা শুধু চাবুক মারেন।
আমাকে দু'দণ্ড শান্তি দিলই না আজব এক হিটলারি ব্রেন।

মাইনে তার কবেকার ডিএ-হীন অতিদীন স্কেলে
চাকরির ক্ষেত্রটুকু মাননীয়াটির দেওয়া উস্কানির পর
আজ নিরাপত্তাহীন। সেই বাঘ হারিয়েছে দিশা
তবু অবসর-লোভ যখন সে চোখে দেখে সার্ভিস বুকের ভিতর,
তখনই ভবিষ্য দোলে অন্ধকারে, বুঝে যাই জেগেছে ভিলেন
বক্তৃতায় অতিদড় গলা যার… মাননীয়া শয়তানি ব্রেন।

তেষট্টি বছর পুড়ে ছাইভরা চিতার মতন
সন্ধ্যা আসে, মাথার মেধা ও স্মৃতি ক্রমশ বাতিল
পৃথিবীর সব রঙ নিভে এলে সিপিএ-র হয় আয়োজন
তখন কেসের ভয়ে ছানি-চোখ করে ঝিলমিল
মৃত্যুপথযাত্রী বাঘ… পাবই না,  পেনশনে প্রাপ্য লেনদেন
থাকে শুধু অন্ধকার, মেরে ফেলে গিলবার শয়তানি ব্রেন।

শুক্রবার, ১৪ জুলাই, ২০১৭

নয়ডা ~ আর্কাদি গাইদার

'কে কখন কোথায় কিভাবে বিষ্ফোরণ ঘটাবে তা জানতে রাষ্ট্রশক্তির এখনো বাকি আছে'
- হারবার্ট, নবারুন ভট্টাচার্য্য

নয়ডাতে মহাগুন মর্ডার্ন সোসাইটি নামক গেটেড কমপ্লেক্স। গেটেড কমপ্লেক্স মানে এই যেমন ধরুন কলকাতার সাউথ সিটি, বা বেংগল অম্বুজা। প্রাচীর ঘেরা জমি, সবুজ লন, তার মধ্যে ছবির মতন সুন্দর অট্টালিকার সমাবেশ। বাইরের নোংরা শহর আর তার ততধিক নোংরা ঘেমোগন্ধওয়ালা মানুষগুলোর থেকে পার্টিশন করা সম্পূর্ন আলাদা একটা জগত। তা এরকমই একটি গেটেড কমিউনিটি মহাগুন মর্ডার্নের কোন একটি ফ্ল্যাটে কাজ করতেন জোহরা বিবি। পরশু থেকে হঠাত নিখোজ হয়ে যান। তারপর কাল তার হদিশ পাওয়া যায়। তার মালিকের দাবি যে জোহরা বিবি নাকি ১০০০০ টাকা চুরি করে বাড়ির বেসমেন্টে লুকিয়ে ছিলেন। জোহরা বিবি জানিয়েছেন, তাকে মালিক গোটা দিন একটা ঘরে আটকে রেখেছিলো। এরপর জোহরা বিবির  বাড়ি যেযে বস্তি/কলোনীতে সেখানকার লোকজন খেপে গিয়ে কমপ্লেক্সে হামলা করেন, ভাংচুর করেন। সিকিওরিটি গার্ডরা হাওয়ায় গুলি চালায়। তারপর পুলিশ আসে। আপাতত ওই বস্তির ৫০ জন পুলিশ হাজতে।

এর পরেই বাজার গরম হয়ে ওঠে বিভিন্ন ভাবে। বেশ কিছু মিডিয়া রিপোর্ট করে যে 'আবাসনের শান্তিপ্রিয় বাসিন্দাদের ওপর 'মব' এর হামলা'। চুরি লুকোতে গা জোয়ারি। ব্যাক্তিগত সম্পত্তি ধ্বংস। সোশ্যাল মিডিয়াতে ভদ্রলোকেরা আতংকিত হয়ে লিখতে শুরু করে - এদের কে কাজে রাখা যাবে না! কি অনাসৃষ্টি! কত সাহস! এমনকি চাড্ডিরাও পিছিয়ে থাকবে না বলে প্রচার শুরু করে দিয়েছে 'হিন্দু মালিকপক্ষের ওপর বেআইনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী মোল্লাদের হামলা'। চাড্ডিদের নিয়ে আজকাল আর অবাক হইনা, হাসিও পায় না। যে কোন শ্রেনী সংঘাতকে সাম্প্রদায়িক রং দিতে ওরা বিশেষ ট্রেনিং পায় বোধহয়। ভাঙরের ক্ষেত্রেও করেছিলো। তা এই চরম ক্যাকোফোনির মধ্যেও কিছু কিছু মিডিয়া ঘটনার সব দিক তুলে ধরে রিপোর্টিং করবার চেষ্টা করেছে, তার লিংক কমেন্টে দিয়ে দেবো।

এই হলো তথ্য। এরপর আসবে সত্য। আমি দুটো বাক্য কে মূলমন্ত্র মেনে চলি - Seek truth from facts. আর There is no truth but class truth. তাই আপাতত তথ্য থেকে শ্রেনী সত্য উদঘাটনের সামান্য প্রয়াস করি।
প্রথমেই জানাই, জোহরা বিবি মিডিয়াকে জানিয়েছেন যে তিনি কুচবিহারের বাসিন্দা, এবং ভারতের নাগরিক হিসেবে তিনি নিজের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড সবই পুলিশ এবং মিডিয়াকে দেখিয়েছেন। এবার চলুন তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম উনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী মোল্লা। তা ওনাকে কাজে রাখবার সময় তো এইটা নিয়ে কোন অসুবিধে হয়নি। তাহলে আজকে ওনার সাথে বৈরিতার সময় এই তথ্য দিয়ে কি হবে? 
ভারতবর্ষের উচ্চমধ্যবিত্ত কি পরিমানে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা বহন করে, তার প্রমান আমরা রোজ হাতেনাতে পাই নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে। এ ছাড়া এই বাংলাতেই খবরের কাগজে মাঝেমধ্যেই বাড়ির কাজের লোকের ওপর অত্যাচার নিয়ে কত খবরই বেরোয়। সেখানে নয়ডার মতন জায়গার বড়লোকরা, বিশেষ করে এই আবাসনে থাকা পয়সাওয়ালারা, যাদের অভিজ্ঞতা আছে, জানবেন যে বাকিদের থেকে অনেককাঠি ওপরে। তাই যখন দেখেছি যে গোটা কলোনীর লোক একসাথে আবাসনে হামলা চালিয়েছে, এটা বুঝতে খুব অসুবিধে হয়নি যে এটা দিনের পর দিন পুঞ্জিভূত হওয়া অন্যায়, অপমান ও শ্রেনীঘৃনার বহিঃপ্রকাশ। 'তোমার আছে, আমাদের নেই' স্রেফ এই কারনে তুমি আমাকে নিচু চোখে দেখলে, একদিন আমি ফেটে পড়বোই।
আমার নিরপেক্ষতার প্রতি কোন দায়বদ্ধতা নেই। বৈষম্যের পৃথিবীতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা মানে ক্ষমতার পাশে দাঁড়ানো। 'নিরপেক্ষতা' দেখানোর জন্যে মিডিয়া আছে, ফেসবুকের বাবু বিবিরা আছে। আমার একমাত্র দায়বদ্ধতা শ্রেনীর প্রতি। তাই আমি ওই মহাগুন মর্ডার্নের তছনছ হয়ে যাওয়া সবুজ লন আর দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে যাওয়া স্থাপত্যগুলো দেখে খুব আনন্দ পেয়েছি। ওই চকচকে ঝকঝকে চামড়াওয়ালা ভীত মুখ গুলো দেখে উল্লাসে ফেটে পড়েছি।
ঠিক যেমন পেয়েছিলাম কয়েকদিন আগে কলকাতার আবাসনে পাশের বস্তি থেকে হামলা করে সব দামী গাড়ি গুড়িয়ে দেওয়াতে। 
জোহরা বিবির বস্তির লোকজন বেশ করেছেন। লাল সেলাম।

There is a storm coming Mr Wayne. You and your friends better batten down the hatches, because when it hits, you are all gonna wonder how you could live so big, and leave so little for the rest of us.






বুধবার, ১২ জুলাই, ২০১৭

সময় ~ রেজাউল করীম

মেয়ে বলল: দেখেছ t উপরে মাত্রা দিয়ে সময়কে ভেক্টর বানিয়ে দিয়েছে। বললাম: ভুল করেছে। সময় ভেক্টর নয়, কিন্তু বলেই কেমন ধন্দ লাগল। সময় কি কেবলই একটা মান, যা দিকশূন্যপুরে সহজেই হারিয়ে যায়! সময়ের গতি শুধু সুমুখপানে কিন্তু সামনে এগোতে পারলে পেছনপানে কেন যেতে পারবে না? আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যানে সময়ের গতি ও দিক নিয়ে নিয়ে বিস্তৃত গবেষনা হয়েছে। তিনরকমের সময়ের তীর বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করেছেন- thermodynamic, Cosmological ও psychological। মনোবৈজ্ঞানিক সময়ের তীর যদি আমাদের বিক্ষত না করত তাহলে পৃথিবীটাই অন্যরকম হত। দুষ্মন্ত সেই সময়ের তীর চালান করতে পারলে শকুন্তলাকে এত কষ্ট পেতে হতে না, জার্মান-প্রুশিয়া রাশিয়া-ফ্রান্সের সঙ্গে লড়তো না আর তাহলে হয়ত নাজি দলের উত্থান হত না। এমনি এক জুলাই মাসে প্রুশিয়ান আর্চ-ডিউক খুন হলেন জুগোশ্লাভ জাতীয়তাবাদী নেতাদের হাতে। রাশিয়া প্রথম যুদ্ধ শুরু করলো। ফ্রান্স ১৮৭৮ র হারের বদলা নেবার সুযোগ খুঁজছিল, তারা সহজেই রাশিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে ফেলল। দেড় কোটি মানুষের মৃত্যু হল আর পৃথিবীর চেহারাটাই গেল চিরতরে বদলে। 

সময়ের মানসিক তীর পশ্চাদগামী না হলে কেমন হত তা রবীন্দ্রনাথ ঠাট্টার ছলে লিখেছিলেন- "পাঁচ বছর পূর্বেকার ভালো-লাগা পাঁচ বছর পরেও যদি একই জায়গায় খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে, বেচারা জানতে পারে নি যে সে মরে গেছে। একটু ঠেলা মারলেই তার নিজের কাছে প্রমাণ হবে যে, সেণ্টিমেণ্টাল আত্মীয়েরা তার অন্ত্যেষ্টি-সৎকার করতে বিলম্ব করেছিল, বোধ করি উপযুক্ত উত্তরাধিকারীকে চিরকাল ফাঁকি দেবার মতলবে।" সময়ের সাথে এগিয়ে না চলতে পারার নাম কী মৃত্যু? তাহলে, আমরা কমবেশী সবাই অল্প স্বল্প মৃত। কেউ সমাজের পুরনো রীতি আঁকডে ধরে প্রানপনে মরতে চাইছি, কেউ আবার ধ্বজাধারী ধর্মের ফসিল আঁকডে নিজেকে ভোলাতে চাইছি। সময়ের গতিপথ নিয়ে হকিং সায়েব বই লিখে ফেলেছেন।  সময় নাকি কোন এক যুগে আবার পেছনপানে চলতে শুরু করবে। আজ যা ঘটছে অনাদিকাল ব্যাপি অনন্তবার সেই ঘটনা ঘটেছে, আবার ঘটতেই থাকবে, এর কোন শেষ নেই। ভেক্টর যাই হোক, ফিজিক্স বেশ রোমান্স ভরা। কল্পনার রঙিন ডানায় ভর করা স্বপ্নকেও সে সাকার করে তোলে- তাই হকিংয়ের মুগ্ধবোধ পড়ে অন্যতর অনুভূতি হয়। শুধু সময়ের তীর যখন সাঁ করে উল্টো দৌড লাগাবে তখন কী সব মনে পড়বে নাকি "যে পথ চলে গেলি সে পথ কেন ভুলে গেলি রে" বলে গান ধরতে হবে!! 
সময়ের মান অর্থাৎ পরিমান নিয়ে ও একই রকম ধন্দ। প্রেমিকের জন্য এক মূহর্ত অপেক্ষা যেন অন্তহীন কিন্তু দেখা হলে? "যুগ যুগ হাম হিয়ে হিয়ে রাখলু/ নয়ন না তিরপেত ভেল!" নয়নের কথা বলেছেন কিন্তু আসলে সময় এত দ্রুত নিজেকে শেষ করে ফেলে যে ঘন্টাগুলো সেকেন্ডের মত দৌডায়। অমিত বলেছিল-  সময় যাদের বিস্তর তাদেরই পাঙ্ক্‌চুয়াল হওয়া শোভা পায়। দেবতার হাতে সময় অসীম তাই ঠিক সময়টিতে সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস্ত যায়। আমাদের মেয়াদ অল্প, পাঙ্ক্‌চুয়াল হতে গিয়ে সময় নষ্ট করা আমাদের পক্ষে অমিতব্যয়িতা। অমরাবতীর কেউ যদি প্রশ্ন করে 'ভবে এসে করলে কী' তখন কোন্‌ লজ্জায় বলব, 'ঘড়ির কাঁটার দিকে চোখ রেখে কাজ করতে করতে জীবনের যা-কিছু সকল সময়ের অতীত তার দিকে চোখ তোলবার সময় পাই নি"। 
এদেশের ঋষিরাও সময় নিয়ে বিস্তর চর্চা ও লেখালেখি করেছেন। কাল শাশ্বত এবং গতিশীল :হে চিন্ময় শক্তিসম্পন্ন ! আপনি পরমেশ্বর ভগবানের নিয়ন্ত্রনকারীরূপ শাশ্বত কালের গতিবিধি সম্বন্ধে অবগত । আপনি যেহেতু আত্ম-তত্ত্ববেত্তা, তাই আপনি আপনার দিব্য দৃষ্টির প্রভাবে সব কিছু দর্শন করিতে পারেন ।(ভাগবত ৩/১১/১৭)
এ শ্লোকে কালকে শাশ্বত বলে অভিহিত করা হয়েছে । কাল গতিশীল এ বিষয়টিও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে । এখানে দিব্য দৃষ্টির উল্লেখ করা হয়েছে যার দ্বারা একজন অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ দর্শন করতে পারেন । দিব্য দৃষ্টির দ্বারা মহাবিশ্বের সবকিছু দর্শন করা যায় এমনকি কালের গতিবিধি সন্মন্ধে ধারণা পাওয়া যায় । রবিঠাকুর কালের যাত্রার ধ্বনিও শুনতে পেয়েছেন। সময়ের সেই অন্তহীন রথে চেপে  একদিন উধাও হয়ে যাব। যেতে যেতে হয়ত আজকের খণ্ড মূহুর্তগুলির সাথে দেখা হয়ে যাবে- নববধুটির মত সাজগোজ করে সময়ের সে বিন্দু বসে থাকবে, অন্তহীন যাত্রার ক্লান্তি সরিয়ে সে বন্দুক সাথে সুখ-দুখের বিনিময় করতে করতে হারিয়ে যেতে বোধহয় ভালোই লাগবে।

বৃহস্পতিবার, ৬ জুলাই, ২০১৭

স্মৃতিচারণ - ৪ ~ স্বাতী রায়

এরকম টুপটাপ, ঝিরিঝিরি বা ঝমঝম বৃষ্টির দিনে খুব মেসে কাটানো দিন গুলোর কথা মনে পড়ে। ২০০৪ সাল, রুমমেট আমি, রুমি, দীপমালা, অন্বেষা। আমি আর রুমি সমবয়সী বাকি দুজন বয়েসে বছর তিনেকের ছোটো। রুমি যাদবপুরের ফিলজফিতে মাস্টার্স করছে, বাকি দুটি ফার্স্ট ইয়ার। আমি তখন গ্র‍্যাজুয়েশন শেষে কাঠ বেকার, চাকরি খুঁজছি। বর্ষার দিনে আমাদের বিলাসিতা ছিলো ঘরের ভিতরেই স্টোভ জ্বেলে ঢ্যালঢ্যালে খিচুড়ি। বাকি তিনজন অভুক্ত বাচ্চার মত খাটের উপর পা গুটিয়ে বসে জুলজুলে লোলুপ দৃষ্টিতে বুগবুগ করে ফুটতে থাকা হলুদ অমৃতর দিকে তাকিয়ে থাকতো। আমি খিচুড়িতে হাতা নাড়তাম। কখনো সেই সুগন্ধি আতপ আর মুগডালের মিশ্র গন্ধে পাগল হয়ে বলতো অনেক হয়েছে, এবার নামিয়ে খেতে দে। আমি ধমক দিতাম, দাঁড়া এখনো চাল ডাল আলাদা আলাদা তাকিয়ে রয়েছে, না মিশলে খিচুড়ি হবে? সকালের চায়ের দায়িত্ব ছিলো দীপ আর অন্বেষার। আমি চিরকাল কুঁড়ে মানুষ,  তায় লেট রাইজার। দুই কন্যা স্টিলের গ্লাসে চা নিয়ে আমায় ঠেলে তুলে দিতো। আর কতো ঘুমুবে? ওঠো। এদিকে বাইরে বেরোবার উপায় নেই গলিতে এক হাঁটু জল। আমাদের দিন রাত ব্যাপি আড্ডা, গান।

 স্মৃতিমেদুর মনে সেসব গলিতে জলজমা বর্ষাদিনের কথা ভাবতে গিয়ে মনে পড়লো অন্বেষা আর দীপ সকাল সন্ধে ঘরে ধূপ দিতো। সেই ধূপের গন্ধে আমার বহুদূরে থাকা মায়ের কথা মনে পড়ত। শাঁখের আওয়াজ, চুড়ির রিনিঝিনি, তুলশী তলায় প্রদীপ। আমি মাথা নোয়াতাম না বলে আমার স্বল্প শিক্ষিত মায়ের বক্তব্য ছিল আমি নিশ্চই হাসপাতালে কোনো যবনীর বাচ্চার সাথে অদলবদল হয়ে গেছি। হিন্দুর বাচ্চা আমি হতেই পারিনা! পুরো স্কুল জীবন, আমি সামনা সামনি কোনো মুসলিমের সাথে মেশার সুযোগ পাইনি। শোনা কথার বিষ আমার ভিতরে কিছুটা হলেও ছিল। কলেজে পড়তে এসে প্রথম পেলাম কিছু অহিন্দু সহপাঠী, আর এই মেসে থাকতে এসে তো একই ঘরে বসত করা শুরু হল। এক সন্ধায় কামাখ্যার ভক্তিমতী দীপের সন্ধার ধূপ দেখানোর পর আমি রুমিকে জিজ্ঞাসা করলাম হ্যাঁ রে তোকে তো কোনো দিন নামাজ পড়তে দেখলাম না। "তোদের" নাকি পাঁচ বেলা নামাজ মাস্ট। রুমি বলল তোকেও তো কোন দিন ধূপ দিতে বা প্রণাম করতে দেখলাম না। আমার চোখের উপর থেকে একটা পর্দা সরে গেলো। মায়ের ভাষায় "যবনী " রুমি Rehana Haidar আমার জ্ঞান চক্ষু উন্মিলিত করে দিল, শিক্ষার বিকল্প নেই। দীপ আর অণ্বেষাকে কোনোদিন এক বিন্দুও অপ্রস্তুত হতে দেখিনি চারজনায় একে অপরের মুখের খাওয়ার কাড়াকাড়ি করে খেতে আপত্তি তো দূর। আদুরে দীপের ফেবারিট পাসটাইম ছিলো ঘুমন্ত আমার বা রুমির চাদরের মধ্যে টুক করে ঢুকে পড়ে জাপ্টে ধরে শুয়ে থাকা, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর না করা অবধি ছাড়তো না। অবিশ্বাসী আমায় বা অন্যধর্মের রুমি কে নিয়ে কই কোনোদিন একফোঁটাও অসহিষ্ণুতা দেখিনিতো। 

 আসলে ওই ফুটতে থাকা চাল ডাল গুলো আমরাই ছিলাম, আমাদের মিলে মিশে এক হয়ে থাকতে কোনো ধর্ম নামক জুজু চোখ রাঙায়নি। আমাদের এক থালায় ভাত খাওয়া, আমাদের একে অপরের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, এর ওর পিছনে লাগা কিছুই ব্যহত হয়নি। পরমা সুন্দরী রুমি কে আমি এখনো যখন-তখন বেগমসাহিবা বলে পিছনে লাগতেই পারি, বড়ো বড়ো চোখ পাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলে। আমাদের একটাই পরিচয় ছিল, এখনো আছে- আমরা রুমমেট, আমরা বন্ধু এবং আমরা... আমরা মানুষ আর কি...

দাঙ্গা ~ আর্কাদি গাইদার

আপনাদের একটি গল্প শোনাই। গত তিন দিন ধরে বিভিন্ন লোকের সাথে কথা বলে, খবর নিয়ে, অনেকুগুলো বিন্দুর মধ্যে লাইন টেনে গল্পটা তৈরি করেছি। আসলে তৈরি করেছি বলা ভুল, আসলে এই গল্পটা খালি অপেক্ষা করছিলো কখন কেউ তাকে একজায়গায় একসাথে লিখে ফেলবে।

পুরো বসিরহাট মহকুমা অঞ্চলেই দীর্ঘদিন ধরে জামাতের চাষ হচ্ছে । বিশেষ করে শেষ দশ বছর।পরিকল্পিত ভাবে বাংলাদেশ থেকে জামাতিরা এসে গ্রামে গ্রামে মিটিং করে যায়। ওয়াজ করে যায়। সেই ওয়াজের কিছু কিছু ভিডিও আপনারা ইন্টারনেটেও দেখতে পান। গোটা বারাসাত বসিরহাট দেগঙা অঞ্চলে শেষ ৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ভরে ভরে জামাতি পাব্লিক এসেছে হাসিনার সরকারের তাড়া খেয়ে, তার সাথে এসেছে জামাতি আইডিওলজি, সৌদি ফান্ডিং আর বেসরকারি মাদ্রাসা। তৃণমুলের আগের এমপি হাজি নুরুল আর এখনকার এমপি ঈদ্রীশ আলি সরাসরি ঘোষিতভাবে জামাতের সাহায্যে প্রচার করে, তার বদলে জামাতকে নিজেদের অঞ্চলে ফ্রী হ্যান্ড দেয় যা ইচ্ছে করবার জন্যে। সারদার টাকা ববির হাত দিয়ে জামাতের কাছে যায়, বিনিময় ওরা বাংলাদেশি জামাতিদের ভোট এবং তার ওপর প্রভাব এনশিওর করে। 
এবার আসরে নামলো বিজেপি / আর এস এস/ সংঘ পরিবার। বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দুদের মধ্যে তাদের সংগঠন অনেকদিন ধরেই ছিলো, তারা এবার অঞ্চলে প্রচার করতে শুরু করলো, যে হিন্দুরা আজ এই আগ্রাসনের সামনে বিপন্ন, যার ফলে উপনির্বাচনে জিতলো শমীক। 
আশার কথা, অঞ্চলের স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যেও ধীরে ধীরে এই জামাতি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি হলো। জামাতিদের প্রথম টার্গেট হলো স্থানীয় মাজহার এবং তাদের পীরেরা, কারন তাদের ধর্মীয় মতবাদে ইসলামে এগুলো শিরক। এই দ্বন্দ্ব গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে আরও শক্তিশালী হয়েছে।

২০১৬ র বিধানসভা নির্বাচনে এইখানকার তিনটে বিধানসভা কেন্দ্রের দুটো জিতলো জোটের প্রার্থীরা (একজন কংগ্রেস একজন সিপিএম) এবং একটি জিতলো তৃণমুল। তৃণমুল দেখলো যে ঈদ্রীশ আলির মতন 'ধর্মপ্রান' নেতা বা জামাতিদের দিয়েও এখানকার মুসলিম ভোট কনসোলিডেট করা যাচ্ছে না, তারা রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে বিবেচনা করে ভোট দিচ্ছে, ধর্মীয় না। 

বাদুড়িয়ায় রবিবার থেকে ঝামেলার সূত্রপাত। একটি খবরের কাগজে স্থানীয় বিজেপি নেতার ইন্ধনে ভুয়ো খবর ছাপানো নিয়ে, যে ঈদের দিন নাকি পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো হয়েছে। এবার আসরে নামলো হিন্দু সংহতি। হিন্দু সংহতির নাম শুনেছেন তো? এদের নেতা তপন ঘোষ। তিনি ভোটের আগে ঘোষনা করে মমতাকে ভোট দিতে আবেদন জানান, তিনি মমতার সরকারকে দশে সাত দেন, তিনি অঞ্চলে অঞ্চলে তৃণমুলের লোকেদেরকে বলেন হিন্দু সংহতিতে যোগ দিতে, কারন 'আমরা আপনাদের এবং দিদিরই পক্ষে'। তা শৌভিক সরকার নামক একটি ১৭ বছরের তরুন, যে আবার এই হিন্দু সংহতির সাথে যুক্ত, সে ফেসবুকে একটি নোংরা ছবি পোস্ট করলো। এ নিয়ে অঞ্চলের স্থানীয় কিছু মুসলিম বিক্ষোভ দেখানো শুরু করলো। শৌভিক গ্রেপ্তার হলো। 

এরপরেই গল্পের আসল মজা। স্থানীয় লোকজন জানাচ্ছেন, যারা বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন, থানা ঘেরাও করেছিলেন, তাদেরকে পুলিশ ডিসপার্স করে দেয়। তারপরেই বাইরে থেকে কিছু অচেনা লোক আসে, যারা হিন্দিতে কথা বলছিলো, তারাই পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগানো এবং ভাংচুর শুরু করে। (নিচে নিউজ ১৮ এর ভিডিও রিপোর্ট দেখুন)

এর পরে হঠাত করে অঞ্চলে কে বা কারা গুজব ছড়াতে থাকে। শোনা যায় বসিরহাটে নাকি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। পবিত্র কোরানের ওপর নাকি প্রস্রাব করা হয়েছে। এবার ঝামেলা ছড়াতে থাকে। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে দলবল নিয়ে কিছু মানুষ বেরিয়ে পড়ে ভাংচুর, অবরোধ শুরু করে, অনেক দোকান আর বাড়িতে আগুন লাগানো হয়। শৌভিকের বাড়িও বাদ যায় না। স্থানীয় বহু হিন্দু-মুসলিম যুবক যুবতী এমনকি বেশ কিছু মসজিদের ইমাম শান্তিরক্ষার জন্যে রাস্তায় নামে, কিন্তু প্রথম কয়েক ঘন্টা তাদের চেষ্টায় কোন কাজ হয়না। খেয়াল রাখবেন, এর মধ্যে মাত্র ২৪ ঘন্টা অতিবাহিত হয়েছে। এই গোটা সময়টায় পুলিশ প্রশাসন ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসেছিলো। এর মধ্যে রাজ্যপাল আর মমতার ফোনে বচসা হয়। মমতা প্রেস কনফারেন্স করে ফেলেন, যেখানে তিনি বলেন - 'আপনাদের আমি অনেক প্রটেকশন দিয়েছি, আর দেবো না'। (নিচে নিউজ রিপোর্ট দেখুন) স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে, এখানে মমতা 'আপনাদের' বলতে কাদের কথা বুঝিয়েছেন? দাঙ্গাবাজরা? জামাতি ধর্মগুরুরা? নাকি সাধারন মুসলমানরা? এবার আস্তে আস্তে পুলিশ সক্রিয় হয়।  স্থানীয় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সংগঠিত হয়। ফুরফুরা শরীফের ইব্রাহিম সিদ্দিকি, বসিরহাটের পীরজাদা, অল বেংগল ইমামস এসোশিয়েশনের চেয়ারম্যান, সবাই বিবৃতি দিয়ে দাঙ্গাবাজদের নিন্দা করেন আর শান্তির আবেদন জানান। তৃণমুলের এমপি ঈদ্রিশ আলি বোধহয় সারাদিন ঘুমোচ্ছিলেন। তৃণমুলের এম এল এ দীপেন্দু বিশ্বাস জার্মানিতে ফুটবল দেখতে গেছেন। তাই তার অঞ্চল বসিরহাট দক্ষিনে মাঠে নেমেছেন বসিরহাট উত্তরের সিপিএমের এমএলএ রফিকুল ইসলাম। ওদিকে ঝামেলার দিন সারাদিন বিজেপির দিলীপ ঘোষ আর বাবুল সুপ্রিয় ট্যুইটারে নিজেদের মধ্যে তরজা করে গেছেন কে রাজনীতিতে নতুন তাই নিয়ে। এখন ওনারা আর হিন্দু সংহতি মাঠে নেমেছেন, হিন্দুদের 'প্রতিশোধ' নিতে আহ্বান জানিয়ে।

তাহলে যা দাড়ালো, এই অঞ্চলে এতদিন জামাত আর হিন্দু সংহতি চাষ করিয়েও সাধারন হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে ধর্মীয় ভিত্তিতে ভোট ভাগাভাগি করা যাচ্ছিলো না। তাই এই ৪৮ ঘন্টার স্ক্রীপ্টটার খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো। হিন্দুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ ঢুকিয়ে তাদের ভোট বিজেপির দিকে ঠেলবার চেষ্টা। বিজেপির বৃদ্ধির সম্ভাবনার জুজু দেখিয়ে মুসলমানদের ভোট তৃণমুলের দিকে টানবার চেষ্টা হলো। বিরোধী ভোট সুন্দর করে ভাগ করে দেওয়া গেলো। যেই ঝামেলা স্রেফ পুলিশ দিয়ে প্রথম এক ঘন্টায় থামিয়ে দেওয়া যেতো, রাজ্য প্রশাসনকে ছুটিতে পাঠিয়ে তাকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে এই আকার দেওয়া হলো। সাথে যোগ করা হলো রাজ্যপালের সাথে তরজা, রাষ্ট্রপতি শাসন আর কেন্দ্রীয় বাহিনীর মশলা। নাগপুর আর কালিঘাটের যৌথ ফরমুলায় ল্যাবরেটরিতে তৈরি হলো এই বিষ। 

এই ঘটনা থেকে যাদের ক্ষীর খাওয়ার তারা খেয়ে নিয়েছে। পড়ে রইলাম আমি আর আপনি। আমাদের মধ্যে আরেকটু অবিশ্বাস বাড়লো। এবার আমরা একে অপরকে আরও বাঁকা চোখে দেখবো। ভয় পাবো। আরও অচেনা হবো। জিএসটি, নারদা, ভাঙরের লড়াই আপাতত সবাই ভুলে গেছে। 

মিশন সাকসেসফুল।

বুধবার, ৫ জুলাই, ২০১৭

বাদুড়িয়া দাঙ্গা ~ শোভন চক্রবর্তী

চৌত্রিশ বছরে দশমী আর মহরম একবারও একই দিনে পরেনি? উত্তর হ্যাঁ! বহুবার পরেছে!ঠাকুর বিসর্জনও হয়েছে আবার তাজিয়াও বেড়িয়েছে! জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যকে কখনও বলতে শুনেছেন ঠাকুর বিসর্জন বন্ধ(?) নাহ! ধর্ম ধর্মের পথে চলেছে! অরিন্দম শীল নয় বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা বলছে ২০০২এ গুজরাট দাঙ্গার বছর যেদিন দশমী সেদিনই ইসলাম মতানুযায়ী মহরম ছিলো! কেশপুরে শেষপুর দেখার পরের বছরও CPI(M) এর নেতৃত্বে চলা বামফ্রন্ট সরকারকে খাবি খেতে হয়নি!আমাদের রাজ্যে কি এমন হলো যে বিসর্জন বন্ধ করে দিতে হবে! আসলে কিছুই হয়নি! বিসর্জনটা বন্ধ করে হিন্দু সাইকোলজিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো "শালা মুসলমানের মহরমের জন্য বিসর্জন বন্ধ করে দিলো মমতা!" রামকে জমি দিতে ইসলাম দরকার! ময়দানে এলেন অবতার দিলীপ এবং তপন ঘোষ! এই প্রথম কোন মুখ্যমন্ত্রী উৎসবে পাঁচিল তুললো! 
এর আগে পশ্চিমবঙ্গের কোন মুখ্যমন্ত্রীকে মঞ্চে উঠে কোরানও কোট করতে হয়নি আবার ইয়া দেবী সর্ব্বভূতেশুও আওড়াতে হয়নি! তাতে শ্রীভূমি কিংবা সুরুচি সংঘে এসেছে শরৎ থিমের পরশ লাগেনি এমনটাও হয়নি আবার কাজী পাড়ায় চাঁদের নানী ঈদে বিরিয়ানিতে ক্যাওড়া জল বেশি ঢেলে ফেলেছে এমনটাও হয়নি!
রামনবমীর অস্ত্র আস্ফালন আপনার জন্য! ধূলাগড়ে অশান্তির মূলে আপনি! কারন বিভেদের তাস খেলেছেন আপনি! নোটের রাজনীতি,ভোটের রাজনীতি মিলিয়ে দিয়েছেন আপনি! ঢঙের সঙ্গে রং মিশিয়ে দিয়েছেন আর মিলে মিশে থাকা মানুষকে আলাদা করে দিয়েছেন! মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন আপনি! ইসকনের রথ টেনেছেন আর প্রশাসনকে ঠুঁটো জগন্নাথ করেছেন!
তবু ......
যেহেতু রাজ্যটার নাম পশ্চিমবাংলা এখনও তাই অল্প হলেও ভরসা আছে! প্যারালাল ভাবে রাজনৈতিক আর প্রশাসনিক কাজ শুরু করুন! আপনার জন্য নয়! মানুষের হাত থেকে মানুষের রক্ত মুছতে! পশ্চিমবাংলার গা থেকে দাঙ্গার গন্ধ মুছতে বামপন্থীরা রাস্তায় থাকবে! কারন এখনও বিশ্বাস করি-
আমার মাটি আমার মা 
পাকিস্তান হবে না!
গুজরাটও হবে না!

মঙ্গলবার, ৪ জুলাই, ২০১৭

বসিরহাট দাঙ্গা ~ পুরন্দর ভাট

বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রে, ২০১০-এ দাঙ্গায় প্ররোচনা দেওয়ার জন্য হাজী নুরুল ইসলামকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১৪-তে সরিয়ে দেন। সরিয়ে কাকে আনেন? তসলিমার বিরুদ্ধে দাঙ্গা খ্যাত ইদ্রিস আলীকে। এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায়। সেখানে যে এরকম পরিস্থিতি হবে সেটাই স্বাভাবিক। তৃণমূল গত ৮-৯ বছর ধরে ওই এলাকায় সাম্প্রদায়িকতার চাষ করেছে। ওই এলাকার কিছু কিছু ধর্মীয় সংগঠন বাংলাদেশ থেকে জামাৎপন্থী মৌলবিদের নিয়ে এসে ওয়াজের আয়োজন করেছে দিনের পর দিন, তৃণমূল চুপ করে থেকেছে কারণ এতে তাদের লাভ হয়েছে। আজকে পরিস্থিতি তাই হাতের বাইরে। উল্টোদিকে তৃণমূলের হিন্দু অংশ কাজে লাগাচ্ছে তপন ঘোষের হিন্দু সংহতিকে। উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সীমান্তবর্তী মহকুমাগুলো আখড়া হয়ে উঠেছে হিন্দু সংহতির। সেই লাভও তৃণমূল নিজের ঘরে তুলেছে গত নির্বাচনে, তপন ঘোষ সরাসরি তৃণমূলকে ভোট দিতে বলেছিল নির্বাচনে। রাজ্য জুড়ে ক্রমশ তৃণমূলের গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব চেহারা নিচ্ছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার। আমার চারপাশে দেখছি সরকারি জমি, ফুটপাথ, এমনকি রাস্তার ওপর গজিয়ে উঠছে নতুন মন্দির, ফলকে লেখা থাকছে "সৌজন্যে" এলাকার বিধায়ক। সেখানে প্রতি শনি মঙ্গল বিলানো হচ্ছে ভোগের প্রসাদ। নিশ্চই এরকম আগাছার মতো মসজিদও গজাচ্ছে, যেহেতু আমার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় যাতায়াত কম তাই চোখে পড়ে না। তৃণমূল সরকার এখন আর চেষ্টা করলেও এই চাকা পেছন দিকে ঘোরাতে পারবে না। জীবন জীবিকা নিয়ে ব্যাপক আন্দোলনই একমাত্র পথ। খাদ্য আন্দোলন পেরেছিলো দেশভাগের ক্ষত মুছে দিতে, সেরকম ব্যাপক আন্দোলনই পারবে পরিস্থিতি ফেরাতে। অনেক ইস্যু রয়েছে সামনে, গণ আন্দোলন তৈরি করবার।

সোমবার, ২৬ জুন, ২০১৭

ক্ষাত্রতেজ ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


সে তো অনেক কিছুই হয় মশাই। হয় না? অরন্যদেব সত্যি, ম্যান্ড্রেক সত্যি, ক্যাপটেন স্পার্ক সত্যি, দত্যি-দানো সত্যি, রাম সত্যি, গন্ধমাদন সত্যি এমনকি সচিন তেন্ডুলকর পর্যন্ত সত্যি। এই গুলো যদি হয় না বলেন, তাহলে যাই কোথা? এসব সত্যি না হলে আমাদের চল্লিশ আশেপাশে দের ছোটোবেলাটাই যায় মিথ্যে হয়ে। তাই বলে বলবেন একটা লোক সাতজনের সঙ্গে লড়ে গেল তাদের ছাতু করেদিল? এতটা সচিন তেন্ডুলকরও পারবে না। পাগল কাহিঁকা। কুম্ভকর্ন গোছের কিছু? সে নাকি যখন মরে পড়েছিল মাটিতে, ওই পর্বত প্রমান লাশ চাপা পড়ে বহু সৈন্য মারা গেছিল। তাও যদি বুঝতুম পুরান-টুরান রামায়ন মহাভারত বলতেন। বলছেন নেহাত এই বছর পঞ্চাশ আগের কথা, অথচ আমি জানিনা? আমাকে কি নেহাত বোকা ঠাউরেছেন? কিছু জানিনা? যত্ত সব সিউডো সেক্যুলার বেয়াক্কেলেপনা।

তাও বলছেন সত্যি? তা লোকটা কোথাকার? ইউপির লোক? জয় শ্রীরাম। হবেই তো, রামচন্দ্রও ইউপির। তা বলুন দেখি, সাতটা এনিমিকে কেমন লড়ে ছাতু করে দিল। ৬৫ সালে? ও বাবা, সে তো সেই পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধু। দিয়েছিলাম ব্যাটাদের নাক ভোঁতা করে। ইউপির লোক তো, ক্ষাত্রতেজেই সাতটা পাকিস্তানি ভস্ম করে দিয়েছে। কি বলছেন? প্রথমেই দু জনের মাথা উড়িয়ে দিল? ও ও ও ... বুঝেছি, শার্প শ্যুটার, ওই আমেরিকান স্নাইপার মুভিতে দেখবেন, আমেরিকানরা দারুন করে এসব। কে? ভ্যাসিলি জাইৎসেভ? সোভিয়েত স্নাইপার? আপনাদের রাশিয়া প্রেমটা এবার ছাড়ুন মশাই, একটু নিজের দেশের কথা ভাবুন। হ্যাঁ বলুন ......

কোথায়? খেমকরনের কাছে? পাঞ্জাবে ? দুটোর খুলি উড়িয়ে দিল তার পর? ও তার পর পজিশন বদলে অন্য ঝোপের পেছনে চলে গেল। দেখেছেন? বুদ্ধি কেমন? আচ্ছা তার পর? হাঁটুতে গুলি? তার পর আবার গুলি? এবার সোজা মাথায়? আরে কি জিপগাড়ি জিপগাড়ি বলছেন? বাকি চার জন পাকিস্তানি ওকে স্পট করে ফেলেছে? তাই দেখে আবার জায়গা বদল? ধুত্তেরি, বলুন না ভাল করে, কথা বলতেও পারেন না মাইরি। আজই ফেসবুকে ছাড়ব মালটা।

বাকি চারজনের মধ্যে দু জন কে পর পর গুলি করে মারল নতুন পজিসন থেকে? ও বাবা, নিজেও গুলি খেয়ে গেল? মাত্র একটা দিয়ে আবার গুলি চালালো? আরো একটা পাকিস্তানি মরে গেল? যাব্বাবা, এবার পাকিস্তানিটা আর আমাদের সেপাই দুজনেই গুলি চালালো? পাকিটাও মরল আর আমাদের বন্দুকটাও উড়ে গেল? আর আমাদের সেপাই? বেঁচে ছিল? তাই নাকি ? একটা হাত উড়ে গেছিল? ও হো, আমি ভাবলাম অকেজো। কিন্তু বন্দুকের গুলি তে কাঁধ থেকে হাত উড়ে গেল? বন্দুক না ? কামান? পাকিস্তানি সৈন্যরা হাতে কামান নিয়ে আসছিল? সৈন্য না? কি বলছেন? সাত জন পাকিস্তানি সৈন্য না? সাতটা পাকিস্তানি ট্যাংক? একাই উড়িয়ে দিল আমাদের বীর? ও কি রাইফেল দিয়েই....? ও আচ্ছা, জিপগাড়ির ওপর অ্যান্টি ট্যাংক কামান লাগানো ছিল। তাই নিয়েই একা লড়ে গেল।।বাহাদুর সিপাহি।  নিজেও মরে গেল? পরমবীরচক্র পেয়েছে? দেখুন দেখুন, ইউপির লোক তো, প্রভূ রামচন্দ্রের মাটির গুন দেখুন। কি নাম বলুন তো? আজই ফেসবুকে ছাড়বো। শালারা দেখুক হিন্দু রক্তের তেজ কতখানি, একা একটা লোক সাত খানা ট্যাংক ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু খুলি উড়িয়েছে বললেন যে? হাঁটুতেও গুলি বললেন না? মানে...... ট্যাংকের বুরুজ হলো খুলি? আর ক্যাটারপিলারকে হাঁটু বলেছেন? হি হি, তা বেশ তা বেশ। নাটকীয় হলো ব্যাপারটা। এই ভাবেই ফেসবুকে ছাড়ব। কি নাম বললেন আমাদের বীরের? মানে ... ইয়ে ... আবদুল???? আবদুল হামিদ???

মানে... লোকটা হিন্দু নয়??   

রবিবার, ২৫ জুন, ২০১৭

রেখেছ মুসলমান করে ~ ড: রেজাউল করীম

এই লেখা অনেককে অখুশি করবে জেনেও লিখলাম। কোন অসহিষ্ণু মন্তব্য করবেন না, দয়া করে। 

দিনদুয়েক আগে উত্তরপ্রদেশে একটা ট্রেনের কামরায় গনপ্রহার ও ছুরিকাঘাতে একটি ১৬ বছরের বালকের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় সব কাগজেই খবরটা বেরিয়েছে। আমার বাড়ীতে Indian Express নেওয়া হয়, ওখানে খবরটা আছে। আর কয়েকটি কাগজেও খবরটা বেরিয়েছে এবং যদি যুক্তি দিয়ে বিচার করা হয়, তাহলে বলতে হবে যে কেবলমাত্র আসন নিয়ে ঝগড়ায় কাউকে গনপ্রহারের মরতে হয়, এ অসম্ভব। অসহিষ্ণুতা ছাড়া এ ঘটনার অন্য ব্যাখা সম্ভব নেই। এই সংবাদটি আমি শেয়ার করার পর বেশীর ভাগ লোকই আমার প্রোফাইলে ঘটনাটার নিন্দা করেছে। তার মধ্যে একজন দেখলাম লিখেছে কাশ্মীরেও "একজন মুসলমান" পুলিশকে সন্ত্রাসবাদীরা মেরে ফেলেছে, কেন আমি তার নিন্দা করছি না। আর একজন লিখেছে, আমি নাকি নিজেকে আর পাঁচটা মুসলিমের থেকে আলাদা "প্রমান করার চেষ্টা করি" তাহলে এই "ফেক নিউজ" কেন শেয়ার করলাম। আমি বেশ কিছু প্রোফাইল খুলে দেখলাম আরো অনেকেই এই সংবাদটি শেয়ার করেছেন কিন্তু তাদেরকে কেউ এই পরামর্শ দিচ্ছেন না। কেন দিচ্ছেন না তার কারন অনুসন্ধান করলেই বুঝতে পারবেন কেন  অসহিষ্ণুতা এই  সমাজের অন্যতম প্রধান  সমস্যা। তাই, পরামর্শটা আমাকে নয়, আমার নামকে দেওয়া হচ্ছে।  কথা হল খবরটা যে ফেক তা প্রমান হল কিভাবে? সরকার কী কোন বিবৃতি দিয়ে বলেছে খবরটা মিথ্যা? একটা বাচ্চা মারা গেল গনপ্রহারে, প্রশাসন চুপ কেন? বোঝা যাচ্ছে,  আরবী ভাষায় নাম হলে  statutory warning  ঝুলিয়ে রাখতে হবে। পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে আরবী নামের কেউ মানুষ খুন করলেই তার নিন্দা করতে হবে, আরবী নামধারী কাউকে অন্য ধরনের নামধারী কেউ মারলেও  চুপ করে থাকতে হবে। তাহলে প্রমান হবে যে লোকটি দেশভক্ত।  এ  না করলে  "you exposed your true colour"! 
আমি কাউকে জবাবদিহি করতে এসব লিখছি না। আমি যা ভাল মনে করবো তাই লিখবো ও বলবো। কে কী ভাবলো তা নিয়ে আমার তত মাথাব্যাথা নেই। ভাল মন্দ যাহাই  আসুক সত্যেরে লও সহজে, এটা আমার নীতি। আমার অনেক ঘনিষ্ট বন্ধু আছে যারা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সক্রিয় সদস্য। তারা সবাই খুব আ্যান্টি মুসলিম এমনও নয়। অনেক মুসলিম বন্ধু বিজেপি দলে কাজ করছেন- কিন্তু কারো সাথে মনোমালিন্য হয়েছে এমন ও নয়। তথাগতদার সাথে আমার যথেষ্ট হৃদ্যতা আছে কিন্তু তাই বলে পরস্পরকে সমালোচনা করা যাবে না, এমন দাসখত কেউ লিখে দেয় নি। 
যতক্ষন সমালোচিত ব্যক্তিকে ধর্মের ভিত্তিতে নতুন পরিচিতি না দেওয়া হচ্ছে ততক্ষন পাব্লিক ডিবেটে কোন অসুবিধা নেই। সমস্যা হল যখন কোন একক পরিচিতি নিয়ে কোন সাধারন সূত্রে ফেলে বিচার শুরু হয়। 
১৯৭৯ সালে আমি যখন কলকাতায় যখন পড়তে আসি  বাঙলা ছাড়া কোন ভাষা জানতাম না। অনেকে আমাকে বলতো- তুই বাংলায় কথা বলছিস, উর্দুতে বলছিস না কেন? একদিন একটি ছেলে, নামটা মনে হয় রিয়াজ, আমাকে বলল- উর্দুতে কথা বল না তুমি কেমন মুসলমান? আমি তো কোনদিন মুসলমান হিসেবে বড় হই নি, তাই তখন এর মর্মার্থ বুঝতে পারি নি, যেমন এখনো বুঝতে পারছি না। কিন্তু, ১৯৯৯ সালে একটা ঘটনা আমাকে খুব আহত করে তুলেছিল। আমার একটা বাসস্থানের দরকার। অজয় ভট্টাচার্য মহাশয় আমাকে পি এন বি মোডে একটা বাড়ী দেখাতে নিয়ে গেলেন। সব কিছু যখন ঠিকঠাক তখন আমার নাম শুনে ভদ্রলোকের মুখ কালো হয়ে উঠল। বললেন- আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলে আসি। মিনিট পাঁচ পরে ভদ্রলোক বললেন- দেখুন আমার স্ত্রী পুজো আচ্চা করেন, আপনাকে ভাড়া দিতে আমাদের অসুবিধা আছে। আমরা আর কি করতে পারি, ওখান থেকে চলে এলাম। অজয়দা খুব লজ্জিত। 
তারপর থেকে বহু চেষ্টা করে দেখেছি যে বিশেষ কিছু এলাকা ছাড়া বাড়ী ভাড়া পাওয়া যায় না। এসব কিছু নিয়েই জীবন।আমি বিশেষ গায়ে মাখি না। কিন্তু আমার মেয়েদের আমি ধর্মের আঁচ লাগতে দিই না। সব পালাপার্বনে অংশগ্রহন করি। যে মন্দিরে ধর্মীয় বিভাজন নেই সেখানে মন্দিরে ও যাই। একসময়ে চার্চে যেতাম বেশ নিয়ম করে।  আমি বিশেষ ভাবে মনে করি যে, সমাজের এই যে বিভাজন তার জন্য সাম্প্রদায়িক আইন সবচেয়ে বেশী দায়ী। সবার জন্য একই আইন হলে অন্তত: ধর্মীয় বিভাজন এত স্পষ্ট হতো না। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় নেতারা ভেবেছিলেন, মুসলিমরা যথেষ্ট পরিমান পরিনত নয় ও সবার জন্য একই আইন তারা গ্রহন করতে পারবে না। সেই যে "রেখেছো মুসলিম করে মানুষ করো নি", সেই বিষবৃক্ষের ফল এখন লাভ করছি। মুসলিম মানেই খারাপ এই ধারনার জন্য মুসলিমরাই  বহুলাংশে দায়ী। তারা সাধারন শিক্ষায় তেমন আগ্রহী নয়, আলাদা ব্যক্তিগত আইন, আরবীয় নাম সবকিছুতেই নিজেদের আলাদা প্রতিপন্ন করার প্রয়াস মানুষ মোটে ভালভাবে নেয়নি। কিন্তু এরা তা বুঝবে না। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও কাশ্মীর সমস্যাও মুসলিমদের সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা না জানে হিন্দুত্বের আদর্শ, না ইসলাম। রমজানের মাসে যে টুপি তারা পরে ভোট কেনে বছরভর সেই টুপিটাই বোকারামগুলোর মাথায় পরিয়ে কর্যোদ্ধার করে। এদেশের যত "সেকুলার" লিডার আছে, সবার পছন্দ সাম্প্রদায়িক মৌলভীদের- এই অশিক্ষিত ধর্মনেতারা সম্প্রদায়ের ও দেশের বারোটা বাজাক তারা ক্ষমতা নিয়ে খুশি। এক একটা ভোট আসবে আর দল বেঁধে সুপারি কিলার দিয়ে এলাকা দখল হবে। আসবে সাম্প্রদায়িক ঘেটোগুলো থেকে। যেকোন সুস্থ মানুষের পক্ষে এসবই খুব অস্বস্তিকর। ব্যক্তির দোষে পুরো সম্প্রদায়কে দায়ী করতে শুরু করলে, এমন অবস্খার সৃষ্টি হয় যে, কেউ ভাবার চেষ্টা করে না যে সব মানুষই স্বতন্ত্র দোষগুণ নিয়ে জন্মায়। একই বাঁধাগতে কাউকে বিচার করা উচিত নয়। আমাদের পরিবারে ছোটবেলা থেকেই কখনো এসব শেখানো তো দূর অস্ত, হিন্দু পরিবারে আমাদের ব্যক্তিগত আত্মীয় স্বজন আছেন। তাই ধর্ম আমাদের জীবনের চালিকা শক্তি নয়। আমাকে অনেকে বলেছে, মেয়েদের বিয়ের সময় মজাটা টের পাবে। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই, আমার অর্থের অভাব থাকতে পারে উদারতার অভাব নেই। আমার মা একবার আমাকে বলেছিল ( তখনো একথাগুলো racial abuse র মর্যাদা লাভ করে নি, joke করে বলা যেত) হাডী-ডোম-চণ্ডাল যা বিয়ে করবে তাকেই বরন করবো। আমার মতও তাই। কাবাব মে হাড্ডি আমার না পসন্দ, কে কোন ধর্মে বিয়ে করলো, অং বং চং বলল নাকি আরবী আওডাল তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই- আমার মেয়েদের তো নেইই। তা যাক, কথা হল- এসবের নিশ্চয় একটা সমাধান আছে। আমার মতে সমাধান হল আধুনিক শিক্ষা, সবার জন্য একই আইন, ওয়াহাবী সংস্কৃতির বদলে সুফিবাদের প্রসার। রাজনীতির লোকেরা যদি অশিক্ষিত মৌলবীদের পাত্তা না দেয় তো একাজটা অবিলম্বে হতে পারে। হিন্দু সমাজে পূজো আর বিয়ে ছাড়া পূজারীদের ভূমিকা তেমন নেই। মুসলিমদের ঠিক উল্টো- যে যত বড় মৌলবী, হিন্দু ধর্ম-নিরপেক্ষ নেতানেত্রীর কাছে তার বাজার দর তত বেশী। মনে আছে সিপিএমর  নন্দীগ্রামে বুখারীকে দিয়ে জনমত ঘোরাতে চেয়েছিল। আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম পরিবারের ছেলেমেয়েদের এগিয়ে আসতে হবে ও রাজনীতির ক্ষেত্রটিকে ধর্মের পরিসরের বাইরে রাখার জন্য লড়তে হবে। এ দেশের শতকরা ৮৫-৯০ ভাগ মানুষ কোন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পছন্দ করে না। কাজেই, মুসলিমরা এক পা এগোলে সেকুলার হিন্দু দশপা এগিয়ে আসবে এ আমি হলফ করে বলতে পারি।

শুক্রবার, ২৩ জুন, ২০১৭

বিশ্ব সংগীত দিবস ~ আর্কাদি গাইদার

আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের গ্রামগুলো থেকে যখন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের জাহাজের খোলে গাদা করে নিয়ে আসা হতো, তখন তাদের মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি জীবিত অবস্থায় আমেরিকা, কিউবা বা ক্যারীবিয়ান দ্বীপগুলোতে পৌছাতো। বাকিরা জাহাজের মধ্যেই মারা যেতো। তাদের মরদেহগুলো অতলান্তিক মহাসাগরের জলে ফেলে দেওয়া হতো। অতলান্তিকের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত - এই লম্বা সমুদ্রযাত্রায় নিজেদের মনোরঞ্জনের জন্যে নাবিকরা মহিলা বন্দীদের লাগাতার ধর্ষন করতো। একবার আমেরিকায় পৌছানোর পরে পরিবারগুলোকে ভেঙে ফেলা হতো। বাবা, মা, সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়া হতো আলাদা আলাদা মালিকের কাছে ক্রীতদাস হিসেবে। শ্বেতাঙ্গরা চিরকালই বুদ্ধিমান জাতি - তারা চেষ্টা করতো যাতে একই মালিকের কাছে এক পরিবার, এক গ্রাম, বা এক উপতাজির সদস্যরা বিক্রি না হয়। নিজেদের মধ্যে চেনাপরিচিত থাকলে, সংগঠিত হয়ে বিদ্রোহ করবার সম্ভাবনা বেশি। আলাদা আলাদা উপজাতির ভাষা আলাদা, এদের সদস্যদের বেছে বেছে আলাদা রাখলে নিজেদের মধ্যে কোনরকম যোগাযোগের মাধ্যম থাকবে না। কিছু কিছু মালিকের তাতেও ভয় যেতো না, তারা তাদের অধীনে সমস্ত ক্রীতদাসদের জীব কেটে দিতো, যাতে নিজেদের মধ্যে কথা না বলতে পারে। মালিকের প্লান্টেশনে এরা খাটতো, জীবনযাপন করতো, প্রেম করতো, বিয়ে করতো, আগামী প্রজন্মের জন্ম দিতো, তারপর দেখতো মালিক তাকে বেচে দিচ্ছে, চাবুক খেতো, গুলি খেতো। এত করেও এদের ইতিহাসকে মালিকরা মুছতে পারতো না। রাতের বেলায় সবাই জড় হতো আগুনের চারপাশে, আফ্রিকায় ফেলে আসা নিজেদের গ্রাম, নিজেদের দেব দেবী, নিজেদের ফেলে আসা মাটির প্রতি উৎসর্গ করতো নিজেদের। নেচে, গেয়ে। কেউ কারুর ভাষা বোঝে না, তাই অধিকাংশ শব্দ শুধু শব্দই থাকতো, কথা না। একটা কাঠের তক্তার দুপ্রান্তে পেরেক গেঁথে একটা তার বাধা, ফাঁপা কুমড়োর খোল, মুরগী বা ছাগল বা মানুষের হাঁড়, মাটির জগ, এই ছিলো বাদ্যযন্ত্র। সাথে ছিলো উদ্দাম নৃত্য আর গোঙানো। প্রতিদিন রাতে এই ভাবে তারা আমেরিকা থেকে পালিয়ে নিজেদের দেশ আফ্রিকায় ফিরে যেতো। এই আদিম সংগীতে আস্তে আস্তে কথা বসলো, সুর বসলো। মালিকদের ভাষাকেই আপন করলো ক্রীতদাসেরা। সেই ভাষাতেই নিজেদের গান লিখলো। ক্রোধ, ক্ষোভ, হতাশা, বিচ্ছেদ পুরোটা উজার করে বন্দী করলো গানে। জন্ম নিলো 'ব্লুজ / Blues'।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় আমেরিকাতে ক্রীতদাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটলো। শ্বেতাঙ্গ মালিকদের নতুন অস্ত্র আবিষ্কার করতে হলো - ধর্ম। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠলো নিগ্রোদের জন্যে আলাদা চার্চ, সেখানে নিগ্রোরা শিখলো বাইবেল, যীশু, অহিংসা, আনুগত্য। এবং শিখলো গান। চার্চের হীম থেকে নিজেরা নিজেদের মতন তৈরি করে নিলো 'গোস্পেল মিউজিক'। আস্তে আস্তে নিগ্রোদের হাতে এলো ইউরোপিয়ান বাদ্যযন্ত্র। শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের মনোরঞ্জনের জন্যে বিভিন্ন জায়গায় বিনোদনকারী হিসেবে কাজ পেলো তারা। শিখলো পিয়ানো, গীটার, ড্রাম, ভায়োলিন। এবং Blues আর Gospel এর হাত ধরে Jazz আবিষ্কার হলো। যা গোটা বিংশ শতাব্দী জুড়ে পৃথিবীকে মাতিয়ে রাখলো।
এর আশেপাশের সময়কালে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে ভারত ভুখন্ড তখন ঘটনাবহুল জায়গা। ইউরোপ থেকে একে একে বিভিন্ন জাতি পাড়ি দিয়ে ঘাঁটি গাড়ছে এই দেশে। ইংরেজ, পর্তুগীজ, ফরাঁসী, ওলন্দাজ সবাই যাত্রা করছে ভারতের পূর্ব উপকূলে বাংলা নামক এক ভুখন্ডে। সেখানে একের পর এক অঞ্চল দখল করে নিজেদের পতাকা ওড়াচ্ছে, মানুষকে পরাধীন বানাচ্ছে। আর তাদের সাথে ঝাকে ঝাকে হাজির হচ্ছে আইরিশ এবং পর্তুগীজ ক্যাথোলিক পাদ্রী। তারা চার্চ তৈরি করছে গ্রামে গ্রামে। এরকমই কোন এক সন্ধিক্ষনে গ্রামের চাষীরা ভয়ে ভয়ে চার্চের বাইরে দাঁড়িয়ে শুনছে ভেতরে সন্ধ্যেপ্রার্থনার ক্যারল। তাদের গ্রাম্য লোকগীতির থেকে তা একেবারেই আলাদা। এবং শুনতে শুনতে কখন তাদের অজান্তেই তাদের লোকগীতির সাথে মিশে যাচ্ছে আইরিশদের লোকগীতি। ভারতের অন্য প্রান্তে তখন রাজস্থানের যাযাবর উপজাতি আস্তে আস্তে যাত্রা করছে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে দিয়ে ইউরোপের দিকে। এদেরকে কেউ বলে 'রোমা', কেউ বলে 'জীপসি'। ইউরোপে তখন আমেরিকা থেকে জ্যাজ সবে এসেছে। এই জীপসিদের হাত ধরে মিলছে একইসাথে তিনটে মহাদেশের সুর। রাজস্থানী লোকগীতির গন্ধওয়ালা Gypsy Jazz পাগল করে দিচ্ছে ইউরোপকে।
মস্কোতে এক শীতের সন্ধ্যায় লেনিন আর গোর্কি আড্ডা মারছেন। রেকর্ডে চলছে বীঠোভেনের Appasionata সোনাটা। লেনিনের চোখে জল। গোর্কি কে বললেন - 'জানো, বীঠোভেন যদি বাজানো বন্ধ না করতেন, তাহলে হয়তো আমি উঠে বিপ্লবটা শুরুই করতে পারতাম না।' হিটলার ওদিকে ঘোষনা করছেন - ' যে জার্মান ওয়াগনারকে অনুধাবন করতে পারে না, সে কোনদিন ন্যাশনাল সোশ্যালিজমকে বুঝতে পারবে না।' রিচার্ড ওয়াগনার। যার ' Ride of the Valkyries' এর নামের সাথে পরিচিত না থাকলেও বহু সিনেমার আবহসংগীত হিসেবে আপনার অতি চেনা সুর।
১৮৭১ সালে গোটা ইউরোপকে কাপিয়ে দিলো প্যারিস কমিউন। মাত্র তিনমাসের জন্যে প্যারিসের শাসনক্ষমতা চলে গেলো শ্রমজীবির মানুষের হাতে। তারপর সৈন্যদের হাতে ধ্বংস হলো কমিউন সরকার। কিন্তু আগামী কয়েক শতাব্দীর জন্যে লড়াইয়ের রসদ জুগিয়ে গেলো খেটে খাওয়া মানুষের চেতনায়। প্যারিস কমিউনের পরাজয়ের পর এই লড়াকু মানুষেরা ভাবলো, পৃথিবীর সব দেশের নিজস্ব anthem রয়েছে। আর আমরা যে দেশটার কথা ভাবি, কল্পনা করি, যার জন্যে লড়ি, যেই দেশের কোন সীমানা নেই, সমস্ত জাতি, সমস্ত ভাষাভাষির খেটে খাওয়া মানুষকে নিয়ে যে দেশটা, যার অস্তিত্ব যত্ন করে রক্ষা করা রয়েছে আমাদের মগজ এবং হৃদয়ে, তার কি কোন নিজস্ব স্তবগান থাকবে না? গান লিখতে বসলেন প্যারিস কমিউনের সৈনিক Eugene Pottier. সুর দিলেন ছুতোর মিস্ত্রী Pierre De Geyter। তৈরি হলো 'The International' - আন্তর্জাতিক। অনুবাদ করা হলো পৃথিবীর সমস্ত ভাষায়। পৃথিবীর প্রতিটি কোনে আজও মানুষের লড়াইয়ের আবহসংগীত হিসেবে বেজে চলেছে - আন্তর্জাতিক!
আমেরিকায় একটি চার্চের সম্পূর্ন অচেনা গোস্পেল - যা ধর্ম নিয়ে লেখা - তা হঠাত গাওয়া হলো সাউথ ক্যারোলিনা খনিশ্রমিকদের স্ট্রাইকে। গানটার নাম 'We Shall Overcome'. আমেরিকাজুড়ে তখন একদিকে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জোয়ার, অন্যদিকে কৃষাঙ্গদের সিভিল রাইটস মুভমেন্ট কাপিয়ে দিচ্ছে একের পর এক শহরকে। আস্তে আস্তে সবার মুখে উচ্চরিত হলো এই গানটি। একে আরও জনপ্রিয় করে তুললো পিট সীগার এবং জোন বায়েজদের মতন শিল্পীরা, প্রতিটি জনসভা, মিটিং, পিকেট লাইনে তারা গাইতে লাগলো - আমরা করবো জয়। আস্তে আস্তে পুরো পৃথিবী শিখে ফেললো এই গানটি - 'আমরা করবো জয়'।
বিশ্ব সংগীত দিবসের শুভেচ্ছা সবাইকে। ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তীর গানের দুটো লাইন ধার করলাম আজকের জন্যে।
'গান হোক, আরও গান হোক,
গান হোক, সবাই সমান হোক, 
আমাদের মন্দিরে আগামী সকালের আজান হোক।'

মার্কেট ভিজিট ১৫ ~ অভিক সরকার

গেসলুম আদিত্যদা'র কাছে! কি বললেন? কোন আদিত্য? ইক্কিরে বাওয়া,  চিনলেন না? আরে আদিত্যদা, ইউপি'র সিএম,  আরে আমাদের যোগীজী! 
মানে? 
এই দ্যাখো, ঘাবড়ে গেলেন নাকি? আরে ঘাবড়াবেন না মশাই। মানে আর কিছুই না, সামান্য এয়ার্কি কচ্ছিলুম আর কি! আমি গোরখপুর গেসলুম মার্কেট ভিজিটে, তাই একটু...আরে এই দ্যাখো, তেড়েমেড়ে আসছে কেন লোকজন? আরে উনি যে খুবই ভালোমানুষ সে কি আর জানি নে? মুক্তকন্ঠে স্বীকার করি সে কথা। যেমন সাহস, তেমন তেজোময় মূর্তি, তেমনই জ্বালাময়ী ভাষণ!  আর কি প্রশস্ত ললাট, কি অম্লানকুসুম হাসি, কি চিকনিচামেলী গাল, এককথায় কি উচ্চবংশ, ক্কি উচ্চবংশ!  
দাঁড়ান, ব্যাপারটা খুলে বলি।

সদ্য যে কম্পানিটি আমার আর আমার বউ বাচ্চার ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিয়েছে, তারা ভালোবেসে নিভৃতে যতনে ইস্টার্ন ইণ্ডিয়ার সঙ্গে ইস্ট ইউপিও জুড়ে দিয়েছে। আমি অবশ্য মিনমিন করে বলার চেষ্টা করছিলুম, "হাম প্রচণ্ড দুবলা হ্যায় স্যার, তাকাকে দেখিয়ে, গাল দুখানা শুকাকে আমসি হো গ্যায়া হ্যায়। উসকে উপর আমার আবার প্রচণ্ড ভূতের ভয় স্যার, আর ইউপির গোভূতগুলো যে কি জঘন্য হোতা হ্যায় স্যার যে কেয়া বোলেগা, তাড়া করনে সে  দৌড়তে দৌড়তে আমার ঠ্যাং খুল যায়েগা স্যার" ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ভবী তো আমার এইসব নানা প্রকারে কাতর আর্তনাদে ভুললেনই না। তার উপর ভাইস প্রেসিডেন্ট লোকটা মশাই দেখলুম বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি সব ভাইসে ভর্তি! খ্যা খ্যা করে হাসতে হাসতে পেটে একটা খোঁচা মেরে বললো, " ওহে কুমড়োপটাশ, সামান্য দৌড়াদৌড়ি করলে আখেরে তোমার ভালোই হবে হে। বডিখান যা বানিয়েছো বাপু, বলি একটা আয়নায় আঁটে?"

ইনসাল্টিং না? আপনারাই বলুন।

অবশ্য পরে ভেবে দেখলুম প্রস্তাব খারাপ না। ইস্ট ইউপি বলতে লাখনৌ থেকে বেনারস আর বালিয়া পজ্জন্ত আর কি! আমিও শুনেটুনে আর আপত্তি করিনি। কম্পানি বলছে লাখনৌ থেকে বেনারস, আমি শুনছি গলৌটি কাবাব থেকে রাবড়ি! বস দেখাচ্ছে বেহরৌচ থেকে সিদ্ধার্থনগর হয়ে গোরখপুর, আমি ম্যাপে পষ্ট দেখছি আঙুল সামান্য এদিকওদিক হলেই কপিলাবস্তু  থেকে লুম্বিনী হয়ে কুশীনগর ! যাদৃশী ভাবনার্যস্য ইত্যাদি প্রভৃতি!

যাক গে। আমিও ভেবেছি গরমটা একটু কমুক, বিষ্টিটিষ্টি একটু পড়ুক, হাসি হাসি মুখে একদিন না হয় এলাহাবাদ বা বেনারসে বডি ফেলবো হপ্তাখানেকের জন্যে। আহা আমার মতন প্রতিভার সঙ্গ কি এক হপ্তার কমে কেউ পেতে চায়, বলুন? একটা 'এয়ার' নিয়ে ফ্লাইট থেকে নামবো, লোকজন গাড়িফারি হাজির থাকবে, সামান্য মার্কেট ভিজিট,  তারপর চন্নামেত্তর মতন চাট্টি উপদেশ ছিটিয়ে দিয়ে হোটেলে ফিরে রাজকীয় অভ্যর্থনা, আর কি চাই? অবস্থাগতিকে  সন্ধেবেলায় মিটিং, হোটেলরুমেই অবিশ্যি.. চাইতেই কোল্ড ড্রিঙ্কস, না চাইতেই....  হেঁ হেঁ সেসব বোঝেনই তো! 
কিন্তু ও হরি, ম্যান প্রপোজেস, ভাইগ্য ডিজপোজেস বলে ঈশপ ফেবলস না রসময় গুপ্তের কাব্যসঙ্কলনে একটা কথা আছে না? হাতেনাতে ফলে গেলো মশাই!

গোরখপুরের আমাদের একটি ডিস্ট্রিবিউটর আছেন, যিনি কিঞ্চিৎ বাহুবলী বলে বাজারে দুর্নাম আছে। এসব অবিশ্যি ওদিকে জলভাত, লোকে দুচারটে খুন করাকে গৌরবজনক বলেই মনে করে। বেয়াইমশাই চারটে খুন করেছেন, আর উনি নিজে মাত্তর দুটো, এ দুর্নাম ঘোচাবার জন্যে মেয়ের বাপ মেয়ের বিয়ের আগে নিজের 'ওজন' বাড়াতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও নেহাৎ বাধ্য হয়েই আরও দুটো খুন করেছে এসব স্বচক্ষে দেখা, স্বকর্ণে শোনা ("চারগো হাম ভি কিয়ে হ্যাঁয়, হাম কিসিসে কম হ্যায় কা রে বাবুয়া?")।   কলকাতায় যেমন মিষ্টির দোকান, ইউপি বড় বড় শহরে তেমন বন্দুকের দোকান। আর শুধু কি 'দম্বুক'? ওয়ান শটার, তামাঞ্চা, দেসি কাট্টা, রামপুরিয়া...ভ্যারাইটি আর অ্যাসর্টমেন্ট দেখলে চোখ টেরিয়ে যাবে মশাই!  আর দুচারটে নীচু জাতের দোসাদ বা চামার বা কুর্মি মারলে ওখানে ওসব তেমন দোষের বলে ধরা হয় না, "অ্যাঃ,  টিকটিকি" বলে কাটিয়ে দেয়।

তা আমাদের ডিস্ট্রিবিউটরটি বছরখানেক বেগড়বাঁই করছেন খুবই। বাহুবলী বলে কেউ বিশেষ কিছু বলতেও সাহস পায় না। আরে মশাই, যে লোকটা দশ বছর আগে গোরখপুরে দশ হাজার টাকা দিয়ে পানের দোকান খুলেছিলো, আজ সে আড়াইশো কোটি টাকার সাম্রাজ্যের মালিক, তার কুছ তো ইজ্জত করো গে কে নেহি, হাঁয়? 
তা গত মাসে বাবুর ষাট লাখ টাকা টার্গেট ছিলো। তিনি বলে পাঠালেন যে তিনি পাঁচ লাখের বেশি করবেন না, তাঁর নাকি মুড নেই! তাতে আমি সবিনয়পূর্বক ফোন তুলে বল্লুম যে যেহেতু আমার বাবা এই ব্যবসায় নেই, তাই তাঁর পক্ষে বাকি পঞ্চান্ন লাখের ভরপাই করা তো সম্ভব হবে না রে ভাই! তোর মুড নেই শুনে দুঃখ পেয়েছি খুবই। তবে কিনা  বড় মানুষের মুড, পালিয়ে আর যাবে কোথায়, কাছেপিঠেই আছে কোথাও। তাকে একটু খুঁজেপেতে এনে অর্ডারটা দিতে হচ্চে যে কত্তা!  তাতে উনি বললেন যে এভাবে কাজ করতে উনি অভ্যস্ত নন। আমি মশাই পোচ্চণ্ড বিনয়ী ম্যান, তাঁর অভ্যেসের সবিশেষ প্রশংসা করে বল্লুম তাহলে আর কি, পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহো ভাই, ব্যবসা আমি অন্যত্র লইয়া যাই!

দুদিন পরে মহাসিন্ধুর ওপার থেকে আমারই সেলস টিমের আর্তনাদ ভেসে এলো, সে বাবু নাকি পিস্তলটিস্তল দেখিয়ে আমার ছেলেছোকরাদের সামান্য চমকেছেন। এখানে স্বীকার করতে আমি বাধ্য যে পিস্তল জিনিসটা শরীরের পক্ষে খুবই উপকারী, ওতে অজ্ঞান নাশ হয়,  শুভবুদ্ধির উদয় ঘটে, পিত্ত থেকে চিত্তবিকার অবধি ক্যুইক সেরে যায়, আর দ্রুত কর্মক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে তো লাজবাব! কিন্তু আমি মাইরি সেলসটিমগতপ্রাণাং, তন্নামশ্রবণপ্রিয়াং, মানে বাংলায় বলতে গেলে তাদের কান্নাকাটি মোটে সইতে পারিনে। ফলে দিন চারেক আগের এক দুপুরবেলা 'পূর্বাঞ্চল এক্সপ্রেস' নামের একটি অতি খাজা ট্রেনে চড়ে বসতে বাধ্য হলাম।

পুর্বাঞ্চল এক্সপ্রেস একটি অতি বেয়াক্কেলে ট্রেন মশাই, এই বারণ করে দিলুম, ঘুণাক্ষরেও চড়বেন না। একে প্যান্ট্রি নাই, তার ওপর যেমন জঘন্য সার্ভিস, তেমনই নোংরা টয়লেট!  সে যাই হোক, অশেষ নরকযন্ত্রণা ভোগ করে, গোরখপুর পৌঁছে, সেই মহামহিম বাহুবলীটির সঙ্গে মিটিং করে, তারই কথার জালে তাকে পেড়ে ফেলে, তৎক্ষণাৎ তাকে স্যাক করে, পরের দিন একখান ইনোভা গাড়িতে বেনারস পৌঁছবো বলে উঠে পড়লুম। সে বেচারা বুঝলোই না কোথা হইতে কি হইয়া গেলো, দস্যু মোহন কি করিয়া যেন তাহারই টুপি তাহাকেই পরাইয়া গেলো! 
বেনারস আমার প্রিয় শহর, এখানেই একবার নাম বিভ্রাটে আমার এক মর্মান্তিক দুঃখভোগ ঘটেছিলো ( মার্কেট ভিজিট ৩ অবলোকন করহ), তদসত্বেও আমি এ শহরের চার্ম থেকে মুক্ত হতে পারিনি। কিছু কিছু শহর গেলেই আমার বড় আপন মনে হয়, যেমন পুনে, যেমন জলপাইগুড়ি, যেমন ভাইজ্যাগ, তেমনই বেনারস। কিন্তু এবার সময় বড় কম ছিলো, ঘন্টা ছয়েকের মধ্যে মার্কেট ভিজিট ও ডিস্ট্রিবিউটার্স মিট সেরে রাতে চড়ে বসলুম কলকাতাগামী একটি ট্রেনে।

আর সেখানেই তেনাকে দেখলুম।

রাতের ট্রেন। আমি দিব্য আমার প্যাকড ডিনার এবং ব্যাগপত্তর নিয়ে আমার  লোয়ার বার্থের সিটটিতে বেশ আয়েশ করে বসেছি। খানিকক্ষণ বাদেই এক মোটাসোটা গোলগাল হাফপ্যান্ট পরিহিত, সোনালি রিমলেস চশমা পরিহিত,  ফ্রেঞ্চকাট শোভিত এক ভদ্রলোক, তাঁরই সুন্দরী সুতনুকা স্ত্রী এবং সাক্ষাৎ তেনাকে সমভিব্যাহারে এসে আমার সামনের সিটটি অধিগ্রহণ করলেন!

তেনার হাইট চার ফুটের মতন, বয়েস পাঁচ বছর, পরনে মিষ্টি একটি বেবি পিঙ্ক ফ্রক, এবং একগাদা চুল মাথায় ঝুঁটি করে বাঁধা। তিনি এসেই প্যাসেজের মধ্যে দুদিকের দুটি লোহার হ্যাণ্ডেল পাকড়ে ( যা বেয়ে লোক ওপরের বার্থে ওঠে) ঝুলতে লাগলেন। তাঁর মাতৃদেবী তাতে হাঁ হাঁ করে উঠলে তিনি সলজ্জ মুখে জবাব দিলেন "ব্যায়াম কচ্চি তো"। বলাবাহুল্য, অমন ব্যায়ামে লোকজনের চলাচলের বিলক্ষণ অসুবিধা হচ্ছিলোই, ফলত তেনার মা তাঁর কান পাকড়ে তাঁকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন, কিন্তু হা হতোস্মি! তিনি মায়ের কোল থেকে নেমে ফের সেই প্যাসেজের মুখে দাঁড়িয়ে প্যাসেজ পেরিয়ে যাতায়াতকারী সব্বার কাছে, "টিকিট,  টিকিট দিজিয়ে" বলে টিকিট দাবি করতে লাগলেন। যাত্রীরা ফিক করে হেসে তেনার গালে হাত দিয়ে একটি করে টিকেটের দাবি মিটিয়ে চলে যেতে লাগলেন। মাতৃদেবী হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, "এই শুরু হলো!"

বুঝলাম,  একটি যন্ত্র ট্রেনে উঠিয়াছেন বটেক!

তা ট্রেন চলতে তিনি খানিকক্ষণ "ও বাবা, বোর হচ্চি তো, ও মা, স্টোন পেপার সিজার খেলো না" বলে ঘ্যান ঘ্যান করে বুঝলেন যে সে লাইনে জুত হচ্ছে না।পিতৃদেব একটি ম্যাগাজিন বার করে ঘুমোতে লাগলেন, মাতৃদেবী চোখ বুঝে বোধহয় কিঞ্চিৎ জিরিয়ে নিয়ে লাগলেন, তাঁর ফুররফুৎ নাসিকাধ্বনিতে মালুম হলো তিনি এই ছুরি পাথরের জগতের মধ্যে আর নেই। তাতে কি এই ক্ষুদ্র লক্ষ্মীবাইটিকে আর থামানো যায় মশাই? তিনি খানিকক্ষণ  আমার দিকে জুলজুল করে চেয়ে রইলেন, তারপর তারপর কথা নেই বার্তা নেই রীতিমতো দাঁত বার করে ইঁ ইঁ ইঁ করে ভয় দেখাতে লাগলেন! আমিও তো "আমি কি ডরাই সখী" বলে তেড়েমেড়ে দাঁত বার করে, দুই কানের পাশে দুই হাত নিয়ে গিয়ে বিচ্ছিরি ভাবে নাড়িয়ে খুবই ভয় দেখাতে লাগলুম। তিনি আমাকে বক দেখালেন, আমি তাঁকে কাক দেখালুম। তিনি ঘোর্ৎ করলেন, আমি ঘুঁৎ করলুম। শেষে তিনি হেসে ফেলে দয়ার্দ্র কন্ঠে বললেন, "তুমি দেখছি কিচ্ছু জানো না, হিঁ.. ওই ভাবে আমার ভয় লাগে নাকি?" জিজ্ঞেস করলুম, "তা তোমার কিসে ভয় লাগে?" তিনি খানিকক্ষণ ভাবলেন, তারপর ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন "ভূতের সিনেমা, ইঞ্জেকশন আর পড়ার আন্টি"। 
বলা বাহুল্য, এরপর অট্টহাস্য করা ছাড়া উপায় থাকে না।

আমার মৃদুকন্ঠের মিষ্টালাপেই নাকি মুমূর্ষু রোগী রোগশয্যা থেকে উঠে বসে ট্রেকিং কিংবা তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে পড়ে, অন্তত  আমাদের ফ্যামিলিতে তো তেমনই  প্রবাদ। বাকিদের ছেড়ে দিন, স্বয়ং আমার গিন্নি তো প্রকাশ্য আদালতে দাঁড়িয়ে তামা তুলসী হাতে এই বক্তব্যে সায় দেবেন!  তা সেই অট্টহাস্যে ট্রেনটা সামান্য থরথর কেঁপে উঠে দ্বিগুণ জোরে ছুটতে লাগলো। তেনার বাবা মা দুজনেই জেগে উঠে খানিকক্ষণ থুম মেরে বসে রইলেন, তারপর সকাতরে আমার দিকে চেয়ে বললেন, "আপনার সঙ্গে খুব দুষ্টুমি করছে, না?"

যার নিজের মেয়ের বয়েস আট, সে পঞ্চমবর্ষীয়া একটি বালিকার অসীম অত্যাচারে ঠিক কতটা বিচলিত হতে পারে সে আপনারা জানেনই ! আমি সজোরে ঘাড় নেড়ে বল্লুম, "কৈ, না তো!"

কিন্তু তিনি কোথায়?

খেয়াল হলো যে এরপর তিনি নেমে পরে একবার তাঁর বর্তমান সাম্রাজ্য, মানে সমস্ত কামরাটি সরেজমিনে তদন্ত করতে বেরিয়েছেন। শুধু কি তদন্ত?  প্রত্যেককে ডেকে ডেকে "হ্যাল্লো আঙ্কেল, হোয়াটস ইওর নেম? হ্যলো আন্টি হোয়াটস ইওর নেম? হোয়ের ডু ইউ স্টে, হুইচ স্কুল ইউ রিড ইন" ইত্যাদি বলে সবাকার তত্ত্বতালাশ নিয়ে সে প্রায় সি আই ডি ডিপার্টমেন্ট খুলে ফেলেন আর কি। তার ওপর আরও অন্য এক রগড়। ঠিক আমাদের পাশে কম্পার্টমেন্টে যাচ্ছিলেন এক 'এম্লেসাহিব',  মানে জনৈক বিধায়ক মহোদয়। তা পৃথিবীর এই অংশে সমস্ত সরকারি বাবুলোগ, মানে আর্দালি ও চাপরাশি অবধি যা সমাদর পেয়ে থাকেন, তা সভ্য দুনিয়াতে বড় বড় 'অফসর'দের কপালে তা মুশকিলহি নেহি, একদম না মুমকিনভি হ্যায়।  এই অম্লসাহিবটিও তিন চারজন পুলিশ প্রহরাবেষ্টিত হয়ে, খানচারেক মোসাহেব ও চামচা সমভিব্যাহারে রাজপাট জাঁকিয়ে বসেছিলেন প্রায়। অকস্মাৎ সেই রাজ্যপাটে  ভদ্রমহোদয়ার ব্লিৎজক্রিগ! তিনি সপাট গিয়ে এম্লেসাহিবের প্রায় কোলে উঠে প্রশ্ন করলেন, " হোয়াটস ইওর নেম?" 
ভদ্রলোকের চোখ প্রায় গোলগোল হয়ে কপালে উঠে যাচ্ছিল আর কি!  ওঁরই এলাকায় ওঁকে নামধাম জিজ্ঞেস করে, হ্যার ঘাড়ে কয়ডা মাথা! কিন্তু প্রশ্নকর্ত্রীর হাইট দেখে বুঝলেন কেসটা কি! তারপর দুজনে মিলে অনেকানেক ভব্য আলোচনান্তে, দুজনেই দুজনকে মাঝেমধ্যে কল করবেন এমন প্রতিশ্রুতি আদায় করে ইনি ফের নিজের রাজপাটে ফিরে এলেন।

কিন্তু চলে এলেই তো আর হলো না মশাই। সামান্য এন্টারটেইনমেন্ট না হলে রাজারাজড়াদের মনই  বা উঠবে কি করে বলুন? এখন ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো সেই আমি। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই সময় আমি একটি রহস্যোপন্যাসে ডুবে ছিলুম। তিনি খানিকক্ষণ আমাকে অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করে প্রশ্নবাণ ছুঁড়লেন, "তোমাকে সামার হলিডেতে খুব হোমটাস্ক দিয়েছে, তাই না?"
দ্রুত একমত হয়ে পড়ি, তদুপরি মুখখানা খুবই কাঁদোকাঁদো করে রাখতে হয়, "সে তো বটেই, একগাদা হোমটাস্ক, তার ওপরে প্রোজেক্ট ওয়ার্ক, তারও ওপরে একগাদা সামেশন আর সাবস্ট্রাকশন, আর আমাদের স্কুল টীচার কি স্ট্রিক্ট কি বলবো কি বলবো, ইয়া ম্মোটা ম্মোটা স্কেল দিয়ে...." আমার গলা থেকে হাহাকার ঝরে পড়ে, সেই আগত দুর্ভোগের চিন্তায় ব্যাকুল কান্নার শুনে পাথরও গলে যেতে বাধ্য, আর ভক্তের কান্নায় ভগবান দ্রবীভূত না হলে শাস্ত্র টাস্ত্র সব মিথ্যে , মুনি ঋষিরা সেইরকমই বলে গেছেন শুনেছি না? তেনারও চোখটা ছলছল করে এলো বোধহয়, আমার পাশে বসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সান্ত্বনা দেন, "আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে, ম্যাথসটা না হয় আমি হেল্প করে দেবো, কেমন? আমাদের তো সামেশন শেখাচ্ছে এখন!"

এত বড় আশ্বাসের পরেও যে খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে যে না ওঠে  স্বীকার করতেই হয় যে সে ব্যাটা এক্কেরে ঘোর পাষণ্ড বিভীষণ! ফলে বইটই বন্ধ করে হাঁটু মুড়ে সিটের ওপর গুছিয়ে বসতেই হলো, আলাপ পরিচয়টা সেরে ফেলি, এই ছিলো মতলব!
"তোমার নাম কি শুনি? 
"মৌটুসি। তোমার নাম কিইইইই?"
"উমমম আমার নাম কুমড়োপটাশ বকবকম"।
"ইশশশশ, মিথ্যেবাদী। কুমড়োপটাশ কারও নাম হয় নাকি?" 
"হয় হয় যানতি পারো না। আচ্ছা তুমি কোথায় থাকো মৌটুসি?" 
" আমি তো খিদিরপুরে থাকি। তুমি?"
দিব্য মজা লাগছিলো, বানিয়ে বানিয়ে বললাম, "আমিও খিদিরপুরে থাকি, হুমহুম, তাই তো তোমাকে চেনা চেনা লাগছে। তোমাদের বাড়িতে একটা বুদ্ধুভুতুম থাকে না?"
" ইসশশ, তুমি কি মিথ্যুক, কি মিথ্যুক গো! আমাদের ক্লাসের বিভানও এত মিথ্যে বলে না। তুমি তো হাওড়ায় থাকো"।
চমৎকৃত হই, সামনে স্বয়ং হারমাইওনি গ্র‍্যাঞ্জার সশরীরে নাকি?, "কি করে বুঝলে?"
"হি হি হি হি,  তোমাকে কেমন হাওড়া হাওড়া দেখতে!"

স্তম্ভিত হওয়ার কিছু বাকি থাকে না আর, সত্যি বলেছে বলে খুশি হবো, নাকি রেসিস্ট কমেন্ট বলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে  ফেসবুকে স্টেটাস দেবো বুঝে উঠতে পারি না। ওদিক থেকে মহোদয়ার মাতৃদেবীর কাংস্যনিন্দিত কণ্ঠস্বর শোনা যায়, "ছি মামমাম, ওসব কি বাজে কথা? বারণ করেছি না ওরকম বলতে?" 
আমি কাষ্ঠহাসি হেসে বলি, "না না ঠিক আছে, বাচ্চা তো, হেঁ হেঁ ", এই বলে ফের  অটল ধৈর্যের সঙ্গে আলাপ জমাতে ব্রতী হই, " আচ্ছা, তোমাদের স্কুলে কী কী পড়ায়?" 
তিনি ভাবুক ও স্বপ্নালু চোখে অনেক্ষণ উর্ধ্বনেত্র হয়ে থাকেন, তারপর ক্ষীণ স্বরে শুরু করেন, " ম্যাথস, ইংলিশ, বেঙ্গলি, সায়েন্স..." এরপরে ভাণ্ডার ফুরিয়ে যায়, তিনি গভীর চিন্তার সঙ্গে কর গুনতে থাকেন। আমারও মায়া হয়, আহা, এই বয়সে আর কত কিই বা শিখবে বলুন তো? সময় তো পড়ে আছেই সামনে,অত্ত তাড়াহুড়ো কিসের অ্যাঁ?  অতএব অন্য প্রশ্নে যেতে হয়, "তোমার বেস্ট ফ্রেণ্ড কে?" 
"স্কুলে না বাড়িতে?"

তাই তো! এই বয়সে এসে যখন চারিদিকে তাকিয়ে দেখি শুধু ঈর্ষাকাতর সহকর্মী আর কাঠিচালনায় বীরোত্তমকেশরী প্রতিবেশীদের, তখন ভুলেই যাই শিশু বয়সে আমারও কিছু বন্ধু ছিলো, তাদেরও আমরা স্কুলের বন্ধু আর পাড়ার বন্ধুতে ভাগ করতাম। তখন ছোট শরীরে বড় মন ছিলো, সর্বত্র বন্ধু খুঁজে পেতাম, আর এখন?

"আচ্ছা, দুটোই বলো"
"স্কুলে প্রেরণা আর সানা। আর সোসাইটিতে সানিয়া আর ফারহা। মল্লিকা আর ঈশানীও ফ্রেন্ড বটে,  কিন্তু বেস্ট ফ্রেণ্ড না। মানে প্রেরণার মত বেস্ট ফ্রেণ্ড না। তবে আইশরইয়ার থেকে বেশি ফ্রেণ্ড। তবে ঈশানী যতটা ফ্রেণ্ড আইশরইয়া তার থেকে বেশি ফ্রেণ্ড। মল্লিকা আর সানিয়াকে তুমি সেম সেম ধরতে পারো। তবে সত্যি করে বলতে গেলে কিন্তু ফৌজিয়াও আবার গুড ফ্রেণ্ডসদের মধ্যে আছে, বুঝলে? ধরো আইশরইয়া আর মল্লিকার থেকে বেশি, কিন্তু ফারহার মতন অতটা নয়...."

ঈশ্বর পরম কারুণিক, বেশিক্ষণ এই ক্লাসিফিকেশন আর পেকিং অর্ডার শুনতে হলে মাইরি অজ্ঞান হয়ে যেতুম, জিএসটি বিলের সাবক্লজ বোঝা বরং এর থেকে ঢের সহজ। এর অর্ধেক মেহনতে শার্লক হোমসের নতুন সিরিজ বার করা যায়, হ্যারি পটার তিনবার নতুন করে লেখা যায়, গেম অফ থ্রোন্সের জি বাংলা ভার্শান বার করা যায় (টিরিয়ন ল্যানিস্টারের চরিত্রে রুদ্রনীল!)।  আমি খানিকক্ষণ শিবনেত্র হয়ে তাকিয়েছিলুম, হাফ বোতল হুইস্কি সাবড়ে তার ওপর দু'পুরিয়া গাঁজা মারলে ওর থেকে বেশি হ্যাল হওয়া সম্ভব না। পরে ধাতস্থ হতে দেখি তিনি আমার কেনা চানাচুরের প্যাকেটটি খুলে খুবই মন দিয়ে সেটি সাফ করার চেষ্টায় আছেন। সেদিকে খুবই করুণ চোখে তাকাতে ( স্প্রাইটে হাফ হাফ করে মিশিয়ে বাকার্ডি এনেছিলুম বটে। এখন বিনা চানাচুরে কি করে ... থাক এযাত্রা  বোধহয় বাড়িতে গিয়েই...),  তিনি দয়াপরবশ হয়ে বললেন, "তুমিও একটু খাবে নাকি? দেখো, খুব ঝাল কিন্তু"! এই বলে সামান্য প্রসাদ আমার হাতে দিলেন। আমিও বুভুক্ষুর মতন মায়ের প্রসাদ, যা পাওয়া যায় তাই ভালো, ভেবে গালে চালান করে দিলুম। তারপর আড়চোখে আরেকবার চাইতেই তিনি চোখ পাকিয়ে বললেন "খুব ঝাল বল্লুম যে, আবার চাইছো? তোমার মা বলেনি যে গ্রিডি হওয়া ভালো নয়? "
এরপর আরেকটু চানাচুর চায়, এমন সাহস কার? আমিই বা কোন বাহুবলী হে? হাত  চাটতে চাটতে জুলজুল করে চেয়ে রইলাম, আর তিনি প্যাকেটটা শেষ করে হু হা করতে করতে তাঁর জন্যে নির্দিষ্ট বোতল থেকে আধ বোতল জল সাবাড় করে দিলেন। আমি আর কি করি, অগত্যা হতাশ্বাস হয়ে ফের একেনবাবু খুলে বসেছি, ( আহা, সুজন দাশগুপ্ত মহাশয়ের জয় হউক),  তিনি দেখি ফের কাছে ঘেঁষে এলেন, "তোমার আরও খেতে ইচ্ছে করছিলো, তাই না?" 
ছোট্টবেলা থেকে শিখেছিলাম মিথ্যে বলা পাপ, তাই দ্রুত ঘাড় নাড়িয়ে সম্মত হলাম। 
ও ম্মা, এইটে শোনামাত্র তিনি দেখি গুটিগুটি পায়ে গিয়ে তেনার মায়ের পাশ থেকে একটা এত্তবড় হলুদ রঙের প্যাকেট বার করলেন, মুখে সলজ্জ হাসি। ওটা কি রে? ত্তাই ব্বলো, একটা আস্ত পট্যাটো চিপসের প্যাকেট! এইটে না বার করে আপনি আমারই চানাচুর আমাকেই দয়াদাক্ষিণ্য করে দিয়ে.... কি নিষ্ঠুর কি নিষ্ঠুর...

তিনি সন্তর্পণে প্যাকেটটা ছিঁড়লেন, যাতে আওয়াজ তেনার মায়ের কানে না যায়। তাঁর সেই চার্লস শোভরাজকে লজ্জা দেওয়া সূক্ষ্ম হাতের কাজ দেখে মালুম হয় যে একাজে তিনি রীতিমতো দক্ষ...শশশ্ করে অবশ্য আওয়াজও করলেন আমার মতন বুরবককে সতর্ক করার জন্যে ... তারপর ... তারপর... তারপর... ভাবতেও জিভে লাল গড়াচ্ছে.. লিখতেও এই পাতি কলমচির আঙুলগুলি শিহরিত হচ্ছে...তিনি একটি মাত্র চিপস তুলে, সেটি ভেঙে এক চতুর্থাংশ মাত্র আমার হাতে দিয়ে অত্যন্ত গম্ভীরভাবে  বললেন যে, " বেশি চিপস খেলে পেট ব্যাথা করে, তোমার মা তোমায় বলেনি?" এই বলে তিনি একমুঠো চিপস নিজের মুখের মধ্যে পুরে কড়মড় করে চিবোতে চিবোতে আমার দিকে সপ্রশ্ন চোখে চেয়ে রইলেন। আমিও সমুদ্রশোষণকারী অগস্ত্যকে চামচে করে জল খেতে দেওয়া হয়েছে এমন মুখ করে আঙুল চেটেচুটে বসে রইলুম।

বল্লাম না, মায়ের প্রসাদ, যা পাওয়া যায় তাইই ভালো!

এরপর অনেক রাত হয়েছে, এই বিধায় আমি আমার সিটে বিছানা বিছোতে লাগলুম, এরপর খেয়ে দেয়ে শোবো এই অভিপ্রায়। আমার দেখাদেখি এঁর মা'ও তাঁদের বিছানা তৈরি করতে লাগলেন। তিনিও অবশ্য সোৎসাহে তাঁর মা'কে সেই পুণ্যকর্মে সহায়তা করতে লাগলেন। মাতৃদেবী যথারীতি বিস্তর বিরক্ত হচ্ছিলেন। এখন কাজ এবং আকাজের মধ্যে এক্স্যাক্টলি কি পার্থক্য সেই নিয়ে ভিন্নরুচির্হি লোকাঃ বলে একটা ভারী দামি কথা আছে। মুশকিল হচ্ছে যে বড়রা কথাটা একদম মানতে চান না।।ফলে তেনার পিঠে উপর্যুপরি দুইবার দুম দুম করে কার্পেট বম্বিং হওয়ার পর তিনি গম্ভীর মুখে যেন ডানকার্কের সেই বন্দর থেকে, "গ্লোরিয়াস রিট্রিট" করে ফের আমার কাছে ফিরে এলেন।
তিনি গম্ভীর মুখে বসে আছেন দেখে সামান্য মায়া হলো। আরেকটু কাছে ঘেঁষে এলাম, 
" তোমরা কোথায় গেছিলে মৌটুসি"।
" এলাহাবাদ", অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত উত্তর, যা লোকে সচরাচর ক্ষিপ্ত হলেই দেয়।
"ইয়ে, ঘুরতে?" প্রশ্নটা করা সঙ্গত হলো কি না বুঝলাম না।
"আঙ্কলের বিয়ে"। নাহ, বুঝলাম, ন্যায়শাস্ত্রে যে বলে পর্বতো বহ্নিমান ধূমাৎ, এই সেই ধূম! অবশ্য পিঠে দুম করে পড়লে... 
"হুমম। তা মৌটুসি, তুমি ঘুরতে যেতে ভালোবাসো?
"হুঁ"। 
"বাহ বাহ। তা এবার সামার হলিডেতে কোথাও ঘুরতে গেছিলে তোমার?"
"না। সামার তো শেষই হয়ে গেলো।"
যাক, মনোসিলেবলের গেরোটা কেটেছে। জ্জয়ক্কালী। হাত দিয়ে ঘাম মুছে অতি সন্তর্পণে পরের প্রশ্নে যাই। 
" তা দুর্গাপুজোতে কোথায় যাচ্ছ তোমরা?"
" এইবার? দার্জিলিং ", এইবার খুশিতে মুখটা ঝলমল করে উঠলো, যেন সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় উড়ে গেলো একঝাঁক রঙীন প্রজাপতির দল। আহা, কে  লিখেছিলেন গো, মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি? "আমি, আমরা সবাই, আর সানিয়া আর ফারহা আর সানিয়া ফারহার পেরেন্টসরা, আর.."

"সে কি? তুমি দুর্গাপুজোতে কলকাতায় থাকবে না?" ছদ্মবিষ্ময়ে বলি।

"না তো,  আমরা প্রত্যেকবার কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই। লাস্ট ইয়ার কেরালা গেছিলাম। পরের বছর কুলু মানালি যাবো। তাই না মা?" তিনি সমর্থন খোঁজার জন্যে ওদিকে ফেরেন।

" মৌ, আঙ্কলকে ঘুমোতে দাও এবার। অনেক বকবক করেছো, খাবে এসো, খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ো",  মাতৃদেবীর কড়া নির্দেশ ভেসে আসে। দেখতে পাই ওদিকে ডিনার প্যাক খোলা হয়ে গেছে।

অগত্যা, তিনি গুটিগুটি পায়ে অগ্রসর হন, ফিসফিস করে বলেন, "আচ্ছা, দুগগা ঠাকুরের দশটা হাত, আর কি বড় বড় চোখ, আমাদের হেডমিস্ট্রেসের মতন। তোমার ভয় করেনা?"

রাত দশটায় পাঁচ বছরের শিশুকে মা দুর্গার দশপ্রহরণধারণের তাত্ত্বিক ব্যাখা শোনানোটা নেহাৎ চাইল্ড অ্যাবিউজ হয়ে যাবে বলে নিজেকে শাসন করতে বাধ্য হই। খেয়েদেয়ে, পর্দাটা টেনে দিয়ে মোবাইলে 'অয়ি গিরিনন্দিনী' শুনতে শুনতে গভীর ঘুম।

পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙলো দেরিতে, তাও তিনি আমার চুল ধরে টানছিলেন বলে। উঠেই দেখি কামরায় একটা ব্যস্ত হুড়োহুড়ির ভাব, সবাই তৈরি হচ্ছেন নামার জন্যে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি ডানকুনি ক্রস করে যাচ্ছে ট্রেন, মানে আর আধঘণ্টার মধ্যে হাওড়া পৌঁছবো। তড়াক করে উঠে  বেসিনে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে আসি। ফিরে এসে সিটে বসে জুতো পরছি, এমন সময় তিনি এলেন, এসেই চ্যালেঞ্জের সুরে, " কাল তুমি আমাকে তো বললে না তুমি কোথায় থাকো?" 
গালটা টিপে দিয়ে বলি, " আমি লেকটাউনে থাকি মৌ। কেন তুমি কি আমাদের বাড়ি আসবে?" 
খানিকক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তিনি কি ভাবেন, তারপর বলেন, "আগে তুমি আমাদের বাড়িতে এসো, তারপর ভেবে দেখছি।" সেই গুরুগম্ভীর গিন্নিবান্নী হাবভাব দেখে এবার ফিক করে হেসে ফেলি, "আচ্ছা তোমাদের বাড়ি কি করে যেতে হয় বলো, দেখি। আমি অ্যড্রেসটা নোট করে নিই। বলো, " বলে মিছিমিছি কিছু টাইপ করার ভঙ্গিতে মোবাইল বাগিয়ে ধরি। তিনিও বলতে থাকেন, "লিখে নাও, ভালো নাম শবনম আখতার, ডাক নাম মৌটুসি, খিদিরপুর সেকেন্ড বাই লেন, বাড়ির নাম পার্ক প্যালেস, আর আমার নাম করলেই সব্বাই দেখিয়ে দেবে, না চিনলে বলবে মোগলি যাদের বাড়ি থাকে। ও তোমাকে মোগলির কথা কিছু বলিনি, না? মোগলি হচ্ছে আমাদের সোসাইটির সওওওবচেয়ে কিউট বেড়াল। লেজখানা তো দেখোনি, এই ইয়্যাত্তোবড়....."

কোথাও কি সূক্ষ্ম কিছু ঘটে গেলো আমার মধ্যে? মানে নামটা শোনামাত্র কি এই নিষ্পাপ অপাপবিদ্ধ শিশুটির যে চারিত্রিক অবয়ব আমার চেতনায় ও ইন্দ্রিয়ে ছিলো, তাতে কি আমারই অবচেতন মন থেকে অনাবশ্যক কিছু রঙের ছিটে এসে পড়লো? কোথাও কি সামান্য হলে, অতি সামান্য হলেও একটা অস্বচ্ছন্দ দূরত্ব তৈরি হলো? মানে যদি সত্যিই এর নাম মৌটুসিই হতো, পদবী হতো মুখার্জি কি মণ্ডল,নিদেনপক্ষে গঞ্জালভেস কি কউর, তাহলে কি আমার এই যে হঠাতই "ও আচ্ছা, মেয়েটা মুসলিম?" চিন্তাটা মাথায় আসতো?

না, বোধহয় আসতো না। কোথায় যেন আমরা দুপক্ষই একে অন্যকে অন্যভাবে দেখাটা অভ্যেস করে ফেলেছি। এ দায় কার কে জানে!

জোর করে এই অস্বস্তিকর চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছি, এমন সময় আরেকটা চিন্তা মাথায় উদয় হলো, ও আচ্ছা, মুসলিম ফ্যামিলি। তাই দুর্গাপুজোয় কলকাতায় থাকে না, তাই মা দুর্গাকে দশ হাতে অত ভয়ঙ্কর লাগে তাই না?

এবং মুহূর্তের মধ্যেই বুকের ভেতরে বসে থাকা আদ্যন্ত মদ্যপ, খিস্তিবাজ, লজিক্যাল, এবং কাউকে রেয়াত না করা কিঞ্চিৎ উদ্ধত লোকটা বলে উঠলো, "বটে? তোমার মামাশ্বশুররা যে গুষ্টিসুদ্ধ ফিবছর পুজোতে বেড়াতে যায় তার বেলা? আর এর পদবী আখতার বলে বিচার করছো দুগগাঠাকুরকে কি বললো, বলি তোমার নিজের মেয়ে গত বছর ভদ্রমহিলাকে পলিগন বলে ডেকেছিলো, সে কথাটা মনে আছে?"

খানিকক্ষণ মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিলাম। না হে, ভুলই করছিলাম বোধহয়, বুদ্ধিশুদ্ধি সোজা রাখা খুবই জরুরি,খারাপকে খারাপই বলতে হয়, কিন্তু  ঘণ্টাকর্ণ হওয়াটা কোনও কাজের কথা নয়।

এমন সব ভাবছি, এমন সময় তিনি খুবই অন্তরঙ্গ ভাবে এসে কোলে উঠে বললেন, "শোনো না, তুমি এলে সাতাশ তারিখে এসো কেমন? মানে ঈদের দিন এসো বুঝলে? অনেক রান্নাবান্না হবে তো, আর তুমি যা হ্যাংলা..হি হিহি...আর শোনো, তোমার সঙ্গে ফারহা সানিয়া মল্লিকা ঈশানী এদের সঙ্গে ফ্রেণ্ডশিপ করিয়ে দেবো, কেমন?  তোমারও অনেকগুলো নতুন ফ্রেণ্ড হয়ে যাবে, তাই না?"
এমন লাভজনক প্রস্তাবে একমত হবো না এমন পাষণ্ড এখনও হইনি, ফলে দ্রুত সম্মতি দিয়ে ফেলি। তারপর কি একটা মনে পড়ে যেতে ফিসিফিসিয়ে জিজ্ঞেস করি, "আচ্ছা মৌটুসি, তুমি ঈদে ঈদী কি নেবে?"
তিনি অপাঙ্গে মায়ের দিকে চেয়ে নেন, তারপর আরও ফিসফিস করে বলেন, "অ্যানা আর এলসার দুটো ডল এনো কেমন?", বলেই চকাম করে একটা হামি খেয়ে ফেলেন! চোখ বুজে সেই হামি উপভোগ করতে থাকি, একটা মিষ্টি দুধেদাঁতের শিশুগন্ধ বুকের মধ্যে নরম অমাভুক জ্যোৎস্নার মতই ছেয়ে যায়। কচি গলায় কে যেন ভেতরে বলে ওঠে এক্সপেক্টোওওও পেট্রোনাম...

বলেছিলাম না, মায়ের প্রসাদ, যা পাওয়া যায় তাইই ভালো!

রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

পাহাড় হাসছে ~ অবীন দত্তগুপ্ত

মনে করুন ,সেই সেদিনের কথা । আপনি দার্জিলিং গেছেন । গুরুং আপনাকে "মা" বলে ডেকে আহ্লাদে গলে পড়ছেন । আপনি সব কথা মেনে নিচ্ছেন গুরুং-এর । একটা গুন্ডাকে রাজনৈতিক বৈধতা দিচ্ছেন । জি টি এ- চুক্তিতে মেনে নিচ্ছেন গোর্খাল্যান্ডের দাবী । আপনার স্বার্থ কি ? কেন, তরাই আর ডুয়ারস-এ গোর্খা ভোট । এর আগে আদিবাসীদের ভাগ করে ফেলেছেন ,আদিবাসী বিকাশ পরিষদকে ধুয়ো দিয়েছেন ডুয়ারসে । তারও আগে কুচবিহারে কামতাপুরিদের সাথে জোট করেছেন । কামতাপুরিদের বাংলা ভাগের দাবিকে হাওয়া দিয়েছেন , গুরুঙ্গের বাংলা ভাগের দাবিকে হাওয়া দিয়েছেন । আপনি এই সমস্ত করেছেন স্রেফ অঙ্কের খাতিরে । যে কোন উপায় সিংহাসন চড়ার লোভে । যে আগুন উস্কে দিয়ে , সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া এক দেহের উপর তান্ত্রিকের আসন পেতে বসেছিলেন - সেই আগুনেই দেখুন আপনার নিজের আসনটাও পুড়তে বসেছে । আপনার চেয়েও ঘৃণ্য বেনিয়ার দল বি জে পি ,বাংলা ভাগের আপনার পুরানো খেলাটাই আরও নোংরা ভাবে খেলতে চাইছে । দেখুন , সেদিনের আপনার সাথে একমাত্র তফাৎ যাদের করতে পারছেন , তারা আপনার চিরশত্রু , কমিউনিস্ট পার্টি । রাজ্যের এই ভয়ঙ্কর পরিণতির সামনে দাঁড়িয়ে , ওরা দেখুন আপনার মতো শবসাধনা করছেন না । মনে রাখবেন ,দুশো জন কমিউনিস্টের রক্ত লেগে আপনার আলগা হাসির পাহাড়ে । মনে রাখবেন ,স্রেফ ক্ষমতার জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদকে প্রশ্রয় দেয় না বামপন্থা । একটু বামপন্থীদের থেকে শিখুন - অদূর ভবিষ্যতে ক্ষমতা হারাবেন যখন ,কাজে দেবে ।

কৃষি ঋণ ~ সুশোভন পাত্র

- দিস ব্লাডি ইউনিয়ন কালচার ইস ক্র্যাপ। 
আপিস ফেরত পথে চিলড্ বিয়ারে চুমুক দিয়ে বলেছিল অসীম। কেতাদুরস্ত মাল্টিন্যাশন্যালে প্রজেক্ট ম্যানেজার অসীম। ব্যালেন্স শিট, ডেটা মাইনিং, ক্লায়েন্ট মিটিং'র কচকচানি, তার উপর বিরক্তিকর ট্রাফিক, আর গোদের উপর বিষ ফোড়া শ্রমিক'দের 'নূন্যতম মজুরি বৃদ্ধির' দাবি তে ট্রেড ইউনিয়নের মিছিল। ফর্ক দিয়ে ক্যাপসিকামটা সরিয়ে একটুকরো পনির টিক্কা মুখে তুলে, একরাশ ক্ষোভ উগরে অসীম এক নাগাড়ে বলে গেল, 
- প্রফেশেনালিজম চাই। চাই ডিসিপ্লিন, ডেকোরাম। ঐ 'শ্রমিক ঐক্য' দিয়ে কিস্যু হবে না। 'দুনিয়ায় মজদুর' আর কবে এক হবে? মিছিল, মিটিং, ধর্মঘট... যতসব ডিসগাসটিং এলিমেন্ট। ডেভলাপমেন্ট করতে একটা 'ওয়ার্ক কালচার' লাগে রে। আই মিন.. 'কর্ম সংস্কৃতি'।
গত পরশু প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন অফিসে গিয়েছিল অসীম। নবগঠিত তথ্য-প্রযুক্তি কর্মী'দের ফোরামের প্রতিনিধি হিসাবে ¹। গত মাসে দেশের তথ্য-প্রযুক্তি সেক্টরে যে ব্যাপক কর্মী ছাটাই হয়েছে অসীম সেই হতভাগা'দের একজন। খবরে প্রকাশ, দেশের শীর্ষ ৭টি তথ্য-প্রযুক্তি কোম্পানি তে আগামী একবছরে রেকর্ড হারে আরও ৫৬ হাজার কর্মী ছাটাই হবে ² । আপিস পাড়ায় কান পাতলেই 'টার্মিনেশন লেটার' আর 'ফায়ারিং নোটিশে'র ফিসফিসানি। 
আজ ট্রেড ইউনিয়ন আর তথ্য-প্রযুক্তি কর্মী'দের ফোরামের সমন্বয় মিটিং প্রথম বক্তৃতা করেছে অসীম। আগামী রবিবার সকল হতভাগ্য'দের মিছিলে পা মেলাতে আহ্বান জানিয়েছে। একরাশ ঘেন্না নিয়ে গলার শিরা ফুলিয়ে অসীম মাইকে বলেছে,   
-দিস হোল ব্লাডি সিস্টেম ইস ক্র্যাপ। 
আজ অসীম বুঝতে পারে ধর্মঘটের মানে। বুঝতে পারে ঝাঁ-চকচকে তথ্য-প্রযুক্তি দপ্তরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনে বসে অ্যালগোরিদিমের পলিনমিয়াল কমপ্লেক্সটি ক্যালকুলেশন করার থেকে দেশের অসংগঠিত শ্রমিক'দের জীবনটা আরেকটু ঝুঁকির। কাজটা আরেকটু পরিশ্রমের। আর স্থায়ী রোজগারের নিশ্চয়তাটা আরেকটু কম। সেন্ট্রাল লেবার ব্যুরোর তথ্যানুসারে শুধু ডিমনিটাইজেশেনের পরবর্তী তিনমাসে কাজ হারিয়েছেন দেশের ১.৫২ লক্ষ অসংগঠিত শ্রমিক ³ । আর গত আর্থিক বছরে ২.৩ লক্ষ ⁴ । ২০১৫-১৬'তে দেশের বেকারত্বের হার ৫% -গত পাঁচ বছরের সর্বোচ্চ ⁵। কেন্দ্রীয় সরকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রকল্পেও কাজ কমেছে ৯.৭% হারে ⁶। কিন্তু এমনটা একেবারেই হওয়ার কথা ছিল না। বরং কথা ছিল, ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের। কথা দিয়েছিলেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী ⁷।  লেখা হয়েছিল, "২৫ কোটি নতুন কর্মসংস্থান লাগাম টানবে ক্রম ঊর্ধ্বমুখী বেকারত্বে" ⁸। লেখা হয়েছিল, খোদ বি.জে.পি'র নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু  রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে সেদিনের সেই বক্তৃতা আর নির্বাচনী ইশতেহার প্রতিশ্রুতি বানের জলে ভেসে গেছে কবেই।  
অবশ্য এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভ্যাস বিক্ষিপ্ত নয়। ১৫'ই এপ্রিল ২০১৪, গুজরাটের সুরেন্দ্রনগরের জনসভায় নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন "বি.জে.পি ক্ষমতায় এলে, কৃষকদের বীজ, সেচ, বিদ্যুৎ, সার এবং কৃষির জন্য ব্যবহৃত অন্য দ্রব্যাদির মূল্য অন্তর্ভুক্ত করেই উৎপাদন মূল্য নির্ধারণ করব। এবং তার সাথে কৃষকদের ৫০% মুনাফা সহ শস্যের সহায়ক মূল্য ঘোষণা করব ⁹।"  আসলে মিডিয়ার পোষ্টার বয় সেদিন কোন নতুন কথা বলেননি। 
আজ থেকে ১১ বছর আগে বামপন্থী'দের কমন মিনিমাম প্রোগ্রামের দাবী মেনেই প্রথম ইউ.পি.এ সরকার সার্বিক কৃষি ব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য স্বামীনাথনের নেতৃত্বে 'ন্যাশনাল কমিশন অফ ফার্মার্স' গঠন করে। সেই কমিশনের রিপোর্টে বলেছিল অবিলম্বে শস্যের উৎপাদন মূল্যের উপর কমপক্ষে ৫০% মুনাফা যোগ করে সহায়ক মূল্য ঘোষণা এবং সেই সহায়ক মূল্যের সঠিক বাস্তবায়ন করা দরকার। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় দেশের সমস্ত রাজ্যে ব্যাপক ভূমি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে ¹⁰। কিন্তু  দেশের আরও পাঁচটা কমিশনের মতই স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্টের জায়গা হয়েছিল সেই ডাস্টবিনেই। 
আর হয়েছিল বলেই আজ, ১৯৯১'র 'ফ্রি-মার্কেট ক্যাপিটালিজম' আমদানির ২৬ বছর পর, দেশের জি.ডি.পি তে কৃষির অবদান ৩৫% থেকে কমে এখন ১৩%'এ। ১স্কয়ার কিলোমিটার চাষযোগ্য জমির অংশীদার ২৬৭ জন থেকে বেড়ে এখন ৩২৪  ¹¹।  সরকারের ধার্য করা সহায়ক মূল্য পান দেশের মাত্র ৬% কৃষক ¹² । বেড়েছে কৃষিতে বিদেশী বিনিয়োগ, বেড়েছে বিদ্যুৎ সার, কীটনাশক ডিজেলের দাম। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কৃষক আত্মহত্যাও। ১৯৯৫-২০১৬ অবধি ভারতবর্ষে প্রতি ৩০ মিনিটে একজন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন ¹³ । মোট ৩,১৬,৪৬৬ জন। সংখ্যাটা ইডেন গার্ডেনসের কানায় কানায় পূর্ণ দর্শক সংখ্যার ৫ গুণ। ভারতবর্ষের প্রমাণ মাপের ট্রেনের, মোট যাত্রী সংখ্যার ২১১ গুণ এবং যেকোনো এয়ারবাসের সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতার ৬৩৪ গুণ ¹⁴ । 
আজ থেকে ৭৫ বছর আগে রাতের অন্ধকারে মহারাষ্ট্রের শেলনী'র জঙ্গলে ব্রিটিশ পণ্যবাহী এক ট্রেন কে আটকে প্রচুর টাকা, অস্ত্র ও অন্য মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধার করে গরীব কৃষক'দের বিলিয়ে দেয় 'তুফান সেনা'। বিস্তীর্ণ সাতারা অঞ্চলে গোরা'দের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা হয় পরের দিন সকালেই। ব্রিটিশ'দের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বাধীনতার আগেই গঠিত হয় কৃষক'দের সমান্তরাল সরকার ¹⁵। 
দিল্লীর মসনদে বসে যে বেণীমাধবরা আজকে কৃষক'দের ফসলের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে দশলাখি স্যুট গায়ে বিদেশ সফরে রায় বাহাদুর'দের পদ লেহন করে বেড়াচ্ছেন, রাজ কোষগারের দখল নিয়ে যে বেণীমাধবরা আজকে শ্রমিকের শ্রমের মজুরি বকেয়া রেখে সেনসেক্স আর জি.ডি.পি'র বালখিল্যতায় উন্নয়নে রঙিন গল্প শোনাচ্ছেন, কৃষকের লাশের পাহাড়ে চেপে যে বেণীমাধবরা আজকে বিজয় মালিয়া'দের 'নন পারফর্মিং অ্যাসেট' কে 'রাইট অফ' করার নীতি নির্ধারণ করছেন, শ্রমিক'দের রক্ত-ঘামের বিনিময়ে পুষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে যে বেণীমাধবরা আজকে আদানি'দের বিদেশে জমি কিনতে সস্তা সুদে ঋণ দিচ্ছেন -কেমন হবে বেণীমাধব এক একটা মন্দসৌরের বারুদ গুলো আজ যদি আগুন হয়ে জ্বলে? কেমন হবে বেণীমাধব সেই আগুন গুলোই আজ যদি হরিয়ানা থেকে রাজস্থানে, মহারাষ্ট্র ঘুরে তামিলনাড়ু তে দাবানল হয়ে গেলে? কেমন হবে বেণীমাধব চা-বাগানের হাভাতে গুলোর মজুরি আদায়ের মিছিল যদি সেই দাবানলে মেলে? কেমন হবে বেণীমাধব শ্রমিক-কৃষক 'তুফান সেনা' দিল্লীর রাইসিনা হিলে হিসেব চাইতে গেলে? কেমন হবে বেণীমাধব বেকার গুলো সব এককাট্টা হয়ে পার্লামেন্টের গেটে তালা ঝুলিয়ে দিলে?