বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৬

জন্মাষ্টমী ~ প্রসেঞ্জিত বোস

আজ রাত্রেই মেয়েটি জন্মায়। গোকুলে ও গোপনে। তার মা তখন প্রসব-পীড়ায় অচেতন। কিছুক্ষণ পর যমুনার ওপার থেকে একটি লোক আসে। নিজের সদ্যোজাত ছেলেটিকে গচ্ছিত রেখে চুপিচুপি মেয়েটিকে তুলে নেয়। মায়ের মুখটি ভাল করে দেখার আগেই জন্মের মতো পরিবার-হারা হয় সেই মেয়ে।

মেয়েটিকে পাচার করা হয় মথুরার এক ঘুপচি কারাগারে। ছেলেটির প্রাণ মূল্যবান। তার প্রক্সি হিসেবে মেয়েটিকে রেখে দেওয়া হয়। মথুরার রাজা ছেলেটিকে মারতে এসে মেয়েটিকে পায় ও তাকেই নিয়ে যায়। মেয়েটি দ্বিতীয় বার হাতবদল হয়।

রাজা যখন পাথরের দেওয়ালে আছাড় মারতে যাচ্ছে কয়েক-ঘণ্টা-আগে-জন্মানো পুঁচকে মেয়েটিকে, হাত পিছলে ছিটকে যায় সে। তারপর কোনও এক অজানা ঘটনা-পরম্পরায় তার ঠাঁই হয় দুর্গম বিন্ধ্য পর্বতে। সেখানেই সে বড় হয়।

মেয়েটির মা-বাবার কাছে ছেলেটিও বড় হয়। একটা সময়ে সেই মা-বাবা সত্যিটা জানতে পারে। ছেলেটি মথুরায় আসল মা-বাবার কাছে ফেরৎ যায়। কিন্তু মেয়েটির মা-বাবা ভুলেও হারানো মেয়ের খোঁজ করে না। কী লাভ খুঁজে ? হারানো, চুরি-যাওয়া, বিক্রি-হয়ে-যাওয়া, পাচার-হয়ে-যাওয়া ছেলেদের ঘরে তোলা যায়। মেয়েদের যায় না।

ছেলেটির এখন দু-জোড়া মা-বাবা। তার জীবনে অনেক প্রেম আসে। অনেক স্ত্রী আসে। অনেক সন্তান আসে। আসে রাজত্ব।

মেয়েটির ? কেউ জানে না। তার এক-জোড়া মা-বাবা, একটি প্রেমিক, একটি স্বামী, একটি সন্তান, একটুও ভূমি জুটেছিল কিনা, কেউ খোঁজ রাখেনি।

একটি ছেলে-বাচ্চাকে বাঁচাতে প্রক্সি হয়েছিল সে, এই তার একমাত্র পরিচয়।

শুভ জন্মাষ্টমী। শুধু কৃষ্ণের নয়, আজ যোগমায়ারও জন্মরাত।

শুক্রবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৬

দলিত রাজনীতি এবং কমিউনিস্ট পার্টি - একটি আলোচনার সূচনা ~ পুরন্দর ভাট

সাম্প্রতিক উনাতে গোরক্ষা বাহিনীর হাতে দলিত নিগ্রহকে কেন্দ্র করে গুজরাটে এক ঐতিহাসিক দলিত - মুসলিম যৌথ আন্দোলনের সূচনা হয়েছে যার ফলস্বরূপ সারা গুজরাট জুড়ে বিশাল এক পদযাত্রার পর উনাতে পঁচিশ হাজার দলিতের সমাবেশ হয়েছে। সেখান থেকে ডাক দেওয়া হয়েছে ব্রাহ্মণবাদ আর তার তাঁবেদারি করা সংগঠনগুলি, বিশেষ করে সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলার। একই সঙ্গে সোনি সোরির নেতৃত্বে ছত্তিসগড়ের আদিবাসী সম্প্রদায় বিজেপি সরকার আর তার আদিবাসী বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে পদযাত্রা করেছে। আগামী দিনে এই দুটো আন্দোলন একই বিন্দুতে এসে মিলবে বলেই মনে করি।  আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নিম্নবর্ণ, সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের ওপর ক্রমাগত শোষণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে যার পুরোভাগে রয়েছে সংঘ পরিবার। এই আন্দোলনগুলোয় বিভিন্ন বামপন্থী দল নিজেদের সীমিত ক্ষমতায় পাসে থাকার চেষ্টা করছে, কোথাও কোথাও নেতৃত্বও দিয়েছে যেমন সিপিএম আম্বেদকর ভবন ভেঙে দেওয়ার বিরুদ্ধে ২০ হাজার দলিতকে নিয়ে মিছিল করেছে মুম্বাই শহরে যার চাপে মহারাষ্ট্র সরকার সেই ভবন পুনর্নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বামপন্থীরা এই দলিত আদিবাসী নবজাগরণকে কি ভাবে নিজেদের তাত্বিক কাঠামোর সঙ্গে মেলাবে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যার বোধয় অভাব আছে। দলিত আদিবাসী আন্দোলনই যে ব্রাহ্মণবাদকে এই দেশ থেকে মুছে দেওয়ার একমাত্র পথ এই নিয়ে আমি নিঃসন্দেহ। কাজটা সোজা নয়, আরএসএস শুধু হিমশৈলীর চূড়া মাত্র, এই আন্দোলন ব্যাপ্ত হলে আরএসএস খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে কিন্তু তাতেই বর্ণবাদ শেষ হয়ে যাবে না, আরও অনেক দূর যেতে হবে তার জন্যে। তাই  বামপন্থীরা কী ভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আর কী ভাবে এই আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করতে পারে এই নিয়ে স্পষ্ট ভাবনাচিন্তা প্রয়োজন। 

জেএনইউর "দেশদ্রোহী" উমার খালিদ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে একটি অসামান্য প্রবন্ধ লিখেছেন টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। অমনোযোগী হয়ে লেখাটা পড়লে প্রবন্ধটির গুরুত্ব বোঝা যাবে না, আরো পাঁচটা ভালো প্রবন্ধের মতোই মনে হবে। আসল বক্তব্য প্রবন্ধটির একদম শেষে রয়েছে, হয়তো অনেকের নজরেও বিষয়টা পড়েনি কারণ কোথাও আলোচনা লক্ষ্য করিনি। উমার লিখছেন যে ভারতবর্ষে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হতে চলেছে দলিত এবং আদিবাসীদের কেন্দ্র করেই। দলিত এবং আদিবাসীরা হাজার হাজার বছরের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে, সামাজিক ন্যায়ের জন্যে  আন্দোলন করবে এবং তাতেই আমাদের পুতিগন্ধময় সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এতে শুধুই দলিতরা মুক্তি পাবে তা নয়, তাদের আন্দোলনের ফলেই এই সমাজ এবং এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শোষিত সমস্ত মানুষই তাদের মুক্তির সন্ধান পাবে। যেটা উনি ব্যাখ্যা করেননি বিস্তারিতভাবে তা হলো যে বর্ণবাদ শুধুই দলিতদের শোষণ করে না। আমাদের সমাজে  নারীদের অবস্থানের পেছনেও সেই বর্ণবাদই দায়ী, শ্রমিক এবং কৃষককে যাঁরা শোষণ করে তাদের অধিকাংশও উচ্চবর্ণই। তাই বর্ণবাদকে মুছে দিলে বাকি শোষণগুলোর ওপরেও তার প্রভাব পড়বে। যাঁরা আমাদের দেশের বিভিন্ন বামপন্থী দলগুলোর প্রোগ্রামের সাথে ওয়াকিবহাল তাঁরা হয়তো অনুধাবন করতে পারছেন উমার যা বলেছে তা কতখানি নতুন এবং ভারতের বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর যে প্রোগ্রাম তার থেকে কতটা আলাদা। বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিচ্ছি। 

আমাদের দেশের সংসদীয় কমিউনিস্ট দলগুলোর মধ্যে প্রধান হলো সিপিএম এবং সিপিআই। এদের প্রোগ্রামে কিছু তফাৎ থাকলেও মূল জায়গায় ফারাক নেই। এই দুই দলই মনে করে যে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম লক্ষ্য হলো  ভারতে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করা। এই জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব করবে  শ্রমিক-কৃষক জোট, তারাই হবে বিপ্লবের চালিকাশক্তি। তারা মনে করে যে  জোটটা শ্রমিক-কৃষকের হলেও শ্রমিক শ্রেণীই থাকবে পুরোভাগে কারণ তাদের চেতনার মান সবচেয়ে উন্নত। শ্রমিক-কৃষক জোট বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাবান শ্রেণীকে উৎখাত করবে এবং সমস্ত উৎপাদনশীল সম্পদের  ওপর নিজের হক প্রতিষ্ঠা করবে।  বলা বাহুল্য যে তাদের এই প্রোগ্রাম লেনিনের থিসিস অনুসরণ করে বানানো। এর সঙ্গে  নকশালবাড়ি আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর প্রোগ্রামের তফাৎ আছে। নকশালদের প্রোগ্রাম বলতো যে শ্রমিক না কৃষকই হবে বিপ্লবের অক্ষ। তারা মাও ও লিন বাও থিসিস অনুসরণ করে নিজেদের প্রোগ্রাম বানায় যাতে কৃষকদের মধ্যে গেরিলা বাহিনী তৈরী করে ক্ষমতা দখল করা লক্ষ্য হয়, গ্রামে গ্রামে রেজিমেন্ট তৈরী করে তা দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্র শহরগুলোকে ঘিরে ফেলার কর্মসূচি নেয়, স্লোগান ওঠে "গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো।" তাদের প্রোগ্রাম বলতো যে  ভারতবর্ষের মূল উৎপাদন কৃষিজাত, শিল্প এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল সম্পদ নামমাত্র, তাই কৃষিসম্পদ দখল করতে পারলে, তাতে সামাজিক অধিকার স্থাপন করতে পারলে বিপ্লব সফল। পরে নকশালপন্থী বিভিন্ন দলগুলি এই প্রোগ্রাম থেকে সরে আসে। যেমন সিপিআইএমএল লিবারেশনের এখন যে প্রোগ্রাম তা মোটামুটি সিপিআই সিপিএমের কল্পিত জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের থেকে  খুব একটা ভিন্ন না। মাওবাদীরা যদিও এখনও কৃষক এবং আদিবাসীদের মধ্যে গেরিলা বাহিনী সংগঠিত করার প্রোগ্রাম থেকে সরেনি। এবার উমার খালিদ যা বলেছেন তা সিপিআই, সিপিএম অথবা নকশালদের কল্পিত বিপ্লব থেকে কিন্তু  সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলছেন দলিত এবং আদিবাসীরাই বিপ্লবের অক্ষ, তারাই চালিকাশক্তি, কৃষক বা শ্রমিক-কৃষকের যৌথ ফ্রন্ট নয়। আমার মনে হয় এ এক অভিনব ভাবনা। কিন্তু  এই নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। 

আসুন দেখি গুজরাটে উনার আন্দোলনের দিকে। উনার আন্দোলন কিন্তু শুধুই সামাজিক সম্মান এবং ন্যায়ের প্রশ্নে থেমে নেই। দলিতরা প্রতিজ্ঞা করছেন যে তারা আর মরা গরু ছোঁবেন না, ময়লা পরিষ্কার করবেন না, যেসব কাজ তাঁরা হাজার হাজার বছর ধরে করতে বাধ্য হয়েছেন সেই কাজ আর তাঁরা করবেন না। কিন্তু এইখানেই প্রশ্ন চলে আসছে যে তাঁরা যদি এই সাবেকি জীবিকাগুলো থেকে সরে যান তাহলে তাঁরা রোজগার করবেন কি করে? মরা  গরু না ছুঁলে যাঁরা চামার তাঁরা কিভাবে উপার্জন করবেন? যিনি জমাদার তিনি জমাদারী ছেড়ে দিলে রোজগার করবেন কি করে? আর এইখানেই উনার দলিত আন্দোলনের উজ্জ্বল নেতা জিগনেশ মেওয়ানি স্লোগান তুলেছেন "লাঠ লেকে জায়েঙ্গে জমিন খালি কারওয়াযেঙ্গে!" অর্থাৎ  লাঠি নিয়ে নিজেদের হকের জমি ছিনিয়ে নেবো। ভারতবর্ষের অধিকাংশ দলিত, সংখ্যালঘু  এবং আদিবাসীদের হাতে খুব স্বল্প পরিমান উর্বর জমি আছে তাই চাষবাস করে তাদের রোজগার করার উপায় সীমিত, আর এই কারণেই তাঁদের সাবেকি পেশার বাঁধন থেকে বেরিয়ে আসা মুশকিল হচ্ছে। জিগনেশরা তাই দাবি তুলছেন ভূমি সংস্কার এবং ভূমি বন্টনের। একদম সঠিক দাবি কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু ভেবে দেখুন যে সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনও কিন্তু সেই উৎপাদনশীল সম্পদ দখল করার মাধ্যমেই নিষ্পত্তির দিশা পাচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদনশীল সম্পদ দখল করা আর তাতে সামাজিক অধিকার স্থাপন করার সাবেক কমিউনিস্ট পার্টির প্রোগ্রামেই আমরা ফিরে যাচ্ছি, দলিতের দলিত পরিচয়ের চেয়ে তাঁর ভূমিহীন হওয়ার পরিচয়টাই মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

তাহলে কি করণীয়? কমিনিউস্ট পার্টিগুলির প্রোগ্রামই তাহলে ঠিক? কৃষক অথবা শ্রমিক-কৃষক জোটই বিপ্লবের অক্ষ হবে আর দলিত, আদিবাসী সংখ্যালঘুদের শ্রমিক বা কৃষক পরিচয়টাই মুখ্য হবে, তাঁদের সামাজিক পরিচয়গুলো গৌণ থাকবে? তাই যদি হয় তাহলে ৫০-৬০ বছরেও কেন দলিত আদিবাসী আইডেন্টিটি পলিটিক্স মুছে গিয়ে বামপন্থীদের সঙ্গে মিশে যায়নি? কেন সেই আইডেন্টিটি পলিটিক্স দিন কে দিন শক্তিশালীই হয়ে চলেছে ক্রমশ আর বামপন্থীরা জমি হারাচ্ছে? দলিতদের নিগ্রহ না করলে তো দলিতরা রাস্তায় নেমে জমির দাবিতে মিছিল করতো না তাই না? বর্ণবাদী সংঘ পরিবার দ্বারা নিগ্রহের কারণেই তাঁরা আজ রাস্তায় নেমে জমির দাবি তুলছে, ছত্তিসগড়ের রমন সিংহ সরকার সেনাবাহিনী দিয়ে আদিবাসীদের দমন করেছে বলেই আদিবাসীরা একজোট হয়ে জঙ্গলের অধিকারের দাবি তুলছে। 
তাহলে? আমার মনে হয় উমার যা বলেছেন তা আংশিকভাবে ঠিক। কৃষক-শ্রমিক জোটই বিপ্লবের অক্ষ হতে পারে কিন্তু সেই জোট তৈরী হওয়ার উপকরণ হিসেবে দলিত এবং আদিবাসীদের আইডেন্টিটি ভীষণ রকম প্রয়োজন। মার্ক্সবাদ শ্রমিকের চেতনার ওপর ভরসা করে, যেহেতু তারা সর্বহারা তাই তারাই বিপ্লবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রহরী। কিন্তু ব্যাপক হারে সেই শ্রমিক চেতনা তৈরী হবে কি করে যেখানে আমাদের দেশের জনসংখ্যার মাত্র ১০-১৫% আজকের দিনে  শিল্পের সাথে জড়িত এবং তা দিন কে দিন হ্রাসমান? বরং আমাদের দেশে দু হাজার বছরের বর্ণবাদী শোষণ যে বিপ্লবী চেতনার উপকরণ রেখে গিয়েছে তাকে বামপন্থীরা উপেক্ষা করেছে এতদিন। সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, শ্রমিক কৃষকের একটা বড় অংশ বিপ্লবের পথে চালিত হতে পারে, এবং যে হেতু আমাদের দেশে পুঁজিবাদ ও বর্ণবাদ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত তাই সামাজিক ন্যায়ের পথে চালিত এই অংশটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবেরও সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রহরী হতে পারে। আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলি বিষয়টা বিবেচনা করে দেখে কিনা সেটাই এখন দেখবার। 

বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৬

আবহ বার্তা ~ অরুনাচল দত্তচৌধুরী


এ'বার বৃষ্টি এলে আমাদের মাঝখানে জেগে ওঠা চর 
ডুবে যাবে
সে'রকম বৃষ্টি হলে আমাদের ঘর
ডুবে যাবে ফেলে আসা প্রেমে।
আমাদের ধুলোমাখা ছবি,
আবার বাঁধানো হবে বজ্র আর বিদ্যুতের ফ্রেমে

অশ্রুপরিণতিহীন সমস্ত বিলাপ,
নিজেদের ঠকানোর নিরন্তর মধ্যবিত্ত পাপ
দিবানিশি গল্প হয়ে ওঠে
চুমুগুলি থমকে থাকে তৃষ্ণাভরা ঠোঁটে
খাতাভরা কবিতারা
অসমাপ্ত পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
তাদের কুড়িয়ে নিয়ে যথাযোগ্য কথাসুতো দিয়ে
গেঁথে দিক বৃষ্টিকণা এসে।

আয় বৃষ্টি আয়
এই সংসারের চাপে যাওয়া হয়নি মধুচন্দ্রিমায়
আজকে মেঘের দেশে হানা দেবে হারানো সে চাঁদ
একপাশে আলো থাক
অন্যপিঠে কিছুটা বিষাদ।

ভুল করে যাকে গেছি ভুলে
আজ সেই নিম্নচাপ
ঘনীভূত আমাদের ছিন্ন উপকুলে

মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৬

স্বাধীনতা দিবস ~ যুদ্ধ পরিস্থিতি

আরেকটি ১৫ই আগস্ট, আরেকবার স্বাধীনতা দিবস এলো আর গেলো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ থেকে স্বাধীনতার জন্যে যারা লড়েছিলেন, তাদের প্রত্যেকের মাথার মধ্যে হয়তো স্বাধীন ভারতের ধারনা সম্পর্কে আলাদা মতামত ছিলো। ভগত সিং যেই স্বাধীন ভারতের ধারনা মাথায় নিয়ে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েছিলেন, আর গান্ধী যে স্বাধীন ভারতের ধারনা বুকে নিয়ে গডসের গুলি খেয়েছিলেন, তার মধ্যে কিঞ্চিত ফারাক রয়েছে।
চট্টগ্রামের পাহাড়ে সূর্য সেনের নেতৃত্বে যেই সুবোধ রায়, অম্বিকা চক্রবর্তী, গনেশ ঘোষ আর লোকনাথ বল একইসাথে কাধে কাধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশদের তাক করে রাইফেল ছুড়েছেন, স্বাধীন ভারতে তারাই কংগ্রেস আর কমিউনিস্ট - দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়ে একে অপরের বিরোধী হয়ে রাজনীতি করেছে্ন, ভারত নিয়ে তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে।

আমরা, স্বাধীন ভারতের নাগরিক যারা, প্রত্যেকেই হয়তো আমাদের এই দেশের কাঙ্খিত চরিত্র সমন্ধে ভিন্ন ধারনা পোষণ করি। এবং এই ভিন্ন ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে হয়তো আমরা অনেকেই নিজেদের স্বল্প পরিসরে কোনরকম ভূমিকা পালন করবার চেষ্টা করি। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে, আমরা যারা ধারনার জগতে একে অপরের বিরোধী, তারাই আবার সহযাত্রীও বটে। কারন স্বাধীনতা তো কোন গন্তব্য নয়, স্বাধীনতা তো যাত্রা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে যারা লড়ে স্বাধীনতা আনলেন, তারা একটা অধ্যায় সমাপ্ত করলেন, এবং স্বাধীনতা যাত্রার পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা করলেন। এই অধ্যায়ের অনেক বৈরিতার মধ্যেও একটা ধারনা অবিচল রয়েছে - বহুত্ববাদ। এই বহুত্ববাদ যতবার আক্রান্ত হয়েছে, এই দেশের মানুষ একজোট হয়ে তাকে রক্ষা করেছে। যাদের ইতিহাসের ভার আমরা বহন করি, তাদের ভারতের ধারনা যে আমাদের মধ্যে প্রবহমান, তাকে আমরা অস্বীকার করি কি করে?
কোন একদিন সুবোধ রায় যখন তেভাগা আন্দোলনের সময় কৃষকদের মিছিলের সামনে হাটছিলেন, তখন কি তার পাশে সূর্য সেন মুচকি হেসে পায়ে পা মেলান নি?
গুরগাঁও তে মারুতি কারখানার যে শ্রমিকরা স্ট্রাইক করে কয়েক বছর জেল খেটে এলেন, তাদের সাথে জেলের ভেতর কি ভগত সিং আর বটুকেশ্বর দত্ত বসে  ১৯২৯ এ ট্রেড ডিসপুট এক্ট পাশ করবার দিন এসেম্বলিতে বোম মারবার গল্প শোনায়েনি?
এই ১৫ই আগস্ট গুজরাটে আহমেদাবাদ থেকে উনা অবধি দলিতদের মহামিছিলের শেষে জিগ্নেশ মেওয়ানি স্টেজে উঠে যখন দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষনা করলেন - 'তুমহারা মাতা তুম রাখো, হামে আপনি জমিন দো', তখন কি আকাশে ছোড়া হাজারটা মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের মধ্যে একটা হাত আম্বেদকরের ছিলো না?
বস্তারে শোনি সোরি যখন কর্পোরেট মাফিয়ার হাতে আদিবাসীদের জল-জমি লুঠের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কোন এক থানায় পুলিশের হাতে অত্যাচারিত হয়ে এক কোনে পড়েছিলেন, তখন কি ইলা মিত্রর কোলে মাথা রেখে কিছুক্ষন জিরিয়ে নেননি? এই ১৫ই আগস্ট যখন শোনি সোরি বস্তারের গ্রামগুলোর মধ্যে দিয়ে আদিবাসীদের মহামিছিলে হেটে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন, তখন কি তার পাশে হাত ধরে প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার হাটছিলেন না?

স্বাধীনতা নামক মহাকাব্যের বর্তমান অধ্যায়ে এই বলিষ্ঠ চরিত্রগুলো যখন দেশ জুড়ে তাদের ভারতের ধারনা কে বাস্তব করে তুলতে মাঠে নেমেছে, 'আজাদি'র যাত্রায় সহযাত্রী হয়েছে, তখন আমরা সহনাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার এই যাত্রা কে মহাড়ম্বরে উদযাপন করবো না কেন? আমরা প্রত্যকেই তো লড়ছি এই আজাদির জন্যে - আমাদের ভারতের ধারনা কে রক্ষা করবার জন্যে। ভুলে গেলে চলবে কি করে, আজ লাল কেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা দিয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী, তিনি এমন একটি সংগঠনের সদস্য যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে শুধু খাতায়-কলমে বিরোধিতাই করে থামেননি, মাঠে নেমে তার বিরুদ্ধে লড়েছেন, যারা এই দেশের পতাকা, সংবিধান কোনটাকেই স্বীকৃতি দেননি।

আজাদির যাত্রা থামবে কেন?

সোমবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৬

স্বাধীনতা ~ পুরন্দর ভাট

দীপা কর্মকার চতুর্থ হলেন। চোখের সামনে ইতিহাস দেখলাম।

ছোটোর থেকে শুনে এসেছি মোহনবাগানের খালি পায়ে বুট পরা সাহেবদের হারানোর গল্প। আমি মাচাদের সহ্য করতে পারিনা কিন্তু তবুও এমন কোনো বাঙালি ফুটবল প্রেমী নেই যে ছোটোবেলায় মোহনবাগানের সেই শিল্ড জেতার গল্প শুনে রোমাঞ্চিত বোধ করেনি। তারপর পড়েছি মিলখা সিংহের সারা জীবনব্যাপী লড়াইয়ের কাহিনী, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো রকম সাহায্য  না পেয়েও তিনি কি ভাবে পৌঁছেছিলেন অলিম্পিকে চার নম্বরে। পড়েছি পিটি ঊষার কথা।

আজ চোখের সামনে দেখলাম। মৃত্যুকে তুচ্ছ করে দিয়ে লাফ দিলো ভারতের বিস্মৃত একটি অঙ্গরাজ্যের মেয়ে। হ্যা, প্রদুনোভায় মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, আনন্দবাজারের দৌলতে অনেকেই সেটা জেনে গেছি। যখন দীপা দ্বিতীয় লাফটা দিতে যাচ্ছে, পশে স্কোর বোর্ডে পরিষ্কার দেখাচ্ছে "ডিফিকাল্টি লেভেল -৭" অর্থাৎ সর্বোচ্চ। যিনি গোল্ড জিতলেন সেই মার্কিনি বাইলস কিন্তু দুটো লাফের প্রথমটা ৬.৫ এবং দ্বিতীয়টা  ৬ ডিফিকাল্টির দিয়েছিলেন। কেন দীপাকে এতো কঠিন লাফ দিতে হলো? কারণ পরিকাঠামো এবং ট্রেনিঙের অভাব, যাতে তিনি অন্যান্য সহজ ঝাঁপিগুলি ঠিক মতো অনুশীলন করতে পারেননি। নিজের সমস্তটুকু বাজি রেখে চেষ্টা করেছিলেন, তবুও হলো না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় দেখেছি ছোট্ট শহরেও রোজ বিকেলে শয়ে শয়ে ছোটো ছোটো মেয়েদের জিমন্যাসিয়ামে নিয়ে যেতে  তাঁদের বাপ্ মায়েদের। ভারী ভালো লাগতো ফুলের মতো শিশুদের লাফালাফি করতে দেখে, পাস দিয়ে গেলেই দাঁড়িয়ে দেখতাম। ওই দেশের পরিকাঠামো, ট্রেনিং এবং সকলের উৎসাহের কথা ভাবলে মনে হয় দীপার চতুর্থ হওয়া  মোহনবাগানের খালি পায়ে শিল্ড জেতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

পার্থক্য একটাই, মোহনবাগান জিতেছিল পরাধীন ভারতে যেখানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির  স্বদেশী খেলোয়াড়দের অবহেলা করাটাই স্বাভাবিক আর দীপা স্বাধীন ভারতের খেলোয়াড়, পর্যাপ্ত ট্রেনিঙের ব্যবস্থা না থাকলেও দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট বিলোনো দলের  ক্রীড়ামন্ত্রী বিজয় গোয়েল তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঠিক ব্রাজিল দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, মুকেশ আম্বানি আর তাঁর স্ত্রী সরকারি টাকায় অলিম্পিক দেখছেন এম্বাসেডর হয়ে।

ও, স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।

শুক্রবার, ৫ আগস্ট, ২০১৬

জি এস টি ~ সুশোভন পাত্র

ঐ জোকসটা পড়েছেন? ঐ যে, ম্যাডাম তাঁর ছাত্র কে জিজ্ঞেস করছেন "বল ২ আর ২ যোগ করলে কত হয়?" অমনি ছাত্র নিঃসংকোচে উত্তর দিচ্ছে ৯.৫। উত্তর শুনে ম্যাডাম যখন ছাত্রের জ্ঞানের দীপ্ত বিচ্ছুরণে বিরক্ত হয়ে বেত্রাঘাতে উদ্যত, তখন সেই ছাত্র কাঁচুমাচু হয়ে হিসেব কষছে "২+২=৪ +VAT+সার্ভিস ট্যাক্স+হাইয়ার এডুকেশন সেস+স্বচ্ছ ভারত সেস+কৃষি কল্যাণ সেস+এক্সাইস ডিউটি করলে ওটা রাউন্ড ফিগারে ৯.৫'ই হবে।" ছাত্রের উত্তর শুনে সেই ম্যাডাম, সেই যে অজ্ঞান হয়েছিলেন, গত পরশুই তাঁর জ্ঞান ফিরেছে; মোট চারজন অর্থমন্ত্রী আর দুই সংসদের এক দশকের বায়নাক্কার পর জি.এস.টি সংক্রান্ত (১২২তম) সংবিধান সংশোধনী বিল রাজ্যসভায় পাশ হওয়াতে। মিডিয়ার করতালির লুজ মোশেনে প্রচার হয়েছে, আগের জটিল ও মিশ্র ট্যাক্সেশন পলিসির 'ক্যাসকেডিং এফেক্ট' সরিয়ে জি.এস.টি হবে অপেক্ষাকৃত মসৃণ ও নির্ঝঞ্ঝাট। বাঁকুড়ার চকবাজার থেকে কলকাতার লালবাজার, গৃহস্থের হাটবাজার থেকে বৌ'র শপিং'র পালিকাবাজার -এবার থেকে সব শেয়ালের এক রা, সব বাজারে এক ট্যাক্স। পণ্ডিতরা বলছেন ভীষণ ফেডারেল স্ট্রাকচারে দুর্লভ এই 'ইকোনোমিক ইউনিটি'। যে কোনও বিলে ঐ যে গণ্ডা খানেক হিজিবিজি ট্যাক্সের, সাড়ে বাহান্ন রকম হ-য-ব-র-ল দক্ষিণার সৌজন্যে আপনার মাঝেমাঝেই কালঘাম ছোটে এবার সেটা মুছে ফেলুন। জি.এস.টি তে এবার সবমিলিয়ে একটাই ট্যাক্স।একটাই টাকার অঙ্ক। জি.এস.টি নাকি সো সিম্পল, সো শর্ট অ্যান্ড সো প্রিসাইস।
২০০৬'র জেনারেল বাজেটে পি.চিদাম্বরম যেবার প্রথম জি.এস.টি'র কথা পেড়েছিলেনে, তখনও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঙ্গুর থেকে দৌড়ে এসে সংবিধান হাতে বিধানসভা ভাঙচুর করেননি, সৌরভ গাঙ্গুলি  কামব্যাক করে গ্রেগ চ্যাপেলের মুখে ঝামা ঘষে দেননি, সাদ্দাম হোসেন তখন জ্যান্ত আছেন, জ্যোতি বসু তখনও দিব্যি আলিমুদ্দিন আসছেন এবং বাইচুং ভুটিয়া তখনও ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন হয়ে নেহেরু কাপ খেলছেন। জি.এস.টি'র সর্বাঙ্গ যদি এত সুন্দর আর সহজ-সরলই হত তাহলে কি আর লাল-সবুজ কার্পেটে মোড়া সংসদে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করতেই জেটলি-চিদম্বরমের একদশক সময় লাগত? অবশ্য দিল্লী এখনও বহুদূর। এবার লোকসভায় তারপর কমপক্ষে ১৫টি রাজ্যের বিধানসভার দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে এই বিল পাশ হয়ে রাষ্ট্রপতির দুয়ার ঘুরলে তবে গঠিত হবে জি.এস.টি পরিষদ। তাঁরাই লিখবেন মূল বিলের খসড়া। সেই বিল কে আবার একে একে পেরোতে হবে লোকসভা ও রাজ্যসভার চৌকাঠ, তবে গিয়ে চালু হবে সাধের জি.এস.টি।
বর্তমান মিশ্র ট্যাক্সেশেন পলিসির ক্যাসকেডিং স্টাইলে যেকোনো পণ্যের ম্যানুফ্যাকচারিং থেকে শুরু করে হোলসেল ঘুরে রিটেল হয়ে আপনি কেনা পর্যন্ত, প্রতি ধাপে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার বিভিন্ন ট্যাক্স আদায় করে। রাজ্য নিজেদের ঘরের হাঁড়ির অবস্থা দেখে প্রয়োজনীয় ট্যাক্স রেটও ধার্য করতে পারে, নতুন ট্যাক্সও বসাতে পারে। যেমন ধরুন, আমাদের দূরদর্শী মুখ্যমন্ত্রী সারদা কাণ্ডে নিজের নেতা-মন্ত্রী-সাংসদ'র ঘুষ খাওয়া টাকা ফিরিয়ে দিতে সিগারেট উপর সেস বসিয়েছিলেন। আবার ধরুন কেরালার নতুন সরকার, বিক্রি কমাতে ফাস্টফুডের উপর বিশেষ ট্যাক্স বসিয়েছে কিংবা প্রবল বন্যার ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করতে উড়িষ্যা সরকারের লাগু সাময়িক ভ্যাট ইত্যাদি। কিন্তু জি.এস.টি চালু হলে ম্যানুফ্যাকচারিং-হোলসেল-রিটেলে নয় বরং ট্যাক্স বসবে শুধু একবারই, পণ্য কেনার সময়। রাজ্যগুলির হাতেও থাকবে না নিজেদের প্রয়োজন মত ট্যাক্স আদায়ের বা নতুন কোন ট্যাক্স লাগু করার ক্ষমতা। ফলে গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু'র মত ম্যানুফ্যাকচারিং রাজ্যগুলি প্রবল রেভেনিউ লসের আশংকায় দীর্ঘদিনই জি.এস.টি লটকে ছিল। এখন অবশ্য গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র'র বিজেপি'র রাজ্য সরকার আর কেন্দ্রের এনডিএ সরকার আমে-দুধে মিশে গেছে। আর আপত্তির আঁটি হাতে নিয়ে তামিলনাড়ু কে আঙুল চুষতে দেখে ফচকে ছোঁড়ারা টুইট কেটেছে "নরেন্দ্র মোদী দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন জি.এস.টি'র বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেই একই বিল পাশ করিয়েছেন।"
একদিকে ট্যাক্সেশেন পলিসির এই সরলীকরণের ফলে বিভিন্ন রাজ্যগুলির ব্যাপক রেভেনিউ লস আটকাতে চড়া রেভেনিউ নিউট্রাল রেট ধার্য করে ফেডারেল ফিসক্যাল পলিসির মান্যতা রক্ষা অন্যদিকে চিফ ইকনমিক  এডভাইসার অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম সুপারিশ মেনে রেভেনিউ নিউট্রাল রেটকে ১৫%'র মধ্যে রেখে মুদ্রাস্ফীতি রক্তচক্ষুকে সামাল দেওয়া -জি.এস.টি'র ভবিষ্যৎ আপাতত এই শাঁখের করাতেই দোদুল্যমান।  
জি.এস.টি ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স। গরীবের লাইফবয় থেকে বড়লোকিরা হুন্ডা-সিটি, মধ্যবিত্তর এসি থেকে আম্বানি'দের চার্টার্ড ফ্লাইট, জি.এস.টি ওমনিপ্রেসেন্ট, হোমোজিনিয়াস। তাই আর্থিক বৈষম্য কাটাতে ট্যাক্স ব্যবস্থা সত্যি রিফর্ম করে, রাজকোষের শ্রীবৃদ্ধি যদি ঘটাতেই হয় তাহলে ডাইরেক্ট ট্যাক্সের গল্পটাও একটু কড়াই গণ্ডায় বুঝে নেওয়া দরকার। বর্তমানে দেশের জিডিপির মাত্র ১৬.৬% ট্যাক্স। যা উন্নয়নশীল ও ও.ই.সি.ডি'র অন্তর্ভুক্ত দেশগুলির গড় ২৭.৫% থেকে অনেকটাই কম। আবার ঐ ১৬.৬%'র মাত্র ৫১.৫% ডাইরেক্ট ট্যাক্স। আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল সবচেয়ে ১০% মানুষের হাতেই যেখানে দেশের ৬৬% সম্পদ সেখানে ট্যাক্স বাবদ দেশের মোট জি.ডি.পি তে তাঁদের অবদান মাত্র ৫.৪৭%। গতবছরও  যেখানে জেনারেল বাজেটে ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স বেড়েছে ২০ হাজার কোটি, সেখানে ডাইরেক্ট ট্যাক্স কমেছে ১ হাজার কোটিরও বেশি। ছাড় দেওয়া হয়েছে ৬৮৭১০ কোটি কর্পোরেট ট্যাক্স। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে ১০টি 'বিগ বিজনেস হাউস'র অনাদায়ী ঋণ ৭.৫ লক্ষ কোটি।
পরশু প্রধানমন্ত্রী টুইট করেছেন, অরুণ জেটলি কেক কেটেছেন। তা বেশ জেটলি স্যার, এবার তাহলে ঋণখেলাপি ললিত মোদি আর বিজয় মালিয়া কেও লন্ডন থেকে ফিরিয়ে আনা হোক, পরের বার বাজেটে ডাইরেক্ট ট্যাক্সের ফাঁকির হিসেবটাও একবার মিলিয়ে দেখা হোক, 'রেভেনিউ ফোরগেনে'র নামে বারবার কর্পোরেট ট্যাক্স ছাড়ের নাটকটারও এবার না হয় যবনিকা টানা হোক, বিগ বিজনেস হাউস'র অনাদায়ী ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও না হয় একবার ৫৬ ইঞ্চির বীরত্ব দেখানো হোক। সেদিন না হয় আমরাও টুইট করব। সেদিন আমরাও কেক কাটবো..

সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

আবেশ কেন মারা গেলো? ~ উৎসব গুহ ঠাকুরতা

আবেশ কেন মারা গেলো? - এই জ্বলন্ত প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে গোটা বঙ্গসমাজ। আবেশের মৃত্যুতে সামগ্রিক বাঙ্গালী জাতির চেতনা জাগ্রত হয়েছে - সামাজিক কাঠামোর প্রতিটি ইঞ্চি বিশ্লেষণ করে নাগরিক সমাজ একের পর এক বৈপ্লবিক দলিল পেশ করছে। আমরা নিজেদের চিনছি, জানছি - আবেশ কেন মারা গেলো, আর কি কি করলে আবেশ মারা যেতো না। আসুন, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জড়ো হওয়া সমস্ত দলিল কে এক করে আমরা একটা কারনের লিস্ট বানাই।

আবেশ মারা গেছে কারন সে আইনত প্রাপ্তবয়স্কের তকমা পাওয়ার আগেই নেশা করতো। দু মিনিট নীরবতা সেই সমস্ত পাষন্ড অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে যারা গত ৪০ বছর ধরে স্কুলে পড়াকালীন লুকিয়ে সিগারেট টেনেছে, পুজোয় বাড়ির থেকে পাওয়া পয়সা জড়ো করে মদ খেয়ে মাতাল হয়েছে, গাঁজা টেনে রাস্তায় পড়ে থেকেছে। কলেজের হোস্টেলে, বাড়ির ছাদে, বন্ধুরা এক হয়ে যারা 'নেশাভাঙ' করেছে, খুন হওয়াই যে তাদের ভবিতব্য, তা আবেশ চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে গেলো।

আবেশ মারা গেছে কারন সে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়তো, টিউশন কামাই করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারতো, এবং তার কাছে মোবাইল ফোন ছিলো। দুমিনিট নীরবতা গোটা রাজ্যের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়া সেই সমস্ত অভাগাদের জন্যে, যারা টিউশন কামাই করেছে, টিউশনের স্যারের টাকা মেরে তাই দিয়ে 'নষ্টামো' করেছে। দু মিনিট নীরবতা সেই সমস্ত বাবা-মায়ের জন্যে, যারা প্রযুক্তির বিস্তার কে অস্বীকার করবার সাহস দেখাতে পারেনি, যারা বাচ্চাদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছে (বাড়িতে কেবেল টিভি লাগাচ্ছে, পার্সোনাল কম্পিউটার কিনে দিচ্ছে, আমাদের সময় এসব ছিলো নাকি!?) , যারা সন্তানের সঠিক বিকাশের জন্যে প্রাক-ডিজিটাল বিপ্লব পরিবেশ তৈরি করতে পারেননি।

আবেশ মারা গেছে কারন তার বান্ধবীদের সাথে 'খোলামেলা' মেলামেশা ছিলো, তাদের সাথে রাতে অন্তর্জালে চ্যাট করতো, আড্ডা মারতো, সামাজিক নজরদারির অভাবের কারনে তাকে এই কর্মকান্ডের থেকে বিরত রাখা যায়েনি। দু মিনিট নীরবতা বাংলার নাগরিক সমাজের জন্যে, যারা নারী-পুরুষের খোলামেলা মেলামেশায় কোনরকম বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি, যারা বাংলার পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে, উত্তর ভারতের মতন খাপের কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। দু মিনিট নীরবতা সেই সমস্ত আধুনিকতার পাঠ পড়া নাগরিকদের জন্যে যারা এই ক্ষেত্রে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছে - পাড়ার রাস্তা দিয়ে হাতে হাত ধরে যখন স্কুল ইউনিফর্ম পড়া ছেলে আর মেয়েটা হেঁটে গেছে, তখন সমাজের যে মাথারা সেই নিয়ে প্রতিবাদ করেছে, তাদের খেঁকুড়ে বুড়ো এবং কালচার কাকু -কাকিমা বলে সন্মোধন করেছে।

আবেশ মারা গেছে কারন তার জগতে ঠাকুমার ঝুলি ছিলো না, ছিলো কানে হেডফোন আর হাতে টাকা। দু মিনিট নীরবতা সেই সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক এবং তাদের সন্তানদের জন্যে যারা মনে করেছে যে সাহিত্যগুনহীন ঠাকুমার ঝুলি না পড়লেও বড় হয়ে ওঠা যায়, যারা বাছবিচার না করে নিজেদের পছন্দমতন গানবাজনা শুনতে অভ্যস্ত।

একটি বিষয় এখনও ঐক্যমত পাওয়া যায়েনি - পাড়ার সাম্যবাদী কাকু বলছেন যে আবেশ মারা গেছে কারন সমাজ এখন ভোগবাদ আর পণ্যায়নে আক্রান্ত, আর টিভিতে সনাতনী দাদু বলছেন যে আবেশ মারা গেছে কারন আমরা পরিচ্ছন সনাতনী ভারতীয় সংস্কৃতি ভুলে পাশ্চাত্যের চাকচিক্যে মেতে উঠেছি। দুজনেই অবশ্য জানিয়েছেন যে সময়ের চাকা কে ৩০ বছর পেছনে ঘোরালেই সেই আদর্শ সমাজব্যাবস্থায় পৌছানো যাবে।

আগামী দিনে আমরা আরও বেশি করে সমাজসংস্কারমূলক ভাবনাচিন্তা আশা করছি বাংলার নাগরিকদের পক্ষ থেকে। সত্য এবং পূন্যের সন্ধানে আমাদের যাত্রা চলবে। সামাজিক আন্দোলনের এই সন্ধিক্ষনের চরম মূহুর্তের  মাঝেই কিছু খুচরো মাতাল এবং পাগল যদিও বেসুরো গাইছে। ব্যাটারা বলছে চা শ্রমিকদের মৃত্যুর কারন খুজবে না? চাষী কেন আত্মহত্যা করছে তার কারন খুজবে না? আম চুরির অপরাধে গ্রামের ওই কিশোরটিকে পিটিয়ে মেরে ফেললো কেন তার কারন খুজবে না? হাজার হাজার বছর ধরে আমরা একে অপরকে হত্যা করছি, ধর্ষন করছি, ১ মাসের শিশুকে রেহাই দিচ্ছি না, আস্ত জনজাতি কে হাপিস করে দিচ্ছি, তার কারন খুজবে না? আরেকজন বলছে হিটলার সিগারেট, মদ, মাংস কিছু না খেয়েই ৬০ লাখ ইহুদিকে সাফা করে দিলো, মোদী তো ছোটবেলা থেকে শাখায় আদর্শ ভারতীয় সংস্কৃতি শিখে বড় হয়েছে, না খায় মদ, না করে নেশা, না করে পার্টি, না দেয় বান্ধবীদের সাথে আড্ডা, হেডফোন লাগিয়ে রক, হিপ-হপ এসব তো নৈব নৈব চ, তার তত্ত্বাবধানে শিশুর গলায় পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হলো, ব্যাপারটা কিরকম গোলমেলে ঠেকছে না?

কিন্তু এসব প্রলাপে আমরা কান দিচ্ছি না। আবেশ মারা গেছে, আপাতত এই ওয়াটারশেড ইভেন্ট কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে চলেছে বাঙ্গালীর দ্বিতীয় নবজাগরন।
এই ঐতিহাসিক স্রোতের বিপক্ষে যারা চলবার চেষ্টা করবে, তারা উড়ে যাবে।

ফরোওয়ার্ড মার্চ!

বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০১৬

কাশ্মীর ~ অনিমেষ বৈদ্য

কাশ্মীর নিয়ে কথা বললেই অবধারিত ভাবে যেটা আসবে তা হলো কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কথা। নিজের জন্মভূমি থেকে উৎখাত হওয়ার যন্ত্রণা অপরিসীম। তা অস্বীকার করার কোনও প্রশ্নই নেই। আগে একাধিক বার সেই যন্ত্রণাকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করেছি শব্দে। কিন্তু যেটা অবাক লাগে তা হলো কাশ্মীর ইস্যু এলেই শুধুমাত্র কাশ্মীরি পণ্ডিতের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিদিন এতো এতো ইভেন্টের রিকোয়েস্ট আসে কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা ইভেন্টের রিকোয়েস্টও পেলাম না যেখানে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের এই উৎখাত হওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কেউ এসে বলেছে তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা। এমন ইভেন্ট হলে আমন্ত্রণ পেতে ইচ্ছুক। আন্তরিক ভাবেই শুনতে যাবো। কিন্তু কাশ্মীরে মানুষ মরলেই শুধু কাশ্মীরি পণ্ডিতদের রেফারেন্স টানা দেখতে দেখতে ক্লান্ত। ওই সিপিএম মেরেছে তাই তৃণমূলের মারকে ন্যায্যতা দেওয়া টাইপ।

কাশ্মীরের মৃত্যু নিয়ে কথা বললেই জঙ্গি সমর্থক। এবং যারা বলছে তাদের অনেকের আবার বিজেপির উপরে অগাধ আস্থা। আবার বিজেপির সঙ্গে সেখানে জোট পিডিপি-র, যারা আফজাল গুরুকে শহীদ মানে। কিন্তু এই জঙ্গি-বিরোধীদের কাছে আবার আফজাল গুরু জঙ্গি। সত্যি! সব হিসেব গুলিয়ে যায়। ঘেঁটে যাই। অবশ্য ঘেঁটে থাকা লোক আবার নতুন করে কী ঘেঁটে যাবে!!!

সরকারি ভাবেই ২০০৯ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত কাশ্মীরে হিংসার বলি হয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার মানুষ (৭ হাজার সেনা সহ)। নিখোঁজ ৩ হাজার চারশো লোক। নাহ! আমার বলা কথা নয়। সরকারি হিসেব। এই নিখোঁজ, মৃত প্রতিটি কাশ্মীরিই জঙ্গি!! এদের মধ্যে একজনও নেই যে শুধু তার স্বাধীনতার দাবি জানাতেই মিছিলে গিয়ে খুন হয়েছে!!

বিধবা শব্দটির মানে কী তা জানি আমরা সবাই। তাদের দুঃখ, দুর্দশা নিয়ে হাজার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু 'আধা বিধবা' শব্দটি শুনেছেন কি? নাহ! আমিও শুনিনি কিংবা জানতাম না আগে। জেনেছিলাম হায়দার সিনেমাটা দেখেই। কাশ্মীরে পুলিশ-সেনা যে সব বিবাহিত পুরুষদের তুলে নিয়ে যায় তাদের স্ত্রীরা 'আধা বিধবা'। কারণ তারা অনেকেই জানতে পারেন না যে তাদের স্বামী আদৌ বেঁচে আছে কি না।

বাসে ভাড়া দেওয়ার পরেও কন্ডাক্টর টিকিট দেখতে চাইলে আমাদের সে কি তুমুল বিরক্তি। কিন্তু কাশ্মীরে প্রতি মুহূর্তে আপনাকে আপনার পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। না দেখালে কি পরিণাম হবে তা অনুমান করা যায়। একজন লোক তার বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু ভিতরে ঢুকছেন না। একজন যেই হুকুমের সুরে পরিচয়পত্র দেখতে চাইলেন ওমনি তিনি 'স্বাভাবিক' হলেন এবং তারপর বাড়ির গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। নাহ! আমার কথা নয়। হায়দার সিনেমাটা দেখলেই দেখতে পাবেন। মনে রাখবেন সে সিনেমা ভারত সরকারের অনুমতিপ্রাপ্ত।

জঙ্গিদের সমর্থন করতে হবে না। কিন্তু এই ঘটনাগুলো নিয়েও ভাবা যাবে না তাই বলে!!! এই মানুষদের কথা তুললেও শুনতে হবে ভারত-বিরোধী, জঙ্গি সমর্থক!! আমি নিজে কাশ্মীরি হলে আজাদি চাইতাম কি চাইতাম না জানি না, কিন্তু এই অন্তহীন মৃত্যু মিছিল নিয়ে এই দূরে বসেও একটুও ভাবিত হবো না!!! যদি দেশের কথাও ভাবি তাহলেও তো কাশ্মীরিরা এই মুহূর্ত পর্যন্ত ভারতীয়ই বটে। একজন ভারতীয় হয়ে অন্য ভারতবাসীর মৃত্যু মিছিল নিয়ে চিন্তিত হবে না আমাদের ভারতীয় আবেগ!!! তাই নিয়ে কথা বললেও শুনতে হবে জঙ্গিবাদের সমর্থক!!!

এর থেকে সোজাসুজি বলুন। কাশ্মীরি মাত্রই জঙ্গি, এতোদিনের প্রতিটি মৃত্যুই জঙ্গির মৃত্যু, আর সেই মৃত্যুতে আপনার এক বিন্দুও দুঃখ নেই, সেই মানুযদের নিয়ে আপনার মানবিকতা এক বিন্দুও বরাদ্দ নেই, তারা প্রত্যেকে খুন হওয়ার যোগ্য, এবং আপনি এদের খুন দেখতে চান। এতে অন্তত আপনার বিরোধিতা করলেও আপনার সততার প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে।

মঙ্গলবার, ১২ জুলাই, ২০১৬

আকালের সন্ধানে ~ সুশোভন পাত্র

হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ গুলোর ম্যাসেজ ডিলিট করতে করতে সেদিন হঠাৎ করেই একটা ম্যাসেজে চোখ আটকে গেল। অবশ্য বলা ভালো, ভাগ্যিস আটকে গেল! মহারাষ্ট্রের এক ভদ্রলোক, এই ৪৮ডিগ্রিতে, আহমেদনগর থেকে নানদেদ ট্রেন যাত্রার অভিজ্ঞতা লিখেছেন।
বাইরের তীব্র দাবদাহ আর জানলার শুষ্ক, গরম বাতাসের জন্যই সেদিন বোধহয় ৯ ঘণ্টার ট্রেন জার্নিতে স্লিপারটা বেশ ফাঁকাই ছিল । যত্নের অভাবে কম্পার্টমেন্টের একমাত্র মোবাইল চার্জিং পয়েন্টটা খারাপ। আর চাহিদার অভাবে ট্রেনের একমাত্র প্যান্ট্রি কার'টাও বন্ধ। তাই তৃষ্ণা মেটাতে সম্বল হাফ বোতলের গরম জলের কয়েকটা ফোঁটা। আর সময় কাটাতে ভরসা ব্যাগে গোঁজা মারাঠি একটা খবরের কাগজ। দুদিকের জানলায় দিগন্ত বিস্তৃত শুকিয়ে কাঠ বিঘা বিঘা ক্ষেতের সাথে বেশ সামঞ্জস্য রেখেছে সংবাদ শিরোনামটা। "দেশের প্রতি ১০টা আত্মহত্যার ৭ জনই কৃষক"। গত পাঁচ বছরে ভয়ঙ্কর খরা কবলিত এই মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়া আর বিদর্ভের কৃষকদের দুর্দশার কথা ভাবতে ভাবতেই ট্রেনটা ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। জানলার বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল একদল বৃদ্ধ-মহিলা-শিশু হাতে বালতি আর বোতল নিয়ে ট্রেনের দিকে ছুটে আসছে। ট্রেনে উঠেই ঐ দলের মহিলার প্রায় নি:সঙ্কোচেই ট্রেনের কম্পার্টমেন্টের টয়লেটে গিয়ে ট্যাপ খুলে বালতিতে জল ধরতে লাগলো। অন্যদিকে শিশুরা হামাগুড়ি দিয়ে সিটের নিচে আর বয়স্করা উঁকি মেরে আপার বার্থে যাত্রীদের উচ্ছিষ্ট জলের বোতলে অবশিষ্ট এক-দু ফোঁটা জলের খোঁজ শুরু করলো। সবকিছুই চোখের সামনে এত তাড়াতাড়ি আর নিখুঁত ভাবে ঘটছিল যেন সবকিছুই 'ভেরি ওয়েল প্ল্যান্ড'। এক বৃদ্ধের কোলে বাচ্চা একটা মেয়ে। এক সহযাত্রী মেয়েটির হাতে তাঁর জলের বোতলের অবশিষ্ট টুকু তুলে দিতেই, বৃদ্ধ করজোড়ে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানালেন। জলের বোতল পেয়ে যখন বাচ্চা মেয়েটার মুখে একগাল হাসির সোনা ঝরছে ঠিক তখনই সম্বিত ফিরল আহাম্মক রেল পুলিশটার বাঁশিতে। লোকগুলো সবাই ভয়ে হুটোপুটি করে ট্রেন থেকে ঝাঁপ মারল ঠিকই, কিন্তু নিপুণ কৌশলে, ভরা জলের একফোঁটাও কিন্তু মাটিতে পড়ল না। টি.টি.ই এসে রেল পুলিশটাকে ক্ষান্ত করে বললেন, "এটাই এখন ওদের ডেলি রুটিন। গ্রামের পুরুষরা আগের স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে ওঠে। সময়, সুযোগ বুঝে চেন টেনে গাড়ি থামায়। ট্রেন থামলে এঁরা ট্রেনে উঠে এইভাবেই 'জল চুরি' করে। আর সেই জলেই কোনক্রমে আরও একদিন খরার সাথে লড়াই করে মরতে মরতে বেঁচে থাকে।"
পূর্ব মহারাষ্ট্রের লাতুর জেলায় প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি লিটার জল লাগে। কিন্তু জলের একমাত্র উৎস মানজার ড্যাম গত তিনমাস ধরে জলশূন্য। বিভিন্ন গাঁয়ের জমিদার আর সুদখোর মহাজনরা নিজেদের প্রয়োজনীয় জলটুকু বাঁচিয়ে কুয়ো গুলো চড়া দামে ভাড়া দিচ্ছেন প্রাইভেট কোম্পানিকে। নতুন লোগোর ঝাঁ চকচকে মোড়কে ১০০০ লিটার সেই জল বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকার বিনিময়ে। আসলে কারও সর্বনাশ হলে পরেই তো কারও পৌষ মাস হবে। তাই না? আর সুইজারল্যান্ডের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি নেসলে'র সিইও পিটার বার্বেক শুধু মুখেই বলেছিলেন "জল মানুষের মৌলিক অধিকার নয়। তাই জলের বেসরকারিকরণ হওয়া উচিত।" আমাদের লাতুর কিন্তু করে দেখাচ্ছে। সত্যি তো,  "मेरा देश बदल रहा है…आगे बढ़ रहा है"   
অবশ্য সবাই যদি বিদর্ভের দলিত শ্রমিক বাপুরাও তাজনের হতেন তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই যেতো। 'উচ্চবর্ণ'র দুয়ারে জল আনতে গিয়ে, অপমানিত, লাঞ্ছিত স্ত্রী'র চোখের জল মুছতে টানা ৪০ দিন, ৬ ঘণ্টার অক্লান্ত পরিশ্রমে তাজনে আস্ত একটা কুয়ো কেটেই তাঁর প্রেম প্রতিজ্ঞার তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। দলিত ঘরের সব  বৌ'দেরও 'স্বামী ভাগ্য'ও আবার তাজনের মত নয়। আর তাই থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন জানিয়েছে মহারাষ্ট্রের অনেক দলিত ঘরের বৌ'রা নাকি পানীয় জল জোগাড় করতে আজকাল বেশ্যা বৃত্তি'ও করছেন। 

এই মুহূর্তে খরা কবলিত দেশের ৩৩ কোটি মানুষ। অবশ্য এটা সেই সরকারী হিসেব যেটা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বীরেন্দ্র চৌধুরী সংসদে পেশ করার সময় লোকসভা কক্ষে উপস্থিত ছিলেন ১০০'রও কম 'মাননীয়' সাংসদ। বেসরকারি হিসেব বলছে দেশে খরা কবলিত মানুষের সংখ্যা অন্তত ৫৪ কোটি। অর্থাৎ প্রতি ৫ জনে ২ জন। দেশের ৯১টি জলাধারের সঞ্চয় আজ এই দশকের সর্বনিম্ন, মাত্র ২৯%।  সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার কে জানিয়েছে "২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে খরা কবলিত এলাকা সহ ১০০ দিনের কাজে বকেয়া মজুরি মোট ১২,০০০ কোটি টাকা। এটা কোন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নমুনা হতে পারে না।" সত্যি? পারে না? তবে যে শুনলাম শেষ ফিসক্যাল ইয়ারে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার নাকি 'দুনিয়া কাঁপানো' ৭.৯%? তাহলে কি দেশের এই শ্রী-বৃদ্ধি তে বকেয়া মজুরির হিসেব হয় না? টয়লেটের জলে রান্না-বান্নার 'পুষ্টি গুনের' হিসেব হয় না? লাতুরের গ্রামের মহাজন'দের জল ব্যবসার চড়া সুদের হিসেব হয় না? বাপুরাও তাজনের 'কান্না ঘাম রক্তের' হিসেব হয় না? দলিত বৌ'দের শরীরের দামের হিসেব হয় না? শুধু কি তাহলে সরকারের ২ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে 'পানাম স্ক্যাম' খ্যাত বিগ বি'র ভাড়া, ১০০০ কোটির কসমেটিক বিজ্ঞাপন আর প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ ভ্রমণেই দেশের জিডিপি'র পার ক্যাপিটা' তরতরিয়ে চড়কে চাপে?
বুন্দেলখন্ডের খরা কবলিত একটি প্রত্যন্ত গ্রামের গ্রামসভাতে, তৃষ্ণার্ত একটি গরুর মৃত্যু কাহিনীর বর্ণনা শেষে, ক্লাস ফোরের মেয়েটা চোস্ত হিন্দিতে বলল "और उसके बात बो तड़प, तड़प के मोर गई..." খোঁজখবর  নিয়ে দেখা গেল, সত্যিই,  বুন্দেলখন্ডের ১৩টি জেলার প্রায় ১১,০৬৫ গ্রামে, শুধু গত মে মাসেই, জলের অভাবে মৃত্যু হয়েছে যে ৩ লক্ষ গবাদি পশুর তার বেশির ভাগটাই গরু। কিন্তু দেখুন এই 'গো-হত্যা' নিয়ে সঙ্গীত সোম'দের কোন মাথা ব্যথা নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর গলায় 'পিঙ্ক রিভলিউশেনের' হম্বিতম্বি নেই। এই গরুরা বোধহয় 'গোমাতা' নয়। এই গরুর মাংস খেতে বোধহয় কোন আপত্তি থাকবে না। এই 'গোমাতা' আখলাখ'দের ফ্রিজে থাকলেও তাঁদের বোধহয় মরতে হবে না। কারণ সব গোমাতা তো আর রাজনৈতিক পশু হয় না। সব 'গোমাতা' তো আর বিধানসভায় ভোট দেয় না...

বুধবার, ৬ জুলাই, ২০১৬

দেশ ও শিক্ষা ~ সুশোভন পাত্র

আপনি আমিষাশী? মাছ-মাংস-ডিম খান? তাহলে প্রোটিনের জরুরী খাদ্যগুণে শরীর পুষ্ট হওয়া তো দূর, আপনার মিথ্যে বলার, লোক ঠকানোর, যৌন সুড়সুড়ি দেবার এমনকি মানুষ খুন করার প্রবণতাও বেশী -বলছে ক্লাস সিক্সের সি.বি.এস.সি'র টেক্সট বুক। মহারাষ্ট্রের বছর ১৪'র ছেলেমেয়েরা পড়ছে, 'হাউসওয়াইফ'রা গাধার মত। সারাদিন শুধু খেটে মরে। তবে একটু হলেও ভালো। অভাব অভিযোগ করে না, রাগ করে বাপের বাড়িও যায় না। ছত্তিসগড়ের 'সোশ্যাল সায়েন্স'র ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা শিখছে, দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কারণ মেয়েদের চাকরি করা। দিননাথ বাত্রার বইয়ে গুজরাটের স্কুল পড়ুয়ারা শুনছে, ড: রাধাকৃষ্ণন বলেছিলেন, ভগবান অজ্ঞনতা বশত প্রথমে যে কাঁচা রুটিটা উনুন থেকে বের করেছিলেন, সেটা থেকে জন্ম হয়েছিলো ব্রিটিশ'দের। অতি সাবধানতায় পরের পুড়িয়ে ফেলাটা থেকে জন্ম নিগ্রোদের, আর সবশেষে যেটা ঠিক সময়ে উনুন থেকে বেরিয়ে স্বাদে-গন্ধে-বর্ণে হল অতুলনীয়, সেটা আমরা, মানে 'ইন্ডিয়ান'রা। রাজস্থানের স্কুলে 'মহান সাধু-ঋষির' তালিকায় স্বামী বিবেকানন্দ, মাদার টেরেসা, গৌতম বুদ্ধ, গুরু নানকের পাশে সচিত্র সুশোভিত হচ্ছেন নাবালিকা ধর্ষণে অভিযুক্ত আশারাম বাপু।  
তবে এসবই কেতাদুরস্ত ইংলিশ মিডিয়ামের, ঝাঁ-চকচকে স্কুল বিল্ডিং'র চার দেওয়ালের রঙিন গল্প। দেশের সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থার হাঁড়ির হালটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট'ই। সর্বশেষ ASER'র রিপোর্টে দেশের ২১.৬% ক্লাস এইটের ছাত্রছাত্রী, ক্লাস টু'র টেক্সট বই'ই পড়তে পারে না। ১৫ বছরের ২৪.৫% স্কুলপড়ুয়ারা ১-১০ সংখ্যা চিনতে পারে না। ৫২.৫% ফাইভের ছাত্র সহজ ভাগের অঙ্ক কষতে পারে না। আর ৭৫.৫%, সামান্য বিয়োগ করতে পারে না।
ভারতবর্ষের প্রতিটি 'দায়িত্বশীল' সরকারই এই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি বদলাতে দেশবাসী কে রঙিন স্বপ্ন দেখিয়েছে। কমিশন বসেছে। মিটিং হয়েছে। সার্ভে করেছে। ভাষণে লাল কেল্লার রঙ্গমঞ্চ উপচে পড়েছে। কোঠারি কমিশনের রিপোর্টের কাঠখড় পুড়িয়ে, স্বাধীন ভারতের পার্লামেন্টে, ১৯৬৮'তে প্রথম ন্যাশনাল ইডুকেশন পলিসি পাশ করিয়ে, ইন্দিরা গান্ধী যেবার ১৪ বছর পর্যন্ত সকলের প্রাথমিক শিক্ষা সুনিশ্চিত করার গুরুদায়িত্বটা রাষ্ট্রের কাঁধে তুলে নিলেন, সেবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলো পাটলিপুত্র থেকে লোনাভেলা, মগধ থেকে ক্যাওড়াতলা। লোক মুখে প্রচার হল, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে "শিক্ষা হবে সার্বজনীন"। তারপর গঙ্গা দিয়ে বহু জল বয়ে গিয়ে, সোভিয়েতের পতন আর লগ্নী পুঁজির দাম্পত্যর মধুচন্দ্রিমার গর্ভজাত মুক্তবাজার অর্থনীতির ইনফ্যাচুয়েশেনের লুস-মোশেনে যখন ভেসে যাচ্ছে তাবড় সংবাদ মাধ্যমের দিস্তা-দিস্তা নিউজ প্রিন্ট, ঠিক তখন, ১৯৮৬-৯২'এ আমদানি হল দ্বিতীয় ন্যাশনাল ইডুকেশন পলিসি। প্রান্তিক মানুষের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার প্রকারান্তরে, বেসরকারি স্কুলে 'আর্থিক ভাবে দুর্বল' অংশের ২৫% সংরক্ষণের মাধ্যমে, শিক্ষা ক্ষেত্রে অভিষেক হল পি.পি.পি মডেলের। পরবর্তী সময় ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের চাপে আর 'লো-কস্ট পরিকাঠামো ও পরিষেবা' প্রদানের উদ্দেশ্যে 'প্যারা টিচারের' আমদানি এবং জনগণনা থেকে পোলিও, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ -দেশোদ্ধারের সমস্ত গুরু দায়িত্ব মাথায় চাপিয়ে দেওয়া স্থায়ী শিক্ষকদের নিয়োগের ব্যাপক ঘাটতিতে, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান যতই পড়েছে ছাত্রছাত্রী'দের মধ্যে ততই বেড়েছে স্কুল ছুটের আর বেসরকারি স্কুলে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রবণতা। শিক্ষা ক্ষেত্রেও লাক্ষণিক ভাবে প্রকট হয়েছে ধনী-গরিবের বৈষম্য। NSSO'র ৭১তম সার্ভের তথ্যানুসারে উচ্চশিক্ষায় ভারতবর্ষের ধনীতম ৫%'র ন্যাশনাল এটেন্ডেন্স রেশিও যেখানে ৫৯.৫% , দরিদ্রতম ৫% 'র সেখানে মাত্র ২০.৫% । আর তার মাত্র ৬%, আদিবাসী, দলিত, সংখ্যালঘু, কিম্বা মহিলা। যেখানে ইউনেস্কো রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের বৃহত্তম নিরক্ষরের বাস ভারতবর্ষে, সেখানে ২০২০'র মধ্যে ভারতবর্ষের ৫০% ছাত্রছাত্রী কে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের জন্যও নিজের ট্যাঁকের পয়সা খরচ করতে হবে বলে আশঙ্কা। শিক্ষা ব্যবস্থার উপর "কল্যাণকামী" রাষ্ট্রের 'সিস্টেমেটিক' বিমাতৃসুলভতার জন্যই স্বাধীনতার ৬৩ বছর পরও প্রয়োজন হয় RTE'র মত বজ্র আঁটুনির ফোস্কা গেরোর।
সদ্য অপসারিত সংসদীয় রাজনীতির শ্রেষ্ঠ 'মেলোড্রামাটিক' কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ৩০বছর পর আবার নতুন 'ন্যাশনাল ইডুকেশন পলিসি'র রণডঙ্কা বাজিয়েছেন। অবশ্য উনি তো সেই বিজেপি সরকারের প্রতিনিধি যারা প্রাথমিক শিক্ষাখাতে ১৩,৬৯৭ কোটি এবং উচ্চশিক্ষা খাতে ৩,৯০০ কোটি সরকারী বরাদ্দ হ্রাস করেছে। সেই 'আচ্ছে দিনের' সরকারে মন্ত্রী যারা ১৫%'র ছাড়া বাকিদের জন্য  ফেলোশিপ 'ডিসকন্টিনিউ' করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উনি সেই মুরলী মনোহর যোশীর যোগ্য উত্তরসূরি যিনি প্যারিসে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন "উচ্চশিক্ষা সমাজের কোন কাজেই লাগে না। তাই যার পয়সার জোর আছে সে পারলে পড়ুক।" উনি সেই ভারত সরকারে নিরবচ্ছিন্নতা যারা ২০০৫ 'ট্রেডেবেল কোমডিটি' হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থার অবারিত দ্বার WTO-GATS'র হাত ধরে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন বেসরকারিকরণের জন্য।বাজারে আজ 'শিক্ষা' বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। উচ্চশিক্ষার ৬৫%'ই আজ বেসরকারি। প্রাথমিক শিক্ষায় বিশ্বের গড় বেসরকারিকরণ যেখানে ১৪%, ভারতে সেখানে ২৫%। অ্যাসোচেমের তথ্যানুসারে, ভারতবর্ষের প্রতি বাবা-মা সঞ্চয়ের ৬৫% ব্যয় করতে বাধ্য হন সন্তানের শিক্ষা বা কেরিয়ারের পিছনে।
যে দেশে শিক্ষা এতো মহার্ঘ্য, যে দেশ জাতীয় আয়ের ৬% শিক্ষাখাতে খরচা করার ৫৮ বছরের পুরনো শর্ত এখনও পূরণে ব্যর্থ, যে দেশের হাইকোর্ট স্বাধীনতার প্রায় ৭০ বছর পর রায়দান করে বলে "সরকারও প্রশাসনের দুর্বলতা এবং ইন্ধনেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেড়েছে ধনী গরীবের বৈষম্য", যে দেশে মন্দির-মসজিদ-গির্জার মোট সংখ্যা স্কুল কলেজের থেকে ৯ লক্ষ বেশী, সে দেশের অঙ্গরাজ্যের টপারদের ত্রিভুজের চারটি বাহুর উপপাদ্য আবিস্কারই স্বাভাবিক, রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সাথে রান্নার হেঁশেলের যোগসূত্র খোঁজাই ভবিতব্য, সে দেশের কপালে ইয়ালে ইউনিভার্সিটির ফেক ডিগ্রির কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী'ই নসীব, মুসলিম মৌলবি'দের সানিয়া মির্জার পোশাকের ফতোয়াই শিরোধার্য, সমাজবাদী পার্টির মন্ত্রীর শিশু ধর্ষণের জন্য মোবাইল কে দায়ী করাই কাম্য, সে দেশের তো রামদেবই ভগবান, জাকির নায়েকই মসীহা, সে দেশের গো-মূত্রই পানীয়, সে দেশের গোবরে সোনা খোঁজাই বিজ্ঞান...

শুক্রবার, ১ জুলাই, ২০১৬

দ্য আদার... ‪#‎ইনবক্স‬ ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

ফেসবুকের "আদার" ইনবক্স একটি স্বর্ণ খনি বিশেষ। নারী মাত্রেই জানেন এর তাৎপর্য‍্য। কত কিসিমের যে লোক হয় এই নেট দুনিয়ায়, তা বোঝার এবং জানার সহজতম উপায় এই "আদার"। আপনি আদার ব্যাপারি হন বা জাহাজের কারবারী, আউট অভ দ্য বক্স ভাবনাচিন্তা কাকে বলে এই ইনবক্স তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।

এমনিতে সবাই জানে যে মেয়ে হওয়া এদেশে মোটামুটি একটা অপরাধের সামিল; এই মেয়েদের জন্যেই ধর্ষণের মতন একটা জঘন্য অপরাধ ঘটছে প্রতিনিয়ত; এই অসভ্য, হায়াহীন প্রজাতি কম কম জামাকাপড় পরে, সেজেগুজে দিনের বেলা তো বটেই এমনকি রাত্তিরবেলাতেও রাস্তায় ঘোরাফেরা করে পুরুষ কে প্রলুব্ধ করতে! কী সাংঘাতিক! শাড়ি-সালোয়ার প্রভৃতি সো-কল্ড ভদ্র পোষাকের বাবা-মেসো করে এরা জিন্‌স, হাপু, এমনকি গরম প্যান্ট পর্যন্ত অনায়াসে পরে ঘুরে বেড়ায়। এসব দেখে যদি পাঁচটা ছেলে একটু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে তাদের দোষ কোথায়? আর একথা ব্যাদে আছে যে ছেলেদের মন মেয়েদের মতন প্যাঁচালো নয়, হুঁ হুঁ বাওয়া, ওদের মনে যা, মুখেও তাই। তাই রাস্তায় এর'ম মেয়ে দেখে যদি মধ্যমা অটোমেটিক্যালি উঠে যায় বা চাট্টি রসের কথা মুখ থেকে বেরোয়- তাহলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়, বুঝিনা।

এত্তসব ট্র্যাফিক আইন হয়েছে, লাইট রে, পুলিশের প্যাট্রোল ভ্যান রে, ক্যমেরা রে, দাদুগীতি রে- আরে বস্‌, কয়েকটা ঝক্কাস দেখতে মেয়ে-পুলিশকে (ইয়েস, আগে মেয়ে, পরে পুলিশ, স্বাভাবিক নিয়মেই) ঝিঙ্কু ড্রেস পরিয়ে মোড়ে মোড়ে দাঁড় করিয়ে দাও, মার্সিডিজ টু রিক্সা , স-ও-ব দেখবে ঠিক জায়গামতন থামছে, চাখছে, যাচ্ছে। Total egalitarian concept- সব্বাই এক, আমরা সবাই রাজা… ইত্যাদি প্রভৃতি।

আচ্ছা, আচ্ছা, যা বলছিলাম… আসলে এই টপিক নিয়ে লিখতে বসলেই আমি একটু, ইয়ে মানে, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি আর কী। ক্ষমাঘেন্না করে দেবেন নিজগুণে…
যাইহোক, হচ্ছিল "আদার" ইনবক্স এর কথা। আমি একদিন এক সুন্দর, সুবাসিত সকালে একটি মেসেজ পেলাম, একজন ভীষণ উদ্গ্রীব হয়ে জানতে চেয়েছেন, আমি শুতে কত নিয়ে থাকি। এতে আমি যারপরনাই অবাক হয়ে রিপ্লাই দিয়েছিলাম যে আমি এমনিতেই ঘুমাতে ভালবাসি, তার জন্য কেউ কখনও টাকাপয়সা দেয়নি আমাকে। ওনার বাড়ির মহিলারা শোয়া বা ঘুমানোর জন্য চার্জ করেন বলে সবাইকে অমন ভাবা ঠিক না। এতে করে কেন জানিনা উনি ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে গেছিলেন। আরো দু-চারটে কথার পর আমাকে ব্লক করে দিলেন অথচ আমি বুঝতেই পারলাম না যে আমার দোষটা কোথায়!

তাছাড়া, প্রত্যেক মেয়েই কোন না কোন সময় মেসেজ পেয়ে থাকে যে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কেউ তাকে মডেল বানাতে চায় বা ফোটোশুট, বা নিদেনপক্ষে, কোন বিশেষ পোজে তার ছবি দেখতে চায়। সুদূর মরক্কো থেকে শুরু করে নিকারাগুয়া, পারস্য এমনকি মঙ্গল্গ্রহ থেকেও এমত অনুরোধ এলে কোন মেয়েই অবাক হয়না। হওয়ার কথাও নয়, আমরা তো জানি, "আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী" … কিন্তু ভুসুকু এও বলেছেন যে, "মূঢ়া হিঅহি ণ পইসঈ" অর্থাৎ গাড়লের মগজে এতসব ঢোকেনা, তাই অবাক হওয়া বাদ দিলেও মাঝে মাঝেই মেয়েরা এইসব নিয়ে চিল্লামিল্লি করে, মানে মেয়েদের তো বুদ্ধিশুদ্ধি টেন্ডস টু জিরো …তাই আর কী…। এসব ছাড়াও, আমি_শুধু_চেয়েছি_তোমায়, বল্গাহীন_ভালবাসা, বিছানায়_বক, Sexy_Stud, Eternal_erection, DiscoDick- এরা সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে খোঁজখবর নিয়ে থাকে, বিচিত্র বানানে "ভালবাষা" জানায়। Lyf roxxx!

তবু, এতকিছুর মধ্যেও ভরসার কথা এই যে, ইহজীবনে যত এরকম "হাম তো (মহা) পুরুষ হ্যায়, হাম ক্যা নেহি কর স্যকতা, সবকুছ জায়েজ হ্যায়" টাইপ ছেলে দেখেছি, তার দ্বিগুণ দেখেছি ঠিক মানুষের মতন পুরুষ। নিজের বাবা, দাদা,কাকা, স্বামী বা ছেলের কথা বাদ দিলেও বন্ধুস্থানীয় তাদের সংখ্যাটাও বড় কম নয়। এইসব নিয়েই তো জীবন, আমাদের জীবন; সবাই "ওম্মা, দ্যাখ কী ভাল, তকাই আমার" হবে, আয় তবে সহচরী গাইবে নেচে নেচে, তাই হয় নাকি? না হওয়া উচিৎ ।

বেঁচে থাক আমার নারীত্ব, আমার মেয়েলী সারল্য, আমার অকারণ হাসি, (পড়ুন ন্যাকামো) আমার চকিত সতর্কতা, আমার সঙ্গীর পায়ে-পা মিলিয়ে এগিয়ে চলার আনন্দ। সে পিছিয়ে পড়লে দাঁড়াব তার জন্য, কারণ আমি জানি সেও ঠিক তাই-ই করবে। পুনর্জন্ম আছে নাকি? কেউ জানেন? থাকলে, অগলে জনম মে মোহে বিটিয়া হি কিজো।


বুধবার, ২২ জুন, ২০১৬

দেশটা কাদের? ~ সুশোভন পাত্র

কিছুদিন আগেও একটা জোকস বাজার গরম করত। এক ভদ্রলোক এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে বসে প্লেন গুলোর ওঠা নামা দেখতে দেখতে আমেজ করে সিগারেট টানছেন। সেইসময় একজন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উপদেশ দিতে শুরু করলেন। "আপনি দিনে কটা সিগারেট খান? কত দামি সিগারেট খান? কতদিন ধরে সিগারেট খাচ্ছেন ?" -এইসব। তারপর একটা হিসেব কষিয়ে তিনি ধূমপায়ী কে বুঝিয়ে বললেন "আপনি যদি সিগারেট না কিনে, পয়সা গুলো জমাতেন, তাহলে আজ সামনের ঐ প্লেনটা আপনার হতে পারতো।" প্রত্যুত্তরে ঐ ধূমপায়ী তাঁকে জিজ্ঞেস করেন তিনি আদেও সিগারেট খান কিনা। নঞর্থক উত্তর পেয়ে  পরের প্রশ্ন করেন যে "তাহলে ঐ প্লেনটা কি আপনার ?" উপদেষ্টা ব্যক্তি বেশ বিব্রত হয়ে বলেন "অবশ্যই না।" তখন ধূমপায়ী একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে কিলার পাঞ্চটা দেন- "মাই নেম ইস বিজয় মালিয়া। অ্যান্ড দ্যাট প্লেন ইস মাইন।" মানে,আপনি যদি বিজয়া মালিয়ার মত ধনী এয়ারলাইন ব্যবসায়ী হন তাহলে লাউঞ্জে বসে সিগারেট টানার 'আইন অমান্য' আপনি করতেই পারেন। পয়সা থাকলেই আপনার সাতখুন মাফ। 

'কিং অফ গুড টাইমস' বিজয় মালিয়ার ৬০'তম বার্থডে সেলিব্রেশনে গোয়ার বিলাসবহুল ক্যান্ডোলিম ও সিংকুয়েরিম প্রাইভেট বিচের রাতের আকাশ যখন উদ্ভাসিত আলোক সজ্জার আতিশয্যে, ২ ঘণ্টার লাইভ কনসার্টর পর সোনু নিগমকে যখন প্রতিস্থাপিত করছেন স্পেন থেকে উড়ে আসা এনরিক ইগলেসিয়াস, শ্যাম্পেনের মাদকতা আর 'ব্যালেন্ডানো'র সুরে যখন অতিথিরা সম্মোহিত, ঠিক তখনই দেশজুড়ে বকেয়া মজুরি আদায়ের জন্য অনশনে কিংফিশার এয়ারলাইন্সের ক্রিউ মেম্বাররা। ঠিক তখনই দেশের ১৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে কিংফিশার এয়ারলাইন্সের বকেয়া ঋণের অঙ্ক ৯,০০০ কোটি। রঘুরাম রাজন বলেছিলেন "সিস্টেমের কাছে যার এতো ধার বাকি, জন্মদিনের পার্টিতে তাঁর এতো অপব্যয়র বিলাসিতা মানায় না।" নর্থ ব্লকের অনুগত আমলারা অবশ্য রাজন কে আলতো করে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন "কারও 'পারসোনাল' ব্যাপারে নাক না গলানোই ভালো।" কিন্তু কোদাল কে কোদাল বলার বদভ্যাস থেকেই কড়া জবাব দিয়েছিলেন রাজন- "যদি কেউ নিজে অনাদায়ী ব্যাংক ঋণের 'পারসোনাল' গ্যারেন্টার হন এবং বিপুল পরিমাণ ধার বকেয়া রাখেন তাহলে তাঁর 'পারসোনাল' লাইফে নাক তো গলাতেই হবে।" 

ক্রেডিট সুইসের তথ্যানুসারে দেশের ১০টি 'বিগ বিজনেস হাউস'র অনাদায়ী ঋণের মোট পরিমাণ ৭.৫ লক্ষ কোটি টাকা। ক্রেডিট রেটিং সংস্থার হিসেবে যার ৫০%'ই 'ডিফল্ট' এবং প্রয়োজনে সরকারের তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেই এই বিপুল বকেয়া ঋণ আদায় করতে পারে। কিন্তু বিজনেস হাউস নাম যখন এসার, ভেদান্ত, জিন্দাল, আম্বানি, আদানি -তখন দেশের সরকারের ঘাড়ে কটা মাথা যে এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে? ার নিলে নির্বাচনী প্রচারে "অবকি বার/মোদী সরকারের" তুমুল প্রচারের বিপুল টাকা কে ঢালবে? হবুমন্ত্রী আর গবুরাজা কে উড়ে বেড়াতে প্রাইভেট চপারই বা কে দেবে?
কিন্তু সরকার ও বিগ বিজনেস হাউসের আন্ডার টেবিল সমঝোতার গলার কাঁটা হলেন রাজন। সমস্ত ব্যাংক কে তিনি নির্দেশ দিলেন "অন্যায় সুবিধা না দিয়ে এই বিগ বিজনেস হাউস গুলির অনাদায়ী ঋণ দ্রুত আদায় করতে হবে।" ফলত ১৯৯৯-২০০০'র 'এশিয়ান ফাইনান্সিয়াল ক্রাইসিসের' সময়েও যে এসার গ্ৰুপ প্রায় 'ঋণখেলাপি' হয়েও ব্যাঙ্ক'র দয়ায় আর নেতা-মন্ত্রী'দের আনুগত্যে পার পেয়ে যাচ্ছিলো তারাও এবার নিজেদের সম্পত্তির কিছু অংশ বিক্রি করে বকেয়া ঋণ আংশিক মেটাতে বাধ্য হয়েছিল। 

৩১শে মার্চ কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রকের অধীনস্থ, 'ডাইরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স', তাদের এক 'জেনারেল এলার্টে' প্রায় ৫০টি কয়লা আমদানিকারী সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা 'স্টিম' কয়লার দাম সংস্থাগুলি বে-আইনি ভাবে বাড়িয়ে রেখেছে। যেখানে ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা কেনা, মালবাহী জাহাজের খরচ ও কাস্টম ডিউটি সহ কয়লার আমদানিকৃত দাম হয় উচিত ৩৩৫০ টাকা/মেট্রিক টন সেখানে এই সংস্থাগুলি বিভিন্ন স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ড ও কর্পোরেশন কে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে ৫৪৯৪/মেট্রিক টন হিসেবে। ফলে আপনাকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ'র জন্য বেশি দিতে হচ্ছে প্রায় ১টাকা ৫০পয়সা। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রীর তথ্যানুসারে আমরা যেখানে প্রতিবছর বিদেশ থেকে মোট ১লক্ষ ৫হাজার কোটি টাকার কয়লা আমদানি করি সেখানে এই দুর্নীতির পুঞ্জীভূত মোট অঙ্ক প্রায় ৫০, ০০০ কোটি। মুম্বাইয়ের ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আইন মন্ত্রকের জমা দেওয়া রিমান্ডে এই দুর্নীতিতে নাম আছে রিলায়েন্স, আদানি, জিন্দাল, এসার মত রাজনের চক্ষুশূল বিগ বিজনেস হাউসগুলিরই। তাই রঘুরাম রাজন কে চলে যেতে বাধ্য করা নিতান্তই রুটিন ওয়ার্ক, কিম্বা অর্থমন্ত্রীর সাথে 'লো ইন্টারেস্ট রেট' আর মুদ্রাস্ফীতির তু তু ম্যা ম্যা নয় বরং 'রিস্কলেস ক্রনি ক্যাপিটালিজমের' পথের কাঁটা সরাতে আস্ত একটা 'মোডাস অপারেন্ডি'।  ঐ যে বলে না, দেয়ার ইস অলওয়েজ অ্যা 'মেথড ইন ম্যাডনেস'। 

যে দেশে ঋণখেলাপি ললিত মোদিরা পায়ের উপর পা তুলে নিশ্চিন্তে লন্ডনে বসে থাকেন, যে দেশে বিজয় মালিয়ারা রাজ্যসভার সাংসদের পদ অলঙ্কৃত করেন, যে দেশে ওত্তাভিও কাত্রোচ্চিরা বোফোর্সের পরও কলার তুলে ঘুরে বেড়ান, যে দেশে ওয়ারেন অ্যাণ্ডারসেনরা ভোপালে নির্বিচারে মানুষ মেরে মন্ত্রীদের প্লেনে চেপে পালিয়ে গিয়ে আমেরিকায় নিশ্চিন্তে মরেন, সে দেশে রঘুরাম রাজনরা থাকতে পারেন না। সে দেশে সতেন্দ্র দুবেরা বাঁচতে পারে না। সে দেশে মুদ্রাস্ফীতি কমতে পারে না। সে দেশ ক্রনি ক্যাপিটালিজমের। সে দেশ সুব্রহ্মণ্যম স্বামীদের। সে দেশ হাম্বার। সে দেশের গোবরই ভিত্তি। সে দেশের ঘুঁটেই ভবিষ্যৎ...

শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০১৬

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ~ নগর যাযাবর



এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আলোচনার শুরুতে অবশ্যই কৃতিত্ব দিতে হবে বিজয়ী পক্ষকে | দীর্ঘদিনের শাসকদলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কারণে তৈরি হওয়া ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় আসা এক জিনিস আর পাঁচ বছর রাজ্য চালানোর পর পুনর্নির্বাচিত হওয়া আরেক জিনিস, কারণ এক্ষেত্রে বিচার হয় প্রধানত তার কাজের ভিত্তিতে, আর কারুর বিরুদ্ধে ক্ষোভের ভিত্তিতে নয় | সুতরাং তৃণমূলের এবারের জয় অবশ্যই হ্যাঁ-ভোটের ভিত্তিতে (সেই হ্যাঁ-ভোট যেভাবেই জোগাড় হয়ে থাকুক না কেন), এটা স্বীকার করেই কোনো আলোচনা শুরু করতে হবে |

নির্বাচন শুধু প্রার্থীদের পরীক্ষা নয়, রাজনৈতিক দলগুলির পরীক্ষা, এবং জনগণেরও পরীক্ষা |

প্রার্থীদের পরীক্ষার সাফল্য-অসাফল্য স্পষ্ট, ফলাফল বেরোয় তৎক্ষণাৎ, খুব একটা কিছু গন্ডগোল না হলে মেয়াদ পাঁচ বছর | বাকিদের ক্ষেত্রে হিসাবটা আরেকটু জটিল এবং বহুমুখী | সেখানে বর্তমানের সঙ্গে অনেক সময়েই মিশে থাকে অতীত ও ভবিষ্যৎ |  

যেমন ধরুন ভোটার অর্থাৎ জনসাধারণ | তাদেরও পরীক্ষা হয় নির্বাচনে | সেই পরীক্ষায় তাদের সরাসরি কোনো হারজিত হয়না, কিন্তু সেই সময়ের সমাজের একটি প্রতিচ্ছবি হিসাবে তাদের মতামত ইতিহাসে লেখা হয় | সেই ইতিহাসের ভিত্তিতে সময় সেই সমাজের, তার নৈতিকতার, মূল্যবোধের বিচার করে | বলাই বাহুল্য সেই বিচার স্বল্পমেয়াদী রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো তফাৎ করে না | যেমন ধরুন এই নির্বাচনের আগে ক্যামেরায় ধরা পড়ল শাসক দলের একগুচ্ছ শীর্ষ নেতা ঘুষ নিচ্ছেন, দাপুটে আঞ্চলিক নেতা থেকে ডাক্তার, অধ্যাপক | কিন্তু দেখা গেল এর ফলে জনগণ এটা মনে করেনি যে তৃণমূল দলটা এতটা অনৈতিক যে তাকে সরিয়ে দিতে হবে, বা তার জয়ের পরিমান কম করতে হবে | দেখা গেল যে বৃহত্তর জনগণ এটাও মনে করেনি যে ওই ঘুষখোর নেতারা ব্যক্তিগতভাবে এমন কোনো অনৈতিক কাজ করেছেন যে তার জন্য তাদের হারাতে হবে | সেরকম মনে করলে এমন ফলও হতে পারত যে তৃণমূল জিতল কিন্তু ওই নেতারা হারলেন | কিন্তু না, তা হয়নি | যে নেতা ঘুষ নিতে নিতে সগৌরব জানিয়েছিলেন যে তিনি এত কম টাকা ঘুষ নেন না ("ছুঁচ মেরে হাত গন্ধ" করেন না), তিনিও হাসতে হাসতে জিতেছেন | শহুরে লোকের কারুর কারুর একটু আত্মশ্লাঘা দেখা গিয়েছিল যে তাঁরা এসব অপছন্দ করেন, কিন্তু গ্রামের গরিব মানুষ এত কিছু বোঝে না, তাই এসব সত্ত্বেও তৃণমূল জিতবে | বাস্তবে দেখা গেছে, না, গ্রাম শহর কোথাও কোনো প্রভাব পরেনি, ঘুষখোররা সব জায়গাতেই জিতেছেন | এত যে কটু কথা হলো, এত যে ভয় দেখানো হলো, এই যে কার্টুন পাঠানোর জন্য অধ্যাপককে জেলে পাঠানো হলো, তার কোনো প্রভাব দেখা গেল ভোটে পড়ল না | দেখা গেল যে দু-টাকা কেজি চাল ও সাইকেল-দান প্রভাব ফেলল | আমরা এ-ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না, কারণ এটা আমাদের এই লেখার মূল বিষয় নয়, সাক্ষী হিসেবে এই-কথাগুলো লিপিবদ্ধ করলাম শুধু |

এ-ব্যাপারে আরেকটা কথাও বলা দরকার - এই যে মানুষ এই যে নৈতিকতার ভিত্তিতে ভোট দিল, এটা শুধু গত পাঁচ বছরের তৃণমূলের শাসনের ফসল নয়, কারণ এই ভোটাররা তাদের জীবনের বেশিরভাগ এবং দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন বামফ্রন্টের শাসনে | আর নৈতিকতা বা আদর্শ একদিনে তৈরি হয়না বা ভাঙ্গে না | এ-প্রসঙ্গে আমরা পরে ফিরব |

নির্বাচনের আরেক মূল অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলো | তাদের ক্ষেত্রে আবার চোখে যা দেখা যাচ্ছে, সাধারণত নির্বাচনের ফলের অভিঘাত হয় তার থেকে বেশি |

যেমন ধরুন এই নির্বাচনে বামফ্রন্ট ৩২-টি আসনে জিতেছে এবং বিজেপি ৩-টি মাত্র আসনে জিতেছে | মানে হবু বিধানসভায় বামফ্রন্টের শক্তি বিজেপির প্রায় দশগুণ | এটুকু হচ্ছে স্বল্পমেয়াদী হিসাব | তার সঙ্গে এটাও পরিষ্কার যে বামফ্রন্ট এখন এই রাজ্যে একটি ক্ষয়িষ্ণু শক্তি এবং বিজেপি বর্ধিষ্ণু শক্তি | প্রায় অর্ধেক শতক বাংলার একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ শক্তি থাকার পর, সাড়ে তিন-দশক দাপটের সঙ্গে রাজ্য শাসন করার পর, নিজেদের মতাদর্শে রাজ্যের মানুষকে অনুপ্রাণিত করার প্রচুর এবং দীর্ঘ সুযোগ পাওয়ার পর বামফ্রন্ট এখন এই রাজ্যে মাত্র এক-দশমাংশ আসনে জয়ী, ভোট মোটামোটি ২৫%, যার মানে প্রতি চারজনে তিনজন মানুষ বামফ্রন্ট-কে ভোট দেননি (এই হিসাবে কংগ্রেস-কে আসন ছাড়ার প্রভাব সামান্য)| অন্যদিকে, রাজ্যের দীর্ঘ ইতিহাসে যারা প্রায় অনুপস্থিত ছিল, সেই বিজেপি প্রায় সব আসনে ভোট বাড়িয়েছে, বহু আসনে ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে এবং শুধু শহরাঞ্চলে নয়, আরএসএস-এর ধীরে ধীরে বাড়ানো সংগঠনের ভিত্তিতে তারা এমনকি মাদারিহাট আসনটি জিতে নিয়েছে এবং কালচিনিতে মাত্র দেড়হাজার ভোটে হেরেছে | তৃণমূল বা কংগ্রেসের কি হবে জানিনা, তবে এই ধারা চলতে থাকলে পরের নির্বাচনের আগে রাজ্যে বিজেপি এবং বামফ্রন্টের পারস্পরিক পরিষদীয় অবস্থাটা উল্টে যেতে পারে | সুতরাং বামফ্রন্ট-বিজেপির ওই ৩২-৩-টা নিরেট সংখ্যার বাইরেও আরো অনেক কিছু নির্দেশ করে |

এইটুকু প্রাথমিক কথার ভিত্তিতেই আমরা ঢুকব আমাদের মূল আলোচ্য প্রশ্নে - কোন দিকে যাচ্ছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন?

এই নির্বাচনের ফলের ভিত্তিতে নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ও বাইরে বহু আলোচনা হবে | পার্টির আলোচনায় অবশ্যই বুথভিত্তিক খুঁটিনাটি আলোচিত হবে এবং আলোচিত হবে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের প্রভাব | সেসব আলোচনা অনেক হয়েছে, আরো হোক |

কিন্তু শুধু তার ভিত্তিতে সমস্যাটির মূলে পৌঁছনো যাবেনা, কারণ সমস্যাটি কৌশলগত নয়, আদর্শগত |

আমাদের মনে হয় কমিউনিস্ট শক্তির এই লাগাতার শক্তিক্ষয়ের কারণ মানুষ আর কমিউনিস্ট পার্টিকে কমিউনিস্ট পার্টি বলে চিনতে পারছেনা, বুঝতে পারছেনা অন্য অনেক দলের সঙ্গে তার আদর্শগত তফাতটা কোথায়, সোজা কথায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়োজনটা কী |

চিনতে পারছেনা কারণ এরা আর এখন কোনো আদর্শচালিত কর্মসূচী নেয়না বা স্লোগান দেয়না, দিলেও বোঝা যায়না | যেমন ধরুন এই নির্বাচনে এবং তার বেশ কিছুদিন আগে থেকে সিপিএম-এর পশ্চিমবঙ্গ-কেন্দ্রিক মূল স্লোগান ছিল দুটো - শিল্প করে কর্মসংস্থান করতে হবে আর রাজ্যে অপশাসনের অবসান চাই | এখন বড় পুঁজিপতিকে সুবিধা দিয়ে - কম পয়সায় জমি, কর-ছাড়, সুবিধাজনক শর্তে ঋণ, এমন কি সময় বিশেষে মুনাফার গ্যারান্টি - ডেকে এনে শিল্প করলে কিছু কর্মসংস্থান হবে, দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ হবে আর তার "সুফল" চুঁইয়ে পরে দেশের গরিব মানুষের কাছে পৌঁছবে, আর এই রাস্তায় পুঁজিপতি যত লাভ করবে তত তার ব্যবসা করার ইচ্ছা বাড়বে - প্রগতির এই ধারণা সম্পূর্ণ ধনতান্ত্রিক আদর্শের ধারণা, এই মডেলে উন্নতি করার জন্য কমিউনিস্ট পার্টিকে ভোট দেওয়ার দরকার নেই | বিজেপি-কংগ্রেস, এমন কি তৃণমূল, এই কাজ সম্ভবত আরো ভালোভাবে করবে, বহু ক্ষেত্রে বড় পুঁজিপতিরা এইসব পার্টির নেতৃত্বে আছে এবং তারা মনে প্রাণে এই তত্ত্ব বিশ্বাস করে |



দ্বিতীয় স্লোগান সুশাসন | এই দাবি সবাই করবে, এই মুহুর্তে বিশেষ করে করার দরকার, কিন্তু সুশাসনের জন্যও কমিউনিস্টদের ভোট দেওয়ার আলাদা করে দরকার নেই, পৃথিবীর উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলোতে চমৎকার সুশাসন আছে, আইন আইনের পথে চলে, কাজের জন্য কাউকে ঘুষ দিতে হয়না, ইত্যাদি |

তাহলে করণীয় কী? অদ্ভূতভাবে এই প্রশ্নটি গত কুড়ি বছরে এ-দেশের কমিউনিস্টদের কাছে জটিল এক ধাঁধা হয়ে উঠলো | পার্টি কংগ্রেসের পর পার্টি কংগ্রেস গেল, প্লেনাম গেল, কিছুতেই আর তার উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না! ক্রমশ তারা বুঝলো যে ধ্যান-ধারণায় "আধুনিক" হতে হবে | আর কমিউনিস্ট হিসাবে "আধুনিক" হওয়ার জাদুকাঠিটি খুঁজে না পাওয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির এক অদ্ভূত অবস্থা দাঁড়ালো - ভারতে সিপিএমের নেতারাসহ সম্ভবত একজনও বিশ্বাস করেনা যে সিপিএম সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য লড়ছে, বরং তাকে জঙ্গি আন্দোলনের নিরিখে যথেষ্ট নিরীহ একটি সংসদীয় দল বলে মনে হয়, কিন্তু পার্টি সশস্ত্র বিপ্লবের কথা তার কর্মসূচী থেকে সম্পূর্ণ মুছে দেয়নি | "সর্বহারার একনায়কতন্ত্র" প্রতিষ্ঠা করার কোনো ইচ্ছা বা সেদিকে কোনো ভূমিকা চোখে পরছেনা, বরং অন্য অনেক "গণতান্ত্রিক" দলের থেকে সিপিএম অনেক বেশি সংসদীয়ভাবে গণতান্ত্রিক, তবু ওই কথাটি কর্মসূচীতে আছে | "জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব" বা "সর্বহারার একনায়কতন্ত্র" আছে কমিউনিস্ট পার্টি হিসাবে, যদিও মানুষ বহুদূর পর্যন্ত দলের কাজে তার কোনো ব্যবহারিক প্রভাব দেখছেনা | আর সামনে দেখছে রাস্তায় নেমে আন্দোলনবিমুখ একটি দল পুঁজিপতিদের ডেকে এনে কর্মসংস্থান করে দেশের উন্নতি করতে চাইছে ! হিসেবগুলো মিলছেনা কমরেড, মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে, ভাবছে এরা ঠিক কোন পার্টি, ঠিক কাদের প্রতিনিধিত্ব করছে | আর যা হওয়ার তাই হচ্ছে, শুধু সংসদীয় বিচারে নয়, সবদিক থেকে ক্রমহ্রাসমান হয়ে যাচ্ছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন | হিসেব মিলছে শুধু শাসক শ্রেণী ও তাদের প্রতিনিধি মিডিয়ার, যারা চায় কমিউনিস্ট আন্দোলন হয় আক্ষরিক অর্থে বা অন্তত আদর্শগতভাবে মুছে যাক |

 

তাহলে উপায় কী? করণীয় কী?

উপায় একটাই | আদর্শের মূল ভিত্তিকে ধরে থাকা এবং আদর্শচালিত আন্দোলন করা |

দু-দশক আগে যখন কলেজে ঢুকেছিলাম, শুনেছিলাম যে দর্শন জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবেনা, মাঠে নেমে পড়তে হবে, বাকি দর্শন কাজ করতে করতে শিখতে হবে | কথাটা অংশত ঠিক, যতক্ষণ পর্যন্ত দর্শনের মূল ভিত্তি নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে | যদি সংশয় তৈরি হয়, তাহলে দর্শনের পুনঃপাঠের প্রয়োজন, যাকে ইংরিজিতে বলে "ব্যাক টু দ্য ড্রয়িং বোর্ড" | কমিউনিস্ট পার্টির মূল আদর্শ শ্রেণীসংগ্রাম | যখন থেকে মানুষ শ্রমের উদ্বৃত্ত তৈরি করতে সক্ষম হলো, মানে শুধুমাত্র জীবনধারণের উপকরণ সংগ্রহ করতে আর সারাদিন ব্যয় করতে হলো না, তখন থেকেই সেই উদ্বৃত্ত শ্রমের সাহায্যে সম্পদ তৈরি হতে শুরু করলো | সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যাপক জনসাধারণের উদ্বৃত্ত শ্রমের ভিত্তিতে তৈরি সম্পদ ভোগ করেছে ছোট একটা শ্রেণী | সে রাজা হোক, জমিদার হোক বা পুঁজিপতি হোক | যত উদ্বৃত্ত, তত লাভ | সুতরাং যুদ্ধ, সুতরাং দাসত্ব, সুতরাং লেঠেল | কিন্তু সম্পদের এই গভীর বৈষম্য ও এই শ্রেণীবিভাজন বহু কারণে (সেগুলো এখানে আলোচনা করার প্রয়োজন বা পরিসর নেই) শোষিত শ্রেনীর জন্য শুধু নয়, সভ্যতার অগ্রগতির জন্য ভালো নয় | সুতরাং শ্রেণীহীন (বা অন্তত শ্রেণীগুলির মধ্যে ব্যাপক বৈষম্যহীন) সমাজের লক্ষ্যে শোষিত-নিপীড়িত শ্রেণীকে শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করতে হয়, আর তার সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেবে তার পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি | এই সামান্য কথাটুকুই মার্কসবাদী দর্শনের মূল কথা যা মার্কস একা নন, আরো অনেক দার্শনিকের দর্শনের ভিত্তিতে তৈরি ও সমৃদ্ধ | এই মূল কথার ব্যাপারে কোনো দ্বিধা থাকলে, পার্টির আন্দোলনে-কর্মসূচিতে এ-ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অস্পষ্টতা থাকলে কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, বারবার হলে কমিউনিস্ট আন্দোলন গুরুত্ত্ব হারায় |

এই মূল বক্তব্যে আধুনিক হওয়ার কিছু নেই | আধুনিক হওয়ার প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার প্রয়োজন প্রয়োগে, কৌশলে | সিপিএম যে জঙ্গলে গিয়ে বোমা তৈরি করার বদলে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে অংশ নিয়ে কাজ করছে, এটা প্রয়োজনীয় আধুনিকতা | আমাদের দেশের সংবিধান ও আইন যা সুযোগ দিয়েছে, তার মধ্যে থেকেই শোষিত শ্রেণীর আন্দোলনকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, মার্ক্সের সময় বা বলশেভিক বিপ্লবের সময় পরিস্থিতি আলাদা ছিল | সশস্ত্র বিপ্লবের বদলে শান্তিপূর্ণ পথে এগোনো প্রয়োজন, একদলীয় শাসনের বদলে বহুদলীয় শাসনের দিকে যাওয়া প্রয়োজন, কারণ শেষ কথা কেউ বলতে পারে না | কিন্তু আধুনিকতার স্বার্থে শ্রেণীসংগ্রাম পিছনে পরে গেলে কমিউনিস্ট পার্টি ও আন্দোলনের আর কিছু থাকেনা |

পাশাপাশি একবার দেখুন বাস্তবটা | মেহনতি মানুষের তৈরি বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র অংশের হাতে | ২০০৭ সালে ভারতের জনসংখ্যার ৭৫% মানুষের দৈনিক আয় ছিল ২০ টাকার কম (ভারত সরকার-নিযুক্ত অর্জুন সেনগুপ্ত কমিটি রিপোর্ট), যে একই সময় ভারতের বিখ্যাত পুঁজিপতির ছেলে বিখ্যাত পুঁজিপতি মুম্বইতে ৬৫০০ কোটি টাকা দিয়ে নিজের বাড়িটি বানালেন! ২০১৩ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট বলছে যে পৃথিবীর পঞ্চাশ শতাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত এক শতাংশ মানুষের হাতে, পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের সম্পদের পরিমাণ ধনীতম ৮৫-জন মানুষের সম্পদের সমান | শোষিত শ্রেণীর অবস্থার হয়ত সামান্য উন্নতি হয়েছে, অন্যদিকে ধনীতমরা ধনী হয়েছে আরো অনেক বেশি | শুধুমাত্র কোন পরিবারে জন্ম এই হাতে-না-থাকা ঘটনাটির ভিত্তিতে আকাশ-পাতাল তফাৎ হয়ে যাচ্ছে একটি শিশুর শৈশবে, তার পাওয়া সুযোগে, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, বাসস্থানে | ঠিক কোন যুক্তিতে বুদ্ধিতে নৈতিকতায় এই ব্যবস্থাটা ঠিক সেটা বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু এই প্রাচীন লুঠতরাজের ব্যবস্থার প্রতি সমর্থনে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে শাসকশ্রেণী ও তাদের তাঁবেদার ও সুবিধাভোগী সংসদ, মিডিয়া | এই ব্যবস্থা অতি প্রাচীন, তাকেই আঁকড়ে আছে শাসকশ্রেণী, কারণ তারা এর সুবিধাভোগী | তারা দখল করতে চায় সমস্ত কিছু | তাই ২০০৯-এর ভারতের সংসদীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের সম্পত্তির হিসাবে দেখা যায় যে বামপন্থীরা ছাড়া আর প্রায় সব দলের বেশিরভাগ প্রার্থী কোটিপতি | সামাজিক ও আদর্শগত প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে অনেক তফাৎ থাকা সত্ত্বেও শ্রেণীগত প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সবাই সমান - কংগ্রেস বিজেপি বিএসপি এডিয়েমকে ডিএমকে বিজেডি, ইত্যাদি | সোজা কথায় সংসদটা ভারতের ধনীতমদের |

আর এই ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে ক্রমশ বাড়ছে পণ্য ও তার প্রতি আকর্ষণ, পৃথিবী ভরে উঠছে জিনিসে | আর এইসব জিনিস তৈরির মাশুল দিচ্ছে প্রকৃতি, আমাদের বাতাস ও জল ভরে উঠছে বিষে, আমাদের সমুদ্র ভরে উঠছে বর্জ্যে | মানুষ ক্রমশ আরো দূরে চলে যাচ্ছে তার শ্রমের থেকে, আমরা বেশিরভাগ মানুষ সারাদিন যা ব্যবহার করি, তার কিছুই নিজেরা তৈরি করিনা, যা তৈরি করি, তা ব্যবহার করিনা!

আর হচ্ছে অবৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রসার - জ্যোতিষী, আংটি, মাদুলি, লাল-সুতো, নতুন নতুন পুজো | খবরের কাগজের পাতা আর টিভি চ্যানেলের পর্দা ভরে উঠছে এদের বিজ্ঞাপনে, সমাজের গণ্যমান্যেরা হাসিমুখে পুজোর উদ্বোধন করে বেড়াচ্ছেন | সেই যে অদৃষ্টের ভয়টা সভ্যতার শুরু থেকে দেখানো শুরু হয়েছিল, রাজাই "দেবতা" হয়ে উঠেছিল বহুক্ষেত্রে, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে |

এইটুকু বলতে হলো এই কারণে যে শ্রেণীসংগ্রামের কারণ বিন্দুমাত্র কমেনি, বেড়েছে; মানুষের পণ্য-ব্যাকুলতা কমেনি, বেড়েছে, শ্রমের থেকে দুরত্ব কমেনি, বেড়েছে, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস কমেনি, বেড়েছে | কিন্তু কোনো এক রহস্যময় কারণে ভারতীয় কমিউনিস্টদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ভাবনার অস্পষ্টতা | তাই একমাত্র স্লোগান হয়ে দাঁড়াচ্ছে যে বড় পুঁজিপতিকে ডেকে শিল্প করতে হবে, যদিও ন্যুনতম মজুরির দাবিতে, পুঁজিপতিদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার বিরুদ্ধে, শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে, পড়াশোনায় সমান সুযোগের দাবিতে, পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে, লাগামহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে, কৃষিতে সমবায় আন্দোলনে, কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নতির লক্ষ্যে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কোনো বড় আন্দোলন দেখা যাচ্ছেনা | যদিও সিপিএম এখনো পৃথিবীর বৃহত্তম কমিউনিস্ট পার্টিগুলির একটি যার ডাকে আজও সহজেই এক লক্ষ লোক জড়ো হতে পারে |

বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন একটি বড় শিল্প একজন বড় পুঁজিপতিকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে করতে হতেই পারে, কিন্তু সেটা সময়ের বাধ্যতা, কমিউনিস্ট পার্টির উন্নতির মূল মডেল হতে পারেনা | অর্থাৎ সেটাই প্রধান স্লোগান হতে পারেনা, আরো পাঁচটা আন্দোলনে কমিউনিস্ট আদর্শের ভিত্তি স্থাপিত থাকলে এটা কোন বড় কথা নয়, মানুষের মনে কোন বিভ্রান্তিও তৈরি হবেনা |

দ্বিতীয়ত দরকার বড় আন্দোলন, যেটা দেখা যাবে, যার দ্বারা বিপুল মানুষ অনুপ্রাণিত হবে, এমন কি পার্টির সমর্থকদের বাইরের একটা অংশও | নিবিড় জনসংযোগ ও স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আন্দোলন জরুরি, কিন্তু সেটা বড় আইকনিক আন্দোলনের বিকল্প নয় | গত বহু বছরে ভারতে সংসদের বাইরে যে চোখে পরার মত আন্দোলন বা কর্মসূচী হয়েছে, অদ্ভুতভাবে তার একটাও বামপন্থীদের নয়! অযোধ্যায় কড়া কট্টরপন্থী ও ধ্বংসাত্মক "করসেবা", যার দ্বারা বিজেপি তার আকর্ষণকে একটা বৃহত্তর জনগোষ্টির কাছে পৌঁছে দিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাস্তা আটকে বসে থাকা, যা জমি অধিগ্রহণকে প্রশাসনিক বিষয় থেকে (যেমন বামফ্রন্ট সরকার চেয়েছিল) একটা সামাজিক এবং বড় রাজনৈতিক বিষয়ে উন্নীত করলো, মেধা পাটকারের "নর্মদা বাঁচাও" আন্দোলন যা বড় ড্যাম তৈরির (এবং সাধারণভাবে বড় "উন্নয়নমূলক" প্রকল্পের) সামাজিক ও পরিবেশগত কু-প্রভাব সম্পর্কে দেশবাসীকে অবহিত করলো, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার অঙ্গীকার এবং দিল্লি-কাঁপানো আন্দোলন, যার ভিত্তিতে রাজনীতিতে আনকোরা কিছু লোক নিয়ে আম আদমি পার্টি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দিল্লিতে বিজেপি-কংগ্রেসকে ধরাশায়ী করল - এগুলো বড় চোখে পরার মত আন্দোলন বা কর্মসূচী, যার প্রভাব তার স্থান-কাল-কে অতিক্রম করতে পারে | এই আন্দোলনগুলো দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন এবং অনেকাংশে পরস্পরবিরোধী শক্তি বা ব্যক্তিরা করেছে, কিন্তু এই তালিকায় কমিউনিস্ট পার্টির কোনো আন্দোলন দেখা যাচ্ছেনা! চরম দক্ষিণপন্থী শক্তি থেকে এনজিও - সবাই তাদের আদর্শ ও ইস্যু নিয়ে বাজার কাঁপিয়ে দিল, শুধু যাদের "বিপ্লব" করার কথা ছিল তারা চুপচাপ! এই আন্দোলনগুলোর কোনটা সমর্থনযোগ্য, কোনটা ক্ষতিকর, কোনটা ক্ষণস্থায়ী, সে ব্যাপারে আমরা কিছু বলছিনা, কিন্তু বড় আন্দোলনের প্রত্যক্ষ এবং ব্যাপক প্রভাব এরা প্রমাণ করে | টিভির তর্কে অংশ নেওয়া, বিধানসভার উঠোনে স্লোগান দেওয়া আর রাজ্যপালকে স্মারকলিপি দেওয়ারও হয়ত প্রয়োজন আছে, কিন্তু এর কোনটাই আবেগ ও আদর্শচালিত বড় আন্দোলনের বিকল্প নয় |

আর তৃতীয় মূল প্রয়োজন রাজনৈতিক দর্শনের ক্রমাগত ও প্রাণবন্ত চর্চা | যে নৈতিকতার কথা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, সেখানে একটু ফিরতে হয় | সাড়ে তিন দশক যে রাজ্যে কমিউনিস্ট পার্টি সরকার চালালো, তার বাসিন্দারা পাহাড়প্রমান দুর্নীতি চোখে দেখতে পেয়েও তার দ্বারা বিচলিত হচ্ছেনা, তোয়ালে জড়িয়ে ঘুষ নেওয়াকে আদৌ কোনো অনৈতিক কাজ বলে ভাবা হচ্ছেনা, অথবা তাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা এতই খারাপ যে এসব দেখেও কিছু ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার জন্য জনগণ ওই দুর্নীতিবাজদেরই ভোট দিচ্ছে, এর কোনটাই রাজ্যের মানুষের চেতনাকে কোনো উজ্জ্বল আলোয় দেখায় না | এর একটা বড় দায়িত্ব অবশ্যই কমিউনিস্ট পার্টিকে নিতে হয় | আগে লোকে অন্তত কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্মীদের দেখে বলত যে লোকগুলো আর যাই হোক, আদর্শবান, সৎ, সাহসী এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের পেছনে ছুটছে না | এখন আর এ-কথা কজনের সম্পর্কে বলা যায় নিশ্চিত নই, তবে জনমানসে সেই উঁচু আসনটি যে আর নেই তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় | কজন পার্টি-সদস্য নিশ্চিতভাবে জানেন যে এই মুহুর্তে ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুত্ত্ব কোথায় এবং মূল কাজ কী, এ নিয়ে সন্দেহ আছে | তাই প্রতিদিনের মিটিং, কর্মসূচী, মেম্বারশিপের হিসেবের পাশাপাশি দরকার দর্শন ও রাজনীতির নিবিড় চর্চা, আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক | সেই আলোচনা এবার এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করলে সুবিধা হবে কিনা, তার থেকে একটা ওপরের স্তরের হওয়া দরকার | এই আলোচনা শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি বা রাজ্য কমিটি স্তরে হলে চলবেনা, শাখা স্তরে হতে হবে | জেলায় জেলায় নিয়মিত তাত্ত্বিক ওয়ার্কশপ হওয়া দরকার শাখা থেকে রাজ্য স্তরের সদস্যদের মধ্যে | সময় নেই বললে চলবেনা, এটাই এখন মূল কাজ |

প্রাক-স্বাধীনতা যুগ থেকেই ভারতের মানুষ, সমাজ ও রাজনীতির জন্য অসামান্য অবদান রেখেছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন | সংসদীয় বৃত্তের মধ্যে (ভূমি সংস্কার, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ) এবং তার থেকেও গুরুত্ত্বপুর্ণভাবে, সংসদীয় বৃত্তের বাইরে (নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সওয়াল করতে, তাকে জোটবদ্ধ করতে, অধিকারের দাবি জানাতে, প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক এবং অবৈজ্ঞানিক রীতিনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে, তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে, বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের ধারণাকে তুলে ধরতে) ক্রমাগত বিশ্বস্ত ভূমিকা নিয়ে গেছে কমিউনিস্ট পার্টি, ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও | এখন দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থানের সময় তাই আরো বেশি করে প্রয়োজন বামপন্থী আদর্শের শক্তিশালী হওয়ার | আদর্শ, আবেগ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়েই প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে কমিউনিস্ট আন্দোলন, রাস্তা বেরোবে | মনে রাখতে হবে শাসক শ্রেণী কমিউনিস্ট পার্টিকে ভয় পায়, মানুষের সংঘবদ্ধতাকে ভয় পায় | ভয় পায় পার্টির বর্তমান শক্তির জন্য নয়, আদর্শের শক্তির জন্য | আর ভয় পায় বলেই তাকে বারবার "বস্তাপচা তত্ত্ব" বলতে চায় | সত্যিই কোনো তত্ত্ব বস্তাপচা হলে বা তা ভূল প্রমাণিত হলে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না |

(লেখক ৯০এর দশকে যাদবপুরে ইঞ্জীনিয়ারিং পড়ার সময় থেকে বাম আন্দোলনের সাথে যুক্ত, বর্তমানে একটি সফটওয়্যার কম্পানিতে কর্মরত)

মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০১৬

সাতশো কোটি টাকা জরিমানা ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী কেজরিবালের ওপর কিছু জনতার ব্যাপক ক্ষার , কারো মতে মালটা বদ্ধ উন্মাদ,যখন যা মনে আসে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, পপুলার পলিটিক্স করে ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই যে কিছুদিন আগে জোড় বিজোড় গাড়ি চালানোর বিধান দিলেন দিল্লীতে, সে পনেরো পনেরো তিরিশ দিন লোকের কি গুসসা হল, বহুত পরিশানি হল। পলুসন তো কিচ্ছু কম হল না বেকার বেকার মানুষের কষ্ট।
সম্প্রতি উনি নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ পরিষেবা দেয় যারা তারা কোন ব্রেকডাউন বা ফল্ট সারাই করতে নির্দিষ্ট সময়ের বেশী সময় নিলে গ্রাহককে পরের বিলে ছাড় বা ডিসকাউন্ট দিতে হবে। কি আবদার বলুন তো দেখি, এসব করলে তো ব্যাবসা লাটে উঠবে, লাভের গুড় পিঁপড়েতে খাবে।কিন্তু পরিষেবা দানকারী কোম্পানিই বা কি করে, মেনে তো নিতেই হবে। ব্যাবসা তো আর হিমালয়ে কি মরুভূমিতে করা সম্ভব নয়।

দু একদিন আগে আবার কামান দেগেছেন, এবার দিল্লীর কিছু বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে। বেসরকারি হাসপাতাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে সরকার অনেক কম মুল্যে জমি দেয়, এটা সব রাজ্যেই পরিকাঠামো উন্নয়নে সাহায্য করে আর সাথে সাথে কিছু শর্ত দিয়ে দেয় সরকার, যেমন হাসপাতালে ফিছু ফ্রি বেড রাখতে হবে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার জন্য কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিছু সিট অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল মানুষের পড়াশুনার জন্য। সে নিয়ম তো অনেক আছে তা আর মানে কে? ভাবুন এক পাঁচতারা হাসপাতালে বিশাল মন্ত্রী, নেতা,শিল্পপতির চিকিৎসা চলছে আর তার পাশাপাশি এক রিকশাওয়ালা বিনি পয়সায় একই চিকিৎসার সুযোগ নিচ্ছে, এটা হয় কখনো, কিংবা আপনার আমার ছেলেমেয়ের সাথে ডিপিএস এ পড়ছে আমার বাড়ির কাজের মেয়েটির ছেলে! মেনে নেওয়া যায়। এমনিতে ট্যাক্স দিয়ে দিয়ে আমাদের পকেট খালি তাপ্পর এইসব।

হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই পরশু সেই পাগল মুখ্যমন্ত্রী দিল্লীর পাঁচ বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে সাতশো কোটি টাকা জরিমানা করেছেন, এই টাকা জমা করতে হবে ৯ই জুলাইয়ের মধ্যে কারন জমি নেবার সর্ত অনুসারে তাঁদের দরিদ্র্য মানুষের জন্য যে সেবা বিনামূল্যে দেবার কথা ছিল টা তাঁরা দেন নি।এই তালিকায় আছে ফরটিস এস্করটস হার্ট ইন্সিটিউট, ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি (সাকেত), শান্তি মুকুন্দ হাসপাতাল, ধরমশিলা ক্যান্সার হাসপাতাল, পুষ্পবতী সিঙ্ঘানিয়া হাসপাতাল। 

বড়লোকের কোর্ট আছে তাই হাসপাতাল সকল আদালতে যাবে শুনালি হবে, রায় বেরোবে, তারপর সুপ্রিম কোর্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। হয়তো প্রমান হবে ওই হাসপাতালগুলো নিয়ম মেনে দরিদ্র সেবা করেছেন ( দেখেছেন নাকি আপনারা এমন কাউকে)। 

তা এহেন মানুষকে লোকে ফাগল বলবে না তো কি করবে, মুখ্যমন্ত্রী তায় আবার রাজধানী শহরের অন্য কত কাজ থাকে যেমন ফ্লাইওভার বানানো, রাস্তা মেরামত করা,ফুলের গাছ লাগানো, হাসি হাসি মুখে নানা অনুষ্ঠানে ফিতে কাটা সেসব নয় পড়েছে প্রধানমন্ত্রীর সার্টিফিকেট ভেরিফাই করতে, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ কোম্পানির যথেচ্ছাচারের মুখে লাগাম পরাতে।

তা কলকাতার বাইপাসের দুপাশ ধরে লাইন দিয়ে যে হাসপাতাল তাঁদেরকেও সরকার ন্যুনতম মুল্যে জমি টমি দিয়েছিল শুনেছি( সে অবশ্য বামফ্রন্ট আমলে) আর এসব শর্তও লেখা আছে তাতে। দান বাম কোন সরকার কিছু করেছে বলে শুনিনি। এএমআরআই তে আগুন লাগার ঘটনায় কারো শাস্তি হয়েছে বলে শুনিনি, অবশ্য দিদি বিমানবাবুর হাত ধরে বলেছিলেন সব্বার নাকি শাস্তি হবে!!

কেজরিবালের এই সব কাণ্ড কারখানা দেখে বিজেপি তো রেগে আগুন, এই সব টাকা সরকার নাকি বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যাবহার করবে তার পর ব্যাবসায়ীদের অধিকারে হস্তক্ষেপ, কি কাণ্ড।
আপনি কি বলেন?

সোমবার, ৬ জুন, ২০১৬

সংখ্যালঘু ~ মাহফুজ আলম

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন যে 'রমজান' মাসে রেশনে রমজান স্পেশাল প্যাকেট দেওয়া হবে।সংবাদ মাধ্যম অনুযায়ী, প্যাকেটে চাল, ময়দা, তেল, খেজুর, ছোলা এবং চিনি থাকার কথা l সংখ্যালঘু মুসলিম মানুষদের সুবিধার জন্যই এই ব্যবস্থা l তবে, শুধু সংখ্যালঘুরাই নন, চাইলে সবাই রেশন থেকে ওই প্যাকেট তুলতে পারবেন l

বেশ ধেই ধেই করে লাফাবার মতন খবর, মোহন বাগান লিগ জিতলে যেরম হয় আর কি। গোটা রোজার মাস ধরে মুসলিম ভাই-বোনেরা 'রমজান' স্পেশাল প্যাকেট পাবেন। যে গরিব মুসলিম রিকশাওলা যে ধর্ম মেনে রোজা রাখে কিন্তু অভাবে পর্যাপ্ত ইফতারি জোটেনা, তার তো ভালো হবেই।

প্লাস, নিন্দুকেরা যদি 'মোছলমান পীরিতি' খোঁজে, তার জন্যে এটাও জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে চাইলে অমুসলিমরাও এই স্পেশাল প্যাকেট পাবে।

এই হ্যাপি এন্ডিং মার্কা গপ্পের শেষে কিছু কোশ্চেন থাকছে।

সংবিধান অনুসারে ধর্মীয় সংখ্যালঘু বলতে খালি মুসলমান বোঝায় না। বৌদ্ধ, জৈন , পারসিক, খ্রীস্টান সব্বাই সংখ্যালঘু। এদের ধর্মেও একমাস টানা না হলেও উপোস ব্যাপারটা রয়েছে।

তা, দিদিমণি এদের উপোসের সময় স্পেশাল প্যাকেট দেবেন না?

সংখ্যাগুরু হিন্দুদের মধ্যেও অনেকে নানাসময় নানাকারণে উপোস করে থাকেন। তারাই বা নিজেদের সময় এ সুবিধে থেকে বঞ্চিত হবেন ক্যানো?

তাহলে কি এই 'রমজান' প্যাকেট এর আসল উদ্দেশ্য নিতান্তই রাজনৈতিক? নিজেকে মুসলিম-প্রেমী বলে প্রমাণ করা?

সন্দেহ নেই, যে এই কাজে 'তিনি' বেশ সফল। জমিয়তও এখন বকলমে তৃণমূলের সমর্থক। তাদের সিদ্দিকুল্লা মন্ত্রীত্ব পেলেন, মৌলানারা ইমাম ভাতা পেলেন, বাকিরা মাদ্রাসা অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি পেলেন, আর গরিব মুসলমান পেলেন 'রমজান' স্পেশাল প্যাকেট।

অতএব 'তিনি'ই বর্তমানে বাংলার মুসলমানেদের জান-মালের রক্ষাকর্তা, তাদের পরবরিশ করনে-ওয়ালা এবং খুদ-খেয়াল-মর্জি'র মালিক।

ব্যাস? গপ্পো শেষ?

দাঁড়ান সার, এট্টু খানি বাকি আছে।

আমি বা আপনি চাই বা না চাই, আমাদের এই রাজ্য এখন জামাত আর আরএসএস
এর পরীক্ষাগার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা নিজেদের স্বার্থেই চাইছে যে হিন্দু ভোট আর মুসলমান ভোট এর মেরুকরণ হোক, যাতে তারা শক্তিশালী হয়ে বিষাক্ত ছোবল মারতে পারে।

এরা খুব সন্তর্পণে এগোচ্ছে। ধর্মের মাধ্যমে কাছে টানা, মগজ-ধোলাই আর অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিষ ঢালা-এটাই এদের কাজ। আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই। এই ফেবুতেই জামাত আর আরএসএস এর পেজগুলো দেখবেন সময় করে। দেখতে পাবেন অর্ধ-শিক্ষিত লোকেরা কিভাবে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে, যাতে দাঙ্গা লাগে আর এদের শক্তি বাড়ে। যেকোনো রকম সংঘর্ষের ঘটনাকেই সাম্প্রদায়িক রূপ দেবার চেষ্টা চলছে।

শহর আর শহরতলি'র লোকেরা খেয়াল করে দেখবেন যে ধীরে ধীরে হিন্দু আর মুসলমান বসত আলাদা হচ্ছে। ধর্মের ভিত্তিতে ফ্ল্যাট বিক্রি হওয়া শুরু হয়েছে।

আজ হয়ত একটা হিন্দু বা মুসলমান খালি হিন্দু বা মুসলমানের মধ্যে বাস করে আপাত নিশ্চিন্তি বোধ করছে, কিন্তু একই সাথে হারাচ্ছে একে অপরকে চেনার সূযোগ।
এবং ভুলে যাবেন না, দাঙ্গা লাগলে কিন্তু শত্রু এলাকা বাছতেও সময় লাগবেনা।

অনেক কেই দেখি হিন্দু সন্ত্রাসবাদের অস্ত্বিত্ব স্বীকার করেননা। ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের আন্তর্জাতিক ব্যাপকতা অনেক বেশী। কিন্তু এদেশে হিন্দু সন্ত্রাসবাদও যথেষ্ট খারাপ চেহারা নিয়েছে।

এবং একটা বোকা যুক্তি দেওয়া হয় যে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতায় হিন্দু সন্ত্রাসবাদের জন্ম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই কোনকালে লিখে গেছেন স্বদেশি আমলে জল খাবার জন্য হিন্দু প্রচারক তার মুসলমান সহযোগীকে দাওয়া থেকে নেমে যেতে বলছেন।

তালিবান দেরও একসময় বিপদ হিসেবে না দেখে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লব হিসেবে দেখা হয়েছিল। সৌজন্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। তার ফলাফল এখনও ভোগ করছি। আরএসএস এর ক্ষেত্রেও একই ভুল করলে বিপদ আছে।

বাজে ক্লিশে বকা শেষ। যদি এতটা পড়ে থাকেন, তাহলে শেষটুকুও ভেবে দেখুন, এই 'রমজান' প্যাকেটের মাধ্যমে কি বিজেপি'কে হিন্দু ভোটের মেরুকরণ এর সূযোগটাই হাতে তুলে দেওয়া হল না? 'তিনি' কি প্রকারান্তে সেটাই চাইছেন?

গরিব মানুষ কে যদি সাহায্য করাটাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে শুধু ইসলাম ধর্মটাই আসছে ক্যানো? বাকি ধর্ম গুলো কি দোষ করলো?

আর শুধু রমজান মাসই ক্যানো? সারা বছর সব বিপিএল তালিকাভুক্ত মানুষ কে এই স্পেশাল প্যাকেট দেওয়া হোক। এই দাবীটা উঠুক।

ইমাম ভাতা দেবার সময়ও একই প্রশ্ন ছিল। গরিব ইমাম রা ভাতা পেলেন। আমার বাড়ির পাশের কালীমন্দিরের গরিব পুরোহিত মশাই কি দোষ করেছিলেন? তারও তো সংসার চলে কোনোরকমে।

বিজেপি সেবারও এই ইস্যু তুলে ধর্মীয় মেরুকরণে সফল হয়েছিল। এই রমজান প্যাকেট নিয়েও তারা যথারীতি একই রকম প্রচারে নামবে।

ক্ষমতার মোহে 'তিনি' নাহয় ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের মাধ্যমে আরএসএস আর জামাত কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, কিন্তু আমরা তো আর একই ভুল করতে পারিনা।

আসুন, আমরা প্রত্যেকটি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ এই ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটাবার সুবিধেবাদী রাজনীতি'র বিরোধিতা করি।

খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই...

বৃহস্পতিবার, ২৬ মে, ২০১৬

অনাগত শহিদের মা ~ মন্দাক্রান্তা সেন

(অর্পিতার জন্য )

কী  উন্মত্ত ক্রূর  ও হিংস্র গর্বে
ওরা লাথি মারে মায়ের আর্ত  গর্ভে

আর্ত ? নয় তো ! সম্ভাবনার ছিল ভ্রূণ
পিশাচেরা তাকে ভয় পেয়েছিল নিদারুন

যদি সেই ভ্রূণ জন্মেই হয় যোদ্ধা !
মানুষের  মতো যদি গড়ে ওঠে বোধ তার

যদি বেড়ে ওঠে ক্রমাগত তার মান হুশ
অঙ্কুর হয়ে ওঠে যদি তার অঙ্কুশ ?

তাই ওরা ভয় পেয়ে গেছে অনাগতকে
দেশ ভরে গেছে নৃশংস যত ঘাতকে

কিন্তু শতেক মায়ের লুকোনো গর্ভ
সম্ভাবনাকে করেনি বন্ধু খর্ব

জন্ম নিচ্ছে লড়াকু হাজারো সন্তান
জন্মেই তার শিরদাড়া এত টানটান

আমরা বাচছি  তাদের গভীর আশাতে
জন্মেই তার চিত্কারে, তার ভাষাতে

শুনছি আমরা ভবিষ্যতের আহ্বান
শুনছি আমরা শেকল ভাঙ্গার সেই গান

জন্মাও ওহে অনাগত , তোর  জন্য
ওগো  মা, কাতর, --- তাহলেও তুমি ধন্য

জন্মের আগে শহীদ হয়েছে যে জাতক
তার সংগ্রামে পিশাচেরা হবে পলাতক

ওরে হানাদার, দেশ থেকে তোকে তাড়াতে
মায়ের গর্ভ জেগে আছে রুখে দাড়াতে

বুধবার, ২৫ মে, ২০১৬

আমি ও সবে নেই ~ শতরূপা সান্যাল

ওরা মার খেলে আমার কি আসে যায় ?
আমি তো দিব্যি আছি নিরাপদ ঘরে।
যারা মার দেয়, তাদের সেলাম করি
পাছে ওরা এসে এখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে !
চাবুক খাবার আগেই কুঁকড়ে আছি !
ডাকাত পড়লে খুলে দিই সিন্দুক !
আমি নিতান্ত গোবেচারা ভালো লোক,
ক্ষমতার পাশে থাকতেই উৎসুক !
যে সব বোকারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে
মার খায় ঘরে বাইরে হাতে ও ভাতে
পুলিশও নেয়না যাদের এফ আই আর-
আমি বাপু নেই সেই সব ঝামেলাতে !
পাশের বাড়িতে আগুন লাগালে ওরা
আমি নিশ্চিত , আমি ঠিক বেঁচে যাব
আমি যে আসলে ওদেরই দলের লোক
এমন একটা নিরীহ ভাব দেখাব !
প্লেট মুছে দেব, মোটা টাকা চাঁদা দেব
দুই হাত তুলে নাচব ওদের সাথে
ওদের ভাষাকে বলব-অমৃত বাণী
এভাবে থাকব বাঙালির মাছে-ভাতে !
অনেকে ভাবছ, আমি শিরদাঁড়া হীন
মনে মনে পুষে রাখছ তীব্র ঘৃণা
আমার ওসবে কিছু যাবে আসবেনা-
মেরুদণ্ডের ঠিকানাই তো জানিনা !!

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১৬

বোদ্ধাদেবের নির্বুদ্ধিতা ও একটি টকটকে লাল স্টেগোসরাসের অপমৃত্যু ~ অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়

হাজার হাজার বছর আগে যখন পৃথিবী অন্য রকম ভূগোল নিয়ে অবস্থান করতো - ঠিক তখনকার কাহিনী এটি। সেই প্রাগৈতিহাসিক দুনিয়ায় এক উপমহাদেশ ছিল যার নাম ছিল রংবং। সেখানে দানবাকৃতি সবুজ গাছপালার মধ্যে বিচরণ করতো নানা রকম ডাইনোসর, আর তাদের বিবর্তনও সাথে সাথে ঘটে চলেছিল। এটি একটি অসাধারণ স্টেগোসরাসের গল্প যার নাম ছিল লালু। কেন মশাই, কুকুর, বেড়াল, বাঁদরের নাম থাকতে পারে, আর স্টেগোসরাসের নাম থাকতে পারে না? প্রথমে স্টেগো নাম দেব ভেবেছিলাম, কিন্তু স্টেথো-স্টেথো শুনতে লাগছিল আর গা গোলাচ্ছিল বলে লালু নামটাই রাখলাম। এই নামের পেছনে আরো একটা কারণ আছে, বলছি দাঁড়ান...
এখন মনে হতেই পারে এই স্টেগোসরাস অসাধারণ কিসের? প্রথমতঃ, সে ছিল টকটকে লাল, ঠিক ধরেছেন - লালু নামটা এই জন্যেও মানানসই। দ্বিতীয়তঃ, তার স্বভাবটি ছিল খুবই পরোপকারী - সে নিজে শাকপাতা খেয়ে থাকত, আর আশেপাশের অন্যান্য জন্তুজানোয়ার যারা শাকপাতা খেত (যেমন ম্যামথ, ব্রকিওসরাস ইত্যাদি) তাদের রাতের বেলা পাহারা দিত। কেউ বলে নি লালুকে, কিন্তু লালু তাও পাহারা দিত, সবাই শান্তিতে আর নিরাপত্তায় থাকলে তার লম্বা প্লেট-লাগানো ল্যাজটা তিড়িংতিড়িং করে লাফাত, সেটা লালুর খুব ভালো লাগত। তাই সে পাহারা দিত, আর সবাইকে নিরাপদ রাখত।
তৃতীয়তঃ, তার একটা গভীর সংবেদনশীল মনও ছিল, ছোট জানোয়ার, কীটপতঙ্গদের সে খাওয়াত জল থেকে শ্যাওলা আর আরো কি সব হাবিজাবি উদ্ভিদ তুলে এনে। এই ভাবে বেশ চলছিল, প্রায় ২৫-৩০ বছর লালু রংবং-এর প্রাণী ও উদ্ভিদকুলকে সুখে শান্তিতে রেখেছিল, ফলে সবাই তাকে ভালবাসত, আর আদর করে লাল সেলাম ঠুকত।
ইতিমধ্যে রংবং-এ এসে হাজির হল একগাদা টেরোডাকটিল। তারা আকাশ থেকে এসে চোখের সামনে যাকে পেত তুলে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলত আর খাওয়ার পরে বিষাক্ত বিষ্ঠা ত্যাগ করে যেত রংবং-এর জঙ্গলে। অতিষ্ঠ হয়ে বাকিরা সবাই লালুকে বললো - "তোর তো প্রচুর গায়ের জোর, যা না গিয়ে এই আপদগুলোকে বিদেয় করে আয়।"
সব শুনে লালু চড়তে আরম্ভ করল সেই পাহাড়ের গা বেয়ে যার ওপরে টেরোডাকটিলের দল থাকত। হতভাগারা আবার নিজেদের নাম দিয়েছিল "মুক্ত বিহঙ্গ" আর পাহাড়টাকে বলতো "কং ফ্রেশ" কারণ পাহাড়ের গুহায় ফ্রেশ কিং কং পাওয়া যেত। এখন রাগে আরো লাল হয়ে গিয়ে লালু পাহাড় চড়তে লাগল। চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে লালু দেখত পেল মুক্ত বিহঙ্গদের দলপতি মোহন বিহঙ্গকে। মারামারি করবে বলে যেই না এগিয়ে গেল সাথে সাথে মোহন বিহঙ্গ ততোধিক মোহন স্বরে লালুকে বলল - "এসো, এসো বোদ্ধা, তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।" অবাক লালু পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল, মোহন বলে উঠল - "তোমাকে আমরা সবাই চিনি বোদ্ধা হিসেবে, তুমি আমাদেরও রাজা হতে পারো।"
অবাক লালু বলে - "কিভাবে?" মোহন বললো - "গুটিকতক শর্ত আছে, আর একটা সহজ পরীক্ষা দিতে হবে।" লালু - "তা সে শর্তগুলোই না হয় আগে শুনি।" মনমোহিনী হাসি হেসে মোহন - "এক - তোমাকে ওই নীচের জঙ্গলের হতভাগা জন্তু জানোয়ার কীট পতঙ্গগুলোকে ত্যাগ করতে হবে; দুই - ওদের আমরা যাতে সহজেই টপাটপ গিলে খেয়ে ফেলতে পারি সেই জন্যে তোমাকে সাহায্য করতে হবে, তুমি রোজ সন্ধ্যেবেলা ওদের পশুসভা, নির্বাচন বা কিছু একটা বলে নদীর ধারে ডেকে নিয়ে আসবে, বাকিটা আমরা বুঝে নেব; তিন - কেউ যদি কোন প্রশ্ন করে তাহলে তুমি বলবে - "বিপ্লব নামের এক মোহিনী সাতরঙ্গা পাখী আসবে, আর সে আমাদের খাওয়া, দাওয়া, থাকার সব দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে দেবে।" তারপরেও যদি কোন বেয়াদব ঝামেলা করে তাকে কান ধরে জঙ্গলের বাইরে বার করে দিয়ে আসবে। এইভাবে পাঁচ বছর চালাও, তারপরে তোমাকে একটা ছোট পরীক্ষা দিতে হবে। তারপরেই তোমার নামে এই পাহাড়কে আমরা লালপাহাড় বলে ডাকব, তুমি হবে আমাদের অবিসংবাদী দেবতা, তোমার নতুন নাম হবে বোদ্ধাদেব। রাজী আছো?"
লালুর শক্ত প্লেটলাগানো ল্যাজটা একেবারে ঝোড়ো হাওয়ায় পাতা নড়ার মত দুলতে লাগল আনন্দে। লালু বুঝতে পারল ডাইনোসর কুলে তার নাম অমর হয়ে যেতে চলেছে। সে মুক্ত মোহন বিহঙ্গর কথামত চলতে লাগল, জঙ্গলের জানোয়ার শেষ হয়ে যেতে লাগল, টেরোডাকটিলদের বিষ্ঠায় গোটা রংবং দূষিত হয়ে গেল, আর লালুর সঙ্গীসাথীরা সব তাকে ছেড়ে চলে গেল অন্য জঙ্গল খুঁজতে। কিন্তু লালুর মাথার ভূত নামল না, তাকে যে বোদ্ধাদেব হতে হবে!
পাঁচটা বছর কেটে গেল, লালু কথা রাখল, লালু মোহনের ইশারায় সব কাজ করে খুশী করে দিল আর গভীর মমতায় মোহন বিহঙ্গ রংবং-কে প্রায় শ্মশানে পরিণত করে দিল। ঠিক পাঁচ বছর শেষ হওয়ার পরে লালু গেল মোহনের কাছে, বলল - "মোহন, আমি আর পারছি না, এবারে কি পরীক্ষা দিতে হবে বল, আমাকে বোদ্ধাদেব হতেই হবে।" মোহন বলল - "খুব সহজ, আমরা যে রকম এই পাহাড়ের ওপর থেকে ডানা মেলে উড়ে যাই, তোমাকেও সেটা শিখে ফেলতে হবে, তুমি অর্ধেক দেব হয়েই গেছ, এটা শিখে নিলেই বোদ্ধাদেব, আগামীকাল এসো, তোমাকে শিখিয়ে দেব।"
মনের আনন্দে দ্বিগুণ জোরে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে লালু রংবং-এ ফিরলো আর তার মাকে বলল সব কথা, মা অনেক চেষ্টা করল লালুকে বোঝানোর যে স্টেগোরা উড়তে পারে না, প্রকৃতি তাদের সে ক্ষমতা দেয় নি, কিন্তু লালু মানল না। লালুর বন্ধুদেরও মুক্ত বিহঙ্গেরা একে একে খেয়ে নিয়েছে এর মধ্যে, ফলে তাকে বোঝানোর আর কেউই নেই রংবং-এ। সকাল হতেই লালু উঠে গেল পাহাড়ের মাথায়, সেখানে মোহন অপেক্ষা করছিল তার জন্যে, যেতেই তাকে নিয়ে চলে গেল পাহাড়চূড়োর ধারে। সেখানে নিয়ে গিয়ে বলল - "কোন ব্যাপার নয়, লাফিয়ে পড়ো, গা ভাসিয়ে দাও, একটু বাদেই দেখবে তুমি উড়ছো, আর তারপরেই তুমি বোদ্ধাদেব।" লালু লাফিয়ে পড়ল, গা ভাসিয়ে দিল...
..............................................................
(এই গল্পের সাথে যারা আজকের রংবং নির্বাচন ফলাফলের মিল খুঁজে পাচ্ছেন - তাদের অনুরোধ আজকের মাথামোটা লালুদের কং ফ্রেশ পাহাড় থেকে নামিয়ে নিয়ে আসুন বুঝিয়ে সুঝিয়ে, নয়তো তারাও কিন্তু ডাইনোসরদের মত প্রাগৈতিহাসিক হয়ে যাবে একের পর এক লাফ মেরে মেরে)

বুধবার, ১৮ মে, ২০১৬

চল রাস্তায় ~ অমিতাভ প্রামাণিক

​​চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড, এই ভোট-টোট সব থামলে
আহা, ডিমফ্রাই কত সুন্দর যবে লোক কয় তারে মামলেট।
ক্যানে চা'র জল, প্যানে ছ্যাঁকছোঁক, ভুলে টেটে ফেল, নাকি পাশটি
চল হৈ হৈ করে খুলি চল গিয়ে তেলেভাজা ইন্ডাস্টি।
চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড...

ভুখা পথঘাট, পাড়া নির্জন, চেনা দাদা যায় অটোরিকশ'য়,
মুখে যা কিছু বলুক সবলোক, পেটে প'লে তবে কিনা পিঠে সয়!
শুধু গুড় জল খেয়ে চলে বল? শুধু পিছনে আছোলা বাঁশটি -
চল হৈ হৈ করে খুলি চল গিয়ে তেলেভাজা ইন্ডাস্টি।
চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড ...

পোষা কুকুরের মত ঘেউঘেউ, যারা সন্ধ্যেয় নিতো হপ্তা
তারা কবে হলো এত ঝিনচ্যাক, চড়ে জেটপ্লেন-হেলিকপ্টার!
কেউ ঝরে গিয়ে ফের ফিরে চায়, কেউ হাসপাতালেই থার্স্টি!
চল হৈ হৈ করে খুলি চল গিয়ে তেলেভাজা ইন্ডাস্টি।
চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড ...

শনিবার, ১৪ মে, ২০১৬

তোর নামতা ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

তুই এক্কে তুই, তুই দু'গুনে কার?
ফাগুন বুকেই আগুন জ্বালাস, এস্পার ওস্পার!
তুই তিরিক্ষে হোস, তুই চারে সন্তোষ,
মরশুমি তোর মনের খবর জানতে চাওয়াও দোষ।
পাঁচ তুইয়ে তুই আলো, ছটায় তাই জানালো,
তুই হলি ভোর, আলতো আদর, শিহরণ জমকালো
তুই সাত্তেই থাক, আটকে আমায় রাখ,
তোর জিম্মায় জীবন চাবি, হাত ধরে সাতপাক!
তুই নাহলেই নয়, দশা কেমন হয়,
ভাবতেও পারছিনা, সোনা, স্বপ্নেও পাই ভয়!

বৃহস্পতিবার, ১২ মে, ২০১৬

(মিছিলের আগে) যে কবিতা লাল কাপড়ে লেখা হবে ~ সৌম্যজিৎ রজক

সুশীল খন্ড 

'বুদ্ধিজীবী'তে গিজগিজ করছে অডিটোরিয়াম। মঞ্চে হাত নাড়া চলছে। চলছে বক্তৃতা ও টীকাটিপ্পনী। 'বুদ্ধিজীবী'রা জানেন, শুধুমাত্র তাহাই পবিত্র যাহা ব্যক্তিগত। মানুষের ভিড় তাঁহাদের পক্ষে আন-হাইজেনিক। ব্রিগেড ক্ষতিকারক এবং হকার ভর্তি ফুটপাথ 'নোংরা'। যদিও গ্রামের হাট 'বুদ্ধিজীবী'দের কাছে রোমান্টিসিজমের উপাদান। আর গ্রামের লোক 'সাইলেন্ট সাব-অল্টার্ণ'।

ওরা এমনটা যে ভাবেন সেটাও শ্রেণি-নিয়ন্ত্রিত। যতই লাফ-ঝাঁপ করুন; শেষ অব্দি মধ্যবিত্তের স্বভাবই তো এই। ছৌ-শিল্পী খুন হলে ওঁরা চুপ থাকবেন। খেতমজুরের জমি কেড়ে নিলে চুপ থাকবেন। শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নিলেও রা কাড়বেন না। তবে শ্রমিক, খেতমজুর আর প্রান্তিক শিল্পীরা এসে নগর কলকাতার রাজপথ দখল করলেই ওঁরা চিৎকার করে উঠবেন; দোহাই দেবেন ট্রাফিক-জ্যামের। এঁদের পছন্দ-

                                             "ক্ষমতার আশেপাশে চক্কর, এবং সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট"

                                                            (জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহারঃ পাঁচ; জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার)।

গরিব-গুরবো মেহনতি মানুষ মানেই বিপদ। তাই দূরে রাখো ওদের। 'বুদ্ধিজীবী'র নোটবই থেকে দূরে রাখো। কবিতার ব্যকরণ নিয়ে ভাবো,ভাবো ছন্দ-শিল্পরূপ নিয়ে। কবিতা থেকে দূরে রাখো মানুষকে। 'বুদ্ধিজীবী' তাই রায় দিয়েছেন বারেবারে, জীবনের জন্য নয়; শিল্প নিখাদ শিল্পেরই জন্য। দায়  নেই তার কোনও আর। জীবনের কাছে, ভবিষ্যের কাছে।

 

হার্মাদ খন্ড 

অডিটোরিয়ামে ঢুকে পড়ল একটি ছেলে; ব্যাগে যার লালঝান্ডা, গায়ে মিছিল ফেরত ঘাম আর প্রত্যয়। সাথে সাথে ধিক্কার জানাল কলাকৈবল্যবাদীরা। রে রে করে উঠল।

 

আর যদি দেখা যায়, মিছিলেরই কথা লিখে ফেলেছে সে! তখন? তার কবিতা ছাপতে অস্বীকার করবেন মহান গণতান্ত্রিক প্রকাশক। 'কবি' – এই বিশেষণ তাহলে তার জন্য নয়। ছেলেটির জন্য বরাদ্দ থাকবে 'হার্মাদ' আর 'ক্যাডার' শব্দ দুটো। আমাদের এই কমরেডও, নিশ্চয়, এরকমই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন। তাই তো, প্রথম কবিতার বইতেই, তিনি লিখেছেন ...

"... মারুন, কাটুন আর কুচিকুচি করুন আমাকে, আমি এভাবেই শুরু করব লেখা। কবিতার ভার নিয়ে আমার সত্যি কোনও মাথাব্যথা নেই শ্বৈলেশ্বরদা, ওগুলা ছাড়ান দেন, মিডিলকেলাস আজো বাকি আছে চেনা?...

পারেন তো ক্ষ্যামা দিন। নাইবা বলুন 'কবি'।... যতক্ষণ তবু এই সি পি এম পার্টি রয়ে যাবে, কলম ঘষটানো আর যে কোনও কবিতা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করা নিছকই অলীক। আমরা ক্যাডার, এটা জানেন নিশ্চয়।"

                                                                                                                   (উন্মোচিত চিঠি ; ভ্রমণকাহিনী)।

প্রসঙ্গত মনে রাখা জরুরি, বাজারের কাগজগুলো 'ক্যাডার' শব্দটি যেভাবেই ব্যবহার করুক; শব্দটার আসল মানেটি যারা জানেন তাদের কাছে কম্যুনিস্ট পার্টির ক্যাডার হওয়াটা গর্বের। আর কিছু নয়।

 

যাইহোক, 'বুদ্ধিজীবী' কোনও শ্রেণি নয় কখনই। প্রতিটি শ্রেণিরই কিছু বুদ্ধিজীবী থাকে। যেমন থাকে প্রতিটি শ্রেণির নিজস্ব পার্টি আর যোদ্ধা। আমাগো বাংলায় শ্রমিক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীর সংখ্যাটা কোনও কালেই কম নয়; যারা এই শ্রেণির কথা বলেছেন, গান গেয়েছেন। আপোষহীনভাবেই। তবে এত রাগ, এত জোর, এত অভিমান জয়দেব বসুকে আলাদা করেই চেনায়। 'প্রতিহিংসা'র বৈধতা নিয়ে এত তীব্র সওয়াল এঁকেই মানায়। শ্রেণির প্রতি, শ্রেণির শক্তি – কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতি, পার্টি-শৃঙ্খলার প্রতি গর্ববোধ ও ভালোবাসা বারেবারে ছলকে উঠেছে শব্দে, এঁর কবিতায়। নিজেকে 'ক্যাডার' বলে প্রকৃতই স্পর্ধিত হতেন তিনি। নাম আর পদবির মাঝে 'হার্মাদ' শব্দটা পুরে নিতে মজা পেতেন। আর ছিল হিম্মত; যার কিছুই নেই হারাবার তার যেরকমটা থাকে। নাহলে কবিতা লিখতে আসা কোনও তরুণ, এ বাংলাতেও, প্রথম কবিতা-বই উৎসর্গ করে 'ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)'কে? তখনও কবি-সমালোচক-পাঠক মহলে নেই কোনও 'স্বীকৃতি' (পরে যেটা পেয়েছেন)! আপনি তো জানতেন, বাংলা কবিতার জগতে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর রাজনৈতিক বাচন মানে কী এবং সেটাই শেষ কথা! প্রথম বইয়ের 'উৎসর্গ পৃষ্ঠা'টাই যথেষ্ঠ কারণ হতে পারত আঁতুড় ঘরে আপনায় খতম করে দেওয়ার জন্য। তবু কী দুঃসাহস কমরেড!

 

শুনেছি, এস এফ আই-এর রাত জেগে অবস্থান ছিল সেদিন। সে রাতেই দুজন কমরেড দেখে ফেলেছিল ব্যাগের ভেতর একটা খাতা। খাতা খোলা হয়। পাওয়া যায় টাটকা নতুন কিছু কবিতা, যা এতদিন লুকিয়ে রাখতেন জয়দেব বসু। কাউকে জানাতেন না। খবর গেল রটে। কবিতাগুলোও, বোধহয়, মুখে মুখে গেল ছড়িয়ে! ব্যাস! আর কখনো সঙ্কোচ করেন নি। লজ্জা পান নি, কবিতা লেখেন বলে। ভয় পান নি, কবিতায় 'সমাজতন্ত্র' আর 'মিছিল' শব্দদুটো লিখে।

 

কবিতা লিখেছেন কমরেডদের সাথে 'রাতপাহারা'র অভিজ্ঞতা নিয়ে। লিখেছেন মধ্যবিত্তের স্বপ্নের আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী চেহারার অ্যানাটমি-

"ওরা ডিজনিল্যান্ডে যায়

আরও নানাবিধ করে বায়না

ওরা পশুদের ভালবাসে

তবে, কালো লোকেদের চায়না

             ...

ওরা ভোট দেয় দুটি দলকে

ভোট নিয়মিত দিয়ে যায়

যারা সৌদিতে সেনা রাখে

রাখে দিয়েগো-গার্সিয়ায়

             ...

ওরা চাকরি রাখার চিন্তায়

কী করবে ভেবে পায়না

ওরা গণতন্ত্রও মানে

তবে, অন্যের দেশে চায়না"

                                                                                      (আপনি কি আদর্শ মার্কিন নাগরিক হতে চান? ; আলাদিন ও আশ্চর্য প্রদীপ)।

প্রেমের কবিতাও লিখেছেন। তবে সেসব কবিতা, ভুলেও, আরচিসের কার্ডে কোট করা হবে না কখনো –

" ... আমার তো মনে হয় কৃষক আন্দোলনে মেয়েটিরও সমর্থন আছে। তোমাকে বলেছে কিছু এ বিষয়ে? রোহিতাশ্ব, অকারণ তোমার এই পুচ্ছ নাচানো দেখে ব্রহ্মতালু জ্বলে যায়। সিরিয়াস হও ভাই। তুমি কি চালাবে কথা? বোলো, আমি কুঁড়ে তবু এখনো বাতিল নই। তেমন সময় এলে আশা করা যায় আমাকেও পুলিশ ধরবে। ভালো মেয়েদের তবু বিশ্বাস করতে নেই খুব। কম্বল ধোলাই খেয়ে আমি যদি কোনোদিন মুখ খুলে ফেলি, তখন আমায় ঘৃণা করবে তো? পারবে তো সে মেয়েটি, বিচ্ছেদ চাইবে তো? জেনে নিও রোহিতাশ্ব। সেই বুঝে বাড়িতে জানাব। "

                                                                                                                                                 (পূর্বরাগ ; ভ্রমণকাহিনী)।

অথবা, সেই লাইনটা যা মিছিলে স্লোগান দিতে দিতে এস এম এস করেছিল আমাদের আরেক কমরেড ...

                                                           " গঞ্জের নাম শ্রেণিসংগ্রাম, মেয়েটির নাম কু। "

                                                                                                                ( কু, ভ্রমণকাহিনী)।

কবিতা সম্বন্ধে প্রিতিষ্ঠিত ধারণাগুলোকেও তছনছ করে করে গেছেন জয়দেব। কবিতার লাইন সাজানোর চিরাচরিত নিয়ম মানেন নি বহু-বহুবার। ইস্তেহার লেখার মতোই টানা গদ্যে (run on) কবিতা লিখেছেন অজস্র। জয়দেব বসুর এইরকমের কবিতাগুলো বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক-একটা মাইলফলক এবং বিদ্রোহ। স্বতন্ত্র, নতুন যে কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন তিনি, তা আমাদের কবিতাকে কতটা অক্সিজেন দিয়েছে - সেকথা 'বিশুদ্ধ কবিতা' বা 'পবিত্র শিল্প'-এর মন্ত্র আওড়ানো বুদ্ধিজীবীরাও জানেন, নিশ্চয়। তাই কবি জয়দেব হার্মাদ বসুকে ওঁরাও অস্বীকার করতে পারেন  নি। পারেন নি বাতিল করে দিতে। উল্টে মেনে নিতে হয়েছে তাঁর শক্তি। শিল্পের জোরেই শিল্পের পরীক্ষাতেও তিনি জিতে গেছেন। উৎপল দত্ত, সলীল চৌধূরীর মতো।

 

মার্কসবাদীরা জানেন 'শিল্প'-এর সঙ্গে 'রাজনীতি'র বিরোধ নেই কোনও। বরং শিল্পের দাবি পূরণ না করলে, যতই বিপ্লবের কথা থাক, কবিতা-গান-ছবি সবই জায়গা পায় ডাস্টবিনে। এবং উল্টোটাও সত্যি। প্রতিক্রিয়ার প্রোপাগান্ডায় শিল্পসৌন্দর্য যতই সুচারু হোক, ইতিহাস তাকে বাতিল করবেই। জয়দেব বসু, তাই, লিখে যান "জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার''।

"এবার অন্যভাবে কবিতা বানানো যাক – এসো, লেখাপড়া করো,

কবিতা লেখার আগে দু'বছর পোস্টার সেঁটে নেওয়া ভালো,

কায়িক শ্রমের ফলে বিষয় মজবুত হয়- এবং, সমান ভালো

রান্না শেখা, জল তোলা, মানুষের কাছাকাছি থাকা।

পার্টি করার থেকে বিশল্যকরণী আর কিছু নেই কবির জীবনে, আমি

অভিজ্ঞতা থেকে এই পরামর্শ দিয়ে যেতে পারি।"   

                                                                                      (জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহারঃ এক; জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার'')।

সাহিত্য মধ্যবিত্তদের জন্য নয়। কবিতা লেখা আয়েসের নয়, পরিশ্রমের কাজ। হ্যাঁ, কবিতা লেখা আসলে 'কাজ'। চাষ করার মতোই, বাড়ি বানানোর মতোই। অর্থাৎ, মানিক ব্যানার্জি যেমন বলতেন নিজেকে – 'কলম-পেষা মজুর'। তেমনই জয়দেব বসু।

 

আপোষহীনতাই মজুরের সহজাত মনোভাব। শ্রমিক-কবিরও। গণতন্ত্রের কেন্দ্রিকতার প্রশ্নে আপোষ নেই। নীতির প্রশ্নে মধ্যবর্তী কোনও রাস্তা নেই।

 

যাদের বিশ্বাস নেই তাঁরা পড়ে দেখুক।

আমরাও এই আগুন ঝলসানো সময়ে,আসুন, পড়ে ফেলি আরেকবার। জয়দেব বসুর কবিতা। পোস্টারে লেখার মতো নতুন কোনও লাইন, হয়ত, খুঁজে পেয়ে যাব।

বুধবার, ১১ মে, ২০১৬

আমার পাওয়া প্রথম প্রপোজাল ~ শ্রুতি গোস্বামী

আজকাল ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেম দিবস থেকে শুরু করে ব্রেক আপ দিবস সবই পালন হচ্ছে, ফেসবুক এর দৌলতে কে কার প্রেমিকা কে কি কিনে দিল, কি খাওয়াল, কোথায় শোওয়ালো, কবার ভালবাসি বললো, সব ই জানা যাচ্ছে। যাকে বলে, প্রাইভেট বলে আর কিসসু রইল না। সবাই চায়, লোকে তার ব্যপার নিয়ে, সে পার্সোনাল হোক, কি পাব্লিক, ইন্টারেস্ট দেখাক। কি করলাম, সেটা আসল না। ছবি তুলে দেখালাম কিনা, সেটাই আসল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা এই প্রেম আর বিচ্ছেদ এর মধ্যে আছে প্রপোজাল ডে। আমরা চিরকাল যেটা জানতাম, প্রপোজ মানে বিয়ের প্রস্তাব, সেটা এখন পালটে দাঁড়িয়েছে প্রেমের প্রস্তাব। তাই সই। আজকাল বিয়ে হবে কিনা সেই নিয়েই কেও আর শিয়র নয়। তা এমন ই এক প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে আজকের লেখা।

তখন ক্লাস ফাইভ। সকালে কোনো রকমে স্কুল করে ফিরে খেয়ে দুপুর কাটতে না কাটতেই বাইরে খেলতে বেরিয়ে যেতাম। আমার সাথে প্রায়ই সবসময় থাকতো মণি, একই ক্লাস এ আমরা। বাকিরা সবাই পড়াশোনা করতো বলে দেরী তে বেরতো। আমাদের সেসবের বালাই নেই। দুপুর টা গল্পের বই পড়ে কাটিয়ে বিকেলে খেলা। সে কাট ফাটা রোদই হোক কি বৃষ্টি। আমরা জনা আটেক মেয়েরা খেলতাম। এক ই স্কুল, সামনের পেছনের পাড়া, বয়েস ও ওই এক দুবছরের এদিক ওদিক। আমাদের ওখানে দুজন ছেলে ছিল, দুজনের ই ডাক নাম রাণা। তা আমাদের বয়েসী যে ছিল তাকে আমরা ছোট রাণা আর আমাদের চেয়ে বয়েসে এক বছরের বড় যে ছিল,তাকে আমরা ডাকতাম বড় রাণা বলে। ছোট রাণা প্রায়ই আমাদের সাথে খেলতো, একা ছেলে। বড় রাণা বিকেলে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াত রাস্তায়, মাঝে মাঝে ছোট রাণা কে আওয়াজ দিত, আমাদের সাথে খেলছে বলে। ওর তাতে বয়েই যেত। তা সে দিনকে তখনো বাকিরা বেরয়নি, আমি আর মণি রাস্তায় হাঁটছিলাম,গল্প করছিলাম। দেখলাম বড় রাণা বেশ কয়েকবার সাইকেল নিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত করলো। কিছুক্ষণ পরে আমরা রাস্তায় হাঁটা বন্ধ করে আমাদের বাড়ির সামনে ছোট ফাঁকা জায়গা তে এসে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছি। জায়গাটার পাশেই একটা সরু পিচ রাস্তা,তারপরে ড্রেন আর তারপরে বিশাল খেলার মাঠ। বিকেলে মাঠে কাছের এক ক্লাবের ছেলেগুলো ফুটবল খেলত। বহুবার বল এসে আমাদের গায়ে লেগেছে, আমরাও খেলছিলাম, রেগে মেগে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি বল দূরের মেইন রাস্তায়। যাইহোক, বড় রাণা মেইন রাস্তা ছেড়ে এবারে বাড়ির সামনে পিচ রাস্তায় সাইকেল নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকলো:" এই বান্টি শোন।" আমি আর মণি দুজনেই ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যপার।
" আমার তোর সাথে দরকারী কথা আছে। একটু এদিকে আয়।"
দুজনেই এগতে বলে: " মণি র আসার দরকার নেই। ওকে একটু যেতে বল।"
শুনেই মাথা গরম হয়ে গেল। মণিও ঝাঁঝিয়ে উঠলো:" কেন রে? ও আমার বন্ধু। তোর যা বলার আমাদের দুজনের সামনেই বলতে হবে। কি এমন বলবি যে আমি থাকতে পারবোনা?"
আমিও ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। কি দরকার? তবে কি ও আমাদের সাথে খেলতে চায়, সেটা বলার জন্য ডাকছে? নাকি আমরা খেলার সময়ে ওকে মেইন রোড এ সাইকেল চালাতে বলি সেই নিয়ে? খেলার জায়গায় বহুবার ওর সাইকেল এ আমরা ধাক্কা খেয়েছি। সেই নিয়ে বেশ কয়েকবার রাগারাগি হয়েছে। তবে কি সেটা নিয়ে বলবে?
উপায় না দেখে রাণা বললো: " তোকে বলার ছিল যে তোকে আমি পছন্দ করি।"
আমি হাঁ করে চেয়ে রইলাম। বাপের জন্মে এরকম কথা শুনিনি। পছন্দ করে মানে? আমার সাইকেল টা চালাতে চায়? মনে পড়লো কিছুদিন আগে আমার নতুন বি এস এ এস এল আর দেখে রাণা বলেছিল সাইকেল টা ভাল।বলেছিলাম রেসিং সাইকেল, রেস করবি নাকি? মুখ ভেটকে বলেছিল আমি মেয়েদের সাথে রেস করিনা। জ্বলে গিয়েছিল, বলেছিলাম ছেলেদের সাথে তো পারবিনা,আমার সাথে চেষ্টা করে দেখ,আস্তে চালাবো। তাতে বেশ চটে গেছিল। তাহলে কি সাইকেলের লোভে এসব বলছে? নাকি পড়াশোনার ব্যাপারে কিছু বলতে চাইছে? কিন্তু ও আমার চেয়ে এক ক্লাস সিনিয়ার। স্কুল ও আলাদা। নাহ। সেটা কারণ নয়।এরকম বলার মানে কি? মাথায় কিছুই ঢুকছেনা।

মণি বুঝে গেছিল। ও হেসে মুখ বেঁকিয়ে বলে " হুঁহ পছন্দ করিস! আয়নায় নিজের মুখ টা দেখেছিস? সাইকেল চালাচ্ছিস তাই চালা। পাকামো মারিস না। প্রেম করার শখ হয়েছে! স্কুল এ কি এই সব শিখছিস নাকি! "

রাণা রেগে গেলে একটু তোতলাতো। বললো" তো তো তোকে বলেছি নয় দূ দূ দূরে যা নাহলে চুপ থাক। তুই কে?"

আমার মাথায় তখন ঢুকলো! আচ্ছা এই ব্যপার! চড়াৎ করে মাথাটা গরম হয়ে গেল। আমাকে পছন্দ করে? আমি কি সাইকেল না বই না জিনিস যে আমাকে পছন্দ করছে? সাহস তো কম না? আমাকে পছন্দ করার কারণ কি? আমাদের সাথে খেলে না বন্ধুত্ব নেই কিছুনা, মুখ উঠিয়ে বলতে চলে এল! এত সাহস!
" তোর যা বলার বলে ফেলেছিস? এবারে যা। চল মণি।"
এগতে যাব, রাণা সাইকেল নিয়ে আমার রাস্তা আটকে দাঁড়ালো।
" তোর উত্তর টা পেলাম না। তুই আমাকে পছন্দ করিস না করিসনা?"
মাথায় তখন আগুন জ্বলছে। এত বড় আসস্পদ্দা! আবার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছে! মুখ বেঁকিয়ে বললাম" তোকে পছন্দ করার মতন আছে টা কি? যা তো। বেকার সময় নষ্ট করাচ্ছিস।"
আবার এগতে যাব, আবার সাইকেল নিয়ে রাস্তা আটকালো।
" ভাল হচ্ছেনা রাণা। রাস্তা ছাড়বি? "
" না ছাড়লে কি করবি?"
" দেখবি কি করবো?"
" হ্যাঁ দেখা!"
ওমনি আমি রাণার সাইকেল টা দু হাতে চেপে ধরে ওকে সমেত ঠেলতে ঠেলতে রাস্তার পাশে মাঠের আগে ড্রেন টাতে নিয়ে গিয়ে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম। ও বসে ছিল। টাল খেয়ে আদ্ধেক ড্রেন এ আদ্ধেক টা সাইকেল সমেত মাটিতে ঠেকে।
পেছনে মণির অট্টহাস্য।
হাত ঝেড়ে বললাম:" আর ফের যদি রাস্তা আটকাতে আসিস, এর পরে সাইকেল ভেঙে তোর মার কাছে দিয়ে আসবো। আর খবরদার আমাকে পছন্দ করতে আসবিনা।

রাণা তখনো ওই ভাবেই আদ্ধেক ড্রেন এ সাইকেল নিয়ে, হকচকিয়ে গেছে। কি করবে কি বলবে বুঝতে পারছেনা।
মণি শেষে যাওয়ার আগে বলে গেল: " নে এবার ড্রেন এ শুয়ে শুয়ে পছন্দ কর মেয়ে।"

তখন বুঝিনি, ওটা প্রোপোজাল ছিল। ওই বয়েসে এর চেয়ে বেশি ম্যাচিউরিটি ছিলনা। কি আর করা যাবে! তবে থাকলেও ছেলেটির কপালে যে দুর্ভোগ থাকতই, সে নিয়ে আজ ও সন্দেহ নেই।