বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০১৫

নীল সাদা, সাদা নীল ~ অমিতাভ প্রামাণিক

ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি বেশ।

দু:খ হয়, জহরলাল জেনে যেতে পারলেন না
তার একটা জুড়ুয়া ভাই ছিল,
কুম্ভমেলায় নয়, সাঁওতাল বিদ্রোহে সে
হারিয়ে গেছে ভীড়ে।
তার বাড়ির কেউ সরকারি অনুদান নিতে আসে না।
মালা চড়াতে তাই ডাক পড়ে বীর চামুন্ডার।
সে বেচারি নির্দোষ, হুল ফোটানোয়
সে ছিল না মোটেই, কিন্তু তাতে কী!

মরিয়া কাউকে প্রমাণ করিতে হয়, সে মরে নাই।
গুরুদেব লিখেছিল, আহা, বেঁচে ওঠো গুরুদেব।
এখনো সন্ধ্যে হলে এ বঙ্গের আনাচে কানাচে
অনশনে লেগে যায় ভিখারিরা।
তারা মুসলিম নয়, মিছিলে যায় না তারা,
বেলেঘাটা কখনো দেখেনি।
শুধুই গান্ধীজীকে ফলের রস খাওয়ালে তুমি?

নরকের কত কীট বেড়ে গেছে, একত্রে কীটস।
শালপ্রাংশু গুঁড়ির মত বপু নিয়ে, গুরুদেব, কবিগুরি হয়ে
এদের আসন দাও। তোমারই তো ফ্রেন্ড।
শেক্সপীয়রকে ডাকো, আমেরিকা চলে যেতে পারো,
ওখানে অনেক কিছু আজকাল বৈধ হয়ে গেছে।

রামরাজ্য এসে গেছে। রামমোহনের পোয়াবারো।
সতীদাহ বিল পাশ করে নিয়ে বিধানসভায়
বাংলাদেশ হয়ে সোজা চলে গেল প্রতিবেশী পাকিস্তানে।
বেঙ্গল প্যাকেজ পেলে আরো কিছু লুটেপুটে নিত।

এসব আর্ষবাক্যে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি।
হচ্ছি ত্রিশূলে।
নীল সাদা, সাদা নীল, চটিপায় গুটিগুটি যাই।

মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০১৫

তেরো - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


রাত এখন কোপার কোপে। যাঁরা জানেন, তাঁরা তো জানেনই। আর যাঁরা আমার মত, বুঝতে না পারলে মুচকি মুচকি হাসেন, আর ভান করেন যেন সব বুঝেছেন, তাঁদের বলি, কোপা হলো কোপা আমেরিকা। আমেরিকা কাপ। ফুটবলের আসর। লাতিন ফুটবলের ধুন্ধুমার লড়াই। গেল হপ্তায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে বার্সিলোনা জুভেন্তাস ঘটে গেছে। শেষ রাতে সেই নিয়ে ফোনে মেসেজ চালাচালি করতে গিয়ে দেখলুম, অনেক বড় বড় ফুটবলপ্রেমীই কেমন যেন আড়ো আড়ো ছাড়োছাড়ো করছেন। সকালে বাসে অফিস যাবার সময় নিত্যযাত্রিদের জোরদার আলোচনায় দেখলুম বার্সিলোনা, কোপা, এমন কি হিউমের আতলেতিকো কলকাতায় যোগদানের আলোচনাও কেমন যেন ঝিমিয়ে। শেষে বলেই ফেললুম, হলোটা কি? কোপা তে মেসি-নেইমার-সাঞ্চেজ-সুয়ারেজ, আর সবাই এত ঠান্ডা? হই হই করে উত্তর এলো বেলো টা চলে গেল যে, বল্লুও নাকি যাবে যাবে করছে...। অন্য দিক তাক করেই ছিলো, এবার দাগল তোদের সঞ্জয় সেন তো আছে রে ভাই, ওটাই আসল, কাতু-সোনি উপরি। ব্যাস। বুঝলুম ফুটবল আছে ফুটবলেই। শুধু টিভির পাশে, পাশের মাঠের ছোঁয়ার আরো রঙিন হবার চেষ্টা চলছে মাত্র।

বেশ কয়েক দিন পার হয়ে গেছে। যা যা বলার, লেখার, সবাই সব বলে বা লিখে ফেলেছেন। আমার মত অকিঞ্চিত অর্বাচিনের মন্তব্য ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। কিন্তু তবুও, ভেবে দেখুন, সবুজ মেরুন ষোলো নম্বর জার্সির ঝাঁকড়া চুলো বাবলু ভটচায্যি অসম মহড়া নিয়ে পেলেকেও পেনাল্টি বক্সে পা রাখতে দেয়নি, আমিও সেই কেলাবের মেম্বার ত বটি। কাজেই বাঘ সিঙ্গির ভিড়ে দু কথা কইতে আমার ও ইচ্ছে জাগতে পারে। ২০০২ সালে যেবার মোহনবাগান জাতীয় লীগ জিতে কলকাতা ফিরলো, সেই রাতটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। দমদম থেকে আবীর, বাজি-পটকা, ফুল, লাখ খানেক লোকের ভিড়, এসব তো ছিলোই। কিন্তু আমি বলছি রাতের কথা। পাড়ায় পাড়ায় পতাকা উড়ছে, মাইক বাজছে, খাওয়া দাওয়ার আয়োজন চলছে। স্বতঃস্ফুর্ত ফুর্তি। নির্মল আনন্দ। সে রাতে ঘুম হয়নি। ঘুম হয়নি। ঘুম হয়নি তার পরে একের পর এক রাতে, সপ্তাহে, মাসে বছরে। পরের তেরো বছরে।

করতে বাকি রেখেছে মোহনবাগান? দেশের সেরা স্ট্রাইকার এসেছে, ক্লাবে নির্বাচন হয়েছে, মাঠ মেরামত হয়েছে। মামলা-মোকদ্দমা অনেক কমে এসেছে। অলিভার কানের শেষ ম্যাচ খেলেছে। কিন্তু কই? জাতীয় লিগ তো আসেনি তাঁবুতে। গান বেরিয়েছে একের পর এক। এগারো নামের ছবি হয়েছে মোহনবাগান কে নিয়ে। অবনমন বাঁচানোর খেলায় মাঠে সত্তর হাজার মানুষের উপস্থিতি রেকর্ড গড়েছে। ইষ্টবেঙ্গলের গোলে ৯০ মিনিটে পাঁচবার বল ঢোকানো হয়েছে। রকমারি জার্সি বদল হয়েছে। কিন্তু দিন বদলায়নি। একটা নতুন প্রজন্ম এসে গেছে, যারা মোহনবাগান কে জাতীয় লিগ চাম্পিয়ন হতে দেখেনি কখনো। কত কিছুই হয়েছে, কিন্তু দিনে দিনে আরো খাদের দিকে এগিয়ে গেছে সবুজ মেরুন ক্লাব। গত চার বছর কোন ট্রফির দেখা পাইনি। টিটকিরি, টিপ্পনি, গালাগাল, এসব তো ছেড়েই দিলাম, কিন্তু আবার কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারার আশা, পাল্টা লড়াই তুলে আনার সম্ভাবনাগুলোই আস্তে আস্তে ঝাপসা হতে শুরু করেছিলো। অনেক অভিমানে আইএসএল দেখতে লাল সাদা জার্সি পরে মাঠে বসেছিলাম। মন বলেছিলো, এ জার্সি তোকে মানায়না ভাই। এ রঙ চাপিয়ে দেওয়া। তোর চামড়ার নয়।

 বন্ধুবর অনিরুদ্ধ, বিদেশ থেকে ফোন করে ফেলল সেদিন, যেদিন ইষ্টবেঙ্গল কলকাতা লিগের খেলায় হারালো মোহনবাগানকে। একটা চল্লিশ বছরের লোক হাউ হাউ করে কাঁদছে। কি করিস তোরা? হালায় ক্লাবটারে ভালোবাসিস না?”। আজ্ঞে হ্যাঁ, অনি বাঙাল, আর আবেগের সময় খাশ ঢাকাইয়া বুলি ফুটে বেরোয়। বাকি সময় ওর অবশ্য শান্তিপুরি বলতে সমস্যা হয়না । অনির ঠাকুরদার বাবা নাকি ১৯১১ সালে শিল্ড জেতার দিন মাঠে ছিলেন। ওর মতে আমার মত কুলিন মোহনবাগানি আর কেডা আসে রে?”। ওদের গুষ্টিসুদ্ধু সব মোহনবাগান মেম্বার। কিন্তু চুড়ান্ত বদঅভ্যেস, ওর কোনো ফেসবুক নেই, ইমেল করলে বছর দেড়েক পরে উত্তর পাবেন। হোয়াট্‌সঅ্যাপের নাম শোনেনি। সুইডেনে গোথেনবার্গ শহরে থাকে। সে এ লেখা পড়বে কিনা জানিনা। পড়লে হয়ত আর একটা ফোন পাবো। এই সব কাগুজে প্রচার নই আমি মারাদোনা নই আমি পেলে, আমি খাস ঘটি, মোহনবাগানের ছেলেযতই করা হোক, মোহনবাগান উত্তর কলকাতার ঘটি একাদশ কোনোকালেই ছিলোনা, হবেও না। মোহনবাগান সবার। ঘটি, বাঙ্গাল, বাঙালি, অবাঙালি, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, শিখ, বৌদ্ধ, মোহনবাগানে এইসব ভাগ কোনকালেই ছিলোনা, আর হতে দেওয়াও হবেনা। চুনোট ধুতি আর বেড়ালের বিয়ে দেওয়া বাবুয়ানির ক্লাব ছিলো শোভাবাজার। সে ক্লাব কবেই ইতিহাসের বাদামী পাতায়। মোহনবাগান চিরকাল সাধারন মানুষের ক্লাব। এই সব আজে বাজে বস্তাপচা প্রচারে মোহনবাগানিরা কান না দিলেই ভালো।

 

(ছবিটি "The Hindu" পত্রিকার অনলাইন প্রকাশনা থেকে সংগৃহিত)

তেরো বছর লিগ নেই। গত চার বছরে কোনো ট্রফি নেই। তার পরে জাতীয় লিগ। সবার আগে কোচ ও খেলোয়াড়, তার পরে কর্মকর্তারা। এনাদের ধন্যবাদ দিয়ে ছোটো করতে চাইনা। যে জন-বিস্ফোরন ও আবেগের স্রোতে কলকাতা ও দেশ ভেসে গেল লিগ জয়ের পরে, সেটা এনারা সকলে আজন্মকাল মনে রাখবেন। কিন্তু আমাকে আশ্চর্য্য করেছে সাধারন মোহনবাগানি সমর্থককূল। বছরের পর বছর ট্রফি নেই। লিগে অবনমন বাঁচাবার লড়াই। বড় ম্যাচে জয় নেই। চার বছর কোন ট্রফি নেই। আজকে যাদের বয়স ১৬-১৮, তারা তো সেই অর্থে মোহনবাগান কে জিততেই দেখেনি। কিন্তু তবুও কোথা থেকে আসে এই আবেগ? উৎস কি এই উন্মাদনার? কোথা থেকে আসে ঠিক পারবো, জিতবোইএই বুক বাজিয়ে বলা বিশ্বাস? কি জানি বাপু। এ কেমনতর আবেগ? যা এই রকম ছ্যাতলাপড়া পারফরমেন্সেও জ্বলজ্বল করতে থাকে, দাউ দাউ করে পুড়িয়ে দিতে থাকে। এই জয়, এই বিশ্বাস, এই আনন্দ যদি মনের ভেতর থেকে কাউকে দিতে পারি, তো দেব মোহনবাগান সমর্থকদের। এই সমর্থকরাই আসল নায়ক, হিরো, সুপারম্যান এবং সুপারউওম্যান। সাবাস মোহনবাগানী।

স্লোগান দিতে গিয়ে, আমি বুঝেছি এই সার,
সাবাস যদি দিতেই হবে, সাবাস দেবো তার,
ভাঙছে যারা, ভাঙবে যারা খ্যাপা মোষের ঘাড়

এগারো সংখ্যাটা প্রতিটি মোহনবাগানীর পরম গর্বের আর আদরের। বাকিদের জানিনা, এবার থেকে তেরো সংখ্যাটা আমার কাছে খুব গর্বের হয়ে থাকবে। এই তেরোটা বছর, ইতিহাসে থেকে যাক সমর্থকদের যুগ হিসেবে। কি ভাবে আবেগ জ্বালিয়ে রেখে অপেক্ষায় থাকা যায়, তার জ্বলন্ত প্রমান হিসেবে।

৩১শে মে, মাঝরাতে সবাই তখনো খুব আনন্দ করছে। হই হুল্লোড় চলছে। আমি কিন্তু আস্তে আস্তে বিছানায় গিয়ে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছি। শান্তির ঘুম। মোহনবাগান আবার নিজের জায়গায় ফেরত এসেছে।  

মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০১৫

ডেসপাইট বিয়িং এ উওম্যান ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

মানে পাতি মেয়েছেলে হয়েও 

যে'ভাবে তুমি সন্ত্রাস রুখেছ… 


ইতিহাসে শূন্য পাওয়া 
ভোটে জেতা লোকটা জানতই না
মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও, আজ্ঞে হ্যাঁ, মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও,
ক্যুরি বাড়ির মেয়েটা, দু' দু'বার নোবেল মঞ্চ আলো করেছিল।

কোনও শিশ্নউদ্ধত পুরুষ যে' সাফল্য ভাবেনি কখনও
একবার ফিজিক্সে অন্যবার কেমিস্ট্রিতে
কী সাহস ভাব একবার
মহামহিম ঐশ্বরিক প্রভু অবশ্য সে ঔদ্ধত্য মেনে নেয় নি
সওগাত পাঠিয়েছিল মৃত্যুমাখা রক্তরোগ


সেই হাইপেশিয়া লীলাবতী থেকে এই সেদিনের মালালা
সবাইকে প্রশংসার
আর দুঃসাহসের শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব
ঈশ্বরের বকলমে আমরা নিয়েছি


সতীদের পুড়িয়েছি… জহরব্রতে বাধ্য করেছি
বহ্নি মহোৎসবে ঠেলেছি ডাইনিদের 
জোয়ান অফ আর্ক সেরে অযোধ্যা পাহাড়ে
তিনশ' পঁয়ষট্টি দিনের থেকে একখানা নারীদিবস ভিক্ষে দিয়ে
তিনশ' চৌষট্টি দিনের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছি পুরুষালী থাবা


অনর্থক তর্কাতর্কি না বাড়িয়ে বলি
একজন মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও
একজন মা আমাকে গর্ভে ধরেছিল


আমার মত মহান পুরুষেরা

যুগে যুগে নরকের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এসেছি


ডেসপাইট বিয়িং এ উওম্যান
তারা সেই মহান কাজটা করতে পেরেছে
স্রেফ আমরা দয়া করেছি বলেই



শনিবার, ৬ জুন, ২০১৫

শ্রীরামপুর : নামকাহিনী ~ ভাস্কর শূর

দরিদ্র এক ব্রাহ্মণ একা
বসিয়া গঙ্গাঘাটে
ভাবিতেছিলেন 'বড় নিরুপায়
দিন যা কষ্টে কাটে'!
অশ্বারূঢ় ফিরিঙ্গি এক
আসিল দৃষ্টিপথে
'গোরাকেই ধরি, ব্যবস্থা যদি
করে দেয় কোনমতে'!
ভাবে ব্রাহ্মণ ম্লেচ্ছ ভাষার
বাক্যটি আছে মনে
না হয় তাহাই প্র‍য়োগ করিব
সকাতর আবেদনে।
জনমানবশূন্য প্রহর
করিতেছে ফাঁকা ধূ ধূ
দেখিল সাহেব দাঁড়াইয়া ঘটে
একটি নেটিভ শুধু
সেই লালমুখো চেঁচাইল জোরে
" হে ঝাগার ক্কী নাম আSe"?
ব্রাহ্মণ ভাবে আসিল সুযোগ
জানাইবে প্রার্থনা সে
করজোড়ে করিয়া মিনতি
বলিল " স্যর আই এম পুয়োর"
সাহেব তাহাতে কী বুঝিয়াছিল
আবছায়া ধুয়ো ধুয়ো
"স্যর-আই-এম-পুয়োর" আজ শ্রীরামপুর
বিদিত সর্বজনে
মুখে আর্জিটি জানাইয়াছিল
মুখার্জি ব্রাহ্মণে।

বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০১৫

ভেজাল ~ সুশোভন পাত্র

​আপনি কি চিৎকার করে মজা পান ? হিন্দি গানের সুরে সিটি মারতে পারেন ? আপনি কি বিয়ে বাড়িতে 'উলু' স্পেশালিষ্ট ? কিম্বা শাঁখ বাজানোর এক্সপার্ট ?
কানের গোঁড়ায় শিঙা ফুঁকুন, ধুমধাড়াক্কা রিপাবলিক ডে-তে সবাই মিলে ড্রাম পিটুন, কালীপূজোয় বাজি ফাটিয়ে লোকের পিলে চমকে দিন, দিস-টাইম ফর আফ্রিকা'র ফুটবলে ভুভুজেলা কে মিশিয়ে দিন, ধর্ম-কম্মের দোহাই দিয়ে অন্যের কানের লতিতে মাইক বেঁধে গাঁতিয়ে কেত্তন শোনান, মনুমেন্টের ঘাড়ে মাইক বেঁধে গাঁকগাঁক করে আজান পড়ুন.. ঐ ডবল ডিমের অমলেটের ওপর ল্যাদ ছিটিয়ে স্যানক্স করা ভদ্রলোকের ডিমদের, ঘুম থেকে তুলে, আড়মোড় ভাঙ্গিয়ে দেখিয়ে দিন, এই যুগটা অযথা শব্দ করারই, যুগটা হুজুগের, যুগটা নিজের ঢাক নিজে পেটানোর, যুগটা বিজ্ঞাপনের, যুগটা ভেজালের।
এযুগে রাহুল দ্রাভিডের কভার ড্রাইভ থেকে আলিয়া ভাটের ডিম্পল, পাউরুটি থেকে শুরু করে হানি সিং'র টাট্টু, কবির বিবেক থেকে আপনার স্বপ্ন সবকিছুই বিক্রি হয়,সবকিছুরই মার্কেটিং হয়, ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডার হয়, আর সবকিছুতেই ভেজাল হয় ...তাই শুধু ম্যাগির ভেজালেই মাথায় আকাশ ভেঙ্গে ফেললে কি করে চলবে বলুন?
প্রধানমন্ত্রী সুদিনের গপ্পো লিখে, ৫৮ পাতার ভেজাল ইস্তেহারে, ৩১%'র মন জয় করলেন, মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরের ৪০০ একর জমি ফেরতের ভেজাল স্বপ্ন দেখালেন, আম্মা আর ভাইজানরা আইনের ভেজাল ঝোলা গুড়ে দেশবাসী কে লবডঙ্কা দেখালেন, নতুন প্রজন্মের শৈশবে নৈতিকতার ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী হারিয়ে যায় ভেজাল সর্বশক্তিমান স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান দের অ্যানিমেশনে, তার বেলা ? যখন অতিনায়ক সাদাচামড়ার অরণ্যদেবের কাছে নতজানু হয়ে প্রার্থনা জানাতে হয় নেংটি পড়া মন্ত্রমুগ্ধ কালো মানুষদেরই, সাদা চামড়ার ম্যানড্রেকের দেহরক্ষী হতে হয় কালো চামড়ার কাউকেই কিম্বা যখন আপনার ছেলে-মেয়ে আয়রনম্যানদের হাতে ভাত খায় --- বর্ণ বৈষম্যের ভেজাল থাকে না বলছেন ?
তাহলে কি আপনি টানা ১৩ দিন ফেয়ার লাভলী মাখলে ফটাস করে কাকেশ্বর কুচকুচে থেকে অ্যাঞ্জিলিনা জোলি হয়ে যান ? নিয়মিত ডাভ সাবান মাখলে নিজের ত্বককে ফর্মুলা ওয়ানের সার্কিটের মত মসৃণ মনে হয় ? নিয়মিত হরলিক্স দুধে গুলে দিলে আপনার সন্তানের গুরু মস্তিষ্কের ক্যামিকেল লোচা'র তীব্রতা তরান্বিত হয় ? আপনি কি তাহলে বিশ্বাস করেন ছায়া প্রকাশনীর প্রশ্ন-বিচিত্রাই আসলে মেধার বিকল্প? ঘরে সার্ফ এক্সেল কিনে এনে আপনি 'দাগ আচ্ছা হ্যা' বলে কাদায় গড়াগড়ি দেন ? আপনি কি মনে করেন সচিন তেন্ডুলকারের ৫১টা সেঞ্চুরির 'সিক্রেট' আসলে বুস্টের 'এনার্জি' ? হিরো হন্ডার উপর চেপে বসলে আপনি দেশের হার্ট-বিটের ই সি জি করতে পারেন ? পরীক্ষার হলে সমাকলনের অঙ্ক আটকে গেলে আপনি কি 'দিমাগ কি বাত্তি' জ্বালানোর জন্য পকেট থেকে বের করে মেন্টস চোষেন ? আচ্ছা আপনিই বলুন .. কোন ডিওড্রেন্ট গায়ে মাখলে যদি আপনার প্রতিবেশীদের ঘরের মেয়েরা এসে একসাথে আপনাকে জাপটে ধরে সেটা কি আপনার পক্ষে আদেও স্বস্তিদায়ক হবে ? অমিতাভ-মাধুরী আর প্রীতি জিন্টা প্যাকেট হাতে নিতে দাঁত ক্যালিয়ে 'টেস্ট ভি হেলথ ভি'... বলে দিলেই নেসলের ম্যাগি কি দু-মিনিটেই নির্ভেজাল হয়ে যাবে ? আফটার অল বুদ্ধিজীবী সেলিব্রেটি দের নৈতিকতাও থাকতে হবে এমন মাথার দিব্যি আপনি আদেও দিয়েছেন কি ? সবাই তো আর কঙ্গনা রানাউত নয়, যে ফেয়ারনেস ক্রিমের ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডারের অফার নাকচ করে নিজের পেটে নিজেই লাথি মেরে জিরো ফিগার বানানোর ধান্দা খুঁজবে ...
ইচ্ছে হলেই নায়ক-নায়িকারা লাদাকের চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যে নেচে গেয়ে বেড়াচ্ছেন, ফাটাকেষ্ট এক-ঘুষিতে ভিলেনের ভুঁড়িওয়ালা চামচাকে পাশের দোকানের হাঁড়িকলসি সহ উল্টে দিচ্ছেন, মাসাকুলার প্রেমিক, সুন্দরী নায়িকা কে প্রেম নিবেদন করলেই, রিমঝিম বৃষ্টি শুরু হচ্ছে, সাইকেল নিয়ে শাহরুখ স্করপিও কে টেক্কা দিচ্ছেন, এককালের ফেলুদা হনুমান চল্লিশার বিজ্ঞাপন করছেন, রাত্রি হলেই খবরের চ্যানেলে জ্যোতিষীরা আপনার চাকরীর জন্য, মহার্ঘ্য ভাতার জন্য, মেয়ের বিয়েতে পণের টাকা জোগাড়ের জন্য, সারদার টাকা ফেরত পাবার জন্য হাতের দশটা আঙ্গুলে দশটা রত্ন গুঁজে দিচ্ছেন... আর আমি নিশ্চিন্ত মনে তালি দিচ্ছে, লুঙ্গি তুলে, কোমরে বেঁধে, মুখে আঙ্গুল পুরে সিটি মারছি ..
এরপরেও বলবেন ভেজাল শুধু ম্যাগিতেই ? কি যে বলেন স্যার ? আমার বোধবুদ্ধির আইসোটোপ ল্যাবরোটারি তে নিয়ে গিয়ে টেস্ট করে দেখুন ... আমি নিশ্চিত, মাত্রাতিরিক্ত সোডিয়াম গ্লুটামেট আর বিপজ্জনক লিডের নমুনা রয়েছে আমার বিবেকেও ..

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০১৫

ভালোবাসার টুকরো ছবি - শুভাশিষ আচার্য্য


জীবনের কিছু মোড় আছে কিছু সিদ্ধান্ত আছে যা যে মানুষ টা নিচ্ছে তাঁর কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ সেরকমই তার চারপাশের জড়িয়ে থাকা মানুষদের কাছে তা হয়ে ওঠে প্রভাবিত করার উপকরণ। আর একটা ব্যাপার আর সবথেকে মুল ব্যাপার হল এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সিদ্ধান্ত সময়োচিত হলে তিনি সফল আর তা না হলে সেটা আর সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়না। আর একটা ব্যাপার হল আমাদের দেশ কাল সমাজ। এ এমন এক মৈত্রীমণ্ডল এমন এক ছায়া যুদ্ধ এমন এক অপরিবেশ বান্ধব যে আজ রাতে রুটির সাথে পেঁয়াজ পাতে থাকবে কিনা সে সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে থাকেনা অনেক সময়। এরকম একটা বিষম সময় হুট করে তিনি সেই ভুবনজয়ী সিদ্ধান্তটা কত অনায়াসে নিয়েছিলেন। এক জ্ঞান তিতিক্ষু মন নিয়ে মাঝ রাতে ঠিক হয়ে গেল সরকারি চাকরির দরকারি কাজ গুল ছুড়ে দিয়ে কাল সকাল থেকে হবে শুধু লেখা লেখির কাজ। ভুবনজয়ী সিদ্ধান্ত। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আর আমরা প্রভাবিত হলাম।

তারপর আর তাঁর কলম থেমে থাকেনি। পাতার পর পাতা দিস্তার পর দিস্তা বই এর পরে বই। মন গড়া নয় মনের ভিতর ঢুকে মনের মানুষের গল্প লিখতেন তিনি যা হত এক একটা ভালোবাসার টুকরো ছবি। তাই ত আমাদের এত কাছের মানুষ মনে হয়। কোন রাজনীতি ভাবনা ধারা চালিত একদম ই নয় খুব সাধারণ লোকেদের কাছে থাকা একজন।

সদাহাস্য আর যাকে আমরা বলতে পারি শুচিস্মিতা তিনি তাই। কিন্তু এসবের পরেও আর একটা ব্যাপার হল তাঁর গভীর চোখ যা নিরন্তর তাঁর সাথে সাথ দিয়েছে যখন তিনি কথা বলতেন আর যে চোখের থেকে আমরা কেউ নিস্তার পাইনি। সবাই ধরা দিয়েছি আপন আপন সুখ দুঃখ নিয়ে। তিনি সেই দুর্দান্ত চোখ দিয়ে দেখেছেন আমাদের দৈনন্দিন মাধুর্য। সেই সব আমাদের কথা রচনা হয়েছে তাঁর রচনাবলীতে।

বিদ্যা যত ছড়ায় তত বাড়ে এমনি শুনেছি কিন্তু হৃদয় যত টুকরো হয় তত কি বাড়তে থাকে। মনে হয় না। নাহলে উনি যে তাঁর হৃদয় দিয়ে এত ছবি এঁকেছেন সে ছবি করতে গিয়ে তাঁর হৃদয় ও কি পুড়তে থেকেছে প্রতিনিয়ত। সে হৃদয় কি কমজোরি হয়ে মৃত্যু মুখে ফেলে দিল তাঁকে। তিনি যদি সাধারণ হতেন তাহলে এটাই ঘটনা বলে প্রকাশিত হত হয়তোবা।

কিন্তু তিনি ত সিদ্ধান্ত নেন। তাই ১২ই মে আবার সেই এক মাঝ রাতে সিদ্ধান্ত নিলেন আর ইহ লোকের কথা লিখবেন না। এবারে যেতে হবে অন্য কোথাও অন্য কোন খানে। চলেও গেলেন আমাদের ছেড়ে। তিনি আর কেউ নন সুচিত্রা ভট্টাচার্য।

সোমবার, ১১ মে, ২০১৫

বাঁচার গান - শুভাশিষ আচার্য্য

ফুল ছোঁড়গো পুষ্প দয়াল মাঝরাতে।
আসর যাব ব্যান্ড বাজছে শিশুর মন,
এলোমেলো কথা বারতা দিগদিশাহীন,
আর কত গো পুড়বো আমি আত্মতেজে,
বাঁচব আমি আরও বাঁচব মধুরবেদন,
যাক ছিঁড়ে যাক সব-ভাবনা গরল দহে,
ফুল ছোঁড়গো পুষ্প দয়াল মাঝরাতে।

স্বপ্নবাতি নিভে যাচ্ছে রোজপ্রতিদিন,
মোহর গুনে ফক্কাজীবন চাওয়া পাওয়া,
মাঝ রাত্রি আমার পাড়া ঘুমবিলাসি,
ফুল ছোঁড়গো পুষ্প দয়াল ফুল ছোঁড়।

শনিবার, ৯ মে, ২০১৫

শেষ হয়েও ... - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


টেবিলের কোনায় পড়ন্ত বিকেলের একটুকরো রোদ এসে পড়েছে। দক্ষিন পূর্ব বাভারিয়ায় গ্রীষ্মের তুলনা হয়ত পৃথিবীর কোথাও নেই। ঝিরিঝিরে হাওয়া, নরম সোনালি রোদ। গাছের পাতা গুলো মনে হচ্ছে হালকা সবুজ মাখনের তৈরি, যেন আর একটু রোদ পেলেই গলতে শুরু করবে। এ অঞ্চলের লোকজন ভারি হাসিমুখ। একটু গাঁইয়া বটে, কিন্তু হাঁদা হবার সুবিধে আছে। যাই বোঝানো হোক, ঝটপট বুঝে যায়। বিংশ শতকের শুরু থেকেই জীবনের লয় দ্রুত হতে শুরু করেছে। এই ১৯৩৭ সালের কেজো পৃথিবীর সঙ্গে গত শতকের অভিজাত ধীরলয়ের জীবনের অনেক পার্থক্য। সে জীবনে গতি ছিলোনা বটে, কিন্তু আভিজাত্য ছিলো, চিন্তার খোরাক ছিলো, মাথা খাটাবার জায়গা ছিলো, সুক্ষতা ছিলো, শিল্পের ছোঁয়া ছিলো সব কিছুর মধ্যেই, এমনকি অপরাধ ও অনেক......।

বারান্দার নিচে একটা ঢাউস কালো চক্‌চকে মোটরগাড়ি এসে দাঁড়ালো। অলস চোখে সেদিকে তাকালেন বর্ষীয়ান প্রোফেসর। চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। পিঠ বেঁকে দুমড়ে গেছে। শনের মত দু চার গাছি সাদা চুল অবশিষ্ট রয়েছে। ঈগলের মত বাঁকা নাক, চোখা থুতনি আর চোখের তীব্র নীল দৃষ্টি এখনো অনেক মানুষকে থমকে দাঁড় করিয়ে দেয়। তবে কিনা, এই অজ্ঞাতবাসে কেটে গেল অনেক গুলো বছর। লোকালয় থেকে একটু বাইরে এই বাড়িটায় তিনি গত ১৪ বছর রয়েছেন। তার আগে কাছাকাছি গাঁয়ে ভাড়া থাকতেন। একদম কাছেই অস্ট্রিয়া সীমান্ত। এ অঞ্চলটা জার্মানির মধ্যে পড়লেও পূব-দক্ষিন-পশ্চিম তিন দিকেই অস্ট্রিয়া দিয়ে ঘেরা। পায়ে হেঁটেই সীমানা পেরিয়ে যাওয়া যায়। আগে তো পাহারাও থাকতো না। মহাযুদ্ধের পর অবশ্য ডান্ডা হাতে পুলিশ টহল দেয়। তবে এই পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে কতটুকুই বা পাহারা দেওয়া সম্ভব। সুইস সীমানাও বেশি দূরে নয়। লেক-কন্সস্ট্যান্স পার হলেই ওপারে সুইটৎসারল্যান্ড। ওই রাস্তা ধরেই তো প্রথম বার এখানে এসে অজ্ঞাতবাসের ডেরা খুঁজে বের করেছিলেন তিনি। তার পরে কেটে গেছে ৫০টা বছর। এখন তিনি ছিয়ানব্বই। শরীর আর দেয়না। তবু মাথা কাজ করে চলেছে। এই পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট গাঁ বার্ষটেশগাডেনে নিশ্চিন্তে দেশ বিদেশ থেকে লোকজন আসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।

কাঠের সিঁড়িতে ধুপ ধাপ শব্দ। তিনি জানেন মোটরে করে কে এসেছে। তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত। গত আঠেরো বছর ছোকরা তাঁর কাছে ঘোরাফেরা করছে। শিখেছে অনেক। অনেক কিছুই করেছেকিন্তু জার্মান মাথা তো, ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিজ্ঞানে মাথা খুললেও বাদবাকি ব্যাপারে ভোঁতা। এ ছোকরা আবার ফৌজে ছিলো। কাজেই আরো একটু বেশীই মোটা দাগের। যদিও তাঁর কথা দেববাক্য হিসেবে মান্য করে। তবুও মাত্রাজ্ঞানের নিতান্ত অভাব, তার ওপরে সুক্ষতা, শিল্প এসবের সে মোটেই ধার ধারেনা। থাকতো যদি গত শতাব্দীর ......।

ভাবতে ভাবতেই ধুড়ুম করে দরজা খুলে শিষ্যের আগমন। পেছন পেছন খানতিনেক চ্যালা। কেন যে এরা লেজুড় ছাড়া চলতে পারে না! চ্যালা...। মনে পড়ে গেল অনেক পুরোনো কথা। হালকা হাসলেন প্রোফেসর নিজের মনে। প্রবলতম প্রতিদ্বন্দী তাঁর। নাঃ সে ও চ্যালা ছাড়া চলতোনা। একবারই চেষ্টা করেছিলো, তার পর তো ......।

- মাই বয়, কতবার বলেছি আমার ঘরে বেশী লোক আমি পছন্দ করিনা।

- এজ টুট মির লাইড হের প্রোফেসর, আই অ্যাম ভেরি সরি, আমি বলছি এদের চলে যেতে। য়প, রুডি, হারমান তোমরা নিচে অপেক্ষা করো। আমি আধঘন্টায় আসছি।

তিনজন থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন ঘর থেলে। এই আইরিশ বুড়োর বদমেজাজের কাছে তাদের গুরু কেন এতটা হেঁহেঁ করেন সেটা পরিস্কার নয়। গুরু আর বৃদ্ধ প্রোফেসর, দুজনেরই কড়া হুকুম আছে, এই সাক্ষাৎকার এমনকি প্রোফেসরের অস্তিত্বটুকু যেন কাকপক্ষিতেও না জানতে পারে।

- হারমান একটা হোঁৎকা মাথামোটা। রুডিও ফক্কা, ওর এক কান দিয়ে তাকালে অন্য কানের ফুটো দিয়ে আকাশ দেখা যায়। একমাত্র য়পের মধ্যে কিছুটা সুক্ষতা আছে মাই বয়, কিন্তু সেও অন্ধ আনুগত্যে তোমাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারছেনা। তোমার চ্যালাদের আমি ভালো চোখে দেখিনা। তুমি জানো।

- আমি জানি প্রোফেসর, কিন্তু এরা আমাকে এক মুহুর্ত চোখের আড়াল করতে চায়না।

- নিজের জন্যে আলাদা সময় রাখতে শেখো মাই ডিয়ার বয়, না হলে মাথা খেলবে কি করে? নতুন পরিকল্পনা আসবে কি করে? সুক্ষতা আসবে কি করে? আর্ট ব্যাপারটা অত ফ্যালনা নয়।

- আপনি তো জানেন প্রোফেসর, আমি নিজে ছবি আঁকতাম, এবং খারাপ আঁকতাম না, শিল্প বুঝিনা একথা.........

- গত পনেরো বছর ঠেকো রোদে দাঁড়িয়ে চড়া গলায় চেল্লামেল্লি করে তোমার ভেতরের আর্টিস্ট শুখিয়ে গেছে মাই বয়। আর তোমার এই চ্যালাচামুন্ডাদের ভেতরেও কেউ সেই যোগ্যতা রাখেনা।

- আলবার্টও না? আপনি তো দেখেছেন তার সৃষ্টি।

- ছোঃ। স্রেফ মোমবাতি, ওভালটিনের কৌটো আর দেশলাই বাক্সর মত দেখতে বিকট কিছু কংক্রিটের দামড়া চাঁই তৈরি করেছে তোমার সাধের স্থপতি। তুমি আইফেল টাওয়ার দেখেছ?

- প্রোফেসর, আপনি জানেন, ওই ফরাসি বেলেল্লাগুলোর মুন্ডু আমি স্টিম রোলারের...... ।

- অন্য সব কাজের মত ক্রাইমের একটা ডিগিনিটি থাকা দরকার ডিয়ার বয়, একটা সুক্ষতা, একটা ওস্তাদের হাতের ছোঁয়া। ওয়ার্ক অফ আর্ট। না হলে তোমাতে, আর হুন সর্দার আত্তিলা তে তফাত কি রইল বলতে পারো? ব্লাডি ভ্যান্ডালিজম।

দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকলো জিম। জিমের বয়স আশি পেরিয়েছে। প্রোফেসরের একসময়ের শিষ্য সেবাস্টিয়ানের আর্দালী এই জিম। কর্নেল সেবাস্টিয়ানের সঙ্গে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে ছিলো সে। আফগান যুদ্ধে একটা পা হারায়। লন্ডনে সেবাস্টিয়ান বেঘোরে মারা যাবার পর জিম একা হয়ে পড়ে। সেই থেকে প্রোফেসরের আশ্রয়েই রয়েছে সে। জিমের হাতে চায়ের ট্রে। খাঁটি ব্রিটিশ, বিকেলের চা খাওয়ার অভ্যেস এত বছর এই কফিখোর জার্মানদের মধ্যে থেকেও ছাড়তে পারেননি প্রোফেসর। তাঁর দেখাদেখি তাঁর এখনকার শিষ্যও চায়ের অভ্যেস ধরেছে। তাঁরই মত দুধ চিনি ছাড়া কালো চা, আর সঙ্গে কিছু হান্টলি পামারের খাঁটি ব্রিটিশ বিস্কুট। দুটোই নিয়মিত আনানো হয়ে থাকে লন্ডন থেকে।    

- সেদিন ওই চশমাপরা ছোকরা এসেছিলো, গোলগাল মুখ, ওকে আমার বেশ লেগেছে। মাথাটি ঠান্ডা, কিছুটা আত্মমগ্ন। এরকম ছেলে আমার পছন্দ মাই বয়।

- হাইনরিখ?

- তাই বোধহয় নামটা। বয়স বাড়ছে মাই বয়, নাম মনে থাকেনা সব সময়............... তবে আমি মারা যাবার মুহুর্তেও ...... একটি নাম কিছুতেই ভুলবোনা। কিছুতেই না।

- হাইনরিখ খুব কাজের ছেলে প্রোফেসর। আর্নষ্টের পরে ওই তো হাল ধরেছে। আপনি সে যাত্রা খুব বাঁচিয়েছিলেন প্রোফেসর, বুঝতেই পারিনি যত নষ্টের গোড়া ঐ আর্নষ্ট র‍্যোম। ওর বাদামী জামা পরা গুন্ডাগুলো হয়ত আমাকেই ধরে জেলে পুরতো। ওই যে এক রাতের মধ্যে সব কটা রাঘব বোয়াল কে সরাতে পারলাম, সেই দিনই বুঝতে পারি আমি ঠিক গুরুর শিষ্যত্বই নিয়েছি। কি নিখুঁত পরিকল্পনা করে দিয়েছিলেন সেদিন। আর রাইখস্ট্যাগে আগুন? ওটা তো সত্যিই শিল্প হের প্রোফেসর।

- সাবধান মাইন ডিয়ার বয়। আমি কিন্তু আর বেশী দিন নেই। খুব সাবধান।

- আপনাকে ছাড়া আমি কিছু চিন্তাই করতে পারিনা হের প্রোফেসর। আমার সামনে প্রধান সমস্যা য়ুডেন বেনিয়ারা। কি করা যায় এদের নিয়ে? কি ভাবে আর কোথায় পাঠাই এদের? এতদিন তো এদের নামে লোক ক্ষেপিয়ে এলাম। এখন চুপচাপ এদের ছেড়ে দিলে, লোকে আমাকেই ঠ্যাঙাবে। 

- ছাড়বে কেন?

- কি করব? খতম?

- এত লোক কে বন্দি করে খাওয়াতে পারবে?

- পাগল নাকি? আমাদের নিজেদেরই খাওয়া শোওয়ার জায়গার অভাব। গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেবো।

- তার পর? এত লোক কে গুলি করবে? আর দেহগুলো কবর দেবে কোথায়? প্রায় ষাট সত্তর লক্ষ লোকের কথা হচ্ছে কিন্তু। পরিকল্পনার সময় আগুপিছু ভাবতে শেখো ছোকরা।

- তাহলে? আপনি বলুন প্রোফেসর।

- একটা প্ল্যান আছে বটে। হয়ত এটাই আমার শেষ কির্তি। শেষ শিল্প। ক্রাইমের দুনিয়ায় শেষ আর্ট। আমি নিশ্চিত, আমার পরে আর কেউ আর্ট নিয়ে মাথা ঘামাবে না অপরাধের দুনিয়ায়। বিগত যুগের আমিই শেষ প্রতিনিধি।

- কি প্ল্যান হের প্রোফেসর?

- তুমি বুয়র যুদ্ধ সম্পর্কে কিছু জানো? মানে দক্ষিন আফ্রিকার ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট ওখানে বুয়র জনগোষ্ঠিকে কিছু ক্যাম্পের মধ্যে ঢুকিয়ে............

- ইখ বিন... মানে আমি ...মানে ...এসব...

- বুঝেছি। তুমি জানবে না। এক কাজ করো মায় ডিয়ার বয়, ওই হাইনরিখ ছোকরা কে পাঠাও আমার কাছে। তাকেই বুঝিয়ে দিচ্ছি কি করতে হবে।

 

*  *  *  *  *  *  *  *    

টুপির তলা থেকে জাল ঝুলছে। মুখ ঢাকা। লম্বা কাঠামো সামনে দিকে ঝুঁকে এসেছে বয়সের কারনে। পরনে চামড়ার কোর্তা , পায়ে রবারের গামবুট হাতে গ্লাভস। লম্বা লম্বা পা ফেলে বুড়ো মানুষটি সন্ধ্যের মুখে তাঁর ডাচায় এসে ঢুকলেন। ডাচা হলো রাশিয়ান খামারবাড়ি। বৃদ্ধ এখানে মৌমাছি পালন করেন। মৌমাছি নিয়ে কিছু গবেষনাও করেন। বই ও লিখেছেন মৌমাছি পালন নিয়ে। টুপি থেকে মুখের জাল খোলার পর দেখা গেল তাঁর উঁচু কপাল, খাড়া নাক, ভাঙ্গা গাল। এই সব বৈশিষ্ট তাঁকে গড়পরতা রুশিদের থেকে কিছুটা আলাদা করেছে। ডাচার সামনে বারান্দায় একটা সাধারন কাঠের গোল টেবিল। তার ওপরে একটা সামোভারে জল ফুটছে। আর একটা কেটলি তে চায়ের লিকার। রুশি চায়ের কাপ খুব বাহারের হয়। ইংলিশ টি এর মত অবশ্য দুধ চিনি মিশিয়ে বিস্কুট বা কেকের সঙ্গে চা খাবার অভ্যেস ও রুশিদের নেই। এরা কালো চা খায় মাঝে মাঝে তাতে লেবুর রস মেশায় কয়েক ফোঁটা। আজন্ম ইংলিশ অভ্যেসের সঙ্গে না মিললেও কিছু এসে যায়না। এই রুশি চা তাঁর ভালোই লাগে। কেবল আজ পর্যন্ত তিনি রুশি তামাকে অভ্যস্ত হতে পারলেন না। তাঁর জন্যে স্টেট এক্সপ্রেস টোব্যাকো আসে লন্ডন থেকে। সেই তামাক তাঁর সাধের ব্রায়ার পাইপে কিছুটা ভরে দুটো টান দিলেন। মাথাটা হালকা লাগছে। সামনে বেশ কিছুটা দূরে লালচে ধুলো উড়িয়ে একটা গাড়ি আসছে। এই সন্ধ্যের মুখে মস্কোর কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে এই খামারবাড়িতে একজনই আসেন। টুপি মাথায় ঝুপো গোঁফ ওয়ালা বেঁটেখাটো লোকটিকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে বৃদ্ধের মুখে তেমন কোনো ভাবান্তর হলোনা। আবেগ ব্যাপারটা তাঁর চরিত্রে কোনোকালেই নেই। তবুও এক পলকের জন্য যেন মনে হলো খুব সামান্য একটা হাসি ফুটে উঠলো পাতলা ঠোঁটের কোনায়। টুপিটি টেবলের ওপর রেখে নবাগত লোকটি বসলেন আরাম করে। বৃদ্ধ মুখ থেকে পাইপ নামালেন, গম্ভীর-গভীর গলার স্বর তাঁর।

- শুভ সন্ধ্যা কোবা, আশাকরি সপ্তাহ ভালো কেটেছে তোমার।

- তাভারিষ স্তারিক, আপনি এই সন্ধ্যেবেলায় চা খাচ্ছেন?

জামার বুক পকেট থেকে কাজবেক সিগারেট বের করলেন কোবা। টেবিল থেকে দেশলাই তুলে নিয়ে ধরালেন। বৃদ্ধ পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে মাথাটা একটু পেছনে হেলিয়ে কথা শুরু করলেন -

- কোবা, ইম্পেরিয়াল টোকে এখানে আর পাচ্ছি কোথায়? চা ই চলুক। অন্ততঃ যতক্ষন না তুমি গাড়ির পেছনের আসনে রাখা ব্যাগ থেকে জর্জিয়ান ওয়াইনের বোতলটা বের করো।

- তাভারিষ স্তারিক, আপনি কি করে বুঝতে পেরে যান বলুন তো সব সময়?

- তোমার বাতুসকার বুক পকেট থেকে সিগারেট বের করার সময় মস্কোর এলিসিভস্কি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের রসিদটা আমার টেবিলের ওপর পড়ল যে। এক রুবল বাড়তি দিয়ে আবার সেটা উপহার দেবার জন্যে অয়েল পেপারের মোড়কে মুড়েও এনেছ দেখছি।

- আপনার চোখ এড়ানো খুব শক্ত। কিন্তু রসিদে দেখছি শুধু ওয়াইন লেখা আছে, জর্জিয়ান, ফরাসি কি পর্তুগিজ সেটাতো লেখা নেই। আপনি বুঝলেন কি করে?

- মাই ডিয়ার ফেলো, নিজের আপন জন্মভুমির জিনিসটি সকলেই সেরা বলে মানে। আমিও, তুমিও। নিজে হাতে করে জর্জিয়ান ওয়াইন কিনবে বলেই তোমাকে এলিসিভস্কি যেতে হলো। না হলে এমনি ওয়াইন মস্কোর যে কোনো দোকানেই পেতে তুমি।

- হুঁ, এভাবে ভেবে দেখিনি অবশ্য...।

- মাই ডিয়ার কোবা, এটাকে বলে অবরোহমুলক সিদ্ধান্ত। আমার সারা জীবনের চর্চার বিষয়। তবে এটাও বুঝতে পারছি, আজ তুমি বেজায় খুশি, আর সেটা খুব সম্ভবতঃ তোমায় পাঠানো পাঁচটি নামের তালিকা পেয়ে যাবার আনন্দ।

- তাভারিষ স্তারিক, আমি তো আপনার চিঠি পেয়ে তাজ্জব। নাম গুলো দেখে আমি তো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে এরাই............

- শোনো হে, এই সুক্ষ কাজের পেছনে যে মাথা আছে, তাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। কাজেই তোমার মত আমি মোটেই আশ্চর্‍্য্য হইনি। এই মাথা প্রয়োজন হলে যে কোনো লোক কে তার অপরাধী জালে জড়াতে পারে, আর তাকে দিয়ে যে কোনো কাজ করাতে পারে। শুনলে আশ্চর্‍্য্য হবে মাই ডিয়ার ফেলো, অনেকে বুঝতেই পারেনা যে সে আসলে যা করছে, সেটা ঘোরতর অপরাধ, আর তাকে চালনা করছে অন্য কেউ।

- তাহলে কমরেড সেই আসল লোকের নামটাই আমাকে দিন না। আমি তাকে ঠিক পাকড়ে আনবো।

- পারবেনা কোবা, পারবে না। আমি তাকে কি বলি জানো? সে হলো অপরাধ জগতের নেপোলিয়ান।

- নেপোলিয়নেরও ওয়াটারলু ছিলো। এই রুশ ভুমি থেকে তাকে ফিরতে হয়েছে মাথা নিচু করে।

- মাথা নিচু করে তাকেও ফেরাতে পেরেছি আমি কোবা, কিন্তু তার ওয়াটারলু এখনো “দুর-অস্ত”।

- ওটা কি বললেন তাভারিশ স্তারিক? দূর না কি যেন?

- ওটা ফার্সি কমরেড কোবা, তোমার মাতৃভূমির কাছেই, সীমান্তের ওপারে এই ভাষায় কথা বলে লোকে। দুর-অস্ত মানে অনেক দূর।

- আমি জানি তাভারিষ, ফার্সি আজারবাইজানেও অনেকেই বলে। জাতীগত সাংস্কৃতিক বৈচিত্র আর বৈশিষ্টের ওপরে আমি অনেক দিন কাজ করেছি।

- তোমার গুরু আমাকে তোমার ব্যাপারে কি বলতেন জানো কোবা?

- কি বলতেন?

- তখন আমি সুইটৎসারল্যান্ডে। একটা দুর্ঘটনার পর কিছুদিন বিশ্রাম নিচ্ছি, সেই সময়েই তোমার গুরুর সঙ্গে আমার আলাপ। উনি বলতেন আমার বয়সে আমি নাকি যত আলু খেয়েছি, তোমাকে নাকি জারের পুলিস রাজদ্রোহের জন্যে তার চেয়েও বেশিবার গ্রেফতার করেছে, আর রুশ এম্পায়ারের সমস্ত রাজ্যের সব জেলেই নাকি তুমি কিছুদিন কাটিয়েছো।

- হা হা হা হা হা হা। উনি আমাকে স্নেহ করতেন খুব।

- তীক্ষ্ণ পর্য্যবেক্ষন ক্ষমতা ছিলো তোমার গুরুর। অসাধারন ধী-শক্তি। তাঁর যুক্তির জাল কাটিয়ে বেরোনো প্রায় অসম্ভব। ভাবতাম দেশ ছেড়ে এতদুরে বসে এই প্রতিভাধর মানুষটা কি করছেন? প্রথমে ভাবতাম উনিও আমার দাদার মত। আমার দাদা তো অসামান্য প্রতিভা নিয়ে স্রেফ একটা ক্লাবে বসে বই পড়েই চুপচাপ জীবন কাটিয়ে দিলেন। পরে দেশে ফিরে তো তিনি......... (পাইপে টান দিলেন বৃদ্ধ)

- আচ্ছা স্তারিক, এত কিছু থাকতে আপনি মৌমাছি পালন করেন কেন বলুন তো?

- ভ্লাদিমির, মানে তোমার গুরু আমাকে কিছু বইপত্র পড়তে দিয়েছিলেন। খুবই ইনটারেস্টিং আর যুক্তির কাঠামো। অপরাধ জগৎ নিয়ে কাজ করে গেছি সারাজীবন, তোমার গুরু, আর তাঁর দেওয়া এই সব বইপত্র গুলোও দেখলাম অপরাধ নিয়েই কথা বলে গেছে। কি ভাবে ঠকানো হচ্ছে লোকজনকে। কত বড় জালিয়াতি। এক দল হাতিয়ে নিচ্ছে অন্য দলের সব কিছু, অথচ তার প্রতিকার হচ্ছে না। সব জায়গায় তো স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড দিয়ে কাজ চলেনা মাই ডিয়ার ফেলো।

- এর সঙ্গে মৌমাছির যোগ কোথায়?

- দেখলাম, তারা বুদ্ধির দিক থেকে, শক্তির দিক থেকে, প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক কমজোরি হতে পারে, কিন্তু তাদের সামাজিক কাঠামো তাদের অদ্ভুত শক্তি দিয়েছে কোবা। সামাজিক ভেদাভেদ এদের মধ্যে নেই, পুরোপুরি রেজিমেন্টেড। কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত সকলে। ফুল থেকে সামান্য রস আহরন করে অসামান্য মধু তৈরি করছে। কি সামান্য কাঁচামাল থেকে দুর্ধর্ষ উৎপাদন ব্যবস্থা। অনেক কিছু শেখার আছে এদের থেকে কোবা।

- তাভারিষ স্তারিক, মানুষ মৌমাছি নয়। শুধু রুটি খেয়ে মানুষ বাঁচেনা। তার চেতনা, তার মনন, সেসব কিছুর জন্যেও খাদ্য দরকার হয়। তার সৃষ্টিশিলতা আলাদা স্বীকৃতি চায়।

- নিশ্চই কোবা, সে গুলো দরকার। অবশ্যই দরকার। কিন্তু একটা কথা ভুলোনা। যত ছোটোই হোক, মৌমাছি তার ওপর আক্রমনকারিকে কখনো ছাড়েনা। হুল ফুটিয়ে নিজেও মরে, আর বহুগুন শক্তিশালী শত্রুকে ঘায়েলও করে। বহিঃশত্রুর মোকাবিলা করার সময় সামাজিক ভেদাভেদ থাকলে চলেনা। মাথায় রেখো কোবা। মাথায় রেখো। পশ্চিমের আকাশে ঘন মেঘ জমেছে, সাংঘাতিক ঝড় আসছে।

- ঝড়? কোথায়? দিব্যি ঝিরঝিরে হাওয়া দিচ্ছে যে, আর আকাশও তো পরিস্কার কমরেড

- তাভারিষ কোবা, মহাযুদ্ধের আগে, ব্রিটিশ সরকারের হয়ে আমি কিছু জার্মান গুপ্তচরের ওপর নজর রাখতে আলটামন্ট নামের এক আইরিশ-আমেরিকানের ছদ্মবেশে ইংল্যান্ডের গন্ডগ্রামে অনেক দিন কাটিয়েছিলাম। এক রাঘব বোয়াল গুপ্তচরকে ধরতেও পেরেছিলাম। আমার দোসর, আমার বন্ধু ডাক্তার, তাকেই ঠিক একই কথা বলেছিলাম, ঝড় আসছে। জানো কোবা, সে ও আমাকে তোমার মতই একই উত্তর দিয়েছিলো।

- ডক্টর ওয়াটসন? আপনি তাঁকে খুব মিস করেন, তাই না কমরেড হোমস?

- খুব। ডাক্তার কে খুব মিস করি এই বুড়ো বয়সে। তবে কিনা তোমার এখানে আমি দিব্যি আছি কোবা। তোমার সঙ্গ আমার ভালো লাগে। বাইরের লোকে যতই তোমাকে ইওসিফ স্তালিন বলে জানুক, আমার কাছে তুমি সেই ১৯১৬ সালের কোবাই থাকবে।

- আজ তাহলে আসি স্তারিক, ওয়াইনটা রইলো। নাম গুলো পেয়ে বড় নিশ্চিন্ত হলাম। সোভিয়েত দেশ থেকে বিদেশী গুপ্তচর আর পঞ্চম বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। আপনার লেস্ট্রেড নেই এখানে, কাজেই আমাদের এনকেভিডি দিয়েই......।

- সাবধান কোবা, খুব সাবধান। এখানে যারা আছে, তারা কেবল শাখাপ্রসাখা, শুঁড়। আসল মাথা বসে আছে অনেক দূরে। অন্য কোথাও। সে যতক্ষন আছে। ততক্ষন নিজেকে নিশ্চিন্ত হতে দিওনা। তীক্ষ্ণ নজর রাখো চারিদিকে। যেখানেই দেখবে নিখুঁত অরগানাইজড ক্রাইম, জানবে এ তারই কাজ।

- আমরা সব সময় নজর রাখছি।

- আর একটা কথা। লেস্ট্রেড নেই বটে, কিন্তু অনেক কাল পরে মনের মত একটি ছাত্র পেয়েছিলাম। তাকে পাঠিয়েছি জাপানে। রিষার্ট জরগে তার নাম। তার কাছ থেকে আসা খবর কখনো অগ্রাহ্য করোনা। সে জাপানে থাকলেও, গোটা পৃথিবীকে সে হাতের তেলোয় রেখে পর্য্যবেক্ষনের ক্ষমতা রাখে।     

 

*  *  *  *  *  *  *  *  

 

সব কটা আলো জ্বললেও ঘরের ভেতরটা কেমন যেন অন্ধকারই থেকে যায়। প্রোফেসরের ব্রিটিশ রুচিতে এ ঘরের সব আসবাবপত্রই ঘন কালো, বা কালচে রঙের। এমন কি কৌচ-কেদারা ও তার গদিও তাই। দক্ষিন-পশ্চিম বাভারিয়ার স্থানীয় বাড়িগুলোর থেকে এ বাড়ি অনেক আলাদা। মেহগনীর তৈরি বিশাল পালংকের ওপরে প্রোফেসর শুয়ে আছেন বুক পর্যন্ত কম্বল ঢাকা নিয়ে। আরো কোটরাগত চোখ। সাদা ফ্যাকাসে মুখ। পালংকের পাশে একটা কাঠের চেয়ারে বসে তাঁর একনিষ্ঠ শিষ্য। সন্ধ্যে পেরিয়ে ঘন অন্ধকার নেমেছে আল্পসের গিরীবর্ত্মে, উপত্যকায়।

- মাই ডিয়ার অ্যাডি, এত চিন্তা করোনা। চিরকাল কেউ থাকেনা। আমার ও দিন শেষের পথে এবার।

- হের প্রোফেসর, ফ্রান্স সমেত গোটা পশ্চিম ইয়োরোপ আমার পায়ের তলায়। ইংল্যান্ডের ওপর সারা দিন সারা রাত বোমা পড়ছে। কি ভাবে আমি পূব দিকে আক্রমন চালাবো?

- আমি নিশ্চিত মাই বয়, সে আছে পূবেই। ইংল্যান্ডে নয়। ইংল্যান্ডের ওপরে বোমা ফেলে তুমি তার চুল ছুঁতে পারবেনা। বরং ইংরেজরা আত্মসমর্পন করে ফেললে বাড়তি সাত কোটি লোককে বসিয়ে খাওয়াতে হবে।

- তাহলে? কি করবো? বোমা ফেলা বন্ধ করে দেবো?

- মাই ডিয়ার বয়, ভুলে যেওনা হাজার হোক ব্রিটেন আমার দেশ, সেখানে এসব দেখতে আমারও ভালো লাগে না। তুমি পূব দিকে নজর দিচ্ছোনা কেন?

- আমি তো ব্রিটিশদের খারাপ চোখে দেখিনা হের প্রোফেসর, আপনি দেখেছেন, আমি ডানকার্কে তাদের ছেড়ে দিয়েছি পিটুনি না দিয়ে।

- তাহলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে এগচ্ছোনা কেন ব্রিটেনকে ছেড়ে?

- না না হের প্রোফেসর, সে হতে পারেনা। এক সঙ্গে দু দিকে যুদ্ধ?

- মাই বয়, আমি থাকতে থাকতে পূবের যুদ্ধ শেষ করো, রাশিয়া দখল করতে তোমার দু-তিন মাস লাগবে বড়জোর। আমি নিশ্চিন্তে চোখ বুঁজবো আমার চরম শত্রুর শেষ দেখে। তাকে তুমি ধরে এনে আমার সামনে গুলি করে মেরো অ্যাডি। সেই রাইখেনবাখের পর তাকে আর দেখিনি। শার্লক হোমসকে মরতে দেখার শেষ সাধটুকু অপূর্ণ রেখোনা আমার।

- ঠিক আছে প্রোফেসর মরিয়ার্টি, এটা মার্চ মাস, আমাকে তিন মাস সময় দিন , মানে এই ৪১ সালের জুন মাসের মধ্যেই অভিযান শুরু হবে রাশিয়ার বিপক্ষে। কথা দিলাম।

- গোটা দুনিয়া তোমার নাম জানবে অ্যাডলফ হিটলার, মাই বয়, আমার নামের মোহ নেই। হাইনরিখ হিমলার ছোকরাকে যে রকম পরিকল্পনা করে দিয়েছি, তাতে আবহমানকালের সেরার সেরা ক্রাইম সংঘটিত করা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। আ পিওর ওয়ার্ক ওফ আর্ট। শিল্প। কেউ আটকাতে পারবেনা। শার্লক হোমসও না। শুধু খেয়াল রেখো, আমি যদি মরে যাই রাশিয়ায় যুদ্ধ শেষের আগে, হোমসের বুদ্ধির সঙ্গে তুমি এঁটে উঠতে পারবে না একা। তাই দেরি করো না।

 

*  *  *  *  *  *  *  *  

 

- সুপ্রভাত কোবা, সক্কাল সক্কাল এদিকে কি মনে করে? আজ কি বিশেষ কোনো দিন?

- আজ তো হলো গিয়ে জুন মাসের ১৫ তারিখ। কিন্তু কমরেড স্তারিক, রিসার্ট জরগের তো কোনো সাড়া শব্দ নেই।

- আসবে আসবে মাই ডিয়ার ফেলো, সে চুপ করে বসে নেই। কিছু তথ্য সে জোগাড় করেছে, কিন্তু এখনো হেঁয়ালির সমাধান করতে পারেনি।

 

- হেঁয়ালি? কিসের?

- রেডিও মেসেজ, টেলিগ্রাম, চিঠি, সবই তো সংকেতে পাঠানো হইয় কোবা যুদ্ধের সময়। তথ্য পেলেই হলো না, তার পাঠোদ্ধার ও করতে হবে তো।

- জার্মানরা শুনেছি একটা যন্ত্র বের করেছে, এনিগমা বলে। সেই যন্ত্র দিয়ে যে সংকেত তারা তৈরি করছে, তার পাঠোদ্ধার নাকি সম্ভব নয়, অন্ততঃ আমাদের বিজ্ঞানিরা তো তাই বলছেন।

- লন্ডনে ওরাও চেষ্টা করছে শুনেছি এই কোড ভাঙ্গার।

- হ্যাঁ তাভারিষ স্তারিক, আর আপনার দাদা মাইক্রফট হোমসের কাছে ব্রিটিশ কোড-ভাঙা টিমের এক ছোকরা দেখা করতেও এসেছিলো। ট্যুরিং না কি যেন নাম।

- দাদা নেমেছে? তাহলে ও কোড ভাঙবেই কোবা। তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।

 

*  *  *  *  *  *  *  *  * 

 

- তাভারিশ স্তালিন, তাভারিশ স্তালিন, এই রাত ২ টোর সময় ঘুম ভাঙ্গানোর জন্যে ক্ষমা চাইছি, কিন্তু জাপান থেকে জরুরি বার্তা পাঠিয়েছেন কমরেড জরগে। আমার সঙ্গে মার্শাল রকোসভস্কি ও আছেন। আর মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই নাকি আক্রমন শুরু করবে জার্মান বাহিনী। তাভারিশ স্তালিন......।

 

*  *  *  *  *  *  *  *  *    

 

- মাইন ফ্যুরার, আপনাকে অভিনন্দন জানাই। আমাদের ফৌজ মিনস্ক দখল করেছে। এই মাত্র খবর এলো। সর্বত্র পিছু হঠছে সোভিয়েত লাল ফৌজ।

- হুঁ। সে তো নাহয় বুঝলাম। কিন্তু দখল করা অঞ্চলে খুব ভালো করে অনুসন্ধান চালাতে হবে। তার বয়স নব্বইয়ের আসেপাশে। রাশিয়ান নয়, সে ব্রিটিশ, লম্বা, খাড়া নাক............ আর কিছু বলবে?

- ইয়ে মানে, মাইন ফ্যুরার, সেই প্রোফেসর, বার্ষটেশগাডেনে আপনি দেখা করতে যান...

- প্রোফেসর মরিয়ার্টি? কি হয়েছে তাঁর? ডাক্তার , নার্সরা দেখাশোনা করছে তো ঠিকঠাক? এই রবিবার আমার যাবার কথা ওখানে। অনেক পরামর্শ নেবার আছে ওনার থেকে।

- না মানে, মাইন ফ্যুরার, একটু আগে খবর এলো...... তিনি আর নেই। মারা গেছেন।

 

*-*

[এরকম একটা উদ্ভট হেঁয়ালি ভরা গল্পের শেষে দু কলম টিকা না জুড়লে পাঠকের মানসপটে কিছু অশ্লীল শব্দ সমষ্টি ঘোরাফেরার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাই, মানে মানে কয়েকটা টিকা দিয়েই দিলাম।]

 

টিকা-টিপ্পনি

* শার্লক হোমসের নিজের কথায় তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দী ছিলেন প্রোফেসর মরিয়ার্টি।

* The Final Problem গল্পে শার্লক হোমস ও প্রফেসর মরিয়ার্টি দুজনেই সুইটৎসারল্যান্ডের রাইখেনবাখ জলপ্রপাতের নিচে পড়ে যান ও মনে করা হয় দুজনেই মারা যান।

* পরে ভক্তদের চাপে, শার্লক হোমস আবার ফিরে আসেন। প্রোফেসর মরিয়ার্টির ডান হাত, কর্নেল সেবাস্টিয়ান মোরানের সঙ্গে হোমসের ঘাত প্রতিঘাত হয়।

* শার্লক হোমস যখন রাইখেনবাখে মারা যাননি, তখন মরিয়ার্টির বেঁচে থাকতে বাধা কোথায়?

* শার্লক হোমস রাইখেনবাখের পরে কিছু দিন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ান। মৌমাছি পালন শেখেন

* স্তালিনের অনেক ছদ্মনামের একটি হলো কোবা। খুব কাছের লোকেরাই তাঁকে এই নামে ডাকতেন

* ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ, বা লেনিন সুইটৎসারলযান্ডে নির্বাসনে কাটিয়েছেন অনেক দিন, ১৯১৭ সালে লুকিয়ে দেশে ফেরেন বিপ্লবের সময়

* ১৯৩৬-৩৮ সালের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে ত্রাতস্কিপন্থি আর ফ্যাসিস্ট চরদের ধরে ফেলা হয়, যার ফলে জার্মান আক্রমনের সময় সে দেশে কোনো পঞ্চমবাহিনী ছিলোনা

* ডানকার্কে কেন হিটলার ব্রিটিশদের ছেড়ে দেন, এবং কেনই বা মাত্র তিন মাস বোমাবাজির পর দুম করে ব্রিটেনের ওপর বোমা ফেলা বন্ধ করেন, সেটা আজ ও অনেকটাই রহস্য।

* রিষার্ট জরগে জাপানে বসে জার্মানির যুদ্ধ প্রস্তুতির নিখুঁত খবর দিতেন স্তালিনকে। কি করে দিতেন, সেটা আজও রহস্য

* জার্মান সামরিক কোড এনিগমা ভাঙ্গেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ গনিতবীদ অ্যালান ট্যুরিং এর নেতৃত্বে একদল গনিতজ্ঞ। তাঁদের একজন ছিলেন সোভিয়েত গুপ্তচর। স্তালিন সব খবরই আগাম পেয়ে যেতেন।

* ১৯৪১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমনের পর থেকে হিটলারের অজেয় বাহিনী হোঁচট খেতে থাকে। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত ও পরস্পরবিরোধী স্বেচ্ছাচারিতার ৪ বছর পরে বার্লিনে পা রাখে বিজয়ী লাল ফৌজ।

* এই লেখার প্রথম প্রকাশের দিন, আজ – ৯ই মে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে ইয়োরোপে লাল ফৌজের বিজয় দিবস