রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ওনাম ও যুদ্ধপরিস্থিতি ~ অবিন দত্তগুপ্ত


কেরালা-তে এখন ওনাম উৎসবের সময় । ওনম কেরালার সবচেয়ে বড় উৎসব । ওনমের সময় কেরালাবাসি-কে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে বি জে পি সভাপতি ,জেনোসাইড-এ পি এইচ ডি অমিত শাহ্‌ টুইট করেছেন - "হ্যাপি বামন জয়ন্তি" । ভাবছেন এ আর এমনকি বিষয় । লোকে গরু খাচ্ছে -গরুর চামড়া ছাড়াচ্ছে বলে খুন হচ্ছে ...আর এ তো পাতি একটা টুইট্‌ । কিন্তু এই টুইট্‌ নিয়েই কেরালা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে , বাছা বাছা বিশেষণে ভুষিত হচ্ছেন অমিত শাহ্‌ । কেন ? সেই উত্তর খুঁজতেই চেষ্টা করা যাক ।

অনেকগুলি ওনাম হয় । মানে একেকটি ওনামের একেকটি গল্প । সবচেয়ে পপুলার মিথোলজি অনুযায়ী , মালায়ালিদের মহাবলী নামে এক রাজা ছিল । পরম পরাক্রমশালী সেই রাজার সবচেয়ে বড় গুন ন্যায় বিচার , আরো ভালো করে বলতে গেলে - সামাজিক ন্যায় বিচার ( Social Justice) । মহাবলীর চোখে সমস্ত মানুষ জাত-ধর্ম নির্বিশেষে এক ছিলেন । তো অনার্য সেই রাজার পপুলারিটি তে, আর্য দেবরাজ ইন্দ্র ভয়ঙ্কর ইনসিকিয়োর্ড হয়ে পড়লেন । একজন রাক্ষস রাজা , বিন্ধ্য পর্বতের ওপারে বাড়ি , কালো - মোটা , সে কিনা আর্য শ্রেষ্ঠ দেবরাজ ইন্দ্রের চেয়েও বেশী জনপ্রিয় !! অতএব ইন্দ্র এসে পৌঁছলেন কূট বুদ্ধিধারী বিষ্ণুর কাছে । বিষ্ণু জানতেন , মহাবলীর কাছে কেউ কিছু প্রার্থনা করলে মহাবলী ফিরিয়ে দ্যান না , এবং মহাবলী তদ্‌কালিন রীতি অনুযায়ী ব্রাহ্মণদের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল । অতএব এক বামুনের ছদ্মবেশে বিষ্ণু মহাবলীর কাছে এলেন এবং তিন পা জমি ভিক্ষে করলেন । মহাবলী তিন পা জমি গ্র্যান্ট করতেই , বামন নিজেকে পাম্প দিয়ে গ্যাস বেলুনের মতো ফোলাতে শুরু করলেন । বিকট বড় আকার ধারন করে তিনি এক পায়ে স্বর্গ , এক পায়ে মর্ত মেপে নিয়ে তৃতীয় পা ফেলতে চাইলেন । মহাবলী তৃতীয় পায়ের জন্য নিজের মাথা এগিয়ে দিলেন । বিষ্ণু পায়ের চাপে মহাবলী-কে পাতালে পাঠালেন এবং পাঠানোর আগে মহাবলীর প্রতিবছর একবার দেশে ফেরার ইচ্ছা মঞ্জুর করলেন । এই প্রতিবছর দেশে ফেরার দিনটাই ওনাম ।
মালায়ালি-রা এই দিনটাকে জাত-ধর্ম নির্বিশেষেই উদযাপন করে থাকেন । প্রতিটি বাড়ির সামনে ফুলের কার্পেট পাতা হয় । চার্চের অল্টার যেখানে থাকে ,সেখানেও পাতা হয় এই ফ্লোরাল কার্পেট । সমান তিন ভাগে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান মানুষ থাকেন কেরালায় । কেরালার সামাজিক শাড়ি ,যে সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের ছুঁচ দিয়ে বোনা , তাতে সুতোর কাজ করে ওনাম । বুঝতেই পারছেন ওনাম কেরালার মানুষের কাছে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ । তা গত বেশ কয়েকবছর ধরে ,আর এস এস কেরালায় বর্ণ হিন্দু সাংস্কৃতি হেজিমনি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে । তারা বলতে চেষ্টা করছে যে , মহাবলী একটি অসুর, তার নামে আদৌ ওনাম নয় । ওনাম আসলে একটা নীচু জাতের রাক্ষসকে পাতালে পাঠানোর সেলিব্রেশন । ওনাম আসলে বিষ্ণুর বামন অবতারের সেলিব্রেশন । অমিত শাহ্‌ সেই লাইনেই খেলেছেন আর কি । সঙ্গে একটি ছবিও দিয়েছিলেন । মহাবলীর মাথায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে বিষ্ণুর বামন অবতার । ছবিটা আসলে আরও বড় অর্থ বহন করে হয়তো । নীচু জাত মহাবলীর মাথায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন উঁচু জাতের বিষ্ণু । বর্ণবাদের যে রাজনীতি অমিত বাবুরা করেন , তার ন্যাচারালাল কনক্লুশান ।

নিজেদের পছন্দ মতো বর্ণহিন্দু সংস্কৃতি ,সহজিয়া বা লোকসংস্কৃতি বা দলিত-আদিবাসি সংস্কৃতির উপর চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতাকেই কাল্‌চারাল ফ্যাসিজিম্‌ বলা হয় । দলিতরা যুগের পর যুগ ধরে চামাড়ের কাজ করেছেন । মৃত গরুর চামড়া ছাড়ানো তাদের জীবিকা । সেটা করতে গিয়ে তাদের খুন হতে হলে ,সেটা কালচারাল্‌ ফ্যাসিবাদ । কমঃ গোবিন্দ পানসারে খুন হলেন কেন ? কমঃ গোবিন্দ পানসারে-কে হিন্দু ফ্যাসিস্টরা খুন করেছে একটি বইয়ের কারণে । বইটির নাম "শিবাজি কৌন হোতা" ( Who was Shivaji ) । কি ছিল এমন বইটাতে ? একটা চটি বই । সরু । ১০০ পাতায় কমঃ পানসারে দেখিয়েছিলেন শিবাজীকে মানুষ ভালোবাসত কারণ শিবাজী গরিব মানুষকে অধিকার দিয়েছিলেন । শিবাজীর জন্য প্রাণ দিয়েছিল যারা, তারা - দলিত , মুসলমান ,হিন্দু । হিন্দুত্ববাদীরা নিজেদের মতো করে ইতিহাস লিখতে চেয়েছেন । তারা দেখাতে চেয়েছেন শিবাজী হলেন আসলে মুসলমান শাসকদের বিরুদ্ধে হিন্দু মাসিহাহ্‌ । কমঃ পানসারে দেখিয়েছেন , শিবাজীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত জেনারেলরা ছিলেন মুসলমান , গরিব মুসলমান । দেখিয়েছেন , শিবাজী যে শুধুই মুঘল বাদশাহদের সাথে লড়েছেন তাই নয় , হিন্দু ফড়েদের পেছনে কষিয়ে লাথি মেরেছেন , হিন্দু রাজাদের হারিয়েওছেন । হিন্দু সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ রুখে দেবার অপরাধেই খুন হন গোবিন্দ পানসারে । আপনার নিজের রাজ্যে আপনি দেখবেন , এরা এদের নিজেদের ইতিহাসের ভার্সন সামনে আনছে । এরা আপনাকে মহম্মদ ইসমাইল ভুলিয়ে দিয়ে স্রেফ সুরাওয়ার্দি মনে রাখাতে চাইবে । এরা আপনাকে ফজলুল হক্‌ ভুলিয়ে দেবে । মুসলিম লিগ মন্ত্রীসভায় শ্যামাপ্রসাদ ভুলিয়ে দেবে । ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আর এস এস - হিন্দু মহাসভার নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চাইবে । ইতিহাসে সংস্কৃতিতে এই ভয়ঙ্কর আক্রমণটাই ফ্যাসিবাদ । সহজিয়া সংস্কৃতি , লোকসংস্কৃতি , দলিত-নিম্ন বর্ণের কালচারাল রেজিস্ট্যান্স-ই একমাত্র এদের হারাতে পারে । অতএব আম্বেদকর-কবির-লালন-লেনিন একসাথে লড়লে তবেই যুদ্ধে জয় সম্ভব । এটা যুদ্ধপরিস্থিতি - অন্য কিছু ভাবার কোন অবকাশ নেই ।


শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

যুদ্ধ ~ সুশোভন পাত্র

ঐ তো অগ্নিদগ্ধ হয়ে শুয়ে আছেন জম্মুর হাবিলদার রভি পাল, ঠিক তাঁর পাশে, ঝাড়খণ্ডের সেপাই জাভ্রা মুন্ডা। কালাশনিকভের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বিশ্বজিৎ গরাই আর মহারাষ্ট্রের নায়েক শঙ্করের বুকটা। হ্যালোজেনের আলসেমি ভেজা রবিবারে কাকভোরে তখনও অবশ্য ঘুমই ভাঙেনি সেভেন রেস কোর্স রোড কিম্বা রাইসিনা হিলের নিশ্চিন্ত বাসিন্দা'দের।

স্বাভাবিক কারণেই,স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে,গর্জে উঠেছে ডাল মাখনি থেকে ইডলি-ধোসা হয়ে ইলিশ ভাপা। স্টার জলসার বিজ্ঞাপন বিরতি তে দীর্ঘশ্বাসের ফাঁকে ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়েছে -'খুন কে বদলা খুনের' অঙ্গীকার। সময়ের পাতনে, গত এক সপ্তাহে অবশ্য সেই বাক্যবাণের অনুরণন, ক্রমশ থিতু হতে হতে ব্র্যাঞ্জেলিনার ডিভোর্সের ঘণ্টাখানেক আলোচনায় বোতলবন্দী। আসলে সীমান্তের চড়াই উতরাইয়ে লাশ কুড়ানোর অভ্যাস আছে আমাদের। ২০০২'র কালুচক ক্যান্টনমেন্টে ৩১, ২০১৩'র শ্রীনগরে সি.আর.পি.এফ ক্যাম্পে ৫, ২০১৫'র গুরুদাসপুরের রাস্তায় ৭, গত জানুয়ারির পাঠানকোটে সেনা ছাউনি তে ৮। এবার সীমান্ত লাগোয়া উরির কাঁটাতার ঘেঁষে সারিবদ্ধ ১৮টা রাষ্ট্রায়ত্ত লাশ। অ্যান্ড দা লিস্ট গোস অন। অ্যান্ড অন...
ক্রোধোন্মত্ত দেশবাসীর ঘৃণার বারুদে অগ্নি সংযোগে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় অবিশ্বাস্য তৎপরতায় হাজির ভারত-পাকিস্তানের সমরসজ্জার পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিসংখ্যান। পরমাণু অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক বরাদ্দ, সাবমেরিন, ডেস্ট্রয়ার, ট্যাঙ্কারের ধারে-ভারে কয়েকশ যোজন এগিয়ে 'হিন্দুস্থান'। বিজেপি প্রেসিডেন্ট রাম মাধবের টুইট 'দরকারে একটা দাঁতের জন্য গোটা চোয়াল উপড়ে নিতে হবে'। তর্কপ্রিয় অর্ণব গোস্বামীর শিশুসুলভ নিষ্পাপ প্রশ্ন "নেশন ওয়ান্টস টু নো, হোয়াই নট কোভার্ট অপারেশন?" রিটায়ার্ড আর্মি চিফ জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী বলছেন 'ফিদায়ীন' বানিয়েই বদলা নিতে হবে।

আরবি শব্দ ফিদায়ীন' অর্থে 'সুইসাইড বোম্বার।' ৭১'র বদলা নিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর দ্বৈত সামরিক 'মাস্টার প্ল্যানের' একটা ছিল এই 'ফিদায়ীন' গ্ৰুপ তৈরি। পরে নয়ের দশকে বেনজির ভুট্টোর ক্যাবিনেটের 'কিং মেকার' নাসিরুল্লা বাবরের সতর্ক নজরদারি তে এই ফিদায়ীন সংশ্লেষিত 'আফগান সেলের' কড়া তত্ত্বাবধানেই ভূমিষ্ঠ হয় সর্বজন নিন্দিত 'তালিবান'। তাহলে কি 'ফিদায়ীন' থেকে 'ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন' তৈরির ঐ বিপজ্জনক পথেরই পথিক হব আমরা? শহীদ জওয়ান'দের বলিদানের মূল্য চোকাতে, আরও কিছু নাগরিক'দের হাড়িকাঠে চড়াব আমরা? কাদের সঙ্গে যুদ্ধ আমাদের? ১৬ আনা উচ্ছন্নে যাওয়া ইসলাম মৌলবাদী আর উগ্র দেশপ্রেমের বিষবৃক্ষ বুকে বয়ে বেড়ানো পাকিস্তানের সাথে? না নিজেদের সাথে? পরমাণু বিধ্বস্ত লাহোরের রক্ত ৩০ কিলোমিটার দূরে অমৃতসরের রাস্তায় বইবে না? বন্দর শহর করাচির বারুদের গন্ধ কচ্ছের রণের বাতাসে মিশবে না? বর্তমানে যুদ্ধের আনুমানিক খরচ ৫ হাজার কোটি/দিন এক পাক্ষিক কালের যুদ্ধে দেশের রাজকোষ ঘাটতি এক লাফে বেড়ে হতে পারে ৮ লক্ষ কোটি। ২০০ টাকা/কেজি ডালের দেশে যুদ্ধের এই বিপুল খরচ বইবে কোন গৌরী সেন?
এন.এই.এ'র তদন্তে আশঙ্কা সেনা ছাউনির ভৌগলিক নকশার সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল জঙ্গি'দের কাছে। খবর ছিল, ১০ডোগরা রেজিমেন্টের কাছ থেকে বিহার রেজিমেন্টের রুটিন দায়িত্ব হস্তান্তরেরও। হাই সিকিউরিটি জোনের কাঁটাতার দু-জায়গায় কেটে, ১৫০ মিটারের উন্মুক্ত অঞ্চল আর সেনা পাহারার নিশ্ছিদ্র বলয় পেরিয়ে, ৪ জঙ্গি নিশ্চিন্তে পৌঁছে গেলেন  একেবারে অলিন্দে। যে জওয়ানরা সিয়াচেনের বরফে জমে দেশ আগলায়, যে জওয়ানরা ঘরের খেয়ে সারাজীবন বনের মোষ তাড়ানোর হিম্মত দেখায়, যে জওয়ানরা রাষ্ট্রসংঘ বোঝে না, সার্কের গোল টেবিলে বৈঠক করে না, তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এতো অবহেলা? যুদ্ধ যদি করতেই হয় তাহলে যে গঠনতন্ত্রের আমলারা কূটনীতির জটিল অঙ্ক কষতে গিয়ে শহীদের নিরাপত্তা দেবার সরল পাটীগণিতের গুন-ভাগে ভুল করেন সেই গঠনতন্ত্রের বিরুদ্ধেই করুন। যুদ্ধ যদি করতেই হয় তাহলে, যে নেতা-মন্ত্রীরা অশ্রুস্নাত জওয়ান'দের কফিন নিয়ে কেলেঙ্কারি করেন তাঁদের বিরুদ্ধেই করুন।    
গত আড়াই মাসে কাশ্মীরে লাগাতার কারফিউ আর জঙ্গি আন্দোলনের শাঁখের করাত সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় শ্রীনগরের 'সন্ত্রাস দমনে'র তথ্য পরিবেশনকারী মাল্টি এজেন্সি সেন্টার। গত দু-মাসে এল.ও.সি বরাবর অনুপ্রবেশর নির্দিষ্ট তথ্যই নেই গোয়েন্দা বিভাগের কাছে। গত কয়েক সপ্তাহে কাশ্মীরে আত্মগোপন করেছে কয়েকশ যুবক। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, দয়া করে, পরিসংখ্যানের কচকচানিটা বুঝুন। চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া নিতান্তই নাবালোকচিত। কাশ্মীর আমাদের পর নয়। পেলেট বিদ্ধ ১১ বছরের কাশ্মীরের আপেল রাঙা ছেলেটাও সন্ত্রাসবাদী নয়। রক্তে ভেজা কাশ্মীরের ইতিহাস সে কথা বলে না।

১৯৪৭-৪৮'এ কাশ্মীরের দখলদারি নিতে আসা পাকিস্তানের হানাদারের ভাগিয়ে দিয়েছিলো কাশ্মীরের সাধারণ মানুষরাই। ১৯৬৫ তে আয়ুব খানের 'অপারেশন জিব্রালটার' ৪০ হাজার অনুপ্রবেশকারীর বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল আজকের পেলেট বিদ্ধ কাশ্মীরিদের পূর্বসূরিরাই।    

সুব্রহ্মণ্যম স্বামী ১০ কোটি ভারতীয় কে পাকিস্তানের সাথে পরমাণু যুদ্ধে আত্মত্যাগের জন্য তৈরি থাকতে বলেছেন। তা ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী জী, ১০ কোটির একজন হতে, আপনার ক্যাবিনেটের গবু মন্ত্রীরা তৈরি তো? আপনার সঙ্ঘ পরিবারের মোড়লরা তৈরি তো? আপনি নিজে তৈরি তো? এই তো সেদিনও আপনি জওয়ান মরলেই 'দুর্বল দিল্লী' সরকার বিরুদ্ধে টুইটারে ঝড় তুলতেন, মিতভাষী মনমোহন সিং কে ব্যাঙ্গ করে পাড়ার রকের মস্তানের মত রংচটা বিবৃতি দিতেন। মৃত সৈনিকের লাশের সওয়ার হয়ে দিল্লীর মসনদ দখলের স্বপ্ন দেখতেন। অথচ দেখুন, সেই আপনিই আজ বাজপেয়ী-মনমোহন পথে হেঁটে 'কূটনৈতিক মোকাবিলার' কথা বলছেন। আজ আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তান কে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন। জিও-পলিটিকাল স্ট্র্যাটেজির অজুহাতে শ্যাম আঙ্কল'দের বাধ্য ছেলের মত, ওয়াশিংটনের 'ধরি মাছ না ছুঁই পানির বিবৃতি' মুখ বুঝেই সহ্য করছেন। তা বেশ! তাই না হয় করুন। আজ না হয়, পেলেট আর পাল্টা ইট বৃষ্টির মৃত্যু মিছিলে লাগাম টানুন, আজ না হয়, কাশ্মীরী'দের আস্থা অর্জন করে পাকিস্তানের মুখে জব্বর একটা ঝামাই ঘষুন, আজ না হয় কাশ্মীরে সকলের সাথে কথা বলে শান্তি ফিরিয়ে আনুন, আজ না হয় আপনার ৫৬ ইঞ্চি ছাতি ফুলিয়ে সীমান্তের জওয়ান'দের আগলে রাখুন। দোহাই আপনাকে, আজ না হয় একবার, প্রথমবার, কথাটা কম, আর কাজটা একটু বেশীই করুন।

বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

কাশ্মীর ~ অবীন দত্তগুপ্ত

​কুনান পোশপারা কাশ্মীরের একটি জায়গার নাম । কুনান পোশপারা ভারতের একটি জায়গার নাম । কুনান পোশপারা এমন একটি জায়গার নাম , যার প্রতিটি বাড়িতে ১৮ থেকে ৫৮ অব্দি প্রত্যেকটি মেয়ে ধর্ষিতা ।

পলিটিকাল কারেক্টনেস্‌ অনেক কিছুই লিখতে দেয় না । কাশ্মীর ভারতের অংশ হয়েছিল অটোনমির আশ্বাস পেয়ে । কথা ছিল , কাশ্মীরের জাতিয় সঙ্গিতটাও নিজস্ব হবে । সেই অনুযায়ী রচিত ভারতের সংবিধানের আরটিকাল নম্বর ৩৭০ । এলাস্‌, প্রতিটি সরকার এসেছে , কাশ্মীর একটু একটু করে নিজের স্বাধীনতা হারিয়েছে । যা যা কথা দেওয়া হয়েছিল ,একটি কথাও রাখা হয়নি । এর বিরুদ্ধে যখন বিদ্রোহ তৈরি হয়েছে , তখন আফস্পা নামের একটা ভয়ঙ্কর আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে । চারদিকে বন্দুক । গুম-খুন-ধর্ষণ । ভাবুন তো কোন টানে , স্ত্রীয়ের শরীরের উষ্ণতা ছেড়ে এক মধ্য বয়সী যুবক , ঠান্ডা বন্দুকে উষ্ণতা খুঁজে পায় ?? কখন পায় ?? আপনি বলবেন "জিহাদ।" মনে রাখবেন , জম্মুতে যখন রক্তের হোলি খেলা হচ্ছে ৪৭-এ , বিশাল একতরফা দাঙ্গায় খুন হচ্ছেন ওখানকার মুসলমান মানুষ - তখন কাশ্মীর ছিল সম্পূর্ণ শান্ত । মুসলমান মৌলবাদিরা এরজন্য কাশ্মীরকে গালি দিতেন - প্যান মুসলমান ঐক্যে কাশ্মীরিরা বেমানান । তাই জিহাদ্‌ কথাটা ঠিক খাটবে না । একটা নির্যাতিত জনজাতি , যখন যার উপর ভরসা করেছে সেই তখন পিঠে ছুড়ি বসিয়ে দিয়েছে । অতএব বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে । এর সুযোগ নিয়েছে সিমান্তের ওপারের শকুনেরা ।

গরিব বাড়ির ছেলেদের ,যাদের চাষে দিন চলে না (অতএব আর্মি) , হাতে বন্দুক ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন আগ্নেয়গিরির সামনে । ১৭ জন খুন হলেন । আপনি ৫৬ ইঞ্চির তান্ত্রিক ১৭টা মৃতদেহ পেলেন । সামনেই উত্তরপ্রদেশ - গুজরাটের নির্বাচন । লাগাও যুদ্ধ । ঘুরাও চাকতি ।

আচ্ছা , আপনি আপনি আপনি , আপনারা সকলেই মনে করেন কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্দ অংশ । তা এই এক মাসে , যে ৮০ জন খুন হয়ে গেল , আজকে যে বাচ্চাটা (১১ বছরের) মাথার চুল উপড়ে নিয়ে , ৪০০টা পেলেট গায়ে গেথে মরে গেল , তারা ভারতীয় নন ? কুনান পোশপারায় প্রতিটি বাড়িতে থাকা ,প্রতিটি নারী ভারতীয় নারী নন ? কাশ্মীরের কেউ নিজেদের কথা আপনাদের বলতে পারছেন না । কাশ্মীরে গুগুল -ইউটিউব- ফেসবুক ব্যানড্‌ । আপনার দেশের অবিচ্ছেদ্দ অংশের মানুষ কেন আপনার থেকে কম সুবিধে পাবে ? কেন তার সংবিধান প্রদত্ত মিনিমাম রাইট টূ ইনফোরমেশন থাকবে না ?

আচ্ছা আরেকটু সহজ করে দি । হিন্দি সিনেমার মতো সহজ । কানেক্ট করতে সুবিধে হবে ।হায়দার সিনেমাটা দেখেছেন তো । টাবুকে দেখেছেন । টাবুর সারা মুখে ছড়িয়ে থাকা যন্ত্রণা ? দেখেছেন ? সবাই টাবুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল । ছেলেটা পর্যন্ত ,অতো সাধের ছেলেটা পর্যন্ত আগন্তুক হয়ে গেল । কেউ কথা রাখে নি । বিশ্বাসঘাতক আপনজনের ছোড়ায় ক্ষতবিক্ষত , সারাটা জীবন বিশ্বাস করে ঠকে যাওয়া ,শেষে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া 'টাব্বু' কাশ্মীরের পারসনিফিকেশন - ধরে নিন, টাব্বুই কাশ্মীর ।​

বুধবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

আইফোন ~ আশিস দাস

আইফোন ৭ লঞ্চ হল কদিন আগে। নতুন ফিচারস আদৌ কিছু এল কিনা সেটা তর্ক সাপেক্ষ। উপরন্তু একটু মোবাইল নিয়ে নাড়াঘাটা করা লোকজন মাত্রেই মানবেন আইফোনের অর্ধেকেরও কম দামে অ্যান্ড্রয়েডের অনেক ফোন রয়েছে একই বা আরো ভাল স্পেসিফিকেশনে। আসলে কোল্ডপ্লে কনসার্ট, আকাশ ছোঁয়া দাম আর চতুর ব্র‍্যান্ডিং দ্বারা এই ফোনকে ঘিরে বহুবছর ধরেই একটা এক্সক্লুসিভিটির মোহজাল তৈরী করা হয়েছে। কোম্পানির ক্যাচলাইন সেই জন্যই "ইফ ইউ ডোন্ট হ্যাভ অ্যান আইফোন, ইউ ডোন্ট হ্যাভ অ্যান আইফোন"! আমি সিওর আইফোনের ওই জ্বলজ্বলে আপেলের লোগো বাদ দিয়ে কাল যদি একই স্পেসিফিকেশনের একটা ফোন আনে অ্যাপল, বেশিরভাগ গ্রাহক সেটা কিনবেন না, দাম আদ্ধেক করে দিলেও না। তবুও হুজুগে ক্রেতার আদেখলামো শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই গোটা বিশ্বজুড়ে, বিশেষত আমেরিকায়।

যাইহোক আইফোন কতটা ওভাররেটেড বা এর প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে আলোচনা করার জন্য এই পোস্টের অবতারণা করিনি। বরং এক একট ঝকঝকে স্লিম আইফোনের পিছনে কতটা কালো দাগ লেগে থাকে সেই ব্যাপারেই দুকথা বলার ছিল। আশা করি অনেকেই জানেন যে আইফোনের ডিজাইন আমেরিকান হলেও ফোন বানানো অর্থাৎ অ্যাসেম্বলিং এর কাজ হয় চিনেই। সেটা অস্বাভাবিক না, কারণ বেশিরভাগ বড় কোম্পানির ফোনই আজকান মেড ইন চায়না। কিন্তু কেন? সেটা ভেবে দেখেছেন? আসুন সেটাই নাহয় একটু বিশদে দেখা যাক।

চিনে আইফোন অ্যাসেম্বল করার মোটামুটি তিনটে বড় কোম্পানি আছে যারা ঠিকাচুক্তি ভিত্তিতে অ্যাপলের সাথে কাজ করে। ফক্সকন, পেগাট্রন এবং উইসট্রন। এর মধ্যে সবথেকে বড় এবং বিখ্যাত (নাকি কুখ্যাত?) কোম্পানি হল ফক্সকন। ফক্সকন আন্তর্জাতিক মহলে সাড়া ফেলে দেয় ২০১০ সালে যখন কারখানার ১৮ জন শ্রমিক আত্মহত্যার চেষ্টা করে। হ্যাঁ তাদের মধ্যে ১৪ জন সফলও হয়। যাইহোক এরপর অবশ্যই ফক্সকন দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এরকম দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি আটকাতে। কি ব্যবস্থা? উমম.. কারখানার চারদিকে বড়বড় জাল লাগানো হয় যাতে আর কেউ ঝাঁপ না দিতে পারে..!! ও হ্যাঁ, সেইবছরই ফক্সকনের লোংঘুয়া ফ্যাক্টরিতে দিনে গড়ে ১৩৭০০০ আইফোন বানানো হয়। মানে মিনিটে ৯০টা! সেই ১৮জন শ্রমিকের মধ্যে ছিল ১৭ বছরের কিশোরী টি-আন ইউ, যে ৪ তলার ডর্মিটরি থেকে ঝাঁপ দিয়েও (দুর্ভাগ্যক্রমে?) বেঁচে যায় এবং কোমরের নীচ থেকে প্যারালাইজড হয়ে পড়ে। তার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি শ্রমিককে সপ্তাহে ৬ দিন নামমাত্র মজুরীতে দিনে ১২ ঘন্টা খাটতে হত। দিন এবং রাত্রি উভয় শিফটেই। আর সাথে বরাদ্দ ছিল একটি ঘুপচি ডর্মিটরি ঘর ৮জন গাদাগাদি করে থাকার জন্য! এসব ঘটনা প্রকাশে আসার পর অবশ্য অ্যাপল একটু নড়েচড়ে বসে। চাইনিজ শ্রমিকদের ভাল থাকার প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি প্রভৃতি সমেত ঝলমলে পুস্তিকা ছাপানো হয়। অ্যাপলের বিভিন্ন ইভেন্টে বিলিও করা হয়। ব্যাস। এই অবদিই। কারণ আগের বছরই চায়না লেবার ওয়াচ নামের আমেরিকান এনজিও-এর করা রিসার্চে দেখা যায় কিভাবে শ্রমিকদের উপর অমানুষিক শোষণ এখনো অব্যাহত রয়েছে। আইফোনের আরেক অ্যাসেম্বলার পেগাট্রনের উপর করা গোপন রিসার্চে উঠে এসেছে অকল্পনীয় সব তথ্য। পেগাট্রনে একজন চাইনিজ শ্রমিক সপ্তাহে ৬দিন, দিনে ১২ ঘন্টা কাজ করেন - যার মধ্যে দৈনিক ১.৫ ঘন্টা আবার আনপেইড লেবার! প্রতি শ্রমিক দিনের পুরো সময় দাঁড়িয়ে কাজ করেন! এবং প্রতি ৩.৭৫ সেকেন্ডে একটা আইফোনে মাদার বোর্ডের কাজ শেষ করতে হয়! গত বছর সাংঘাইতে নূন্যতম শ্রমিক মজুরি বাড়ানো হয়েছিল। তাই পেগাট্রন কতৃপক্ষ শ্রমিকের চিকিৎসা বিমার টাকা ছেঁটে ব্যাপারটা ব্যালান্স করে দেন। নিখুঁত কি বলেন? উইসট্রন নামের অন্য কন্ট্রাকটরের উপর ড্যানিশ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ড্যানওয়াচের রিপোর্টে জানা যায় তারা ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহার করে কম খরচে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য। স্থানীয় স্কুল এবং কলেজের ছাত্রছাত্রীদের বাধ্যতামূলক ভাবে মাসের পর মাস কারখানায় একজন সাধারণ শ্রমিকের মতই হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়, কিন্তু অনেক কম পারিশ্রমিকে। ড্যানওয়াচকে এক ১৯ বছরের ছাত্রী জানান, এই কারখানায় কাজে স্বেচ্ছায় রাজী নাহলে কলেজ থেকে ডিগ্রী না দেবার হুমকিও দেওয়া হয়!

তাহলে ব্যাপারটা যা দাঁড়াল শ্রমিকদের ঘন্টা প্রতি মাত্র ১.৬ ডলার দিয়ে আমাদের ৭০০০০ টাকায় ফোন বেচে অ্যাপল মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলছে। শুধু গতবছরেই তাদের লাভ ছিল ৪৭ বিলিয়ন ডলার। মোট সম্পদের দিক থেকে (২৩১ বিলিয়ন ডলার) অ্যাপল আমেরিকার সরকারের থেকেও ধনী! তবুও তারা শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরিটুকু দিতে নারাজ। শ্রমিকদের শোষণ করা আর ক্রেতাদের টুপি পরানো - এই মোটামুটি অ্যাপলের বিজনেস মডেল! এবার আপনি ভেবে দেখুন। পরেরবার সদ্য কেনা আইফোনে সেল্ফি তোলার সময় ১৭ বছরের কিশোরীর ছাদ থেকে ঝাঁপ দেওয়া স্ক্রিনে ভেসে উঠবে না তো? কিংবা আইপ্যাড বা আইপডে গান শোনার সময় কানে ১২ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ শ্রমিকের হাঁপানির শব্দ কানে আসবে না তো? টাকা আপনার। আপনি সেটা অ্যাপলের গগনচুম্বী মুনাফার পাহাড়ে যোগ করে সেই পাহাড়ের তলায় লাখ লাখ শ্রমিককে পিষে মারবেন কিনা সেই সিদ্ধান্তও আপনার। একেবারেই আপনার।

ঋণস্বীকার : দ্যা গার্ডিয়ানে প্রকাশিত আদিত্য চক্রবর্তীর প্রবন্ধ।

শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মোক্যাম্বো ~ উৎসব গুহ ঠাকুরতা

মোক্যাম্বোতে মনীশ ভাইয়ার অপমানের ঘটনার পর সারা শহর রাগে ফুসেছে, ফেসবুকে গালাগালি করে গায়ের ঝাল মিটিয়েছে, বয়কট মোক্যাম্বো নামে বেশ কয়েকটা ফেসবুক গ্রুপ শুরু হয়ে গেছে, মোক্যাম্বোর সামনে ইতিমধ্যেই একটা ধর্না হয়ে গেছে, আগামী শনিবার আরেকটা হবে, শহরের এক সাংবাদিক একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে নিয়ে মোক্যাম্বোতে খেয়ে এসে তার প্রতিবাদ নথিভুক্ত করেছে। এবার আসুন তো বস, একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবি, এই রাগটা আসলে কি নিয়ে?

মোক্যাম্বো যেটা করেছে তাকে আমরা বলি 'এক্সক্লুসিভিটি'। অর্থাৎ তারা এমন একটা অভিজ্ঞতাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে যা 'এক্সক্লুসিভ', সবার জন্যে নয়। মনীশ ভাইয়া মোক্যাম্বোতে খেতে গেছিলো, ইয়ে মানে, মনীশ ভাইয়া মোক্যাম্বোতে খেতে যাবে কি করে? অত ট্যাকের জোর তো তার নেই। তাকে নিয়ে গেছিলেন তার গাড়ির প্যাসেঞ্জার একজন উচ্চমধ্যবিত্ত মহিলা। তিনি না নিয়ে গেলে, মনীশ ভাইয়া বাপের জন্মে মোক্যাম্বোতে খাওয়ার কথা ভাবতো না। এটা তো শুধু মোক্যাম্বোর গল্প না বস। চারিদিকে তো সবকিছুই এরকম 'এক্সক্লুসিভ'। বাজারে মাছ আর সব্জির দাম এক্সক্লুসিভ, সবার জন্যে নয়। উচ্চশিক্ষা এক্সক্লুসিভ, সবার জন্যে নয়। ক্যাফে কফি ডে তে কফির পেয়ালা এক্সক্লুসিভ, সরকারের হিসেব অনুযায়ী একটি পরিবারের এক সপ্তাহের খাওয়ার খরচ উঠে আসবে তার থেকে। সাউথ সিটি মলের বাইরে জয় ইঞ্জিনিয়ারিং এর শ্রমিক দাঁড়িয়ে থাকলে তার জন্যে কতৃপক্ষ কে ব্রিটিশদের মতন গোদা ভাবে 'কুকুর আর ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ' জাতীয় বোর্ড লাগাতে হয় না। মলের দোকানে দ্রব্যমূল্যের প্রাইস ট্যাগ সেই বোর্ডের কাজ করে। স্কুলে ভর্তির সময় কতৃপক্ষ যখন বাচ্চার বাবা মায়ের স্যালারি স্লিপ চায় এপ্লিকেশন ফর্মের সাথে তখন আপনারা রেগে যান না কেন বস? শহরের নামী ক্লাবে মেম্বার হতে গেলে এপ্লিকেশনের সাথে যখন গত ৫ বছরের ইনকাম হিস্টরি দেখাতে হয় তখন রাগ থাকে কোথায়? আমাদের প্রতিদিনের জীবনের প্রতিটা মুহুর্তই তো 'এক্সক্লুসিভ'। শহরের ধনী পাড়া,বস্তি, খেলার মাঠ, কমপ্লেক্স, মল, রেস্তোরাঁ, এমনকি সংস্কৃতিও তো এক্সক্লুসিভ। শ্রেনী, বস, শ্রেনী। শ্রেনীকে অস্বীকার করবে কে? শ্রেনী সত্য, শ্রেনীসত্যই সত্য, এবং তাই এক্সক্লুসিভিটিও সত্য। এই যে দেশে চারিদিকে ধর্ম এবং জাতপাতের ডিসক্রিমিনেশন কে শেষ করতে সমস্ত সচেতন নাগরিক উঠেপড়ে লেগেছে, সবচেয়ে বড় ডিসক্রিমিনেশন তো শ্রেনীবিভক্ত সমাজ। তা সেসব নিয়ে কিছু করবার কথা ভাবছেন নাকি বস? ধুর, জানি তো, ওসব পুরনো বস্তাপচা মাথা আলুর চপ করা ভাবনা ঠিক ফ্যাসনবেল না। খাটুনিও প্রচুর। তারওপরে টিআরপি নেই। মানে জাতপাত কে অস্বীকার করে এগিয়ে চলো বলে স্লোগান দিন, ধর্ম মানি না বলে স্লোগান দিন, সচেতন নাগরিক এবং মিডিয়া বাহবা বলে এগিয়ে আসবে। এবার বলুন শ্রেনীবিভক্ত সমাজ মানি না, উৎপাদন প্রক্রিয়ার মালিকানার সামাজিকরন করো, মিডিয়া পেছনে ঝ্যাটা নিয়ে তাড়া করবে, নাগরিক সমাজ পাভলভে ভর্তি করবার জন্যে চাদা তুলতে মিছিল করবে।

(জিগনেশ মেওয়ানি নামক এক দলিত নেতা বলেছে - দলিতদের সামাজিক স্বীকৃতি দিতে হলে আগে জমি দাও, ব্যাস, আপাতত পুলিশ লকাপে তুলে নিয়ে রেখে দিয়েছে।)

তাহলে আপনি হঠাত মোক্যাম্বোর কেসে এত রেগে গেলেন কেন? আসলে আপনি রেগেছেন অন্য কারনে। মুক্ত বাজার আর পুঁজিবাদ আপনাকে প্রমিস করেছিলো যে ট্যাকে পয়সা থাকলে সব কেনা যায়। আর আমরা তো জানি, ঠিকঠাক মেধা, বুদ্ধি এবং অধ্যবসায় থাকলে আমরা যে কেউ আম্বানি হতে পারতাম। পুঁজিবাদ আমাদের শিখিয়েছে, অসংখ্য র‍্যাগস টু রিচেস স্টোরির মাধ্যমে, তা ধীরুভাই আম্বানির বাস্তব ইতিহাস হোক, বা 'দ্য পারসুইট অফ হ্যাপিনেস' নামক সিনেমা হোক, শিখিয়েছে যে খাটো, খাটো, খাটো, এবং পৃথিবী তোমার মুঠোর মধ্যে। আমরা কেউই আসলে গরীব না, নিম্নমধ্যবিত্ত না, সবাই ধনী হওয়ার পথে বিভিন্ন দুরত্ব অতিক্রম করেছি মাত্র। মানি স্পিক্স - ফ্রী মার্কেটের মূলমন্ত্র, যা আমরা অমোঘ সত্য বলে মানি (হ্যা সবাই মানি, ওই যে মালগুলো লাল ঝান্ডা নিয়ে ডাউন ডাউন ক্যাপিটালিজম বলে, তারাও জানে না তারা কখন এটা মেনে নিয়েছে), সেই সত্যকে এক নিমেষে ঢপের চপ প্রতিপন্ন করে দিয়েছে মোক্যাম্বো, এবং এখানেই আমাদের রাগ। অবিশ্বাস, হতাশা, অক্ষোমের ক্রোধ। পুরো বিলা কেস তো বস। তাহলে ব্যাপারটা কি? আরে ওই যে আরও কয়েকটা গাঁঁড়ল কিসব বলে - আধা সামন্ততান্ত্রিক-আধা পুঁজিবাদী - কিসব ভাট, কে জানে, ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।

তাই ভেবে দেখলাম, মোক্যাম্বো 'রাইট অফ এডমিশন রিজার্ভড' বোর্ড লটকে বেশ সৎ কাজ করেছে, কারন আপাতত পৃথিবীজুড়ে যে নৈশভোজ চলছে, তাতে ৯০% মানুষের ক্ষেত্রে 'রাইট অফ এডমিশন রিজার্ভড' - খালি বোর্ডটা লটকানো নেই।

শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

বং ~ সুশোভন পাত্র

- হু ওয়াজ নজরুল মামমাম?
- সাচ অ্যা শেম তাতাই! ইউ ডোন্ট ইভেন নো নজরুল তাতাই? হি ওয়াজে গ্রেট বেঙ্গলি পোয়েট, রাইটার অ্যান্ড মিউজিসিয়ান। উই অল রেড হিস পোয়েম ইন আওয়ার চাইল্ডহুড।
দিল্লী মেট্রো তে আড়ি পেতে শোনা এই কথোপকথনের মত, গত পাঁচ বছরে আরও গণ্ডা খানেক উদাহরণে ঋদ্ধ হয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে, দিল্লীর কনটেম্পোরারি বাঙালি বাপ-মা'রা কদাচিৎ ব্যতিক্রম ছাড়া আর ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে বাংলায় কথা বলেন না। আজকাল তো শুনছি কলকাতাতেও বলেন না।
গ্লোবালাইজেশনের দুনিয়ায় ক্লাস টু'র বাচ্চা'দের ইংরেজিতে ঢেকুর তোলাটাও নাকি আবশ্যিক। আমরা নেহাতই ওল্ড ফ্যাশানড তাই ক্লাস এইটে প্যাসিভ ভয়েস কে অ্যাক্টিভ করলে ইংরেজি মাস্টার ভালোবেসে একটা চুইনগাম চিবোতে দিতেন। আবেশের বন্ধুদের ইন্টার্ভিউ দেখতে গিয়ে খেয়াল করলাম, কি ঝরঝরে ইংরেজি। কি কেতাদুরস্ত উচ্চারণভঙ্গি। মুখ ফসকেও একটা বাংলা বেরল না। এরা আমার-আপনার মত সাদামাটা বাঙালি নয়, এরা 'বং'। কলোনিয়াল কালচারের সম্পৃক্ততায় মাতৃভাষা কে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলার প্রবল চেষ্টা এই 'বং জেনারেশনে'র ট্রেন্ডিং ফ্যাশন। আর অযথা আমেরিকান এসেন্টে ইংরেজি বলাটা এলিটিজম।

যে ধরনের এলিটিজম আপনি ধরবো ধরবো করবেন কিন্তু ধরতে পারবেন না সেটা 'সোশ্যাল স্ট্যাটাস'। যেমন ধরুন, আইফোন সেভেন। কিম্বা ধরুন, মহারাষ্ট্রের বিজেপি বিধায়কের বৌ'কে জন্মদিনে গিফট করা ৩.৫ কোটির ল্যাম্বোরগিনির গাড়ি। আবার যে ধরনের এলিটিজম আপনার কষ্টকল্পনা'তেও বিলাসিতা সেটা হল 'গ্ল্যামার'। যেমন ধরুন, ফিতুর সিনেমায় চিনার পাতার রঙে ক্যাটরিনা কাইফের চুল রাঙিয়ে দিতে ৫৫ লাখের বাজেট। কিম্বা বিরাট কোহলির প্রতিদিনের ১০ লক্ষ টাকার প্যাকেজ। এই 'সোশ্যাল স্ট্যাটাস' আর 'গ্ল্যামার'র ককটেল যদি সময় মত বগল দাবা করতে পারেন তাহলে আপনি 'সেলিব্রেটি'। আর এদেশের সেলিব্রেটি সত্ত্বা হল দায়িত্ব-কর্তব্য, আইন-প্রশাসন -সবকিছু ফাঁকি দেবার এলিটিজম।   

সংসদের দু-কক্ষ মিলিয়ে সাংসদ'দের উপস্থিতির গড় ৮০.৫%। আর সেলিব্রেটি সাংসদ'দের কিরণ খের ছাড়া বাকি সবার উপস্থিত ৭৫%'র কম। গত চার বছরে অভিনেত্রী রেখার রাজ্যসভায় উপস্থিতি ৫%। বিতর্কে অংশগ্রহণ শূন্য। প্রশ্ন উত্থাপনও শূন্য। এম.এল.এ ফাটাকেষ্টর রুপালি পর্দায় ডায়লগ বাজি করে সততার রুশ বিপ্লব নামিয়ে ফেলা মিঠুন চক্রবর্তীর উপস্থিতি ১০%। কেন্ট আরও'র বিজ্ঞাপনে গোটা দেশের মানুষকে বিশুদ্ধ জল সরবরাহকারী হেমা মালিনীর উপস্থিতি ৩৭%।

'ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান' নিয়ে দেব লোকসভাতে বাংলায় মুখ খুলেছেন ঐ একবারই। আর তাতেই ভাষা আন্দোলনের মর্মন্তুদ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি রোমন্থনের সাব-অলট্রানিসমের আবেগে ধুয়ে গেছে তাঁর মুখে লেগে থাকা লোকসভায় মাত্র ৯% উপস্থিতি'র চুনকালি। সংসদে এনারা সাবডিসাইজড ক্যান্টিনে খাবার খেতে আর শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে হাই তুলতে মোট দুবার মুখ খুললেও, আমাদের ট্যাক্সের টাকা চটকে, মাসের শেষে সাংসদ হবার সমস্ত সুযোগ সুবিধা উদরস্থ করতে কোন কসুরই করেন না। আসলে এদেশে সেলিব্রেটি'দের সাংসদ হওয়া তে কোন দায়বদ্ধতা নেই। আছে একধরনের এলিটিজম। সংসদীয় এলিটিজম। 

'ভারতরত্ন' লতা মঙ্গেশকার ২০০১'এ মুম্বাইয়ের পেদ্দার রোডে তাঁর বিলাসবহুল বাড়ির উল্টো দিকে একটি ফ্লাইওভারের নির্মাণ পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করে প্রয়োজনে দেশ ছেড়ে পাকাপাকি দুবাইয়ের বাসিন্দা হবার হুমকি দেন। তড়িঘড়ি ফ্লাইওভার নির্মাণ পরিকল্পনার স্থগিতাদেশ ঘোষণা করে মুম্বাই মিউনিসিপালিটি কর্পোরেশন। আজ অবধি আর শুরু হয়নি সে নির্মাণ। আরেক 'ভারতরত্ন'শচীন তেন্ডুলকার ২০০৩'এ ডন ব্র্যাডম্যানের ২৯'টি সেঞ্চুরির রেকর্ড টপকে মাইকেল শুম্যাখার উপহার ইটালিয়ান ফেরারী স্পোর্টস কারের ১.১৩ কোটি টাকা আমদানি শুল্ক ছাড় দেবার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেন। ২০১১'তে বান্দ্রার ৮০ কোটির অট্টালিকায় আইন বহিৰ্ভূত নির্মাণের অভিযোগ ওঠে লিটিল-মাস্টারের বিরুদ্ধে। কিছুদিন আগেও মুসৌরি তে DRDO'র নো-কন্সট্রাকশন জোনে বিজনেস পার্টনার সঞ্জয় নারঙ্গর বিরুদ্ধে যে বে-আইনি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছিলো, শচীন নিজে মনোহর পারিকরের সাথে দেখা করে তার মধ্যস্থতা করেন। আসলে এদেশের ম্যাচো ম্যানরা থাম্পস আপের বোতলে তুফানি চুমুক দিয়ে হরিণ মেরে, ফুটপাতে গাড়ি চালান। রাতের অন্ধকারে, মানুষ মেরে, প্রধানমন্ত্রীর সাথে নিঃসংকোচে ঘুড়ি ওড়ান। আর এদেশের মুন্নাভাই'রা ঘরে বে-আইনি অস্ত্র রাখার গুরুতর অপরাধ অভিযুক্ত হয়েও বরাদ্দ মেয়াদের আগেই জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। এলিটিজম কি আর শুধু মোকাম্বো'র রেস্টুরেন্টে? এলিটিজম তো এদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। 

মোকাম্বো'র ঘটনার প্রায় সমান্তরালেই পালিত হল 'ওনাম'। পৌরাণিক বিশ্বাসে মালায়ালি দলিত রাজা মহাবলীর রাজত্বে নাকি সবার ছিল সমানাধিকার, সব প্রজারা ছিলেন বেজায় খুশি। মহাবলীর প্রতিপত্তিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে, ছলে বলে কৌশলে তাঁকে পরাস্ত করে, তাঁকে নরকে পাঠিয়ে দেন বামনা অবতারে মর্ত্যে অবতীর্ণ বিষ্ণু। গোটা কেরালা যখন ওনাম উপলক্ষে এই মহাবলীর পুনরাবির্ভাব উদযাপনে ব্যস্ত, তখন বামনা অবতারের কল্পিত চিত্র টুইটারে পোস্ট করে 'বামনা জয়ন্তী' পালন করলেন বিজেপি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ।  রাজনীতি ও ধর্মের সংমিশ্রণে শ্যামলা বর্ণের দলিত রাজার উপর গোরা ব্রাহ্মণ্যবাদের এলিটিজম।

আসলে এলিটিজম আমাদের রক্তে। সোশ্যাল মিডিয়া ঝড় তুলে আমার ভেতরের এলিটিজমের ভিসুভিয়াস'টাকে যদি চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া যেত, তো বেশ হত। জোমেটো তে রেটিং দিয়ে যদি দেশের সব এলিটিজম এক লহমায় ঝেড়ে ফেলা যেত, তো বেশ হত। কিন্তু কি করবেন বলুন, দিনের শেষে আমরাও তো 'ভদ্রলোক'। আমরা সকালবেলা আনন্দবাজার পড়ি। সন্ধ্যে বেলা অফিস ফেরত মায়ের বাতের ব্যথার ওষুধ কিনি। ফোর্ড আইকনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পরের দিনের ভাতের থালাতে পালং শাকের অপেক্ষা করি। তাই প্রাণহীন মোকাম্বো'ও এলিটিজম প্র্যাকটিস করে। তাই প্রাণহীন মোকাম্বোর স্টাফ হাউসের এলিটিজম নিশ্চিত করে। কারণ আমরাই এলিটিজম কে ধাওয়া করি। আমরাই এলিটিজম আগলে রাখি। আমরাই মনের মণিকোঠায় এলিটিজমের আকাঙ্ক্ষা কে সযত্নে লালন পালন করি ...

মঙ্গলবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মোক্যাম্বো ~ সৌমিক দাশগুপ্ত

সে এক দিন ছেল। ট্রেনে করে দুর্গাপুর যেতুম। লোক্যালে লোক্যালে। হাওড়া বর্ধমান কর্ড লাইন ধরে দুনিয়ার আলবাল স্টেশন পেরিয়ে বর্ধমান। মেন লাইন হলে আধ ঘন্টা টাইম বেশী লাগত। সেখান থেকে পুরুলিয়া প্যাসেঞ্জার বা অমন কিছু একটা ধরে দুর্গাপুর। এর বেশী বিশেষ যাতায়াত হত না। পুরো রাস্তা জুড়ে আলট্রা প্রোলেতারিয়েত টাইপ কিছু পাবলিক, কিছু ডেইলি প্যাসেঞ্জার, কিছু হকার এর সাথে সহবাস করতে করতে। ভর দুপুরের ট্রেন আপন মনে ঘুচ ঘুচ করে চলত। দরজার কাছে কোন এক ক্ষ্যাপাচোদা টাইপ পাবলিক বসে ময়লা একটা লুঙ্গী বিপদসীমার উপরে তুলে ঘচর ঘচর করে বিচি ফিচি চুলকাতো। আর আমিও বেশ, দেখি দাদা, একটু সাইডে চেপে বসুন, গাঁড়টা ঠেকাই বলে টলে তিনটে সীটের চতুর্থ পাবলিক হয়ে পৌঁছে যেতাম।

ঝামেলাটা হল চাকরী পাবার পর। বেশ বুঝতে পারলাম, ন্যাহ বাঁড়া, পোষাচ্ছে না। বেশ কয়েকশো টাকা বেশী দিলে ঠান্ডা ঠান্ডা একটা কামরা পাওয়া যায়। তাতে হাই ব্লাড প্রেসারে ভোগা কিছু মাল চড়ে। হেব্বি চাম্পি টাইপ কিছু মামণি, উফফ, কি পেটি পাগলা। আর ট্রেনে উঠেই ল্যাপটপ খুলে একটা এক্সেল শীট নিয়ে চোয়াল শক্ত করে বসে থাকা বেশ কয়েকটা লোক। হেব্বি বিজি। এদের সাথে যাওয়াটা বেশ ভালো। বেশ কমফোর্টেবল ও। এখানে ভিখিরি নেই, হকার নেই, বাথরুমে হিসির গন্ধ নেই। বড়লোকদের হিসিতে গন্ধ থাকে না।

তা দেড় দশক কেটে গেল, নন এসি কামরা দেখলে কেমন যেন লাগে। লোক্যাল ট্রেনে চড়তে হবে ভাবলে ট্যাক্সিতে করে যাওয়া যায় কিনা চিন্তা আসে।

খলনায়ক দেখতে গেছিলাম, ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো, অশোকাতে। র‍্যান্ডাম ক্যালাকেলি করেছিলাম ডায়মন্ড হারবার রোডের উপর। হল এর গেট খুলতে দেরী হলে, কি রে খানকীর ছেলে, কতক্ষণ দাঁড়াবো বাঁড়া আর বলে চেল্লানো। এ ছাড়া প্রদীপ বা ভবানীতে গিয়ে মাঝে মধ্যে প্যায়াসী চুড়েইল বা জওয়ানি কি চুলকানি টাইপ ব্যাপার স্যাপার দেখে, হলের আলো আঁধারিতে প্যান্টের চেনটা আলতো করে নামিয়ে.....মানে যা যা হয় আর কি।

তারপর হটাত করেই উপলব্ধি, কিছু টাকা বেশী নেয় বটে, কিন্তু কেমন যেন মায়াবী জগত। ছোট্ট ছোট্ট হল, হেলানো সীট। সিটি ফিটি দেয় না তেমন কেউ। কুড়ি টাকার ভুট্টার খই দুশো টাকায় বেচে বটে, কিন্তু কি সুন্দর ইংরাজি বলে। ইয়োর অর্ডার স্যার, চিজি পপকর্ণ উইদ এক্সট্রা স্পাইস, টু হান্ড্রেড থার্টি, থ্যানক ইউ স্যার। শুনে কান জুড়িয়ে যায়। ও হ্যাঁ, ছোট প্লাস্টিকের গ্লাসে জল ও পাওয়া যায়। একদম ফ্রী। কোন শালা যায় ওই হলে, যেখানে পাশের সীটের লোকটার গা থেকে কেমন ছারপোকার মত গন্ধ ছাড়ছে।

ফাইন ডাইন দু হাজারেও হয় না আর। সেই নিভু নিভু রেস্তোরাঁ তে ওয়েটারকে যখন শ কিংবা দুশো টিপস দি, অথবা পঁচাশি টাকার বীয়র দুশো টাকায় কিনে আলতো চুমুক মারি, অথবা আড়াই তিন হাজারী পেমেন্ট স্লিপে খচাখচ সাইন মারি, মাইরী বলছি, সেই এস এন ব্যানার্জী রোডের ভাতের হোটেল আর আনোয়ার দার কথা মনে পড়ে না। অবিশ্বাস্য লাগবে, যদি আমার পাশের সোফাতে আনোয়ার দা কে গ্রীলড স্যামন এ ছুরি চালাতে দেখি। অবচেতন মন মানতে চাইবে না। সিসিডি তে প্রেমিকার সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে থাকার সময় আমি চাইবো না, আমার পাশে গুড়কের দোকানে ধারে চা বিড়ি খাওয়া রঞ্জু এসে বসুক। মানতেই পারবো না।

পয়সা দেকাচ্চো বাঁড়া? এলিটিজম? গাঁড়ে মোক্যাম্বো গুঁজে দেবো বাল।

রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

কানহাইয়া ও কারাত ~ পুরন্দর ভাট

জেএনইউর ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমার প্রকাশ কারাটকে খোঁচা মেরেছেন কারণ কারাট বলেছেন যে বিজেপি ফ্যাসিস্ট শক্তি নয় এবং বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই কংগ্রেসের মতো দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে করা যাবে না। কানহাইয়া তাতে বলেছেন যে লড়াই করার ইচ্ছে যদি না থাকে কারাট বাবু অবসর নিয়ে বিদেশে গিয়ে পড়ান। এরপর দেখছি কিছু সিপিএম কর্মী সমর্থক কানহাইয়াকে গালমন্দ করছেন। তা ভালো, ২৫ দিন জেল খেটে এসে বিজেপিকে ফ্যাসিস্ট বলা অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা  কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলানোর নয়, প্রশ্নটা অনেক গভীর।

কানহাইয়া এবং সাবেকি কমিউনিস্টদের চিন্তাধারার মধ্যে একটা মূল তফাৎ আছে। কানহাইয়া যতখানি মার্ক্সবাদী ততখানিই আম্বেদকারবাদী, এটা সে বক্তৃতায়, লেখায়, বার বার বুঝিয়ে দিয়েছে। আর কানহাইয়া একা নন, উত্তর ভারতে বামপন্থী আন্দোলনের সাথে যুক্ত অধিকাংশ নেতা কর্মীর কাছে  সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ। কানহাইয়া তাই মনে করে যে আরএসএস বিজেপির বিরুদ্ধে সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে এক বৃহত্তর ঐক্য তৈরী করতে হবে, তাতে অবামপন্থীরাও থাকবে। আরএসএস যে উচ্চবর্ণের স্বার্থসিদ্ধি করার একটা সংগঠন এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই কারণ বর্ণবাদ ব্যাতি রেখে হিন্দুত্ববাদ সম্ভব না, ওটা বাদ দিলে যা দাঁড়ায় তাকে বৌদ্ধ ধর্ম বলা যেতে পারে, চৈতন্যের বৈষ্ণব ধর্ম বলা যেতে পারে, বাউল অথবা সহজিয়া অথবা চার্বাক ধর্ম বলা যেতে পারে কিন্তু সনাতনী হিন্দু ধর্ম বলা যায় না। আরএসএস হিন্দুত্ব বলতে চৈতন্য বা বাউল বা চার্বাক বোঝে না, বোঝে সনাতন ধর্ম। তাই কানহাইয়া মনে করেন যে আরএসএস এর সিঁড়দাঁড়ার গাঁটগুলো একে একে খুলে ফেলতে হলে সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলন গড়ে তোলাই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আর সেই আন্দোলনে হিন্দুত্ববাদ বিরোধী সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করা দরকার।

এর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে কারাটের মতো সাবেকি কমিউনিস্টরা মনে করেন যে আরএসএস কে হারাতে হলে শ্রমিক শ্রেণীর বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন, নব উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণীর একতা তৈরী করতে হবে এবং এই একতা ধর্ম, জাত পাতের উর্ধে উঠে গড়তে হবে। এই একতা তৈরী হলেই বড় পুঁজি আর পশ্চিমী  সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ বিজেপি-আরএসএস কে প্রতিরোধ করা সম্ভব। অর্থাৎ আরএসএস-এর হিন্দু ঐক্যর বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য। তাই কারাট বলছেন যে কংগ্রেসের সঙ্গে কোনো বোঝাপড়া করে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়া যাবে না কারণ কংগ্রেস একই অর্থনৈতিক নীতির পক্ষে।

এই নিয়ে সন্দেহ নেই যে নব উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে না লড়লে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব নয় কারণ ভারতে যে ধরণের পুঁজিবাদ আজকে বিরাজমান তা বর্ণবাদী শোষণ কমানো তো দূরে থাক বরং বাড়িয়েই চলেছে। তাই নব উদারবাদী নীতি সমর্থন করে যে সব রাজনৈতিক শক্তি তাদের সঙ্গে জোট করে সামাজিক ন্যায়ের লড়াই কোনোদিন ফলপ্রসূ হবে না।  আমার মনে হয় যে কানহাইয়াও তা অস্বীকার করেন না। কিন্তু প্রশ্নটা হলো যে গুরুত্ব কোনটিকে দেওয়া হবে? সামাজিক ন্যায়ের লড়াইকে না কি নব উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে শ্রেণী আন্দোলনকে? এই প্রশ্নটা কিন্তু প্রাসঙ্গিক, এই জন্যে যে দ্বিতীয়টাকে যখনই মূল লক্ষ্য বলে স্থির করবো তখনই স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্নটা আসবে যে নব উদারবাদী নীতিকে আটকে দিলেই কি বর্ণবাদী শোষণ কমে যাবে? সম্পূর্ণ নির্মূল না হলেও অন্তত কিছু মাত্রায় কি সুরাহা হবে? আমার মনে হয় এর উত্তর হলো না। তাই যদি হতো তাহলে ৫০-৬০ এর দশকে নেহরুবাদি সমাজতন্ত্রের সময় বর্ণবাদী শোষণ কম থাকতো এখনকার তুলনায়। সেটা যে নয় তা সকলেই জানে। বর্ণবাদী শোষণ শুধু বেসরকারি পুঁজিই লালন পালন করে না, সরকারি পুঁজিও তা করে। সরকারি অফিসার, পুলিশ, সেনা সবেতেই বর্ণবাদ বহাল তবিয়তে রয়েছে এবং বেসরকারি পুঁজির জায়গায় সরকারি পুঁজি থাকলেও সেই অফিসার, পুলিশ, সেনারাই বর্ণবাদী শোষণকে ধারণ করতে সাহায্য করতো। তাই আম্বেদকারবাদীদের যদি গিয়ে বলি যে ভাই তোমরা সব ছেড়ে আপাতত নব উদারবাদ বিরোধী আন্দোলনকেই পাখির চোখ করো তাহলে তারা শুনবে কেন? সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলন নব উদারবাদ বিরোধী আন্দোলন ছাড়া অসম্পূর্ণ সেটা মানলেও গুরুত্ব দিতে হবে সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনের ওপরেই।

ইদানিংকালে বামপন্থীদের মধ্যে  "জয় ভীম" স্লোগান জনপ্রিয় হলেও মাত্র ৩-৪ বছর আগেও সামাজিক ন্যায়ের লড়াইকে "আইডেন্টিটি পলিটিক্স" বলে খাটো করতেন তারা। প্রকাশ কারাট কয়েক বছর আগেই লিখেছিলেন "The ruling classes in India are not disturbed by the diversity of identity politics and the limited movements that they spawn. They seek to engage and give concessions to such identity politics. The obverse side of this is that identity politics disrupts the unity of the working class by preventing the broader mobilisation against the system; by diverting the attention of the people from the rampant inequalities and exploitation under the neo-liberal regime." বলাই বাহুল্য যে এইরকম মানসিকতা নিয়ে দলিত অধিকারের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হওয়া সম্ভব না। যদিও গত তিন চার বছরে সিপিএম নিজেদের কর্মসূচি এবং ভাবনাচিন্তার অনেক বদল ঘটিয়েছে।     

আম্বেদকর বলতেন যে ভারতে শ্রমিক শ্রেণী বলে কোনো শ্রেণী নেই, শ্রমিক শ্রেণী গোষ্ঠী বলে একাধিক শ্রেণী আছে। উনি বামপন্থীদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন যে "আপনারা শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র তৈরী করতে চান কিন্তু সেই একনায়কতন্ত্রে কোন শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব সবচেয়ে বেশি থাকবে? আপনারা কি নিশ্চিত যে উচ্চবর্ণের শ্রমিকরা সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিয়ে দলিত শ্রমিকদের চেপে দেবে না?" ১৯২৮-এ যখন বোম্বের কাপড় কলের শ্রমিকরা এক ব্যাপক ধর্মঘট করে কমিউনিস্ট পার্টির কিংবদন্তি নেতা ডাঙ্গের নেতৃত্বে তখন আম্বেদকর শ্রমিকদের দাবিসমূহ সব সমর্থন করেন কিন্তু তার সাথে  ডাঙ্গের কাছে আরও একটি বিশেষ দাবি করেন। বোম্বের কাপড় কলের শ্রমিকদের মধ্যে দুটো প্রধান ভাগ ছিল কাজের ভিত্তিতে। যার মধ্যে একটি কাজে সুতোতে মুখের থুতু দিতে হতো। যেহেতু সেই সুতো নিয়ে তারপর অন্য শ্রমিকদের কাজ করতে হতো তাই ওই থুথু দেওয়া কাজে কোনো দলিত শ্রমিককে নিয়োগ করা যেত না, দলিতের থুথু দেওয়া সুতো  উচ্চবর্ণের শ্রমিকরা ছোঁবে না বলে। কিন্তু সেই থুথু দেওয়ার কাজের মজুরি ছিল বেশি। তাই আম্বেদকর ডাঙ্গেকে চিঠিতে লেখেন যে বাকি সব দাবির সাথে এই বর্ণ ভিত্তিক নিয়োগের দাবি তোলাকেও রাখা হোক। ডাঙ্গে তাতে অসম্মত হন কারণ তিনি বলেন যে এতে শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য ব্যাহত হবে। তাই শ্রেণী বনাম বর্ণ এই বিবাদ বামপন্থী আম্বেদকারপন্থীদের মধ্যে নতুন না, ভারতে বামপন্থার শুরু থেকে এটা চলছে। প্রকাশ কারাট আর কানহাইয়ার মধ্যে বিভেদেও এই কোনটাকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার তার প্রশ্ন রয়েছে।

শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

পেট্রোল ডিজেল গ্যাস এর দাম ~ সুশোভন পাত্র

কে.সি নাগের অঙ্ক তো নয় যেন গব্বর সিং'র জুলুম। অনুশীলনীর তিরিশ, একত্রিশের অঙ্কগুলো তো কষার জন্য নয় বরং অঙ্কের টিউশনে যৌবনের প্রেস্টিজ কে ছড়িয়ে ছাপ্পান্ন করার জন্যই লেখা। বাজার থেকে একটু চা-পাতা কিনতে যাবেন অর্ধেক আসাম চা-পাতার সাথে দার্জিলিং চা-পাতা, ভেজাল চা-পাতা মিশিয়ে কে.সি নাগ আপনাকে লাভ-ক্ষতির হিসেব করতে বসিয়ে দেবেন। স্নান করতে যাবেন দেখবেন কে.সি নাগ চৌবাচ্চা তে একটা বড় আর একটা ছোট ফুটো করে দিয়ে চলে গেছেন। এবার পাটীগণিতের মাথা খেয়ে স্নান করবেন না, জল ধরবেন-জল ভরবেন? দুনিয়ায় একমাত্র কে.সি নাগের বইয়েই কোনও বাঁদর তৈলাক্ত বাঁশে উঠতে চেষ্টা করে। একবার ৫ ফুট উপরে ওঠে আবার তার পরের মিনিটেই ৪ ফুট নিচে নামে। ঠিক যেন পেট্রোল-ডিজেলের দাম। পরশু ২ টাকা ২৭ পয়সা কমল। কাল আবার ৩.৩৮ বেড়ে গেলো। বাঁদরও যেমন এতদিনেও আর বাঁশের মাথায় উঠলো না, পেট্রোল-ডিজেলের দামও তেমন আজও সাধারণ, মধ্যবিত্তর নাগালে এলো না।   

২০০৫'র রঙ্গরাজন এবং ২০০৯'র কিরীট পারিখ কমিটির সুপারিশ মেনে, সরকার যখন পেট্রোল এবং ডিজেলের দাম বিনিয়ন্ত্রণ করছে, তখন দুর্বার বাজার অর্থনীতির অভিমুখে দেশের অর্থনীতির আরও একধাপ উত্তরণের করতালিতে মুখরিত হয়েছিল দেশের তাবড় সংবাদমাধ্যম। পেট্রোল-ডিজেলের ভর্তুকির গলদঘর্ম ত্যাগে রাজকোষের শ্রীবৃদ্ধি এবং সমানুপাতিক হারে 'পরিকাঠামো উন্নয়নের' স্বপ্নের মায়াজাল বেঁধেছিলেন কেতাদুরস্ত অর্থনীতিবিদরা। আকাশছোঁয়া পেট্রোল-ডিজেলের দামে নাজেহাল সাধারণ মানুষ কে শান্ত করতে তখন বিশ্ব-বাজারে অপরিশোধিত তেলের অগ্নিমূল্যের কেতাবি অজুহাত। বিভিন্ন 'জিও-পলিটিক্যাল' কারণে গত ১৬ মাসে বিশ্ব-বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৭৫% কমে এখন জলের থেকেও কম। এক লিটার মাত্র ১২.৫৮ টাকা। 'তরল সোনার' এই ইন্দ্রপতনে যখন সর্বস্বান্ত হওয়ার জোগাড় ভেনিজুয়েলার মত একাধিক তেলের রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি তখন ৮০% তেল বিশ্ব-বাজার থেকে আমদানি করা ভারতের মত দেশের অর্থনীতির রমরমা। তাহলে কেন আপনি এখনও পেট্রোল-ডিজেলর অগ্নিমূল্যে  প্রতিদিন জ্বলে পুড়ে মরছেন?
বিনিয়ন্ত্রণের  নিয়ম অনুযায়ী যদি বিশ্ব-বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের উপরেই যদি পেট্রোল-ডিজেলের দাম নির্ভর করে তাহলে তো গত ১৬ মাসে পেট্রোল-ডিজেলের ক্রয়মূল্যও ৭৫% কমে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হয়েছে কি?

দেশে যে সমস্ত সংস্থা অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করে কিম্বা বিদেশ থেকে আমদানি করে তারা 'আপস্ট্রিম সেক্টর'। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ ONGC কিম্বা বেসরকারি রিলায়েন্স, HOSE, প্রিমিয়ার ওয়েলের মত 'আপস্ট্রিম সেক্টর' যে দামে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে অর্থনীতির পোশাকি ভাষায় বলা হয় 'প্রাইস অফ ক্রুড ওয়েল'। বর্তমানে এক লিটার পেট্রোলের ক্ষেত্রে যা ১৯.৮০ টাকা।
এবার সরকারী IOCL, HPCL এবং বেসরকারি রিলায়েন্স, এসার, শেলের মত 'ডাউনস্ট্রিম সেক্টর' এই অপরিশোধিত তেল রিফাইনিংর পর যে মূল্যে ব্যবহার যোগ্য পেট্রোলিয়াম পণ্য হিসেবে বিক্রি করে সেটা 'রিফাইনারি গেট প্রাইস'। এক লিটার পেট্রোল পিছু রিফাইনিং খরচা যদি ৩.৭৩ টাকা হয় তাহলে এই অবস্থায় 'রিফাইনারি গেট প্রাইস' ২৩.৫৩ টাকা। পরিশোধিত এই তেল  আবার বিভিন্ন পরিবহনকারী সংস্থার গাড়ি বয়ে আপনার নিকটবর্তী পেট্রোল পাম্প রিটেলারের দুয়ারে এসে পৌঁছায়। ট্রান্সপোর্টেশেন খরচা সহ  তখন তেলের এই 'প্রি-ট্যাক্স প্রাইস' মেরেকেটে ২৬.২১ টাকা। এরপরই শুরু আসল গল্প। ২৬.২১ টাকার এক লিটার পেট্রোলের উপর এবার বসে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ২১.৪৮ টাকার 'এক্সাইস ডিউটি' আর রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে পলিউশেন সেস ও সারচার্জ মিলিয়ে ১৩.৪৯ টাকার ভ্যাট। ব্যাস কেল্লা ফতে!  বুকে পাথর রেখে এক লিটার পেট্রোল ভরতে যেই আপনি পাম্পে দাঁড়িয়ে ইলেক্ট্রনিক্স মিটারে চোখ রাখবেন অমনি ২৬.২১ টাকার পেট্রোল আর ৩৪.৯৭ টাকার মোট ট্যাক্স মিলিয়ে, ঘ্যাঁচাৎ করে কাটা যাবে ৬৩.৪৭ টাকা। মানে,  আগে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের আকাশছোঁয়া দামের খেসারৎ দিয়ে আপনার পকেট কাটা হত। আর এখন বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমে যাবার সুযোগে নিয়ে গত দু-বছরে বিজেপি সরকারের ডিজেলে ৪০০% আর পেট্রোলের ১৩৩% 'এক্সাইস ডিউটি' বৃদ্ধির বদান্যতায় আপনার পকেট কাটা হয়।
অতএব মুক্তবাজারের অর্থনীতির অঙ্কে, সরকারের লাভ হোক বা ক্ষতি, পকেট কিন্তু কাটা হবে এক্সক্লুসিভলি আপনার।  
তখন একদিকে রিলায়েন্সের বিরুদ্ধে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রাকৃতিক গ্যাস চুরির অভিযোগে, অন্যদিকে কেজি অববাহিকার একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ইচ্ছাকৃত কম উৎপাদন করে গ্যাসের বাজার দর ইচ্ছাকৃত ভাবে বাড়িয়ে রাখার ষড়যন্ত্রের অভিযুক্ত রিলায়েন্স একটি জনস্বার্থ মামলা সুপ্রিম কোর্টে রীতিমত কোণঠাসা। ঠিক সেই সময়ে দিল্লীর শাস্ত্রী ভবনের কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস মন্ত্রকের দরজার ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে সরকারী ফাইল থেকে চুরি হয়ে গেলো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। চুরি হওয়া কাগজের মধ্যে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ইনপুট  হিসেবে তেল-মন্ত্রকের দেওয়া দু-পাতার নোট এবং তেল-মন্ত্রকের বিদেশ নীতির খসড়া। ধৃত সাংবাদিক শান্তনু সাইকিয়া বলেছিলেন তেল-মন্ত্রকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের এই গুপ্তচরবৃত্তি আসলে একটা '১০০০০ কোটি টাকার দুর্নীতির টিপ অফ দি আইসবার্গ।'

কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই 'আইসবার্গের' আর হদিশ পায়নি সরকার। খুঁজে বের করতে পারেনি কাদের পরামর্শে এই তথ্য চুরি করার কাজ করেছিল সরকারী দপ্তরের সাধারণ ছা-পোষা ঐ কেরানী গুলো। তদন্তে উঠে আসেনি কোথায় গিয়েছিলো আর কাদেরই বা বাড়া ভাতে ছাই দিতে কাজে লেগেছিল ঐ তথ্যগুলো? ৫৬ ইঞ্চির সরকার জিজ্ঞাসাবাদ করার সাহস করেনি একজনও রিলায়েন্সের কর্মকর্তা'দের। আসলে দিনের শেষে সরকার কে তো পেট্রোল-ডিজেলে 'এক্সাইস ডিউটি' বাড়িয়ে, আমার আপনার পকেট কেটে, কর্পোরেট ট্যাক্সেই প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার ছাড় দিয়ে হয়। দিনের শেষে এই সরকার কে তো আম-আদমির নয় আম্বানি-আদানিরাই স্বার্থসিদ্ধি করতে হয়।
দিনের শেষে তো আদানিদের চার্টার্ড ফ্লাইটেই লোকসভার প্রচার সারতে হয়। দিনের শেষে তো প্রধানমন্ত্রী'কেও সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতায় রিলায়েন্স জিও'র বিজ্ঞাপনে দন্ত বিকশিত করে ভোডাফনের কুকুরের মার্কেট ভ্যালু কে টেক্কা দিতে হয়...

সোমবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৬

জয়েন্টের পরীক্ষায় কারচুপি? ~ পুরন্দর ভাট

জয়েন্ট পরীক্ষা নিয়ে দুদলের অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছি।

এক দল বলছে আল আমীন থেকে ৪৫০ জন পেয়েছে মানেই কিছু একটা কারচুপি হয়েছে। এদের মানসিকতা হলো যে মুসলমানরা লেখাপড়া করতে পারে না, লেখাপড়া তো শুধুই বর্ণহিন্দুদের জাগিরদারি। যখন রহড়া বা নরেন্দ্রপুর থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ ডাক্তারি অথবা সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পেতো এদের কোনো সন্দেহ হয়নি, যখন সেন্ট জেমস বা সাউথ পয়েন্টের একই ক্লাস থেকে ১৫-১৬ জন আইআইটি পায় এদের কোনো সন্দেহ হয়না, যখন রাজস্থানের কোটার কোচিং সেন্টার গুলো থেকে ৪০-৫০% ছেলেমেয়ে আইআইটিতে পায় তখন এনাদের কোনো সন্দেহ হয় না। এই রাজ্যের কোচিং সেন্টারগুলো থেকেও  গুচ্ছ গুচ্ছ ছেলেমেয়ে ডাক্তারি বা সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পায়, সাকসেস রেট্ খুব ভালো, বিশেষ করে সেইসব ইনস্টিটিউটগুলোর যারা ভর্তি করার সময় পরীক্ষা নিয়ে ভর্তি করে। আল আমীনও তাই করে, ভর্তি করার সময় এন্ট্রান্স পরীক্ষা নেয় এবং সাংঘাতিক পরিশ্রম করায়, তাই সেখান থেকে যে অনেকজন পাবে এতে সন্দেহ কী? তা ছাড়া আল আমীন একটি ইস্কুল না, তাদের ১১ টা সেন্টার থেকে ছাত্র ছাত্রীরা জয়েন্ট দিয়েছিলো।

আবার আরেক দল দেখছি যারা জয়েন্টে কারচুপি হয়েছে বললেই রেগে যাচ্ছে। এদের বক্তব্য হলো আল আমীন ভালো করেছে মানে জয়েন্টে কারচুপি হতে পারে না। এরা আল আমীনকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে জয়েন্টের কারচুপির প্রশ্নটাকেই চেপে দিতে চাইছে! প্রথম দলের সঙ্গে দ্বিতীয় দলের বিশেষ তফাৎ নেই, প্রথম দলের মনে করে আল আমীন থেকে এত জন পেয়েছে মানেই কারচুপি আর দ্বিতীয় দল মনে করে আল আমীন থেকে এত জন পেয়েছে মানেই কারচুপি না।

এবার জয়েন্টের পরীক্ষায় কারচুপি হয়েছে কিনা সেটা তদন্ত না হলে কেউ বলতে পারবে না তবে সন্দেহের যে যথেষ্ট কারণ আছে এটা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলেই বুঝবেন। রেজাল্ট বেরোনোর সাথে সাথেই বহু মানুষ ফেসবুক এবং অন্যত্র আওয়াজ তুলেছেন, আল আমীন ইত্যাদির কথা তখনও কেউ জানেই না, আমি নিশ্চিত এখনো অধিকাংশ প্রতিবাদকারী পরীক্ষার্থী এবং অভিবাবকরা আল আমীন থেকে কজন পেয়েছে সেটা জানে না, তাই আল আমীন থেকে বেশি জন পেয়েছে বলে তারা প্রতিবাদ করছে এটা ভুল। অনেকগুলো আশ্চর্য্যজনক ঘটনা ঘটেছে যা থেকে বলাই যায় যে এবারের জয়েন্টের রেজাল্ট নজিরবিহীন। যেখানে ২৫০০ আসন সব মিলিয়ে সেখানে এবারে কোয়ালিফাইং নম্বর পেয়েছেন   ১২০০০ এর বেশি  ছাত্র ছাত্রী, আগেরবারের ৩ গুন্। ৮০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে ৩০০ জন, আগেরবার পেয়েছিলো ১৮ জন। এই সমস্ত হয়েছে আগেরবারের চেয়ে ২০ হাজার কম পরীক্ষার্থী থাকার পরেও। বহু পরীক্ষার্থী ওএমআর শিট দেখতে পাচ্ছে না, কোয়ালিফাইং নম্বরের বেশি পেয়েও কোনো রাংক আসেনি অনেকের, বহু ছাত্রের রেজাল্ট ইনভ্যালিড দেখাচ্ছে। তা ছাড়াও দশ নম্বরের ভুল প্রশ্ন নিয়ে একটা কনফিউশন রয়েছে। ওএমআর শিট না দেখতে পাওয়ার জন্যে এই কনফিউশন কাটছে না। জয়েন্ট পরীক্ষা নিয়ে এতো অভিযোগ আমার স্মৃতিতে নেই। তা ছাড়া ছত্তিসগড়, মধ্য প্রদেশ, উড়িষ্যাতে মেডিক্যাল জয়েন্ট নিয়ে কারচুপি হয়েছে, আমাদের রাজ্যেও টেট পরীক্ষা নিয়ে যে প্রহসন হয়েছে আমরা দেখেছি তাই ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখেছে। কাল আদালতে যাচ্ছে শুনলাম, যদি সত্যি কিছু কারচুপি হয়ে থাকে তাহলে এর বিশাল প্রতিবাদ দরকার, সকলে মিলে।

বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৬

জন্মাষ্টমী ~ প্রসেঞ্জিত বোস

আজ রাত্রেই মেয়েটি জন্মায়। গোকুলে ও গোপনে। তার মা তখন প্রসব-পীড়ায় অচেতন। কিছুক্ষণ পর যমুনার ওপার থেকে একটি লোক আসে। নিজের সদ্যোজাত ছেলেটিকে গচ্ছিত রেখে চুপিচুপি মেয়েটিকে তুলে নেয়। মায়ের মুখটি ভাল করে দেখার আগেই জন্মের মতো পরিবার-হারা হয় সেই মেয়ে।

মেয়েটিকে পাচার করা হয় মথুরার এক ঘুপচি কারাগারে। ছেলেটির প্রাণ মূল্যবান। তার প্রক্সি হিসেবে মেয়েটিকে রেখে দেওয়া হয়। মথুরার রাজা ছেলেটিকে মারতে এসে মেয়েটিকে পায় ও তাকেই নিয়ে যায়। মেয়েটি দ্বিতীয় বার হাতবদল হয়।

রাজা যখন পাথরের দেওয়ালে আছাড় মারতে যাচ্ছে কয়েক-ঘণ্টা-আগে-জন্মানো পুঁচকে মেয়েটিকে, হাত পিছলে ছিটকে যায় সে। তারপর কোনও এক অজানা ঘটনা-পরম্পরায় তার ঠাঁই হয় দুর্গম বিন্ধ্য পর্বতে। সেখানেই সে বড় হয়।

মেয়েটির মা-বাবার কাছে ছেলেটিও বড় হয়। একটা সময়ে সেই মা-বাবা সত্যিটা জানতে পারে। ছেলেটি মথুরায় আসল মা-বাবার কাছে ফেরৎ যায়। কিন্তু মেয়েটির মা-বাবা ভুলেও হারানো মেয়ের খোঁজ করে না। কী লাভ খুঁজে ? হারানো, চুরি-যাওয়া, বিক্রি-হয়ে-যাওয়া, পাচার-হয়ে-যাওয়া ছেলেদের ঘরে তোলা যায়। মেয়েদের যায় না।

ছেলেটির এখন দু-জোড়া মা-বাবা। তার জীবনে অনেক প্রেম আসে। অনেক স্ত্রী আসে। অনেক সন্তান আসে। আসে রাজত্ব।

মেয়েটির ? কেউ জানে না। তার এক-জোড়া মা-বাবা, একটি প্রেমিক, একটি স্বামী, একটি সন্তান, একটুও ভূমি জুটেছিল কিনা, কেউ খোঁজ রাখেনি।

একটি ছেলে-বাচ্চাকে বাঁচাতে প্রক্সি হয়েছিল সে, এই তার একমাত্র পরিচয়।

শুভ জন্মাষ্টমী। শুধু কৃষ্ণের নয়, আজ যোগমায়ারও জন্মরাত।

শুক্রবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৬

দলিত রাজনীতি এবং কমিউনিস্ট পার্টি - একটি আলোচনার সূচনা ~ পুরন্দর ভাট

সাম্প্রতিক উনাতে গোরক্ষা বাহিনীর হাতে দলিত নিগ্রহকে কেন্দ্র করে গুজরাটে এক ঐতিহাসিক দলিত - মুসলিম যৌথ আন্দোলনের সূচনা হয়েছে যার ফলস্বরূপ সারা গুজরাট জুড়ে বিশাল এক পদযাত্রার পর উনাতে পঁচিশ হাজার দলিতের সমাবেশ হয়েছে। সেখান থেকে ডাক দেওয়া হয়েছে ব্রাহ্মণবাদ আর তার তাঁবেদারি করা সংগঠনগুলি, বিশেষ করে সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলার। একই সঙ্গে সোনি সোরির নেতৃত্বে ছত্তিসগড়ের আদিবাসী সম্প্রদায় বিজেপি সরকার আর তার আদিবাসী বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে পদযাত্রা করেছে। আগামী দিনে এই দুটো আন্দোলন একই বিন্দুতে এসে মিলবে বলেই মনে করি।  আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নিম্নবর্ণ, সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের ওপর ক্রমাগত শোষণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে যার পুরোভাগে রয়েছে সংঘ পরিবার। এই আন্দোলনগুলোয় বিভিন্ন বামপন্থী দল নিজেদের সীমিত ক্ষমতায় পাসে থাকার চেষ্টা করছে, কোথাও কোথাও নেতৃত্বও দিয়েছে যেমন সিপিএম আম্বেদকর ভবন ভেঙে দেওয়ার বিরুদ্ধে ২০ হাজার দলিতকে নিয়ে মিছিল করেছে মুম্বাই শহরে যার চাপে মহারাষ্ট্র সরকার সেই ভবন পুনর্নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বামপন্থীরা এই দলিত আদিবাসী নবজাগরণকে কি ভাবে নিজেদের তাত্বিক কাঠামোর সঙ্গে মেলাবে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যার বোধয় অভাব আছে। দলিত আদিবাসী আন্দোলনই যে ব্রাহ্মণবাদকে এই দেশ থেকে মুছে দেওয়ার একমাত্র পথ এই নিয়ে আমি নিঃসন্দেহ। কাজটা সোজা নয়, আরএসএস শুধু হিমশৈলীর চূড়া মাত্র, এই আন্দোলন ব্যাপ্ত হলে আরএসএস খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে কিন্তু তাতেই বর্ণবাদ শেষ হয়ে যাবে না, আরও অনেক দূর যেতে হবে তার জন্যে। তাই  বামপন্থীরা কী ভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আর কী ভাবে এই আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করতে পারে এই নিয়ে স্পষ্ট ভাবনাচিন্তা প্রয়োজন। 

জেএনইউর "দেশদ্রোহী" উমার খালিদ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে একটি অসামান্য প্রবন্ধ লিখেছেন টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। অমনোযোগী হয়ে লেখাটা পড়লে প্রবন্ধটির গুরুত্ব বোঝা যাবে না, আরো পাঁচটা ভালো প্রবন্ধের মতোই মনে হবে। আসল বক্তব্য প্রবন্ধটির একদম শেষে রয়েছে, হয়তো অনেকের নজরেও বিষয়টা পড়েনি কারণ কোথাও আলোচনা লক্ষ্য করিনি। উমার লিখছেন যে ভারতবর্ষে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হতে চলেছে দলিত এবং আদিবাসীদের কেন্দ্র করেই। দলিত এবং আদিবাসীরা হাজার হাজার বছরের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে, সামাজিক ন্যায়ের জন্যে  আন্দোলন করবে এবং তাতেই আমাদের পুতিগন্ধময় সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এতে শুধুই দলিতরা মুক্তি পাবে তা নয়, তাদের আন্দোলনের ফলেই এই সমাজ এবং এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শোষিত সমস্ত মানুষই তাদের মুক্তির সন্ধান পাবে। যেটা উনি ব্যাখ্যা করেননি বিস্তারিতভাবে তা হলো যে বর্ণবাদ শুধুই দলিতদের শোষণ করে না। আমাদের সমাজে  নারীদের অবস্থানের পেছনেও সেই বর্ণবাদই দায়ী, শ্রমিক এবং কৃষককে যাঁরা শোষণ করে তাদের অধিকাংশও উচ্চবর্ণই। তাই বর্ণবাদকে মুছে দিলে বাকি শোষণগুলোর ওপরেও তার প্রভাব পড়বে। যাঁরা আমাদের দেশের বিভিন্ন বামপন্থী দলগুলোর প্রোগ্রামের সাথে ওয়াকিবহাল তাঁরা হয়তো অনুধাবন করতে পারছেন উমার যা বলেছে তা কতখানি নতুন এবং ভারতের বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর যে প্রোগ্রাম তার থেকে কতটা আলাদা। বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিচ্ছি। 

আমাদের দেশের সংসদীয় কমিউনিস্ট দলগুলোর মধ্যে প্রধান হলো সিপিএম এবং সিপিআই। এদের প্রোগ্রামে কিছু তফাৎ থাকলেও মূল জায়গায় ফারাক নেই। এই দুই দলই মনে করে যে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম লক্ষ্য হলো  ভারতে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করা। এই জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব করবে  শ্রমিক-কৃষক জোট, তারাই হবে বিপ্লবের চালিকাশক্তি। তারা মনে করে যে  জোটটা শ্রমিক-কৃষকের হলেও শ্রমিক শ্রেণীই থাকবে পুরোভাগে কারণ তাদের চেতনার মান সবচেয়ে উন্নত। শ্রমিক-কৃষক জোট বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাবান শ্রেণীকে উৎখাত করবে এবং সমস্ত উৎপাদনশীল সম্পদের  ওপর নিজের হক প্রতিষ্ঠা করবে।  বলা বাহুল্য যে তাদের এই প্রোগ্রাম লেনিনের থিসিস অনুসরণ করে বানানো। এর সঙ্গে  নকশালবাড়ি আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর প্রোগ্রামের তফাৎ আছে। নকশালদের প্রোগ্রাম বলতো যে শ্রমিক না কৃষকই হবে বিপ্লবের অক্ষ। তারা মাও ও লিন বাও থিসিস অনুসরণ করে নিজেদের প্রোগ্রাম বানায় যাতে কৃষকদের মধ্যে গেরিলা বাহিনী তৈরী করে ক্ষমতা দখল করা লক্ষ্য হয়, গ্রামে গ্রামে রেজিমেন্ট তৈরী করে তা দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্র শহরগুলোকে ঘিরে ফেলার কর্মসূচি নেয়, স্লোগান ওঠে "গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো।" তাদের প্রোগ্রাম বলতো যে  ভারতবর্ষের মূল উৎপাদন কৃষিজাত, শিল্প এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল সম্পদ নামমাত্র, তাই কৃষিসম্পদ দখল করতে পারলে, তাতে সামাজিক অধিকার স্থাপন করতে পারলে বিপ্লব সফল। পরে নকশালপন্থী বিভিন্ন দলগুলি এই প্রোগ্রাম থেকে সরে আসে। যেমন সিপিআইএমএল লিবারেশনের এখন যে প্রোগ্রাম তা মোটামুটি সিপিআই সিপিএমের কল্পিত জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের থেকে  খুব একটা ভিন্ন না। মাওবাদীরা যদিও এখনও কৃষক এবং আদিবাসীদের মধ্যে গেরিলা বাহিনী সংগঠিত করার প্রোগ্রাম থেকে সরেনি। এবার উমার খালিদ যা বলেছেন তা সিপিআই, সিপিএম অথবা নকশালদের কল্পিত বিপ্লব থেকে কিন্তু  সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলছেন দলিত এবং আদিবাসীরাই বিপ্লবের অক্ষ, তারাই চালিকাশক্তি, কৃষক বা শ্রমিক-কৃষকের যৌথ ফ্রন্ট নয়। আমার মনে হয় এ এক অভিনব ভাবনা। কিন্তু  এই নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। 

আসুন দেখি গুজরাটে উনার আন্দোলনের দিকে। উনার আন্দোলন কিন্তু শুধুই সামাজিক সম্মান এবং ন্যায়ের প্রশ্নে থেমে নেই। দলিতরা প্রতিজ্ঞা করছেন যে তারা আর মরা গরু ছোঁবেন না, ময়লা পরিষ্কার করবেন না, যেসব কাজ তাঁরা হাজার হাজার বছর ধরে করতে বাধ্য হয়েছেন সেই কাজ আর তাঁরা করবেন না। কিন্তু এইখানেই প্রশ্ন চলে আসছে যে তাঁরা যদি এই সাবেকি জীবিকাগুলো থেকে সরে যান তাহলে তাঁরা রোজগার করবেন কি করে? মরা  গরু না ছুঁলে যাঁরা চামার তাঁরা কিভাবে উপার্জন করবেন? যিনি জমাদার তিনি জমাদারী ছেড়ে দিলে রোজগার করবেন কি করে? আর এইখানেই উনার দলিত আন্দোলনের উজ্জ্বল নেতা জিগনেশ মেওয়ানি স্লোগান তুলেছেন "লাঠ লেকে জায়েঙ্গে জমিন খালি কারওয়াযেঙ্গে!" অর্থাৎ  লাঠি নিয়ে নিজেদের হকের জমি ছিনিয়ে নেবো। ভারতবর্ষের অধিকাংশ দলিত, সংখ্যালঘু  এবং আদিবাসীদের হাতে খুব স্বল্প পরিমান উর্বর জমি আছে তাই চাষবাস করে তাদের রোজগার করার উপায় সীমিত, আর এই কারণেই তাঁদের সাবেকি পেশার বাঁধন থেকে বেরিয়ে আসা মুশকিল হচ্ছে। জিগনেশরা তাই দাবি তুলছেন ভূমি সংস্কার এবং ভূমি বন্টনের। একদম সঠিক দাবি কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু ভেবে দেখুন যে সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনও কিন্তু সেই উৎপাদনশীল সম্পদ দখল করার মাধ্যমেই নিষ্পত্তির দিশা পাচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদনশীল সম্পদ দখল করা আর তাতে সামাজিক অধিকার স্থাপন করার সাবেক কমিউনিস্ট পার্টির প্রোগ্রামেই আমরা ফিরে যাচ্ছি, দলিতের দলিত পরিচয়ের চেয়ে তাঁর ভূমিহীন হওয়ার পরিচয়টাই মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

তাহলে কি করণীয়? কমিনিউস্ট পার্টিগুলির প্রোগ্রামই তাহলে ঠিক? কৃষক অথবা শ্রমিক-কৃষক জোটই বিপ্লবের অক্ষ হবে আর দলিত, আদিবাসী সংখ্যালঘুদের শ্রমিক বা কৃষক পরিচয়টাই মুখ্য হবে, তাঁদের সামাজিক পরিচয়গুলো গৌণ থাকবে? তাই যদি হয় তাহলে ৫০-৬০ বছরেও কেন দলিত আদিবাসী আইডেন্টিটি পলিটিক্স মুছে গিয়ে বামপন্থীদের সঙ্গে মিশে যায়নি? কেন সেই আইডেন্টিটি পলিটিক্স দিন কে দিন শক্তিশালীই হয়ে চলেছে ক্রমশ আর বামপন্থীরা জমি হারাচ্ছে? দলিতদের নিগ্রহ না করলে তো দলিতরা রাস্তায় নেমে জমির দাবিতে মিছিল করতো না তাই না? বর্ণবাদী সংঘ পরিবার দ্বারা নিগ্রহের কারণেই তাঁরা আজ রাস্তায় নেমে জমির দাবি তুলছে, ছত্তিসগড়ের রমন সিংহ সরকার সেনাবাহিনী দিয়ে আদিবাসীদের দমন করেছে বলেই আদিবাসীরা একজোট হয়ে জঙ্গলের অধিকারের দাবি তুলছে। 
তাহলে? আমার মনে হয় উমার যা বলেছেন তা আংশিকভাবে ঠিক। কৃষক-শ্রমিক জোটই বিপ্লবের অক্ষ হতে পারে কিন্তু সেই জোট তৈরী হওয়ার উপকরণ হিসেবে দলিত এবং আদিবাসীদের আইডেন্টিটি ভীষণ রকম প্রয়োজন। মার্ক্সবাদ শ্রমিকের চেতনার ওপর ভরসা করে, যেহেতু তারা সর্বহারা তাই তারাই বিপ্লবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রহরী। কিন্তু ব্যাপক হারে সেই শ্রমিক চেতনা তৈরী হবে কি করে যেখানে আমাদের দেশের জনসংখ্যার মাত্র ১০-১৫% আজকের দিনে  শিল্পের সাথে জড়িত এবং তা দিন কে দিন হ্রাসমান? বরং আমাদের দেশে দু হাজার বছরের বর্ণবাদী শোষণ যে বিপ্লবী চেতনার উপকরণ রেখে গিয়েছে তাকে বামপন্থীরা উপেক্ষা করেছে এতদিন। সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, শ্রমিক কৃষকের একটা বড় অংশ বিপ্লবের পথে চালিত হতে পারে, এবং যে হেতু আমাদের দেশে পুঁজিবাদ ও বর্ণবাদ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত তাই সামাজিক ন্যায়ের পথে চালিত এই অংশটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবেরও সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রহরী হতে পারে। আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলি বিষয়টা বিবেচনা করে দেখে কিনা সেটাই এখন দেখবার। 

বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৬

আবহ বার্তা ~ অরুনাচল দত্তচৌধুরী


এ'বার বৃষ্টি এলে আমাদের মাঝখানে জেগে ওঠা চর 
ডুবে যাবে
সে'রকম বৃষ্টি হলে আমাদের ঘর
ডুবে যাবে ফেলে আসা প্রেমে।
আমাদের ধুলোমাখা ছবি,
আবার বাঁধানো হবে বজ্র আর বিদ্যুতের ফ্রেমে

অশ্রুপরিণতিহীন সমস্ত বিলাপ,
নিজেদের ঠকানোর নিরন্তর মধ্যবিত্ত পাপ
দিবানিশি গল্প হয়ে ওঠে
চুমুগুলি থমকে থাকে তৃষ্ণাভরা ঠোঁটে
খাতাভরা কবিতারা
অসমাপ্ত পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
তাদের কুড়িয়ে নিয়ে যথাযোগ্য কথাসুতো দিয়ে
গেঁথে দিক বৃষ্টিকণা এসে।

আয় বৃষ্টি আয়
এই সংসারের চাপে যাওয়া হয়নি মধুচন্দ্রিমায়
আজকে মেঘের দেশে হানা দেবে হারানো সে চাঁদ
একপাশে আলো থাক
অন্যপিঠে কিছুটা বিষাদ।

ভুল করে যাকে গেছি ভুলে
আজ সেই নিম্নচাপ
ঘনীভূত আমাদের ছিন্ন উপকুলে

মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৬

স্বাধীনতা দিবস ~ যুদ্ধ পরিস্থিতি

আরেকটি ১৫ই আগস্ট, আরেকবার স্বাধীনতা দিবস এলো আর গেলো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ থেকে স্বাধীনতার জন্যে যারা লড়েছিলেন, তাদের প্রত্যেকের মাথার মধ্যে হয়তো স্বাধীন ভারতের ধারনা সম্পর্কে আলাদা মতামত ছিলো। ভগত সিং যেই স্বাধীন ভারতের ধারনা মাথায় নিয়ে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েছিলেন, আর গান্ধী যে স্বাধীন ভারতের ধারনা বুকে নিয়ে গডসের গুলি খেয়েছিলেন, তার মধ্যে কিঞ্চিত ফারাক রয়েছে।
চট্টগ্রামের পাহাড়ে সূর্য সেনের নেতৃত্বে যেই সুবোধ রায়, অম্বিকা চক্রবর্তী, গনেশ ঘোষ আর লোকনাথ বল একইসাথে কাধে কাধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশদের তাক করে রাইফেল ছুড়েছেন, স্বাধীন ভারতে তারাই কংগ্রেস আর কমিউনিস্ট - দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়ে একে অপরের বিরোধী হয়ে রাজনীতি করেছে্ন, ভারত নিয়ে তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে।

আমরা, স্বাধীন ভারতের নাগরিক যারা, প্রত্যেকেই হয়তো আমাদের এই দেশের কাঙ্খিত চরিত্র সমন্ধে ভিন্ন ধারনা পোষণ করি। এবং এই ভিন্ন ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে হয়তো আমরা অনেকেই নিজেদের স্বল্প পরিসরে কোনরকম ভূমিকা পালন করবার চেষ্টা করি। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে, আমরা যারা ধারনার জগতে একে অপরের বিরোধী, তারাই আবার সহযাত্রীও বটে। কারন স্বাধীনতা তো কোন গন্তব্য নয়, স্বাধীনতা তো যাত্রা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে যারা লড়ে স্বাধীনতা আনলেন, তারা একটা অধ্যায় সমাপ্ত করলেন, এবং স্বাধীনতা যাত্রার পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা করলেন। এই অধ্যায়ের অনেক বৈরিতার মধ্যেও একটা ধারনা অবিচল রয়েছে - বহুত্ববাদ। এই বহুত্ববাদ যতবার আক্রান্ত হয়েছে, এই দেশের মানুষ একজোট হয়ে তাকে রক্ষা করেছে। যাদের ইতিহাসের ভার আমরা বহন করি, তাদের ভারতের ধারনা যে আমাদের মধ্যে প্রবহমান, তাকে আমরা অস্বীকার করি কি করে?
কোন একদিন সুবোধ রায় যখন তেভাগা আন্দোলনের সময় কৃষকদের মিছিলের সামনে হাটছিলেন, তখন কি তার পাশে সূর্য সেন মুচকি হেসে পায়ে পা মেলান নি?
গুরগাঁও তে মারুতি কারখানার যে শ্রমিকরা স্ট্রাইক করে কয়েক বছর জেল খেটে এলেন, তাদের সাথে জেলের ভেতর কি ভগত সিং আর বটুকেশ্বর দত্ত বসে  ১৯২৯ এ ট্রেড ডিসপুট এক্ট পাশ করবার দিন এসেম্বলিতে বোম মারবার গল্প শোনায়েনি?
এই ১৫ই আগস্ট গুজরাটে আহমেদাবাদ থেকে উনা অবধি দলিতদের মহামিছিলের শেষে জিগ্নেশ মেওয়ানি স্টেজে উঠে যখন দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষনা করলেন - 'তুমহারা মাতা তুম রাখো, হামে আপনি জমিন দো', তখন কি আকাশে ছোড়া হাজারটা মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের মধ্যে একটা হাত আম্বেদকরের ছিলো না?
বস্তারে শোনি সোরি যখন কর্পোরেট মাফিয়ার হাতে আদিবাসীদের জল-জমি লুঠের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কোন এক থানায় পুলিশের হাতে অত্যাচারিত হয়ে এক কোনে পড়েছিলেন, তখন কি ইলা মিত্রর কোলে মাথা রেখে কিছুক্ষন জিরিয়ে নেননি? এই ১৫ই আগস্ট যখন শোনি সোরি বস্তারের গ্রামগুলোর মধ্যে দিয়ে আদিবাসীদের মহামিছিলে হেটে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন, তখন কি তার পাশে হাত ধরে প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার হাটছিলেন না?

স্বাধীনতা নামক মহাকাব্যের বর্তমান অধ্যায়ে এই বলিষ্ঠ চরিত্রগুলো যখন দেশ জুড়ে তাদের ভারতের ধারনা কে বাস্তব করে তুলতে মাঠে নেমেছে, 'আজাদি'র যাত্রায় সহযাত্রী হয়েছে, তখন আমরা সহনাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার এই যাত্রা কে মহাড়ম্বরে উদযাপন করবো না কেন? আমরা প্রত্যকেই তো লড়ছি এই আজাদির জন্যে - আমাদের ভারতের ধারনা কে রক্ষা করবার জন্যে। ভুলে গেলে চলবে কি করে, আজ লাল কেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা দিয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী, তিনি এমন একটি সংগঠনের সদস্য যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে শুধু খাতায়-কলমে বিরোধিতাই করে থামেননি, মাঠে নেমে তার বিরুদ্ধে লড়েছেন, যারা এই দেশের পতাকা, সংবিধান কোনটাকেই স্বীকৃতি দেননি।

আজাদির যাত্রা থামবে কেন?

সোমবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৬

স্বাধীনতা ~ পুরন্দর ভাট

দীপা কর্মকার চতুর্থ হলেন। চোখের সামনে ইতিহাস দেখলাম।

ছোটোর থেকে শুনে এসেছি মোহনবাগানের খালি পায়ে বুট পরা সাহেবদের হারানোর গল্প। আমি মাচাদের সহ্য করতে পারিনা কিন্তু তবুও এমন কোনো বাঙালি ফুটবল প্রেমী নেই যে ছোটোবেলায় মোহনবাগানের সেই শিল্ড জেতার গল্প শুনে রোমাঞ্চিত বোধ করেনি। তারপর পড়েছি মিলখা সিংহের সারা জীবনব্যাপী লড়াইয়ের কাহিনী, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো রকম সাহায্য  না পেয়েও তিনি কি ভাবে পৌঁছেছিলেন অলিম্পিকে চার নম্বরে। পড়েছি পিটি ঊষার কথা।

আজ চোখের সামনে দেখলাম। মৃত্যুকে তুচ্ছ করে দিয়ে লাফ দিলো ভারতের বিস্মৃত একটি অঙ্গরাজ্যের মেয়ে। হ্যা, প্রদুনোভায় মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, আনন্দবাজারের দৌলতে অনেকেই সেটা জেনে গেছি। যখন দীপা দ্বিতীয় লাফটা দিতে যাচ্ছে, পশে স্কোর বোর্ডে পরিষ্কার দেখাচ্ছে "ডিফিকাল্টি লেভেল -৭" অর্থাৎ সর্বোচ্চ। যিনি গোল্ড জিতলেন সেই মার্কিনি বাইলস কিন্তু দুটো লাফের প্রথমটা ৬.৫ এবং দ্বিতীয়টা  ৬ ডিফিকাল্টির দিয়েছিলেন। কেন দীপাকে এতো কঠিন লাফ দিতে হলো? কারণ পরিকাঠামো এবং ট্রেনিঙের অভাব, যাতে তিনি অন্যান্য সহজ ঝাঁপিগুলি ঠিক মতো অনুশীলন করতে পারেননি। নিজের সমস্তটুকু বাজি রেখে চেষ্টা করেছিলেন, তবুও হলো না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় দেখেছি ছোট্ট শহরেও রোজ বিকেলে শয়ে শয়ে ছোটো ছোটো মেয়েদের জিমন্যাসিয়ামে নিয়ে যেতে  তাঁদের বাপ্ মায়েদের। ভারী ভালো লাগতো ফুলের মতো শিশুদের লাফালাফি করতে দেখে, পাস দিয়ে গেলেই দাঁড়িয়ে দেখতাম। ওই দেশের পরিকাঠামো, ট্রেনিং এবং সকলের উৎসাহের কথা ভাবলে মনে হয় দীপার চতুর্থ হওয়া  মোহনবাগানের খালি পায়ে শিল্ড জেতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

পার্থক্য একটাই, মোহনবাগান জিতেছিল পরাধীন ভারতে যেখানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির  স্বদেশী খেলোয়াড়দের অবহেলা করাটাই স্বাভাবিক আর দীপা স্বাধীন ভারতের খেলোয়াড়, পর্যাপ্ত ট্রেনিঙের ব্যবস্থা না থাকলেও দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট বিলোনো দলের  ক্রীড়ামন্ত্রী বিজয় গোয়েল তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঠিক ব্রাজিল দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, মুকেশ আম্বানি আর তাঁর স্ত্রী সরকারি টাকায় অলিম্পিক দেখছেন এম্বাসেডর হয়ে।

ও, স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।

শুক্রবার, ৫ আগস্ট, ২০১৬

জি এস টি ~ সুশোভন পাত্র

ঐ জোকসটা পড়েছেন? ঐ যে, ম্যাডাম তাঁর ছাত্র কে জিজ্ঞেস করছেন "বল ২ আর ২ যোগ করলে কত হয়?" অমনি ছাত্র নিঃসংকোচে উত্তর দিচ্ছে ৯.৫। উত্তর শুনে ম্যাডাম যখন ছাত্রের জ্ঞানের দীপ্ত বিচ্ছুরণে বিরক্ত হয়ে বেত্রাঘাতে উদ্যত, তখন সেই ছাত্র কাঁচুমাচু হয়ে হিসেব কষছে "২+২=৪ +VAT+সার্ভিস ট্যাক্স+হাইয়ার এডুকেশন সেস+স্বচ্ছ ভারত সেস+কৃষি কল্যাণ সেস+এক্সাইস ডিউটি করলে ওটা রাউন্ড ফিগারে ৯.৫'ই হবে।" ছাত্রের উত্তর শুনে সেই ম্যাডাম, সেই যে অজ্ঞান হয়েছিলেন, গত পরশুই তাঁর জ্ঞান ফিরেছে; মোট চারজন অর্থমন্ত্রী আর দুই সংসদের এক দশকের বায়নাক্কার পর জি.এস.টি সংক্রান্ত (১২২তম) সংবিধান সংশোধনী বিল রাজ্যসভায় পাশ হওয়াতে। মিডিয়ার করতালির লুজ মোশেনে প্রচার হয়েছে, আগের জটিল ও মিশ্র ট্যাক্সেশন পলিসির 'ক্যাসকেডিং এফেক্ট' সরিয়ে জি.এস.টি হবে অপেক্ষাকৃত মসৃণ ও নির্ঝঞ্ঝাট। বাঁকুড়ার চকবাজার থেকে কলকাতার লালবাজার, গৃহস্থের হাটবাজার থেকে বৌ'র শপিং'র পালিকাবাজার -এবার থেকে সব শেয়ালের এক রা, সব বাজারে এক ট্যাক্স। পণ্ডিতরা বলছেন ভীষণ ফেডারেল স্ট্রাকচারে দুর্লভ এই 'ইকোনোমিক ইউনিটি'। যে কোনও বিলে ঐ যে গণ্ডা খানেক হিজিবিজি ট্যাক্সের, সাড়ে বাহান্ন রকম হ-য-ব-র-ল দক্ষিণার সৌজন্যে আপনার মাঝেমাঝেই কালঘাম ছোটে এবার সেটা মুছে ফেলুন। জি.এস.টি তে এবার সবমিলিয়ে একটাই ট্যাক্স।একটাই টাকার অঙ্ক। জি.এস.টি নাকি সো সিম্পল, সো শর্ট অ্যান্ড সো প্রিসাইস।
২০০৬'র জেনারেল বাজেটে পি.চিদাম্বরম যেবার প্রথম জি.এস.টি'র কথা পেড়েছিলেনে, তখনও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঙ্গুর থেকে দৌড়ে এসে সংবিধান হাতে বিধানসভা ভাঙচুর করেননি, সৌরভ গাঙ্গুলি  কামব্যাক করে গ্রেগ চ্যাপেলের মুখে ঝামা ঘষে দেননি, সাদ্দাম হোসেন তখন জ্যান্ত আছেন, জ্যোতি বসু তখনও দিব্যি আলিমুদ্দিন আসছেন এবং বাইচুং ভুটিয়া তখনও ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন হয়ে নেহেরু কাপ খেলছেন। জি.এস.টি'র সর্বাঙ্গ যদি এত সুন্দর আর সহজ-সরলই হত তাহলে কি আর লাল-সবুজ কার্পেটে মোড়া সংসদে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করতেই জেটলি-চিদম্বরমের একদশক সময় লাগত? অবশ্য দিল্লী এখনও বহুদূর। এবার লোকসভায় তারপর কমপক্ষে ১৫টি রাজ্যের বিধানসভার দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে এই বিল পাশ হয়ে রাষ্ট্রপতির দুয়ার ঘুরলে তবে গঠিত হবে জি.এস.টি পরিষদ। তাঁরাই লিখবেন মূল বিলের খসড়া। সেই বিল কে আবার একে একে পেরোতে হবে লোকসভা ও রাজ্যসভার চৌকাঠ, তবে গিয়ে চালু হবে সাধের জি.এস.টি।
বর্তমান মিশ্র ট্যাক্সেশেন পলিসির ক্যাসকেডিং স্টাইলে যেকোনো পণ্যের ম্যানুফ্যাকচারিং থেকে শুরু করে হোলসেল ঘুরে রিটেল হয়ে আপনি কেনা পর্যন্ত, প্রতি ধাপে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার বিভিন্ন ট্যাক্স আদায় করে। রাজ্য নিজেদের ঘরের হাঁড়ির অবস্থা দেখে প্রয়োজনীয় ট্যাক্স রেটও ধার্য করতে পারে, নতুন ট্যাক্সও বসাতে পারে। যেমন ধরুন, আমাদের দূরদর্শী মুখ্যমন্ত্রী সারদা কাণ্ডে নিজের নেতা-মন্ত্রী-সাংসদ'র ঘুষ খাওয়া টাকা ফিরিয়ে দিতে সিগারেট উপর সেস বসিয়েছিলেন। আবার ধরুন কেরালার নতুন সরকার, বিক্রি কমাতে ফাস্টফুডের উপর বিশেষ ট্যাক্স বসিয়েছে কিংবা প্রবল বন্যার ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করতে উড়িষ্যা সরকারের লাগু সাময়িক ভ্যাট ইত্যাদি। কিন্তু জি.এস.টি চালু হলে ম্যানুফ্যাকচারিং-হোলসেল-রিটেলে নয় বরং ট্যাক্স বসবে শুধু একবারই, পণ্য কেনার সময়। রাজ্যগুলির হাতেও থাকবে না নিজেদের প্রয়োজন মত ট্যাক্স আদায়ের বা নতুন কোন ট্যাক্স লাগু করার ক্ষমতা। ফলে গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু'র মত ম্যানুফ্যাকচারিং রাজ্যগুলি প্রবল রেভেনিউ লসের আশংকায় দীর্ঘদিনই জি.এস.টি লটকে ছিল। এখন অবশ্য গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র'র বিজেপি'র রাজ্য সরকার আর কেন্দ্রের এনডিএ সরকার আমে-দুধে মিশে গেছে। আর আপত্তির আঁটি হাতে নিয়ে তামিলনাড়ু কে আঙুল চুষতে দেখে ফচকে ছোঁড়ারা টুইট কেটেছে "নরেন্দ্র মোদী দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন জি.এস.টি'র বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেই একই বিল পাশ করিয়েছেন।"
একদিকে ট্যাক্সেশেন পলিসির এই সরলীকরণের ফলে বিভিন্ন রাজ্যগুলির ব্যাপক রেভেনিউ লস আটকাতে চড়া রেভেনিউ নিউট্রাল রেট ধার্য করে ফেডারেল ফিসক্যাল পলিসির মান্যতা রক্ষা অন্যদিকে চিফ ইকনমিক  এডভাইসার অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম সুপারিশ মেনে রেভেনিউ নিউট্রাল রেটকে ১৫%'র মধ্যে রেখে মুদ্রাস্ফীতি রক্তচক্ষুকে সামাল দেওয়া -জি.এস.টি'র ভবিষ্যৎ আপাতত এই শাঁখের করাতেই দোদুল্যমান।  
জি.এস.টি ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স। গরীবের লাইফবয় থেকে বড়লোকিরা হুন্ডা-সিটি, মধ্যবিত্তর এসি থেকে আম্বানি'দের চার্টার্ড ফ্লাইট, জি.এস.টি ওমনিপ্রেসেন্ট, হোমোজিনিয়াস। তাই আর্থিক বৈষম্য কাটাতে ট্যাক্স ব্যবস্থা সত্যি রিফর্ম করে, রাজকোষের শ্রীবৃদ্ধি যদি ঘটাতেই হয় তাহলে ডাইরেক্ট ট্যাক্সের গল্পটাও একটু কড়াই গণ্ডায় বুঝে নেওয়া দরকার। বর্তমানে দেশের জিডিপির মাত্র ১৬.৬% ট্যাক্স। যা উন্নয়নশীল ও ও.ই.সি.ডি'র অন্তর্ভুক্ত দেশগুলির গড় ২৭.৫% থেকে অনেকটাই কম। আবার ঐ ১৬.৬%'র মাত্র ৫১.৫% ডাইরেক্ট ট্যাক্স। আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল সবচেয়ে ১০% মানুষের হাতেই যেখানে দেশের ৬৬% সম্পদ সেখানে ট্যাক্স বাবদ দেশের মোট জি.ডি.পি তে তাঁদের অবদান মাত্র ৫.৪৭%। গতবছরও  যেখানে জেনারেল বাজেটে ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স বেড়েছে ২০ হাজার কোটি, সেখানে ডাইরেক্ট ট্যাক্স কমেছে ১ হাজার কোটিরও বেশি। ছাড় দেওয়া হয়েছে ৬৮৭১০ কোটি কর্পোরেট ট্যাক্স। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে ১০টি 'বিগ বিজনেস হাউস'র অনাদায়ী ঋণ ৭.৫ লক্ষ কোটি।
পরশু প্রধানমন্ত্রী টুইট করেছেন, অরুণ জেটলি কেক কেটেছেন। তা বেশ জেটলি স্যার, এবার তাহলে ঋণখেলাপি ললিত মোদি আর বিজয় মালিয়া কেও লন্ডন থেকে ফিরিয়ে আনা হোক, পরের বার বাজেটে ডাইরেক্ট ট্যাক্সের ফাঁকির হিসেবটাও একবার মিলিয়ে দেখা হোক, 'রেভেনিউ ফোরগেনে'র নামে বারবার কর্পোরেট ট্যাক্স ছাড়ের নাটকটারও এবার না হয় যবনিকা টানা হোক, বিগ বিজনেস হাউস'র অনাদায়ী ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও না হয় একবার ৫৬ ইঞ্চির বীরত্ব দেখানো হোক। সেদিন না হয় আমরাও টুইট করব। সেদিন আমরাও কেক কাটবো..

সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

আবেশ কেন মারা গেলো? ~ উৎসব গুহ ঠাকুরতা

আবেশ কেন মারা গেলো? - এই জ্বলন্ত প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে গোটা বঙ্গসমাজ। আবেশের মৃত্যুতে সামগ্রিক বাঙ্গালী জাতির চেতনা জাগ্রত হয়েছে - সামাজিক কাঠামোর প্রতিটি ইঞ্চি বিশ্লেষণ করে নাগরিক সমাজ একের পর এক বৈপ্লবিক দলিল পেশ করছে। আমরা নিজেদের চিনছি, জানছি - আবেশ কেন মারা গেলো, আর কি কি করলে আবেশ মারা যেতো না। আসুন, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জড়ো হওয়া সমস্ত দলিল কে এক করে আমরা একটা কারনের লিস্ট বানাই।

আবেশ মারা গেছে কারন সে আইনত প্রাপ্তবয়স্কের তকমা পাওয়ার আগেই নেশা করতো। দু মিনিট নীরবতা সেই সমস্ত পাষন্ড অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে যারা গত ৪০ বছর ধরে স্কুলে পড়াকালীন লুকিয়ে সিগারেট টেনেছে, পুজোয় বাড়ির থেকে পাওয়া পয়সা জড়ো করে মদ খেয়ে মাতাল হয়েছে, গাঁজা টেনে রাস্তায় পড়ে থেকেছে। কলেজের হোস্টেলে, বাড়ির ছাদে, বন্ধুরা এক হয়ে যারা 'নেশাভাঙ' করেছে, খুন হওয়াই যে তাদের ভবিতব্য, তা আবেশ চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে গেলো।

আবেশ মারা গেছে কারন সে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়তো, টিউশন কামাই করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারতো, এবং তার কাছে মোবাইল ফোন ছিলো। দুমিনিট নীরবতা গোটা রাজ্যের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়া সেই সমস্ত অভাগাদের জন্যে, যারা টিউশন কামাই করেছে, টিউশনের স্যারের টাকা মেরে তাই দিয়ে 'নষ্টামো' করেছে। দু মিনিট নীরবতা সেই সমস্ত বাবা-মায়ের জন্যে, যারা প্রযুক্তির বিস্তার কে অস্বীকার করবার সাহস দেখাতে পারেনি, যারা বাচ্চাদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছে (বাড়িতে কেবেল টিভি লাগাচ্ছে, পার্সোনাল কম্পিউটার কিনে দিচ্ছে, আমাদের সময় এসব ছিলো নাকি!?) , যারা সন্তানের সঠিক বিকাশের জন্যে প্রাক-ডিজিটাল বিপ্লব পরিবেশ তৈরি করতে পারেননি।

আবেশ মারা গেছে কারন তার বান্ধবীদের সাথে 'খোলামেলা' মেলামেশা ছিলো, তাদের সাথে রাতে অন্তর্জালে চ্যাট করতো, আড্ডা মারতো, সামাজিক নজরদারির অভাবের কারনে তাকে এই কর্মকান্ডের থেকে বিরত রাখা যায়েনি। দু মিনিট নীরবতা বাংলার নাগরিক সমাজের জন্যে, যারা নারী-পুরুষের খোলামেলা মেলামেশায় কোনরকম বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি, যারা বাংলার পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে, উত্তর ভারতের মতন খাপের কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। দু মিনিট নীরবতা সেই সমস্ত আধুনিকতার পাঠ পড়া নাগরিকদের জন্যে যারা এই ক্ষেত্রে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছে - পাড়ার রাস্তা দিয়ে হাতে হাত ধরে যখন স্কুল ইউনিফর্ম পড়া ছেলে আর মেয়েটা হেঁটে গেছে, তখন সমাজের যে মাথারা সেই নিয়ে প্রতিবাদ করেছে, তাদের খেঁকুড়ে বুড়ো এবং কালচার কাকু -কাকিমা বলে সন্মোধন করেছে।

আবেশ মারা গেছে কারন তার জগতে ঠাকুমার ঝুলি ছিলো না, ছিলো কানে হেডফোন আর হাতে টাকা। দু মিনিট নীরবতা সেই সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক এবং তাদের সন্তানদের জন্যে যারা মনে করেছে যে সাহিত্যগুনহীন ঠাকুমার ঝুলি না পড়লেও বড় হয়ে ওঠা যায়, যারা বাছবিচার না করে নিজেদের পছন্দমতন গানবাজনা শুনতে অভ্যস্ত।

একটি বিষয় এখনও ঐক্যমত পাওয়া যায়েনি - পাড়ার সাম্যবাদী কাকু বলছেন যে আবেশ মারা গেছে কারন সমাজ এখন ভোগবাদ আর পণ্যায়নে আক্রান্ত, আর টিভিতে সনাতনী দাদু বলছেন যে আবেশ মারা গেছে কারন আমরা পরিচ্ছন সনাতনী ভারতীয় সংস্কৃতি ভুলে পাশ্চাত্যের চাকচিক্যে মেতে উঠেছি। দুজনেই অবশ্য জানিয়েছেন যে সময়ের চাকা কে ৩০ বছর পেছনে ঘোরালেই সেই আদর্শ সমাজব্যাবস্থায় পৌছানো যাবে।

আগামী দিনে আমরা আরও বেশি করে সমাজসংস্কারমূলক ভাবনাচিন্তা আশা করছি বাংলার নাগরিকদের পক্ষ থেকে। সত্য এবং পূন্যের সন্ধানে আমাদের যাত্রা চলবে। সামাজিক আন্দোলনের এই সন্ধিক্ষনের চরম মূহুর্তের  মাঝেই কিছু খুচরো মাতাল এবং পাগল যদিও বেসুরো গাইছে। ব্যাটারা বলছে চা শ্রমিকদের মৃত্যুর কারন খুজবে না? চাষী কেন আত্মহত্যা করছে তার কারন খুজবে না? আম চুরির অপরাধে গ্রামের ওই কিশোরটিকে পিটিয়ে মেরে ফেললো কেন তার কারন খুজবে না? হাজার হাজার বছর ধরে আমরা একে অপরকে হত্যা করছি, ধর্ষন করছি, ১ মাসের শিশুকে রেহাই দিচ্ছি না, আস্ত জনজাতি কে হাপিস করে দিচ্ছি, তার কারন খুজবে না? আরেকজন বলছে হিটলার সিগারেট, মদ, মাংস কিছু না খেয়েই ৬০ লাখ ইহুদিকে সাফা করে দিলো, মোদী তো ছোটবেলা থেকে শাখায় আদর্শ ভারতীয় সংস্কৃতি শিখে বড় হয়েছে, না খায় মদ, না করে নেশা, না করে পার্টি, না দেয় বান্ধবীদের সাথে আড্ডা, হেডফোন লাগিয়ে রক, হিপ-হপ এসব তো নৈব নৈব চ, তার তত্ত্বাবধানে শিশুর গলায় পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হলো, ব্যাপারটা কিরকম গোলমেলে ঠেকছে না?

কিন্তু এসব প্রলাপে আমরা কান দিচ্ছি না। আবেশ মারা গেছে, আপাতত এই ওয়াটারশেড ইভেন্ট কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে চলেছে বাঙ্গালীর দ্বিতীয় নবজাগরন।
এই ঐতিহাসিক স্রোতের বিপক্ষে যারা চলবার চেষ্টা করবে, তারা উড়ে যাবে।

ফরোওয়ার্ড মার্চ!

বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০১৬

কাশ্মীর ~ অনিমেষ বৈদ্য

কাশ্মীর নিয়ে কথা বললেই অবধারিত ভাবে যেটা আসবে তা হলো কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কথা। নিজের জন্মভূমি থেকে উৎখাত হওয়ার যন্ত্রণা অপরিসীম। তা অস্বীকার করার কোনও প্রশ্নই নেই। আগে একাধিক বার সেই যন্ত্রণাকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করেছি শব্দে। কিন্তু যেটা অবাক লাগে তা হলো কাশ্মীর ইস্যু এলেই শুধুমাত্র কাশ্মীরি পণ্ডিতের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিদিন এতো এতো ইভেন্টের রিকোয়েস্ট আসে কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা ইভেন্টের রিকোয়েস্টও পেলাম না যেখানে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের এই উৎখাত হওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কেউ এসে বলেছে তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা। এমন ইভেন্ট হলে আমন্ত্রণ পেতে ইচ্ছুক। আন্তরিক ভাবেই শুনতে যাবো। কিন্তু কাশ্মীরে মানুষ মরলেই শুধু কাশ্মীরি পণ্ডিতদের রেফারেন্স টানা দেখতে দেখতে ক্লান্ত। ওই সিপিএম মেরেছে তাই তৃণমূলের মারকে ন্যায্যতা দেওয়া টাইপ।

কাশ্মীরের মৃত্যু নিয়ে কথা বললেই জঙ্গি সমর্থক। এবং যারা বলছে তাদের অনেকের আবার বিজেপির উপরে অগাধ আস্থা। আবার বিজেপির সঙ্গে সেখানে জোট পিডিপি-র, যারা আফজাল গুরুকে শহীদ মানে। কিন্তু এই জঙ্গি-বিরোধীদের কাছে আবার আফজাল গুরু জঙ্গি। সত্যি! সব হিসেব গুলিয়ে যায়। ঘেঁটে যাই। অবশ্য ঘেঁটে থাকা লোক আবার নতুন করে কী ঘেঁটে যাবে!!!

সরকারি ভাবেই ২০০৯ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত কাশ্মীরে হিংসার বলি হয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার মানুষ (৭ হাজার সেনা সহ)। নিখোঁজ ৩ হাজার চারশো লোক। নাহ! আমার বলা কথা নয়। সরকারি হিসেব। এই নিখোঁজ, মৃত প্রতিটি কাশ্মীরিই জঙ্গি!! এদের মধ্যে একজনও নেই যে শুধু তার স্বাধীনতার দাবি জানাতেই মিছিলে গিয়ে খুন হয়েছে!!

বিধবা শব্দটির মানে কী তা জানি আমরা সবাই। তাদের দুঃখ, দুর্দশা নিয়ে হাজার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু 'আধা বিধবা' শব্দটি শুনেছেন কি? নাহ! আমিও শুনিনি কিংবা জানতাম না আগে। জেনেছিলাম হায়দার সিনেমাটা দেখেই। কাশ্মীরে পুলিশ-সেনা যে সব বিবাহিত পুরুষদের তুলে নিয়ে যায় তাদের স্ত্রীরা 'আধা বিধবা'। কারণ তারা অনেকেই জানতে পারেন না যে তাদের স্বামী আদৌ বেঁচে আছে কি না।

বাসে ভাড়া দেওয়ার পরেও কন্ডাক্টর টিকিট দেখতে চাইলে আমাদের সে কি তুমুল বিরক্তি। কিন্তু কাশ্মীরে প্রতি মুহূর্তে আপনাকে আপনার পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। না দেখালে কি পরিণাম হবে তা অনুমান করা যায়। একজন লোক তার বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু ভিতরে ঢুকছেন না। একজন যেই হুকুমের সুরে পরিচয়পত্র দেখতে চাইলেন ওমনি তিনি 'স্বাভাবিক' হলেন এবং তারপর বাড়ির গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। নাহ! আমার কথা নয়। হায়দার সিনেমাটা দেখলেই দেখতে পাবেন। মনে রাখবেন সে সিনেমা ভারত সরকারের অনুমতিপ্রাপ্ত।

জঙ্গিদের সমর্থন করতে হবে না। কিন্তু এই ঘটনাগুলো নিয়েও ভাবা যাবে না তাই বলে!!! এই মানুষদের কথা তুললেও শুনতে হবে ভারত-বিরোধী, জঙ্গি সমর্থক!! আমি নিজে কাশ্মীরি হলে আজাদি চাইতাম কি চাইতাম না জানি না, কিন্তু এই অন্তহীন মৃত্যু মিছিল নিয়ে এই দূরে বসেও একটুও ভাবিত হবো না!!! যদি দেশের কথাও ভাবি তাহলেও তো কাশ্মীরিরা এই মুহূর্ত পর্যন্ত ভারতীয়ই বটে। একজন ভারতীয় হয়ে অন্য ভারতবাসীর মৃত্যু মিছিল নিয়ে চিন্তিত হবে না আমাদের ভারতীয় আবেগ!!! তাই নিয়ে কথা বললেও শুনতে হবে জঙ্গিবাদের সমর্থক!!!

এর থেকে সোজাসুজি বলুন। কাশ্মীরি মাত্রই জঙ্গি, এতোদিনের প্রতিটি মৃত্যুই জঙ্গির মৃত্যু, আর সেই মৃত্যুতে আপনার এক বিন্দুও দুঃখ নেই, সেই মানুযদের নিয়ে আপনার মানবিকতা এক বিন্দুও বরাদ্দ নেই, তারা প্রত্যেকে খুন হওয়ার যোগ্য, এবং আপনি এদের খুন দেখতে চান। এতে অন্তত আপনার বিরোধিতা করলেও আপনার সততার প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে।

মঙ্গলবার, ১২ জুলাই, ২০১৬

আকালের সন্ধানে ~ সুশোভন পাত্র

হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ গুলোর ম্যাসেজ ডিলিট করতে করতে সেদিন হঠাৎ করেই একটা ম্যাসেজে চোখ আটকে গেল। অবশ্য বলা ভালো, ভাগ্যিস আটকে গেল! মহারাষ্ট্রের এক ভদ্রলোক, এই ৪৮ডিগ্রিতে, আহমেদনগর থেকে নানদেদ ট্রেন যাত্রার অভিজ্ঞতা লিখেছেন।
বাইরের তীব্র দাবদাহ আর জানলার শুষ্ক, গরম বাতাসের জন্যই সেদিন বোধহয় ৯ ঘণ্টার ট্রেন জার্নিতে স্লিপারটা বেশ ফাঁকাই ছিল । যত্নের অভাবে কম্পার্টমেন্টের একমাত্র মোবাইল চার্জিং পয়েন্টটা খারাপ। আর চাহিদার অভাবে ট্রেনের একমাত্র প্যান্ট্রি কার'টাও বন্ধ। তাই তৃষ্ণা মেটাতে সম্বল হাফ বোতলের গরম জলের কয়েকটা ফোঁটা। আর সময় কাটাতে ভরসা ব্যাগে গোঁজা মারাঠি একটা খবরের কাগজ। দুদিকের জানলায় দিগন্ত বিস্তৃত শুকিয়ে কাঠ বিঘা বিঘা ক্ষেতের সাথে বেশ সামঞ্জস্য রেখেছে সংবাদ শিরোনামটা। "দেশের প্রতি ১০টা আত্মহত্যার ৭ জনই কৃষক"। গত পাঁচ বছরে ভয়ঙ্কর খরা কবলিত এই মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়া আর বিদর্ভের কৃষকদের দুর্দশার কথা ভাবতে ভাবতেই ট্রেনটা ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। জানলার বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল একদল বৃদ্ধ-মহিলা-শিশু হাতে বালতি আর বোতল নিয়ে ট্রেনের দিকে ছুটে আসছে। ট্রেনে উঠেই ঐ দলের মহিলার প্রায় নি:সঙ্কোচেই ট্রেনের কম্পার্টমেন্টের টয়লেটে গিয়ে ট্যাপ খুলে বালতিতে জল ধরতে লাগলো। অন্যদিকে শিশুরা হামাগুড়ি দিয়ে সিটের নিচে আর বয়স্করা উঁকি মেরে আপার বার্থে যাত্রীদের উচ্ছিষ্ট জলের বোতলে অবশিষ্ট এক-দু ফোঁটা জলের খোঁজ শুরু করলো। সবকিছুই চোখের সামনে এত তাড়াতাড়ি আর নিখুঁত ভাবে ঘটছিল যেন সবকিছুই 'ভেরি ওয়েল প্ল্যান্ড'। এক বৃদ্ধের কোলে বাচ্চা একটা মেয়ে। এক সহযাত্রী মেয়েটির হাতে তাঁর জলের বোতলের অবশিষ্ট টুকু তুলে দিতেই, বৃদ্ধ করজোড়ে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানালেন। জলের বোতল পেয়ে যখন বাচ্চা মেয়েটার মুখে একগাল হাসির সোনা ঝরছে ঠিক তখনই সম্বিত ফিরল আহাম্মক রেল পুলিশটার বাঁশিতে। লোকগুলো সবাই ভয়ে হুটোপুটি করে ট্রেন থেকে ঝাঁপ মারল ঠিকই, কিন্তু নিপুণ কৌশলে, ভরা জলের একফোঁটাও কিন্তু মাটিতে পড়ল না। টি.টি.ই এসে রেল পুলিশটাকে ক্ষান্ত করে বললেন, "এটাই এখন ওদের ডেলি রুটিন। গ্রামের পুরুষরা আগের স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে ওঠে। সময়, সুযোগ বুঝে চেন টেনে গাড়ি থামায়। ট্রেন থামলে এঁরা ট্রেনে উঠে এইভাবেই 'জল চুরি' করে। আর সেই জলেই কোনক্রমে আরও একদিন খরার সাথে লড়াই করে মরতে মরতে বেঁচে থাকে।"
পূর্ব মহারাষ্ট্রের লাতুর জেলায় প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি লিটার জল লাগে। কিন্তু জলের একমাত্র উৎস মানজার ড্যাম গত তিনমাস ধরে জলশূন্য। বিভিন্ন গাঁয়ের জমিদার আর সুদখোর মহাজনরা নিজেদের প্রয়োজনীয় জলটুকু বাঁচিয়ে কুয়ো গুলো চড়া দামে ভাড়া দিচ্ছেন প্রাইভেট কোম্পানিকে। নতুন লোগোর ঝাঁ চকচকে মোড়কে ১০০০ লিটার সেই জল বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকার বিনিময়ে। আসলে কারও সর্বনাশ হলে পরেই তো কারও পৌষ মাস হবে। তাই না? আর সুইজারল্যান্ডের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি নেসলে'র সিইও পিটার বার্বেক শুধু মুখেই বলেছিলেন "জল মানুষের মৌলিক অধিকার নয়। তাই জলের বেসরকারিকরণ হওয়া উচিত।" আমাদের লাতুর কিন্তু করে দেখাচ্ছে। সত্যি তো,  "मेरा देश बदल रहा है…आगे बढ़ रहा है"   
অবশ্য সবাই যদি বিদর্ভের দলিত শ্রমিক বাপুরাও তাজনের হতেন তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই যেতো। 'উচ্চবর্ণ'র দুয়ারে জল আনতে গিয়ে, অপমানিত, লাঞ্ছিত স্ত্রী'র চোখের জল মুছতে টানা ৪০ দিন, ৬ ঘণ্টার অক্লান্ত পরিশ্রমে তাজনে আস্ত একটা কুয়ো কেটেই তাঁর প্রেম প্রতিজ্ঞার তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। দলিত ঘরের সব  বৌ'দেরও 'স্বামী ভাগ্য'ও আবার তাজনের মত নয়। আর তাই থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন জানিয়েছে মহারাষ্ট্রের অনেক দলিত ঘরের বৌ'রা নাকি পানীয় জল জোগাড় করতে আজকাল বেশ্যা বৃত্তি'ও করছেন। 

এই মুহূর্তে খরা কবলিত দেশের ৩৩ কোটি মানুষ। অবশ্য এটা সেই সরকারী হিসেব যেটা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বীরেন্দ্র চৌধুরী সংসদে পেশ করার সময় লোকসভা কক্ষে উপস্থিত ছিলেন ১০০'রও কম 'মাননীয়' সাংসদ। বেসরকারি হিসেব বলছে দেশে খরা কবলিত মানুষের সংখ্যা অন্তত ৫৪ কোটি। অর্থাৎ প্রতি ৫ জনে ২ জন। দেশের ৯১টি জলাধারের সঞ্চয় আজ এই দশকের সর্বনিম্ন, মাত্র ২৯%।  সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার কে জানিয়েছে "২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে খরা কবলিত এলাকা সহ ১০০ দিনের কাজে বকেয়া মজুরি মোট ১২,০০০ কোটি টাকা। এটা কোন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নমুনা হতে পারে না।" সত্যি? পারে না? তবে যে শুনলাম শেষ ফিসক্যাল ইয়ারে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার নাকি 'দুনিয়া কাঁপানো' ৭.৯%? তাহলে কি দেশের এই শ্রী-বৃদ্ধি তে বকেয়া মজুরির হিসেব হয় না? টয়লেটের জলে রান্না-বান্নার 'পুষ্টি গুনের' হিসেব হয় না? লাতুরের গ্রামের মহাজন'দের জল ব্যবসার চড়া সুদের হিসেব হয় না? বাপুরাও তাজনের 'কান্না ঘাম রক্তের' হিসেব হয় না? দলিত বৌ'দের শরীরের দামের হিসেব হয় না? শুধু কি তাহলে সরকারের ২ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে 'পানাম স্ক্যাম' খ্যাত বিগ বি'র ভাড়া, ১০০০ কোটির কসমেটিক বিজ্ঞাপন আর প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ ভ্রমণেই দেশের জিডিপি'র পার ক্যাপিটা' তরতরিয়ে চড়কে চাপে?
বুন্দেলখন্ডের খরা কবলিত একটি প্রত্যন্ত গ্রামের গ্রামসভাতে, তৃষ্ণার্ত একটি গরুর মৃত্যু কাহিনীর বর্ণনা শেষে, ক্লাস ফোরের মেয়েটা চোস্ত হিন্দিতে বলল "और उसके बात बो तड़प, तड़प के मोर गई..." খোঁজখবর  নিয়ে দেখা গেল, সত্যিই,  বুন্দেলখন্ডের ১৩টি জেলার প্রায় ১১,০৬৫ গ্রামে, শুধু গত মে মাসেই, জলের অভাবে মৃত্যু হয়েছে যে ৩ লক্ষ গবাদি পশুর তার বেশির ভাগটাই গরু। কিন্তু দেখুন এই 'গো-হত্যা' নিয়ে সঙ্গীত সোম'দের কোন মাথা ব্যথা নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর গলায় 'পিঙ্ক রিভলিউশেনের' হম্বিতম্বি নেই। এই গরুরা বোধহয় 'গোমাতা' নয়। এই গরুর মাংস খেতে বোধহয় কোন আপত্তি থাকবে না। এই 'গোমাতা' আখলাখ'দের ফ্রিজে থাকলেও তাঁদের বোধহয় মরতে হবে না। কারণ সব গোমাতা তো আর রাজনৈতিক পশু হয় না। সব 'গোমাতা' তো আর বিধানসভায় ভোট দেয় না...

বুধবার, ৬ জুলাই, ২০১৬

দেশ ও শিক্ষা ~ সুশোভন পাত্র

আপনি আমিষাশী? মাছ-মাংস-ডিম খান? তাহলে প্রোটিনের জরুরী খাদ্যগুণে শরীর পুষ্ট হওয়া তো দূর, আপনার মিথ্যে বলার, লোক ঠকানোর, যৌন সুড়সুড়ি দেবার এমনকি মানুষ খুন করার প্রবণতাও বেশী -বলছে ক্লাস সিক্সের সি.বি.এস.সি'র টেক্সট বুক। মহারাষ্ট্রের বছর ১৪'র ছেলেমেয়েরা পড়ছে, 'হাউসওয়াইফ'রা গাধার মত। সারাদিন শুধু খেটে মরে। তবে একটু হলেও ভালো। অভাব অভিযোগ করে না, রাগ করে বাপের বাড়িও যায় না। ছত্তিসগড়ের 'সোশ্যাল সায়েন্স'র ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা শিখছে, দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কারণ মেয়েদের চাকরি করা। দিননাথ বাত্রার বইয়ে গুজরাটের স্কুল পড়ুয়ারা শুনছে, ড: রাধাকৃষ্ণন বলেছিলেন, ভগবান অজ্ঞনতা বশত প্রথমে যে কাঁচা রুটিটা উনুন থেকে বের করেছিলেন, সেটা থেকে জন্ম হয়েছিলো ব্রিটিশ'দের। অতি সাবধানতায় পরের পুড়িয়ে ফেলাটা থেকে জন্ম নিগ্রোদের, আর সবশেষে যেটা ঠিক সময়ে উনুন থেকে বেরিয়ে স্বাদে-গন্ধে-বর্ণে হল অতুলনীয়, সেটা আমরা, মানে 'ইন্ডিয়ান'রা। রাজস্থানের স্কুলে 'মহান সাধু-ঋষির' তালিকায় স্বামী বিবেকানন্দ, মাদার টেরেসা, গৌতম বুদ্ধ, গুরু নানকের পাশে সচিত্র সুশোভিত হচ্ছেন নাবালিকা ধর্ষণে অভিযুক্ত আশারাম বাপু।  
তবে এসবই কেতাদুরস্ত ইংলিশ মিডিয়ামের, ঝাঁ-চকচকে স্কুল বিল্ডিং'র চার দেওয়ালের রঙিন গল্প। দেশের সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থার হাঁড়ির হালটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট'ই। সর্বশেষ ASER'র রিপোর্টে দেশের ২১.৬% ক্লাস এইটের ছাত্রছাত্রী, ক্লাস টু'র টেক্সট বই'ই পড়তে পারে না। ১৫ বছরের ২৪.৫% স্কুলপড়ুয়ারা ১-১০ সংখ্যা চিনতে পারে না। ৫২.৫% ফাইভের ছাত্র সহজ ভাগের অঙ্ক কষতে পারে না। আর ৭৫.৫%, সামান্য বিয়োগ করতে পারে না।
ভারতবর্ষের প্রতিটি 'দায়িত্বশীল' সরকারই এই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি বদলাতে দেশবাসী কে রঙিন স্বপ্ন দেখিয়েছে। কমিশন বসেছে। মিটিং হয়েছে। সার্ভে করেছে। ভাষণে লাল কেল্লার রঙ্গমঞ্চ উপচে পড়েছে। কোঠারি কমিশনের রিপোর্টের কাঠখড় পুড়িয়ে, স্বাধীন ভারতের পার্লামেন্টে, ১৯৬৮'তে প্রথম ন্যাশনাল ইডুকেশন পলিসি পাশ করিয়ে, ইন্দিরা গান্ধী যেবার ১৪ বছর পর্যন্ত সকলের প্রাথমিক শিক্ষা সুনিশ্চিত করার গুরুদায়িত্বটা রাষ্ট্রের কাঁধে তুলে নিলেন, সেবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলো পাটলিপুত্র থেকে লোনাভেলা, মগধ থেকে ক্যাওড়াতলা। লোক মুখে প্রচার হল, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে "শিক্ষা হবে সার্বজনীন"। তারপর গঙ্গা দিয়ে বহু জল বয়ে গিয়ে, সোভিয়েতের পতন আর লগ্নী পুঁজির দাম্পত্যর মধুচন্দ্রিমার গর্ভজাত মুক্তবাজার অর্থনীতির ইনফ্যাচুয়েশেনের লুস-মোশেনে যখন ভেসে যাচ্ছে তাবড় সংবাদ মাধ্যমের দিস্তা-দিস্তা নিউজ প্রিন্ট, ঠিক তখন, ১৯৮৬-৯২'এ আমদানি হল দ্বিতীয় ন্যাশনাল ইডুকেশন পলিসি। প্রান্তিক মানুষের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার প্রকারান্তরে, বেসরকারি স্কুলে 'আর্থিক ভাবে দুর্বল' অংশের ২৫% সংরক্ষণের মাধ্যমে, শিক্ষা ক্ষেত্রে অভিষেক হল পি.পি.পি মডেলের। পরবর্তী সময় ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের চাপে আর 'লো-কস্ট পরিকাঠামো ও পরিষেবা' প্রদানের উদ্দেশ্যে 'প্যারা টিচারের' আমদানি এবং জনগণনা থেকে পোলিও, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ -দেশোদ্ধারের সমস্ত গুরু দায়িত্ব মাথায় চাপিয়ে দেওয়া স্থায়ী শিক্ষকদের নিয়োগের ব্যাপক ঘাটতিতে, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান যতই পড়েছে ছাত্রছাত্রী'দের মধ্যে ততই বেড়েছে স্কুল ছুটের আর বেসরকারি স্কুলে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রবণতা। শিক্ষা ক্ষেত্রেও লাক্ষণিক ভাবে প্রকট হয়েছে ধনী-গরিবের বৈষম্য। NSSO'র ৭১তম সার্ভের তথ্যানুসারে উচ্চশিক্ষায় ভারতবর্ষের ধনীতম ৫%'র ন্যাশনাল এটেন্ডেন্স রেশিও যেখানে ৫৯.৫% , দরিদ্রতম ৫% 'র সেখানে মাত্র ২০.৫% । আর তার মাত্র ৬%, আদিবাসী, দলিত, সংখ্যালঘু, কিম্বা মহিলা। যেখানে ইউনেস্কো রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের বৃহত্তম নিরক্ষরের বাস ভারতবর্ষে, সেখানে ২০২০'র মধ্যে ভারতবর্ষের ৫০% ছাত্রছাত্রী কে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের জন্যও নিজের ট্যাঁকের পয়সা খরচ করতে হবে বলে আশঙ্কা। শিক্ষা ব্যবস্থার উপর "কল্যাণকামী" রাষ্ট্রের 'সিস্টেমেটিক' বিমাতৃসুলভতার জন্যই স্বাধীনতার ৬৩ বছর পরও প্রয়োজন হয় RTE'র মত বজ্র আঁটুনির ফোস্কা গেরোর।
সদ্য অপসারিত সংসদীয় রাজনীতির শ্রেষ্ঠ 'মেলোড্রামাটিক' কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ৩০বছর পর আবার নতুন 'ন্যাশনাল ইডুকেশন পলিসি'র রণডঙ্কা বাজিয়েছেন। অবশ্য উনি তো সেই বিজেপি সরকারের প্রতিনিধি যারা প্রাথমিক শিক্ষাখাতে ১৩,৬৯৭ কোটি এবং উচ্চশিক্ষা খাতে ৩,৯০০ কোটি সরকারী বরাদ্দ হ্রাস করেছে। সেই 'আচ্ছে দিনের' সরকারে মন্ত্রী যারা ১৫%'র ছাড়া বাকিদের জন্য  ফেলোশিপ 'ডিসকন্টিনিউ' করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উনি সেই মুরলী মনোহর যোশীর যোগ্য উত্তরসূরি যিনি প্যারিসে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন "উচ্চশিক্ষা সমাজের কোন কাজেই লাগে না। তাই যার পয়সার জোর আছে সে পারলে পড়ুক।" উনি সেই ভারত সরকারে নিরবচ্ছিন্নতা যারা ২০০৫ 'ট্রেডেবেল কোমডিটি' হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থার অবারিত দ্বার WTO-GATS'র হাত ধরে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন বেসরকারিকরণের জন্য।বাজারে আজ 'শিক্ষা' বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। উচ্চশিক্ষার ৬৫%'ই আজ বেসরকারি। প্রাথমিক শিক্ষায় বিশ্বের গড় বেসরকারিকরণ যেখানে ১৪%, ভারতে সেখানে ২৫%। অ্যাসোচেমের তথ্যানুসারে, ভারতবর্ষের প্রতি বাবা-মা সঞ্চয়ের ৬৫% ব্যয় করতে বাধ্য হন সন্তানের শিক্ষা বা কেরিয়ারের পিছনে।
যে দেশে শিক্ষা এতো মহার্ঘ্য, যে দেশ জাতীয় আয়ের ৬% শিক্ষাখাতে খরচা করার ৫৮ বছরের পুরনো শর্ত এখনও পূরণে ব্যর্থ, যে দেশের হাইকোর্ট স্বাধীনতার প্রায় ৭০ বছর পর রায়দান করে বলে "সরকারও প্রশাসনের দুর্বলতা এবং ইন্ধনেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেড়েছে ধনী গরীবের বৈষম্য", যে দেশে মন্দির-মসজিদ-গির্জার মোট সংখ্যা স্কুল কলেজের থেকে ৯ লক্ষ বেশী, সে দেশের অঙ্গরাজ্যের টপারদের ত্রিভুজের চারটি বাহুর উপপাদ্য আবিস্কারই স্বাভাবিক, রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সাথে রান্নার হেঁশেলের যোগসূত্র খোঁজাই ভবিতব্য, সে দেশের কপালে ইয়ালে ইউনিভার্সিটির ফেক ডিগ্রির কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী'ই নসীব, মুসলিম মৌলবি'দের সানিয়া মির্জার পোশাকের ফতোয়াই শিরোধার্য, সমাজবাদী পার্টির মন্ত্রীর শিশু ধর্ষণের জন্য মোবাইল কে দায়ী করাই কাম্য, সে দেশের তো রামদেবই ভগবান, জাকির নায়েকই মসীহা, সে দেশের গো-মূত্রই পানীয়, সে দেশের গোবরে সোনা খোঁজাই বিজ্ঞান...

শুক্রবার, ১ জুলাই, ২০১৬

দ্য আদার... ‪#‎ইনবক্স‬ ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

ফেসবুকের "আদার" ইনবক্স একটি স্বর্ণ খনি বিশেষ। নারী মাত্রেই জানেন এর তাৎপর্য‍্য। কত কিসিমের যে লোক হয় এই নেট দুনিয়ায়, তা বোঝার এবং জানার সহজতম উপায় এই "আদার"। আপনি আদার ব্যাপারি হন বা জাহাজের কারবারী, আউট অভ দ্য বক্স ভাবনাচিন্তা কাকে বলে এই ইনবক্স তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।

এমনিতে সবাই জানে যে মেয়ে হওয়া এদেশে মোটামুটি একটা অপরাধের সামিল; এই মেয়েদের জন্যেই ধর্ষণের মতন একটা জঘন্য অপরাধ ঘটছে প্রতিনিয়ত; এই অসভ্য, হায়াহীন প্রজাতি কম কম জামাকাপড় পরে, সেজেগুজে দিনের বেলা তো বটেই এমনকি রাত্তিরবেলাতেও রাস্তায় ঘোরাফেরা করে পুরুষ কে প্রলুব্ধ করতে! কী সাংঘাতিক! শাড়ি-সালোয়ার প্রভৃতি সো-কল্ড ভদ্র পোষাকের বাবা-মেসো করে এরা জিন্‌স, হাপু, এমনকি গরম প্যান্ট পর্যন্ত অনায়াসে পরে ঘুরে বেড়ায়। এসব দেখে যদি পাঁচটা ছেলে একটু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে তাদের দোষ কোথায়? আর একথা ব্যাদে আছে যে ছেলেদের মন মেয়েদের মতন প্যাঁচালো নয়, হুঁ হুঁ বাওয়া, ওদের মনে যা, মুখেও তাই। তাই রাস্তায় এর'ম মেয়ে দেখে যদি মধ্যমা অটোমেটিক্যালি উঠে যায় বা চাট্টি রসের কথা মুখ থেকে বেরোয়- তাহলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়, বুঝিনা।

এত্তসব ট্র্যাফিক আইন হয়েছে, লাইট রে, পুলিশের প্যাট্রোল ভ্যান রে, ক্যমেরা রে, দাদুগীতি রে- আরে বস্‌, কয়েকটা ঝক্কাস দেখতে মেয়ে-পুলিশকে (ইয়েস, আগে মেয়ে, পরে পুলিশ, স্বাভাবিক নিয়মেই) ঝিঙ্কু ড্রেস পরিয়ে মোড়ে মোড়ে দাঁড় করিয়ে দাও, মার্সিডিজ টু রিক্সা , স-ও-ব দেখবে ঠিক জায়গামতন থামছে, চাখছে, যাচ্ছে। Total egalitarian concept- সব্বাই এক, আমরা সবাই রাজা… ইত্যাদি প্রভৃতি।

আচ্ছা, আচ্ছা, যা বলছিলাম… আসলে এই টপিক নিয়ে লিখতে বসলেই আমি একটু, ইয়ে মানে, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি আর কী। ক্ষমাঘেন্না করে দেবেন নিজগুণে…
যাইহোক, হচ্ছিল "আদার" ইনবক্স এর কথা। আমি একদিন এক সুন্দর, সুবাসিত সকালে একটি মেসেজ পেলাম, একজন ভীষণ উদ্গ্রীব হয়ে জানতে চেয়েছেন, আমি শুতে কত নিয়ে থাকি। এতে আমি যারপরনাই অবাক হয়ে রিপ্লাই দিয়েছিলাম যে আমি এমনিতেই ঘুমাতে ভালবাসি, তার জন্য কেউ কখনও টাকাপয়সা দেয়নি আমাকে। ওনার বাড়ির মহিলারা শোয়া বা ঘুমানোর জন্য চার্জ করেন বলে সবাইকে অমন ভাবা ঠিক না। এতে করে কেন জানিনা উনি ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে গেছিলেন। আরো দু-চারটে কথার পর আমাকে ব্লক করে দিলেন অথচ আমি বুঝতেই পারলাম না যে আমার দোষটা কোথায়!

তাছাড়া, প্রত্যেক মেয়েই কোন না কোন সময় মেসেজ পেয়ে থাকে যে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কেউ তাকে মডেল বানাতে চায় বা ফোটোশুট, বা নিদেনপক্ষে, কোন বিশেষ পোজে তার ছবি দেখতে চায়। সুদূর মরক্কো থেকে শুরু করে নিকারাগুয়া, পারস্য এমনকি মঙ্গল্গ্রহ থেকেও এমত অনুরোধ এলে কোন মেয়েই অবাক হয়না। হওয়ার কথাও নয়, আমরা তো জানি, "আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী" … কিন্তু ভুসুকু এও বলেছেন যে, "মূঢ়া হিঅহি ণ পইসঈ" অর্থাৎ গাড়লের মগজে এতসব ঢোকেনা, তাই অবাক হওয়া বাদ দিলেও মাঝে মাঝেই মেয়েরা এইসব নিয়ে চিল্লামিল্লি করে, মানে মেয়েদের তো বুদ্ধিশুদ্ধি টেন্ডস টু জিরো …তাই আর কী…। এসব ছাড়াও, আমি_শুধু_চেয়েছি_তোমায়, বল্গাহীন_ভালবাসা, বিছানায়_বক, Sexy_Stud, Eternal_erection, DiscoDick- এরা সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে খোঁজখবর নিয়ে থাকে, বিচিত্র বানানে "ভালবাষা" জানায়। Lyf roxxx!

তবু, এতকিছুর মধ্যেও ভরসার কথা এই যে, ইহজীবনে যত এরকম "হাম তো (মহা) পুরুষ হ্যায়, হাম ক্যা নেহি কর স্যকতা, সবকুছ জায়েজ হ্যায়" টাইপ ছেলে দেখেছি, তার দ্বিগুণ দেখেছি ঠিক মানুষের মতন পুরুষ। নিজের বাবা, দাদা,কাকা, স্বামী বা ছেলের কথা বাদ দিলেও বন্ধুস্থানীয় তাদের সংখ্যাটাও বড় কম নয়। এইসব নিয়েই তো জীবন, আমাদের জীবন; সবাই "ওম্মা, দ্যাখ কী ভাল, তকাই আমার" হবে, আয় তবে সহচরী গাইবে নেচে নেচে, তাই হয় নাকি? না হওয়া উচিৎ ।

বেঁচে থাক আমার নারীত্ব, আমার মেয়েলী সারল্য, আমার অকারণ হাসি, (পড়ুন ন্যাকামো) আমার চকিত সতর্কতা, আমার সঙ্গীর পায়ে-পা মিলিয়ে এগিয়ে চলার আনন্দ। সে পিছিয়ে পড়লে দাঁড়াব তার জন্য, কারণ আমি জানি সেও ঠিক তাই-ই করবে। পুনর্জন্ম আছে নাকি? কেউ জানেন? থাকলে, অগলে জনম মে মোহে বিটিয়া হি কিজো।


বুধবার, ২২ জুন, ২০১৬

দেশটা কাদের? ~ সুশোভন পাত্র

কিছুদিন আগেও একটা জোকস বাজার গরম করত। এক ভদ্রলোক এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে বসে প্লেন গুলোর ওঠা নামা দেখতে দেখতে আমেজ করে সিগারেট টানছেন। সেইসময় একজন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উপদেশ দিতে শুরু করলেন। "আপনি দিনে কটা সিগারেট খান? কত দামি সিগারেট খান? কতদিন ধরে সিগারেট খাচ্ছেন ?" -এইসব। তারপর একটা হিসেব কষিয়ে তিনি ধূমপায়ী কে বুঝিয়ে বললেন "আপনি যদি সিগারেট না কিনে, পয়সা গুলো জমাতেন, তাহলে আজ সামনের ঐ প্লেনটা আপনার হতে পারতো।" প্রত্যুত্তরে ঐ ধূমপায়ী তাঁকে জিজ্ঞেস করেন তিনি আদেও সিগারেট খান কিনা। নঞর্থক উত্তর পেয়ে  পরের প্রশ্ন করেন যে "তাহলে ঐ প্লেনটা কি আপনার ?" উপদেষ্টা ব্যক্তি বেশ বিব্রত হয়ে বলেন "অবশ্যই না।" তখন ধূমপায়ী একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে কিলার পাঞ্চটা দেন- "মাই নেম ইস বিজয় মালিয়া। অ্যান্ড দ্যাট প্লেন ইস মাইন।" মানে,আপনি যদি বিজয়া মালিয়ার মত ধনী এয়ারলাইন ব্যবসায়ী হন তাহলে লাউঞ্জে বসে সিগারেট টানার 'আইন অমান্য' আপনি করতেই পারেন। পয়সা থাকলেই আপনার সাতখুন মাফ। 

'কিং অফ গুড টাইমস' বিজয় মালিয়ার ৬০'তম বার্থডে সেলিব্রেশনে গোয়ার বিলাসবহুল ক্যান্ডোলিম ও সিংকুয়েরিম প্রাইভেট বিচের রাতের আকাশ যখন উদ্ভাসিত আলোক সজ্জার আতিশয্যে, ২ ঘণ্টার লাইভ কনসার্টর পর সোনু নিগমকে যখন প্রতিস্থাপিত করছেন স্পেন থেকে উড়ে আসা এনরিক ইগলেসিয়াস, শ্যাম্পেনের মাদকতা আর 'ব্যালেন্ডানো'র সুরে যখন অতিথিরা সম্মোহিত, ঠিক তখনই দেশজুড়ে বকেয়া মজুরি আদায়ের জন্য অনশনে কিংফিশার এয়ারলাইন্সের ক্রিউ মেম্বাররা। ঠিক তখনই দেশের ১৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে কিংফিশার এয়ারলাইন্সের বকেয়া ঋণের অঙ্ক ৯,০০০ কোটি। রঘুরাম রাজন বলেছিলেন "সিস্টেমের কাছে যার এতো ধার বাকি, জন্মদিনের পার্টিতে তাঁর এতো অপব্যয়র বিলাসিতা মানায় না।" নর্থ ব্লকের অনুগত আমলারা অবশ্য রাজন কে আলতো করে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন "কারও 'পারসোনাল' ব্যাপারে নাক না গলানোই ভালো।" কিন্তু কোদাল কে কোদাল বলার বদভ্যাস থেকেই কড়া জবাব দিয়েছিলেন রাজন- "যদি কেউ নিজে অনাদায়ী ব্যাংক ঋণের 'পারসোনাল' গ্যারেন্টার হন এবং বিপুল পরিমাণ ধার বকেয়া রাখেন তাহলে তাঁর 'পারসোনাল' লাইফে নাক তো গলাতেই হবে।" 

ক্রেডিট সুইসের তথ্যানুসারে দেশের ১০টি 'বিগ বিজনেস হাউস'র অনাদায়ী ঋণের মোট পরিমাণ ৭.৫ লক্ষ কোটি টাকা। ক্রেডিট রেটিং সংস্থার হিসেবে যার ৫০%'ই 'ডিফল্ট' এবং প্রয়োজনে সরকারের তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেই এই বিপুল বকেয়া ঋণ আদায় করতে পারে। কিন্তু বিজনেস হাউস নাম যখন এসার, ভেদান্ত, জিন্দাল, আম্বানি, আদানি -তখন দেশের সরকারের ঘাড়ে কটা মাথা যে এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে? ার নিলে নির্বাচনী প্রচারে "অবকি বার/মোদী সরকারের" তুমুল প্রচারের বিপুল টাকা কে ঢালবে? হবুমন্ত্রী আর গবুরাজা কে উড়ে বেড়াতে প্রাইভেট চপারই বা কে দেবে?
কিন্তু সরকার ও বিগ বিজনেস হাউসের আন্ডার টেবিল সমঝোতার গলার কাঁটা হলেন রাজন। সমস্ত ব্যাংক কে তিনি নির্দেশ দিলেন "অন্যায় সুবিধা না দিয়ে এই বিগ বিজনেস হাউস গুলির অনাদায়ী ঋণ দ্রুত আদায় করতে হবে।" ফলত ১৯৯৯-২০০০'র 'এশিয়ান ফাইনান্সিয়াল ক্রাইসিসের' সময়েও যে এসার গ্ৰুপ প্রায় 'ঋণখেলাপি' হয়েও ব্যাঙ্ক'র দয়ায় আর নেতা-মন্ত্রী'দের আনুগত্যে পার পেয়ে যাচ্ছিলো তারাও এবার নিজেদের সম্পত্তির কিছু অংশ বিক্রি করে বকেয়া ঋণ আংশিক মেটাতে বাধ্য হয়েছিল। 

৩১শে মার্চ কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রকের অধীনস্থ, 'ডাইরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স', তাদের এক 'জেনারেল এলার্টে' প্রায় ৫০টি কয়লা আমদানিকারী সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা 'স্টিম' কয়লার দাম সংস্থাগুলি বে-আইনি ভাবে বাড়িয়ে রেখেছে। যেখানে ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা কেনা, মালবাহী জাহাজের খরচ ও কাস্টম ডিউটি সহ কয়লার আমদানিকৃত দাম হয় উচিত ৩৩৫০ টাকা/মেট্রিক টন সেখানে এই সংস্থাগুলি বিভিন্ন স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ড ও কর্পোরেশন কে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে ৫৪৯৪/মেট্রিক টন হিসেবে। ফলে আপনাকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ'র জন্য বেশি দিতে হচ্ছে প্রায় ১টাকা ৫০পয়সা। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রীর তথ্যানুসারে আমরা যেখানে প্রতিবছর বিদেশ থেকে মোট ১লক্ষ ৫হাজার কোটি টাকার কয়লা আমদানি করি সেখানে এই দুর্নীতির পুঞ্জীভূত মোট অঙ্ক প্রায় ৫০, ০০০ কোটি। মুম্বাইয়ের ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আইন মন্ত্রকের জমা দেওয়া রিমান্ডে এই দুর্নীতিতে নাম আছে রিলায়েন্স, আদানি, জিন্দাল, এসার মত রাজনের চক্ষুশূল বিগ বিজনেস হাউসগুলিরই। তাই রঘুরাম রাজন কে চলে যেতে বাধ্য করা নিতান্তই রুটিন ওয়ার্ক, কিম্বা অর্থমন্ত্রীর সাথে 'লো ইন্টারেস্ট রেট' আর মুদ্রাস্ফীতির তু তু ম্যা ম্যা নয় বরং 'রিস্কলেস ক্রনি ক্যাপিটালিজমের' পথের কাঁটা সরাতে আস্ত একটা 'মোডাস অপারেন্ডি'।  ঐ যে বলে না, দেয়ার ইস অলওয়েজ অ্যা 'মেথড ইন ম্যাডনেস'। 

যে দেশে ঋণখেলাপি ললিত মোদিরা পায়ের উপর পা তুলে নিশ্চিন্তে লন্ডনে বসে থাকেন, যে দেশে বিজয় মালিয়ারা রাজ্যসভার সাংসদের পদ অলঙ্কৃত করেন, যে দেশে ওত্তাভিও কাত্রোচ্চিরা বোফোর্সের পরও কলার তুলে ঘুরে বেড়ান, যে দেশে ওয়ারেন অ্যাণ্ডারসেনরা ভোপালে নির্বিচারে মানুষ মেরে মন্ত্রীদের প্লেনে চেপে পালিয়ে গিয়ে আমেরিকায় নিশ্চিন্তে মরেন, সে দেশে রঘুরাম রাজনরা থাকতে পারেন না। সে দেশে সতেন্দ্র দুবেরা বাঁচতে পারে না। সে দেশে মুদ্রাস্ফীতি কমতে পারে না। সে দেশ ক্রনি ক্যাপিটালিজমের। সে দেশ সুব্রহ্মণ্যম স্বামীদের। সে দেশ হাম্বার। সে দেশের গোবরই ভিত্তি। সে দেশের ঘুঁটেই ভবিষ্যৎ...

শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০১৬

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ~ নগর যাযাবর



এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আলোচনার শুরুতে অবশ্যই কৃতিত্ব দিতে হবে বিজয়ী পক্ষকে | দীর্ঘদিনের শাসকদলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কারণে তৈরি হওয়া ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় আসা এক জিনিস আর পাঁচ বছর রাজ্য চালানোর পর পুনর্নির্বাচিত হওয়া আরেক জিনিস, কারণ এক্ষেত্রে বিচার হয় প্রধানত তার কাজের ভিত্তিতে, আর কারুর বিরুদ্ধে ক্ষোভের ভিত্তিতে নয় | সুতরাং তৃণমূলের এবারের জয় অবশ্যই হ্যাঁ-ভোটের ভিত্তিতে (সেই হ্যাঁ-ভোট যেভাবেই জোগাড় হয়ে থাকুক না কেন), এটা স্বীকার করেই কোনো আলোচনা শুরু করতে হবে |

নির্বাচন শুধু প্রার্থীদের পরীক্ষা নয়, রাজনৈতিক দলগুলির পরীক্ষা, এবং জনগণেরও পরীক্ষা |

প্রার্থীদের পরীক্ষার সাফল্য-অসাফল্য স্পষ্ট, ফলাফল বেরোয় তৎক্ষণাৎ, খুব একটা কিছু গন্ডগোল না হলে মেয়াদ পাঁচ বছর | বাকিদের ক্ষেত্রে হিসাবটা আরেকটু জটিল এবং বহুমুখী | সেখানে বর্তমানের সঙ্গে অনেক সময়েই মিশে থাকে অতীত ও ভবিষ্যৎ |  

যেমন ধরুন ভোটার অর্থাৎ জনসাধারণ | তাদেরও পরীক্ষা হয় নির্বাচনে | সেই পরীক্ষায় তাদের সরাসরি কোনো হারজিত হয়না, কিন্তু সেই সময়ের সমাজের একটি প্রতিচ্ছবি হিসাবে তাদের মতামত ইতিহাসে লেখা হয় | সেই ইতিহাসের ভিত্তিতে সময় সেই সমাজের, তার নৈতিকতার, মূল্যবোধের বিচার করে | বলাই বাহুল্য সেই বিচার স্বল্পমেয়াদী রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো তফাৎ করে না | যেমন ধরুন এই নির্বাচনের আগে ক্যামেরায় ধরা পড়ল শাসক দলের একগুচ্ছ শীর্ষ নেতা ঘুষ নিচ্ছেন, দাপুটে আঞ্চলিক নেতা থেকে ডাক্তার, অধ্যাপক | কিন্তু দেখা গেল এর ফলে জনগণ এটা মনে করেনি যে তৃণমূল দলটা এতটা অনৈতিক যে তাকে সরিয়ে দিতে হবে, বা তার জয়ের পরিমান কম করতে হবে | দেখা গেল যে বৃহত্তর জনগণ এটাও মনে করেনি যে ওই ঘুষখোর নেতারা ব্যক্তিগতভাবে এমন কোনো অনৈতিক কাজ করেছেন যে তার জন্য তাদের হারাতে হবে | সেরকম মনে করলে এমন ফলও হতে পারত যে তৃণমূল জিতল কিন্তু ওই নেতারা হারলেন | কিন্তু না, তা হয়নি | যে নেতা ঘুষ নিতে নিতে সগৌরব জানিয়েছিলেন যে তিনি এত কম টাকা ঘুষ নেন না ("ছুঁচ মেরে হাত গন্ধ" করেন না), তিনিও হাসতে হাসতে জিতেছেন | শহুরে লোকের কারুর কারুর একটু আত্মশ্লাঘা দেখা গিয়েছিল যে তাঁরা এসব অপছন্দ করেন, কিন্তু গ্রামের গরিব মানুষ এত কিছু বোঝে না, তাই এসব সত্ত্বেও তৃণমূল জিতবে | বাস্তবে দেখা গেছে, না, গ্রাম শহর কোথাও কোনো প্রভাব পরেনি, ঘুষখোররা সব জায়গাতেই জিতেছেন | এত যে কটু কথা হলো, এত যে ভয় দেখানো হলো, এই যে কার্টুন পাঠানোর জন্য অধ্যাপককে জেলে পাঠানো হলো, তার কোনো প্রভাব দেখা গেল ভোটে পড়ল না | দেখা গেল যে দু-টাকা কেজি চাল ও সাইকেল-দান প্রভাব ফেলল | আমরা এ-ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না, কারণ এটা আমাদের এই লেখার মূল বিষয় নয়, সাক্ষী হিসেবে এই-কথাগুলো লিপিবদ্ধ করলাম শুধু |

এ-ব্যাপারে আরেকটা কথাও বলা দরকার - এই যে মানুষ এই যে নৈতিকতার ভিত্তিতে ভোট দিল, এটা শুধু গত পাঁচ বছরের তৃণমূলের শাসনের ফসল নয়, কারণ এই ভোটাররা তাদের জীবনের বেশিরভাগ এবং দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন বামফ্রন্টের শাসনে | আর নৈতিকতা বা আদর্শ একদিনে তৈরি হয়না বা ভাঙ্গে না | এ-প্রসঙ্গে আমরা পরে ফিরব |

নির্বাচনের আরেক মূল অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলো | তাদের ক্ষেত্রে আবার চোখে যা দেখা যাচ্ছে, সাধারণত নির্বাচনের ফলের অভিঘাত হয় তার থেকে বেশি |

যেমন ধরুন এই নির্বাচনে বামফ্রন্ট ৩২-টি আসনে জিতেছে এবং বিজেপি ৩-টি মাত্র আসনে জিতেছে | মানে হবু বিধানসভায় বামফ্রন্টের শক্তি বিজেপির প্রায় দশগুণ | এটুকু হচ্ছে স্বল্পমেয়াদী হিসাব | তার সঙ্গে এটাও পরিষ্কার যে বামফ্রন্ট এখন এই রাজ্যে একটি ক্ষয়িষ্ণু শক্তি এবং বিজেপি বর্ধিষ্ণু শক্তি | প্রায় অর্ধেক শতক বাংলার একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ শক্তি থাকার পর, সাড়ে তিন-দশক দাপটের সঙ্গে রাজ্য শাসন করার পর, নিজেদের মতাদর্শে রাজ্যের মানুষকে অনুপ্রাণিত করার প্রচুর এবং দীর্ঘ সুযোগ পাওয়ার পর বামফ্রন্ট এখন এই রাজ্যে মাত্র এক-দশমাংশ আসনে জয়ী, ভোট মোটামোটি ২৫%, যার মানে প্রতি চারজনে তিনজন মানুষ বামফ্রন্ট-কে ভোট দেননি (এই হিসাবে কংগ্রেস-কে আসন ছাড়ার প্রভাব সামান্য)| অন্যদিকে, রাজ্যের দীর্ঘ ইতিহাসে যারা প্রায় অনুপস্থিত ছিল, সেই বিজেপি প্রায় সব আসনে ভোট বাড়িয়েছে, বহু আসনে ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে এবং শুধু শহরাঞ্চলে নয়, আরএসএস-এর ধীরে ধীরে বাড়ানো সংগঠনের ভিত্তিতে তারা এমনকি মাদারিহাট আসনটি জিতে নিয়েছে এবং কালচিনিতে মাত্র দেড়হাজার ভোটে হেরেছে | তৃণমূল বা কংগ্রেসের কি হবে জানিনা, তবে এই ধারা চলতে থাকলে পরের নির্বাচনের আগে রাজ্যে বিজেপি এবং বামফ্রন্টের পারস্পরিক পরিষদীয় অবস্থাটা উল্টে যেতে পারে | সুতরাং বামফ্রন্ট-বিজেপির ওই ৩২-৩-টা নিরেট সংখ্যার বাইরেও আরো অনেক কিছু নির্দেশ করে |

এইটুকু প্রাথমিক কথার ভিত্তিতেই আমরা ঢুকব আমাদের মূল আলোচ্য প্রশ্নে - কোন দিকে যাচ্ছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন?

এই নির্বাচনের ফলের ভিত্তিতে নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ও বাইরে বহু আলোচনা হবে | পার্টির আলোচনায় অবশ্যই বুথভিত্তিক খুঁটিনাটি আলোচিত হবে এবং আলোচিত হবে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের প্রভাব | সেসব আলোচনা অনেক হয়েছে, আরো হোক |

কিন্তু শুধু তার ভিত্তিতে সমস্যাটির মূলে পৌঁছনো যাবেনা, কারণ সমস্যাটি কৌশলগত নয়, আদর্শগত |

আমাদের মনে হয় কমিউনিস্ট শক্তির এই লাগাতার শক্তিক্ষয়ের কারণ মানুষ আর কমিউনিস্ট পার্টিকে কমিউনিস্ট পার্টি বলে চিনতে পারছেনা, বুঝতে পারছেনা অন্য অনেক দলের সঙ্গে তার আদর্শগত তফাতটা কোথায়, সোজা কথায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়োজনটা কী |

চিনতে পারছেনা কারণ এরা আর এখন কোনো আদর্শচালিত কর্মসূচী নেয়না বা স্লোগান দেয়না, দিলেও বোঝা যায়না | যেমন ধরুন এই নির্বাচনে এবং তার বেশ কিছুদিন আগে থেকে সিপিএম-এর পশ্চিমবঙ্গ-কেন্দ্রিক মূল স্লোগান ছিল দুটো - শিল্প করে কর্মসংস্থান করতে হবে আর রাজ্যে অপশাসনের অবসান চাই | এখন বড় পুঁজিপতিকে সুবিধা দিয়ে - কম পয়সায় জমি, কর-ছাড়, সুবিধাজনক শর্তে ঋণ, এমন কি সময় বিশেষে মুনাফার গ্যারান্টি - ডেকে এনে শিল্প করলে কিছু কর্মসংস্থান হবে, দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ হবে আর তার "সুফল" চুঁইয়ে পরে দেশের গরিব মানুষের কাছে পৌঁছবে, আর এই রাস্তায় পুঁজিপতি যত লাভ করবে তত তার ব্যবসা করার ইচ্ছা বাড়বে - প্রগতির এই ধারণা সম্পূর্ণ ধনতান্ত্রিক আদর্শের ধারণা, এই মডেলে উন্নতি করার জন্য কমিউনিস্ট পার্টিকে ভোট দেওয়ার দরকার নেই | বিজেপি-কংগ্রেস, এমন কি তৃণমূল, এই কাজ সম্ভবত আরো ভালোভাবে করবে, বহু ক্ষেত্রে বড় পুঁজিপতিরা এইসব পার্টির নেতৃত্বে আছে এবং তারা মনে প্রাণে এই তত্ত্ব বিশ্বাস করে |



দ্বিতীয় স্লোগান সুশাসন | এই দাবি সবাই করবে, এই মুহুর্তে বিশেষ করে করার দরকার, কিন্তু সুশাসনের জন্যও কমিউনিস্টদের ভোট দেওয়ার আলাদা করে দরকার নেই, পৃথিবীর উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলোতে চমৎকার সুশাসন আছে, আইন আইনের পথে চলে, কাজের জন্য কাউকে ঘুষ দিতে হয়না, ইত্যাদি |

তাহলে করণীয় কী? অদ্ভূতভাবে এই প্রশ্নটি গত কুড়ি বছরে এ-দেশের কমিউনিস্টদের কাছে জটিল এক ধাঁধা হয়ে উঠলো | পার্টি কংগ্রেসের পর পার্টি কংগ্রেস গেল, প্লেনাম গেল, কিছুতেই আর তার উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না! ক্রমশ তারা বুঝলো যে ধ্যান-ধারণায় "আধুনিক" হতে হবে | আর কমিউনিস্ট হিসাবে "আধুনিক" হওয়ার জাদুকাঠিটি খুঁজে না পাওয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির এক অদ্ভূত অবস্থা দাঁড়ালো - ভারতে সিপিএমের নেতারাসহ সম্ভবত একজনও বিশ্বাস করেনা যে সিপিএম সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য লড়ছে, বরং তাকে জঙ্গি আন্দোলনের নিরিখে যথেষ্ট নিরীহ একটি সংসদীয় দল বলে মনে হয়, কিন্তু পার্টি সশস্ত্র বিপ্লবের কথা তার কর্মসূচী থেকে সম্পূর্ণ মুছে দেয়নি | "সর্বহারার একনায়কতন্ত্র" প্রতিষ্ঠা করার কোনো ইচ্ছা বা সেদিকে কোনো ভূমিকা চোখে পরছেনা, বরং অন্য অনেক "গণতান্ত্রিক" দলের থেকে সিপিএম অনেক বেশি সংসদীয়ভাবে গণতান্ত্রিক, তবু ওই কথাটি কর্মসূচীতে আছে | "জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব" বা "সর্বহারার একনায়কতন্ত্র" আছে কমিউনিস্ট পার্টি হিসাবে, যদিও মানুষ বহুদূর পর্যন্ত দলের কাজে তার কোনো ব্যবহারিক প্রভাব দেখছেনা | আর সামনে দেখছে রাস্তায় নেমে আন্দোলনবিমুখ একটি দল পুঁজিপতিদের ডেকে এনে কর্মসংস্থান করে দেশের উন্নতি করতে চাইছে ! হিসেবগুলো মিলছেনা কমরেড, মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে, ভাবছে এরা ঠিক কোন পার্টি, ঠিক কাদের প্রতিনিধিত্ব করছে | আর যা হওয়ার তাই হচ্ছে, শুধু সংসদীয় বিচারে নয়, সবদিক থেকে ক্রমহ্রাসমান হয়ে যাচ্ছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন | হিসেব মিলছে শুধু শাসক শ্রেণী ও তাদের প্রতিনিধি মিডিয়ার, যারা চায় কমিউনিস্ট আন্দোলন হয় আক্ষরিক অর্থে বা অন্তত আদর্শগতভাবে মুছে যাক |

 

তাহলে উপায় কী? করণীয় কী?

উপায় একটাই | আদর্শের মূল ভিত্তিকে ধরে থাকা এবং আদর্শচালিত আন্দোলন করা |

দু-দশক আগে যখন কলেজে ঢুকেছিলাম, শুনেছিলাম যে দর্শন জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবেনা, মাঠে নেমে পড়তে হবে, বাকি দর্শন কাজ করতে করতে শিখতে হবে | কথাটা অংশত ঠিক, যতক্ষণ পর্যন্ত দর্শনের মূল ভিত্তি নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে | যদি সংশয় তৈরি হয়, তাহলে দর্শনের পুনঃপাঠের প্রয়োজন, যাকে ইংরিজিতে বলে "ব্যাক টু দ্য ড্রয়িং বোর্ড" | কমিউনিস্ট পার্টির মূল আদর্শ শ্রেণীসংগ্রাম | যখন থেকে মানুষ শ্রমের উদ্বৃত্ত তৈরি করতে সক্ষম হলো, মানে শুধুমাত্র জীবনধারণের উপকরণ সংগ্রহ করতে আর সারাদিন ব্যয় করতে হলো না, তখন থেকেই সেই উদ্বৃত্ত শ্রমের সাহায্যে সম্পদ তৈরি হতে শুরু করলো | সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যাপক জনসাধারণের উদ্বৃত্ত শ্রমের ভিত্তিতে তৈরি সম্পদ ভোগ করেছে ছোট একটা শ্রেণী | সে রাজা হোক, জমিদার হোক বা পুঁজিপতি হোক | যত উদ্বৃত্ত, তত লাভ | সুতরাং যুদ্ধ, সুতরাং দাসত্ব, সুতরাং লেঠেল | কিন্তু সম্পদের এই গভীর বৈষম্য ও এই শ্রেণীবিভাজন বহু কারণে (সেগুলো এখানে আলোচনা করার প্রয়োজন বা পরিসর নেই) শোষিত শ্রেনীর জন্য শুধু নয়, সভ্যতার অগ্রগতির জন্য ভালো নয় | সুতরাং শ্রেণীহীন (বা অন্তত শ্রেণীগুলির মধ্যে ব্যাপক বৈষম্যহীন) সমাজের লক্ষ্যে শোষিত-নিপীড়িত শ্রেণীকে শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করতে হয়, আর তার সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেবে তার পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি | এই সামান্য কথাটুকুই মার্কসবাদী দর্শনের মূল কথা যা মার্কস একা নন, আরো অনেক দার্শনিকের দর্শনের ভিত্তিতে তৈরি ও সমৃদ্ধ | এই মূল কথার ব্যাপারে কোনো দ্বিধা থাকলে, পার্টির আন্দোলনে-কর্মসূচিতে এ-ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অস্পষ্টতা থাকলে কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, বারবার হলে কমিউনিস্ট আন্দোলন গুরুত্ত্ব হারায় |

এই মূল বক্তব্যে আধুনিক হওয়ার কিছু নেই | আধুনিক হওয়ার প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার প্রয়োজন প্রয়োগে, কৌশলে | সিপিএম যে জঙ্গলে গিয়ে বোমা তৈরি করার বদলে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে অংশ নিয়ে কাজ করছে, এটা প্রয়োজনীয় আধুনিকতা | আমাদের দেশের সংবিধান ও আইন যা সুযোগ দিয়েছে, তার মধ্যে থেকেই শোষিত শ্রেণীর আন্দোলনকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, মার্ক্সের সময় বা বলশেভিক বিপ্লবের সময় পরিস্থিতি আলাদা ছিল | সশস্ত্র বিপ্লবের বদলে শান্তিপূর্ণ পথে এগোনো প্রয়োজন, একদলীয় শাসনের বদলে বহুদলীয় শাসনের দিকে যাওয়া প্রয়োজন, কারণ শেষ কথা কেউ বলতে পারে না | কিন্তু আধুনিকতার স্বার্থে শ্রেণীসংগ্রাম পিছনে পরে গেলে কমিউনিস্ট পার্টি ও আন্দোলনের আর কিছু থাকেনা |

পাশাপাশি একবার দেখুন বাস্তবটা | মেহনতি মানুষের তৈরি বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র অংশের হাতে | ২০০৭ সালে ভারতের জনসংখ্যার ৭৫% মানুষের দৈনিক আয় ছিল ২০ টাকার কম (ভারত সরকার-নিযুক্ত অর্জুন সেনগুপ্ত কমিটি রিপোর্ট), যে একই সময় ভারতের বিখ্যাত পুঁজিপতির ছেলে বিখ্যাত পুঁজিপতি মুম্বইতে ৬৫০০ কোটি টাকা দিয়ে নিজের বাড়িটি বানালেন! ২০১৩ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট বলছে যে পৃথিবীর পঞ্চাশ শতাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত এক শতাংশ মানুষের হাতে, পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের সম্পদের পরিমাণ ধনীতম ৮৫-জন মানুষের সম্পদের সমান | শোষিত শ্রেণীর অবস্থার হয়ত সামান্য উন্নতি হয়েছে, অন্যদিকে ধনীতমরা ধনী হয়েছে আরো অনেক বেশি | শুধুমাত্র কোন পরিবারে জন্ম এই হাতে-না-থাকা ঘটনাটির ভিত্তিতে আকাশ-পাতাল তফাৎ হয়ে যাচ্ছে একটি শিশুর শৈশবে, তার পাওয়া সুযোগে, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, বাসস্থানে | ঠিক কোন যুক্তিতে বুদ্ধিতে নৈতিকতায় এই ব্যবস্থাটা ঠিক সেটা বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু এই প্রাচীন লুঠতরাজের ব্যবস্থার প্রতি সমর্থনে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে শাসকশ্রেণী ও তাদের তাঁবেদার ও সুবিধাভোগী সংসদ, মিডিয়া | এই ব্যবস্থা অতি প্রাচীন, তাকেই আঁকড়ে আছে শাসকশ্রেণী, কারণ তারা এর সুবিধাভোগী | তারা দখল করতে চায় সমস্ত কিছু | তাই ২০০৯-এর ভারতের সংসদীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের সম্পত্তির হিসাবে দেখা যায় যে বামপন্থীরা ছাড়া আর প্রায় সব দলের বেশিরভাগ প্রার্থী কোটিপতি | সামাজিক ও আদর্শগত প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে অনেক তফাৎ থাকা সত্ত্বেও শ্রেণীগত প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সবাই সমান - কংগ্রেস বিজেপি বিএসপি এডিয়েমকে ডিএমকে বিজেডি, ইত্যাদি | সোজা কথায় সংসদটা ভারতের ধনীতমদের |

আর এই ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে ক্রমশ বাড়ছে পণ্য ও তার প্রতি আকর্ষণ, পৃথিবী ভরে উঠছে জিনিসে | আর এইসব জিনিস তৈরির মাশুল দিচ্ছে প্রকৃতি, আমাদের বাতাস ও জল ভরে উঠছে বিষে, আমাদের সমুদ্র ভরে উঠছে বর্জ্যে | মানুষ ক্রমশ আরো দূরে চলে যাচ্ছে তার শ্রমের থেকে, আমরা বেশিরভাগ মানুষ সারাদিন যা ব্যবহার করি, তার কিছুই নিজেরা তৈরি করিনা, যা তৈরি করি, তা ব্যবহার করিনা!

আর হচ্ছে অবৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রসার - জ্যোতিষী, আংটি, মাদুলি, লাল-সুতো, নতুন নতুন পুজো | খবরের কাগজের পাতা আর টিভি চ্যানেলের পর্দা ভরে উঠছে এদের বিজ্ঞাপনে, সমাজের গণ্যমান্যেরা হাসিমুখে পুজোর উদ্বোধন করে বেড়াচ্ছেন | সেই যে অদৃষ্টের ভয়টা সভ্যতার শুরু থেকে দেখানো শুরু হয়েছিল, রাজাই "দেবতা" হয়ে উঠেছিল বহুক্ষেত্রে, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে |

এইটুকু বলতে হলো এই কারণে যে শ্রেণীসংগ্রামের কারণ বিন্দুমাত্র কমেনি, বেড়েছে; মানুষের পণ্য-ব্যাকুলতা কমেনি, বেড়েছে, শ্রমের থেকে দুরত্ব কমেনি, বেড়েছে, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস কমেনি, বেড়েছে | কিন্তু কোনো এক রহস্যময় কারণে ভারতীয় কমিউনিস্টদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ভাবনার অস্পষ্টতা | তাই একমাত্র স্লোগান হয়ে দাঁড়াচ্ছে যে বড় পুঁজিপতিকে ডেকে শিল্প করতে হবে, যদিও ন্যুনতম মজুরির দাবিতে, পুঁজিপতিদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার বিরুদ্ধে, শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে, পড়াশোনায় সমান সুযোগের দাবিতে, পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে, লাগামহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে, কৃষিতে সমবায় আন্দোলনে, কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নতির লক্ষ্যে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কোনো বড় আন্দোলন দেখা যাচ্ছেনা | যদিও সিপিএম এখনো পৃথিবীর বৃহত্তম কমিউনিস্ট পার্টিগুলির একটি যার ডাকে আজও সহজেই এক লক্ষ লোক জড়ো হতে পারে |

বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন একটি বড় শিল্প একজন বড় পুঁজিপতিকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে করতে হতেই পারে, কিন্তু সেটা সময়ের বাধ্যতা, কমিউনিস্ট পার্টির উন্নতির মূল মডেল হতে পারেনা | অর্থাৎ সেটাই প্রধান স্লোগান হতে পারেনা, আরো পাঁচটা আন্দোলনে কমিউনিস্ট আদর্শের ভিত্তি স্থাপিত থাকলে এটা কোন বড় কথা নয়, মানুষের মনে কোন বিভ্রান্তিও তৈরি হবেনা |

দ্বিতীয়ত দরকার বড় আন্দোলন, যেটা দেখা যাবে, যার দ্বারা বিপুল মানুষ অনুপ্রাণিত হবে, এমন কি পার্টির সমর্থকদের বাইরের একটা অংশও | নিবিড় জনসংযোগ ও স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আন্দোলন জরুরি, কিন্তু সেটা বড় আইকনিক আন্দোলনের বিকল্প নয় | গত বহু বছরে ভারতে সংসদের বাইরে যে চোখে পরার মত আন্দোলন বা কর্মসূচী হয়েছে, অদ্ভুতভাবে তার একটাও বামপন্থীদের নয়! অযোধ্যায় কড়া কট্টরপন্থী ও ধ্বংসাত্মক "করসেবা", যার দ্বারা বিজেপি তার আকর্ষণকে একটা বৃহত্তর জনগোষ্টির কাছে পৌঁছে দিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাস্তা আটকে বসে থাকা, যা জমি অধিগ্রহণকে প্রশাসনিক বিষয় থেকে (যেমন বামফ্রন্ট সরকার চেয়েছিল) একটা সামাজিক এবং বড় রাজনৈতিক বিষয়ে উন্নীত করলো, মেধা পাটকারের "নর্মদা বাঁচাও" আন্দোলন যা বড় ড্যাম তৈরির (এবং সাধারণভাবে বড় "উন্নয়নমূলক" প্রকল্পের) সামাজিক ও পরিবেশগত কু-প্রভাব সম্পর্কে দেশবাসীকে অবহিত করলো, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার অঙ্গীকার এবং দিল্লি-কাঁপানো আন্দোলন, যার ভিত্তিতে রাজনীতিতে আনকোরা কিছু লোক নিয়ে আম আদমি পার্টি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দিল্লিতে বিজেপি-কংগ্রেসকে ধরাশায়ী করল - এগুলো বড় চোখে পরার মত আন্দোলন বা কর্মসূচী, যার প্রভাব তার স্থান-কাল-কে অতিক্রম করতে পারে | এই আন্দোলনগুলো দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন এবং অনেকাংশে পরস্পরবিরোধী শক্তি বা ব্যক্তিরা করেছে, কিন্তু এই তালিকায় কমিউনিস্ট পার্টির কোনো আন্দোলন দেখা যাচ্ছেনা! চরম দক্ষিণপন্থী শক্তি থেকে এনজিও - সবাই তাদের আদর্শ ও ইস্যু নিয়ে বাজার কাঁপিয়ে দিল, শুধু যাদের "বিপ্লব" করার কথা ছিল তারা চুপচাপ! এই আন্দোলনগুলোর কোনটা সমর্থনযোগ্য, কোনটা ক্ষতিকর, কোনটা ক্ষণস্থায়ী, সে ব্যাপারে আমরা কিছু বলছিনা, কিন্তু বড় আন্দোলনের প্রত্যক্ষ এবং ব্যাপক প্রভাব এরা প্রমাণ করে | টিভির তর্কে অংশ নেওয়া, বিধানসভার উঠোনে স্লোগান দেওয়া আর রাজ্যপালকে স্মারকলিপি দেওয়ারও হয়ত প্রয়োজন আছে, কিন্তু এর কোনটাই আবেগ ও আদর্শচালিত বড় আন্দোলনের বিকল্প নয় |

আর তৃতীয় মূল প্রয়োজন রাজনৈতিক দর্শনের ক্রমাগত ও প্রাণবন্ত চর্চা | যে নৈতিকতার কথা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, সেখানে একটু ফিরতে হয় | সাড়ে তিন দশক যে রাজ্যে কমিউনিস্ট পার্টি সরকার চালালো, তার বাসিন্দারা পাহাড়প্রমান দুর্নীতি চোখে দেখতে পেয়েও তার দ্বারা বিচলিত হচ্ছেনা, তোয়ালে জড়িয়ে ঘুষ নেওয়াকে আদৌ কোনো অনৈতিক কাজ বলে ভাবা হচ্ছেনা, অথবা তাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা এতই খারাপ যে এসব দেখেও কিছু ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার জন্য জনগণ ওই দুর্নীতিবাজদেরই ভোট দিচ্ছে, এর কোনটাই রাজ্যের মানুষের চেতনাকে কোনো উজ্জ্বল আলোয় দেখায় না | এর একটা বড় দায়িত্ব অবশ্যই কমিউনিস্ট পার্টিকে নিতে হয় | আগে লোকে অন্তত কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্মীদের দেখে বলত যে লোকগুলো আর যাই হোক, আদর্শবান, সৎ, সাহসী এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের পেছনে ছুটছে না | এখন আর এ-কথা কজনের সম্পর্কে বলা যায় নিশ্চিত নই, তবে জনমানসে সেই উঁচু আসনটি যে আর নেই তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় | কজন পার্টি-সদস্য নিশ্চিতভাবে জানেন যে এই মুহুর্তে ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুত্ত্ব কোথায় এবং মূল কাজ কী, এ নিয়ে সন্দেহ আছে | তাই প্রতিদিনের মিটিং, কর্মসূচী, মেম্বারশিপের হিসেবের পাশাপাশি দরকার দর্শন ও রাজনীতির নিবিড় চর্চা, আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক | সেই আলোচনা এবার এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করলে সুবিধা হবে কিনা, তার থেকে একটা ওপরের স্তরের হওয়া দরকার | এই আলোচনা শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি বা রাজ্য কমিটি স্তরে হলে চলবেনা, শাখা স্তরে হতে হবে | জেলায় জেলায় নিয়মিত তাত্ত্বিক ওয়ার্কশপ হওয়া দরকার শাখা থেকে রাজ্য স্তরের সদস্যদের মধ্যে | সময় নেই বললে চলবেনা, এটাই এখন মূল কাজ |

প্রাক-স্বাধীনতা যুগ থেকেই ভারতের মানুষ, সমাজ ও রাজনীতির জন্য অসামান্য অবদান রেখেছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন | সংসদীয় বৃত্তের মধ্যে (ভূমি সংস্কার, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ) এবং তার থেকেও গুরুত্ত্বপুর্ণভাবে, সংসদীয় বৃত্তের বাইরে (নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সওয়াল করতে, তাকে জোটবদ্ধ করতে, অধিকারের দাবি জানাতে, প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক এবং অবৈজ্ঞানিক রীতিনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে, তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে, বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের ধারণাকে তুলে ধরতে) ক্রমাগত বিশ্বস্ত ভূমিকা নিয়ে গেছে কমিউনিস্ট পার্টি, ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও | এখন দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থানের সময় তাই আরো বেশি করে প্রয়োজন বামপন্থী আদর্শের শক্তিশালী হওয়ার | আদর্শ, আবেগ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়েই প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে কমিউনিস্ট আন্দোলন, রাস্তা বেরোবে | মনে রাখতে হবে শাসক শ্রেণী কমিউনিস্ট পার্টিকে ভয় পায়, মানুষের সংঘবদ্ধতাকে ভয় পায় | ভয় পায় পার্টির বর্তমান শক্তির জন্য নয়, আদর্শের শক্তির জন্য | আর ভয় পায় বলেই তাকে বারবার "বস্তাপচা তত্ত্ব" বলতে চায় | সত্যিই কোনো তত্ত্ব বস্তাপচা হলে বা তা ভূল প্রমাণিত হলে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না |

(লেখক ৯০এর দশকে যাদবপুরে ইঞ্জীনিয়ারিং পড়ার সময় থেকে বাম আন্দোলনের সাথে যুক্ত, বর্তমানে একটি সফটওয়্যার কম্পানিতে কর্মরত)