রবিবার, ২৩ মার্চ, ২০২৫

এক বিপ্লবীর সাথে আরেক বিপ্লবীর অসমাপ্ত কথপোকথন ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত



ভগত সিং কে আজকের স্মরণ করার যে তাগিদ আছে সেটা বুঝতে গেলে একটু প্রেক্ষিত দরকার। তার পার্টির মতাদর্শ একটু জানা দরকার। পার্টির প্রথম দিকের একটি দলিল দিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে।

খুব পরিষ্কারভাবে ওই দলিল জানাচ্ছে যে, "রাজনীতির আঙিনায় বিপ্লবী পার্টির আশু লক্ষ হ'ল সংগঠিত ও সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে এক 'ফেডারেল রিপাবলিক অফ ইউনাইটেড স্টেটস অফ ইন্ডিয়া' গঠন করা। যখন ভারতের প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রূপায়ণ করার ক্ষমতা জন্মাবে তখনই কেবল ভারতের নতুন সংবিধান তৈরি ও ঘোষণা করা হবে। কিন্তু এই প্রজাতন্ত্রের বুনিয়াদি ভিত্তি হবে সার্বজনীন ভোটাধিকার এবং সেই সমস্ত ব্যবস্থার বিলোপ যা মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণকে সম্ভবপর করে যেমন রেলওয়ে ও যোগাযোগের অন্য মাধ্যমগুলি খনিসমূহ, ও বড় বড় শিল্প যেমন ইস্পাত কারখানা, জাহাজ কারখানা ইত্যাদির জাতীয়করণ করা হবে।" (সূত্রঃ ১)

সমাজতন্ত্রের নানান চেহারা এর আগে বা পরে ভারতবাসী দেখেছেন, শুনেছেন। এই দলিল প্রথমবার খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিল, ভারতের মাটিতে তা কেমন চেহারা নিতে পারে। সাম্প্রতিককালের বিলগ্নিকরণ ও বেসরকারিকরণ এর এই জামানায় প্রাসঙ্গিক। 

স্বাধীন ভারতে গণতন্ত্রের চেহারাটা কেমন হবে সেই প্রসঙ্গে কেবলমাত্র সার্বজনীন ভোটাধিকার নয়, দলিল আরো এক পা এগিয়ে বললো যে "ওই প্রজাতন্ত্রে নির্বাচকমন্ডলী তথা ভোটারদের পূর্ন অধিকার থাকবে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রিকল করার বা ফিরিয়ে আনার কারণ সেটা বাদ দিয়ে গণতন্ত্র একটা তামাশায় পরিণত হবে।" (সূত্রঃ ১)

ততকালীন ভারতের মূলধারার অন্যান্য দলগুলি ও ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে হিংসা বনাম অহিংসার নীতিতে একটি সমালোচনা ছিল। সে সম্পর্কে জবাব দিতে গিয়ে ওই দলিল জানায় যে, "টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ এবং এনারকিজম বা নৈরাজ্যবাদ নিয়ে দু একটি কথা বলতে গেলে যা বলা যায় যে শব্দদুটি নিয়ে নষ্টামি চলছে। বিপ্লব প্রসঙ্গে কোনো কথা উঠলেই অবধারিত ভাবে শব্দদুটির অপপ্রয়োগ হচ্ছে কারণ ঐ দিয়ে বিপ্লবীদের বদনাম করা সুবিধাজনক।" (সূত্রঃ ১)

দলিল একেবারে দ্বিধাহীন ভাবে জানালো যে, "ভারতীয় বিপ্লবীরা  সন্ত্রাসবাদী নয়, নৈরাজ্যবাদীও নয়। তারা (অর্থাৎ হিন্দুস্তান রিপাবলিকানরা) দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে চলে না সেজন্য তাদের নৈরাজ্যবাদী বলা চলে না। সন্ত্রাসবাদও কোনোকালে তাদের লক্ষ্য নয় তাই তাদের সন্ত্রাসবাদীও আখ্যা দেওয়া যায় না। তারা কখনোই বিশ্বাস করে না যে সন্ত্রাসবাদ একাই কেবল স্বাধীনতা এনে দিতে পারে এবং স্রেফ সন্ত্রাসবাদের জন্যই সন্ত্রাসবাদ, এই নীতি চায় না যদিও প্রত্যাঘাত হানার জন্য মাঝে মধ্যে এই ফলদায়ক পদ্ধতি তাদের অবলম্বন করতে হয়।" (সূত্রঃ ১) 

তৎকালীন ভারতের আর পাঁচটা দল/গোষ্ঠী যারা সশস্ত্র সহিংস স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িত ছিল তাদের সাথে তফাৎটা আরো স্পষ্ট হয়ে যায় হিন্দুস্তান রিপাবলিকানদের দলিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে নজর দিলেই। তা'হল, ইউরোপের প্রধানধারার বামপন্থীদলগুলির ঢঙে আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতি গ্রহণ। দলিল বলছে, "বিপ্লবী পার্টি কেবলমাত্র জাতীয় নয়, প্রকৃতিগতভাবে আন্তর্জাতিক কারণ তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের বিবিধ স্বার্থ্যরক্ষার প্রতি সম্মান জানানোর মাধ্যমে বিশ্বে ঐকতান স্থাপন করা।" (সূত্রঃ ১)

ভগত সিংকে বোঝার জন্য, তিনি যে দলের সদস্য, সক্রিয় কর্মী ও নেতা ছিলেন সেই দলের মতাদর্শগত অবস্থান নিয়ে সামান্য আলোচনা করা হ'ল। এবার সরাসরি তাঁর কাজকর্মের দিকে চোখ ফেরানো যাক। তাঁর সক্রিয় বিপ্লবী কাজ যেমন বোমা নিক্ষেপ স্যান্ডার্স হত্যা ইত্যাদি বহুল প্রচারিত কাজকর্ম বাদ দিয়ে তাঁর অন্য দু একটি কম আলোচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবদান সামনে আসা প্রয়োজন।

যে সময়টা ভগত সিং সক্রিয় রাজনীতিতে আসছেন সেই সময়ে ভারতের নানান ঘটনার মধ্যে অন্যতম হ'ল সাম্প্রদায়িক হিংসা, দাঙ্গা। পার্টি দলিলে বিষয়টিকে এইভাবে রাখা হয়েছিল, "কমুনাল কোশ্চেন বিষয়ে বিপ্লবী পার্টি মনস্থির করেছে যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সমস্ত  অধিকার মেনে নেওয়া হবে যেমনটা তারা দাবি জানাবে এই শর্ত সাপেক্ষে যে সেগুলি অন্য সম্প্রদায়ের স্বার্থের সাথে সংঘাত ঘটাবে না এবং শেষ পর্যন্ত অদূর ভবিষ্যতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে জীবন্ত জৈবিক এক মিলন ঘটাবে।" (সূত্রঃ ১)

পার্টি কর্মসূচির এই ধারাকে মাথায় রেখে আরো একধাপ এগিয়ে গেলেন ভগত সিং। পার্টি মুখপত্রে প্রবন্ধে লিখলেন, "আমরা যদি এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলির মূল শেকড় খুঁজতে যাই, দেখবো কারণ হ'ল অর্থনৈতিক। যে যাই করুক না কেন, পেট ভরানোর প্রশ্নটা সবকিছুরই তলদেশে থাকে। কার্ল মার্ক্স এর তিনটি প্রধান প্রবচনের মধ্যে এটি একটি। এই প্রবচনের জন্যই তগলিব, তানজিম, শুদ্ধি (হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক প্র্যাকটিস) জাতীয় অভ্যাস গুলি শুরু হয়েছে এবং যার ফলে আমরা এই নিদারুণ অবস্থায় পৌঁছেছি।" (সূত্রঃ ২)

একথা আমরা যদি মনে রাখি যে কার্ল মার্ক্স কে উদ্ধৃত করে প্রবন্ধ রচয়িতা এই তরুণ ভারতীয় বিপ্লবীর বয়েস তখন মাত্র ১৯ বছর, তাহলে আমাদের বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। তরুণ বিপ্লবী আরো লিখছেন, "জনগণকে একে অন্যের বিরুদ্ধে মারপিট করা থেকে বিরত থাকার জন্য জরুরি হ'ল শ্রেণী সচেতনতা। গরিব চাষি-মজুরদের একথা পরিষ্কারভাবে বোঝাতে হবে যে তাদের প্রকৃত শত্রু হ'ল পুঁজিপতিরা, যাতে তারা তাদের (পুঁজিপতিদের) পাতা ফাঁদে পা না দেয়। এটা আপনার স্বার্থ যে ধর্ম, বর্ণ, জাত পাত, জাতীয়তার নামে সবধরনের বিভেদ-বৈষম্য দূর হয় এবং রাষ্ট্রক্ষমতা আপনার হাতে আসে। এই সব প্রচেষ্টা কোনোভাবেই আপনার কোনো ক্ষতি করবে না বরঞ্চ একদিন আপনার শৃঙ্খল  ছিন্ন করবে, আপনাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এনে দেবে " (সূত্রঃ ২)

ওপরের লেখা থেকে স্পষ্ট যে মার্ক্সবাদের প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই ওই তরুন বিপ্লবী হয়ে উঠছেন মার্ক্সবাদী। "মার্ক্সিস্ট ইন আ মেকিং"। তাই প্রায় একলব্যের ঢঙে প্রশিক্ষিত কেমন অনায়াসে ভারতের মাটিতে প্রয়োগ করলেন সেই বিশ্ববিক্ষার তত্ত্ব।

পরের আরেকটি প্রবন্ধে চোখ বলাবো আমরা। পিকরিক এসিড বা নাইট্রো গ্লিসারিনের বিভিন্ন উপাদান নিপুণভাবে মিশিয়ে ট্রেজারি বেঞ্চ এর দিকে ছুঁড়ে দেওয়ার অসীম সাহসী কাজের চেয়ে কোনো অংশে কম সাহসী নয় সেই ভারতের অবিসংবাদী নেতার হরিজন তত্ত্বের ওপর ছোঁড়া তার এই বোমা। তরুণ বিপ্লবী কলম ধরলেন ভারতের আরেকটি সমস্যা নিয়ে যেটি এতই একান্ত ভাবে ভারতীয় যে ধ্রুপদী মার্ক্সবাদী রচনা ঘেঁটেও এর সমাধান পাওয়া দুষ্কর। ভারতের জাতপাতের সমস্যা।

তরুণ বিপ্লবী লিখছেন, "কর্কশ সত্যি এটাই যে তোমরা (হিন্দুরা) তাদের (দলিতদের) সাথে গরুছাগলের চেয়েও খারাপ ব্যবহার করে থাকো, তারা তাই তোমাদের ত্যাগ করে অন্য ধর্মের আশ্রয় নেবে যেখানে তারা আশা করে যে একটু বেশি অধিকার উপভোগ করতে পারবে, সহ নাগরিকের মতো বাঁচতে পারবে।" (সূত্রঃ ৩)।

প্রকৃত শ্রেণী চেতনা সম্পন্ন বিপ্লবীর মতোই ভগত সিং দলিতদের নিজের সমস্যা নিজেই সমাধান করার আহ্বান জানালেন, "যারা মুক্ত হয়ে যাবেন, তারাই প্রথম আঘাতটা হানবেন।  মনে রাখতে হবে যে সুবিধাভোগী শ্রেণীর প্রত্যেকে নিজের নিজের অধিকারগুলিকে উপভোগ করার জন্য বাঁচিয়ে রাখতে চায়, দলিত শ্রেণীকে নিপীড়ন করে তাকে তার জুতোর তলায় চেপে রাখতে চায়। সেজন্য আর সময় নষ্ট করো না, নিজের পায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়ানোর জন্য একজোট হও আর সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করো। তারপরে দেখই না কে তোমাদের প্রাপ্য টুকু দিতে অস্বীকার করার মতো আস্পর্ধা দেখায়"। (সূত্রঃ ৩)

আর পাঁচজন নিছক আগুনখেকো নেতার মতো কথার ফুলঝুড়ি নয়, ভগত সিং এর মননশীলতার পরিচয় তার আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণী ক্ষমতায়। তিনি লিখলেন, " কারুর দয়ার ওপর নির্ভরশীল থেকো না, ওদের সম্বন্ধে কোনো মায়া যেন না থাকে। সতর্ক থাকো যাতে আমলাতন্ত্রের ফাঁদে পড়তে না হয় কারণ তোমার মিত্রপক্ষ হওয়াতো দূরের কথা ওরা ওদের সুরতালে তোমাকে নাচতে বাধ্য করবে। এই পুঁজিবাদী-আমলাতন্ত্রের গাঁটছড়া তোমার শোষণ-বঞ্চনার মূলে। সেজন্য ওদের পরিত্যাগ করো। তুমি হচ্ছ প্রকৃত খেটে-খাওয়া শ্রেণী, ওয়ার্কিং ক্লাস। শ্রমজীবিরা এক হও - শৃঙ্খল ছাড়া তোমাদের হারাবার কিছু নেই।" (সূত্রঃ ৩)
 
অতীব পরিচিত একটি আন্তর্জাতিক স্লোগানকে ভারতের মাটিতে ভারতীয় সমস্যার মোকাবিলায় ব্যবহার করছেন একজন বিপ্লবী যার বয়েস মাত্র কুড়ি তখন। তিনি ডাক দিচ্ছেন, "সামাজিক বিক্ষোভ-আন্দোলন থেকে বিপ্লব শুরু করুন আর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিপ্লবের জন্য কোমড়বন্ধটা কষে আঁটুন। আপনারা, কেবল আপনারাই হলেন জাতির পিলার, স্তম্ভ, তার অন্তর্লীন শক্তি। ঘুমন্ত সিংহের দল জাগ্রত হন, বিদ্রোহের পতাকা ঊর্ধে তুলে ধরুন।" (সূত্রঃ ৩)
 
কেবল মুখপত্র প্রচার পুস্তিকায় মাস এপিল সম্পন্ন লেখা নয়, জেলের ভেতর থেকে কলম ধরছেন ফাঁসির আসামি এই বিপ্লবী। মর্ডান রিভিউ এর এডিটর যখন তাঁর বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে ন্যারেটিভ নামাচ্ছেন তখন ঝলসে উঠছে ২১ বছরের তরুণের কলম। প্রতিবাদ পত্রে লিখছেন, "আমরা ওই স্লোগানের (ইনকিলাব জিন্দাবাদ) উদ্গাতা নই।  ওই আওয়াজ রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলনে উঠেছিল।  (সূত্রঃ ৪)

প্রিভিলেজড ক্লাসের প্রতিভূ ওই পোষা বুদ্ধিজীবীর মননশীলতার মুখোশ খুলে দিয়ে বিপ্লবী উদ্দিপনার মর্মস্পর্শী বয়ান আনছেন ভগত সিং, "এই ধরণের প্রতিটি চিৎকৃত ঘোষণার একটি সাধারণ বোধকে চিহ্নিত করে যার কিছুটা অর্জিত বাকিটা সহজাত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যখন স্লোগান দিই "যতীন দাস অমর রহে" তখন তার মানে এই নয় বা আমরা বোঝাতে চাই না যে যতীন দাস শারীরিকভাবে জীবন্ত থাকবেন। তার মানে এই যে যতীন দাসের জীবনের মহান আদর্শ, তার সেই অদম্য প্রাণশক্তি যা তাকে অকথ্য যন্ত্রণা ও চূড়ান্ত আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে গিয়ে মহান শহীদ হতে সাহায্য করেছিল আমরা যেন সেই সাহস দেখাতে পারি আমাদের আদর্শের জন্য।" (সূত্রঃ ৪)

বহু বছর আগে যে সাবধানবানী রচিত হয়েছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক কি না সে বিচারের ভার পাঠক-পাঠিকার ওপরে, "প্রলেতারিয়েত এর আশা ভরসা এখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে সমাজতন্ত্রের ওপরে কেবল যা পারে সমস্ত সামাজিক বৈষম্য মুছে এক স্বাধীন, সম্পুর্ন স্বাধীন ভারত স্থাপনা করতে।" (সূত্রঃ ৫)

ফাঁসির মঞ্চ থেকে দু'পা দূরে দাঁড়িয়েও একজন বিপ্লবীর ভুল হয় না আরেকজন বিপ্লবীকে চিনতে। ভগত সিং টেলিগ্রাম পাঠাচ্ছেন, "আজ লেনিন দিবসে আমরা তাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি যারা মহান লেনিনের আরব্ধ কাজগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট। রাশিয়াতে যে মহান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, আমরা তার সাফল্য কামনা করছি। আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী শ্রেণীর মুক্তি সংগ্রামের ধ্বনিতে আমরা আমাদের আওয়াজ মেলাচ্ছি। প্রলেটারিয়েতদের জয় অনিবার্য। পুঁজিবাদ পরাজিত হবে। সাম্রাজ্যবাদ খতম।" (সূত্রঃ ৬)

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আর তাদের দেশীয় দোসররা ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছিল এই বিপ্লবীকে কারণ ওরা ভয় পেয়েছিল যে একে বাঁচিয়ে রাখলে ভারতে বিপ্লব হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না। আমরা পেয়েও পাইনি আমাদের লেনিনকে। কে বলতে পারে, বেঁচে থাকলে হয়তো আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতেন একজন ভারতীয় যার নাম বিশ্বের মুক্তিকামী জনতা লেনিনের মতো একই রকম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতেন।  

এই লেখাটি শেষ করা যাক ভগত সিং এর পুস্তক প্রেম নিয়ে। উনি বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। স্কুলছাত্র থাকা অবস্থায় (১৯১৩-২১) প্রায় পঞ্চাশখানা, ও পরে কলেজের সময় প্রায় ২০০ খানা বই শেষ করেছিলেন। ৮ই এপ্রিল, ১৯২৯ থেকে ২৩শে মার্চ, ১৯৩১, কারাবাসের এই দিনগুলোতে তার পঠিত বইয়ের সংখ্যা আনুমানিক ৩০০ হবে।  মন্মথনাথ গুপ্তা তার স্মৃতিচারণে ভগত সিং এর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো স্মরণ করতে গিয়ে বলেছেন, "জল্লাদ রা যখন এসে ওনাকে বলে, এবার ফাঁসিকাঠে ওঠার সময় হয়ে গেছে, তখন ভগত সিং তার সেলে একটি বইয়ে তন্ময় হয়েছিলেন। ওদের বলেন, "একটু দাঁড়িয়ে যাও। দেখছো না, একজন বিপ্লবী আরেকজন বিপ্লবীর সাথে কথা বলছে।" [সূত্র ৭]

তার কথায় ব্রিটিশ জল্লাদ বাহিনী সত্যিই থমকে দাঁড়িয়ে যায়। ভগত সিং বইয়ের পাতাটা শেষ করে বইটা মুড়ে বন্ধ করে এগিয়ে যান ফাঁসিকাঠের দিকে, দৃপ্ত পায়ে। কী অদ্ভুত মানুষ !

যে বইটা ভগত সিং আর কোনদিনই শেষ করে যেতে পারেন নি সেই বইটার লেখিকার নাম ছিল ক্লারা জেটকিন। জার্মান প্রবাদপ্রতিম কম্যুনিস্ট নেত্রী। আর বইটার নাম ছিল, "রেমিনিসেন্সস অফ লেনিন", লেনিনের স্মৃতিচারণ। এক বিপ্লবীর সাথে আরেক বিপ্লবীর কথোপকথন অসমাপ্তই থেকে গেল চিরকালের মতো। 

আজ শহীদ দিবস। ভগত সিং অমর রহে। শহীদ ভগত সিং আমাদের অধরা স্বপ্নের ভারতীয় নায়ক। শহীদ তোমায় লাল সেলাম।

তথ্যসূত্রঃ 
(১) বিজয় কুমার (রামপ্রসাদ বিসমিল এর ছদ্মনাম) স্বাক্ষরিত দি রেভলিউশনারী নামের চার পাতার দলিল, সেন্ট্রাল কাউন্সিল, রিপাবলিক পার্টি, ১৯২৭

(২) ধর্মভর ফাসাদ তে উনহা দে ইলাজ (ধর্ম ভিত্তিক দাঙ্গা ও তার সমাধান), ভগত সিং, কীর্তি পত্রিকা, জুন, ১৯২৭ সংখ্যা

(৩) অচ্ছুৎ কা সওয়াল (অচ্ছুৎ বিষয়ক পরিপ্রশ্ন), কীর্তি পত্রিকা, জুন, ১৯২৮ সংখ্যা

(৪) মর্ডান রিভিউ এই সম্পাদককে লিখিত পত্র , ২৪শে ডিসেম্বর, ১৯২৯

(৫) হিন্দুস্তান সোসালিস্ট রিপাবলিকান এসোসিয়েশন এর ইশতেহার, ১৯২৯ এর লাহোর কংগ্রেস অধিবেশনে প্রচারিত

(৬) ২১শে জানুয়ারি, ১৯৩০ কোর্ট থেকে পাঠানো ভগত সিং এর টেলিগ্রাম, শহীদভগতসিং.অর্গ

(৭) বাইয়োগ্রাফি অফ ভগৎ সিং, এম এম জুনেজা, মর্ডান পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ১৩২

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

বন্ধু ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য


একটা চড়ুই  জল থৈথৈ বৃষ্টিদিনে ভেজে 
গাছগুলো সব সবুজ হল, নতুন সাজে সেজে।।
দুটো চড়ুই সকাল হলে উঠোন বারান্দায়
ঝগড়া করে ইচ্ছে হলে, দু একটা গান গায়।।
তিনটে চড়ুই বায়না করে ভর্তি হবে স্কুলে
পড়াশুনোর ধার ধারে না, সবকিছু যায় ভুলে।।
চারটে চড়ুই বিকেলবেলা ধানক্ষেতে রোদ্দুরে
ভীষণ তাড়া ফিরবে বাড়ি, অনেকটা পথ উড়ে।।
পাঁচটা চড়ুই গরমকালে খানিক ছায়ার খোঁজে
তেষ্টা পেলে জল দিও প্লিজ, সবাই কি আর বোঝে।।
ছটা চড়ুই গাছের ডালে নয়তো ধানের ক্ষেতে
বগল বাজায়, ডিগবাজি খায় মনের আনন্দেতে।।
সাতটা চড়ুই দোল খেত বেশ টেলিগ্রাফের তারে
হাজার হাজার জ্বলত জোনাক রাতের অন্ধকারে।।
আটটা চড়ুই দিগন্ত নীল দিচ্ছে ডানা মেলে
আমিও যেতাম তোদের সাথে একটু খবর পেলে।।
নটা চড়ুই এদিক ওদিক দেখেছ নিশ্চয়
ছোট্ট তো খুব কি আর বোঝে সবকিছুতেই ভয়।।
দশটা চড়ুই বন্ধু ছিল, ছুটির দুপুরবেলা
লুকোচুরি মেঘ রোদ্দুর সমস্তদিন খেলা।। 

আজ বিশ্ব চড়ুই দিবস।

বুধবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫

শুয়োর ~ ডাঃ কৌস্তুভ রায়

যখন  নিজস্ব হার্লে-ডেভিডসন বাড়িতে এসেছিল তখনকার কয়েকটা কথা লিখলে বোধহয়  পাঠককুল নিশ্চয়ই বিরক্ত হবেন না। আপনারা অনেকেই জানেন, বা জানেন না, যে  হার্লে - ডেভিডসন মোটরসাইকেল আসতো মস্ত একটা পিচবোর্ডের বাক্স করে। তলায়  লোহার ফ্রেমে আটকানো মোটরসাইকেলটা থাকত, আর মস্ত পিচবোর্ডের বাক্সটা ওপরে  চাপানো থাকতো। তলার নাটবোল্টগুলো খুলে ফেললে বাক্সটা আলগা হয়ে যেত তখন দুজন  লোক ওটা ধরে তুলে বার করে নিলে মোটরসাইকেলটা দৃশ্যমান হতো। বাক্সের গায়ে  এটা সেটার সাথে একটা কথা লেখা থাকতো - ইয়োর হগ হ্যাজ অ্যারাইভড।

এবারে  আসি - হগ মানে কি? ইংরাজীতে হগ মানে হয় বুনো শুয়োর। অর্থাৎ গুগল  ট্রান্সস্লেটরের মত বাংলা করলে দাঁড়ায় - 'বাপধন, তোমার শুয়োর এসে গেছে।'  এখানে কিন্তু হগ মানে অন্য - হগ পুরো কথাটা হল - এইচ. এ. জি. মানে হার্লে  ওনারস্ গ্রুপ। অর্থাৎ আমি এখন থেকে হগ হলাম। যদিও আমার মাথায় এখনও ঢুকল না  যে গোটা গ্রুপটা কি করে একজনের বাড়িতে আসতে পারে। তা হবে বা, লিখেছে যখন -  আমেরিক্যানদের ব্যাপার স্যাপার, আদার ব্যাপারী অত জাহাজের খপর জিজ্ঞাসা  করতে নেই। কিন্তু ওটা লেখা থাকত। এটা শুনে আমার এক কাছের বন্ধু জিজ্ঞাসা  করেছিল - মানে তুই আলটিমেটলি শুযোর হলি। তখন ছিলাম রোগা ডিগডিগে, ছাতি বার  ইঞ্চি, পেট বার ইঞ্চি, কোমর বার ইঞ্চি, অর্থাৎ একদম বাচ্চা শুয়োর। এটা আরও  প্রমাণ হল যখন গোটা কলকাতা হার্লে ডেভিডসন শো রুম খুঁজেও আমার জন্য একটা  লেদার জ্যাকেট পাওয়া গেল না। অবশেষে সেটা আমেরিকা থেকে স্পেশাল করে আনাতে  হয়েছিল। এবং সাইজটা ছিল - আমেরিক্যান বাচ্চাদের বড় সাইজ।
সে যাই হোক  হার্লে নেবার পর দেখলাম আমি জাতে উঠেছি। অনেকেই যারা নাক সিঁটকে চলে যেত  আমি শেরপা কিংবা একটা পেট্রল অ্যামবাসাডার চালাই বলে, তারা গদগদ চিত্তে  আমাকে আজাদ হিন্দ ধাবায় অথবা হিন্দুস্থান হোটেলে গিয়ে বাইকার্স ব্রাদারহুডে  যোগ দেবার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন - এমনকি আমি কোনোদিন লাদাখ যাইনি বলে  অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মনে করিয়ে দিলেন যে যেকোন বাইকারের জীবনে লাদাখ  রিটার্ণ ব্যাজ ঝোলানো নাকি অবশ্যকর্তব্য। এছাড়াও এপ্রান্ত ওপ্রান্ত থেকে  অনুষ্ঠানে ডাক আসতে লাগল। অনেক অনুষ্ঠানে গিয়ে আমি পেছনের একটা চেয়ারে  গুটিসুটি মেরে বসে পড়ে লক্ষ্য করি যে - স্টেজে গিয়ে একজন আর একজনের থেকে  দেড় ইঞ্চি বড় হবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আমি অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে এটাও  লক্ষ্য করলাম আমি দাদা বা ভাই থেকে স্যার - এ উন্নীত হযেছি। (অবশ্যই  ব্যতিক্রম আছে, থাকবেই) আমি আলটিমেটলি এটা বুঝলাম যে মানুষে মোটরসাইকেল  তৈরী করে না, মোটরসাইকেলে মানুষ থুড়ি "স্যার" ওরফে শুয়োর  তৈরী করে।

কিন্তু  কি হল? আদতে আমি একটা গেঁয়ো আখাম্বা ভূত, ওরফে বর্তমানে ছোট্ট, বাচ্চা  শুয়োর - তার পেডিগ্রী যাবে কোথায়? তাই আমি আমার মত করে বাইকার্স ব্রাদারহুড  বলতে যা বুঝেছি তা লিখতে বসলাম।

"অঞ্জনা নদীতীরে চন্দনী গাঁয়ে, পোড়ো মন্দিরখানা গঞ্জের বাঁয়ে। 
জীর্ণ ফাটলধরা এককোণে তারি, অন্ধ নিয়েছে বাসা কুঞ্জবিহারী"
১৯৯৭  - ৯৮ সালের কথা হবে। উত্তরপ্রদেশের এক গ্রাম্য জায়গা ধরে এগোচ্ছি, ওখানকার  স্টেট হাইওয়ে, দুপাশে আমগাছের সারি, রাস্তায় ট্রাকের-বাসের-গাড়ির চাকায়  পিষ্ট হওয়া আম। গরমকাল, মে মাস, হু হু করে লু বইছে, মুখ গামছায় ঢাকা,  চম্বলের দস্যুর মতো মুখের চেহারা, এর আগে দু বার শেরপার ইঞ্জিন সিজ হয়ে  রাস্তায় গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছিল, ঠান্ডা আর হতেই চায় না, তাও লাথিয়ে লাথিয়ে  ২০-৩০ মিনিট পর 'এস্টাট' করা গেছে। এখান থেকে নানশোনা আরও ৪৫ কিলোমিটার  ওখান থেকে রাতের আশ্রয় খেরিপুর বা খৈরীপুর আরও ৯০ কিলোমিটার। বিরক্ত  লাগছিল। ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটার দেখাচ্ছে স্পিডোমিটার, যাচ্ছি বোধহয় আরও কম।  গরমে বোধহয় ওটারও মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মোটরসাইকেলে কেউ বেড়াতে আসে?  যত্তসব......
হঠাৎ একটা কড় কড় আওয়াজ করে আবার গাড়িটা বন্ধ হয়ে গেল।  ধ্যাত্তেরী। আবার সিজার? না অন্য কিছু? যাই হোক একটু ছায়া দেখে দাঁড় করালাম  বাহনকে। পিচ রাস্তার উপড়ে থেবড়ে বসলাম, ব্যাথাওয়ালা পেছনে বেশ সেঁক দেবার  মতো আরাম লাগলো।
উপরে আমগাছ, দুপাশে দিগন্তবিস্তৃত  মাঠ......দিগন্তবিস্তৃত বলতে একদম যা বোঝায় ঠিক তাই। একটু দূরে রাস্তার  থেকে শ-দুই ফুট দূরে একটা ঝোপ মতো, গোটা দুই বড় গাছ, একটা জায়গা থেকে ধোঁয়া  উঠছে।
গাড়িটাকে ঠেলে নিয়ে গেলাম। বড় রাস্তা থেকে একটু হাল্কা পায়ে চলা  দাগ চলে গেছে ঝোপের দিকে। আার মনে হল ধোঁয়া মানে লোক আছে বা ছিল বা  থাকবে....ইত্যাদি প্রভৃতি।
একটা হিরো পুক মোপেড দাঁড় করানো ঝোপটার কাছে,  তার উপরে কিছু সাদা কাপড় শুকোতে দেওয়া আছে। অদ্ভুত ব্যাপার হল  রেজিস্ট্রেশন নম্বরটা পশ্চিমবাংলার। হিসেব করলাম মনে মনে - পশ্চিমবাংলা  থেকে মোপেড নিয়ে কেউ এতদূর আসতেই পারে না। আমি প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দূরে  আছি কলকাতা থেকে। তার মানে কেউ এটাকে কিনে এনেছিল মল্লিকবাজার থেকে কিলোদরে  - তারপর একটু সারিয়ে-সুরিয়ে বোধহয় মাঠে আসে ক্ষেতি দেখতে। নম্বরটা বাহুল্য  হলেও রয়ে গেছে। যাই হোক চোরডাকাত না হলেই ভাল। তারপরেই মনে হল এই রে  খেয়েছে....নির্ঘাত কেউ প্রাতঃকৃত্য করতে ঢুকেছে এখানে আর  আমি....ইয়ে........
যাই হোক, একটু বসলাম মোপেডটার কাছে। একটু বাদে মনে  হল, প্রাতকৃত্য ভাল কথা...তাহলে ধোঁয়া থাকবে কেন? এই গরমে ধোঁয়া দিয়ে  মশামাছি তাড়িয়ে এই পান্ডববর্জিত জায়গায় কেউ ইয়ে করতে বসে না। যাই হোক আর  একটু এগিয়ে দেখলাম গামছা পরা একটি লোক একটা মেকশিফ্ট্ উনুন বানিয়ে একটু  চটা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে কিছু বসিয়েছে। যাই হোক বললাম....."নমস্তে,  থোড়া পিনে কা পানি হোগা?" আমার খাবার জলও তলানিতে তখন।
লোকটি বিনা বাক্যব্যয়ে একটা বোতল এগিয়ে দিল, ঘোলাটে জল, তাই সই। নেই মামার থেকে কানা মামা ভাল - কানা মামি আরও ভাল।
লোকটি ঠেঁটো হিন্দিতে বলল - "বৈঠিয়ে জারা, হাম থোড়া পিনে কা পানি লে আইই।"
খাণিকক্ষণ  বাদে ফিরে এসে পরিষ্কার বাংলা শুনলাম কানের কাছে...."কোথা থেকে আসা হচ্ছে  বাবুমশায়ের" শুনেই সাংঘাতিক শক খেলাম একটা ....বুঝলাম রেজিস্ট্রিশন নম্বরটা  যথার্থ পশ্চিমবঙ্গের, এবং মালিক ওটাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কোথাও।  কোনওরকমে বললাম "আপনি বাঙালী?" এবারে উত্তর এল - "না দাদা"। সন্দেহের চোখে  তাকালাম - নির্ভুল বাংলা উচ্চারণ, কোথাও কোন টান নেই। আবার কানে এল "এ  বাংলার শরীর নয়, তবে বাংলায় অনেকদিন ছিলাম। আপার গাড়ির চেহারা আর নম্বর  দেখে বুঝলাম আপনি বাঙালী, তাই বাঙলায় কথা বললাম। তা চললেন কোথায় আর  দাঁড়ালেনই বা কেন? এইসব জায়গায় তো কেউ দাঁড়ায় না।"
বললাম "গাড়ি খারাপ  হয়েছে.....মিস্ত্রি ডাকতে হবে না হয়তো, সাথেই যন্ত্রপাতি স্পেয়ার সব আছে।  একটু গাড়িটা ঠান্ডা হলে দেখে নিয়ে সারাব।"
খানিকক্ষণ আবার কোন কথা  নেই....গুণগুণ করে গান করতে করতে ভদ্রলোক ভাতে ফুঁ দিতে লাগলেন। অসাধারণ  গানের গলা - সম্ভবতঃ কোন ভজন হবে। একটু বাদে গুণগুণ থামিয়ে বললেন "স্কুলে  যা পড়েছিলাম তার সাথে তখন একাত্ম হতে পারি নি এখন তার মানে বুঝছি।"
উনি  হয়ত কিছু বুঝেছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি কিছুই বুঝলাম  না....একমনে গাড়িটা কি করে ঠিক করব তাই ভাবতে লাগলাম। বেলা পড়ে আসতে লাগল,  আমগাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যদেব পশ্চিমদিকে চললেন। রান্তা দিয়ে হুশ হুশ করে চলে  যাওয়া মাঝে মাঝে কোন গাড়ি ছাড়া পিনড্রপ সাইলেন্স। কান মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল।
একটু বাদে ডাক এল....."দাদা, দুটো প্রসাদ মুখে দিয়ে নিন, নুন নেই, রাগ করবেন না। আজকে ওপরওয়ালা এইরকমই মাপিয়েছেন।"
দেখি  একটা শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ছবি। বিবর্ণ হয়ে গেছে। তার সামনে একটা ছোট থালাতে  করে একটু ভাত আর শাক। পাশেই বোতলে ঠাকুরের খাবার জন্য সেই ঘোলা জল।
খুব কুণ্ঠিত হয়ে বললাম আরে না না আপনি খান ....আমি যা হোক করে চালিয়ে নেব।
হাসলেন,  বললেন "কে কাকে খাওয়ায় ভাই.....আপনি এসে গেলেন, একটু না হয় আনন্দ করেই  দুভাইয়ে খেলাম। আনন্দটাকে কেন বিসর্জন দেন দাদা?" আর কথা বাড়ানো গেল না।
খেতে  বসলাম - দুটো তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়ামের থালা, তাতে একটু করে ভাত, আর কোন  শাকসেদ্ধ, তাতে আবার একটু সয়াবিনের বড়ি ফেলা। ভাতের যা পরিমাণ তাতে কারোরই  পেট ভরার কথা নয়। স্বাভাবিক....আমি একজনের কষ্টার্জিত খাবারে ভাগ বসিয়েছি।
খাওয়া  শেষ হবার পরে পেছনে একটা ডোবাতে গিয়ে আঁচিয়েও আসা হোল। এবারে গাড়ি খুলে  আমি খুটখাট করতে লাগলাম আর উনি চিৎপটাং হয়ে শুয়ে ঘুমাতে লাগলেন। নাক ডাকার  শব্দ আসতে লাগল। আমার দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে গাড়ি পারাবত থেকে পর্বত হয়ে গোঁ  ধরে বসতে লাগল। নট নড়নচড়ন।
যখন রোগ আবিষ্কার করা গেল তখন বেলা শেষ,  দিনের আলোয় রোগের উপশমের কাজটা করতে পারলেও গাড়ি ফিট করে খেরিপুর যাওয়া  প্রায় কেন, একদমই অসম্ভব।
ভদ্রলোক জেগে উঠে বললেন "রাতে কি বানাবো  বাবাজী?" আটা আছে সাথে....।" যেন বাড়ির লোকের গলা শুনছি - "আজ রাতে কি  খাওয়া হবে?" আঁৎকে উঠে বললাম "রাতটা কি এখানে কাটাবেন?" ভদ্রলোকের গলায় কোন  তাপ উত্তাপ পাওয়া গেল না, বললেন "তা নয়তো কি? আপনাকে ফেলে রেখে আমি চলে  যাব? সেটি হবে না বাবাজী"
রাত নামল, কোটি কোটি তারার মেলা, হাওয়া দিতে  লাগল, একটু ঠান্ডা হল চরাচর, ভদ্রলোক সুমধুর গলায় গাইতে লাগলেন "খন্ডন ভব  বন্ধন জগ-বন্দন বন্দি তোমায়......" আমি চুপ করে বসে বসে শুনতে লাগলাম। নিশা  ঘন হতে লাগল, আবার গান শুরু হল - "তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি  ধাই...." গান শেষ হলে বললেন...ছোটবেলায় রামকৃষ্ণ মিশনে পড়েছিলাম, পরে  শান্তিনিকেতনে।"
শুধু এটুকুই জানতে পেরেছিলাম ওনার সম্পর্কে....নামটাও  জানি নি, জানার মতো কৌতুহল-ও হয় নি। ফোন নম্বর তখন ভারতবর্ষে সুলভ ছিল না,  উনি পরিব্রাজক, কোন ঠিকানাও নেই....খালি মনে হচ্ছিল বেশি কথা বলে কি হবে?  আমি তো কিছুই জানি না।
রাত্রে মোটামোটা হাতে চাপা পোড়া রুটি প্রসাদ পেয়েছিলাম। তারপর চাদর বিছিয়ে মহাকাশের তলায় ঘুম।
পরের  দিনের ঘটনা সংক্ষিপ্ত - আমার গাড়ি ঠিক হয়ে যাবার পর সব গুছিয়ে নিয়ে দুজন  দুদিকে যাত্রা করলাম। যতদূর মনে আছে উনি যাচ্ছিলেন বারাণসীর দিকে। জড়িয়ে  ধরে বলেছিলেন, "দ্যাখো দেখি প্রেমময় ঠাকুরের কীর্তি, সব জায়গায় সঙ্গী  পাঠিয়ে দেন। পরে কোথাও আবার ঠিক দেখা হয়ে যাবে বাবাজী, অথবা যদি শরীর চলে  যায় আর হবে না"। বলে গাড়ি স্টার্ট দিলেন।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে  লাগলাম .....সামান্য সংসার নিয়ে পঞ্চাশ সিসির হিরো পুক চলেছে দিগন্তের  দিকে। সাদা কাপড় দিগন্তে মিলিয়ে গেল ঝাপসা হয়ে চোখের জলের সাথে।
আজও অবধি আর দেখা হয় নি।

এরপর  যখন শুনি বাইকার্স ব্রাদারহুড জিন্দাবাদ - আজাদ হিন্দ ধাবায় গিয়ে, তখন  বুঝি আমি খরচার খাতায়......। এটা পড়ার পর আমি খুব শিওর অনেক "বাইকার" এর  মনের কথা হবে.....

হতচ্ছাড়া শুয়োর - তোমাকে আর লাদাখ যেতে হবে না, তুমি গোল্লায় অথবা জাহান্নম যেখানে খুশি যাও।

শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৪

সাত নম্বর কুকুরের বাচ্ছা ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

কিছুদিন আগে কথা। কাজের দায়িত্বের অঙ্গ হিসেবে একটা বড় হাসপাতালে গিয়েছিলাম প্রেসক্রিপশন অডিট করতে সঙ্গে আরো কিছু দেখতে। সময়টা ছিল বড়দিন এর আশপাশে। সেই ভিজিটের রিপোর্ট লিখতে বসে ভেবেছিলাম যে অনেক কিছুই ভালো দেখলাম। লেবার রুম খুব সুন্দর, সাজানো গোছানো। ডাক্তার সিস্টারদের বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা ও জ্ঞানও খুবই ভালো। কেবল একটা জিনিস একটু আপত্তিজনক মনে হয়েছিল। মায়েদের একটু বেশি কড়া হায়ার জেনারেশন এন্টিবায়োটিক লেখা হচ্ছে যা স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট প্রটোকল অনুযায়ী ঠিক নয়। এনিয়ে সুপারের সাথে আলোচনার ফাঁকে গাইনোকলজিস্ট আসলেন। ঘটনাচক্রে সে আমার পুরানো বন্ধু বেরিয়ে গেল। মেডিক্যাল কলেজের সহপাঠী। 

একথা সেকথার পরে আমার আপত্তির প্রসঙ্গটা তোলার পরেই হঠাৎ খেপে গেলো বন্ধুটি। আমার হাত ধরে টানতে টানতে ওয়ার্ডে নিয়ে গেল। সেখানে এত ভিড় যে মায়েদেরও মেঝেতে রাখতে হচ্ছে। তাদের দেখিয়ে বন্ধু বললো উত্তেজিত হয়ে, "এই যে দেখছিস, মেঝেতে শুয়ে আছে, এরা মানুষ নয়, কুকুর, আর ওদের সাথে শুয়ে আছে, ওরা মানুষের বাচ্ছা নয়, ওরা কুকুরের বাচ্চা। আর আমি মানুষ নয়, কুকুরের ডাক্তারি করি। তোর কোন টেক্সট বই বা স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকলে লেখা আছে যে প্রসব বা সিজার হওয়া মাকে মেঝেতে শুতে হয় ? " 

বন্ধু তখন উত্তেজিত হয়ে যা তা অবস্থা, আমাকে প্রায় চিৎকার করে বলছে, " হ্যাঁ আমি জানি, আমি হায়ার এন্টিব্যাওটিক লিখি। ইচ্ছে করেই লিখি, যাতে মেঝেতে থাকা এদের ইনফেকশন না হয়, কাল থেকে তুই এদের বেডে শোয়ার ব্যবস্থা করে দে, আর লিখবো না।"

সত্যি বলতে কি আমি এতদিনের আগের বন্ধুর এই অবস্থা দেখে নিজেকে খানিকটা গুটিয়ে নিয়েই ফেরত এসেছি। এসে নেট ঘেঁটে দেখছিলাম যে ভারত সরকার সত্যিই স্বাস্থ্য নিয়ে কতটা চিন্তাভাবনা করে।

এ বছরের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট ৬,২১,৯৪০ কোটি, গ্রামীণ খাতে বাজেট ২,৬৫,৮০৮ কোটি, কৃষি খাতে ১,৫১,৮৫১ কোটি, গৃহ মন্ত্রক খাতে ১,৫০,৯৮৩ কোটি, শিক্ষা খাতে ১,২৫,৬৩৮ কোটি, আই টি টেলিকম খাতে ১,১৬,৩৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ আর সাত নম্বরে আছে স্বাস্থ্য যার বরাদ্দ মাত্র ৮৯,২৮৭ কোটি টাকা।

ফিরে আসার আগে আমার সেই বন্ধুর সাথে আবার দেখা। তখন ওর মেজাজ অনেক ঠান্ডা হয়ে এসেছে। হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে অনেক পুরোনো সুখ দুঃখের গল্প হল। বলেছিল, "রাগের মাথায় বলেছি, তুই কিছু মনে করিস না, আমার অসহায় অবস্থা টা একটু বোঝার চেষ্টা করিস।"

ফিরে এসে রিপোর্টে আমাকে লিখতেই হয়েছিল সেই স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট প্রটোকল ভাঙার কথা, বন্ধুকে যতই ভালোবাসি। আমি নিরুপায়। কিন্তু রিপোর্ট লিখতে বসে ওর সেই রাগী মুখটা বারবার মনে পরে যাচ্ছিল আর সেই কথাটা। "আমি মানুষের নয়, কুকুরের চিকিৎসা করি"।

আমরা ভারতের নাগরিকরা স্বাধীনতার এত বছর বাদেও ভারত সরকারের চোখে সত্যিই বোধহয় "মানুষ" হয়ে উঠতে পারলাম না। পারলে প্রসূতি মাকে তার সদ্যজাত শিশুকে নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে ঠাঁই নিতে হত না। 

আমরা আবার আমাদের দেশ নিয়ে বড়াই করি। লেটেস্ট রাফায়েল জেট বিমান আমাদের অস্ত্র সম্ভারে যোগ করে আমরা উল্লসিত হই। ভারতের মাননীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তাঁর চিরাচরিত ধুতি খুলে ফাইটার পাইলট এর ড্রেস পরে ছবি তুলে, লেবু ঝুলিয়ে পোজ দেন ফটোর জন্য। সেই ছবি হাজার লক্ষ শেয়ার হয়, লাইক হয়। আমরাই করি। 

অনেকদিন আগে আস্তাবলে এক দেবশিশুর নাকি জন্ম হয়েছিল। সেই দিনটা যাকে আমরা বড়দিন বলে মানি। সেটাও কনকনে ঠান্ডার দিন ছিল। আজও তাই। আজও অনেক দেবশিশুর জন্ম হবে। আমাদের কেবল ভাবা দরকার যে তাদের কজন মানুষের বাচ্চা আর কজন তালিকায় সাত নম্বর এ থাকা "কুকুরের বাচ্ছা" আমার সেই বন্ধুর ভাষায় ? 

বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৪

জাতীয় পতাকা ও হিন্দুত্ববাদী ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

প্রতিবেশী দেশে আমাদের জাতীয় পতাকার অবমাননা এর ঘটনায় যখন গোটা দেশ সরব,আমরা মানে সাধারণ মানুষরা দুঃখিত, ব্যথিত এমনকি ক্রুদ্ধ, তখন এই ঘটনার ফায়দা তুলতে কিছু ছদ্ম জাতীয়তাবাদী আসরে নেমে পড়েছে। জঙ্গী জাতীয়তাবাদের জিগির তোলা এইসব হিন্দু মৌলবাদীদের স্বরূপ জানা বোঝার জন্য আমাদের জাতীয় পতাকা নিয়ে তাদের প্রকৃত মুল্যায়ন কি সেটা জেনে রাখা দরকার হয়ে পড়েছে।

সংঘ পরিবার ও জাতীয় পতাকা ১:
১৯২৯ সাল এর ডিসেম্বর মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নেয় যে পরের বছর ২৬শে জানুয়ারি দিনটিকে স্বরাজ দিবস হিসেবে পালন করা হবে এবং চরকা চিহ্নিত তেরঙ্গা পতাকা তোলা হবে সর্বত্র। এর প্রেক্ষিতে ২১শে জানুয়ারি ১৯৩০ সংঘ প্রধান কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার একটি সার্কুলার দেন যার মোদ্দা কথা হল যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের শাখাগুলি গেরুয়া ঝান্ডা (ভাগোয়া ঝান্ডা) কেই জাতীয় পতাকা হিসেবে মান্যতা দেবে, ওই তেরঙ্গা ঝান্ডাকে নয়। [সূত্র: পালকার, ডক্টর হেড গেওয়ার পত্ররূপ ব্যক্তি দর্শন, অর্চনা প্রকাশন, পৃষ্ঠা ১৮]

সংঘ পরিবার ও জাতীয় পতাকা ২:
১৯৪১ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে সাভারকার বলেন যে যার মতে ওম এবং স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকা হিন্দু মহাসভার পতাকা ই হিন্দুদের একমাত্র পতাকা যেসব অনুষ্ঠানে ওই পতাকা থাকবে না সেগুলি বয়কট করতে হবে। চরকা চিহ্নিত ওই তেরঙ্গা পতাকা কেবল কংগ্রেসের পতাকা ওটা গর্বিত হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব মূলক নয়। [সূত্র: ভিডে এ এস, বিনায়ক দামোদর সাভারকার, এক্সট্র্যাক্ট ফ্রম প্রেসিডেন্টস ডায়েরি, পৃষ্ঠা ৪৬৯, ৪৭৩]

সংঘ পরিবার ও জাতীয় পতাকা ৩:
১৪ই জুলাই, ১৯৪৬ সালে গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এক জমায়েতে সংঘের উচ্চ নেতৃত্ব কে গোলয়ালকর বলেন যে কেবল মাত্র গেরুয়া ঝান্ডা ই ভারতীয় সংস্কৃতিকে হাজির করতে পারে। এটাই ঈশ্বরের ইচ্ছা। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে একদিন গোটা জাতি এই পতাকার সামনে মাথা নত করবে। [সূত্র: গোলয়ালকর শ্রী গুরুজী সমগ্র দর্শন, নাগপুর সং, পৃষ্ঠা ৯৮]

সংঘ পরিবার ও জাতীয় পতাকা ৪:
১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট, সমগ্র জাতি যখন আসন্ন স্বাধীনতা দিবস নিয়ে উদ্বেল তখন আর এস এস এর ইংরেজি মুখপত্র অর্গানাইজার এ লেখা হয়, "ভাগ্যের ধাক্কায় যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা আমাদের হাতে তেরঙ্গা ঝান্ডা তুলে দিতে পারে কিন্তু ওই পতাকা কখনোই হিন্দুদের শ্রদ্ধার জায়গা নিতে পারবে না। তিন শব্দটাই অশুভ এবং তিন রঙে সজ্জিত ওই পতাকা আমাদের ওপর অতি ক্ষতিকারক মানসিক প্রভাব ফেলবে এবং দেশের পক্ষে আঘাত স্বরূপ [সূত্র: অর্গানাইজার ওই সংখ্যা]

সংঘ পরিবার ও জাতীয় পতাকা ৫:
স্বাধীনতার পরেও দেশের আইন অনুযায়ী স্বীকৃত জাতীয় পতাকার মর্যাদাকে ক্রমাগত অস্বীকার করার চেষ্টা সংঘ পরিবার দেখিয়ে গেছে। গেরুয়া ঝান্ডা কে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সংঘ প্রধান গোলোয়ালকর এর কথায় আমাদের দেশের নেতারা নাকি নকল নবীশ, অন্যদেশের টুকলি করে আমাদের জাতীয় পতাকা বানানো হয়েছে যার কোনো প্রয়োজনই ছিল না আমাদের দেশে যার সুমহান ঐতিহ্য আছে। হাজার বছর ধরে আমাদের কি কোনো নিজস্ব ঝান্ডা ছিল না? [সূত্র গোলোয়ালকর, বাঞ্চ অফ থটস, সাহিত্য সিন্ধু প্রকাশন, ১৯৬৬, পৃষ্ঠা ২৩৭-২৩৮]

সংঘ পরিবার ও জাতীয় পতাকা ৬:
২০০১ সাল অবধি আর এস এস এর সদর দপ্তরে কোনোদিন জাতীয় পতাকা তোলা হতো না। ওই বছর রাষ্ট্রোপ্রেমী যুবা দল বলে একটি সংগঠন আর এস এস স্মৃতি ভবনে ঢুকে পরে জোর করে জাতীয় পতাকা ওঠায়। ওই সংগঠনের বিরুদ্ধে আর এস এস এর অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৩ সালে অভিযুক্ত এরা ছাড়া পায়। [পিটিআই রিপোর্ট, ২০১৩]

ওপরের তথ্য গুলি অনুধাবন করলে একথা স্পষ্ট যে জাতীয় পতাকার অবমাননার জন্য কুমিরের কান্না কেঁদে যাওয়া সংঘ পরিবারের ছোট বড় কোনো সদস্যের কোনো নৈতিক অধিকার ই নেই এ নিয়ে কোনো কথা বলার কারণ সুযোগ পেলে ওরা আমাদের জাতীয় পতাকাকে ওদের গেরুয়া ঝান্ডা দিয়ে প্রতিস্থাপিত করবে এটা নিশ্চিত। কেউ ফেক জাতীয়তাবাদী না  প্রকৃত দেশপ্রেমিক, আমাকে আপনাকে বুঝে নিতে হবে।

শনিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৪

জাতীয় পতাকা ও আবেগ ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

আমাদের, ভারতের জাতীয় পতাকা আবার শিরোনামে এসেছে প্রতিবেশী দেশের কিছু লোকের দুঃখজনক আচরণের ফলে। বর্তমান নিয়ে লেখার আগে অতীতের কিছু গল্প শোনাতে শোনাতে চাই আপনাদের। গল্পও ঠিক নয়, সত্যকাহিনী। শুনতে চাইলে এগিয়ে যান। 

প্রথম কাহিনী ১৯৩২ সাল:-
ওই সময় সবে পরীক্ষা দিয়ে উঠেছে ওই কিশোর, সায়েন্স প্র্যাকটিক্যাল তখনো বাকি। ভগত সিং এর প্রথম শহিদ বার্ষিকী পালনের কথা হচ্ছে। গর্ভনর এর সেদিন জলন্ধর থেকে ৪০ কিমি দূরে হোসিয়ারপুর দেখতে আসার কথা। জেলা কংগ্রেস কমিটি ঘোষণা করলো যে সেদিন জেলা আদালত প্রাঙ্গনে ইউনিয়ান জ্যাক এর বদলে ত্রিবর্ন পতাকা ওড়ানো হবে। এই কর্মসূচি বানচাল করার জন্য জেলা শাসক আর্মি মোতায়েন করেন আর কেউ পতাকা তোলার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করার আদেশ জারি করেন। 

সেদিন হোসিয়ারপুর পোঁছে মন খারাপ কিশোরের। শুনলো পতাকা তোলার কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। কংগ্রেস অফিস সম্পাদক হনুমানজির কাছে কিশোর দাবি করলো, কেন বাতিল হল। উনি প্রশ্ন করলেন, গুলি চালানোর আদেশ এর কথা ঐ কিশোর জানে কি না। তাই শুনে খেপে গিয়ে কিশোর পাল্টা বললো, "গুলি খাওয়ার ভয়ে আপনারা হাল ছেড়ে দিলেন ? এত জাতির প্রতি অপমান!" উনি পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বসেন," এতই যদি তোমার সাহস, তাহলে তুমিই পতাকা তুলে দেখাও।"

কিশোরটি অফিসের একটি ডান্ডায় লাগানো পতাকা খুলে নিয়ে কোর্টের দিকে দৌড় দিল, সেই আদালত যাকে সেই সময়ে ব্রিটিশ শক্তির একটা নিদর্শন হিসেবে ধরা হতো। কর্মসূচির নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়াতে তখন পুলিশ আর সেনাবাহিনীর মধ্যে একটু ঢিলেঢালা ভাব। তার সুযোগ নিয়ে সিঁড়ি টপকে ছাদে উঠলো কিশোর, ইউনিয়ন জ্যাক খুলে নামিয়ে দিল, লাগিয়ে দিল ত্রিবর্ন পতাকা। তাই দেখার পরে গুলি চালানো শুরু হয়। দুটো গুলি কিশোরের কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়, গায়ে লাগেনি। ডেপুটি কমিশনার বাখলে বেরিয়ে আসেন। কিশোরটিকে বাচ্চা ছেলে দেখে তিনি গুলি চালানো বন্ধ করার আদেশ দেন। কিশোর স্লোগান দিতে শুরু করে। তার কাছে কোনো অস্ত্র নেই,সে নিরস্ত্র এটা নিশ্চিত হওয়ার পরে সেনারা সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে যায়।

পরের দিন বিচার শুরু হয়। ম্যাজিস্ট্রেট নাম জিজ্ঞেস করলে কিশোর বলে, "আমার নাম লন্ডন তোড় সিং।" আসল নাম কিছুতেই বের করতে পারেনি। যা করেছে তার দায় স্বীকার করে কিশোর, ভগত সিং এর অনুপ্রেরণার কথা বলে। ওর এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হয়। "মাত্র এক বছর ?" ম্যাজিস্ট্রেটকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বাড়িয়ে চার বছর কারাবাস এর আদেশ দেন।" 

সেদিন জাতীয় পতাকা তোলার জন্য প্রাণ তুচ্ছ করে এগিয়ে আসা কিশোরের আসল নাম হরকিসেন সিংহ সুরজিৎ। ডান্ডা বেড়ি পরে অকথ্য পরিবেশে হাজতবাস করা সেদিনের সেই কিশোর পরবর্তীকালে ভারতের মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির প্রথম পলিটব্যুরোর নবরত্ন এর একজন এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় কাহিনী, এবার ১৯৪২ সাল:-
"ভারত ছাড়ো" আন্দোলনে যোগ দিয়েছে এক ছাত্রী। ১৫ আগস্ট জেলে বন্দী অবস্থায় মারা গেলেন গান্ধীজির সচিব মহাদেব দেশাই। অহল্যার নেতৃত্বে ছাত্রীরা পথে নামলো প্রতিবাদে। মিছিল। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হল ছাত্রীটি, হল তিনমাসের জেল, পুণের ইয়েরওয়াড়ায়। জেলের মধ্যে থাকাকালীন আবার অবাধ্যতার জন্য শাস্তি হয় ছাত্রীটির, বন্ধু ইন্দুতাই কেরকারের সাথে সাত দিনের সলিটারী। 

সেই ছাত্রীটির নেতৃত্বে ঠিক হয় ইয়েরওয়াড়া জেলের উঁচু পাঁচিল সাজানো হবে জাতীয় পতাকায় যাতে দূর দূর থেকে লোক দেখতে পারে। প্রথমে মহিলা বন্দীদের কাছ থেকে শাড়ি সংগ্রহ করা হয়। তার পরে সেগুলির কাপড় থেকে সেলাই করে তৈরি হয় জাতীয় পতাকা। এবার ওড়ানো হবে সেই পতাকা। কিন্তু কি ভাবে ? মহারাষ্ট্রে ছেলেরা একজন আরেকজনের পিঠে কাঁধে চড়ে হিউম্যান পিরামিড তৈরিতে ওস্তাদ। সেই আইডিয়া ধার করে মেয়েদের দিয়ে তৈরি হয় হিউম্যান পিরামিড। জেলের প্রাচীরের ওপরে পৌঁছে গিয়ে তোলা হয় জাতীয় পতাকা। ছাত্রীটির মুঠি বাঁধা হাত তখন আকাশের দিকে। 

ছাত্রীটির নাম অহল্যা রঙ্গনেকর যার জঙ্গী মনোভাব দেখে পদবি পাল্টে ডাকা হত অহল্যা "রণরঙ্গিনী" বলে। ছাড়া পাওয়ার পরে মহিলা সংগঠনের নেত্রী, মুম্বাই এর কর্পোরেটর, সাংসদ, সিআইটিইউ এই ভাইস প্রেসিডেন্ট, মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভ্য।

এবার তৃতীয় ও শেষ কাহিনী, ১৯৪৭ সাল:-
শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে এই কমরেড প্রথমে কংগ্রেসে তার পরে কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টিতে। তার পরে মোহ ভঙ্গ হয়ে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। স্বাধীনতার আগেই অসংখ্যবার কারাবরণ, অত্যাচার সহ্য করা আবার আরেকদিকে প্রথম শ্রেণীর বন্দীর আরাম আয়েশ অগ্রাহ্য করে জেল ভেঙে বেরিয়ে আসা। কালিকট এ ১৯৪৬ সালে পার্টির প্রার্থী। কংগ্রেস এর হাতে হেরে যাওয়া। গণ আন্দোলনে আবার ঝাঁপ পুনাপ্রা ভায়ালার, বিড়ি শ্রমিক ধর্মঘট, চিড়াক্কল কৃষক বিদ্রোহ। 

মাদ্রাজে তখন প্রকাসম মন্ত্রিসভা। কমরেডকে আবার জেলে ভরা হল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের সেই রাতে কুন্নুর জেলের সলিটারী সেলের গারদ ভেদ করে ভেসে আসছে আওয়াজ, "মহাত্মা গাঁধীজি কি জয়, ভারতমাতা কি জয়।"। কমরেড এর নিজের জবানিতে, "গোটা দেশ অপেক্ষায় আছে কাল সকালের সূর্যোদয়ের, তার পরেই শুরু হবে উৎসব। কতজন কত বছর ধরে অপেক্ষা করছে, সংগ্রামে আত্মত্যাগ করেছে। আমিও ওই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আনন্দিত যার জন্য আমি জীবন-যৌবনকে উৎসর্গ করেছিলাম।" কমরেড বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন কংগ্রেস এর হাতে বন্দী হয়ে, আর তারই এককালের সহকর্মী তখন বিশ্বের সামনে ভাষণ দিচ্ছেন "নিয়তির সাথে অভিসার"।

পরের দিন সকাল। একটা তেরঙা পতাকা জোগাড় করে সেটা তুলে জেল চৌহদ্দির পরিধি বরাবর হাঁটলেন কমরেড। তারপর জেলের ছাদে তোলা হল সেই পতাকা। সব বন্দীরা তার সামনে জড়ো। কমরেড তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তাদের বুঝিয়ে বললেন দিনটির তাৎপর্য। নেমে এসে আবার সলিটারী সেল। জেলার এর বদান্যতার  কয়েক ঘন্টার মেয়াদ শেষ। 

কমরেড এর নাম এ কে গোপালন। ছাড়া পাওয়ার পরে পাঁচ বার সাংসদ। ভারতের মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির এর প্রথম পলিটব্যুরোর নবরত্ন এর একজন। 

সেই পুরোনো রংচটা তিনটে পতাকার কথা মনে পড়লে একটু আবেগ তাড়িত  হয়ে পড়ি। হোসিয়ারপুর আদালতের মাথায়, ইয়েরওয়াড়া জেলের প্রাঙ্গনে, কুন্নুর জেলের পাঁচিলের ওপর পতপত করে উড়তে থাকা সেই পতাকা তো শুধু পতাকা নয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আমাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রতীক। সেই পতাকা কারুর পদতলে লাঞ্ছিত হতে দেখলে মন খারাপ লাগে। 

বাংলাদেশের শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষজনের কাছে আবেদন যে আমাদের পতাকা পায়ে মাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার আগে একটি বার ভাবুন, যারা ওইসব কাজ করছেন তাদের বোঝান যে একটা অন্য দেশের কিছু মানুষজন, কিছু ব্যবসায়ী, দেশের কিছু নেতাকর্মী দের কাজে বিরক্ত ক্ষুব্ধ হওয়ার অধিকার অবশ্যই আপনাদের আছে। কিন্ত পতাকা মাড়িয়ে দেওয়া মানে একটা গোটা দেশের সমগ্র জনগণ কে অপমান করা। সেই অপমানিতদের দলে আমরাও আছি, যারা মনে করেন বাংলাদেশের সব মানুষ একরকম নন, সবাই ধর্মান্ধ মৌলবাদী অসহিন্ধু ভারত বিদ্বেষী নন। আপনাদের পতাকা আমাদের দেশে লাঞ্ছিত হলে একই রকম প্রতিবাদ করবো। আমাদের পাশে থাকুন। সবার সব অপমানে আমরা যেন সমান হতে পারি। ধর্মান্ধ মৌলবাদী অসহিন্ধু মানুষজনকে দুদেশেই যেন চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করতে পারি। এখনো সময় আছে।


বুধবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৪

আমাদের নিজস্ব ভূত চতুর্দশী ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত



একটা ভূত তখন তারক জিডিএ এর সঙ্গে থাকে। মধ্যমগ্রামের সেই প্রাইমারি হেল্থ সেন্টারের পুকুর পাড়ের পেছল পথ ধরে তারক যখন বর্ষার রাতে ডাক্তারবাবুকে কোয়ার্টার থেকে একহাতে ছাতা আর অন্য হাতে কলবুক নিয়ে ডাকতে যায় ভূতটা তখন সঙ্গে থাকে। তারকের পাশে পাশে হাঁটে। আশেপাশের ঘাস জঙ্গলের বনে, ভেঙে পড়া পাম্প হাউসের ইটের পাঁজায় বসে থাকা দাঁড়াশ আর কালাচগুলোকে ভূতটা আঙ্গুল তুলে শাসানি দেয়। খবরদার তারকের কাছে আসিস না।

আরেকটা ভূত তখন নীলিমা সিস্টারের সঙ্গে থাকে। মাঝরাতে এপিএইচ ব্লিডিং এর পরে ক্লান্ত ফ্যাকাসে মায়ের ঠান্ডা হয়ে আসা হাতটা ধরে লেবার রুমের আলোয় চ্যানেল করার জন্য ভেন খুঁজতে গিয়ে হয়রান নীলিমার মাথার ওপর দিয়ে ভূতটা উঁকি দেয়, স্পট ল্যাম্পটা একটু বাঁকিয়ে ফোকাস ফেলে হাতের ওপর। এই তো অনায়াসে শিরার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে জেলকোর সরু সূচ।

আরেকটা ভূত তখন অয়ন ডাক্তারের সঙ্গে থাকে। ভোর রাতে সাপে কাটা বাচ্ছা ছেলেটার শরীর থেকে নেয়া রক্ত টোয়েন্টি ডাবলুবিসিটির টেস্ট টিউবে ঢেলে দিয়ে অয়ন যখন ইমারজেন্সি ঘরে কুড়িজন পেশেন্ট পার্টির তৈরি করা চক্রব্যূহে অভিমন্যুর মতো অপেক্ষা করে তখন ওই ভূতটাইতো অয়নের কাঁধে বসে ভরসা দেয়। কানে কানে বলে আরে কিচ্ছু হবে না, এরা ভালো লোক, রুগী মরে গেলেও তোর গায়ে হাত দেবে না। অয়ন ভরসা পেয়ে সিরিঞ্জ ঢোকায় এভিএস এর শিশিতে। 

তারক রিটায়ার করে যায়। নীলিমা বদলি সুপার স্পেশালিটিতে। অয়ন নিট পিজিতে চান্স পেয়ে পড়তে। হেল্থ সেন্টারে রাতে আর রুগী আসে না। লোকে ভূতের বাড়ি বলে বদনাম দেয়। ভূতগুলো খালি এমনি এমনি হেল্থ সেন্টারের এঘর ও ঘর ঘুরে বেড়ায়। 

নীলিমার যত্ন করে লিউকোপ্লাস্ট দিয়ে বাঁধানো রেজিস্টারগুলোতে ওরা হাত বোলায়। তারকের গজ থান কাটার কাঁচিটা সযত্নে কাচ ভাঙা আলমারিতে তুলে রাখে। অয়ন এর নিজের পয়সায় কেনা চা খাওয়ার সেই ইলেকট্রিক কেটলির জল ফেলে মুছে দেয়। ওরা আশায় থাকে। আরেকটা তারক, আরেকটা নীলিমা, আরেকটা অয়ন কবে আসবে আবার। ওদের বড় একা লাগে। ওদের মন খারাপ হয়। ভূত বলে কি ওরা মানুষ নয় ?

ব্লকের নতুন বড় ডাক্তারবাবু আসে। পিএইচসির এ ঘর, ও ঘর ঘুরে দেখে। ভূত গুলো খবর পেয়ে শেওড়া গাছ থেকে সুরুৎ করে নেবে আসে। খুব খটোমটো নাম, সুহৃদ না সুরহিত কি একটা। ওদের চোখে চোখে কথা হয়। এ কি পারবে হাল ফেরাতে ? অভিজ্ঞ ভূতেরা মাথা নেড়ে কচিগুলোকে স্বান্তনা দেয়, দেখছিস না, এক্কেবারে ছেলেমানুষ বিএমওএইচ, গোঁফ ওঠেনি ভালো করে, মনে তো হয় পারবে না। তবে চোখ দুটো খুব জ্বলজ্বলে। কচিগুলো মাথা নেড়ে সায় দেয়, পারবে না, পারবে না। গাছের ডালপালাগুলো দুলে দুলে সায় দেয়। 

সুহৃদ না সুরহিত ডাক্তার বোধহয় শুনতে পায়, চোখ দুটো সত্যিই জ্বলে ওঠে। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, রকে  বসে আড্ডা দেয়া, মাস্তানি করা সবই তো এই গ্রামে। পারবে না মানে। ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি। জামার হাতা দুটো গুটিয়ে নিয়ে কাজে নামে। এখান থেকে দুটো টাকা জোগাড় করে ওখানে একটু চুনকাম, সেখান থেকে তিনটে টাকা যোগাড় করে ইলেকট্রিকের নতুন একটা লাইন। ডেপুটি সিএমওএইচ তিন এর কাছ থেকে ভিক্ষে করে চারটে নতুন লোক। ধেড়ে ভূতগুলো দেখে আর বড় বড় নিশ্বাস ফেলে, হচ্ছেটা কি বাপু, বাপের জন্মেও দেখিনি। 

দিন নেই, রাত নেই মোটর সাইকেল দাবড়ে সুহৃদ না সুরহীত ডাক্তার পি এইচ সি থেকে ঢোকে আর বেরোও। নীলিমা সিস্টারের জায়গায় মায়া, ছায়া, আরো চারজন নতুন সিস্টার। তারা তাদের স্যারকে দেখায়, ঐখানে একটা বেসিন লাগবে স্যার, আর এইখানে অটোক্লেভ এর প্লাগ পয়েন্ট। সব লেগে যায় একে একে।  কিচ্ছুটি চুরি হয় না, ভেঙ্গে যায় না। কচি ভূতেরা পাহারায় আছে যে। 

ডেপুটি সিএমওএইচ এক এর লোকেরা সাদা হাতি করে নামিয়ে দিয়ে যায় স্যালাইন এর পেটি। ডেপুটি সিএমও এইচ দুই পাঠায় এন্টি স্নেক ভেনম সিরাম। তারকের জায়গায় কাজে আসা নতুন জিডিএ চন্দন, নন্দনরা ফটাফট নামিয়ে ফেলে সে সব। ভূতগুলোও হাত লাগায়। ফার্মাসিস্ট বিপুল কোথায় কোনটা রাখবে ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে চুমুক দিয়ে ফেলে ঠাণ্ডা চায়ের কাপে। একটা ছোকরা ভূতকে ধমক দিয়ে গরম চা নিয়ে আসতে বলে। সুরহিদ ডাক্তার দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করে।  ইটের পাজায় পাশাপাশি বসে দাঁড়াশ আর কালাচ দুটো দেখে চোখ মেলে।

আবার গুটি পায়ে একটি দুটি রুগী আসে সন্ধ্যে বেলায়, মাঝরাতে। ভর্তি হয়, স্যালাইন চলে, মুখে গোঁজা হয় থার্মোমিটার, পেটে পড়ে প্যারাসিটামল। ভূত গুলো জানালার পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে। ছায়া সিস্টার ভাবে বাতাসে উড়ে গেল পর্দা বুঝি।

কচি ভূতগুলো ধেড়েদের দুয়ো দেয়, তবে যে বলেছিলে পারবে না, পারবে না। তোমরা বুড়োরা হেরে ভূত। এই শুনে ধেড়েগুলো হাসে। কচিগুলোও। আজ কয়েকটা প্রদীপ জ্বালানো এর রাত। কয়েকটা প্রদীপ কেউ হয়তো জ্বালাবে পিএইচসি এর দোরগোড়ায়। কচি ধেড়ে সব ভূতেরাই হাত লাগাবে প্রদীপ জ্বালাতে কারণ আজ তো ওদেরই দিন থুরি রাত। প্রদীপগুলো সারারাত জ্বলবে কিনা ওরা খেয়াল রাখবে, সবগুলো নিভে গেলে ও একটা প্রদীপ যেন জ্বলে থাকে যেটা ওদের প্রিয় অভয়া দিদিমণির নামে। ওরা হাসবে, হাসতে হাসতে কেঁদেও ফেলবে, দিদিমনি কে আজ এই আনন্দের দিনে, উৎসবের দিনে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রনায়। বাইরে তখন আলোর মেলা। ভূতদের চোখের নোনা জল মিশে যাবে উত্তর চব্বিশ পরগনার মধ্যমগ্রামের, উত্তমগ্রামের, অধমগ্রামের মাটিতে। ভূত বলে কি কাঁদতে নেই ?

বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

আরজি কর কান্ডের নেপথ্যে ~ ডাঃ বিষাণ বসু

এই আন্দোলন এমন অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে - সমাজের সব অংশের মানুষের পবিত্র ক্রোধ যেভাবে প্রকাশ পাচ্ছে - যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখছি প্রতি মুহূর্তে - তাতে একে শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন বা ডাক্তারদের দেখানো পথে আন্দোলন বলে সীমায়িত করার প্রশ্নই নেই। এ একেবারেই জনগণের আন্দোলন। যথার্থ গণ-আন্দোলন। 

একটি মেডিকেল কলেজের একটি ঘটনা - যাকে 'ছোট ছেলেদের ভুল' বলে উড়িয়ে দেওয়া যেতেই পারত - এবং অন্তত একজন, আমার পরিচিত বৃত্তেরই একজন, তা-ই বলেছেন - হ্যাঁ, আরজিকর মেডিকেল কলেজের এক সন্দীপ-ঘনিষ্ঠ 'প্রফেসর' আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের বলেছেন, দ্যাখ, রেপ-মার্ডার তো কেউ ইচ্ছে করে করে না, ভুল করে হয়ে গেছে, আর মেয়েটা তো মরেই গেছে, তাকে তো ফিরিয়ে আনা যাবে না, এখন যারা এর'ম করে ফেলেছে তারাও তো আমাদেরই ছেলে, তাদের কেরিয়ারটা তো নষ্ট হতে দিতে পারি না - বিশ্বাস করুন, একজন চিকিৎসক-অধ্যাপক সত্যিসত্যিই এরকম বলেছেন - তো যা-ই হোক, মেডিকেল কলেজের সীমার মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা ঘিরে এমন বিপুল আবেগের বিস্ফোরণ আমি সুদূরতম স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি।

তাই একথা একবারও বলতে পারব না, যে, আপনারা এই আন্দোলনটা দেখছেন বাইরে থেকে - আর আমি দেখছি ইনসাইডার হিসেবে। কেননা, আমি জানি, এখানে আমার এবং আপনার অবস্থান একই - আমরা সবাই অংশগ্রহণকারী।

তবু কিছু কিছু দিকের কথা বলব, যেগুলো হয়ত আপনি আজ জানলেন - বা আগামীকাল কোনও 'ব্রেকিং নিউজ'-এর মাধ্যমে জানবেন - অথচ যে খবরগুলো আমি (এবং আমরা) অনেকদিন ধরেই জানি। জানি, এবং আপনাদের জানানোর চেষ্টাও করেছি - জানাতে গিয়ে সরকারের বিরাগভাজন হয়েছি - বাবা মারা যাবার মাসকয়েকের মাথায় বদলি হয়েছি, যে বদলির খবরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বয়স্ক মা আরও বিপর্যস্ত হয়েছে, এবং বদলি হয়েছি সদ্য গড়ে ওঠা এমন মেডিকেল কলেজে, যেখানে ক্যানসার চিকিৎসার কোনও বিভাগ থাকা তো দূর, বসার মতো একটি টেবিল-চেয়ারও জোটেনি, এছাড়া আমাকে পদোন্নতির ইন্টারভিউয়ে বসতে দেওয়া হয়নি, ইত্যাদি প্রভৃতি আরও অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত অভাব-অভিযোগ ফেসবুকে শোনানো বা প্যানপ্যান করার অভ্যেস আমার কোনও কালেই নেই, তাই আপনাদের এইসব কথা আগে বলিনি, আজও সেসব নিয়ে বিস্তারিত বলব না - তবে স্বাস্থ্য-দফতরের দুর্নীতি ও অনাচারের কথা আমি বারবারই বলে এসেছি, আপনারা শুনে আপাতভাবে বিচলিত হয়েছেন বটে, কিন্তু রাস্তায় নামেননি।

নামলে, 'অভয়া' মেয়েটা হয়ত বেঁচে থাকত। 

তবে হা-হুতাশ করার জন্য এই লেখা নয়। আসলে, এই আন্দোলনের সুবাদে এতজনকে, বিশেষত এত চিকিৎসককে আচমকা 'বিপ্লবী' হয়ে যেতে দেখছি - অনেকেই হয়ত এমনিতে সাতেপাঁচে থাকেন না, কিন্তু এবারে সত্যিসত্যিই তাঁরা বিচলিত হয়েছেন, 'অনেক হয়েছে আর না' বলে রাস্তায় নামছেন, কিন্তু এরই মধ্যে ডাকসাইটে বারবণিতা-সুলভ আচরণকারী কিছু চিকিৎসক-অধ্যাপককে যেভাবে আচমকা সতীলক্ষ্মী সেজে ঘোমটা টেনে তুলসীতলায় প্রদীপ হাতে নামতে দেখছি - তাতে ভয় হচ্ছে, ভোল বদলে এঁদেরও 'মূলস্রোতে' মিশে যাবার সম্ভাবনা। এই মুহূর্তে জল যে খুবই ঘোলা, সে নিয়ে তো সন্দেহের অবকাশ নেই - তাতে কইমাছ সেজে ঝাঁকে মিশে যাওয়া কী এমন কঠিন কাজ? তাই নিজের কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে এই লেখা।

এতদিনে আপনারা এটুকু জেনেছেন, যে, স্বাস্থ্য-দফতরে ভয়াবহ দুর্নীতি চলেছে গত কয়েকবছর। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, অনাচারের চূড়ান্ত ঘটেছে মেডিকেল কলেজগুলোতে। তো মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থার একজন ইনসাইডার হিসেবে কয়েকটা কথা লিখে রাখা ভালো।

১. গত কয়েকবছর ধরেই ডাক্তারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মেডিকেল কলেজগুলোয় বিক্রি হয়। পরীক্ষার কত ঘণ্টা আগে কে প্রশ্ন পাবে, তার উপর দাম নির্ভর করে। অর্থাৎ পরীক্ষার আধঘন্টা আগে পেলে একরকম দাম, দুই ঘণ্টা আগে পেলে আরেকরকম (বেশি দাম)। সঙ্গে দেওয়া হয় স্ট্যান্ডার্ড উত্তর। সুতরাং এনআরএস মেডিকেল কলেজের এবং নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার উত্তর কমা-ফুলস্টপ-সহ হুবহু মিলে যায়। (এখানে বলে রাখি, কেনাবেচা কিন্তু সবার জন্য নয়। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীকেই পড়াশোনা করে পাস করতে হয়েছে। সব মেডিকেল কলেজেই।) চিকিৎসক-অধ্যাপকদের সকলেই এটা জানতেন, জানেন। এ নিয়ে যাঁরা বিস্ময়ের ভান করছেন, তাঁদের মামণিকে বলুন কমপ্ল্যান খাওয়াতে।

২. প্রশ্নপত্র বিক্রির সার্কিটের মূল কেন্দ্র - রাজ্য স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়। সুহৃতা পাল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, তখন থেকেই এই ব্যবস্থার শুরু। সঙ্গে চক্রের পরিচালক হিসেবে মূল - অভীক দে এবং বিরূপাক্ষ বিশ্বাস। পরীক্ষক হিসেবে কে কোথায় নিযুক্ত হবেন, কে কে 'কথা শোনে' এসব হিসেবনিকেশও ওখানেই কষা হয়।

৩. সুহৃতা দেবী প্রতিভাবান মানুষ। উপাচার্য থাকাকালীন তিনি নিজের ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে 'মেন্টর' হিসেবে নিয়োগ করেন - ছেলে নিয়মিত মাসোহারাও পেত - নিয়োগ ঘটে পরীক্ষা বা ইন্টারভিউ ছাড়াই। এছাড়াও ছেলের নবগঠিত কোম্পানিকে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের কন্ট্র‍্যাক্ট পাইয়ে দেন। সন্দীপ ঘোষ, সুশান্ত রায়, অভীক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাস প্রমুখ তারকাদের ভিড়ে সুহৃতা পালের মতো গুণী মহিলার নামটি (বারাসাত মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষা) ইদানীং পেছনের সারিতে চলে গিয়েছে, ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনক। 

৪. অভীক দে এসএসকেএম হাসপাতালে সার্জারি বিভাগের ছাত্র। প্রান্তিক অঞ্চলে কোভিড বিভাগে 'সার্ভিস' দেবার সুবাদে বিশেষ কোটা পেয়ে তিনি স্নাতকোত্তরে ঢুকেছেন। বর্ধমান শহরের মেডিকেল কলেজের অনাময় ইউনিট কি 'প্রান্তিক অঞ্চল'? তদুপরি, অভীক দে যেসময় 'সার্ভিস' দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে, সেসময় সরকার 'কোভিড ওয়ার্ড' বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তবু অভীক দে কোটা পেলেন কী করে? সার্টিফাই করেছিলেন ডা কৌস্তভ নায়েক। বর্ধমান মেডিকেল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ। যিনি বর্তমানে রাজ্যের স্বাস্থ্যশিক্ষার সর্বোচ্চ পদে আসীন। ডিরেক্টর অফ মেডিকেল এডুকেশন। ডিএমই।

৪. মেডিকেল এডুকেশন সার্ভিসে বদলি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনেকদিনের। ইদানীং পরিস্থিতি বহুগুণে খারাপ হয়েছে। লাখ লাখ টাকা ঘুষের কারবার। এখানেও ডা অভীক দে ও বিরূপাক্ষ বিশ্বাসের হাতযশ। সঙ্গে আরজিকর মেডিকেল কলেজের এক জুনিয়র ডাক্তার ডা সৌরভ পাল। সে যা-ই হোক, সর্বোচ্চ পদে আসীন ডা কৌস্তভ নায়েকের স্নেহের পরশ তথা স্বাক্ষর বাদে কোনও বদলিই কার্যকর হতে পারে না - পারত না - বলা-ই বাহুল্য। অবশ্য যাঁরা খবর রাখেন, তাঁরা সকলেই জানেন - অভীক দে-ই আসল ডিএমই, বাকি কৌস্তভ নায়েক-টায়েক স্রেফ ফর্ম্যালিটি। এবং রাজ্যের প্রতিটি মেডিকেল কলেজে - হ্যাঁ, প্র-তি-টি মেডিকেল কলেজেই - অভীক দে তথা উত্তরবঙ্গ-লবির বিশ্বস্ত অনুচরেরা রয়েছেন। ছাত্র হিসেবে, বা জুনিয়র ডাক্তার হিসেবে, অথবা চিকিৎসক-অধ্যাপক হিসেবে - ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসক হিসেবেও।

৫. চিকিৎসাক্ষেত্রে নৈতিকতা তথা এথিক্সের দিকটি রক্ষিত হচ্ছে কিনা, তা দেখার ভার রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিলের। বিগত নির্বাচনে যাঁরা 'নির্বাচিত' হয়ে এসেছেন - ঠিক কীভাবে তাঁরা জিতেছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারে যাচ্ছি না, শুধু আনন্দবাজারের একটি সম্পাদকীয়-র লিঙ্ক কমেন্টবক্সে দিয়ে রাখছি - তো নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন ডা সুদীপ্ত রায় (প্রেসিডেন্ট), ডা সুশান্ত রায় (ভাইস-প্রেসিডেন্ট), ডা অভীক দে প্রমুখ। বিভিন্ন কমিটিতে আমন্ত্রিত সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ডা সন্দীপ ঘোষ, ডা বিরূপাক্ষ বিশ্বাস, ডা সুহৃতা পাল, ডা সৌরভ পাল প্রমুখ। সকলেই, বলাই বাহুল্য, স্বনামধন্য। এহেন মেডিকেল কাউন্সিল যে আমজনতার অভাব-অভিযোগ খুঁটিয়ে দেখা ও মেডিকেল এথিক্সের বিষয়গুলোর পর্যালোচনার চাইতে ব্ল্যাকমেইলিং ও তোলাবাজির দিকে বেশি নজর দেবে, সে নিয়ে তো সংশয়ের অবকাশ নেই।  

৬. মেডিকেল কাউন্সিল ইদানীং মেডিকেল কলেজে কলেজে ঘুরে নতুন ছাত্রছাত্রীদের এথিক্সের পাঠ দিয়ে থাকেন। সেখানেও এঁরাই শিক্ষক। যেমন আমাদের ঝাড়গ্রাম মেডিকেল কলেজে একবার এথিক্স পড়াতে এসেছিলেন বিশিষ্ট নীতিবান অধ্যাপক বিরূপাক্ষ বিশ্বাস ও নীতিচূড়ামণি সুশান্ত রায় মহোদয়। এবং এমন শিক্ষকরা যাতে এতটুকু মনোক্ষুণ্ণ না হন, তাই কলেজে কলেজে অধ্যক্ষরা এমন শিক্ষাক্রমে সকল অধ্যাপক-চিকিৎসকও (যদিও অনুষ্ঠানটি ডাক্তারি ছাত্রছাত্রীদের জন্যই) যাতে অবশ্যই হাজির থাকেন, সেই মর্মে দস্তুরমত হুলিয়া জারি করেন।

৭. কলেজে কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যাঁরা আছেন, এবং এমএসভিপি হিসেবেও, (বিরল ব্যতিক্রম বাদে) তাঁদের প্রায় সকলেই উত্তরবঙ্গ-লবির ধামাধরা। এঁদের মধ্যে কারও কারও মেরুদণ্ড রয়েছে - সে মেরুদণ্ড কারও জেলি-র মতো, কারও বা রাবারের মতো - অনেকেরই আবার মেরুদন্ডটি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে গত কয়েকবছরের এই অভাবনীয় অরাজকতা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে এঁদের সক্রিয় সহযোগিতার সুবাদেই। এঁদের কেউ কেউ কুকাজে সহযোগিতা করেছেন 'উপরমহলের নির্দেশ মেনে', কেউ আবার আগ বাড়িয়ে প্রোয়্যাক্টিভ হয়ে, প্রশাসনের সুনজরে আসার লোভে। অনেক বিভাগীয় প্রধানের ক্ষেত্রেও এই একই কথা। আন্দোলনের ঢেউয়ে এঁরা কেউ কেউ এখন ভালো সাজার চেষ্টা করছেন, কিন্তু আগের কাজকর্মগুলো ভুলে যাওয়া মুশকিল। 

আরও অনেক কথা-ই লেখা যেত - এবং আরও অনেক নামও। কিন্তু লেখাটা ফেসবুকের পক্ষে অলরেডি বেশি লম্বা হয়ে গেছে, আর বড় হলে কেউ পড়বে না।

মোদ্দা কথা হলো, স্বাস্থ্য-শিক্ষাব্যবস্থার যে বেহাল পরিস্থিতি, তাকে অন্তত কিছুটা ভদ্রস্থ অবস্থায় দাঁড় করাতে গেলেও যা যা বদল এখুনি করতে হবে - যে যে বদল না করলেই নয় -

ক) স্বাস্থ্য ভবনের শীর্ষপদে বদল। স্বাস্থ্যপ্রশাসক, যেমন ডিএমই থেকে শুরু করে আমলাদের (প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ও হেলথ সেক্রেটারি, যাঁরা তৃণমূল ছাত্র পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন, অভীক-বিরূপাক্ষদের সঙ্গে গা-ঘষাঘষি করেন, তাঁদের) বদল। মেডিকেল কলেজগুলোর অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদেরও বদলি দরকার - তবে শীর্ষপদে বদল ঘটলে, সম্ভবত, তাঁরা আপাতত সমঝে যাবেন। অধিকাংশই হাওয়ামোরগের জাত - হাওয়া বদলাচ্ছে বুঝলে শুধরে যেতে সময় লাগবে না।

খ) বর্তমান মেডিকেল কাউন্সিল এখুনি ভেঙে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন তদারকি কাউন্সিল গঠন করে নতুন কাউন্সিল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা।

এতগুলো কথা এজন্য বলা, কেননা, মূল ঘটনাটা ঘটেছে মেডিকেল কলেজে - যেখানে চরম অরাজকতা ও দুর্নীতির চাষ না হলে এ ঘটনা ঘটতেই পারত না এবং সেই ঘটনাকে লুকোনোর জন্য এতশত অপপ্রয়াসও হতো না - সুতরাং 'অভয়া'-র ধর্ষণ-খুনের ঘটনার 'জাস্টিস' চাওয়ার অন্যতম দিক, অন্তত আমার চোখে, এই পরিস্থিতির বদল। সম্পূর্ণ শুদ্ধিকরণ যদি না-ও হয়, পরিস্থিতির অন্তত খানিকটা উন্নতি।

হ্যাঁ, প্রমাণ লোপাটের জন্য বিনীত গোয়েলের অপসারণের দাবি খুবই যুক্তিযুক্ত। তবে মনে রাখতে হবে, প্রমাণ লোপাট বলতে তিনি এক তাল বিষ্ঠাকে কার্পেটের তলায় চাপা দিতে গিয়ে লেবড়ে ফেলেছেন।

কিন্তু বিষ্ঠাটি এলো কোত্থেকে? এই বিষ্ঠা কোন পায়ুদ্বার হতে নির্গত?

বিনীত গোয়েল - বা বিনীত গোয়েলরা - সরে যেতে পারেন (বা তাঁকে সরিয়েও দেওয়া হতে পারে), কিন্তু মূল উৎসমুখ বিষয়ে এখনই সোচ্চার না হলে পরবর্তী বিষ্ঠা চাপা দেবার জন্য উপযুক্ত সময়ে পরবর্তী কোনও বিনীত গোয়েল ঠিকই হাজির হয়ে যাবেন।


মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

কাটছে ভয় ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

কালচে মেঘ
লালচে মুখ
দিচ্ছে শান
মুষ্ঠিবদ্ধ, যুথবদ্ধ 
রুদ্ররূপ - রুদ্ররূপ
কাটছে ভয়
এই সময় 
থমকে যান
কাঁপছে আজ, কাঁদছে আজ
রাস্তাঘাট - রাস্তাঘাট
বাঁধছে জোট 
উঠছে হাত
গাইছে গান
উচ্চস্বর, হাজার কণ্ঠ
দাও স্লোগান - দাও স্লোগান
অচেনা মুখ
চেনা আবেশ
চাইছে আজ
বিচার চাই, এখুনি চাই
প্রতিবাদ - প্রতিবাদ
হাজার হাত
হাজার পা
লক্ষ মন
চেতনায় লাগছে কি 
আজ আগুন - আজ আগুন?
বাঁধো জোট
ব্যারিকেড
কন্ঠ পাক
আজকে প্রাণ 
দিক স্লোগান দিক স্লোগান

পুলিশ ~ ডাঃ বিষাণ বসু

এ পুলিশ কেমন পুলিশ, পেছন দিকের দরজা ধরো
এ কেমন চাকরি তোমার, মিথ্যে কথার আবাদ করো
এ পুলিশ কেমন পুলিশ, খিড়কি দিয়ে পালিয়ে বাঁচা
প্রমাণ লোপাট করেই খালাস, কাজটি তোমার বড্ডো কাঁচা

চাকরির আগে জীবন, পরেও জীবন, বাড়িতে বাচ্চার মুখ
শুধু কি তেল মেরে আর ঘুষ খাওয়াতেই সবটুকু সুখ
আপিসের বাইরে জীবন, রাস্তা পাড়ায়, ভুলেই গেছো
চাচারা করছে সেটিং, তুমিও এখন পালিয়ে বাঁচো
রাত জেগে চাইছে বিচার, কত মানুষ হচ্ছে জড়ো
(তোমারই) ঘরের মানুষ চাইছে বিচার, মেয়েটাও হচ্ছে বড়

মাইনেয় সুখ হয় না, উপরি চাইছ, জুটছে যে ঘুষ
গাড়ি বাড়ি বিদেশভ্রমণ, বিলাসের হাজার ফানুশ
দাবি চেয়ে জাগছে সবাই, পালানোর জায়গা খোঁজো
মেয়েও তোমায় ঘেন্না করে, অবস্থাটা নিজেও বোঝো

এ পুলিশ কেমন পুলিশ, মান বাঁচাতে মুখ লুকোনো
ফেসবুকের ওই ঢপ ছেড়ে আজ মানুষের স্লোগান শোনো
মানুষের ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে তোমাদেরও ছেলেমেয়ে
দাঁড়িয়ে আছে তোমার কাছে মরা বোনের বিচার চেয়ে
এখনও কষছ হিসেব, চাকরির আর প্রমোশনের
হিসেব তোমার মিটবে ঠিকই, চোখের জলে, রাত ও দিনের

ডাঃ বিষান বসু

সোমবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৪

আরজিকর কাণ্ড ~ ডাঃ বিষাণ বসু

আরজিকর কাণ্ডের পনের দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর, আমার যেটুকু ব্যক্তিগত উপলব্ধি, তাতে মনে হয়, সেই রাত্রে ঠিক কীভাবে কী ঘটেছিল, তা কখনোই আর পুরোপুরি স্পষ্টভাবে প্রকাশ্যে আসবে না। শুরুর দিনকয়েক কলকাতা পুলিশ যেভাবে সাফল্যের সঙ্গে 'তদন্ত' করেছে, তাতে এখন শার্লক হোমস এরকুল পয়রো ব্যোমকেশ বক্সী একযোগে নামলেও পরিপূর্ণ সত্য উদঘাটনের সম্ভাবনা কম। জড়িত কেউ স্বীকারোক্তি জাতীয় কিছু দিলে একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু আপাতত তেমন সম্ভাবনা তো কিছু দেখছি না।
অতএব, হয়ত 'প্রমাণ' হয়ে যাবে, যে, সঞ্জয়-ই এক এবং একক অপরাধী। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলেছে, ঘটনাস্থলে পাওয়া স্পেসিমেন-এর সঙ্গে তার ডিএনএ-ও নাকি মিলেছে, অতএব…
মদ খেয়ে চুর একজনের পক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক একটি মেয়েকে মারধর করে খুন ও ধর্ষণ এতসব করা সম্ভব কিনা, এসব প্রশ্নও, হয়ত, প্রশ্ন-ই রয়ে যাবে। আমাদের মেনে নিতে হবে, ধর্ষণ যদি সঞ্জয় করে থাকে (মেয়েটির জীবিত অবস্থায় বা মৃতদেহের উপর), তাহলে খুন-ও সে-ই করেছে। হয়ত সঞ্জয় সাজা পাবে, অথবা যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে গুরু দণ্ড কিছু পাবে না। এই সব কিছুর সঙ্গে আমাদের মানিয়ে নিতে হবে। এদেশে যেমন হয় আর কি!
এখানে পুলিশ অপরাধী ধরার চাইতে অপরাধের প্রমাণ লোপাট করার কাজে বেশি দক্ষ।
এদেশে সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা, তাদেরও অপরাধী ধরার রেকর্ড তেমন ঈর্ষণীয় কিছু নয়।
এদেশে মহামান্য সর্বোচ্চ আদালত আগ বাড়িয়ে শুনানি করতে ডেকে আদ্ধেক শুনে পনের দিন বাদে বাকিটা শুনবেন বলেন।
এমতাবস্থায় আমজনতা যায় কোথায়? খড়কুটো ধরে বাঁচার মতো, মোবাইল ফোনে ভেসে আসা অজস্র খবরের মধ্যে আশার আলো খোঁজেন। যে খবরের অনেকটাই কল্পিত। গুজব। কিন্তু আশা করতে যে বড় ভালো লাগে! বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, অমুকের দিকে সিবিআই এবার নজর দিচ্ছে... তমুকের সঙ্গে অমুকের যোগসাজশ প্রকাশ হয়ে যাবার মুখে...
আশায় আশায়, অনেকেই, খুব খুউব রাগ নিয়ে রাস্তায় নামেন। হাতে হাত রেখে লড়তে চান। প্রশ্ন করেন - এবারেও, এই এত বড় ঘটনার পরেও, কেউ ধরা পড়বে না? অনেকবার আশাহত হতে হলেও, আবারও আশায় থাকেন…
কোনও কোনও সাংবাদিক, দেখলাম, হয়ত শ্লেষের সুরেই তাঁদের প্রশ্ন করছেন - 'উই ওয়ান্ট জাস্টিস' বলে তো মিছিল করছেন, তা জাস্টিস-টা কার কাছে চাইছেন? শুনতে যতোই বিরক্তিকর লাগুক, প্রশ্নটা কিন্তু ভ্যালিড। এমতাবস্থায়, এই আশ্চর্য অবস্থায়, ন্যায় বলতে কী বুঝব? আর সেই ন্যায় কার কাছে চাইব??
দেখুন, এখনও অব্দি 'তিলোত্তমা'-র মৃত্যুরহস্যের সমাধান না হলেও একটা বড় রহস্য কিন্তু প্রকাশ্যে চলে এসেছে। মানে, ওখানে আর অতখানি রহস্য নেই। এবং 'তিলোত্তমা'-র ধর্ষক-খুনীর পরিচয় ততখানি স্পষ্ট না হলেও, এই রহস্যের কুশীলবদের নাম যথেষ্ট স্পষ্ট। সীমাহীন দুর্নীতি ও সেই দুর্নীতির কাণ্ডারীর নাম। নয়ই আগস্ট রাত্তিরের ঘটনা একা সঞ্জয়ের পক্ষে সম্ভব ছিল কিনা, সে নিয়ে সংশয়ের অবকাশ থাকলেও এই দুর্নীতি যে একা সন্দীপ ঘোষের পক্ষে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না, এবিষয়ে সকলেই নিঃসন্দেহ। খুন-ধর্ষণের দায় একা সঞ্জয়ের কাঁধে ফেলা সম্ভব হলেও হতে পারে - কিন্তু আরজিকর-এর অরাজকতার দায় একা সন্দীপের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা সফল হওয়া মুশকিল।
এবং এই দুর্নীতি - যা আরজিকর মেডিকেল কলেজে উৎকর্ষের শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেছিল অবশ্যই - কিন্তু তা কেবলমাত্র এই একটি মেডিকেল কলেজে সীমাবদ্ধ ছিল, এমন কখনোই নয়। কথাটা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক-অধ্যাপকদের সকলেই জানেন - জানতেন অনেকদিন ধরেই - তবে এখন হয়ত কেউ কেউ সেটা মুখে স্বীকার করতে পারবেন। আর ডাক্তারি-জগতের বাইরের লোকজন হয়ত কথাটা - দুর্নীতির এই লেভেলটা - সে বিষয়ে সদ্য জানলেন। মানে, বর্তমান আমলে দুর্নীতি যে কমবেশি সব জায়গায়ই চলে (আর স্বাস্থ্য-দফতর, প্রায় ঐতিহাসিকভাবে, ঘুঘুর বাসা), এটা সবাই জানেন - কিন্তু চিকিৎসা-শিক্ষার দুনিয়ায় তা যে এই স্তরে পৌঁছেছে, সেটা এখন জানতে পারলেন।
অনেকে হয়ত বলবেন, লাগামছাড়া এই দুর্নীতির শুরু ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই। হতেও পারে। হতেই পারে। কিন্তু, বর্তমান শাসকদলের একান্ত বিরোধী হয়েও বলি, আমার তেমনটা মনে হয় না। মানে, দুর্নীতি অবশ্যই ছিল - কিন্তু ব্যাপারটা এই স্তরে পৌঁছেছে গত কয়েক বছরে। মোটামুটি বলতে পারি, বিগত মেডিকেল কাউন্সিল নির্বাচনটি পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সে নির্বাচনে ঢালাও দুর্নীতি ইত্যাদি ঘটেছিল - সে আর কোন নির্বাচনে ঘটে না!! - কিন্তু সেই নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় শাসকদলের এমন একটি গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো, যাঁরা 'চিকিৎসক' হিসেবে বিবেচ্য হওয়ার যোগ্য কিনা, সে কথা তো ছেড়েই দিন, যাঁরা মানুষ হিসেবেই 'ভিন্ন' স্তরের। চিকিৎসার নৈতিকতার দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল কাউন্সিলের হর্তাকর্তা হয়ে বসলেন এমন নীতিবোধহীন কিছু 'চিকিৎসক', সেই দুর্ভাগ্যজনক সত্যির বাইরে আরও বড় বিপদ - এঁদের ক্ষমতা স্রেফ মেডিকেল কাউন্সিলে সীমাবদ্ধ রইল না। মেডিকেল কলেজে কলেজে অধ্যক্ষ থেকে ডিন, সর্বত্র নিযুক্ত হতে থাকলেন এঁদের পছন্দের লোক - সবাই ধামাধরা এমন বলব না, কিন্তু অধিকাংশই তেমনই - স্বাস্থ্যশিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিতদের ক্ষেত্রেও তা-ই। দেখুন, আরজিকর মেডিকেল কলেজের ঘটনায় মেডিকেল কাউন্সিলের এক কর্ণধার চটজলদি সেখানে হাজির হন, কাউন্সিলের আরও কিছু তরুণ সদস্যদের নিয়ে। মেয়েটির বাবা-মাকে আত্মহত্যার খবর জানানো হলেও, সেই একই সময়ে (বা তার আগেই) তিনি জেনেছিলেন ধর্ষণ ও খুনের খবর - একথা তিনি নিজেই মিডিয়াকে জানান। পুলিশের তদন্তের সময়কালে (নাকি আগেই) তিনি কেন এসেছিলেন? তিনি কেন ধর্ষণ খুনের ঘটনা বিষয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে মিটিংয়ে বসলেন? যে সন্দীপ ঘোষ বিষয়ে এত কথাবার্তা উঠছে, কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট মাসকয়েক আগেই তাঁকে ঢালাও সার্টিফিকেট দিয়েছেন। কাউন্সিলের তরুণ তুর্কীদের প্রায়শই দেখা যেত আরজিকর-এ - এমনকি মেডিকেল কাউন্সিল নির্বাচনের 'বিজয়োৎসব' প্রথম পালিত হয় ওই আরজিকর-এই। মেডিকেল কাউন্সিলের হর্তাকর্তারা স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নাক গলাচ্ছেন, এমন এর আগে ঘটেনি।
মেডিকেল ছাত্র-রাজনীতিতেও একটা বড় বদল এসেছে এঁদের কল্যাণে। স্টুডেন্টস ইউনিয়ন নির্বাচন তুলে দেওয়ার সুবাদে ছাত্র-রাজনীতি বলতে মূলত দাদাগিরি - তোলাবাজি ইত্যাদি - ও পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানো কমানো। শাসক-ঘনিষ্ঠ ছাত্র-রাজনীতি ও শাসক-ঘনিষ্ঠ অধ্যাপক-রাজনীতি যোগাযোগ রক্ষা করে চললেও দুইয়ের মধ্যে একটা দূরত্ব ছিল - দূরত্ব থাকাটাই স্বাভাবিক, এবং বাঞ্ছনীয় - বর্তমানে সেটি মুছে ফেলা গেছে। ছাত্র-নেতারা অধ্যাপকদের 'চমকায়' - অধ্যাপকরাও তাদের তোয়াজ করে চলেন, কেননা বদলি থেকে পদোন্নতি, সবই তরুণ তুর্কীদের হাতে। এবং স্বাস্থ্য-দফতরের শীর্ষ আমলা শাসকদলের ছাত্র-সংগঠনের অনুষ্ঠানে হাজির থাকেন - গদগদ হাসি মুখে পুষ্পস্তবক হাতে ছবি তোলেন - অতএব, আনাড়িরাও চট করে বুঝে যান, ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ঠিক কোনখানে।
তো পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাটা, এই মুহূর্তে, শাসকদলের যে গোষ্ঠীর দ্বারা যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে - অনভিজ্ঞ আনাড়ি দুর্নীতিগ্রস্ত মূল্যবোধহীন কিছু জুনিয়র ডাক্তারের দ্বারা, মূলত - সঙ্গে কিছু ঘোড়েল ও ধান্দাবাজ সিনিয়র তো আছেনই, যেমন থাকেন - তার খোলনলচে না বদলালে কিছুই কাজের কাজ হবে না।
জাস্টিস চাই, বলতে - অন্তত এটুকু হোক।
সরকারি কর্মী হিসেবে এবং রাজ্যের একজন নাগরিক হিসেবে, আমার জাস্টিস-এর দাবি আমাদের রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। একজন চিকিৎসক হিসেবে এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক হিসেবে দাবিটা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছেও।
সিবিআই তদন্ত করতেই পারে - মহামান্য আদালত বিভিন্ন আকর্ষণীয় 'অবজারভেশন'-এর পর পরবর্তী শুনানির তারিখ শোনাতেই পারেন - কিন্তু নিজের দলের সীমিত কয়েকজন গোষ্ঠীবদ্ধ মাফিয়া সিন্ডিকেট গোছের কিছু চালিয়ে গেলে তা শুধরানোর দায় সেই দলের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের। এখানে 'তদন্ত চলছে' বা 'বিষয়টি বিচারাধীন' বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। সব জানার পরেও - বিশেষত সব প্রকাশ্যে আসার পরেও - না শুধরাতে চাইলে ধরে নিতে হবে, এই অনাচার চলে এসেছে (এবং চলতে দেওয়া হবে) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতিতে।
তো স্বাস্থ্যমন্ত্রী পুলিশমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ জাতীয় কিছু দাবি আমার এখুনি নেই - গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত সরকারকে সরাতে গেলে ভোটের মাধ্যমেই সরাতে হবে, পদত্যাগের মাধ্যমে নয় - কিন্তু, জাস্টিস চাই বলতে আমি চাই রাজ্য স্বাস্থ্য-প্রশাসনের খোলনলচে বদল। প্রকাশ্যে যে মুখগুলো রয়েছে - চিকিৎসক-প্রশাসক থেকে শুরু করে আমলা অব্দি সকলেই - এবং আড়াল থেকে যারা কলকাঠি নাড়ছে, তার প্রতিটি স্তরে এখুনি বদল জরুরি। এবং যে চিকিৎসার নৈতিকতার দেখভালের দায়িত্ব যে মেডিকেল কাউন্সিলের, সেই স্টেট মেডিকেল কাউন্সিলের শীর্ষ সদস্যদের নাম যখন দুর্নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়, তখন সেই কাউন্সিলকে যে বরখাস্ত করা একান্ত জরুরি, সে তো বলা-ই বাহুল্য।
এটুকু-তে সর্বজনস্বীকৃত জাস্টিস হবে কিনা বলা মুশকিল, কিন্তু অন্তত এটুকুও না হলে যে স্বাস্থ্য-প্রশাসন ও সামগ্রিকভাবে প্রশাসনের উপর মানুষের আস্থা ফিরবে না, সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
এবং, আমার মতোই, রাস্তায় যাঁরা আছেন, বিশ্বাস করুন, এই পোস্ট হতাশার পোস্ট নয়। অন্তত এই দাবিটুকু যদি আদায় হয়, তা, অন্তত স্বাস্থ্যব্যবস্থার পক্ষে, মস্ত বড় বদল। রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং আগামী প্রজন্মের ডাক্তারি শিক্ষা - এই দুইয়ের পক্ষেই, এর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চাহিদা এখুনি মনে পড়ছে না।

বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৪

এক্সকিউজ মি, প্লিজ ~ শাশ্বত চক্রবর্তী

'এক্সকিউজ মি, প্লিজ'। ভিড়ের মধ্যে থেকে ভেসে  এলো বাজখাঁই আওয়াজটা, একদম বিশুদ্ধ ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট।  জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ মিছিল বেড়িয়েছিলো অমৃতসরে।  সেই মিছিলেই কালা আদমিদের ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এলো এক ধলা, হাতে তার মোমবাতি।  আবার গর্জে উঠলো তার বাজখাঁই কণ্ঠ: " উই ওয়ান্ট জাস্টিস"। কাম সারসে, এ যে স্বয়ং জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার!

- মানে? আপনিই তো গুলি চালালেন? আপনার আবার কিসের জাস্টিস চাই?

- আমি চক্রান্তের শিকার। আমরা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করেছিলাম। ডিপ্রেশনে ভোগা দেশিগুলো সব কুয়োতে ঝাঁপ দিয়ে সুইসাইড করল। প্রমাণ আছে আমার কাছে,মৃতদের পকেট থেকে প্রেসক্রিপশন পাওয়া গেছে।

 

হতভম্ব জনতাকে আরো অবাক করে দিয়ে মিছিলের আরেকদিকে তখন আবির্ভুত হয়েছেন আরেক সাদা চামড়া। ওরে বাবা, এযে পাঞ্জাবের গভর্নর মাইকেল ও'ডায়ার!

- আপনি তো সেদিনই বললেন ডায়ার যা করেছে ঠিক করেছ। আপনি আবার এখানে?

- উই ওয়ান্ট জাস্টিস।কিছুলোক পাঞ্জাবকে বদনাম করতে চাইছে। এই প্রতিবাদ মিছিলেও সশস্ত্র হামলাকারী মিশে আছে, হয়তো তথ্য প্রমাণ লোপাট করতে চায়। তাছাড়া এটাও জানানো দরকার আমাদের সেক্যুলার গভর্নমেন্ট কিন্তু এখানেও সেক্যুলার কাজই করেছ।

- মানে ?

- মানে হিন্দু-শিখ নির্বিশেষে সেদিন সবাইকে মারা হয়েছ।  ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে রেয়াত করা হয়নি।

 

ততক্ষনে মিছিলে হাজির বুদ্ধিজীবী শিরোমনি প্রখ্যাত সাহিত্যিক রুডিয়ার্ড কিপলিং।

- আপনি না সাম্রাজ্যবাদের প্রবল সমর্থক? আপনার মতে তো আবার ডায়ার নাকি ভারতের রক্ষাকর্তা! তা এদিকে কি পথ ভুল করে?

- উই ওয়ান্ট জাস্টিস।  এখন রাস্তায় না নামলে আমার বইয়ের বিক্রি কমে যাবে।  বিবিসি রেডিওতে 'ঘন্টাখানেক সঙ্গে ছিঁড়ুন' অনুষ্ঠানেও ডাক পাবো না আর। জবাব চাই, জবাব দাও।

- কার থেকে জবাব চাইছেন ?

- আপনাদের টেগোর এর থেকে।

- কেনো? উনি আবার এখানে কি দোষ করলেন ?

- আদিখ্যেতা হচ্ছে? নাদের শাহের সেনা যখন দিল্লীতে অতো মানুষ মারলো ,তখন নাইট উপাধি প্রত্যাখানের কথা মাথায় আসেনি ?কেবল দুনিয়ার সামনে ব্রিটিশরাজকে বদনাম করার ফিকির।

 

রবি ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালে।  ১৭৩৯ সনে নাদের শাহের আক্রমণের সময়ে তার বয়েস ঠিক কত ছিল সেই কঠিন অঙ্ক কষতে মিছিলের জনতা যখন ব্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে উল্টোদিক থেকে একটা ছ্যাকরা গাড়ি এসে থামলো মিছিলের মুখে। আজ শুধুই অবাক হবার দিন। কারণ গাড়ি থেকে নামলেন খোদ দেশের ভাইসরয়, চেমস্ফোর্ড সাহেব।  পরনে ধপধপে সাদা জামা, নীল কোট, পায়ে হাওয়াই চটি আর সাথে তার পোষা একঝাঁক বিড়াল। সাহেব আদর করে এদের নাম রেখেছেন লি-বেড়াল।  সে এক আশ্চর্য জানোয়ার মশায়।  ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাইরে কোথাও কিছু অন্যায় দেখলে এরাই ভোল পাল্টে সিংহবিক্রমে গর্জে ওঠে সুতীব্র প্রতিবাদে। আর দেশে কোনো ঘটনা ঘটলেই অমনি চেমস্ফোর্ড সাহেবের চটিচাটা মিউমিউ মেনিবিড়াল। আবেগমথিত কণ্ঠে বক্তৃতা শুরু করলেন চেমস্ফোর্ড সাহেব:

" জনতার আবেগকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে এর চেয়ে অনেক বড়ো নারকীয় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে মরক্কোতে, যেখানে শাসক স্প্যানিশ; এ্যাঙ্গোলাতে পর্তুগিজ, কঙ্গোতে বেলজিয়ান বা লিবিয়াতে ইতালিয়ান শাসকদের বর্বরতার কথাও ভুললে চলবেনা। আমরা জানি এই মিছিলেও  এইসব ব্রিটিশবিরোধী শক্তির প্রত্যক্ষ মদত আছে।  যাইহোক, জনদরদী ব্রিটিশ সরকার নিহতদের পরিবারবর্গকে আর্থিক সাহায্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।  মৃতের প্রোফাইল অনুযায়ী তার রেটকার্ড ধার্য হয়েছে। পাঁচ হাজার থেকে রেট শুরু ,আর কেউ ডাক্তার হলে তার পরিবার দশ লক্ষ টাকা পাবে। এছাড়া হান্টার কমিশন গঠিত হয়েছে, তাই অপরাধীদের নিস্তার নেই। উই ওয়ান্ট জাস্টিস।"

 

এতদূর শুনে মিছিলের মাঝে দাঁড়িয়ে চোয়া ঢেকুর তুলতে তুলতে জেনারেল ডায়ারের স্বগোতক্তি:

" ধুর মরা এই হয়েছে এক হান্টার কমিশন। গত ছদিন যাবৎ আমাকে ডেকে ডেইলি সাতঘন্টা ধরে সেই একই প্রশ্নগুলো করে যাচ্ছে আর আমিও চপ-সিঙ্গারা গিলতে গিলতে সেই একই উত্তর দিয়ে যাচ্ছি।  এত চপ-সিঙ্গারা খেয়ে আমার শালা অম্বল হয়ে গেলো"।

 

এদিকে কখন আবার মিছিলে যোগদান করেছেন সিডনি রাওলাট সাহেব। তার হাতে প্ল্যাকার্ড : 'এক দুই তিন চার, জনবিরোধী রাওলাট আইনের বহিস্কার'।

- এ আবার কেমন আঁতলামি? আপনিই তো যত নষ্টের গোড়া।  এ তো আপনার কমিটির তৈরী আইন !

- আমরা আইনের রচয়িতা। ল এনফোর্সমেন্টের দায় কেন নিতে যাবো? তাই সবার সাথে আজ আমিও প্রতিবাদে সামিল। উই ওয়ান্ট জাস্টিস"।

 

তারপর মিছিলটা অমৃতসর থেকে ট্রাফালগার স্কোয়ার হয়ে হাতিবাগান পেরিয়ে যেইনা শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে ঢুকেছে, ওমনি--------------------------------------------------------------

ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। উল্টোপাল্টা খেয়ে পেটগরমের স্বপ্ন আরকি। বাস্তবের কোন ঘটনার সাথে মিল খুঁজেতে যাবেননা আবার। এক্সকিউজ মি, প্লিজ।

বুধবার, ৭ আগস্ট, ২০২৪

ভীনেশের লড়াই ~ বিহঙ্গ দত্ত

এই মুহূর্তটার জন্য গোটা অলিম্পিক ধরে অপেক্ষা করে এসেছি। কিন্তু কাল রাতে সৌমিক যখন ড্র জানালো তখন বুঝলাম, এ হওয়ার না। বিশ্ব কুস্তিতে সুজাকি একটা নাইটমেয়ার। ৮২ টা লড়াই লড়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। একটিও হারেননি। আনসিডেড হয়ে অলিম্পিক মঞ্চে আসার কারণে ভীনেশের ড্র খারাপ হবে সবাই জানত। কিন্তু এক্কেবারে প্রথমেই বাঘের মুখে পড়বে জানা ছিল না। যখন পড়ল তখন রেপচোজের রাউণ্ডের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় দেখলাম না দুজনেই। 

কিন্তু কেন আনসিডেড থাকলেন ভারতীয় কুস্তির আখড়ার শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা? তাঁর লড়াই ৫৩ কিলো ক্যাটাগরিতে। অন্তিমকে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে সেই ক্যাটাগরিতে। পাঙ্গাল ভারতের কুস্তির নতুন তারকা। সবার নজর তাঁর দিকে। ভীনেশ যখন ডাইরেক্ট তাঁর নাম পাঠানোর আবেদন করে ফেডারেশনের কাছে সে কি কটূক্তি ভক্তকুলের! এ কারণেই তো আন্দোলন! এ কারণেই তো নমস্য রে*পি*স্ট ব্রিজভূষণজির বিরুদ্ধে কুৎসা! 

সাক্ষীর বয়স হয়ে গেছে। তাঁর দরজা যে এবার বন্ধ হবে সবাই জানত। জানত না যে বজরঙ-এর সঙ্গে এই নোংরামোটা হবে ডোপিং টেস্ট কিট নিয়ে। আরেকবার কোয়ালিফাই করার সুযোগ বরবাদ করে ভক্তকুল উল্লাসে ফেটে পড়ল। বজরঙ নেই। সাক্ষী নেই। ভীনেশ পুরো একা পড়ে গেল। ঠিক করল ওয়েট কমিয়ে খেলবে। 

রেস্টলিং-এ ওয়েট কমিয়ে খেলা ভয়ানক চাপের ব্যাপার। আজকেই দেখছিলাম যে ফুল মিল অব্দি করতে পারে না রেস্টলাররা। জল খাওয়া যায় না প্রপারলি। তাই নিয়ে ভীনেশ লড়ল মাত্র একমাসের নোটিশে এবং কোয়ালিফাই করল। ভক্তকুল বলল ফ্লুক! প্রথম রাউণ্ডেই ফুটে যাবে। 

তাই যখন সুজাকির নাম শুনলাম তখন দমে গেছিলাম। শুধু সরে যাওয়া না, চোট আঘাতের ভয় কাজ করছিল ভীষণভাবে। অনেকেই ১৬-র অলিম্পিকের ওই ভয়ংকর নি ডিসলোকেশনের দৃশ্য ভোলেননি। সেবার স্ট্রেচারে করে রিং ছাড়তে হয়েছিল ২১ বছরের ভীনেশকে। গতবছর সেই হাঁটুর চোটেই কেরিয়ার খতম হতে বসেছিল। অপারেশনের পর ক্রাচ নিয়ে হাঁটতে হত ভীনেশকে। 


দুপুর ৩ টে ১০। ভীনেশ লড়াই শুরু করল। ক্ষিপ্র চিতাবাঘের মতো ওঠানামা। সুজাকিকে ছুঁতে দিল না প্রথম হাফে। তবু একটাবার পায়ের নাগাল পেয়ে গেছিল সুজাকি। ১ সেকেণ্ডের ৫ ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে নিজেকে মুক্ত করে ভীনেশ। সুজাকির চোখে ওই প্রথম বিস্ময় দেখেছিলাম। 

কিন্তু উপায়ান্তর না দেখে ট্যাকটিকালি প্যাসিভ হওয়ার কারণে পরপর দুটো হাফেই একটা করে পয়েন্ট গিফট করল সুজাকিকে। ম্যাচের বাকি আর ১০ সেকেন্ড। বিমর্ষ হয়ে গেছি। তখন ঝলসে উঠল তরবারির মতো দুটো হাত! 

এই হাতদুটোকে ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল দিল্লি পুলিশ। সাতজন মিলে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে ছুঁড়ে ফেলেছিল রাস্তার ধারে। ব্রিজভূষণ সহাস্য মন্তব্য করেছিল- কান্ধো কি জোর কম পড় গ্যায়ি ক্যা? 
 কান্নায় ভেঙে পড়তে পড়তে এই হাতদুটো জড়ো করে ভীনেশ আর বজরঙ্গ বলেছিল সরযূর তীরে মেডেল ভাসিয়ে দেবে। 
সাক্ষী বলেছিল- আই কুইট! 

সেই হাত ঝলসে উঠল। সুজাকি তখন জয়ের জন্য প্রায় নিশ্চিত। একটু কি কোর্টের কোনায় সরে গেছিলেন? ক্রুদ্ধ ঈগলের মতো আঁকড়ে ধরে উল্টালেন ভীনেশ! সপাটে আছড়ে পড়ল সুজাকি কোর্টের বাইরে। রেফারির হাত উঠল দুটো আঙ্গুল উঁচু করে। 

প্রথম খানিকক্ষণ বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমি আর সৌমিক দুজনেই হোয়াটস্যাপে বারবার একে অপরকে লিখে যাচ্ছি ওহ মাই গড! ওহ মাই গড! 
অপ্রতিরোধ্য ৮২-র গতি থামল। স্ক্রিনজুড়ে বড়ো বড়ো করে লেখা হল ৮২-১। 

বেলা ৪টে ৩০। পরের লড়াই ইউক্রেনিয়ানের সঙ্গে। রেস্টলিং এক তুমুল নিষ্ঠুর খেলা। যে জিতছে সে দম ফেলার অবকাশ পায় না। আগেই লিখেছি ভীনেশকে ওয়েট কমাবার জন্য কী কী করতে হয়েছে। ওই অশক্ত অবস্থায় কোয়ার্টার খেলার জন্য নামল ভীনেশ। ইউক্রেনিয়ান ওকসানা এদিকে ১০-২ এ ম্যাচ হারিয়ে ফুটছে রীতিমতো। ধীরস্থির শুরু হল। খানিক পরেই বোঝা যাচ্ছিল এ লড়াই ভীনেশ শুধু জেতার জন্য লড়ছে না। লড়ছে এক আকাশ অপমান আর আসমুদ্র লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে। ব্রিজভূষণ বলেছিল ১৫ টাকার মেডেলজয়ী! ওই যে সাক্ষীকে চ্যাং দোলা করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ! বজরঙ-এর মুখে থুথু মেরেছিল ভক্তরা! সবাই দেখো, আমি লড়ছি। সাতজন মিলে টানতে টানতে যখন নিয়ে যাচ্ছিল তখনও হাত থেকে জাতীয় পতাকা সরেনি। সে হাত এত সহজে হার মানবে না। 
 
পরপর সিঙ্গল লেগ অ্যাটাক! ৪-০ তে এগোলো ভীনেশ। ছাড়ার পাত্র নয় ওকসানা। ট্যাকটিকাল মুভে আছড়ে ফেলল ভীনেশকে কোর্টের বাইরে। মাঝে খেলা বন্ধ হল দুইবার। কিছুতেই শেষ টাইম সেট করতে পারছেন না জাজেরা। শেষ ৮ সেকেণ্ড! কোর্টে তখন ঝড় উঠেছে। একটা হিলহিলে সাপের মতো নিজেকে বাঁকিয়ে চুরিয়ে ওকসানার হাত থেকে বাঁচাচ্ছেন ভীনেশ! ফিনিশিং বেল বাজল গম্ভীর সুরে। 

মিডিয়া উত্তাল এখন। কেউ যা ভাবেনি তাই হতে চলেছে কি? ভল্ট ঘেঁটে সোশাল মিডিয়ায় উঠে আসছে দিল্লির রাজপথের ছবি, উঠে আসছে হাতজোড় করে কান্নার বিমর্ষ দৃশ্য! উঠে আসছে বিষাক্ত সাপেদের ছোবল মারার মুহূর্তগুলো! 

রাত ১০টা ১৫। সেমিফাইনাল। বিপক্ষ কিউবান আগের ম্যাচে পুরো সময় খরচাই করতে দেননি। ১০-০ স্কোর করে দিয়েছেন অনায়াসে। কিন্তু এ ধারে ভারে ভীনেশের মাপের রেস্টলার নয় তা বলছিল অ্যানালিস্টরা। এই বছরেই ভীনেশ একে হারিয়েছে ৩-১ এ। লড়াই শুরু। প্রথম হাফে চারবার লেগ অ্যাটাক বাঁচাল ভীনেশ। দ্বিতীয় হাফে যখন প্যাসিভ পয়েন্ট যাচ্ছে ভীনেশের এগেন্সটে তখন কমেন্টেটর খানিক অশান্ত। এত কেন স্লো খেলছে? উল্টোদিকে সাক্ষী তখন বড্ড ঠাণ্ডা গলায় বলল, একটা সুযোগের অপেক্ষা করছে ভীনেশ! পেলে ম্যাচ বের করে নেবে। সুযোগ এল প্যাসিভ পয়েন্টের একদম শেষ ১২ সেকেণ্ডের মাথায়! এবার ডাবল লেগ অ্যাটাক! জানপ্রাণ দিয়ে পাক মারছে গোটা শরীরটা! কোথায় ব্রিজভূষণের চ্যালারা? কোথায় গোদি মিডিয়া? কোথায় আইটি সেলের ট্রলবাজরা? ওই ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের মেডেলটাকে ১৫ টাকায় কেনা যায় বলেছিলি! সব দাঁত নখ নিয়ে আয়! দেখ, ভীনেশ লড়ছে! পরপর ৪ পয়েন্ট এল। ম্যাচ ওখানেই শেষ। 

কোনও কোনও ইতিহাস তৈরি হয় বড্ড নিশ্চুপে। যাকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়েছিল আইটিসেল বাহিনী তাঁর কাঁধে আজ গোটা দেশের ভার। ওই কাঁধের জোর মাপতে গেছিল ব্রিজভূষণ! আসুন বাহুবলি! মেপে যান! 

সামনে ফাইনাল। ভীনেশ একা নয়। পেছনে ভূতের মতো উঠে আসছে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রের চাষীরা। উঠে আসছে তাঁর সংগ্রামসঙ্গী সাক্ষী মালিক, বজরঙ্গ, দিদি গীতা, বৃদ্ধ জ্যাঠা মহাবীর সিং ফোগট! উঠে আসছে মতি নন্দীর গল্পের চরিত্ররা! ট্রামের পাদানি থেকে অফিস কামাই করে নামল কমল গুহ। গ্যারেজের কাজ সেরে ছুটতে ছুটতে হাজির হল প্রসূন। শীতল, কালো জল ঠেলে উঁকি দিল কোনির মুখ, রুটির দোকানের মাল নামিয়ে ঋজু হয়ে দাঁড়াল শিবা! সিনা টান করে দাঁড়াল গোটা ভারতবর্ষের মেহনতি! 

ফাইনালের দিন এরা সবাই থাকবে। ভীনেশ ফোগট জানে ওই মারণপ্যাঁচের থেকেও কঠিন ছিল সেদিনের ঘাড়ধাক্কা, থুৎকার! সেদিন হাল ছাড়েনি যে বন্ধুরা, তারা ছেড়ে যাবে না ভীনেশকে। একাকী যাবে না অসময়ে।


সোমবার, ২২ জুলাই, ২০২৪

πকাব্য ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

πকারি দরে পটল বেগুন লাউ কুমড়ো বা উচ্ছে
ছাπ  সাড়ির নানা ডিজাইন রঙিন ময়ূরপুচ্ছে!
জলπ আর জল এক নয়, ডিফারেন্স নয় অল্প
চারিদিকে কত শিক্ষিত চোর, πরেট কপি গল্প।
πরিয়া আর πলসের কোন স্থায়ী সমাধান πনে
শিমলা গিয়েছে মুগ্ধ হয়েছি দেবদারু আর πনে।
πথন শিখে মাইথন গিয়ে কোπ নদীর পার্শ্বে , 
πনি তোমার দর্শন প্রভু পৃথিবী বা মহাকর্ষে।
πইক সেπ বরকন্দাজ সাজুগুজু বরযাত্রী
πপয়সার হিসেব কি দেয় কলেজ ছাত্রছাত্রী।
শনি বুধ আর বিশ্যুদবার πইকপাড়ায় যাই না 
মাঝে মাঝে তব দেখা π চিরদিন কেন π না।। 

হ্যাপি ২২/৭ দিবস। যদিওবা অফিসিয়ালি পাই ডে চোদ্দই মার্চ(৩.১৪)।

শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪

ইস্কুল, মিড ডে মিল ও তাঁর নিজস্ব অনুভব ~ সীমান্ত গুহঠাকুরতা

 

"মাস দুয়েক হল এক চরম অভাবের সংসারের কর্তা সেজে বসেছি। এ এক অদ্ভুত 'নেই-রাজ্য'। স্কুল-বাড়ি ভেঙে পড়ছে -- রক্ষণাবেক্ষণের পয়সা নেই, শিক্ষক নিয়োগ হয় না -- আংশিক সময়ের শিক্ষকের বেতন দেবার সামর্থ্য নেই,  বাচ্চারা প্রচন্ড গরমে কষ্ট পাচ্ছে -- পর্যাপ্ত পাখা কেনার ফান্ড নেই, স্কুল চত্বরে রাত্রে বহিরাগত সমাজবিরোধী ঢুকছে – নিরাপত্তা রক্ষী রাখার অনুমতি-অধিকার কোনোটাই নেই। বাচ্চাগুলো ক্ষিধেয় মুখ কালো করে ঘুরে বেড়ায় -- তাদের পাতে একটু সুখাদ্য তুলে দেবার ক্ষমতাও নেই। মাথাপিছু বরাদ্দ যা, তা দিয়ে ওই ডাল-ভাত-আলু কুমড়ো অথবা আলু-সয়াবিনের 'থোড় বড়ি খাড়া খাড়া বড়ি থোর' চালিয়ে যেতে হয় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। 

কিন্তু ভালোবাসা? সেটুকু কি আছে আমাদের? শাস্ত্রে বলেছে 'শ্রদ্ধায়া দেয়ম্‌', অর্থাৎ যাকে যেটুকু দেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেবে। শ্রদ্ধা তো অনেক বড় ব্যাপার, বাচ্চাগুলোর পাতে দুপুরের অন্নটুকু তুলে দেবার সময় সামান্য দরদ বা ভালোবাসাটুকুও কি আমাদের থাকে? আমরা, পেটমোটা মধ্যবিত্তের দল আজও তো মিড-ডে মিলটাকে নিছক দয়া হিসেবেই দেখি, ভাবি রাষ্ট্রীয় খয়রাতি। আর আমার মত যারা ব্যবস্থাটার সঙ্গে জড়িত তারা তো এটাকে পড়াশুনার সঙ্গে সম্পর্কহীন একটা উটকো ঝামেলা হিসেবেই গণ্য করি। তাই গ্রামের সেলফ-হেলফ গ্রুপের মহিলারা রান্না করেন, বাচ্চাগুলো থালা হাতে গিয়ে দাঁড়ায়, ভচাৎ করে এক থাবা ভাত আর এক হাতা ডাল এসে পড়ে, সেই থালা নিয়ে গিয়ে ওরা কোনো কোনায় গিয়ে বসে গপগপ করে গেলে। কেউ কোনোদিন ওদের ডেকে জিজ্ঞেসও করে না, 'কীরে, পেট ভরেছে?' কিংবা 'আরে একটু ভাত বা তরকারি নিবি?' কেউ ভুলেও জানতে চায় না, 'আজকের রান্নাটা কেমন হয়েছে রে?' 

মাঝে মাঝে পরিদর্শকরাও আসেন। তিনি রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর বা খাবার ঘর – কোথাও উঁকিটিও মারেন না। এসেই অফিসঘরে খাতা-পত্তর নিয়ে বসে যান, অর্থাৎ কাগজ-পত্রে হিসেব-নিকেশ ঠিক থাকলেই তিনি খুশি। সেই হিসেব উপর-মহলে গেলে উপর-মহলও খুশ্‌। বাচ্চাগুলো খাচ্ছে, নাকি কাগজপত্র খাচ্ছে – বোঝা দায়!! প্রতিবার পরিদর্শনের শেষে তিনি যখন প্রসন্ন চিত্তে গাড়িতে উঠে বসেন, তোতাকাহিনীর সেই নিন্দুকের মত তাঁকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করে, 'মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি?' 

ছোটবেলায় দেখেছি চূড়ান্তের অভাবের সংসারে মা কচু-ঘেঁচু কত কিছু রাঁধত। কিন্তু যা-ই রাঁধুক না কেন, খাবার সময় তা থালায় করে তা সাজিয়ে দিত পরম যত্নে। মায়ের সেই ভালবাসাটুকুই তো অর্ধেক পেট ভরিয়ে দিত। আমি তাই জানি, পাতে কী তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল সেই খাবারের সঙ্গে মিশে থাকা দরদটুকু, যত্নটুকু, ভালোবাসাটুকু। 

আজ সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি। আবহাওয়া মনোরম। হুকুম দিয়েছিলাম, আজ তবে খিচুড়ি হোক। সঙ্গে ভাজাভুজি কিছু হবে না? ডোন্ট পরোয়া। খিচুড়িতেই পড়ল আলু, টমেটো আর ডিম ভুজিয়া। লোভ সামলাতে না পেরে থালা হাতে দাঁড়িয়ে গেলাম ওদের সঙ্গেই এক লাইনে। আনন্দে হইহই করে উঠল ভৈরব বাহিনী। তারপর ওদের সঙ্গেই বসে সুড়ুৎ-সুড়ুৎ করে গরম-গরম খিচুড়ি আর অঢেল গল্প। একজন বলল, 'স্যর, আজ কিন্তু খিচুড়িটা হেব্বি হয়েছে'। বললাম, 'যা, আরেকটু নিয়ে আয়'। একগাল হেসে ছেলে দৌড় মারল থালা হাতে। আরেকজন খেলার টানে অর্ধেক খেয়ে উঠে যাচ্ছিল, বাকিরা ধমক দিল, 'অ্যাই, স্যর বলেছে না, ভাত নষ্ট করতে নেই'। সে বেচারি কাচুমাচু মুখে আবার খাবারে মন দিল। 

'দেশে-বিদেশে'-তে মুজতবা আলি পাঠানদের মেহমান-নওয়াজীর বর্ণনা দিতে গিয়ে দিয়ে একটি বাক্যে লিখেছেন, 'দোস্ত/তুমহারে রোটি, হামারে গোস্ত', অর্থাৎ 'তুমি যে আমার বন্ধু এই আমার পরম সৌভাগ্য, শুধু শুকনো রুটি আছে? কুছ পরোয়া নেই, আমি আমার মাংস কেটে দেব'।"

শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০২৪

চন্দন বসু নিয়ে ~ অশোক চক্রবর্তী

ঢাকা পড়ে থাকা কিছু কথা॥ 

১৯৬৯ এ বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় ডিভিশনে পাশ করে চন্দন ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯৭১ তে পারিবারিক পরিচিতির সূত্রে ফারুক আবদুল্লা তাকে রাজ্যের কোটায় জম্মু কাশ্মীর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করান । ১৯৭৪ তে পড়া অসমাপ্ত রেখে তিনি কলকাতায় ফিরে এসে আবার সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি হন । 
১৯৭৭ তে বেঙ্গল ল্যাম্প এ সেলস ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি হিসেবে কাজে ঢোকেন ,  স্নিগ্ধা ওয়াহির সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে হয়। স্নিগ্ধা হলেন ইন্ডিয়া স্টিমশিপে কাজ করা শিশির ওয়াহি'র বোন। শিশির রিটায়ার করে কলকাতা ফিরে কিছু ব্যবসা করার চেষ্টা করেন। এদিকে ১৯৭৮ এ চন্দনের প্রথম কন্যা হয় এবং যেহেতু তার সংসার আলাদা ছিলো, সেও খরচ সামলানোর জন্য কিছু একটা করার কথা ভাবছিলো। 

এসময় ব্রিটানিয়া বিস্কিট মুর্শিদাবাদে  তাদের সেলস ফ্রাঞ্চাইজি খুঁজছিলো।  শিশির ও চন্দন , "ওম্কার ট্রেডিং কোম্পানী" নামে সেই ফ্রাঞ্চাইজি নেয়।  তখন বিস্কিটের বাজার ছিলো বাংলায় প্রায় ৩০ কোটির আর বৃদ্ধি ছিলো বছরে ২০ % হারে। 

শিশির চন্দন একটা বিস্কিটের নিজেদের কোম্পানী খুলতে চেয়ে ১৯৭৯ তে তৈরি করলো, নিজেদের সঞ্চয়ের ৫ লাখ ক্যাপিটালের "ইস্টার্ন বিস্কিট কোম্পানি"। Durgapur Development Authority এর কাছে ৬০ বছরের জন্য জমি লিজে পেলো,  SME হিসেবে ২ একর, একর প্রতি ৫০,০০০টাকায় ।  ৩৪,০০০ টাকা জমা দিয়ে ও বাকি টাকা ৪ টি কিস্তিতে দেবার চুক্তিতে জমির পজেসন পেলো। এসবই সরকারি নিয়মে চলছিলো। প্ল্যান্ট ডিজাইন সরকারি কর্তাদের পরামর্শ নিয়ে স্ক্রুটিণি করিয়ে জমা দেওয়া হলো আর সেভাবেই প্ল্যান্ট তৈরি এগিয়ে চললো । 

সরকারি নিয়ম মেনে WBFC এর কাছে ২৪ লাখ  ব্যাংক লোনের জন্য কোম্পানী দরখাস্ত করলো। টার্ম ক্যাপিটাল ২৯ লাখ, ওয়ার্কিং ক্যাপিটল ১২ লাখ ,  মোট ৪১ লাখ । মার্চ,  ১৯৮০ স্যাংসন হলো ১৮ লাখ, মে তে ডিসবার্স হয় ৯ লাখ। সরকারি ও ব্যাংকের নিয়মে এক SSI হিসেবে ৩,৪৫ লাখ টাকা ক্যাশ সাবসিডি ও   ৭৫ হাজার টাকা সিড মানি পাওয়ার কথা।  একেতো প্রোজেক্ট আর্থিক সহায়তা ৬৬ % কমিয়ে দিলো ব্যাংক তার উপর ৪,২০ লাখ টাকা আটকে রাখলো তারা। 

এদিকে যখন প্ল্যান্ট অনেকটাই হয়েছে,  DDA আসরে এসে জানালো প্ল্যান্ট ডিজাইনে ভুল আছে। ক্যাশ ক্রাঞ্চ এ ভুগতে থাকা একজন এন্টারপ্রেনার এর কাছে এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর হয়না । 

কিন্তু আরও বড় দুঃসংবাদ টা এলো "বিপ্লবী" যতীন ও তার সহোদর(!) সুবোধ বাবুদের দলের কাছ থেকে। আনন্দবাজার/ বর্তমান দের কাজে লাগিয়ে চন্দনের বিরুদ্ধে কুৎসা শুরু করলেন কারন তারা ভেবেছিলেন এতেই জ্যোতি বাবুকে পাঁকে নামাতে পারবেন।  

মমতা দেবীর ভাইপো , হেকিম সাহেবের মেয়ে, মাঝি সাহেবের ছেলে , কাকলী দেবীর দুই ছেলের নাম সম্প্রতি আম জনতা জানতে পেরেছে ডাক্তার বলে। এর বাইরে কতো সব ""পোতিভাবান" ছেলে মেয়ে আছে এমন নেতাদের যারা ডাক্তার হয়ে বসে আছেন। কিভাবে তারা ডাক্তার হয়েছেন তার একটা নমুনা ছিলো মাঝি সাবের ছেলের পরীক্ষা নিয়ে সংবাদ ভাষ্যে। 

এর বাইরে যারা আজ প্রকাশ্যে তাড়া তাড়া নোট নিচ্ছেন, যাদের মধ্যে আছেন অমিত শা'র ছেলে জয় শা বা মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জী ,(এমনকি মোরারজি'র ছেলে কান্তিভাই)  যাদের কড়ে আংগুল সঞ্চালনে ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা লুট হয়ে যায়, যেসব পার্টির খুচরো পাড়ার নেতা ঠিক করে দেন কার কপালে কতো কাটমানি জমা পড়বে  তারা ভাবতেই পারবে না সর্ব শক্তিমান মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে ২০/ ২৫ লাখ টাকার সংস্থান না করতে পারার জন্য আর DDA /WBFC স্তরের কিছু পুঁটি অফিসারের বিরোধিতার জন্য এক নবীন এন্টারপ্রেনার তার সঞ্চয় জলে ফেলে বাড়ি চলে এলো। 

জ্যোতিবাবুকে কিছু বলতে হতো না ,  শুধুই জয়কৃষ্ণ বাবু এদের কাউকে দেখে না হাসলেই যখন চন্দন হার্ডল মুক্ত হতে পারতো সেখানে সেটুকু মাত্র এঁরা করেননি।  

আনন্দবাজার/ বর্তমান এবং যতীন/সুবোধ চক্র এক নবীন এন্টারপ্রেনার কে ধংস করতে চেয়েছিলেন ।  

চন্দন তাই বলেছিলেন,  আমার অপরাধ ছিলো আমি জ্যোতি বসুর মতো এক রাজনীতিকের ছেলে হয়ে জন্মেছিলাম তাও আবার এই বাংলায়। 

জ্যোতিবাবুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাঁর ছেলেকে নিয়ে কেনো লিখলাম ? 
উপসংহার টা হলো ,  জ্যোতি বাবুর এই ঋজু ও সততাকে কোনও মতে  ঢাকা দেওয়া যাবে না  "মমতা সততা শাড়ি"র ঢক্কানিনাদে॥ জ্যোতিবাবু তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রেও সৎ জীবন কাটিয়েছেন॥ 

জ্যোতিবাবু / বুদ্ধবাবুর ব্যক্তি সততার ক্ষেত্রে পায়ের নখের যোগ্য নন তাঁদের সমালোচকেরা ॥ রাজনীতির সমালোচকরা রাজনীতির সমালোচনা করুন কিন্তু ব্যক্তিগত সততার প্রশ্নে কিছু বলার আগে নিজের দিকে তাকান ॥  

কৃতজ্ঞতা :  জ্যোতির্ময় হাজরা দা 

তিনি নেই, তাঁর ছড়িয়ে যাওয়া মণিমানিক্য গুলো আছে!❤❤

সোমবার, ১ জুলাই, ২০২৪

ডক্টরস ডে ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত


চেতনার জগতের এক মহাশূন্যতা আর ভারসাম্য রক্ষা করার খেলায় নিয়োজিত দুই খেলোয়াড়, চিকিৎসক আর রুগী আর বাকি অসংখ্য মানুষ যারা সবাই স্বঘোষিত আদর্শবান রেফারি হিসেবে হুইসিল মুখে অপেক্ষমান যে চিকিৎসকদের বিন্দুমাত্র ত্রুটি বিচ্যুতি দেখলে "ফাউল" বলে ফুউউউর করে বাঁশি বাজিয়ে দিতে সদা প্রস্তুত এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষার স্বার্থে চিকিৎসক সমাজের একটা বড় অংশ নিজেদের, ঈশ্বর নই, নিছক পেশাদার" এই মডেলটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছেন। 

দার্শনিক রেনে দেকর্তে এর দ্বিত্ববাদের এই মডেল, যাতে প্রাণ ও মনকে আলাদা ভাবে দেখানো হয়েছে তার সীমাবদ্ধতা এইখানেই যে সেটা চিকিৎসককে নিরাসক্ত, নৈব্যর্তিক বিজ্ঞান-পেশাদার এর সীমাবদ্ধ ভূমিকায় আটকে রেখেছে। ওই মডেল এর বিপ্রতীপ কোনো মডেল যেখানে যুক্তিশাস্ত্র, মনস্তত্ববিদ্যা, নীতিশাস্ত্র সবকিছুই মিশে আছে,  মেডিসিন এর তেমন  দর্শনতত্ত্ব এর তত্ত্বতলাশ সামান্য একটু করে দেখা যেতে পারে। 

ডাক্তার শব্দটা শব্দতত্ব অনুযায়ী আসলে শিক্ষক থেকে এসেছে। চিকিৎসকের ঐতিয্যপূর্ণ অবয়ব ও অবস্থানের ঐতিহাসিক বস্তুগত উপাদান আছে যার ওপরে দাঁড়িয়ে রুগীর সাথে(এবং তার বাড়ির লোকের সাথে) সংলাপে তার ভূমিকাটা নিরূপিত হচ্ছে।ইন্টেলেকচুয়াল হেজিমনির আসন থেকে সরে এসে (যেমনটা রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন), একজন চিকিৎসক রোগীকে বা তার বাড়ির লোককে ঠিক কি ধরনের যে ভাষা, শব্দ প্রয়োগ করে সংলাপে যাবেন যাতে করে সেটা অন্যদের অনুধাবনযোগ্য হয়, সেটা মস্ত একটা চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জের এটা শেষ নয়, এটা শুরু। 

বিংশ শতাব্দীর মেডিক্যাল এথিক্স এর সম্ভবতঃ সবচেয়ে পরিচিত বিশেষজ্ঞ ডাঃ এডমান্ড পেলেগ্রিনো এর ভাষায় "মেডিসিন হল বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে সবচেয়ে মানবিক, শিল্পকলাগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রায়োগিক এবং মানবীবিদ্যাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত।" উনি লক্ষ্য করেছেন যে "মানবজীবনের সমস্ত সমস্যা - নিরাসক্তি, অনুরাগ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আত্মীয়তা, এমনকি মোক্ষলাভ অবধি মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে যে অস্তিত্ববাদী পরীক্ষণাগারে তার নাম হাসপাতাল। প্রতিটি মানবতাবাদী প্রশ্ন আরো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে যখন বস্তুগত পরিবেশে তাকে ফেলা হয়।" 

ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রেক্ষিতে মেডিসিন এর বিষয়গুলি (স্বাস্থ্য, অসুস্থতা এবং অসুস্থ মানুষ) এবং মেডিসিন এর লক্ষ্যবস্তু (চিকিৎসা, হৃত স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার, অথবা স্রেফ কষ্ট যন্ত্রণার উপশম) চিহ্নিত করতে আমাদের সাহায্য করেছে কিছুদূর অবধি। পরিবেশগত, পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার জন্য যে চিকিৎসক তার অধিত বিদ্যার পুরোপুরি প্রয়োগ করতে পারছেন না, তার মানবতাবাদী প্রশ্নগুলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশাসক,  আয়োজকদের নির্মম নিরাসক্ত উদাসীনতার নিরেট পাথরের দেয়ালে মাথা কুটে মরছে, দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জের সেইখানে শুরু। ওয়ার্ডে কুকুর বিড়ালের সাথে সদ্যজাত মনুষ্য সন্তানের  শান্তি পূর্ন সহবস্থানকে একজন চিকিৎসকের পক্ষে নিরাসক্ত, নৈব্যর্তিক বিজ্ঞান-পেশাদার হিসেবে মেনে নেয়াকে আর যাই হোক, দেকার্তে মডেল বলা যায় না। 

ডাক্তার তাহলে আর ঈশ্বর রইলেন না, চিরন্তন শিক্ষক রইলেন না, নৈব্যর্তিক পেশাদার রইলেন না, তিনি নেমে আসলেন একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে রুগীদের মাঝে তাঁর যাবতীয় যত্নআত্তি, সমবেদনা ও করুণা দিয়ে রুগীকে জড়িয়ে ধরতে। এই থ্রি সি মডেল (Care, compassion & Charity) অনুযায়ী রোগীকে মেডিক্যাল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ধরে নিয়ে মেডিক্যাল দর্শন একজন চিকিৎসককে শেখায় কিভাবে সে রোগীর মধ্যে এক যন্ত্রণাকাতর সহনাগরিককে দেখতে পাবে। এইবার আসছে তৃতীয় চ্যালেঞ্জ। 

কনজ্যুমার প্রটেকশন এক্ট বা ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড এর যত যাবতীয় ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে মা উড়ালপুলের ওপর আকস্মিক হৃদ রোগে আক্রান্ত সহ নাগরিক কে সিপিয়ার প্রয়োগ করে যে চিকিৎসক বাঁচিয়ে তুললেন, জনগণের যাবতীয় জয়ধ্বনির মাঝে তিনি সেই নিঃসঙ্গ মানুষ যিনি জানেন মেডিক্যাল এপিস্টেমলজি বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞানতত্বের সীমাবদ্ধতা ঠিক কতটা। ওই রুগী বেঁচেছে বলে একই পদ্ধতি প্রয়োগ করে পরবর্তী রুগী টিকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। 

কোন রোগকে নিরাময় করতে যখন একজন চিকিৎসক ব্যর্থ হ'ন তখন তার সামনে কি কি পথ খোলা থাকছে আসুন একবার দেখা যাক। মেডিক্যাল রাশিবিজ্ঞানের প্রয়োগ হয়তো বলছে ওই নির্দিষ্ট রুগীর আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা মাত্র দুই শতাংশ। এই তথ্যটি অবিকৃত, অবজেক্টিভ ভাবে রুগী বা তার বাড়ির লোকের কাছে উপস্থাপন করাই কোনো মানবিক চিকিৎসকের আদর্শ কাজ হতে পারে না। রুগীর বা তার বাড়ির লোকের সাথে সংলাপ এর সাবজেক্টিভ ভাষ্য সেই চিকিৎসককে সেই রুগীর জন্য আলাদা করে প্রস্তুত করতে হয়। প্রব্যবিলিটির থিওরি প্রয়োগ করে কোন নির্বিকল্প একাডেমিক ডিসকোর্স হচ্ছে না। একটি মানুষের বাঁচা মরা এবং অবধারিত মৃত্যু হলে তার শেষ দিনগুলোর জন্য একটা টার্মিনাল ট্রিটমেন্ট প্ল্যান বা পরিকল্পনা তৈরি হয় ওই সংলাপের মধ্যে দিয়ে।

ডাক্তার যেখানে নিরাময়কারী নয়, পেশাদার গ্রিফ কাউন্সিলর মাত্র। অন্ততঃ হাজার খানেক স্টাডি আছে যেখানে রুগী বা তার বাড়ির লোক চিকিৎসকের ডিগ্রি এই সাথে তার ব্যবহার, সমবেদনার ভাষা জানানোর ক্ষমতাকে একজন 'ভালো ডাক্তার" আখ্যা পাওয়ার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে ঘোষণা করেছে। এই বার আসছে চতুর্থ চ্যালেঞ্জ। 

সমাজ সভ্যতার যে বিকৃত অগ্রগতি একই সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটিয়েছে আর একই সাথে স্বাস্থ্য কে মৌলিক অধিকার থেকে রূপান্তরিত করেছে পণ্যে, সেই শীর্ষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে একজন চিকিৎসকের কতটুকু ক্ষমতা আছে সমবেদনার সেই বয়ান ভাষ্য রচনা করার। প্রিয়জনের মৃত্যু তে শোকে অধীর, সাধ্য অতিরিক্ত ব্যয় করে বাঁচাতে না পারার জ্বালা যন্ত্রণায় অস্থির ক্রুদ্ধ জনতার সামনে একজন চিকিৎসক তো অসহায় নিগ্রহের বস্তু, যার ছাল চামড়া ছাড়িয়ে না নেয়া অবধি ওই জনতার শান্তি নেই, "আমি তোমাদের লোক" বলে তাঁকে কেউ ভাবছেই না। 

এত চ্যালেঞ্জের পরেও তাহলে এই পেশায় আসে কেন কেউ? বেশ কিছু পেশা আছে, মানুষ নানা কারণে বেছে নিতে বাধ্য হয় যাতে তার ছাত্র জীবনের অধিত বিদ্যে কাজে লাগে না। ফিজিক্স অনার্স পড়ে ব্যাংক এর চাকরি, ইলেকট্রনিকস এ এম টেক হয়ে মৎস দপ্তরের আইএএস সচিব। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এম বি এ করে টুথ পেস্ট বিক্রি। সে দিক দিয়ে ডাক্তারদের বেশির ভাগই সৌভাগ্যবান। যা শিখেছে, সেটাই রোজ কাজে প্রয়োগ করতে হয়। ডাক্তারি পাস করার প্রত্যেকটা পরীক্ষা খুব ভয়াবহ হয়। প্রচুর ফেল করে, সাপ্লি পায়। এপ্রোন পড়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আট ঘন্টা ধরে ভাইভা আর প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দিতে হয়। যারা দিয়েছে, তারাই জানে সেই নরক যন্ত্রণা কাকে বলে। ফাইনাল পাশ করে যাওয়ার পরে মনে হয়েছিল আঃ কি আরাম, এসব থেকে মুক্তি। কেউ সেদিন বলে দেয়নি যে মুক্তি নেই, এই সবে শুরু। সারা জীবন, রোজ, অসংখ্যবার ওই পরীক্ষায় বসতে হবে।

যেমন ধরা যাক সামান্য জ্বরের রোগী (যদিও সামান্য জ্বর বলে কিছু হয় না)। ডাক্তার অনেক কিছু দেখে ভেবে ওষুধ লিখলেন। জ্বর না সারলে ফেল। সাধারণ থেকে জটিল অস্ত্রোপচার, কথাই নেই, প্রত্যাকটাই এক একটা পরীক্ষা। অসফল মানে রুগীর মৃত্যু। তবুও সারা পৃথিবী জুড়ে, ভারত জুড়ে, অসংখ্য ডাক্তার রোজ কত বার এই পরীক্ষায় বসে স্বেচ্ছায়। মার্কশিট মহাকালের হাতে। পাশ না ফেল, সেটার ওপর নির্ভর করে একটা পরিবারের ভবিষ্যৎ। সবটা জেনে বা না জেনে, এই পরীক্ষায় বসতেই হয়। সিন-আনসিন, কমন-আনকমন যে কোনো প্রশ্ন আসতে পারে। এক্সামিনেশন হল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সেই কুড়ি বছরের নার্ভাস তরুণ বা তরুণী যে ভাবে এক্সাম হলের সামনে অপেক্ষা করতো, বাঘা বাঘা সব এক্সামিনারের নানা প্রশ্ন ফেস করার আশংকায় তার হাতের তালু ঘেমে যেত, ঘন ঘন জল তেষ্টা পেত, সেই রকম নার্ভাস না হলেও, প্রতিবার একজন নতুন রুগী নামক প্রশ্নপত্রের সম্মুখীন হওয়ার সময় বুকের স্পন্দন সামান্য হলেও দ্রুত হয়, কি একটা আবেগ তিরতির করে কাজ করে। নিজের হার্টবিট এর শব্দ নিজেই শুনতে পায় সেই ডাক্তার। প্রত্যেকবার তাকে যে করেই হোক, পাশ করতেই হবে, ফেলের কোনো জায়গা নেই।

অসফল হওয়ার আশঙ্কায় ভুগে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পরার ঝুঁকি নিয়ে, সফল হওয়ার তাগিদে অসম্ভব পরিশ্রমের ফলে বয়সের আগেই বুড়িয়ে গিয়ে, ফুরিয়ে গিয়ে, বার্নট আউট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও জীবন মৃত্যুর এই খেলায় একজন চিকিৎসক জয়ী হতে চায়।  নিজের বুকে স্টেথো বসিয়ে সে নিজেই শুনে নিতে চায় তার হৃদয়ের সেই শব্দ যেটা বলে দেয় যে সে চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত, সে সুখী হতে চায় না, জয়ী হতে চায়। সুখী চিকিৎসক দিবস বলে কিছু নাই। নো হ্যাপি ডক্টরস ডে।