শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৪

la guerre n'est pas finie ~ অবিন দত্তগুপ্ত

কামদুনির মেয়েটার পরিবারকে টাকায় কিনেছিলেন উনি । যাদবপুরের মেয়েটির বাবাকেও হাটতে বাধ্য করা হয়েছিল নোংরা মিছিলে । আমার রাজ্যের ফ্যাসিস্টের এমন অনেক , কুৎসিত গল্প আমার জানা । 

সেই পুতিগন্ধময় পরিবেশ থেকে উদ্ধার করবেন এক ৫৬ ইঞ্চি বুকের মালিক লৌহ পুরুষ ,যিনি ভালো দিন আনবেন ... বাজারি বাতাসে, বোকা বাক্সে আর সাইনিং হৃদয়-এ এমনি স্বপ্নের আনাগোনা । তা, কৃষক মৃত্যু কমলো না , ডিজেলের দাম কমলো না ... কিন্তু উনি আমেরিকায় দুর্দান্ত বক্তিমে দিলেন । সাইনিং মধ্যবিত্ত অমনি আহা বাহা রবে এফ বিতে এবং অন্যত্র লাফ মারল । উনি ঝাঁটা হাতে ক্যামেরার সামনে দাড়িয়ে, ' দাঁড়িয়ে ঝাঁটাও ' প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করলে্ন ... পোশাকি নাম, স্বচ্ছ ভারত । অমনি ( বস্তি ফেসিং ফ্ল্যাটে অনিহা )সাইনিং তুমি , ভ্যাকুয়াম ক্লিনার হাতে , খাট ছেড়ে মেঝেতে নামলে( মিনতির মা, একদিন ছুটি পেল ) । 

অথচ , রামের নব অবতারের আসল ইচ্ছা অনুধাবন করতে পেরেছিল ,একমাত্র তার বিশ্বস্ত বানর সেনা । স্বচ্ছ ভারত, অর্থাৎ হিন্দু ভারত , নোংরা বিধর্মী মুক্ত ভারত । এই স্বচ্ছতার অভিযানে ,সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন এবং দিচ্ছেন হনুমানস্বামী । তো প্রথমত ওনারা বললেন , " এই যে এতো সংখ্যক বিধর্মী , তার মূল কারণ ভালবাসা । এরা বেছে বেছে হিন্দু মেয়েদের সাথে ,প্রেম করে ,শুয়ে পড়ে এবং যে বাচ্চা জন্মায় সে বাপের ধর্ম নেয় ।" ... অতএব, এ একপ্রকারের জিহাদ্‌ , হনুমানস্বামী নাম দিলেন লাভ্‌ জিহাদ । নাম তো দিলেন, এবার প্রমাণ করতে হয় । রামকেও প্রমাণ করতে হয়েছিল রাবণ শয়তান ,তার জন্য শূর্পণখার নাক কাটতেও ( ইজ্জত কাড়তেও ) ,উনি পিছপা হন নি । রাক্ষস খারাপ প্রমাণ করতে পারলে ,রাক্ষস মারতে সুবিধা ,হিউম্যান রাইটস্‌ প্রবলেম করবে না । অতএব লাভ জিহাদের একটা ঘটনা , মার্কেটে উপস্থিত করা চাই ।

মিরাট সম্পর্কে আমার ধারণা , কন্সপিরেসি কেস অব্দি সীমাবদ্ধ । তবে সেই কন্সপিরেসি , যা কিনা আদতে , মুক্তিকামী মানুষকে কাছাকাছি এনেছিল ,এবং সাম্প্রতিক কন্সপিরেসিতে আসমান-জমিন ফারাক্‌ । একটি হিন্দু মেয়ে , একটি বিধর্মী ছেলেকে ভালবেসে পালিয়ে যায় । এরম আমরা আগেও দেখেছি , বিভিন্ন হিন্দি সিনেমায় । গানও আছে " হামনে ঘর ছোড়া হে , রাস্‌মো ক তোরা হে " ...সে যাই হোক । তা বানরসেনা জানান দিল ,মেয়েটিকে জোর করে একটি বিধর্মী অস্বচ্ছ পুরুষ ধর্ষণ করেছে । মেয়েটির বাবা-মা ও একি কথা বলল । হঠাতি, প্রেমে সাহসী মেয়েটি , বাঘিনীর মত উঠে দাড়িয়ে জানালো ,সে স্বেচ্ছায় ছেলেটির হাত ধরেছে ,এবং তার বাপ-মাকে ২৫,০০০ টাকায় কিনেছে , বানর সর্দার । 

এরপর-ও আপনি , সুদিনের স্বপ্নে বিভোর থাকবেন । ধর্মের নামে মানুষ কাটা হলেও , আপনার 'মা' সিরিয়াল বিঘ্নিত হবে না । এসব জানা কথা । কিন্তু লিখি , যদি কারো চোখে পড়ে যায় । ভালোবাসাকে বুঝলেন , সমস্ত ফ্যাসিস্ট ভয় পায় । কারণ ভালোবাসা , যে কোন ক্ষমতার মূল ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে । আমরা বাম্পন্থিরা , তাই মানুষে মানুষে ভালবাসার কথা বলি । হিন্দু-মুসলমানে , দলিতে-উচুজাতে , নারীতে-পুরুষে , পুরুষে-পুরুষে, নারীতে-নারীতে । ইচ্ছের কথা বলি ।বলি এই দক্ষিনপন্থার বন্ধ ভেঙ্গে , নতুন সূর্যের ভোরের কথা ...

la guerre n'est pas finie 
( The War is not over )

রবিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৪

ঘটি - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

এই কয়েক দিন আগের কথা। সাগরপারে থাকা এক বন্ধু বিজয়া করতে ফোন করেছিলো। কথায় কথায় পুরোনো স্মৃতি ফিরে ফিরে এলো। চল্লিশে পা রাখলে এসব স্মৃতিচারন বেড়ে যায় একটু। ডেকার্স লেনের চিত্তর হোটেল থেকে সাবিরের রেজালা, ব্রাজিল, মোহনবাগান, সিপিএম, পুরোনো বান্ধবীরা, ভাঙ্গা প্রেম, পূজাসংখ্যার পড়তে থাকা মান, ছানাপোনার কির্তি-কলাপ এসব পেরিয়ে কথার তোড় যখন একটু কমেছে, তখন বর্তমানে ফিরলাম। কি করছি, কি করছিনা এই সব। বন্ধু আমাদের পাঁচফোড়নের নিয়মিত পাঠক। তবে লেখালিখি তার ধাতে নেই। বেজায় কুঁড়ে। জানি এ লেখাও সে পড়বে, পড়ে তার “কুঁড়ে” খেতাবের জন্যে আমাকে মনে মনে একটু খিস্তিও দেবে, কিন্তু ওই যে, কুঁড়ের বেহদ্দ, তাই এসব নিয়ে কিস্যু লিখবে না। বন্ধু ১০০% ঘটি, কাজেই এটাই তার স্বভাব। মনে মনে যতই খারাপ লাগুক, মুখ ফুটে সেটা বলতে তার আলিস্যি। কথায় কথায় বললো পাঁচফোড়নে নাকি বাঙালদের নিয়ে প্রচুর লেখা বেরচ্ছে, আর সেগুলো বেশ মুখরোচক ও সুখপাঠ্য। কিন্তু ঘটিদের নিয়ে কোনো লেখা টেখা কেন নেই, সেটা তার মাথায় ঢোকেনা। এর পর, স্বগতোক্তি করলো – জয়ঢাক তো আছে, কিন্তু সেটা পেটায় কে? ওই যে , আর পাঁচজন ঘটির মতো আমাদের দুজনের ও নিজেদের নিয়ে বলতে গেলে এন্তার আলিস্যি। কিন্তু অন্যদিকে, বৈঠকি আসরে বসিয়ে দিন, ঘটিদের মুখে তুবড়ি ছুটবে। তড়বড় করে কথা বলাটা আসেনা ঠিক, ঘটিদের মধ্যে একটু বৈঠকি মেজাজ সব সময়েই থাকে। ধিরে সুস্থে তারিয়ে তারিয়ে গপ্প বলা হবে। সে গপ্প আবার পরিবেশিত হবে নিজস্ব ধারায় আর বিস্তর রসিকতার সঙ্গে। সে রসিকতার রস গ্রহন করতে আবার মাঝে মাঝে একটু সময় লাগতে পারে। এই যেমন আমার এক দাদা-স্থানীয়, তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বলতে শুরু করলেন বাড়ির রান্নাবান্না নিয়ে। ওনার অর্ধাঙ্গিনি বাঙাল, উচ্চশিক্ষিতা ও শিক্ষিকা। দাদা বললেন বাঙালরা ভালো রান্না করে। তারপর একটু থেমে বললেন, অন্ততঃ সেরকমই বলে। ব্যাস হয়ে গেল। কিন্তু এ রসিকতা বুঝতে একটু সময় তো লাগেই। তাই ঘটিদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলে, সময় বড় প্রয়োজন। আর ওই যে, বৈঠকি মেজাজ, সেটা ছাড়া ঘটিদের মুখ খোলানো খুব কঠিন। হ্যাঁ হুঁ করবেন তাঁরা, প্রয়োজনে দু চারটে প্রয়োজনীয় তথ্যও দেবেন। সেটুকুই। আড্ডা জমবে না। অথচ এ লোকটাই ভাইফোঁটায় খাওয়া দাওয়ার পর নাকি এক টানা ১১ ঘন্টা টানা আড্ডা দিয়েছিলো।

ঘটিদের কিছু কিছু শব্দ ও তার প্রয়োগ নিজস্বতা রাখে। এই যেমন ধরুন “সর্বনাশ”। মুজতবা আলীর মত মানুষও ঘটিদের সর্বনাশ বলা নিয়ে এক পাতা লিখে গেছেন। প্রচণ্ড ভিড়ে ঠাসা একখানা বাস এসে দাঁড়ালো বাসস্ট্যান্ডে। ঘটি দেখলেন বাসের দিকে। অস্ফুটে বললেন “সর্বনাশ”। শীতের রাত, খুব গুটিশুটি মেরে কম্বলের তলায় ঢুকে ঘটি দেখলেন ঘরের আলো নেভানো হয়নি। আবার কম্বলের তলা থেকে বেরিয়ে আলো নেভাতে যেতে হবে। “সর্বনাশ”।  আজকাল ঘটিদের ভাষাগত নিজস্বতা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। খব সহজেই নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের বলতে শুনি “আড় কত দারিয়ে থাকবো?”। সব কিছুই বদলায়, কাজেই ভাষাও বদলাবে। উচ্চারন বদলাবে। ভুল উচ্চারন হলেও সেই ভুলটা বেশিরভাগ লোকে বললে, সেটাই চলবে। আমার এ নিয়ে কোনো আফশোস নেই। তবে, যেটা নিয়ে অল্প হলেও আছে, সেটা হলো, ঘটিদের জেলায় জেলায় নিজস্ব কিছু প্রবাদ প্রবচন ও বাক্যরীতি আছে, যে গুলো এখন অনেকটাই শুনিনা। ভাষা পাল্টাবে, কিন্তু ওই যে “স্বভাব যায় না ম’লে”। নিজেদের ব্যাপারে যতই মুখচোরা হোন না কেন, এক থালা মিষ্টির সামনে তাঁরা পৃথিবীর অন্য যেকোনো জনগোষ্ঠির থেকে বেশি মুখ খোলা। বিশ্বাস করুন, ১০০% খাঁটি ঘটি কখনো, কোনো কালে, মিষ্টি গুনে খাননি। আশু মুখুজ্যের গোঁফের দিব্যি। যদি কেউ সেটা করে থাকেন, খোঁজ নিয়ে দেখুন, ব্যাটার চতুর্দশ পুরুষে নির্ঘাত ভেজাল আছে। মুজতবা আলী যেমন দেখেছিলেন, খাঁটি পাঠান কখনো আটক্‌ (সিন্ধু নদ) পেরোয় না, আর রমজান খান পেরিয়েছিলো বলে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছিলো, রমজান খানের ঠাকুমা পাঞ্জাবী। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু (সে আবার নির্ভেজাল বাঙাল) শুনে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলো, রোজ রাতে মিষ্টি আনা হয় বাড়িতে। না হলে খাওয়াই হবে না। সে বেচারা রাতে আয়েস করে ভাত মাছ খায়। তার সঙ্গে ক্ষিরকদম, লবঙ্গলতিকা, পান্তুয়া বা কেশরভোগ চলেনা। আর ঘটিদের, এই সব ছাড়া, রাতের খাওয়া অসম্পুর্ন। অর্থনৈতিক অবস্থা ভেদে বোঁদে, খেজুর গুড় এমনকি ভেলিগুড় পর্যন্ত চলতে দেখেছি। কিন্তু মিষ্টি ছাড়া রাতের খাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। বাইরের দেশে থাকার সময় আমি এক শিশি জ্যাম কিনে রাখতাম। খাবার শেষে এক চামচ মুখে দিলে, তবে খাওয়া শেষ হতো।

খাওয়া দাওয়ার কথা যখন উঠলোই, তখন বলি, ঘটিদের লুচি প্রেম অস্বাভাবিক ধরনের বেশি। আমার পৈতের পর আমার ঠাকুমা এক বছর নিরামিষ খাবার নিদান নাকচ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার মা অতি কষ্টে একটি মাত্র নিয়ম আমাকে মানাতে পেরেছিলেন, সেটা হলো, ভাত খাবার সময় কথা বলা চলবে না। কথা বলে ফেললে, আর ভাত খাওয়া যাবে না। ভাত খাওয়া যাবেনা বটে, কিন্তু অন্য কিছু খেতে বাধা নেই। কাজেই, আমি একটি বছর এই নিয়মের নিদারুন ফায়দা তুলেছিলাম। আমার মত মুখচোরা লাজুক ছেলেও অধিকাংশ দিন স্কুলে যাবার সময় কথা বলে ফেলত, আর ফল স্বরুপ একখানা চিরকুট পাওয়া যেত মায়ের থেকে। স্কুলের ঠিক পাশেই আমার কাকু-কাকিমা থাকতো। আমি সেখানে কাকিমা কে চিরকুট দিয়ে চলে যেতাম ক্লাসে। টিফিনের সময় কাকিমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতো। আমাকে স্কুল থেকে বেরোতে দেখলেই কড়া চড়তো, আর আমি খান কুড়ি-বাইস লুচি খেয়ে স্কুলে ফিরতাম। প্রতি মাসে ভক্তি ভরে একাদশী ও পালন করেছি। কারন সেদিন ও লুচি খাওয়ার দিন। দু বেলা। এখনো প্রতি বছর, জন্মাষ্টমী, দুর্গাপূজোর অষ্টমী এসব দিনে নিয়ম করে দু বেলা লুচি, যাকে ঘটি ভাষায় আমরা বলি ময়দা খাওয়া। কলেজে পড়ার সময় এক বছর আমার এক বন্ধু অষ্টমীর দিন কবজি ডুবিয়ে পাঁঠার মাংস খাবার আমন্ত্রন জানিয়েছিলো। বিনীত ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আমার কাছে, অষ্টমীর ময়দার চেয়ে সুস্বাদু খাবার পৃথিবীতে নেই। বন্ধু কে বলেছিলাম, মাংস তো নবমী তে খাবোই। সঙ্গে মিঠে মিঠে ঝুরঝুরে সুগন্ধী পোলাও।

ঘটিদের সমালোচনা বড় অদ্ভুত। ধরুন আপনি একটা ছবি এঁকেছেন, এবং নিজেরই পছন্দ হয়নি ছবিটা। খাশ ঘটি ছবি দেখে বললেন – “বাঃ বেশ এঁকেছ তো, দিব্যি হয়েছে, চালিয়ে যাও!“। আপনি প্রশংসা শুনে বিগলিত হলেন। কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। আপনার পাশে আরো একজন ছবি এঁকেছে, এবং আপনি স্পস্ট দেখতে পাচ্ছেন, সেটা আপনার চেয়ে অনেকটা ভালো এঁকেছে। ঘটি ওটার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করলেন – “সর্বনাশ, করেছ কি হে? এ তো সাংঘাতিক কান্ড, তোফা হয়েছে ছবিটা!!!”। এবারে আপনি বুঝলেন প্রসংসা কাকে বলে। খাশ ঘটি, মুখের ওপর কখনো চটকরে কোন কিছু কে খারাপ বলবে না। ওটা আপনাকে বুঝে নিতে হবে। বাঙালদের কথা একদম সোজাসুজি, স্পস্ট সরল। তারা মুখের ওপর বলে দেয়। ঘটিদের কথায় কতগুলো স্তর আছে। কারোর সরাসরি নিন্দে করার চলন ঘটিদের মধ্যে নেই বলবো না, তবে বেশ কম। আপনাকে তার প্রশংসার ধরন দেখে ব্যাপারটা বুঝে নিতে হবে। শেষে ফিরি আর এক বন্ধুর কথায়। এই বন্ধু খাশ উত্তর কলকাতার ঘটি, বেঙ্গালুরুতে একখানি বহুজাতীক সংস্থায় কর্মরত। আমি তখন বেঙ্গালুরুতে থাকি। বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে মাঝে মাঝে কাছেই এক বাঙালি রেস্টুরেন্টে খেতে যেতাম। সে খাওয়া চলতো ঘন্টা দেড়েক। জমাটি আড্ডা। আর অদ্ভুত ভাবে, সে আড্ডায় সবাই ছিলো ঘটি। এরকম নিছক ঘটি আড্ডা আর একবার বিদেশে পেয়েছিলাম, সানফ্রান্সিকোতে। আমাদের সবার সঙ্গে এই বন্ধুটি তারিয়ে তারিয়ে খেতো, আর মাঝে আফসোস করতো, রাত্রে বাড়িতে তাকে আবার অখাদ্য-কুখাদ্য খেতে হবে। আমি একদিন বলেছিলাম – তোমার বাড়ি তো পাশের পাড়ায়, এখান থেকে নিয়ে গেলেই পারো মাঝে মধ্যে, তাহলে আর অখাদ্য খেতে হয় না। এক গাল হেসে অমিত দত্ত জবাব দিয়েছিলো, ভাইরে, ঘটিরা কবে থেকে একা একা সুখাদ্য খেতে শুরু করলো?


অনেক কিছুর পারেনা ঘটিরা। একা একা কোন কিছু উপভোগ করতে একেবারেই পারেনা। ঘটিত্বের অন্যতম মাপকাঠি, গুষ্টিসুখ উপভোগ করা। 

শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

মানুষ বাঁধার গল্প ~ অবিন দত্তগুপ্ত

তখন আমার ৬-৭...ধর্মে হিন্দু (ওই শিশুদের যেমন হয় ,বার্থ সার্টিফিকেট মতে)

আমার যুদ্ধের গল্প, যুদ্ধের সিনেমা, যুদ্ধের সিরিয়াল হেব্বি লাগতো । তখন প্রিয় ছিল টিপু সুলতান আর দি গ্রেট মারাঠাস্‌ । আমি চাইতাম পানিপতের যুদ্ধে মারাঠারা জিতুক ,চাইতাম টিপু যেন একটাও যুদ্ধে না হারে । মোদ্দা কথা , টিপু - মারাঠা ইত্যাদিরা তখন আমার কাছে ইস্ট-বেঙ্গলের মত, ওরা জেতা মানে আমার টিম জেতা । যে বছরের কথা বলছি , সে বছর রথের সময় ,আমি একটা তিনতলা(মানে তিন্টে বক্স) রথ টেনেছিলাম। মা দারুণ সাজিয়ে দিয়েছিল ।তারপরের বছর থেকে আর কেন জানি না, রথ টানা হয়নি । যাক সে কথা,পয়েন্টে ফিরি । সালটা ৯২ ... টি ভি তে দেখতাম ,একটা শেয়ালের মত দেখতে বয়স্ক লোক , রথে চড়ে এদিক ওদিক ঘুড়ছে । কয়েক হাজার মানুষ দৌড়চ্ছে তার পিছনে । আমার বেশ লাগত । মহাভারতের , শকুনির মত অনেকটা । দাদুকে দেখতাম ,ওই লোকটাকে দেখলেই ভুরু কুঁচকে হাতের কাগজের দিকে চোখ সরাত । প্রসঙ্গত ,বলে রাখি আমার দাদুর দিনের বেশীর ভাগ সময়টাই ,গনশক্তি নামে একটা কাগজ পড়ে কাটত ।

তো হঠাত-ই একদিন ,সবাই টি ভির সামনে বসে, উদবিগ্ন । আমি ঘরে ঢুকতে গেলেই ,বাবা বকা দিল...পাশের ঘরে যাওয়ার হুকুম হল । আমি বরাবরের অবাধ্য ,মায়ের আঁচলের তলা দিয়ে টি ভির পর্দায় চোখ রাখলাম । স্ক্রিন জুড়ে দেখলাম , কখনো আগুন জ্বলছে ,কখনো তলোয়ার নিয়ে মানুষ ছুটছে , কারুর মাথায় টুপি,কারুর কপালে তিলক । এমনটা অবশ্য আমি আগেও দেখেছি , টিপু সুলতানে অথবা মারাঠায় । মাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম "এটা কি যুদ্ধ হচ্ছে মা ? " মা ঘাড় নাড়ল ।
"কার কার ?"
"হিন্দু-মুসলিম"।
বার্থ সার্টিফিকেটে হিন্দু ৭ বছরের আমি ,মুহূর্তে দল বেছে নিলাম "কে জিতছে মা ? হিন্দুরা ??"
মা আমার মাথায় আলতো হাত রেখে জানিয়েছিল "মানুষ হারছে ।" মানে বুঝিনি ।
টিভিতে এই যুদ্ধ চলছে যখন ,তখনো দাদু গনশক্তি পড়ছে । আমি জানতাম ,দাদু সব শোনে ।

একঘণ্টা পর , একটা পরিচিত মুখ এলো পর্দায় । দাদুর মতোই চশমা । এই লোকটাকে সবাই হেব্বি ভালবাসত । নাকের ফুটো গুলো আমার একটু বড় বড় লাগতো । কিন্তু লোকটাকে সবাই ভালবাসত ,অতএব আমিও বাসতাম । ওই দাদুটা কে ,জানতে চাওয়ায় ,আমার দাদু বলেছিল ,আমার নেতা, জ্যোতি বোস । সে যাই হোক, উনি আধ্‌ ঘন্টা কি সব বললেন ,বাবা-দাদু গোগ্রাসে গিলল । শেষ হতেই , "কাল তাড়াতাড়ি বেরতে হবে ,খেতে দাও বলে বাবা আমারি মতো লম্ফ-ঝম্প আরম্ভ করল । দাদুর মুখ তখন আবারো ,কাগজে-নিচু ।

পরদিন যখন ঘুম থেকে উঠলাম ,শুনলাম স্কুল বন্ধ । দাদুর খাটে লাফিয়ে উঠে, টি ভি তে চোখ রাখলাম , যুদ্ধ দেখব বলে। বাবা সকাল থেকে বাড়ি ছিল না । বাবা কোথায় গেছে জানতে চাইলে, মা টি ভির দিকে আঙুল তুলে বলল "ওখানে" ।, স্ক্রিনে দেখলাম হাজারে হাজারে লোক হাতে হাত ধরে দাড়িয়ে আছে , কারো মাথায় টুপি ,কারুর পাগড়ি ,কেউ বা খালি মাথায়। কত্ত রং । আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম "বাবা ওখানে কি করতে গেছে, এটা কি হচ্ছে "।
"মানুষ মানুষ কে বাধছে"
"কি ভাবে ?"
"হাত দিয়ে"
"আর বাবা ? "
"দ্যাখ কার হাত ধরে ,দাড়িয়ে আছে " ।
"কিন্তু যুদ্ধ ... যুদ্ধটার কি হল ? এখন কে জিতছে ? "

হাতের গণশক্তি নামিয়ে, আমায় কোলে তুলে , একগাল হেসে দাদু বলল " মানুষ "

--------------------------------------------------------------------------------------------- আমরা কি আরেকবার মানুষকে মানুষের সাথে বাঁধতে পারি না ??? আমার কমরেড যারা ,শেষের প্রশ্নটা তাদের জন্য ।

মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৪

পুজো ও বাঙাল ঘটির ব্যাপার স্যাপার ~ সৌমিক দাশগুপ্ত

জন্মসূত্রে 'বাঘ' হবার দরুণ, বেশ ছোটবেলা থেকেই ব্যাপারটা উপভোগ করে আসছি। বাবা অইলো গিয়া এক্কেরে বরিশাইল্যা কাঠ বাঙাল, আর মা নেহাতই হুগলী জেলার ঘটির মাইয়া। তা পুজো আচ্চার দিনে, আমাদের বাড়ীর নিয়ম ছিল, নিরামিষ আবার কি ? লক্ষ্মীপুজো হোক, বা দুর্গাপুজোর অষ্টমী বা সরস্বতী পুজো, নন ভেজ মাস্ট। আমার ঠাকুমা নাকি মা কে বলতো, "পুজার দিনে, এয়োস্ত্রীগো নিরামিষ খাইতে নাই মনি, ঘরে কিছু না থাকলেও, চাড্ডি পেঁয়াজ কুচাইয়া লইবো গিয়া।" 

তারপর ঠাকুমা তো চলে গেলেন, মা জমিয়ে রান্নাঘরে ঘটি রুল চালু করে দিল। অষ্টমীতে "ময়দা খাওয়া", সরস্বতী পুজোয় খিচুড়ি, লক্ষ্মীপুজোতে (যদিও এটা ঘটিদের নেই আদৌ) পোলাও। আমিও ছোটবেলা থেকে ঘটি খাওয়া দাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। 

তখন ক্লাস এইটে পড়ি। আমার পিসি একদিন ঘরে এসে তুমুল বাওয়াল দিল। এ কি, তোরা ছেলেটাকে অষ্টমীর দিন নিরামিষ খাওয়াস, ঘোর অন্যায়। মানবসভ্যতা বিপন্ন হয়ে যেতে পারে। এমনিতেই ননদ এবং বৌদির সম্পর্ক একটু অম্লমধুর হয় সকলেরই জানা। সেদিন থেকেই, আমার বাবা সাপোর্ট পেয়ে কিরকম হিংস্র হয়ে গেল। তুমি শালা ঘটির মেয়ে, কি করে বুঝবে আমাদের ব্যাপার স্যাপার, অতএব, পরের অষ্টমীতেই মাছ লাও। মা একটু গাঁইগুঁই করলেও, শ্বশুর বাড়ীর রুল ভেবে মেনেই নিল আবার। 

সরস্বতীই একমাত্র অনেক দিন অবধি নিরামিষে বেঁচে ছিলেন। 

তারপর কালের নিয়মে আমার বিয়ে হল, আমার গিন্নী যিনি এলেন, তিনিও ঘটি, এবং উত্তরপ্রদেশীয় প্রবাসী। ইনি যদিও "মাছ ছাড়া ভাত মুখে তুলতে পারেন না", কিন্তু পুজো ইত্যাদির সময় "আঁশ খাবে ? তওবা তওবা, গন্ধি বাত" । ঘরের সমস্ত নারীশক্তি যদি বিপক্ষ শিবিরের হয়, তাহলে সসেমিরা অবস্থা তো হবেই। 

এতদসত্ত্বেও বেঁচে গেলাম। তৃতীয় নারীর আবির্ভাবে। যখন আড়াই বছর বয়স, তখন থেকেই নিদারুণ শাক্ত হয়ে উঠলো। চার বছর বয়সে, শ্রাদ্ধবাড়ীতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে হুঙ্কার দিয়েছিল, "চিকেন কিধর হ্যায়"। অতএব, আমি বাঁচলাম, আমার বাবা বাঁচল, অষ্টমী বাঁচল, সরস্বতীর কপালে জোড়া ইলিশ জুটল, এমন কি আগামী কাল লক্ষ্মী পুজোর দিনও সকালে জমিয়ে ইলিশ মাছের আয়োজন হয়েছে, রাতে যদিও আমি বেশ ভক্তিভরে ভোগের খিচুড়ী আর নারকেল নাড়ু খাবো। 

কে জানে, সেই বুড়ীই ফিরে এসেছে কিনা। কিচ্ছু বলা যায় না।

সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

হোক কলরব ~ সোমনাথ রায়

​​
আমরা যারা রাত্রে বাড়ি ফিরছি
আমরা যারা কুন্ঠাভয়ে থাকছি
বুঝতে পারি এ পথ কিছু পিচ্ছিল
এবার যদি হোক কলরব ডাক দি?

আমরা যারা পাসপোর্টের ঘুষ দি
ফোনের লাইন খারাপ থাকে দশদিন
নিজের মধ্যে মানুষ যাকে পুষছি
রোজ দুবেলা তার জ্বালাতে অস্থির

আমরা যারা বাস পাইনা রাস্তায়
রোজই দেখি বাড়ছে বাজারমূল্য
আমরা যারা আচ্ছে দিনের আস্থায়
ভাবছি আজ কারখানা কি খুললো?

আমরা যারা কলেজ ফি এর ধাক্কা
লোনের আকর টানতে গিয়ে ধুঁকছি
রাস্তা ভাঙা, নল সারানোর পাকখাই
এবং শুনি মন্ত্রী-নেতার উক্তি

আমরা যারা টেবিলের এই পারটা
ঘাড়টি গুঁজে নিচ্ছি তাই যা দিচ্ছে
ফলন কমে, দাম বেড়ে যায় সারটার-
হোক কলরব, তাই আমাদের ইচ্ছে

শিউরে উঠে ভোরের কাগজ পড়ছি
আমরা যারা খবর দেখে অন্ধ
শহর জুড়ে সবাই আছে পড়শি
হোক কলরব সামনে যখন বন্ধ

আমরা যারা সিঁটিয়ে ছিলাম পাশটায়
ক্রমশঃ আজ ঘাড় উঁচিয়ে রাখছি-
বন্ধুরা সব আসবে নেমে রাস্তায়
এবার যদি হোক কলরব ডাক দি

পাল্টা ~ অনামিকা

​তৃণমূলের পাল্টা মিছিল,
ডাক দিয়েছেন শঙ্কু রে।
প্রতিবাদের বিষলতাকে
উপড়ে ফেলো অঙ্কুরে।

হাঁটবে নায়ক হাঁটবে গায়ক
বিদ্দ্বজ্জন… সুবোদ্ধা।
তোলাবাজ আর আরাবুল আর
অর্পিতা আর সুবোধদা'।

কাদের হাতে পাওয়ার এখন
প্রমাণ দেব সংখ্যাতে
প্রমাণ দেব সবাই রাবন
পৌঁছে গেলে লঙ্কাতে।

রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

হোককলরব ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


(Photo Courtesy-Ronny Sen)
 
ফোর্ট কালিঘাটে, মাটির ৩০ ফুট নিচে খুবই সুরক্ষিত এক বাঙ্কারে, নিজের ঘরে বসে তিনি খবর নিচ্ছিলেন। পাশের ঘরে কয়েকজন খ্যাতনামা প্রযুক্তিবীদ ও ভূবিদ্যাবিশারদ এক খানা অত্যাধুনিক সিজমোগ্রাফ নিয়ে বসে আছেন। সিজমোগ্রাফ, যা ভুমিকম্প মাপে। স্বভাব বশতঃ অধৈর্‍য্য হয়ে তিনি উঠে আসছিলেন বার বার। জিজ্ঞেস করছিলেন
ধরা গেছে? কম্পন ধরা গেছে?

প্রযুক্তিবীদরা ওঘর থেকে হাওয়াই চটির ফট্‌ফট্‌ শুনলেই আরো বেশি করে মন দিচ্ছিলেন কাজে। মুন্ডু যতক্ষন আছে, মুন্ডুর ভয় ও আছে। সর্বহারা-হাভাতে হলে হয়ত ভয় ও থাকতো না।

কিন্তু কোথায় কি? সিজমোগ্রাফের কাঁটা নড়ে না। সাদা কাগজের ওপর শুধুই সমান্তরাল রেখা। ওদিকে কেষ্টাপো (মানে, যে গেষ্টাপোরা অনেকটা কেষ্ট মন্ডলের মত স্বভাব চরিত্রে), সদর দফতরে কর্পুর-কায়স্থ, মানে যে কায়স্থর চরিত্র কর্পুরের মত, মিনিটে মিনিটে রাডার নিরিক্ষন করছেন, আর খবর দিয়ে চলেছেন ফোর্ট কালিঘাটে – মিছিল বিড়লা ছাড়ালো, এবারে পার্ক স্ট্রিট, আরো এগোচ্ছে।

কাঁপছে? কাঁপছে? কাঁপুনি ধরা পড়লো? অধীর হয়ে তিনি আবার হানা দিলেন পাশের ঘরে।
না ম্যাডাম। এখনো কাঁপেনি। ধরা পড়েনি কম্পন।

মিছিল মেয়ো রোড। সিজমোগ্রাগ এখনো নিস্তরঙ্গ। মিছিল এবারে রাস্তায় বসে পড়েছে। আর এগোবে না।

বলিনি? আমি বলিনি? কলকাতা কাঁপবে না আগেই জানতাম। অতই সোজা? বললেই হলো মিছিলে কলকাতা কাঁপাবে?

তৃপ্তির হাসি হাসলেন তিনি। তাঁর ওপরে খবরদারী করবে এত সাহস এই কয়েক হাজার কচি ছেলে মেয়ের? কিন্তু খটকা একটাই। ধোলাই খাবার পরেও হিম্মত হলো কি করে এদের? ধোলাই তো সর্বত্র দেওয়া হচ্ছে। এখানে ওখানে। পাড়ায় পাড়ায়। রাস্তা ঘাটে। প্রতিষ্টানে, মাঠে ঘাটে। আচ্ছা, আজকে এই যাদবপুরের খোকা খুকু দের দেখে আগামী কাল যদি পাড়ায় পাড়ায় শহরে গ্রামে এই জিনিষ শুরু হয়? তাহলে......... তাহলে ??? কপালে বিনবিনে ঘাম, পা গুলো কেমন অসাড় লাগছে। হাঁটু গুলো...... হাঁটু গুলো............

পাশের ঘর থেকে চিৎকার শোনা গেল –
কেঁপেছে কেঁপেছে।

সিজমোগ্রাফের কাঁটা গুলো ভিষন ভাবে কাঁপতে কাঁপতে সাদা কাগজের ওপর হিজিবিজি টেনে লিখে যাচ্ছিলো

(Photo Courtesy - Purba Rudra)
 "হোককলরব" "হোককলরব" "হোককলরব" "হোককলরব"....


শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

গেঞ্জি পুলিশের সওয়াল-জবাব ~ অনামিকা

গেঞ্জি পুলিশ গেঞ্জি পুলিশ, তোমার হাতে কি?
শক্ত বাঁশের পোক্ত লাঠি, লুকিয়ে রেখেছি।


কে ডেকেছে পুলিশ তোমায়, গভীর হলে নিশি।
-সবাই জানে, তিনিই মহান শিক্ষারত্ন ভিসি।


উর্দি কোথায়? তোমার গায়ে গেঞ্জি, পায়ে চটি।
-বন্ধু, ইয়ে গুন্ডাও যে এসেছিলেন ক'টি।


অমন করে মারলে পুলিশ? ছিঁড়লে গায়ের বস্ত্র?
-কী আর করা।ওরা তো সব মাওবাদী সশস্ত্র।


অস্ত্র কোথায়? গাইছিলো গান। শুনতে পাওনি পুলিশ?
-শিক্ষাই যে অস্ত্র ও'দের, কেমন করে ভুলিস?


শুনতে পাচ্ছো, হাইকোর্টও বলেছে শেম শেম।
-এটাই তোদের ডেমোক্রেসির চূড়ান্ত 'পবলেম'!


ছাত্রীদেরও ডলতে লজ্জা পাওনি পুলিশ ভাই?
-সবগুলো লাইট একসঙ্গে নিভিয়েছিলাম তাই।


ক্যামেরাকেও ভয় করোনি। সত্যি তুমি ভিলেন?
-প্রেসকে মিছে বলতে তিনি শিখিয়ে দিয়েছিলেন।


কে সেই তিনি। বলো পুলিশ, নামটা শোনাও তার।
-বলা বারণ। ডাকনাম তাঁর, মহিলা হিটলার।

শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

তাহলে দাঁড়াল কি? ~ সংগীতা দাশগুপ্তরায়

​একদল বাঘা বাঘা ছেলে মেয়ে একটা নেংটি ইঁদুরকে ঘিরে বিক্ষোভ করছিল এবং আলোচনা করছিল নেংটিকে মেরে তার ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে কতগুলো জুতো বানানো যাবে। নেংটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সিংহসম পুলিশ বাহিনীকে তলব দেয়। পুলিশ আসে সহানুভূতি আর ভালবাসায় বোনা সাদা গেঞ্জী পরে। আসার সময় তারা প্রচুর 'বহিরাগত মাওবাদী' কে দ্যাখে কিন্তু অতিথি দেবো ভবঃ ভেবে তাদের ইগনোর করে ভেতরে চলে যায়। কেউ কেউ অবশ্য ঝটিতি বহিরাগত মাওবাদীদের হাতের অস্ত্রগুলির ছবি তুলে নেয় মোবাইলে যাতে সান্টাকে দেখাতে পারে এই ক্রিসমাসে তাদের ছেলেমেয়েদেরও ওমনি অস্ত্রশস্ত্র চাই। এর পর তারা ক্যাম্পাসে ঢুকে মিষ্টি হেসে ছাত্রদের হাতে মার খায়। অসব্য ছাত্রগুলো আগে পুলিশ-মার খেলা খেলে তারপর নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করে। পুলিশ তখন ওদের খেলে ভেঙ্গে "রাত হয়েছে, শুবি আয়" বলে কোলে করে থানায় নিয়ে যায়।



সম্পূর্ণ ঘটনা শুনে আমাদের মাননীয়া বলেন এসব হল তিল কে তাল করা। এটা উনি ঠিকই বুঝবেন কারন বিরোধী থাকা কালীন উনি তিল থেকে তাল বানিয়ে সে তালের বড়া বানিয়ে বানিয়ে সারাদিন রাইটার্সে ছুঁড়ে মারতেন তাই তাল দেখে তিল চিনে বার করায় ওনার প্রতিভা প্রশ্নাতীত। 

আপাতত উনি ওনার দুই সহচরী নিলীমা ও সফেদা (যাদেরকে ফালতু জনতা জুন আর লকেট বলে ডাকে)কে বলেছেন সব তিল বয়ামে তুলে রাখতে। প্রতিবছর হতভাগ্য কবি, গায়ক, নায়কদের নিয়মমাফিক তিলকাঞ্চনে সেগুলো ব্যবহার করা হবে।

সফেদি কি চমকার পুলিশ খোকারা এখন যাদবপুর, আনোয়ার শাহ, বাইপাস মোড়ে শান্ত হয়ে বসে লোক দেখছেন এবং ভাবছেন ফুটেজে কি রাণীমা আমাকে দেখতে পেলেন? দেখতে পেলে এক কুনকে "লাভের গুড়" তো বাঁধা...
পুঃ - কায়েতের পো এখন ক্যাম্পাসে ঝাঁট দিয়ে বাকি তিল কুড়িয়ে নিয়ে তা পিষিয়ে তেল বার করে দুবেলা রাণীর পায়ে মাখাচ্ছেন... মাঝে মাঝে হাত কেঁপে যাচ্ছে বটে তবে তা ভয়ে না ভক্তিতে তা ঠাকুর জানেন ।

#hokkolorob

বৃহষ্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

জে ইউ ভিসি ~ অমিতাভ প্রামাণিক

​খুকুর 'পরে রাগ করেছো,
ভাংলো বলে তেলের শিশি?
মেরুদন্ড ভাংছে দেখো
ধেড়েখোকা জে ইউ ভিসি,
তার বেলা?

_________________________________________

ভিসির ঘরে ছাত্র ছিল জনা ঊনিশ-কুড়ি।
ভিসি হাঁকেন, ওরে, আমার ল্যাজ গিয়েছে চুরি!
ল্যাজ হারানো? আজব কথা! তাও কি হয় সত্যি?
ল্যাজখানা তো তেমনি আছে, চুল-টুল সব ভত্তি।
সবাই তাঁরে বুঝিয়ে বলে, শুধরে দিয়ে ভুলকে,
আসছে রাণী, ল্যাজ নেড়ে তার চরণ দিও চুলকে ...


রেগে আগুন, তেলে বেগুন, তেড়ে বলেন ভিসি,
ল্যাজ হারালো আমার, তোরা ডাকিস নিরুপিসি!
লতানো পুঁইডাঁটার মত বাঁকানো রামধনু,
এমন ল্যাজ তো রাখতো জানি রামায়ণের হনু।
এ ল্যাজ যদি আমার বলিস, উড়াবো সব খুলি।
এই না বলে ক্যাম্পাসেতে ডেকে নিলেন পুলিশ।



__________________________________________

ছাত্রনিধন-যজ্ঞ চলে, কলকাঠি তার নাড়ছেটা কে?
কোন সাপে খায় দুধকলা সেই মধ্যরাতের বিছনা ফুঁড়ে?
পালিয়ে তোরা বাঁচবি কদিন, ঢিল মেরেছিস যে মৌচাকে -
রাস্তাগুলো সব চিনে রাখ, মিলবে দেখিস যাদবপুরে।

 

বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বলো বাবা বিশ্বকর্মা মাইকি জয়!! ~ শ্রুতি গোস্বামী

বাবা বিশ্বকর্মার পুজোর দিনে কিছু টুকরো টুকরো ঘটনার মন্তাজঃ

১। সকালে বাবার পুজোতে গলা ফাটিয়ে মাইক বাজিয়ে যে গান গুলি বাজছে তার কিছু নমুনাঃ "তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণ যাত্রা যেদিন যাবে","মা গো,ভাবনা কেন,আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে"(সকাল থেকে আমার ঘুমের অশান্তি ঘটিয়ে),"আমায় একটু জায়গা দাও মায়ের মন্দিরে বসি"( বাবার পুজোয় মায়ের গান এ উৎসাহ দেখে বুঝলাম এ রাজ্যে মায়ের আরাধনা এবং শ্লিলতাহানি দুটোই সমান উৎসাহে চলে)। সেই শ্লিলতাহানি ধামাচাপা দিতে ছাত্রদের লাঠি চার্জ করা হয়।পুলিশ এবং গুন্ডাদের আলাদা ট্রেনিং দেওয়া হয় কিভাবে মহিলাদের কে আরেস্ট করতে গেলে তাদের বুকে হাত দিয়ে টেনে হাতকড়া পড়াতে হয়।যাতে মায়ের শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলেরা শান্তি বজায় রাখতে পারে।

২। অফিসে সবাই বাবা কে হাত জোড় করে প্রার্থনা জানালো,৪৯% ডি এ টা এবারে দিয়েই দেওয়া হোক,আর পারা যাচ্ছে না।কেও কেও আবার এক কল এ টেন্ডার ম্যাচিওর করে দেওয়ার আর্জিও জানালো।

৩। আজকে রাজ্য মাতাল দিবসের নাম রাখার প্রচেষ্টার কোনো ত্রুটি দেখলাম না।বাড়ি ফেরার সময় গাড়িতে যেতে যেতে দেখলাম একটি লোক এইচ পি এল লিঙ্ক রোডের পাশে সাইকেল সমেত উলটে পড়ে আছে,এবং সেখানেই শুয়ে শুয়ে মোবাইলে কিসব মেসেজ পাঠাচ্ছে কাওকে।তার ওঠারও ক্ষমতা নেই।

৪। রাস্তার দু ধারে বাবার প্যান্ডেল খাঁ খাঁ করছে,সবাই বাবার নামে এ দু পেগ চড়াতে গেছে।

৫। একটি মাতাল পুরোহিত কে দুটি লোক মোটরসাইকেল এ মাঝখানে চেপে ধরে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও।তাদের বোধহয় তখনও পুজো হয়নি।মাল খেতে ব্যস্ত ছিল।

৬। বলো বাবা বিশ্বকর্মা মাইকি জয়!!

লড়াই চলবে ~ অবিন দত্তগুপ্ত

আজকে কিছুই হয়নি এমন ভাব দেখাতে অস্বস্তি হয় । অতএব লিখি ।

আজকের উপনির্বাচনের ফলাফল খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয় বোধহয়, এবং যা বোঝায় তা দক্ষিনপন্থার সংহত হওয়া এবং বাম্পন্থার পিছু হটা ছাড়া অন্য কিছু নয় । লাখ লাখ মানুষ সর্বস্বান্ত, সরকারি কর্মীরা ডি এ পাচ্ছেন না । পরিবহন শ্রমিকদের মাইনে নেই । কারখানা বন্ধ হচ্ছে , ছাত্র খুন হচ্ছে, মেয়েদের উপর নির্যাতন বাড়ছে , একের পর এক মন্ত্রি চোর প্রমাণিত, কিন্তু এ সব বিষয় ভোট হল না । হল, ধর্মীও বিভাজনের উপর ভিত্তি করে । অর্থাৎ দক্ষিনপন্থা তার পায়ের তলার মাটি শক্ত করল । এই হারটা, রাজনৈতিক । কিন্তু শ্রেণী রাজনীতির হার নয় । কেন ?

কারণ বহুদিন ধরে আমাদের রাজনীতির শ্রেণী অভিমুখটা ভুল । ভুল বলেই , প্রান্তিক মুসলমান চাষি এখনো, আগে মুসলমান ,পরে চাষি । আর ঠিক তাই , একজন চাষির মুসলমান সত্তা আক্রান্ত হওয়ায়, একটি হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলের আগ্রাসন আটকাতে, ক্ষমতাসীন লুম্পেনদের-ই বেছে নিতে বাধ্য হয় । উদবাস্তু আন্দোলনের পরিধির বাইরে যে উদবাস্তু মানুষ, তারা অন্য মানুষের আঁচ পায় না, তারা কেউ মৃত্যুঞ্জয় সেন হয় না, ধর্মীয় বিদ্বেষ বা ধরমগুরুর আইডেণ্টিটি তাদের কাছে মুখ্য পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় ।

অতএব আমাদের ঠিক করতে হবে , আমাদের মিছিলের মুখ কারা । আমাদের,মধ্যবিত্ত আমাদের,মধ্যবিত্ত বাম্পন্থি আমাদের বুঝতে হবে , ঠিক কোথায় আমাদের দাঁড়ানোর কথা । এইটাই সুযোগ, নিজের দিকে আঙুল তোলার । এবার সময় বাম্পন্থি শক্তিকে সংহত করার । শেষ কয় মাস, ট্যাক্সি শ্রমিকদের নিয়ে , উদবাস্তু মানুষকে নিয়ে , সব হারানো মানুষকে নিয়ে, সব হারিয়ে রাস্তায় থাকার রাজনীতি ঠিক।

নিও-লিবদের মুখে লাথি মেরে, এই রাস্তার রাজনীতি , ন্যাংটা ফকিরের রাজনীতি, লালনের রাজনীতি-ই আমাদের নীতির রাজা.. সর্বশ্রেষ্ঠ নীতি ।

লড়াই চলবে ...