বৃহষ্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০১৪

নবারুণ ~ অনিমেষ বৈদ্য

সেই কলমটা থেমে গেলো আজ,
এই সময়ে সব থেকে যা দামী।
খিস্তি করে দেখানো যার কাজ
রাষ্ট্র আর সমাজের ঢ্যামনামি....

চেতনায় ছুঁয়ে যাক নবারুণ আলো............

বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০১৪

“প্রেম”!! বাপরে বাপ! বহুত চাপ!... - সাগর চক্রবর্তী


বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ- নীচের লেখাটি পড়া আদি অকৃত্রিম নিখাদ প্রেমে উন্মত্ত যুগলের পক্ষ্যে বিপদজনক। নিজেদের দায়িত্বে ঝুঁকি নিয়ে পড়ুন!!

“প্রেম”!! বাপরে বাপ! বহুত চাপ!...

         *****************
হায় হায়!! কথায় বলে, “আশায় বাঁচে চাষা”। এতদিন হল আমাদের রিলেশন, রোজই মনে হয়, এই বুঝি আজ থেকে বেগার খাটা বন্ধ হবে। কিন্তু কোথায় কি! শুধু বেগার খেটে যাও। তাও শুধু ওর জন্য হলে মানতাম। ওর ছোটভাই-মাসির ছেলে-থুত্থুড়ে ঠাম্মা-সবার জন্য খেটে মরতে হবে। “এই তুমি আজ সন্ধায় ফ্রি তো, তাতাই কে একটু ফিজিক্স টা দেখিয়ে দিও।” ব্যস, পাড়ার রকের আড্ডা জলে। সোনামুখ নিয়ে একটা হাফ-বাঁদরকে পড়াতে বোসোঠাকুমার বুক ধড়ফড়, অ্যাপয়েন্টমেন্ট তো বটেই, ডাক্তারখানায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। হ্যাঁ, অবশ্যই ট্যাক্সিতে। ভাড়াটাও তুমিই গুনবে হে গৌরী সেনের নাতজামাই। “বাঁকুড়া থেকে ন’পিসিরা এসেছে, নেটে ৪ টে টিকিট কেটে দাও না সোনা।” উঁহু! নো দাঁতচাপা খিস্তিয়াল কমেন্টস! এখন ডেবিট কার্ডে খরচা তো কি, ও দিকে যে ক্রেডিট (প্রেম) জমছে। বোঝো ঠ্যালা!!
                    *****************
মাঝেমধ্যে মনে হয়, প্রতি উইকেন্ডেই নতুন চাকরির ইন্টার্ভিউতে বসছি। তখন মনকে বোঝাই, না, প্রেম করছি। কিন্তু মন মানতে চায় না। সত্যিই মনে হয়, কেন রে বাবা, প্রেমই তো করছি, তা হলে প্রতি শনিবার বিকেলে অমন ধোপদুরস্ত ধড়াচুড়ো পরে ডিও বাগিয়ে হাঁচিকাশি চেপে প্রেজেন্ট প্লিজ কেন দিতে হবে? রোজ চোখ কুঁচকে, “ম্যাগো, কী মুটচ্ছো রে বাবা! দেখি, বেল্টের ফুটো ফের এক ঘাট বেড়েছে?” বলি, প্রেম করছি না পি.টি. টিচারের কাছে দশ আঙুলের নখ পরিষ্কার কি না দেখাচ্ছি! “এ কি, পাঞ্জাবি পরেছ, এ দিকে পায়ে স্নিকার?” আড়াই দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়িমুখ, সামনে গেলে চাঁদবদনী হাড়িমুখ। “খবরদার চুমু খাবে না এই জঙ্গুলে মুখ নিয়ে!” এতদিনে বুঝেছি, প্রেমিক=২৪*৭ মডেল-লুক। প্রেম করতে গিয়ে আমি ফ্যাশন শিখে ফেলেছি। বোঝো ঠ্যালা!!
                     *****************
মাঠে ঘাটে বসলে পিঁপড়ে-লোফার-ভিখিরি-পলিউসন, তাই রোজ রেস্তরাঁ। টানা হপ্তাদুই বিরিয়ানি, পোলাও, মাটনকসা, চিলিচিকেনের পর, যা হওয়ার তাই। সারা রাত বাথরুমে বসে তার কথা ভাবা। মুশকিলটা হচ্ছে, প্রেমিকের কখনও আমাশা হতে পারে না। তাই ফুটো লিভার-থ্যাতলা প্যানক্রিয়াস আর ছদ্মসুখী মুখ নিয়ে ফের শ্যামবাজার গোলাবাড়িতে হানা দেওয়া, জমিয়ে রেশমি কাবাব আর রোগান জোশ! ক্রমে প্রেম জম্পেশ, আলসার-ও। বেশীরভাগ সময় প্রনয়ী ছেড়ে যায়, পেটব্যথা ছাড়ে না। ধুত্তোর!!
*****************
মুখে চোর চোর ভাব। হাত ধরাধরি করে সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটতে গিয়েও তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুন্ডুর ব্যায়াম। যদি ২-এক পিস চেনা থোবড়া বেরিয়ে পড়ে! আচ্ছা, সামনের সিটের ভদ্রলোকের টাকটা ঠিক মেসমশাইয়ের মতো চকচক করছে না! গাছের আড়াল থেকে অবিকল ছোট কাকার স্টাইলে ধোঁয়ার রিংগুলো বেরিয়ে আসছে না! পার্কের ঝোপে চুমু খেতে গিয়েও বুক ধড়াস ধড়াস। যদি ঘাড়ে এসে পড়ে পুলিশের থাবা! আত্মীয়ঘন পরিবেশে বেমক্কা মোবাইলে ওর ডাক এলে বেইজ্জতির ভয়, দুম করে কেটে দিলে ওর রাগের ভয়, প্রেমের কথা বাড়ীতে চেপে রাখতে ভয়, উগরে দিলে তুমুল অশান্তির ভয়। পঁচিশের আগেই ব্লাডপ্রেশার, ই.বি.এস. (ইরিটেটিং বাওয়াল সিনড্রোম)! বোঝো ঠ্যালা!!
*****************
যেন প্রেম করতে গেলে অসামাজিক হতেই হবে! প্রথমেই বেস্ট ফ্রেন্ডদের নামে চুগলি করে করে তাদের সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেবে। বন্ধুরা যখন ফ্রিক আউট করছে, আমায় পার্কে ওর চোখে চোখ রেখে মশার কামড় খেতে হবে! বন্ধুরা গ্রুপে মন্দারমণি গিয়ে মস্তি করছে, কিন্তু ঐ গ্রুপে ২ টো ছেলে আছে বলে ও আমাকে যেতে দেবে না! কলেজের টিচারের বিয়েতে নেমন্তন্ন। ও কোনও এক অজানা কারণে, এক ঘন্টা আগে সেখানে পৌঁছে আমাকে বের করে আনবে। এই যে আমরা গোটা পৃথিবীটাকে দু’ভাগ করে ফেললাম, এক প্রান্তে আমরা ‘দো জিসম এক জান’ আর অন্য প্রান্তে না জানি কেন ‘দুশমন জমানা’, বলতে নেই কোনও কারণে যদি ‘সাধের প্রেম’টাই ভ্যানিশ হয়ে যায়, তো এই ব্যর্থ প্রেমের আবর্জনা পোড়াতে আসবেটা কে? সেই বন্ধুবান্ধব আত্মীয়রা? যাদের একসময় ২ জনে মিলে ‘হাম কো জমানে সে কেয়া’ বলে ফুটিয়ে দিয়েছিলাম? ইল্লে??
*****************
সবচেয়ে বড় অসুবিধা, প্রেম অন=খিস্তি অফ। ওর সঙ্গে থাকলে, পেট ফুলে গেলেও খিস্তি করা যাবে না। অটোতে ২ জন যাচ্ছি, সিগনালে কেতাবাজ বাইকবাহন ওর দিকে তাকিয়ে স্যাট করে নিজের ঠোঁটে কদর্য জিভ বুলিয়ে নিলেও না! প্রিন্সেপ ঘাটের সিঁড়িতে জোড়ায় বসে আছি, ঠিক সামনেটায় কেউ ছিরিক করে গুটখার পিক ফেললেও না। রাগে অন্ধ, তবু খিস্তি বন্ধ। মাইরি বলছি, আলজিভ নিশপিশিয়ে ভোকেবুলারি উঠে আসে, কিন্তু কেন জানি না ও সামনে থাকলে মুখ দিয়ে পলিটিকালি কারেক্ট ‘অসভ্য! অশিক্ষিত!’ই বেরিয়ে আসে, যাতে ওর মনে হয়, আহা! ‘প্রেমিক’ যে একেবারে গোলাপ পবিত্র, চার অক্ষর বলতে ও শুধু ‘ভালবাসা’ই বোঝে! বোঝো ঠ্যালা!!
*****************
গোড়াতেই নিজের কাছে নিজে শপথ নিতে হয়, ‘যাহা বলিব মিথ্যা বলিব, মিথ্যা বই সত্য বলিব না’।  ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়া টি২০ ম্যাচের নাটকীয় মুহূর্তে প্রেমিকার ফোন এলে অম্লান বদনে বলতে হয় ‘এই তো তোমার কথাই এতক্ষণ ভাবছিলাম’। সাজের বহর দেখে রাগে গা জ্বলে গেলেও মুখে একটুকরো হাসি লাগিয়ে বলতে হয়-‘ফাটাফাটি!’ বুক ফাটলেও মুখ দিয়ে বেরোবে না ‘ওরে মড়া, আমি এখন পাশবালিশ আঁকড়ে স্বপ্নে সানি লিওন-এর সাথে মরিশাস-এ বেড়াতে যেতে চাই, তোমার সঙ্গে গঙ্গার পাড়ে নয়!’ কিংবা, ‘এর আগে আরও ১৪টা মেয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তুমি ১৫তম।’ প্রেমের রাজ্যে পৃথিবী মিথ্যেময়। আর অভিমান বোঝাতে নিজের চোখের কোনায় নখ দিয়ে খুচিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার ফ্যাকড়া তো আছেই! ধুত্তোর!!
*****************
বাস্তব ডকে উঠে যায়। পুরোটাই ভবিষ্যৎ কাল, পুরোটাই ওয়ান্ডারল্যান্ড। কত্ত সুন্দর একটা বাড়ী হবে আমাদের, গুল্লু গুল্লু ২টো ছানা, বছরে একবার ফরেন ট্যুর, আমরা কিন্তু একদম ঝগড়া করবো না, কেমন? ঘুন্টুপুচু, এখন একটু কষ্ট করে ঝালমুড়িতে মন দাও। এই তো, মাইনে একবার বাড়লেই ফি হপ্তায় দু’বার মোক্যাম্বো থেকে মেনল্যান্ড চায়না। প্রমিস। এই দুনিয়ায় আর্থিক মন্দা নেই, ইএমআই নেই, আগুন বাজার নেই, হু হু করে ডলার পতন নেই... কিন্তু ফ্যান্টাসির ফানুস ফুলতে ফুলতে এক দিন ফটাস! আর, তার পর সোজা প্লুটো থেকে পৃথিবীতে আছাড়। গায়ের ব্যথা মারতে নেক্সট প্রেমের অপেক্ষায় বসে থাকা...!!!
*****************
প্রেম সফল হলে বিয়ে হয়ে যায়! যে জিনিসের লাস্ট সিনে এমন সাংঘাতিক সর্বনাশ অপেক্ষা করে আছে, সে কি ভদ্র কান্ড হতে পারে? ভুলিয়েভালিয়ে লজেঞ্চুস দেব বলে ফুটন্ত কড়ায় এনে ফেলা যার অভ্যাস, সেই প্রেমকে তোল্লাই দেয় যারা, সকলে মিলে তাদের চিহ্নিত করুন এবং সর্বসমক্ষে ‘রদ্দা মারুন’!!
----------

সোমবার, ২৮ জুলাই, ২০১৪

মদন - সিদ্ধার্থ দে

ইংরিজি “স্ল্যাং” শব্দটির সঠিক অনুবাদ কঠিন এবং তর্কসাপেক্ষ | অপভাষা বা কুবচন বলা যেতে পারে | ব্যবহৃত হতে হতে অনেক স্ল্যাং আবার গৃহীত ভাষ্যের অন্তর্গত হয়ে যায় | অভিধান ঘাঁটলে এই সব শব্দের ব্যুৎপত্তি বিষয়েও প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ করা কঠিন নয় | আজকের যুগ বিশেষীকরনের – অনেক পুস্তক বিক্রেতা আজকাল স্ল্যাংএর অভিধান-ও রাখছেন |

ইন্টারনেট বন্ধুবান্ধবীদের মধ্যে আজকাল বয়স কোন বাধা নয় | সেই একটি গানের কলি আছে না – “তুমি আমারও বন্ধু, বাপেরও বন্ধু” – সাইবার সম্পর্কগুলো সেই জাতীয় আর কি | চোখ আর মনের দরজা খোলা রাখলে চলতি ভাষার ওপর দিব্যি দখল এসে যায় | এই যেমন স্ত্রী কি একটা বিষয়ে নালিশ জানাচ্ছিল সেদিন – আমি সাবলীল ভাবে বললাম “একদম চাপ নিও না !”

শেখার কোন বয়স নাই | আমার মন এখনো যথেষ্ট অনুসন্ধিৎসু – কোন শব্দের মানে না জানলে বৈদ্যুতিক শব্দকোষ খুলে জানার চেষ্টা করি | সমস্যা হল- কিছু বহু প্রচলিত কথা অভিধানে নেই – থাকলেও সেগুলির সংজ্ঞা প্রচলিত অর্থের সঙ্গে একেবারেই বেমানান | গুগুলানুসন্ধান করেও খুব একটা বেশি আলোকপ্রাপ্তি হয়না |

আজ শুধু এমন একটি শব্দের কথাই লিখব | প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে পরশপাথর খোঁজার মত কথাটির অর্থ বোঝার ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছি |

বাঙালী পরিবারে আমাদের সময়ে আত্মীয় বন্ধুদের আড়ালে কোন বিশেষ নামে অভিহিত করা হত | হয়ত এখনো হয় | উদাহরণস্বরূপ – এক প্রবাসী আত্মীয় বৎসরান্তে দেশে এলে উন্মত্তের মত কলকাতা তথা অন্যান্য শহরে চষে বেড়াতেন | আমি তাঁর নাম দিয়েছিলাম “চরকিবাজি” | স্বভাব এবং নামকরণের এমন সঙ্গতির ফলে অচিরেই তা সাদরে গৃহীত হয়েছিল | ( গোপনীয়তা রক্ষার জন্য তৎকালীন এক রাজনীতিবিদ শ্রী চন্দ্রভানু গুপ্তার নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে তাঁকে CB Gupta বলে ডাকা হত ) কিঞ্চিৎ অন্যধরণের কণ্ঠস্বরের জন্য আর এক কিছুটা দূর সম্পর্কের আত্মীয়ার নাম হয়েছিল হাঁড়িচাঁচা | পরিণত বয়সে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই – নামটি খুব একটা রুচিপূর্ণ ছিল না| বলা বাহুল্য, এগুলি ঠিক ডাকনাম বলতে যা বোঝায় তা ছিল না – কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে নামগুলি কখনই ব্যবহৃত হত না অনভিপ্রেত প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় |

উপরের দুই ক্ষেত্রেই নামের মানে এবং ব্যুৎপত্তি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন ছিল না | কিন্তু সমস্যা হল যখন আমার দাদা এক ঘনিষ্ট আত্মীয়ের নাম দিলেন ” মদন ” | রবি ঠাকুরের এক গীতিনাট্য ( চিত্রাঙ্গদা ) শুনে ধারণা হয়েছে তিনি প্রেমের দেবতা – যখন তখন পছন্দমত মানুষকে প্রেমাভিলাস পূরণের বর দিয়ে থাকেন | আর একটু বড় হয়ে জেনেছি তাঁর আর এক নাম কামদেব | এই আত্মীয়ের সঙ্গে সেই দেবতার কোন যোগসূত্র অনেক ভেবেও খুঁজে পাইনি |

তাছাড়া অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির নাম-ও মদন | যেমন ভারতের এক ক্রিকেটার মদনলাল যিনি একবার ইডেন উদ্যানে প্রায় তিরিশ গজ দৌড়ে এতো আস্তে বল নিক্ষেপ করেছিলেন যে ভিভ রিচার্ডস থতমত খেয়ে আগে ব্যাট চালিয়ে লোপ্পা ক্যাচ তুলে আউট হয়ে যান – আমার নিজের চোখে দেখা | আর একজন অভিনেতা মদন পুরী বোম্বাইয়ের বিখ্যাত খলনায়ক – পর্দায় যাঁর চোখেমুখে ক্রুরতা ঝরে পড়ত | তৃতীয় জন পশিম বঙ্গের এক মন্ত্রী মদন মিত্র, যিনি নিজের অনেক কীর্তির ছাপ অল্পদিনেই রেখে ফেলেছেন | সব শেষে বহু কালজয়ী গানের ( যেমন “নায়না বরসে রিম ঝিম”) স্রষ্টা মদন মোহন-ও আছেন |এঁদের কারোর সঙ্গেই আমাদের ভালোমানুষ, শান্ত স্বভাবের আত্মীয়ের বিশেষ মিল নেই| কলকাতায় মদন স্ট্রিট ( প্রচলিত উচ্চারণ যদিও ম্যাডান স্ট্রিট ) নামে একটা রাস্তাও আছে বৌবাজারের কাছে – অবশ্য সবাই জানে, বৌবাজারে যেমন বৌপ্রাপ্তি হয়না, ওই রাস্তাও দুনিয়ার মদনদের কেন্দ্র নয়|

তবে হ্যাঁ, তবে আমাদের মদনের কিছু প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট ছিল বটে – মনে হয় সেটা তাঁর সারল্য থেকে উদ্ভূত | যেমন, কোন নিমন্ত্রণে একটা সুস্পষ্ট নতুন পাতলুনের সঙ্গে একটা ইস্তিরি না করা তাপ্পিমারা বেমানান রঙের শার্ট পড়ে হাজির হলেন| বা কোন জমায়েতে এমন একটা মন্তব্য করে বসলেন যা উপস্থিত ব্যক্তিদের জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত | একবার তো যৌবনচ্ছাস প্রসূত অনেক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করা একটি খাতা বাড়ির অতি কৌতুহলী বড়দের বিনোদনের জন্য অসাবধানে ফেলে রেখেছিলেন| ( বলে রাখি, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্পর্কে আমার মনোভাবের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে – এক সদ্য যুবকের বিষয়ে কিছু আলোড়ন জাগানো “স্কুপ” নিয়ে হাসিঠাট্টা করাটা অত্যন্ত অন্যায় এবং অসমীচীন ছিল – তবে মনে রাখতে হবে ঘটনাকাল প্রায় ৫০ বছর পূর্বের ) |একবার একটি ছোটখাটো অন্যায় ঢাকার জন্য এমন সব দুর্বল অজুহাত দিয়েছিলেন যা সবার দীর্ঘদিনের হাসির খোরাক হয়েছিল | নামটা এতই দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে যে সেদিন নাকি আমার ভ্রাতুস্পুত্রবধু টেলিফোনে তাঁকে প্রায় মদন আঙ্কেল বলে ডেকে ফেলেছিল | ( আসলে আঙ্কেল বলেনি – ইংরিজিতে আঙ্কেল অর্থে মামা, কাকা, জ্যেঠা , পিসে, মেসো অনেক কিছুই বোঝায় – সম্পর্কটি গোপন রাখতে শব্দটি ব্যবহার করলাম)

আজ সেই নামের সুবর্ণজয়ন্তী প্রাপ্তির বেশ কয়েক বছর পরেও আমি সেই এক-ই তিমিরে | মদনের আসল সংজ্ঞা আজও আমার কাছে ধোঁয়াটে | এই মদন নামক ব্যক্তি নয়ন সুমুখে নেই, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের নানা পরিস্থিতিতে আমাদের মাঝখানে ঘন ঘন আবির্ভূত হন ভিন্ন ভিন্ন রূপে | তিনি এলে চিনতে পারি, তবে যথাযত ভাবে বর্ণনা করতে পারিনা |

এই লেখা শেষ করব ফেসবুক বন্ধুগোষ্ঠীতে মদনের সঙ্গে পরিচিত আমার আত্মীয়দের একটা অনুরোধ জানিয়ে | দয়া করে এমন কোন মন্তব্য করবেন না যাতে মদনের পরিচিতি প্রকাশ পায় | তিনি ফেসবুকে সক্রিয় নন এই তথ্যের ভিত্তিতেই এই লেখার সিদ্বান্ত নিয়েছি | তাঁকে নিয়ে এই ধরনের ইয়ার্কি চলছে জানতে পারলে খুবই দু:খ পাবেন | জানিয়ে রাখি, ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর কাছে নানাভাবে ঋণী | তাঁকে কোনভাবে অপদস্ত করার অভিপ্রায় আমার নেই – এ লেখা নিছকই এক লঘু স্মৃতিচারণ |

বৃহষ্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০১৪

প্রজ্ঞা থাপার ছোট্ট জীবন ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

প্রজ্ঞা থাপা ক্লাস টেনের ছাত্রী। স্কুলে খেলাধুলোয় রীতিমত নাম আছে তার। পড়াশোনাতেও প্রজ্ঞা পেছিয়ে নেই সে কোনো ভাবে। বাবা থাকেন দেশের বাইরে, বাহরিনে। প্রজ্ঞা দেশের বাড়িতে মা কল্পনা থাপা আর দাদুর সঙ্গে থাকে আর ইটাহারির স্থানীয় মর্নিং স্টার স্কুলে পড়ে। মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার, তেমন অস্বাচ্ছন্দ কিছুই নেই। এই মেয়েটি ২০১৪ সালের ৯ই জুলাই খবরের শিরোনামে চলে এলো।

রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত লিখেছিলেন "ফুটবল"। একটা নাটক। সে নাটক কতজন দেখেছেন জানিনা, কিন্তু সে নাটকে দেখানো হয়েছিলো এক দায়িত্বজ্ঞানহীন এক হিংস্র আক্রমন। সে নাটকের সমসাময়িক ঘটনা ১৯৮০ সালের ১৬ই আগস্ট, যেদিন ইডেনে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল খেলায় দাঙ্গায় ১৬ জন মারা গিয়েছিলেন। তার পরে সামান্য কিছু হইচই হয়েছিলো। দু দলের সমর্থক দের খেলার সময় আলাদা আলাদা বসানোর ব্যবস্থা হয়েছিলো। সে ব্যবস্থা এখনো আছে। লিগের প্রথম বড় খেলায় এখনো লোকে জিজ্ঞেস করে – "আমাদের কি ১ নম্বর আর ২ নম্বর? নাকি তিন চার দিয়েছে আমাদের?"। অনেকটা তফাত করে বসানো। ঘেটোর মত। মাঝখানে কাঁটাতার, অস্ত্র নিয়ে পুলিশ। ১৯৯৮ সালে দুই বন্ধু অফিসে একসঙ্গে ঢপ মেরে আইএফএ শিল্ডের ফাইনাল দেখতে গেছি একই ট্যাক্সিতে চড়ে, ভাড়া ভাগাভাগি করে। কিন্তু মাঠে পৌঁছে ও গেলো ওদিকে, আর আমি গেলাম এদিকে। এক সঙ্গে বসে খেলা দেখা গেলো না, কারন দু জন দু দল কে ভালোবাসি। এসব তো থাকবেই। মাঠে ঢোকার আগে, দুজনে দুজনকে "অল দ্য বেস্ট" জানাতেও ভুলিনি।

ফুটবল ভালোবাসি বলেই না দলকে ভালোবাসি, ফুটবলে উৎসাহ না থাকলে আর এ দল, ও দলের প্রশ্নই আসবে কেন? মনে আছে, আরো অনেক ছোটো বেলায়, বাবার হাত ধরে সন্ধের মুখে মিস্টির দোকানে যাচ্ছি মিস্টি কিনতে। বড় খেলায় জিতলে বাবা এক হাঁড়ি গরম রসগোল্লা কিনে খাওয়াতো লোকজন কে। আর এটাকে বলতো মধুরেন সমাপয়েৎ। সেদিন পাড়ার আর একটি ছেলেকে দেখে, খেলায় হারা নিয়ে একটা টিটকিরি মেরেছিলাম দোকানের সামনে। আমি তখন ক্লাস থ্রী কি বড়জোর ফোর। কান থেকে ঠোঁট ঝন্‌ঝন্‌ করে উঠেছিলো বিরাশি সিক্কা থাপ্পড়ে। মিস্টির ফরমায়েশ তদ্দন্ডেই বাতিল। কানের কাছে গম্ভীর স্বর শুনেছিলাম বাবার – "নিজেকে কখনো মোহনবাগান সমর্থক বলে পরিচয় দিওনা"। সারা জীবন অসম্ভব ফুটবল পাগল একজন মানুষের কাছে ধীরে ধীরে শিখেছি, খেলাকে কি ভাবে ভালোবাসতে হয়। প্রতিপক্ষকে কি ভাবে সন্মান দিতে হয়। খেলায় জয় মানে নির্মল আনন্দ। অহংকার বা জীঘাংসা নয়। পরাজিত পক্ষ, কেবলমাত্র প্রতিপক্ষ, কখনই আজকের খবরের কাগজের ভাষায় শত্রুপক্ষ নয়। আজকে জিতলে, কালকে হারতেই হবে তার কাছে। এটাই খেলা। আর হেরে যাবার স্বাদ, আপনার প্রতিপক্ষের চেয়ে ভাল আর কেউ জানবেনা, কেননা খেলায় সকলকেই হারতে হয়েছে। আমাদের অফিসে আমরা একটা প্রথা চালু করেছিলাম। যাদের দল খেলায় জিতবে, তারা অন্যদের খাওয়াবে। এই খাওয়ানোর মধ্যে দিয়ে দেখতাম জেতার ঝুঠো অহংবোধ আর হারের ঝুঠো গ্লানির পরিসমাপ্তি হতো। ২০০৬-০৭ পর্য্যন্ত এটা চলতে দেখেছি।

গতকাল একটি ছেলের প্রশ্ন – "আমি কি তাহলে গায়ে পতাকা জড়িয়ে আগুন দিয়ে পুড়ে মরব? ব্রাজিলের খেলা ভালো লাগাটা কি আমার অপরাধ? কেন আমার ওপর এই হিংস্র আক্রমন? এর পর তো বাড়িতে ঢুকে মারবে"। না, বাংলার রাজনীতি নয়, ভোট নয়, সমাজবিরোধী আক্রমন বা সাম্প্রদায়ীক সন্ত্রাস নয়। একটা খেলার ফলাফল, এবং তৎপরবর্তী কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ছেলেটিকে এই ভাবে মানসিক অত্যাচার সয়ে সকলের চোখের আড়ালে লুকিয়ে গুটিয়ে থাকতে হচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায়, অফিসে, স্কুল কলেজে সর্বত্র এই হিংস্র আক্রমন। তবে বোধহয় সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে ফেসবুক , হোয়াট্‌স্‌অ্যাপ জাতীয় সামাজিক মেলামেশার জায়গা গুলো। আমাদের দেশে শুনি ক্রিকেট হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। সে নিয়ে আমার নিজের কোনো সন্দেহ নেই। কিছু দিন আগে আইপিএল শেষ হলো। গোটা দেশ সেই নিয়ে মেতে ছিলো। ক্রিকেটের বিশ্বকাপ যখন হয়, তখন দেখেছি, কি চরম উৎসাহ, উন্মাদনা, উত্তেজনা। কিন্তু যেটা দেখিনি সেটা হলো এই হিংস্রতা। সত্যি দেখিনি। বরং অন্য দলের খেলোয়াড় ভালো খেললে তার প্রশংসা শুনেছি। খেলায় হার জিত নিয়ে টিটকিরি দেখেছি, উল্লাস দেখেছি, স্বপ্নভঙ্গ দেখেছি। কিন্তু কোথাও শুনিনি, কেউ এই ভাবে অন্যজনের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। এটা অন্য খেলায় হয় না।

আমাদের পাড়ায় বিশ্বকাপের ঠিক আগে থেকে দেখলাম বড় বড় রঙিন পতাকা ঝুলছে। কতগুলো নীল সাদা, সে গুলো আর্জেন্তিনার, আর কতগুলো হলুদ সবুজ সে গুলো ব্রাজিলের। দেখে খুব ভালো লাগলো, যে আমাদের এখানে ফুটবলের নামে লোকজন কতটা মেতে উঠেছে। ব্রাজিল বা আর্জেন্তিনা খেলায় জেতার পর মাঝরাতে পটকা ফাটা শুনেও ভালো লাগছিলো, কিন্তু সেই সঙ্গে খারাপ লাগছিলো, যে এই যে বিশ্বকাপে ক্যামেরুন খেলছে, গত বছর দিল্লিতে যখন এই ক্যামেরুনকে হারালো ভারত, তখন একটাও পটকা ফাটলো না। একটাও তেরঙ্গা ঝান্ডা উড়লো না। ফেসবুক হোয়াটস্‌অ্যাপ ছয়লাপ হয়ে গেলো না সুনিল ছেত্রি বা সুব্রত পালের ছবিতে। পেছিয়ে থেকেও সমতা ফিরিয়ে এনে ভারত হারালো বিশ্ব ফুটবলের এক সাড়া জাগানো শক্তিকে, কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি, যাঁরা এই লেখা পড়ছেন, তাঁদের সিংহভাগ ভারতেই এই সাফল্যের কথা জানেনই না। আমি নিচে লিঙ্ক দিলাম, গোটা খেলা, এবং টাইব্রেকারের।
প্রথমার্ধ – https://www.youtube.com/watch?v=qM7DK0pwYVw
দ্বিতীয়ার্ধ – https://www.youtube.com/watch?v=mZXFJFp5b0k
টাইব্রেকার - https://www.youtube.com/watch?v=MZ6O-7yRkTo

আবার অন্যদিকে এই বছরের গোড়ায় কাঠমান্ডুতে যখন ভারত নেপালের কাছে ১-২ গোলে হেরে গেলো, সেদিন সন্ধ্যায় অফিসে বসে মনে হচ্ছিলো অনেক অনেক অনেক কিছু যেন হারিয়ে গেল। অনেক স্বপ্ন আবার গোড়া থেকে দেখতে শুরু করতে হবে। পেছিয়ে গেলাম যেন আমরা। রাত্রে কিছু খেতে পারিনি সেদিন বাড়ি গিয়ে। আমি এবারেও নিশ্চিত, এ লেখা যাঁরা পড়ছেন, তাঁদের সিংহভাগ এ খেলার খবর ও রাখেন না।

তাহলে ব্রাজিল আর্জেন্তিনা নিয়ে এই সাংঘাতিক রেশারেশির উৎস কোথায়? দয়া করে এটা বলবেন না যে এই দুটো দেশের কিছু ইশ্বরতুল্য খেলোয়াড়ের জন্যই এই রেশারেশি। খেলোয়াড়ের খেলা ভালো লাগলে তিনি যে দলের জার্সিই পরুন, তাঁর খেলা ভালো লাগতে বাধ্য। সেখানে ব্রাজিল আর্জেন্তিনা আসেনা। আর তা ছাড়া এই দু দেশ বাদে অন্য দেশে তেমন কোন খেলোয়াড় নেই, এটাও মানতে পারছিনা। আমার দেখা এই উত্তেজনা তৈরির নেপথ্যে সংবাদ মাধ্যম। আমাদের দেশের এবং গোটা উপমহাদেশেরই সংবাদ মাধ্যম ব্রিটিশ মিডিয়ার লেজ ধরে চলে। সেই নোংরা মিডিয়াকে অনুসরন করেই এরা কৃত্ত্রিম উন্মাদনা তৈরি করছে। লোকের উন্মাদনা যত জাগবে (পড়ুন লোকে যত "খাবে") ততই বিজ্ঞাপন আর ততই বিদেশ ভ্রমন, পত্রিকার বিক্রি। বাকি দায়......নেই। আমার যতদুর মনে পড়ছে এই জিনিষের শুরু ১৯৮৬ থেকে আজকাল পত্রিকার হাত ধরে। আর ১৯৯০ আর ৯৪ সালে কুৎসিত আর পরিকল্পিত ভাবে উন্মাদনা ছড়ানো হয় আমাদের এখানে।

বিদেশি ফুটবল সারা বছর দেখা যায় টিভিতে। তার কতটুকু নিয়ে লোকে এখানে মাতামাতি করে? কিছু উচ্চমধ্যবিত্ত কিশোর তরুন হয় ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, বার্সিলোনা নাহলে রিয়েল মাদ্রিদের সাপোর্টার বলে দাবী ও করে নিজেদের। ওই পর্যন্তই। রেশারেশি বা হিংশ্র উন্মাদনা দেখিনি, যা দেখি ব্রাজিল আর্জেন্তিনা নিয়ে। ফুটবল ভালোবাসলে এনারা নিশ্চিত নিজের দেশের খবরটুকু রাখতেন। ভালো খেলোয়াড়দের ভালোবাসলে নিশ্চিত ভাবেই মেসি বা নেইমার দুজনের খেলাই এনাদের ভালো লাগতো। পেলে আর মারাদোনা নিয়ে ঝগড়া না করে তাঁদের পাশে রিভেলিনো , দি স্তেফানো বা পুসকাসের ছবিও লাগাতেন। মারাদোনার সম্পর্কে একটা কথা বলি, গোটা পৃথিবীর কয়েকশো কোটি মারাদোনা ভক্তের মধ্যে আমিও একজন। আর নিজের অন্তর থেকে মারাদোনা খেলাকে শ্রদ্ধা করি। তাই সেই ৮৬ সালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলার পরের দিন সকালে প্রচন্ড অভিমান করেছিলাম মারাদোনার ওপর। হ্যান্ডবল তো সবাই করে। তুমি সেটা গৌরবান্বিত করতে চাইলে কেন মারাদোনা? তুমি তো ওরকম গোল আরো দিতে পারো। বলনা ভুল হয়ে গেছে। তুমি তো রক্ত মাংসের মানুষ। ১৯৯৪ তে মারাদোনার ডোপ টেস্টে ধরা পড়ার পর মনে হয়েছিলো মাটি সরে যাচ্ছে পায়ের নিচে থেকে আমার। আমার কাছে ভগবানের মত এই লোকটা কেন ড্রাগ নেবে? আমাদের মত ভক্তদের চিৎকার কি কানে পৌঁছয়না তোমার মারাদোনা? কেন অন্য উত্তেজনা লাগে? উঠতে বসতে শুনতে হয়েছে তখন, ওইতো তোদের মারাদোনা, ড্রাগ নেয়। আমি আজও মারাদোনার ফুটবলের সেই ভক্তই আছি। সেই যাদুতেই আচ্ছন্ন আছি। শুধু মানুষ মারাদোনার ভক্ত আর নেই।

ব্রাজিল আর্জেন্তিনার রেশারেশিও আমার মাথায় ঢোকেনা। ব্যক্তিগত ভাবে আমি লাতিন আমেরিকান ঘরানার ফুটবলের ভক্ত। ছোটো ছোটো পাস, বুদ্ধিদীপ্ত আক্রমনাত্মক ফুটবল। গতি পরিবর্তন হয়ে চলেছে সব সময়। বল দখলে রাখার অসাধারন মুন্সিয়ানা। আর ভালো লাগে দলগত খেলা। ব্যক্তি নির্ভর হলে আমার ভালো লাগে না। শুধু ব্রাজিল আর্জেন্তিনা নয়, আমার ভালো লাগে চিলি, কলম্বিয়া এমনকি মেক্সিকোর খেলাও। উরুগুয়ে কে কেমন মনে হয় যেন কিছুটা ইয়োরোপ ঘেঁসা খেলা। যেমন স্পেন ও পর্তুগালের খেলায় আবার লাতিন আমেরিকান ঘরানা অনেকটা কাজ করে। আমার তো এই দুই দেশ জিতলেই ভালো লাগে। রেশারেশিটা সত্যিই মাথায় ঢোকেনা আজও। এখানে দেখি, মেসি ভালো মানেই নেইমার খারাপ, সে খেলার অভিনয় করে। মারাদোনা কোকেন নিয়ে ৯৪ সালে বিশ্বকাপ থেকে নির্বাসিত মানেই পেলে ও ড্রাগের ব্যবসা করে। এই ধরনের বিতন্ডা। খেলা নিয়ে ঘরানা নিয়ে, দক্ষতা নিয়ে কখনো কোনো আলোচনা দেখতে পেলাম না। আমাকে ফোন করে একজন জানতে চাইলো গত পরশু আমি ব্রাজিল না আর্জেন্তিনা। কারন আমার ফেসবুকের পোস্ট থেকে নাকি সে ঠিক বুঝতে পারছে না আমি আসলে কি। আমি বললাম আমি মোহনবাগান আর ভারত। ঠিক বুঝতে পারল বলে মনে হলো না।


নেপালের প্রজ্ঞা থাপা ক্লাস টেনের ছাত্রী। স্কুলে খেলাধুলোয় রীতিমত নাম আছে তার। পড়াশোনাতেও প্রজ্ঞা পেছিয়ে নেই সে কোনো ভাবে। চাকরির কারনে তার বাবা থাকেন দেশের বাইরে, বাহরিনে। প্রজ্ঞা দেশের বাড়িতে মা কল্পনা থাপা আর দাদুর সঙ্গে থাকে আর ইটাহারির স্থানীয় মর্নিং স্টার স্কুলে পড়ে। মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার, তেমন অস্বাচ্ছন্দ কিছুই নেই। এই মেয়েটি ২০১৪ সালের ৯ই জুন খবরের শিরোনামে চলে এলো। ব্রাজিল হেরে যাবার পর, সকাল বেলা মেয়েটি ঘরের মধ্যে ঢুকে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলো। প্রজ্ঞা নিজের ছোট্ট জীবন শেষ করে দিয়ে এমন এক জগতে চলে গেলো, যেখানে সম্ভবতঃ ব্রাজিল আর্জেন্তিনার রেশারেশি নেই। মেসি না নেইমার এই তর্ক নেই। ফুটবলই নেই। কিন্তু বাহরিনে কর্মরত প্রজ্ঞার বাবা আর তার মা, নিজের একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর জন্য নিজেদের কি ভাবে স্বান্তনা দেবেন? দিতে পারবেন কি? এই মৃত্যু, এই চলে যাওয়ার কি মানে থাকতে পারে? কারা দায়ী এর পেছনে? ফুটবল দায়ী? ব্রাজিল দায়ী হেরে যাবার জন্যে? জার্মানি দায়ী হারাবার জন্যে? আর্জেন্তিনা দায়ী রেশারেশির জন্যে? নাকি এই অর্থহীন রেশারেশি যারা তৈরি করলো ব্যবসার স্বার্থে তারা দায়ী? ও জোগো বোনিতো - এই সুন্দর খেলা। একে অসুন্দর করবার কোনো অধিকার দেওয়া হয়নি কাউকে। যাঁরা জেতা হারা মানেন না। যাঁরা খেলার সৌন্দর্য্য না দেখে অন্য পক্ষের ওপরে অর্থহীন নোংরা আক্রমন করেন তাঁদের অপরাধ বন্ধ হওয়া দরকার। তার জন্যে দরকার, সত্যিকারের ফুটবল যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁদের এগিয়ে এসে আমাদের এখানে একটা ফুটবল সংস্কৃতি তৈরি করা। বিদেশের মাঠে, দু দলের সমর্থক পাশাপাশি দু দলের জার্সি পরে খেলা দেখতে পারেন যদি, তো এখানে আমাদের এই হিংস্রতার অর্থ কি? আর কোনো প্রজ্ঞা যেন অকালে ঝরে না যায়। আসুন, ফুটবলকে ভালোবাসি। হলুদ সবুজ সাদা নীল এসব যেন ফুটবলকে ভালোবাসার পথে বাধা না হতে পারে। আর প্রানপনে সমর্থন করতেই হয় যদি, সমর্থন করুন নীল জার্সির ভারতকে। আজ যদি ভারতীয় ফুটবল তেমন কিছু করতে না পেরে থাকে, তাহলে আসুন, কিছু করি, যাতে করে এক দিন নীল জার্সি পরে হাতে তেরঙা নিয়ে আমরাও গ্যালারি মাতাতে পারি। 

বুধবার, ৯ জুলাই, ২০১৪

ফুলেকা - ২০১৪ ~ রাজ সাহা

​চোখ ফুটতেই খেলাধুলা শুরু। খেলনাবাটি, গাড়িগাড়ি আরও কতো কি। তারপর জানলাম আরেকটা খেলা আছে ফুটবল। বল নিয়ে খেলা। মাথা দিয়ে ভাবতে হয়, চোখ দিয়ে দেখতে হয়, হাত না লাগিয়ে দৌড়ে গিয়ে গোলে মারতে হয় অন্যদলকে কাটিয়ে। খেলতাম আমরাও। তারপর জানলাম এটাই নাকি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলা। আর পুরো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফুটবল-দল ব্রাজিল। তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড় হলো পেলে। যিনি নাকি বিশ্বকাপেও হ্যাট্রিক করেছেন।

আমাদের ক্লাবের মাঠের বড় পর্দায় দেখলাম জায়ান্টস অফ ব্রাজিল। একেবারে সিনেমা। মারপিট আছে, চোট্টামি আছে আমাদের মতো, তারচেয়েও বড় কথা ড্রিবল আছে, শিল্প আছে, স্বপ্ন আছে। সে দেশের সমর্থকেরা গোলা ফাটানোর জন্যে ঘরবাড়ি বিক্রি করে মহাদেশ পার করে জাহাজে করে অন্য দেশে পাড়ি দেন। হেরে যাবার পর তাঁদের হাতে থাকে স্রেফ ভিক্ষার ঝুলি, কান্নাতো নিত্যদিনের সঙ্গী। কারন ব্রাজিল দেশটা আমাদের চেয়েও তখন নাকি গরিব।

সেইদেশও আমাদের মতো ইউরোপীয়দের দেশ ছাড়া করে স্বাধীন হয়েছে অথচ তারা গোটা বিশ্বকে অস্ত্র দিয়ে নয়, যুদ্ধ দিয়ে নয়, রাজনৈতিক কুটকচালি দিয়ে নয়, স্রেফ খেলা দিয়ে শাসন করেন। সবাই তাঁদের পেছনে দৌড়ায়, তাঁরা এগিয়ে যান খেলে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে। সেই ছাপ থাকতো তাঁদের খেলাতেও, তাঁরা ফেয়ার প্লে অর্থাৎ মারপিট না করে স্রেফ খেলার আনন্দেই খেলেন এবং জেতেন সেই সুস্থ প্রতিযোগিতায়।

ইংল্যান্ডে যেবার বিশ্বকাপ হয় সেবার তাঁরা পারেন নি। সেবার নাকি স্রেফ ইংরেজদের চোট্টামির জন্যেই অনেক ভালো দল প্রতিযোগিতা থেকে হারিয়ে যান। কিন্তু, চ্যালেঞ্জ ছিল জুলেরিমে কাপ জেতার। যে তিনবার জিতবে সেই কাপ চিরজীবনের জন্যে তাঁদের। সেই লড়াই ব্রাজিল জিতে নেয়। এবং গোটা বিশ্বে নিজের দেশের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে নেয়। তখনো মারাদোনা তথা আর্জেন্টিনা বিশ্বফুটবলের মানচিত্রে আসেন নি।
সেই স্বপ্নে ভারতবর্ষের একটা ছোট্ট শিশু মশগুল হয়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ছিল এবং অবশ্যম্ভাবী ছিল। কারন এই খেলা ছিল দেশকাল, বর্ণ, রাজনীত, যুদ্ধ সবকিছুর উর্ধে। স্রেফ ভালবাসার অন্তিম বহিঃপ্রকাশ।

জায়ান্টস অফ ব্রাজিল দিয়ে শুরু, তারপর জিকো অর্থাৎ সাদা পেলে, এডিনহো, সক্রেটীস, কারেকা, অ্যালেমাও, ফালকাও, জুনিয়রকে দিয়ে সরাসরি দেখা ব্রাজিলের ম্যাজিক। না সেবার ব্রাজিল পারে নি জিততে। কিন্তু মন ভরিয়ে দিয়েছিল তাঁদের খেলোয়াড়ি শিল্পে। ঢেউয়ের মোট আছড়ে পড়া বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে। এবং একেরপর এক গোলের সম্ভাবনা তৈরি করা। কোনদিনই তাঁরা ডিফেন্সে বিশ্বাসী ছিলেন না। বরং একটা গোল খেলে ৪টে গোল করার মানসিকতায় মাঠে নামতেন। আবার একই কথা বলি, খেলার আনন্দে খেলতেন ফলে তাঁদের খেলা ছিল স্বপ্নময় সুন্দর।

জেতার জন্যে কিছু দল বিধ্বংসী খেলা খেলে, যার বেশিরভাগই ইউরোপীয়। সেই দলের নাম বলে আর বিড়ম্বনা বাড়াতে চাই না। তবে তাঁরাও জেতে। কিন্ত,শুধু খেলাটুকুই জেতে। মন জিততে পারে না। কালোচামড়ার প্রতি সাদা চামড়ার শোষণের লড়াইতে চিরকাল জিতে এসেছে, সেখানে এই খেলাটুকুই হচ্ছে সান্ত্বনার জায়গা। এবং বৃহত্তর মানবিকতার লড়াই। যা গোটাবিশ্বের আপামর জনতার হয়ে লড়েছে, ব্রাজিল। এবং স্বপ্নপুরন করেছে ব্রাজিল। আমাদের কিছু না করতে পারা জীবনের এটাই ছিল একটা সান্ত্বনার জায়গা। যেখানে ব্রাজিল বলে দেয় "যে সব ক্ষেত্রেই ওরা সেরা নয়, ওঁরা যেখানে সেরা সেটাই একমাত্র মোক্ষ নয় আমাদের জীবনে"।

তাই ব্রাজিলকেই সমর্থন করে ফেলেছি অজান্তেই। ভালবেসে ফেলেছিও অজান্তেই। যথার্থই ভালবাসা বলতে বাধা নেই, কারন এখানে চাওয়াপাওয়ার হিসেবটা নেই। তবে কি কিছুই চাই নি?

চেয়েছি, বারবার চেয়েছি, প্রতিবার প্রমান করতে যে ব্রাজিলই শ্রেষ্ঠ, কিন্তু খেলার অমোঘ নিয়ম এমনই যে এই খেলায় যে কোন দুটো দলের সবসময়েই একদম ৫০-৫০ সম্ভাবনা থাকে। সামান্যতম সুবিধা কেউ আগেপরে পায় না। সেখানেই ফুটবল আলাদা। শ্রেষ্ঠ খেলা ফুটবল।

তিলতিল করে গড়ে তোলা ভালবাসার প্রাসাদ আজ চূর্ণ জার্মানির অতর্কিত আক্রমণে। আজ ব্রাজিল ৭-১ গোলে হেরে যাওয়াতে কি প্রমান হয়? আমার জ্ঞ্বান সীমিত, তবু বলতে পারি যে ৮৪বছরের বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে লজ্জাজনক হার। আমার মনে প্রশ্ন উঠে আসে, যে তাহলে কি সৃষ্টিশীল ফুটবলের ধারক ও বাহকের দিন শেষ? এবার শুরু নতুন অধ্যায় যেখানে কেবলই ট্যাকটিকস ও পরিকল্পনা মাফিক খেলার জয় হবে? তাহলে সেটা কি খেলা হবে নাকি রোবটের লড়াই হবে। হয়তো কেউ কেউ বলবেন, কেন আর্জেন্টিনা, হল্যান্ড, উরুগুয়ে, চিলি, স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, পেরু, ক্যামেরুন, জাপান এদের খেলায় কি শিল্প নেই? আমি বলবো আলবাত আছে। মানুষ এতবড় মূর্খ হতে পারেনা যেখানে মারাদোনা স্বয়ং আছেন। তিনিও ফুটবলে শিল্পের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় [আমার মতে]। মারাদোনা মানেই স্বপ্ন। কিন্তু সেতো শুধু মারাদোনা। তাঁর দেশ আর্জেন্টিনা আমার মনে সেইভাবে দাগ কাটেনি। মারাদোনার আবির্ভাবের আগেই আমার মনের গাঁটছড়া বাধা হয়ে গেছে ব্রাজিলের সঙ্গে, গোটাদেশটার সঙ্গে। সেখানে মারাদোনাকে আমি কুর্ণিশ করতে পারি। তাকে প্রণাম করে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে পারি। কিন্তু ভালবাসতে পারি শুধু ব্রাজিলকেই। আমার অক্ষমতা ক্ষমা করবেন আশাকরি।

আলোচনার খাতিরে ধরে নিচ্ছি, যদি ব্রাজিলের স্বপ্নের দিন শেষ। কিন্তু তাতেও অন্যান্য দলের কোন ফায়দা হচ্ছে না। একটা মহীরুহ যদি উপড়ে যায়, সেইসঙ্গে একটা গোটা ইকোসিস্টেম ধ্বংস হয়ে যায়। সেই জেতা কখনই আনন্দের হতে পারে না। বরং, লড়াই করে জেতার স্বাদই আলাদা।

আরমাডিলো-ফুলেকা আর ব্রাজিলের ফুটবল এক সাথে কাব্যিক পরিণতি দিচ্ছে এই বিশ্বকাপের খেলায়। এই অসহায়তা কাউকেই আনন্দ দিতে পারে না বোধহয়। হয়তো আর্জেন্টিনা জিতবে, কিম্বা জার্মানি, অথবা নেদারল্যান্ড। যেই জিতুক সেই দেশকে অনেক দায়িত্ব নিতে হবে। যদি হয় হোক আরেক নতুন অধ্যায়ের সূচনা, ক্ষতি নেই। তাকেও সসম্মানে স্বাগত জানাই।
---------------------------------------------------------------
আর যারা গতবার স্পেনকে সাপোর্ট করেছিলেন, এবার জার্মানিকে করছেন, কিম্বা ২০০৬এ ফ্রান্সকে করেছিলেন এবার অন্য কাউকে করছেন, কিম্বা ২০০২তে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেছেন এবার হয়তো নেদারল্যান্ডকে করছেন তাঁরা হয়তো ফুটবলের অনেক কিছুই জানেন যা আমার মতো সাধারণ মানুষ জানেই না। কিন্তু তাঁদেরকেও আমি ক্ষমা করে দিলাম, ব্রাজিলের লজ্জাজনক পরাজয়ে নখ বাজাচ্ছেন আর গোটা ফেসবুক দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন "তোর ব্রাজিল কি করলো রে" বলে... বেচারারা এতো কিছু জানলো, কিন্তু ভালবাসতে জানলো নে এখনো...

মঙ্গলবার, ৮ জুলাই, ২০১৪

​ওস্তাদের মার শেষ রাতে ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

তাহার পর কি হইলো তাহা বিশ্ববাসী দেখিয়াছেন। দেখিয়াছেন গগনভেদী অট্টরোল। দেখিয়াছেন লুটিয়ে পড়া খেলোয়াড় ও বাকিদের হা-হুতাশ। পরের দিন দেখিয়াছেন উল্লাস ও স্বপ্নভঙ্গ। স্মৃতিরোমন্থন ও খিস্তি খেউড়। কিন্তু কি ঘটিয়াছিলো সেখানে?

তখন শেষ রাত। জমাট অন্ধকারে টিভি নামক বৈদ্যুতিন মাধ্যমের পর্দায় চোখ বিশ্ববাসীর। বিষুব অঞ্চলের উষ্ণতায় যোগ হইয়াছে খেলার উত্তেজনা। একখানি বল ও তাহার পিছনে বাইশ জন খেলোয়াড় তিন জন রেফারি, আর কোটি কোটি মানুষের চোখ দৌড়াইতেছে। দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিম প্রান্তের দেশ কলম্বিয়া গনরাজ্যের লাল টুক্‌টুকে জার্সি পরা হুয়ান ক্যামিলো জুনিগা ও একই মহাদেশের পূর্বপ্রান্তের দেশ ব্রাজিল প্রজাতন্ত্রের দশ নম্বর জার্সিধারী এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে বল দখলের লড়াই তে প্রানপনে দৌড়াইতেছেন। খেলা তদবধি আশি মিনিটের কিছু অধিক গড়াইয়াছে। খেলোয়াড়রা ঘর্মাক্ত ও পরিশ্রান্ত। তৃষ্ণায় ছাতি ফাটে। দর্শকাসনের উন্মাদনা খেলোয়াড়দের প্রতিটি রোমকূপে প্রবেশ করিতেছে। জুনিগার দল খেলায় এক গোলে পিছাইয়া আছে।

জুনিগা আরো জোরে দৌড়াইলেন। এই মহতি সভায় পরাজিত হইয়া মাথা নিচু করিয়া দেশে ফিরিতে কে চাহিবে? সামনের ব্রাজিলীয় তরুন অতিশয় চতুর। বল দেখিতে দিতেছে না। কেবল আড়াল করিয়া আছে। জুনিগা স্টেডিয়ামের ওপরে চলিতে থাকা অতিকায় ঘড়ির দিকে চাহিলেন। টিক্‌ টিক্‌ করিয়া সময় বহিয়া যাইতেছে। এই ব্রাজিলীয় বিচ্চুর খপ্পর হইতে বল দখল করিতে হইবে। কিন্তু ধিরে ধিরে বিচ্চু বলটি কে আরো দূরে লইয়া যাইতেছে। আকাশ বাতাস কাঁপিতেছে দর্শকের গর্জনে। তা বলে কি মাথা নোয়াইতে হইবে? ইশ্বর , হে ইশ্বর, সর্বশক্তিমান, দয়াময়, তুমি কি সহায় হবে না ? এই আর্তি কি তোমার কর্ণকুহরে পৌঁছাইতেছে না? হে দয়াময়, হে পিতা, আজ এই আর্তের সহায় হও। পথ দেখাও , পথ দেখাও প্রভু। আর পারিলেন না, জুনিগা এক মুহুর্ত চোখ বন্ধ করিলেন। ইশ্বরের পায়ে নিজেকে সমর্পন করিলেন।

মুহুর্ত পরে, জুনিগা চোখ খুলিলেন জুনিগা। গগনভেদী কর্ণপটবিদারী চিৎকার কোথায় যেন মিলাইয়া গেল, আলোকোজ্জ্বল স্টেডিয়াম তাঁর চোখে পড়িলনা, ক্লান্তি শ্রান্তি তৃষ্ণা সব যেন মিথ্যা হইয়া গিয়াছে। শুধু চোখের সামনে জুনিগা দেখিতে পাইলেন ইশ্বরের নির্দেশ। তাঁর বানী। দয়াময় সর্বশক্তিমান ইশ্বর তাঁর সহায়। আর পারিলেন না, দু চোখ ফেটে আবেগের অশ্রু বেরিয়ে এলো জুনিগার। প্রতিটি রোমকূপে হর্ষ ও উত্তেজনা ফুটিয়া বাহির হইতেছে। জুনিগা দেখিলেন জ্বলজ্বলে হলুদ রঙের উপর স্পষ্ট লেখা ইশ্বরের নির্দেশ – "নে মার"। তার নিচে লেখা ১০। জুনিগা আর থাকিতে পারিলেন না। তিনি তো শুধু ক্ষুদ্র মানুষ, ইশ্বরের ইচ্ছাই সব। তিনিই সর্বনিয়ন্তা। জুনিগা হাঁটু উঠাইলেন।

১০ বার মারার নির্দেশ ছিলো। তবে কিনা ইশ্বরের মার বলে কথা। বাকি ৯ খানি প্রয়োজন হয় নাই। ওস্তাদের মার শেষ রাতে দেখিয়াছি আমরা।