ভগত সিং কে আজকের স্মরণ করার যে তাগিদ আছে সেটা বুঝতে গেলে একটু প্রেক্ষিত দরকার। তার পার্টির মতাদর্শ একটু জানা দরকার। পার্টির প্রথম দিকের একটি দলিল দিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে।
খুব পরিষ্কারভাবে ওই দলিল জানাচ্ছে যে, "রাজনীতির আঙিনায় বিপ্লবী পার্টির আশু লক্ষ হ'ল সংগঠিত ও সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে এক 'ফেডারেল রিপাবলিক অফ ইউনাইটেড স্টেটস অফ ইন্ডিয়া' গঠন করা। যখন ভারতের প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রূপায়ণ করার ক্ষমতা জন্মাবে তখনই কেবল ভারতের নতুন সংবিধান তৈরি ও ঘোষণা করা হবে। কিন্তু এই প্রজাতন্ত্রের বুনিয়াদি ভিত্তি হবে সার্বজনীন ভোটাধিকার এবং সেই সমস্ত ব্যবস্থার বিলোপ যা মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণকে সম্ভবপর করে যেমন রেলওয়ে ও যোগাযোগের অন্য মাধ্যমগুলি খনিসমূহ, ও বড় বড় শিল্প যেমন ইস্পাত কারখানা, জাহাজ কারখানা ইত্যাদির জাতীয়করণ করা হবে।" (সূত্রঃ ১)
সমাজতন্ত্রের নানান চেহারা এর আগে বা পরে ভারতবাসী দেখেছেন, শুনেছেন। এই দলিল প্রথমবার খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিল, ভারতের মাটিতে তা কেমন চেহারা নিতে পারে। সাম্প্রতিককালের বিলগ্নিকরণ ও বেসরকারিকরণ এর এই জামানায় প্রাসঙ্গিক।
স্বাধীন ভারতে গণতন্ত্রের চেহারাটা কেমন হবে সেই প্রসঙ্গে কেবলমাত্র সার্বজনীন ভোটাধিকার নয়, দলিল আরো এক পা এগিয়ে বললো যে "ওই প্রজাতন্ত্রে নির্বাচকমন্ডলী তথা ভোটারদের পূর্ন অধিকার থাকবে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রিকল করার বা ফিরিয়ে আনার কারণ সেটা বাদ দিয়ে গণতন্ত্র একটা তামাশায় পরিণত হবে।" (সূত্রঃ ১)
ততকালীন ভারতের মূলধারার অন্যান্য দলগুলি ও ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে হিংসা বনাম অহিংসার নীতিতে একটি সমালোচনা ছিল। সে সম্পর্কে জবাব দিতে গিয়ে ওই দলিল জানায় যে, "টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ এবং এনারকিজম বা নৈরাজ্যবাদ নিয়ে দু একটি কথা বলতে গেলে যা বলা যায় যে শব্দদুটি নিয়ে নষ্টামি চলছে। বিপ্লব প্রসঙ্গে কোনো কথা উঠলেই অবধারিত ভাবে শব্দদুটির অপপ্রয়োগ হচ্ছে কারণ ঐ দিয়ে বিপ্লবীদের বদনাম করা সুবিধাজনক।" (সূত্রঃ ১)
দলিল একেবারে দ্বিধাহীন ভাবে জানালো যে, "ভারতীয় বিপ্লবীরা সন্ত্রাসবাদী নয়, নৈরাজ্যবাদীও নয়। তারা (অর্থাৎ হিন্দুস্তান রিপাবলিকানরা) দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে চলে না সেজন্য তাদের নৈরাজ্যবাদী বলা চলে না। সন্ত্রাসবাদও কোনোকালে তাদের লক্ষ্য নয় তাই তাদের সন্ত্রাসবাদীও আখ্যা দেওয়া যায় না। তারা কখনোই বিশ্বাস করে না যে সন্ত্রাসবাদ একাই কেবল স্বাধীনতা এনে দিতে পারে এবং স্রেফ সন্ত্রাসবাদের জন্যই সন্ত্রাসবাদ, এই নীতি চায় না যদিও প্রত্যাঘাত হানার জন্য মাঝে মধ্যে এই ফলদায়ক পদ্ধতি তাদের অবলম্বন করতে হয়।" (সূত্রঃ ১)
তৎকালীন ভারতের আর পাঁচটা দল/গোষ্ঠী যারা সশস্ত্র সহিংস স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িত ছিল তাদের সাথে তফাৎটা আরো স্পষ্ট হয়ে যায় হিন্দুস্তান রিপাবলিকানদের দলিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে নজর দিলেই। তা'হল, ইউরোপের প্রধানধারার বামপন্থীদলগুলির ঢঙে আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতি গ্রহণ। দলিল বলছে, "বিপ্লবী পার্টি কেবলমাত্র জাতীয় নয়, প্রকৃতিগতভাবে আন্তর্জাতিক কারণ তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের বিবিধ স্বার্থ্যরক্ষার প্রতি সম্মান জানানোর মাধ্যমে বিশ্বে ঐকতান স্থাপন করা।" (সূত্রঃ ১)
ভগত সিংকে বোঝার জন্য, তিনি যে দলের সদস্য, সক্রিয় কর্মী ও নেতা ছিলেন সেই দলের মতাদর্শগত অবস্থান নিয়ে সামান্য আলোচনা করা হ'ল। এবার সরাসরি তাঁর কাজকর্মের দিকে চোখ ফেরানো যাক। তাঁর সক্রিয় বিপ্লবী কাজ যেমন বোমা নিক্ষেপ স্যান্ডার্স হত্যা ইত্যাদি বহুল প্রচারিত কাজকর্ম বাদ দিয়ে তাঁর অন্য দু একটি কম আলোচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবদান সামনে আসা প্রয়োজন।
যে সময়টা ভগত সিং সক্রিয় রাজনীতিতে আসছেন সেই সময়ে ভারতের নানান ঘটনার মধ্যে অন্যতম হ'ল সাম্প্রদায়িক হিংসা, দাঙ্গা। পার্টি দলিলে বিষয়টিকে এইভাবে রাখা হয়েছিল, "কমুনাল কোশ্চেন বিষয়ে বিপ্লবী পার্টি মনস্থির করেছে যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সমস্ত অধিকার মেনে নেওয়া হবে যেমনটা তারা দাবি জানাবে এই শর্ত সাপেক্ষে যে সেগুলি অন্য সম্প্রদায়ের স্বার্থের সাথে সংঘাত ঘটাবে না এবং শেষ পর্যন্ত অদূর ভবিষ্যতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে জীবন্ত জৈবিক এক মিলন ঘটাবে।" (সূত্রঃ ১)
পার্টি কর্মসূচির এই ধারাকে মাথায় রেখে আরো একধাপ এগিয়ে গেলেন ভগত সিং। পার্টি মুখপত্রে প্রবন্ধে লিখলেন, "আমরা যদি এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলির মূল শেকড় খুঁজতে যাই, দেখবো কারণ হ'ল অর্থনৈতিক। যে যাই করুক না কেন, পেট ভরানোর প্রশ্নটা সবকিছুরই তলদেশে থাকে। কার্ল মার্ক্স এর তিনটি প্রধান প্রবচনের মধ্যে এটি একটি। এই প্রবচনের জন্যই তগলিব, তানজিম, শুদ্ধি (হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক প্র্যাকটিস) জাতীয় অভ্যাস গুলি শুরু হয়েছে এবং যার ফলে আমরা এই নিদারুণ অবস্থায় পৌঁছেছি।" (সূত্রঃ ২)
একথা আমরা যদি মনে রাখি যে কার্ল মার্ক্স কে উদ্ধৃত করে প্রবন্ধ রচয়িতা এই তরুণ ভারতীয় বিপ্লবীর বয়েস তখন মাত্র ১৯ বছর, তাহলে আমাদের বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। তরুণ বিপ্লবী আরো লিখছেন, "জনগণকে একে অন্যের বিরুদ্ধে মারপিট করা থেকে বিরত থাকার জন্য জরুরি হ'ল শ্রেণী সচেতনতা। গরিব চাষি-মজুরদের একথা পরিষ্কারভাবে বোঝাতে হবে যে তাদের প্রকৃত শত্রু হ'ল পুঁজিপতিরা, যাতে তারা তাদের (পুঁজিপতিদের) পাতা ফাঁদে পা না দেয়। এটা আপনার স্বার্থ যে ধর্ম, বর্ণ, জাত পাত, জাতীয়তার নামে সবধরনের বিভেদ-বৈষম্য দূর হয় এবং রাষ্ট্রক্ষমতা আপনার হাতে আসে। এই সব প্রচেষ্টা কোনোভাবেই আপনার কোনো ক্ষতি করবে না বরঞ্চ একদিন আপনার শৃঙ্খল ছিন্ন করবে, আপনাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এনে দেবে " (সূত্রঃ ২)
ওপরের লেখা থেকে স্পষ্ট যে মার্ক্সবাদের প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই ওই তরুন বিপ্লবী হয়ে উঠছেন মার্ক্সবাদী। "মার্ক্সিস্ট ইন আ মেকিং"। তাই প্রায় একলব্যের ঢঙে প্রশিক্ষিত কেমন অনায়াসে ভারতের মাটিতে প্রয়োগ করলেন সেই বিশ্ববিক্ষার তত্ত্ব।
পরের আরেকটি প্রবন্ধে চোখ বলাবো আমরা। পিকরিক এসিড বা নাইট্রো গ্লিসারিনের বিভিন্ন উপাদান নিপুণভাবে মিশিয়ে ট্রেজারি বেঞ্চ এর দিকে ছুঁড়ে দেওয়ার অসীম সাহসী কাজের চেয়ে কোনো অংশে কম সাহসী নয় সেই ভারতের অবিসংবাদী নেতার হরিজন তত্ত্বের ওপর ছোঁড়া তার এই বোমা। তরুণ বিপ্লবী কলম ধরলেন ভারতের আরেকটি সমস্যা নিয়ে যেটি এতই একান্ত ভাবে ভারতীয় যে ধ্রুপদী মার্ক্সবাদী রচনা ঘেঁটেও এর সমাধান পাওয়া দুষ্কর। ভারতের জাতপাতের সমস্যা।
তরুণ বিপ্লবী লিখছেন, "কর্কশ সত্যি এটাই যে তোমরা (হিন্দুরা) তাদের (দলিতদের) সাথে গরুছাগলের চেয়েও খারাপ ব্যবহার করে থাকো, তারা তাই তোমাদের ত্যাগ করে অন্য ধর্মের আশ্রয় নেবে যেখানে তারা আশা করে যে একটু বেশি অধিকার উপভোগ করতে পারবে, সহ নাগরিকের মতো বাঁচতে পারবে।" (সূত্রঃ ৩)।
প্রকৃত শ্রেণী চেতনা সম্পন্ন বিপ্লবীর মতোই ভগত সিং দলিতদের নিজের সমস্যা নিজেই সমাধান করার আহ্বান জানালেন, "যারা মুক্ত হয়ে যাবেন, তারাই প্রথম আঘাতটা হানবেন। মনে রাখতে হবে যে সুবিধাভোগী শ্রেণীর প্রত্যেকে নিজের নিজের অধিকারগুলিকে উপভোগ করার জন্য বাঁচিয়ে রাখতে চায়, দলিত শ্রেণীকে নিপীড়ন করে তাকে তার জুতোর তলায় চেপে রাখতে চায়। সেজন্য আর সময় নষ্ট করো না, নিজের পায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়ানোর জন্য একজোট হও আর সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করো। তারপরে দেখই না কে তোমাদের প্রাপ্য টুকু দিতে অস্বীকার করার মতো আস্পর্ধা দেখায়"। (সূত্রঃ ৩)
আর পাঁচজন নিছক আগুনখেকো নেতার মতো কথার ফুলঝুড়ি নয়, ভগত সিং এর মননশীলতার পরিচয় তার আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণী ক্ষমতায়। তিনি লিখলেন, " কারুর দয়ার ওপর নির্ভরশীল থেকো না, ওদের সম্বন্ধে কোনো মায়া যেন না থাকে। সতর্ক থাকো যাতে আমলাতন্ত্রের ফাঁদে পড়তে না হয় কারণ তোমার মিত্রপক্ষ হওয়াতো দূরের কথা ওরা ওদের সুরতালে তোমাকে নাচতে বাধ্য করবে। এই পুঁজিবাদী-আমলাতন্ত্রের গাঁটছড়া তোমার শোষণ-বঞ্চনার মূলে। সেজন্য ওদের পরিত্যাগ করো। তুমি হচ্ছ প্রকৃত খেটে-খাওয়া শ্রেণী, ওয়ার্কিং ক্লাস। শ্রমজীবিরা এক হও - শৃঙ্খল ছাড়া তোমাদের হারাবার কিছু নেই।" (সূত্রঃ ৩)
অতীব পরিচিত একটি আন্তর্জাতিক স্লোগানকে ভারতের মাটিতে ভারতীয় সমস্যার মোকাবিলায় ব্যবহার করছেন একজন বিপ্লবী যার বয়েস মাত্র কুড়ি তখন। তিনি ডাক দিচ্ছেন, "সামাজিক বিক্ষোভ-আন্দোলন থেকে বিপ্লব শুরু করুন আর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিপ্লবের জন্য কোমড়বন্ধটা কষে আঁটুন। আপনারা, কেবল আপনারাই হলেন জাতির পিলার, স্তম্ভ, তার অন্তর্লীন শক্তি। ঘুমন্ত সিংহের দল জাগ্রত হন, বিদ্রোহের পতাকা ঊর্ধে তুলে ধরুন।" (সূত্রঃ ৩)
কেবল মুখপত্র প্রচার পুস্তিকায় মাস এপিল সম্পন্ন লেখা নয়, জেলের ভেতর থেকে কলম ধরছেন ফাঁসির আসামি এই বিপ্লবী। মর্ডান রিভিউ এর এডিটর যখন তাঁর বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে ন্যারেটিভ নামাচ্ছেন তখন ঝলসে উঠছে ২১ বছরের তরুণের কলম। প্রতিবাদ পত্রে লিখছেন, "আমরা ওই স্লোগানের (ইনকিলাব জিন্দাবাদ) উদ্গাতা নই। ওই আওয়াজ রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলনে উঠেছিল। (সূত্রঃ ৪)
প্রিভিলেজড ক্লাসের প্রতিভূ ওই পোষা বুদ্ধিজীবীর মননশীলতার মুখোশ খুলে দিয়ে বিপ্লবী উদ্দিপনার মর্মস্পর্শী বয়ান আনছেন ভগত সিং, "এই ধরণের প্রতিটি চিৎকৃত ঘোষণার একটি সাধারণ বোধকে চিহ্নিত করে যার কিছুটা অর্জিত বাকিটা সহজাত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যখন স্লোগান দিই "যতীন দাস অমর রহে" তখন তার মানে এই নয় বা আমরা বোঝাতে চাই না যে যতীন দাস শারীরিকভাবে জীবন্ত থাকবেন। তার মানে এই যে যতীন দাসের জীবনের মহান আদর্শ, তার সেই অদম্য প্রাণশক্তি যা তাকে অকথ্য যন্ত্রণা ও চূড়ান্ত আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে গিয়ে মহান শহীদ হতে সাহায্য করেছিল আমরা যেন সেই সাহস দেখাতে পারি আমাদের আদর্শের জন্য।" (সূত্রঃ ৪)
বহু বছর আগে যে সাবধানবানী রচিত হয়েছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক কি না সে বিচারের ভার পাঠক-পাঠিকার ওপরে, "প্রলেতারিয়েত এর আশা ভরসা এখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে সমাজতন্ত্রের ওপরে কেবল যা পারে সমস্ত সামাজিক বৈষম্য মুছে এক স্বাধীন, সম্পুর্ন স্বাধীন ভারত স্থাপনা করতে।" (সূত্রঃ ৫)
ফাঁসির মঞ্চ থেকে দু'পা দূরে দাঁড়িয়েও একজন বিপ্লবীর ভুল হয় না আরেকজন বিপ্লবীকে চিনতে। ভগত সিং টেলিগ্রাম পাঠাচ্ছেন, "আজ লেনিন দিবসে আমরা তাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি যারা মহান লেনিনের আরব্ধ কাজগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট। রাশিয়াতে যে মহান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, আমরা তার সাফল্য কামনা করছি। আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী শ্রেণীর মুক্তি সংগ্রামের ধ্বনিতে আমরা আমাদের আওয়াজ মেলাচ্ছি। প্রলেটারিয়েতদের জয় অনিবার্য। পুঁজিবাদ পরাজিত হবে। সাম্রাজ্যবাদ খতম।" (সূত্রঃ ৬)
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আর তাদের দেশীয় দোসররা ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছিল এই বিপ্লবীকে কারণ ওরা ভয় পেয়েছিল যে একে বাঁচিয়ে রাখলে ভারতে বিপ্লব হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না। আমরা পেয়েও পাইনি আমাদের লেনিনকে। কে বলতে পারে, বেঁচে থাকলে হয়তো আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতেন একজন ভারতীয় যার নাম বিশ্বের মুক্তিকামী জনতা লেনিনের মতো একই রকম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতেন।
এই লেখাটি শেষ করা যাক ভগত সিং এর পুস্তক প্রেম নিয়ে। উনি বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। স্কুলছাত্র থাকা অবস্থায় (১৯১৩-২১) প্রায় পঞ্চাশখানা, ও পরে কলেজের সময় প্রায় ২০০ খানা বই শেষ করেছিলেন। ৮ই এপ্রিল, ১৯২৯ থেকে ২৩শে মার্চ, ১৯৩১, কারাবাসের এই দিনগুলোতে তার পঠিত বইয়ের সংখ্যা আনুমানিক ৩০০ হবে। মন্মথনাথ গুপ্তা তার স্মৃতিচারণে ভগত সিং এর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো স্মরণ করতে গিয়ে বলেছেন, "জল্লাদ রা যখন এসে ওনাকে বলে, এবার ফাঁসিকাঠে ওঠার সময় হয়ে গেছে, তখন ভগত সিং তার সেলে একটি বইয়ে তন্ময় হয়েছিলেন। ওদের বলেন, "একটু দাঁড়িয়ে যাও। দেখছো না, একজন বিপ্লবী আরেকজন বিপ্লবীর সাথে কথা বলছে।" [সূত্র ৭]
তার কথায় ব্রিটিশ জল্লাদ বাহিনী সত্যিই থমকে দাঁড়িয়ে যায়। ভগত সিং বইয়ের পাতাটা শেষ করে বইটা মুড়ে বন্ধ করে এগিয়ে যান ফাঁসিকাঠের দিকে, দৃপ্ত পায়ে। কী অদ্ভুত মানুষ !
যে বইটা ভগত সিং আর কোনদিনই শেষ করে যেতে পারেন নি সেই বইটার লেখিকার নাম ছিল ক্লারা জেটকিন। জার্মান প্রবাদপ্রতিম কম্যুনিস্ট নেত্রী। আর বইটার নাম ছিল, "রেমিনিসেন্সস অফ লেনিন", লেনিনের স্মৃতিচারণ। এক বিপ্লবীর সাথে আরেক বিপ্লবীর কথোপকথন অসমাপ্তই থেকে গেল চিরকালের মতো।
আজ শহীদ দিবস। ভগত সিং অমর রহে। শহীদ ভগত সিং আমাদের অধরা স্বপ্নের ভারতীয় নায়ক। শহীদ তোমায় লাল সেলাম।
তথ্যসূত্রঃ
(১) বিজয় কুমার (রামপ্রসাদ বিসমিল এর ছদ্মনাম) স্বাক্ষরিত দি রেভলিউশনারী নামের চার পাতার দলিল, সেন্ট্রাল কাউন্সিল, রিপাবলিক পার্টি, ১৯২৭
(২) ধর্মভর ফাসাদ তে উনহা দে ইলাজ (ধর্ম ভিত্তিক দাঙ্গা ও তার সমাধান), ভগত সিং, কীর্তি পত্রিকা, জুন, ১৯২৭ সংখ্যা
(৩) অচ্ছুৎ কা সওয়াল (অচ্ছুৎ বিষয়ক পরিপ্রশ্ন), কীর্তি পত্রিকা, জুন, ১৯২৮ সংখ্যা
(৪) মর্ডান রিভিউ এই সম্পাদককে লিখিত পত্র , ২৪শে ডিসেম্বর, ১৯২৯
(৫) হিন্দুস্তান সোসালিস্ট রিপাবলিকান এসোসিয়েশন এর ইশতেহার, ১৯২৯ এর লাহোর কংগ্রেস অধিবেশনে প্রচারিত
(৬) ২১শে জানুয়ারি, ১৯৩০ কোর্ট থেকে পাঠানো ভগত সিং এর টেলিগ্রাম, শহীদভগতসিং.অর্গ
(৭) বাইয়োগ্রাফি অফ ভগৎ সিং, এম এম জুনেজা, মর্ডান পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ১৩২